মৌরি কাল অনামিকার কথাগুলো অনেক ভেবেছে। আর এখন তারও মনে হচ্ছে অনামিকার কথাগুলোই ঠিক। মেজর কোনো ঝামেলায় আছে। কোনো মিশনে আটকা পড়েছে হয়তো। নাহয় কেন এতগুলো দিন তাকে নিতে আসবেনা। কথা তো দিয়েছিল তাকে সসম্মানে পরিবারের কাছে চেয়ে নিবে। নিশ্চয় দরকারি কাজে আটকা পড়েছে। আচ্ছা কোনো বিপদে পড়েনি তো? খুব চিন্তিত দেখায় তাকে কথাটা মাথায় আসতেই।
কিছুদিন পর,
ঘরভরা হালকা ঠান্ডা। শীতের সকালে জানালা দিয়ে সূর্যের প্রথম কোমল আলো এসে পড়েছে মৌরির ঘরের এক কোণে পড়ার টেবিলে। সেই আলো সরু রেখার মতো ছড়িয়ে পড়েছে টেবিলে রাখা বইয়ের স্তূপের উপর। মৌরির মনে হচ্ছে যেন সূর্য উঠেই বইগুলিকে শুভ সকাল জানাচ্ছে।
বইগুলোর ওপরে একটি জীবন্ত উজ্জ্বল লাল রঙের গর্বেরা ফুল দেখা যাচ্ছে, কোনোরুপ তীব্রতা ছাড়ায় নরম, উষ্ণ রোদে ভেজা এক প্রশান্তিতে ফুলের পাপড়িগুলো আলোয় ঝলমল করছে।
ঘরে একটু আগেও হালকা কুয়াশার ছোঁয়া ছিল, এখন আলো সেই কুয়াশা সরিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। বাইরের হিমেল হাওয়ার সুর জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ফুলের পাপড়ি একটু দুলিয়ে দেয়।
এই বাড়ির আনাচে কানাচে ফুঁলের টব রাখা যাবে এমন কোনো ফাঁকফোকর অযথা ফেলে রাখা হয়নি। সবখানেই নানান ফুঁলের টব লাগানো। ছাঁদে তো আছেই অসংখ্য ফুল গাছ, সাথে বাড়ির আঙিনায়। এসব মৌরিরই কাজ। ফুল জিনিসটা তার এত ভালো লাগার! নেম প্লেট দেখার আগ অব্দি যে কেউ নির্দ্বিধায় এ বাড়ির নাম ‘ফুলবাড়ি’ ধরে নেবে। তবে আফসোস, বাড়ির নামখানা সওদাগর বাড়ি।
মৌরি একাডেমিক বই পড়ছে শীতের আদিত্যের নরম সরু সোনালি আলো সামনে রেখে। খুব আরামে পড়তে পারছে সে এই উষ্ণ নরম রোদে গা ভিজিয়ে। পড়তে পড়তে ব্যল্কনি থেকে পুঁই পাখির সুরেলা কণ্ঠ কানে আসে - ‘মেজর উষি পরি মেজর উষি পরি সুন্দরী।’
মৌরি জানেনা এই পুঁই পাখি হঠাৎ এসব শিখলো কোথা থেকে। অবশ্য হঠাৎ-ও না। সেদিন আনমনে যখন মেজরের নাম নেয় পুঁই পাখির সামনে। তখন থেকেই শুরু করেছে এই শব্দগুলো জিকির করা। মেজর, পরি, সুন্দরী- সব বুঝলো। কিন্তু এই উষিটা কি, তা সে জানেনা। অদ্ভুদ এক মায়াবী অনুভূতি হয় তার ভেতরে এই শব্দখানা শুনলে। মনে হয় যেন শব্দটার সাথে তার আত্মার টান। মৌরি পুঁই পাখিকে জিজ্ঞেসও করেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু অবুঝ পাখিটা প্রতিবার এই শব্দগুলোই উচ্চারণ করে। তাই এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে মৌরি। কি জানি কে এই উষি। মৌরির কাছে আসার আগে যেখানে ছিল পুঁই পাখি, সেখান থেকে শিখেছিল হয়তো।
মৌরি পড়ছে, এমন সময় চাচ্চুর ছেলে মৃন্ময় দৌড়ে দৌড়ে আসে। বারো বছরের মৃন্ময় দেখতে বেশ গুলোমলো ধরণের। সে এসে বোনকে জানায়,
-”আপু, তুলি আপু আর দীপ্ত ভাইয়া এসেছে। নিচে চলো।”
বোন এসেছে শুনে মৌরি লাফিয়ে উঠে বই রেখে। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
-”সত্যি? কবে এসেছে? তানিম-তোহাও এসেছে?”
