হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ১৮

🟢

সময়টা তখন সকাল গড়িয়ে প্রায় এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে। সকাল থেকে মৌরি নির্বিকারভাবে স্বামীর বলা প্রতিটি কাজ করে গেছে। মেজরের মেয়ে; উষশী। তার সবরকম যত্ন, আদর, পরিচর্যা - খাওয়ানো থেকে শুরু করে নিজের সাথে গোসল করানো পর্যন্ত সবই করেছে সে। যদিও না চাইতে করেছে এমন নয় বিষয়টা। তার মেজরের মেয়েটার প্রতি কোনোরকম ক্ষোভ নেই। আসেনা মন থেকে। বরং নরম গাঁলটা দেখলেই চুমু এঁকে দিতে ইচ্ছে করে, আদর আদর পায়। মন চায় বুকের সাথে লাগিয়ে রাখতে। কিন্তু অতোটাও সতঃস্ফূর্ত আদর সে দেখায় না মেজরের সামনে। মনের বিষয় মন অব্দিই।

এখন উষশীকে রুমে রেখে এসেছে। তিন চাকার ছোট্ট একটা বাচ্চাদের গাড়িতে বসে সে খেলছে। সামনে সাজানো ঝুনঝুনির মতো গোল বলগুলো নিয়েই তার ব্যস্ততা। মৌরি রুমের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। এটাকে অবশ্য ব্যাল্কনি বললেও ভুল হবে। এক প্রকার ছোট বারান্দা। কাঠের মেঝে ও সাদা রেলিং-ঘেরা। চারপাশজুড়ে নানা ধরনের ফুলের টব। বিশেষ করে গোলাপি ও বেগুনি রঙের ফুল ঝুলছে, আর সাজানো রয়েছে। দুয়েকটা বেতের তৈরি আরামকেদারা রাখা।

মেজর তখন বাইরে। যে মহিলা উষশীর দেখাশোনা করতেন, তাকেও সকাল সকাল ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৌরি শুনেছে, যাওয়ার সময় লোকটা বলছিল,

_“উষশীর মা চলে এসেছে, তাই আর তেমন দরকার পড়বে না। ক’দিন ছুটি কাটিয়ে আসুন।”

মৌরি তখন শুধু প্রতারক স্বামীর তাকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসটা দেখছিল চেয়ে চেয়ে। প্রতারণার সম্পর্ক জড়িয়ে এখন নিশ্চিন্তে ‘মা’ শব্দটা ব্যবহার করছে। আবার নিশ্চিত যে মৌরি তার মেয়েকে দেখে রাখবে, ভালোবাসবে। কি আত্মবিশ্বাস আর আত্মগরিমা! রাগ বৈ কিছু আসেনি লোকটার প্রতি তখন।

মৌরি বাড়িতে ফোন লাগিয়ে এসব ভাবনাতে মশগুল ছিল। ফোন রিসিভ হয়ে ওপাশ থেকে ভাইয়ের আওয়াজ কানে আসলে তার ধ্যান ভাঙে,

_”মৌ? কেমন আছিস? রাতে ফোন দিয়েছিলাম কতবার। রিসিভ করলিনা যে? সব ঠিক আছে?”

ভাইয়ের কথায় গভীর শ্বাস টেনে উষশী কি করছে একবার দেখে নেয় মৌরি। ঠিকভাবে খেলছে নিশ্চিত হয়ে বলে,

_”আমি ভালো আছি ভাইয়া। কাল ফোন সাইলেন্ট ছিল, তাই কল দেখতে পাইনি।”

_”আচ্ছা, বাকিরা কেমন আছে? সব ঠিকঠাক ওখানে? তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা তো?”

মৌরি বাড়ির কারো সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ খুজছিল সকাল থেকে। মেজরের সামনে কথা সে বলতে চায়না কোনোভাবে। কখন না জানি ফিরে আসে এর মধ্যে। সে ভাইয়ের কথার উত্তর না দিয়ে জানতে চায়,

_”ভাইয়া, লোকটা… মানে বলছি মেজর, উনি কাল বাড়িতে কি বলেছিল তোমাদের?”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে,

_”কি বলেছিল বলতে? কি বলার কথা বলছিস তুই?”

