হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ২১

🟢

উষশীর কান্নার বেগ বাড়ছে বুঝে তাড়াহুড়ো করে চলে যায় দুজন। এরপর আর এই নিয়ে কথা তুলেনি। বাবা মা কারো দেখা না পেয়ে দোলনায় উষশীর সে কি কান্না!! উমরান কোলে নিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে আদুরে কণ্ঠে অনেক কিছু বুঝায়, কিন্তু মায়ের মতো জেদী মেয়ে তার শান্ত তো হয়না, উল্টে পাপার গালে-নাকে ছোট ছোট আঙ্গুলের তীক্ষ্ণ নখে খামচে দেয় কাঁদতে কাঁদতে। পরে মৌরিই কোলে নিয়ে গান-টান শুনিয়ে, এলোমেলো নানান কথা বলে কান্না থামায়। ততক্ষণে উষশীর জন্য তার পাপা খাবার তৈরি করে আনলে, সেসব খাইয়ে আস্তে ধীরে ঘুম পাড়ায়।

____

সেই রাতের পর দুদিন কেটে গেছে। মৌরি এই দুদিনে আর ওসব নিয়ে কোনো কথা তুলেনি। উমরানের ঐ কাজে যথেষ্ট ভয় পেয়েছে সে। আবার কিছু জানতে চাইলে, না জানি নতুন কোনো পাগলামি শুরু করে দেয়। কি একটা লজ্জ্বার ব্যাপার! ঐ লোকের মধ্যে এমন লজ্জ্বাজনক একটা কাণ্ড ঘটিয়েও কোনো ভাবাবেগ দেখেনি মৌরি। সে ভেবে নিয়েছে - সঠিকভাবে জবাবদিহিতা করতে চায়না বলেই উমরান ওসব মনগড়া কাহিনী বলে তাকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল।

তারপর থেকে স্বাভাবিকই কেটেছে দুটোদিন। গতকাল আবার তিনজন বাইরে গেছিল। মৌরির জন্য স্বাভাবিক পড়নের পোশাক, শীতের কাপড়সহ যাবতীয় দরকারি জিনিস কিনতে একবার সময় করে শপিং এ যাওয়া দরকার, এমনটা ভাবছিল উমরান। যদিও মৌরিকে ডক্টর দেখাতে বের হলে তখনই ওকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সব কেনাকাঁটা করে ফেলবে শপিং এ ঢুঁকে, এমনটা পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেদিন অতিথিদের আগমনে আর ডক্টরের কাছে যাওয়া হয়নি বলে কেনাকাঁটাও হয়না। তাই আজই বের হয়। আবার এপয়েনমেন্ট নিয়ে ডক্টর দেখিয়ে ফেললো মৌরিকে।

মৌরি জানতো তারা শপিং এর জন্য বের হয়েছে। হঠাৎ হসপিটাল নিয়ে যাওয়ায় একটু চিন্তিত দেখায় পরিচিত কেউ হস্পিটালে ভর্তি হলো কি না ভেবে। তারপর ঢুকার পর থেকেই হস্পিটালের কর্মীরাসহ অন্যান্য ডক্টরদের তার স্বামীকে সম্মান জানাতে দেখে কৌতূহল জাগে, আশপাশটাই তাকাতেই চোখে পড়ে দেয়ালের একপাশে লেখা ‘চৌধুরী ক্লিনিক অ্যান্ড হসপিটাল’। এতে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছিল নিজেদের হস্পিটালে অন্য কোনো দরকারে এসেছে ভেবে। কিন্তু পরে যখন দেখে তার নামেই আপয়েনমেন্ট। তখন কপাল কুঞ্চিত করে জানতে চায়,

_”কি ব্যাপার? আমার আবার কি হলো? আমার নামে ভিজিট কেন?” মৌরি বিস্মিতই বটে। তার অসুখ হয়েছে, অথচ নিজেই জানেনা।

উষশী তখন পাপার কোলে তাইনাই করছে। হাত ধরে নিজ গাঁলে মেয়ের আদর নিতে নিতে উমরান বলেন,

_”কিছু সমস্যা আছে। তোমার এক্সি ‘ডেন্ট হয়েছিল বছরখানেক আগে। তার জন্য কিছু টেঁস্ট করতে হবে।”

মৌরি জানে তার এক্সিডেন্টের ব্যাপারে। যদিও মনে নেই সেসব। কিন্তু ভাইয়া বলেছিল ট্যুরে গিয়ে এক্সিডেন্ট হয়েছিল তার। অনেকদিন অসুস্থ ছিল সে ঐ এক্সিডেন্টের পর। কিন্তু তখনই যা কয়েকবার ডক্টর দেখাতে গেছিল বাবা-মা কিংবা ভাইয়ার সাথে। এরপর আর তেমন ডক্টর দেখাতে নিয়ে যায়নি কেউ। হয়তো সুস্থ হয়ে গেছিল বলে। কিন্তু এতদিন পর আজ আবার এসব নিয়ে ডক্টর দেখাতে হচ্ছে কেন? আর উষশীর পাপা-ই বা জানলো কি করে?

_”আমার এক্সি ‘ডেন্টের বিষয়ে আপনি জানলেন কি করে? ভাইয়া বলেছে?” অর্ণবের সাথে যেহেতু দেখা করেছিল একবার, তাই নিজেই উত্তরটা ভেবে নিয়ে প্রশ্ন রাখে।

উমরান ততক্ষণে দুজনকে নিয়ে করিডোরে ডক্টরের কেবিনের বাইরে বেঞ্চটায় বসেছে। মৌরির প্রশ্নে একনজর তাকিয়ে উষশীর পিঠে হাত রেখে অল্প দোলাতে থাকে। অ্যালকোহল, ফিনাইলসহ তীব্র জীবাণুনাশক আর ওষুধের গন্ধে সে কিছুটা অস্থির হয়ে উঠেছে। মৌরি স্বামীর দিকে প্রশ্নাতুর চোখে চেয়ে ছিল। উত্তরে একনজর তাকানোর মানে সে ‘হ্যাঁ’ ই ধরে নিলো। মুখটা ফিরিয়ে সামনে তাকায়। কুঞ্চিত ললাটের ভাঁজ মেলায়নি। হঠাৎ ডক্টর দেখাতে হবে জেনে আর ভালো লাগছেনা তার।

_”সব তো ঠিক ছিল, আমার শরীরেও আর কোনো ক্ষত বা আঘাত -কিছুই নেই। অসুস্থ বোধ করি এমনও না। তাহলে ডক্টর কি দেখে ওষুধ দেবে?”

