হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ৩১

🟢

শ্রেয়সী টুপটাপ চুমু খাচ্ছে স্বামীর গালে। ঠোঁটের কিনারায়, অন্য গালে, কপালে, চোখের পাতায়, চিবুকে– কোনো স্থান বাদ রাখছেনা। এলোপাতাড়ি চুমুর বর্ষণে ভরিয়ে দিল।

দীদুনের মারা যাওয়ার ঐ মুহূর্তটা হাসির মতো না হলেও, উমরান বউকে শান্ত করতে ওভাবে বলছিল। কিন্তু অকস্মাৎ এহেন আক্রমণে সে থেমে থাকে। শ্বাস আঁটকে থাকে তার।

শ্রেয়সী একের পর এক আদুরে স্পর্শ দিয়েও থামছেনা। শেষে ঠোঁটের কিনারায় ঠোঁট বসাতেই,

_”আহ!” শব্দ করে থেমে গেলো। পাশ থেকে কোমর আগলে উমরান অকস্মাৎ দৃঢ়ভাবে নিজের ওপর উঠিয়ে নিয়েছে তাকে। শ্রেয়সী কোমরে ঐ দৃঢ় স্পর্শে আর্তনাদ করে উঠে।

_”থেমে যাও শ্রেয়সী। এখানে কিছু করতে চাইছিনা। আমরা বাড়িতে নেই ভুলে গিয়েছ?”

শ্রেয়সী সে কথায় কর্ণপাত করলো না। তার কানের কাছে মুখটা এগিয়ে নিয়ে নিম্ন কণ্ঠে বলে,

_”ভালোবাসি মেজর।” কানের সাথে অধর স্পর্শ করে গেলো। উমরান শক্ত হয়ে আছে। শ্রেয়সী সেই অবুঝ থাকাকালীন এভাবে না বুঝে কাছে চলে আসতো। উমরানকে নিজের চঞ্চলতাময় স্পর্শে সেই সময়ে ক্ষণে ক্ষণে কম প্রলুব্ধ করেনি। কিন্তু সে সামলে থাকতো, কারণ উপযুক্ত সময় ছিল না। এরপর কতো কী হয়ে গেলো!

সেই শ্রেয়সী সর্বোচ্চ সুখের ফোয়ারা তার হাতে তুলে দিয়ে হারিয়ে গেলো, আবার ফিরেও এলো। কিন্তু আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের বাচ্চামি স্বভাবে তাকে মাতিয়ে রাখেনি। না তো এমন প্রেমময় স্পর্শ দিয়েছে নিজ থেকে।

যা পেয়েছে সেসব তো উমরান নিজেই আদায় করে নিয়েছে প্রতিবার।

তাই বুঝি আজ বউয়ের সামান্য চুমু দেওয়াতেও এত কেঁপে কেঁপে উঠছে তার বুকটা।

শ্রেয়সীর কোমরে রাখা তার হাতের স্পর্শ গাঁঢ় হচ্ছে ক্রমশ। আর বিচরণ স্থান প্রসারিত হচ্ছে আশেপাশে। একহাতে তার মুখটা সামনা সামনি কাছে এনে বউয়ের প্রেম নিবেদনময় বাক্যের বিপরীতে বলে,

_”তোমাকেও ভালোবাসি সোনা। কিন্তু এভাবে যে সিডিউস হচ্ছি আমি!” বুকের উপর থাকা শ্রেয়সী তখন সেই বুকের কম্পন স্পষ্ট টের পাচ্ছে, শার্টের ফাঁক দিয়ে ওখানটাই হাত গলিয়ে রাখে। আঙ্গুলের নড়চড়ে গভীরভাবে ওখানটাই কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করে সে।

উমরান সেই হাতের উপর হাত রেখে গাঁঢ় শ্বাস টানে, ফিসফিস করে বলল,

_“এখন আমরা বাড়ি নেই শ্রেয়সী। উষিকে অন্য কোথাও রাখা যাবেনা। আর আমি সিডিউস হচ্ছি জগন্যভাবে। থেমে যাও প্লিজ।” শ্রেয়সী তৎক্ষণাৎ মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকায়,

_”ইশ! কিছু করতে পারিনা, ওমনি সিডিউস হতে হয় আপনার।”

_”আপনি রাস’বেরির মতো ঠোঁট দুটো দিয়ে জায়গায় জায়গায় ছুঁয়ে দেবেন, আর আমি সিডিউস হতে পারব না?” শ্রেয়সীর নাকে নাক ঠেকিয়ে বলে উমরান।

_”না পারবেন না, আমি আপনাকে অনেকগুলো চুমু দেবো। আর আপনি চুপচাপ নেবেন।” জেদী কণ্ঠে কথাগুলো বলে সে ফের অনবরত অধরজোড়া দিয়ে স্বামীকে ছুঁয়ে দিতে আরম্ভ করলো।

উমরান সেই স্পর্শ নিতে নিতে তার পিঠে রাখা হাতটা দৃঢ় করে, শান্ত কণ্ঠে বলে,

_”আমি শুরু করলে আর মানা করেও কুল পাবেনা শ্রেয়সী। ছেড়ে দাও আজকের জন্য। কাল সকালে… আচ্ছা ভোরেই চলে যাবো বাড়িতে, তখন শুধু আমার চেহারায় আর বুকে না। আরও অনেকভাবে অনেক জায়গায় তোমার চুমু নেবো। এখন ছেড়ে দাও” বলতে না বলতে শ্রেয়সী হেসে দিয়ে তার অধর দুটোতে স্বীয় অধর চেপে ধরে। ছোট ছোট স্পর্শ দিতে দিতে দৈবাৎ নিজের পিঠ বিছানায় আবিষ্কার করল। হঠাৎ তার সাথে কী হয়েছে বুঝে না উঠে সামনে তাকায়।

উমরান তাকে শুইয়ে দিয়ে উঠে বসেছে। শ্রেয়সীর ওপরে চলে আসল। কোনো কথাবার্তা ছাড়া গায়ের শার্ট খুলে বেল্টে হাত দিলে শ্রেয়সী চমকিত হয়ে হাত দিয়ে আঁটকে নেয়।

_”কী করছেন? পোশাক-আশাক খুলে ফেলছেন কেন?”

_”বুঝতে পারছ না?”

শ্রেয়সী বুঝেছে, সে বলে,

_”আপনি কী পাগল? উষি ঘুমাচ্ছে এখানে। দেখি পাশে আসুন। ঘুমিয়ে পড়ি দুজনে।”

উমরান তখন হাঁপাচ্ছে, অস্থির হয়ে সব খুলতে নিচ্ছিল। শ্রেয়সীর বাঁধা পেয়ে, আবার এই কথা শুনে আক্রমনাত্মক হয়ে এগিয়ে আসে তার মুখের দিকে,

_”এই তোমাকে আমি পিষে ফেলব কসম। ছলনা করছ আমার সাথে? আমাকে উত্তেজিত করে এখন ‘কী করছেন’ জিজ্ঞেস করো? নাটক করবেনা। এই মুহূর্তে তোমাকে চাই আমার।”

উমরান পাগলামি আচরণ করে শ্রেয়সীকে পেতে, কিন্তু এতটা বন্য আজ অব্দি হয়নি তার যতটুকু মনে পরে। অবাক হওয়ার সাথে সাথে শ্রেয়সীর হাসিও পেলো অধৈর্য পুরুষটিকে দেখে। সে হাসি আটকে বলে,

_”আশ্চর্য! নাটক কই করছি? আর আপনি এত ডেস্পারেট আচরণ করছেন কেন হঠাৎ? বউয়েরা ভালোবাসি বললে –সুন্দর সুন্দর কথা বলে তাদের কপালে চুমু দিতে হয়।” ঠোঁট চেপে হাসি আটকে সে বলে, “আর আপনি দেখি সোজা বেল্ট খুলছেন! আজব তো!”

সাথে সাথে কপালে অধৈর্য স্বামীর কষা ওষ্ঠজোড়ার স্পর্শ পেলো সে। পরপর দুহাতে ধরে তার দুগালেও দিল অধরের ছোঁয়া।

_”দিয়েছি, রাগ করো না। তোমাকে তো আমি এমনিতেও উঠতে বসতে চুমু দিই। নাও আরও দিলাম। কিন্তু আর থামাবে না প্লিজ।”

শ্রেয়সী তাও মানল না,

_”উহু, উষি উঠে যাবে। নতুন জায়গায় এমনিতেও ঘুমাতে চাইছিল না। আজ না।”

উমরান দাঁতে দাঁত চাপল।

_”এটা তো আমিও বলেছিলাম, শুনেছ তুমি? এই শুনেছ?”

শ্রেয়সী মানেনা,

_”না। আজ না”

_”আজই”

_”আমার কনসেন্ট নেই কিন্তু” সে ভ্রু উচিয়ে বলে,

_”না থাকুক” বলতে বলতে তার পোশাকের ভেতর হাত গলিয়ে অস্থিরভাবে ছুঁয়ে দিতে শুরু করেছে উমরান।

শ্রেয়সী হাত সরাতে চেয়ে বলে,

_”জোর করবেন?”

উমরান অনেকটা ডুব দিয়েছে শ্রেয়সীর মধ্যে। তার কোমল উদরে, নাভিদেশে– জিহ্বা, আর অধরের স্পর্শ দিতে দিতে উমরান প্রতিউত্তর করে,

_”করবো।”

শ্রেয়সী আবেশে চোখজোড়া বন্ধ করে জবাব দেয়,

_”জোর করে এসব মানে কিন্তু রেই’প”

_”হোক রেই’প”

_”কেইস করব আপনার বিরুদ্ধে।”

_”করো, তোমায় রেই’প করে তবেই হাজতে যাবো আমি।”

শ্রেয়সী চোখ মুখ কুঁচকে নাক ছিটকে উঠে,

_”ছিঃ! নষ্ট মন আর নষ্ট মুখ আপনার। যা তা বলে দেন।”

শ্রেয়সীর পোষাক সরাতে সরাতে,

_”হ্যাঁ আমার নষ্ট মন, আর নষ্ট সবকিছু। তোমাকেও নষ্ট করব এখন।”

শ্রেয়সী না হেসে পারছেনা লোকটার একঘুয়ে–জেদী কথাগুলো শুনে। দুদিন আগেও রান্নাঘরে দাড়িয়ে বলছিল তাকে নাকি পাগল করে ছেড়ে দেবে এমন কোনো মুহূর্তে। আর মোক্ষম সময়ে নিজেই পাগল হয়ে বসে থাকে।

ইতোমধ্যে দুজনে অনাবিল সুখের জগতে পাড়ি জমিয়েছে। চরম উন্মাদনার মুহূর্তে শ্রেয়সী মেয়েকে নড়েচড়ে উঠতে দেখে স্বামীকে থামতে বলে,

_”আ আস্তে আস্তে মেজর। উষি উঠে যাবে।”

কিন্তু উমরান সে কথা আদৌ কর্ণগোচর করেছিল কী না জানা নেই!

_________

শ্রেয়সীরা পরদিন ফিরে যায় নিজেদের ফুলবাড়ি নামক আপননীড়ে।

এসে জানল সারাকে তার বাবা এসে নিয়ে গেছে। শ্রেয়সী সারার চলে যাওয়ায় খুশি হলেও কর্নেল আঙ্কেল এসে তার সাথে দেখা না করে চলে গেলো বলে মন খারাপ করে। পরে ফোনে কথা বলে শ্রেয়সীকে মানিয়ে নেন কিবরিয়া সাহেব। আরেকবার এসে দেখা করে পুরোদিন সময় কাটিয়ে তবেই যাবেন বলে কথা দিলেন।

উমায়রা আগামীকাল স্বামী–সন্তান নিয়ে চাচা শ্বশুরের বাড়ি চলে যাবে। আগামী পরশু বিয়ের অনুষ্ঠান। তাই তারা কালই চলে যাবে।

এখন শ্রেয়সী মায়ের কাছে শেখা পদ্ধতিতে ডেজার্ট বানাচ্ছে ব্যস্ত হাতে; সাথে আছে রাইমা। সেদিন কী জানি রাঁধতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলেছিল অল্প করে। তারপর থেকে একা রান্নাঘরে আসা মানা তার —শ্বশুর শাশুড়ির নির্দেশ রাইমাকে সাথে রাখা।

ডেজার্টটি দুটি ফ্লেভারে বানিয়েছে সে। একটা সেমোলিনা কুনাফা, অন্যটা চকলেট কুনাফা। বাচ্চারা যাতে একটা পছন্দ না হলেও অন্যটা স্বাচ্ছন্দে খেতে পারে।

_”রাইমা… এটা টেস্ট করে দেখুন তো। চকলেটি ওটা ভালোই লাগছে আমার। কিন্তু সেমাই দিয়ে যে বানালাম? এটা কী পছন্দ করবে? আপুরা তো ওয়েস্টার্ন খাবারে অভ্যস্ত। এটা শুনলাম আরবীয় দেশগুলোতে বেশি জনপ্রিয়। উনাদের ভালো লাগবে তো?”

প্লেটে এক টুকরো নিয়ে রাইমাকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে শ্রেয়সী। রাইমা স্বাভাবিকভাবেই তা নিলো। চামচ দিয়ে অল্প একটু মুখে নিয়ে প্রশংসা করে,

_”আমার তো বেশ লাগছে উষির আম্মু। কিন্তু উনারা যেহেতু লন্ডনবাসী, তাই কেমন লাগবে বলতে পারছিনা। তবে সমস্যা নেই তো। চকলেটি ওটা দেবেন নাহয় সেমাইয়েরটা ভালো না লাগলে। ওটাও তো যথেষ্ট পরিমাণে বানিয়েছেন। বাচ্চাদের সাথে সাথে আপনারাও খেতে পারবেন, এত চিন্তা করবেন না।”

বলতে বলতে প্রস্তুত করে প্লেটে রাখা সবটুকু আস্তে আস্তে নিয়ে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখলেন। শ্রেয়সী নিজেও অন্য একটা প্লেট থেকে চামচ দিয়ে অল্প অল্প খাচ্ছে। তারও ভালোই লেগেছে। সে রাইমার কথায় মাথা নাড়ায়।

রাইমা আবার বলে,

_”তাছাড়া ভালো না লাগলেও দেখবেন খুশি খুশি খেয়ে নিচ্ছে সবাই। আপনি ভালোবেসে বানিয়েছেন যে!”

