বিল্ডিংটি দেওয়ান বাজারের আবাসিক-২ এর ছয় নাম্বার গলিতে। শহরের এমন কোণায় কোণায় থাকা একই ধরণের অলিগলিগুলো দেখলে বিচক্ষণরাও অনেক সময় তাদের গন্তব্য ঠিক কোন গলিতে তা গুলিয়ে ফেলে।
রিকশাঁ ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি বা প্রাইভেট কার নিয়ে গেলে পাশ দিয়ে আর গাড়ি চলতে পারেনা গলিগুলোতে। খুব গাঁ ঘেঁষে যায় গাড়িগুলো। এতে ছোটখাটো যেকোনো সংঘর্ষে গাড়ির ক্ষতি হতে পারে। উমরান এমনই একটা গলি বেয়ে বেয়ে গাড়িটা নিয়ে থামে কাঙ্ক্ষিত বিল্ডিং এর সামনে। বিল্ডিং এর সামনে একপাশে গাড়িটা রেখে ঢুঁকে পড়ে গেইটে। গন্তব্য চারতলা।
উঠে বেল বাজাতেই একজন মাঝবয়সী মহিলা দরজা খুলে দিলো। গাঁঁয়ে মুটামুটি পুুরনো ধাঁচের একটা শাড়ি। চোখের নিচে অল্প কালি। নিম্ন মধ্যবিত্তের মতো ভাব দিচ্ছে বাহ্যিক রুপটা। অথচ মাসখানেক আগেও সামান্য পানির গ্লাসটাও এগিয়ে দেওয়ার জন্য কাজের লোক বরাদ্দ ছিল নিজেদের আলিশান বাড়িতে। এখন সেসবের কিছুই আর লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা।
_“ভালো আছেন? মিসেস সুলেমান?”
উমরানের উপস্থিতিতে চমকিত মাঝবয়সী ধাঁরালো চেহারার মহিলাটি। নিজেকে সামলে বিরক্তিসহ অল্প ক্ষোভ নিয়ে তার প্রশ্নের জবাব দেয়,
_”জি বেশ আছি। আপনি হঠাৎ এখানে কেন অফিসার? কি চাই?”
_”ঢুকতে দেবেন না? বাইরে রেখেই অতিথির সাথে আলাপ সারবেন?” সামান্য ভ্রু উচায় কথাখানা বলে। অথচ কণ্ঠে নিপুন ভদ্রতা উমরানের।
মহিলা না চাইতেও উমরানকে ঢুকতে দিলো। সে ঢুঁকে একবার ফ্ল্যাটের ভেতরটায় চোখ বোলায়। তেমন কিছুই নেই। বসার ঘরে ছোটখাটো সোফা, আবার একপাশে শোয়ার খাট। ভেতরে এর বাইরে একটায় রুম শুধু, আর কিচেন। রুমগুলোও তেমন বড় না।
_”মিসেস সুলেমানের তো এই ছোটখাটো বাড়িতে থাকতে বেশ কষ্ট বয়ে যাচ্ছে আই থিংক। এই কষ্টের ভার বইতে গিয়ে মেয়ের দিকে তেমন নজর দিতে পারছেন না বোধ হয়?” চারদিকটায় চোখ বুলিয়ে কথাগুলো বলতে বলতে মুখে বিরক্তি আর কৌতূহল নিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকা সাবেক কর্নেল সুলেমানের স্ত্রী রাবেয়ার দিকে তাকান। তারপর ফের জিজ্ঞেস করেন, _”তাই কি?”
_”যা বলতে চাইছেন সোজাসুজি বলুন।”
উমরান হাসেন মহিলার তার প্রতি বিরক্তি আর ক্ষোভের পরিমাণ বুঝে। মাথা নেড়ে ঠোঁট চেপে বলেন,
_”জি জি অবশ্যই, সোজাসুজিই বলতে হবে। সাবেক কর্নেল সুলেমান সাহেবের স্ত্রীর আবার ধৈর্য কম। যাকে বলে শর্ট টেম্পারড, একদম স্বামী সন্তানের মতো। তাইনা?”
মহিলাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে উমরান ফের বলে,
_”না না, সে ঠিকই আছে। আপনাকে মানায় অধৈর্যপণা, বাচ্চামো, অবুঝপণা - এসবে আপনাকে বেশ মানায়। বয়স বাড়ছে, বয়সের সাথে সাথে বুদ্ধি লোপ পাবে। বাচ্চামো স্বভাব আসবে, অবুঝপণা বাড়বে। নিজেদের কিসে ভালো, কিসে ক্ষতি সে বোধ হারাবেন। খুব স্বাভাবিক এসব। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।”
সাবেক কর্নেল সুলেমানের স্ত্রী রাবেয়া সরু চোখে উমরানকেই দেখছিল। মূল কথায় এসেছে বুঝে না চাইতেও আরও মনোযোগ নিবেশ করেন। উমরান তা বুঝে হাসলেন। তবে সময় ব্যয় না করে বলেন,
_”সমস্যা হচ্ছে আপনার মেয়ে। সে এখনো ঐ বয়সে যায়নি যে এমন বাচ্চামো কাণ্ড তাকে মানাবে। নিজের ভালো বোঝার মতো সঠিক বয়সেই আছে সে। তাও এমন বাচ্চামো… এসব তো শোভা পায়না।”
রাবেয়ার কপাল কুঞ্চিত হলো মেয়ের কথা তোলায়,
_”রিশা কি করেছে?”
