_”আপনারা এভাবেই থাকেন সবসময়?”
_”এভাবে বলতে?”
_”এই যে আপনি, উষশী - আপনারা দুজন শুধু। আপনার পরিবার… আই মিন, বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ নেই?”
_”আছে, আমি বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। আর বোন আছে ছোট। সে বিবাহিত,স্বামী সন্তানসহ দেশের বাইরে থাকে। আমার বাবা-মাও ছয় মাস ধরে ওখানেই থাকছে ওদের সাথে। মায়ের চিকিৎসার জন্য।”
_”আপনার মায়ের কি হয়েছে?”
_”পায়ে সমস্যা, হাঁটতে পারেনা। রোড এক্সি ‘ডেন্ট হয়েছিল।”
মৌরি ‘ওহ’ শব্দ করে ফের নিশ্চুপতা গ্রহণ করে। তারা স্বামী স্ত্রী রান্নাঘরে। কাউন্টার লাগোয়া হাই স্টুলে বসেছিল মৌরি। সেভাবেই নানানকিছু ভাবতে ভাবতে কথাগুলো জিজ্ঞেস করে স্বামীকে।
উষশী রুমে তন্দ্রায় বিভোর। কাটিং বোর্ডের ওপর নিপুণ হাতে ছুরি চালিয়ে সবজি কাটছে মৌরির স্বামী। সে-ই করছিল এই কাজ। মেয়েকে নিয়ে তার স্বামী রুমে ছিল। ঘুম পাড়িয়ে যখন রান্নাঘরে এসে দাড়ায়, সেই মুহূর্তে মৌরি অন্যমনস্কতায় আঙ্গুলে ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল অল্প করে। এর পর স্বামীর তাকে নিয়ে উদ্বেগ, ব্যাকুলতা- সব দেখেছে। পরে কাঁটাকুটির কাজ থেকে মৌরিকে সরিয়ে নিজেই হাঁত লাগায়।
মৌরি তখন অবচেতন মনে স্বামীর এই অল্প স্বল্প যত্নে ভালোলাগা অনুভব করে খুব। অল্প কাঁটা আঙ্গুলটা যখন যত্নসহিত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয় আলতো হাতে ছুঁয়ে, তখন মৌরির মনে হচ্ছিল শরীরের সেই সামান্য ক্ষতটা যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। ব্যথার জায়গায় এখন এক চিনচিনে ভালোলাগা। যে মানুষটার সাথে তার সম্পর্কের সমীকরণটা গত দুদিন থেকে স্রেফ ধোঁকা আর কর্তব্যের মনে হচ্ছিল, আজ সেখানে যেন নতুন কোনো রঙের ছোঁয়া লাগছে।
মৌরি ভাবল, জীবনটা কি এমনই? কখনও ঝড়ো হাওয়া এসে তাণ্ডব চালিয়ে সবটা এলোমেলো করে দেয়, আবার কখনও সেই ঝড়ো হাওয়ার অশান্ত গোঙানি সুর পাল্টে মধুর কণ্ঠে ভেসে আসে। তার স্বামীর এই নিপুণ হাতে সবজি কাটা, সংসারের ছোটখাটো কাজে এগিয়ে আসা, বাচ্চা সামলানো - এই সবকিছু তার ভেতরটা ভালোলাগায় ছেয়ে দিচ্ছে। আধুনিকতার ভাষায় যাকে বলে - হাসব্যান্ড ম্যাটেরিয়াল।
মৌরি এক্সি ‘ডেন্টের পর থেকে সাধারণত রাতে কিছু অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখে, যার কোনো কুল কিনারা সে পায়না। মাঝে কিছুদিন এই সমস্যাটা কমে এসেছিল পুরোপুরি। তবে কক্সবাজার ভ্রমণের পর আবার দেখা যায়। কিন্তু কেন জানি গতরাতে অকস্মাৎ একটু বেশিই বেড়ে যায়।
তন্দ্রায় বিভোর মৌরির মনে হচ্ছিল সবার থেকে দূরে অন্য কোনো জগতে চলে গেছে, অথচ তাও জায়গাটা আপন। ঘন বন-জঙ্গল, আঁকাবাঁকা-উচুনিচু রাস্তা, ছোট ছোট বাচ্চাসহ আরও অনেক কিছু। মুক্ত পাখির মতো উড়ছিল সে ওখানে। এসব স্বপ্নের হেতু সে জানেনা। আবার বাচ্চার ক্রন্দনস্বর আর কারো আকাশ বাতাস কাপিয়ে কাউকে ডাকার শব্দ কানে এসে বারি খাচ্ছিল শুধু। তন্দ্রাচ্ছন্ন মৌরিকে অস্বাভাবিকভাবে গোঙাতে দেখে তার স্বামী আগলে নিয়েছিল। মৌরি যখন ঘুম ভেঙে আতঙ্কে কোথায় আছে, কি অবস্থায় আছে বুঝে উঠতে পারছিলনা। তখন উষশীর বাবা বুকে জড়িয়ে তাকে আগনে নেয়। মাথায় হাঁত বুলিয়ে, হাত পা মেজে বুকে নিয়ে তাকে শান্ত করে তবেই থেমেছে। আবার তাদের নড়চড়ে মেয়ে জেগে যাওয়ায়, তাকেও সামলায় একা হাতে। কন্যা, স্ত্রী - দুজনকে সমানতালে আগলে নিচ্ছিল উমরান তাওসিফ।
আতঙ্কিত মৌরির তখন সেসব চোখে না পড়লেও, সকাল হতে হতে সবটা মনে পড়ে। সবজি কাটতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গতরাতের কথা-ই ভাবছিল। এসব ভাবতে গিয়ে আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে সে।
_”কি ভাবছ এত ধ্যানমগ্ন হয়ে?”
