হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ৩

🟢

সেদিন মৌরিকে সঙ্গে নিয়ে মেজর উমরান চলে গিয়েছিল সেই রিসোর্টে, যেখানে তারা নিজেরা উঠেছিল আগে থেকেই। রিসোর্টে পৌঁছেই মৌরি দেখতে পেলো একজন কাজী উপস্থিত। চারপাশে নিরবতা, অচেনা পরিবেশে সে শুধু কয়েকজনকে দেখল; বিচে মেজরের সঙ্গে থাকা বাকি অফিসারদের মধ্যে দুজন আর এক নারী, যিনি এর আগেও মৌরিকে ধা ‘ক্কা খাওয়ার ঘটনার পর শান্ত হতে বুঝিয়েছিলেন। বাকিরা হয়তো তুলি আর দীপ্তর সাথেই রয়েছে এখনো।

অল্প কথায়, কোনো আড়ম্বর ছাড়াই ওখানেই তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। যেন সবকিছু অদৃশ্য এক শক্তির ইশারায় ঘটছে। যার নিয়ন্ত্রণ মৌরির হাতে নেই। নিজেকে নিজের মতো আর মনে হচ্ছিল না। একজন অচেনা পুরুষের পাশে বসে, কোনো পারিবারিক সম্মতি ছাড়া, বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে সে। যা তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা আর নীতিবোধের সঙ্গে একেবারেই যায় না।

তবু সেই মুহূর্তে কিছুই ভাবতে পারেনি মৌরি। মেজরের কথাগুলোর মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা উপেক্ষা করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেই কণ্ঠে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, এক অজানা দৃঢ়তা। যা তার মনের প্রতিরোধ ভেঙে দিয়েছিল। ধা ‘ক্কার পর থেকে সবকিছু তার কাছে দুঃ ‘স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল, মাথা কাজ করছিল না; নিজেকে ‘ট্রমাটাইজড’ মনে হচ্ছিল।

বিয়ে শেষ হলে মেজরের সঙ্গে থাকা অন্য দুজন কাজী সাহেবকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করে। তারপর মেজর উমরানের চোখের ইশারায় তারা-ও চলে যায়, সঙ্গে সেই নারীটিও। রিসোর্টের রুমে তখন শুধু মেজর উমরান আর মৌরি।

প্রত্যেকে চলে গেলে উমরান মৌরির দিকে চোখ দেয়। গলা ঝাড়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টায়। কিন্তু মৌরির ধ্যান ভাঙেনা। উমরান গভীর চোখে মৌরিকে পরখ করে। আনমনা হয়ে আছে মেয়েটা। হয়তো এখনো ঘোর থেকে বের হতে পারছেনা।

উমরান হালকা কণ্ঠে গলা পরিষ্কার করে বলল,

-“মিসেস উমরান তাওসিফ।”

তার ভারী, শীতল কণ্ঠে মৌরির ধ্যানভঙ্গ হলো। উমরান শান্ত গলায় বলে,

-“আপনাকেই বলছি। বিচে আপনার বোন আর তার স্বামী অপেক্ষা করছে। আমি আপনাকে এখন ওখানেই পৌঁছে দেব। চিন্তা করবেন না। এই মুহূর্তে আপনাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি না।

বিয়েটা যদিও গোপনে হলো। তবে আজ যা ঘটেছে সেটা আমাদের মধ্যেই থাকবে। সময় এলে আমি আসব। সবাইকে জানিয়ে, আপনার পরিবারকে জানিয়ে, তাদের সম্মতি নিয়েই আপনাকে আমার জীবনে আনব।

হয়তো এখন আপনার মনে হচ্ছে, ‘এই মুহূর্তে এই বিয়ের প্রয়োজনটাই বা কী ছিল?’

ইন দ্যাট কেস, আমি শুধু বলব - আমার জন্য এটা খুব দরকার ছিল। কেন, তা এখন জানার প্রয়োজন নেই আপনার। তবে আজ থেকে শুধু একটা কথাই মনে রাখবেন। আপনি এখন আমার। মেজর উমরান তাওসিফের নামে আপনি নিজেকে লিখে দিয়েছেন।

আজ থেকে নিজেকে আমার জন্য সুরক্ষিত রাখবেন। আপনি এখন মেজর উমরান তাওসিফের স্ত্রী। এই পরিচয়টা মনে রাখবেন। বুঝেছেন?”