মৌরির হাশফাশ লাগে। কিভাবে জিজ্ঞেস করবে বুঝতে পারছেনা। লোকটা কি তাদের বিয়ে কিভাবে হয়েছে সবটা বলে দিয়েছে, নাকি তাকে নির্দোষ দেখিয়ে নিজের মতো সাজানো কোনো গল্প? কিছুই বুঝতে পারছেনা। এখন বাড়িতে সবাইকে কি জানিয়ে তাকে নিয়ে এসেছে বুঝতে না পারলে তো, সে এই লোক কিভাবে তার সাথে প্রতারণা করেছে তা তাদের বলতে পারবেনা। যদি তার পূর্ণ সম্মতিতে বিয়ে হয়েছিল এ কথা জেনে থাকে সকলে। তাহলে কি বলে বিচার দেবে সে? যেখানে পরিবারের অজান্তে এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজে নিজেই। আর যদি কোনোভাবে এসব সত্য মেজর জানায়নি, এমনটা বুঝতে পারে। তাহলেই নাহয় মৌরি নিজের মতো বুঝাতে পারবে যে মেজর একটা প্রতারক। কিন্তু মেজর আসলে কি জানিয়েছে কিছুই তো বুঝতে পারছেনা কোনোভাবে। তবে যেভাবেই হোক, মৌরিকে জানাতে হবে। তার পরিবারকে জানাতে হবে, যার সাথে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে সে একজন ঠকবাজ। আগের পক্ষের বউ-বাচ্চা আছে।

_”মানে… ভাইয়া। বলছি, উনি তো আমাদের বাড়ি গেছিল কাল। তোমাদের কি বলেছে? আমাকে কেন উনার সাথে দিয়ে দিলে একা?”

অর্ণবের উত্তর সাথে সাথে এল না। একটু থেমে বলে,

_”মেজর তাওসিফ কি কিছু বলেছে তোকে? ওখানে থাকতে সমস্যা হচ্ছে তোর?”

_”হ্যাঁ, আমি উনার সাথে থাকব না। আমাকে নিয়ে যাও প্লিজ। আমি বাড়ি যেতে চা…” মৌরি চলে যেতে চায়, তা ভাইকে স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চেয়েছিল এই সুযোগে। কিন্তু আকস্মিক ফোনটা কেউ কেঁড়ে নেওয়ায় চাপা অস্থিরতা আর বিরক্তি নিয়ে পেছন ফেরে সে। তবে উমরানকে দেখে বিরক্তির জায়গায় দ্বিধা ফুঁটে উঠল। অল্প একটু গুটিয়ে গেল।

_”কি কথা হচ্ছিল? আর কার সাথে?”

মৌরি তার পেছন থেকে ব্যাল্কনির দরজা দিয়ে ভেতরে উষশীকে দেখে। হাতে মৌরির মাথার ক্লিপটা নিয়ে খেলছে সে। পরপর স্বামীর দিকে তাকায়। দম নিয়ে বলে,

_”আমার ভাইয়া ছিল। কি কথা বলেছি সেটা আপনাকে বলা প্রয়োজন মনে করছিনা।”

_”তাই? চলে যাওয়ার কথা বলতে শুনলাম বোধ হয়।”

_”ঠিক শুনেছেন। এতকিছুর পর আপনার সাথে আমি এখানে থেকে যাবো, এ কথা ভাবেন কি করে? আমার বাড়ি ফিরে যেতে চাই আমি। আর, ফোন দিন আমাকে।”

স্বামীর কাছ থেকে ফোনটা নিতে হাত বাড়ায় মৌরি। কিন্তু উমরান দিলেন না। ফোনটা প্যান্টের পেছনের পকেটে পুরে, মৌরিকে বাহু ধরে কাছে টেনে নিলেন। আকস্মিক টানে সে খুব কাছে চলে এলো। তার চিবুকে সন্তর্পণে হাত দিয়ে দৃষ্টি নিজের দিকে করেন মেজর। মৌরির উচ্চতা উমরানের কাঁধ ছুঁই, এর বেশি না। তাই মাথা তুলেই তাকাতে হচ্ছে। তাছাড়া উমরানও চিবুকে হাঁত দিয়ে নিজের দিকে করে নিয়েছে মুখটা। মৌরি রেগে সরিয়ে নিতে চাইলেও, পুরুষালি গাম্ভীর্যে ভরপুর চেহারাটা দেখে আপনা আপনি দমে যায়, কিছু বলতে পারেনা।

মেজর স্নিগ্ধ মৌরির সমগ্র মুখমণ্ডলে নজর বুলিয়ে, ময়ূরাক্ষীর মতো মায়াবী চোখ দুটোতে এসে থামেন,

_”কাল তোমার বাবা কী বলেছিলেন, মনে নেই? উমরান তাওসিফ তোমাকে যেখানে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবে, সেটাই হবে তোমার আসল ঠিকানা, সেটাই এখন থেকে তোমার ঘর। আমি তোমার অভিভাবক, তোমার সবকিছু। এখানে যারা আছে, আর যা কিছু আছে- সবই তোমার। আর তুমিও এসবেরই অংশ। তোমার হাতটা আমার হাতে তুলে দিয়ে উনি তোমাকে আমার কাছে তুলে দিয়েছেন সম্পূর্ণরুপে। কি, মনে নেই?”

