_“তো উমরান! বউকে নিয়ে সেদিন ডাক্তার দেখিয়ে এসেছ শুনলাম। কী সমস্যা, আর উন্নতি আসতে কত সময় যাবে - এসব কিছু বলেছে ডাক্তার?”
_“কোনটার কথা বলছেন আঙ্কেল? ডাক্তার তো দুটো সমস্যা নিয়ে দেখালাম।”
_“হ্যাঁ দুটোর কথাই বলছি।”
_“রিল্যাক্টেশন ঠিকঠাক হতে কতদিন লাগবে জানালো? আর বউয়ের অতীত মনে পড়ে না কেন, এ নিয়ে কিছু বলেছে? সব মনে পড়তে কতদিন সময় যাবে?”
_“চেষ্টা চালিয়ে গেলে একসময় সব ঠিক হবে এটুকুই। এক্স্যাক্ট টাইমটেবল ধরে দেয়নি ডাক্তার।”
খেতে খেতে কথা বলছিল তারা। উমায়রার শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনের প্রশ্নে জবাব দেয় উমরান।
_“সাইকোলজিস্ট কী বলেছে? ট্রমার কারণেই সব ভুলে গেছে?”
উমায়রার শ্বশুরের এই প্রশ্নে চোখ তুলে তাকায় সে। এক নজর পাশে স্ত্রী-কন্যার দিকেও তাকালো। শ্রেয়সী নিজের পাত থেকে ডিমের কুসুম অল্প করে খাইয়ে দিচ্ছে উষশীকে। এদিকে মনোযোগ নেই তার। আদুরে কণ্ঠে মেয়েকে খাওয়ানোতেই ব্যস্ত সে। উমরান জবাব দেয়,
_“আপাতত ট্রমার কারণটাই ধরে নিচ্ছি। এর বেশি নিশ্চিত বলতে পারেনি কিছু।”
আরও কিছু গল্পগুজব আর কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সকলের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো।
সেদিন সাইকোলজিস্ট দেখানোর পর ডাক্তার শ্রেয়সীর সব ভুলে যাওয়ার কারণ হিসেবে অন্য কোনো সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে উমরানকে। শুধুমাত্র ট্রমার কারণে তার এভাবে সব ভুলে যাওয়া তেমন গ্রহণযোগ্য লাগেনি ডাক্তারের কাছে। কারণ তীব্র মানসিক আঘাত কিংবা মন ভাঙার মতো কিছু ছিল না যে ট্রমা-সম্পর্কিত অ্যামনেশিয়ার সম্ভাবনা হবে। অথবা হলেও স্মৃতিগুলো বেশিতে ঝাপসা হওয়ার কথা শুধু। কিন্তু শ্রেয়সী সবটা ভুলে বসে আছে। তাই সেশনে তার সাথে সব রকম কথাবার্তা বলার পর ডাক্তার ট্রমা ছাড়াও অন্য কোনো কারণ থাকার সম্ভাবনা আছে - এমনটা জানায়। কিন্তু কারণটা কী সেটাই নিশ্চিত নয়, আর এ নিয়ে কোনো ধারণাও করতে পারছে না। উমরান কিছুদিন আগের নিউরোলজিস্টের পরীক্ষা করা সব রিপোর্ট দেখিয়েছে। অস্বাভাবিক কিছুই দেখেনি ডাক্তার। তাই নিশ্চিত না বলে ধারণা থেকেও কিছু মাথায় আনতে পারছে না। এ কারণে উমায়রার শ্বশুরের জানতে চাওয়ায় সেভাবে কিছু জানালো না সে।
______
তখন বাবা-ছেলে, অর্থাৎ উমরান আর ওলিউল্লাহ সাহেব - নিজেদের হাসপাতাল থেকে ব্যবসায়িক কোনো কাজে যাচ্ছিল। উমরান ড্রাইভ করছে। ফোনে কারো কল আসছে শুনে হাতে নিয়ে দেখলো কর্নেল কিবরিয়া স্যার। উমরান স্বাভাবিকভাবেই রিসিভ করলো তা।
_”“হ্যালো উমরান?”
