হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ৩০

🟢

------ ১ম অংশ ---------

তুলি বাপের বাড়ি এসেছে দুদিন আগে। স্বামীর সঙ্গে এখান থেকেই তার এক বন্ধুর বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবে বলে তিন–চারখানা শাড়ি সঙ্গে এনেছে। দুপুরে খাওয়া–দাওয়া সেরে রুমে বসে সেগুলো বোন মৌরিকে দেখাচ্ছে। কোনটা পরলে ভালো হবে, কোনটা মানাবে– এই নিয়ে চলছে পরামর্শ। উঠতি বয়সী তূর্ণাও পাশে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত চোখে শাড়িগুলো দেখছে।

ছোটবেলায় মায়ের আর বড় বোনদের ওড়না জড়িয়ে কতবার যে শাড়ি পরেছে, তার হিসেব নেই। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে পা দেওয়ার পর শরীরের গঠনে পরিবর্তন বেশ; তাই আর ওড়না গায়ে বসে না। সেই সঙ্গে শাড়ি পরাও অনেকদিন হয়ে ওঠেনি। তুলির বের করা শাড়িগুলোর মধ্যে থেকে একটা তুলে নিয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। এলোমেলো করে, যেন সাপের মতো পেঁচিয়ে কোনোমতে গায়ে জড়ালেও কুঁচি আর কিছুতেই ধরতে পারে না।

_“আপু, কুঁচিগুলো ধরে দাও তো।” বোনের কাছে এগিয়ে এসে বলে সে।

_“পাগলি! বাম হাতে শাড়ি পড়েছিস কেন? ওটা তো ডান দিক দিয়ে পরে।” তুলি হেসে ওঠে।

_“তাহলে ঠিক করে দাও না। ভেবেছিলাম এদিক থেকে শুরু করলে ডান হাতের দিকেই যাবে। কিন্তু উল্টো বাম হাতে চলে এলো।”

মৌরি কোলের ওপর রাখা শাড়িটা নামিয়ে রেখে উঠে আসে। তূর্ণার গায়ের শাড়িটা খুলে আবার নতুন করে পরাতে পরাতে বলে,

_”আপু, বাবা মাকে বলো আমার আগে যেন এটাকে বিদায় করে দেয়। বউ সাঁজার হেব্বি শখ তার। সেদিন মা আলমারির সব শাড়ি বের করে রোঁদে দিচ্ছিল। সে দেখে একটা পছন্দ করে আমার কানে কানে বলে ওটা নাকি তাকে যখন পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে প্রথমবার, তখন পড়বে।”

তুলি আর মৌরি দুজনেই হেসে ওঠে।

_“এই বয়সেই তো রঙিন স্বপ্ন দেখবে। ভুল কী আছে?” তুলি বলে। “আমি তো বলি, ওই শাড়ি না —আমার বোনের জন্য আরও নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি আনব। যেটা পছন্দ হয় ওটা পরে পাত্রপক্ষের সামনে যাবে।”

_“উফ্! তোমরা চুপ করো তো,” তূর্ণা নাক সিটকায়। “এভাবে বলছ, যেন মৌরি আপুর নিজের বিয়ের সময় কী পরবে তার কোনও প্ল্যানই নেই!”

মৌরি থামে না, আরও পচানি দিতে থাকে। তুলি বলে,

_“শুধু শাড়ি পরলে হবে? গায়ের ফ্রকটা খুব লুজ। এটা পরে ভালো লাগবে না। এই ব্লাউজটা নে। নতুন বিয়ের সময় সেলাই করেছিলাম। তোর হবে।”

মৌরি ততক্ষণে কুঁচি ঠিক করে ধরে দিয়েছে, আঁচলটা গুছিয়ে দিল। তারপর হেসে বলল,

_“হ্যাঁ, এটা পরে নে। একদম বউয়ের মতো লাগবে। এই ব্লাউজে তো এখন রানু মণ্ডলের ছোট বোন মনে হচ্ছে!”

_“কিন্তু আমি তো তোমারই ছোট বোন, আপু। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?” ভ্রু নাচিয়ে রসিকতা করে তূর্ণা।

তুলি হো হো করে হেসে ওঠল। মৌরি বুঝে পিঠে একটা চাপড় বসায়। তূর্ণা মুখ ভেঙিয়ে হাসতে হাসতে রুমের এক কোণায় গিয়ে ব্লাউজ পরে পড়ে নেয়।

তুলি খুলে রাখা শাড়িগুলো ভাঁজ করতে থাকে। মৌরি কিছু মেকআপের জিনিস বের করছে বোনকে সাজাবে বলে। তূর্ণা তৈরি হয়ে এলে তাকে বসিয়ে ধীরে ধীরে সাজিয়ে দেয় —চুড়ি পরায়, কানে ঝুমকা ঝোলায়, শেষে চুল একপাশে সিঁথি কেটে গুছিয়ে নেয়।

_“বাহ! একদম নতুন বউ!” মৌরি বলে ওঠে। “বিয়ে দিয়ে দিতে হবে একে। বেশি দেরি করলে রাস্তাঘাটে না আবার কেউ তুলে নিয়ে যায়। কী বলো আপু?”

নেহাতই রসিকতা। নানান বাহারি কথা বলে বোনকে লজ্জা দেওয়া ওদের নতুন না। তূর্ণার গাল লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে ওঠে। তবে নিজের বোনদের সামনে সে গুটিয়ে যায় না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কখনও ঘোমটা দেয়, কখনও আঁচল ঘোরায়, কখনও চুল নিয়ে ঢং করে নিজেকে দেখতে থাকে। তুলি ফোন বের করে ছবি তোলে।

_“আপু, শাড়িতে আমাকে অনেক বড় বড় লাগছে তাইনা?” তূর্ণা জিজ্ঞেস করে।

_“তাহলে আর বলছি কি?,” মৌরি হাসে। “একদম বিয়ে দেওয়ার মতো।”

এমন সময় বাইরে থেকে ভাই অর্ণবের ডাক ভেসে আসে। মৌরি দরজা খুলে তাদের নয় বরং মাকে ডাকছে শুনে আবার চলে আসে। তূর্ণার ভিডিও করতে থাকে সে। ডাকতে ডাকতে অর্ণব বোনেদের রুমে চলে আসল। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

_“এখানে বসে রঙ্গ করছিস তিনজনে? ডাকলে কানে আওায়াজ যায় না তোদের?” ধমকের সুরে বলে সে।

তুলি ফোন হতে নজর সরিয়ে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায়।

_”কি সমস্যা? কি খুজঁছিস?”

অর্ণব তিনজনের দিকে নজর ঘুরিয়ে তাকায়। বিরক্তি তার চোখে মুখে। কিছুটা মাথা গরম দেখাচ্ছে। ধমক কণ্ঠে বলে,

_”ফোন হাতে নিয়ে আছিস অথচ হাজার বার কল দিলেও পাওয়া যায়না একটাকে। ফোনগুলো ভেঙে ফেল। জরুরী কলে না পেলে ঐ ফোনের আর দরকার কি? মা-চাচী কোথাও?”

তুলি ওয়াইফাই অন করে দেখল হোয়াটস অ্যাপে বারো-টা কল। বাচ্চাগুলো ফোন নিলে ইউটিউবে কিছু যাতে না আসে তাই ওয়াইফাই অফ করে দিয়েছিল সব মোবাইলে। ঘুমানোর পর আর অন করতে মনে নেই।

_”বাচ্চারা ঘুমাচ্ছিল না তাই অফ করে রেখেছিলাম ওয়াইফাই।” তুলি

_”আসমার দাদী নাকি বাথরুমে পা পিছলে পরে ব্যথা পেয়েছে ভাইয়া। ওখানে দেখতে গেছে মা আর চাচী। তোমার কিছু লাগবে?”

নিউমার্কেট গেলে মা ফোন দিতে বলেছিল। কিছু লাগবে হয়তো, সে গেছিল বিদায় কল দিচ্ছিল বারবার। কিন্তু এখন চলে এসেছে। আর বলে লাভ নেই। কলে একটাকেও পাচ্ছিল না বলে মাথা গরম ছিল।

কিন্তু আয়নার সামনে রংঢং করা তূর্ণাকে খেয়াল হতেই ললাটে ভাঁজ পড়লো।

_”লাগবে না আর। চলে এসেছি বাজার থেকে। কিন্তু এর এই অবস্থা কেন?” আঙ্গুলের ইশারা করে দেখায় সে।

তূর্ণা গালে ব্লাশ লাগাচ্ছে মেকআপ ব্রাশ দিয়ে। অর্ণবের কথায় আয়নায় নিজের পেছনে থাকা অর্ণবের দিকে চেয়ে বলে,

_”এই অবস্থা মানে? শাড়ি পড়েছি দেখতে পাচ্ছ না?”

তার কথায় অর্ণব আগাগোঁড়া নজর বুলিয়ে দেখে। কপালের ভাঁজ মিলাল না।

_”সেটা দেখতে পাচ্ছি। এত রংঢং কি উপলক্ষে তা জানতে চাইছি আমি। কোথায় যাওয়া হচ্ছে?” সে ভেবেছে কোথাও যাবে শাড়ি পরে। যা মোটেও ভালো চোখে দেখছে না আপাদত।

_”তূর্ণার বউ হতে ইচ্ছে করছে রে অর্ণব। একটা পাত্রের খোঁজ লাগা। ওর বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ দেখতে এলে নাকি এভাবে সাঁজবে ও? প্র্যাক্টিস করছে।”

হেসে উঠলো দুবোন।

_”আপুউউ!”

অর্ণব ভাইয়ার সামনে বড় বোন শাড়ি পরা অবস্থায় বিয়ের কথা তোলায় তূর্ণা লজ্জ্বা পেলো এবার। গালে অল্প ব্লাশ ছিলই, তার ওপর লজ্জায় গাল দুটো যেন আগুনের মতো লাল হয়ে ওঠে। সে লাজে রাঙা চেহারায় চোখ রাঙিয়ে তাকায় দুবোনের দিকে। অর্ণবের দিকে এক বারও তাকাল না। তার চোখ দুটো স্পষ্ট জানান দিচ্ছে সে অর্ণবকে লজ্জ্বা পাচ্ছে।

সেদিনই তো প্রথমবারের মতো ধাক্কাটা খেয়েছিল অর্ণব। বিরক্তি নিয়ে শাড়িতে উঠতি বয়সী তূর্ণাকে দেখতে দেখতে লাজে রাঙা গাল, আর চোখ দুটোতে নিজের সর্বনাশ দেখে ফেলল।

তূর্ণা তাকে লজ্জ্বা পাচ্ছে, শাড়ি পরে বিবাহিত রমণীর ন্যায় সাঁজ দিয়ে তার দিকে লজ্জ্বায় চোখ তুলে তাকাচ্ছেনা। মনোযোগসহিত বিরক্তিমিশ্রিত বিমোহিত এক দৃষ্টিতে দেখল তা। বুকের ভেতর কোথাও যেন ভয়ংকর এক ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। সেই মুহূর্তে তার দুনিয়া থমকে দাঁড়ায় লাজে রাঙা চেহারাটা দেখে।

শত চেষ্টা করেও আর ঐ মুহূর্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি এরপর। না!! তূর্ণাকে এড়িয়ে চলার, কিংবা বাজে ব্যবহার করে দূরে সরার চেষ্টা করেনি। অকারণে মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার তার স্বভাবে নেই।

বরং ভাই-বোনের সম্পর্ক হিসেবে বন্ধনটা আরও দৃঢ় করার প্রচেষ্টায় ছিল সে। যাতে এসব চিন্তা মাথায় আনার আগে নিজের প্রতি ধিক্কার আসে - কাকে নিয়ে কি ভাবছে!