_”জি আপনার মেয়ের নামেই বিচার নিয়ে এসেছি। বলছি, অধৈর্য হবেন না। চোখে মুখে বয়সের ছাপ এলেও, আদতে আপনি অধৈর্য হয়ে উঠলে বয়সের সাথে সাথে এসব স্বাভাবিক ভেবে সামনের জন মানিয়ে নেবে সেই বয়সে যান নি। সো আপনার মেয়ে রিশা না বে**... সে কোথায় তাকে ডাকুন।”
রাবেয়া বিরক্তিকে চোখ কুচকে নিলো বয়স নিয়ে খোঁচামূলক কথায়। সে সম্ভ্রান্ত পরিবারের পুত্রবধু হিসেবে তেমনই ফ্যাশন কনশাস ছিল। বয়স লুকাতে পার্লারে আসা যাওয়া ছিল নিত্য ব্যাপার। আর আজ এই পরিণতি, সেসবেরই খোঁচা দেবে যে কেউ। স্বাভাবিক!!
কিন্তু মেয়েকে নিয়ে শেষ কথাটা শুনে র ‘ক্ত গরম হয়ে এলো।
_”হোল্ড ইউর টাং অফিসার। একা পেয়ে যা ইচ্ছে বলে বেড়াতে পারেন না। অভদ্র ব্যবহার করছেন আপনি।”
_”তাই? আর আপনার মেয়ে যাকে তাকে বিছানায় আসার প্রস্তাব দিলে সেটা খুব ফেয়ার তাইনা? সে যে কারো সাথে শুয়ে পড়তে চাইবে। আর কেউ তাকে স্লাট ডাকতে পারবে না। তাই কি?” কটাক্ষ তার কণ্ঠে।
_”রিশা কি করেছে সেটা বলুন। ও বাড়ি নেই।” দাঁতে দাঁত চেপে বলে রাবেয়া।
তার প্রতি উত্তরে উমরান এবার কিছুটা শান্ত মেজাজে গাম্ভীর্য আঁটলেন চেহারায়,
_”একে তো স্বামী সন্তান ছাড়া অভিভাবকহীন হয়ে আছেন। তার উপর সব প্রপার্টি হারিয়ে প্রায় পথে নেমে এসেছেন আপনারা মা মেয়ে। বাবা ছেলের কীর্তি জানার পর নিকটাত্মীয়রাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই এখন অন্তত ঠিক পথে আসুন, দেখার মতো কেউ নেই আপনাদের। মেয়েকেও সঠিক পরামর্শ দিয়ে বাকি জীবন শান্তিতে নির্ভেজালে কাটান। আপনার ঐ উগ্র মেয়েকে বলবেন তাকে ফার্স্ট এন্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিতে এসেছিলাম। আমার পরিবারের দিকে যেন হাত না বাড়ায়। আপনার স্বামী সন্তান চেষ্টা করে দেখেছিল, আর তার পরিণতি তো চোখের সামনেই। নিজেরা খেতে পারছেন না, এমন সময় আমার পেছনে প্রতিশোধপরায়ন হয়ে ভাড়া গুন্ডা লাগিয়ে লাভ আছে? ওসব চুনোপুঁটির হামলা আমি বা আমার পরিবারের কিছু করতে পারবেনা। তাকে বলে দেবেন প্রথমবারের মতো আপনাদের অসহায় গরীব দোস্ত আর অবুঝ ভেবে ছেড়ে দিলেও, ফার্দার এমন কাজ রিপিট করলে আর ছেড়ে দেবো না। সোজা বাবা ভাইয়ের সাথে চৌদ্দ শিকের পেছনে পাঠাবো। তাই বুঝেশুনে থাকবেন মেয়েকে নিয়ে। আসছি।”
কথাটা বলেই বেরিয়ে আসে। বিল্ডিংটা শহরে হলেও তেমন একটা সুবিধার নয়। পুরনো ধাঁচের। তাই লিফ্টও নেই। সিঁড়ি বেয়েই নামতে হচ্ছে। ফোনে নোটিফিকেশন আসায় মেসেজ চেক করেন। শ্রেয়সী লিস্ট পাঠিয়েছে দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য। দুধ, খেজুর, ওটস,মেথি, কালোজিরা, সজিনা পাতা, লাল চাল, চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, তিল, কলা, আপেল - এসব আছে লিস্টে। কিন্তু এসবের মধ্যে উষশী শুধু ওটসই খায়। কলা বা আপেল দিয়ে বানানো ওটস পছন্দ করে সে। তবে বাকিগুলো সচরাচর দরকার পড়েনা। তাই একসাথে এতকিছু দেখে অবাক হলেনই বটে। তাও যাওয়ার সময় নিয়ে যাবেন ভেবে, আপাদত ফোন পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে যাবেন, এমন সময়ে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে কিছু একটা অনুভব করে হালকা সরে দাঁড়ালেন। সরে দাঁড়াতেই, সিঁড়ি ঘরের যে স্থানে সে দাড়িয়ে ছিল অল্প ক্ষণের জন্য ফোন নিয়ে। সেখানটায় হাওয়ায় হাত রাখতে দেখা গেলো যুবতী একটি মেয়েকে। উমরানের কাঁধেই রাখতে গিয়েছিল হাতটা। সরে যাওয়ায় তা সম্ভব হলো না। সে হেসে উঠল উমরান অকস্মাৎ সরে গেছে বুঝে।
_”ইশ!! চুপি চুপি এসেছিলাম। ভেবেছিলাম ভয় দেখাবো। তাও বুঝে গেলেন দেখি অফিসার। এত নির্ভুল আন্দাজ কিভাবে লাগান?”