শ্রেয়সী হাসল এ কথা শুনে। আজ অব্দি সে যা যা নিজ হাতে বানিয়েছে তা এদিক ওদিক হলেও স্বানন্দে খেয়ে নিয়েছে সবাই; সাথে তাকে আশাবাদী দেখায় বলে প্রশংসা তো করেই। অথচ নিজে খেতে গিয়ে নানান কমতি টের পায় সে। বাড়ির কেউ একদিনও কোনো অভিযোগ করেনা। শ্রেয়সী তো কতোবার রান্না ভালো না হলে কিছু বলেনা বলে রাগও দেখায়। তার ভুলগুলো ধরিয়ে না দিলে কী সে নিখুঁত রাধুঁনি হতে পারবে কখনো? তাই এই নিয়ে মন খারাপ করে বলেওছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু যতক্ষণ বলে ততক্ষণই সেসব।

দুপুরে খাবার দাবার সেরে তবেই শ্রেয়সী কুনাফা দিয়েছে সবাইকে। তখন খাওয়া হয়েছে মাত্র। সবাইকে উঠে সোফায় বসতে বলে রাইমাকে দিয়ে ওসব আনায় শ্রেয়সী। টেবিলে রেখে এঁকে এঁকে প্লেটে নেওয়ার সময় সোফায় গিয়ে ভাতিজিকে নিয়ে বসা উমায়রা বলে,

_”শ্রেয়সী স্পেশাল কিছু বানিয়েছ নাকি আজ?”

_”হ্যাঁ আপু। এটা কুনাফা। পরশু মায়ের কাছে শিখেছি। আমার অনেক ভালো লাগে এটা। তাই ভাবলাম আপনাদের একবার বানিয়ে খাওয়াই।”

উমায়রা উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলে,

_”কুনাফা? এটা আমার অনেক প্রিয়। ইনফ্যাক্ট উমরানেরও। আমরা আগে অনেক খেয়েছি এটা। মা বানাত আমাদের দুই ভাই বোনের জন্য। কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিতাম জানো? অনেকদিন খাইনা। দেখি কেমন বানিয়েছ! তাড়াতাড়ি দাও। তর সইছেনা।”

শ্রেয়সী এঁকে এঁকে প্লেটে নিচ্ছে। আর আরাবি তার পাশে দাড়িয়ে সবটা দেখছে। চকলেট কুনাফা খেতে অধীর আগ্রহী সে। এমির তার মায়ের পাশে। রাতে গেইম’স খেলে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত হয়ে গিয়েছিল। তাই ঘুম পাচ্ছে তার, কিন্তু উষশীর তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকানো দেখে তার সাথে কথা না বলে পারছেনা। গাল টেনে টেনে নানান কথা বলছে সে। উমায়রার স্বামী পাশে বসে ফোনে কিছু দেখছে।

শ্রেয়সী একটা প্লেট রাইমার হাতে দিয়ে উমায়রাকে দিতে পাঠাল। আরও স্লাইস প্লেটে নিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে ননদের কথার বিপরীতে বলে,

_”আপনার ভাইয়েরও? কই সেদিন আমাদের বাড়িতে মা এটা বানিয়েছিল; খেয়েওছে। বলেনি তো?”

_”বলেনি? অনেকের মধ্যে ছিলে তাই হয়তো। বাট এটা ওর অনেক প্রিয়।” উমায়রা চামচ দিয়ে অল্প করে মুখে নিয়ে বলে, ”উম, ইট’স সো টেস্টি শ্রেয়সী। অনেকদিন পর মায়ের হাতের কুনাফা খাচ্ছি মনে হলো।”

তাহুরা চৌধুরী টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বেসিন থেকে এসে সোফায় একপাশে বসেন।

_”আমাকেও এক প্লেট দাও তো বউমা; সেমাইয়ের-টা। কেমন বানিয়েছ দেখি। অনেকদিন বানানো হয়না এটা। উমায়রার বিয়ের পর হাতে গোনা কয়েকবার বানিয়েছিলাম শুধু, তাও ও বেড়াতে এলে তখন। উমি তো ওর বিয়ের পর বানালে সেভাবে খেতইনা। বোনকে ছাড়া নাকি তার দুজনের প্রিয় খাবার খেতে ইচ্ছে করেনা।”

উমায়রা হাসল খেতে খেতে। তার ক্ষেত্রেও একই বিষয়টা। ভাইকে ছাড়া জমেনা। তাই নিজেরও সেভাবে বানিয়ে খাওয়া হয়নি। আজ বহুদিন পর শ্রেয়সীর বানানোতে তর সামলাতে পারল না।

এঁকে এঁকে সবাইকে দিল শ্রেয়সী। অল্প অল্প করে দুই স্বাদেরই খেলো সবাই। উমায়রার স্বামী বলে,

_”স্বামীকে জানাওনি তার ফেভারিট ডেজার্ট বানিয়েছ? এখনো আসছেনা যে? আমরা খেয়ে ধেয়ে উঠে গেলাম। বাবা-উমরান কেউ দেখি এলো না এখনো।”

_”উনার আসতে আসতে তিনটা বাজবে ভাইয়া। বাবার সাথে হস্পিটালে কোনো জরুরী মিটিং এ আছেন জানাল। আপনারা খেয়ে নিন। তিনটা বললেও উনাদের আসতে আসতে চারটা পেরিয়ে যাবে।”

সবাই খেয়ে ধেয়ে নিলো। বিকেলে তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন এলো। তাহুরা চৌধুরী ফেরার পর থেকে ফুলবাড়িতে নানান অতিথির আনাগোনা হচ্ছে। তেমন আজও এসেছে কেউ কেউ। ভালো মন্দ খবর নিয়ে গল্পগুজব করে তবেই ফেরে তারা।

সন্ধ্যার আগে আগে উমরান, আর তার বাবা এলো। বাইরেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছে দেরি হওয়ায়। তাই শ্রেয়সী রাতে খাবারের পর কুনাফা দিল তাদের। অতিথিদের জন্য আবার নতুন করে নানান কিছু বানিয়েছিল, সেসব থেকেও দেয়। বেশ প্রশংসা করেছেন ওলিওল্লাহ চৌধুরী। শ্রেয়সীর সংসারী মনোভাবটা চোখে পড়ার মতো। মিলেমিশে, সবাইকে নিয়ে, হাসিখুশিভাবে –একসাথে থাকার একটা গুণ আছে তার মধ্যে। সংসারের প্রতি তার ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো জানান দেয় সংসারটা তার ভীষণ শখের। এমন একটা ভরা পরিবার তার স্বপ্ন ছিল যে! হবেনা?

পরদিন উমায়রা তার স্বামী-সন্তানকে নিয়ে চলে যায় বিয়ে বাড়িতে। যাওয়ার সময় আরাবির সে কী কান্না! বোনকে ফেলে যেতে তার কষ্ট হচ্ছে। এমির উষশীকে অনেকগুলো চকলেট, আর খেলনা দিয়ে যায়। এগুলো সে দেশে আসার সময় নিয়ে এসেছিল। বাচ্চা কাচ্চা যাদের সাথেই দেখা হবে, কিছু কিছু দেবে– এই ভাবনাতে। উষশীকেও অল্প কিছু চকলেট, আর খেলনা দিয়েছিল এসেই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার আনা সবকিছুই উষশীর পাওনা। অন্য কারো অধিকার নেই। তাই সব উষশীর জন্য রেখে আসে।

আরাবিকে বিয়ে বাড়ি থেকে আবার এখানে চলে আসবে বলার পরই থামানো যায়।

কিন্তু তাকে থামানো গেলেও উষশীকে কাঁদিয়ে চলে গেলো সবাই। তাহুরা চৌধুরী নাতনীর কান্না থামাতে নানানকিছু করেন। পুঁই অসুস্থ ছিল কিছুদিন ধরে। পালক ফুলিয়ে বসে থাকে, নড়াচড়া কম, কথাও কম– তাই উমরান ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখিয়ে এনেছিল কাল।

এখন পরামর্শ অনুযায়ী যত্ন চলছে। পুঁইকে দেখিয়ে এটা ওটা বোঝান। বাড়ির বাগানের দিকে, পুলের দিকে, দোলনার দিকে – সব জায়গায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনেন। বিড়াল, আকাশে নানান পাখি, প্লেন –এসব দেখিয়ে শান্ত করেন নাতনিকে।

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটার ঘরে।

তাহুরা চৌধুরী, আর রাইমা টিভিতে কিছু দেখছেন মন দিয়ে।

শ্রেয়সী মেয়েকে বুকে নিয়ে গায়ে ওড়নায় ঢেকে তার নিত্য অনুশীলন করাচ্ছে– এদিক ওদিক হাঁঁটাহাঁটি করে। উষশীকে তার ফুফিদের চলে যাওয়ার সময় থামানো গেলেও পরে খেলতে গিয়ে আবার আরবিকে না পেলে কাঁদতে শুরু করছিল বারবার। সারাদিন অনেকক্ষণ কেঁদে রেধে ক্লান্তিতে শান্ত হয়েছে মাত্র। তাই ঘুম পাড়াতে চাইছে সে।

ফোনের ভাইব্রেশন হলো শ্রেয়সীর। সে দেখে– উষশীর বাবা এসেছে; মানুষটা মেয়ে কবে কবে ঘুমাতে পারে না পারে তা বুঝে যায়। এজন্যে কলিং বেল বাজায়না। এই যে আজও সারাদিন মেয়ে কান্নাকাটি করে এই সময়টায় একটু ক্লান্ত হয়ে ঘুমাবে তা বুঝে নিয়েছে। একারণে বেল বাজায়নি।

দরজা খুলে দিলে ক্লান্ত মেয়ের ক্লান্ত পিতাকেও দেখতে পেলো শ্রেয়সী।

_”ঘুমিয়ে গেছে? নাকি টায়ার্ড হয়ে কোলে পড়ে আছে?” মেয়েকে উদ্দেশ্য করে জানতে চায় সে।

_”ঘুমায়….নি”

শ্রেয়সীর কথার মাঝে উষশী মাথার ওপর থেকে ওড়না সরিয়ে তাকায় পাপার আওয়াজ শুনে। চোখ দুটো ফোলাফোলা, চোখে পানি চিকচিক করছে এখনো, নাকটাও লাল হয়ে আছে– সারাদিন কেঁদেছে কী না! পাপাকে দেখে ক্লান্ত চেহারাটিতে হাসি ফুঁটে,

_”আপ্পা, পা পা!”

_”মাম্মা। আমার কলিজা। আমার লক্ষী মা –খুব কেঁঁদেছে আজ? আমার বুকে আসো মা।”

উষশী পাপার কোলে চলে যায়। শ্রেয়সী পোশাক ঠিক করে। এতক্ষণে মুখে হাসি ফুঁটলেও উষশীর তুলতুলে শরীরটা ক্লান্তিতে নেতিয়ে আছে। চঞ্চলতা নেই হাত পায়ের নড়চড়ে। বাবার কোলে গিয়ে কাঁধে মাথা ফেলে গলা জড়িয়ে রাখে কোমলভাবে। উমরান ক্লান্ত হয়ে বাইরে থেকে ফিরলে সাধারণত মেয়েকে নেয়না। আজ পিঠে হাত রেখে আগলে নিলো। গালে চুমু দেয়, হাতে চুমু দেয়, মাথায় চুমু দেয়।

ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,

_”আমার মাম্মা খুব কেঁদেছে আজ তাইনা? মাম্মাকে ফেলে চলে গেছে ওরা। ওদের সাথে আমার মা কথা বলবেনা আর। আড়ি সবার সাথে। আমার উষিকে ফেলে চলে যায় তার ফুফি, আপু, ভাইয়া–সবাই। ওদের সাথে আমার মায়ের আর কথা নেই।”

_”আপুউ, পু।”

_”আপুর সাথে বলবে কথা? আচ্ছা, শুধু আপু। বাকিদের সাথে আড়ি।”

উষশী কী ভেবে মাথা নাড়ে। হয়তো আড়ি না বোঝাচ্ছে। সে ওদের আবার চায়।

উমরান তা বুঝে সবার সাথে আড়ি না জানালো। সবার সাথে কথা বলবে উষশী।

মেয়েকে নিয়ে ওপরে চলে যায় নানান কথা বলতে বলতে। পেছন পেছন শ্রেয়সীও চলে গেলো উষশীর ফিডার হাতে নিয়ে।

উষশী এটুকু সময়েই ঘুমিয়ে গেছে। শ্রেয়সী তাকে নিয়ে শুইয়ে দিল। উমরান হাতের ঘড়ি, আর গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। শ্রেয়সী তার সব জামা কাপড় বের করে রাখে। উমরান কথা শেষে ফোনে কিছু দেখতে দেখতে শ্রেয়সীকে বলে,

_”শার্টের পকেটে কিছু ওষুধ আছে। ওগুলো নিয়ে নাও। এবার থেকে খাবার শেষে প্রতিরাতে মনে করে খাবে।”

শ্রেয়সীর নতুন ওষুধের কথা শুনায় কপালে ভাঁজ পরে। তবে কীসের ওষুধ, কেন– এসব প্রশ্ন করল না। কতো ওষুধ খেয়েছে সেই দূর্ঘটনার পর থেকে। কীসের জন্য খেতে হচ্ছে এসব এখন আর জানতে ইচ্ছে করেনা তার। ওষুধের নাম শুনলে বিরক্ত লাগে।

সে খুলে রাখা শার্ট হাতে নিয়ে পকেট থেকে বের করে কিছু। প্রথমেই ওষুধ আসলো না; কোনো কার্ড আসে হাতে। ওটা রেখে আবার হাতড়াতে হাতড়াতে নাক কুঁচকে বলে,

_”পুরো গন্ধ হয়ে আছে। কোথায় ছিলেন আজ? এত ঘেমে নেয়ে গেছেন যে? হস্পিটালে ছিলেন না বাবার সাথে?”

