হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ১৯

🟢

রোগীর পোশাক গাঁঁয়ে মেয়েটার। মাথাটা কাঁত করে আছে, পাশে রাখা নবজাতক বাচ্চাটাকে আদর দেওয়ার ইচ্ছে ছিল হয়তো। মৌরির তো দেখে তাই মনে হলো। চেহারা পুরোটা দেখা যাচ্ছেনা মাথা কাঁত করে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে থাকায়। মৌরি বুঝল উষশী আর তার মা ছবিতে। দীর্ঘশ্বাস টানে সে পুরো ছবিতে চোখ বুলিয়ে। বিছানায় শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে খেলতে থাকা উষশীর দিকে একনজর তাকিয়ে আবার ছবিতে দৃষ্টি ফেলে। কেন জানি ভালো লাগছেনা তার। মেয়েটার জন্মদাত্রী মা সে হলে ভালো হতো। উষশীর পাপার একমাত্র বউ হতো সে। আর উষশীকেও সে জন্ম দিতো। সবটা সুন্দর হতো তখন। মৌরি আপনমনে কথাগুলো ভেবে নিজেই থমকে যায়। আশ্চর্য!! কীসব ভাবছে সে। একজন ঠকবাজ লোকের জন্য এসব নিয়ে আফসোস করার মানে হয়না। মাথা থেকে কথাগুলো ঝেড়ে সে ছবিটা আপন জায়গায় রেখে দেয়।

_”উষি, পরী… উষি পরী।”

অকস্মাৎ পুঁই পাখির সুরেলা কণ্ঠ কানে আসতেই হতবাক নয়নে পেছন ফেরে মৌরি। উষশীর পাপা এসেছে। হাতে পুঁই এর খাঁচা। মৌরির চেহারায় আনন্দের দ্যুতি খেলে গেল। উষশীকেও পুঁই এর সুরেলা কণ্ঠে উৎফুল্ল দেখায়। তার বন্ধু চলে এসেছে। আবার পাপাকেও দেখা যাচ্ছে। খুশি হবেনা?

_”আয়আম্মা… পু পু… আপ্পা।”

উষশী তুলতুলে গাঁ খানা টেনে ডেকে উঠে উৎফুল্ল কণ্ঠে। মৌরি ওর একপাশে খাটের কিনারায় দুটো বালিশ এনে দিতে দিতে বলে,

_”পুঁইকে কোথায় পেয়েছেন? বাড়ি থেকে কেউ এসেছে?” কৌতূহল আর কিছুটা আনন্দ তার কণ্ঠে।

উমরান অর্ণবের সাথে দেখা করে আর কোথাও যায়নি। সোজা বাড়ি ফিরেছে। উষশী ঘুম থাকতে পারে সম্ভাবনায় বেল না বাজিয়ে চাবি দিয়ে খুলে চলে এসেছেন। খাঁচাটা টেবিলে একপাশে রেখে গাঁঁয়ের শাঁর্ট আর ঘড়ি খুলতে খুলতে বলেন,

_”অর্ণবের সাথে দেখা করেছিলাম ক্যাফেতে। ওকেই নিয়ে আসতে বলেছি।”

মৌরির মনে তার ভাইয়ের সাথে কি কারণে দেখা করতে হলো প্রশ্ন জাগলেও, পুঁইকে আনার জন্যই দেখা করেছে ভেবে আর কিছু বলেনা। উষশীকে বেশি উৎফুল্ল দেখে ওকে বিছানা থেকে তুলে নেয় সে। পুঁইএর কাছে নিয়ে যায়,

_”পুঁই পাখিকে বেশি ভালো লেগেছে তোমার? হু? নাও দেখি… পুঁই এর সাথে কেমন খেলতে পারে দেখি উষি সোনা…”

উষশী হাত নেড়ে নানান শব্দ করে। সাথে পুঁই এর উৎফুল্লতা তো আছেই।

_”ভাইয়াকে বাড়ি আসতে বলেন নি কেন? বাইরে থেকে দেখা করে চলে গেল? পুঁইকে নিয়ে নিজেই বাড়ি আসতে পারত।” কোলে উষশী। কিন্তু মৌরির তার ভাই বাইরে থেকেই পুঁইকে দিয়ে চলে গেছে শুনে ভালো লাগলনা।

_”ফোন করে জিজ্ঞেস করো বাইরে থেকে দিয়ে চলে গেল কেন? আমি তো জানিনা ওর না আসার কারণ। তুমিই আসতে বলো।”

