তূর্ণা বাড়ির প্রত্যেকের উপর অভিমান করে আছে। কাল থেকে আগের মতো প্রাণোচ্ছল হয়ে কথা বলছেনা কারও সাথে। না তো নিজের তিড়িং-বিড়িং স্বভাব জারি রাখছে। কেউ কিছু জানতে চাইলে উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থাকে। চেহারা গম্ভীর করে রাখে। খেয়ে-ধেয়ে চুপচাপ রুমে এসে দরজায় খিল দেয়।
এখনো রুমেই আছে সে। তবে সামনে একটা বই দেখা যাচ্ছে। হয়তো পড়ছে। দরজায় কারো নক করার শব্দ শুনে এক নজর তাকায়। তারপর বিছানায় পাশ থেকে কলম নিয়ে বইয়ে কিছু একটা দাগাতে দাগাতে সাড়া দেয়,
_”কে?”
_”আমি বলছি আপু। দরজা খুলো।”
_”কি দরকার?”
_”তুমি দরজা খুলো। তারপর বলছি।”
_”আমার কোনো দরকার নেই। এখান থেকে যা তুই।”
_”আমি দরকারি কথা বলেই চলে যাবো। দুই মিনিট লাগবে শুধু। খুলো না প্লিজ।”
_”বলেছি তো আমার কোনো দরকার নেই তোদের সাথে। যা তো এখান থেকে। বিরক্ত করবি না একদম। পিঠের উপর দেবো আরেকবার দরজা ধাক্কালে।”
_”হ্যাঁ তোমরা শুধু আমার পিঠটাই দেখো। কথা না শুনলেও পিঠের উপর, শুনলেও পিঠের উপর। সরকারি জায়গা পেয়েছ যে…” রেগে বলে মৃন্ময়। তারপর আবার আওয়াজ তুলে,
_”অর্ণব ভাইয়া কথা বলতে চাইছে তোমার সাথে। ফোন নাও, আর আমাকে উদ্ধার করো। তোমার চেয়ে অর্ণব ভাইয়ার হাতের কিল বেশি ভারী হয়।”
অর্ণবের ফোন শুনে তূর্ণার অভিমান আরও গাঢ় হলো। নাক ফুলিয়ে বলে,
_”অর্ণব ভাইয়ার সাথে কথা বলতে চাইনা আমি। তোরা কেউ আমার ভাই না। আমার কেউ নেই। বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ নেই। চলে যা এখান থেকে।”
_”সেটা তুমি অর্ণব ভাইয়াকে বলো। সে লাইনে আছে। তোমার সব কথা শুনছে। বলেছে দরজা না খুললে বাড়ি এসে সবার আগে তোমার রুমের লক সিস্টেম নষ্ট করে দেবে। তারপর সামনে থেকে কি করো দেখবে।”
তূর্ণা রাগে গজরাতে গজরাতে না চাইতেও উঠে এসে দরজা খুলে দিলো। এখন কথা না শুনলে পরে অর্ণব ভাইয়া বাড়ি আসলে সত্যি সত্যি হুক নষ্ট করে দেবে তা জানে সে। রাগ করলে ধুম ধাম দরজা বন্ধ করার স্বভাব তার। সাথে খাবার বর্জন। অনেক বলে কয়েও খোলা যায়না। তাই একবার রুমের হুক নষ্ট করে দিয়েছিল অর্ণব। পরে তূর্ণা অনেক বলে কয়ে ঠিক করেছে তা। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও দরজা খুলে দেয়। তারপর হনহন করে আবার বিছানায় গিয়ে বসে পড়ে। মৃন্ময় ঢুকল পিছু পিছু।
_”এই নাও ভাইয়া। কথা বলো।” কথাটা বলে সে ফোন বোনের সামনে রেখে দিলো। ভিডিও কল। তূর্ণা সেদিকে তাকাচ্ছেনা। মুখে বিরক্তি তার।
_”তূর্ণা…” অর্ণব ফোনের ওপাশ থেকে ডাকল। তূর্ণা ফিরে তাকায়না। নিজের মতো বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে।
_”তোকে ডাকছি তূর্ণা।”
তাও উত্তর দিলো না সে। অর্ণব অভিমানীর অভিমান দেখে তির্যক নেত্রে চেয়ে চেয়ে। ক্যান্টিনে বসে আছে সে। গাঁঁয়ে সাদা এপ্রোন জড়ানো, আর পাশে টেবিলে স্টেথোস্কোপ রাখা। হাতের কফির মগে চুমুক দিতে দিতে কিছুপল চুপচাপ দেখে তূর্ণাকে। তারপর মৃন্ময়কে বলে,
_”মৃন্ময়। বাইরে যা তুই।”
সে বসেছিল কথা শেষ হলেই ফোন নিয়ে যাবে বলে। মায়ের ফোনে গেইমস খেলছিল। ভাই চলে যেতে বলায় নাখোশ চেহারা নিয়ে বের হয়ে যায়।
_”সকাল থেকে ফোনের উপর ফোন দিচ্ছি, কথা বলতে চাইছিস না কেন তুই?”