_”ডক্টর কি দেখে ওষুধ দেবে সেটা ডক্টরই ভালো বুঝবেন। আর তেমন কোনো ওষুধ দেবে বলে মনেও হয়না। কিছু বিষয় জানতে চাইবে, তারপর দুয়েকটা টেস্ট দেবে - এটুকুই আই থিংক। এত ভয় পেয়োনা, রিল্যাক্স।”

স্বামীর আশ্বস্তবাণী শুনেও শান্ত থাকতে পারল না মৌরি। আরও নানান প্রশ্ন থাকলেও অস্থির উষশীকে সামলাতে ব্যস্ত দেখে আর ঘাটায়না স্বামীকে।

মিনিট কয়েক পর তাদের ডাক পড়লো। তিনজনেই প্রবেশ করে। ডক্টর তাদের স্বাগতম জানিয়ে বসতে বলেন। উমরানের সাথে কুশলাদি বিনিময় করে উষশীকে আদর করে দিলেন। মৌরির সাথেও সৌজন্যসূচক কথা হলো। ততক্ষণে বসে পড়েছে তারা।

_”তো? চা না কফি?” ডক্টর

_”কোনোটাই দিতে হবেনা ডক্টর। আমরা খেয়েই এসেছি।”

ততক্ষণে চা কফিসহ আরও কিছু নাস্তা চলে এসেছে। উমরান এসেছে দেখে আগেই পাঠিয়েছে রিসিপশনিস্ট। ডক্টর ড্রয়ার থেকে একটা চকলেট আর ললিপপ বের করে উষশীকে আদর করে দিয়ে ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন। কোলে থাকছেনা সে। টেবিলেই বসিয়ে দেয় তার পাপা, ললিপপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে উশষী।

_”তাহলে এবার কাজে আসি,” থেমে ডক্টর ফের বলেন,

_”রোগী তো ইনি, তাইনা? কিছু প্রশ্ন করবো। যতটুকু পারেন জবাব দেবেন মিসেস তাওসিফ।”

মৌরি স্বামীর দিকে একনজর তাকিয়ে সম্মতি জানালো মাথা নেড়ে।

প্যাডে কলম চালাতে চালাতে ডক্টর জিজ্ঞেস করেন,

_”শরীরে কোনো ব্যাথা তো অনুভব করেন না তাইনা?”

_”না”

_”এক্সিডেন্ট কিভাবে হয়েছিল মনে পড়ে?”

_”না ডক্টর। এক্সিডেন্ট যে হয়েছিল, এটা মনে আছে ঝাপসার উপর। এর বাইরে অন্য কিছু, আই মিন কিভাবে হয়েছিল, কেন - এসব মনে নেই।”

_”এক্সিডেন্টের পর পরও একেবারে মনে পড়তো না?”

মৌরি একটু ভেবে বলে,

_”এক্সি ‘ডেন্টের পর জ্ঞান ফিরে ট্রমায় পড়ে গেছিলাম খুব। ঐ সময়ে কি কি মনে ছিল, কি কি করতাম, কিংবা বলতাম - এসব এখন তেমন একটা মনে করতে পারিনা। তাই ট্রমার সময়টাতে আগের কিছু মনে ছিল কি না, তাও মনে পড়েনা। সবটা আবছা আবছা লাগে কেন জানি।”

ডক্টর তার দিকে পূর্ণ নজর ফেলে বলেন,

_”ঘাবড়াবেন না। ট্রমা টাইমের বিষয়বস্তু ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। ট্রমা বা শারীরিক/মানসিক আঘাতের সময় মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাস ও অ্যামিগডালার কার্যক্রম সাময়িকভাবে প্রভাবিত হয়। এর কারণে নতুন ঘটনার স্মৃতি দীর্ঘমেয়াদী মেমোরিতে ঠিকভাবে স্টোর হয় না। এটা নরমাল।” থেমে আবার বলেন,

_”আপনার কি সেই এক্সিডেন্টের আগের ঘটনাগুলো মনে পড়ে মিসেস তাওসিফ?”

মৌরি এই প্রশ্নে একটু থমকালো। তার বিশেষভাবে কিছুই মনে পড়েনা। নিজের সম্পর্কে বাড়ির সবার কাছে যা জেনেছে তা অব্দিই সীমাবদ্ধ তার স্মৃতি।

সময় নিয়ে বলে,

_”না ডক্টর। তেমন কিছু মনে পড়েনা।”

_”আই থিংক আপনি নিজের পরিচয়টাও ঠিকঠাক নিশ্চিত ছিলেন না। এম আই রাইট?” তীক্ষ্ণ নয়ন ফেলে বলেন।

মৌরির কেমন জানি লাগছে। এভাবে আগে কেউ এসব নিয়ে তার কাছে কিছু জানতে চায়নি। হঠাৎ খোলামেলা আলোচনায় কেমন আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে সে। ঢোক গিলে বলে,

_”আ আমি জানিনা এসব। এক্সি ‘ডেন্টের পর সুস্থ হয়ে জ্ঞান ফেরার পর কি হয়েছে না হয়েছে কিংবা কি বলেছি, এসব মনে পড়েনা আমার। কাউকে চিনতে পেরেছিলাম কি না তাও মনে নেই। তবে বাড়ির সবাই বলেছিল যে ভুলে গিয়েছিলাম। এমনকি তাদের কথাও মনে ছিল না। আস্তে আস্তে চিনতে পেরেছি নাকি, আই মিন ট্রমা টাইমে পরিবারের সাথেই তো ছিলাম। ঐ সময়টাতে কবে ওদের চিনে নিয়েছি জানা নেই সঠিক।”

_”আপনার পরিবারের লোকেদের সাথে নিশ্চয় কোনো না কোনো ছবি ছিল আগের। সেসব দেখলেও কি পরিবারের কাউকে চিনতে পারতেন না?

_”না, সেসবে আমার এখনকার চেহারার মিল নেই তো। আমি তিনমাস কোমায় ছিলাম। চেহারার একপাশ তেতলে গেছিল। তারপর সার্জারি করিয়েছে। তাই মেলেনা।”

ডক্টর চশমা ঠিক করে বলেন,

_”তাই? আপনার আগের কোনো ছবি দেখতে পারি?”

