সেদিন তাদের উপর হওয়া হামলার খবরটা যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশবাসীর সাথে সাথে উমরান-শ্রেয়সীদের চেনা-জানারাও এসব দেখেছে। তাদের ভিডিও কিংবা ছবিতে দেখে আত্মীয়স্বজনেরা চিনে নেবে এটা স্বাভাবিক বিষয়। তার উপর উমরানের পরিচয়ও উঠে এসেছিল সেখানে। তাই চেনা জানাদের তাদের সুস্থতা কিংবা হামলা হওয়ার কারণ নিয়ে কৌতূহল হওয়ারই কথা। তবে শ্রেয়সীর স্বজন-পরিজনের গণ্ডি সীমিত। কর্নেল কিবরিয়া চলে এসেছিলেন পরদিন সকাল হতে না হতেই, উমরানের কাছে সবটা জেনে নিয়েছেন তিনি। রেগে গিয়েছিলেন খুব, রিশাকে পুলিশে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল উনার। কিন্তু উমরানের তাকে হাজতে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না বলে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঠাণ্ডা করে নেন।
সেদিন উমরানের পরিবারের দিক থেকে পরিচিতদের আনাগোনাও হলো ফুলবাড়িতে।
একে তো শ্রেয়সীকে নিয়ে তাদের কৌতূহলের শেষ নেই। কারণ তাকে কেউ দেখেনি। চৌধুরীদের একমাত্র পুত্র চাকরির সুবাদে বান্দরবান গিয়ে সেখানেই মেয়ে পছন্দ করে বিয়ে করে নিয়েছিল। লোকবল জানানো হয়নি। এমনকি বাবা-মা আর একমাত্র বোনটা অব্দি উপস্থিত ছিল না। যে ছেলের জন্য বড় বড় বাড়ির যোগ্য মেয়েদের প্রস্তাব আনতো, অথচ তাহুরা চৌধুরী আর ওলিওল্লাহ চৌধুরী বারবার ফিরিয়ে দিতো ছেলের অসম্মতির কারণে। সে চাকরির সুবাদে এক জায়গায় গিয়ে কয়েকদিনেই মেয়ে পছন্দ করে বিয়ে করে নিয়েছে। অথচ তারা জানতো উমরান তাওসিফ নিজের মতো চিন্তাধারার এবং ব্যক্তিত্বের কাউকে খুজছে। আর নিজেই দেখেশুনে সেই কাউকে পছন্দ করে আনবে। যে কিনা তাকে বুঝবে, তার চাওয়া পাওয়া বুঝবে, আবার নিজেরটুকুও বুঝে নেওয়ার মতো মানসিকতার অধিকারী হবে। মোটকথা নিজের মতোই দৃঢ় ব্যক্তিত্বের যোগ্য কাউকে বিয়ে করতে চেয়েছিল বলেই তাদের আনা প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিতো।
সেই ছেলে অবশেষে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করলো। তাও কোনো লোক জানাজানি ছাড়া। আত্মীয় স্বজনেরা তো বিয়ের খবর জেনেছে যখন চৌধুরীদের পুত্রবধু অন্তঃসত্ত্বা হলো তখন। তাদের নাকি পরিকল্পনা ছিল বড় করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ের কথা জানানোর। কিন্তু পুত্রবধুর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাওয়ায় তা আর হয়নি। বিয়ের খবর আয়োজন করে জানাবে বলে গোপন রাখা গেলেও বংশপ্রদীপের আগমনী খবর চেপে রাখতে পারেনি তারা। বিয়েসহ এই খবরও স্বানন্দে জানিয়ে দেওয়া হয় সবাইকে। অকস্মাৎ এমন দুটো খবরে পরিচিত যে কেউ চমকিত হবে স্বাভাবিক। তারাও হয়েছে। গোপনে বিয়ে করে নিলো, আবার লোকবল জানিয়ে ঘরে তোলার আগে বউ অন্তঃসত্ত্বা। শ্রেয়সীকে দেখার কৌতূহল জেগেছিল বৈকি! এর মধ্যে যখন নতুন দুই সদস্য প্রথমবার বাড়ি আসবে বলে বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল তাদের দাওয়াত দিয়ে। তার আগের রাতেই ওমন মর্মান্তিক দূর্ঘটনার খবর পেলো। বাকিরা কিছুটা সুস্থ স্বাভাবিক থাকলেও তাদের পুত্রবধুকে আর পাওয়া গেলনা। বছরখানেক নিখোঁজ ছিল। তারা তো ধরেই নিয়েছিল উমরানের স্ত্রী মৃত। গভীর খাঁদে পড়ে দীর্ঘসময় নিখোঁজ থেকে আবার বেঁচে ফিরবে - এমন কথা ভাবনার বাইরে রাখবে এটাই স্বাভাবিক। তাই পরিবারের সবার ছন্নছাড়া অবস্থায় অন্তত নবজাতকটার কথা ভেবে উমরানকে দ্বিতীয় বিয়ের পরামর্শ অব্দি দিয়েছিল কেউ কেউ। যদিও সে পরামর্শ ফলেনি।