মৌরি কিছুই বলল না। শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। নিস্তব্ধ, অনুভূতিহীন। যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। উমরান তাওসিফ বুঝল, মেয়েটি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আর এই আকস্মিক ঘটনার পর এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে উপলব্দি করলো, সে এখন মৌরির জীবনে একটি ট্রমাসূচক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে সেটা কাঁঁটাতে তার সঙ্গ দেওয়ার মতো উপায় নেই। উমরান তাওসিফের সদা গম্ভীর চিত্ত বিষয়টা উপলব্দি করে কিছুটা হাশফাশ করে উঠলো। মুখে একটুখানি অস্বস্তির ছায়া ফুটে উঠল। চারপাশে তাকিয়ে ঘাড়ে হাত বুলিয়ে নিল সে, যেন নিজের অস্থিরতাকে সামলানোর চেষ্টা করছে।

এরপর হঠাৎ, সে যেই টুলটিতে বসে ছিল সেটা টেনে এনে মৌরির একদম কাছাকাছি বসে পড়ে। দু’জন মুখোমুখি। দূরত্বটা এতটাই কম যে নিঃশ্বাসের উষ্ণতা মিশে যাচ্ছে দুজনের।

উমরান ঝুঁকে আসে। পেছন থেকে তাকালে তার বলিষ্ঠ দেহের ছায়া আড়াল করে ফেলে মৌরিকে। এই পর্যায়ে তার অপ্রত্যাশিত নৈকট্যে মৌরির বুক কেঁপে ওঠে। তার মুখের ওপর পড়ছে উমরান তাওসিফের নিঃশ্বাসের গরম পরশ, আর সেই স্পর্শে সে বিস্মিত, কিছুটা আতঙ্কিত নয়নে তাকায় মেজর উমরান তাওসিফের চোখের দিকে। মৌরির সেই আতঙ্কিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে উমরান তার হাত ধরে আলতো স্পর্শে। নিজের হাতের মুঠোয় নেয়।

-“শুনুন মৌরি, এত চিন্তা করতে হবেনা। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি সময় হলে আমি সব ঠিক করে দেবো। আপনার চোখে নিজের জন্য আতঙ্ক দেখতে আমার ভালো লাগছেনা। গিল্ট ফিল হচ্ছে। এই অনুভূতি দেবেন না প্লিজ। আমি নিজের জন্য আপনার চোখে শুধু ভালোবাসা দেখতে চাই। এত সহজে তা হবেনা জানি। তবে ভালোবাসা না দেখলেও আতঙ্ক নিতে পারছিনা। আমি আপনার কাছে এখন অপরিচিত, আগন্তুক এক ব্যক্তি। কিন্তু এক সময় আমি আপনার অতি আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হয়ে উঠবো। এই বিশ্বাস আমার আছে। এখন আমাদের হাতে আর সময় নেই। আপনাকে আপনার বোন আর তার স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আবারও বলছি, আমি আসবো আপনাকে নিতে। আমার অপেক্ষায় থাকবেন, আপনি আমার আমানত। আমার জন্য নিজেকে সেইফ রাখবেন। মেজর উমরান তাওসিফের বউ আপনি। এই পরিচয়টা ভুলবেন না। শুধু একটু অপেক্ষা করতে হবে। এই আগন্তুক দেখবেন আপনার সারাজীবনের ভরসার স্থল হয়ে উঠবে একদিন। এখন একটু সব ভয় আর দ্বিধা সরান ঐ দুচোখ থেকে।” কথাগুলো বলে তার হাতটা মুখের কাছে এনে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মৌরির দেহের কম্পন স্পষ্ট হয় সাথে সাথে। তবে নিয়ন্ত্রণে ঢোক গিলে।

“আপনি আসবেন?”

