নিশুতি রাত। বাহিরটা ঘন কুয়াশার আস্তরণে নিমজ্জিত। ঘুমিয়ে আছে সারা শহর।
ফুলবাড়ির দোতলার সেই কক্ষটিতে তখন তিনটি প্রাণের উপস্থিতি। অথচ কর্ণগোচর হচ্ছে কেবল দুজনার অস্থির শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতিধ্বনি। দেয়ালে নেচে ওঠা তাদের ছায়া দুটো একে অপরের সাথে মিলেমিশে একাকার। যেন কোনো ফাঁকফোকর নেই। দুটি দেহ, দুটি অস্তিত্ব পরস্পরের ভেতরে বিলীন হতে ব্যস্ত। একে অপরে মত্ত সেই দু-দেহের নিজস্ব প্রেমছন্দের অস্থির সুর থেকে থেকে কক্ষের দেয়ালে ভারী খাচ্ছে।
স্পন্দিত হৃদয় আর হাঁপানো নিঃশ্বাসের সাথে সাথে কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ঘর্মাক্ত শরীর আর প্রেমরসের অদ্ভুত এক ঘ্রাণ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই মুহূর্তে তৃতীয় কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই তাদের মাঝে।
তখন মৌরি…
উহু!
শ্রেয়সী।
মেজর উমরান তাওসিফ চৌধুরীর একাধারে দু’বার নিজের নামে সিলবদ্ধ করে নেওয়া স্ত্রী, উষশী তাওসিফ চৌধুরীর জন্মদাত্রী মা। কোনো কৃত্রিম পরিচয়ধারী মৌরি নয়।
উমরান যার মাঝে নিজেকে জাহির করছে, যার ভেতর নিজেকে বিলীন করছে - সে শুধু এবং শুধু শ্রেয়সী নেওয়াজ। শ্রেয়সী নিজে তা না জানলেও, এটাই চিরন্তন সত্য।
শ্রেয়সী ক্লান্ত; স্বামীর প্রেম উন্মাদনার মধুর ছন্দে তাল মেলাতে না পেরে মুষড়ে পড়েছে। ক্ষীণ কণ্ঠে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে উমরানকে থামতে বলে। কিন্তু উমরান তখনও ক্ষীপ্র গতিতে নিজের প্রেমপিয়াস মেটাতে ব্যস্ত।
কিছু মুহূর্ত পর আত্মতৃপ্তি মিললে কপালে আর অধরে অন্তিম মিলন স্পর্শ দিয়ে তবেই সে ছাড়ে শ্রেয়সীকে।
__
পাশাপাশি শুয়ে আছে দুজন। সফেদ চাঁদর গাঁঁয়ে শ্রেয়সীকে বুকে টেনে নিজের সাথে আগলে রাখেন উমরান। ক্লান্ত শরীর দুটো বিশ্রাম নেয়। নীরবতায় কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ।
তারপর ক্ষীণ, ক্লান্ত কণ্ঠে শ্রেয়সী বলে ওঠে,
_”উষশী হিসু করে দিলো নাকি দেখে আসুন উঠে। জেগে যাবে আবার।” উমরানের আঙুল তখন তার চুলের ভাঁজে আলতো করে চলেছে।
_”উহু, হিসু করলে নড়েচড়ে উঠবে। আমি দেখবো, তুমি ঘুমাও।”
আর কোনো কথা বলে না শ্রেয়সী। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে পড়ে থাকে উমরানের বুকে।
নীরবতার চাদর ভেদ করে কিছুক্ষণ পর ভেসে আসে উমরানের কণ্ঠ,
_”ঘুমাচ্ছ না কেন?”
সে জেগে আছে মেজর বুঝলো দেখে শ্রেয়সী কিঞ্চিৎ অবাক হয়। তবে শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,
_”এমনি। আপনি ঘুমাচ্ছেন না কেন?”
উমরান চাদরের ভেতর হাত বাড়িয়ে তার ধনুক ন্যায় বাঁঁকানো কোমরে রাখেন তা। নরম শরীরটা টেনে একটু ওপরে তুলে নেন। শ্রেয়সীর মাথা এসে ঠেকে তার চিবুকে। কানের কাছে মুখ এনে বলে,
_”এত চিন্তিত কি নিয়ে?”
শ্রেয়সী মাথা তুলে তার দিকে তাকায়। চোখের মণি ঘুরিয়ে স্বল্প কৌতূহলে বলে,
_”আমি চিন্তিত?” চাহনিতে সেই পুরনো শ্রেয়সী ভাবটা। উমরান তার নাকে আঙ্গুল ছুঁইয়ে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে বলেন,
_”তা তো তুমিই ভালো জানবে।”
_”তাহলে আপনি বলছেন যে?”
_”বলবো না? কাল থেকে আপনমনে কি এত ভাবা হচ্ছে?”