উমরান তির্যক নয়নে চেয়ে কথাগুলো শুনলো,
_”মিসেস সুলেমানও দেখছি আজকাল স্বামী সন্তানদের মতো স্বভাবে আচরনে নিজের বংশপরিচয় দেয়।”
রিশা বুঝলো তার মা তখন সে বাড়িতে নেই বলে মিথ্যা বলেছিল বলে কটাক্ষ করছে উমরান।
_”ওসব দিকে গিয়ে সময় নষ্ট না করি…” ভ্রু উচিয়ে কথাটা বলে ফের নিজেই বলে,
_”অনেকদিন পর দেখা পেলাম আপনার। ভালোমন্দ জানতে চান… আমিও শুরু করি আলাপ-সালাপ।”
_”এসব ফাত্রামি বারে প্রতিদিন যাদের সাথে শুয়ে পড়ো তাদের সাথে গিয়ে করো। প্রস্টিটিউট কোথাকার।” শেষ শব্দ দুটো বিড়বিড় করে বললেও রিশার কানে গেলো।
তবে ওকে বলতে না দিয়ে উমরান নিজের আবার বলেন,
_”সব কথা তোমার মাকে বলে এসেছি যদিও, তাও গরীব দোস্ত মানুষদের খাতিরে আরেকবার রিপিট করায় যায়। শুনো, যে বাচ্চামিগুলো করছ বাপ ভাইয়ের কারণে অযথা প্রতিশোধপরায়ন হয়ে! ওসব ছেলেখেলা ছেড়ে ভালো পথে আসো। লাভের লাভ কিছু হবেনা। মাঝখান দিয়ে তুমিও বাপ ভাইয়ের সাথে কারাগারে ঢুকে পড়লে তোমার মা টা বাইরের দুনিয়ায় অসহায় হয়ে পড়বে। তাই এখনো সময় আছে। শুধরে যাও।”
_”ওপস, ভয় পেয়ে গেলাম যে। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে আমার। গরীব দোস্ত ভেবে দয়ার খাতিরে এতকিছু করলেন। একটু বিছানায় এসে গাঁ টাও গরম করে দিন প্লিজ। খুব উপকার হবে। আর আপনাকে কে বললো আমি বাপ ভাইয়ের কারণে প্রতিশোধপরায়ন হয়েছি? ওসব তো যেদিন ওদের শুনানির ডেটে কোর্টে গিয়ে আপনাকে দেখলাম, সেদিনই দাফন হয়ে গেছে। বরং প্রতিশোধের আগুন এখন অন্য আগুনে রুপ নিয়েছে। একবার আপনাকে পেলেই সে আগুন নিভে যাবে ট্রাস্ট মি! আপনি, আপনার ফ্যামিলি কারো দিকে আর চোখ দেবো না। জাস্ট একবারের জন্য রাজী হয়ে যান। নাহয় লাইফে কিছুদিন পর পর এমন ছোটখাটো থ্রিল এবার থেকে হরহামেশা পাবেন চলতে ফিরতে।”
তির্যক নয়নে চেয়ে সব কথা শুনলেন উমরান। কিছু বোঝার মতো করে মাথা নেড়ে এক কদম এগিয়ে এসে রিশার সামনে নিরাপদ দূরত্বে দাড়ালেন। দাঁতে নিচের ঠোঁটের একপাশ অল্প একটু কামড়ালেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। মনে হলো কিছু ভাবছে। অদ্ভুদ এক আত্মবিশ্বাস চোখে। কিন্তু তাও রিশাকে বিভ্রান্ত করতে তা দেখালেন না বুঝি! অল্প একটু ঠোঁট কামড়ে না বুঝার মতো করে তার দিকে তাকিয়ে বলেন,
_”একটু বেশিই সাহস দেখিয়ে কথা বলে ফেললে না রিশা?”
_”সাহসের আর কি দেখলেন? আপনি একবছর বউ ছাড়া থেকেও একবারের জন্য সুযোগ দিলেন না আমাকে, এর মধ্যে খবর পেলাম সাধনার বউটার খোঁজও পেয়েছেন। ইশ! ঘুম হারাম হয়ে ছিল এতদিন পর বউ পেয়ে কিভাবে কিভাবে না আদর করছেন ভেবেই। অথচ আমার মতো একজনের কাছে অফার পেয়েও একবছর উপোষ থাকলেন। ইগোতে লেগেছে খুব। তাই একটু থ্রিল দিলাম লাইফে। বাই দা ওয়্যে এনজয় করেছেন তো?”
_”থ্রিল এঞ্জয় না করলেও এতদিন পর বউ পেয়ে শীতের রাতগুলো খুব এঞ্জয় করেছি ট্রাস্ট মি। যেমনটা ভেবেছ, অনেক অনেকভাবে আদর করেছি বউকে। এক বছরের উপোষের পর সামনে মধু পেলে যেমন হয়? ঠিক তেমন। কিন্তু আমাকে তুমি এত সুন্দর একটা থ্রিল উপহার দিলে, আর আমি রিটার্ন গিফট করলাম না। এটা কি সুন্দর দেখায় বলো? আমার একটা ক্লাস আছে না?”