মৌরি টেবিলে রাখা হ্যান্ড ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে একটা ছবি দেখায়।

ডক্টর সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। তারপর ঠোঁট চেপে বলেন,

_”সার্জারি বলতে কোন সার্জারি করিয়েছে? রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি? নাকি প্লাস্টিক?”

মৌরিকে বিভ্রান্ত দেখালো।

_“আমি আসলে জানিনা। ভাইয়া তো মুখের সার্জারি করিয়ে দাগ চেঞ্জ করেছে - এমনটাই জানিয়েছে।”

_”কিন্তু মিসেস তাওসিফ… আপনার এখনকার চেহারার সাথে তো এক পারসেন্টও মেলেনা ছবির চেহারা। রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি করালে নুন্যতম ৪০–৭০% মিল থাকার কথা। আর প্লাস্টিক সার্জারি করালেও নুন্যতম ২০–৪০% মিল থাকবে।”

‘এই সার্জারি ঐ সার্জারি, আবার এত এত পারসেন্ট মিল অমিল’ মানে কিসের কি? ডক্টর কি বুঝালো মৌরি তার কিছুই ধরতে পারল না। দ্বিধান্বিত চোখে তাকায় সে।

_”আচ্ছা রিল্যাক্স। এক্সি ‘ডেন্ট পরবর্তী সময়টা এবার যাক। আপনার এক্সি ‘ডেন্টের আগের কোনো কিছু কি মনে পড়তে চায়না? ধরুন পাস্টের সাথে রিলেটেড কিছু একটা দেখলেন, তখন আপনার আবছা আবছা করে পাস্টের সেই ঘটনা মনে পড়লো। এমনটাও কি হয়না?” প্রশ্নটা করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান।

মৌরি ভেবেচিন্তে সময় নিয়ে জবাব দেয়,

_”না তো। এটা তেমন একটা হয়না। কিংবা খুব রেয়ার। আমি আসলে মনে করতে পারছিনা এমনটা ঘটেছে বলে। তবে আমি ট্রমা টাইমটা কেটে যাওয়ার পরও প্রায় রাতে ঘুমালে অদ্ভুদ অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখতাম। এটা এক্সি ‘ডেন্টের সাথে কোনোভাবে রিলেটেড নাকি অন্য কোনো কারণে, তা নিয়ে ধারণা ছিলনা। মা বলেছিল, রাতে আজেবাজে স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। এমনটা অনেকেরই হয়। তেমনই ছিল আমার বিষয়টা। পরে আস্তে আস্তে একেবারেই কমে যায় সেসব। কিন্তু তিন/চারদিন আগে হঠাৎ আবার দেখলাম ঐরকম স্বপ্ন। এক্সিডেন্টের বিষয়টাও দেখেছি সেরাতে। কয়েকজন মানুষের রোড এক্সি’ ডেন্ট। কেউ ডাকছিল অনেক জোরে জোরে, বাচ্চা কাঁদছিল, আমার মনে হয়েছে স্বপ্নে আমিও আছি। কাঁদছি খুব। আমার জানা নেই কি ছিল। কিন্তু সেদিন স্বপ্নে এক্সি/ডেন্ট হতে দেখেছি।” বলতে বলতে তাকে কিছুটা অস্থির দেখায়। তাও থামল না। ডক্টর পানির গ্লাস এগিয়ে দিলে সেটা শেষ করে ফের বলে,

_”হয়তো আমার এক্সি ‘ডেন্টটাই ছিল ওটা। ট্যুরে অন্যান্য যারা গেছিল। তাদেরসহ দেখেছি বোধ হয়।”

_”আপনার সাথে সেদিন অন্যান্য যারা ছিল, তাদের সাথে কি যোগাযোগ করেছেন? কেমন আছে তারা?” চশমার ফাঁক দিয়ে মৌরিকে তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করে বলেন ডক্টর।

এই প্রশ্নে তাকে একটু দ্বিধান্বিত দেখালো। সে তো ওসব নিয়ে আর কোনোকিছু ভাবেইনি। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে নিজের জীবনে ফিরেছিল। পরিবারের সবার মাঝে ফিরে এসেছিল। তার দৈনন্দিন জীবন কিংবা আশপাশ বলতে ছিল পরিবারটাই। কোথাও, কোনো আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের বাড়িতে কিংবা কোনো জায়গাতেও যাওয়া হতো না। কারণ বাবা চাচ্চুরা পছন্দ করেনা। সে ছোট থেকে রক্ষণশীলভাবে বড় হয়েছে। এমনটাই তো জানে। তেমন বন্ধু বান্ধব নেই অনামিকা ছাড়া।

_”না, খোঁজ নেওয়া হয়নি আসলে।” ধীরে জবাব দেয় মৌরি।

_”কে কে ছিল গাড়িতে, তা জানা আছে?”

_”বন্ধুরাই ছিল নিশ্চয়।” কলেজ থেকে ট্যুরে বন্ধু বান্ধব আর শিক্ষকরাই তো যায় - এ কথা মাথায় রেখে জবাব দেয়।

_”ঠিক আছে মিসেস তাওসিফ। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্মুদলি কো অপারেট করার জন্য। আপাদত আর কোনো প্রশ্ন নেই আমার। তবে কিছু টেস্ট করতে হবে। আপনার হাসব্যান্ডের সাথে যান। টেস্টগুলো করেই বাড়ি ফিরতে পারবেন। বাকি যা করণীয় আপনার হাসব্যান্ডকে দিয়ে হয়ে যাবে। তাও আপনাকে দরকার পড়ছে মনে হলে, আমি জানাবো মিস্টার তাওসিফকে। উনার সাথে চলে আসবেন।” প্যাডে কিছু লিখতে লিখতে কথাগুলো বলছিলেন। লেখা শেষে মৌরির দিকে দৃষ্টি ফেলেন,

_”আর হ্যাঁ, কোনোরকম স্ট্রেস নেওয়ার প্রয়োজন নেই এসব নিয়ে। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবো আপনার মেমোরি ফেরানোর। কিন্তু বাকিটা আপনার হেলথ আর ভাগ্যের উপর। এই নিয়ে স্ট্রেস নেওয়ার দরকার নেই। মনে পড়লে পড়বে, না পড়লে নেই। এ আর এমন কি? স্বামী সন্তান তো আছেই। আর কি চায়? তাদের নিয়ে সুখে থাকুন। আর টেস্টগুলো করিয়ে নেবেন।” থেমে আবার বলেন,