তার প্রশ্নে শ্রেয়সীর কৌতূহলী নেত্র কিছুটা নেতিয়ে গেলো। মুখ ফিরিয়ে ফের নীরবে স্বামীর বুকে মাথা রাখে। উমরানের উন্মুক্ত পুরুষালি বুকে আনমনে হাতের আঙুল চালায়, কি জানি কি আকিবুঁকি করছে! সময় নিয়ে নিজেই বলে,
_”তেমন কিছুনা, বেশিই দেখছেন।” নিম্নস্বর তার।
উমরান নিজের বাম হাতে শ্রেয়সীর গালে ছুঁয়ে আবার নিজের দিকে ফেরান।
_”আমার প্রতি খুব অবিশ্বাস তাইনা?”
_”তেমন কিছু না, ভুল ভাবছেন।” এড়িয়ে বলে সে।
_”ভুল ভাবছি? কাল থেকে অন্যরকম হয়ে আছ। তোমার মনে অজস্র প্রশ্ন, দ্বিধাদন্ধ, কৌতূহল, অনেক কিছু। তুমি জানো আমার কাছে আছে সেসবের উত্তর। আমি দিতেও চাই উত্তর, কিন্তু তুমিও জানো তুমি সেসব বিশ্বাস করবেনা। এজন্য নিজেই আমার কথা মানবেনা মনস্থির করে এখন আর কিছু জানতে চাইছ না।” একটু জিরিয়ে শ্রেয়সীর চোখে চোখ রেখে বলে,
_”এত অবিশ্বাস কেন? একটু শুনলে, কি বলতে চাইছি বুঝলে কি সমস্যা? কোথাও সব শুনলে আমাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য না হয়ে যাও, এই নিয়ে ভয় হয়? মানে দাঁড়ালো আমি যা বলব তুমি জানো তা মিথ্যে না। কিন্তু তাও ঠিক করে নিয়েছ বিশ্বাস করবেনা। আবার সব শুনলে বিশ্বাস করে ফেলবে ভয়ে এড়িয়ে যাচ্ছ। অল্প ইঙ্গিত পেয়েও আর জানতে চাইছনা কিছু। এত দ্বিধাদন্ধ কেন শ্রেয়সী?” তার গালে হাত রেখে কথাটা বলতে বলতে চোখে মুখে আকুলতা ভেসে উঠল উমরানের।
_”ইঙ্গিত যা পেয়েছ তার পর মনের ভেতর যা যা প্রশ্ন জাগছে তা জানাও, উত্তর শুনো, নিজেও ভাবো যা বলছি তা যুক্তিযুক্ত নাকি অবান্তর। সবটা নির্বিঘ্নে ভাবলে দেখবে নিজেই সব ঝট খুলে ফেলেছ। বাকি কিছু নিয়ে তাও দ্বিধা থেকে গেলে আবার আমায় জানাও, আমি মিলিয়ে দিচ্ছি সবটা। আমাকে এখনো বিশ্বাস না হলে যাকে বিশ্বাস হবে তাকে জিজ্ঞেস করো। সওদাগর বাড়ির যে কাউকে জিজ্ঞেস করো। সেও যদি আমার হয়েই বলে তাহলে সব মেনে নিতে কিসের আর দ্বিধা? আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তুমি এখন কিছু বিষয় বুঝেও স্বেচ্ছায় পালিয়ে বেড়াচ্ছ। কেন শ্রেয়সী? পালিয়ে আর কতদিন থাকবে? আমিই তোমার শেষ গন্তব্য। আমি আর আমার মেয়েই তোমার নিজ হাতে গড়ে আবার রেখে যাওয়া গোটা একটা জগত। তাদের থেকে পালিয়ে বেড়াবে? ”
শ্রেয়সী বুকে পড়ে থেকে সবটা শুনলো। সময় যায়, কিন্তু নীরবতা তখনো তাদের মধ্যে বাসা বেধে আছে। উমরান ভেবেছিলেন শ্রেয়সী এবার অন্তত কোনো প্রশ্ন রাখবে বিশ্বাস করার কিংবা সে যা বলবে তা ভেবে দেখার নিয়ত রেখে। কিন্তু কোনো শব্দ এলো না বুকের উপর পড়ে থাকা কোমল দেহের মেয়েটির তরফ থেকে। হতাশায় চোখ বুজে গভীর শ্বাস টেনে নিলেন উমরান। তবে একটুও বিরক্ত হলেন না স্ত্রীর উপর। বরং কোমল দেহী মেয়েটার পিঠে থাকা বন্ধন আরও দৃঢ় হলো। বিরক্তিসীমার চূড়ান্ত রেখা পার করলেও এই মেয়েটা তার মন অন্তঃস্থলের রাণী। দূরে সরানোর প্রশ্ন আসেনা। চোখ বুজে নেন শ্রেয়সীকে আর জোর না দিয়ে। কিন্তু কিছু সময় যেতেই অকস্মাৎ বুকে তরল জাতীয় পদার্থের স্পর্শে ভেজা ভাব অনুভব করে কিছুটা থমকালেন। সেকেন্ড কয়েক সময় লাগাল কি হচ্ছে বুঝে উঠার। নোনাজলে ভিজে উঠেছে বুকটা।
শ্রেয়সী কাঁদছে, বিচলিত হলো সে। কক্ষে ঘুমন্ত কন্যার উপস্থিতি মাথায় রেখে সংযত কণ্ঠে বলেন,
_”শ্রেয়সী… কি হলো? কাঁদছ কেন?” শ্রেয়সীর জবাব এলো না।
_”এই শ্রেয়সী, কাঁদছ কেন সোনা? কি হয়েছে? আমার কথায় কষ্ট পেয়েছ?”