-”হ্যাঁ, বাচ্চাদের নিয়েই এসেছে। তাছাড়া বাচ্চাদের ফেলে ওরা স্বামী স্ত্রী আসবে নাকি একা? এখনো বুদ্ধি হলো না তোমার।” মৃন্ময় বোনকে ভেঙিয়ে বলে। সাথে সাথে মাথায় গাট্টা পরে।
-”খুব বড় হয়ে গেছিস, ফাজিল!” মৌরি
দুজনে নিচে চলে যায়।
-”তানিম-তোহা কই?” সিঁড়ির বেয়ে নিচে নামতে নামতে মৌরি তার ভাগিনা ভাগিনির নাম ধরে ডাকে।
-”এই তো খালামণি। এসেছি।” দুজনে ঝাপিয়ে পরে মৌরির বুকে। মৌরি আগলে নেয় তাদের। আদর দেয়, চুমু খায়।
-”লক্ষীসোনারা কেমন আছে?” মৌরি তাদের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে এলোমেলো করে দেয়। এটা তার অভ্যাস। তার ভাগিনা-ভাগিনিও খালামণির এই অভ্যাসের সাথে অভ্যস্ত।
-”আমি তুউব ভালো। তুমি তেমন আতো?” তিন বছরের তানিমের আদো আদো শব্দে প্রশ্নের বিপরীতে মৌরি আগে তার গালে একখানা চুমু এঁকে দেয়। তারপর তাকে কোলে নিয়ে বোন আর বোন জামাইয়ের কাছে যেতে যেতে বলে,
-”আমি তো তোমার মতো তুউব ভালো আছি, তানিম সোনাকে দেখে এখন আরও ভালো।” তোহাও তার পেছন পেছন আসে। কুটুর কুটুর পায়ে হেঁটে আধো আধো কণ্ঠে নানান কিছু বলে দুজনে খালামণিকে।
-”হয়েছে, এবার ছাড়ো দুজনে খালামণিকে। ভারী কাপড় খুলে দিই। গরম লাগবে।” মৌরির মা কথাটা বলে নাতি নাতনিদের নিয়ে নেন। গরমই লাগবে। এখনো অতোটাও শীত পড়ছেনা যে উলের কাপড় পরে থাকতে হবে এই দিনের বেলা। ভারী পোশাক ছেড়ে দুজনে মৌরির চাচ্চুর দুই ছেলে মেয়ের সাথে ব্যস্ত হয়ে পরে।
-”তো শালী সাহেবা, কি খবর তোমার? সব ঠিক ঠাক?” দীপ্ত
বোন জামাইয়ের প্রশ্নে মৌরি সোফায় বোনের পাশে বসতে বসতে বলে,
-”একদম, তোমাদের দেখে আরও বেশি। কিন্তু আজ আসবে শুনিনি তো। আগে থেকে আসার কথা ছিল নাকি আজ?” মৌরি
-”আরে না। কালই ঠিক করলাম। হঠাৎ প্ল্যান, আর হঠাৎ আসা।” দীপ্ত
-”শুধু মাকে জানিয়েছিলাম” তুলি
-”ওহ” মৌরি মাথা নাড়ায়
-”হু, কিন্তু মৌরি। বোন আমার, তুমি সেবার কক্সবাজার যে কাণ্ডটাই না ঘটালে। আমার এখন শ্বশুরবাড়ি আসতেও ভেতরে ভেতরে লজ্জা করে। তাদের মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে ফেললাম। এখনো তারা জানেনা ঐ ঘটনা। আমার তো ঐ দিনের কথা ভাবলে এখনো পিনিক উঠে যায়।” দীপ্ত হাসতে হাসতে সেদিনের কথাটা বলে। মৌরি লজ্জ্বা পেয়ে যায়। এখনো বাড়ির কেউ জানেনা। বলেনি তারা, যে তাদের মেয়ে ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে গেছিল।