_”আচ্ছা আমি বরং মিস্টার তাওসিফকে ডাকছি। উনাকেই বুঝিয়ে দিই। আপনি মেয়েকে সামলাতে পারেন এবার।” উমরান মাঝ সেশনেই উষশীর অতিরিক্ত জ্বালাতনে ডক্টরকে একটু বুঝেশুনে এগোতে বলে বাইরে চলে গেছিলেন। মৌরি বের হতেই সে মেয়েকে কোলে নিয়ে নিলো, আর উমরানকে ডক্টর ডাকছে তা জানায়।

ডক্টর তাকে সবটা বুঝিয়ে দিলে চলে যায় টেস্ট করতে। তিনটে টেস্ট দিয়েছে। প্রথমটা MRI, তারপর EEG আর রক্ত পরীক্ষা।

সব টেস্ট শেষে বেরিয়ে গেলো তারা। মৌরি উষশীর গাঁঁয়ে শীতের কাপড় ঠিকঠাক জড়িয়ে দেয়, কয়েকদিন ধরে খুব বেশি শীত পড়ছে। চট্টগ্রামের তাপমাত্রা ১৪° সেলসিয়াসে এ নেমে গেছিল কাল। নিজেও গাঁঁয়ে শাল জড়িয়েছে। উমরান একহাতে উষশীকে কাঁধে ফেলে নিয়ে অন্য হাতে মৌরিকে ধরে বেরিয়ে যান। কাল সকালে বের হলে তখন একবার এদিকে এসে নিয়ে নেবে রিপোর্টগুলো।

তারপর তারা যায় শপিং করতে। প্রিলেগ্যান্ট মলে ঢুকেছিল, সেখান থেকে সবরকম কেনাকাঁটা শেষে, অল্প ঘুরাঘুরিও করেছে পার্কে। ক্যাফেতে ঢুঁকে খাবার সেরে আসে। শপিং মল থেকে দামি দামি খেলনা, পোশাক কিনেও উষশীর ফুঁটপাতে বসা দোকানে বাহারি খেলনা দেখে চোখে মুখে আগ্রহ, মুখে নানান শব্দ। হাত দেখিয়ে ‘আম্মা, পা’ শব্দ করছে ওদিকে যেতে। কোল থেকে গাঁ ঠেলছে। বিশেষ করে ঝিলমিল বেলুন দেখে কোলে থাকতেই চাইছিল না। তা বুঝে মৌরি স্বামীকে বলে আবার সেখান থেকেও নিলো কিছু খেলনা, আর একটা বেলুন। তারপর রাস্তার ধারে বসা ভাপা পিঠার স্টল থেকে অল্প স্বল্প পিঠা খেয়ে পার্কিং লটে চলে গাড়ির উদ্দেশ্যে।

তখন উষশীকে একহাতে কোলে নিয়ে মৌরিকেও অন্য হাতে ধরে রেখেছে উমরান। রাস্তার ধারে হাটছে পার্কিং লটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। চারদিকে মানুষের ভিড় কম। মুটামুটি খালি রাস্তা। মৌরি কি ভেবে একটু ডাকে স্বামীকে,

_”শুনুন, একটা কথা ছিল।” তখনই দূরে কোথাও একটা গাড়ি উচ্চশব্দে হর্ণ বাজালো। তাই উমরান শুনতে পেলেননা স্ত্রীর ডাক।

মৌরি স্বামীর বাহুতে হাত ছুঁইয়ে ডাকে,

_”আপনাকে বলছি।”

উমরান ঘাড় ফিরিয়ে পাশে তাকান। কপাল কুঞ্চিত করে শুধান,

_”হু? কিছু বলবে? আর কিছু দরকার?”

_”না, আর কিছু কিনতে হবেনা। আমি আসলে একটা কথা জানতে চাইছিলাম।”

_”কি কথা? বলো…” মানুষজন কম হওয়ায় নির্বিঘ্নে হাটা যাচ্ছে। উষশী পাপার কাঁধে মাথা ফেলে রেখেছে, হাত নেড়ে নেড়ে আপনমনে নানান শব্দ করছে।

_”বলতে চাইছি… আপনাকে কি ভাইয়া বলেছে আমাকে ডক্টর দেখানোর কথা? আগের মেমোরিগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য?”

একনজর তার দিকে তাকিয়ে বলেন,

_”তোমার ভাইকে বলতে হবে? আমি নিজে তোমার ট্রিটমেন্ট করাতে পারিনা তোমার মেমোরি ফেরাতে?”

_”উফফ!! সোজা কথা আপনার মুখ দিয়ে আসেনা তাইনা উষশীর পাপা? সব কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে হবে। কি একটা মানুষ আপনি …” বিরক্তি স্পষ্ট মৌরির কণ্ঠে। ‘অর্ণব বলেনি, আমিই ভেবেছি ডক্টর দেখানোর কথা’ এমনটা বলে দিলে কি সমস্যা। সব কথা প্যাঁচাতে হবে। মৌরি বিরক্ত স্বামীর এই স্বভাবে। অবশ্য অন্য কারো সাথে করেনা এমনটা। স্পষ্টভাষীই মনে হয় অন্যদের সামনে। শুধু তার বেলাতেই যতো কথার মারপ্যাঁচ।

_”তোমারই।”

_”হু?” উমরান কি বলেছে শুনতে না পেয়ে মৌরি বিরক্তি ধরে রেখেই প্রশ্নাতুর চোখে তাকায় কি জানতে চেয়ে।

_”বলছি মানুষ যেমন হই না কেন… তোমারই।”

____

পরদিন,

ফুলবাড়িতে মৌরির বাপের বাড়ির লোকজন এসেছে। সকাল এগারোটার দিকে এসেছিল। সেই থেকে ফুলবাড়ি কোলাহলপূর্ণ। বাচ্চাদের হইচই থেকে পুঁই পাখির তাদের অনুকরণের শব্দ - সব মিলিয়ে প্রতিদিনের মতো শান্ত নেই বাড়িটা। তার উপর আজ বাড়ির সবাই আসবে তা জানতোনা মৌরি। অকস্মাৎ তারা আসবে খবর শুনে সকাল থেকে শুরু হয়েছিল তার তাড়াহুড়ো। সেই তাড়াহুড়ো তাদের আসার পর আপ্যায়ন শেষ হলে তবেই থেমেছে। দুপুরের রান্না নিয়ে চিন্তায় ছিল সে। এতগুলো মানুষের জন্য বাচ্চা নিয়ে একা হাতে রান্না মুখের কথা নয়। তার উপর উষশীর পাপা সকালেই বের হয়ে গেছিল কোথাও, তখনো আসেনি। শুধু ফোন করে তার বাপের বাড়ির লোকজন আসবে জানিয়েছে। তারপর থেকে কাজে লেগেছিল।