বলতে বলতে তার মাথা তুলতে চাইলেন। কিন্তু শ্রেয়সী নড়ল না। আরও গভীরভাবে বুকের ভেতর মুখ গুঁজে ধরল। নিঃশব্দে কাঁদছে সে, নীরব কান্নার মাঝেই বারবার কেঁপে উঠছে তার শরীর। উমরানের বুক ভিজে একাকার হয়ে গেল তার অশ্রুজলে।
সে অধৈর্য হয়ে উঠে খানিক,
_”এই মেয়ে, কি হলো তোমার? আমি খুব সরি সোনা, আর এসব নিয়ে কথা তুলবো না প্রমিস। তুমি থামো। কোন কথায় কষ্ট পেয়েছ আমাকে জানাও, আমি কান ধরবো ট্রাস্ট মি।”
কিন্তু সেই আদুরে স্বরেও শ্রেয়সীর কান্না একটুও কমল না। বরং তার নরম বুক আর পিঠের কম্পন আরও স্পষ্ট জানান দিলো ভেতর থেকে কান্নার গতি বেড়েই চলেছে। যেন কাঁদতে কাঁদতে উমরানের বুকের ভেতর ঢুকে যেতে চাইছে সে।
উমরান নিজে ভেতরে ভেতরে অস্থির হলেও আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। শ্রেয়সীকে থামতেও বললেন না। এই কান্না যে গভীর কোনো জায়গা থেকে আসছে, তা সে বুঝতে পারছে। কেবল হেতু অজানা। তাই শ্রেয়সীর কাঁধে থাকা হাতের আলিঙ্গন দৃঢ় করে সময় দিলেন।
শ্রেয়সী তখনও অঝোরে কাঁদছে। মাঝে মাঝে নাক টানে, মাঝে মাঝে শরীর কেঁপে উঠে। সময় গড়ায়। সে কিছু বলে না। উমরান ধৈর্য ধরে থাকেন।
অবশেষে শ্রেয়সী নিজেই কাঁদতে কাঁদতে ঢোক গিলে মুখ খুলল,
_”আমি জানি সব।”
ওকে কথা বলতে দেখে হাফ ছাড়লেন উমরান।
_”আজ আলমারির নিচের ড্রয়ারগুলো খুলেছিলাম সব পরিষ্কার করতে গিয়ে।” উমরানের কপালে ভাঁজ পড়ল, কিন্তু মুখে নীরবতা। নরম আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছেন স্ত্রীকে।
শ্রেয়সী অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে আবার বলল,
_”আপনার বিয়ের সব ছবি দেখেছি। আপনার আর আপনার স্ত্রীর একত্রে সব ছবি, উষশী আর ওর মাম্মা পাপার সব ছবি।” বলতে বলতেই কেঁপে উঠল সে। থেমে আবার ভাঙা কণ্ঠে বলে,
_“ডক্টরের সব কথা তখন মাথায় ঘুরছিল। নিজেকে পাগল পাগল লাগছিল। মনে হচ্ছিল মাথাটা ফে ‘টে যাবে। আপনি তখন বাড়িতে ছিলেন না। অনামিকাকে ফোন দিয়েছিলাম - আমার বান্ধবী। সব ছবি পাঠাই, ডক্টরের সব কথা বলি। ও প্রথমে বলতে চাইছিল না। বারবার এড়িয়ে যাচ্ছিল। আমার তখন ইচ্ছে করছিল সব ভেঙে চুরমার করে দিতে।”
একটু দম নিয়ে আবার বলে,
_“পরে আমার অবস্থা দেখে ও সব সত্য বলে। আমি বাবা-মায়ের আসল সন্তান মৌরি সওদাগর নই। ওদের মেয়ে এক রাতে সুই ‘সাইড করেছিল। কাউকে ভালোবাসত সে। ওর গর্ভে নাকি সন্তান এসেছিল। অনামিকা ঐ মৌরিরই বান্ধবী যে মা ‘রা গেছে। মৌরির এসব ব্যাপারে কেউ জানতো না। আত্মীয়স্বজন, পরিজন কেউ না। সম্মানের ভয়ে বাবা চাচ্চুরা এসব কাউকে জানায়নি। সেই মৌরির জায়গাতেই আমি ছিলাম এতদিন। আমার কিছু মনে ছিলনা হয়তো তখনো। তাই ওদের মেয়ে হয়েই থেকে গেছিলাম।”
কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে আসে তার। অবিরত চোখের পানি ঝরছে,
_“অনামিকা বলল, এখন আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে সেই আমার স্বামী। আমার সন্তানও আছে।”
চোখের জল মুছতে না মুছতেই সে বলতে থাকে,