তবে সেই শুরু থেকে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু মানুষটির নিখোঁজ হওয়ার এক বছর পর আবার ফিরে আসার খবর শুনে সকলে তাকে দেখতে উদগ্রীব ছিলই। শুধু তাহুরা চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে অকস্মাৎ কথাবার্তা ছাড়া এসে বাচ্চাসহ একা বউ মানুষটাকে বিপাকে ফেলতে চায়নি বলেই আসেনি এ কদিন। কিংবা এলেও আরেকটু সময় নিয়ে মুরব্বিজনেরা আসতো। এখনো তো বউয়ের ফেরার বেশিদিন হয়নি। একটু সময় নিয়ে আসতো। কিন্তু এর মধ্যে আবার হামলার খবর শুনে আর দ্বিধা করেনি। পরদিন কেউ সকালে, কিংবা বিকেলে করে চলে আসে। শ্রেয়সীর সাথে পরিচিত হয়ে কথাবার্তা বলে, স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার কেমন চলছে, শ্বশুর শাশুড়ির অবস্থা, শাশুড়ির চিকিৎসার খবর - এসব হালছাল জেনে নেয়। একা সংসার দেখে বসে গল্প-স্বল্প করে তবেই যায়। উমরান সকালের দিকে বাড়ি থাকলেও দুপুরের দিকে বের হওয়ায় বিকেলে আর ছিল না। দেওয়ান বাজার গেছিল সেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাটি দিতে।
তারপর রাতেই ফিরে। তখনই শ্রেয়সীর কাণ্ডখানা দেখে। দুজনে তখন রুমে চলে এসেছে। সন্ধ্যার সময় হয়ে আসায় বারান্দায় ঠাণ্ডা। উষশীকে বিছানায় কিছু খেলনাসহ বসিয়ে দেয় উমরান। নিজেও পাশে বসে,
_”এবার বলো হঠাৎ এত গভীর গভীর চিন্তা-ভাবনার কারণ?”
শ্রেয়সী তখন একটু আগের ছাদ থেকে নিয়ে আসা উষশীর জামাগুলো ভাঁজ করছে। বিকেলের দিকে আসা মহিলাগুলোর সাথে গল্পে বসায় তার কাপড় ঢুকাতে মনে ছিল না। তারা যাওয়ার পর তাড়াহুড়ো করে নিয়ে এসেছে আবার। সে উমরানের কথায় ছোটছোট জামাগুলো ভাঁজ করতে করতে বলে,
_”গভীর ভাবনা চিন্তা আবার কি? ভাবনা চিন্তা তো ভাবনা চিন্তায় হয়।”
_”সে বুঝলাম, কিন্তু আমার এমন কেন মনে হচ্ছে যে তুমি কোনো কারণে গিল্ট ফিল করছ?” মেয়ের পাশে বসে হাতে হাতে তার সাথে খেলছে সে। তবে মনোযোগ শ্রেয়সীর দিকে।
শ্রেয়সী এ কথায় একনজর তাকায়।
_”কিসের গিল্ট ফিল?”
_”সেটা তো তুমিই বলবে।”
সে কথাটা শুনে আরেকটা জামা নিয়ে ভাঁজ করতে করতে বলে,
_”তেমন কিছুনা। বেশি বেশি বুঝছেন আপনি।”
_”জি বেশি বেশি না। ঠিকই বুঝতে পারছি আমি। আপনার চেয়ে বেশি চিনি আমি আপনাকে। কিসের কারণে নিজেকে দোষী ভাবা হচ্ছে আমাকে জানানো হোক।” অবিচল কণ্ঠ তার
শ্রেয়সী ললাট কুঞ্চিত করে একনজর তাকিয়ে কিছু বলেনা। উমরান মনযোগ দিয়ে তাকে দেখছিল। ওভাবে তাকাতে দেখে বলে,
_”শ্রেয়সী… বাহানা শুনতে চাইছিনা। কে কি বলেছে বলো? আমি যাওয়ার পরও অনেকে এসেছে তাইনা? ওরা কেউ উল্টাপাল্টা কিছু বলেছে?” অনুসন্ধানি কণ্ঠ তার। মেয়ে মানুষ কিছু একসাথে হলে এদিক সেদিক কিছু একটা বলবেই, এটা তার ধারণা। সে হিসেবে ওরাই কেউ কিছু বলেছে মনে হচ্ছে তার।
শ্রেয়সী একটার উপর একটা ভাঁজ করে রাখা জামাগুলো হাতে চেপে দিয়ে বলে,
_”ওরা কিছুই বলেনি।”
_”আমার এমন কেন মনে হচ্ছে যে তুমি উষশী এই এক বছর একাকীত্মে কাটিয়েছে, কিংবা যেকোনোরকম কিছুর অভাববোধ করেছে বলে এর পেছনে তুমি নিজেকে দায়ী করছ। আমি কি ভুল বলছি?”