উমরান ফোন হতে চোখ সরিয়ে বউয়ের দিকে তাকায়, কপালে ভাঁজ তারও।

_”কীসের গন্ধ?”

_”ঘামের গন্ধ আরকি!”

কিছুপল থেমে তাকে দেখে উমরান। ফোন হাতে রেখে হেঁটে তার পাশে এগিয়ে আসল। পেছন বরাবর দাড়িয়ে বলে,

_”আমার ঘাম তোমার গন্ধ লাগছে?”

_”তো গন্ধ লাগবেনা? ঘাম কী সুগন্ধ হয়?”

_”নেওয়াজ কুঠিরে থাকতে ক্যাম্প থেকে আরও ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফিরতাম। তখন তো আমি ফিরলেই গলা জড়িয়ে ঝুলে থাকতে। পিছুই ছাড়তে চাইতেনা। কতবার তোমাকে কোলে নিয়েই ওয়াশরুমে ঢুঁকে গেছি।” তার কানে ফুঁ দিয়ে বলে, “আমাকে শাওয়ার নিতে দেখেছ দাড়িয়ে দাড়িয়ে। কখনো বুকে জড়িয়ে থেকে, কখনো কোলে উঠে আমার সাথে শাওয়ার নিয়েছ… এসেই কোলে উঠে একসাথে শাওয়ার – মানে বুঝতে পারছ তো শ্রেয়সী? শুধু শাওয়ারই নেওয়া হয়নি তখন, আরও কিছু হয়েছে ঘেমে নেয়ে থাকা অবস্থায়। মনে পরে?”

শ্রেয়সী লজ্জ্বায় পেছন ফিরে তাকাল না। ওভাবেই চলে যেতে চায় সে,

_”সরুন তো! আপনাকে একটা কথা বলেও শান্তি নেই। হাজারটা টেনে আনেন। দূউর!!”

উমরান যেতে দিল না। কোমরে হাত রেখে বলে,

_”উহু! কই যাচ্ছ? বলে তো যাও, আর কী কী বলার আছে। কী কী গন্ধ লাগে তোমার হু?” কানে ঠোঁট ছোঁয়ায় অল্প করে।

_”আ আমি এমনি বলেছি। আপনার কী ক্ষিদে লাগেনি? ফ্রেশ হয়ে আসুন তাড়াতাড়ি। তারপর খেয়ে নেবেন।”

_”খাবো তো। এত টেস্টি খাবার থাকলে খাবো না? বাড়িতেই তো আছ। এত তাড়া কীসের? কিন্তু…”

_”কোনো কিন্তু না। আপনার কথা একটা পেলেই হয়। ছাড়ুন তো! ফ্রেশ হয়ে নিচে আসবেন। আমি গেলাম।”

এক মিনিটও অপেক্ষা করল না কথাগুলো বলে। চোখের পলকে পালিয়ে যায়। উমরান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে ওয়াশরুমে ঢুঁকে যায়।

__________

তাহুরা চৌধুরী, আর ওলিওল্লাহ চৌধুরী যাবেন উমায়রার চাচাশ্বশুরের মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণে। ছেলে-বউ আর নাতনি নিয়ে স্বপরিবারে যাওয়ার নিমন্ত্রণ আছে। কিন্তু শ্রেয়সীর সেশন আছে আজ, আর উষশীকেও কিছুটা দূর্বল দেখাচ্ছে। তাই তারা যাবেনা। উষশীর দাদা-দাদীই যাবেন শুধু।

কিন্তু সকালে হঠাৎ ফুলবাড়িতে সারার আগমন দেখা গেলো। সে নাকি এখানে কী কী ফেলে গিয়েছিল। অফ-ডে হওয়ায় সেসব নিতে এসেছে। তখন প্রত্যেকেই উপস্থিত ছিল বাড়িতে। প্রকাশ না করলেও মনে মনে বিরক্ত হয় সারার আসায়। কারণ তার মনোভাব বুঝতে পারে সবাই। আর বিকৃত চাওয়াগুলোও ধরতে পারে কিছুটা। কেউ সরাসরি বিরক্তি প্রকাশ করল না তার উপস্থিতিতে। কিন্তু আজ তাহুরা চৌধুরী বাড়ি থাকবেন না। যাবেন বিয়ে বাড়িতে। রাইমাও নেই; ছুটির দিনে সেও আসেনি আজ। শ্রেয়সীরা মা-মেয়ে একা থাকবে বলে উমরানের বাড়িতে সময় কাঁটানোর কথা আছে। শুধু তারা স্বামী–স্ত্রী আর সন্তান থাকবে বাড়িতে। এর মধ্যে সারার উপস্থিতি বিরক্তিকর বটে। এখন সে যখন আছে উমরানও না থেকে পারবেনা। ঐ মেয়েটার সাথে মেয়ে–বউকে একা ছাড়ার প্রশ্ন আসেনা।

দুপুর দুইটার সময় ওলিওল্লাহ চৌধুরী, আর তাহুরা চৌধুরী তৈরি হন বিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে। শ্রেয়সীরা তখন সেশন শেষে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে তারা। উমরান তখন রুমে। বসার ঘরে এসে শ্রেয়সীকে তাড়াতাড়ি ফিরবে আশ্বাস দিয়ে দেখেশুনে থাকতে বলছেন তাহুরা চৌধুরী। তারপর সারার কাছে এসে বলেন,

_”সারা মা! দেখেশুনে থেকো কেমন? আমার বউমা আর নাতনীকেও দেখে রেখো।” কিছুটা নিম্নকণ্ঠে তার মাথায় হাত রেখে, “তোমাকে একসময় এ বাড়িতে তুলতে চেয়েছিলাম, এ-কথা তুমি জানো। সেসব নেহাতই অতীত এখন। অতীত ভুলে মুভ অন করো মা। তোমার অনেক সুন্দর একটা জীবন পড়ে আছে সামনে। আমাদের বয়স হয়েছে। আবেগে কিংবা উপায় না পেয়ে অনেক অন্যায় আবদার করে ফেলি অনেক সময়। ছেলেমেয়েদের জন্য আমরা যেটা চাই ওটাই ভালো হবে ভেবে রাখি। এটা ভুল। আমি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে ছিলাম মা। আমার নাতনিটার জন্য একটা কোল দরকার –এমনটাই ভাবনা ছিল আমার। তাই তোমাকে ওর প্রতি অল্প স্বল্প যত্নশীল হতে দেখে উদ্ভট চিন্তা মাথায় এনে ফেলেছিলাম। আমার ছেলে শ্রেয়সী না ফিরলেও আর কাউকে জীবনে আনতো না। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা জোর করলেও কিছু হতো না এটা খুব জানি আমরা। তাও বিভ্রম হয়েছিল আমাদের। বয়স হয়েছে বুঝই তো!”

থেমে শ্রেয়সীর দিকে এক নজর তাকিয়ে বলেব,

_“কিন্তু এখন দেখো? সব ঠিকঠাক। সবার সব আছে। তোমারও গোটা একটা জীবন পরে আছে। তুমি এখনো ঐ স্বপ্ন মনে লালন করো আমি বুঝতে পারি। এটা এখন অন্যায় সারা। তাও কিছু বলিনা কারণ কোথাও না কোথাও আমাদেরও দোষ আছে। কিন্তু আর কতো? তুমিই বলো না? এভাবে আর কতদিন অবুঝ হয়ে থাকবে? আমাদের দোষে নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎ শেষ করে লাভ আছে? আমার বউমা… ঐ নির্দোষ মেয়েটার সংসার কেঁড়ে লাভ আছে? এসব ভীষণ দৃষ্টিকটু বিষয় সারা। খুবই লজ্জ্বার। তুমি এখন বুঝতে পারছ না। পাঁচ কান হলে তোমার চরিত্রে দাগ পড়বে। উমরানের নাম আসলেও দেখবে ছেলেদের জন্য এসব কিছুনা। কিন্তু তোমার সবটা শেষ হয়ে যাবে সারা। একটা ভুল পদক্ষেপে তোমার চরিত্রে কালি লেগে যাবে।”

কথাগুলো বলে গভীর শ্বাস টেনে নিলেন। ওলিওল্লাহ চৌধুরী একপাশে ফোনে কারো সাথে কথা বলছেন। শ্রেয়সী উষশীর সাথে এটা ওটা করে নানান অসংলগ্ন কথা বলছে। উমরানকে সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নামতে দেখা গেলো। তিনি আবার সারার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,

_”সুন্দর করে মিলেমিশে থেকো কেমন? আমরা রাতেই চলে আসবো। তুমি কী থাকবে আজকের দিনটা? মন চাইলে থেকে যেয়ো। শ্রেয়সী তোমার বোনের মতো। ওর সাথে পারলে হেসেখেলে থেকে যেয়ো। আমাদের কোনো সমস্যা নেই বিশ্বাস করো সারা। শুধু এমন কোনো কাজ করোনা যাতে তোমার নিজের কিংবা আমাদের সম্মানে আঘাত লাগে।”

উমরান নেমে এলো। তাদের প্রস্তুত দেখে বলে,

_”এখনই বের হচ্ছো মা?”

_”হ্যাঁ হ্যাঁ, আর দেরি করব না। ওদিকে আবার তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে না? বের হয়ে যাবো।”

বলে উষশীকে নিয়ে সরে যাওয়ার ইশারা করলেন বউমার উদ্দেশ্যে। শ্রেয়সী ধীরে ধীরে ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েকে নিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। গাড়ি নিয়ে দাদা দাদিকে চলে যেতে দেখলে আবার কান্নাকাটি শুরু করবে উষশী।

তাহুরা চৌধুরী আর ওলিওল্লাহ চৌধুরী চলে গেলেন। সারা চুপচাপ ভদ্রমহিলার সব কথা শুনে নিজেও ভদ্রমেয়ের মতো পুরো সময়টা চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো। তির্যক নেত্রে একবার শ্রেয়সীর দিকে তাকায়। তারা চলে যেতেই অল্প মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

_______

তারা চলে গেছে বেশি সময় কাটেনি। মিনিট বিশেক হবে হয়তো। শ্রেয়সী বাগানের দিকে সিটিং লনে বসেছে মেয়েকে নিয়ে। পুঁই-এর খাঁচাটিও আছে পাশে। আজ একটু সরব দেখাচ্ছে পুঁইকে। সুর তুলে উষশীর সাথে অল্প স্বল্প কথা বলছে।

উমরান বাবা-মা চলে যাওয়ার পর একটু বাড়ির গেইটের বাইরে গিয়েছিল। বাবার অফিস থেকে কিছু ফাইল নিয়ে আসতে বলেছে এক কর্মচারীকে; সাথে একটা পার্সেল আসার কথা। কিছু সময় পর ওসব নিয়ে ফোন দেখতে দেখতে সে ভেতরে এলো। ফাইলগুলো পাশে রেখে সোফায় বসে।

_”শ্রেয়সীইই?” উমরান আওয়াজ তুলে ডাকল। এক মগ কফি দরকার। তবে বাড়ির বাইরে হওয়ায় শ্রেয়সীর কানে যায়নি। সে মেয়েকে নিয়ে ওপরে গেছে ভেবে আর না ডেকে কিচেনে গেলো।

ওখানে সারা আছে। কফি মেকারে কফি বানাচ্ছে। সে সারাকে দেখে ফিরে আসতে নিলে সারা পেছন থেকে ডাকল।

_”কিছু দরকার আপনার?”

উমরান একবার পেছন ফিরে তাকে দেখে তির্যক নেত্রে। পরপর কফি মেশিনের দিকে। ভারি কণ্ঠে আওয়াজ তুলে বলে,

_”নাথিং। ইউ মে ক্যারি অন।”

_”ওয়্যেট, আপনার কফি লাগবে?”

উমরান থামেনা। কর্ণপাত না করে চলে গেলো সোফায়। ফাইলগুলো নিয়ে ওপরে চলে যেতে উঠতেই সারা তার জন্য কফি বানিয়ে এনে সামনে ধরল।

_”এই নিন। আপনার কফি।”

_”নো থ্যাংক্স।”

সারা দাঁত চেপে সামলায়,

_”ওপরে যাচ্ছেন? শ্রেয়সী ওপরে নেই।”

উমরান শুনলো। তবে বিপরীতে কোথায় আছে জানতে চায়নি। একনজর তাকিয়ে কফিটা নিয়ে শ্রেয়সীকে কল লাগায় ফোনে। সারা তা দেখে হাসে। ঠোঁট চেপে দেখে আবার কিচেনে চলে গেলো। তাকে আশপাশ থেকে চলে যেতে দেখে উমরান আবার সোফায় বসে। ওপরে না থাকলে মেয়েটা কোথায়?

সে তাকে কল দিতে দিতে কয়েক চুমুক দিল কফিতে। সারা আর আসেনা তার কাছে। মিনিট কয়েক পর উমরান গায়ে ঘাম দিচ্ছে দেখে পানি খেতে চাইল। কিন্তু জগে পানি নেই। বুকের দিকে শার্টের কয়েকটা বোতাম খুলে দিয়ে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে যায়; হাতে জগ।

শরীরে তার অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। কেমন অস্থির অস্থির লাগছে নিজেকে। কিছু একটা দরকার এই মুহূর্তে উমরানের। সে বুঝে উঠতে না পেরে অস্থির ভাবটা নিয়েই গেলো পানি নিতে। ওখানে কেবিনেটের সাথে হেলান দিয়ে সারা দাড়িয়ে আছে। উমরানের তার কথা মনে ছিলনা এক মুহূর্তের জন্য। তার দিকে চোখ পড়তেই বিরক্তি দেখা গেলো। সে পানি নিয়ে চলে আসতে গেলে,

_”কী হলো? আর কতো আটকাবেন নিজেকে? আজ অন্তত এতো সুপুরুষ সাঁজবেন না উমরান তাওসিফ।”

উমরানের ঘাড় বাকিয়ে তাকায়। সবটা অস্থির লাগছে তার। শ্রেয়সীকে দরকার এই মুহূর্তে। ভীষণ দরকার।

সে বিরক্তি, আর অদ্ভুদ উত্তেজনায় চোখ মুখ কুঁচকে রেখেছে। সারার কথা শুনে তার দিকে ফেরে। কিছুপল চেয়ে রইলো অশালীন বেশে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটির চোখ দুটোর দিকে। সেকেন্ড কয়েক লাগল তার সবটা ধরতে। বুঝে গাঁঢ় শ্বাস টেনে পাশ থেকে পানির গ্লাস নিলো। ঢকঢক করে গিলে সারার দিকে ফিরে বলে,

_”ক্যারেক্টারলেস মেয়ে। যা করলে তার কন্সিকুয়েন্সেস ভাবতে পারছ? তোমাকে আমি এমনি এমনি ছেড়ে দেবো?”