_”আমি সব শুনে আর কিছু বলিনি, ফোন কেটে দিই। বিশ্বাস হচ্ছিল না তখনো। মনে হচ্ছিল সব স্বপ্ন। অন্য ঘোরে আছি। স্বপ্ন ভাঙলে ঘোর কেটে যাবে। তারপর উষশী ঘুম থেকে উঠে কাদছিল। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। যা যা বুঝলাম তার মানে দাড়াচ্ছে ও আমার মেয়ে। অথচ আমার ঘোর কেটে গেলে আবার সব মিথ্যা এটা আমি জানি। কিন্তু উষশীকে কাঁদতে দেখে সেই প্রথম দিনের মতো বুকের ভেতর কেমন কাপঁছিল। ও আমার মেয়ে ভেবেই কেমন একটা লাগছিল। আমার মেয়ে আমার থেকে দূরে ছিল এতদিন। আমার ছোট্ট মেয়ে। এখন তো এক বছর চলছে ওর, তখন নবজাতক ছিল নিশ্চয়। আমাকে ছাড়া কিভাবে থেকেছে আমার মেয়েটা…” শ্বাস জড়িয়ে আসে তার। ঢোক গিলে আবার বলে,
_”এদিকে স্বপ্ন ভাঙলে সব ঠিক হয়ে যাবে আমি জানতাম। আবার সব ঠিক হলে তবে ফের আগের জগতে। আপনার প্রতারণায় দেওয়া এলোমেলো জীবন। স্বপ্নে থাকলে আপনি, আপনার মেয়েই সব। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম মেজর। পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম স্বপ্নে থাকলে, স্বপ্নের বাস্তবে এতদিনে সঠিক দিশায় এসেছে আমার জীবনটা। আবার বাস্তবে ফিরলে, বাস্তবের বাস্তবতায় স্বপ্নের সব মিথ্যা। তারপর ফের দ্বিধা, আর প্রতারক আপনিসহ আমার এতদিনের সুন্দর জীবনের ইতি। দু-দুটো পরিচয় আর কল্পনা-বাস্তবের মধ্যে দ্বিধা নিয়েই থাকলাম, কিছু মেলাতে পারছিলাম না। এর মধ্যে বাড়ির সবাই আসবে জানালে অনেক কষ্টে সব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলি। কিন্তু তখনও অনামিকা যা যা বললো তা মিথ্যা প্রমাণ হয়নি। বরং ওর কথাগুলো ছবিতে যা দেখেছি তা সত্য প্রমাণ করতে ব্যস্ত। আমার ঘোর কাটলনা। ওভাবেই বাড়ির সবার সাথে সময় কাটালাম। ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম অল্প একটু। ভাইয়া একবার জোর দিয়ে সেই আগের মতো আমাকে নিয়ে আমার দ্বিধা কাটিয়ে দিলে বুঝে নিতাম আমার ঘোর ভেঙে গেছে। আসলেই এতক্ষণ স্বপ্ন দেখেছি। আমি মৌরিই। অনামিকা মিথ্যা বলেছে। আপনার ড্রয়ারের ছবিগুলোও মিথ্যা। কিন্তু…” কান্নার ধমক আঁটকে বলে, _”কিন্তু ভাইয়া আগের মতো আমার নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধা এলে আর জোর দিয়ে বোঝাল না যে আমি মৌরিই। উল্টো আমার প্রশ্নটা করার সাথে সাথে ভাইয়ার চোখে যে ভয় দেখলাম, সেটাই আমার সব স্বপ্নকে বাস্তব প্রমাণ করে দিলো। ভাইয়া নিজেই বলেছে আমি যেন নিজে পরখ করে দেখি। আর আমিও বুঝলাম, আমি… আমি শ্রেয়সী, আপনার স্ত্রী আর উষশীর মা।”
থামলো সে। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে উমরানের বুক। তার কান্নার যে হেঁচকি তা স্পষ্ট জানান দেয় যে সে পারছেনা অজোরে কাঁঁদতে। হয়তো মাতৃমন এতকিছুর মাঝেও কক্ষে ঘুমন্ত সন্তানের উপস্থিতি খেয়ালে রেখেছে।