….(নিরুত্তর)
_”এখনো রেগে আছিস? বাড়িতে কারো সাথে নাকি কথা বলছিস না!”
তূর্ণা বাঁকা চোখে তাকাল। বিচার দেওয়াও হয়ে গেছে এর মধ্যে।
_”এভাবে কি দেখছিস? কেউ বিচার দেয় নি। মৃন্ময়কে কি করছিস জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওই বলেছে।”
_”ভালো” ছোট জবাব তার।
_”হু ভালো তা তো জানি। এখন বল এত মন খারাপ করে থাকতে হবে কেন? আর কেউ কি বলেছে বিয়ের কথা সকাল থেকে? না বললে রেগে থাকার কারণ?”
তূর্ণা এবার পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে তাকায়,
_”আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে রাগ করে। আমি ভীষণ দুঃখিত। তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও। করবে ক্ষমা? নাকি এই অপরাধে আবার বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার আলোচনায় বসবে সবাই মিলে? বলো বলো! আমার এই অপরাধে আবার বিয়ের আলোচনায় বসবে তাইনা? মেয়ে হয়েই ভুল করেছি। তুমি, মৃন্ময় যাই করো সবার ভালো লাগে। আমি একটু রেগে থাকলেই মস্ত বড় অপরাধ। তোমরা বরং আমাকে সত্যি সত্যিই বিয়ে দিয়ে দাও। একবার শ্বশুর বাড়ি চলে গেলে আর জীবনে তোমাদের বাড়ি আসবো না দেখে নিও। লাটি ঝাটা খেলেও ওখানেই থেকে যাবো। তাও তোমাদের কাছে ফিরব না। তোমাদের মনের আশা পূর্ণ হবে তখন।”
বলতে বলতে অশ্রুকণা দেখা গেলো তার চোখে। অনেক কষ্টে সামলালো নিজেকে। যা সে করেনি, তা ভবিষ্যতে করবে এই আশঙ্কায় বিয়ে দিতে চাইছে তাকে এত তাড়াতাড়ি। ভীষণ কষ্ট পেয়েছে সে। এত অবিশ্বাস করতে হবে কেন? এমনিতেই কি কম চোখে চোখে রাখে তাকে সবাই? প্রতিনিয়ত এত চাপে রেখেও আবার ওসব সন্ধেহের মানে কি? ভাবতে ভাবতে নাক টানে সে। এর মধ্যে অর্ণবের কণ্ঠ শুনতে পেলো।
_”শেষ?”
রাগের পারদ বাড়ল তার।
_”হ্যাঁ শেষ। আমার বকবক করা শেষ। তোমার কানটা বেঁচে গেছে, আর বকবক শুনতে হবেনা। যাও এখান থেকে।”
বলতে বলতে ফোন হাতে নিয়ে কল কেটে দিতে চাইছিল।
_”কল কাটলে তোর হাত কেটে বক্স ভরে রেখে দেবো।”
_”তুমি ফোনের ওপাশে। পারবে না। তাই ভয় পাচ্ছিনা।”
_”বাড়ি আসবো না কোনোদিন? আমার সামনে পড়বিনা তুই?”
দমে গেলো সে। ফোন না কেটে রেখে দিলো। তবে মুখ ঝামটা মেরে অন্যদিকে তাকায়।
_”এখন চুপচাপ আমার কথা শোন।”
তূর্ণা তাও ফিরল না দেখে অর্ণব শ্বাস টানে। ক্যান্টিন বয়কে আরেকটা কফি দিতে বলে হাতঘড়িতে সময় দেখে তূর্ণার উদ্দেশ্যে তাকায়,
_”এদিকে তাকা তূর্ণা। দ্বিতীয়বার বলতে হলে গাল লাল করে দেবো থাপড়ে।”
না চাইতেও তাকাল সে।
অর্ণব অভিমানীর চোখ মুখ মনোযোগ দিয়ে দেখে বলে,
_”সবাইকে আমি বলে দিয়েছি যেন কেউ বিয়ের কথা আর না তুলে। এখন আর রেগে থাকতে হবেনা ওসব নিয়ে। আর বিয়ে দিলেও কি? বিয়ে কি খারাপ নাকি? মেয়ে হয়েছিস বিয়ে করবিনা? আমার সাথে কথা না বলে এত রাগ কিসের?”
_”মেয়ে হয়েছি বলে বিয়ে করতে হবে কথা আছে? তুমি ছেলে বলে কি বিয়ে করতে হবেনা?” ত্যাড়া দৃষ্টি তার।
_”অবশ্যই হবে। আমি বিয়ে না করলে তোর বিয়ে কি করে হবে?”
তূর্ণার চেহারায় আনন্দের ঝিলিক দেখা গেলো অল্প করে।
_”মানে? তুমি বিয়ে করে তবেই আমাকে বিয়ে দেবে?”
_”না, একসাথে বিয়ে করবো দুজনে।”
_”তাও ভালো একসাথে দুটো বিয়ে। মজা হবে অনেক। কিন্তু তুমি কাল আমার সব কথা না শুনে ফোন কেটে দিয়েছ কেন? আবার জানতে চাইছ রাগ কিসের!”