কিন্তু শত ধিক্কার এলেও নিজের মনকে বেঁধে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে সে।

আর আজ সেদিনের ঐ ব্যর্থতা নিজের জায়গায় সফল হতে যাচ্ছে।

তূর্ণাকে বঁধূবেশে সাজিয়ে ঘোমটা তুলে দেওয়া হলো মাথায়। সেদিনের মতো এ বাড়ির বড় দুই মেয়ে মিলেই ছোট মেয়েটাকে সাজিয়ে দিয়েছে। শুধু জীবনচক্র স্বেচ্ছায় পরিবার-পরিজন ত্যাগ করা মৌরির জায়গায় পরিবারহীন শ্রেয়সীকে এনে দিয়েছে। যে পরিবারের মূল্য বুঝে, আত্মার সম্পর্কগুলোকে ধরে রাখতে জানে।

না তো শ্রেয়সী পরিচয়ে যারা তাকে পরিবারের মতো আগলে রেখেছে শুরু থেকে, তাদের অবমূল্যায়ন করেছে কখনো, আর না নিজের একমাত্র নাড়ি ছেড়া ধনটার থেকে জানা-অজানায় দূরে রাখা এই পরিবারটিকে অবমূল্যায়ন করেছে।

সেদিনের বোকা শ্রেয়সী দুনিয়া যতই কম বুঝুক, সম্পর্কের মূল্য খুব করে বুঝে সে। এই দুনিয়ায় রক্তের সম্পর্ক তার ছিল না সঠিক বুঝজ্ঞান আসার আগে থেকেই। যারা তাকে ভালবেসে আগলে রেখেছে, তাদেরই রক্ত সম্পর্ক নেই বলে আপনজন নয় বলে ভাববে কোন সাহসে? আর এখন তার সন্তান আছে। সন্তানের প্রতি এক মায়ের ভালোবাসার কোনো মাপকাটি হয়না। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের একজন এসেছে বলে আগের মতো যদি এই পরিবারটাকে আপন করতে না পারে, জানা অজানায় যা হয়েছে সবটা একপাশে রেখে যদি সেই সম্পর্কগুলো আগের মতো সুন্দর মানসিকতা নিয়ে মূল্যায়ন করতে না পারে। তাহলে তো সে স্বার্থপর হয়ে গেলো। আগে কেউ ছিল না বলে ভাগ্যজোরে পাওয়া কাছের মানুষদের মূল্য বুঝেছে, আর এখন উষশী আছে জেনেছে বলে তার মানসিকতা বদলে গেলো - এমনটা কি করে হতে দিতে পারে সে? তাহলে তো সে আর শ্রেয়সীই নয়।

কারণ এই যে চাইলেই সব কথা সবার সামনে তুলে খোলামেলাভাবে কৈফিয়ত নিতে পারতো সে। অথচ এমনটা করেনি। অনেক জটিল বিষয়টা সহজভাবে ভেবে বিশ্বাস রেখেছে, সম্পর্কগুলোকে ধরে রেখেছে - এটাই তো শ্রেয়সীর বিশেষত্ব। সে এমন বলেই সে শ্রেয়সী। বোকা, তাও কোথাও যেন অবিবেচক নয়।

অর্ণব–তূর্ণার বিয়ে ঘরোয়াভাবেই হচ্ছে। কালরাতে পাওয়া আকস্মিক নিমন্ত্রণে দীপ্ত তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এসেছে, আর উমরান এসেছে শ্রেয়সী ও উষশীকে সঙ্গে করে।

শ্যালক–শ্যালিকার বিয়ে। রাত বারোটার দিকে খবরটা পেয়ে অবাকই হয়েছিল তারা। আজ এখানে এসে সবটা পরিষ্কার হলো। জামাইদের কাছে কিছুই গোপন রাখা হয়নি। যা ঘটেছে –সবটা জানানো হয়েছে তাদের।

তুলি শুরুতে তূর্ণাকে বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে একেবারেই রাজি ছিল না। কিন্তু তূর্ণার মামা–মামির আচরণ শুনে তার মাথা গরম হয়ে আছে। নিজের বোনকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে –এই বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। তাদের বাড়ির মেয়েদের জন্য নিশানের থেকেও বড় বড় বাড়ির ছেলেদের প্রস্তাব এসেছে। তাকেও কত ঘর থেকে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু সবদিক বিচার করে একবারই এক ঘরে দেখানো হয়েছিল। আর সেই ঘরেরই বউ আজ সে। তূর্ণা কোনও দিক দিয়েই কম নয়। অথচ তার নিজের মামাবাড়ি থেকেই প্রস্তাব রেখে আবার মুখের ওপর ফিরিয়ে দিলো। এটা কীভাবে করতে পারে তারা? এই নীরব দ্বন্দ্ব আত্মীয় ঘরের সাথে হওয়ায় পরিস্থিতি আরও থমথমে হয়ে উঠেছে।

দীপ্ত বউয়ের রাগ দেখে বেশি কিছু বলেনি। নিজের সম্বন্ধির সঙ্গে শ্যালিকার বিয়ে। বিষয়টা সে মনে মনে উপভোগই করছে। তার বাচ্চারাও খুব খুশি। মামা আর ছোট খালামণির বিয়ে– এই আনন্দে ওদের ছুটোছুটি চোখে পড়ছে। বাড়িটা বিশেষভাবে সাজানো হয়নি। সময় পায়নি কেউই। তূর্ণাকেই দুবোন মিলে সম্পূর্ণ বউ সাজিয়ে দিয়েছে।

সোফায় বসে কাজী সাহেব কিছু লিখছেন। পাশে অর্ণবের বাবা আর চাচা। উমরান বসে বসে সবটা লক্ষ্য করছে। কোলে উষশী। নতুন জায়গায় সে শান্ত নেই, তাইনাই করছে। গায়ে নতুন জামা, মামার বিয়েতে এসেছে –সে কি সাজবে না? সামনে টেবিলে রাখা পায়েসের বাটি থেকে অল্প অল্প করে চামচে তুলে খাওয়াচ্ছে তাকে তার পাপা।

উমরান দুই ব্যস্ত শাশুড়ির দিকে তাকায় –উষশীর জন্য আরও খাবার নিয়ে আসছে ট্রে ভরে।

_“আন্টি, আর কিছু দেবেন না প্লিজ,” অনুরোধ করে বলে সে। “পায়েস শেষ করতেই ওর অনেক সময় লেগে যাবে।”

_“তা বললে কি করে হয় বাবা? প্রথমবার নানাবাড়ি এসেছে। পেটপুরে না খেলে হয়? মৌ–র কাছ থেকে জেনে নিয়েছি, ও এসব খুব পছন্দ করে। অল্প অল্প করে সবখান থেকেই খাওয়াও। নানীর হাতের রান্না খেয়ে দেখুক।”

গালে হাত বুলিয়ে আদর করে দেন তিনি। উমরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে সম্মতি জানায়। কিছু করার নেই। সে নিজেও খেয়েই বসেছে। দীপ্ত আর সে –দুজনকেই টেবিল ভরে নাস্তা ধরিয়ে দিয়েছিল। অল্প অল্প করে খেয়েছে। অতো খাবার আপ্যায়নের জন্যই হয়, খাওয়া যায়না।

খাওয়ার সময়ই সবটা জানানো হয়েছিল তাদের। উমরান বিশেষ কোনও মত দেয়নি। শ্রেয়সীকে অর্ণব–তূর্ণার বিয়েতে খুশিই লাগছে। সে যদি কম বয়সে বিয়ে না দেওয়ার কথা তোলে, তাহলে নিশ্চিত তাদের ইতিহাস টেনে কথা শুরু করবে মেয়েটা।

তাছাড়া এই বিয়েটা কেবল পড়িয়েই রাখা হবে। অর্ণব এমবিবিএস শেষ করে বিদেশ যাবে এফজিএস করতে। সার্জন হয়ে ফিরলে তখন সবাইকে জানিয়ে বড় অনুষ্ঠান করা হবে। তবে আজকের বিয়ের খবর তূর্ণার মামাবাড়িতে যে পৌঁছাবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। হয়তো তূর্ণার বাবাই মিষ্টি নিয়ে যাবে।

তূর্ণাকে নিয়ে আসতে বলা হলো। অর্ণব তখন নিজের রুম থেকে বেরিয়েছে– গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। হাতার ভাঁজ ঠিক করতে করতে দীপ্তর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বের হয়। পাশের ঘর থেকে শ্রেয়সী আর তুলি তূর্ণাকেও বের করে আনে। শ্রেয়সী উষশীর কান্না শুনে তুলিকে বলে,

_“আপু, ওকে তুমি আস্তে আস্তে নিয়ে এসো। উষি কাঁদছে হয়তো, আমি যাই।”

তুলি সম্মতি জানায়। তূর্ণা অর্ণবকে দেখে আর কোনও কিছু না ভেবে শাড়ি সামলে তার দিকে এগিয়ে আসে।

_“অর্ণব ভাইয়া!”

অর্ণব ফিরে তাকায় সেই উদ্গ্রীব ডাকে। বধূবেশে তূর্ণা। তার জন্যই এই সাজ। আপাদমস্তক একবার দেখে নেয় সে। প্রথম দিনের সেই অনুভূতিটা আবার ফিরে আসে অকস্মাৎ। তবে আজ তূর্ণার চোখে লাজুকতা নেই। তার জায়গায় একরাশ প্রশ্ন, বিস্ময় আর অভিমান।

_“বল।”

_“তুমি দুদিন আগে আমাকে কী বলেছিলে?”

_“তো?”

_“তো মানে?” গলা ভেঙে আসে তার। “এসব কী? আমাকে বউ সাজিয়ে ফেলেছে। আজ বিয়ে! এসবের মানে কী?”

বলতে বলতে চোখের জল ছেড়ে দিল তূর্ণা। সারাদিন ধরে বিস্ময়ে ঠিকমতো কথা বলতে পারেনি। আজ হঠাৎ নিজের বিয়ের খবর শুনে মাথায় ঢুকতে সময় লেগেছে। যখন বুঝেছে– সবার আগে অর্ণবের কথাই মনে আসে। তার সব সমস্যার সমাধান থাকে অর্ণব ভাইয়ার কাছেই থাকে। বোনেরা কোনও জবাব দেয়নি। বাবা-মাকে বোঝাতে যাওয়া মানে অযথা গলা শুকানো। কারণ তূর্ণাকে বিয়ে দিতে তারা কতটা উদ্গ্রীব তা সে জানে। তাই শুধু অর্ণবের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। একটু কেঁদেকুটে বললেই হবে। সবাইকে মানিয়ে নেবে তার অর্ণব ভাইয়া। কিন্তু সে সুযোগ কেউ দেয়নি তাকে। এই মাত্র দেখা হলো। সে তো অর্ণব বাড়ি ফিরেছে এটাই জানত না, নাহলে সবার কাছে ফোন খুঁজতে হতো না ওভাবে। নিজেই দেখা করে নিতো।

দীপ্ত ইশারায় তুলিকে নিয়ে সরে গেল। দুজনে নিচে চলে যায়।

_“মানে আজ বিয়ে হবে,” অর্ণব বলে।

_“কিন্তু কেন?” চোখভর্তি জল নিয়ে প্রশ্ন করে তূর্ণা। “ওসব তো থেমে গিয়েছিল। আবার কেন? তাও সরাসরি বিয়ে! কার সঙ্গে বিয়ে, কিসের কী কিছুই বুঝতে পারছি না।”

অর্ণব এগিয়ে এসে খুব সাবধানে তার চোখের জল মুছে দেয়।

_“আমাকে বিশ্বাস করিস?”

_“অবশ্যই করি। কিন্তু– ”

_”বিশ্বাস করলেই হবে। সবটা যেভাবে হচ্ছে হতে দে। বিয়ের পর কিছু বদলাবেনা। তোকে কারো সাথে বিয়ে পড়িয়ে রেখে পড়াশোনা করাতে চাইছিল না চাচা-চাচী? তাই শুধু বিয়েটাই হবে। তুই আগে যেমন ছিলি তেমন থাকবি। তাই যা যা বলা হবে করবি, বুঝেছিস? আজ আমাদের বিয়ে।”

_”তোমারও বিয়ে?” হতবাক-প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি তার।

অর্ণবের চোখ দুটো হেসে উঠলো এই অতি চালাক ইঁচড়েপাকার বোকামি দেখে।

_”হ্যাঁ, তোর আর আমার বিয়ে।” চোখে চোখে রেখে জবাব দেয় সে।

বিস্ময়, আনন্দ, দ্বিধা –সব মিলিয়ে তূর্ণা কথা হারিয়ে ফেলে। যে সে এখনই বিয়ে করতে চায় না –এই কথাটাও মাথায় আসছে না। হুঁশ থাকলে হয়তো কান্নাকাটি করে বিয়ে থামিয়ে দিত। কিন্তু এখন সে শুধু বলে,

_“আমি কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যাবো না এত তাড়াতাড়ি।”

_“বলেছি তো আগের মতোই থাকবে সব।”

সবটা এখনও পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও অর্ণবের আশ্বাসে তূর্ণা মাথা নাড়ে।

_“এখন চল,” বলে সে তূর্ণার হাত ধরে।

পাঁচ আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। শাড়ি সামলাতে পারছে না তূর্ণা। এক হাতে কুঁচি ধরে রাখলেও ভারসাম্য ঠিক হচ্ছে না। অনেকদিন পর শাড়ি পরেছে সে –মৌরি আপু একবার পরিয়ে দিয়েছিল সেই কবে। এরপর অর্ণব ভাইয়া মানা করে দেওয়ায় আর পরা হয়নি।

কুঁচি ধরে রাখতে না পেরে সে অর্ণবের আঙুল ছেড়ে কনুই আঁকড়ে ধরে।

_“ভাইয়া, মেহমান এসেছে?”

