শ্রেয়সী সাদার উপর গোলাপি ফ্লাওয়ার প্রিন্টের একটা সিল্ক কাপড়ের লং ফ্রক, আর তার উপর একটা স্টাইলিশ লেডিস সুয়েটার পড়েছে। গলায় লাভ শেইপের ডায়মণ্ড পাথরের লকেট, আর হাতে সিলভার প্লেটের ডাবল লেয়ার বাটারফ্লাই ব্রেসলেটসহ লেডিস ওয়াচ। কপালের দুপাশে কিছু চুল এনে রেখে আর অল্প কিছু আলাদা নিয়ে সামান্য পেঁচিয়ে ঘুরায়। তারপর পেছনে ক্লিপ আটকায় হাল্কা করে। বাকি লম্বাচুলগুলো পেছনে ছেড়ে রাখা। মইশ্চরাইজারসহ যাবতীয় সবকিছু লাগায়, ঠোঁটে লিপগ্লস দিয়ে এদিক ওদিক করে নিজেকে দেখে নেয় সে। গুচ্চির একটা ছোট সাইড ব্যাগ কাঁধে ঢুকিয়ে নিলো যাতে অপরপাশে কোমরে এসে পড়ে থাকে। সব শেষ করেও এদিক ওদিক ঘুরে নিজেকে দেখে সে।
_”রেডি হতে কতক্ষণ লাগে? উফ… বসে আছি একঘণ্টা।” বিরক্তির রেখা উমরানের ললাটে। বিশ মিনিট যাবত এসব দেখছে। উষশী আর সে সম্পূর্ণ তৈরি। পাপার পাশে রুমের সোফায় নিজের ছোট্ট ডল নিয়ে বসে আছে সে রেডি হয়ে। কখনো চোখ ঘুরিয়ে মাম্মার ঢং দেখছে।
উমরান তাড়া দিলে নিজেই বলেছিল বেশিক্ষণ লাগবেনা। আরেকটু পর রেডি হচ্ছি। এখন কত সময় যে লাগাচ্ছে। উমরান ফের বলেন,
_”সব তো দিয়েছ শ্রেয়সী। আর কিসের জন্য দাড়িয়ে আছ? বের হতে হতে এগারোটা বেজে যাবে। শীতের দিনে চোখের পলকে দেখবে বিকেল হয়ে এসেছে। ঘুরাঘুরি হবে আর?” স্বল্প বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে বলে সে। গাঁঁয়ে আটসাট সাদা শাঁর্ট, আর তার উপরে কালো ব্লেজার। চুলগুলো সর্বদা ন্যায় আর্মি কাটের, খুব গোছালো। হাতে রোল্যাক্স ঘড়ি।
হ্যান্ডসাম পুরুষ যাকে বলে। মেয়েদের এক দেখায় ক্রাশ খাওয়ার মতো। কিন্তু পাশে যে এক বছর বয়সী কন্যাটি তুলতুলে গাঁ খানা নিয়ে বসে আছে, তার চোখ দুটো মায়ের মতো হলেও গাল আর ঠোঁটদুটো যেন বাবার কার্বন কপি। তার উপস্থিতিই মেয়েদের এক দেখার ক্রাশ বাঁশে পরিণত হতে যথেষ্ট হবে। আর সুন্দরী এক রমণী তো আছেই ঘরণী হয়ে, তার সন্তানের মা হয়ে। মেয়েসহ মেয়ের মা পাশে থাকলে আর কারো বদনজর পড়ার সুযোগ হবে উমরানের উপর? বরং মুগ্ধ হয়ে দেখবে ভালোবাসার চিহ্নসহ সুন্দর একখানা দম্পতিকে।
_“দাড়ান দাড়ান, আর দুমিনিট।” কথাটা বলে তাড়াহুড়ো করে আরেকটা সামান্য বড় সাইজের ব্যাগ নিলো সে। ওতে একপাশে উষশীর জন্য এক্সট্রা পোশাক নেয়, সাথে নিজের একটি শাল আর টেবিলে রাখা ছোট টিফিন বক্সটিও ঢুকাতে দেখা গেলো। পরপর আবার বাবা মেয়ের সামনে এসে পারফিউম হাতের মধ্যে বেশি করে স্প্রে করে, পাপার পাশে সাহেবি সেজে বসে থাকা উষশীর কচি পাতার মতো হাতের কব্জিতে, আর কানের নিচে গলার দিকটায় নিজের স্প্রে করা হাতটা মেজে দিলো। এটা সে বোন তুলিকে দেখে শিখেছে। বাচ্চার গাঁঁয়ে সরাসরি স্প্রে করেনা সে, কেন কি জানি!!
_”হ্যাঁ, এবার চলুন।”
অবশেষে বের হলো তিনজন।
শ্রেয়সীকে সবকিছু একদিনেই জানানো উচিত হবে না। ভালো-মন্দ মিশ্র অনুভূতিতে তার কাছে সবকিছু আবার এলোমেলো লাগতে পারে। এতে ছোটখাটো যেকোনো মানসিক ধাক্কার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, সে তার অতীতের কিছুই মনে করতে পারছে না। এই অবস্থায় হতাশা কিংবা অজানা খারাপ লাগার অনুভূতি তার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই উমরান আজও শ্রেয়সীকে অতীত নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা থেকে দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। সারাদিন শ্রেয়সী আর উষশীকে নিয়ে ঘুরাফেরায় ব্যস্ত থাকবে। অবশ্য শুধু অতীত থেকে দূরে রাখতে বললেও ভুল হবে। ছুটিতেই যদি পরিবার নিয়ে আনন্দ-ঘুরাফেরা না করে, স্ত্রী-সন্তানকে সময় দিতে না পারে -তাহলে সেই ছুটির আর দরকার কি?