মৌরির মনে আছে সবটা। কিছু ভুলেনি। কিন্তু সে তাও থাকবেনা এখানে। সে নিশ্চিত, বাবারা কেউ এই লোকের আগের বিয়ে আর বাচ্চা নিয়ে কিছু জানেনা। তাই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে মেজরের সাথে। তার অধর আর চোখের কম্পন দেখে অতি নৈকট্যে থাকা মেজর বুঝে নিলেন কি ভাবছে মনে মনে। শ্বাস টেনে চিবুকের হাতটা ধীরে স্ত্রীর গালে আনেন, উদ্দেশ্য শান্তভাবে কিছু বুঝাবে। কিন্তু মৌরি এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে দিলো।

_”ছাড়ুন, এভাবে ছুবেন না একদম। কাল কিছু বলিনি বলে ভাববেন না, আজও চুপ থাকব।”

উমরান ঝটকা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়া হাতটা দেখেন। কিছুপল দেখেই থাকেন। অতঃপর নজর সরিয়ে ভ্রু টানটান করে মৌরিপানে তাকান গম্ভীর চেহারায়। তাকেই দেখছে মেয়েটা। দৃষ্টি এমন, যেন ঘৃণিত আর নিকৃষ্ট কিছু আছে সামনে। উমরান বলেন,

_”কাল চুপ করে ছিলে কই? রুমের প্রতিটা দেয়াল সাক্ষী তোমার শীৎকারের। আমাকে অনুভব করতে করতে সুখ আর ব্যাথা-যন্ত্রণায় কি কি শব্দ করেছ তাও ভুলে গেলে সকাল হতে না হতে?”

তীব্র অস্বস্তি আর লজ্জ্বায় মৌরি কিছুটা সরে দাড়ালো স্বামীর কাছ থেকে। চোখে অশ্রুকণা ভেসে উঠল। ঢোক গিলে সে সামলানোর প্রয়াসে। কান লাল হয়ে এসেছে লজ্জ্বায়। কিন্তু মুখে অপমানিত বোধ করার মতো ভাবখানা স্পষ্ট। উমরান দেখলেন তা। একটু দমিয়ে নিলেন নিজেকে। শ্বাস টেনে কাছে আসেন স্ত্রীর। চোখের কোণ থেকে অল্প অশ্রুবিন্দুটুকু হাতের আঙ্গুলে সরিয়ে ফেলেন। মুখটা পুরুষালি হাতের আজলায় নিয়ে নিজের দিকে ফেরান। সন্তর্পণে কপাল হতে চুল সরিয়ে বলেন,

_”রিল্যাক্স! এত ইম্ব্যারেস হওয়ার কিছু নেই। উই আর হাসব্যান্ড এন্ড ওয়াইফ। হোয়াটএভার হ্যাপেন্ড বিটুইন আস, অর হ্যাপেনিং - ইটস অল নরমাল।”

মৌরি জবাব দিলনা। মেজর আবার বলেন,

_”আ, আচ্ছা, লিসেন… কাল রাতের জন্য আমি খুব দুঃখিত। ওটা আমার ভুল ছিল, নিজেকে ওভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া উচিত হয়নি। সামনে থেকে আর কখনো এমন হবে না। তুমি যখন চাইবে, যখন তোমার মন সায় দেবে, ভালো লাগবে - তখনই আমরা কাছে আসব। তার আগে না। কাল আমার ভুল ছিল। আ’ম ভেরি সরি সোনা।”

মৌরি জবাব দেয়না। তবে অস্বস্তিভরে স্বামীর হাতটা গাল থেকে সরিয়ে নেয়। সময় নিয়ে বলে,

_”আপনার প্রথম স্ত্রী, মানে উষশীর মা সম্পর্কে জানতে চাইছি।”

উমরান থেমে মৌরির চেহারার ভাবভঙ্গি পূর্ণরুপে পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর সময় নিয়ে বলেন,

_”বলবো। সময় হোক।”

_”বেঁচে আছে?”

_”হ্যাঁ”

মৌরির মধ্যে আলাদা কোনো অনুভূতি দেখা গেল না স্বামীর প্রথম স্ত্রী বেঁচে আছে শুনে।

_”আপনাকে ধোঁকা দিয়ে চলে গেছে?”

_”না।” এ কথা শুনে মৌরি ঢোক গিলে পেছনে রুমের ভেতর খেলতে থাকা উষশীপানে তাকায়। অতঃপর মেজরকে বলে,

_”উষশী এখনো ছোট। অনেকটা ছোট। আপনার আর আপনার স্ত্রীর মধ্যে যায় ঝামেলা থাকুক। ওকে এই বয়সটাতে মায়ের কাছে রাখা উচিত ছিল। মেয়েটা দুধের শিশু এখনো। মাতৃদুগ্ধের বিকল্প কিছু দিলেও, তা কখনো মাতৃদুগ্ধের সমান না। আশা করি বুঝতে পারছেন। ওর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য মায়ের কোল দরকার। ন্যায্য খাবার দরকার।”

কাল শেষরাতে উষশীর অযাচিত কাণ্ডটা ঘটানোর পর নানান চিন্তা করতে গিয়ে মৌরির মাথায় এসেছিল বিষয়টা। ভাবনা অনুযায়ী মেজরকে জানিয়ে দিয়েছে।

উমরান চোখে হেসে বলেন,

_”আচ্ছা, ভেবে দেখবো বিষয়টা।”

_”এবার শুনুন আমার কথা। সেদিন সমুদ্রপাড়ে যা হয়েছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল সবটা। তা আপনিও জানেন, আমিও জানি। এরপর যা করেছেন, আবেগের বশে আমি সায় দিয়েছি। আমি ভুল করেছি। আপনার আগের স্ত্রী-সন্তান থাকতে পারে। এমন কিছু মাথায় আসেনি তখন। ওখানের মহিলাগুলোকে আপনার বউ নেই বলতে শুনেছিলাম। এতে আমি ধরে নিয়েছিলাম আপনি অবিবাহিত। বিবাহিত হয়েও বউ নেই, এমন কিছুর সম্ভাবনা আছে বুঝতে পারলে আমি কখনোই রাজী হতাম না। কোনো বিবাহিত, বিপত্নীক কিংবা ডিভোর্সি, সাথে সন্তানসহ পুরুষ - যায় হোক না কেন, এমন কোনো ধরণের পুরুষই আমি চাইনা আমার জীবনে। এখন অবশ্য আমার গাঁয়েও এর মধ্যে একটা দাগ লেগে গেছে। কিন্তু আমি কোনো ধোঁকার সম্পর্কেও থাকতে চাইনা। আপনি আর কোনো বাড়াবাড়ি করবেন না প্লিজ। আমি আমার বাড়ি ফিরে যেতে চাই।”

উমরান বেশ মনোযোগী চিত্তে শুনলেন স্ত্রীর প্রতিটি কথা। গাম্ভীর্য ধরে রেখে রেলিং এ হেলান দেন পিঠ ঠেকিয়ে। মৌরি তার সামনে। দুজনে মুখোমুখি। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছু ভাবতে ভাবতে ভেতরে খেলতে থাকা কন্যাকে দেখতে দেখতে বলেন,

_”একটু আগেও মনে করিয়ে দিয়েছিলাম, তোমার বাবা যা যা বলেছে।”

_”হেয়ালি করবেন না। আমার বাবা জানেনা যে আপনি আগে থেকে বিবাহিত। একারণেই আপনার সাথে পাঠিয়ে দিয়েছে, এটুকু বুঝার বোধ আমার আছে।”

কথাগুলো বলে কি ভেবে মৌরি আবার নিজেই বলে,

_”আচ্ছা, এসব রাখুন। আপনি আগে বলুন তো কাল বাড়িতে ঠিক কি বলে নিয়ে এসেছেন আমাকে?”

স্ত্রীর প্রশ্নাত্মক চোখে চোখ রেখে উমরান বলেন,

_”বলেছি তুমি আমার বউ।”

_”বিয়ে কিভাবে হয়েছে এ কথা কিভাবে, কেমন, কতটুকু জানিয়েছেন তা জানতে চাইছি।” বিরক্তি তার কণ্ঠে।

_”জানতেই হবে?”