শ্রেয়সী একটু থেমে স্বামীপানে চায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। নজর ফিরিয়ে নেয়। উমরান তা দেখে বিরক্তি ফুঁটিয়ে তুললো চেহারায়। বুঝলো তার ধারণা ঠিক। এই মেয়েটা একটু বেশি বেশিই অবুঝ হয়ে যায় ক্ষেত্রবিশেষে। দূর্ঘটনায় কার কি হাত ছিল যে ওসবের জন্য নিজেকে দায়ী ভেবে অপরাধবোধে ভুগতে হবে! বাড়াবাড়ি হয়ে গেলোনা? সে কণ্ঠে বিরক্তি ধরে রেখে বলে,
_”মাথা গরম করছ শ্রেয়সী। এক্সিডেন্টে আমাদের কারো হাত ছিলনা যে এরপরের উষির খারাপ সময়গুলোর জন্য নিজেদের দায়ী করতে হবে। এসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।”
শ্রেয়সী কোমল কণ্ঠে বলে,
_”এক্সিডেন্টে আমাদের হাত ছিলনা তা আমিও জানি মেজর। কিন্তু আমার বাবা-মা…” কথাটা সম্পূর্ণ করতে গিয়েও থেমে গেলো সে। আবার সংশোধন করে বলে,
_”মানে, মৌরির পরিবার যদি আমায় নিজেদের কাছে রেখে না দিতো, তাহলে নিশ্চয় আমাকে আরও আগেই খুজে পেতেন। কাল ঐ মেয়েটাও তো বললো যে আমার ছবি কোনো একটা নিউজে দিয়েছিল। বাড়ির কেউ কি দেখেনি? আমাকে তাও ফিরিয়ে দিলো না। ওরা যদি তখন ফিরিয়ে দিতো তাহলে নিশ্চয় এত লম্বা একটা খারাপ সময় কাটতো না উষশীর!” উদাস কণ্ঠ তার।
_”এতে তোমার নিজেকে অপরাধী ভাবার কারণ?” শ্রেয়সীকে তখনই ফিরিয়ে দিলে তাদের সময়গুলো আরেকটু ভালো কাটতে পারতো এ কথা সে জানে। এসব তার মনে আরও আগেই এসেছে। তাই সেসব নিয়ে নতুনভাবে বউয়ের সাথে মিলে আফসোসে বসার মানে হয়না। সময় নষ্ট ছাড়া কিছুনা। কিন্তু এতে নিজেকে দোষী ভাবার হেতু খুঁজে পেলো না সে।
শ্রেয়সী বসে বসে বেবিটয় নিয়ে খেলতে থাকা মেয়ের গালে আনমনে ঠোঁট ছুঁঁইয়ে বলে,
_”আপনার কি আমার বাবা মা… মানে ও বাড়ির লোকেদের উপর রাগ হয়?”
উমরান উত্তর দিলোনা। বরং ফের প্রশ্ন রাখে,
_”এ প্রশ্ন মনে আসলো কি কারণে?”
_”না মানে মামণি আফসোস করছিল তখন। আমারও খারাপ লাগছে এসব ভেবে। আসলেই আগেই ফিরিয়ে দিলে আমার মেয়ে আরও ভালো থাকতো। আজ ঐ মহিলাগুলোর মধ্যে লামিয়ার আম্মু নামে যে এসেছে? সে তার ছোট জা এর বাচ্চাকে নিয়ে এসেছিল। ওর এগারো মাস চলছে। উষশীর তো তেরো মাস। অথচ ওদের মেয়েটা দেখলাম কেউ কোনো কথা মুখ থেকে ফেলতে পারেনা সাথে সাথে অনুকরন। আমার উষশী তো আমাকে আর আপনাকে ছাড়া কাউকে চিনেওনা তেমন, আর ডাকতেও পারেনা। ওদের মেয়েটা এলোমেলোভাবে দৌড়াতেও পারে, উষশীর সাথে খেলতে কতো আগ্রহী। অথচ উষি স্বাভাবিক হাঁটতে গেলেও কতবার পড়ে যায়। অতো মানুষ দেখে কোল থেকে নামতেই চাইছিল না। খেলবে দূরের কথা। আমি দুটো চকলেট হাতে দিয়েছিলাম ওর। আপনার মেয়ে কাঁঁদতে শুরু করে দিলো। ওর থেকে ঐ দুটো নিয়ে তবেই থেমেছে। অথচ ওদের মেয়েটা কি সুন্দর উষি কাঁঁদছে দেখে দিয়ে দিলো।”
_”তারপর?”