অর্ণব মায়া জড়ানো মুখটার দিকে চেয়ে বলে,
_”ব্যস্ত ছিলাম তাই কাটতে হয়েছে। সরি ফর দ্যাট, সামনে থেকে আর কোনোদিন এমনটা হবেনা। তোর সব কথা শুনে তবেই ফোন কাটব।”
_”ঠিক আছে। আর না করলেই হলো।”
তাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে দেখে অর্ণব চুলের ভাঁজে হাত বোলাতে বোলাতে বলে,
_”একটা কথা বল!! তোর কি এখন বিয়ে করতে সমস্যা ছিল নাকি তোর নিশান ভাইকে বিয়ে করতে সমস্যা?”
_”অবশ্যই বিয়ে করাতে।”
অর্ণব হাত নামিয়ে অতীব ঠাণ্ডা চোখে তাকায়,
_”মানে সময় হলে তখন নিশানকে বিয়ে করতে সমস্যা নেই তোর?”
তূর্ণা হাতে কলম দিয়ে কিছু আকঁছিল। এই প্রশ্নে কপাল কুঞ্চিত করে তাকায়,
_”তুমি কি পাগল? নিশান ভাইয়ার প্রেমিকা আছে আমি জানি। এই খবর আমার কাছে অনেক আগেই এসেছে। বাবা-মা কিংবা মামা-মামী চাইলেও জীবনে নিশান ভাইয়া ওর প্রেমিকা ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবেনা। খুব ভালোবাসে ভাবিকে নিশান ভাইয়া।”
_”এত কথা তুই কি করে জানিস?” কপালে ভাঁজ অর্ণবের। সে ভেবেছিল নিশান ছেলেটাকে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু এখানেও অন্য ব্যাপার। কিন্তু সে না জানলেও এই বিচ্ছু ঠিকই জেনে রেখেছে তাকে ছোটখাটো চিন্তায় ফেলে রেখে।
_”জানবো না? গতবার মামা বাড়ি থাকতে ভাইয়াকে কথা বলতে শুনে নিয়েছিলাম। আমার চোখে ফাঁকি দেওয়া অতো সহজ নাকি? মুখ বন্ধ রাখতে ট্রিট দিয়েছে বুঝেছ? ঐ যে বাইকে করে বাড়ি ফিরেছি বলেছিলাম না? তখন ট্রিট দিয়েছিল। আমি তো ভাবির সাথে কথাও বলেছি ফোনে।” ঠোঁট চেপে হাসে সে। চোখে মুখে গর্ব তার। বড় ভাইয়ের প্রেম ধরে ফেলেছে, হবেনা?
অর্ণব দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
_”ছোট বলে বিয়ে করবিনা বিয়ে করবিনা কাঁদিস। এদিকে দুনিয়ার সব শয়তানি শিখে বসে আছিস। আবার বড় মুখ করে বলছিস। শোন বেয়াদব, সামনে থেকে যদি নিজের কিংবা আশেপাশে যে কারো, যে কোনো ধরণের প্রেম নিয়ে আগ্রহ দেখি, অথবা এই সংক্রান্ত বিষয়ে নাক গলাতে দেখি। তাহলে নিজ দায়িত্বে বিয়ের ব্যবস্থা শুরু করবো আমি।
এবার থেকে ঠিক মতো পড়বি, খাবি, সবার সাথে কথা বলবি। বড়দের কথা না শুনলে মার একটাও মাটিতে পড়বেনা আমি বাড়ি এলে। এমনিতে ছোট। ওদিকে দুনিয়ার জানেনা কিছু বাকি নেই তার। আবার ভাবিও ডাকে, ইঁচড়েপাকা মেয়ে। ফোন কাট।”
বলতে দেরি না হলেও তূর্ণার ফোন কাটতে দেরি হলো না। জিব কাটে সে বেঁচে গিয়ে। অর্ণব ভাইয়া এসব শুনলে রেগে যায় জানা কথা।
উত্তেজনায় নিশান ভাইয়ার প্রেমিকার কথা বলে ফেলেছে। সে মৃন্ময়কে ডাক দিয়ে ফোন নিয়ে যেতে বলে।
অর্ণব তূর্ণাকে সান্ত্বনা তো দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেদিন ঐ মুহূর্তে বাবাকে ফোন করে তূর্ণার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে আলোচনা ওখানেই থামাতে বললেও চাচা তা আদতে মানেনি। উনার এক কথা মেয়েকে কারো সাথে জুড়ে দিয়ে তবেই নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারবেন। একবার বাড়ির জোয়ান মেয়ে হারিয়েছে, তূর্ণার বেলায় কোনোপ্রকার সুযোগ বা ঝুঁকি নেওয়ার মানে হয়না। কিছু একটা ওদিক ওদিক হলে খোয়াতে খোয়াতে বেঁচে যাওয়া সম্মান তো যাবেই, সাথে মেয়ে হারানোর তীব্র ভয় মনে।
