হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ২৬

🟢

------ ১ম অংশ ---------

অনামিকা,

মৌরির প্রিয় বান্ধবী। যে মৌরির অস্তিত্ব এখন আর এই পৃথিবীতে নেই। অনামিকাই নিজের প্রিয় বান্ধবীর প্রেমিকপুরুষ একজন বিধর্মী - এ কথা জানিয়েছিল তাকে। মৌরির প্রেমিক তুষারের পুরো নাম তুষার কায়ান। আধুনিকতায় মোড়ানো চিন্তাধারা আর চলাফেরা তার। মুসলিম প্রধান দেশে বিশেষ কোনো চিহ্নের মাধ্যমে কাউকে দেখে কোন ধর্মের তা বোঝা না গেলে যে কেউ মুসলিম ভেবে নেবে স্বাভাবিক। মৌরিও তেমনই ভেবেছে। কিশোরী বয়সে একজনের প্রেমে পড়েছে, সেই জন নিজেই প্রেমিক হওয়ার প্রস্তাব দিলে একসময় প্রেমও হয় তাদের।

কিন্তু সে তো আর জানত না যে সবার জীবনে প্রেম এলেও সেই প্রেমে পূর্ণতা হেঁটে হেঁটে আসে না। প্রেমে পূর্ণতা পেতে হলে লড়াই করতে হয়। লাজ, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সংগ্রাম করে যেতে হয় পরিবার, সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে। মৌরি খুব বোকা। প্রেমের জন্য প্রেমিকের কাছে ইজ্জত বিলিয়ে দিতে পেরেছিল, অথচ সেই প্রেমের ফল জিইয়ে রাখতে একটু লড়াই করে যেতে পারল না। নিজের ভুল উপলব্ধি করার পর প্রেমিককে নাহয় ধর্মের আগে রাখল না। কিন্তু প্রেমের নিষ্পাপ ফলটা টিকিয়ে রেখে তাকে সম্বল করে একটু সংগ্রামের মাধ্যমে বেঁচে থাকা যেত না? কিংবা প্রেমিককেই নাহয় জানাল সব সমস্যার কথা। কারণ পাপ থেকে পালাতে যে পথে গেল, সেটাও যে ঘোরতর পাপ। তার প্রেমিককে বলে নাহয় দু’জনে সম্মিলিত কোনো সিদ্ধান্তে আসত। কিন্তু মৌরি ওসব কিছু করল না। আগেও যেমন আবেগের বশে গর্হিত অপরাধ করেছে, নিজের ভুল উপলব্ধি করার পরও ফের সেই আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে সমাধানের পথ না খুঁজে মুখ লুকিয়ে পালিয়েছে।

যার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছিল, যার নামে প্রেমবিষ পান করে অল্পবয়সেই পাপের ঘড়া পূর্ণ করেছে, সেই ছেলেটাকে একবার নিজের সমস্যার কথা জানায়নি সে। দুনিয়ার থেকেও মুখ লুকিয়ে পালিয়েছে, সাথে নিজের প্রেমিক আর প্রেমচিহ্নের সাথে মস্ত বড় অন্যায় করেছে। অন্যায়ই তো! ভুল যখন দু’জনে মিলে করেছে, তখন সমাধানের দায়িত্ব কী করে তার একার হয়? পালালেও একসাথে পালাবে, লড়লেও একসাথে লড়বে। তারপর পূর্ণতা আসবে কি আসবে না সেটা পরের বিষয়। কিন্তু লড়তে তো হবে। তাহলেই তো সে একজন যোগ্য প্রেমিকা।

এখন যে প্রেমের জন্য সে নিজের ইজ্জত বিলাল, বাবা-মায়ের অযোগ্য সন্তান হয়ে রইল, ভাইবোনদের অযোগ্য বোন হয়ে রইল, মেয়ে হিসেবে নিজেকে কলঙ্কিত করল - সেই প্রেমেরই ব্যর্থ আর অযোগ্য এক প্রেমিকা মৌরি।

তুষারের ফেসবুক আইডির নাম “TuShar K’ayan”। মৌরির সাথে যুক্ত ছিল ফেসবুকে। সে এই নামে অস্বাভাবিক কিছু কখনো মাথায় আনেনি। সেখানেই তাদের যত প্রেমালাপ। কিন্তু তুষার মূলত বেশি সক্রিয় থাকত নিজের ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে। ফেসবুকে তার সক্রিয়তা বলতে মেসেঞ্জারে প্রেমিকার সাথে আলাপের সময়টুকু। এর বাইরে মাঝে মাঝে নিজের কিছু ছবি আপলোড দিতে মন চাইলে দিত, নাহয় নেই। মৌরির কোনো ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ছিল না বলেই মেসেঞ্জারে আলাপ করতো তারা।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও দুজনের আলাদা সাইটে সক্রিয়তার কারণে দু’জনের ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞাত রয়ে গেল। নাহয় নিশ্চিত সরাসরি জানতে না পারলেও কিছু হলেও চোখে পড়ত, আন্দাজ করতে পারত যে দু’জনে ভিন্ন ধর্মালম্বী। কিন্তু আফসোস, তা হলো না।

অনামিকা তখন নতুন নতুন ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খুলেছে। নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেই ফেসবুকে যারা যুক্ত আছে তাদের আইডি আপনা-আপনি সুপারিশে আসল। প্রিয় বান্ধবীর প্রেমিকের আইডি দেখে কৌতূহলবশত ঢুকেছিল প্রোফাইলে। আনমনে স্টক করতে করতে আপনা-আপনি বুঝে গেল এই সত্য।

তারপরও নানাভাবে যাচাই করে যখন দেখল তার সন্দেহে কোনো ভুল নেই, তখন কিছু না ভেবেই মৌরিকে জানিয়ে দিল এ কথা। যে আফসোস তার এক জীবনে বোধ হয় ফুরাবে না।

সেদিন আর কোনোপ্রকার যোগাযোগ করতে পারেনি অনামিকা মৌরির সাথে। কিন্তু সারাটা দিন প্রিয় বান্ধবীর মনের অবস্থা ভেবে চিন্তায় রইল। তাও অনামিকা কল্পনাতে আনতে পারেনি যে মৌরি আত্ম হ ত্যার পথ বেছে নেবে। কিন্তু তার মানসিক ভাঙনের কথা ভেবে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় ভুগছিল। মৌরির সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে পরদিন তাদের বাড়ি যাবে ঠিক করল। কিন্তু সকাল হতে না হতেই মৌরির ভাইয়ের ফোন আসে। জানতে চাইলো মৌরির পেটের বাচ্চাটা কার? অথচ অনামিকা তখনই জেনেছে যে তার বান্ধবী অন্তঃসত্ত্বা। মাথায় যেন বাজ পড়ল। সাথে এও জানল মৌরি আর বেঁচেই নেই। কালরাতেই স্বেচ্ছায় দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছে।

স্তব্ধ অনামিকা নিজেকে মৌরির মতোই অযোগ্য আর ব্যর্থ এক প্রিয় সখী উপলব্ধি করল। যে তার বান্ধবী প্রেমের মরণবিষ পান করেছে - জানতেই পারেনি। আর না তার বান্ধবী তাকে জানিয়েছে। ব্যর্থই তো সে - যেখানে নিজেকে বান্ধবীর কাছে একটা বিশ্বাস আর আরামের জায়গা হিসেবে উপলব্ধি করাতে পারেনি। যার কাছে সবচেয়ে গোপনীয় কথাও ভাগাভাগি করা যায়, জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে যার সাথে কথা বলে নিজেকে হালকা করা যায়- এমন বিশ্বস্ত জায়গা সে হয়ে উঠতে পারেনি। আর না সে ঐ খবর শুনে নিজের বান্ধবী কতটা ভেঙে পড়বে তা আন্দাজ করতে পেরেছে।