সারা সে ধরতে পেরেছে বুঝে অদ্ভুদভাবে হাসল। তার কাছে চলে আসে, সাহস করে খোলা শার্টের ফাঁক দিয়ে বুকে হাত রেখে বলে,

_”আমি তো চাই আপনি আমাকে ধরে রাখুন। একদম ছাড়বেন না। সারাজীবন ধরে রাখবেন প্লিজ। সারাজীবন” মোহনীয় কণ্ঠে পিপাসুর মতো দৃষ্টিতে চেয়ে বলে সারা।

উমরান ঘন ঘন শ্বাস টেনে তার হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়,

_”তোমাকে এতদিন শুধুমাত্র কিবরিয়া স্যারের মেয়ে বলে এড়িয়ে গেছি। এত ক্যারেক্টার লুজ মেয়ে হবে জানলে আরও আগেই তোমার জন্য সুইটেবল জব খুজতাম। ব্লাডি প্রস্টিটিউট!” থেমে গাঁঢ় শ্বাস টেনে সে বলে, “এখান থেকে এই মুহূর্তে যাও সারা। নয়তো ইট’স গ’না বি সামথিং সো ব্যাড ফোর ইউ। জাস্ট লিভ ইউ বিচ। লিইইভ!” চোখে ধমক, চোয়াল শক্ত।

সারাকে অল্প আতঙ্কিত দেখায় গম্ভীর এই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা পুরুষটির রাগী রুপ দেখে। তবে সে থামেনা। চেয়েছিল উমরান যেন নিজেই তাকে কাছে টানে, সেই ব্যবস্থা-ই করেছে। কিন্তু সে কিছুক্ষণ উমরানের দিকে চেয়ে অকস্মাৎ নিজের পড়নের পোশাকের বাহুর দিকে হাতা কিছুটা টেনে হিঁচড়ে ছিড়ে ফেলতে শুরু করে। উমরান চলে যেতে নিচ্ছিল এখান থেকে। শ্রেয়সীকে দরকার তার।

কিন্তু মেয়েটাকে এমন করতে দেখে সেকেন্ড কয়েক তাকায়, কিছু আন্দাজ করতে পারল। অস্থির উমরান দু-সেকেন্ড হা করে ঘনঘন শ্বাস টেনে শিকারি নয়নে তার দিকে তাকায়। সারার চোখে স্পষ্ট ভয়। তাও সে এটা করছে। উমরানের দিকে এক নজর তাকিয়ে শ্রেয়সীর নাম ধরে চিৎকার দিতে শুরু করে,

_”শ্রেয়া… শ্রে। আআহ!!”

শ্রেয়সীকে পুরোপুরি ডেকে উঠতে পারল না সে। উমরান গালে থাপ্পর বসিয়ে দিয়েছে শক্ত হাতের থাবায়। চুল এলোমেলো হয়ে যায় তার। মাথা হেলে গেছে। কিন্তু সে থামলনা। বেপরোয়া হয়ে ফের মাথা তুলে। উদ্দেশ্য চিৎকার করবে আবার।

উমরান উন্মাদ মেয়েটাকে একনজর দেখে পাশের কফি মেকার থেকে মগে কফি নেয়।

ততক্ষণে সারা চিৎকার করতে মুখ খুলেছে,

_”শ্রে…” কিন্তু এবারও পুরো নামটা বেরোতে পারল না। উমরান হঠাৎ গরম কফি ঢেলে দিয়েছে তার হাতে।

_“আহহ—উফফ!” জ্বালায় সারার কণ্ঠ ভেঙে গেল। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।

_“কী করলেন এটা?”

উমরানের কণ্ঠে ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা,

_”কেন? চিৎকার করো এবার। শ্রেয়সী এসে দেখুক তুমি কেন এত জানপ্রাণ দিয়ে তাকে ডাকছ। শাউট ড্যাম ইট”

অকস্মাৎ এত জোরাল ধমকে সারা কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই বুঝে গেল —এখন চিৎকার করে আর কোনো লাভ নেই। সবকিছু উমরান নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

কিন্তু এই হাত!!

ভীষণ জ্বালা করছে। জ্বালা যেন আগুন হয়ে শিরা বেয়ে ছুটে যাচ্ছে। সারার ঠোঁট কেঁপে উঠল, দাঁত চেপে ধরল সে, তবু একটা অস্ফুট গোঙানি গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। পানির নিচে হাত রেখেও শান্তি মিলছে না —বরং মনে হচ্ছে পানিটা আগুনের মতোই ঝাঁঝালো। বুকের ভেতর দম আটকে আসে, চোখ বুজে ফেলতেই চোখের কোণ গড়িয়ে পড়ে আরও জল। অসহায়ভাবে সে কনুই ভর দিয়ে বেসিনে ঝুঁকে পড়ে, যেন শরীরের সব শক্তি ওই জ্বালার কাছে হার মেনে বসে আছে। মনে হয়, এই ব্যথা শুধু হাতে নয়— ভেতর পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে তাকে।

আজ যা করেছে তার কোনো ফল পাচ্ছে না সে। এতক্ষণে এটুকু অন্তত বুঝে এসেছে সারার। কিন্তু তবু… তার উমরানকে চাই।

_“কী করলেন এটা?”

উমরানের কণ্ঠে ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা,

_”কেন? চিৎকার করো এবার। শ্রেয়সী এসে দেখুক তুমি কেন এত জানপ্রাণ দিয়ে তাকে ডাকছ। শাউট ড্যামিট”

অকস্মাৎ এত জোরাল ধমকে সারা কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই বুঝে গেল —এখন চিৎকার করে আর কোনো লাভ নেই। সবকিছু উমরান নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

কিন্তু এই হাত!!

ভীষণ জ্বালা করছে। জ্বালা যেন আগুন হয়ে শিরা বেয়ে ছুটে যাচ্ছে। সারার ঠোঁট কেঁপে উঠল, দাঁত চেপে ধরল সে, তবু একটা অস্ফুট গোঙানি গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। পানির নিচে হাত রেখেও শান্তি মিলছে না —বরং মনে হচ্ছে পানিটা আগুনের মতোই ঝাঁঝালো। বুকের ভেতর দম আটকে আসে, চোখ বুজে ফেলতেই চোখের কোণ গড়িয়ে পড়ে আরও জল। অসহায়ভাবে সে কনুই ভর দিয়ে বেসিনে ঝুঁকে পড়ে, যেন শরীরের সব শক্তি ওই জ্বালার কাছে হার মেনে বসে আছে। মনে হয়, এই ব্যথা শুধু হাতে নয়— ভেতর পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে তাকে।

আজ যা করেছে তার কোনো ফল পাচ্ছে না সে। এতক্ষণে এটুকু অন্তত বুঝে এসেছে সারার। কিন্তু তবু… তার উমরানকে চাই। এই কথাটা সে কাকে গিয়ে বলবে? কীভাবে এই মানুষটাকে নিজের করবে?

ছেলে হলে হয়তো সব সহজ হতো। অপহরণ, খু ন, অপরাধ— যাই পারে, করে প্রিয় মানুষটাকে নিজের করে নেওয়ার একটা পথ বের করে নিতো। কিন্তু তার কেন নেই সেই ক্ষমতা? কেন এই মানুষটাকে নিজের করার শক্তিটুকু তার হাতে নেই?

কেন?

রাগে বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে। নিজের ওপর রাগ, ভাগ্যের ওপর রাগ– আর সেই রাগটাই ঘুরে ফিরে এসে আছড়ে পড়ে সারার নিজের গায়েই।

অথচ সে মানল না। জেদী মনটা বলছে শ্রেয়সীর দোষ এটা।

যদি শ্রেয়সী ম ‘রে যেত তাহলে হয়তো আজ তাকে এত নিচে নামতে হতো না। এত লজ্জা, এত ব্যথা, এত অপমান– কিছুই সইতে হতো না। খুব সহজেই উমরানকে পেয়ে যেত সে।

পোড়া হাতটা বুকে চেপে ধরে সারা। জ্বালা এখনও থামেনি। ধীরে ধীরে চোখ তুলে উমরানের দিকে তাকায় সে– চোখে ব্যথা, রাগ আর এক অসম্ভব আকাঙ্ক্ষার মিশ্র ছায়া।

অথচ উমরান তার দিকে চোখ তুলেও তাকাচ্ছে না। একবার পাশে রাখা গ্লাস তুলে ঢকঢক করে পানি গিলছে, আবার পরক্ষণেই ফোনের পর ফোন দিচ্ছে বউকে। এই অস্থিরতা, এই ছটফটানি —যেন কোথাও বিলিয়ে দিয়ে নিজেকে শান্ত করার কথা মানুষটার মাথায় একবারও আসছে না!

সারার আবার রাগ লাগে।

তার এতক্ষণকার ভাবনাগুলো যে ভুল —উমরানের তার প্রতি এই উদাসীন চোখদুটোই চোখে আঙুল দিয়ে সেটা দেখিয়ে দিচ্ছে। শ্রেয়সীর অনুপস্থিতিতেও সে উমরানকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছে। তবু কখনোই তাকে একফোঁটা পাত্তা দেয়নি লোকটা। আজ এমন অবস্থায়ও তার দিকে একবার চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। তাহলে আদৌ শ্রেয়সীর উপস্থিতি, অনুপস্থিতি অবদান রাখছে?

এই মানুষটা কেন বারবার শুধু ওই শ্রেয়সীকেই খোঁজে? সারা কেন নয়? কেন সবকিছুতেই তার শ্রেয়সী চাই? কেন সব জায়গায় সে-ই?

এই মুহূর্তে অন্তত সারাকে কাছে পাওয়ার আবদার করতে পারত সে। অন্তত একবার। কিন্তু লোকটা তার দিকে তাকাচ্ছেই না।

এত সৌন্দর্য নিয়ে কী হবে, যদি প্রিয় মানুষটাকে রূপে বাঁধাই না যায়?

সারা হাঁ করে ঘনঘন শ্বাস টেনে পোড়া হাতে আবার পানি ঢালতে থাকে। এখনো জ্বলুনি কমেনি। এবার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। যার জন্য নিজেকে নিকৃষ্টতম পর্যায়ে নামাতেও দুবার ভাবেনি —সেই মানুষটা তাকে গুনাতেও রাখেনা।

উমরান এবার বাইরে মেয়ের আওয়াজ শুনে আর এক মুহূর্ত ওখানে দাঁড়ালনা। বসার ঘরে এসে ওদিক ওদিক তাকাতেই বাড়ির বাইরের দিকে ব্যাল্কনির মতো লাগোয়া বারান্দায় মা-মেয়েকে বসে থাকতে দেখল নরম তোষক বিছিয়ে। তার মাথা গরম হয়ে আসে, এতক্ষণ ধরে এই মেয়েটাকে ডাকছে। অথচ এখানে বসে থেকেও কোনো সাড়া শব্দ নেই।

সে ভারি কদম ফেলে চলে যায় ওখানটায়। বসে বসে পুঁই-এর গায়ে হাত বোলাতে থাকা শ্রেয়সী উমরানকে বাড়ির ভেতর থেকে আসতে দেখে অবাক হয়,

_”আপনি ওদিকে কোথা থেকে আসছেন?”

উমরান তার কথা কর্ণপাত করল না, ধমকে বলে,

_“এখানে বসে থেকেও ডাকে সাড়া দিচ্ছিলেনা কেন? ডাকলে আওয়াজ বের হয়না মুখ দিয়ে?” চোখ দুটো টকটকে লাল, মাথার চুল এলোমেলো, হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে। যেন নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করছে কিছু নিয়ে। শ্রেয়সী আতঙ্কিত হলো উমরানকে এমন অবস্থায় দেখে।

_”কী হলো আপনার এই অবস্থা কেন?”

_”এতক্ষণ কোথায় ছিলে ইডিয়ট?” আবার ধমকে জানতে চায় সে। শ্রেয়সী কেঁপে উঠল সেই শক্ত কণ্ঠে। উমরান হাঁটু মুড়ে বসে তার দিকে ঝুঁকে বসে। শ্রেয়সীর নরম বাহুতে তার শক্ত হাত।

_”কী হলো চুপ করে আছ কেন? মুখে কুলুপ এঁটেছ? এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আর ফোন কোথায় তোমার?” শ্রেয়সী উমরান রেগে আছে কেন বুঝতে পারছেনা। কিন্তু এলোমেলো অবস্থা দেখে ভয়ও লাগছে। সে ঢোক গিলে ভয়ার্ত নেত্রে চেয়ে বলে,

_”আমি তো বাগানে সিটিং লনে বসেছিলাম। পুঁই হঠাৎ উড়ে গেলো গেইটের বাইরে। অনেকক্ষণ আসছেনা দেখে উষিকে নিয়ে ওকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। বাইরের শিমুল গাছটার পাশে পড়ে ছিল। দূর্বল লাগায় উড়ে আসতে পারছিল না। আপনিও মামণিরা চলে যাওয়ার পর গেইটের বাইরে গেছেন দেখে ফিরে আসবেন ভেবে অপেক্ষা করছিলাম। এতক্ষণেও আসছেন না তাই চলে এসেছি।”

সব বুঝিয়েও ভয় স্পষ্ট তার দুচোখে। এর মধ্যে আবার উমরানের শক্ত গমগমে কণ্ঠে কেঁপে উঠল,

_”ফোন কোথায় তোমার? কল ঢুঁকেনা কেন?”