আজ ধরণীতে মনভরা রোদ, যা বিগত কয়েকদিন ধরে দেখা যায়নি। যেন অনেকদিন পর সূর্যমামা নিজেই এসে উপস্থিত হয়েছে।
শীতের সেই মিষ্টি রোদ মাথায় নিয়ে উমরান স্ত্রী আর কন্যাসহিত গাড়ি নিয়ে বেরোলেন ঘুরতে। শ্রেয়সী সওদাগর পরিবারের সাথে চট্টগ্রাম থাকলেও তার প্রথম এবং শেষ ঘুরতে বের হওয়া ছিল বোনের সাথে কক্সবাজার ভ্রমণ। তাও তুলি অকস্মাৎ ওমন ভ্রমণে মৌরিকে যুক্ত করতে বাবাকে অনেক বলে কয়ে রাজী করিয়েছিল। এরপরই শুরু হলো তার নতুন জীবনের মিথ্যা দিয়ে সাঁজানো গল্পের ইতি।
__
তারা বের হতে হতে প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। সবার আগে যাওয়ার গন্তব্য পাহাড়তলী ফয়’স লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে মা মেয়ে দেখছিল রাস্তাঘাটের নানান দৃশ্য, জনমানবের ভিড়, স্ট্রিট স্টল। লম্বা বাঁশের কাঠিতে গাঁথা রঙিন ফুল, হাওয়ায় ঘুরতে থাকা মিঠাই কিংবা বাচ্চাদের খেলনার পাখা, কোথাও একগুচ্ছ বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিক্রেতা। সব মিলিয়ে খুব উপভোগ করলো তারা। উষশীর জন্য রাস্তাঘাট মানেই সবকিছু নতুন।
এভাবেই দেখতে দেখতে গাড়ি ঢুকে পড়ে ফয়’স লেক এরিয়ায়। সেখানে এমিউজমেন্ট রাইডগুলোর সামনে উষশীর বেশ ভালো সময় কাটে। যদিও আগে থেকেই ভাবনা ছিল কোনো রাইডে জয়েন না করার, শীতের হাওয়ায় উষশীর ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। তবু অন্যদের রাইড দেখেই সে ভীষণ আনন্দ পাচ্ছিল।
পাপার কোলে গা নাচিয়ে দুলে উঠছে উষশী। কখনো এলোমেলো তালি দিচ্ছে, কখনো আঙুল তুলে শব্দ করে রাইডের দিকে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে। আবার কাছে গেলেই হঠাৎ ধুম করে পাপার কাঁধে মুখ গুঁজে লুকিয়ে পড়ছে। একটু পর দাঁড়ালেই আবার যেতে চায়, কিন্তু যায় না। রাইড শুরু হলেই আবার খুশিতে কোলের ভেতর নেচে ওঠে। যেন চড়ার ইচ্ছা আছে, আবার মনের ভেতর হালকা ভয়ও - এমনই তার কাণ্ড।
উষশীর এই আচরণ দেখে শ্রেয়সী নিজেও চোখে-মুখে উৎসাহ নিয়ে সবটা উপভোগ করছিল। হঠাৎ সে ডেকে ওঠে,
_“শুনুন…”
উমরান ফিরে তাকাতেই সে বলে,
_“আমরা জয়েন করি একটাতে? তেমন কিছু হবে না। স্পিড কমিয়ে দিতে বলবেন। নেক্সট রাইডে যাই?”
কণ্ঠে স্পষ্ট আগ্রহ। মেয়েকে নিয়ে চড়তে চায় সে। আশেপাশে আরও অনেক মাকেই বাচ্চা কোলে রাইডে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
উমরান প্রথমে কোনো উত্তর দিলেন না। কপাল কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোন রাইডটা নিরাপদ হবে তা যাচাই করলেন। তারপর উষশীকে মায়ের কোলে দিয়ে সেখানে দাঁড়াতে বলে নিজে একপাশে চলে গেলেন।
কয়েক মিনিট পর ফিরে আসলে শ্রেয়সী আবার বললো,
_“কি হলো? চড়বো না আমরা? ও দেখুন কত লাফাচ্ছে। একটা রাউন্ডে যাই না প্লিজ। স্পিড কমাতে বলবেন।”
উষশী তখন মায়ের কোলে বসে অন্যদের রাইড দেখে আনন্দে লাফাচ্ছে।
উমরান এবার বললেন,
_“হ্যাঁ, দাঁড়াও। মেরি-গো-রাইডে যাবে। এই রাউন্ডটা শেষ হোক।”
কথা বলতে বলতে দুজনকে নিয়ে ওদিকেই এগিয়ে গেলেন।
এর মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত রাইডের এক পাক শেষ হলো। সবাই নেমে পড়ল। চার থেকে দশ-এগারো বছরের বাচ্চারা ছিল, কারো কারো সঙ্গে অভিভাবকও। সব রাইডের গতি সমানভাবেই চলছিল। উমরান পুরো একটি রাউন্ড রিজার্ভ করে নিয়েছিলেন তখন, যাতে অন্য কেউ না থাকে এবং সর্বনিম্ন গতিতে চালানো যায়।
রাইড খালি হতেই শ্রেয়সী আর উষশীকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন।
শ্রেয়সী স্বানন্দে ঘোড়ার পিঠের বসার সিটে উঠে বসল। তারপর স্বামীর কাছ থেকে মেয়েকে হাত বাড়িয়ে নিজের কোলে নিল। মায়ের কোলে বসে উষশীও বুঝে গেছে এবার তারা চড়বে। সে মহাখুশি।