_“জি স্যার, আমি বলছি। কোনো সমস্যা হয়েছে? এই সময় তো ক্যাম্পে থাকার কথা।”
_“আর বলো না। ক্যাম্পেই আছি। তবে একটু ঝামেলায় পড়ে গেলাম মেয়েটাকে নিয়ে। তোমার সাহায্য লাগতো।”
মেয়ের কথা বলায় কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়ে তার। কোন মেয়ের কথা বলছে বুঝল না। আর ঝামেলাই বা কেমন? তবে খুব বেশি না ভেবে এক পলক পাশে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
_“জি স্যার, কী ঝামেলা আমায় বলুন? আমি যথাসাধ্য হেল্প করছি।”
_“আমার মেয়েটাকে নিয়ে ঝামেলার শেষ নেই। সেদিন ওখানে এক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো ঢাকার পাবলিক থেকে এডমিশন ক্যান্সেল করে। আমি চেয়েছিলাম কোনো বাসা ভাড়া নিয়ে রাখতে। সে বললো হোস্টেলে থাকবে বাসায় না। বুঝিয়েছিলাম যে ওখানে মানিয়ে নিতে পারবে না। ওখানের খাবারদাবার ওর সাথে যাবে না। জেদ ধরে ওখানেই গেলো। এখন দুদিন না হতেই ফোন এসেছে - ওখানকার খাবারদাবার তেমন খেতে পারছে না। যা খেয়েছে, ওতেই অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। এখন হঠাৎ তো এভাবে যেতে পারছি না। মেয়ে মানুষ- যেকোনো পরিচিতকেও সহজভাবে একটু জানাতে পারছি না। তুমি যদি একটু গিয়ে দেখো। আমি কাল-পরশুর দিকে চলে আসবো।”
উমরান এক দৃষ্টে গাড়ি চালাতে চালাতে সব কথা শুনলো। বুঝেছে ঐ সারা মেয়েটার কথাই বলছে। তার যদিও ঐ মেয়ের অসুস্থতায় গিয়ে নিয়ে আসার ইচ্ছে জাগছে না। কিন্তু কর্নেল স্যার যখন বলছে অমান্য করা সম্ভব না। সে মানুষটাকে খুব মানে। উপরন্তু তার অবর্তমানে তার শ্রেয়সীর সবচেয়ে সুরক্ষিত আর নিরাপদ অভিভাবক।
_“জি স্যার, দেখছি বিষয়টা। আপনি ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিন।”
_“হ্যাঁ, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। একটু ডাক্তার দেখিয়ে এনো, আমি গতকালই আসছি।”
_“আরেহ বেয়াই সাহেব! এত অস্থির হবেন না। আপনি সব কাজ-কাম সেরেই আসুন। আপনার মেয়ে আমাদের বাড়িতে থাকুক ততদিন। বাইরের কারোর বাড়িতে তো আর থাকছে না। আপনার আরেক মেয়েরই বাড়ি। আপনি ব্যস্ততা মিটিয়ে তবেই আসুন। মেয়ে এখানে ভালো থাকছে - তার নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি।”
ফোন লাউডে থাকায় সব শুনছিলেন ওলিওল্লাহ সাহেব।
_“ওহ, বেয়াই সাহেবও আছেন নাকি? মেয়েটা যে হঠাৎ এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে বুঝতে পারিনি। একটু দেখবেন কী হলো। আর বাঁচালেন আপনারা। মেয়ে মানুষ তো - চিন্তায় থাকি।”
ওলিউল্লাহ সাহেব আশ্বস্ত করে নিশ্চিন্তে থাকতে বললেন। কথা শেষে ফোন কাটা হলো।
_“তুমি তবে ওকেই গিয়ে নিয়ে এসো। আর বাড়ি যাওয়ার আগে একবার হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ফেলো। ফুড পয়জনিং হয়েছে হয়তো। মিটিং এও তো একজনকে যেতে হবে। আমি ওখানেই যাই।”