সময় বদলার, সাথে মানুষও। শ্রেয়সী এখন আর আগের মতো অতটাও অবুঝ নয় যে যুক্তি কি বলছে বুঝবেনা। ডাক্তারের সব কথা ক্ষণিকের বিভ্রান্তিতে ফেললেও সে ওসব বিষয় খুটিনাটি নিজেই বুঝে নিয়েছে পরবর্তীতে। আগেও নিজেকে নিয়ে দ্বিধা আসতো। কিন্তু সে অন্য কেউ হতে পারে এমন কিছু তার ধারণাতে ছিলনা বলে পরিবার যা বুঝিয়ে দিতো তাই ধরে নিতো। সেদিন রাতে উমরান কিছু কথা বলে দিয়েছিল। ওসব, আর ডাক্তারের কথাগুলো ভেবেই অজানা অস্বস্তি হয়। এসবের মধ্যে ছবিগুলো দেখে নিলো, যেখানে সে আর উমরান স্পষ্ট। সাথে তার সন্তান। না মানতে চাইলেও তখনই উমরানের সেরাতে বলা কথাগুলো মাথায় চলে আসে। সেই তার প্রথম স্ত্রী, আর উষশীর মা। আবার অনামিকা শ্রেয়সী সম্পর্কে জানাতে না পারলেও, আসল মৌরি সম্পর্কে জানিয়ে দিলো। সাথে অর্ণব; ভাইয়ের চোখে যে ক্ষীণ আতঙ্ক, তাদের ভুল বুঝে দূরে সরে যাবে আশঙ্কায় হাঁহাকার, আর লুকোচুরি শেষ হওয়ার গোপন স্বস্তি দেখেছিল মৌরি। তারপর আর কোথায় যেত সে না মেনে? এতকিছুর পর সব বুঝেও না বোঝার ভান করলে তো পালিয়ে বেড়ানোই হতো।
_”তাহলে কাঁদা হচ্ছে কেন?” এতক্ষণে উমরানের কণ্ঠ শুনা গেলো। ছোট প্রশ্নটা রেখে ঢোক গিলে সে আবার বলে,
_”কাঁদা হচ্ছে কেন শ্রেয়সী?” কথাটা প্রশ্নসূচক হলেও, উমরানের ভেতর থেকে কেমন প্রশান্তির আভা বের হলো। দীর্ঘ এক বছরের যন্ত্রণা আর অপেক্ষা থেকে রেহায় পাওয়ার আরও একটি মধুর ধাপ পেরোলো। শ্রেয়সীর নিরুদ্দেশ হওয়ার যতো দিন পার হয়, তত চারদিক থেকে নিশ্চিতবাণী পেলো যে তার শ্রেয়সী আর নেই। ম’রে গেছে সে। একটা মেয়ে এভাবে তো উধাও হয়ে যায়না। এত খোঁজ, অনুসন্ধানে যাকে পাওয়া যায়নি। সে বেঁচে থাকবে এ নিছকই মিরাক্কেল। যা সৃষ্টিকর্তা প্রসন্ন হয়ে ঘটালে তবেই ঘটে। এছাড়া নয়।
সেখানে যেই মেয়েটির আয়ুর ভাগ্যও বাবা মায়ের মতো না হয় কোথাও - এই নিয়ে আগে থেকেই চেনাজানাদের মুখে চর্চা ছিল। সেই মেয়েটির ক্ষেত্রে মিরাক্কেল ঘটা অকল্পনীয়ই বটে। তবু উমরান ধৈর্য হারায়নি। এক বারের জন্যও তাদের কথায় এসে মনকে মানতে দেয়নি যে শ্রেয়সী আর নেই। অপেক্ষায় ছিল সে। ওকে খুজে পাওয়ার অপেক্ষা। শ্রেয়সীকে না পেলে হয়তো এই অপেক্ষা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি থাকতো। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন তার। খুজে পেলো সে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। চারপাশের মানুষদের ওসব কথা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। অপেক্ষার এক ধাপ যেদিন ওর অস্তিত্বের জানান পেলো, সেদিন ফুরোয়। আরেক ধাপ তাদের বাবা মেয়ের জীবনে এনে ফুরোয়, আর আজ আরও একটি মধুর ধাপ ফুরোলো তার। বাকি শুধু ওর সবটা মনে পড়া।
ভাবনা চিন্তার মধ্যে উমরানের ‘কাদঁছ কেন’ প্রশ্নের জবাব কানে এলো,
_”কষ্ট হচ্ছে।” অতি কান্নায় শ্রেয়সীর কণ্ঠ যেন নাক থেকে আসছে। মাথাটা তখনো উমরানের বুকে।
_”কেন? শ্রেয়সী নেওয়াজ পরিচয়ে কষ্ট পাচ্ছ?”
সে মাথা নাড়ায়।
_”উষশীর মা বলে কষ্ট পাচ্ছ?” উমরান
আবার মাথা নাড়ায়।
_”সওদাগর পরিবারের আসল মৌরি নও বলে কষ্ট পাচ্ছ?”
এবার মুখে জবাব দিলো সে,
_”না…”
_”তাহলে?”