দুজন ঠিকঠাক বসেছে কি না নিশ্চিত হয়ে তবেই উমরান অপারেটরকে রাউন্ড শুরু করার অনুমতি দিলেন।
একেবারে নিম্ন গতিতে চলছে। উষশী আনন্দে ওখান থেকে হাত নাড়িয়ে “আআপ্পা, পা পা” করে বাবাকে ডাকছে ওদিক থেকে ঘুরে আসার সময়। হয়তো সে চড়ছে তা দেখাতে চাইছে পাপাকে। উমরান হেসে উঠলেন মেয়ের ইঙ্গিতে।
_”আমার আম্মা… পাপার কলিজা, মাম্মার সাথে চড়ছে? বাব্বা, চড়ো দেখি। পাপার অনেক ভালো লাগছে।”
আদুরে স্বরে মেয়েকে সাড়া দিতে দিতে ফোন বের করে ছবি তুলেন। মা-মেয়ের রাইড ভিডিও করেন। সে মায়ের কোলে আনন্দে লাফাচ্ছে একপ্রকার। রাউন্ড শেষ হলে উষশীর আগ্রহ দেখে আবার কার রাইডে গেলেন উমরানসহ। শ্রেয়সীর জোরাজোরিতেই যেতে হলো তাকে। কিন্তু বিপত্তি হলো উষশীকে নিয়ে। সে আগেরটা ঠিকমতো উপভোগ করলেও কার রাইডে চড়তে সময় অকস্মাৎ ভয় পেয়ে কেঁদে উঠলো। বাবার কাঁধে শক্ত করে পড়ে থাকে শব্দ তুলে কাঁঁদতে কাঁঁদতে। যেন কেউ নিয়ে যাচ্ছে তাকে। কি আশ্চর্য! একটু আগেও তো ঠিক ছিল। বাবার সাথে রাইড পেয়ে ন্যাকু হয়ে গেলো নাকি? মাঝ রাইডেই নেমে যেতে হয় তাদের। নেমে বাবা মায়ের আরও আদর সোহাগ নিয়ে তবেই ক্ষ্যান্ত হলো সে।
দুপুরের আগ অব্দি সময়টা ওখানেই কাটে। তারপর আশপাশের একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলো। উষশীর খাবার নিজে বানিয়ে টিফিন করে নিয়ে এসেছিল শ্রেয়সী। তাকে ওসবই খাওয়ায়। জিরিয়ে ফের বের হয় তারা অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
এবার যাবে ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায়। আধ ঘণ্টার মতো লাগলো পৌঁছাতে। সবার আগে একটা ক্যাফেতে ঢুঁকে তারা। উমরানের কয়েকজন পুুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা করে ক্যাফেতে। তারা ট্রেনিং এর পুরো সময়টা জুড়ে একসাথে ছিল। এরপর একেকজনের একেক জায়গায় পোস্টিং হলে আলাদা হয়ে যায়। যারা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে আছে, তাদের সবার সাথে দেখা হলো। স্ত্রী কন্যাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। উমরানের বিষয়ে তারা সবটা জানে। তার স্ত্রী নিখোঁজ হওয়া। এক বছর ধরে এমন মেয়ে নিয়ে তো স্ত্রীকে খোঁজার চেষ্টায়, আবার এসবের পেছনে যারা ছিল তাদের শাস্তি দেওয়ার চেষ্টায় - এসবেতে মগ্ন ছিল সে। তার উন্মাদের মতো শ্রেয়সীর অনুসন্ধান, দিনরাত এক করে এক্সি ‘ডেন্টের কালপ্রিটের জীবনে ধ্বস নামাতে মিশনে পড়ে থাকা - সবটা জানে তারা। উমরানকে অবশেষে তার বউ আর মেয়ে নিয়ে একসাথে দেখে সকলে খুব শান্তি পেলো।
ওখানে বন্ধুদের সাথে দেখা শেষে ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ার নিরিবিলি দিকটায় যায় তারা হাঁটতে। মাঝে মাঝে কয়েকজন চোখে পড়লেও তেমন কোলাহল নেই। শ্রেয়সী আর উষশীকে নানান ভঙ্গিতে কতক ছবি তুলে দেওয়া হলো। উষশী বাবার কোলে, শ্রেয়সী স্বামীর বাহু ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে সেসব ছবি দেখছিল। আর এটা এমন হয়েছে, ওটা ওমন হয়েছে অভিযোগ করছে স্বামীর কাছে।
_”এক্সকিউজ মি…” পাশাপাশি কথা বলতে বলতে হাঁটতে গিয়ে অকস্মাৎ কারো ডাকে থেমে যায় তারা। শ্রেয়সী ফোন হতে নজর সরায়। পাশ ফিরে কয়েকটা মেয়েকে দেখলো সে। ওদের মধ্যে যেজন তাদের ডেকেছে, তাকে বেশ কৌতুহলী দেখাচ্ছে,
_”আপনি উমরান তাওসিফ চৌধুরী, আর ইনি আপনার ওয়াইফ শ্রেয়সী নেওয়াজ। তাইনা?” বেশ আগ্রহ তার চোখে।
শ্রেয়সী আর উমরান এঁকে অপরের দিকে তাকালো। তারা কেউ চেনেনা মেয়েটিকে। উমরান কপালে ঈষৎ ভাঁজ ফেলে বলেন,
_”ইয়াহ, আমরা বলছি” তারপর থেমে ফের বলে,
_”আমরা কি কোনোভাবে পরিচিত?”