উমরান সম্মতি জানায়। ড্রাইভারকে অন্য একটা কাজে পাঠিয়েছে তাই দুজনে একই কাজে যাচ্ছে বলে একসাথে বেরিয়েছিল। বাবাকে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় দিয়ে উমরান চলে গেল কর্নেল কিবরিয়ার পাঠানো ঠিকানা অনুযায়ী।
__________
উমায়রার শ্বশুর-শাশুড়ি তার চাচা-শ্বশুরের বাড়ি চলে গেছে। তার শ্বশুররা চার ভাই। একেকজন একেক জায়গায় থাকে পরিবার-সমেত। সবাই বিয়ে উপলক্ষে একত্রিত হয়েছে। তাই তারাও চলে গেল। উমায়রাও অনেকদিন পর তার পরিবারের সবার সাথে একত্রিত হয়েছে। তার উপর বড় দুর্ঘটনা, আর দুঃসময় পার করে একসাথে হয়েছে। তাই সে এখানেই থেকে গেল। বিয়ের সময় যাবে বাচ্চাদের নিয়ে।
শ্রেয়সী, উমায়রা আর তাহুরা চৌধুরী গল্প করছে ড্রয়িংরুমে। আরাবী আর উষশী পুঁইকে সাথে নিয়ে ফ্লোরে নরম কাপড় বিছিয়ে খেলছে চারদিকে খেলনাপাতা রেখে। এমির বাবার সাথে কোথাও বেরিয়েছে।
কলিংবেল বেজে উঠলে উষশী লাফিয়ে উঠল আনন্দে। বেল বাজা মানেই তো তার পাপা আসা। রাইমা গিয়ে দরজা খুললে সে চিল্লিয়ে পাপাকে ডাকে। তার সাথে পুঁইও ডানা ঝাপটে উঠে। আরাবী নিয়ে গেল বোনকে কোনোভাবে কোলে নিয়ে কুটুমুটু পায়ে।
উমরান সারাকে সাথে নিয়ে এসেছে। হাতে সারার লাগেজ। সে লাগেজ নিয়ে ঢুকতেই সবাই তাকালো। আরাবী আর উষশীকে দেখে,
_“আমার মা দুইটা চলে এসেছে? খেলছিল নাকি তারা?”
_“ইয়েস মামা। আমরা খেলছিলাম। ডিড ইউ ব্রিং চকলেট ফর আস?”
উষশীকে কোলে নিয়ে নিয়েছে ব্যাগগুলো রেখে। ভাগ্নির কথা শুনে উমরান তার গাল টেনে দিয়ে বলে,
_“ইয়েস মামা। আই ব্রট ইট। আমার মামা বাড়ি আছে আর আমি চকলেট আনবো না?” বলে পকেট থেকে বের করে দিল। আরাবী মিষ্টি হাসি দিয়ে থ্যাংক ইউ জানায়।
ততক্ষণে পেছন পেছন সারাও প্রবেশ করেছে। ধীর কদমে হাঁটছে সে। হাঁটাচলা দুর্বল আর চেহারা অন্ধকার মনে হলেও অসুস্থ মনে হচ্ছেনা। বসার ঘর থেকে উমরানের হাতে এত লাগেজ দেখে তাহুরা চৌধুরী উঠে এসেছিলেন। সারাকে দেখে উমায়রা আর শ্রেয়সীও উঠে এলো। স্বামীর পেছন পেছন বাড়িতে আকস্মিক সারার প্রবেশ খুব একটা ভালো প্রভাব ফেলেনি তার ওপর - তা বোঝা যাচ্ছে চেহারা দেখে। বাকিদের কপালেও কিঞ্চিৎ ভাঁজ।
_“সারা যে? ওকে কোথা থেকে নিয়ে এলি উমি?”
মায়ের প্রশ্নে একনজর পেছনে তাকিয়ে উমরান জবাব দেয়,
_“কিবরিয়া স্যার ফোন করেছিল। জানালো মেয়ে অসুস্থ, গিয়ে যেন নিয়ে আসি। তাই নিয়ে এলাম।” অস্বাভাবিক কিছু না বললেও কেমন গাঁ-ছাড়া জবাব শোনাল। সারা একনজর তাকায়। উমায়রা আর তাহুরা চৌধুরীকে তার এমন নির্লিপ্ত জবাবে একটু অপ্রস্তুত দেখালো।
উমায়রা হাসার চেষ্টা করে বলে,
_“ভালো করেছিস নিয়ে এসে। এসো সারা। ভেতরে এসো।”
_“কী হয়েছে হঠাৎ? অসুস্থ হয়ে পড়লে যে? এখন শরীর ভালো লাগছে?”