রিশার আত্মবিশ্বাসী চোখে কিছুটা কৌতূহল জাগে। চোখের নৃত্যে বোঝালো কি থ্রিল দেখতে চায়।
উমরান সুন্দর একখান হাসি উপহার দিয়ে বললেন,
_”একটু অপেক্ষা করো। থ্রিলিং একটা উপহারের খবর আপনা-আপনি তোমার কাছে চলে আসবে। এত অধৈর্য হলে হয় বোকা মেয়ে? যার সাথে শুতে চাইছ। তার ঝাঝ সবাই নিতে পারে নাকি? তুমি তোমার বেডমেটদের কাছে যে সুখ পাও? আমার জনের চেহারার দিকে তাকালেও আমি তার চেয়ে হাজারগুণে শুদ্ধ, হাজারগুণ সুখময় এক শান্তি পায়। আর বিছানাতে তো বলার অপেক্ষা রাখেনা। ঐ একজনকে পেলেই হয়, রাস্তার মেয়েদের দরকার পড়েনা। আমায় যেভাবে চাইছ সেভাবে নাহয় নাই পেলে, আমার দেওয়া থ্রিলের ঝাঝটা কেমন হয় সেটা হলেও উপভোগ করো তুমি আজ। ওকে?”
কথাটা বলে আর অপেক্ষা করলেন না। চলে আসলেন ওখান থেকে। তবে রিশা কিছুটা তির্যক নয়নে চেয়েই দাড়িয়ে রইলো। তাকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে এতটুকু বুঝলো। নাহয় কিসের কি উপহারের কথা বললো?
উমরান ওখান থেকে আসতে আসতে কাউকে একটা ভিডিও পাঠিয়ে, ঐ ভিডিও নিয়ে কিছু একটা করতে বললেন মেসেজে। এরপর আর কিছুই করেন নি।
রিশা তখন অল্পক্ষণের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে উমরানকে এত তাড়াতাড়ি যেতে দিলো ভেবে আফসোস করছিল। বাসায় ঢুঁকে বসার ঘরের খাটটাতে গাঁ এলিয়ে মাকে এক গ্লাস পানি দিতে বলে সে। বেশ কয়েকবার বলে, তারপর ভেতরের রুম থেকে এলো, কিন্তু পানি নিয়ে নয়। হাতে ফোন নিয়ে আতঙ্কিত চোখে হতদন্ধ হয়ে এগিয়ে আসছিলেন।
রিশা তখন শুয়ে আছে অদ্ভুদ ভঙ্গিতে বিছানায় গাঁ এলিয়ে। মায়ের এমন আতঙ্কিত চেহারা দেখে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করবে। তার আগেই তার মা ফোনটা এনে সামনে ধরলো।
রিশার অসংখ্য ছেলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই লিস্টে তার নিজের বন্ধু, কিংবা ভাইয়ের বন্ধু - কোনোটাই বাদ যায়নি। এমনকি বাবার এক বন্ধুর সাথেও অবৈধ সম্পর্ক উপভোগ করেছে সে। ছোট থেকেই উগ্র আর বেপরোয়া রিশা। ভাইয়ের মতো স্বভাব চরিত্র। অসংখ্য ছেলের সাথে উঠাবসা কিংবা শোয়া আছে তার। জীবন বিন্দাসভাবে উপভোগ করবে, টাকা উড়াবে, যা চাই ভোগ করবে - এটুকুই তার জীবন।
তার বাবা ভাই সেনাবাহিনীতে থাকলেও দেশের প্রতি নিবেদিত কোনো মানসিকতা ছিলনা কোনোকালে। বরং টাকার খেলই বুঝে তারা। সেভাবেই সেনাবাহিনীতে থাকলেও তার ফায়দা তুলেই নানান অপকর্ম চালিয়ে যায় নিখুঁতভাবে। উমরান তাদের সাথে একই সেনানিবাসে যোগ দেওয়ার পর ওসব ধরতে পেরেছিল এখানকার কমান্ডে পরিচালিত অন্য মিশনগুলো বারবার ফেইল হওয়ার পেছনের হেতু কিংবা ত্রুটিসমূহ নিয়ে স্টাডি করতে গিয়ে।
এরপর ভাবনা চিন্তা করেই ওদের বিষয়টা গোপনীয়ভাবে অন্যান্য সিনিয়রদের কাছে তুলে ধরে সবটা তাদের উপর সপে দিতো। কিন্তু রাওফানের শ্রেয়সীকে নিয়ে ঘটানো ঘটনার পর অকস্মাৎ মেজাজ খুইয়ে ফেলেছিল। তার উপর ছেলের কীর্তি জেনে সাবেক কর্নেল সুলেমান নিজেই ছেলের জন্য শ্রেয়সী চাইছিল। একথা শুনে আর সামলাতে পারেনি নিজেকে কোনোভাবে। সবটা খোলামেলাভাবেই সবার সামনে তুলে ধরে। সুলেমান সাহেবের মতো মানুষ প্রতিশোধ নেবে এ জানা কথা। কিন্তু উমরান ভেবেছিল পেশাগত দিক দিয়েই আক্রমণ করবে। যদিও পরিবারকেও নিরাপদে রাখতো ঝুকি না নিয়ে। কিন্তু বেশি নজর পেশাগত দিকেই দিয়েছিল, আর সুলেমান সাহেবও আদতে পেশাগত দিকেই আক্রমণ এনে উমরানকে বিপদে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু মাঝখান দিয়ে জেলে থেকে পালিয়ে থাকাকালীন সময়ে রাওফান শুনলো শ্রেয়সীর