শ্রেয়সী ভয়ার্ত চোখে উমরানকে আগাগোঁড়া দেখে। কী হয়েছে কিছুই আন্দাজ করতে পারছেনা সে। উষশী কিছু নিয়ে মনোযোগ দিয়ে খেলছে বলে এদিকটায় খেয়াল করছেনা। সে চোখ ফিরিয়ে উমরানের দিকে তাকায়,

_”কাল উষি কান্নাকাটি করার সময় ফ্লোরে আঁছাড় মেরেছে বলেছিলাম ভুলে গেছেন? বন্ধ হয়ে আছে তো!”

অস্থির উমরানের রাগ একটু কমতে দেখা গেলো। সে চোখ বুজে শ্বাস টানে গভীরভাবে। শ্রেয়সী তা দেখল, রাগ কমেছেও বুঝল। গালে হাত রেখে বলে,

_”আপনার কী হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন?” থেমে বিচলিত কণ্ঠে বলে, “অসুস্থ লাগছে মেজর?”

উমরান তার পাশ ঘেষে বসে গেলো দেয়ালে হেলান দিয়ে, শ্রেয়সীকে তুলে দুদিকে পা করে কোলে বসিয়ে নেয়। শ্রেয়সী দৈবাৎ এহেন কাণ্ডে কিছুটা চমকায়। তবে দ্বিরুক্তি করল না। সামলে বসে, একহাতে গলা জড়িয়ে চুল ঠিক করে দিতে দিতে ফের প্রশ্ন রাখল,

_”আপনার কোথায় খারাপ লাগছে বলুন না? জ্বর আসতে চাইছে?”

_”উহু, কিস অন মাই নেক?” শ্রেয়সীর কাঁধে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে সে। মাতাল মাতাল অস্থির এক কণ্ঠ।

শ্রেয়সী অসুস্থতায় একটু বেশিই খারাপ লাগছে ধরে নিলো। ওভাবেই উমরানের ঘাড়ে নরম করে অধর ছুঁয়ে দিল সময় নিয়ে। গালে হাত রেখে বলে,

_”দিয়েছি। ভেতরে যাবেন? কিছু খেয়ে ওষুধ নিয়ে নিলে ভালো লাগবে হয়তো।”

উমরান মাথা তুলে তার গালে অধর ছুঁইয়ে আবার কণ্ঠনালীর ওখানটায় নাক ঠেকিয়ে গাঁঢ় শ্বাস টেনে নেয়। কিছুক্ষণ ওভাবে থাকল। কিন্তু এখনো অস্থির লাগছে তার ভেতরটা। খুব অস্থির লাগছে। শ্রেয়সীর গলদেশসহ ওপর-নিচের ওখানটাই পোশাক সরিয়ে অজান্তে ডুব দিল মুহূর্তের ব্যবধানে।

_____

সারা বেশ অনেকক্ষণ হাতটা পানিতে রেখে নিজেকে শান্ত করলো। পুড়ে চামড়া উঠে গেছে হাতের। নানান ভাবনায় নিজেকে ভীষণ নিকৃষ্ট লাগছে তার। চোখের অবিরত অশ্রুধারা মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলো সে। আজ যা করেছে সেসবের পরামর্শ দিয়েছিল তার এক বান্ধবী। অনেক আগেই দিয়েছিল। কিন্তু সে সাহস করে উঠতে পারেনি।

আজ আসলেই কিছু জিনিস ফেলে যাওয়ায় ওসব নিতে ফুলবাড়ি এসেছিল। ভালোই ভালোই চলে যেত সে। কিন্তু তাহুরা চৌধুরীর শ্রেয়সীর সামনে ওসব বলা সে মেনে নিতে পারেনি। অপমানিত বোধ করেছে ভীষণ। শ্রেয়সী তাদের পাশে ছিল। কানে না নেওয়ার ভান করে থাকলেও আদতে সব শুনেছে তা সারা জানে। তার ঐ মুহূর্তটায় ভীষণ অপমানজনক লেগেছে। তাই আজ প্রতিশোধপরায়ন হয়ে সেই পদক্ষেপটি নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন সারার মনে হচ্ছে এটা উচিত হয়নি। হটকারিতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হয়নি একেবারেই।

ভাবতে ভাবতে ওপরে উঠে যেতে নিচ্ছিল সাঁরা।

ঠিক তখনই —কানে এলো কিছু অস্বাভাবিক শব্দ। পা থেমে যায় সারার। দু–সেকেন্ড শোনে —একটা ক্ষীণ, ভাঙা আর্তচিৎকার মনে হলো।

অবচেতন মন ভুল করেনা। কীসের আর্তচিৎকার—তা সে বুঝে নিল সঙ্গে সঙ্গেই। গা শিউরে উঠল তার। শরীরের ভেতর দিয়ে যেন ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। মুখের ভঙ্গিমা শক্ত হয়ে জমে যায়। ভয়, অনিশ্চয়তা, আর অজানা আশঙ্কা একসঙ্গে আটকে গেল চোখে-মুখে।

ঢোক গিলে সে গাঁঢ় শ্বাস টানে। না চাইলেও পা দুটো ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিল বারান্দার দিকে।

বসার ঘরের এক পাশে লাগোয়া মাঝারি সাইজের বারান্দাটি দেখতে ব্যাল্কনির মতো, তবে একটু খোলামেলা। বাইরে থেকেও ওঠার জন্য অল্প উচ্চতার সিঁড়ি আছে। শ্রেয়সী নিশ্চয়ই সেই সিঁড়ি দিয়েই মেয়েকে নিয়ে ওখানে এসেছে। তাই ভেতরের কোনো কিছু চোখে পড়েনি তার।

ঘরের ভেতর থেকে বড়সড় জানালা দিয়ে বারান্দাটা দেখা যায়। এখন জানালাটা খোলা, একদিকে পর্দা আধখানা সরানো। ওপাশে জানালা বরাবর হেলান দিয়ে বসে আছে উমরান —আর তার কোলে শ্রেয়সী। সারার চোখ এতটুকুই দেখতে পেল। কারণ তাদের পিঠ থেকে ওপরের অংশটাই কেবল দৃশ্যমান সেই জানালার ওপর দিয়ে।

তবু সেটুকুই যথেষ্ট ছিল।

শ্রেয়সীর পোশাক কিছুটা এলোমেলো, বুকের দিকের কিছু অংশ মেলে আছে চোখে পড়ার মতোভাবে। উমরানের গলা আঁকড়ে ধরেছে। ক্ষীণ ব্যথায় তার চোখ উল্টে আছে, মুখটা কুঁচকে গেছে। দুজনেই অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। কাঁপুনি যেন শুধু শরীরের না, ভেতরেরও। ঘনিষ্ঠ, আঁকড়ে ধরা আলিঙ্গনে মেয়েটা বসে আছে স্বামীর কোলে। আর তার সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে সেই ভাঙা, আর চাপা শীৎকার।

তাদের ঠিক সামনে, বারান্দার অন্য পাশে, তোষকে বসে উষশী মন দিয়ে খেলছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেলনা। পুঁইয়ের সঙ্গে এলোমেলো, অর্থহীন কথা। শিশুর স্বাভাবিক শব্দ।

আর এদিকে তার বাবা-মা…

সারা আর দেখতে পারল না।

বুকটা হঠাৎ অতিমাত্রায় কেঁপে উঠেছে। মাথার ভেতর সবটা বুঝে নিতে গিয়েই সে ঘেমে গেল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে বেরিয়ে আসছে, যেন ফুসফুসের ভেতর বাতাস ঢুকছে না ঠিকমতো। আতঙ্ক, অনাকাঙ্কিত দৃশ্য দেখার অস্থিরতা —সব একসঙ্গে গলা চেপে ধরল তাকে।

জানালার এপাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বুকে হাত চেপে ধরে সে গাঁঢ় শ্বাস নিতে লাগল। নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। মাত্র দু–সেকেন্ড।

ঠিক তখনই আবার কানে এলো সেই শব্দ; শ্রেয়সীর ক্ষীণ আর্তচিৎকার।

এইবার আর দাঁড়াল না সারা। এক মুহূর্তও না। হতবম্ব, ভাঙাচোরা, আর ভিতর থেকে নড়ে যাওয়া মনটা নিয়ে সে দৌড়ে ওপরে উঠে গেল।

পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ফিরে আসে । পোশাক বদলেছে তাড়াহুড়োয়; চুল এলোমেলো, পোড়া হাত, মুখে রক্তশূন্য শুকনো ভাব। এ বাড়িতে ঢোকার সময় যে সারা ছিল পরিপাটি, গোছানো—কাঁধে টোট ব্যাগ, চোখে শান্ত ভদ্রতা —সে আর নেই।

ব্যাগটা এখনো কাঁধে ঝুলছে। শুধু মানুষটা ভেঙে গেছে।

কোনো দিকে তাকাল না সে, আর না তো কোনো শব্দ করল। ব্যাস, নিজের মতো বেরিয়ে যায় শুধু।

এতদিন সে ছুটেছে এক মরিচিকার পেছনে। যদি এই বোধটা একটু আগেই আসত— তাহলে আজ বুকের ভেতর অদৃশ্য এই ছুরিকাঘাত এত বাজেভাবে আঘাত হানতো না।

শ্রেয়সী লোকটার কাণ্ডে অবাক হচ্ছে। নামতে চাইলেও দেয়না। আবার ঠিকমতো যা চাইছে তা বেরও করতে পারছেনা।

_”হয়েছে আপনার? এতক্ষণ লাগে? আমি ব্যাথা পাচ্ছি আশ্চর্য! আর একসাথে এতগুলো জিনিস কে পকেটে রাখে?”

উমরান তাকে একনজর দেখে আবার পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে বলে,

_”হাতে ফাইল ছিল অনেকগুলো। নুপুর দেখতে দেখতে বক্সটা পড়ে যায়। আর নিইনি; পকেটে ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম।” বের করতে পারল, শ্রেয়সীর সামনে ধরে বলে, “সিই! উষির জন্য একজোড়া বানাতে দিয়ে ভাবলাম তোমার জন্যও নিই। আবার ভাবলাম মা কী দোষ করল! তাই তিনজনের জন্যই নিয়ে নিলাম। পছন্দ হয়েছে?”

তিনজোড়া রুপার নুপুর। একটা পাতলা চেইন দিয়ে তৈরি, একেবারেই মিনিমাল দেখতে। চেইনের মধ্যে একটা লুপ আছে, যেটা থেকে ছোট ঝুলন্ত ড্রপ নিচের দিকে লটকছে। শ্রেয়সী বুঝল এটা মামণির জন্য।

আরেকটা ছোট সাইজের; উষির জন্যে। সিলভার রঙের, চিকন চেইন স্টাইলের নুপুর এটা; খুব ভারী না। হালকা আর আরামদায়ক মনে হচ্ছে। নুপুরের সাথে ছোট ছোট গোল বেল ঝুলছে, যেগুলো নড়াচড়া করলে টুনটুন শব্দ করে। ডিজাইনটা একদম মিনিমাল কিন্তু কিউট — বাড়তি কারুকাজ নেই। উষশীর কোমল পায়ের ত্বকের সাথে দারুণ মানাবে।

আর অপরটি দুইটি পাতলা চেইন দিয়ে তৈরি। এক চেইনে ছোট ছোট গোল চকচকে রুপার বোলস আছে। অন্য চেইনটি গ্লসির ফিনিশ সহ, অল্প ডিজাইন। পায়ে দিলে গোড়ালির উপরে হালকা ঝুলে থাকবে, চেইনের লম্বা অংশটি হালকা ফাঁক রেখে ধরবে। শ্রেয়সীর দেখেই ওটা পছন্দ হলো।

সে উৎফুল্ল নয়নে দেখে একটা হাতে নেয়। মেয়েকে তার জন্য আনা জোড়া নেড়ে শব্দ করে দেখায় পেছন ফিরে।

_”উউষি… মাম্মা দেখো তো! টুং টুং কী বাজে এখানে?”

উষশী খেলনা রেখে মনোযোগী চোখ তুলে তাকায়। শ্রেয়সী তাকে উদ্দেশ্য করে সুন্দরমতো দেখাবে, তার আগে গেইট দিয়ে সারাকে বেরিয়ে যেতে দেখল ওখান থেকে।

_”আরেহ, সারা না ওটা? কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা?”

মাথা উচিয়ে এক নজর তাকিয়ে সুবিধা করতে পারল না। উমরানের কোল থেকে নেমে যেতে চাইল। কিন্তু সে আঁটকে নেয়,

_”চলে গেছে ও। আর আসবেনা কোনোদিন। ওকে নিয়ে এত ভাবতে হবেনা তোমার।”

_”মানে? হঠাৎ চলে গেলো কেন? আমি তো ভাবলাম আরও কিছুদিন থেকে যাবে। আজই চলে গেলো?” অবাকতা তার কণ্ঠে। সারা এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে ভাবেনি সে।

_”হ্যাঁ, চলে গেছে। আর কোনোদিন এ বাড়ি মুখো হবে বলে মনে হয়না। ভালোই হয়েছে। তুমি উঠে পাশে বসো তো। নুপুর দুটো কেমন লাগছে দেখি পায়ে।”

বলে তাকে পাশে বসিয়ে দিল নামিয়ে। শ্রেয়সী তখনো বিস্মিত। সারা আর এ বাড়িতে আসবেনা - এটা কীভাবে বলছে লোকটা?

_”কী বলছেন? ও আসবেনা আপনাকে কে জানাল? আর হঠাৎ কী হলো ওর বুঝতেই তো পারছিনা। কেমন দৌড়ে গেলো মনে হয়েছে দেখে!”