_”নো নো। একচুয়ালি আমি আপনাদের চিনি। আই মিন, সেভাবে পরিচয় নেই আপনাদের সাথে। তবে চিনি।” ওরা কিছু জিজ্ঞেস করার আগে মেয়েটা নিজেই আবার বলতে থাকে,
_”আসলে আপনার ওয়াইফের, আই মিন উনার… ডেলিভারির দিন ঐ হস্পিটালে আমার বোনেরও ডেলিভারি ছিল। আমরা আপনাদের দেখেছিলাম পরদিন। সেভাবে পরিচয় না হলেও মুখ দেখা চিনতাম আপনাদের। দেন, মাস না পেরোতেই আপনাদের এক্সি ‘ডেন্ট নিউজ দেখলাম। উনি তো নিখোঁজ ছিলেন তাইনা? উনার ছবি দিয়েছিল একটা নিউজে, দেখেই চিনতে পেরেছিলাম বাড়ির সবাই। এই যে আমার কাছে এখনো আছে ঐ ছবিটা।” থেমে আবার বলে,
_”ট্রাস্ট মি, আমার বোনের পরিবারসহ আমরা বাড়ির প্রত্যেকে জাস্ট শকে ছিলাম আপনাদের ওই নিউজ দেখে। আপু তো উনি নিখোঁজ শুনার পর কেমন ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছিল বাচ্চার কথা ভেবে। আজ হঠাৎ এভাবে আপনাদের দেখা পাবো কল্পনাও করতে পারিনি। আমার সত্যি খুব ভালো লাগছে আপনাদের একসাথে দেখে। সবসময় উনার খোঁজ পাওয়া গেছে এমন নিউজ আসে কিনা অপেক্ষায় থাকতাম। কতশত প্রার্থনা করেছি উনার খবর পাওয়ার। কিন্তু মাসের পর মাস গেলেও কোনো নিউজ দেখলাম না আর। আজ আপনাদের দেখে প্রথমে মনে হচ্ছিল আমি ভুল দেখছি। কিন্তু উনার সেই একটা ছবি এখনো আছে আমার ফোনে, দেখুন। আবার ছবি দেখে তবেই শিউর হলাম যে আসলেই আপনারা।” কথাটা বলে ফোনটা এগিয়ে দেখালো, স্ক্রিনে ঝলঝল করছে শ্রেয়সীর একটা হাস্যোজ্জ্বল ছবি। পাহাড়ি রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে পেছন হয়ে দাড়িয়ে আছে। মাথাটা ঈষৎ কাত করে মুখে হাসি টেনে ক্যামেরার দিকে তাকানো।
মেয়েটার অবাক আর আগ্রহী চিত্তের সব কথা শুনে ছবিটাও দেখল তারা। উষশী বাবার কোলে থেকে নতুন মানুষ দেখছে। উমরান শুনে বলেন,
_”থ্যাংক্স, আপনাদের দোয়ায় আমাদের রাখার জন্য। আর অচেনা হয়েও শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকার জন্য। মেইবি আপনার মতো অচেনা আরও অনেক শুভাকাঙ্ক্ষিদের দোয়ায় ওকে ফিরে পেয়েছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।”
মেয়েটা তেমন বড় নয় যে আপনি ডাকতে হবে। তাও অচেনা মেয়েটির প্রতি ভদ্রতাসূচক সম্বোধন রাখলেন উমরান। শ্রেয়সীও হেসে ধন্যবাদ জানালো।
_”ও আপনার সেই মেয়ে তাইনা? ওকে কোলে নিতে পারি একবার?” মেয়েটার আবদারে শ্রেয়সী উষশীকে স্বামীর কাছ থেকে নিয়ে তার কোলে দিলো। কিন্তু উষশী বেশিক্ষণ থাকল না অপরিচিত এক আন্টির কোলে। তার চুল ধরে টেনে কান্না তুলবে তার আগেই নিয়ে নিলো শ্রেয়সী।
মেয়েটা হেসে উঠে উষশীর কাণ্ডে। ফের বলে,
_”আপনাদের সাথে একটা ছবি তুলতে পারি? আমি বাড়ির সবাইকে দেখাতে চাই আপনাদের। জাস্ট ওয়ান পিকচার প্লিজ।” মেয়েটার অনুরোধ কণ্ঠে তারা মানা করলোনা। তাদের তিনজনের সাথে একটা সেলফি নিলো সে। তারপর অল্প সৌজন্য কথা সেরে বিদায় নেয়।
উমরানও উষশীকে কোলে নিয়ে শ্রেয়সীর পাশাপাশি হাঁটতে থাকে, উষশী ‘বা বা বা’ করে অহেতুক শব্দ তুলে চারদিকটা দেখছে। দুইয়েকটা পাখি উড়তে দেখা গেলে তার খুশিরও অন্ত থাকেনা। হাতে আঙ্গুল দেখিয়ে নিজেই দেখে, আবার হেসে উঠে।
তার পায়ের ছোট্ট জুতোগুলো লুজ হয়ে গেছে দেখে উমরান তা ঠিক করে দিলেন। কিন্তু অকস্মাৎ খেয়াল হলো, শ্রেয়সী কেমন চুপচাপ হয়ে আছে, চেহারা দেখে কেমন থমথমে লাগছে। উমরান কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগে শ্রেয়সী নিজেই বলে,
_”মেয়ে মানুষ দেখলে বেশি মিষ্টি করে কথা বলতে ইচ্ছে করে তাইনা?”
_”মানে? কি বলছ?” কপাল ভাঁজ ফেলে জানতে চাই সে। বুঝতে পারছেনা কথার মানে।
_”মানে মেয়েটার সাথে এত গুছিয়ে, সুন্দর করে কথা বলার কি দরকার ছিল? পাশের মেয়েগুলো কোলে উষশীকে, পাশে আমাকে দেখেও কেমন করে আপনার দিকে তাকিয়ে ছিল দেখেন নি? আপনি চুপ থেকে ওর সাথে কথাগুলো আমি বললে কি বিশেষ ক্ষতি হয়ে যেতো?” থমথমে কণ্ঠ তার। উমরান হতবম্বই হলো বটে। সে তো শুধু ঐ মেয়েটাকেই খেয়াল করেছে যার সাথে কথা হয়েছে। পাশে আরও মেয়ে যে ছিল চোখেই পড়েনি তেমন। অন্যকেউ ছিল শুনে কারা দেখতে পেছনে মাথা কাত করে তাকাতে চাইবে তার আগে শ্রেয়সী বলে,
_”আবার ওদিকে ফিরছেন কেন আশ্চর্য?”