_“মেহমান কেন আসবে?”

_“আজ না আমাদের বিয়ে!”

_“ওহ,” অর্ণব মাথা নাড়ে, “মৌ আর তুলি এসেছে দুলাভাই আর বাচ্চাদের নিয়ে। আর কেউ না।”

কপালের দুই পাশে চিকন করে নামানো চুল চোখে এসে পড়ছিল। বিরক্ত হয়ে চুল সরাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে চাইলো তূর্ণা।

_“আহ!”

অর্ণব তৎক্ষণাৎ কোমর আগলে ধরে ফেলে। তূর্ণা সামলে দাঁড়ায়। কিন্তু শাড়ির ফাঁক দিয়ে উদরে অর্ণবের স্পর্শ টের পেয়ে সে এক মুহূর্ত থেমে যায়। অস্বস্তিটা লুকিয়ে খুব সাবধানে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

এমনটা কখনো হয়না অর্ণবের সাথে তার। সে এরূপ বিষয়ে সচেতন থাকে, যতই দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠ বন্ধন থাকুক। আর অর্ণবও অবশ্যই এত অসচেতনভাবে কখনো স্পর্শ করেনা তাকে। আজ হঠাৎ এমনটা কীভাবে হয়ে গেলো জানে না তূর্ণা। একটু ঘেমে উঠল সে। অর্ণব ভাইয়া নিশ্চয় খেয়াল করেনি, তাই ওভাবে ধরে ফেলেছে।

অর্ণব তার ভাব বুঝে নীরবে হেসে ওঠে। কোণাচোখে একবার তাকিয়ে আবার তার হাত ধরে নেয়।

_____

দুজনে পাশাপাশি সোফায়। তূর্ণা ততক্ষণে তার বিয়ে কার সাথে তা জেনে গেছে। থম মেরে বসে আছে সে। একবারও চোখ তুলে তাকায়নি কারও দিকে। পাশে অর্ণব– তার দিকেও তাকাচ্ছেনা। সেই তখন নিয়ে এসে যেখানটাই বসিয়েছে, সেখানেই নত মস্তকে জমে বসে আছে।

কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলো।

তূর্ণার এক হাত অর্ণব আড়ালে নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে নিয়েছে। মেয়েটার হাতটা কেমন নিস্তেজ, প্রাণহীন। অর্ণব সেটা বুঝতে পেরে আলতো করে হাত নাড়ায়। নিজের উপস্থিতি, নিজের স্পর্শটা তাকে বোঝাতে চায়। কিন্তু তূর্ণার সাড়া নেই।

চারপাশে সবাই ঘিরে আছে। মৃন্ময়, তুলি, শ্রেয়সী –যে যার মতো ছবি আর ভিডিও নিচ্ছে মুহূর্তটাকে ধরে রাখার জন্য। কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেব তূর্ণাকে কবুল বলতে বলেন।

একবার।

দুইবার।

তিনবার।

কিন্তু যতবার কবুল বলতে বলা হচ্ছে, ততবার তূর্ণা যেন আরও নিজের ভেতর গুটিয়ে যাচ্ছে। ঘোমটা দেওয়া মুখটা মাথা নিচু করে রাখায় ঠিক করে দেখাও যাচ্ছে না।

তূর্ণার মা এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াতে চাইলে অর্ণব হাত তুলে তাকে থামায়।

সে একটু ঝুঁকে তূর্ণার দিকে মুখ এনে নিচু গলায় বলে,

_“কবুল বল, তূর্ণা।”

_“না।”

কণ্ঠটা এতটাই নিচু ছিল যে অর্ণব ছাড়া আর কেউ শুনতে পায়নি। সে নত মুখটার দিকে তাকিয়ে আরও নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

_“আমায় বিয়ে করবি না?”

তূর্ণার শ্বাস ঘন হয়ে আসে। অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝেই সে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছেনা। কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতার পর খুব আস্তে বলে,

_“কবুল।”

_“আর দুইবার, মা,” কাজী সাহেব বলেন।

_”কবুল কবুল।”

কাজী সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসাথে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লো। তারপর অর্ণবকে কবুল বলতে বলা হলে সে তিনবার নির্দ্বিধায় বলে দেয়।

তূর্ণা–অর্ণবের বিয়ে সম্পন্ন হলো।

কাজী সাহেবকে খাইয়ে–দাইয়ে, সম্মানিসহিত বিদায় জানানো হয়। তূর্ণা ক্রমেই আরও গুটিয়ে যাচ্ছে দেখে অর্ণব বেশিক্ষণ তার পাশে বসে থাকল না। উঠে দাঁড়িয়ে সরে গেল। দীপ্ত সুযোগ ছাড়ল না। সম্বন্ধিকে নিয়ে হালকা পচানি শুরু করলো। অর্ণব গিয়ে উমরানের পাশে, পুরুষদের মধ্যে বসে পড়ল।

অন্যদিকে শ্রেয়সী আর তুলি মিলে তূর্ণাকে ঘিরে ধরে অনেকক্ষণ ধরে নানান কথা বোঝাতে থাকে। সাজানোর সময় সবকিছু খুলে বললে তূর্ণা আপত্তি করবে বলেই কিছু জানানো হয়নি। সেই কথার জন্য দুজনেই ক্ষমা চেয়ে নিল। একের পর এক নানানভাবে সান্ত্বনা দিতে লাগল তারা।

কিন্তু তূর্ণা কোনো কথারই জবাব দিল না।

অর্ণব পাশ থেকে উঠে যাওয়ার পর তার মধ্যে যেন সামান্য স্বস্তি নেমে এলো। যে মানুষটা পাশে থাকলে স্বস্তি আর নিজেকে নিরাপদ লাগার কথা, আজ তার উপস্থিতিই সবচেয়ে অস্বস্তিতে ফেলছে তাকে। মুখটা সেই ঘোমটাসহিত আড়াল করে রেখেছে নত মস্তকে। একদম যেন নতুন বউ।

বাচ্চাদের একজন একজন করে তূর্ণার পাশে এনে ছবি তোলা হলো। বউয়ের সাথে ছবি তুলতে আগ্রহী তারা। পরে সবাই মিলে একসাথেও তোলা হলো। শেষে শুধু বোনেরা মিলে আরও কিছু ছবি তুলে।

অনেকক্ষণ পর উমরান নিজেদের আলাপ ছেড়ে বলে উঠে,

_“আই থিংক এবার তূর্ণাকে উপরে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। ওর একটু স্পেস দরকার।”

কথাটা শুনে অর্ণব মনে মনে স্বস্তি পেল। বাবা আর চাচা তখন তূর্ণার মামাবাড়িতে খবর পাঠানো নিয়ে আলোচনা করছে। মা আর চাচীও পাশে। এতজনের সামনে তূর্ণাকে ওপরে পাঠানোর কথা বলতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। লজ্জাও লাগছিল।

তূর্ণার দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে সে কতটা নার্ভাস।

শেষমেশ মৌরি আর তুলি দুপাশ থেকে ধরে তূর্ণাকে নিয়ে ওপরে চলে গেল। বাচ্চারাও উৎসাহ নিয়ে তাদের সঙ্গে চলে যায়।

_”তূর্ণা। এভাবে থম মেরে বসে ছিলি কেন? রাগ করেছিস সবার ওপর? আরে তোর বাপের বাড়ি শ্বশুর বাড়ি এক এখন। এর চেয়ে খুশির আর কি আছে? শ্বশুর বাড়ি যাবিনা বলেছিলি না? তোর ইচ্ছা পূরণ হলো দেখ।” তুলি

_”এমন ভাগ্য কজনে পায়! এত অভিমান করে থাকিস না তো। আচ্ছা তুই আদৌ অভিমান করেছিস নাকি লজ্জ্বা পাচ্ছিস বলতো। আমি তো তোর মতিগতি কিছুই বুঝতে পারছিনা।” শ্রেয়সী

দুজনে নানানভাবে তূর্ণার সাথে কথা বলতে চাইল। নানানভাবে বুঝাতে থাকল। কিন্তু তূর্ণা একটা ফিরতি জবাব দেয়নি। শেষে রুমে রেখে আবার কিছুক্ষণ সান্ত্বনা দিয়ে দুবোন চলে আসে নিচে।

তারা চলে যেতেই তূর্ণা সবার আগে দরজায় খিল লাগাল। তারপর খাটের ওপাশে গিয়ে ওতে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে পরে। দুহাতে মুখ ঢেকে ঘনঘন শ্বাস টেনে বসে থাকে কিছুপল।

তাতে বোধ হয় কাজ হলো না। সেকেন্ড কয়েক যেতেই মুখ তুলে বিছানা থেকে নিজের একটা ওড়না টেনে নেয়। ওটায় নিজেকে ঢেকে ফের মুখখানা আড়াল করে। লজ্জ্বায় কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা সে। অর্ণব ভাইয়ার সাথে কী করে বিয়ে হয় তার? এটা কীভাবে হলো? সবাই কীভাবে এটা মাথায় আনল? কীভাবে কীভাবে!!

আবার বিছানায় মুখ গুঁজে নিজেকে আড়াল করে সে। ঘরের আসবাবগুলোকেও দেখতে লজ্জ্বা পাচ্ছে বোধ হয়। নিচে কীভাবে যে বসে ছিল সবার মাঝে –একমাত্র সেই জানে।

সময় গড়ায়। তূর্ণা দরজা খুলেনা। বাচ্চারা নতুন বউয়ের কাছে ঘুরঘুর করবে বলে বেশ কয়েকবার দরজা ধাক্কাছিল। সে খুলেনি। তুলি খাবার নিয়ে এসে কয়েকবার ধাক্কায়।

খুলেনা।

এমনকি ডাকে একবার সাড়া অব্দি দিলনা। শ্রেয়সী এসে কয়েকবার ডাকে।

খুলেনা।

শেষে ভয় পেয়ে গেলো তারা। রাগ, অভিমানে কিছু করে বসেনি তো? এমনিতেই মৌরির ঘটনার পর এসব বিষয় নিয়ে আতঙ্ক কাজ করে প্রত্যেকের মনে। তুলি সবাইকে গিয়ে জানালো –তূর্ণা দরজা খুলছেনা। বাবা, মা–সহ সবাই উঠে আসে। তানিম–তোহা ঝগড়া লাগিয়ে কাদঁছিল বলে একজনকে নিয়ে অর্ণব একটু বাড়ির বাইরের দিকে গেছে।

বাকিরা উপরে এসে তূর্ণাকে ডাকতে লাগল।

_”তূর্ণা! মা দরজা খোল। এভাবে লক করে রেখেছিস কেন?”

_”দরজা খোল তূর্ণা। কথা বল।”

_”তূর্ণা কি করছিস? দরজা খোল না!! এই তূর্ণা।”

একটাবার সাড়া দিলনা সে। আতঙ্কে কি করবে ভেবে পেলো না তারা। উমরান বলে,

_”অর্ণবকে ডাকলে ভালো হতো না? ও কিছু বুঝিয়ে বললে বা ক্ষমা চাইলে যদি খুলে। হয়তো ওর ওপর অভিমান করে আছে।”

_”হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই করি। ওর কথা যদি শুনে।”

মৃন্ময় এক দৌড়ে নিচে গিয়ে অর্ণবকে ডেকে নিয়ে আসলো।

সে এসে জানতে চায়,

_”কি হয়েছে এখানে?”