নানান কথাবার্তার মধ্যে মৌরির মা-চাচী মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের জন্য নাস্তা-পানি নিয়ে আসেন। তারপর সবাই মিলে গল্প গুজবে বসে যান। মৌরির বাবা আর চাচ্চু দুপুরে বাড়ি আসবেন। কথায় কথায় মৌরি জানতে পারলো আর দুই/তিন দিন পর তার ভাই অর্ণবও চলে আসবে মেডিকেল থেকে। সে ঢাকা মেডিকেলে পড়ে। থাকেও ওখানে। আর তাদের বাড়ি চট্টগ্রাম।
ভাইও আসবে শুনে মৌরির খুশি হওয়ার কথা হলেও সে আদতে খুশি হতে পারলো না। বোন আর বোন জামাইয়ের হঠাৎ আসা, তারপর ভাইও আসবে। তার মনে ভয় ঢুকে। বিয়ের বিষয়টার জন্য এত জরুরী তলব নয়তো সবার?
যা ভেবেছিল তাই হয়েছে। দুদিন পর মৌরির ভাই অর্ণব আসে। সেদিনও সে আগের বারের মতো আবার দীপ্ত ভাইয়া আর অর্ণব ভাইয়ার সাথে বাবা চাচ্চুর কথোপকথন শুনে নেয়। শেষবার যে প্রস্তাবটা নিয়ে কথা বলতে শুনেছিল। ওটা নিয়েই ভাবছেন তারা। তার ভাই আর বোন জামাই আর এক থেকে দুদিন সময় চেয়েছে। তারা নিজেরা আরও কিছু খোঁজখবর নিয়ে তবেই মৌরিকে জানাবে, আর তার সম্মতি নিয়েই দেখাদেখি পর্যায়ে যাবে।
মৌরি এসব শুনে চিন্তায় পড়ে যায়। কি করে সে এসব আটকাবে? কাকে গিয়ে জানাবে যে সে বিবাহিত! তার স্বামী আছে। বাবা মাকে জানানো যাবেনা। না তো ভাইয়াকে জানাতে পারবে সে এসবের কিছু। মৌরির ভাই যদিও খুব বুঝদার ছেলে। সব দিক বিবেচনা করতে পারে সে শীতল মস্তিষ্কে। তবে মৌরির ভাইকে গিয়ে সবার অজান্তে বিয়ে করে নিয়েছে এটা জানানোর সাহস নেয়। শুধু ভাইকে কেন? কাউকেই বিয়ের কথা জানাতে পারবেনা সে। ভাই, বোন কিংবা দুলাভাই -কাউকে না। তাহলে বিয়ে আটকানোর উপায়?
মৌরির ভীষণ দুশ্চিন্তা আর দ্বিধার সাথে সময়গুলো কাঁটছে। কিভাবে এই বিয়ের বিষয়টা সামাল দেবে তা সে জানেনা। চিন্তায় চিন্তায় মাথা ফে ‘টে যাওয়ার জোগাড়। অথচ মেজরের কোনো খবর নেই। লোকটার কি তার কথা মনে পরছেনা একটুও? সে কি অনুভব করতে পারছেনা মৌরি বিপদে আছে; দুশ্চিন্তায় আছে!!