রান্নাঘরের মশলার ঘ্রাণ আর চামচ নাড়ার টুংটাং শব্দ ছাপিয়ে মৌরির কানে বাজলো স্বামীর কথাখানা। অস্ফুট সুরে বলে,
_”আপনি কি আসলেই এমন? নাকি নাটক করছেন? এসবেতেও নতুন করে ধোঁকা দেওয়ার মতলব না তো?”
তেলের ছ্যাঁতছ্যাঁত শব্দে উমরান তা শুনতে পেলেন না।
_”হুম? কি বলছ?”
স্বামীর শক্ত পেশিযুক্ত হাতের দক্ষ কাজ দেখতে দেখতে প্রশ্নখানা করেছিল মৌরি। উল্টো প্রশ্নে সে পূর্ণ মনোযোগে তাকায়। সুদর্শন ত্রিশোর্ধ্ব পুরুষটিকে মন দিয়ে দেখতে দেখতে বলে,
_”আপনার স্ত্রী সম্পর্কে তো কিছুই বললেন না এখনো…” কেন জানি বেশ আশা মৌরির, যে আজ সঠিক উত্তরই দেবে তার স্বামী। অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয় সে।
ফ্রাইপেনে চামচ নাড়তে নাড়তে উমরান একনজর তাকান স্ত্রীপানে। পরপর নির্লিপ্তে বলেন,
_”দুদিন সময় চেয়েছিলাম।”
_”আমার ধৈর্য হয়না আর।”
_”যা বলবো, বিশ্বাস হবেনা তোমার।”
_”না হোক বিশ্বাস। আপনি বলুন।”
_”বিশ্বাস করবেনা জেনেও কেন বলবো?”
_”আমি বলেছি তাই…”
জেদি স্বরে আরেক নজর তাকিয়ে উমরান বলেন,
_”আমার স্ত্রী তুমিই। আর কেউ না।”
_”আমি প্রথম স্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাইছি।”
_”আমার স্ত্রী একজনই।”
_”হেয়ালি করবেননা প্লিজ।” কপালের ভাঁজটা তার বিরক্তিস্তরের প্রমাণ দিলো। তা বুঝেও বলেন,
_”আমি হেয়ালি করছিনা।”
_”তাহলে উষশী কি আকাশ থেকে টপকেছে?” দাঁতে দাঁত চেপে বললো মৌরি।
উমরান সামান্য হেসে বলেন, _”উহু, আট মাস তেরো দিন ওর মাম্মার পেটে ছিল। তারপর ওর মাম্মার ধৈর্য, আর আমাদের অশেষ দুশিন্তার অবসান ঘটিয়ে অপারেশনের মাধ্যমে আমার কোলে এসেছে।”
_”তাহলে আপনার স্ত্রী আমিই - এ কথা কেন বলছেন?” অসম্ভব ক্রোধান্বিত তার কণ্ঠ। তাও তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলে।
_”কারণ এটাই সত্য।”
_”আচ্ছা? আপনার অন্য কোনো বিয়ে না হলে, বউয়ের সাথে কিছু না করলে এমনি এমনি…” বাধনহারা হয়ে কথাটা সম্পূর্ণ করতে গিয়েও থেমে যায় মৌরি। উমরান সামান্য করে হেসে ফেললেন তার কথায়। সদা গাম্ভীর্যে ছেয়ে থাকা চেহারাখানায় হাসিটা খুব মানায়।
_”কি বলতে চাও সম্পূর্ণ করো…” কাউন্টারে হাতের ভর দিয়ে ভ্রুকুটি করে মৌরির দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি রেখে বলেন।
তার ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় একটু লাজাবরণ আসতে চাইলেও মৌরি সামলে নেয় নিজেকে। মনোযোগসহকারে তাকায় স্বামীর দিকে। চোখে মুখে এক ধরণের কৌতুকপূর্ণ হাসি। যেন মজা পেয়েছে মৌরির কথায়। তাও সেই হাসির পেছনে চেহারাটা দেখে মনে হয়না তার, যে অনুভূতির দিক দিয়ে এই লোকটার জীবনে দ্বিতীয় নারী সে। অথচ কাজকর্মে মনে হয় আগেও সংসার করেছে।
_”সত্যি করে বলুন তো। আসলেই আমি প্রথম?”