_”তারপর আর কি? উনি ওসব দেখে বললো আমার মেয়ে একাকীত্মের মধ্যে বড় হওয়ায় একটু একঘেয়ে থেকে গেছে। কারো সাথে মিশতে পারছেনা। কোলাহলে অস্বস্তি হচ্ছে বলে কাঁদছিল। উনার মেয়ে লামিয়াও নাকি যৌথ পরিবারে বড় হওয়ায় ছোট থেকেই পাকনা পাকনা ছিল। সব আগে আগে করেছে। দাড়ানো, হাটা-চলা, কথা বলা -সব।”
উমরান সব শুনল মনোযোগ দিয়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। এসব বিষয় খুব স্বাভাবিক। কেউ কেউ আগে আগে পরিপক্ক হয়, কারো একটু সময় লাগে। কেউ কোলাহল পছন্দ করে, কেউ করেনা। এসব সুস্থ পরিবেশে সব পেয়ে বড় হওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও হতে পারে। অথচ এই সামান্য কারণে কতকিছু ভেবে ফেলছে মেয়েটা। নিশ্চয় তার মেয়ে সবেতে পিছিয়ে গেছে শুনে মন খারাপ করে ছিল আগে থেকে। এর মধ্যে মাকে ফোন করে কারা কারা দেখতে এসেছিল জানানোর সময় নিশ্চয় নাতনিকে নিয়ে আরেকদফা আফসোস করেছে। আর ওকে আরও আগে ফিরিয়ে দিলে ভালো হতো বলায় ভেবে নিয়েছে সওদাগর বাড়ির লোকেদের দোষী ভাবছে তারা। এই নিয়ে পরিবারের ভুল নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিজেকে অপরাধী ভাবছে। কতরকম চিন্তা তার বউয়ের।
অথচ উমরান জানে তার মা ওসব ভেবে বলেনি। মায়ের তো শ্রেয়সীর নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই নাতনির চিন্তায় হাঁ হুতাশের শেষ ছিলনা। এখনো সেসব জারি। তেমনই স্বাভাবিকভাবে বলেছে। কিন্তু শ্রেয়সী ভেবে নিয়েছে তার পরিবারকে নিয়ে ক্ষোভ রেখেছে মনে, এ কারণে পরিবারের হয়ে নিজে আত্মগ্লানিতে ভুগছে।
_”শ্রেয়সীইই!! বেশি বেশি ভাবছ তুমি। মা তেমন কিছুই মনে আনেনি। আর আনলেও বা কি? তোমার অন্যের দোষ নিয়ে আত্মগ্লানিতে ভুগতে হবে কেন? ওসব ভাবনা বাদ দাও। আমি কি বলছি শুনো।”
শ্রেয়সী স্বামী গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে বলতে চাইছে বুঝে পূর্ণমনোযোগে তাকালো উষশীর পিঠে আনমনে হাত বোলাতে বোলাতে।
_”শুনো, তুমি যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছ ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি তোমার বিষয়টা। কিন্তু তোমার জানায় কিছু এদিক ওদিক আছে। আমি রিল্যাক্টেশনের বিষয়ে সব কিছু আগেই জেনে নিয়েছি। চেষ্টা করলে দেড় দুই মাসেই চলে আসতে পারে ব্রেস্ট মিল্ক। কিন্তু আবার এর বেশি সময় চেষ্টা করেও অনেক ক্ষেত্রে আসেনা। আমরা ডক্টর দেখাবো। যা যা বলে সব মানবো। কিন্তু যে কথাটা আগেই জানিয়ে দিতে চাইছি সেটা শুনো, আমরা চেষ্টা করবো ঠিক আছে। কিন্তু সফল না হলে তখন যেন আবার এই নিয়ে হাঁ হুতাশ করে তোমাকে কাঁঁদতে বসতে না দেখি।”
_”হবে। দেখবেন হবেই। আমি কতো খাবার আনিয়েছি আজ! এবার থেকে ওরকম খাবার খাবো শুধু। দিনরাত খাবো। ডক্টর আরও যা যা বলবে সব মেনে চলবো। দেখবেন চলে আসবে।” সাথে সাথে দৃঢ় কণ্ঠে জবাব এলো তার।
উমরান গভীর শ্বাস টেনে বলেন,
_”আচ্ছা ঠিক আছে হবে। মনোবল শক্ত রাখা খুব ভালো। আমি শুধু জানিয়ে দিচ্ছি , যা চাইছ তা না হলে তখন যেন এই নিয়ে লাইফটাইম আফসোস করে আত্মগ্লানিতে ভোগা না হয়।”
_____
তখন অল্প সময় কেটে ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে পা দিয়েছে। শ্রেয়সী রাতের খাবার প্রস্তুত করছে রান্নাঘরে। উমরান বসার ঘরে সোফায় ল্যাপটপে কোনো কাজ করছে। তাদের হসপিটালসহ পারিবারিক ব্যাবসা সংক্রান্ত দিকগুলো বাবা না থাকায় তাকেই দেখতে হচ্ছে। উষশী ল্যাপটপের কিবোর্ডে টাইপ করলেই জ্বলে উঠতে দেখে মজা পায়, ছোটছোট আঙ্গুলে সুইচ চেপে বারবার ওমন করছিল। উমরান কাজে ব্যাঘাত ঘটায় কোল থেকে পাশে সোফায় বসালে সে আবার তুলতুলে গাঁ-খানা টেনে কোল বেয়ে উঠে। ফের কি বোর্ডের সুইচে আঙ্গুল চাপে। সুইচগুলোর চারপাশ জ্বলে উঠতেই আনন্দে গাঁ নাচিয়ে উঠে। উমরান মেয়ের কাণ্ড দেখে হাসে ক্ষীণ। গাঁলে চুমু এঁকে শ্রেয়সীকে ডাকে,
_”শ্রেয়সীইই… উষিকে নিয়েও যাও তো একটু। দরকারি কাজ আছে।”
_”আসছিই…” সাড়া দিয়ে একটু পরই এসে নিয়ে গেলো সে। উষশী অবাধ্য হয়না। স্বানন্দে তাইনাই করতে করতে যায়।
কাঁটাবাচা সব হয়ে যাওয়ায় সমস্যা হয়না শ্রেয়সীর। তরকারি চুলায় দিয়েছে। উষশীকে কোলে নিয়ে চামচ হাতে নাড়তে থাকে। উষশীর বিরক্ত লাগায় বাবার কাছে যেতে চায়। শ্রেয়সী এটা ওটা বলে ভুলায়। চুমু একে ঘুরে উঠে মেয়েকে নিয়ে। উষশী আনন্দ পেলো।
এর মধ্যে কলিং বেল বেজে উঠে। এই সময়ে কে আসলো ভেবে অবাক হয়। উমরান গিয়ে দরজা খুলে দেয়। সওদাগর বাড়ি থেকে মৌরির বাবা-মা, ভাই আর চাচীর ছেলে মেয়ে দুটো এসেছে। উমরান সালাম দিয়ে তাদের ঢুকতে দিলো,
_”হঠাৎ যে, কেমন আছেন আপনারা?”