_”দেখ না বাবা। দরজা খুলছেনা তূর্ণাটা। অভিমান করে আছে হয়তো। কিছু করে না বসে আবার। একটু দেখ।” অর্ণবের মা

_”নরম করে বুঝিয়ে বল অর্ণব। বকলে আবার ভয়ে খুলবেনা।” বাবা

অর্ণব ধমক দিলেই হয়ে যায় তূর্ণার জন্য। কিন্তু আজ যেহেতু অর্ণবকে নিয়েই সমস্যাটা, তাই সে ধমক দিলে মানবেনা ভেবে নরম করে বুঝিয়ে বলতে বলে তারা।

অর্ণব সেসব কর্ণপাত করলো না। দরজা বন্ধ করে আছে শুনে কপালে ভাঁজ পড়েছে তার। কোল থেকে ভাগ্নেকে তার বাবার কোলে দিয়ে দরজায় একবার নক করে,

_”তূর্ণা? দরজা বন্ধ করেছিস কী কারণে? দরজা খোল।” ধমক না হলেও নরম নয় তার কণ্ঠ। তার কথায় খুলবে বলে মনে হলো না। তূর্ণার মা এসে আবার দরজা ধাক্কাতে চাইলে অর্ণব বাঁধা দেয়,

_”দুই মিনিট অপেক্ষা করো, খুলবে। পারলে এখান থেকে ভিড় কমাও। সবাই মিলে ঘিরে আছ বুঝেই খুলছেনা।”

_”বেশি বুঝিস? সেই কবে থেকে শুধু আমি আর মৌ দরজা খুলতে বলছি ওকে। খুলছেইনা,” তুলি

সাথে সাথে খট করে দরজা খোলার আওয়াজ হয়। তূর্ণার কণ্ঠও কানে এলো,

_”খুলেছি আমি। কেউ ঢুকবেনা খবরদ্বার।”

সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দীপ্ত বলে,

_”আমার মনে হয় সবার এখান থেকে যাওয়া উচিত। আর শালাবাবু চাইলে একটু ভেতরে গিয়ে কী সমস্যা জেনে নিতে পারো।”

বড়রা এ কথায় তাদের দিকে নজর ঘুরিয়ে তাকিয়ে চলে গেলো। সব যখন ঠিকঠাক আছে আর দাড়িয়ে থেকে লাভ নেই। তারা যেতেই অর্ণব কোনোদিক না তাকিয়ে অল্প করে দরজা খুলে আকস্মিক ভেতরে ঢুঁকে দরজা বন্ধ করে দিল। দু-সেকেন্ডে ছেলেটা কি করলো কেউ তৎক্ষণাৎ ধরতে পারেনি।

বুঝতেই শ্রেয়সী লজ্জ্বা পেয়ে গেলো। দীপ্ত শব্দ করে হেসে দেয়। উমরান এক নজর সবাইকে দেখে এখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য বলতেই নিচ্ছিল। তুলি গিয়ে দরজা ধাক্কাতে চায়। উমরান কপাল কুচকে নিলো। মেয়েটা পাগল নাকি?

কিন্তু দীপ্ত তা হতে দেয়নি। আঁটকে নেয় সহধর্মিণীকে।

_”কি করছ তুলি? চিন্তা, উৎকণ্ঠায় সবাইকে উপেক্ষা করে ঢুঁকে পড়েছে হয়তো। তুমি দরজা ধাক্কালে লজ্জ্বায় পরে যাবে দুজনে। বেচারি শ্যালিকা সেই থেকে লজ্জ্বায় মুখ তুলে তাকাচ্ছেনা।”

_”কিন্তু তূর্ণা কাউকে না ঢুকতে বলেছিল। ওর কতো রাগ তুমি জানো? কেঁদে কুটে বাড়ি মাথায় তুলবে। ওটা বেশ পারে তূর্ণা। তখন আমার ভাইটা আরও বেশি লজ্জ্বায় পরে যাবে।”

_”বেশি বুঝো তুমি। কিছু হবেনা। অর্ণব সামলে নেবে। স্বামী হয় এখন সে, আগের সম্পর্ক আর নেই। বউকে একা রুমে সামলানোর অনেক টেকনিক থাকে পুরুষ মানুষের কাছে। তুমি এত চিন্তা করো না তো, চলো এখান থেকে।”

দুজন এখন স্বামী-স্ত্রী মাথায় আসতেই দীপ্তর কথা-ই ঠিক মনে হলো। সে নিজেও বিবাহিত কি না! তবে ছোট বোনের স্বামীর সামনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়।

_”যাওয়া যাক প্লিজ। এভাবে দরজার সামনে দাড়িয়ে ডিসকাস করছি বিষয়টা আমাদের জন্যও ইম্বেরেসিং। অর্ণবও বুঝলে অপ্রস্তুত হবে। সো উই শো’ড লিভ আই গেইস।”

উমরানের কথায় সরে গেলো তারা। নিচে চলে যায়।

_______

তূর্ণা সাঁজপোশাক বদলায়নি। তবে শাড়ি কিছুটা অগোছালো হয়েছে আগের চেয়ে। আঁচল, আর কুঁচিগুলো হাঁল্কা হয়ে এসেছে। সে দরজা খুলে দিয়ে আবার সোজা বিছানায় কাঁত হয়ে শুয়ে পড়েছে দুহাতে মুখ ঢেকে।

অর্ণব নিঃশব্দে দরজা খুলে ঢুকে। তাকে কাঁত হয়ে হাতে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতে দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল। ধীরে পাশে এসে বসে। নিঃশব্দে শুয়ে আছে মেয়েটা। তার শ্বাস প্রশ্বাসের গতির ছন্দ অর্ণব গুণতে পারছে যেন।

শুধু কি মুখ গুঁজে রেখেছে, না কাঁদছে –বুঝতে সে কিছুটা ঝুঁকে এলো। তবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেও বুঝতে পারল না।

_”তূর্ণা…” ডেকে হাত দিয়ে ঘোমটা একটু সরায়।

চট করে মাথা তুলল তূর্ণা। অর্ণবকে দেখেই আবার মুখ লুকিয়ে ফেলে।

_”তুমি কেন এসেছ? আমি তো দরজা খুলে দিয়েছি তোমার কথা শুনে। কাউকে না আসতে বলেছিলাম। তুমি আমার কথা শুনলে না কেন তাহলে?”

_”দরজা বন্ধ করে কাউকে সাড়া দিচ্ছিলি না কেন? সবাই চিন্তায় পরে গেছিল। দেখি এদিকে তাকা।”

……(নিরুত্তর)

_”কি সমস্যা তোর?”

_”কিছুনা। যাও তো তুমি”

অর্ণব ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে কিছুপল তাকায় সেজেগুজে হাতের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে রাখা বধূপানে।

_”রেগে আছিস?” ধীরকণ্ঠে জানতে চায় সে।

_”উহু।”

_”অভিমান?”

_”না।”

_”তাহলে আমাকে বিয়ে করতে হয়েছে বলে অখুশি তুই?”

_”অর্ণব ভাইয়া এখান থেকে যাওনা…”

অর্ণব পাশ ঘেঁষে তূর্ণার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়, গালে হাত রেখে নিজের দিকে ফেরায় সে। কিছুটা ঝুঁকে এসে চোখে চোখ রাখে, চাপা স্বরে জানতে চায়,

_”আমাকে বিয়ে করায় অখুশি তুই?”

তূর্ণা আবার আগের মতো নিজেকে লুকাতে চায়। অর্ণব দিল না–গালে রাখা হাতটা দৃঢ় করেছে। তূর্ণার অস্বস্তি হচ্ছে নিজের মুখের উপর অর্ণব ঝুঁকে থাকায়। চোখ বন্ধ করে ফেলে,

_”তেমন কিছু না, তুমি চলে যাও। আমাকে একা থাকতে দাও প্লিজ।”

_”দেবো না একা থাকতে, আমার সাথে কথা বল তুই। তোর মন খারাপ আমার সাথে বিয়ে হয়েছে বলে?”

_”না।”

_”তাহলে?”

তূর্ণা নিরুত্তর। চোখ কাপঁছে তার। গালে লাল লালিমা। অর্ণব চোখ ঘুরিয়ে তা দেখে হঠাৎ বলে,

_”তুই কি লজ্জ্বা পাচ্ছিস তূর্ণা?”

_”হ্যাঁ।” সে গাঁইগুই না করে ঘনঘন শ্বাস–প্রশ্বাস নিতে নিতে সোজা বলে দিলো।

অর্ণবের ঠোঁট বাকিয়ে হেসে উঠে,

_”আমাকে লজ্জ্বা পাচ্ছিস?”

তূর্ণা জবাব দিল না, ঢোক গিলে শুধু। বন্ধ চোখের পাতা তিরতির করে কাপঁছে।

_”এই তূর্ণা…” ধীর কণ্ঠে ডাকে অর্ণব।

_”আমাদের বিয়ে কেন হলো? এটা কীভাবে হতে পারে?”

_”কেন দেখিস নি একটু আগে? কবুল বলে বিয়ে করেছি!”

_”কিন্তু তোমার সাথে কী করে আমার বিয়ে হয়? এসব কে বলেছে? আমাদের বিয়ের কথা উঠল কেন? বাবা মায়ের মাথায় এসব কী করে আসে?” অসংখ্য প্রশ্ন তার।

_”আমি চেয়েছি বলে হয়েছে। আর ওরা সবাই আমার কথায় রাজী হয়েছে।”

তূর্ণা চমকে তাকায় সোজাসাপ্টা জবাবে। কিন্তু চোখ খুলতেই অর্ণবকে এখনো এত কাছে দেখে ফের চোখ খিচে নিলো। সময় নিয়ে জানতে চায়,

_”তুমি বলেছ?”

_”হ্যাঁ, আমি বলেছি।”

_”কেন বলেছ?”

_”কারণ আমি চেয়েছি তুই আমার জন্য শাড়ি পরবি, বউ সাঁজবি। আমাকে লজ্জ্বা পাবি। ঠিক এখন যেভাবে বউ সেজে লজ্জ্বা পাচ্ছিস।” বলতে বলতে বুকের উপর হাল্কা হয়ে আসা আঁচলটা উপরে তুলে দিল সে অতি সাবধানে।

_”কিন্তু তুমি তো এমন ছিলেনা। আমাদের সবকিছু অন্যরকম ছিল।”

অর্ণব তার গাঁঁয়ের দুপাশে বিছানায় হাত রেখে ভর দিয়ে আরেকটু কাছে এগিয়ে আসে, নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

_”ছিল। অনেক কিছু ছিল। তুই বুঝতে পারিস নি। আমি তোকে বুঝতে দিইনি তাই। এখন বুঝাচ্ছি, তাই বুঝতে পারছিস।”

তূর্ণা ঘনঘন শ্বাস টেনে নিরুত্তর থাকে। অর্ণব সদ্য বিবাহিত সহ ধর্মিণীর দুপাশে কপালের চুল সরিয়ে দেয় সাবধানে ছুঁয়ে,

_“শোন,” অর্ণব ধীরে বলে। “আমি বলেছিলাম আমাদের বিয়ে একসাথে হবে। আজ সেটা হয়ে গেছে। তোকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবো না বলেছিলাম–পাঠাচ্ছিও না। এখানেই থাকবি। এই ঘরেই।”

একটু থেমে শ্বাস নেয় সে।

_“আগের কিছু বদলাবে না তূর্ণা। অভিমান করিস না তুই। ঠিক যেভাবে আগে ছিলি, সেভাবেই থাকবি। আমি কাল ভোরের ট্রেনে চলে যাবো। অসময়ে অনেকদিন ছুটি কাটিয়ে ফেলেছি। ফাইনাল ইয়ার আমার–আর ছুটি পাবো না। ডাক্তার হয়েই বের হবো। তারপর দেশের বাইরে যাবো আরও ডিগ্রি নিতে। এখানে থাকব না। চিন্তা নেই।”

কণ্ঠে তখন স্থিরতা আর একরাশ কোমলতা,

_“তুই তোর মতো থাকবি। যেমনটা চাচ্চু চেয়েছিল–মেয়েকে কারও নামে পবিত্র সম্পর্কে বেঁধে দিয়েই পড়াশোনা করাবে। ঠিক তেমনই।”

আরেকবার গভীর শ্বাস নেয় সে।

_“আমি তোর কাছাকাছি থাকবো না। তুই নিজের মতো থাকবি। সব আগের মতোই চলবে। শুধু সবসময় মনে রাখবি–আমার বউ তুই।”

একটু থেমে যোগ করে,_“এই কথাটা ভুলে যাবি না। ঠিক আছে?”