“আসবো মৌরি, আমি আসবো।”

মৌরির কম্পমান কণ্ঠের প্রশ্নে সাথে সাথেই উত্তর দেয় উমরান। দুজনের চোখাচোখি হয়। আকস্মিক মেজর মৌরির আরও কাছে গিয়ে সন্তর্পণে তার দুগালে হাত রাখে। মৌরি কিছু বুঝে উঠবে তার আগেই স্বীয় অধরে উষ্ণ নরম আরেক অধরের ছোঁয়া পায়।

ব্যাস! এরপর আর কোনো কথা হয়নি দুজনের।

তাকে তুলি আর দীপ্তর কাছে দিয়ে আসে উমরান। মৌরিকে পেয়ে দুজনে স্বস্তির শ্বাস নেয়। মেজর উমরানসহ প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা জানায় তাদের সহযোগিতা করায়। এরপর সৌজন্য আলাপচারিতা সেরে যে যার পথে চলে যায়।

অপ্রত্যাশিত ব্যক্তি, অপ্রত্যশিত ঘটনা, অপ্রত্যাশিত বিয়ে - সব পেছনে ফেলে মৌরি ফিরে আসে নিজ ঠিকানায়। অপেক্ষায় থাকে দিনের পর দিন মেজরের একটি ফোন কলের, অথবা ছোট্ট একটি ইশারার - যাতে মৌরি বুঝতে পারবে যে, ‘মেজর আছে, তার খোঁজ রাখছে। তাকে নিতে আসবে। যা হয়েছে, তা ছেলেখেলা ছিলো না বুঝিয়ে দেবে।’ কিন্তু তেমন কোনো ইঙ্গিত পেলোনা। দিন পার হয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ কেটে মাস হয়ে গেলো। অথচ আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির নাম গন্ধও নেই। তার মানে কি সব মিথ্যা ছিল? মেজর যে কথা দিয়েছিল। সেসব মিথ্যে?

মিথ্যা না হলে এতদিনেও কেন তার কোনো খোঁজ নিচ্ছেনা। এমন তো না যে তাকে খুজে বের করতে কষ্ট হবে। দীপ্ত ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করলেই তো তার ঠিকানা পেয়ে যাওয়ার কথা। তাও কেন লোকটা তাকে নিতে আসছেনা?

মৌরি এ কদিনে এসব কথা অসংখ্যবার ভেবেছে। আর প্রত্যেকবার মন বলেছে মেজর মিথ্যে আশ্বাস দেয়নি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, মিথ্যেই ছিল সব। নাহয় তার কোনো খোঁজ কেন নেবেনা? লোকটা প্রতারনা করলো না তো তার সাথে? যদি করে তাহলে?

এখন তো বাড়িতে বিয়ের কথাও উঠছে। সে কি করবে?

আচ্ছা বিয়েটা যে হলো, এটা কি আদৌ বিয়ে ছিল? আকস্মিক এমন বিয়ে হয়? তার বাবা-মা জানেনা কিছু, পরিবারের কেউ কিছু জানেনা। এভাবে নিশ্চয় বিয়ে হয়না। এলোমেলো ভাবনায় তার মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়। মৌরি বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে অনামিকাকে কল লাগাতে লাগাতে ব্যাল্কনিতে যায়। পুঁই পাখিকে দানা দিতে দিতে গ্রিলে হেলান দিয়ে দাড়ায়। খাঁচায় বন্দি পুঁই পাখি ডানা ঝাপটে ঝাপটে একটা সুন্দর দৃশ্য দেখছে।

‘বিকেলের ম্লান আলোয় শহরের এক কোণ। সামনের বাড়িগুলোর দেয়াল ধূসর আর নীলচে আলোয় ঢেকে আছে। হালকা শীতের বাতাস বইছে। সামনের রাস্তার উপরে ঝুলে আছে কয়েকটা বিদ্যুতের তার, যা এলোমেলোভাবে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ছড়িয়ে গেছে।

সেই তারের উপর পাশাপাশি বসে আছে দুইটি কবুতর। একটির পালক বাদামি, অন্যটির ধূসর-সাদা মিশ্র রঙ। তাদের ঠোঁট একে অপরের দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে।’

পুঁই পাখি ঐ কবুতর দুটোকেই দেখছে খাঁচায় বন্দি থেকে। মৌরিও গ্রিলে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে দেখে দৃশ্যখানা। অবচেতন মন কবুতর দুটোকে দেখে নিজ অধরে মেজরের অধরের সেই উষ্ণ স্পর্শের মুহূর্তটুকু অনুভব করছে। কি আশ্চর্য! সে কি পাগল হলো? এই তো লোকটাকে প্রতারক ভাবছিল। আবার তার দেওয়া আদুরে স্পর্শ মনে করছে। এদিকে অনামিকাও ফোন রিসিভ করছেনা। বিরক্ত হয়ে কল কেটে দেবে তখনই সে রিসিভ করে,