হঠাৎ করে নিষ্ঠুর এক সত্য জানা মাত্র খবর পাঠিয়ে দিল। সে যদি একটু ভেবে চিন্তে, সামনাসামনি দেখা করে, প্রিয় সখীকে মানসিকভাবে আরেকটু শক্ত করে এই সত্য জানাত… বা যদি আস্তে ধীরে নিজেই যাতে উপলব্ধি করতে পারে এমনভাবে তুষারের সত্য তার সামনে আনত - তাহলে আজ তার প্রাণের সখী বেঁচে থাকত।

সেই হঠকারি একটা সিদ্ধান্তের আফসোস অনামিকার এক জীবনে কখনো মিটবে না।

_____

_“ভাইয়া, এটা নাও। মৌরি আপুর বান্ধবী অনামিকা এটা তোমাকে দিতে বলেছে।”

অর্ণব বাইরে থেকে এসে একটু আগেই বসার ঘরে সোফায় বসেছে। ফোনে কিছু একটা দেখছিল মনোযোগ দিয়ে। তূর্ণা পাশে এসে বসেছে তা চোখে পড়েছে। কিন্তু ওর বলা কথাটা শুনে চট করে তাকালো। তূর্ণা হাতের সাদা কাগজের চিরকুটটা অর্ণবের দিকে এগিয়ে রেখেছে। সে তাকাতেই চোখের ইশারায় নিতে বোঝায়।

_“কি হলো? নাও? তোমার জন্য চিরকুট পাঠিয়েছে সে।”

অর্ণব আসলেই ঠিক শুনেছে বুঝে সাথে সাথে জানতে চায়,

_“ওর দেখা কোথায় পেয়েছিস তুই?”

_“কোচিং থেকে ফেরার সময় দেখা হয়েছিল। আপুটা এই খাম আমার হাতে দিয়ে বলেছে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে।”

_“কি লেখা আছে এতে?”

_“আমি কি জানি! দেখিনি তো। আরেকজনের প্রেমপত্র আমি কেন পড়বো?”

_“এটা প্রেমপত্র তোকে বলেছে ঐ মেয়েটা?” তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার।

তূর্ণা বলে,

_“পাগল তুমি? ওসব আমাকে বলবে? লজ্জা পাবেনা ভবিষ্যৎ ননদের সামনে?” রসিকতা মিশ্রিত কণ্ঠ তার।

_“থাপড়ে দাঁত ফেলে দেবো বেয়াদব। এসব ফালতু কথা কোথা থেকে শিখেছিস? চুলপাকনা কথা আরেকবার মুখে আনলে চেহারার নকশা বদলে দেবো।”

ধমক শুনে তূর্ণা একটু গুটিয়ে গেলো। সে ভেবেছিল অনামিকার চিরকুটটা যত্ন করে কাউকে জানানো ছাড়া অর্ণবের কাছে পৌঁছে দিলে খুশি হবে তার উপর। আশকারা পেয়েছে এমনটাই ভেবে নিয়েছে মনে মনে, এই সুযোগে কিছুমিছু চেয়ে নেওয়া যাবে ট্রিট হিসেবে। কিন্তু উল্টো ধমক দেওয়ায় বুঝলো তার ভাবনায় ভুল আছে।

_“আচ্ছা, আর হবে না। তুমি চিরকুটটা নাও। দেখবে অনামিকা আপুর বার্তাগুলো পড়ে তোমার মুড একদম ফুরফুরে হয়ে যাবে।”

অর্ণব কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। অনামিকা চিরকুটে কি লিখেছে তা সে জানে না। তবে নিজে খুলে পড়তে ইচ্ছে করলো না তার।

_“ওটা খুলে পড়।”

_“আমি পড়বো?” খানিক অবাক কণ্ঠ তূর্ণার।

_“কানে কম শুনিস?”

_“আচ্ছা, পড়ছি।” খুশিই হলো সে। কি লেখা আছে তা পড়ার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল তার। সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করল না।

খুলে পড়তে শুরু করলো,

_“প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিই আপনার বোনের মাধ্যমে এভাবে চিরকুট দেওয়ায়। কিন্তু আর কোনো উপায় আপনি রাখেন নি, অর্ণব। ফোনকল রিসিভ করেন না, মেসেজ দিলে সিনই করেন না। আমি জানি আপনি আমার প্রতি খুব বিরক্ত। কিন্তু এইবার আসলেই দরকার ছিল আপনার সাথে যোগাযোগ করাটা। অনেক ভেবে চিন্তে তূর্ণাকে দিয়ে চিরকুটটা পাঠালাম।

সেদিন মৌরি (লিখে কেটে দেওয়া), মানে শ্রেয়সী আমার কাছে ফোন দিয়ে সবটা জানতে চাইছিল। ঐ বাড়িতে নিজের আগের ছবি দেখে সন্দেহ হয়েছিল ওর। আমি আপনার সাথে কোনো কথাবার্তা ছাড়া জানাতে চাইনি। কিন্তু ওর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। পাগলের মতো করছিল তখন, তাই জোরাজুরিতে আর না বলে পারিনি। আমি ওর মৌরি পরিচয় যে মিথ্যা এ কথা জানিয়ে দিয়েছি অর্ণব। আমাকে ক্ষমা করবেন আপনার কথা রাখতে পারিনি। কিন্তু ওর অবস্থা দেখে না বলে পারিনি। পরবর্তীতে অন্য কারো কাছে এসব আমিই জানিয়েছি শুনলে আবার আমাকে ভুল বুঝবেন আপনি তা জানি। তাই নিজেই জানিয়ে দিলাম। আমি আবার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনার কথা রাখতে না পারায়। দুঃখিত আমি!

এবার, প্রসঙ্গের বাইরে কিছু বলি? সুযোগ পেয়ে নিজেকে আটকাতে পারছিনা। এর জন্যও ক্ষমা চেয়ে নিই আগেভাগে।

আপনি খুব খারাপ, অর্ণব। খারাপ একটা ছেলে আপনি, একটা বার আমাকে বুঝতে চান না। ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়ে নিলেন, অথচ আমার অনুভূতিগুলো বুঝলেন না। আপনার কাছে যতটা অবজ্ঞা-অবহেলা পেয়েছি, তা আমি পুরো জীবনে আর কখনো কারো কাছে পাইনি, বিশ্বাস করুন। তাও আপনাকেই ভালো লাগে। কেন বলতে পারেন? আপনাকে না ভেবে পারিনা একেবারেই। একটু বিবেচনা করলে কি হয়, অর্ণব?”

বিস্মিত কণ্ঠে মনোযোগ সহকারে পুরো লেখাটা পড়লো তূর্ণা। অর্ণব শান্তভাবে বসে আছে। এতদিন ভেবেছিল বোনকে তার স্বামীই সব জানিয়ে দিয়েছে। অনামিকা জানাতে পারে এ কথা মাথায় আসে নি। তবে তাও খুব একটা বিরূপ মনোভাব আসলো না এবার ওর প্রতি।

কিশোরী বয়সে মৌরির সাথে যখন এ বাড়ি আসতো, তখন থেকেই অনামিকা তাকে পছন্দ করতো। তাই বারবার এড়িয়ে যেতো। কারণ অর্ণবের দিক থেকে বোনের প্রিয় বান্ধবীর প্রতি কোনো অনুভূতিই ছিল না।

প্রথমবার অনামিকার সাথে বসে দীর্ঘ সময় কথা বলেছিল মৌরির মৃত্যুর পরদিন। ক্যাফেতে বসে মৌরির প্রেমের সম্পর্কটা নিয়ে যতটা পারে জেনে নিয়েছে। অনামিকার যা কিছু জানা ছিল না, সেসবের জন্যও চাপ দিয়েছিল। মাথা গরম ছিল তখন অর্ণবের। প্রিয় বান্ধবী হয়ে বান্ধবীকে ভুল পথে যাওয়া থেকে আটকাতে পারেনি, সবটা জেনে সাপোর্ট করেছে - এসব ভেবে ক্ষোভ ছিল অনামিকার উপর। তার উপর বারবার মৌরির প্রেমের গভীরতা এতটা বেড়েছে তা জানতো না বলে অস্বীকার করছিল।