_”তুমি চলে যাবে?”

_”হ্যাঁ, সার্জন হবো বলেছিলাম না একবার? ওটার জন্য দেশের বাইরে যাবো। তারপর ফিরে আবার বউ বানাবো তোকে।”

_”অর্ণব ভাইয়া আমার লজ্জ্বা লাগছে।” বুকের উচ্চগতির শ্বাস–প্রশ্বাস হৃৎপিণ্ডের কাঁপনের জানান দিচ্ছে তার। অর্ণবের যেমন বুকের ভেতর ঘূর্ণিঝড় বয়েছিল সেবার, আজ তূর্ণারও তাই হচ্ছে বুঝি! অর্ণব মনোযোগ সহিত তার লাজে রাঙা মুখখানা আর শ্বাস–প্রশ্বাসে গতি পর্যবেক্ষণ করতে করতে নরম দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

_”লাগুক। আমার তোকে লজ্জ্বা পেতে দেখে ভালো লাগছে।” তূর্ণার কানের দুল ছুঁয়ে দিয়ে বলে, ”চোখ খোল তো, একটু লজ্জ্বা ভাঙাবো তোর।”

তূর্ণা ধ্রুতগতিতে মাথা নাড়াল। খুলবেনা চোখ।

_”চুমু খাবো তোকে।” তার ঠোঁটে অতি সাবধানে তর্জনী আঙ্গুলের স্পর্শ দেয়, “আমার চোখ চোখ রেখে তাকাতে পারলে গালে, নয়তো ঠোঁটে।”

তূর্ণা চমকিত নয়নে তাকায় চুমুর কথা শুনে। কিন্তু দুসেকেন্ডের মতো অতি নৈকট্যে থাকা পুরুষটির সাথে দৃষ্টির মিলন হয়েছে শুধু। তূর্ণা এর মধ্যেই গালে এক জোড়া অধরের স্পর্শ পেয়ে যায়। বিষয়টা বুঝে উঠবে, তার আগে অন্য গালেও এসে ঠেকল সেই অধর দুটো, পরপর তিরতির করে কাঁপতে থাকা চোখের পাতায়।

হতবম্ব তূর্ণা শ্বাস আটকে শুয়ে থাকে। অর্ণব চলে গেছে তার গালে নিজের স্পর্শ এঁকে দিয়ে। কানে কানে একটা কথা বলে গেছে যাওয়ার আগে। অর্ণব ভাইয়া তাকে ভালোবাসে। এটাই তো বলেছে। বিস্মিত স্থির তূর্ণা। পৃথিবীটা একদিনেই অসহ্য দেখতে বাহারি রঙে রাঙিয়ে গেছে বুঝি।

অর্ণব বের হওয়ার মিনিট পাঁচেক পরেই হুড়মুড় করে রুমে ঢুকে পড়ে শ্রেয়সী আর তুলি। তূর্ণা তখনও বালিশে মাথা এলিয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ, শ্বাস–প্রশ্বাস ঘন আর অস্থির।

_“তূর্ণা, কীরে? ঘুমিয়ে গেলি নাকি?”

মুখে কথাটা বললেও চোখের পাতার কাঁপনেই বোঝা যাচ্ছিল যে ঘুমায়নি। তাই তুলি হাত ধরে টেনে তাকে বসায়। তূর্ণা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। বোনের বুকে শরীর এলিয়ে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

তুলি আর শ্রেয়সী দুজনেই অবাক হলো।

_”কি হলো তূর্ণা? কাদঁছিস কেন? ভাইয়া কিছু বলেছে তোকে? দরজা বন্ধ করে রেখেছিলি বলে বকেছে?” শ্রেয়সী তার মাথায় হাত রেখে বিচলিত কণ্ঠে প্রশ্ন রাখে।

কাঁদতে কাঁদতে তূর্ণা মাথা নাড়ে

_”না।”

_“তাহলে এমন করে কাঁদছিস কেন?” তুলি পিঠে হাত বুলিয়ে বিচলিত হয়ে জানতে চায়।

_“আমার লজ্জা লাগছে আপু,” ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে তূর্ণা। “আমি কীভাবে সবার সামনে যাবো? অর্ণব ভাইয়ার সামনে যাবো কীভাবে?”

গালের ভেতর ভেতর কান্নাস্বরে বলে সে। তূর্ণার স্বভাবটার সঙ্গে তারা পরিচিত। তাই বুঝতে সময় লাগে না। তুলি আদর করে মাথায় চাপড় দেয়।

_“পাগলি! লজ্জার কী আছে? আমাদের কি বিয়ে হয়নি? বাচ্চার মা হয়ে বসে আছি। এত কিসের লজ্জা?”

তূর্ণা ফিসফিস করে বলে,

_“অর্ণব ভাইয়া আমাকে চুমু দিয়েছে।”

শ্রেয়সী এক ঝটকায় হেসে উঠতে গিয়েও সামলে ধমক দেয়,

_“তূর্ণা! এসব কথা বলতে নেই। ছিঃ ছিঃ! মানুষে শুনলে কী বলবে?”

তুলি অবশ্য পাত্তা দেয় না। উল্টো হেসে চোখ বড় করে জানতে চায়,

_“তাই নাকি? আমার ভাই এর মধ্যেই তোকে চুমুও দিয়ে দিল? তা কোথায় চুমু দিয়েছে? ঠোঁটে না গালে?”

_“আপুউউ!” শ্রেয়সী চাঁপা স্বরে থামাতে চায়।

_“গালে,” তূর্ণা আরও লাজুক হয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে। “আর বলেছে… আমাকে ভালোবাসে। আমার খুব লজ্জা লাগছে আপু।”

_“এহ্‌হে!” তুলি হেসে ওঠে। “গালে চুমু খেয়েছে বলে এখন লজ্জায় লাল–নীল হয়ে যাচ্ছিস! দুদিন বাদে দেখবি অবশিষ্ট লজ্জাও ভাঙিয়ে দেবে। তখন শুধু ভালোবাসে বলবে না, ভালোবাসা চাইবেও। তখন তো মনে হয় তোকে খুঁজেও পাওয়া যাবে না, পাগলি!”

একটু থেমে বোঝানোর সুরে বলে,

_“শোন, এসব কাউকে বলবি না। বর যদি প্রেম দেয়, চুপচাপ প্রেম নিতে হয়। সবাইকে বলে বেড়াতে হয়না। বুঝেছিস?”

------ ২য় অংশ ---------

উমরান স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সওদাগর বাড়ি এসেছিল দুপুরে খাবার–দাবার সেরে। সকালে শ্রেয়সীকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিল বলে সকালের দিকে আসতে পারেনি তারা।

বিয়ে হয়েছে তাদের আসার পর– বিকেলে। আজ রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল সকালে চলে যাবে। তাদের বাড়িতেও মেহমান– উমরানের বোন, বোন-জামাই, ভাগিনা-ভাগিনি আছে। বাড়িতে মেহমান রেখে এখানে বেশি সময় কাটানো ভালো দেখাবেনা। তবু রাতটুকু কাটিয়ে যাবে ঠিক করেছে। ভাইয়ের বিয়ে, বোনও এসেছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। আজই চলে যেতে হলে শ্রেয়সীরও একটু মন খারাপ লাগবে।

তারা সকাল থেকে হাসপাতালে ছিল, সেখান থেকে আবার এখানে আসা– সব মিলিয়ে কিছুটা ক্লান্ত হতে পারে ভেবে উমরানকে শ্রেয়সী আগে যে রুমে থাকতো সেখানে বিশ্রাম নিতে দেওয়া হলো। মেয়েকে নিয়ে বিছানায় আছে সে। হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে ফোনে জরুরী কিছু দেখছে, আর গাঁঁয়ের উপর উষশী গড়াগড়ি খাচ্ছে খেলতে খেলতে।

মিনিট দুয়েক পর শ্রেয়সী এলো ব্যস্ত কদমে। হাতে একটা বাটি, আর গ্লাস। বিছানার পাশে টেবিলে রেখে দিলো। ব্যাগ থেকে উষশীর জন্য নরম পোশাক বের করতে করতে বলে,

_”আপনি কি ঘুমাবেন একটু? কাল রাতেও বাড়ি ফিরেছেন রাত করে। বাড়ি থেকে হস্পিটাল, হস্পিটাল থেকে বাড়ি, আবার এখানে - ক্লান্ত লাগবে। একটু ঘুমান নাহয়। আমি উষিকে মৃন্ময়ের কাছে দিয়ে আসি।”

একহাত মেয়ের পিঠে, ফোন হতে দৃষ্টি সরিয়ে এক নজর শ্রেয়সীকে দেখে আবার ফোনে নজর দিল উমরান,

_”না এখানেই থাকুক। আমি ঘুমাব না।” উষশীকে টেনে উপরে তুলে, “এই পোশাকগুলো চেঞ্জ করে দাও তো ওকে। গায়ে র‍্যাশ হচ্ছে।”

_”হ্যাঁ, ওর পোশাকই বের করছি।” ব্যাগ হাতরে দেখতে দেখতে জবাব দেয়।

_”তুমি কি করছ? এত তাড়াহুড়ো লাগাচ্ছ যে?”

_”মা তার দুই জামাইয়ের জন্য কিছু ডেজার্ট বানাচ্ছে। একটা আমার ভীষণ পছন্দের আগে থেকে। কিন্তু রেসিপি জানিনা। শিখে নেবো এখন।” উৎফুল্লতা তার চোখে, “বাড়ি গিয়ে ওটা বানাব। আপু–ভাইয়া, এমির–আরাবি —সবার পছন্দ হবে দেখবেন।”

উষশীর পোশাক খুঁজে পেলো।

_”মাম্মা। আমার লক্ষী এদিকে এসো দেখি।”

উষশী একহাতে পাপার বুকের উপর ‘বা বা’ করে খেলতে খেলতে টেনেটেনে অনেকটা খুলে ফেলছে গাায়ের পাথর, নেটে –ডিজাইন করা পোশাকটা। শ্রেয়সী ওটা খুলে নিলো সাবধানে। নরম থেকে একটা পরিয়ে দিতে দিতে বলে,

_”কিছু দরকার হলে আমাকে ডাকবেন। এখানে মিল্কশেক, আর বাটিতে মাফিন রেখেছি। গাঁইগুই করলে খাইয়ে দিয়েন।”

উমরান সম্মতি জানায়। গম্ভীর চিত্তে কিছু ভাবছে সে।

শ্রেয়সী চলে গেলো। উষশী নরম পোশাক পরে আরামবোধ করছে। নিজে নিজে খেলতে লাগল।

ফোনে শ্রেয়সীর ডাক্তারের পাঠানো একটা ইমেইল চেক করছিল উমরান। কপালে ভাঁজ, ঠোঁট চেপে কিছু ভাবনা চিন্তা করতে করতে আনমনে অনুদ্দেশ্যে তাকাল।

ওয়্যারড্রোবের ওপর একটা ওষুধের বক্সে চোখ পড়তে, মেয়েকে নামিয়ে একটু বসায়। গায়ের শার্ট নামিয়ে উঠে এলো ওটার কাছে। হাতে নিয়ে খুলে দেখল ওষুধগুলো। কি ভেবে ফোনে ছবি তুলে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। অর্ণবের রুমের দিকে এগোলো।

অর্ণব তার পড়াশোনার দরকারি কিছু কাগজপত্র ঘাটছে। নতুন বর ফ্রেশ হয়ে বের হয়েছে হয়তো। খালি গা।

উমরান দরজায় নক করতেই তাকাল সে।

_”হ্যাঁ ভাইয়া, আসুন প্লিজ।” গাঁয়ে টি–শার্ট জড়িয়ে নিলো সে তাকে আসতে বলে।

_”বিয়ের কাগজপত্র ঘাটছ নাকি?”