_”ওর কথা বাদ দাও না তুমি। এত কীসের চিন্তা ওকে নিয়ে?” বিরক্তি উমরানের কণ্ঠে। শ্রেয়সীর এক পা কোলে নিয়ে নুপুর পড়িয়ে দিচ্ছে।

সে ওটা টেনে নেয়,

_”রাখুন তো নুপুর। আমাকে কী হয়েছে সবটা বলুন। আপনাকে দেখে অসুস্থ ভেবেছিলাম তখন। এখন তো মনে হচ্ছে ঠিক আছেন। আমি যখন বাইরে ছিলাম তখন ঐ মেয়েও ভেতরে ছিল আপনার সাথে তাইনা, ও কিছু করেছে? মিথ্যা বলবেন না।” উমরান উত্তর দেওয়ার আগে নিজে অধৈর্য হয়ে আবার বলে, “আমি এজন্যই আপনাকে এক মুহূর্তের জন্য একা ছাড়তে চাইনি। গেইটের বাইরে বের হয়ে আবার চুপি চুপি ভেতরে এসেছেন আমার চোখে ফাঁকি দিয়ে। আর আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমাকে খুজে নিতে পারেননি আপনি?” অবুঝ এক অভিযোগ তার কণ্ঠে। “কতো সময় ধরে ছিলেন বাড়িতে ওর সাথে একা! এই উষির পাপা, আপনাকে ও কিছু বলেছে? কথা বলতে চেয়েছে আপনার সাথে? আপনি বলেছেন ওর সাথে কথা? আর কী কী হয়েছে, আপনি ওমন করছিলেন কেন, ও হঠাৎ চলে গেলো কেন? সব বলুন আমাকে, সব।” উমরানের শার্ট আঁকড়ে অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল শ্রেয়সী।

উমরান এক নজর তাকিয়ে হাত থেকে একটা নুপুর হামাগুড়ি দিয়ে কাছে চলে আসা মেয়ের হাতে তুলে দেয়। সে একটা নতুন শব্দ শিখেছে। কিছু দেখলেই খুব সুন্দরভাবে বিস্মিত কণ্ঠে ‘ওয়াআও’ বলে উঠে। নুপুর জোড়া দেখেও,

_”ওয়াআও” বলে হাসিমুখে তুলতুলে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। উমরান হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

উষশী পাপার কাছ থেকে নুপুর জোড়া নিয়ে আবার ‘বা বা’ শব্দ তুলে খেলনার কাছে চলে গেলো। ওটা নিয়ে হেসেখেলে শব্দ করতে থাকে।

মেয়ে চলে যেতেই শ্রেয়সীর দিকে নজর ফেলে চাইলো মনোযোগ দিয়ে, সূর্যের কমলা আলো উকি দিচ্ছে শ্রেয়সীর পেছনে। উমরানের চোখ সেই আলোর বিপরীতে কিছুটা কুঁচকে আছে।

_”তেমন কিছু হয়নি। বাড়িতে শুধু ও উপস্থিত ছিল বলে তোমায় ফোন দিচ্ছিলাম। কয়েকবার ডেকেওছি। সাড়া দাওনি তাই রেগে গেছিলাম।”

শ্রেয়সীর চোখে তখনও সন্ধেহ,

_”তাহলে ও চলে গেল কেন ওভাবে? আর সামনে কখনো আসবেনা– এটা কী করে বলছেন?”

_”বলছি কারণ একটু আগে আমাদের ইন্টিমেট হতে দেখে ক্যারেক্টার লুজ মেয়েটা কষ্ট পেয়েছে।” নাক ছিটকে নির্বিকারে বলে সে।

_”কী? কীসের ইন্টি…” সংকোচে থেমে বলে, “মানে কী দেখেছে ও?”

_”একটু আগে আমার কোলে বসে ছিলে না? পকেটে নুপুর ছিল বলে ব্যাথায় শব্দ করেছিলে?” শ্রেয়সীর পায়ে অন্য নুপুরটা পড়িয়ে হুক লাগাতে লাগাতে বলে, “বেয়াদব মেয়েটা আমাদের পেছনে জানালার ওপাশে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ওসব শুনেছে। ভেবেছে আমরা,” সে থামল, হুক লাগিয়ে মনোযোগ দিয়ে তাকে শুনতে থাকা শ্রেয়সীর দিকে তাকায়, আগ্রহী চোখ দুটোতে নজর ফেলে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টানে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে পুরুষালি কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে, “ভেবেছে আমরা সহবাস করছি এখানে। ঐ যে আমার কোলে ওভাবে বসেছিলে? পকেটে নুপুর থাকায় নড়েচড়ে ওসব বের করাতে, তুমিও নড়ে উঠছিলে? ব্যাথা পাচ্ছিলে? ওসব পেছন থেকে দেখে নষ্ট মনের মেয়েটা ভেবেছে- উই অয়্যার হ্যাভিং সে* ওপেনলি। তাই সরাসরি এসব দেখে কষ্ট পেয়ে ভেগেছে”

হতবম্ব শ্রেয়সী চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছে এসব শুনে। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। উমরানের গলার পেছনে রাখা হাতটা অজান্তে ওখানে দেবে দেয়,

_”হায় তওবা! কী বিচ্ছিরি কাণ্ড। আপনি সারা আমাদের দেখছে জানলেন কী করে? আর আমায় বলতে পারতেন তো! কত ইম্বেরেসিং একটা ঘটনা। ছিঃ ছিঃ!”

_”ইম্বেরেসিং আমাদের জন্যে না, ওর জন্য হবে। আর তোমায় জানালে তো তুমি সংযত হয়ে যেতে।” ঠোঁটে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি উমরানের।

গভীর ঐ চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই কিছু বুঝে শ্রেয়সীর গালে লাল লালিমার লাজুক প্রলেপ পড়লো। লোকটা ঐ সময় সারা তাদের দেখছে বুঝে ইচ্ছে করে আরও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, আরও নড়েচড়ে উঠে তার উরুতে হঠাৎ চেপে ধরে ব্যাথা দিয়েছিল, নামতে চাইলে নামতে দিচ্ছিল না কোমর চেপে — সব এ কারণেই; এই রহস্যময় গভীর চোখ দুটোই তার সাক্ষী।

সে লাজে ঠিকঠাক উমরানের দিকে তাকাতেও পারল না, নজর লুকিয়ে জানতে চায়,

_”ও যে এখানে দাড়িয়ে ছিল তা জানলেন কীভাবে বললেন না তো!”

শ্রেয়সীর পায়ের নুপুর দেখতে দেখতে হঠাৎ এক পা হাতে নিয়ে কিছুটা তুলে উমরান, নিজেও অল্প ঝুঁকে একটা চুমু দিল সেথায়। পরপর বলে,

_”তোমার বর সামরিক বাহিনীর সদস্য শ্রেয়সী নেওয়াজ। চোখের প্রতিবিম্বেও শত্রুপক্ষের অবস্থান বোঝার ক্ষমতা তার আছে।”

শ্রেয়সী সহজ হয়। তার পাশে বসে হাত জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখল সুন্দর এক অনুভূতিতে। এই সুন্দর বিকেল। চোখে কমলা রঙা রোদের ঝিলিক। সে আর তার ব্যক্তিগত পুরুষটি পাশাপাশি। সামনে তার দুটো বাচ্চা; উষশী-পুঁই। খেলছে বাচ্চা দুটো। আর বসন্তের আগ সময়ের সেই অল্প শীতল হাওয়া। যার আলো আর গন্ধে বসন্তের আভাস শুরু হয়ে গেছে। সে কাঁধে মাথা রেখেই বাগানের দিকে চোখ রেখে বলে,

_”দেখুন, হাওয়ার সুরেরা বলছে বসন্ত আসছে।”

_”উহু, হাওয়ার সুরেরা বলছে তুমি এসেছ।”

শ্রেয়সী অল্প করে মাথা তুলে শান্ত কণ্ঠের পুরুষটার দিকে তাকাল। মেয়ে তার পাপার কোলে চলে এসেছে। উমরান উষশীর পায়েও পড়িয়ে দিল নুপুর জোড়া। সে ভীষণ খুশি, নড়লেই পায়ে ঝুনঝুন শব্দ হচ্ছে যে! খিলখিল করে হাঁসছে পা নাড়াতে নাড়াতে। উমরান সেই তুলতুলে এক পা তুলে মোলায়েম পাতায় গভীর চুমু খেলো। একটাতে দিয়েছে তাই পাপার রাজকন্যা অপর পা -টাও তুলে দিয়েছে। ওখানেও চুমু লাগবে তার।

_”পাপা এত্তে আপ্পা দাআ।” হেসে উঠল দুজনে। উমরান সেই পায়ের পাতাতেও চুমু এঁকে নাকে নাক ঘষে দিল।

_”দিয়েছি, আমার প্রিন্সেসের পায়ে চুমু। মিইইষ্টি একটা চুমু। তুমি দাও আম্মা। পাপার গালে।”

বলতে দেরি কিন্তু উষশীর পাপার গালে চুমু দিতে দেরি নেই। “আআআপপ্পা” বেশ টেনে শব্দ করে দিল সে।

শ্রেয়সী দুজনকে দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ মুখ কুঁচকে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,

_”আমার বর, আমার মেয়ে — সব আমার। তাও অন্যরা নজর দেয়।”

কাঁধেই মাথা রেখে আনমনা কণ্ঠ তার। উমরান মেয়ের হাত স্বীয় গালে লাগিয়ে নজর ফিরিয়ে তাকায়।

_”নজর টিকা লাগিয়ে দিও। আর নজর দেবেনা।”

_”এবার থেকে তাই দেবো। আমার দু-দুবার বিয়ে করা বর। তাও ভাগ বসাতে চায়!!” নিজে নিজেই বলছে সে। তার নামে সিল করা ব্যক্তিগত পুরুষ। তাও কেন এমন করবে? দুবার বিয়ের কথা ভাবতেই অকস্মাৎ তাকে বিচলিত দেখাল,

_”মেজর? ঐ যে রিসোর্টে বিয়ে হয়েছিল? আমি তো তখন মৌরি ছিলাম। দ্বিতীয়বার কী মৌরির সাথে বিয়ে হলো আপনার?”

উমরানকে অল্প ভ্রু কুঁচকাতে দেখা যায়,

_”মৌরির সাথে বিয়ে হবে কেন? তোমাকেই বিয়ে করেছি আমি।”

_”কিন্তু আমি যে তখন মৌরি ছিলাম? কাজী সাহেব কী মৌরি সওদাগরের নামে বিয়ে পড়ায়নি?”

বিচলিত কণ্ঠ তার। উমরান তাকে ঘাবড়াতে মানা করে,

_”রিল্যাক্স! যা ভয় পাচ্ছ তেমন কিছুই হয়নি। কাজী সাহেব শ্রেয়সী নেওয়াজ নামেই বিয়ে পড়িয়েছে। আর তুমি রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করো নি। থাম্বপ্রিন্ট দিয়েছিলে, মনে করে দেখো।”

শ্রেয়সীর একটু ভাবতেই মনে পড়লো। আসলেই সে কোনো সাইন করেনি। আঙ্গুলের ছাপ দিয়েছিল সই করার জায়গায়। যাক ভালোই হলো। তার চিন্তা কমল। মৌরির সাথে বিয়ে হয়নি। তার সাথেই হয়েছে তার স্বামীর বিয়ে।

_”ও আচ্ছা। মৌরির সাথে হয়নি তার মানে। আমিই আপনার একমাত্র বউ।” নিশ্চিন্ত কণ্ঠ তার। থেমে ফের বলে,

_”আপনি জানেন? আমি এবার বাড়িতে মৌরির ছবি দেখেছি। মেয়েটা খুব সুন্দর।”

_”তাই? কীভাবে দেখলে?”

_”আপুর ফোনে। ওদের অনেক ছবি। সব দেখেছি বসে বসে। ইশ! খুব সুন্দর, মায়াবী দেখতে মেয়েটা। কীভাবে পারল এমন অসময়ে সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে।” আফসোসে ভরা উদাস কণ্ঠ তার। উষশী তখন মায়ের কাছে এসে তার পায়ের নুপুর জোড়া দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আর মুখে অভ্যাসবশত ‘ওয়াআও ওয়াআও’ শব্দ করছে। উমরান শ্রেয়সীর মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে শুইয়ে দেয় সন্তর্পণে। চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে বলে,

_”মানুষের আয়ুষ্কাল আগে থেকেই নির্ধারিত। এভাবে ওভাবে ওর চলে যাওয়ারই ছিল। এখন এটা নিয়ে মন খারাপ করে থাকলে তোমায় আমি মাইর দিবো।”

_”আয়ুষ্কাল নির্ধারিত জানি তো। কিন্তু ও যে নিজে নিজে চলে গেলো? আমার না ওর সেই প্রেমিককে দেখার খুব ইচ্ছে। ঐ ছেলেটা এখন কী করছে, কেমন অবস্থায় আছে— যদি দেখতে পারতাম! আর ছেলেটার জন্য মৌরি এভাবে সবাইকে ছেড়ে চলে গেলো। সে এখন না জানি কোন মেয়ের সাথে আবার মন বেধেঁছে। আমার তো এ কথা ভাবলেই মৌরির জন্য কষ্ট লাগে । ওর সাথে যদি কোনোভাবে আমার আগে থেকে পরিচয় থাকত, তাহলে কতোই না ভালো হতো! আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়, মৌরি বুঝি ওর পরিচয়ে আমি ওর জায়গা নিয়েছি সবখানে— এটা দেখে মন খারাপ করে আমার ওপর।”

_”আবার এলোমেলো চিন্তা তোমার।” বিরক্তি নিয়ে কথাটা বলতে বলতে উমরান ফোন বের করে তাতে কিছু একটা এনে শ্রেয়সীর সম্মুখে ধরে। শ্রেয়সী ওতে নজর ফেলল। কোনো একটা ভিডিও। কিন্তু ভিডিওতে দৃশ্যমান মানবটিকে দেখে সে কোনো কথাবার্তা ছাড়া নাক ছিটকে উঠে,

_”ছ্যা! আপনি এই ছেলেটার ভিডিও দেখেন? ছেলেটা একটা নাস্তিক। কোনো ধর্ম মানেনা। কী বলে মানব ধর্ম আর প্রেম ধর্ম সবার ঊর্ধ্বে; এমনকি সৃষ্টিকর্তাও। পুরাই নাস্তিক।”

_”তুমি জানো এর নাস্তিকে পরিণত হওয়ার কারণ?”