অর্ণবের বাবাও এখনো নিজের ছোট মেয়েকে হারানোর সেই অন্ধকার অধ্যায় থেকে বের হতে পারেনি। রাত হলেই মেয়ের মুখটা চোখে ভাসে। বাচ্চাকালের খিলখিল করা সেই হাসি কানের কাছে বেজে উঠে। যতোই রাগ, ক্ষোভ দেখাক উপরে উপরে - জন্মদাতা পিতা হয়। একটুও কি কষ্ট হয়না? হয়তো তো! স্ত্রী যখন মাঝরাতে কাঁদে তখন বুক ফেটে যেতে চায় তার। মনে হয় সবটা মিথ্যা। মেয়ে এখনো ছোট ভাই-বোনসহ তাকে নিয়ে মেলায় যাওয়ার আবদার করে ঘুমের মধ্যে এসে। পরীক্ষা শেষ হলে মামা বাড়ি যাওয়ার বায়না করে। ভাই বকেছে দেখে বাবার কাছে বিচার আনে। আবার বাবা বকলে অভিমান করে। সেই মেয়েটা আর বেঁচে নেই। মানতে কষ্ট হয় এখনো।
সাথে ওসব ভাবলে বাড়িতে যে মেয়েটা আছে তাকে নিয়েও ভয় হয়। মৌরির প্রেম নিয়ে বাড়ির একটা মানুষ কিছু টের পায়নি মা ‘রা যাওয়ার আগ অব্দি। না জানি কোথাকার, কেমন ছেলের মায়ায় বা ফাঁদে পড়ে যায় তূর্ণাও। যুগ বড় খারাপ এখন। ক্ষণিকের আবেগে কি থেকে কি করে ফেলছে বাচ্চাগুলো। এত কাণ্ড করেও এখনো সেই বাচ্চাটাই ছোটবেলার মতো ভুল করে ফেলেছে মনে হয় তার। শুধু বড়বেলা হওয়ায় ভুলটাও বড়। কিন্তু মনে মনে এত সুন্দর চিন্তা ভাবনা আনা যতটা সহজ। বাস্তবে তা নয়, মেয়ে যা করেছে ঘোর অন্যায়। এ কথা অর্ণবের বাবা নিজেও জানে। তাই তো মনে মনে মেয়েকে ক্ষমা করে দিলেও তা কখনো প্রকাশ করেনা মুখে।
ভাইয়ের ভয়টাও অর্ণবের বাবা বুঝতে পারে। নিজেও তো বাবা, আর তূর্ণারও যে বড় বাবা। ভয় তারও কম নয় তূর্ণাকে নিয়ে। তাই একমন মৌরির ভুলের কারণে তূর্ণাকে এভাবে বেঁধে ধরে বিয়ে দেওয়া উচিত হবেনা মনে হলেও, অন্য মন নানান ভবিষ্যৎ আশঙ্কায় ভাইকে যা করতে চাইছে করতে দিতে মন চায়।
অর্ণব সাময়িক সময়ের জন্য তূর্ণার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে ভাবা বন্ধ করার অনুরোধ করেছে চাচার কাছে। আর বাবাকে কিছু কথা বলেছে। যা একান্তই তার আর বাবার মধ্যে। বাকি যা করার সে নিজে বাড়ি গেলে করবে।
_____
কোলে উষশী। ঘুমাচ্ছে সে। শ্রেয়সী তাকে কাঁধে নিয়ে ‘শু শু’ শব্দ করে ঘুম আরও গাঁঢ় করার চেষ্টা করছে। পাশে আরাবি আর এমির। এমিরের হাতে একটা ঝুড়ির মতো বক্সে বেশ কিছু খাবার। শ্রেয়সীকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি খাবার খেতে হয় এখন। তার নিয়মিত শুকনো খাবার তালিকার প্রায় সবকিছু শেষের দিকে। তাই ড্রাইভারকে দিয়ে বাজার করে পাঠিয়েছে উমরান। এমির মামীকে তা রুমে নিতে সাহায্য করছে। উষশী ঘুমাচ্ছে যেহেতু, তাই তাকেও বিছানায় রেখে আসবে। আরাবি হাতে একহাতে চকলেট আর ললিপপ নিয়ে তাদের পাশাপাশি যাচ্ছে।
_”তুমি এখন কোন ক্লাসে এমির?”
_“আমাদের তো ক্লাস বা স্ট্যান্ডার্ড বলে না, মামী। Year হিসাব করা হয়,”
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে এমির।
_“আমার GCSE শেষ। এই বছর Year Twelve-এ উঠেছি। A-Levels শুরু করবো। এখান থেকে ফিরেই সিক্সথ ফর্মে জয়েন করবো।”
_“বয়স কতো তোমার?”
_“ইট্স সিক্সটিন। আর কয়েক মাসের মধ্যেই সেভেন্টিনে পা দেবো।”
_“ওহ, আচ্ছা। আর আরাবিকে স্কুলে দিয়েছে?”