তবে পরে আস্তে আস্তে অনামিকার প্রতি তার ক্ষোভ অহেতুক ছিল তা বুঝতে পারে। তাই আরেকবার দেখা করে তার সাথে কথা বলে ক্ষমা চেয়ে নেয়। অনামিকা মৌরির বিষয়ে সব যেহেতু জানে, তাই ওর কাছে লুকানোর মানে হয় না। এ কারণে শ্রেয়সীর বিষয়ে সবটা বলেছে তাকে।

এমনকি তার সহযোগিতাও চেয়েছে। প্রিয় পুরুষের আবদার ফেলেনি অনামিকা। তখন এটাকে নিজের প্রতি সম্মতিসূচক ইঙ্গিত ভেবে অর্ণবের সাথে কথা বলতে চাইতো। ফোনকল, মেসেজ - সবভাবে যোগাযোগের চেষ্টা ছিল। অর্ণব এতে তিতিবিরক্ত। তাই এড়িয়ে যায় বারবার। যার ফলস্বরূপ আজকের এই চিরকুট।

_____

শ্রেয়সী আর উমরানের মেয়েকে নিয়ে দিনগুলো ভালোই কাটছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত তখন। উষশী বিছানায় বসে বসে খেলছে বেবিটয় নিয়ে। উমরান সারাদিন বাইরে ছিল। সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে এখন শুয়েছে একটু। উষশী খেলতে খেলতে কখনো পাপার গাঁঁয়ের উপর উঠে, আবার নামে। পাপার গলায় ছোট ছোট আঙুল ছুঁইয়ে কাতুকুতু দিতে চায়। কিন্তু সাড়া না পেয়ে বিরক্ত সে।

_“আপ্পা, পা পা… তু, তু!!” গালে তুলতুলে হাত রেখে ডাকে সে। অর্থাৎ চোখে চোখ রেখে তার সাথে কথা বলার আহ্বান।

উমরান চোখ না খুলে তাকে অকস্মাৎ দুহাতে জড়িয়ে বুকে উপরে শুইয়ে দেয়। গালে আদর একে দেয়।

_“পাপা একটু ঘুমাবে কলিজা। তুমি ঘুমাবে পাপার সাথে?”

_“আন্না এনা না না…”

উষশী গাঁ বাকায়। সে ঘুমাবে না। অর্থহীন শব্দ করে বোঝায় সে পাপার সাথে খেলবে। ব্যাস, বুকে বসিয়ে কাতুকুতু দিতে দিতে, নানাভাবে আদর দিয়ে মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হলো সে।

বালিশের পাশে রাখা তার ফোনটা এর মধ্যে টুং টাং শব্দ করে উঠলো। মেয়ে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় উমরান খেয়াল করলো না। শ্রেয়সী বাইরে থেকে রুমে আসে, পুঁইকে কিছু দানা পানি দিয়ে এসেছে। হাতে প্লাস্টিকের বক্স ধরণের একটি ধারায় সব উষশীর খেলনা। না খেললেও সব খেলনা ঢেলে চারপাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখার বদ অভ্যাস উষশীর। ওগুলো নিয়ে খেলবে না, আবার ঢুকিয়ে ফেলতে চাইলে কাঁদবে।

সব গুছিয়ে এনে একপাশে রেখে দিলো সে। বাবা-মেয়ের পাশে বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেয়। সময় দেখতে পাশ থেকে স্বামীর ফোনটা হাতে নিলো। দেখে রেখে দিতে গিয়েও থেমে যায়, কিছুক্ষণ নীরবে সময় লাগিয়ে দেখল।

তারপর বেশি না ভেবে ফোনটা রেখে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। বাবা-মেয়ে তখন খেলতে খেলতে খিলখিল করে হাসছে। পেটের উপর বুকের দিকে বসে আছে উষশী। উমরান পেটে মুখ গুজে আদর দিলেই সুড়সুড়ি লেগে হেসে উঠে সে।

শ্রেয়সী হাত বাড়িয়ে ডাকলো মেয়েকে,

_“মাম্মা… এদিকে এসো লক্ষী।”

_“এন্না নান না।” উষশী মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায়। খেলবে সে।

_“মাম খাবে না? মাম্মা মাম দিবো তোমাকে। এসো মা…” মাম দেবে শুনে সে হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে চলে এলো “মাম মাম মাম” শব্দ তুলে।

শ্রেয়সী নিজের পাশে শুইয়ে দেয় তাকে। উপরিভাগের একাংশের পোশাক সরিয়ে তাকে বুক ধরিয়ে দিলো। তারপর ওড়না দিয়ে ঢেকে দেয়। ডাক্তার দেখিয়ে সবরকম পরামর্শ নিয়েছিল তারা। তখন থেকেই সময়ে অসময়ে সুযোগ পেলেই উষশীকে বুক ধরিয়ে রাখে। যদিও ঠিকঠাক চুষ ‘তে জানে না, কিন্তু আস্তে আস্তে শিখে নেবে একদিন। উষশী মাঝেমাঝে অনীহা প্রকাশ করে। কিন্তু শ্রেয়সী ফল দিয়ে কিডস জেলি বানিয়ে রেখেছে। ওভাবে বুকের মধ্যে থাকলে তবেই কিছুক্ষণ পরপর সেই জেলি খাইয়ে দেওয়া হবে তা উষশী জানে। তাই জেলি মামের আশায় সে চলে আসে দুগ্ধহীন মায়ের বুকে।

উমরান মেয়ে মায়ের কাছে চলে যাওয়ায় ফোন নিয়ে কিছু করছিল। কিছুক্ষণ আগের পাঠানো সব মেসেজ দেখল। চিন্তার রেখা তার কপালে। শ্রেয়সী পানে চায়। একটু আগে ফোন নিয়েছিল সে, উমরান দেখেছে।

শ্রেয়সীও তাকেই দেখছিল। উমরান তার দিকে তাকাতেই চোখের ইশারায় জানতে চায়,

_“কি দেখছেন?”

উমরান ঠোঁট কামড়ে বউকে দেখে নিয়ে বলে,

_“কিছু বলবেনা?”

_“কি বলবো আমি?”

_“কোনো প্রশ্ন নেই?”

_“প্রশ্ন থাকবে কেন?”

_“মেসেজগুলো তো দেখেছ।”

_“তো?”

বিরক্তি ফুঁটে উঠলো উমরানের চেহারায়। কাছে এগিয়ে আসে শ্রেয়সীর। সে কাত হয়ে শুয়ে আছে। মেয়েও তার মতো করে শুয়ে বুকে মুখ রেখে আছে। ওড়না দিয়ে ঢাকা। উষশীর পাশে এসে শ্রেয়সীর দিকে ঝুকে বলে,

_“ভুল বুঝে বসে আছ তাই না?”

চোখে চোখ রেখে সে জবাব দেয়,

_“ভুল বুঝবো কেন?”

_“তাহলে কোনো প্রশ্ন করছ না কেন?”

উমরানের চোয়াল শক্ত। তবু ললাটে চিন্তার রেখা। শ্রেয়সী স্বামীকে পূর্ণ মনোযোগে দেখে বলে,

_“সারা আপনাকে ওদের বাড়িতে কর্নেল আঙ্কেলের সাথে কোনো কারণে দেখা করতে গেলে তখন দেখতো। আমিও ছিলাম না। আলাদা অনুভূতি ওর আপনাকে দেখে। আমার মেয়েকেও আদর করতে থাকে কাছে পেলে। সবাই আপনার দ্বিতীয় বিয়ের কথা চিন্তা করছিল, এমন সময় সারার ওসব দেখে চেয়েছিল ওকেই আপনার বউ করে আনতে। তাইতো?”

উমরান উত্তর না দিয়ে শ্রেয়সীর মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে সে আবার বলে,

_“কি হলো? বলছেন না যে? মামণি, বাবা, আপু, সারা - এমনকি সারার মাও এতে সম্মতি দিয়েছিল তাই না?”