অর্ণব হাসে অল্প করে। কাগজ গুছিয়ে বলে,

_”তেমন কিছুনা। গতবারে বেশিদিনের জন্য আসায় সার্টিফিকেটসহ দরকারি পেপার্স গুলো নিয়ে এসেছিলাম। যাওয়ার সময় মনে ছিল না নিতে। সেগুলোই গুছিয়ে নিচ্ছি।” গুছিয়ে টেবিলে রাখে, “আপনি দাড়িয়ে আছেন কেন? বসুন প্লিজ।”

উষশীকে মামার বিছানায় ছেড়ে দিয়ে বলে,

_”বসবো না। তোমার সাথে একটু দরকারি কথা ছিল অর্ণব। তাই হঠাৎ বিরক্ত করতে চলে এলাম।”

_”বিরক্ত হবো কেন?” অর্ণবের কপালে ভাঁজ, ”আপনার কি দরকার বলুন। আমি যথাসাধ্য হেল্প করছি।”

উমরান মেয়েকে দেখেশুনে খেলতে দিয়ে অর্ণবের দিকে তাকায়,

_”হ্যাঁ, শ্রেয়সীকে এই অব্দি দেওয়া মেডিসিনগুলোর লিস্টের দরকার ছিল একটু। ডক্টর চাইলেন আজ।”

অর্ণব সম্মতি জানিয়ে আলমারি খুলে একে একে সব রিপোর্ট আর প্রেসক্রিপশন বের করলো। ফাইলে ভরে সব উমরানের কাছে দিয়ে বলে,

_”এই যে, এখানে সব আছে। এগুলো দিলেই হবে।”

উমরান সম্মতি জানিয়ে সেসব নেয়, একটু দেখে উষশীসহিত চলে এলো রুমে। ডাক্তারকে ছবি তুলে পাঠায় সবকিছুর। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর ফিরতি মেইল এলো। মন দিয়ে দেখে সে ওটা।

_______

রান্নাঘরে শ্রেয়সী মায়ের পাশে দাড়িয়ে আছে। ফ্রাইপেনে ব্যস্ত মায়ের হাত। শ্রেয়সী দুধের সঙ্গে সামান্য চিনি দিয়ে ফ্ল্যানের মিক্সচার ঘেঁটে দিচ্ছে। তার কাঙ্ক্ষিত ডেজার্টের রেসিপি শিখছে সে।

মা হাত চালাতে চালাতে জানতে চাইল,

_”তোর শ্বশুর–শাশুড়ি, আর ননদ– ওরা এ বাড়ি থেকে এখনো কেউ যাইনি বলে কিছু বলেনি তো তোকে মৌ?”

শ্রেয়সী হাতের কাজ জারি রেখে মায়ের কথায় নাক কুঁচকায়,

_”না… ওরা অনেক ভালো মা। এসব মনে করা-করি নেই ওদের মধ্যে। আমরা তো আজ চলে যাবো ভেবে রেখেছিলাম। আপু– মানে উষির ফুফু বললো এত চিন্তা না করতে। আজকের দিনটা যেন থেকে যাই।”

_”তাহলে তো ভালোই। আমি আরও ভাবলাম ওরা আসার পর যাওয়া হয়নি বলে মনে কিছু নিয়ে বসে না থাকে। তোর বাবা আর চাচ্চুও ব্যস্ত থাকছে। অর্ণবও চলে গেলো তখন। খালি হাতে কি যাওয়া যায় বল? বাড়ির বানানো নাস্তা-পানি ছাড়া মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যেতে লজ্জ্বা লাগে আমার। এখন অতো নাস্তা বানাতে কতো কি দরকার পরে! কতদিন ধরে বলছি এনে দিতে জিনিসপত্রগুলো। কারোরই তো সময় হয়না। মহাব্যস্ত সবাই।” থেমে চুলার আঁচ একটু কমায়, “তার উপর গত চার/পাঁচদিন তূর্ণার বিয়ে নিয়ে কম ঝামেলা চললো নাকি বাড়িতে! কাল থেকে একটু শ্বাস নিতে পারব বোধ হয়।”

_”তুমি এত চিন্তা করো না তো মা। আস্তে ধীরে করো সব। বেশি চাপ নিলে আবার অসুস্থ হয়ে বসে থাকতে হবে। তখন বিছানায় পরে থাকলে কিছুই করা হবেনা আর। এর চেয়ে ধীরে সুস্থে করো সবটা।”

_______

_”আসবো?”

উমরান ফিরে তাকায়। দরজায় অর্ণব। সে সম্মতি জানিয়ে ভেতরে আসতে বললো।

_”জী ভাইয়া। আর কোনো দরকার? ডক্টর কিছু বলেছে নাকি।”

উমরান ফোনে একটা ছবির সাথে কাগজের কিছু মেলাচ্ছিল। মনোযোগ দিয়ে দেখা শেষে ধীরে উঠে দাড়ায়। অর্ণবের দিকে ফিরল,

_”অর্ণব। এখানে কিছু গরমিল আছে। লুক অ্যাট দিস। তুমি যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছ ওখানে প্রতি মেডিসিনের টাইম ট্যাবল দেখলাম।

সব মিললেও, এই যে এটা…” কাগজে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, “লোরাজেপাম – এটা দিয়েছিল মাত্র ৭–১৪ দিনের জন্য। তাহলে ওষুধের বক্সে এখনো এটার পাতা থেকে যাওয়ার তো কথা নয়। ৭–৮ দিন মানে অনেক আগের কথা, প্রায় শুরুর দিকে। খালি পাতা তো স্বাভাবিক জিনিস পরিষ্কার করতে গিয়েও ফেলে দেওয়ার কথা।” টেবিল থেকে বক্সটাও নিয়ে খুলে দেখাল সে। যেটা ওয়্যারড্রোবের ওপর দেখেছিল, ”এই ওষুধের সাইড এফেক্ট, মেইন এফেক্ট–সবটা মাত্র ডক্টর আমাকে বিস্তারিত জানিয়েছে। তুমি কি বুঝতে পারছ অর্ণব, হোয়াট অ্যাম আই ট্রায়িং টু স্যে?”

অর্ণব মনোযোগ সহকারে সব কথা শুনল তার। সবকিছু দেখল। লোরাজেপাম এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, মূল প্রতিক্রিয়া– এসব সে জানে। তাছাড়া ডাক্তার সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিল এই ওষুধগুলো দেওয়ার সময়। তার জানামতে সেই শুরুর ১০ দিন টানা খাওয়ানো হয়েছিল এটা শ্রেয়সীকে। আর প্রথমদিকের ওষুধগুলো সে নিজেই কিনেছে প্রতিটা। ১০ দিন খাওয়ার পর একটাও থাকার কথা না। কারণ এই কোম্পানির লোরাজেপামের এক পাতায় থাকেই দশটা। কিন্তু এখানে পুরো এক পাতার দশটা ওষুধের আট-টাই থেকে গেছে। অর্থাৎ নতুন করে আরেক পাতা থেকে দুটি খাওয়ানো হয়েছে।

সে চোখ তুলে তাকায় উমরানের দিকে,

_”আপনি হয়তো বেশি চিন্তা করে ফেলছেন। এখানের দুটো খাওয়ানো হয়েছে মাত্র। হয়তো আমার অনুপস্থিতিতে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই বাবা এগুলো এনেছে। মাত্র দুটো ভাইয়া। এটা লং টাইম মেমোরি লসে তেমন ভূমিকা রাখার কথা নয়।” উমরান সরাসরি না বললেও পরোক্ষভাবে যা বোঝাতে চাইছে তা সঠিক নয় এটাই বলছে অর্ণব।

উমরান তার কথা শুনে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। টেবিল থেকে কিছু নিয়ে ধরল অর্ণবের চোখের সামনে। আরও দুটো পাতা ঐ ওষুধের। সম্পূর্ণ খালি।

অর্ণব চোখ বন্ধ করে নিলো গভীর শ্বাস টেনে। বাড়ির কারো কাজ এটা। বুঝতে পারছে সে। নিশ্চয় বাবা-মার মধ্যে কেউ। নাকি দুজনে মিলেই এটা করেছে কি জানি। ভীষণ লো ফিল করলো অর্ণব এই মুহূর্তে নিজের পরিবারের মানুষের এই কাজে।

এটা ডাক্তার শ্রেয়সীর চিকিৎসার শুরুর দিকে দিয়েছিলেন। বড় দুর্ঘটনা, অপারেশন, ভয়ংকর মানসিক ধাক্কা, অ্যাকিউট অ্যানজাইটি, প্যানিক, ইনসমনিয়া–এসব ক্ষেত্রে এই ওষুধ দেওয়া হয়। শ্রেয়সীকেও দশ দিনের জন্যই দেওয়া হয়েছিল, একেবারে স্বাভাবিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে।

কারণ অস্থির হয়ে উঠত সে, ট্রমাটাইজড ছিল খুব, হঠাৎ হঠাৎ আতঙ্কে সবার থেকে গুটিয়ে যাওয়া নিত্য ব্যাপার ছিল তখন। একে তো চেনা পরিচিত কাউকে দেখত না চোখের সামনে, ছিল সব অচেনা মানুষ। এদিকে দূর্ঘটনার কারণে মানসিক আঘাত আর অসুস্থতার কারণে সব ঠিকঠাক বোঝাতে পারত না। তাই প্যানিক অ্যাটাকও উঠে যেত অনেক সময়। একারণেই মূলত এই ওষুধ দিয়েছিল।

এটা নেওয়ার পর থেকে অনেকটা শান্ত হয়ে আসে শ্রেয়সী, চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ায় মানসিক অশান্তি কম অনুভব করতো, তাদের কথামতো চলত, যা বোঝাত মেনে নিতো। বেশ ভালোই চলছিল এটা নেওয়ার পর থেকে। ওষুধটা দেওয়ায় হয়েছিল তাকে শান্ত রাখতে। স্মৃতি ঝাপসা, কিংবা ভুলেই যাওয়া, মাথা ঘোরা, মনোযোগ কমে যাওয়া, ব্রেইন ফগ(ভাবনায় ধোঁয়াশা), সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া, আবেগ ভোঁতা হয়ে যাওয়া– এসব ঐ ওষুধের মূল এফেক্ট। তাই সেই সময়টাতে শ্রেয়সীকে নিজেদের মতো বোঝানো কঠিন কিছু ছিল না। হয়েছেও তাই। কিন্তু এটা দিনের পরদিন চলছিল অর্ণবের জানা ছিল না।

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, ডাক্তার যখন ওষুধটার ব্যাপারে বোঝাচ্ছিলেন, তখন বাবাও তার সাথেই ছিলেন। আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রইল না।

ভাবনার ভারে নামানো চোখ দুটো সে তুলে নিল। বিছানায় খেলতে থাকা উষশীর দিক থেকে দৃষ্টি সরে গিয়ে গিয়ে আটকে গেল উমরানের মুখে।

চোখে তার অপরাধবোধ, অনুতাপ স্পষ্ট।

________

_”মৌ, তোর বর ডাকছে বোধ হয়। যা গিয়ে দেখ কি চাইছে।”

মায়ের পাশে দাড়িয়ে মনোযোগ সহিত কি কি করছে দেখে এটা ওটা নিয়ে কথা বলছিল শ্রেয়সী। ভাইয়ের ডাকে ফিরে তাকায়,

_”ডাকছে? আমাকে?”

_”হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি যা।”

_”যাচ্ছি,”

শ্রেয়সী প্রায় সবটা জেনে নিয়েছে এরপর কীভাবে কি করতে হবে তা। তাই বের হয়ে আসলো রান্নাঘর থেকে।

_”হলে আমাকে ডেকো মা, সবার আগে আমি টেস্ট করবো।” যেতে যেতে বলে সে।

_”আচ্ছা আমি ডাকবো। তুই যা, জামাই কি চাইছে দেখ গিয়ে।”

শ্রেয়সী চলে গেলো। সে যেতেই অর্ণব গম্ভীর চিত্তে মায়ের পাশে এসে দাড়ায়। ওষুধের পাতা দুটো মায়ের সামনে রাখে,

_”এসব কী মা?”

তার মা তাকাল ওষুধের খালি পাতা দুটোর দিকে। প্রথমে বুঝতে পারেনি। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখতেই চমকিত দেখাল কিছুটা।

_”কী হলো? বলো এটা কী?”

অর্ণবের মা উত্তর না দিয়ে ছেলের দিকে তাকাল। চোয়াল শক্ত অর্ণবের। সে কখনো মায়ের সাথে এভাবে কথা বলেনা। সে যায় হোক, এই ওষুধ হঠাৎ অর্ণবের হাতে গেলো কী করে!