বিয়ে হয়ে গেছে, সাথে সে তখন প্রেগন্যান্ট। তার উপর বিয়ে হয়েছে তাদের এক্সপোজ করা ঐ অফিসারের সাথে। মিশনে যাওয়ার আগে অবশ্য একবার তাকে এই নিয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু নেহাতই চোখে পড়েছে বলে মানবতা থেকে সতর্ক করেছে এমনটাই ছিল তার ভাবনা। কিন্তু তার সাথেই বিয়ে হয়েছে, আবার বাচ্চার মাও হচ্ছে শুনে তখনই সে উগ্র হয়ে উঠে। বাবার সাথে মিলে প্রতিশোধ নেওয়ার ভাবনা বাদ দিয়ে দেয়। কারণ বাবা চাইছিল অন্যভাবে উমরানের ক্ষতি করতে। আর সে শ্রেয়সীর বিষয়টা শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেছে রাগে ক্ষোভে। তাই নিজেই লোক লাগিয়ে নানান সুযোগ খুজছিল শ্রেয়সীর ক্ষতি করার। এসিড মে ‘রে কিছু একটা করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ পায়নি। শেষে তার লাগিয়ে রাখা লোকগুলো তাদের চট্টগ্রাম যাওয়ার দিন গাড়ির ব্রেকফেল করার সুযোগ পায়। আর ওটাই ঘণ্টাকখানেকের মধ্যে নিভিয়ে দিলো তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুন। কিন্তু এরপর কিছুদিন শান্তিতে পালিয়ে বাঁচতে পারলেও, তা আর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সে ছিল তখন সেন্ট মার্টিন। লাস্যময়ীদের নিয়ে উপভোগ করছিল দ্বীপভ্রমণ। উমরান অনেক খোঁজ অনুসন্ধানের পর ওদের ওখানে থাকার খবর পেয়েছিল। যদিও নিশ্চিত ছিল না। আবার কোনো এক রাজনৈতিক দলের মন্ত্রীর পরিবারের মহিলা সদস্যরা নাকি ওখানে ভ্রমণে যাবে। সেই মহিলাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল তার সহকর্মী বন্ধু মেজর রায়হান। তার নিরাপত্তা টিমের মধ্যেই মিশে গেছিল সে নিজের মিশনের প্রত্যেককে নিয়ে। এটা ঝুকিপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পরিবারের সদস্যের নিরাপত্তা টিমে নিজেদের ঢুকিয়ে ফেলেছিল অনেক কারসাজি করে। রায়হানকে এসব জানিয়ে উমরানের মিশনে সাহায্য করায় রাজী করাতেও কম বেগ পোহাতে হয়নি। বন্ধু হলেও প্রফেশনে ঝুকি নেওয়া সকলের ইথিক্সের সাথে যায়না। কিন্তু ঝুকি নিয়ে হলেও তাই করলো। তারপর ওখান থেকে রাওফানকে লক্ষ্য করা হলো। সেন্ট মার্টিন থাকতেই সে খবর পেয়ে যায় উমরানদের উপস্থিতির বিষয়ে। চারদিক থেকে নজর রাখা হচ্ছিল। শেষে টেকনাফের জাহাজপুরার একটি নিষিদ্ধ এলাকায় গাঁ ঢাকা দেয় সে।
পরবর্তীতে ওখান থেকেই ওদের ধরেছিল উমরান। অবশ্য রাওফানের বাবাকে ছেলের মাধ্যমে পরে আটক করে। কিন্তু মূলত এরপরই রাওফানদের জীবনে ধ্বস নামে। তাদের দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা সব সম্পত্তি, ব্যাংক ব্যালেন্স সরকারের নিলামে উঠে। আর বাবা ছেলের আটক হওয়ার সাথে সাথে বাইরে মা মেয়েও ঘর ছাড়া হয়। রিশা বাবা ভাইয়ের শুনানির জন্য যেদিন কোর্টে যায়, সেদিনই উমরানকে দেখেছিল। এরপর থেকে তার পেছনে লেগে ছিল। বারেবারে নানান ভাবে বাজে প্রস্তাব দিয়েছে সে। কখনো সরাসরি সামনে এসে, কখনো ফোনে। উমরান সেসব বারবার উপেক্ষা করে যেতো।
কিন্তু সেই মেয়েটা হিংসার বশবর্তী হয়ে তার বউ আর মেয়ের উপর হামলা চালাবে ভাবতেও পারে নি। ভেবেছিল নতুন শত্রুর উপদ্রব। কিন্তু গতদিনের ঐ লোকটা জবানবন্দি দিয়েছে রিশা-ই তাকে ভাড়া করেছিল ওদের উপর হামলা চালাতে।
রাগে হিতাহিত জ্ঞান খুইয়ে তখনই ঐ মেয়ের ভিডিও নেটে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল কাউকে দিয়ে। রিশার ওসব ভিডিও জোগাড় করতেও বেশি বেগ পোহাতেও হয়নি। যার তার সাথে শুয়ে পড়া প্রস্টিটিউট একটা।