_”আমার কেন কিছু মনে পড়ছেনা উষশীর পাপা?” বড্ড ব্যাকুল শুনালো তার সেই কণ্ঠ। স্বামী সন্তান নিয়ে অনেক স্মৃতি দেখলো আজ সে। অথচ একটা ক্ষীণ পলও সে মনে করতে পারলো না এখনো অব্দি। অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারছেনা শ্রেয়সী।
_”আমি আপনাদের খুব করে মনে করতে চেয়েছি। ছবিতে আপনার আমার বিয়ের ঐ মুহূর্তগুলো, উষশীকে নিয়ে হাসপাতালে ঐ মুহূর্তগুলো - কোনোকিছু মনে পড়েনা আমার। কিচ্ছু না। স্বপ্নতে যা যা দেখি, ঐসবই আধো আধো মনে আছে। আর কিচ্ছু মনে আসেনা। কেন?” নাক টেনে উঠলো সে ব্যাকুল কণ্ঠে কথাটা বলে।
আজ সকালে গিয়ে গতকালের সব টেস্টের রিপোর্ট দেখে এসেছে উমরান। অস্বাভাবিক কিছু নেই। ব্রেনে কোনো ড্যামেজ নেই। অল্প যা ছিল সেসবের চিকিৎসা অর্ণবরাই করিয়ে ফেলেছে। শ্রেয়সীর চেকাপ করা সেই ডক্টর আর তার বাবার পরামর্শ অনুযায়ী উমরান সাইকোলজিস্ট এর শরণাপন্ন হবে ঠিক করেছে। কারণ যা বুঝলো সমস্যাগুলো শ্রেয়সীর মানসিক স্বাস্থ্যের। তারপর দেখা যাক কতটুকু উন্নতি হয়।
_”রিল্যাক্স। সব জেনে গেছো, আর মেনে নিয়েছ এটাই বেশি আজকের জন্য। এত প্রেশার নিয়ো না। সব মনে পড়বে আস্তে আস্তে। ট্রমায় ছিলে তাই কোনো সমস্যা হয়েছে হয়তো। অতিরিক্ত মানসিক আঘাত পেলে হয় এমনটা। ঘাবড়ানোর দরকার নেই। আমরা সাইকোলজিস্ট এর কাছে যাবো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে নিয়মিত কাউন্সেলিং এ গেলে।” আশ্বস্ত করে সে শ্রেয়সীকে।
শ্রেয়সী মানল তা। অনেকক্ষণ চুপ থেকে কান্না কমালো। উমরানও সময় দিলেন পিঠে, মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে। তারপর নাক টানতে শ্রেয়সী জানতে চায়,
_”আমার বাড়ি কোথায়?”
উমরান কপাল কুচকে বলে,
_”এটাই তো।”
_”না, বাবা বাড়ি।”
_”বান্দরবান।”
শ্রেয়সী বুঝলো স্বপ্নের ওসব আকাবাঁকা আর উচু নিচু রাস্তার হেতু।
_”আমার বয়স কতো? আমি অনেক বড় তাইনা?”
_”মানে? অনেক বড় মনে হচ্ছে কেন?” কিঞ্চিৎ ভাঁজই পড়লো ললাটে। বয়স কতো আবার কি?
শ্রেয়সী এবার নাক টেনে মাথা তুলে,
_”মানে আমি নিশ্চয় আরও বড় হবো? এখন তো উনিশে উঠেছি। উষশী এক বছর হলে আমি আঠারোতে নিশ্চয় মা হইনি?”
বিয়ে আঠারোতে হলে মা হওয়ার কথা অন্তত উনিশে পা দেওয়ার আগে আগে। সে এখনই উনিশ বছর, আর উষশী এক বছর হলে মা কখন হলো? আঠারোতে? তাহলে বিয়ে কখন হলো?
শ্রেয়সী আগের মতো আর অবুঝ নেই। অনেককিছু বুঝে। আঠারোর আগে নিশ্চয় বিয়ে হয়নি তার। তাও সামরিক বাহিনীর লোকের সাথে। তাই বয়স বেশি হবে এই আন্দাজই আসবে স্বাভাবিক।
_”আমাদের বিয়ে হওয়ার তিনমাস পর তুমি সতেরোতে পা দিয়েছ মেয়ে। আর মা হয়েছ বিয়ের ঠিক এক বছর পর। আর এখন উনিশে। সব গণনা ঠিক আছে। তোমার বয়সও। এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না তো। আজকের জন্য বেশি হয়ে যাচ্ছে।”
_”মানে বাল্যবিবাহ?”