-“প্রেসিডেন্ট আসছে দেশের। সামান্য একটা কল রিসিভ করতেও ব্যস্ততা তার। এতক্ষণ কই ছিলি?” মৌরি

-”চেতে যাচ্ছিস কেন? টয়লেটে ছিলাম, ইমারজেন্সি। পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি। সে পেটে কিছু চালান দিয়ে হোক, কিংবা পেট থেকে বের করে।” অনামিকা বিছানায় গা এলিয়ে অতীব শান্ত কণ্ঠে বলে, যেন সে খুব হালকা অনুভব করছে।

-”হাহ!! সবার জীবনেই শান্তি, আমারটা ছাড়া।” মৌরি

-”মেজরকে নিয়ে ভাবছিস আবার?” অনামিকা

-”আর কি নিয়ে অশান্তিতে থাকবো তুই বল? বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে আরেকটা। এবার তো বাবা-চাচারাও আগ্রহী দেখা যাচ্ছে। আমি কিভাবে কি আটকাবো তুই বল? মানুষটা আমাকে এভাবে গ্যাঁড়াকলে ফেলে দিয়ে উধাও হয়ে গেলো? আচ্ছা আদৌ যা ছিল সব সত্য ছিল তো অনা? কোথাও ঠকালো না তো আমাকে? বিয়েটা আদৌ আসল ছিল?” মৌরি

-”তোর মুখে যা যা শুনেছি তাতে তো এমন কিছু মনে হচ্ছেনা আমার। কিন্তু তুই বা কেমন বলদ? এভাবে অচেনা-অজানা একটা মানুষকে কেউ কবুল বলে দেয়?” অনামিকা

-”অনা। প্লিজ এই বিষয়টা নিয়ে আর কিছু বলিস না। আমি নিজেই এর কোনো বাখ্যা পায়না। কি হয়েছিল আমার, কিসের ঘোরে ছিলাম। আমি কিছু জানিনা। জানতেও চায় না। শুধু ঐ লোকটা আদৌ আসবে কিনা এই দ্বিধায় আছি। বলে তো ছিল আসবে। কিন্তু এখন ওসব নিছক ছেলেমানুষী ছিল মনে হচ্ছে। বিয়েটা যদি মিথ্যে হয়ও, আমি কিভাবে সেটা নিশ্চিত না হয়ে অন্য কারো সাথে বিয়ে বসবো? সত্য হোক, বা মিথ্যা। ঐ লোকটার মুখোমুখী হওয়া খুব দরকার। তুই বুঝতে পারছিস আমি কি বলতে চাইছি?” মৌরির উদ্বিগ্ন কণ্ঠ

-”আমি বুঝতে পারছি মৌ। কিন্তু আমার গাট ফিলিংস বলছে মেজর ফ্রড নয়। ঠিক আসবে তোকে নিতে। আরেকটু অপেক্ষা কর তুই। আমার মনে হয় কোনো কাজে আঁটকে পড়েছে। সৈনিকদের হঠাৎ হঠাৎ কত ঝামেলা-ই তো পড়তে হয়। নানান অপারেশনে ইনজুরড হয় তারা। এমন কিছুই হবে হয়তো। তুই আরেকটু ধৈর্য ধর।”

অনামিকার কথাগুলো শুনে মৌরি গ্রিলে হেলান দিয়ে রাস্তার তারের উপর বসে থাকা ঐ কবুতর দুটোর দিকে তাকায় আনমনে। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে আপনমনে বিরবিরিয়ে উঠে,

“আহহ!! মেজর উমরান তাওসিফ। রইলাম নাহয় আপনার অপেক্ষায়। দেখি আপনি কতদিনে আসেন। ঠিক কতো সময় পর গিয়ে আপনার সবার অগোচরে বিয়ে করা বউয়ের কথা মনে পরে।”

মৌরির কণ্ঠ শুরুর দিকে চওড়া থাকলেও শেষের কথাগুলো খুব নিম্নস্বরেই বলে। তাই মেজরের নামটাই শ্রুতিমান হয় শুধু। পুঁই পাখি তা শুনে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে সুর তুলে,

-”তাওসিফ, মেজর উমরান তাওসিফ। মেজর উমরান তাওসিফ।”

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ৩ গল্পের ছবি