উমরান অতল সমুদ্র ন্যায় চোখের দৃষ্টি ফেলে বলে,

_“হ্যাঁ।”

_“আপনি রিজেক্ট করেছিলেন?”

_“না, প্রস্তাব আমি অব্দি আসতে দেইনি। সো রিজেক্টও হয়নি। এসব নিয়ে কথা হচ্ছে শুনার পর ওখানেই থামিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর আর এই নিয়ে কোনো কথা হয়নি আমার সামনে।”

_“ভালো।”

উষশী ওড়না তুলে নেয় নিজের উপর থেকে। একবারও জেলি দেওয়া হয়নি তাকে। আর থাকবেনা ওভাবে। গাঁ বাঁকিয়ে মাথা তুলে। উমরান শ্রেয়সীর উদাস কণ্ঠের বিপরীতে অকস্মাৎ ঝুঁকে তার গালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।

_“মন খারাপ করছ কেন? আমাকে বিশ্বাস হয় না? কোনো প্রস্তাব আসলেও আমি মেনে নিতাম?”

_“বিশ্বাস করি তো।”

_“আমার দিকে তাকাও।”

শ্রেয়সী তাকালো।

_“এবার বলো, বিশ্বাস করো?”

শ্রেয়সী পূর্ণ মনোযোগে গভীর চোখ জোড়া দেখে হালকা হেসে বলে,

_“করি বিশ্বাস, বিশ্বাস না করলে তো দেখেই রাগারাগী করতাম। কিন্তু ও কেন আপনাকে মেসেজ দিচ্ছে এখনো? আমি তো আছি এখন। তাও এমন করছে সারা?”

_“এই যে, এই প্রশ্নটা করলে? আর কোথায় করলে বিশ্বাস?” শ্রেয়সীর নাকের সাথে উমরানের নাক ছুঁয়ে যাচ্ছে। ভারী তার কণ্ঠ।

শ্রেয়সী তার গালে হাত রেখে বলে,

_“রেগে যাচ্ছেন কেন? প্রশ্ন করা মানেই অবিশ্বাস নাকি?”

_“নয়?”

_“উহুম।”

_“ব্লক করে দিয়েছ…”

_“হ্যাঁ, আমার স্বামীকে কেন প্রেমের… না, পরকিয়ার প্রস্তাব কেন দেবে আমার স্বামীকে?”

সাথে সাথে অধর দুটো বন্ধি হলো আরেক জোড়ায়। উষশী মায়ের ওপাশে রাখা জেলি বক্সটা পেতে বাবা-মাকে টপকে যেতে চাইছিল গাঁয়ের উপর দিয়ে। কিন্তু বাবাকে মায়ের সাথে এমন করতে দেখে কিছু পল দেখলো। তারপর বাবার মাথাটা ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু কিছু হলো না। সে দেখছে তার মাকে কামড়ে দিচ্ছে বাবা। উষশী হতবুদ্ধির ন্যায় কিছুক্ষণ চেয়ে শব্দ তুললো,

_“আপা, পা, পাপ্পা। না না। মাম্মা বেটা।” তার মা ব্যথা পাচ্ছে তাই এমন না করার অনুরোধ। বাবা ছাড়ছেনা দেখে নরম হাতের আঘাত হানলো পিঠে। উমরান ওকে কাঁদতে শুনে কিছু সময় পর ছেড়ে দেয়। শ্রেয়সী শ্বাস টানতে টানতে সামলালো, বালিশে মাথা ফেলে। উমরান গাঁয়ে মিষ্টি আঘাত হাঁনা হাত দুটো ধরে নেয়।

_“সরি আম্মা। মাই প্রিন্সেস। ভ্যাএএরি সরি। আর হবে না, প্রমিস। লক্ষী মা।” কান্না তুলতে চাওয়া কন্যাকে থামাতে ক্ষমা চেয়ে তার গালেও আদর এঁকে দিলো। উষশী বাবার মুখ খামচে দেয় রেগে।

_“উফফ, ব্যথা। উষির মাম্মাও ব্যথা, পাপাও ব্যথা।”

বাবাও ব্যথা পেয়েছে বুঝে একটু দমে যায় উষশী। পাপা ব্যথা পেলে সে কষ্ট পায়। তাই গালে হাত দিয়ে আদর করে দিলো।

------ ২য় অংশ ---------

অর্ণবের ছুটির মেয়াদ শেষ। কালই ফিরে যাবে মেডিকেলে। পারিবারিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ছুটি নিয়ে চলে এসেছিল। নয়তো সেমিস্টার শুরুর দিকের এই সময়ে ছুটি পাওয়া কিছুটা কঠিন তাদের জন্য।

সে সব গোছগাছ করে নিয়েছে। ব্যাগের চেইনটা লাগিয়ে বসতে না বসতেই ফোনে রিং হতে শুনলো। বিছানা থেকে হাতে নিয়ে দেখলো বন্ধুর কল। হয়তো কাল ফিরছে কিনা জানতে চায়। সে রিসিভ করে,

_”হ্যাঁ বল।”

_”কাল ফিরছিস তো? সেমিস্টার ক্লাস শুরু হবে কাল থেকে, থিওরি ক্লাস তো পেলিনা।”

_”সমস্যা নেই। কভার দিয়ে দেবো। কাল আসছি।”

কথা বলতে বলতে সে বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে দাঁড়ালো। থিওরিতে কি কি ছিল সেসব নিয়ে কথা বলছে। আনমনে আরও কিছুদূর যায়।

তূর্ণা সদ্য গোসল করে বেরিয়েছে। শীতের কামড়ে গা-হাত-পা কাঁপছে থরথর করে। শরীরে শাল জড়িয়ে মাথা পর্যন্ত ঢেকে নিয়েছে সে। দুহাতে মুখের সামনে আঁকড়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে এসে সোফায় বসলো। অর্ণবের মা ছেলে কাল চলে যাবে বলে কিছু শুকনো খাবার বক্স ভরে দিচ্ছে। অর্ণব যদিও মানা করে দেয় প্রতিবার। কিন্তু তার মা শুনলে তো!

_”তূর্ণা, যা তো বক্স দুটো অর্ণবকে দিয়ে আয়। ব্যাগ গুছাচ্ছে হয়তো। দিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। চেইন লাগিয়ে ফেললে নিতে গাঁইগুই করবে।” তাড়াহুড়ো কণ্ঠ অর্ণবের মায়ের।

_”ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেছে ভাইয়া। আসার সময় রুমের দরজা খোলা দেখেছি, ব্যাগপত্র গোছগাছ শেষ। আর নেবেনা। তুমি রেখে দাও এখানে। আমি খাবো ওগুলো, খাবার তো বরবাদ দিতে পারিনা।”

_”এক থাপ্পর লাগাবো, শুকনো খাবার সব। বরবাদ হতে যাবে কেন? তুই গিয়ে অর্ণবকে বল আমি ঢুকাতে বলেছি ব্যাগে। এত কথা কিসের?”