তার কথা শেষ হতে না হতেই শ্রেয়সীর বিস্মিত কণ্ঠ কানে আসে। উমরানের বুক থেকে অনেকটায় উঠে গেছে সে। তার চেহারার দিকে তাকিয়ে হতবাক নয়নে চায় সে।
উমরান কিছুটা চমকিত হলো। এই মেয়ে কতকিছু মাথায় এনে ফেলেছে। এই বাল্যবিবাহ কথাটা উমরানের কাল, যেন পিছু ছাড়তে চায়না। মেয়েটাকে বিয়ে করার পর যখন জানল বাবা হবে। সে কথা বাতাসের বেগে পুরো সেনানিবাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। কতো যে কাহিনী হয়েছিল ক্যাম্পে। অফিসাররা মিটিং বসতে গিয়েছিল এই নিয়ে। নেহাত শ্বশুর মশাই উদার মনের বন্ধু একটা রেখে গিয়েছিল। তিনি সব সামলে নিয়েছেন। নাহয় তাকেই ওসব লজ্জ্বাজনক পরিস্থিতি সামলাতে হতো। তাও কম অপদস্ত হতে হয়নি। বাচ্চা একটা মেয়েতে দেওয়ানা হয়ে বাল্যবিবাহ করে নিয়েছে মেজর উমরান তাওসিফ, এই নিয়ে প্রচুর আলোচনা কিংবা মুখোমুখি ঠাট্টার, মশকরার স্বীকার হয়েছে সহকর্মীদের কাছে। প্রথম দিনই যার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব নিয়ে গুঞ্জন উঠেছিল ক্যাম্পে। সে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে, আলোচনায় আসারই কথা। জুনিয়ররাও তাকে দেখলে বেশকিছুদিন মুখ টিপে হাসতো। ট্রেনিং এ ওসবে মন না দিয়ে জীবনের লক্ষ্যে ফোকাসড হওয়ার কথা বলতো সে, যাদের মধ্যে রঙিন হাওয়া লেগেছে মনে হতো। সেই সেনাগুলোর চোখে চোখ রাখতে গিয়েও প্রথম প্রথম কম সংকোচ লাগেনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা, কর্নেল কিবরিয়া স্যার। তার শ্বশুর - সে নিজেও শ্রেয়সীর প্রেগন্যান্সির পর কেমন অদ্ভুদ এক রাগ, ক্ষোভ, কিংবা বিরক্তি নিয়ে তাকাতো তার দিকে। এরপর বাল্যবিবাহের একটা কেইস নিয়ে দুজনের সামনে এক অফিসার কিছু আলোচনা করছিল একবার। উমরানের দিকে যে তীর্যক চাহনি ছুড়েছিল শ্বশুর, উমরান এই জীবনে ভুলবেনা।
সে কণ্ঠে বিরক্তি এনে শ্রেয়সীকে বলে,
_”কোথা থেকে কি টানো আবার। আসো কাছে আসো। ঘুমিয়ে পড়ি, অনেক রাত হয়েছে।”
শ্রেয়সী শুনল না তা। কণ্ঠে ফের অবাকতা টেনে বলে,
_”আপনি না মেজর? বাল্যবিবাহ করলেন?”
_”চুপ শ্রেয়সী। ওসব ফালতু কথা বাদ দাও।” অল্প ধমকে বলে। শ্রেয়সী কর্ণপাত করলে তো!!
_” আপনি পারলেন। ছিঃ ছিঃ! আমাকে লেখাপড়া করতে দিয়েছিলেন তো? নাকি সেসবও বাদ ছিল? আর আমার বাবা মা আমাকে বাল্যবিবাহ দিলো? আশ্চর্য!!”
উমরান চোখে মুখে বিরক্তি টেনে সামনে তার উপর আধশোয়া মাথা তুলে নানান প্রশ্নে জর্জরিত করা মেয়েটির কথা শুনছিল মন দিয়ে। শেষ কথাটি শুনে কপালের বিরক্তিভাঁজ মিলিয়ে গেলো অজান্তে। চেয়ে থাকল মায়াবী চেহারার মেয়েটিকে। তার নিজের অপেক্ষা একে একে শেষ হচ্ছে। আর শ্রেয়সীর জীবন সম্পর্কে এঁকে এঁকে সব তার সামনে আসবে। নতুন করে তার নিজের সম্পর্কে জানবে। কষ্ট পাবে যখন জানবে উষশী ছাড়া রক্তের সম্পর্কের কেউ নেই তার এই পৃথিবীতে। আবার রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও আত্মার সম্পর্কের কিছু আপন মানুষ ছিল জানলে ততোটাই আনন্দিত হবে।
জীবনটা বড়ই অদ্ভুদ। একেক জড়ো হাওয়া আসে, আর তাণ্ডবে সুখগুলো সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। আবার একই হাওয়াদের তাণ্ডব মধুর সুরে হারিয়ে যাওয়া সুখগুলো ভাসিয়ে আনে।
কিন্তু উমরান এই মুহূর্তে আর অন্য কিছু জানাতে চায়না শ্রেয়সীকে। সে নিজের উপর আধশোয়া হয়ে থাকা শ্রেয়সীকে বাহু ধরে অকস্মাৎ পাশে ফেলে শুইয়ে দেয়। আর নিজে তার মেদহীন নরম উদরের দুপাশে হাঁটু ফেলে উঠে বসে। উমরানের পড়নে নাভির নিচে ঢুলুঢুলু ট্রাউজার থাকলেও শ্রেয়সী বিবস্ত্র বলতে গেলে। শুধু চাঁদরটা ছিল তার গাঁঁয়ে। ওটা এখন কোনোভাবে তার শরীরের নিম্নভাগ ঢেকে বাকিটা গাঁঁয়ের নিচে পড়ে আছে। শ্রেয়সী তৎক্ষণাৎ চিকন চিকন হাত দুটোকে উন্মুক্ত সুডৌল নারী অবয়বের লাজাবরণ বানালো।
উমরানের আকস্মিক এহেন কাণ্ডে তার আতঙ্কিত চোখ দুটো স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়ে এসেছে। মাথার ঘন কেশরাশি বালিশে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। কিছু উন্মুক্ত ফর্সা মেয়েলী গলায় লেগে থাকলো আলতোভাবে। ভীষণ আবেদনময়ী আর চোখ ধাঁধানো সে দৃশ্য। পুরুষ লোকেদের মাথা খারাপ করার মতো। উমরানও অমনোযোগী চিত্তে চোখ ঘুরালো তাতে। নিজ অবয়ব ঢাকতে ব্যবহৃত হাত দুটো থেকে গলার প্রলুব্ধিময় কলার বোনসহ আলতোভাবে ওখানে লেপ্টে থাকা চুলগুলো - মদ্যপ নয়নে সব দেখে সে চোখ ঘুরিয়ে চেহারায় নজর ফেলতেই শ্রেয়সীর চমকিত আর আতঙ্কিত নয়ন দুটোতে চোখ পড়লো। ওমনি মনোযোগ ফিরে তার। চোখে তীক্ষ্ণতা এনে বলে,
_”তার মানে শ্রেয়সী নেওয়াজ আজ স্বামীর মিলন আহ্বানে সাড়া দিয়েছে অতীত জেনেই? নয়তো স্বামীকে ফিরিয়ে দিতো সে?”