কানের কাছে ধমক কণ্ঠে অকস্মাৎ চমকিত হয়ে ফেরে সে। এখনো সবটা বুঝে উঠতে পারছেনা। কি থেকে কি কারণে এত রাগছে মেয়েটা।
_”মেয়েগুলোর এমনিতেই চোখ বের হয়ে যাচ্ছে আপনাকে দেখতে দেখতে। আবার এই লোক পেছন ফিরে তাকিয়ে সিগনাল দিচ্ছে…” শ্রেয়সীর নিজেরও চমকিত নয়ন। ওদিকে ফিরতে চাইছে আবার। অবাক হবেনা?
উমরান ওকে এত হাইপার হয়ে যেতে দেখে বলেন,
_”আচ্ছা রিল্যাক্স। আমি জাস্ট আরও কেউ ছিল শুনে কৌতূহল থেকে দেখছিলাম। নাথিং এল্স।”
শ্রেয়সী অল্প বিরক্তি আর নারাজগি ধরে রেখে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকায়। তা দেখে উমরান ফের বলেন,
_”আরেহ বলছি তো এত কিছু খেয়াল করিনি আমি। নাহয় কোনো কথা বলতাম না। আর ওরা দেখলেও বা কি? আমাকে যেমন দেখছে তেমন কোলেরটা আর পাশেরটাও নিশ্চয় দেখেছে? সো রিল্যাক্স। দে আর নোবডি।”
তাও চুপ থাকল শ্রেয়সী। নীরবে কদম ফেলতে থাকে। চারদিকে মানুষজন নেই তেমন। দুয়েকটা ছেলে আর অল্প দূরে ঐ মেয়েগুলোই আছে, ছবি তুলছে। কখনো বা এদিকে তাকাচ্ছে, তা শ্রেয়সী জানে। উমরান ওকে নিশ্চুপ দেখে মুড এখনো খারাপ নাকি বুঝার চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে শ্রেয়সীর আনমনা কণ্ঠ কানে আসে,
_”আচ্ছা আমায় যদি আর খুঁজে না পেতেন?”
অকস্মাৎ উমরানের চেহারার ভাবভঙ্গি বদলাতে দেখা গেলো।
_”এসব ভাবছ কেন হঠাৎ?”
_”না, এমনি। আমায় যদি আর খুজে না পেতেন তাহলে কি হতো? উষশী আমায় ছাড়া বড় হয়ে যেতো। আমার চেহারাটাও মনে থাকতো না ওর তাইনা?” থেমে আবার বলে,
_”তারপর বড় হয়ে অন্যদের মায়ের ভালোবাসা পেতে দেখলে ও খুব কষ্ট পেতো। আচ্ছা আপনি কি ওর জন্য সৎ মা এতে দিতেন মেজর?” উমরানকে জবাব দেওয়ার সময় না দিয়ে নিজেই আবার বলে,
_”এক বছর নানা কারণে অপেক্ষা করেছেন, কিন্তু আরও কয়েকবছর কেটে গেলে কি আবার বিয়ে করে নিতেন না? আপনারও তো বউয়ের দরকার পড়তো। কিংবা উষশীর জন্য মা দরকার ভেবে হলেও বিয়ে করে নিতেন তাইনা? তারপর নতুন সংসার, নতুন পরিবা… আহহ!!” আনমনে নানান কিছু বললেও শেষ কথাটা আর সমাপ্ত করতে পারল না সে। নরম ওষ্ঠাধরে কারো দাঁতের কামড়ে চিনচিনে ব্যাথায় থেমে যেতে হয়। নোনতা স্বাদ পাচ্ছে মুখে। দাঁতে কামড়ে র ‘ক্ত বের করে দিয়েছে। শ্রেয়সী হাতের আঙ্গুলে ঠোঁট ছুঁয়ে ব্যাথাতুর নয়নে সম্মুখের স্বামীপানে তাকায়। আশ্চর্য! কিভাবে কামড়ে দিলো হঠাৎ। বাবা মেয়ে দুটোই তার খুব কাঁছাকাছি। উষশী এমন দৃশ্যে মজা পেয়েছে। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সে।
শ্রেয়সী মেয়ের থেকে চোখ সরিয়ে আশেপাশে তাকায়। ঐ মেয়েগুলো তো দেখেছেই, সাথে ততক্ষণে দূরের ঐ কয়েকটা ছেলেও এদিকে চলে এসেছিল, ওরাও দেখে নিয়েছে। কেমন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। সে অল্প লাজে নজর সরিয়ে সামনে তাকায়। নাক ফুঁলিয়ে বলে,
_”কি করলেন এটা? সবাই কি ভাবছে? আর আমি কতো ব্যাথা পেলাম? পাগল হয়ে গেছেন?”
উমরান গাম্ভীর্য ধরে রেখে রাগী দৃষ্টিতে ওকেই দেখছিল। ওর প্রশ্নের জবাবে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
_”বেশ করেছি, আবার দেবো।” বলতে না বলতে বা -হাঁতে তার গালটা ধরে ঈষৎ উপরে তুলে নিয়ে ফের কামড় বসায়। উষশী নিজেও বাবার সাথে সাথে মায়ের দিকে হেলে যাচ্ছিল। সে আবার এমন হওয়ায় খুশিতে অল্প তালি দিয়ে উঠে।
_”তোমাকে খুঁজে না পেলে আমি আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি অপেক্ষা করতাম। আজ দিলাম এই প্রশ্নের জবাব। সামনে থেকে যেন এই প্রশ্ন, আর যা যা অগ্রীম চিন্তা করলে ওসব মাথায় না আনা হয়। বুঝেছ?” গম্ভীর কণ্ঠ তার।
শ্রেয়সী বুঝলো তার স্বামী রেগে গেছে। কিন্তু আশপাশের ছেলেমেয়েগুলোর সামনে এমন পরিস্থিতিতে পড়ায় তার লজ্জ্বায় কোথাও লুকিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। সে উমরানের বুকেই মুখ গুজে খানিকটা কাছে এসে। বাহু ধরে মিনমিনিয়ে বলে,
_”আচ্ছা আর বলবো না। এখন এই জায়গা থেকে যাই প্লিজ। ওরা কিভাবে দেখছে!”