_”জানি তো। একবার একটা ইন্টারভিউতে বলেছিল— প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছে। ওর প্রেমিকা নাকি বিধর্মী ছিল। পরে এটা নিয়ে কোনো ঝামেলা হওয়ায় সুইসা ‘ইড করেছে মেয়েটা। সেই থেকে মানসিক সমস্যা দেখা যায় এই ছেলের মধ্যে। সাইকো টাইপ হয়ে গিয়েছিল নাকি। মেন্টাল হসপিটালে ছিল অনেকদিন। পরে ভালো হলে তখন থেকেই নাস্তিক হয়ে যায়।”

_”হু, অনেক কিছুই তো জানো দেখছি। ওর নাম হচ্ছে তুষার কায়ান।”

শ্রেয়সী ভিডিওটা আনমনে দেখতে দেখতে হঠাৎ কী বুঝে থমকে যায়। চোখে বিস্ময় নিয়ে উমরানের দিকে তাকায়। উমরান চোখে সম্মতি জানালে সে নিশ্চিত হয়।

এই ছেলেটা-ই তার মানে মৌরির সেই প্রেমিক। কী আশ্চর্য! সে জানতই না। এই ছেলের ঘটনাও জানে, মৌরির ঘটনাও। অথচ কখনো এরাই এঁকে অপরের প্রেমিক প্রেমিকা হতে পারে –এ কথা মাথায় আসেনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম–সাময়িক তরুণ, আর জনপ্রিয় সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে একজন তুষার কায়ান। চেনেনা এমন মানুষ কম। পেঠানো শরীরের চোখ ধাঁধানো এক পুরুষ। বিশেষ করে বিদেশী গড়ন হওয়ায় দশজনের মধ্যে থাকলেও আলাদা করা যায়। প্রথম প্রথম জনপ্রিয়তা পাওয়ার সময়ে তরুণী মেয়েদের হার্টথ্রোব ছিল। ফিড জুড়ে এই বিদেশী দেখতে দেশী ছেলের চর্চা। কিন্তু দুদিন যেতেই জানা গেলো এই ছেলে নাস্তিক। তাও আবার সে বিধর্মী হওয়ায় প্রেমিকা নাকি সুইসা’ ইড করেছিল। এর কারণেই এখন সে ধর্ম বিমুখ। কোনো সৃষ্টিকর্তার আরাধনা সে মানেনা। তারপর কিছুদিন এই চর্চা-ই চললো। এক দল এটাকে জাস্টিফাই করে তার দিকটার সঠিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেছে, আবার কেউ কেউ সরাসরি তিরস্কার, আর বুলি করেছে— অনেকদিন ছিল এই পক্ষে বিপক্ষে নানান চর্চা। কিন্তু তুষার এই নিয়ে একবার একটা ইন্টারভিউতেই মুখ খুলেছিল শুধু। এরপর এসব চর্চায় আগে পরে আর কোনো কথা সে বলেনি। নিজের মতো দেশ বিদেশের সমসাময়িক নানান ঘটনা, কিংবা নতুন-পুুরনো নানান বিষয় বিশ্লেষণ করে সেসবের নেপথ্য, ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকসহ নানান কিছু তুলে ধরে ভিডিওতে। আর তা দেশের মানুষ অব্দি সীমাবদ্ধ না; তার জনপ্রিয়তার পরিধি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তুষার দেশে থাকেনা। সুইজারল্যান্ডের মাটিতে আছে সুস্থ হওয়ার পর থেকে।

বিস্মিত শ্রেয়সী অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। মাথার ভেতর নিজেই নানান চিন্তা করছিল। মাথাটা তার স্বামীর কোলে, আর বুকের ওপর উষশী। একহাত আনমনে মেয়ের পিঠে বিচরণ করছে। সে ওভাবেই বলে,

_”ছেলেটা তারমানে মৌরিকে আসলেও ভালোবাস তো।”

_”এখনো সন্ধেহ!”

_”উহু, কিন্তু ও কী আসলেই মৌরি যে মুসলিম এ কথা জানত না?”

_”জানত।” আনমনে প্রশ্নটা করলেও উমরানের তৎক্ষণাৎ জবাবে সে ফের চমকিত নয়নে তাকায়।

_”জানত মানে?”

_”মানে তুষার জানত মৌরি-র বিষয়ে। জেনেশুনেই ওকে ভালোবেসেছে। আর মৌরির কাছে লুকিয়ে গেছে – সে জানলে তুষারের সাথে সম্পর্কে জড়াত না তাই। মৌরি ওকে একবার ভালোবেসে ফেললে নিজেই একসময় ওর মায়াতে আঁটকে পড়বে, আর ছেড়ে যেতে পারবেনা— এ ভাবনাতে ওকে না জানিয়ে আগে ভালোবাসায় জড়িয়ে নিয়েছে। ও প্রথম প্রথম ভেবেছিল দুজন দুই ধর্ম থেকেই বিয়ে করা যাবে। কিন্তু আস্তে আস্তে এটা সম্ভব না জেনে নিজেই ধর্মান্তর হওয়ার সিদ্ধান্তে আসে। পরিবারের সাথে এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝামেলা চলছিল ওর। এসবের মাঝেই মৌরি এই সত্য জেনে গেছে। তুষারের কাছে সে কোন ধর্মের জানতে চাইলে তুষার সরাসরি মিথ্যা বলতে পারেনি; স্বীকার করে নেয় যে ও খ্রিষ্টান।” থেমে দীর্ঘশ্বাস টেনে ফের বলে, “এসব নিয়ে এমনিতেও পরিবারে নানান ঝামেলায় ছিল, মৌরির সাথেও কোনো কারণে সাময়িক দূূরত্ব তৈরি হয়, শারীরিক-মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিল তুষার। তাই ও এসব আগে থেকে জেনেও মৌরিকে ইচ্ছাকৃত জানায়নি বুঝে ভুল বুঝতে পারে, তাদের নিজেদের মধ্যে নতুন কোনো ঝামেলা হতে পারে— এই ভাবনায় ও জানতে চাইলে তখন এসব না জানার ভান করে। কিন্তু মৌরি সইতে না পেরে এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে নেবে ভাবতে পারেনি। তাছাড়া মৌরির প্রেগ্ন্যান্সির ব্যাপারেও ও মারা যাওয়ার পরেই জানতে পেরেছে তুষার। সব মিলিয়ে এত কিছু মেনে নিতে না পেরে মানসিক সমস্যা দেখা যায়। মৌরি আর ওর অনাগত সন্তানের জন্য পাগলামি করতে থাকে দিনের পর দিন। একসময় চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়। কিন্তু এরপর নিজের জীবনের নিয়ম নিজে বেঁচে নিলো। এখনো ওভাবেই আছে। কোনো মেয়েকে ভালোবাসেনি আর। অহেতুক চিন্তা করছিলে।”

থামল উমরান। হাত তার শ্রেয়সীর চুলের ভাঁজে, আর মেয়ে তার নিজের মাথার ক্লিপ খুলে মেয়ে পাপার মাথায় আঁটকে দেওয়ার প্রচেষ্টায়। শ্রেয়সী অনুদ্দেশ্যে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে আনমনে এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিল। ঢোক গিলে বলে,

_”আপনি এসব কীভাবে জানলেন?”

_”তোমার খবর নিতে গিয়ে মৌরির সম্পর্কে জেনেছিলাম। তখন তুষারের বিষয়টাও জানতে পারি। ওর মুখেই শুনেছি এসব।”

শ্রেয়সী ফের ঢোক গিলে। নাক টেনে স্বামীর দিকে তাকায়। স্বয়ং তুষারের সাথেই কথা বলে এসব জেনেছে তার মানে। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না। এদের কথাগুলো ভাবলে কেন জানি বিষাদ বিষাদ লাগে। প্রেম সবার জন্য আসেনা। মৌরিদের জন্য যেটা এসেছে, ওটা নিষিদ্ধ ছিল। সেই নিষিদ্ধ প্রেম গ্রহণ করায় তার শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু তাও শ্রেয়সীর খালি মনে হয়— মৌরির সাথে এমনটা না হলেও পারত, মেয়েটার জীবন আরেকটু সহজ হলেও পারত।

________

_”অর্ণব ভাইয়া?”

_”হ্যাঁ বল। শুনছি আমি।” চাঁপা স্বর তার

_”তোমার জন্য ‘তূর্ণার বর’ লিখে খোদাই করা একটা আংটি বানিয়েছি। কিন্তু এটা কীভাবে তোমার কাছে পৌঁছাব? তুমি তো আসবে একবারে ঈদের ছুটিতে। ততদিন আমার চিহ্ন ছাড়া থাকবে?” বলতে বলতে উজ্জ্বল কিশোরী মুখটা তমসায় ছেয়ে গেলো।

_”এটা বলার জন্য ফোন করেছিস? আমি এখন ল্যাবে আছি। ল্যাব শেষ করে ফোন দিচ্ছি কেমন?”

অর্ণব বললো নিচু গলায়। গলার স্বরটা ইচ্ছে করেই চেপে রাখা। কারণ চারপাশে নিস্তব্ধতা, আর একধরনের নিয়ন্ত্রিত ব্যস্ততা।

সে তখন অ্যানাটমি ল্যাবে। সাদা অ্যাপ্রন পরা কয়েকজন স্টুডেন্ট স্টিলের টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে। ফরমালিনের তীব্র গন্ধ বাতাসে ভাসছে। চোখে নাকে হালকা জ্বালা ধরানো সেই পরিচিত গন্ধ। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা ধীরে টিকটিক করছে, মাঝে মাঝে স্যার-এর মনোযোগী কণ্ঠের নির্দেশনা ভেসে আসছে।

সে সবার পেছনে খুব সাবধানে নিম্ন স্বরে কথা বলছে বাড়িতে রেখে আসা কিশোরী বউয়ের সাথে।

_”শোন, আমি ওটা কুরিয়ার করে পাঠানো শিখিয়ে দেবো তোকে। এত চিন্তা করতে হবেনা। এখন রাখ, ল্যাব শেষে আমি ফোন দেবো।”

_”কিন্তু আমি যে চুরি করে আম্মুর ফোন নিয়ে এসেছি। তুমি ফোন দিলে তো সবাই কথা বলবে আমি ছাড়া।”

তূর্ণার অনিশ্চিত কণ্ঠের বিপরীতে অর্ণব একনজর সামনে নির্দেশনারত স্যারের দিকে তাকিয়ে, ঠোঁট টিপে হেসে বলে,

_”কেন? আগে যেভাবে অন্যদের থেকে ফোন কেঁড়ে নিতি? ওভাবে নিবি আরকি।”

_”দূউর, আমার লজ্জ্বা লাগবেনা এখন?” লাজুক কণ্ঠ তার। অর্ণব না চাইতেও ঠোঁট চেপে অল্প হেসে উঠে। পাশের এক বন্ধু হঠাৎ লুকিয়ে ফোন বের করে তার ছবি তুলে নিলো। অর্ণব ল্যাবে দাড়িয়ে চুপিচুপি বউয়ের সাথে কথা বলছে। চোরের প্রমাণ রাখা লাগবেনা একটা?

সে চোখ রাঙিয়ে ফোন নামিয়ে নিতে ইশারা করে। বন্ধুরা পাত্তা দিল কি না সন্ধেহ। চোখ সরিয়ে কারো পেছনে ঠিক করে আড়াল হয়ে তূর্ণার উদ্দেশ্যে নিম্ন কণ্ঠে বলে,

_”সেদিন না লজ্জ্বা ভাঙিয়ে এলাম? এখনো এত লজ্জ্বা?”

_”লাগবেনা? এখন তো আমার বর তুমি” মিনমিন করে বলে সে।

অর্ণব না চাইতেও ফের ঠোঁট চেপে হাসল। ভ্রু উচিয়ে নির্দেশনারত স্যারের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে বলে,

_”বর ছাড়া অন্য কারো সামনে লজ্জ্বা পাওয়া মানা বুঝেছিস? আমার বউয়ের লাজুক চেহারা শুধু আমি দেখব।” ওপাশে তূর্ণার গালে যে আবারও রক্তিম আভা এসেছে তা সে বুঝল, চোখে হাসে সে, “এখন রাখছি। আমি কল দিলে মৃন্ময়কে দিয়ে তোর কাছে পাঠাব ফোন।”

_”আচ্ছা এখন রাখো তাহলে।” লাজ লুকিয়ে বললো সে।

_”শোন,” সে কান হতে ফোন নামাতে গিয়ে আবার অর্ণবের কণ্ঠ পেয়ে থামল,

_”হ্যাঁ বলো।”

_”অর্ণবের বউ পড়াশোনা ঠিকমতো করছে?”

সেই ফিসফিস কণ্ঠের বিপরীতে কিছুপল থেমে তূর্ণা মিনমিনিয়ে জবাব দিল,

_”করছে,”

_”খাবার-দাবার ঠিকমতো খাচ্ছে?”

_”খাচ্ছে”

_”বড়দের সব কথা শুনছে?”

_”হুম।”

_”অর্ণবের বউকে বলবি অর্ণব তাকে ভালোবাসে”

কানে কথাটা বেজে সেকেন্ড কয়েক গড়াল। ওপাশে অর্ণব এখনো আছে। তূর্ণার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি মনোযোগ দিয়ে শুনে তার বুকের কম্পন বোঝার চেষ্টায় সে। তূর্ণা সময় পর গাঁঢ় শ্বাস টেনে এদিক ওদিক তাকিয়ে দৈবাৎ বলে উঠে,

_”বলব না। তুমি গিয়ে জানাও তাকে। আমায় তূর্ণার বর বলেছিল যেন কারো প্রেম-ভালোবাসা বিষয়ক আলোচনায় আগ্রহ না দেখাই কখনো। তাই তুমি নিজে গিয়ে জানাও।”

টুট করে ফোন কেটে দিল সে গড়গড় করে কথাগুলো বলে, ফোন কেটেই ওটা বুকে নিয়ে গভীর শ্বাস টানে। ঠোঁট চেপে হাসল সামলে। রক্তিম গালটা সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরী মনের রঙিন-তাজা আবেগের প্রতিচ্ছবি।

অর্ণবের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে যে কতো বেগ পোহাতে হয় তূর্ণাকে— তা তার বর অর্ণব কী কখনো জানতে পারবে?