কিন্তু বাড়ির লোকেরা শীতপিঠা নিয়ে এসেছে, সাথে নানানপদের রান্না। তাই দুপুরের রান্না নিয়ে আর কষ্ট করতে হলোনা মৌরিকে। এটা চট্টগ্রামের একটা রীতি। শীতের সময় ভাপাপিঠা নিয়ে সবাই মিলে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যায়। পিঠা নিয়ে মূল আয়োজন হলেও সাথে গরুর মাংস কিংবা হাসের মাংস, খেজুরের রস সহ অন্যান্য হরেকরকম রান্নার পদ থাকে। তাই ওসব নিয়ে এসেছে দেখে মৌরির রান্নার তাড়াহুড়া থামল।

তখন তারা সবাই বসার ঘরে। দুপুরের খাওয়া ধাওয়াও হয়েছে। তূর্ণা, মৃন্ময় উষশীকে নিয়ে খেলছে। বসার ঘরে শুধু তারা বড়রা আর মৌরিসহ তার স্বামী। মৌরির বাবা আর চাচ্চু একপাশে তার স্বামীর সাথে কথাবার্তা বলছে। মা চাচী একপাশে। অর্ণব ফোনে কারো সাথে কথা সেরে বারান্দা থেকে এসে মৌরির পাশে বসল। মৌরির মা চাচী নিজেদের আনা খাবার কোনটায় তেল মশলা, লবন কমবেশি হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করছে। মৌরি আনমনে পাশে বসা ভাইকে জিজ্ঞেস করলো,

_”ভাইয়া? আমার চেহারায় যে সার্জারি করিয়েছ বলেছিলে একবার? ওটা কেমন সার্জারি?”

অর্ণব থমকালো বোনের প্রশ্নে। চেহারায় চোখ বুলায়। সেথায় আনমনা ভাব স্পষ্ট। অর্ণব এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল, তার বোন সবটা জেনে ইচ্ছে করে প্রশ্নটা করেছে। তাদের মিথ্যা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে। কিন্তু ভাবনা অসত্য বুঝে গভীর শ্বাস টানে। স্বাভাবিক হয়ে শুধায়,

_”কেন বলতো? হঠাৎ এই প্রশ্ন যে?”

_”কাল উনার সাথে ডক্টর দেখাতে গিয়েছিলাম। ডক্টর অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন। আমি অতীতের কিছু মনে করতে পারি কি না, জ্ঞান ফেরার পর তোমাদের সবাইকে চিনতে পেরেছিলাম কি না। আরও অনেক কিছু। তখন আগের ছবি দেখতে চাইলো। দেখে বললো এখনের সাথে কোনো মিল নেই। কি কি সার্জারি করালেও নাকি কত কত পারসেন্ট জানি মিল থাকে বললো। আমি কি এতটাই চেঞ্জ হয়ে গেছি ভাইয়া?”

অর্ণব তার কথা পূর্ণ মনোযোগে শুনল। বুঝল ডক্টর কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে মৌরিকে। প্লাস্টিক সার্জারি আর রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির কথা জানিয়েছে। সে থেমে বলে,

_”তোর ফোনে তো আছে আগের ছবিগুলো। নিজেই দেখ কতটুকু মিল পাস এখনের সাথে।”

মৌরির ফের আনমনা কণ্ঠ,

_”হু, দেখতে হবে। অনেককিছু ভাবতে হবে একটু নির্বিঘ্নে বসে।” কাল থেকে কিছু ভাবার সময় পায়নি সে। সেদিন উষশীর পাপার মুখে শ্রেয়সী ডাকটা শুনে কিছু প্রশ্ন জেগেছিল। যার ঠিকঠাক উত্তর মেলেনি। স্বামীর অপ্রীতিকর কাণ্ডে ঐ বিষয়টা মাথা থেকে বেরিয়েই গেছিল। আবার ডক্টরের কাছে এক্সি ‘ডেন্টের বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করায় মনে পড়েছে। ঐ ডাক নিয়ে মনে জাগা প্রশ্নের কোনো সুরাহা মেলেনি। আর কাল ডক্টরের বলা অনেক কথা তাকে ভাবাচ্ছে। কিন্তু সেসব নিয়ে একটু মাথা খাটানোর সময় পেলো না কাল থেকে।

তারা বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে এসেছিল। এসেই ফ্রেশ হয়ে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয়। কিন্তু সারারাত উষশীর জ্বালাতনে তেমন একটা ঘুম হয়নি দুজনের। বেশি শীত পড়ায় ঘনঘন প্রস্রাব করে মেয়েটা। ওর পাপার মিশনে থাকাকালীন সময়ে প্রতি রাতেই রাইমা ডায়াপার পড়িয়ে রাখতো। একবার ঘুম ভাঙলে সারারাত কান্না থামানো যেতো না বলে। এর বাইরে দিনের বেলাও ডায়াপার থাকতই ওর গাঁঁয়ে। তাই উরুর দিকে এক জায়গায় লাল হয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এজন্য এখন ডায়াপার পড়িয়ে আর ঝুকি নেয়না, ঘা হয়ে যেতে পারে বলে। তাই ঘুমের ঘোরেও পাশ হাতড়ে মেয়ে হিসু করে দিলো কি না নজর রাখতে হয় দুজনকে। এই নিয়ে সারারাত স্বামী স্ত্রীর ঘুমের নাজেহাল অবস্থা।