_“ইয়াহ,” এমির আরাবির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে।
_“শি স্টার্টেড নার্সারি অ্যাট টু এন্ড আ হাফ।”
কথা বলতে বলতে হাঁটছিল তারা। উষশী কাঁধে ঘুমোচ্ছে। মাঝপথে সারাকে দেখতে পেলো। ফোন দেখতে দেখতে এদিকে আসছে। শ্রেয়সী এমিরের দিকে ফেরে,
_”এমির। তুমি একটু ওগুলো রুমে রেখে আসো প্লিজ। আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।”
এমির হেসে মাথা নাড়ায়,
_”ওকে, নট আ প্রব্লেম।”
আরাবিও ভাইয়ের পেছন পেছন যায়।
_”সারা, একটু দাড়াও প্লিজ।”
তার কণ্ঠে সারা ফোন থেকে মাথা তুলে তাকাল। শ্রেয়সীর ডাকে সে ললাট কুঞ্চিত করে তাকায়। মেয়েটার তার সাথে তেমন সখ্যতা ভাব নেই। অতিথি হিসেবে দরকারে যেটুকু কথা বলার প্রয়োজন, সেটুকুই আলাপ তাদের।
_”হ্যাঁ। বলো।”
_”বলছিলাম তোমার ফোনে নিশ্চয় আমার দিদুনের অনেক ছবি থাকবে। আমাকে কিছু ছবি ট্রান্সফার করতে পারবে? প্লিজ।”
তার অনুরোধে সারা কিছুপল চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই জবাব দেয়,
_”হ্যাঁ আছে। ওয়েট।”
সে ফোন ঘেঁটে নিজের দাদীর ছবিগুলো বের করলো। তারপর শ্রেয়সীর দিকে বাড়িয়ে দেয় ফোনটা।
শ্রেয়সী ফোল্ডারে থাকা তার দিদুনের ছবিগুলো বেঁছে বেঁছে নিলো। পুুরনো কিছু ছবিতে তাকেসহ দেখা যাচ্ছে। আকস্মিক তার মনে হলো ছবির মুহূর্তগুলো কিছুটা মনে পড়ছে তার। হ্যাঁ, সারার জন্মদিন অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে গেছিল কর্নেল আঙ্কেল।
উৎফুল্ল মনে সব ছবি নিজের ফোনে নিয়ে নেয় সে। নেওয়া হলে এক্সিট দিয়ে ফোনটা সারার দিকে বাড়িয়ে দিলো। কিন্তু ভ্রু কুচকে যায় তার। এক্সিট দিতেই ফোনের স্ক্রিনে একটা ছবি দেখল না? পেছন ফিরে আছে কোনো পুরুষ। ওটা তার স্বামী। চিনতে পেরেছে সে। শ্রেয়সী আবার ফোন নিয়ে দেখতে পারল না। সারা নিয়ে নিয়েছে ততক্ষণে। কিন্তু তার অতিশয় কুঞ্চিত ললাট স্পষ্ট জানান দিচ্ছে সে ওটা দেখেছে এবং চিনেছে। শ্রেয়সীর হতবাক-প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি দেখে সারা বলে,
_”কিছু বলবে?”
সে জবাব দিলো না। ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে রয়। শ্বাস প্রশ্বাস একটু ঘন দেখাচ্ছে আগের চেয়ে। হয়তো কি বলবে, কি প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝে উঠতে পারছেনা। ঢোক গিলে সে। তবে বেশিক্ষণ নিরুত্তর থাকল না।
_”ফোনের লক স্ক্রিনের ঐ ছবিটা উষশীর পাপার।”
সারা মেয়েটা দেখে নিয়েছে বুঝে হালকা হাসল।
_”তো?”
_”তো তুমি কি বুঝতে পারছ না অন্যের স্বামীর ছবি তোমার ফোনের ওয়ালপেপারে দিয়েছ?”
_”পারব না কেন? জেনেই তো দিয়েছি।” সরাসরি তাকিয়ে জবাব দেয়।
শ্রেয়সী বিরক্তি আর সুপ্ত ক্ষোভ নিয়ে অনুদ্দেশ্যে তাকিয়ে চোখ মুখ কুচকে নেয়। এমির আর আরাবি বেরিয়ে এসেছে ততক্ষণে।
_”এমির? একটু এদিকে এসো প্লিজ।”
এমির এগিয়ে আসলে মামীকে অস্বাভাবিক চেহারায় দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে সারার দিকে তাকায়। কিছু হয়েছে মনে হচ্ছে দুজনের মাঝে। তবে কোনো প্রশ্ন করল না।
_”ওকে একটু নাও প্লিজ। রুমে গিয়ে সাবধানে শুইয়ে দেবে কেমন? দুপাশে বালিশ দিও দুটো।”
এমির মামীর কথা অমান্য করল না। গম্ভীর, তির্যক নেত্রে এক নজর সারাকে দেখে, উষশীকে কোলে নিয়ে আবার চলল মামীর রুমের উদ্দেশ্যে। আরাবিকে ছোট থেকে নেওয়ার অভ্যাস আছে তার। পিঠে নিজের মতো হাত বুলিয়ে দিল যাতে উঠে না যায়।
সারা নিজেও তেরচা নজরে সবটা দেখল। এমির যেতেই হাল্কা হেসে বলে,
_”মেয়েকে পাঠিয়ে দিলে যে? চুলোচুলি করবে নাকি আমার সাথে?”