ধমক শুনে না চাইতেও বক্স দুটো হাতে নিয়ে উঠলো সে। চাদরটা ঠিকঠাক জড়িয়ে নেয়। বাইরে আওয়াজ শুনে সেখানেই গেলো।

_”ভাইয়া, বড় মা এগুলো দিয়েছে। বলেছে ব্যাগে ঢুকাতে।”

অর্ণব তখনও ফোনে কথা বলছে। পেছন থেকে কথাটা শুনে তাকায়। হাতের দিকে তাকিয়ে বক্স দুটো দেখলো। মা পাঠিয়েছে। সে চোখের ইশারা করে বলে,

_”রুমে গিয়ে ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখ। মাঝের বড় পার্টে সবার উপরে রাখবি। চেইন ঠিকঠাক লাগিয়ে দিস।”

_”আচ্ছা।”

তূর্ণা চলে গেলো। গিয়ে যেমনটা বলেছে তা-ই করে আবার ফিরে আসে। ধীরে ধীরে হেঁটে অর্ণবের পাশে এসে দাঁড়ায়। অর্ণব তখনও ফোনে কথা বলছে। তাকে পাশে এসে দাঁড়াতে দেখে একনজর তাকায়। তূর্ণার হেলদোল নেই। দাঁড়িয়ে থাকে সে। দুহাত ঘষছে শীতের ঠাণ্ডায়। গোসল করে বের হওয়ার হাত–পা সব বরফ হয়ে আছে। অর্ণব পাঁচ মিনিট পর কথা শেষে ফোন কাটল।

প্রথমে কোনো কথা বললো না দুজনে। অর্ণব জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি তারা। কোণা চোখে পাশের সদ্য স্নানসারা রমণীকে দেখে অর্ণব। ল্যাভেন্ডার ফ্লেভার বডি ওয়াশের একটা সুঘ্রাণ আসছে। প্রিয় রমণীর অঙ্গ হতে নাকে আসা ঘ্রাণ মাতাল করা হয়, তা উপলব্ধি করতে পারলো অর্ণব। সে পকেট হতে হাত বের করে, তূর্ণার অল্প ঘষতে থাকা দুহাতের একটা সন্তর্পণে নিয়ে নিজের সাথে জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। তূর্ণা সাথে সাথে তাকালো, তবে অর্ণবের দৃষ্টি তখন সম্মুখে। তাকে নির্লিপ্ত দেখে সে সামনে ফিরলো।

_”অর্ণব ভাইয়া…?”

_”হু!!”

_”কাল বিকেলে আমায় কেন নিয়ে গেছিলে? আমার তো কোনো দরকার ছিলনা ওখানে।”

_”অনামিকার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক আছে মনে হয়নি তোর ঐ চিরকুট পড়ে?”

_”হয়েছে তো! আমি ভেবেছিলাম তোমাদের মধ্যে মান–অভিমান হয়েছে তাই অনামিকা আপুর ফোন রিসিভ করছিলে না।”

_”তারপর ওখানে গিয়ে কি মনে হলো?”

_”কি মনে হবে!! বুঝলাম অনামিকা আপু তোমাকে পছন্দ করে, কিন্তু তুমি করো না। তাই সে ফোনকল কিংবা মেসেজ দিলে বিরক্ত হও।”

_”মানে আগের ভুল ভেঙেছে?”

_”হ্যাঁ, সব তো দেখলাম। ভাঙবেনা?” কথাটা বলে অর্ণবের দিকে তাকায়।

_”এজন্যই নিয়ে গেছি।”

তূর্ণা বুঝল না। দ্বিধান্বিত চোখে তাকায়। অর্ণব জবাব দেওয়ার দরকার মনে করল না হয়তো।

তূর্ণা হঠাৎ প্রশ্ন রাখে,

_”মৌরি আপু কোথায় ভাইয়া?”

অর্ণব সাথে সাথে ফিরলো। প্রশ্ন রেখে স্থির চোখে চেয়ে আছে তূর্ণা। ঐ চিরকুট পড়ে শুধু অনামিকা আর অর্ণবের প্রেম না, আরও কিছু বিষয় মাথায় এসেছে। অনামিকাও অন্য চেহারার মৌরি যে, তূর্ণার বোন মৌরি নয় এ কথা জানতো। চিরকুটে স্পষ্ট লেখা ছিল। বিকেলে তাকে নিয়ে হঠাৎ বের হয় অর্ণব। একটা ক্যাফেতে গিয়ে বসে। একটু পর দেখল অনামিকা এসেছে। অনামিকা অর্ণবের সাথে তূর্ণাকে ওখানে আশা করেনি তা তার চেহারাতেই স্পষ্ট ছিল। তাই তূর্ণার ইতস্তত লাগে। সেও বুঝেছে অর্ণব মূলত অনামিকার সাথেই দেখা করতে এসেছে। ওদের প্রেমিক–প্রেমিকার মাঝে নিয়ে আসায় সে অপ্রস্তুতবোধ করছিল। উপরন্তু আলাদা কোনো অনামিকা অসন্তোষ না দেখালেও, তাকে যে এখানে আশা করেনি - তা বুঝে আরও গুটিয়ে যায় তূর্ণা। একবার অর্ণবকে কানে কানে তাদের কপোত–কপোতীর মাঝে নিয়ে আসলো কেন জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু অর্ণবের অতিমাত্রার শীতল দৃষ্টির শিকার হতেই অনামিকার সাথে সৌজন্য কথা বলে সে চুপ মেরে থাকে পুরোটা সময়।

তারপর অনামিকা আর অর্ণবের এঁকে এঁকে সব কথোপকথন শুনে বুঝলো, তার মৌরি আপুর কিছু একটা হয়েছে, ঊষশীর মাকে সব সত্য অনামিকা জানিয়ে দিয়েছে। সাথে অনামিকা–অর্ণব প্রেমের সম্পর্কে নেই, বরং একতরফা ওদের বিষয়টা। আসার সময় কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে বকবক করলেও। ফিরতে সময় আর কোনো কথা বলেনি সে। কারণ তার মাথায় বোনের বিষয়টা ঢুকেছে গভীরভাবে। সেই প্রতিবারের ন্যায় বাইকে উঠে দুহাতে অর্ণবের পেট জড়িয়ে পিঠে মাথা এলিয়ে দেয়, আনমনে কিছু ভাবতে ভাবতে চলে আসে।

গতদিনের ভাবনা থেকে ফিরে তূর্ণা ফের প্রশ্ন রাখে,

_”কি হলো? বলছ না যে? আপু কোথায় ভাইয়া?”

_”নেই।” স্পষ্ট জবাব অর্ণবের।

_”নেই মানে?”

_”নেই মানে নেই। মৌরি নেই। মরে গেছে।” তূর্ণার চোখে চোখ রেখেই বলে সে।

_”অর্ণব ভাইয়া।” চিৎকার করে ধমক স্বরে ডাকে তূর্ণা,

_”এভাবে বলছ কেন?”

অর্ণব চোখ নির্লিপ্ত চোখে তাকায়,

_”তোর মৌরি আপু নেই তূর্ণা। কথার কথা বলছি না। মরে গেছে ও। এক বছর আগে। তুই যখন মামার বাড়ি ছিলি তখন। আত্মহত্যা করেছে মৌরি। বাঁচাতে পারিনি আমরা। মরে গেছে ও।”

তূর্ণা স্তম্ভিত নেত্রে চেয়ে রয়। পাথর বনে গেছে জমে। তবে দুচোখে অশ্রু জমতে দেখা গেলো। অবিশ্বাস্য লাগছে তার। টকটকে লাল হয়ে গেছে চোখ দুটো। কিছু বিষয় আন্দাজ করার পর ভেবেছিল মৌরি আপু কোনো ছেলের সাথে পালিয়েছে। তাই সবাই এই বিষয়টা এমন লুকিয়ে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু মৌরি আপু নেই আর, মরে গেছে - এমন কিছু মাথায় আনেনি সে একবারের জন্যও। টল–মলে, হতবাক চোখে চেয়ে সে বলে,

_”তুমি মিথ্যা বলছ। কারো সাথে পালিয়ে গেছে তাইনা? রেগে মিথ্যা বলছ?” অথচ তার মন বলছে মিথ্যা না, অর্ণব ভাইয়া মিথ্যা বলেনা। কান্না আসতে চাইছে ভেতর থেকে। ঠোঁট ভেঙে আসছে তার।

_”মিথ্যা বলছিনা। পালিয়েছে মৌরি, তবে কারো সাথে নয়, একা। বিধর্মী একটা ছেলেকে ভালোবেসে একা একা দুনিয়া থেকে পালিয়েছে তোর বোন।”

_”মিথ্যা বলছ তুমি, আমি জানি। মৌরি আপু কারো সাথে পালিয়েছে। মরে নি, মিথ্যা বলছ।”

শব্দ করে কেঁদে উঠে তূর্ণা। কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে একই কথা বারবার জপতে থাকে। তাকে নিয়ন্ত্রণহারা হতে দেখে অর্ণব হাত বাড়িয়ে কাছে টানে। বুকে মাথা টেনে শান্তভাবে বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তূর্ণা কোনো কথা কানে নিচ্ছে না। তার কান্নার স্বর ক্রমশ বাড়ছে। অর্ণবের মা, চাচী বাইরে চলে এলো তাকে বিলাপ করতে শুনে।

_”তূর্ণা, ভেতরে চল। এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে কাঁদছিস, মানুষজন শুনতে পেলে পাগল ডাকবে। ভেতরে চল।” অর্ণব

_”মৌরি আপু কেন চলে গেলো? কখন থেকে নেই আপু? তোমরা জানাওনি একবারও। আমার আপু বেঁচে নেই। কেউ বলোনি।” বলতে বলতে হেঁচকি উঠে যায় তার।

_”কিরে? এভাবে কাঁদছে কেন ও?”