ধারালো কণ্ঠ তার। যেন এমন হলে বিষয়টা খারাপ হতে যাচ্ছে শ্রেয়সীর জন্য। তবে শ্রেয়সী ওসব মাথায় রেখে সাড়া দেয়নি। তারও যথেষ্ট চাওয়া পাওয়া জেগেছিল উমরানের ওমন অনিয়ন্ত্রিত স্পর্শে, তার নিজের শরীরটাও বেহায়া হয়ে উঠেছে মনে হচ্ছিল তার। ব্যাকুল ব্যাকুল লাগছিল শরীরে আরও গাঁঢ় ছোঁয়া পেতে। আর দেখেছে স্বামীর চাহনিতে কতটা কাতরতা ছিল!! যেন ঐ মুহূর্তে তাকে না পেলে ম ‘রেই যাবে।
_”য যেমন ভাবছেন তেমন কিছুনা।” তারও যে ইচ্ছে ছিল তা চেপে গেলো সে। কোনোভাবে কথা কাঁঁটাতে চায়।
_”আচ্ছা? তাহলে আজ এই অধমের উপর মায়া হওয়ার কারণ? প্রথম দিন কিভাবে কাঁদছিলে আমি ছুঁয়েছি বলে। সেদিনই অনেক কিছু বলে ফেলেছিলাম আমি ঘোরে। কিন্তু তুমি আমার ছোঁয়ায় এতটা ঘৃণ্যভাবে নিয়েছিলে যে আমার কথাগুলোও কর্ণপাত করার দরকার মনে করো নি। সেসব বেশ মনে আছে আমার। তাহলে?” ভ্রু উচিয়ে জানতে চায় সে। যদিও এসব আজকের জন্য শ্রেয়সীকে অতীত নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা মাত্র।
শ্রেয়সী দ্বিধা অনিশ্চয়তায় চোখের মণি এদিক ওদিক ঘুরায়।
_”এদিকে তাকাও।” হাঁতে চিবুক ছুঁয়ে মুখ ফেরায় নিজের দিকে।
শ্রেয়সী তাকাতেই দেখল একটু আগের তীক্ষ্ণতাভরা সেই চাহনির পরিবর্তিত মাতাল রুপ। হ্যাঁ, চোখের চাহনিটা তার মাতালের মতোই লাগছে। ঢোক গেলে সে। উমরান কানের কাছে এসে ধীমি কণ্ঠে বলেন,
_”নাকি তোমারও ইচ্ছে ছিল আজ স্বামীর কাছে মিলন সুখ পাওয়ার?” শ্রেয়সী উমরানের এমন ইচ্ছাকৃত লাগাম ছাড়া কথায় তীব্র লজ্জ্বা অনুভব করলো ভেতরে ভেতরে। লোকটা বুঝে নিয়েছে। হাতটা অতি নিকটে থাকা উমরানের গলার পেছনে চুলের নিচটা আঁকড়ে ধরেছে। অস্থির শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে উমরান ফের বলে,
_”সেদিন যে কাঁদছিলে আমি ছুয়েছিলাম বলে? তার শাঁস্তি পাবে আজ।” কথাটা বলেই গালে ঠোঁট ছুঁঁইয়ে তার নিজ অবয়ব ঢাকতে রাখা অবশিষ্ট এক হাতটাও সরিয়ে নেয়।
শ্রেয়সী এই মুহূর্তে আর চায়না উমরান যা করতে চাইছে তা হোক। উষশী যেভাবে এত ফিসফিস গুঞ্জনেও নিশ্চিন্তে-বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, পরিপূর্ণ ঘুম হলে সকাল সকাল উঠে যাবে নিশ্চিত। সারারাত না ঘুমালে, সকালেও মেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে গেলে ঘুম লাটে যাবে। সাথে মাথা ব্যাথায় কালকের পুরো দিনটাও। কিন্তু তার মানা শুনার অপেক্ষা করল না তার স্বামী।