_”দরকার পড়লে করতে দ্বিধা নেই আমার। তবে আপাদত ওতে যাচ্ছিনা। প্রথমত যেটা করবো সেটা হচ্ছে…” বলে সারার হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে এক আঁছাড় মারল ফ্লোরে।
_”এই যে, এটা করলাম সবার আগে। এরকম আরও অনেক কিছু করবো প্রয়োজন পড়লে।”
_”হোয়াট দা ফাঁ*।”
বিস্মিত সারা নিচে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল সবার আগে। এই মেয়ে ফোনটা এভাবে কেঁড়ে নিয়ে আঁছাড় মারবে ভাবতে পারেনি সে। দু-ভাগ হওয়া ফোনটা হাতে নিয়ে হতবাক নেত্রে তাকায়। রাগে, ক্ষোভে মাথা তুলে শ্রেয়সীর চেহারায় চোখ রাখে। কপালে আসা চুলগুলো কানে গুজে উঠে দাড়ায়। শ্রেয়সীর বাহু ধরে বলে,
_”আর ইউ ইনসেইন অর হোয়াট? ফোন ভাঙলে কোন সাহসে।”
_”শুধু ফোন না। আরেকবার আমার স্বামীকে নিয়ে বেহায়াপনা করলে তোমার মুখটাও ভেঙে দেবো।” ঝাড়া মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় সে।
_”ইউ ব্লাডি বি*চ। ফোনের দাম কতো জানো? এমন ফোন জীবনে চোখে দেখেছ?”
_”তোমার ফোন নিয়ে তুমি কাজি বানিয়ে খাও নির্লজ্জ মেয়ে। এমন ফোন বহু দেখেছি আমি। কিন্তু তুমি মনে হয় জীবনে পুরুষ মানুষ চোখে দেখোনি। তাই অন্যের স্বামী দেখে কুকুরের মতো পেছনে পরে আছ।”
সারা ততক্ষণে বহু কষ্টে নিজেকে সামলেছে। এখানে অবাঞ্চিত প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবেনা তা সে জানে। ঘনঘন শ্বাস টানে,
_”এর জন্য তোমাকে পে করতে হবে শ্রেয়া। একেবারেই ঠিক করো নি। যা যা বলেছ, যা করেছ। ইউ উইল হ্যাভ টু পে ফর ইট।”
_”দেখব। কে কাকে পে করে।” তাচ্ছিল্য কণ্ঠে কথাটা বলে কি ভেবে শ্রেয়সী আবার নিজেই বলে,
_”আচ্ছা তুমি কি পে বলতে কোনোভাবে টাকা পয়সা খুজঁছ? আগে বলবে না? আমার আবার অনেক টাকা। বাবার সব আমার, স্বামীর সবও আমার। তোমাকে দুবার কিনে নিতে পারব জানো? বলো কতো লাগবে। আমি দিয়ে দিচ্ছি। টাকা নিয়ে এখান থেকে বিদায় হতে চাইলে তাই বরং নাও। বলো কতো চাই?”
অপমান করতে ইচ্ছাকৃত এসব বলছে সে। সারার চোখ মুখ লাল হয়ে এসেছে রাগে।
_”আমার বাড়িতে থেকে আমার স্বামীর দিকে কুনজর দিচ্ছ। আমি জেনেও বারবার ছেড়ে দেবো ভেবেছ?” শ্রেয়সী
সারা তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
_”তোমার বাড়ি? নিজের নিজের করছ!! বেশ ভালোই। তবে তোমার স্বামীর বাবা-মা নিজে একসময় আমাকে এই বাড়ির বউ করতে চেয়েছিল জানো তো? আমি যদি কোনোভাবে তোমার স্বামীর নামে কবুল পড়ে এ বাড়িতে উঠি। দেখবে ওরাও মেনে নেবে আমাকে। এখন যেভাবে তোমার বাড়ি বাড়ি করছ না? তখন দেখবে আমিও এ বাড়ির অংশীদ্বার হবো।”
_”বাড়ির নেমপ্লেট নিশ্চয় দেখেছ? ওটার ইতিহাস জানো? আমার শ্বশুর তার পুত্রবধুর পছন্দ মাথায় রেখে নিজেদের ‘আপননীড়’কে আমার জন্য ‘ফুলবাড়ি’ করে দিয়েছে। তো আমি আমার বাড়ি বলবো না তো আর কে বলবে? আর বাকি তোমাকে বউ করে আনতে চাওয়ার কথা? মানুষের বয়স বাড়লে আবেগ অনুভূতি বাড়ে। মাথায় লজিক কমে যায়। তোমার মতো বেহায়া কুটনি মেয়েদের ম্যানিপুলেশন সহজে ধরতে পারেনা। তাই অল্প সময়ের জন্য বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়েছিল তাদের। তবে চিন্তা নেই। এখন তো আমি আছি। আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে কীভাবে বাইরের বেহায়া, নির্লজ্জদের থেকে বেঁচে থাকতে হয় তা শিখিয়ে পড়িয়ে দেবো।”
সারা ক্ষোভে কিছু বলতে চাইছিল। শ্রেয়সী হাত দেখিয়ে থামিয়ে দেয়,