_”কি হয়েছে তূর্ণা? দেখি ব্যথা পেয়েছিস?”

মা আর চাচী এসে মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে ঘাবড়ে গেলেন। প্রশ্ন করে অর্ণবের বুক থেকে তুলে ফিরিয়ে নিলো তূর্ণাকে। আবোল–তাবোল বলে কাঁদতে দেখে চোখের পানি মুছিয়ে বুকে আগলে নেন,

_”এভাবে কাঁদছে কেন ও? কি বলছে গালের ভেতর কিছুই তো বুঝতে পারছিনা। কিছু বলেছিস তুই?”

অর্ণব উত্তর দিল না। তূর্ণাকে কাঁদতে দেখে নিজেরই আদরের বোনের কথা মনে আসছে বারবার। তার উপর এই মেয়েটার কান্না সহ্য হয়না ইদানিং।

_”তূর্ণা মা, ব্যথা পেয়েছিস? মাকে দেখা, মলম লাগিয়ে দিলে চলে যাবে। এভাবে কাঁদতে হয় পাগলি?”

মায়ের কথায় তূর্ণা বহু কষ্টে স্পষ্ট করে বলে,

_”মৌরি আপু নাকি আর নেই। আপু মরে গেছে। তোমরা আমাকে জানাওনি কোনোদিন। কেন বলোনি? আমার আপু কেন মরে গেলো?”

মা, চাচী থেমে গেলো তার কথা শুনে। সান্ত্বনা বাণীও শোনা গেলো না আর। মেয়ের “কেন জানাওনি” প্রশ্নের জবাব আসেনা। কান্নার কারণ শুনে থমকে থাকে কিছু পল। তারপর অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বুঝল সেই জানিয়েছে এসব। ঢোক গিলে শুধু বুকে আগলে রাখলো মেয়েকে। তূর্ণার অভিযোগ আর কান্না নিয়ন্ত্রণহারা হচ্ছে ক্রমশ। পেছন থেকে অর্ণব বলে,

_”ভেতরে নিয়ে যাও ওকে। বাবা, চাচ্চু আসবে এখন।”

_”এভাবে কাঁদতে হয়না মা। ভেতরে চল। বাইরের মানুষ শুনলে কি বলবে? চল বড়মার সাথে।” তূর্ণা গেলো না। বোন নেই একবছর, কেউ জানায়নি। বিলাপ করতে করতে বড়মার থেকে সরে আসে সে।

_”তোমরা আমাকে জানাওনি কেন? আপুকে চলে যেতে দিলে কেন? কষ্ট পাচ্ছিল বুঝতে পারোনি তোমরা? ওকে আটকাওনি কেন কেউ?”

_”তূর্ণা। পাগলামি করছিস। তোর বাবা, আর বড় বাবা চলে আসবে এখন। এসব দেখলে বকা শুনবি। ভেতরে চল।” তার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তূর্ণা নিচে বসে গেছে। দাদীর মৃত্যুর খবর শুনেও বোধ হয় তার এতখানি কষ্ট লাগেনি। বয়স বাড়লে তাদের মৃত্যু সংবাদে মানুষ স্বভাবগতভাবেই তৎক্ষণাৎ কষ্ট অনুভব করলেও মন থেকে মেনে নিতে পারে। কিন্তু এমন অসময়ে আপন মানুষদের মৃত্যু। তূর্ণার যে কেমন লাগছে, কি অনুভব করছে - কিভাবে বুঝাবে কাউকে সে? বোনের ঐ চেহারাটা আর দেখবেনা। মানুষটাকে দেখেইনা বছর খানেক। বোনের অনুপস্থিতি ভীষণভাবে অনুভব করতো। কিন্তু সে বেড়াতে গেছে জেনে সেভাবে পাত্তা দেয়নি। কারণ ফিরে তো আসবেই। কিন্তু আসলো না। অন্য কাউকে এনে বললো সেই তার বোন। চেহারা বদলালেও ওটাই তো তার বোন, কিন্তু সেটাও যখন মিথ্যা জানলো সেদিন। তখন মৌরি আপু কোথায় এই চিন্তায় কিছুই ভালো লাগতো না। ভেবে নিলো কারো সাথে পালিয়ে গেছে। কিন্তু চোখের আড়াল কিংবা দূরত্ব থাকলেও, পৃথিবীতে তো আছে। তাই পালিয়ে গেছে বুঝেও এতটা কষ্ট লাগেনি। কিন্তু মারা গেছে, কথাটা মেনে নিতে পারছে না সে। একেবারেই পারছেনা। বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চাইছে। মৌরি আপু কিভাবে মারা যেতে পারে এভাবে?

কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়েছে সে। মা চাচী তুলতে চাইলেও উঠল না। শেষে অর্ণবের দিকে তার মা করুণ চোখে তাকালে, সেই বিলাপ করতে থাকা তূর্ণাকে কোলে নিয়ে ভেতরে চলে এলো। মা, চাচীও এলো পেছন পেছন।

মায়ের মতো বড় দুবোন তার। তারা নিজেরা ঝগড়া–বিবাদ করলেও, সবার ছোট বলে তূর্ণা দুজনের চোখের মণি। নিজেদের সাজের জিনিসপত্র দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া, হোমওয়ার্ক করে দেওয়া, খাইয়ে দেওয়া, তার আবদারে নিজেদের ভাগ ছেড়ে দেওয়া, বাড়ির বড়দের বকা–ধমক থেকে বাঁচানো — কি করতো না তার বোনেরা? মৌরি, তুলি- দুজনেই তো তূর্ণার ঢাল! কিন্তু সেই দুবোনের এক বোন পৃথিবীতেই নেই আর। তূর্ণা জানলোই না এ কথা এতদিন। কতটা কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যা করেছে তার বোন? আপুর কষ্টটা বাড়ির কারো চোখে পড়েনি? কেউ আটকাতে পারলনা!