সহকর্মী বন্ধু রায়হানের অনেক বুঝানোর পর ওটা দিয়ে ভয় দেখিয়েই দাবিয়ে রাখবে ভেবেছিল। আজ মায়ের সাথে ভেতরে রিশাও থাকলে তখনই সম্মানহানীর অস্ত্র যে আছে সেই ইঙ্গিত দেবে ভেবেছিল। কিন্তু তা হয়নি। তাই ওয়ার্নিং দিয়েই চলে আসে। কিন্তু মেয়েটা সহ্যসীমার বাইরে চলে যাওয়ায় না চাইতেও লাগাম টেনে দিতে হলো প্রথম সতর্কবার্তা দেওয়ার দিনেই। এখন অ্যাডাল্ট ওয়েবসাইটে ক্লিয়ার ভিডিও দিয়ে দিয়েছেই। সাথে সেসব ঝাপসা করে সোশ্যাল মিডিয়াতেও কিছু কিছু তুলে ধরেছে। এসব সেনসিটিভ বিষয় ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয়না। তার উপর রিশার এসবে আকৃষ্ট মানুষজনের সাথে পরিচিতি বেশি। তাই একটু তাড়াতাড়িই খবর পেয়ে গেলো।
___
শ্রেয়সী তখন মেয়েকে নবজাতকদের যেভাবে কোলে নেওয়া হয়, ঠিক সেভাবে নিয়ে বসেছিল বারান্দায় বেতের চেয়ারগুলোর একটায় বসে। পড়নে স্ট্রেইট নেক কাটের একটি বক্ষযুগল বেধে রাখা টপ্স। আর নিচে বরাবরের মতো শ্রেয়সী ভাব এনে দেওয়া স্কার্ট। তবে টপ্সের উপরে একটা লেডিস সুয়েটার আছে। যেটার একাংশ কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছে সে। খেয়াল করলে দেখা যাবে শুধু সুয়েটারের একাংশ নয়, টপ্সটির একপাশে কাঁধের চিকন ফিতেটাও নামানো। শুধু তাই নয়, বক্ষযুগল বেধে রাখা টপ্সটির ফিতে নামানো ঐপাশের বুক হতে টপ্সও নামানো। উষশীকে ওদিকে করে শুইয়ে বুকে মুখ লাগিয়ে দিয়েছে। আর আদুরে কণ্ঠে এটা ওটা বলে চু ‘ষতে শিখিয়ে দিচ্ছে।
উমরান বাড়ি এসে বসার ঘর, রান্নাঘর আর রুম খালি দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে মা মেয়ে কোথায় আছে খুজছিল। রুমে এসে বারান্দায় অল্প স্বল্প আওয়াজ পেয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে ভেবে নিশ্চুপ হয়ে ধীরে দরজায় এসে দাড়ায়। কিন্তু এ দৃশ্য চোখে পড়বে ভাবতে পারেনি। হতবম্ব সে। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। পাগল হয়ে গেলো নাকি মেয়েটা?
_”শ্রেয়সী… কি করছ এসব?” আশ্চার্যান্বিত কণ্ঠ তার।
সেই কণ্ঠের আওয়াজ শুনে উষশী খুশিমনে মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে ফিরে তাকালেও, শ্রেয়সী ঘাবড়ে গেলো কিছুটা। উষশীকে ঠিকভাবে নিয়ে তার দিকে ফেরে। উমরানের চোখে তখনো দ্বিধান্বিত আর বিস্মিত চাহনি। শ্রেয়সী এর হেতু বুঝে বুকের টপ্স ঠিক করে দেয়।
উমরান হাতের বড় পলিথিন মুড়ানো জিনিসগুলো একপাশে রেখে কাছে এগিয়ে আসে।
_”এটা কি করছিলে? পাগল হয়ে গেছ? তোমার ব্রেস্ট মিল্ক আসবেনা। এক বছর গ্যাপে আপনাআপনি ব্রেস্ট মিল্ক আসেনা শ্রেয়সী।” তার গালে হাত দিয়ে কিছুটা হতাশ কণ্ঠে বুঝানোর মতো করে বলে উমরান। শ্রেয়সী জবাবে কিছু বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু ওপাশে পলিথিনটা দেখে বলে,
_”সব নিয়ে এসেছেন? নাকি কিছু বাদ পড়েছে? আমার সব লাগবে কিন্তু। ওটা এদিকে এগিয়ে দিন তো। নাকি কিছু আনতে ভুলে গেলেন দেখি।”
_”আমি সব নিয়ে এসেছি দেখে দেখে। তুমি আগে আমার কথা শুনো। এক বছরের গ্যাপে আপনাআপনি ব্রেস্ট মিল্ক আসেনা।” উমরানের ধারণা শ্রেয়সী এক বছর গ্যাপে যে সন্তান দুধ পান করতে চাইলেই আসেনা এ কথা জানেনা বলেই মনে আশা রেখে একাজ করছিল। তাই কোমল কণ্ঠে বুঝানোর মতো করে বলে।
শ্রেয়সী অবশ্য অকস্মাৎ স্বামীর ঐ মুহূর্তের আগমনে লজ্জ্বা পেয়েছে ভেতরে ভেতরে। সে এড়িয়ে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু স্বামী সে জানেনা এমনটা ভেবে নিয়েছে বুঝতে পেরে লাজ লুকিয়ে বলে,
_”আমি জানি আসেনা সেটা। আপনাকে অতো ভাবতে হবেনা। যা আনতে বলেছি এনেছেন কিনা সেটা বলুন!”