_”শুনো। তোমার এসব নির্লজ্জ কাজ কারবার কাউকে আমি বলবো না। তুমি বেহায়া হলেও আমি এসব ওদের সামনে গিয়ে বলার মতো লাজ শরম ত্যাগ দিতে পারিনি এখনো। নিজেরই লজ্জ্বা হচ্ছে তোমার বিচ্ছিরি স্বভাব দেখে। তাই যতদিন এই বাড়িতে আছ ভালোই ভালোই থাকো। নয়তো আমার ধৈর্য সীমা পার হলে ফোনটা যেভাবে ভেঙেছি, ওভাবে সবার সামনে তোমার বেহায়া রুপও তুলে আনতে দেরি করবো না।”
রুমের ভেতর থেকে উষশীর কান্নার শব্দ আসায় শ্রেয়সী আর দাড়াল না। চলে যায় তাড়াহুড়ো করে। সারা তার যাওয়ার পথে কিছুপল চেয়ে থাকে ঘনঘন শ্বাস ফেলে।
______
শ্রেয়সী মেয়ের কান্না বাড়তে শুনে তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। কিছুক্ষণ আগের সেই দৃঢ় অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা চেহারায়। এখন বিচলিত ভাব সেথায়। রুমে এসে দেখল আরাবি খিলখিল করে হাঁসছে, আর এমির চোখ মুখ কুচকে উষশীকে কোলে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। পারছেনা মেয়েটাকে রেখে দিতে, না তো কোলে রাখতে। তার পুরো গাঁ ভিজিয়ে দিয়েছে উষশী, এক ঘরা হিশু করে।
শ্রেয়সী বিচলিত কণ্ঠে বলে,
_”উষিকে রাখতে পারো নি? উঠে গেছে?”
_”শুধু উঠে যায়নি মামী। তোমার মেয়ে পি করে দিয়েছে আমার কোলে।” কাতর কণ্ঠ তার। শ্রেয়সী জিব কাটল।
_”এই রে। আমি ভেবেছিলাম এসে ওয়াটারপ্রুফ প্যাড দিয়ে দেবো নিচে। এর মধ্যেই হিশু করে দেবে বুঝতে পারিনি। আমাকে দাও। তোমায় তো পুরো ভিজিয়ে দিলো।”
এমির মামীকে দিতে দিতে বলে
_”এত্ত পি কে করে? দেখতে এটুকুনি বাচ্চা। পি করেছে এক বালতি। শাঁর্ট বেয়ে বেয়ে প্যান্ট শুদ্ধ ভিজিয়ে দিয়েছে। সিই!! মনে হচ্ছে আমিই করেছি।”
ক্রন্দনরত উষশীকে কোলে নিয়ে বকতে থাকে তার মা। হাল্কা কণ্ঠেই আদুরে বকা দিচ্ছে সে। কিন্তু আরাবি তা একেবারেই মানতে পারল না। সে বিছানার উপর থেকে নেমে আসে। কোমরে হাত দিয়ে বলে,
_”শি ডিড আবসলিউটলি দা রাইট ম্যজিক মামী। উষি তো ঘুমিয়ে ছিল। ভাইয়া ওকে রেখে ভালোই ভালোই চলে না এসে ওর ঠোঁটে, গালে হাত দিয়ে জোরে জোরে টাচ করছিল। দ্যাটস হোয়াই শি ওয়েকড আপ। এন্ড স্টার্টেড ক্রায়িং। এন দেন হোয়েন হি পিকড হার আপ টু স্টপ ক্রায়িং। শি পি’ড। টিট ফর ট্যাট হু!!”
নাকে হাত ঘষে সে বোনের পক্ষে কথাগুলো বলে। আরাবির বলার ভঙ্গিমা দেখে না হেসে পারল না শ্রেয়সী।
_”শাট আপ রাবি। ইউ আর টকিং টু মাচ!”
_”অ্যাম আই?” ভাইয়ের ধমকে তাকে বিচলিত হতে দেখা গেলো না। বরং চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে সে।
শ্রেয়সী আরাবির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
_”আচ্ছা আচ্ছা। তোমার বোন ইনসেন্ট। সে কিছু করেনি। এখন উষির ওয়্যারড্রোব থেকে দুটো ড্রেস নিয়ে এসো তো। সাথে একটা ছোট কাঁথা নিও।”
_”ওক্কে!!” সে চলে গেলো।
_”এমির। তুমিও যাও। চেঞ্জ করে নাও। শীতের মধ্যে বেশিক্ষণ ভেজা গাঁ নিয়ে থেকো না।”
_”ইয়াহ। যাচ্ছি।” যেতে যেতে শান্ত হয়ে আসা উষশীর দিকে চোখ বড় করে তাকাল, যেন ভয় পায়। কিন্তু সে উল্টো হেসে দিল। মায়ের কাঁধে মুখ গুজে দেয় হেসে। এমিরের ঠোঁটের কোণেও হাসি দেখা যায় উষশীর কাণ্ড দেখে।
______
অর্ণব দুদিন পর হঠাৎ বাড়ি ফিরেছে। সেদিন বৃহস্পতিবার। রাতে ফিরেছে সে। বাড়ির কেউ জানত না যে সে আসবে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়ায় চলে এসেছে ট্রেনের টিকিট কেটে।
কিছুদিন আগেই ফিরে গিয়ে এখন আবার বাড়ি দেখে অবাক হয় সবাই। নানান প্রশ্ন তাদের। কোনো সমস্যা হলো কি না!