হাসির রেশ কমে এসেছে উমরানের। হাত চালাচ্ছিলেন কাজে। স্ত্রীর অতি গভীর প্রশ্নটা শুনে ফের চোখ তুলে তাকান। মৌরির পেখম রাঙা দৃৃষ্টিতে নজর বুলিয়ে সরাসরি চোখ রেখে জবাব দেন,
_”হ্যাঁ, তুমিই প্রথম, আর একমাত্র।”
_”আমার আগে কাউকে অনুভব করেননি?”
_”কাউকে না।” তখনও তার দিকে দৃষ্টি
_”ছোঁননি কাউকে?” থেমে নিচু গলায় যোগ করে, _”যেভাবে আমাকে ছুঁয়েছিলেন।” প্রশ্নটা করতে গিয়ে কোথাও একটা অস্বস্তি কাজ করলেও সাহস সঞ্চয় করে, লাজ বর্জন করে করলো সে। উমরান তার সবটা বুঝলেন। চোখের ভাষা পড়ে নিলেন নিঃশব্দে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এনে বলেন,
_”উহু, তুমিই প্রথম। তোমার আগে কাউকে ছুঁইনি।”
_”মিথ্যুক।” প্রহসনের শব্দ মৌরির।
_”উষশীর প্রমিস।” উমরান একটুও বিচলিত না হয়ে তার চোখের গভীরে তাকিয়ে বললেন। চুলার সামনে দাড়িয়ে, এক হাত কিচেন কাউন্টারে ভর দিয়ে রাখা। পাশে স্টুলে বসা মৌরি। দুজনার দৃষ্টি দুজনাতে। সে একটু থামল বোধ হয় উমরানের কথা শুনে,
_”তাহলে ও কার সন্তান?”
_”আমার। আমার আর তোমার সন্তান।” সামান্য দ্বিধা না রেখে ফের বলে দিলেন এ কথা। মৌরি চোখ পিটপিট করে তাকায়।
____
কর্নেল আফজাল কিবরিয়া; ওরফে শ্রেয়সীর কর্নেল আঙ্কেল। তিনি এসেছেন ফুলবাড়ি, প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে। তাদের নিয়ে আসার কথা ছিলনা। তবে শ্রেয়সীর দীদুনের সাথে মুটামুটি ভালো সম্পর্ক ছিল প্রথম পক্ষের স্ত্রীর। তার শ্রেয়সীকে দেখার ইচ্ছে। যে মেয়েটা লাপাত্তা হওয়ায় এত এত অনুসন্ধানের পরেও খোঁজ মেলেনি, যাকে মৃ ‘তই ধরে নিয়েছিল প্রত্যেকে। তার সন্ধান পাওয়া গেছে পুরো একটা বছর পর। কৌতূহল কাজ করবে স্বাভাবিক। তাছাড়া শ্রেয়সীকে নিজের দুই ছেলে আর এক মেয়েসহ পূর্ণ সংসারে ঠায় দিয়ে ঝামেলা বাড়াতে না চাইলেও, খারাপ চাননা বটে। শুভাকাঙ্ক্ষী বলা যায়। মেয়েটার এমন আকস্মিক হারিয়ে যাওয়া, সবার মনে দাগ কেটেছিল। সেই সূত্র ধরে শ্রেয়সী ফিরেছে শুনে দেখতে আসার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন স্বামীর কাছে। তাই কিবরিয়া সাহেব প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানসহ এসেছেন ফুঁলবাড়ি।
এই বাড়িটির পূর্ববর্তী নাম ছিল ‘আপন নীড়’। শ্রেয়সী আর উষশীকে চট্টগ্রামে সেদিন প্রথমবার নিজেদের বাড়ি নিয়ে আসার আগে, পুরো ঘর সাজানো হয়েছিল মা-মেয়ের জন্য। নাতনির আগমনের খুশিতে বাড়ির রঙ-সহ ইন্টেরিয়র পরিবর্তন করেছিলেন, সাথে ছেলের কাছে শ্রেয়সীর পছন্দ জেনে নিয়ে সারাবাড়ি লোক লাগিয়ে ফুলে ফুলে সাজিয়ে ফেলেছিলেন ওলিওল্লাহ চৌধুরী। পুত্রবধুর উপর ভীষণ সন্তুষ্ট তিনি। ঐ বয়সে বিয়ে পড়ানোর কোনো ভাবনায় ছিলনা তাদের। ছেলের অবুঝপণার জন্য সায় দিতে হয়। আবার কয়েকমাসেই তাদের বংশ প্রদীপের