____

বিকেল হতেই সওদাগর বাড়ির সকলে মেয়ে নাতনিকে আদর দিয়ে ফুলবাড়ি থেকে বিদায় নেয়। শীতের দিন খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, দেখা যাবে বিকেল হতে না হতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে ধরণীতে আধার নেমে এলো। তাই তাড়াতাড়ি রওনা দেয়। তারা এসেছিল নিজেদের গাড়ি নিয়ে। মৌরির বাবা-মা, চাচা-চাচী আর তূর্ণা গাড়িতে ছিল। আর মৃন্ময় অর্ণবের সাথে বাইকে। ভ্যানে করে পিঠাসহ অন্যান্য রান্নাগুলো পাঠিয়ে দেয় আগেই। কিন্তু মৃন্ময়ের কাশি হচ্ছে বেশি। বাইকে গেলে বাতাস লেগে আরও বেড়ে যাবে। তাই মা বড়মার মাঝে গাড়িতে বসে সে। আর তূর্ণাকে অর্ণবের সাথে বাইকে দিলো। গাড়ি টান দেওয়ার আগে দেখল মৌরি উষশীকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাড়িয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যে হাত তুলে ‘টা টা’ দিচ্ছে সে মায়ের কথামতো। সে দৃশ্য দেখে তারা মজা পেলো বৈকি। বাচ্চা বুড়ো সবাই মাথা বের করে তাদের মৌরির মেয়েকে হাত দেখিয়ে ‘টা টা’ দিলো স্বানন্দে। উষশী মজা পেয়ে মায়ের কোলে নেচে উঠে কাঁধে মুখ গুজে।

_“ভাইয়া… আরও জোরে চালাও। এত আস্তে মানুষে বাইক চালায়?” হু হু করে বাতাস কানে ঢুকছে তূর্ণা, অর্ণবের। রাস্তার গাড়িগুলো সেই বাতাসের সাথে তীব্র বেগে ছুটছে। কিন্তু তাদেরটাই মনে হচ্ছে বাতাস দিয়ে ঠেলে ঠেলে চালানো হচ্ছে। এত ধীরে বাইকে চড়ে আর মজা পাওয়া যায়? তূর্ণা ভাইয়াকে ঝাপটে ধরে পিঠে মুখ গুঁজে রেখেছে। শীত তারও লাগছে। কিন্তু তাও বাইকে চড়ছে বলে মনে না হলে আর চড়ে লাভ কি?

_”কি হলো? এত আস্তে চালাচ্ছ কেন? মনে হচ্ছে বাতাসের ঠেলায় কোনোভাবে চলছে বাইক। এভাবে চড়ে বাইকের মজা পাওয়া যায়?” বিরক্তির কণ্ঠে বলে তূর্ণা।

_”থাপ্পর দিয়ে দাঁত ফেলে দেবো। বাইকের মজা আবার কি? মজা করে বাইকে কয়বার চড়েছিস যে বাইকের মজা খুজছিস?” দাঁতে দাঁত চেপে বাইক চালাতে চালাতে বলে অর্ণব।

_”চড়েছি তো অনেকবার তোমার সাথে। কিন্তু মজা একবারই পেয়েছি। গতকাল নিশান ভাইয়ার সাথে খুব মজা করে চড়েছি জানো? ভাইয়া অনেক স্পিডে বাইক চালায়। ভয় করেছে যদিও, কিন্তু খুব উপভোগ করেছি আমি।” স্বানন্দে কথাটা বলতে না বলতেই রাস্তার একপাশে বাইকটা থেমে দাড়িয়েছে বুঝতে পারল তূর্ণা। সে অর্ণবের পিঠে মুখ গুঁজে ছিল। চোখ খুলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়।

_”নাম।”

অর্ণব ভাইয়া মাঝরাস্তায় বাইক থামিয়ে হঠাৎ নামতে বলছে কেন? তূর্ণা চমকিত নয়নে তাকায়। কি হলো হঠাৎ!!

_”কিছু হয়েছে? বাইক থামালে কেন?”

অর্ণব বাইকের হ্যান্ডেলে রাখা হাতটা আরও দৃঢ় করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

_”নামতে বলেছি তোকে। বাইক থেকে নাম।” ধমকের মতো শুনাল তার কথাটা।

তূর্ণ ভাইয়ের রাগী কণ্ঠ শুনে ভয়ে ভয়ে নামলো। কি হয়েছে ধারণা নেই তার। সে নামার সাথে সাথে অর্ণবও সময় ব্যয় না করে নেমে গেলো। চাবি ছাড়িয়ে পকেটে পুরে।

_”কি বলছিলি আবার বল।” গলা শান্ত হলেও শক্ত চোয়াল তার। তূর্ণা তা দেখে আতঙ্কিত হলো।

_”কি হলো? চুপ করে আছিস কেন? কথা বল।”

অর্ণব তাকে চুপ দেখে ফের ধমক দিলে তূর্ণা গড়গড় করে বলে,

_”নিশান ভাইয়া, নিশান ভাইয়ার সাথে কাল বাইকে করে এসেছিলাম। মানে বাড়ি ফিরেছিলাম। পরশুই তো গেলাম মামার বাড়ি। কাল দুপুরে মা হঠাৎ ফোন দিয়ে মামাকে বলে আমাকে যেন রাতের মধ্যে বাড়ি নিয়ে আসে। আজ সবাই আপুর বাড়ি আসবে তাই। কিন্তু মামা ব্যস্ত ছিল বলে নিশান ভাইয়ার সাথে পাঠিয়ে দেয়। ভাইয়ার বাইকে করে এসেছি বিকেলে। অনেক স্পিডে চালিয়েছিল, তাই বলেছি ওভাবে। তোমার পছন্দ না হলে আর কখনো বলবোনা প্রমিস ভাইয়া। আজকের মতো ক্ষমা করে দাও।”

তূর্ণার সবকথা শুনল অর্ণব। চেহারা দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে যে রাগের অনলে মস্তক পূর্ণ তার। নীরবে কিছুপল পূর্ণ মনোযোগে দেখে তূর্ণাকে। চেহারায় আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট তার। সময় নিয়ে অর্ণব বলে,

_”প্রথম যেদিন বাইকে তুলেছিলাম, সেদিন - সামনে কোনোদিন আমি ছাড়া অন্য কারো সাথে বাইকে না উঠবিনা কথা দিয়েছিলি কি না?”