____
এখন সময়টা বিকেল। তারা ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া থেকে বের হয়ে টাইগারপাস রাউন্ডরুট বেয়ে সোজা জামাল খান চলে এসেছে। সেখান থেকে চেরাগী পাহাড় মোড়।
চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার। এটা মূলত পাইকারি বাজার। ছোট-বড় মিলে মোট ৬২টি দোকান আছে এই বাজারে একাধারে। ফুলপ্রেমী শ্রেয়সীকে এই ফুলের হাট দেখানোর চেয়ে অন্য কিছু দেখানোতে বেশি আনন্দ দেবে বলে মনে হয়না উমরানের। তাই নিয়ে চলে এলো এখানটায়। সরাসরি রাস্তার পাশে ছোট বড় দোকানগুলো আছে প্রায় শতাব্দী ধরে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ফুল হাট। দুই পাশে গুচ্ছ গুচ্ছ ছোট বড় দোকানগুলোতে ফুলের বাহারি রঙের সমুদ্র। জুই, চম্পা, সূর্যমুখী, রজনীগন্ধা, মালতি, চামেলি, আর্কিড, গোলাপ, জবা, লিলি, পলাশ, গাঁধা - কোনোটাই বাদ নেই। দোকানগুলো সব সাজানো, ছোট কাঠের বা টিনের ঘর। ফুলগুলো টাঙানো, সাজানো, ঝুলানো কিংবা ঝুড়ি ভরে দোকানের সামনে রাখা। হাওয়ার সঙ্গে সুবাস ছড়াচ্ছে চারপাশে।
শ্রেয়সী হতবাক এই দৃশ্য দেখে। সে জানতোনা এমন কোনো ফুলের রাজ্য আসলেই আছে এই শহরে। মেয়েকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে দেখছে সে সবটা। কখনো ঝুলিয়ে রাখা ফুলগুলো ছুঁয়ে দেয়। ইশ!! এত সুন্দর চারপাশটা। বাজারের মাঝের এই রাস্তা বেয়ে কয়েকটা সাইকেল আর ভ্যান যাচ্ছে যেগুলোতে পেছনে গুচ্ছ গুচ্ছ করে অনেকগুলো ফুল আর ফুলে বুকি নেওয়া। কি যে সুন্দর সে দৃশ্য! স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে তার। ঘুরেফিরে হতবাক নেত্রে দেখে সে সবটা। উষশী নিজেও মায়ের চেয়ে কম বিস্মিত নয় কোনো অংশে।
উমরান পকেটে হাত গুজে তাদের পেছন পেছন হাটছে। বিকেল হয়ে আসায় ঠাণ্ডা লাগছে। পেছন থেকে শ্রেয়সীর দুপাশে হাত বাড়িয়ে কোলে থাকা কন্যার মাথার টুপি ঠিকঠাক করে দিলো সে। একটা দোকানের সামনে দাড়িয়েছে তখন তারা। শ্রেয়সী ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখে বলে,
_”আপনাকে ধন্যবাদ। আমি এমন জায়গা আসলেই আছে জানতাম না। ভীষণ ভালো লাগছে।” উৎফুল্ল আর চমৎকৃত কণ্ঠ তার।
ফের যুক্ত করে, _”এত সুন্দর চারপাশটা, ইশ!! ঘ্রাণটা শুকে দেখুন একবার।” বলে সে নিজেই চোখ বন্ধ করে চারপাশ থেকে শ্বাস টেনে ঘ্রাণটা শুষে নিলো।
_”আকক!!”
অকস্মাৎ কারো ব্যাথাতুর কণ্ঠে শ্রেয়সী চোখ খুলে আতঙ্কিত হয়ে পেছন ফিরে। সাথে সাথে ঘাবড়ে গেলো সে। উমরান একটা লোকের সাথে দস্তাদস্তি করছে। লোকটার হাতে ছু’ রি। তাদের খুব কাছেই, উমরান দস্তাদস্তি করে ধা ‘ক্কা দিয়ে লোকটাকে তাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গেলো। শ্রেয়সী বুঝল তাদের উদ্দেশ্যে খারাপ মতলবে ছু ‘রি ব্যবহার করতে চেয়েছ লোকটা। হৃদয়টা কেঁপে উঠলো তার। কোমর থেকে নিয়ে উষশীকে বুকে লাগিয়ে নিলো সে। চারপাশ থেকে লোক জড়ো হচ্ছে। লোকটার সাথে উমরানের ভীষণ হাতাহাতি চলছে। শ্রেয়সী আতঙ্কে একটু কাছে এগিয়ে আসে। চিল্লিয়ে বলে,
_”মেজর, কি করছেন। লেগে যাবে। দূরে সরে যান প্লিজ। আপনার লেগে যাবে।” ব্যাকুল কণ্ঠ তার। ছু’ রি দেখে খারাপ আশঙ্কায় বুক কাপঁছে। আশপাশটাতেও হইচই পড়ে গেছে ততক্ষণে।
উমরান শ্রেয়সীর কথা কর্ণপাত করলেন না। হাতাহাতির এক পর্যায়ে কায়দা করে ছু ‘রিটা নিয়ে নিলো সে, কেউ কেউ বুঝেছে ছু ‘রি হাঁতে লোকটা হামলা করতে এসেছিল তাদের উপর। পুলিশে খবর দিয়ে দিলো। ছু’ রিটা পাশের এক লোককে দিয়ে গাঁঁয়ের জ্যাকেটটা খুলে শ্রেয়সীকে দিয়ে দেন উমরান। তারপর বেধড়ক মার শুরু করলেন। ছাব্বিশ/সাতাশ বয়সী কোনো যুবক। দেখতে সন্ত্রা ‘সীদের মতো। চোখগুলোই তার প্রমাণ। গাঁয়ের রং শ্যামকালো। খোয়েরি রঙা শাঁর্টের উপর একটা পুরোনো ধরণের শীতের লম্বা জ্যাকেট পড়া। তখন শ্রেয়সীর কথা বলার মাঝেই হাঁটতে হাঁটতে তাদের গাঁ ঘেঁষে দাড়িয়ে ছু ‘রি চালিয়ে দিতে চেয়েছিল।
উমরান মারতে মারতে আধমরা করে ফেলছেন, কানের কাছে ঘুষি দিতে দিতে বলেন,