_“জি আন্টি। উনি ডাক্তার দেখিয়ে আনলেন মাত্র। আপনারা ভালো আছেন?”
উমরানকে এভাবে সম্বোধন করাটা তারা ভালো চোখে দেখল না। একনজর শ্রেয়সীর দিকে তাকায়। সে নীরবে দেখছে সব। তাদের জবাব না দিতে দেখে সারা তাকায়। শ্রেয়সীর দিকেই চোখ গেল,
_“তুমি ভালো আছ শ্রেয়সী?”
শ্রেয়সী একটু দূরে মেয়েকে আদর দিতে থাকা স্বামীর দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। তবে মুখে জবাব দিলনা।
_“আন্টি আপনারা কবে এলেন? আপুকে প্রথমবার দেখলাম।”
_“হ্যাঁ, আমিও তোমায় সামনাসামনি প্রথমবার দেখলাম। গত পরশুই এসেছি সবাই।” থেমে আবার বলে,
_“বাকি কথা পরে হবে, তুমি বরং আগে ফ্রেশ হয়ে নাও।” রাইমাকে বলে,
_“উনাকে নিয়ে গেস্টরুমে যান রাইমা। কী কী লাগে দেখবেন একটু।”
সারাকে নিয়ে উপরে চলে গেল রাইমা। উমরান নিজেও মেয়ে আর ভাগ্নিকে খেলতে দিয়ে রুমে চলে গেছে।
______
উমরান ওয়াশরুমে। শ্রেয়সী নিজেদের রুমে এলো। মেয়েকে খাওয়াচ্ছিল সে। ফিডার রুমে থেকে যাওয়ায় নিতে এলো উষশীকে বসার ঘরে রেখে।
কোথাও স্বামীকে না দেখে ওয়াশরুমে চেয়ে দেখল, হয়তো গোসল করছে। সে চোখ ফিরিয়ে প্রতিবারের ন্যায় আলমারি থেকে পোশাক বের করে বিছানায় রেখে দিল। তারপর ফিডারটা কোথায় রেখেছিল খোঁজে। মেয়েটা খেলতে খেলতে কোন কোনায় যে রেখে দেয়, খুঁজতেই আধঘণ্টা লেগে যায়। বালিশের নিচে, ড্রয়ারে, ড্রেসিং টেবিলে - কোথাও না পেয়ে অনেক খুঁজল। শেষে খেলনার বড় ঝুড়িতে খুঁজল। সব সরিয়ে সরিয়ে দেখে শেষে দেখা মেলে। নিয়ে উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই পিঠের খোলা অংশে অতীব ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ অনুভব করল। হঠাৎ এমন হওয়ায় গা শিউরে উঠে। তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে খুব কাছে উমরানকে দেখল।
_“কি সমস্যা? পানি লাগিয়ে দিচ্ছেন কেন গায়ে?”
উমরান তার গালে ভেজা হাত ছুঁইয়ে দিয়ে বলে,
_“এমনি।”
শ্রেয়সী হাত সরিয়ে দেয়,
_“আশ্চর্য! এমন করছেন কেন?” গাল থেকে পানি মুছে নিল সে বিরক্তিতে।
উমরান বিরক্তি উপেক্ষা করে তার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়,
_“কেমন করছি?”