_”হ্যাঁ বাবা ভালোই আছি। তোমরা ভালো আছ তো?” মৌরির বাবা
উমরান জবাব দিয়ে তাদের সাথে নিয়ে বসার ঘরে এলো। বসতে দিয়ে শ্রেয়সীকে ডাকে। সেও কে এসেছে দেখতেই আসছিল। বাবা-মা, ভাই-বোনেদের দেখে খুশি হয়।
_”মা, বাবা… কেমন আছো তোমরা? আসবে বলোনি তো?” তূর্ণা-মৃন্ময় বোনের কাছে যায়। কেমন আছে-নেই জেনে নিয়ে তূর্ণা উষশীকে কোলে নিলো। সে আবার বাচ্চাদের ভালোই নিজের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। তুলি আপুর বাচ্চাদের নিয়ে অভিজ্ঞতা আছে।
_”আমরা খুব ভালো আছি। তোদের দেখতে এলাম, কাল কারা দেখলাম হামলা করতে চাইলো তোদের। ঠিক আছিস তো সবাই? তোদের কারও লেগেছে? তোর বাবা, চাচ্চু, অর্ণব কেউ বাড়ি ছিল না। চিন্তায় ম’ রে যাচ্ছিলাম। একা আসতেও পারছিলাম না। যখন বাড়ি এলো, তোর বাবা-ভাই দুটোই সাথে এলো। তাই অপেক্ষা না করে চলে এসেছি।”
বলতে বলতে মেয়ের কাছে গিয়ে গালে মাথায় হাত বুলান। শ্রেয়সী মাকে জড়িয়ে ধরলো।
_”আমাদের কারো কিছু হয়নি মা। ঐ লোকটাকে তো কিছু করার আগেই উষশীর পাপা দেখে ফেলেছিল। ওখানেই মেরেছে খুব।”
_”হ্যাঁ তা তো দেখেছি। জামাই বাবা তুমি ঠিক আছো? তোমার কোথাও লেগেছে?”
অর্ণবের বাবার প্রশ্নে উমরান জবাব দেয়,
_”না আঙ্কেল, আমাদের কারো কিছু হয়নি। সবাই ঠিক আছি।”
_”কিন্তু হঠাৎ হামলা করলো কেন লোকটা? পুলিশে দিয়েছিলেন দেখলাম, কিছু বলেছে?” অর্ণবের প্রশ্নে উমরান কিছু বলবে তার আগে শ্রেয়সী জবাব দেয়,
_”আরেহ লোকটা নাকি অন্য কাউকে আঘাত করতে গিয়ে ভুলে আমাদের করে ফেলেছে। সেসব বাদ দাও তো। বসো তোমরা। আমি একটু আসছি, চুলায় তরকারি বসিয়েছিলাম।”
শ্রেয়সীকে উমরান হামলার কারণ এমনই জানিয়েছে। অতো কাহিনী বলার মানে হয়না ওকে। বুঝবেওনা তেমন। একটা শুনলে আরও চল্লিশটা প্রশ্ন থেকে যাবে, চিন্তা করবে। এর চেয়ে অন্য কাউকে মারতে গিয়ে ভুলে ওদের উপর হামলা করে ফেলে বলে কাটিয়ে দিয়েছে।
শ্রেয়সী সবাইকে বসতে দিয়ে তাদের আনা জিনিসগুলো নিয়ে রান্নাঘরে যায়। চুলায় বসানো তরকারিগুলো দেখে নামিয়ে নেয়। নাস্তার ব্যবস্থা করলো সবার জন্য। যদিও ওরাই হালকা খাবারসহ রেস্টুরেন্ট থেকে ভারী কিছু খাবার পদও নিয়ে এসেছ। সেসবসহ চা নাস্তার ব্যবস্থাও করলো সে। উমরান তাদের নিয়ে বসেছে সোফায়।
বাড়ির সবার খোঁজখবরসহ নানানরকম আলাপে বসলো। অর্ণবরা বুঝতে পারছে তাদের মৌরি এখন শ্রেয়সী হয়ে আছে। সবটা জেনে গেছে সে। উমরানের সম্বোধনে না বোঝার কথা নয়। আর বোঝার পর থেকেই একটু হাশফাশ লাগছে তাদের। শ্রেয়সী তাদের ভুল বুঝলো কি না চিন্তা লাগছে। মেয়েটা কি সেই ভুলটার জন্য তাদের সব ভালোবাসা উপেক্ষা করে যাবে? ভুলে যাবে তাদের সাথে কাঁটানো সেই দিনগুলো? র ‘ক্তের সম্পর্ক না থাকলেও আত্মার বন্ধন বলেও তো কিছু হয়!! যেটা ছিল তাদের মধ্যে। সেই বন্ধনটাও উপেক্ষা করে যাবেনা তো? ভেবেই বুকের ভেতর অদ্ভুদ এক হাঁহাকার অনুভব করলো তারা।
নিজের ছোট মেয়েটাকে অসময়ে হারিয়ে পাগল পাগল হয়ে গেছিল অর্ণবের মা। বাবা তো সেই থেকে পাথর বনে ছিল। বাড়িতে ওর ব্যাপারে কথা বলাও নিষেধ। অর্ণব ঐ পুরো সময়টাতে ভাই হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ উপলব্দি করেছে। বেঁচে থাকতে বোন যে সঠিক পথে নেই তা তো বুঝেওনি, এমনকি বোনের লাশটা অব্দি বাড়ি তুলতে দেয়নি তার বাবা। শেষে বাইরে বাইরে গোপনেই সবটা সামলাতে হয়েছে তাকে। সওদাগর বাড়ির সবটা এত এলোমেলো হয়ে ছিল, অথচ কাউকে তিল পরিমাণ কিছু বুঝতে দেয়নি। মৌরি যে নেই, এ কথা আজও কেউ জানেনা। মৌরির মৃত্যুর কিছুদিন পর তার দাদী মারা গেলো। সব আরও লন্ডভণ্ড হলো।