———
-”সোনা মা, খেয়ে নাও মা। আমার লক্ষ্মী। ঐ দেখো পাখি, দেখো দেখো।”
বাচ্চাটির হাসি নেই; বদলে সে মুখ ফিরিয়ে নিল। ছোট ছোট আদুরে হাতের বৃ্দ্ধাঙ্গুলটি মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। চুক চুক শব্দ করে চু ‘ষতে থাকে। যেন অতি সুস্বাদু চকলেট খাচ্ছে; চোখ ভেজা। বোঝায় যাচ্ছে অনেক কেদেছে। টলমল চোখে আঙ্গুল চু ‘ষতে চু ‘ষতে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঠোঁট ভেঙে হঠাৎ আবার কাঁদতে শুরু করে। মহিলার মুখে খামচি দিতে শুরু করে, চুল টানতে থাকে। তিনি এটা সেটা বলে বাচ্চাকে দোলাতে দোলাতে কোনোরকম নিজেকে ছাড়িয়ে নেন।
-”ঐ দেখো পাখি মা। কি সুন্দর পাখি। এইইই পাখি…… এদিকে এসো। সোনা মাকে ডানায় করে নিয়ে যাও। সে কাঁদে। মামাণিকে মারে। ভীষণ দুষ্টু, প ‘চা মেয়ে।”
এমন নানান অসংলগ্ন কথা বলে বাচ্চাটির কান্না থামাতে চায় মহিলা। কিন্তু বাচ্চার কান্না থামাথামির নাম নেই। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও যখন পারেনা তখন না পেরে বাচ্চার বাবাকে ফোন দেয়।
——
সময়টা তখন রাত। চারদিকে ঝি ঝি পোকার শব্দ। শীতের রাত হওয়ায় তাপমাত্রা নিম্ন, কনকনে ঠাণ্ডা। গভীর অন্ধকার, যেন সময়টা কৃষ্ণপক্ষের অতল গহ্বরে আঁটকে আছে। জঙ্গলের দিকে অবস্থান। জঙ্গলের খড়খড়ে শুকনো পাতায় কয়েকজনের কদম ফেলার ভারী শব্দ শুনা যায়। খুব সতর্ক তাদের পদক্ষেপ। যেন কাক পক্ষীকেও নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে অনীহা। হঠাৎ অনুসন্ধানী চোখে কিছু একটা দেখে তাদের লিডার হাত দেখিয়ে থামিয়ে দেয়। প্রত্যেকে সেই ইশারা দেখে যার যার অবস্থানে থেমে যায়। নিঃশ্বাসও যেন নিচ্ছেনা এমন নিস্তব্দ চারপাশ।
বামদিক থেকে শাঁ করে তীব্র বেগে কিছু ছুটে আসছে অনুমান করতে পেরে তাদের লিডার আকস্মিক মাথা ঝুকিয়ে বসে পড়ে। গুলি ছুড়েছে কেউ। তবে তার গাঁয়ে লাগেনি। পেছনের গাছটি বেধ করে গেছে। শত্রুপক্ষ তাদের অবস্থান টের পেয়েছে বুঝতে পেরে প্রত্যেকে সতর্ক ভঙ্গিতে নিজেদের আড়াল করে নেয়। একজন লিডারের দৃষ্টি আঁকর্ষণ করে ইশারায় কিছু একটা বোঝায়। লিডার তা বুঝতে পেরে নিষেধ করে, এবং অনুসন্ধানী চোখে কিছু একটা খুজে নিজেই টার্গেট করে। আর লক্ষ্যভেদ করে প্রথম গুলিটা ছুড়ে। কারো আর্তনাদ স্পষ্ট কানে আসলো। অর্থাৎ নিশানা ঠিক জায়গায় লেগেছে।