শ্রেয়সী গালে হাত দিয়ে মুছে নিল সেই স্পর্শ। মুখে বিরক্তি টেনে বলে,
_“ভেজা গা নিয়ে কি শুরু করেছেন? গা মুছে পোশাক পরে নিন। আর পথ ছাড়ুন। কাজ আছে আমার।”
উমরান তার স্পর্শ মুছে নেওয়া জায়গায় অল্প করে কামড়ে দেয়। শ্রেয়সী আর্তনাদ করে ওঠে। উমরানের উন্মুক্ত বাহুতে তার নখ দেবে গেল। উমরান পাত্তা না দিয়ে দাঁত বসে যাওয়া ভেজা জায়গায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিল।
_“নিচে কাজ নেই তোমার। তোমার কাজ আমার সাথে।”
_“আছে। নিচে কাজ আছে আমার। পথ ছাড়ুন।” গা ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সরলো না, বরং আরও কাছে আসায় পেছাতে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকল তার। তা দেখে চোখ তুলে উমরানের দিকে তাকায়। মাথার চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। তার গায়ে শ্রেয়সীর হাত থাকায় সেটাও ভিজে যাচ্ছে। সে সরিয়ে নেয়, নিজেকে আরও সেটে নেয় দেয়ালে। ভেজা গায়ে লেগে থাকতে ভালো লাগছে না তার। উমরান তা বুঝে মাথা ঝাঁকিয়ে চুলের পানি দিয়ে আরও ভিজিয়ে দিল। শ্রেয়সী ঘাড় কাত করে চোখ কুঁচকে নেয়, হাতে সরানোর চেষ্টা জারি রেখে বলে,
_“উফ, দূরে সরুন তো। বলছি তো কাজ আছে আমার।”
_“মুখ অন্ধকার করে রেখেছ কেন? সারা মেয়েটাকে নিয়ে এসেছি তাই রাগ হয়েছে?” নরম কণ্ঠ তার। শ্রেয়সী জবাব দিল না। বরং বলে,
_“ভালো লাগছে না এভাবে। সরে দাঁড়ান।”
_“কিভাবে ভালো লাগবে বলো? আমি সেভাবে পজিশন নিচ্ছি।”
_“ফালতু কথা বলবেন না।”
_“ফালতু কথা? আমি তো কিভাবে দাঁড়ালে তোমার ভালো লাগবে তা জানতে চেয়েছি জান। অন্য কিছু বোঝাইনি।”
শ্রেয়সী লাজমিশ্রিত বিরক্তি নিয়ে তার চোখের দিকে তাকায়। উমরানও তার দিকে ঝুঁকে চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রেয়সীর তাকানোতে ভ্রু নাচায়।
_“সরে দাঁড়ান।”
_“সরব না।”
_“পথ ছাড়ুন।”
_“ছাড়ব না।”
_“নিচে আপনার মেয়ে কাঁদছে।”
_“কাঁদছে না। আমার মেয়ে জানে তার মাম্মা অভিমান করে আছে। তাই পাপাকে মায়ের অভিমান ভাঙাতে স্পেস দিচ্ছে।”
_“আমি কিন্তু এটা খুলে দেব এবার না সরলে।” শ্রেয়সীর ইঙ্গিত অনুযায়ী নিজের কোমরে কোনোভাবে ঝুলে থাকা তোয়ালের গিঁটের দিকে তাকালো। ওটা ছাড়া আর কিছু নেই আপাতত গায়ে। চোখ তুলে আবার শ্রেয়সীর দিকে তাকায়। আত্মবিশ্বাসী চেহারা শ্রেয়সীর।
_“খুলে দাও।”
শ্রেয়সীর কান লাল হয়ে এলো এমন নির্লিপ্ত সম্মতিতে। সে তবু সাহস জোগাড় করে বলে,
_“সত্যি সত্যি খুলে দেব কিন্তু।”
_“তো দাও না। আমিও তো বলছি খুলে দিতে। তোমার অদেখা কিছু নেই, আরও দেখতে চাইলে…” আর কিছু বলতে দিল না শ্রেয়সী। গাল চেপে ধরেছে নিজের কোমল হাতে। ক্ষীণ মিহি কণ্ঠে বলে,
_“চুপ করুন আপনি। কি শুরু করলেন আশ্চর্য! আমি কোনো অভিমান করিনি। আপনি পোশাক পরে নিচে আসুন খেয়ে নেবেন। আমিও যাচ্ছি। সেই কবে খাবার নিয়েছি উষির জন্য।”
উমরান গালের হাতটা সন্তর্পণে সরিয়ে হাতে নিল। কথা বলতে বলতে অনেক কাছে চলে এসেছে দুজনে। কোমরে হাত রেখে আরেকটু টেনে নিজের সাথে লাগিয়ে নিল। ঠোঁটে অল্প করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
_“তোমার অভিমান বোঝার ক্ষমতা আমার আছে মিসেস। শুনো, তোমার কর্নেল আঙ্কেল ফোন করে হঠাৎ বলল তার মেয়ে অসুস্থ, গিয়ে যেন নিয়ে আসি। মানা করাটা শোভা পায় না। তোমায় তো সব জানিয়েছি… কিবরিয়া স্যার, তোমার দীদুন - উনারাই তোমার জীবনের একমাত্র কাছের মানুষ ছিলেন। সেই কিবরিয়া স্যারকে কিভাবে মানা করতাম? উনাকে আমি বাবার পরে স্থান দিয়েছি অনেক আগেই। লাভ ইউ শ্রেয়সী। অভিমান রেখো না। তোমার স্বামী তোমারই।”
_“আমি মোটেও এসব কারণে অভিমান করিনি।” দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস বারি খাচ্ছে। শ্রেয়সী মাথা উচিয়ে অতীব নিকটে থাকা স্বামীর চোখে চোখ রেখে কথাটা বলল।
_“তাহলে? আমার উষির মায়ের চেহারাটা এমন অন্ধকার কেন?”