আগমনী বার্তা দিল। অসম্ভবরকম দুশ্চিন্তায় ছিলেন সবমিলিয়ে। অঘটন ঘটে গেলে সব এলোমেলো হয়ে যেতো। যে ছেলেকে বিয়েতে রাজী করানো যেতনা, অতিরিক্ত ক্যারিয়ার এম্বিশিয়াস হওয়ায় জীবনে অন্য কাউকে জড়াতে চাইছিলনা। সে তখন একজনাতে ডুবেছে। কিছু একটা এদিক ওদিক হয়ে গেলে হাতের বাইরে চলে যেত সবটা। কিন্তু নিজে সুস্থ থেকে তাদের নাতনিকেও সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখালো শ্রেয়সী। যেখানে নিজেই তখনো দুনিয়া ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারেনি।
সব মিলিয়ে শ্রেয়সীর কথা মাথায় রেখেই চৌধুরীদের ‘আপন নীড়’ হলো ‘ফুলবাড়ি’।
কিবরিয়া সাহেবের পরিবারসমেত ফুলবাড়ি উপস্থিতির বেশ সময় গড়িয়ে গেল। শ্রেয়সীকে দেখে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বেশ অনেকক্ষণ নিজের পাশে বসিয়ে রেখেছিলেন। মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে, মমতার স্বরে অনেক কথা বলেছেন। শ্রেয়সীর যেহেতু কিছু মনে নেই। আর উমরান মানা করে দিয়েছে। তাই আগের কিছু নিয়ে কথা তুললেননা।
স্বামীর কর্মস্থলের সিনিয়র অফিসার পরিবারসমেত এসেছে তাদের বাড়ি, এটুকুই জানে মৌরি। দুই জমজ ছেলে, তার বয়সী এক মেয়ে, আর কর্নেল সাহেবসহ তার স্ত্রী। কিবরিয়া সাহেব কর্নেল আঙ্কেল ডাকতে শিখিয়ে দিলেন মৌরিকে। মৌরির তাকে দেখার শুরু থেকে আফজাল কিবরিয়ার অল্প ভেজা চোখ দুটো খেয়াল করেছে। মাথায় রাখা স্নেহের হাতটা অনুভব করে তার মনে হয়েছিল, যেন বহুবছর ধরে চেনে সে মানুষটাকে। বহুবছর ছিল এই হাতটা তার মাথার উপর। বুকের ভেতরটাই কেমন একটা করে উঠেছিল।
বেশ ভালো সময় কাটল তাদের। উষশী একই চেহারার দুই মানব দেখে বিস্মিত। চেহারা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছে সে। আঁচড়ও দিয়ে দেয় একজনকে। তার উপর তার জন্য নতুন নতুন খেলনা নিয়ে এসেছে। ভীষণ খুশি সে। কর্নেল নানুকে আগেও দেখেছে বলে অল্প স্বল্প চেনে সে। তার সাথেও নানান দুষ্টুমি। বাবার কোল থেকে নিচে নেমে যেতে চায়। কিন্তু ঠান্ডার মধ্যে তাকে ফ্লোরে ছেড়ে দিতে অসম্মতি তার বাবার। তাই উষশী নারাজ। একই চেহারার দুই মানবের সাথে খেলছে, আর কোল থেকে নামতে গাঁইগুই করছে।
__
তখন উমরান, কর্নেল কিবরিয়া, আর তার স্ত্রী বসার ঘরে সোফায়। উষশীকে নিয়ে জমজ দুভাই পুঁই পাখির কাছে। মৌরি কর্ণেল আঙ্কেলের মেয়েকে বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। ফুলে ফুলে মুখরিত বাড়ি দেখতে বেশ আগ্রহ তার চোখে। অল্প স্বল্প কথাবার্তা হচ্ছে দুজনের। হাঁটতে হাঁটতে কর্নেলের মেয়ে বলে,
_”তুমি এ বাড়িতে আছো কতোদিন? আর কি নামে ডাকবো তোমায়?”
_”গত দুদিন ধরে আছি এখানে। আর মৌরি সওদাগর আমার নাম। মৌরিই ডেকো।”
_”উষশীকে সামলাতে পারো? ও তোমাকে চেনে তো?”