এরপর শুরু হলো তীব্র ঘাত-প্রতিঘাত। রাত্রির স্তব্ধতা আর নেই; রাইফেল আর বন্দুকের গুলির আলোর ফাঁকে গাছপালা নড়ে ওঠে, ধোঁয়া বাতাসে মিশে যায়। সবকিছু তীব্র হাওয়ায় জানালার ঝাঁকে ঝাঁকে বারি খাওয়ার ন্যায় কাঁপছে। তাদের মাঝে কেউ পড়ে যায়, কেউ আবার উঠেই ঘাত-প্রতিঘাত চালিয়ে যায়। অনেকে আহত, মাটিতে র ‘ক্ত, গলায় ব্যাথা -তবু তাদের দল থামেনা; অদম্য মনোবল। অফিশিয়াল মিশন কম, প্রতিশোধই বেশি মনে হচ্ছে। প্রতিটা গুলি যেন কোনো পুরনো আঘাতের জবাব।
-“আহতদের নিয়ে যাও, ফিরে এসো না। কভার দরকার।” মেজরের ঠান্ডা কণ্ঠ
এক সৈনিক জরাজীর্ন গলায় বলে,
-“মেজর, শাহিন। পায়ের কাছে আঘাত, বেশ র ‘ক্ত।”
মেজর ছুটে এসে বিমর্ষ হয়ে বললেন,
-“চাপ দাও, ব্যান্ডেজ লাগাও। দু’জন অ্যাফোর্ডেবল করে পিছনে পাঠাও। মেডিক্যালকে জানাও। কুইক।”
ঘন্টাখানেকের টানা লড়াই শেষে, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। শত্রুপক্ষ ঠেসে পড়েছে। তাদের আক্রমণের তীব্রতা কমছে। গোলাগুলি অনিবার্যভাবে মলিন হয়ে এল। শেষে মেজরের আদেশ কণ্ঠে কানে আসে,
-“স্ট্যান্ডডাউন।” সবাই ধীরে ধীরে অস্ত্র ঝোলা শুরু করল, কজনের কণ্ঠে ক্লান্তি।
মেজর একবার দলকে ঘুরে দেখে বললেন,
-“কিছু সৈনিক আহত হয়েছে; তবে শত্রুপক্ষকে গায়েল করাও সম্ভব হয়েছে। এখন নিজেদের আয়ত্তে নাও। আহতদের সেফলি পাঠাবে। আমি কভার রেখে এসেছি। আস্তানায় গিয়ে এবার আমরা মেইন কালপ্রিটকে ধরব। এটা বহু অপেক্ষার মিশন ছিল। প্রতিশোধ আমার, ব্যক্তিগত ক্ষোভও থাকলে আমার থাকার কথা। তোমাদের নয়, এটা মাথায় রাখবে। তাই প্রফেশনালিজম মেন্টেইন করা চাই। সুস্থভাবে যেন আটক করা হয়। আমার প্রিয় মানুষ, আমার পরিবার -তাদের ন্যায় বিচার আমি দেবো, ছাড় নেই। তাই তোমরা আবেগে হটকারিতা করবেনা আশা করছি।” মেজর সবাইকে আরও একবার সচেতন করে দিলেন।
শত্রুপক্ষের অধিকাংশকে যেহেতু গায়েল করা সম্ভব হয়েছে, তাই এবার মূল আস্তানায় গিয়ে মেইন কালপ্রিটকে ধরা সহজ। ইতোমধ্যে আস্তানা ঘেরাও করা হয়েছে। আধ ঘণ্টার মধ্যে মূলহোতাকে আটক করার লক্ষ্য তাদের। তাকে সুস্থ আর জীবিত আটক করা মেজরের জেদ। অবশেষে পূর্ণ হবে। মেজর প্রশান্তির শ্বাস টানেন। বহুল প্রতিক্ষার দিন আজ। প্রিয় মানুষ, পরিবার, আপনজন প্রত্যেকের অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়ার দিন। বহু