_”কে পাঠিয়েছে বল। বাস্টার্ড, জীবিত ফিরতে পারবি না আজ এখান থেকে। বল কে পাঠিয়েছে।” লোকটা মুখ খুললো না। উমরানকেও পাল্টা আঘাত করতে চাইছে। কিন্তু মার খেয়ে প্রায় আধমরা সে। কান দিয়ে র ‘ক্ত বেরুচ্ছে।
_”কু ‘ত্তার বাচ্চা। এত সহজে কাজ সেরে ভেগে যাবি ভেবেছিস? আজ ওদের শরীর থেকে এক ফোঁটা র ‘ক্ত বের হলে এখানেই জ্যান্ত কবর দিতাম তোকে। শুয়োর কোথাকার। বল কে পাঠিয়েছে?”
নাক, কানের দিকটা আর বুকে অনবরত আক্রমণে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে লোকটার। তাও ছাড়াছাড়ির নাম নেই উমরানের।
_”মেজর, ছেড়ে দিন না, লেগে যাবে আপনার। চলে যায় আমরা। মেজর…” শ্রেয়সী ক্রমাগত চিৎকার করে চলেছে। ফিরে আসতে বলছে স্বামীকে। উষশী বুঝতে পারছেনা কিছু, এত চিৎকার চেঁচামেচি আর কোলাহলে সেও ভয় পাচ্ছে। কয়েকজন উমরানকে থামতে বলে। কিন্তু উমরান থামছেনা। ছাড়াতে এসে নিজেরাই আহত হয়ে দূরে সরে গেলো। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। শ্রেয়সী পুলিশ দেখে আতঙ্কে ফের চিৎকার করে উঠল,
_”মেজর… ছেড়ে দিন প্লিজ, পুলিশ আসছে।”
পুলিশগুলো কাছে এসে ছাড়াতে চাইবে তার আগেই উমরান পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দেখিয়ে ফের মারতে শুরু করলো। শ্রেয়সী বোধ হয় তার স্বামীর পেশা ভুলে গেছিল। এক মুহূর্ত আতঙ্কে ছেয়ে গেছিল বুকটা। পুলিশগুলো মানুষজন দূরে সরিয়ে দেয় কিছুটা।
_”বাস্টার্ড… আমার বউ বাচ্চাকে মারবি তুই? ওদের মারবি? কুত্তার বাচ্চা গোষ্ঠী শুদ্ধ হাইকোর্ট ঘুরিয়ে আনবো। বাস্টার্ড কোথাকার।” মারতে মারতে কথাগুলো বলে সে। শেষে পুলিশদের অনুরোধে আধমরা করে ছেড়ে দিলো।
কলার ঠেলে এক অফিসারের দিকে ছুড়ে বলে,
_”আজ রাতের মধ্যে কে পাঠিয়েছে জবান বন্দি নেবেন। বাইরে কারো সাথে কোনোপ্রকার যোগাযোগ যেন না হয়। কোনো জামিন হবেনা, আর না কারো সাথে দেখা করবে যতক্ষণ না কে পাঠিয়েছে বলছে।” ঠান্ডার মধ্যেও ঘেমে নেয়ে একাকার সে। শাঁর্টের হাতা গুটানো। মারপিট করে চুলগুলোও এলোমেলো হয়ে গেছে।
_”আমরা সর্বাত্মক চেষ্টায় থাকবো স্যার। আপনি টেনশন নেবেন না। ম্যাম আর আপনার সন্তানকে দেখুন। আমরা এর বিষয়টা হ্যান্ডেল করছি।”
পুলিশগুলো কথাটা বলে লোকটাকে জিপে তুলে। হামলার ছু ‘রিটাও নিয়ে নিলো অন্য লোকটার কাছ থেকে। চারদিকে তখনো কৌতূহলী মানুষদের ভিড়। উমরান এতক্ষণে ফিরে তাকালেন স্ত্রী সন্তানের দিকে। আতঙ্কে চোখ দিয়ে অশ্রকণা ঝরছে শ্রেয়সীর। বুকে মেয়েও অস্থির হয়ে উঠেছে। সে কাছে আসে। উষশীসমেত শ্রেয়সীকে বুকে টেনে নিলেন। কেঁদে উঠলো শ্রেয়সী।
_”লোকটা আমাদের মারতে এসেছিল? আমরা কি করেছি?” ক্রন্দনস্বর তার। উমরান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। দুজনের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলেন,
_”কিচ্ছু হয়নি, ইটস নাথিং। আমি আছি না? ডোন্ট প্যানিক সোনা। ইটস নাথিং…”
_”কিন্তু লোকটা আমাদের মারতে চাইছিল কেন? আমরা কি ক্ষতি করেছি তার?” তার প্রশ্নের জবাব দিলেন না উমরান। পাশের দোকানদার পানি এনে দিলো। উমরান বোতল খুলে শ্রেয়সীকে খাইয়ে দিলেন আগে। নিজেও কয়েক ঢোক পান করেন। আতঙ্কে মিইয়ে যাওয়া কন্যাকে কোলে নিয়ে শ্রেয়সীকেও অন্যহাতে আগলে নিয়ে আস্তে ধীরে ভিড় থেকে বের হয়ে আসেন।
__
উষশী বাবার কাঁধে পড়েছিল ভয়ে। ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। গাড়িতে তারা উঠেছে মাত্র। ততক্ষণে প্রায় সন্ধ্যা। গাঁঁয়ে জড়ানোর জন্য যে চাঁদরটা ব্যাগে নিয়েছিল, ওটা দিয়ে উষশীকে ভালো করে ঢেকেঢুঁকে দিয়ে কোলে নিয়ে বসেছে শ্রেয়সী। উমরান দুটো পানির বোতল কিনে একটা গাড়ির দরজা খুলে ডেস্কে রাখে। আরেকটা খুলে বাইরে হাত মুখ ধুয়ে নিলো। টিস্যু পেপারে সব মুছে নিয়ে ড্রাইভিং এ বসলো। সময় দেখতে ফোনের স্ক্রিন অন করতেই অসংখ্য ফোন কল ভেসে উঠে। কর্নেল কিবরিয়া, অর্ণব, সওদাগর বাড়ির অন্যান্যদের কল, আবার লন্ডন থেকে তার বাবা-বোনের কলও দেখা যাচ্ছে। কতক বন্ধুদেরও কল আছে দেখলো। কপালে ভাঁজ পড়লো তার। কার বিপদ হলো আবার!!