উমরান বলতে বলতে ওয়াশরুমে ঢুঁকে যান। ফ্রেশ হয়ে তবেই কন্যার কাছে যাবেন। উষশী পুঁই এর ডানা ঝাপটে সুর তোলা কথাগুলো উপভোগ করলেও, মায়ের কোলে একটু গাঁইগুই করছে। পাপার কাছে যাবে সে।

_”পাপা ফ্রেশ হয়ে আসছি মাই প্রিন্সেস। জাস্ট ফাইভ মিনিট। মাম্মার কোলে থাকো।”

গলা তুলে কথাটা বলেন ওয়াশরুম থেকে।

মৌরি মেয়েকে শান্ত রাখতে নানান কিছু বলছে। পুঁই ও থেমে নেই। মৌরি পুঁইকে পেয়ে খুশিই হয়েছে। তবে তাকে একটা কথা খুব ভাবাচ্ছে হঠাৎ। পুঁইকে আগেও ‘উষি, পরী’ এসব বলতে শুনেছে সে। তবে মৌরির জায়গায় পরী ডাকছে ভাবলেও, উষি ডাকের মানে বুঝতনা সে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে উষশীকে উদ্দেশ্য করেই পুঁই এর এই ডাক। আর উষশীকেও দেখে মনে হচ্ছে পুঁইকে সে আগে থেকে চেনে। খানিকটা চিন্তার রেখা ফুঁটে উঠলো তার কপালে। তবে কোলে থাকা উষশীর অস্থিরতায় ভাবনা ছেড়ে তাকে অল্প ঝাকাতে লাগলো।

_”লক্ষীসোনা আমার। তুমি খুব লক্ষী তাইনা? আমার চাঁদের কণা। গুড গার্ল। পাপা এখন আসবে তো। এই তো এসে যাবে… আর ইটটু সময়!”

_”পুঁই কি বলছে শুনো… ও বেশি কথা বলে তাইনা? আমার উষি ভালো। পুঁই পচা…”

পাপাকে ভুলিয়ে রাখতে মৌরির এটা ওটা বলার মাঝেই উমরান বের হয়ে আসেন। গোসল সেরে বের হয়েছে সে। ৬ ফুট ১.৬ ইঞ্চি উচ্চতার ছিপছিপে কিন্তু শক্ত শরীরটাতে নিয়মিত শরীরচর্চার ছাপ স্পষ্ট। চওড়া কাঁধে টাওয়েল রেখে তার একপাশ দিয়ে চুল মুছছে। ভ্রু দুটো স্বাভাবিকভাবেই একটু কুঁচকে থাকে খেয়াল করলো মৌরি। এটা কেমন গম্ভীরভাব এনে দেয় চেহারাটায়। গায়ের রং হালকা শ্যামলা। মুখের গড়ন বেশ তীক্ষ্ণ, চওড়া কপাল আর চোয়ালটা স্পষ্ট। মুখের খোঁচা খোঁচা চাপদাড়ি মেজরকে ভীষণ মানায়, পরিণত দেখায়। মৌরিকে বেশ আকর্ষণ করলো তা। গভীর চোখ দুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দিকে তাকালে মনে হয় ভেতর পর্যন্ত বুঝে ফেলে।আর্মি কাট দেওয়া কালচে ঘন চুলগুলো ভেজা হওয়ায় কপালে এসে পড়েছে এলোমেলো হয়ে। সম্মোহিত হয়ে দেখে সে। ট্রাউজার আর সাদা শাঁর্ট জড়িয়ে বের হয়েছিল। হাতার ভাঁজ করা অংশে তার বাহুর গঠন চোখে পড়ে মৌরির, সাথে শাঁর্টের বোতাম খোলা হওয়ায় উন্মুক্ত বুকের পরিপাটি গঠনটাতেও। সম্মোহিত হয়ে দেখছিল। বাবা মেয়ের আওয়াজ শুনে ধ্যান ভাঙতেই অস্বস্তিভরে চোখ ফিরিয়ে নেয়। লোকটা খুব কাছে তার। কোলে থাকা উষশীকে আদর করছে। তুলতুলে হাতটা মুখে নিয়ে চুমু এঁকে এঁকে কিছু বলছে আদুরে স্বরে। আবার পেটে মুখ গুঁজে আদর দিয়ে চুমু খাচ্ছে। মেয়েও হাসছে আনন্দ পেয়ে। মৌরি এই লোকটাকে এত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল ভেবে অস্বস্তিতেই পড়লো। কেমন একটা ঘোরে ছিল। তার উপর এত কাছাকাছি কবে এসে পড়েছে খেয়াল করেনি সে। অন্যদিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে নিজেকে সামলায়। গলা ঝেড়ে বলে,

_”বলছিলাম, পুঁইকে দেখে উষশী এত খুশি হয়ে গেল কেন? ও কি চেনে পুঁইকে? আর আমি তো আপনাকে পুঁইকে এনে দেওয়ার কথা বলিনি একবারো। ওর কথা আপনি কিভাবে জানলেন?”

মেয়েকে আদর করতে করতেই চোখ তুলে স্ত্রীপানে তাকান উমরান। উষশীকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসে আছে সে। আর উমরান ফ্লোরে হাঁটুমুড়ে বসে উষশীকে আদর করছে।

_”ও আমাদের কাছে ছিল আগে। উষির খেলার সাথী। কক্সবাজার থাকতে উড়ে চলে যায় কোথাও, তাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। কেউ ধরে আবার তোমার কাছেই বিক্রি করেছে।”

মানে ঠিকই ধরেছিল মৌরি। আগে যাদের কাছে ছিল, ওখানেই শিখেছে ‘উষি’ ডাক।

_”পুঁইকে নিয়ে কক্সবাজারও ঘুরতে গেছেন। আশ্চর্য! দেখেশুনে রাখতে না পারলে এখানে ওখানে নিয়ে যাওয়ার দরকার কি ওকে? আর আমার কাছেই আছে পুঁই তা কিভাবে জানলেন? বললেন না তো?”

উমরান উঠে স্ত্রীর কোল থেকে মেয়েকে নেন। তাকে আদর দিতে দিতে বলেন,

_”উষিও ছিল তখন কক্সবাজার। পুঁইকে আর একা এখানে রেখে কি করতাম? ওরা চারদিন ছিল ওখানের অন্য এক রিসোর্টে নিরাপদে। একদিন ভুলে কোথাও উড়ে গিয়ে অচেনা জায়গা হওয়ায় আর ফিরে আসতে পারেনি পুঁই। সেদিন তোমাদের বাড়ির বাইরে গাড়ির কাছে যখন দাড়িয়ে ছিলাম আমরা দুজন। তখন তোমাদের বাড়ির দুতলায় ব্যাল্কনিতে ওকে দেখেছি। বাড়িতে উষি কাঁদছিল শুনে আর সময় নষ্ট করতে চাইনি ভেতরে গিয়ে।” কোলে তখন উষশী দুলছে। পাপার ভেজা চুলগুলো আরও এলোমেলো করে দিচ্ছে সে।

_’শুনো… কাল কিছু অতিথি আসবে। প্রস্তুত থেকো। আর ওদের জন্য আপ্যায়নের জন্যও কিছু করো।” যেন বহুদিনের সংসার তাদের। বাড়ির কর্ত্রীকে জানাচ্ছে অতিথির আগমনী বার্তা। যাতে সবটা প্রস্তুত রাখতে পারে সে। মৌরির রাগে কিছু বলে দিতে ইচ্ছে করলেও সামলালো। ভ্রু টানটান করে জানতে চায়,

_”অতিথি মানে কারা? আপনার আত্মীয়?”

উমরান এবার স্ত্রীপানে পূর্ণদৃষ্টি ফেলেন। তার দিকে প্রশ্নাত্মক নয়নে চেয়ে আছে সে। উষশী আর সে নাহয় খুব অল্প সময় স্থান পেয়েছে শ্রেয়সীর জীবনে। কিন্তু ছোট থেকে যাদের সাথে জুড়ে ছিল। তাদেরও কি চিনতে পারবেনা মেয়েটা? জানা নেই উমরানের। তার এখনো অবিশ্বাস লাগে - শ্রেয়সীর তার মেজরকে মনে নেই, তার মেয়ে উষশীকে মনে নেই। ভুলে গেছে পুরোপুরি। ওকে ভুলিয়ে দিয়েছে তাদের সব স্মৃতি ঐ স্বার্থপর মানুষগুলো… সব ভেবে অজানা ক্ষোভ এসে জড়ো হয় মাথায়। তাও সামলে স্ত্রীকে শান্ত স্বরে জবাব দেন,

_”আসবে কিছুজন। আমার আত্মীয় না, বলবে আমাদের আত্মীয়।”

___

সওদাগর বাড়িতে আগের মতো হইহল্লাপূর্ণ সেই পরিবেশটা আর নেই। কাল মৌরির চলে যাওয়ার পর থেকেই সবটা কেমন ম্লান হয়ে আছে। আজ সকালে তুলিরাও চলে গেছে। মৌরির মায়ের শরীরটাও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল গতরাত থেকে। সময়টা রাত আটটার ঘরে। বসার ঘরে তূর্ণা আর মৃন্ময় টিভি দেখছে তখন। বছরের শেষ সময়। ওদের বার্ষিক পরীক্ষাও শেষ। এখন এই সময়ে টিভি দেখতে কোনো বাঁধা নেই। নাহয় এটা সাধারণত তাদের পড়ার সময়। কিংবা পড়া শেষ হলেও বাবা, বড় বাবাদের আসা অব্দি পড়ার টেবিলে বসে থাকতে হয় তাদের। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন কোনো ভয় নেই টিভি দেখতে।

অর্ণব বাইরে থেকে এসেছে মাত্র। সোফায় বসে মৃন্ময়ের পাশে। তূর্ণার উদ্দেশ্যে আদেশ ছুড়ে,

_”পানি দে একগ্লাস।” পরপর মৃন্ময়ের পিঠে হাত রেখে বলে,

_”মা আর চাচী কোথায়?”

_”মা রান্না ঘরে, আর বড় মা রুমে। শুয়ে আছে বোধ হয়। শরীর খারাপ লাগছে বলছিল।”

ততক্ষণে তূর্ণা পানি নিয়ে এসেছে। অর্ণব পানি পান করে উঠে যায়। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। পরপর আবার বসার ঘরেই আসে। মৃন্ময়কে পাঠাল তার মাকে ডেকে আনার উদ্দেশ্যে। সে মৌরিকে ফোন লাগিয়েছে। রিসিভ হলো সেকেন্ড কয়েক পরেই।

_”ভাইয়া… কেমন আছ তুমি? আজ উনার সাথে কোথায় দেখা করেছ শুনলাম। বাড়ি আসলেনা কেন?”

অর্ণব মৃদু হেসে বলে,

_”খুব ভালো আছি আমি, তোর সব ভালো যাচ্ছে?”

_”আমিও আছি, তুমি বাড়ি না এসেই চলে গেলে কেন ভাইয়া? পুঁইকে নিয়ে এখানে আসা যেতনা?”

_”আরেকদিন যাবো। আজ কাজ ছিল।”

_”কি এমন জরুরী কাজ যে উনার সাথে বাইরে দেখা করতে পারো, কিন্তু বোনকে দেখতে আসতে পারো না?”

বোনের অভিমানী কণ্ঠের বিপরীতে অর্ণব উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলোনা। তূর্ণা আর মৃন্ময় ফোনে বোনের কণ্ঠ পেয়ে ছুটে এসেছে। তাদের মাও চলে এলো রান্নাঘর থেকে।

_”আপু, তুমি কেমন আছ? আজকে ভাইয়ার সাথে মেলায় গেছিলাম। তাই দুপুরের পর কারখানায় যেতে পারেনি ভাইয়া। এজন্য বিকেলে ব্যস্ত ছিল কারখানায়। তাই যায়নি হয়তো। তুমি ভালো আছ?” তূর্ণা

_”আপু পুঁইকে দেখাও। ওকে নিয়ে যাচ্ছে জানলে আমি নিতে দিতাম না। বাড়ি এসে শুনি তূর্ণা মেলায় গেছিল, পুঁইও নেই। আজ সবাই আমার সাথে অন্যায় করেছে। তুমি প্লিজ পুঁইকে দেখাও।” মৃন্ময়

ওদের একেক প্রশ্নে মৌরি উত্তর দেওয়ার জো পেলোনা। তূর্ণা ভাইকে সে কি কি মজা করেছে মেলায় এসব শুনাতে শুরু করে। মৃন্ময়ের ভালো লাগেনা ওসব শুনতে। দুজনের কথা কাটাকাটি লেগে যায়।

মৌরি ওদিকে পাত্তা না দিয়ে চাচির সাথে কথা বলে। ভিডিও কলে এদিক ওদিক তাকিয়েও মায়ের দেখা পেলোনা।

_”চাচী, মা কোথায়? দেখতে পাচ্ছিনা যে?”

সে জিজ্ঞেস করতে না করতেই মাকে আসতে দেখা যায়। মৌরির ফোন দেখে কাছে এসে বসেন। অর্ণব ফোনটা মায়ের দিকে করে দিলো।

_”মৌ? কেমন আছিস মা? ওখানে ভালো আছিস তো?”

_”আমি ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছ? চোখ মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন? এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়লে?”

মৌরির মা অবসন্নতা লুকিয়ে বলে,

_”আমি ভালোই আছি। তোর সব ঠিক যাচ্ছে তো? ভালো মতো খাওয়া দাওয়া করছিস?”

_”ভালো যাচ্ছে আমার। খাওয়া দাওয়াও ঠিক আছে। শুধু তোমাদের কথা বেশি মনে পড়ে। ভাইয়া আজ উষশীর পাপার সাথে দেখা করলো। অথচ বাড়ি এলোনা। তোমাদের কি কাল অব্দি আমার কথা মনে পড়েনি একটুও।”

অভিমান স্পষ্ট মৌরির কণ্ঠে। সবাই শুনলো তা। কিন্তু ‘উষশীর পাপা’ শুনে তূর্ণা জানতে চায়,

_”উষশীর পাপা কে আপু? আর উষশীই বা কে?” তূর্ণার সাথে মৃন্ময়ও জানার ইচ্ছে জ্ঞাপন করলো। বিষয়টা মৌরির মাথায় ঢুকতেই কিছুটা থেমে যায়। সে তখন ব্যাল্কনিতে ফোন নিয়ে নেওয়ার পর ভেবেছিল সুযোগ পেলেই আবার ভাইকে অথবা বাবা চাচ্চুকে ফোন দিয়ে তাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবে। কিন্তু কেন যেন মেজরের কথামতো দুটোদিন অপেক্ষা করতে মন চাইলো। তবে মাত্র অজান্তে ঐ লোক আর উষশীর কথা তুলে ফেললো। সুযোগ পেয়ে মেজরকে দুদিন সময় দেবে ভাবলেও নিজেকে আর আটকাতে পারল না মৌরি,

_”মা, তোমরা আমাকে ঐ লোকের সাথে কেন পাঠিয়ে দিয়েছিলে কাল, একটু খুলে বলো প্লিজ। আমার জানতে হবে। কেন একটা অচেনা অজানা লোকের সাথে আমাকে একা পাঠিয়ে দিলে?”

সবাই নিজেদের অবস্থানে স্থির হয়ে বসে থাকে। মৌরিকে জবাব দেওয়ার মতো কিছু নেই তাদের কাছে। তূর্ণা, মৃন্ময় কিছু জানেনা। তাই তারাও জানতে আগ্রহী। তূর্ণাকে সামান্য প্রতিবেশিদের বাড়িতে যেতেও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, মৌরির ক্ষেত্রেও একই ছিল। কিন্তু হঠাৎ অচেনা একটা লোকের সাথে পাঠিয়ে দিলো? তাদের মনে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু জবাব দেওয়ার কেউ নেই। কৌতূহলবশত জানতে চাইলে ঝাড়ি ছাড়া আর কিছু আসেনা বিপরীতে। মা চাচীকে স্থির হয়ে থাকতে দেখে অর্ণব ফোন নিজের দিকে ফেরায়।

_”উনার সাথে তোর বিয়ে হয়েছে এ কথা জানি আমরা মৌ। এখন একজনের সাথে বিয়ের বন্ধনে থাকা অবস্থায় অন্য কারো সাথে তো আর তোকে বিয়ে দিতে পারিনা। মেজর উমরান তাওসিফ তোর স্বামী। সে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছে। নিজের অধিকার বুঝে নিতে এসেছে। স্ত্রীকে তখনই সাথে নিয়ে যেতে চায় এ কথা জানিয়েছিল আমাদের। এখন আমরা কারো বিয়ে করা বউকে কি করে আঁটকে রাখবো?”

মৌরি জমে গেলো ভাইয়ের কথাগুলো শুনে। অর্থাৎ মেজর সবটা জানিয়ে দিয়েছিল তখন বাড়িতে। আর সে বোকা ভেবে নিয়েছিল তাকে বাঁচাতে লোকটা নিজের মতো কিছু জানিয়ে এসেছে। মৌরি বাড়ির সবাই কক্সবাজারে ঘটে যাওয়া ঘটনা জেনে গেছে শুনে, আর কিছু ভাবার বা বলার মতো খুঁজে পেলোনা। না তো জানতে চাইলো, ‘সে নাহয় না জেনে একটা ভুল করেছে, তাই বলে একটা বাচ্চাসহ বিবাহিত লোকের কাছে পাঠিয়ে দেবে এভাবে? নাকি তারা জানেনা, যে মৌরি নিজেই এই বিষয়ে জানতনা। ঠকে গেছে সে।’

তাদের কথাবার্তা কোনোরকম শেষ হয়। মৌরির মা চাচী কিছুই বুঝতে পারেনি অর্ণবের কথা।

_”কি বললি এসব? মৌরির বিয়ে হয়েছিল তা জানতি - এ কথা বলে দিলি? কেন বলেছিস? আর ও কেন বিপরীতে কিছু জানতে চাইলো না? মৌরির কি মনে পড়ে গেছে আগের সবটা? তাহলে ওর বিয়ে হয়েছিল এ কথা জানতি বলার পরও চুপ কেন? কিছু জানতে চাইলনা কেন? ঠিকভাবেই তো কথা বলেছে আমাদের সাথে।”

মৌরির মায়ের অসংখ্য প্রশ্ন। অর্ণব মাকে বেশি চিন্তিত দেখে বলে,

_”রিল্যাক্স মা। এত হাইপার হচ্ছো কেন? বসো তুমি শান্ত হয়ে।”

_”না, তুই আগে সবটা বল। মৌ এর কি সবটা মনে পড়ে গেছে? আমি ওকে জন্ম দিইনি জেনে গেছে ও?”

মাকে বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়তে দেখে অর্ণব বলে,

_”কিছু মনে পড়েনি মা। তোমাকে বলছি শান্ত হতে। আমি অন্য একটা বিয়ের কথা বলেছি, আগের বিয়ের না। তুলিদের সাথে কক্সবাজার থাকতে সময় ওর খোঁজ পেয়েছিল ওর স্বামী। ওখানেই দেখেছে প্রথম। তখন মৌরির মেমোরি লস হয়েছে বুঝে ওকে এটা সেটা বুঝিয়ে ব্রেনওয়াশ করে বিয়ে করে নিয়েছিল। কারণ ওদের আগে বিয়ে হয়েছিল শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতিতে। আইনিভাবে ওদের বিয়ের কোনো প্রমাণ ছিলনা। আর না তো আইনি ভাবে বিয়ে হয়েছিল ওদের। মৌরি তখন আন্ডারএজ ছিল তাই। ঐ বয়সেই ও স্বামীর সংসার করেছে, সন্তান জন্ম দিয়েছে। এজন্য ওর দেখা পেয়ে, মেমোরি লস হয়েছে আর নতুন পরিচয়ে কোনো পরিবারে থাকছে বুঝে - সামনে যাতে আমরা ঝামেলা করলে ওকে ফিরিয়ে নিতে কোনো সমস্যা না হয়। তাই তখনই কাগজে কলমে বিয়ে করে নিয়েছে। আজ উনার সাথে দেখা করেছি। অনেক কথা হয়েছে। তখনই জানতে পেরেছি এসব। মৌ ভয়ে আমাদের জানায়নি ঐদিনের ঘটনা। ও ভেবেছিল আমরা কক্সবাজারে ঘটা সবটা জেনে গেছি বলে সেদিন ওর স্বামীর সাথে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তাই এতটা শান্তভাবে গেছে মেজর তাওসিফের সাথে। নাহয় আমরা বলেছি বলেই কি ও অচেনা একটা লোকের সাথে চলে যাবে? গেলেও কেন পাঠাচ্ছি কারণ না জানানো অব্দি ও শান্ত থাকতো? আমার ওর এত সহজে মেনে যাওয়া নিয়ে সন্ধেহ লেগেছিল। তাই আজ ওর স্বামীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। উনিই বলেছেন এসব। আর মৌরিকেও মাত্র ঐ বিয়েটার কথাই বললাম।”

মৌরির মা চাচী শুনলো সবটা। বুঝলো মৌরির আর্মি জবের মেজর স্বামীটা বেশ দূরন্দর। নাহয় আকস্মিক বছরখানেক পর নিখোঁজ স্ত্রীকে খুজে পেয়ে আবেগে-অনুভূতিতে থমকে যাওয়ার কথা যে কারো, আর নয়তো বিভ্রান্তিতে পড়ে কি করবে ভেবে না পাওয়ার কথা। অথচ অল্প সময়টুকুতে সবটা ভেবে চিন্তে, বুঝে নিয়ে - কায়দা করে তাদের মেয়েকে হাত করে ফেললো উমরান তাওসিফ।

___

সকালে শান্তভাবে বুঝিয়ে দুদিন সময় চেয়ে নেওয়ার পর সারাদিন আর তেমন অবাধ্য হতে দেখা যায়নি উষশীর মাকে। সন্ধ্যায় উমরানের বাড়ি ফেরার পরও সবটা ঠিক ছিল। হঠাৎ আবার কি হলো যে চেহারা অন্ধকার আর গম্ভীর হয়ে আছে মেয়েটার, তা উমরান বুঝতে পারছেনা। সে এখন ছুটিতে আছে। তাই বিশেষ কাজ থাকেনা বাইরে। বাড়িতেই ছিল সন্ধ্যায় আসার পর থেকে। এর মধ্যে কর্ণেল কিবরিয়ার সাথে কথা বলার সময়ে একটু বারান্দায় গেছিল উষশী আর উষশীর মাকে রুমে রেখে। এরপর ফিরে এসে উষশীকে ঘুম দেখলেও তার মাকে আর আগের মতো প্রাণোচ্ছল দেখালনা। মুখটা কেমন গম্ভীর আর অন্ধকার করে রেখেছে। উমরান মেয়ের পাশে শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছিলেন। মাঝেমধ্যে এটা সেটা জিজ্ঞেস করে কথা বলতেও চেয়েছিল বউয়ের সাথে। কিন্তু সীমিত উত্তর বিপরীতে।

রাতেও খাওয়ার সময় থমথম করে সবটা করলো। উমরান পুরোটা সময় ভ্রু কুচকে দেখেছে বউকে। এমন করার কারণ বুঝতে পারছিলনা সে কোনোভাবেই।

কিন্তু ঘুমানোর সময় আর চুপ থাকতে পারল না। দুজনেই শুয়ে পড়েছে তখন। একপাশে উষশী ঘুম। উমরান স্ত্রীর পাশে। মাথা তুলে প্রশ্ন করেন,

_”কি হলো তোমার? এমন হয়ে আছো কেন? বিকেলেও তো সব ঠিক ছিল। কোনো সমস্যা?”

বিপরীতে জবাব এলোনা। মৌরি না শোনার মতো অন্যপাশ হয়ে শুয়ে থাকে। একরাত কাটিয়েছে লোকটার সাথে। তাও মনে রাখার মতো রাত। সারাদিন ভুলে থাকলেও, এখন রাতের বেলা একই বিছানায় লোকটার সাথে থাকতে গিয়ে গতরাতের সব ঘটনা মনে পড়ছে এঁকে এঁকে। মেজরের প্রতারণা থেকে শুরু করে উষশীর কাণ্ড। চোখে ভাসছে মেজরের সব উন্মাদনা। দুটো শরীরের অন্তরঙ্গ দৃশ্য। যতবার মনে পড়ছে ততবার গাঁঁয়ে কাঁটা দিচ্ছে। পাশ থেকে মেজর এই বুঝি আবার গতরাতের মতো ছুঁয়ে দেবে!! এমনটা মনে হচ্ছে মৌরির। তার উপর মেজর তার পরিবারের কাছে সব সত্য জানিয়ে দিয়েছিল জেনে অজানা অভিমান হচ্ছে। কেমন জানি ভালো লাগছেনা কিছু।

উমরান তাকে চুপ দেখে টেনে নিজের দিকে ফেরান,

_”কি হয়েছে? মন খারাপ করে আছ কেন? নতুন করে কিছু করেছি বলে তো মনে পড়ছেনা।”

_”ছাড়ুন।”

_”না বলা অব্দি ছাড়ব না। কি হয়েছে বলো? মুখ এমন অন্ধকার কেন? একটু আগেও তো ঠিক ছিলে।”

_”আপনাকে ছাড়তে বলেছি।” মৌরি বাহু থেকে স্বামীর হাত সরাতে সরাতে বলে।

_”আমি বলেছি ছাড়বনা।” জেদী কণ্ঠের বিপরীতে দৃঢ় কণ্ঠ। লোকটা মৌরিকে কাছে টেনে রেখেছে হাত ধরে। মৌরি জেদী নয়নে চেয়ে থাকে। তাও কিছু বলেনা।

উমরান তাকে আরও দৃঢ়ভাবে কাছে টানেন,

_”বলবে কি না?”