পরিকল্পনার মিশন ছিল। তার সুখের জীবন শেষ করে দেওয়া অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মিশন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই একজনের চেহারা ভেসে উঠলো তার চোখে। ভাসা ভাসা মায়াবী ঐ চোখের ব্যক্তি। যে এক জড়ো হাওয়ার দিনে তার জীবনে এসে শেষ দিন অব্দি তাকে সর্বোচ্চ সুখ দিয়েছিল, আবার হারিয়ে গেছে। ঐ মানুষগুলোর কারণে হারিয়ে যেতে হয়েছে। আপনজনেরা কেউ নেই এখন। সবাইকে শেষ করে দিয়েছিল তারা। আর আজ তাদের শেষ করার দিন শুরু হলো।
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া গাঁয়ে লাগতেই আবার ঐ চেহারাটা মাথায় ঘুরপাক খায়। আর একরাশ প্রশান্তি তার গা ছুঁয়ে যায়। হাওয়ার সুরেরা বলে গেলো, ‘এবার অপেক্ষার প্রহর শেষ। আর কোনো বাঁধা নেই। তাকে নিয়ে আসাটা বাকি শুধু।’
রাতের নিস্তব্দ আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে ভাবা ভাবনাদের রেশ কাঁঁটাতে হয় পকেটে ফোনের কম্পন বুঝতে পেরে। সাইলেন্ট ছিল। মেজর ফোনটা বের করে রিসিভ করেন।
-”ও কাঁদছে বেশি।” ফোনের ওপাশে মহিলার চিন্তিত কণ্ঠ।
মেজর শীতল কণ্ঠে বলেন,
-”ওর কানে ধরো ফোন।”
ফোনের ওপারে ছোট্ট কণ্ঠ আঁচড়ে ওঠে,
-”পা পা,”
মেজর কণ্ঠে আদর মিশিয়ে বলে,
-“না না, আর কাঁদেনা। পাপা তুমি কি চাও? পাপাকে বলো, আমি নিয়ে আসছি। পাপা আসবে তোমার কাছে। আর খুব শীঘ্রই তোমাকে মাম্মাও এনে দেবো। কাঁদেনা পাপা। মাই ব্রেইভ গার্ল, নো ক্রাই, অনলি স্মাইল ওকে? ডোন্ট ক্রাই সোনা। পাপা ফিল হার্ট হয়্যেন ইউ ক্রাই।”
আদুরে স্বরে আরও কিছু বোঝায় বাচ্চাটিকে।
বাচ্চাটি কি বুঝলো জানা নেই। তবে বাবার কণ্ঠেই বোধ হয় শান্ত হয়ে গেলো। মেজর তা বুঝতে পেরে স্বস্তির শ্বাস নেন। মহিলাকে বলেন,
-”রাইমা, টেক কেয়ার অফ ইউরসেল্ফ এন্ড মাই ডটার। আমি আসছি।”
কল কেটে গেল। মেজর কিছুক্ষণের জন্য সরে দাঁড়িয়ে কণ্ঠে এক দীর্ঘশ্বাস টেনে নিলেন;চোখে অদৃশ্য পানি জমল।
দূর থেকে মেড টিমের হোওপা-হোওপা শোনা যাচ্ছিল; আহত সৈন্যদের সেফলি ট্রান্সফার শুরু হল। জঙ্গলের ভিতর সেই গোপন আস্তানার দিকে তাদের দল ধীরে ধীরে এগোলো। মিশন কখনো সহজ না, কিন্তু মেজরের হৃদয় শান্ত। আজকের দিনটা তার বহু দিনের অপেক্ষার প্রতিশোধমূলক খণ্ড। আর সামনে ঘুরে বাচ্চার কান্না থামানো, সান্ত্বনা দেওয়া সেই কথাটা- ‘তাকে মা এনে দেবে।’