মৌরিকে তেমন না দেখলেও তাদের বাড়িতে বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে, এ কথা যেহেতু জানা। তাই সেই সময়টাতে নানান প্রস্তাব আসতো। বাড়ি বয়ে ঘটক আসলে তাদের মুখে মেয়ে দেখার আর্জি!! অথচ মেয়ে তাদের বেঁচে নেই। সমাজ আর পরিবারের লাঞ্চনা থেকে বাঁচতে, পাপ থেকে পালাতে - আরেক পাপ স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে। তাদের সময়টা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিধ্বস্ত। কিভাবে এই খবর লুকিয়ে রাখবে, কিংবা মৌরি নেই এ কথা জানালেও এর পেছনের ঘটনা লুকিয়ে মান সম্মান রক্ষা করবে, এই চিন্তায় যখন কুলকিনারা পাচ্ছিল না তার বাবা। তখন অর্ণব ছুটি শেষ হওয়ার আগে বাড়ির ঐ পরিস্থিতিতে মেডিক্যালের উদ্দেশ্যে চলে যায়। মা আরও পাগল পাগল হয়ে উঠে। সন্তানদের চোখের আড়াল করতেও ভয় পেতো তখন। অর্ণব জানায় তাদের মেডিক্যালে অজ্ঞাত পরিচয়ে রাখা এক পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে, অজ্ঞাত পরিচয়ধারী হওয়ায় এতদিন নিজের দায়িত্বে চিকিৎসা করিয়েছিল তার এক বন্ধু। বিদেশী কোনো টুরিস্ট তাদের মেডিক্যালে নিয়ে এসেছিল ওকে এক রাতে। অর্ণবের সেই বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে চলে যায়। চিকিৎসা করিয়েছে দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু জ্ঞান ফেরেনি তার। এদিকে অচেনা অজানা এক মেয়ের চিকিৎসায় তেমন খেয়াল রাখেনি কেউ। ওভাবেই ফেলে রেখেছিল। দরকার পড়লে ডাক্তার দেখিয়েছে, নাহলে দেখায়নি -এটুকুই।
কিন্তু যখন জ্ঞান ফিরল তখন অর্ণবের সেই বন্ধু বোনের বিয়ের জন্য গ্রামের বাড়ি ছিল। তার পক্ষে আসা সম্ভব ছিলনা। অর্ণবকে অনুরোধ করে ওর বিষয়টা দেখতে বললে সে যায়। বাড়ির ঐ অবস্থায় ছুটি শেষ না হতেই চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সবটা জানায় বাবাকে। রোগীর সম্পর্কে সবটা জেনে সেদিনই তার বাবা ওকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় মুহূর্তেই। বিস্মিত অর্ণব অনেক বুঝিয়েছে, অসম্মতি জানিয়েছে বাবার কথায়। খোঁজখবর নিয়ে তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবে এই ভাবনা ছিল তার। কারণ মেয়েটার আলাদা এক পরিবার আছে, তার চেয়ে বড় কথা নবজাতক একটা বাচ্চা আছে থাকার সম্ভাবনা ছিল। রোগীর মেডিক্যাল টার্ম তো তাই বলেছে। কিন্তু বাবার যে সম্মান রক্ষার উন্মাদনা, উপায় পেয়ে হাতছাড়া করতে না চাওয়া স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্তটা ছিল ঐ মুহূর্তে। তার আগে টিকতে পারেনি অর্ণব। মেয়েটার এই অবস্থা যখন ওর নবজাতকটাও নিশ্চয় সেই এক্সিডেন্টের পর আর বাঁচেনি। এমনটা ধরে নিয়ে তার বাবা এসব তাকেও বুঝাতে লাগলো। শ্রেয়সীকে নিজেদের কাছে নিয়ে গেলো। পরিবারকে বোঝাল এটাই এখন থেকে তাদের মৌরি। তার মাকে ঐ সময়টায় এই মেয়েটাকে পেয়ে স্বাভাবিক হতে দেখে অর্ণবও আস্তে ধীরে বাকিদের মতো অভিনয় জারি রাখলো।
মেয়েকে লুকিয়ে লুকিয়ে রাখলো সেই থেকে। তুলি যেমনভাবে বড় হয়েছে সেভাবেই চলালো শ্রেয়সীকে। কোথাও গেলে সাধারণ বোরকার সাথে হিজাব-নিকাব। কিংবা সাধারণ পোশাক পড়লেও মুখ বাঁধা রাখতে নির্দেশ দিতো। শ্রেয়সী এসবের কারণ হিসেবে জানতো ছোট থেকে ওভাবেই বড় হয়েছে তারা দুই বোন। তাছাড়া তাদের ওদিকের এলাকায় প্রায় মেয়েরায় এমনভাবেই চলে। তাই অসুবিধা হলোনা মানিয়ে নিতে। শ্রেয়সীর মৌরি পরিচয়ে আসার পর বাইরের মানুষ বলতে তার দেখা পেয়েছে এক অনামিকা। এর বাইরে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়ে সেখানে মুখ খুলেছিল। আর সেদিন প্রথমবার পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে।
ব্যাস, আর কেউ তাকে সরাসরি দেখলো কই এরপর? দেখেনি!!