_______

উমরানের বোনের পরিবারসহ তার বাবা-মা আসছে আজ লন্ডন থেকে। আরও দু’দিন পর আসার কথা ছিল। কিন্তু উমরানের বোন উমায়রার চাচাশ্বশুরের মেয়ের বিয়ে পড়েছে সামনে। তাই তাদের স্বপরিবারে চলে আসতে হচ্ছে। তার মায়ের চিকিৎসাও সম্পূর্ণ। তাই আর অপেক্ষা না করে চলে আসছে সবাই একসাথে। উমায়রা তার স্বামী, সন্তান আর শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে ফুলবাড়িতেই আসবে। ভাইয়ের বউ, সন্তান - কাউকে সে দেখেনি এখনো। নিজের সংসারের সবটা গুছিয়ে দেশে যে আসবে ভাইয়ের বউকে দেখতে, সে সময় হয়ে উঠেনি তখন। আর এরপর সবটা এলোমেলো হয়ে গেল। এখন তাই সবার আগে ফুলবাড়িতেই আসবে।

বাড়িতে উষশীর খেয়াল রাখা রাইমা নামের সেই মহিলাটি চলে এসেছে। এতগুলো মানুষ আসবে, অনেক রান্নাবান্না সহ ঘর গুছানোর কাজ আছে। শ্রেয়সী মেয়ে নিয়ে একা হাতে পারবে না। তাই রাইমাকে চলে আসতে বলেছিল।

দুজনে মিলে সবটা করছে। একটা নরম কাপড় বিছিয়ে ফ্লোরে, ওতে উষশীকে বসিয়ে দিয়েছে বসার ঘরে। পাশে পুঁইয়ের খাঁচাও রাখা। চারপাশে খেলনা নিয়ে খেলছে সে পুঁইকে সঙ্গে করে।

ব্যাস, দুজনের জন্য সহজ হলো রান্নাবান্নাসহ সবটা করা।

দুপুরের পরপর চলে এলো সবাই। উমরান কাজে ছিল, সেখান থেকেই গাড়ি নিয়ে চলে যায় এয়ারপোর্ট। বাড়ির অন্য গাড়িটাও বাবার ড্রাইভারকে দিয়ে আনানো। সেও এতদিন ছুটিতে ছিল। এখন মালিক আসায় কাজে ফিরেছে। রাইমাকে অবশ্য সবার চলে যাওয়ার পর কর্নেল কিবরিয়া ঠিক করে দিয়েছিল উষশীর দেখভালের জন্য। এবার থেকে ফুলবাড়ি আগের রূপে ফিরবে।

উমরান সকলকে সাথে নিয়ে ফিরল দুপুরের পরপর। তখন রাইমাসহ শ্রেয়সী সোফায় বিশ্রাম নিচ্ছে। সকাল থেকে কম ধকল যায়নি। উষশী মায়ের বুকে চুকচুক করছে, মাথার উপর ওড়না দিয়ে ঢাকা। বেল বেজে উঠলে সে ওড়না তুলে কোল থেকে তাকালো দরজার দিকে। নিশ্চয় পাপা এসেছে।

_“ওরা এসেছে বোধ হয়। আপনি গিয়ে দরজা খুলে দিন উষির মা। আপনাকে দেখলে খুশি হবে সবাই।”

রাইমার হাসিমুখে বলা কথায় শ্রেয়সী এক নজর তাকায়। তার একটু অন্যরকম লাগছে। এতদিন পর দেখবে শ্বশুরবাড়ির সবাইকে। শ্বশুর-শাশুড়িকে আগে পেলেও তার সেসব মনে নেই। কেমন না কেমন হয় সবার সাথে সামনাসামনি আলাপ হওয়ার পর। মনে মনে খুশি হলেও একটু ইতস্তত লাগছে।

_“হ্যাঁ, যাচ্ছি।”

আবার বেল বেজে উঠল। সে তাড়াতাড়ি পোশাক ঠিকঠাক করে উঠে পড়ে। উষশী কোল ছাড়েনি। চলল সাথে। দরজা খুলতেই সবার আগে দেখল মেয়ের পিতাকে—যার কোলে তিন-চার বছরের এক কন্যা শিশু। আর তার পেছনে একে একে সবাই। উমরানের মা-বাবা, উমায়রা, উমায়রার স্বামী-ছেলে, শ্বশুর-শাশুড়ি। সবাই তাকেই দেখছে। সে সালাম দিল হাসিমুখে।

_ “আপা, পা পাপা। আমাল পাপা।”

উষশী বাবার কোলে অন্য কাউকে দেখে অখুশি। সে প্রতিবাদ করে।

উমরান মেয়ের নাক টেনে দিল,

_“আমার মাম্মা, প্রিন্সেস রেগে আছে নাকি?”

_“আল্লাহ গো, এত কিউট এটা কিভাবে উৎপাদন করলি রে?”

উষশীকে তার ফুফু কোলে নিয়ে নিয়েছে। তার প্রশ্নের জবাব দেবে তার আগে শ্রেয়সীর দিকে তাকাল উমায়রা। গালে হাত দিয়ে, “মাশাল্লাহ” বলে।

তাহুরা চৌধুরী এগিয়ে এসে নাতনির গালে চুমু এঁকে দিলেন। শ্রেয়সীকে জড়িয়ে ধরলেন।

_“বউমা দেখি অনেক বড় হয়ে গেছে। আগের পিচ্চি পিচ্চি নেই আর। মেয়েকে সামলাচ্ছে একা একা।”

_“শ্রেয়সী মা, কেমন আছ? আমার নাতনি বেশি জ্বালায় নাকি?”

_“আলহামদুলিল্লাহ ভালো বাবা। আপনারা সবাই ভালো আছেন? আসতে অসুবিধা হয়নি তো?”

_“আমরা সেফলি চলে আসতে পেরেছি মা, নিশ্চিন্তে থাকো তুমি।”

_“মামা, এটা উষি?”

কোলে থাকা ভাগ্নির কথায় উমরান জবাব দেন,

_“ইয়েস মামা, শি ইজ উষি। ইউর সিস্টার।”

_“মেয়ে তো দেখি মা-বাবা দুইটা মিলে আধা আধা চেহারা।”

বোনের কথায় উমরান বলে,

_“এসব হিসাব পরে করিস। আগে ভেতরে চল। দাঁড় করিয়ে রাখবি নাকি সবাইকে?”

উমরানের কথায় সবাই ভেতরে আসল। শ্রেয়সী উমায়রার শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথা বলে তাদের সবাইকে নিয়ে ভেতরে এলো।

______

সবার আগে ফ্রেশ হতে গেল প্রত্যেকে। তাহুরা চৌধুরী এখন সুস্থ। পায়ে আর কোমরে আঘাত পেয়েছিল তখন। এরপর হাঁটা চলায় ব্যাঘাত আসে। এখন সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষে তবেই এসেছে। এতগুলো দিন পর নিজের সেই আপন নীড়, ওরফে তার বউমার ফুলবাড়িতে ফিরে এসে আবেগী হয়ে উঠেছেন কিছুটা। সবকিছু ভেজা নয়নে দেখলেন। নাতনিকে কোল থেকে নামতেই দিচ্ছেন না। ওলিওল্লাহ চৌধুরী অল্পক্ষণের জন্য নিতে পেরেছিলেন। আর কাউকে দেননি। কিভাবে কিভাবে যেন এত তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে চলে এসেছেন নাতনিকে নিতে! বাকিরা এখনো আসেনি বসার ঘরে।

উমায়রার সাথে তার স্বামী আরফাত, আর দুই সন্তানসহ শ্বশুর-শাশুড়িও এসেছে। তারা লন্ডন স্থায়ী। অনেক বছর ধরে ওখানে আছে। এমনকি উমায়রার প্রথম সন্তান এমিরের জন্মও ওখানেই হয়েছে, যার বয়স এখন ষোল। আর উমরানের দুই বছরের বড় উমায়রা।

_“তাহুরা, এবার আমাকে একটু দাও। আর কতক্ষণ নিয়ে বসে থাকবে। আমি একটু নিই দিদিভাইকে।”

তাহুরা চৌধুরী পাত্তা দিলেন না। নিজের মতো নানান ছন্দে ছড়া শুনাচ্ছেন নাতনিকে। উষশী আনন্দ পাচ্ছে সেসবে।

_“নান্না। আমি কি উষিকে একটু কোলে নিতে পারি?”

উমায়রার মেয়ে আরাবি ফ্রেশ হতেই নিচে চলে এসেছে বাবা-মায়ের আগে। তার বয়স এখন চার। ফোনে উষশীকে অনেক দেখেছে। ওখানে থাকতেই কোলে নেওয়ার ইচ্ছে জাগত বাচ্চাটিকে।

_“নিতে পারো তো নানুমণি। কিন্তু তুমি কোলে নেবে, আর নান্না ধরে রাখব ওকে?”