মেডিকেলে ঝামেলা কি না!
অর্ণব সেসবের উত্তর দেয়নি। ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা রুমে যায়। ফ্রেশ হয়ে সবার আগে খাবার দিতে বলে। খেয়েও নেয় ধীরে। তারপরের সময়টুকু বাবার সাথে রুমে ছিল। মিনিট কয়েক পর বাইরে চিন্তিত বদনে বসে থাকা চাচাকেও ডেকে নিলো তার বাবা।
অর্ণব তূর্ণার বিয়ের বিষয় নিয়ে আলোচনা বন্ধ রাখতে বলায় তা করেছিল তারা। কিন্তু পরদিন রাত হতে হতে নিশান নিজে বাবা মায়ের কাছে ওসব শুনে মানা করে দেয়। প্রেমিকার কথা না জানালেও তূর্ণাকে কোনোভাবেই ঐভাবে সে দেখতে পারবেনা এ কথা জানিয়ে দিয়েছে। অর্ণবের কথায় আলোচনা বন্ধ রাখলেও মানা করা হয়নি এ বাড়ি থেকে। এর আগে ঐ বাড়ি থেকেই মানা করে দিল। এখন নিজেরা প্রস্তাব দিয়ে নিজেদের দিক থেকেই আবার প্রত্যাখ্যান অর্ণবের বাবা চাচার ভালো লাগেনি, না তো তার চাচীর। ভীষণ গাঁঁয়ে লেগেছে এই বিষয়টা।
তূর্ণার বাবা তো মেয়ে নিশানের চেয়ে ভালো কোনো ছেলের হাতে তুলে দেবে পণ করে ফেলেছে। তাও যে সময়ে নিশানের সাথে কথা এগোনোর কথা ছিল, ঐ সময়েই করবে।
তূর্ণা অর্ণবের সাথে সেদিন কথা বলার পর থেকে দিব্যি আছে। কোনো চিন্তা নেই তার। অর্ণব ভাইয়া বলেছে ওসব নিয়ে আর কথা হবেনা বাড়িতে। তার ওপর ভাইয়ার বিয়ের পর বা তার বিয়ের সময়ই একসাথে তার বিয়ে হবে বলেছে। তাহলে আর চিন্তা কিসের!! খায় দায় আর ঘুমায় সে।
কিন্তু তূর্ণার বাবার কাছে যেন বারংবার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কারণ স্বয়ং নিজে উড়ে উড়ে আসছে। এমনিতে নিজের চিন্তা আর ভয় কাঁটাতে তূর্ণাকে কারো হাতে তুলে দিয়ে রাখার চিন্তা আগে থেকে। তার মধ্যে যে অহমিকায় আঘাত আসলো, তা মানতে পারছেনা কোনোভাবে। সরাসরি মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করে কীভাবে? মৌরিকে যে দেয়নি তারা, সেই শোধ তুলেছে বলেই তো মনে হচ্ছে।
অথচ মৌরিকে দিতে পারেনি বলে তূর্ণাকে যখন চেয়েছে একবারো না ভেবে হ্যাঁ করে দিয়েছিল তারা। এই তার প্রতিদান?
অর্ণব কাল রাতে মায়ের কাছে শুনেছে এসব। বাবাকে একান্তে তূর্ণার ভবিষ্যৎ বিয়ে ছাড়াও আরও ভালোভাবে, নিরাপদে গড়তে পারবে, প্রয়োজনে সবটা সে দেখবে - এ নিয়ে নানান কথা বলছিল যখন, তখনই মনের খবরের কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে। তাও তার চাচা মেয়ে অন্য কোথাও পাত্রস্থ করতে খোঁজ লাগাচ্ছে জেনেও মানা করল না।
তার মা-চাচীর কোনো ধারণা নেই অর্ণবের চলে আসার কারণ কি! ভেতরে বাড়ির তিন পুরুষের মধ্যে কি কথা হচ্ছে। হঠাৎ এত থমথমে কেন সবটা। এই নিয়ে কোনো ধারণা নেই তাদের।
চিন্তায় চিন্তায় সব কাজ সারল। তাদের রাতের খাবার হয়ে গেছে অর্ণবের আসার আগেই। এখন সব গুছিয়ে নিচ্ছে। রাত তখন বারোটার ঘর পার হয়েছে।
শেষে ছেলে আর তার বাবা চাচা বের হলো। দুই মেয়ে জামাইকে ফোন দিয়ে কাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সওদাগর বাড়ি আসার নিমন্ত্রণ দিতে বললো। অর্ণবের মা আশ্চর্য হয় স্বামীর কথায়।
_”এই শেষরাতে মেয়ে জামাইদের ফোন দিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে আসার দাওয়াত দেবো? মাথা ঠিক আছে আপনাদের? আর কি উপলক্ষে দাওয়াত?”