***
_”ভাইয়া… মৌরি আপু আমাদের মৌরি আপু নয়, তাইনা?”
তূর্ণার ফিসফিস কণ্ঠ। পাশাপাশি আছে দুজন। সোফায় বসেছে। সবাই চা নাস্তা খাচ্ছে উষশীকে নিয়ে গল্প করতে করতে। বাচ্চা মেয়েটার সব কাণ্ডই তাদের ভালো লাগে। হাসলেও, রাগ দেখালেও, বিরক্তি দেখালেও, খেলতে চাইলেও কিংবা কোলে আসবেনা বলে কাঁদলেও - সবই ভালো লাগে তাদের। ওকে নিয়েই মেতে ছিল তারা। এসবের মধ্যে তূর্ণা নিচু কণ্ঠে ভাইকে কথাটা জিজ্ঞেস করলো।
অর্ণব হঠাৎ ওর ফিসফিস কণ্ঠ শুনে কপাল কুচকে তাকায়।
_”সবার মাঝে বসে ফিসফিস কি করছিস বেয়াদব? চুপচাপ বসে থাক।”
তূর্ণা বিরক্তিতে ভেংচি কাটে। তবে তার কথা ভাই শুনেনি বুঝে ফের প্রশ্ন রাখে।
_”মৌরি আপুকে ওর স্বামী শ্রেয়সী ডাকছে কেন ভাইয়া? আর মৌরি আপুর বাচ্চা এলো কোথা থেকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম এখনো বলোনি কিন্তু তুমি।”
অর্ণব ওকে আবার সবার মাঝে মাঝে ফিসফিস করতে শুনে ধমক দেবে ভেবেছিল। কিন্তু কথাগুলো কানে আসতেই থেমে যেতে হলো। তূর্ণা তার হাঁঁটুতে ঠোকা দিয়ে ডাকে,
_”এই ভাইয়া? বলো না প্লিজ। সব উল্টাপাল্টা কেন এমন? অন্য নামে ডাকছে, সে বুঝলাম স্বামী আদর করে অন্য নামে ডাকতেই পারে। কিন্তু আপুর বিয়ে কবে হলো সেটাই জানলামনা। অথচ শ্বশুর বাড়ি চলে এলো সেদিন। আবার আগেরবার এসে দেখলাম কিউটি পিউটি একটা বাচ্চাও। মানে কিভাবে কি? একটু বলো না প্লিজ। বাচ্চা কিভাবে এলো?”
_”অন্য নামে ডাকার কারণ যখন ভেবে নিয়েছিস নিজে নিজে। সেভাবে বাকি প্রশ্নের উত্তরও খুজে নে।”
তূর্ণা কথাগুলোর অর্থ বুঝে একটু লজ্জ্বা পায়। তবে পাত্তা দিলোনা। কৌতূহলের সাথে সাথে বিরক্তি বাড়ছে। সে অর্ণবের শাঁর্টের হাঁতা টেনে নিম্ন কণ্ঠে বলে,
_”কিন্তু বিয়ের কথা তো জানলাম না, আর বাচ্চা কিভাবে এলো? সব বলো না…”
অর্ণব সবার দিকে একনজর তাকায়। তাদের কেউ দেখছেনা বুঝে স্বস্তির শ্বাস টানে। পরপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
_”এখন আমি তোকে বাচ্চা কিভাবে এলো তা বুঝাবো বিস্তারিত?”
তূর্ণা দাঁতে জিব কাটে। একটু ঘুরে গেছে তার প্রশ্নটার অ্যাঙ্গেল। অন্যভাবে গেছে ভাইয়ার কাছে। সে সামলে বলে,
_”উফফ!! আমি ওসব বলছি নাকি? বাচ্চা কিভাবে হয় আমি জানি। কিন্তু সেদিন আর্মিটার সাথে পাঠিয়ে দিলে আপুকে সবাই মিলে। তারপর আর বাড়ি এলোনা। জিজ্ঞেস করলাম মাকে। মা বললো আপুর বিয়ে হয়ে গেছে। এরপর এ বাড়ি এলাম। দেখি বাচ্চাও আছে একটা। মানে কিভাবে কি?”