কাকে আগে ব্যাক দেবে ভাবতে ভাবতে ফের কল এলো বোনের। সে ওটাই রিসিভ করে,
_”হ্যাঁ বল, এত কল দিচ্ছিস কেন, কোনো সমস্যা?”
_”আমার সমস্যা মানে? তোরা ঠিক আছিস? কারো লাগেনি তো? উষশী, শ্রেয়সী - ওরা ঠিক আছে?” বিচলিত কণ্ঠ তার।
উমরানের কপালে ভাঁজ পড়ে। সিটবেল্ট লাগাতে লাগাতে বলেন,
_”হ্যাঁ আমরা সবাই ঠিক আছি। কারো লাগেনি। কিন্তু তুই জানলি কি করে হামলা হয়েছে?”
_”কি বলছিস? লাইভ দেখালো সোশ্যাল মিডিয়ায়। হট টপিক হয়ে আছে ফিডে। নেটে ঢুঁকে দেখ।”
শ্রেয়সী সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ক্লান্ত লাগছে হয়তো। তার দিকে একনজর তাকিয়ে উমরান বলে,
_”আচ্ছা আমি দেখছি, বাবা মাকে বলে দিস আমরা ঠিক আছি। কারো কিছু হয়নি। আরও ফোন আসছে সবার। এখন রাখি, বাড়িও ফিরতে হবে।”
ফোন কেটে দিলো। কাউকে কল দেওয়ার আগে নেটেই ঢুঁকে দেখল। তাদের ধস্তা’ ধস্তির শুরু থেকে ওখান থেকে চলে আসার পুরো সময়টা লাইভ দেখিয়েছে কেউ। ‘স্ত্রী আর কন্যার উপর ছু ‘রি চালানোর চেষ্টা করায় আততায়ীকে বেধড়ক পেঠাচ্ছে স্বামী। জানা গেছে স্বামী পেশায় একজন মেজর পদের সামরিক সদস্য উমরান তাওসিফ চৌধুরী।’ আরেকটার শিরোনাম ‘বউ বাচ্চার উপর হামলা চেষ্টা করায় আততায়ীকে ঘটনাস্থলে পিঠিয়ে আধম ‘রা করলেন স্বামী।’ আবার অনেকে ছবি তুলেছে। চারদিকে ফুল আর মানুষের কোলাহলের মাঝে শ্রেয়সী আর উষশীকে বুকে নিয়ে মাথায় চুমু খাওয়ার দৃশ্য, পানি খাওয়ানোর দৃশ্য -কেউ ফ্রেমবন্দি করেছে। সেসব অনেকে নানানরকম পূর্ণতার ক্যাপশন লিখে স্ট্যাটাস দিচ্ছে।
উমরান বিস্মিতই হলেন। এসব কবে করলো, আর কোনফাঁকে? আশ্চর্য!! সুদূর লন্ডন খবর পাঠিয়ে দিলো ঘটনা শেষ হতে না হতেই। এখন জনে জনে সবার ফোনে কৈফিয়ত দাও!! বিরক্তই হলেন। তবে লাইভে সব যখন দেখিয়েছে, তারা যে সুস্থভাবে ওখান থেকে ফিরে এসেছে তাও নিশ্চয় সবাই দেখেছে, কথাটা ভেবে ফোনটা বন্ধ করে রেখে দিলেন।
সিটে মাথা ফেলে মেয়েকে বুকে নিয়ে থাকা শ্রেয়সীর কাছে এসে গালে হাত রাখলেন,
_”শ্রেয়সী… শুনতে পাচ্ছ সোনা?”
‘উউম।’ শব্দে সাড়া দিলো সে। উমরান গালে হাত বুলিয়ে বলেন,
_”খিদে পেয়েছ তোমার? কিছু নিয়ে আসবো? নাকি বাড়ি গিয়ে খাবে?”
_”বাড়ি গিয়ে খাবো, মাথা ব্যাথা করছে। তাড়াতাড়ি চলুন প্লিজ।” চোখ বন্ধ রেখেই বলে সে। উমরান সামনে আসা চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে তার কপালে ঠোঁট ছুঁঁইয়ে সরে আসেন। সাইড মিররে চোখ বুলিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলেন।