-”কিরে? ওদিকে কি দেখছিস?”
-“কিছুনা।”
মৌরি ঘাড় ফিরিয়ে নেয়। সোজা হয়ে সিটে মাথা দৃঢ়ভাবে এলিয়ে দিয়ে বসে। শ্বাস টানে, তবে বুকের ধুকপুক শব্দ অনামিকাকে বুঝতে দেয়না।
-“কিছুনা মানে? আমার কাছে লুকিয়ে কি হবে?”
মৌরি ততক্ষণে কিছুটা সামলে নিয়েছে নিজেকে। অনামিকার পানে তাকায়।
-“ঐ গাড়িতে তোর ব্যক্তিগত মেজরের খোঁজ করছিলি নাকি?” অনামিকা
বান্ধবী তার অব্যক্ত কথা ধরে নিয়েছে বুঝতে পেরে চোখ সরিয়ে নেয় মৌরি। তারা এখন চলন্ত বাসে আছে। ইউনিভার্সিটির বাস। জানালার ধারে আছে সে। পাশে বসে থাকা অনামিকার সাথে গল্প করতে করতে হঠাৎ উল্টোদিক থেকে একটা আর্মিদের গাড়ি যেতে দেখে খানিকটা মাথা বের করে দেখছিল সে। এমন না যে, ওখানে ঐ অপরিচিত মেজরের থাকার কথা ছিল। হঠাৎ আর্মিদের গাড়ি দেখে অবচেতন মন কেন ওখানে লোকটা থাকতে পারে বললো তা সে জানেনা। ব্যাস আর্মি গাড়ি দেখে মাথা বের করে চোখ দুটো কাউকে খুজছিল। তবে বৃথা গেলো খোজা। এমন কাউকে চোখে পড়েনি সেখানে। আরও একটু খুঁজে দেখবে, তার আগে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটা গাড়িটা উধাও হয়ে যায়। মৌরি অনামিকার কথা শুনে তাকে
-“তেমন কিছুনা” বলে কাটিয়ে দিতে চায়।
তবে অনামিকা যা বুঝার বুঝে নিয়েছে।
-“লুকিয়ে কি হবে? সব তো বুঝি। তবে আরেকটু ধৈর্য ধর দোস্ত। আমার মনে হয় ব্যাটা কোনো সমস্যায় আছে।”
-”বাদ দে। ঐ টপিকে কথা বলতে চাইছিনা। বাই দা ওয়ে, সেমিস্টার এক্সামের ডেট দিবে শুনলাম আজ। তুই জানিস কিছু?”
অনামিকা বান্ধবী কথা ঘুরাচ্ছে বুঝতে পেরেও আর ঘাটায়না। অন্য বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করে দুজনে।
সেদিনের পর একমাসের মতো কেটে গেছে। মৌরির জীবন এখন আগের ধারাতেই চলছে। লেখাপড়া, বাড়ি, পরিবার - এসবই। তার বাবা এলাকার সনামধন্য একজন ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। বারো আর পনেরো বছরের দুটো সন্তানসহ চাচা আর চাচী আছে। মুটামুটি যৌথ পরিবার। মৌরির একটা বড় ভাই আছে, সাথে বড় বোন তুলি। ব্যাস, তাদের নিয়েই পরিবার। খুব প্রটেক্টিভ আর কনজারভেটিভ তার পরিবারটা। তবে শাসন বারণ থাকলেও, আদর ভালোবাসারও কোনো কমতি নেই সন্তানদের প্রতি; বরং একটু বেশিই।
ইউনিভার্সিটিতে সারাদিনের ঝক্কি ঝামেলা শেষে বাড়ি ফেরে মৌরি। সবার আগে নতুন পোষা পাখিটিকে দেখতে যায়। ঠিকঠাক দানা আর পানি খেয়েছে কিনা দেখে।
-”পুঁইসোনা রাগ করেছিস নাকি? চুপচাপ যে?”
পুঁই মাথা কাত করে তাকায়, তারপর হঠাৎ ডাকে,
-“পরি পরি, সুন্দরী, এসেছে এসেছে!”
মৌরি বিরক্ত হওয়ার ভান করে,
-“আহা, কতবার বলবো!! পরিও নয়, সুন্দরীও নয়। মৌরি, মৌরি আমার নাম। বল মৌরি??”
ডানা ঝাপটে পুঁই বলে উঠে,
-”পরি, পরি। সুন্দরী!”
পুঁইকে এমন ডানা ঝাপটে ঝাপটে ঘুরতে দেখে মৌরি না হেসে পারেনা।
-”কত সহজ একটা নাম ‘মৌরি’। তা না ডেকে পরি, সুন্দরী এসব ডাকিস। বুঝেছি সোজা রাস্তায় তোর হয়না। নাহলে একমাসে অন্তত নামটা শিখতে এত কষ্ট হতোনা। জেদি পুঁই!”
-“জেদি পুঁই, পুঁই জেদি। পুঁই জেদি।”
মৌরির মুখের কথা মাটিতে পড়তে দেয়না এই পুঁই পাখি। মৌরি পুঁই পাখিকে এক মাস আগে কক্সবাজার থেকে আসার পথে কিনেছিল। সেই থেকে তার সাথে আছে। পুঁই এর সাথে আলাপ সালাপের মধ্যে মায়ের চেঁচামেচির আওয়াজ কানে আসে তার। ইউনিভার্সিটি থেকে এসেই লেগেছে তোতাটাকে নিয়ে তাই। যদিও টিয়া মানেই তোঁতা, তবে মায়ের ভাষ্যমতে পুঁই শুধু ‘তোতা’ একটা। কোনো কথা মুখ থেকে ফেলতে পারেনা কেউ, ওমনি চিকন চিকন সুর তুলে পুঁই সেটা বারবার করে গাইতে থাকে। এতে মৌরির মা ভীষণ বিরক্ত হয়। ছেলে মেয়েদের বকা দেওয়ার সময়, থমথমে পরিস্থিতিতে এই তোঁতাটা নিজের মুখ চালাতে শুরু করলে আর কেউ উনার কথায় গুরুত্ব দেয়না, হেসে লুটোপুটি খেতে শুরু করে। তাই উনার পুঁই এর উপর বেশ বিরক্তি। মায়ের কণ্ঠ শুনে মৌরি পুঁইকে বলে,
-“পুঁইসোনা, পরে আসছি। আম্মাজন রেগে আছে বুঝেছিস? ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া না সেরে তোর কাছে চলে এসেছি বলে হিংসে হচ্ছে মা জননীর। ইউ ওয়েট ওক্কে? আম জাস্ট গোয়িং, এন্ড জাস্ট কামিং। ততক্ষণ ইউ নিজে নিজে পকপকায়িং”
-”গোয়িং, কামিং এন্ড পকপকায়িং! গোয়িং, কামিং এন্ড পকপকায়িং!” ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে পুঁই পাখি শুরু করে নৃত্য। মৌরি হাসঁতে হাঁসতে চলে যায়। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নেয়। যদিও ভার্সিটির ক্যন্টিন থেকে সে যা খাওয়ার খেয়ে নেয় ব্রেক টাইমে। কিন্তু প্রতিদিন ইউনিভার্সিটি থেকে এসে আবার খাওয়া একটা অঘোষিত নিয়ম তাদের বাড়ির। বাবা, চাচ্চুর আদেশ আছে। তারা রুষ্ট হন নিয়ম অনুযায়ী যার যার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এসে আবার বাড়ির স্বাস্থ্যকর খাবার না খেলে। ছেলে মেয়েদের কিছু বলেননা। কিন্তু বাড়ির দুই কর্ত্রীকে ছাড় দেয়না। বাচ্চাদের কেন খাওয়ালো না, না খেতে চাইলে হাতে ধরে খাইয়ে দেবে দরকারে।
মৌরি খাওয়া শেষ করে উঠে চলে আসে। কিছুক্ষণ ফোন ঘাটাঘাটি করে পুঁইপাখির সাথে সময় কাটায়। পুঁই -এর দানা শেষ হয়ে গেছে দেখে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে বাইরে আসে। কিন্তু রান্নাঘরে আর যাওয়া হয়না। বাবা, চাচ্চুদের কথা শুনে থেমে যায়,
-“হ্যাঁ ভাইজান, ছেলে তো দেখতে শুনতে মাশা-আল্লাহ। আমারও খুব পছন্দ হয়েছে।” চাচ্চু
-”যাক, তোরও পছন্দ হয়েছে শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। আমি খবরাখবর নিয়েছি। পরিবার ভালো, ভালো বেতনের চাকরি। এলাকায় বংশের যথেষ্ট নাম আর মানও আছে। আমি না করার মতো কোনো ত্রুটি দেখতে পাচ্ছিনা।” বাবা
-”জিহ বুঝতে পারছি। তবে আরেকটু সময় নিয়ে যাচাই বাছাই করি। তারপর এগোলে ভালো হতো আমার মনে হয়। অর্ণবও আসুক ততদিনে। অর্ণব, তুলি, জামাই - সবার সাথে কথা বলে তারপর…” চাচ্চু
-”হ্যাঁ হ্যাঁ। অর্ণব, তুলি, জামাই - ওদের সাথে কথা বলেই মৌরিকে জানাবো এই বিষয়ে। তারপর এগোবো। আপাদত উনারা প্রস্তাব একটা যখন রেখেছেন। কিছু একটা জানিয়ে রাখতে তো হবে।” বাবা
ব্যাস আর কিছু শুনতে পায়না মৌরি। সে সরে আসে ওখান থেকে। তার ভেতরটা কেমন অদ্ভুদ অস্বস্তি, দ্বিধা আর ভয়ে ঝেঁকে ধরেছে। বাবা আর চাচ্চুর কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। আর প্রতিবার এক নামহীন স্মৃতি তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের হাঁওয়ার সুরে ভেসে আসা ঐ অপরিচিত ব্যক্তির কথা মনে আসছে। মৌরি মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকে। বাইরে জানালা দিয়ে আলো এসে তার গায়ের শুভ্র কাপড়টার উপর পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। আলোর সাথে সাথে মৃদু হাওয়া প্রবেশ করছে। সেই হাওয়ার সুর তার কানে ঝংকার তুললো,
-“আপনাকে আমার বউ বানাবো... রিসোর্টে কাজী এসে অপেক্ষা করছে।”
মেজর উমরানের গম্ভীর কণ্ঠ। সে মাথা ঝাঁকিয়ে স্মৃতিটা সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু পারে না।
ঐ দিনটা... সমুদ্রের ধারে সূর্যটা অস্ত যাচ্ছিলো। বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ, ঢেউয়ের গর্জন, আর দূর থেকে মানুষের হাসির শব্দ। সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন থমকে গিয়েছিলো। মৌরি চোখে পানি নিয়ে বলেছিলো,
-“মাথা ঠিক আছে আপনার?”
তখন মেজর চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলো অনেকক্ষণ। তার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস। যেন নিজের সাথে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাকে নিয়ে। ঐ চোখের দৃঢ়তা তাকে থামিয়ে দেয়। তখনই যা সর্বনাশ ঘটার ঘটে যায়।
একসময় ধীরে মেজর বলে,
-”আমি আপনার কাছে অপরিচিত। আপনি আমার কাছে নন। আপনার মনে অনেক দ্বিধা, আমার মনে নয়। জানি এসব কথার কিছুই বুঝতে পারছেননা। তবে এক্সপ্লেনেশন দেবনা। শুধু বলবো বিশ্বাস রাখুন। আর এখন, এই মুহূর্তে আমার হাত ধরুন। আমি কথা দিচ্ছি এই হাত ছাড়বোনা। এই হাওয়ার সুরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আপনাকে পাবো ভাবিনি। তবে যখন পেয়েছি, হারাতে দেওয়ার মানেই হয়না। আর সত্যি বলতে, আপনি না মানলেও আজ আমরা নিজেদের এঁকে অপরের নামে লিখে দেবো। বাই হুক অর ক্রুক। জোর জবরদস্তি ভালো দেখাবেনা। আসুন।”
তখন হাওয়া খুব জোরে বইছিলো। মৌরির চুলের কিছু গোছা উড়ে এসে মুখে পড়েছিলো। সে থমকে ছিলো ঐ মুহূর্তে। মেজরের চোখে যে অনুভূতি, সেটাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।
তারপর কী হয়েছিলো সে ঠিক মনে করতে পারে না। শুধু মনে আছে -
মেজর হালকা স্বরে বলেছিলো,
-“চলুন, সমুদ্র আর সমুদ্রের হাঁওয়া আমাদের আজকের এই পাগলামির সাক্ষী থাকুক। আপনি না জানলেও সে জানুক, কিভাবে অতি আকাঙ্ক্ষিত একজনকে অনাকাংঙ্ক্ষিতভাবে নিজের সুরের সাথে ভাসিয়ে আমার কাছে এনে দিয়েছে।”
মৌরি হাওয়ার শাঁ শাঁ সুরেলা শব্দের মাঝে সেসব কথা শুনতে পায়নি। তবে সেই দিনের রোদ, সেই চোখ, সেই ভারী নিঃশ্বাস। সব যেন এখনও বুকের ভেতরে লুকিয়ে আছে কোথাও।
কিন্তু এখন... এখন বাস্তবের পৃথিবী অনেক আলাদা।