মৌরি স্বাভাবিকভাবেই জবাব দেয়, _”হ্যাঁ, চিনবেনা কেন? বেশ চেনে। ওর বাবা বাড়ি না থাকলে আমার সাথে ভালোমতো থেকে যায়। না চিনলে তো কান্নাকাটি করত।”
সারা মাথা নাড়ায়। সারা বিনতে আফজাল তার নাম। কর্নেল কিবরিয়ার আদরের কন্যা। সে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলে বলে হাঁটছে মৌরির সাথে। আকস্মিক থেমে গিয়ে বলে,
_”তুমি কি কিছুই মনে করতে পারনা?”
মৌরি থেমে ভ্রু কুচকে জানতে চায়,
_”কি মনে করার কথা বলছ তুমি?”
সারা তার তাকানো দেখেই বুঝল কিছু মনে নেই শ্রেয়সীর। বাড়ি থাকতেই বাবা তাদের সাবধান করেছিল অতীত নিয়ে কথা না বলতে। তা মাথায় রেখেই সে প্রশ্ন রাখল,
_”তোমার স্বামীর আগের স্ত্রী ছিল, একটা সন্তান আছে - এই নিয়ে তোমার কি মতামত?”
মৌরি ফের থমকালো। মেয়েটা এসব নিয়ে কথা বলছে কেন? অতিথি অতিথির মতো থাকলেই তো ভালো। তাকে নিসশ্চুপ দেখে সারা আবার বলে,
_”মেজর সাহেবের একটা মেয়ে আছে আগে থেকে। তাও তুমি উনাকে বিয়ে করলে? তোমার পরিবার তোমাকে এমন একজনের সাথে বিয়ে দিলো?”
মৌরির মেয়েটার মুখে নিজের স্বামীকে এমনভাবে সম্বোধন করায় মোটেও ভালো লাগলনা। আবার অন্যান্য প্রশ্নে কিছুটা অস্থির দেখাল তাকে। সময় নিয়ে পাশ কাটিয়ে বলে,
_”উষশীর খিদে পায় এসময়ে। কাঁঁদতে শুরু করলে থামানো যাবেনা। এসব কথা পরে বলে এখন আমরা চলি।” কথাটা বলেই চলতে শুরু করে সে। সারাও পেছন থেকে তাকে দেখতে দেখতে নির্লিপ্তে হাঁটতে থাকল।
___
দুপুরের ভোজ সেরে বিকেলের দিকে অতিথিরা চলে গেল। কর্নেল আঙ্কেল যাওয়ার সময় মৌরিকে জানালেন, এবার থেকে মাঝে মাঝেই এ বাড়িতে তাঁর দেখা মিলবে। তাতে যেন সে বিরক্ত না হয়। মৌরি হেসে সম্মতি দিয়েছে। উষশীর নরম কচি পাতার মতো দুটো হাতে দুটো হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে আদর করে সবাই বিদায় নেয়।
কিন্তু মৌরির ভেতরে স্বামীর জন্য জেগে ওঠা ক্ষীণ ভালো লাগাটুকুও আর রইল না। মেয়েটার সম্বোধনেই বোঝা যায়, সে উষশীর বাবাকে আগে থেকেই চেনে। তার ওপর অদৃশ্য এক প্রহসনের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো সে ছুড়ে দিয়েছিল, তার একটারও সঠিক উত্তর সে দিতে পারেনি। বাইরের কারো কাছে স্বামীকে ছোট করতে চায়নি বলেই চুপ ছিল। নইলে স্পষ্ট বলে দিতে পারত যে লোকটা প্রতারণা করে তাকে বিয়ে করেছে।
সকালের মতো আর নেই তার মন।
ছাদে শুকাতে দেওয়া উষশীর এক পাহাড় কাপড় নিতে এসেছিল সে। সব জড়ো করে একপাশে ঝুড়িতে রেখে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দৃষ্টি আকাশপানে। ঠান্ডা পড়ছে খুব। গায়ে শীতের পোশাক নেই, তবু নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে রইল। কী ভাবছিল, জানা নেই। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ গায়ে একটা জ্যাকেট জড়িয়ে দিল। মৌরি ফিরে তাকায়। তার স্বামী। নিজের পড়নের জ্যাকেটটা তার গায়ে তুলে দিয়েছে।
_“এখানে এই ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে আছ কেন?” জ্যাকেট ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন উমরান। ললাটে স্ত্রীর জন্য উৎকণ্ঠার ভাঁজ। মৌরি তা দেখেও কোনো জবাব দিল না।
_“কী হলো? চলো, শীতে পুরো শরীর হিম হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি চলো।” হাত টেনে ধরলেন।
কিন্তু মৌরি সেই হাত ধরে থামিয়ে দিল।
উমরান পেছন ফিরে তাকাতেই শান্ত কণ্ঠের দৃঢ় কথাগুলো কানে বাজল তার,
_”আপনার আমার এই সম্পর্কে আমি শুরু থেকে নানান প্রশ্নে আঁটকে আছি। কোনো কিছুর সঠিক জবাব নেই। সবটা দ্বিধা, দ্বিধা আর দ্বিধা। মানিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু আর পারছিনা। বারবার এক জায়গায় আঁটকে যাই। আপনাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারিনা। কি বলছেন বুঝতে পারিনা। কি চান বুঝতে পারিনা। আমার কাছে আপনি মানুষটা পুরোই একটা ধাঁধা। দুদিনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমি। এভাবে সংসার হয়না। আপনার মতো নির্লিপ্ত, নির্বিকার, অনুভুতিহীন এক জড় বস্তুর সাথে আমি ঘর করতে পারবনা। আমার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে। আমি আর পারছিনা এভাবে। মুক্তি চাই আমি। কিন্তু তার আগে সব প্রশ্নের উত্তরও চায়। এখন কি প্রশ্ন সেটা জিজ্ঞেস করে আমাকে উন্মাদ হতে বাধ্য করবেননা। যা প্রশ্ন আমার মনে আছে। সেসব নিজেই সৃষ্টি করেছেন। তাই কি প্রশ্ন, তা খুঁজে বের করে উত্তরও আপনিই দেবেন। আজ উত্তর না দিলে আমি এখান থেকে এক পাও নড়বনা।”
জ্যাকেট খুলে ফেলায় উমরানের গাঁ ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। শুধু সাদা শার্ট গাঁঁয়ে। ঝাপসা কুয়াশা, সাথে অল্প হাওয়া বইছে। যা এই শীতে গাঁঁয়ে শিহরণ অনুভব করাতে যথেষ্ট। কিন্তু মেজর উমরান তাওসিফ যেকোনো তাপমাত্রায় মানিয়ে নেওয়ার ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তাই গাঁঁয়ে কাঁটা দিচ্ছে কিনা প্রশ্ন করার অবকাশ রাখেনা। উমরান পূর্ণমনোযোগে শুনলেন স্ত্রীর সব কথা। এরই মাঝে মৌরি ফের আওয়াজ তুলে,
_”আপনাকে সকালে কেন জানি ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল তখন যে রুপটা দেখিয়েছেন, কোথাও না কোথাও ওটাই আসল আপনি। কিন্তু না। আপনি সেই পুরোনোটাই। আগাগোঁড়া ধোঁকাবাজ একটা। প্রথম আমাকে বিয়ে করে উষশীর সাথে, ওর মায়ের সাথে প্রতারণা করেছেন। উষশী আর ওর মায়ের কথা না জানিয়ে আমার সাথে প্রতারণা করেছেন, আবার বাইরের মেয়েদেরও সুযোগ দেন নিজের প্রতি। এদিকে ভাব এমন যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী, শ্রেষ্ঠ বাবা। কতরুপ দেখাবেন আপনি?”
বেশ খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে স্ত্রীকে দেখেই গেলেন উমরান। ঝাপসা কুয়াশায় মুখ দিয়ে শব্দ নিঃসৃত হওয়ার সাথে সাথে হালকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সন্ধ্যার আধার নামছে ধরণীতে। ফুলবাড়ির চারপাশের নিয়ন আলোগুলোর কারণে স্নিগ্ধ মুখখানা ঝিলিক দিচ্ছে তার চোখের সামনে। উমরান স্থির দৃৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে অবশেষে মুখ খুললেন,
_”বাইরের মেয়েদের সুযোগ দিই বলতে?”
_”কাদের সুযোগ দেন সেটা আপনার ভালো জানার কথা। আমাকে এই নিয়ে ফের দ্বিধাদন্ধে ফেলার চেষ্টা করলে আমি কি করবো আপনি ভাবতেও পারবেননা। এখন কথা না ঘুরিয়ে যা জানতে চেয়েছি জবাব দিন।”
_”নিচে উষশীকে একা দোলনায় রেখে এসেছি।”
_”থাকুক।” নরম হতে গিয়েও শক্ত জবাব মৌরির।
উমরান চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টানেন।
_”কাল সকালেও বলেছিলাম দুটোদিন সময় দিলে আমি সবটা বুঝিয়ে দিতে পারবো তোমাকে। কিন্তু তুমি সেই জেদি মেয়েটাই থেকে গেলে শ্রেয়সী।”
সোজা জবাবে না এসে অন্য কিছু বলায় বিরক্তি ফুঁটতে গিয়ে অকস্মাৎ প্রশ্ন ফুঁটে উঠল চেহারায়। ‘শ্রেয়সী’...... হ্যাঁ, কাল রাতে স্বপ্নে কেউ একজন এই নামে ডাকছিল। সকালে উঠে মনে পড়লে, এই নাম আগেও কোথায় একটা শুনেছে শুনেছে মনে হচ্ছিল বারবার। কিন্তু মনে করতে পারছিলনা। এখন মনে পড়লো। মেজরের মুখেই শুনেছে সে। সেই প্রথমদিন, যখন মৌরি প্রতারক ডেকেছিল বলে অকস্মাৎ রেগে গিয়ে তার উপর উঠে এসেছিল লোকটা। তারপর দুজনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তেও কিছু কথা বলেছিল কানের কাছে ফিসফিস করে, তখনও এই নামটা শুনেছিল বোধ হয়। তবে ঐ অবস্থায় তেমন একটা মাথায় নিতে পারেনি সেসব। কিন্তু কাল স্বপ্নে এই ডাকই তো শুনল!!
_”আমি মৌরি, মৌরি সওদাগর। কি নামে ডাকছেন আমাকে?”
উমরান নির্বিকারে স্রেফ বললেন, _”আমি শ্রেয়সীর সাথে কথা বলছি। আমার একমাত্র স্ত্রী, আমার সন্তানের মা।”
মৌরি ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে কাছে আসে স্বামীর। আবার সবটা ধাঁধা মনে হচ্ছে তার। এই লোক ইচ্ছাকৃত করছে এসব। পেশিবহুল বাহুতে হাঁত রেখে শার্টের কাপড় মুঠোয় চেপে ধরে সে,
_”আবার এলোমেলো কথা বলে আমায় ধাঁধায় ফেলতে চাইছেন… আপনাকে আমি মে ‘রে ফেলবো উষশীর পাপা।” ক্ষোভে চোখ চিকচিক করছে স্বল্প অশ্রুতে।কিন্তু সম্বোধন করা ডাকটা ভালোলাগায় ছেয়ে দিলো উমরানের তনুমন।
_”কোনটা এলোমেলো কথা মনে হচ্ছে তোমার।” ঠান্ডায় আর ক্ষোভে কাপঁছে দেখে স্ত্রীকে না ছাড়িয়ে আরও কাছে টেনে নিলেন। সম্মুখের চুলগুলো সরিয়ে দেন সন্তর্পণে।
মৌরি ছাড়াতে চাইলেও ছাড়লেননা। উপরন্তু তীব্র ঠান্ডা বুঝে অজান্তে আরও গাঁ ঘেঁষে দাড়ালো সে। দূূরত্ব নেই দু দেহের মাঝে। উমরান মৌরির গাঁঁয়ের জ্যাকেটের ভেতর হাত গলিয়ে কোমর জড়িয়ে নিলেন। মৌরিকে আরেকটু আগলে নেন।
_”আমাকে অন্য নামে ডাকছেন কেন?”
_”যদি বলি তুমি মৌরি নও। শ্রেয়সী তোমার নাম?” মৌরি ঘন ঘন শ্বাস টেনে তাকিয়ে রইলো নিরুত্তর। উমরান ফের বলেন,
_”শ্রেয়সী নেওয়াজ। আমার স্ত্রী। প্রথমবার যাকে কবুল করেছিলাম। আমার প্রথম স্ত্রী। যার সাথে আগে একবার সংসার করেছি আমি, থেকেছি, ঘর করেছি, ছুঁয়েছি যাকে। আমার সন্তান পেটে ধরেছে যে। জন্ম দিয়েছে যে। আমাকে সর্বোচ্চ সুখ দিয়েছে যে। আবার হারিয়ে গিয়ে নিঃসঙ্গতার জীবন উপহার দিয়েছে দুটো মানুষকে। আমার মেয়ে উষশীকে, আমাকে। ফিরে পেয়ে আবার শেষ যাকে কবুল করেছি, সেই তুমি।” থেমে যোগ করলেন, _”বিশ্বাস করবে?” চোখে চোখ রেখেই প্রশ্ন রাখলেন।
শ্রেয়সীর যদি এতই অনুসন্ধিৎসা থাকে যে আর মাত্র একটা দিন অপেক্ষা করার ধৈর্য হচ্ছেনা। তাহলে জানুক সে। সবটা জানুক। উমরান নিজেও এভাবে অন্য কোনো নাম-পরিচয়ে নিজের বউকে মেনে নিতে পারেনা। শ্রেয়সী শুধুই শ্রেয়সী। আর কেউ না। তার বউ, তার মেয়ের মা। আর কোনো কৃত্রিম পরিচয়ধারী মানবী না সে। তার ঠিকঠাক ঐ মৌরি নামটা উচ্চারণ করতেও মন সায় দেয়না ভেতর থেকে। তাও বেশ কয়েকবার মৌরি ডেকেছে প্রথম প্রথম। কিন্তু সেই কয়েকবারের পর আদতেই মৌরি নামের একজনের অস্তিত্ব ছিল জেনে আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেনি সে ঐ নামে।
বেশ খানিকক্ষণ চারপাশটা নীরবতায় ছেয়ে থাকল। অথচ দুজনের দৃষ্টি দুজনাতে। একজন সামনের জনের মনোভাব বুঝতে চাইছে। অপরজন দৃঢ় অথচ মোহনীয় দৃষ্টি ফেলে হৃদয়মোহিনীকে দেখছে।
_”ফাজলামো পেয়েছেন?”
_”যদি প্রমাণ দিই?”
_”কেউ একজন যা তা প্রমাণ দিলেই আমি মেনে নেবো যে আমি আমি নই?” ব্যঙ্গ করে কথাখানা বলার সঙ্গে সঙ্গে কোমরে চাপ অনুভব করলো সে। পা দুটো ছাদের ফ্লোর থেকে কিছুটা উপরে উঠে গেল। তবে আঙ্গুলগুলো তখনও ফ্লোরে ছুঁয়ে আছে। ভারসাম্য ঠিক রাখতে দুহাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে নিতেই কানে বাজল তার দৃঢ় কণ্ঠ,
_”মানতে হবে।”
আগে থেকে এঁকে অপরের সংস্পর্শে থাকায় অপ্রত্যাশিত টানে দুদেহে ঘর্ষণ হয়েছে। মৌরির নাজুক দেহখানা দৃঢ় দেহটার সাথে ঘেঁষে নিচ থেকে অল্প করে উপরে উঠে গেছে। তার শরীরের বাকগুলো সামনের জন স্পষ্ট অনুভব করেছে তা মৌরি বেশ বুঝল। চোখ খিচে নেয় সে চিনচিনে ব্যাথায়। স্বামীর কাঁধ খামচে ধরে বলে,
_”ঠিক আছে, দেখান আপনার প্রমাণ। আমিও দেখি আমাকে আমি নই প্রমাণ করতে কি কি রামলীলা কাহিনী রচনা করেন।”
_”প্রমাণ বেশ আছে আমার কাছে। তার আগে তুমি যে মৌরি নও, তা প্রমাণ করতে পারলে কি করবে বলো?” অতি নৈকট্যে থাকা চেহারাটায় চোখ বোলাতে বোলাতে বলেন।
_”অলীক কল্পনা বাদ দিয়ে প্রমাণ দেখান, আমি একটু চক্ষুদর্শন করি সেসব। আমি একজনের সাথে সংসার করেছি, তার বাচ্চা পেটে ধরেছি, আবার জন্ম দিয়েছি - অথচ আমিই জানিনা। একটু দেখান আপনার সেই মহামূল্যবান প্রমাণ।” প্রহসন কণ্ঠে কথাগুলো বলে জিরোতে পারলনা সে। তার আগে তাকে নিজের কাছ থেকে ছেড়ে দাড় করিয়ে দিল তার স্বামী। সে ঠিক হয়ে দাঁড়ানোর আগে উমরানকে দেখল ফ্লোরে বসে তার গাঁঁয়ের কাপড়ে হাত দিতে। পড়নের কামিজ সরিয়ে পাজামার ফিতেতে হাত দিয়েছে উমরান। মৌরি বিস্মিত হয়ে ফিতেটা ধরে নিয়ে পিছু হটে যায়।
_”পাগল আপনি? এগুলো কোন ধরণের অ ‘সভ্যতামি। যা তা শুরু করে দেন দেখছি।”
উমরান তার কথা উপেক্ষা করে যান,
_”হুশশশ!! চুপ। আমার উষশীর পৃথিবীতে আসার চিহ্ন দেখাবো তোমাকে সবার আগে। তুমি ওটা অস্বীকার…” আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন উমরান। কিন্তু উষশীর ক্ষীণ ক্রন্দনস্বর কানে আসতেই থেমে গেলেন।
দুজনের দৃষ্টি তখনও এঁকে অপরের দিকে। মৌরি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উষশীর কণ্ঠ শুনে। লোকটা যখন তখন যা তা শুরু করে দেয়। কি আশ্চর্য! এমন একটা লোক জুটল তার কপালে... স্বস্তির শ্বাস টেনে ধীরে ফিতেটা আঁটকে নিলো সে।