_”আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এটা মাত্র মৌ-র স্বামী আমাকে দেখাল। এবং সবটা জেনে গেছেন উনি। কতটা অপমানবোধ করেছি উনার সামনে বুঝতে পারছ? এটা দিনের পর দিন মৌকে দিলে কী বুঝে আমাকে একটু বোঝাও তো? বাবা আমাকে কথা দিয়েছিল যেদিন ওর সবটা মনে পরবে, নিজের মানুষদের কাছে ফিরতে চাইবে–সেদিন কোনো দ্বিরুক্তি ছাড়া তা মেনে নেবে। অথচ তোমরা লুকিয়ে ওকে সবটা ভুলিয়ে রাখার জন্য মেডিসিন দিচ্ছিলে। তুমিই নিয়মিত ঠিক টাইমে খাইয়েছ বাবার কথায় তাইনা?” থামে সে। মা নিরুত্তর।

_”তুমি কী বুঝতে পারছ কী করেছ এটা? এটা একটা ক্রাইম মা। এটা এভাবে টানা ওকে দিচ্ছিলে। অনিয়ন্ত্রিত ডোজে ওর মাথায় সমস্যা দেখা দিতে পারতো মা। কতোদিন দিয়েছ এটা?”

অর্ণবের মা চোখ বন্ধ করে। ভাঙা স্বরে ঢোক গিলে জবাব দেয়,

_”তোর বাবা বলেছে কোনো ক্ষতি হবেনা ওর। শুধু আমরা যা বলবো তা মেনে নেবে এটা খাওয়ালে।”

অর্ণবের শক্ত চোয়াল আরও দৃঢ় হলো বৈকি! তা দেখে তিনি ফের বলেন,

_”সবসময় ওর স্বামী, সন্তান, দীদুন নাকি কে জানি - ওদের নাম জপত। আমি আর কি করতাম? তুই ছিলিনা, তাই তোর বাবাকে জানিয়েছিলাম। উনিই এনে দিয়েছিলেন এই ওষুধ। বলেছে ওর কোনো ক্ষতি হবেনা, শুধু ঐ ওর আগের পরিচিত মানুষগুলোর চিন্তা আর মাথায় আসবেনা এটুকুই।”

বিরক্তি দেখা যায় তার চেহারায়।

_”সেই মৌরির যাওয়ার পর থেকে অবাক হচ্ছি আমি বাবার একেকটা কর্মকাণ্ড দেখে। এখন তো তোমাকেও অচেনা লাগছে। ওর নিজের আপনজনদের মনে করতে পারছিল এ কথা আমাকে একবারো জানাওনি। উল্টো যা মনে এসেছে সেসবও দূর করতে ওষুধ ওভার ডোজে খাওয়াচ্ছিলে। বুঝতে পারছ কতো নিকৃষ্ট কাজ করেছ মা?” থামে সে, বিরক্তি আর ক্ষোভেভরা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

_”মান-সম্মানই সব ঐ মানুষটার কাছে। সেই শুরু থেকে, আবেগ অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। আমার বোনটার লাশ অব্দি বাড়ি তুলতে দিল না।” থামে সে। পুরুষ হয়েও গলা ভেঙে আসছে। যতোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। বোনটার চলে যাওয়ার সময় থেকে এরপরের সেই মুহূর্তগুলো থেকে কখনো সরে আসতে পারবেনা অর্ণব। প্রকাশ না করলেও বাবা আর বোনের প্রতি অনেক অভিযোগ জমা তার। গালে হাত ঘষে, জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায় সে, “এই যে মৌ– ওদের শ্রেয়সী– মেয়েটা এসব জানলে এখনো এতোকিছুর পর যে সম্মান আর ভালোবাসা দিচ্ছে, এসবের কানাকড়ি থাকবে আর মা? বাবার তো এত মান সম্মানের পরোয়া! সে কতটা নিচে নেমে যাবে মেয়েটার চোখে ভাবতে পারছ?”

তার মায়ের চোখে অশ্রু,

_”কী করতাম তুই বল না? আমি আর কী করতাম? আমার মৌরিটা নেই। আমার বুকে আর আসেনা আমার মেয়ে। ওকে সেই ফাঁকা বুকে নিয়ে একটু শান্তি পেতাম। সবাই নিজের নিজের জায়গায় ঠিক। তাহলে আমার কী দোষ? আমি কেন বারবার সন্তানহারা হবো? আমারও তো কষ্ট হয়। আমাকে স্বপ্নে যখন মা ডাকে আমার মৌরি। তখন ছুঁতে পারিনা ওকে। ঘুম ভাঙলে ঐ মেয়েটাকেই কাছে পাই। একটু বুকে নিলেই মনে হয় আমার মেয়ে আমার বুকে আছে। ওকে আমি কী করে যেতে দিতাম তুই বল না? আমার কষ্ট তোদের কারো চোখে পড়েনা। না তোর বোন একবারো মায়ের কথা ভেবেছে, না তোরা আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করিস। সবাই খালি দূরে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।”

অর্ণবের মাকে যুক্তি দেখিয়ে বোঝানোতে লাভের লাভ কিছু হবে বলে মনে হলো না আর। তার মা ওসবের মধ্যে নেই। তার চিন্তা ভাবনা শুধু সন্তান কেন দূরে সরে যাচ্ছে এই নিয়ে। অথচ নিজেরাও এক বাচ্চার কাছ থেকে তার মাকে দূরে রেখেছে এ কথা মাথায় আসছে না।

সে অশ্রুজলে সিক্ত মায়ের চেহারাপানে তাকায়। কষ্টও হয় মায়ের জন্য। আবার যেটা করেছে সেটাও বিবেচনা করার মতো না। কিছু না বলে চলে গেলো সে ওখান থেকে।

তার বাবা লোরাজেপাম ব্যবহারের পূর্ণ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে না জেনেই ঐ কাজ করেছে। নিশ্চয় শুধু ডাক্তারের বলা ‘লোরাজেপাম দিলে চিন্তাশক্তি কমে যাবে, আগের বিষয়গুলো মাথায় সেভাবে কাজ করবেনা’ এ কথাটাই মাথায় রেখে এই কাজ করেছে। অথচ যেকোনো ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রার ব্যবহার শরীরের জন্য ক্ষতিকর, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, এতে খারাপ কিছু হতে পারে।

শ্রেয়সীর শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সে দূর্ঘটনা, মানসিক আঘাত, ট্রমা - এসবের মধ্যেই এই অতিরিক্ত ডোজের ওষুধে বেকাবু হয়ে গেছে। স্মৃতিভ্রষ্টে লোরাজেপামের সরাসরি ক্রিয়া না থাকলেও এতকিছুর মধ্যে চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ায়, আর প্রতিনিয়ত নিজেকে অন্য একজন হিসেবে চেনায় মস্তিষ্ক নিজেই আগের বিষয়গুলো ভুলিয়ে রেখেছে। আর দিনের পর দিন এমন হওয়ায় হুট করে বন্ধ করার পরও মস্তিষ্ক সেই জট খুলতে পারেনি।

হয়তো সময় লাগবে। তবে সব যে মনে পড়বে এতে কোনো সন্ধেহ নেই। বিশেষ করে যখন সেই মানুষগুলোর মধ্যে আছে যাদের নিয়ে তার অতীতকাল। তাদের নিজেদের কাছে থাকাকালীন শ্রেয়সীর দূর্বল চিন্তাধারার মাঝে তাকে নিজের কাছেই অন্য পরিচয়ে জাহির করায় তখন ওসব ভুলিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। এখন যেহেতু আপনজনেদের কাছেই আছে। তাই ধীরে ধীরে সবটা মনে পড়বেই।

অর্ণব মাকে আর কোনো কথা না বলে চলে যায় ওখান থেকে। মুখে তার বিরক্তি। মায়ের কাছে আর কৈফিয়ত নিতে চায়না বলে মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা সব প্রশ্ন থেকে পালাতে অর্ণব ওখান থেকে সরে এসেছে।

বিরক্তি নিয়ে চলতে গিয়ে হঠাৎ বুকে এসে কারো নাক ঠেকল।

_”আহ!”

তূর্ণার আওয়াজ। অর্ণব বিরক্তিমাখা চেহারা নিয়েই তাকায়। তূর্ণাকে দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো।

_”চোখ কী হাতে নিয়ে হাঁটিস?”

তূর্ণা চুপি চুপি এদিকটায় এসেছিল। বারি খেয়ে নাকে অল্প ব্যথা পেয়েছে। অর্ণবের আওয়াজ শুনে নাকে হাত রেখে চোখ তুলে এক নজর তাকায়। পরপর অকস্মাৎ উল্টো ঘুরে যেদিক থেকে এসেছে ওদিকে পা চালাতে লাগলো। অর্ণবের কপালের ভাঁজ গাঁঢ় হয়। কি সমস্যা বুঝল না ঠিক।

_”এই তূর্ণা… কী সমস্যা তোর?”

এগিয়ে এসে তূর্ণার হাত ধরে আটকে নিয়েছে সে। তূর্ণা হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।

_”আশ্চর্য! কী সমস্যা? এমন পালাচ্ছিস কেন?”

_”আমার কোনো সমস্যা নেই অর্ণব ভাইয়া। আমাকে ছাড়ো প্লিজ।”

_”কোথায় যাচ্ছিলি তুই?”

_”কোথাও না, আমাকে ছাড়ো না তুমি।”

অর্ণব জবাব না দিয়ে নত মাথায় তার হাত ছাড়াতে চাওয়া মেয়েটির দিকে তাকায়। তার দিকে তাকাচ্ছেনা একবারো। অর্ণব বুঝল তূর্ণা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল এদিকটায়, আর তার সামনে পরে যাওয়ায় এখনো লজ্জ্বা পাচ্ছে। না হেসে পারল না সে।

_”তুই এখনো আমাকে লজ্জ্বা পাচ্ছিস?“

তূর্ণা একবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নেয়,

_”মোটেও না”

_”তাই? তাহলে ক্ষিদে লাগা সত্ত্বেও রান্নাঘরে না গিয়ে আমায় দেখে পালাচ্ছিস যে?”

তূর্ণা অন্যদিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে,

_”উফ, তুমি এখান থেকে যাও না। আমি একদম ঠিক আছি। কোনো ক্ষিদে লাগেনি।”

অর্ণব কপালে ভাঁজ ফেলে তাকায় লাজবতীর দিকে, লজ্জ্বায় তার দিকে তাকাতেও পারছে না, অথচ স্বীকার করছেনা তা।

সে আর না ঘেঁটে বলে,

_”যাচ্ছি আমি, তোর ক্ষিদে লাগলে রান্নাঘরে যা। মা কী যেন বানাচ্ছে। খেয়ে আয় গিয়ে। ক্ষুদা নিয়ে আর লজ্জ্বা পেতে হবেনা।”

তূর্ণা ছাড়া পেয়ে আর কথা বাড়ায় না। পা চালায় সে।

_”এই এই একটু দাড়া দেখি…”

অর্ণবের কৌতূহলী ডাকে সে ফিরে তাকাল ভ্রু কুঁচকে।

_”কী হয়েছে?”

অর্ণব কাছে এগিয়ে এলো বেশ কৌতূহল নিয়ে। তার চেহারা আর হাত দুটোর দিকে তাকাল পূর্ণ মনোযোগে। তূর্ণার নাকে একটা নাকফুল, আর হাতে দুটো চুড়ি দেখা যাচ্ছে। অর্ণব নজর ঘুরিয়ে তাকায়। কিছুটা আশ্চর্য দেখালেও, মনটা ভালো লাগায় চেয়ে গেলো।

_”এগুলো কে দিয়েছে? মা?” চোখের ইশারায় দেখিয়ে বলে।

তূর্ণা হাতের চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,

_”হ্যাঁ, বড় মা দিয়েছে তোমরা সবাই চলে আসার পর। কেন?”

_”কিছুনা। একদম আমার বউ বউ লাগছে তোকে।” মদ্যপ নয়নে চেয়ে কথাটা বলে অর্ণব। তূর্ণার গালটা আবার লাল হয়ে এলো। আর চোখ তুলে তাকায়না। গাঁইগুই করে বলে,

_”এগুলো আমি খুলে ফেলব।”

অর্ণবের কপালে ভাঁজ পরে,

_”কেন? এগুলো তোর গায়ে থেকে কী ক্ষতি করছে?”