এতক্ষণে তূর্ণা তার ভুল কোথায় তা টের পেলো। অন্য কারো বাইকে না উঠার শর্ত রেখে তাকে বাইকে তুলেছিল অর্ণব ভাইয়া প্রথমবার। আর সেও ভাইয়ের নতুন কেনা বাইকে চড়ার লোভে ফটাফট রাজী হয়ে যায়। কিন্তু সে কথা ভুলেই বসেছিল প্রায়। তূর্ণা ভয়ার্ত নেত্রে তাকায়।

_”এবারের মতো ক্ষমা করে দাও ভাইয়া। আর কখনো এমনটা হবেনা। প্রমিস করছি।” তূর্ণার নরম গলার কাতর স্বরে অর্ণবের রাগ দমে না। সে অকস্মাৎ বলে,

_”কান ধরে উঠবস কর দশবার।” রাস্তা দিয়ে এঁকে এঁকে শাঁ শাঁ করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। অর্ণব ভাইয়া একপাশে থামিয়েছে বাইকটা। আর তার পাশেই দুজন। রাস্তা স্পষ্ট এখান থেকে। গাড়ি থেকে অনায়াসে যে কেউ দেখবে তাদের। এর মধ্যে কান ধরে উঠবস!!

_”কি বলছ ভাইয়া? এটা অসম্ভব। রাস্তায় কতো মানুষ?”

_”বিশবার উঠবস কর।”

_”ভাইয়া প্লিজ, এমন করছ কেন? এবারের মতো ক্ষমা করে দাও। আর হবেনা।”

_”ত্রিশবার।”

_”অর্ণব ভাইয়া। বাড়ি গিয়ে…”

_”চল্লিশবার।”

সে সম্পূর্ণ করতে পারলনা, তার আগেই অর্ণবের চাওয়া বাড়ল। তূর্ণা কাতর নয়নে একনজর চেয়ে কান ধরে উঠবস করতে শুরু করে। খনখনে ঠাণ্ডা। আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার নামছে। এর মধ্যে নিজেও ধরিত্রীর ন্যায় মুখটা অন্ধকার বানিয়ে উঠবস করতে লাগলো তূর্ণা। পাঁচবার উঠবস করে তাকায় সম্মুখের জল্লাদপানে। তাকেই দেখছে তীক্ষ্ণ চোখে। তূর্ণা কাঁপা কাঁপা গাঁঁয়ে উঠবস করতে করতে বলে,

_”তুমি ছাড়া অন্য কারো সাথে বাইকে উঠলে কি হয়েছে?”

অর্ণব কিছু বললো না। চেয়েই থাকে বকবক করতে থাকা তূর্ণার দিকে।

_”কি হলো? চুপ করে আছ কেন? তুমি যেমন আমার ভাইয়া, নিশান ভাইয়াও আমার ভাইয়া। তোমার বাইকে চড়তে পারলে নিশান ভাইয়ার বাইকে চড়তে সমস্যা কোথায়?”

_”তোর নিশান ভাইয়া আর আমি এক?”

_”তা নয়তো কি? তুমি চাচাতো ভাই, আর সে মামাতো ভাই। কি তফাৎ?”

_”আমাকে যেভাবে ঝাপটে ধরে বসা হয়, তোর নিশান ভাইয়ার বাইকে চড়লেও ওভাবে বসিস?”

_”না তো।”

_”কেন?”

_”ওটা তো তুমি না, নিশান ভাইয়া। যে কাউকে ওভাবে ধরব নাকি?” বিরক্তি তার কণ্ঠে।

_”কেন? আমিও তোর ভাই, নিশানও তোর ভাই। তাহলে?” ভ্রু উচিয়ে জানতে চায় সে। কানে হাত থাকলেও কথার তালে উঠবস থেমে গেছে তূর্ণার।

সে অর্ণবের কথায় ভাবে একটু। কি বুঝল জানা নেই। তবে ফের কণ্ঠে বিরক্তি টেনে বললো,

_”তুমি আর নিশান ভাইয়া কি এক হলে? আশ্চর্য!!”

_”মাত্রই তো বললি আমি আর তোর নিশান ভাইয়া এক। তাহলে এখন……” সে কথাটা বলে সম্পূর্ণ করতে পারল না। তার আগে চিকন সুরে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে তূর্ণা তার বুকে এসে মুখ লুকায়। অর্ণব দেখল একটা কুকুর তাদের সামনে। লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে কবে যে তূর্ণার পাশে এসে দাড়িয়েছে তারা কেউ খেয়াল করেনি। কুকুরটাকে দেখতে দেখতে তূর্ণার পিঠে হাত রাখে।

_”অর্ণব ভাইয়া, সামনে তাকাও। জিহ্বা বের করে দাড়িয়ে আছে কুকুর একটা। ওটাকে তাড়াও প্লিজ। এখান থেকে তাড়াও।”

_”কুকুর তোকে খেয়ে ফেলছে না। স্থির থাক।”

_”কতো বড় জিহ্বা দেখ ওটার। পাগল কুত্তা বোধ হয়।”

অর্ণব তূর্ণাকে কিছুক্ষণ চুপ থাকতে বলে, তারপর কুকুরটা নিজেই চলে গেলো লেজ নাড়াতে নাড়াতে। তা বুঝে তূর্ণা স্বস্তি নিয়ে সরে আসে।

_”অনেক শাস্তি দিয়েছ। আর না প্লিজ। এবার বাড়ি যায়, আমার খুব শীত লাগছে। তোমাকে মাথা টিপে দেবো যখন চাইবে তখন, প্রমিস।”

অর্ণব চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। এই প্রমিস একবার সওদাগর বাড়ি পা রাখলেই ভুলে যাবে তা জানা আছে অর্ণবের। এখন এখান থেকে যাওয়ায় মূল লক্ষ্য তূর্ণার। বুঝেও নিজের হেলমেটটা তার মাথায় পড়িয়ে দিয়ে বাইকে উঠে। তূর্ণার শীতে গাঁ কাপঁছে বোঝায় যাচ্ছে। তাই হেলমেটটা তাকে দিলো, যাতে বাতাস কম লাগে। তূর্ণাও উঠে পড়লে বাইক স্টার্ট দেয় অর্ণব। তূর্ণা এবারে আরও ঝাপটে ধরলো অর্ণব ভাইয়াকে।