তূর্ণার যখন অর্ণব ভাইয়ার তাকে গালে চুমু দেওয়ার সেই দৃশ্যটা মনে পরে, তাকে কানে ফিসফিস করে প্রথমবার ভালোবাসি বলার দৃশ্যটা মনে পরে, সে নির্জীব হয়ে শুয়ে থাকার সময় তার ওপর ঝুঁকে নিক্ষেপ করা সেই মাতাল দৃষ্টির কথা মনে পরে— গা-টা যেন শিরশিরিয়ে উঠে এখনো, বুকটা লুব-ডুব শব্দ করে লাফিয়ে উঠে। রাতে ঘুমাতে গিয়ে অর্ণব ভাইয়ার কথা মনে আসলে যখন সারারাত পেটে প্রজাপতিরা গুড়গুড় করে, বিছানায় এদিক-ওদিক করে কাঁঁটাতে হয়— তখন তার ভাবনার ঐ মানুষটা অর্ণব ভাইয়া— তার অর্ণব ভাইয়া —এ কথাটা ভেবে নিজেকে কোথাও লুকিয়ে ফেলতে মন চায়।

অর্ণব ফোন কেটে ল্যাবে মনোযোগ দিল বন্ধুদের ইশারা-ইঙ্গিতে করা হাসিঠাট্টা উপেক্ষা করে। তূর্ণা বহু কষ্টে স্বাভাবিকভাবে তার সাথে কথা বলে —এ কথা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তাই একটু ছাড় দিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভালোবাসার কথা জানান দিচ্ছিল। কিন্তু যত লাজুকই হয়ে যাক, বউ তার দিনশেষে ইঁঁচড়েপাকা-ই। ভেবেই স্যারের নির্দেশনা শুনতে শুনতে হেসে ফেলল সে।

তূর্ণা মায়ের ফোনটা চুপিসারে গিয়ে সোফায় রেখে আসলো। তবে রান্নাঘর থেকে তার মা দেখে নিয়েছে। নজর লুকিয়ে দৌড়ে চলে আসে সে। তার মা ভ্রু উচিয়ে কোণা চোখে মেয়ের কাণ্ড দেখে। পরক্ষণে আপনমনে হাল্কা হেসে কাজে মন দিল।

পাশে বড় জা-ও আছে। অর্ণবের মায়ের মলিন চেহারায় না চাইতেও হাসি ফুঁটে কিশোরী মেয়েটার কাণ্ডে। তবে ভালো লাগে মেয়েটা তার পুত্রবধূ — কথাটা ভাবলে।

তূর্ণা অন্তত সারাজীবন তাদের কাছেই থাকবে। এর থেকে স্বস্তির আর কী হতে পারে?

অর্ণবের সাথে তূর্ণার আগের মতো তেমন কথা হয়না। তূর্ণা যেকোনো কারণে হুটহাট ফোন দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। সম্পর্ক বদলে যাওয়ায় দ্বিধা-সংকোচ এসেছে তাতে। কিন্তু কখন একটু কথা বলতে পারবে সে আগ্রহে মুখিয়ে থাকে তার অবচেতন মন। তবে অর্ণব বাড়িতে ফোন দিলেও তার সাথে কথা বলে খুব মেপে মেপে। কথোপকথন কতটুকু হলে তার তৃষ্ণা কিছুটা নিবারণ হবে, সাথে তূর্ণা তাকে নিয়ে ভাববে, আবার পড়াশোনায়ও বড় প্রভাব আসবেনা— সবটা বুঝে চলতে হয় তার।

_________

তাহুরা চৌধুরী আর ওলিওল্লাহ চৌধুরী বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর সব ঠিকঠাকভাবে চললো। শ্রেয়সীর বুকের দুধ ফিরবে কী না এখনো তার নিশ্চয়তা নেই। তবে ডাক্তারের পরামর্শ, আর তাদের চেষ্টা— দুটোই চলছে। তার স্মৃতি সম্পূর্ণ ফেরেনি। কিছু বিষয় এখনো সঠিকভাবে মাথায় আসেনা। অনেককিছু ঘোলাটে তার মস্তিস্কে। ডাক্তার বলেছে শ্রেয়সীকে তার জন্ম, আর বেড়ে উঠার স্থানে নিয়ে গেলে, ওখানে কিছুদিন সময় কাঁটালে— স্মৃতিশক্তি নিখুঁত হয়ে ফেরার সম্ভাবনা আছে। আর অবশ্যই কাছের মানুষগুলো পাশে থাকতে হবে।

সামনে রমজান। উমরানের ছুটিও আর বেশিদিন নেই। ডাক্তারের পরামর্শ মাথায় রেখে শেষদিনগুলো উষশী, আর শ্রেয়সীসমেত উমরানের বান্দরবানে গিয়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উমায়রার পরিবার এবারের ঈদ দেশে কাঁটিয়ে তবেই ফিরবে। তারা বিয়ে সম্পূর্ণরুপে উপভোগ করছে। সাথে এত বছর পর দেশে আসায় আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা, সময় কাটানো, আর ঘুরে বেড়ানো তো আছেই। শ্রেয়সীরা উমরানের ছুটি শেষ হওয়ার আগের সময়টুকু সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বান্দরবানেই কাঁটাচ্ছে। ছুটি শেষ হলে তারা মা-মেয়ে ফুলবাড়ি ফিরে যাবে।

মায়ের জন্মস্থান ঘুরে বেড়াল উষশী। এতদিন বাবার শহর দেখেছে, এখন দেখছে মায়ের শহর। শ্রেয়সীকে এতদিন পর পেয়ে আশ্রমে, ক্যাম্পে যেন উৎসব লেগেছে। বাচ্চাদের জন্য নানান উপহার এনেছে সাথে, তাদের আনন্দের শেষ নেই। আশ্রমের কোণায় কোণায় সেই পুরোনো আমেজ। তবে আনন্দ, ফুর্তির জন্যে সদস্য বেড়েছে। সাথে শ্রেয়সীকে টপকে এখন প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে ছোট্ট উষশী। পুঁই -ও যেন নিজের সেই সর্বপ্রথম হওয়া নীড়ে ফিরে কিছুটা চাঙ্গা হলো।

নেওয়াজ কুঠিরেই থাকছে তারা। শ্রেয়সী তার পুরনো বান্ধবীদের সাথে দেখা করেছে সময় সুযোগ ঠিক করে। কারও বিয়ে হয়নি এখনো। পড়াশোনা করছে তারা। শ্রেয়সীর স্বামী-সন্তানসহ পরিপূর্ণ সংসার দেখে সে কী হাপিত্যেশ তাদের। জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে গেছে নাকি!

বিকেলের নরম আলোয় নেওয়াজ কুঠিরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছটার ডাল থেকে ঝুলে থাকা দোলনায়, মেয়েকে কোলে নিয়ে দুলতে দুলতে সেসব ভাবনাতে আপনমনে হাসছিল সে। পা দুটো কখনো মাটিতে ছুঁয়ে আবার ছন্দে ছন্দে দোলনায় ভেসে উঠছে। দোলের তালে তার ঘন চুলগুলো হাওয়ার সঙ্গে মিশে উড়ছে; কখনো গালে এসে লাগে, কখনো ঘাড় ছুঁয়ে সরে যায়।

গায়ে তার সাদার ওপর আকাশী রঙা ফ্লোরাল প্রিন্ট, আর বার্ডট হাতার কাঁধ উন্মুক্ত গোল জামা। যা তার গলা আর কাঁধের কোমলতা ও নারীত্বকে স্পষ্ট ফুঁটিয়ে তুলেছে। মাথার পেছনে আকাশী রঙা কাপড়ের তৈরি বড় ফুল দিয়ে বানানো একটি ক্লিপ আলতো করে চুলে আঁটকে দেওয়া। কোলে উষশী —তার গায়েও ঠিক একই রঙের পোশাক, মাথায় মিলিয়ে দেওয়া হেয়ারব্যান্ড। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো হুরপরি তার রাজকন্যাকে কোলে নিয়ে পরীর রাজ্যের দোলনায় দুলছে।

সময়ের ব্যবধানে শ্রেয়সীর বাগানের ফুলগাছগুলো আরও বড় হয়েছে; ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। চারপাশটাও যেন জানান দিচ্ছে এটা এক ফুলকন্যার রাজ্য।

এক হাতে দোলনার রশি ধরে, অন্য হাতে মেয়েকে আগলে রেখেছে সে। দোলনায় চড়তে চড়তে উষশী আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। সেই শব্দে বিকেলের বাতাসও কেমন হাসছে যেন। শ্রেয়সী তাকে আরও আগলে নেয়, কণ্ঠে মায়ের আদুরে গর্ব মিশিয়ে বলে,

_“মাম্মা তোমাকে আর তোমার পাপাকে পেয়ে শুনলাম, আমি জীবনযুদ্ধে অনেক এগিয়ে গেছি। এখন একজন বিজয়ী যোদ্ধাকে কী উপহার দেওয়া যায়? মাম্মা বিজয়ী। উপহার দাও দেখি মাম্মাকে।”

উষশী কোনো জবাব দেয় না। চোখ-মুখ কুঁচকে দোলনার দোল উপভোগ করতেই ব্যস্ত সে। পুঁই ও আছে, ফুঁলের বাগানে এদিক ওদিক উড়ছে সে। উষশী ছোট ছোট হাতে তালি দিতে দিতে ভাঙা ভাঙা শব্দ করে,

_“বা বা… আম ম্মা… দু আলও আলও…”

শ্রেয়সী হেসে ওঠে। দোলের ছন্দে, মেয়ের নিশ্ছিদ্র আনন্দের মাঝে আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

_“বলো বলো? কী উপহার দেবে মাম্মাকে?”

_“মাম্মাকে কী উপহার দেবে উষশী? মাম্মার উপহার তো সে নিজেই।”

পুরুষালি কণ্ঠস্বরটা হাওয়ার সঙ্গে মিশে কানে আসতেই শ্রেয়সী দোলনার ছন্দে ছন্দে হাসিমুখে পেছন ফিরে তাকাল। চোখে পড়ে পরিচিত সেই মুখ। তাদের নিরাপত্তা আর ভালোবাসার নির্ভর ঠিকানা। তাকানোর মুহূর্তেই উমরান তার কানের ফাঁকে আলতো করে গুঁজে দিল একটা জারবেরা ফুল।

পাপাকে দেখেই উষশীর আনন্দ যেন বাঁধ ভাঙে। ছোট্ট শরীরটা দোলনার সঙ্গে আরও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠল। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভাঙা ভাঙা শব্দে বলে,

_“ওয়াআও… ওয়াআও… আলও, আপ পাপা, দাআও।”

সে দোল দিতে বলছে। ইদানিং কিছু কিছু বলা শিখেছে বেশ।

পেছন থেকে দোলনার রশিতে হালকা চাপ দিতে দিতে উমরান বলে,

_“এত জোরে না, মাম্মা। ঠাণ্ডা লেগে যাবে তোমার।”

দোলনার গতি একটু কমে আসে। তবু শ্রেয়সীর চোখে-মুখে সেই ভাসমান সুখ। সে মৃদু গলায় বলে,

_“মেজর, খুউব ভালো লাগছিল। যেন আমরা হাওয়ার ওপর ভাসছি। আরও দিন না।”

উমরান নরম স্বরে জবাব দেয়,

_“এটুকুই এনাফ শ্রেয়সী। ভালোই লাগবে দেখো।”

_“না না, আরও দিন। আপনার হাওয়ায় উড়তে ভালো লাগেনা? আমার তো খুউব ভালো লাগছে। আমরা চড়ব, হাওয়ায় ভাসবো। আরও দিন।” শিশুসুলভ আবদার আর মুগ্ধতা একসাথে মেশানো তার কণ্ঠে।

উমরান সংযত হাতেই দোলনার গতি একটু বাড়াল। দোল খেয়ে সামনে পাঁক খেয়ে আবার ফিরে আসলো তারা। গলায় এক গভীরতা আর কণ্ঠে প্রেম মেখে উমরান তার কথার বিপরীতে বলে,

_“কে বলেছে হাওয়াদের আমার ভালো লাগেনা? আমার কাছে ধরিত্রীর প্রতিটি বাতাস, প্রতিটি হাওয়া —শ্রেয়সী, শ্রেয়সী লাগে। যেন সে এসে আমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় প্রতিবার।”

শ্রেয়সীর ঠোঁট ফাঁক করে মেয়েলি হাসি ঝরে পড়ে। সেই হাসিতে যেন মুক্তোর ঝিলিক। গাছের পাতায়, দোলনার কাঠে, আর বিকেলের আলোয় চারপাশটাও কেমন করে ওঠে সেই সুরেলা হাসিতে!

মাকে হাসতে দেখে উষশীও মাথা উঁচু করে খিলখিলিয়ে ওঠে। এক হাতে সে শক্ত করে দোলনার রশি আঁকড়ে ধরেছে, অন্য হাতে মায়ের জামা খামচে ধরেছে। পুঁই অদূরে বাগানে এদিক ওদিক উড়ছে কণ্ঠে নিজস্ব সুর তুলে।

স্বামীর কথার উত্তরে দুলতে থাকা শ্রেয়সী হাসি জারি রেখে মেয়েকে আরও আগলে নেয়, গলায় আবদারের মিশিয়ে আওয়াজ তুলে বলে,

_“তাহলে দিন। আরও দোল দিন, মেজর। আমি হাওয়ায় ভাসবো। হাওয়ার সুরে ভেসে আপনার কাছে যাবো, আপনাকে ছুঁয়ে দেব। আর আপনি আমায় অনুভব করবেন।”

------ ~ সমাপ্ত ~ ---------

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ৩১ গল্পের ছবি