উমরান দেখল অল্প লজ্জ্বা পেয়েছে মেয়েটা। কিন্তু সে তখনও দ্বিধান্বিত। জেনেই থাকলে ওমন কাণ্ড করলো কেন?
সে জিনিসগুলো তাকে দিয়ে পাপার কোলে আসতে উৎসুক উষশীকে কোলে নেয়। কাঁধে নিয়ে শ্রেয়সীকে বলে,
_”তাহলে জানলে ওটা কি করছিলে?”
শ্রেয়সী লোকটা ফের ঐ বিষয়ে কথা তুলছে দেখে নাক ফুলিয়ে তাকায়। আশ্চর্য! দেখতে পাচ্ছে সে লজ্জ্বা পাচ্ছে। তাও এই নিয়ে কথা তুলতে হবে কেন? কিন্তু ভেবে দেখল উষশীর বাবাকে না জানালে যা চাইছে কিছুই হবেনা।
সে ইতস্তত করে স্বামীর শাঁর্টের হাতা ধরে বলে,
_”শুনুন, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা গাঁইনি ডক্টর, নাহয় শিশু বিশেষজ্ঞ কোনো ডক্টরের এপয়েনমেন্ট নেবেন। আমার ডক্টর দেখাতে হবে তাড়াতাড়ি।”
_”আবার ডক্টর কেন? কি হয়েছে তোমার?” কপালে চিন্তার ভাঁজ এঁটে জানতে চান। আবার শিশু বিশেষজ্ঞও বললো মনে হলো!
উমরান কিছুই বুঝতে পারছেনা শ্রেয়সী চাইছে কি, করছে কি! না পেরে আবার নিজেই বলে,
_”শ্রেয়সী তোমার মনে কি চলছে আমাকে একটু খুলে বলো তো। পাগল বানিয়ে দিচ্ছ আমাকে। এসে থেকে কি বলছ কিছু বুঝতে পারছিনা।”
_”আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” কথাটা বলে উমরানের দিকে তাকায়। সে নিজেও কৌতূহলী চোখে চেয়ে আছে কি সিদ্ধান্ত শুনতে।
বুঝে শ্রেয়সী বলে,
_”বাচ্চাদের তিন বছর অব্দি মায়ের দুধ খাওয়ানো যায় জানা মতে। তাহলে উষশীর তো এখনো এক বছর চলছে। এক বছর চলে গেছে তাতে কি? এক বছরের জন্য বাকি দুবছর বাদ দেবো কেন তাইনা? ওকে আবার দুধ খাওয়ানো শুরু করতে চাই আমি। ডক্টর দেখায় আমরা প্লিজ?”
শ্রেয়সীর চোখে মুখে অনুরোধ, যেন মানা না করে। সে তার মেয়েকে বাকি দুবছর নিজের বুকের দুধ খাওয়াতে চায়। যেভাবে হোক তার বুকে উষশীর জন্য দুগ্ধ ফিরিয়ে আনতে চায় সে। যা করার দরকার সব করবে। কিন্তু এক বছর তো চলতে পেরেছে মায়ের দুধ ছাড়া! একথা ভেবে বাকি দুবছর সে অবহেলার চোখে দেখতে চায়না মোটেও। উমরানকে নিজের দিকে অদ্ভুদ এক কোমল নজরে তাকাতে দেখে সে নিজেই আবার বলে,
_”এই যে দেখুন। নেটে আমি অনেক কিছু জেনে নিয়েছি। চেষ্টা করলে বুকের দুধ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ২-৪ সপ্তাহ পুষ্টিকর খাবার খেয়ে নিয়মিত চেষ্টা করলেই হবে। সাথে উষশীকেও বুক ধরতে শেখাতে হবে। ও শিখতে না পারলে ব্রেস্ট পাম্প ইউজ করবো নাহয়। কিন্তু আমি আজ অনেকক্ষণ ওকে ওভাবে নিয়ে বসেছিলাম, শিখিয়ে দিচ্ছিলাম। ও একেবারেই বিমুখ হয়ে থাকেনা। আরেকটু সময় নিয়ে রেগুলার শেখালে উষশীও পারবে। প্লিজ, একটা ডক্টর দেখিয়ে ওষুধ টষুধ নেওয়ার দরকার পড়লেও নিই? একটু চেষ্টা করলে পারবো দেখবেন।”
ব্যাকুল কণ্ঠ তার। সে খুব করে চায় দুধ ফেরাতে। মেয়েকে দুধ খাওয়াতে। যে ভেবেছিল আর সম্ভব হবেনা। আজ শাশুড়ি মা আর ননদের সাথে ফোনে কথা হয়েছে অনেকক্ষণ। তার শাশুড়ি আফসোস করছিল তার নাতনিটা তারা থাকলে বয়স অনুযায়ী আরও পরিপক্ক হতো ভেবে। দাদা দাদীর কাছেই নাতি নাতনিরা মূলত পাকনা পাকনা কথা শেখে। পরিপক্ক হয়। তাদের নাতনি না জন্মের কিছুদিন পর থেকে মাকে ঠিকঠাক পেলো, না দাদা দাদী, না একটা সুস্থ পরিবার। মায়ের বুকের দুধটুকু ঠিকঠাক পায়নি। না জানি বড় হয়ে এসবের কোনো বিশেষ প্রভাব পড়ে কিনা। যদিও মাকে ফিরে পেয়েছে, আস্তে আস্তে বাকিদেরও ফিরে পাবে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অব্দি কি একাকিত্মই না ছিল নবজাতক বাচ্চাটার জীবনে।