_____

রাতে খেয়ে ধেয়ে শুয়ে পড়েছে উষশী আর তার মাম্মা পাপা। উষশী সারাদিন অতিথি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো। উমরানও চোখ বুঝে আছে। ঘুমিয়ে গেছে হয়তো। মৌরির চোখেই নিদ্রারা নামতে চাইছেনা। এলোমেলো নানান চিন্তা তার মস্তিষ্কে। হাতে মাথার চুলের ক্লিপটা। অযথায় হাতে নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। একবার পেছন ফিরে কাত হয়ে বাবা মেয়ে ঘুমিয়ে গেলো কিনা দেখে মৌরি। দুজনেই তন্দ্রায় বিভোর। ফের মাথা ফিরিয়ে বালিশে রাখে। আপনমনে গুণগুণ করে গান তুলে কণ্ঠে। তেমন শুনা যাচ্ছেনা, মৌরির নিজের কান অব্দিই গেলো বোধ হয় গানের শব্দ। গাঁইতে গাঁইতে হঠাৎ অনুভব করলো তার দিকে ফিরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তার স্বামী। তার নরম উদরে উমরানের হাত। অল্প বিচরণ করছে।

_”না ঘুমিয়ে গান গাওয়া হচ্ছে?” মৌরির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস কণ্ঠে বলে।

_”ঘুমানোর ভান ধরা হচ্ছিল?” মৌরিও একইভাবে প্রশ্ন রাখল।

_”উহুম। ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এই শীতে লেপের গরমের চেয়ে বউয়ের সাথে লেপ্টে থাকলে উম বেশি হয়। শরীর উত্তপ্ত হতে বেশি সময় নেয়না। তাই ওটার অভাববোধ করে ঘুম আসছিল না।”

_”ছিঃ… অশ্লীল আপনি!” কথাটা বলে অল্প হাত নাড়িয়ে ছাড়িয়ে নিতে চায় মৌরি। কিন্তু উমরান ছাড়লেন না। বরং পায়ের ভাঁজে পা ঢুকিয়ে আরাম করে ধরলেন। কোমল উদরে রাখা উষ্ণ পুরুষালি হাতটাও আশেপাশে কিংবা নিচে বিচরণ করছে। মৌরির কথায় তার কানে অল্প কামড় দিয়ে বলেন,

_”অশ্লীল কি হু? শীতের রাতে বউ পাশে নিয়ে প্রতিদিন পড়ে পড়ে ঘুমানো যায়? কতটা অস্থির লাগে, বুঝো তুমি?” কথাটা বলে গালে গাল ঘষলেন।

_”কাল কই ঘুমালেন? জেগেই তো ছিলাম দুজনে। আজও পড়ে পড়ে না ঘুমাতে চাইলে বলুন, আমি উষশীকে জাগিয়ে দিচ্ছি।” মৌরি অবুঝ সেজে বলে।

উমরান বুঝলেন বউ তার মজা করছে তার সাথে। সে মৌরির জামার ফিতেটা পেছন থেকে খুলে দেয় সন্তর্পণে। নিজের দিকে ফিরিয়ে, কোমল বুকে মুখ গুজে ঠোঁটের আর দাঁতের নরম ভেজা স্পর্শ দেন। হাতের বিচরণ জারি রাখে। মৌরি উত্তেজনার শিরশিরে অনুভুতিতে চোখ বুজে নিলো। উমরান ততক্ষণে তার উপরে উঠে এসেছে আদর দিতে দিতে।

কণ্ঠে মাদকতা ঢেলে বলেন,

_”ওভাবে না, আজ মেয়েকে ঘুমে রেখে রাত জাগতে চাই তোমার সাথে। জাগবে তুমি?”

স্বামী নামক পুরুষের কণ্ঠে মৌরির খুব কাছে থেকেও ইঞ্চি দূরত্বটুকু মিটিয়ে নেওয়ার আকুল আবেদন। মৌরির বুকের ভেতরটা জলোচ্ছাসের ন্যায় তীব্র বেগে আঁচড়ে উঠল।

উত্তর দিলোনা সে। চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছে। উমরান কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন। কিন্তু জবাব এলো না। তখনো চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে মেয়েটা। তীব্র বেগে শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে। ফিতে খুলে দেওয়ায় জামার বড় গলার ফাঁক দিয়ে কমনীয় বক্ষভাজ উকি দিচ্ছে তার সামনে। বুকের উঠানামা স্পষ্ট। এমনকি অনুভবও করতে পারছে সে শরীরের সাথে লেগে থাকায়। জবাব না পেয়ে একটা ঢোক গেলেন। বিছানার চাঁদরে থাকা পুরুষালি হাতটা চাঁদর খামচে ধরলো। হয়তো রাগ কিংবা হতাশাজনক কিছু একটা নিবারন করলেন। একটা গভীর শ্বাস টেনে মৌরির উপর থেকে নেমে আসেন ধীরে। শরীরে উঠতে চাওয়া তাপদাহ বহু কষ্টে সামলে অন্যপাশ ফিরে শুয়ে পড়তে চায়। কিন্তু অকস্মাৎ মৌরি তার শার্টের হাতা খামচে ধরলো। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলে,

_”উ উষশীকে দোলনায় রেখে আসুন।”

উমরান ফিরে তাকালেন কথাটা শুনার সাথে সাথে। তখনো চোখ বন্ধ মৌরির। তিরিতির করে কাপঁছে অধরদুটো, আর ঘন পাপড়ির পলকগুলো। তাকে দেখতে দেখতেই বলেন,

_”কিছু বললে?”

_”উষশীকে দোলনায় রেখে আসুন।” আবার বললো মৌরি কথাটা।

_”তারপর?”

মৌরি ঈষৎ লজ্জ্বা পেলেও বলে,

_”জানিনা।”

_”তারপর কি, জানোনা?”

বন্ধ নেত্রে মাথা নাড়ায়,

_”না” অথচ পলকগুলোর ধীর কম্পন জানান দেয় সবটা বুঝে বলছে মৌরি। উমরান চোখে হাসলেন তা বুঝে।

সময় ব্যয় না করে ধীরে উষশীকে তুলে নিয়ে দোলনায় রেখে আসেন। তারপর বিছানায় লাজ নিয়ে পড়ে থাকা স্ত্রীপানে চেয়ে চেয়ে অধৈর্য হয়ে পড়নের শাঁর্ট খুলে ফেলেন। মৌরির গাঁঁয়ের উপর উঠে আসলেন, ঠোঁটে গভীর চুমু খেয়ে তার পড়নের কাপড় একে একে খুলে নিয়ে দুজনে এক লেপের ভেতর ঢুঁকে যান। মৌরির কানের কাছে এসে কণ্ঠে মাদকতা ঢেলে বলেন,

_”আমি দেখাচ্ছি তারপর কি।”

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ২১ গল্পের ছবি