_“উষির পাপাকে অন্য এক আন্টি ‘উনি উনি’ করে ডাকলে উষির মায়ের ভালো লাগে না।”
_“কবে ডাকল?”
_“শোনেন নি?”
_“না তো! চারদিকে তিন তিনটা পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ রেখে আমি বাজে কণ্ঠের মেয়েদের কথা শুনবো নাকি?”
_“তাই? আমাকে গলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এসব বলে!”
উমরান হেসে উঠল। কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। শ্রেয়সী সে স্পর্শ গ্রহণ করল নীরবে।
_“হয়েছে, এবার পোশাক পরে নিন। দরজা খোলা। বাড়িতে অনেক মানুষ। আগের মতো শুধু আমরা নেই আর। যান যান।”
শ্রেয়সী যে কার কথা বুঝিয়েছে উমরান তা বুঝতে পেরেছে। সে নীরবে হাসল তার মনের অল্পস্বল্প হিংসে আর প্রটেক্টিভ স্বভাব দেখে।
________
শ্রেয়সী বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু দরজা পেরুতেই সারার দেখা পেলো। দেখে তো মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ হলো দাড়িয়ে আছে। শ্রেয়সী কাছে গিয়ে চোখে চোখ রেখে তাকায়,
_”তুমি? কিছু লাগবে সারা?”
সারার চোখ তার গালে বসে যাওয়া দাঁতের ছাপে। সোজা কথায় লাভবাইট। যেটা একটু আগে শ্রেয়সীর স্বামী তাকে দিয়েছে। “কিছু লাগবে?” প্রশ্নের জবাবে সারা একবার তার রুমের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে জবাব দেয়,
_”লাগবে।”
শ্রেয়সীর দৃষ্টি প্রশ্নাত্মক। সারা জবাব দেওয়ার আগে উমরান মাথা ঝাকিয়ে অল্প ভেজা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বের হয়ে এলো। বাইরে শ্রেয়সী আর সারাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে থেমে যায়। দুজনের দিকে এক নজর তাকিয়ে শ্রেয়সীর পাশে দাড়াল, হাত ধরে জানতে চায়,
_”কোনো সমস্যা শ্রেয়সী? ঠিক আছ?”
সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
_”ওহ, তাহলে এসো। নিচে যাই। উষি চিৎকার করছে খুব। চলো চলো।”
এ কথায় শ্রেয়সীর মনোযোগ ঘুরে গেলো সারার থেকে। নিজে দেরি করিয়ে এখন চলো চলো মারায়।
_”নিজেই তো দেরি করালেন। এখন আসছে তাড়াহুড়া দেখাতে।”
_”আচ্ছা সরি মিসেস। আমার মেয়ে এখন কাঁঁদতে শুরু করবে। তাড়াতাড়ি যাওয়া হোক প্লিজ।”
আরও অল্প স্বল্প কথা বলতে বলতে চলে গেলো দুজনে, সারাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। সে দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুধু দেখল। সে অতিথি, অথচ তাকে একটাবার কি সমস্যা জানতে চাইল না। বউকে নিয়ে চলে গেলো মেয়ে কাঁদছে তাড়াহুরো দেখিয়ে।