_”অবশ্যই ক্ষতি। মানুষজনে দেখেই বুঝে যাবে আমি বিবাহিত।”

_”তো সমস্যা কী? বোঝার জন্যই এসব পড়া হয়।” চোয়াল শক্ত তার। খুলে ফেলবে বলায় নাখোশ।

তূর্ণা মাথা তুলে বলে,

_”কেন? আমি কেন পড়বো? তুমি তোমার মতো থাকবে। আর আমি তোমার বউ এটা সবাইকে জানিয়ে জানিয়ে থাকব নাকি? আমার বান্ধবীরা সবাই জানলে কতো পচানি দেবে জানো? তোমার তো কিছুই না। তুমি যে আমার বর এটা কেউ জানবেও না। তাহলে আমি তোমার চিহ্ন নিয়ে, বান্ধবীদের পচানি খেয়ে খেয়ে ঘুরে বেড়াব কেন?”

অর্ণবর চোয়াল সরব হয়। চোখের প্রশ্ন আর নাখোশ ভাব উধাও হয়ে, হাসির ঝিলিক দেখা যায় তাতে। এগিয়ে এলো তূর্ণার দিকে। মাথা ঝুঁকিয়ে তার বরাবর হয়। কপালের চুল সরিয়ে পরপর নাকে ঠোকা দিয়ে বলে,

_”আমি কার বর– এটা না জানলেও, কোনো এক লাজবতীর নামে যে কবুল পড়েছি এটা আমার সব বন্ধুরা জানে বুঝেছিস? এত চিন্তা করতে হবেনা তোর বরকে নিয়ে। নাহয় তুই বরং আমাকে কিছু একটা কিনে দিস। আমি ওটা সবসময় তোর চিহ্ন হিসেবে আমার সাথে রাখব। তাহলে তো সমান সমান তাইনা?”

তূর্ণা অতি সন্নিকটে থাকা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়,

_”তুমি যে আমার বর এটা জানিয়ে দিয়েছ সবাইকে?”

_”উহু, আমি যে একজনের বর এটা জানিয়েছি।”

তূর্ণাকে খুশি দেখাল এই কথা শুনে,

_”ঠিক আছে পড়বো চুড়ি, আর নাকফুল। তোমাকে আমি একটা গিফট দেবো, ওখানে লেখা থাকবে 'তূর্ণার বর'। তুমি পড়বে ঠিক আছে?”

_”ঠিক আছে, কিন্তু তুই কীভাবে একটা জিনিস গিফট করবি? টাকা আছে? বাবার থেকে খুজিস না আবার। আমাকে জানাবি, যখন কিনবি তখন।”

_”না, আমার অনেক টাকা আছে। তোমার কাছেও নেই অতো টাকা। আমিই কিনব।”

_”তাই? অতো টাকা কোথায় পেয়েছিস?”

_”বাবা-বড়বাবা– দুজনে আমাকে প্রতিদিন স্কুলে, কোচিং -এ যাওয়ার সময় তোমার থেকেও বেশি টাকা দেয়। তুমি কী জানো! আর অতো টাকার খাবার খাই নাকি আমি? গত ঈদের টাকাও এখনো ব্যাংকে নতুন নতুন পরে আছে। সেবার মেলায় নিয়ে গেছিলে? তখনও বাবাকে ফোন দিয়ে তোমার সাথে মেলায় যাবো বলে টাকা চেয়েছিলাম, মাকে বলে অনেক টাকা দিয়েছিল, ওগুলোও আছে সব। তারপর…”

_”আচ্ছা, তোর অনেক টাকা আমি বুঝতে পেরেছি। কিনলে তখন আমায় দিস ওটা। আমি রেখে দেবো আমার কাছে। যেন সবাই বুঝতে পারে আমি 'তূর্ণার বর'।”

______

যেহেতু দিনটি অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা ছিল, তাই রাতের খাবার সারতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সবার।

শ্রেয়সী তখন মেয়েকে বিছানায় পাশে নিয়ে কাঁত হয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে “শু শু” শব্দ করে। উমরান ব্যালকনি থেকে কারো সাথে ফোনে কথা সেরে রুমে আসে। লাইট বন্ধ করে শুয়ে পরে একপাশে।

শ্রেয়সী মেয়ে পুরোপুরি ঘুমিয়ে গেছে খেয়াল করেনি। নিজের ধ্যানে মগ্ন সে। কিন্তু উমরানের তা চোখে পরেছে রুমে ঢুকেই। কিছু একটা চিন্তা করছে বুঝতে পেরেছে। পেছন থেকে টেনে নিয়ে পাশে শোয়ায় তাকে। শ্রেয়সী ধ্যান ভাঙতেই মেয়ে উঠে যাবে ভেবে কিছু বলতে নেয়, কিন্তু উমরান থামিয়ে দিলো।

_”উষি অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে শ্রেয়সী। তুমি কোন ধ্যানে আছ?”

শ্রেয়সী একনজর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝে মাথাটা ফেলে রাখে। উমরান কিছু বলল না। শ্রেয়সী নিজেই কিছুক্ষণ পর মাথাটা তুলে তার বুকে এনে রাখে। নিম্নস্বরে বলে,

_”দীদুনকে মনে পরছে মেজর।”

উমরান তার পিঠে হাত রেখে আগলে নেয়, কথাটা শুনে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,

_”মনে পরছে বলতে?”

_”দীদুনের সাথে সবকিছু আমার কাল পরশু থেকেই মনে আসছিল খুব। আমি ওখানে থাকতাম দীদুনকে নিয়ে। কেউ ছিল না আমার সাথে আমার দীদুন ছাড়া। অথচ আজ আমি কতো সুন্দর একটা পরিবার পেয়ে গেছি। সবাই আছে, হেসেখেলে থাকছি সবার সাথে। বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি দুটোই পেয়ে গেলাম। অথচ আমার দীদুন নেই।” চোখের জল ছেড়ে দিলো সে, “কিছু দেখে যেতে পারল না আমার দীদুন।” নাক টেনে বলে, “আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মেজর। সবার মধ্যে কতো আনন্দে আছি আমি। কিন্তু আমার দীদুন যে নেই! আমার খুব মনে পরে দীদুনের কথা, খুব মনে পরে। আপনাদের সাথে তেমন কিছু এখনো মনে আসেনা।” ফুঁফানো স্বর তার,

“দীদুনের সাথে যে থাকতাম? আশ্রমে যেতাম? সারাদিন দৌড়ঝাপ করে এসে পা ব্যাথা নিয়ে বিছানায় কাতরাতে থাকতাম। আমার দীদুন আমাকে পায়ে মালিশ করে দিতো। বকতো সারাদিন টইটই করতাম বলে। আমি সারারাত কাঁদলে দীদুন একটুও ঘুমাতে পারতনা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো, জ্বর হলে দীদুনই দেখত আমাকে সারারাত। জ্বরপট্টি দিতো, খাইয়ে দিতো। রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে গেলে বকে বকে নিজেই আবার আধঘুমে তুলে খাইয়ে দিতো আমাকে। আমার সব মনে পরে। দীদুন নেই ভাবলেই আমার সব সুখ অনর্থক লাগে।” নাক টানে সে, “যে সুখ দীদুন দেখেই যেতে পারেনি। সে সুখ আমার অপূর্ণ লাগে। আজ সারাদিনও কতো আনন্দে কাঁটালাম সবার সাথে। আমার বাপের বাড়ি এটা - তাইনা? জীবন আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এলো দেখুন না? এটা এখন আমার বাপের বাড়ি। অথচ বাপের বাড়ির দিকের সর্বপ্রথম সদস্য হওয়ার কথা ছিল আমার দীদুন। সে-ই আর নেই। দীদুনকে ছাড়া সব আছে মেজর। আমার জীবনে এখন দীদুনকে ছাড়া সব আছে। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব।”

শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে শ্রেয়সী স্বামীর বুকটা। নির্দ্বিধায় সবটা উগড়ে দিল সে। চোখের অশ্রু বাঁধ মানছেনা।

উমরান শ্রেয়সীকে আরও দৃঢ়ভাবে আগলে রেখেছে নিজের সাথে। পিঠে একহাত, আর অন্যটা তার চুলের ভাঁজে। সবটা শুনে গভীর শ্বাস টানে সে।

_”শ্রেয়সী, তোমার দীদুনের সাথে সবটা মনে পরছে এটা খুব ভালো খবর। এভাবে কাঁঁদতে হয়না। মানুষের আয়ুষ্কাল আগে থেকেই নির্ধারিত। তোমার তো খুশি হওয়া উচিত এখনকার যুগে বৃদ্ধরা যেভাবে অসুখে বিসুখে কষ্ট পেয়ে দুনিয়া ছাড়ছে সেভাবে কষ্ট পেতে হয়নি তোমার দীদুনকে। সৃষ্টিকর্তার ডাক পেয়েছেন, তাই হঠাৎ সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন।”

_”না আপনি জানেন না। দীদুন কষ্ট পেয়েই চলে গেছে। আমি নেই যখন থেকে শুনেছে। তখন থেকেই দীদুন ভেঙে পড়েছিল, দূর্বল হয়ে গেছিল মনে মনে। এটা আমি জানি, খুব ভালো করে জানি। তাই তো আমি ফেরার আগেই চলে গেলো।” হেঁচকি উঠে তার।

উমরান তার মাথায় চুমু এঁকে দিল।

_”আচ্ছা, বুঝতে পারছি। এখন এতো কেঁদোনা তো। আমার মেয়েটা উঠে যাবে আবার।”

শ্রেয়সী কান্না সংযত করার চেষ্টায় একটু শ্বাস টেনে নিলো।

_”দীদুন যেদিন চলে যাচ্ছিল সেদিন আমাকে কী বলেছিল জানো?” উমরান

শ্রেয়সী অশ্রু সিক্ত চোখে আগ্রহ নিয়ে বুক থেকে মাথা তুলে তাকাতে চায়, উমরান মাথাটা তুলতে দিল না। বুকেই রেখে দিল। অতঃপর বলে,

_”দীদুন আমার হাত ধরে কথা নিয়েছিল যেন তার নাতনির জায়গা আমি অন্য কখনো কাউকে দিই। নাতনির জায়গা নিয়ে কী সচেতন ভাবতে পারছ? অন্য কাউকে যেন উষশীর মা না বানায়, আমার ঘরে যেন আর কেউ না উঠে - সেই কথাটা নেওয়া ছাড়া ছাড়ছিলই না আমাকে। আর ঐ যে ঐ মেয়েটা, ঐ অবস্থায়ও সে পারছিল না আমার হাতটা ছোঁ মেরে ছাড়িয়ে নিতে। যেন দীদুনকে কথা দিতে না পারি। আমি তার হাঁবভাব বুঝে আরও সুন্দর করে স্পষ্টভাবে কথা দিলাম। দীদুনের ঐ অবস্থায় সবাই কীভাবে মানুষটার জন্য চিন্তিত। আর সে চিন্তিত তোমার জায়গা কাউকে না আবার দিয়ে দিই তা নিয়ে। ভাবতে পারছ কতো পসেসিভ? আমার তো এখনো ভাবলে…” কথাটা শেষ করার আগে নিজের গালে কারো অনবরত অধরের স্পর্শ পেলো।

শ্রেয়সী টুপটাপ চুমু খাচ্ছে স্বামীর গালে, ঠোঁটের কিনারায়, অন্য গালে, কপালে, চোখের পাতায়, চিবুকে - কোথাও বাদ রাখছেনা। অনবরত অধর ছুঁয়ে দিচ্ছে। দীদুনের মারা যাওয়ার ঐ মুহূর্তটা হাসির মতো না হলেও, উমরান বউকে শান্ত করতে ওভাবে বলছিল। কিন্তু অকস্মাৎ এহেন আক্রমণে সে থেমে থাকে। শ্বাস আঁটকে আছে তার।

শ্রেয়সী একের পর এক আদুরে স্পর্শ দিয়েও থামছেনা। শেষে ঠোঁটের কিনারায় ঠোঁট বসাতেই,

_”আহ!” শব্দ করে থেমে গেলো। পাশ থেকে কোমর আগলে অকস্মাৎ দৃঢ়ভাবে নিজের ওপর উঠিয়ে নিয়েছে তাকে। শ্রেয়সী কোমরে ঐ দৃঢ় স্পর্শে আর্তনাদ করে উঠে।

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ৩০ গল্পের ছবি