উষশীর দাদীর এসব হাঁ হুতাশের পর শ্রেয়সীর মাতৃ মনটায় মেয়ের ঐ একাকিত্মের সময়টুকু ভেবে দমবন্ধ লাগছিল। নিশ্চয় তুলি আপুর বাচ্চারা এক মুহূর্ত তুলি আপুকে না দেখলে যেমন চটফট করে তেমন করতো তার মেয়েও। তার উপর তার মেয়েটা তো নবজাতক ছিল। কিভাবে থেকেছে তাকে ছাড়া, সবাইকে ছাড়া। এসব ভেবে চারপাশটা দমবন্ধকর লাগছিল তার। মেয়েক বুকে নিয়ে অনেকক্ষণ বুকের সাথে লাগিয়ে রাখে। শেষে কি ভেবে অকস্মাৎ মেয়েকে বুকের দুধ বাকি দুবছর খাওয়াবেই -এই সিদ্ধান্তে আসে সে। আর নেটে নানান তথ্য দেখে অনেক ধারণা নিয়েছে। দিনে ৮–১২ বার বুক ধরতে দিতে হবে বাচ্চাকে, মাকে প্রচুর পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, স্কিন-টু-স্কিন কন্ট্যাক্টসহ এমন আরও অনেক কিছু নিয়মিত মানতে হবে। দরকার পড়লে ল্যাকটেশন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে জানিয়েছে নেটে। এভাবে রিল্যাকটেশন সম্ভব। চেষ্টা করলে দেরি হলেও আসবে। না আসার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। তাও সে চেষ্টা করবে যেটুকু সম্ভাবনা আছে এতে। সেটা হোক কম বা বেশি।
উমরান তার চেহারায় কোমল নেত্রে নজর বুলিয়ে বলেন,
_”ওকে বুক ধরানো শেখাচ্ছিলে?”
_”হ্যাঁ। আর ও একেবারেই বিমুখ হয়ে থাকেনা সত্যি। অনেকটা পারে। পুরো শেখানো কঠিন হবেনা। কাল পরশু যায় ডক্টর দেখাতে?” শ্রেয়সী সাথে সাথে জবাব দেয়।
_”নেটে যা যা বলেছে তোমাকে, ওসব জানি। কিন্তু অনেক সময় শত চেষ্টা করেও সম্ভব হয়না। এটা দেখেছো তো? তার উপর তোমার দীর্ঘ গ্যাপ। নিশ্চয়তা নেই শ্রেয়সী।”
শান্ত কণ্ঠ তার। শ্রেয়সী বলে,
_”হোক না। না হলে না আসবে। চেষ্টা তো করতেই পারি। যদি এসে যায়?” তাও সে চেষ্টা করে দেখবেই। উমরান শ্বাস টেনে বলেন,
_”কিন্তু আমি চেয়েছিলাম আগে সাইকোলোজিস্ট দেখিয়ে মেমোরি ফেরানোর বিষয়টা নিয়ে ভাবতে।”
শ্রেয়সী অসম্মতি জানায়,
_”না, ওটা পরে। ওটা আমারও মাথায় ছিল। একসাথে অতো প্রেশার নিতে পারবো না। আগে রিল্যাকটেশনের বিষয়টা নিয়ে ভাবতে চাই। সাইকোলোজিস্ট এর বিষয়টা নিয়ে পরে ভাববো, স্মৃতি ফিরতে যদি অনেক দেরি হয়ে যায়, ততদিন তো নষ্ট হয়ে যাবে। যতদিনে স্মৃতি আসবে, ততদিনে দেখা গেলো রিল্যাকটেশন হয়ে যেতো চেষ্টা করলে। তাহলে? এমন হলে অহেতুক সময় নষ্ট করা হয়ে যাবেনা? তাই ওটা নিয়ে পরে ভাববো।”
উমরান কি ধারণা করেছিল, আর কি বের হলো। ভেবেছিল আবেগী হয়ে না জেনে মেয়েকে দুধ খাওয়াতে চাইছিল শ্রেয়সী। কিন্তু সে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে বাকি দুবছর মেয়েকে দুধ খাওয়াবেই। অথচ তার ভাবনা ছিল শ্রেয়সী এখনো সেই আগের বাচ্চা মেয়ে। এখন যে তার মেয়েকে জন্ম দিয়ে নিজেও মা হয়ে গেছে তা ভুলেই যায় উমরান। মায়েদের মতো চিন্তাভাবনা করছে তার শ্রেয়সী। উমরান কল্পনাও করেনি সে কিছু ভেবে নিবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবে মেয়েকে সবটুকু আদর, ভালোবাসা, কিংবা তার প্রাপ্যটা দিতে। চেষ্টা করে না আসলে না আসবে, কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? এটাই ভেবেছে সেদিনের চঞ্চল পাখিটা। যার নিজের ভালোমন্দ নিয়েই সঠিক ধারণা ছিলনা। মেয়ের ভালোমন্দ ভাবছে। এত গভীরে ভাবছে। মা হয়ে গেলো বুঝি!! হবেই তো। মা -ই তো সে!! মায়ের মতো ভাবনা হবেনা?