চোরা নজরে সবাইকে দেখে নিয়ে অর্ণবের দিকে তাকায় সে প্রশ্নের জবাব চাইতে। কিন্তু অর্ণবকে নিজের দিকে অদ্ভুদ নজরে চাইতে দেখে কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেলো সে।
_”কি হয়েছে?” তূর্ণা
তখনো অদ্ভুদ নজর তার দিকে। অর্ণব নিজের বাহু হতে তূর্ণার হাত সন্তর্পণে ছাড়িয়ে বলে,
_”সরে বস তূর্ণা।”
কথাটা শুনে তূর্ণা। খেয়াল করলো সে অর্ণব ভাইয়ার গাঁ ঘেঁষে বসেছে। ফিসফিস করে কেউ না শুনে মতো বলতে গিয়ে কবে এতোটা কাছে চলে গেছে বুঝতে পারেনি। সে একটু সরে আসে। আর কিছু জানতে চাইলো না এরপর।
একে তো এত কাছাকাছি বসেছিল মেয়েটা। তার উপর উল্টা পাল্টা প্রশ্ন করছিল। যদিও ওর দিক দিয়ে ঠিকই আছে। যে কারো এসব প্রশ্ন মাথায় আসবে স্বাভাবিক। কিন্তু তার স্বাভাবিক লাগেনি। পুরুষালি মনটায় অন্যকিছু আছে, আর সেই অন্য অনুভূতি নব্য হওয়ায় সামলাতে শেখেনি এখনো অর্ণব। তাই তার এত কাছাকাছি এসে এসব প্রশ্ন করায় সেই অন্যকিছুর দিক দিয়ে হৃৎপিণ্ডের কোথাও একটা কম্পন অনুভুত হয়। খারাপ চিন্তা আসে মাথায়।
তূর্ণার নিজেরও শেষদিকে এসে প্রথমবারের মতো অর্ণব ভাইয়ার সামনে কিছু একটা নিয়ে অস্বস্তি হলো। কিন্তু কিশোরী মন সেই অস্বস্তির হেতু খুজে পেলো না। সে আরও সরে এসে বড় মায়ের পাশে বসে যায়। অর্ণবের তা চোখে পড়লো।
তূর্ণা উষশীকে নিয়ে মেতে উঠে এরপর। কিন্তু তার মনে আসলেই অনেক প্রশ্ন। যার উত্তর সে মেলাতেও পারছে কিছুটা। তাও অর্ণব ভাইয়ার মুখে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল।
মামাতো বোনের জন্মদিন অনুষ্ঠানে গিয়ে একবার অনেকদিন থেকে গেছিল সে আর মৃন্ময়। বাড়ি থেকে আসার চাপ দেয়নি তাই মামার বাড়ি রসের হাড়ি পেয়ে তারাও ফিরে আসার নামগন্ধ নেয়নি। তারপর একেবারে খবর পেলো দাদী মারা গেছে। তখনই আসে বাড়ি। এসে আর মৌরি আপুকে দেখেনি। তারা জানতো নিজের মামা বাড়ি গেছে সেও। বড়বাবা আর তার বাবা সাধারণত তাদের কোথাও বেড়াতে গেলে থাকতে দেয়না। তারা যেমন মামা বাড়িতে সুযোগ পেয়ে অনেকদিন থেকে এসেছে, তেমন মৌরি আপুও থাকছে ভেবে বেশি ভাবতো না। কিন্তু দাদীর মা ‘রা যাওয়ার দিনও আসলো না কেন অবাক লেগেছিল, যেখানে মৌরি আপুর নানু বাড়ির সবাই চলে এসেছে সেখানে সে কেন আসেনি? মাকে জিজ্ঞেস করলে বললো এসেছিল সে দেখেনি।
তাদের এত কান্নাকাটির মধ্যে বোন থেকেও তাদের সামনে আসেনি শুনে অবাক লাগলেও অল্পবয়সী তূর্ণা-মৃন্ময় অতকিছু গভীরভাবে ভাবেনি। তবে খুব মিস করতো বোনকে। পরে হঠাৎ একদিন সকালে একটা মেয়েকে দেখলো বাড়িতে। সবাই বললো ওটাই মৌরি আপু। তার নাকি এক্সি ‘ডেন্ট হয়েছিল বলে হাস্পাতালে ভর্তি ছিল। খুব বড় এক্সি ‘ডেন্ট। সারা শরীরে আর মুখমণ্ডলে নাকি তীব্র আঘাত। অপারেশন করে ঠিক করতে হয়েছে। মুখেও প্লাস্টিক সার্জারি করে বদলে দিয়েছে। তূর্ণা, মৃন্ময় কষ্ট পাবে বলে তাদের জানায়নি। তাদের বোন তাদের সবাইকে নাকি ভুলে গেছে। তাদের নিজেদের সবটা চেনাতে হবে আপুকে।
সিরিয়ালে আসক্ত তূর্ণা বিশ্বাস করতে সময় নেয়নি। কিন্তু তখন ছোট থাকলেও এখন সময়ের সাথে সাথে মুখে না বলা কথাও চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করে বুঝে নিতে পারে।
এই যে সে বুঝতে পারছে সেদিন যে মেয়েটাকে এনে তাদের বোন বলে জানিয়েছিল সবাই, সে মেয়েটা তাদের মৌরি আপু নয়। বরং উষশীর মা, আর এই সুদর্শন দেখতে আর্মি ভাইয়াটার বউ - যার নাম শ্রেয়সী। তাদের কাছে ছিল এতদিন অন্য পরিচয়ে। এখন সব ঠিক আছে। কিন্তু তার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। তার মৌরি আপু কোথায়?