_“শিওর।”

কোলে নিল সে উষশীকে। উষশী কুটুমুটু নয়নে চেয়ে থাকল। হয়তো বাচ্চা একটা মেয়ে তাকে কোলে নিয়েছে কেন ভাবছে। দেখতে দেখতে গালে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিল আরাবির। আরাবি মিষ্টি করে হাসল সেই ইঙ্গিতে। তাকে ভালো লেগেছে ম্যাজিক মামীর মেয়ের। নানা-নানীর দিকে তাকায় সে। তাহুরা চৌধুরী ধরে রেখেছে। তার তাকানোতে ওলিওল্লাহ চৌধুরী হেসে বলেন,

_“নানুমণিকে দেখি উষি সোনার পছন্দ হয়েছে।”

_“ইয়েস। শি লাইকস মি, স্মাইলিং!! সি…?”

আরাবির ভাই এমির এলো। তাকে আলাদা রুম দেওয়া হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে নামছে। এসে সোফায় বসে।

_“সো, শি ইজ উষি। লুকস কিউট। হার মাদার ইজ টু।”

নাতনিকে কোলে হাঁটুর উপরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। বড় নাতির কথায় শুনে বলেন,

_“হবে না? মা-বাবা দুইটা মিলেই হয়েছে চেহারাটা। ওর মায়ের চোখ দুটো দেখেছ? মাশাল্লাহ। ছেলে আমার এমনি এমনি তো আর পাগল হয়নি।”

_“ওর গায়ে ডায়াপার আছে? আমায় একটু দাও তো নানু। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সব। কোথায় এত মানুষ দেখে কাঁদবে তা না।”

শ্রেয়সী রাইমার সাথে মিলে ডাইনিংয়ে খাবার প্রস্তুত করছে সবার জন্য। তারাও দুপুরের খাবার খায়নি সবাই আসলে একসাথে খাবে বলে। এমিরের কথাটা শুনে শ্রেয়সী ওখান থেকে জবাব দেয়,

_“উরুর দিকে ঘা হওয়ায় ডায়াপার পরাই না তেমন। তবে আজ পরিয়ে দিয়েছি। তুমি নিশ্চিন্তে নিতে পারো।”

এমির একটু বাচ্চাকাচ্চার বিষয়ে সংবেদনশীল, তা সে বুঝেছে। পনেরো-ষোল বছরের ছেলেটা খুব গুছানো-পরিপাটি দেখাচ্ছে। কথাবার্তা আর চালচলনও লন্ডনের মাটিতে জন্ম-লেখাপড়ার ছাপ আছে।

_“তোমার তো বাচ্চা পেলেই কাঁদানোর স্বভাব এমির। কোলে নাও, কিন্তু খবরদার আমার কলিজার নাতনিকে কাঁদাবে না।”

বলতে বলতে উষশীর গালে গাল ঘষে দিয়ে এমিরের কাছে দিয়ে দিলেন,

_“তোমার মেয়ে বাড়ি থাকতেই সাবধান করে দিয়েছে তার ভাতিজিকে যেন না কাঁদাই এখানে এসে। আমি তো জাস্ট কোলে নেব।”

এমির বোনকে কোলে নিল। তার স্বভাব -বাচ্চা দেখলেই কাঁদানো। যদিও নিজের বোনের ক্ষেত্রে ভিন্ন। কিন্তু অন্যদের বাচ্চা দেখলেই এমন করে ছেলেটা। তবে উষশীকে কাঁদাল না। আদর করে দিল আরাবির মতো। আরাবিও তার পাশে বসে উষশীর সাথে কথা বলে আদর করছে। আজ ভাগ্যক্রমে সকাল থেকে উষশীর মন-মেজাজ ফুরফুরে। নয়তো অচেনা কেউ নিতে চাইলেই ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠত।

তাহুরা চৌধুরী গেলেন পুত্রবধুকে সাহায্য করতে। শ্রেয়সী জায়গায় জায়গায় সবার সামনে প্লেট, চামচ সবটা দিয়ে রাখছে। শাশুড়িকে পাশে এসে দাঁড়াতে দেখে হাসল।

_“কিছু লাগবে মামণি? ক্ষুধা লেগেছে তাই না? এখনই হয়ে যাবে আমার। আর দু’মিনিট।”

_“আমার কিছু লাগবে না। তাড়াহুড়ো করো না। তোমাকে দেখছিলাম।”

শ্রেয়সী এক নজর তাকায়। মামণি তাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। হেসে হাতের কাজ চালিয়ে গেল।

_“তোমাকে এভাবে দেখে কি যে ভালো লাগছে, তুমি বুঝতেও পারবে না মেয়ে।”

মাথায় হাত দিয়ে কথাটা বলেন। শ্রেয়সী জবাব দেবে তার আগে নিজে আবার বলেন,

_“রিল্যাক্টেশনের জন্য সেদিন ডাক্তার দেখিয়েছিলে তাই না?”

_“হ্যাঁ মামণি। সেদিন তো গেলাম। তারপর থেকে সবকিছু নিয়ম মেনেই চলছি। খাবারদাবার, উষশীকে অনুশীলন করানো -সবটা।”

_“সাইকোলজিস্ট দেখাবে বলেছিল শুনলাম তোমার বাবার কাছে। ওটাও দেখিয়েছিলে সেদিন?”

_“হ্যাঁ ডাক্তার দেখিয়ে দেখলাম আমাদের বসিয়ে রেখেছে আরেকটা ডাক্তারের কেবিনের সামনে এনে আপনার ছেলে। জিজ্ঞেস করলে বলল সাইকোলজিস্টও আজই দেখাবো। আধঘণ্টা যাবত এটা-ওটা কত কী যে জানতে চাইলো ঐ ডাক্তার। এবার থেকে সপ্তাহে দুইবার করে নাকি যেতে হবে সেশনে। আমি উষশীর পাপাকে মানা করেছিলাম, শুনেনি। বলছে উনি থাকতেই শুরু করতে চান, যেন উনি সাথে থাকতে পারেন প্রথম দিকের সেশনগুলোতে। দু’মাসের ছুটি উনার তাই।”

_“হ্যাঁ, উমি থাকতেই শুরু করেছে, ভালোই হয়েছে। উষশীকেও তো দেখতে হবে। তাছাড়া প্রথমদিন উমি ছিল বলে তোমার তেমন আনইজি লাগেনি। নাহয় দেখতে ভয় লাগতো।”

শ্রেয়সী জানে তাহুরা চৌধুরী ভুল বলেননি। উমরান না থাকলে এত সহজভাবে অতো লম্বা সময় ধরে সেশনে মনোযোগ দিতে পারত না। উল্টো নার্ভাস হয়ে পড়ত।

উমায়রা তার স্বামী আর শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। আসতে আসতে জানতে চাইলো সে,

_“তো, উষশীর মা আমাদের সবার জন্য কি রান্না করলে আজ?”

_“রেঁধেছি তো অনেক কিছুই আপু। কিন্তু আপনাদের কেমন পছন্দ হয় সেটাই দেখার বিষয়। আমার রান্নার হাত খুব কাঁচা।”

_“নিশ্চিন্তে থাকো। আমরা তোমার হাতে আজ যা দেবে খেয়ে নেব। তোমার দিন আজ! আর আমাদের শত প্রত্যাশার।”

_“বউ আমার একটু আবেগী উষির আম্মা। আবেগে বলে ফেলেছে ওসব। আপনি আবার ওর কথা সিরিয়াসলি নিয়ে বিষ-টিষ খাইয়ে দিয়েন না কেমন? আমরা নিরীহ মানুষ।”

শ্রেয়সীর হাতে যা দেবে খেয়ে নেবে বলায় উমায়রার স্বামী আরফাত মশকরা করছে শ্রেয়সীর সাথে। একমাত্র শালা সাহেবের স্ত্রী কি না! শ্রেয়সী হাসল শুনে। ততক্ষণে উমরানও চলে এসেছে। সবাই বসে পড়লো।

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ২৬ গল্পের ছবি