_”বলবো না?”

উমরানের মাথা গরম হচ্ছে। শ্বাস টেনে সামলে নিচু স্বরে বলেন,

_”উষি ঘুমাচ্ছে। আমাকে রাগিওনা। কি হয়েছে বলো ধৈর্য থাকতে।”

_”আপনার ধৈর্য নিয়ে আপনি গোল্লায় যান। আমাকে ছাড়ুন।”

সাথে সাথে হেচকা টানে লোকটার গাঁঁয়ের উপর পড়লো মৌরি। সে বিস্ময়ে কিছু বলার আগেই স্বামীর কণ্ঠ কানে আসে,

_”আজ সারারাত এভাবেই আমার সাথে লেপ্টে থাকতে হবে। উত্তর দিলে তবেই ছাড়া পাবে। তার আগে না।” মেজরের সামান্য স্পর্শেও যে তার গাঁঁয়ে শিরশিরে এক অনুভূতি হচ্ছিল গতরাতের কথা ভেবে, তা তার স্বামী বুঝে গেছে। তাই শরীরটা এমন বুকে মিশিয়ে আর পায়ে পা পেছিয়ে অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছে তাকে। যেন জব্দ করতে পারে। এ কথা মৌরি খুব বুঝলো।

_”আপনি সকালে গতরাতের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন, আর বলেছিলেন সামনের বার থেকে আমি না চাইলে এসব আর করবেন না।”

_”তো আমি কোথায় সহবাস করতে চাইছি তোমার সাথে? জড়িয়ে ধরলেই কেউ প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়না।”

মৌরি লজ্জ্বা-অপমানে কপাল ঠেকিয়ে মাথা ফেলে দেয় স্বামীর বুকে। মুখ তুলে আর তাকায়না। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলে ওভাবেই পড়ে থাকে। সময় যায়। মৌরি চুপচাপ থাকে। নিস্তব্দ সবটা। শুধু রুমে থাকা তিনজনের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ কানে আসছে। কিছু সময় পর মৌরির পিঠে থাকা মেজরের হাতটা সন্তর্পণে তার মাথায় আসে। অন্যহাত তার কোমরে পেছিয়ে আছে। উমরান তার মাথার চুলের ভাঁজে হাঁত গলিয়ে বলেন,

_”কি হয়েছে বলবেনা?”

_”আপনি খারাপ।”

সাথে সাথে কিছু বলেন না উমরান। থেমে কানের কাছে মুখ এনে শুধান,

_”কিছু করেছি? না জেনে হার্ট করে থাকলে আ’ম ভেরি ভেরি সরি। কিন্তু কি হয়েছে না জানালে ভুল শুধ্রে নেবো কি করে?”

_”আমার বাড়ির সবাইকে কেন জানিয়ে দিয়েছেন যে আমাদের বিয়ে হয়েছিল?”

_”না জানালে তো তোমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিতো। তখন?” অতি নিকটে ফিসফিস কণ্ঠ দুজনার।

_”উফ, একেবারে না জানাতে বলেছি? বলতে চাইছি অন্যভাবে বুঝিয়ে বলা যেতনা? সেদিন আপনার কথায় রাজী হয়ে বিয়েতে সম্মতি দিয়েছি তা কেন জানিয়ে দিলেন আপনি? এখন বাড়ির সবার কাছে আমি মুখ দেখাব কি করে? ওরা তো আমাকে ভুল বুঝে বসে আছে নিশ্চিত।”

বহুদিন পর উমরানের মনে হলো সে শ্রেয়সীর সাথে কথা বলছে, সওদাগর বাড়ির লোকেদের গড়া কোনো কৃৃত্রিম মৌরির সাথে নয়। এভাবেই তো তার শ্রেয়সী বিরক্তি প্রকাশ করতো। অল্প স্বল্প অভিমানও করেছে বোধ হয় সেই আগের মতো। উমরানের আলিঙ্গন দৃঢ় হলো। গাঢ় শ্বাসটুকু তার আত্মপ্রশান্তির স্বাক্ষী। মাথা নামিয়ে শ্রেয়সীর নরম গালে চুমু এঁকে বলে,

_”আচ্ছা, আমি খুব সরি। আর কখনো এমন হবেনা। এবার শেষ, প্রমিস।”

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ১৯ গল্পের ছবি