বারবার এমন হেয়ালি মৌরির ভালো লাগছেনা। বিরক্তিতে কিছু একটা করে ফেলতে ইচ্ছে করলো তার। ভাবনা অনুযায়ী অকস্মাৎ স্বামীর কাছে এসে তার পুরুষালি বাহুতে হাত রাখে। মেজর পদের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সিনিয়র আর্মি অফিসার উমরান তাওসিফের শক্ত পেশির পাশে, স্ত্রীর হাত যে কতটা নরম ও হালকা, তা সে নিজেই টের পেল।

তবু রেশমি ছোঁয়ার মতো মেয়েলি হাতে মৌরি খামচে ধরল স্বামীর বাহু। নখ বসে গেল। ইচ্ছে করেই এমনভাবে ধরেছে, যাতে দেবে যায়। কিন্তু তাতেও উমরানের কোনো হেলদোল হলো বলে মনে হলো না। বরং ভ্রু কুঁচকে তাকান।

মৌরি কণ্ঠে জেদ চেপে রেখে বলে,

_”বলুন আমায়, কি বলেছেন আপনি বাড়ির সবাইকে?” জেদি স্বর হলেও চোখে অসহায়ত্ব আর কাতরতা স্পষ্ট। নিজের জীবনের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ট্র্যাজেডি মৌরি মেনে নিতে পারছেনা কোনোভাবেই। যা হচ্ছে, তা সে কখনোই কল্পনাতে আনেনি। সুন্দর একটা জীবন ছিল তার। এই লোক সব বরবাদ করে দিয়েছে। মৌরির মনে হচ্ছে, তার কিছুই আর তার নেই। সবটা এখন এই লোকের। এটা সে মেনে নিতে পারছেনা কোনোভাবে।

উমরান তার মনের অবস্থা খুব বুঝতে পারল। একদিকে ওর স্বাস্থের কথা ভেবে কিছু জানাচ্ছেনা, অন্যদিকে নিজেই আবার সবচেয়ে বড় মানসিক অশান্তিতে ফেলে দিয়েছে। ওকে এখনই নিয়ে আসা কি ভুল হলো? কোথাও আরেকটু সময় নেওয়া উচিত ছিল কি? কিন্তু সেদিনের পর একটা মাস তো করেছে অপেক্ষা। কক্সবাজার যাত্রার ঐ মিশন সম্পূর্ণ করে তবেই স্ত্রীকে এনেছে। চাইলে ওকে নিয়ে এসে মেয়ের কাছে, ওর সাথে রেখে - তবেই মিশনে যেতে পারতো। কিন্তু মৌরির কথা ভেবেই নিয়ে আসেনি। তখন আরও মানসিক দ্বিধাদন্ধে থাকতো মেয়েটা, সে নিজেও থাকতনা কিছু বোঝানোর মতো। তাই মেয়ের কাছে নিয়ে আসার ইচ্ছে থাকলেও স্ত্রীর কথা ভেবেই আপোষ করেছে। উষশীরও মাকে কাছে পাওয়ার অধিকার আছে এ কথা মাথায় আসা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা করে গেছে। এখন সে ফিরে এসেও যদি সময় নিতো, তাহলে উষশী কি একটু বেশিই বঞ্চিত হতোনা? উষশীর মায়ের সবটা মনে পড়লে, সবটা জানতে পারলে - তখনও কি রাগ ক্ষোভ নিয়ে থাকবে স্বামীর প্রতি? না। এমনটা হবেনা উমরান জানে। বরং সন্তুষ্টই হবে যখন সবটা জানতে পারবে, মনে করতে পারবে। এখন যেভাবে ভুল বুঝছে। তখন সবটা পরিষ্কার হয়ে গেলে আর কোনো রাগ ক্ষোভ থাকবেনা তার আর তার মেয়ের প্রতি। বরং অজান্তে, তার অনিচ্ছাতে হলেও - মেয়ের কাছে রেখেছিল তাকে। তার মেয়েকে মায়ের ভালোবাসা পেতে দিয়েছিল জানলে খুশিই হবে তখন।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌরিকে আবার কাছে টেনে আনেন। মৌরি না চাইলেও মানেন না। দৃঢ়ভাবে বুকের কাছে টেনে এনে, গাঁ ঘেঁষে দাড় করান। কপালে চুমু এঁকে, তাতে নিজের কপাল ছোঁয়ান,

_”ভীষণ টায়ার্ড লাগছে। এখন এসব নিয়ে কথা না বলি, প্লিজ। আমাকে একটু সময় দাও, সবটা আমি নিজেই তোমাকে বলব; প্রমিস। এখন শুধু আর দুটো দিন একটু অপেক্ষা করো। এক মাস তো অপেক্ষা করেছই, আর মাত্র দুটো দিন। প্লিজ, এই দুটো দিন আমাকে দাও। তারপর তোমার এলোমেলো জীবনের সবটা গুছিয়ে দেব ট্রাস্ট মি। তোমার যত প্রশ্ন আছে, একটারও উত্তর বাকি রাখব না। তখন তুমি যা চাইবে, সবই হবে। এই মুহূর্তে শুধু আমাদের বাবা-মেয়েকে একটু তোমার মন-মস্তিষ্ক আর বুকে জায়গা দাও। আপাতত আর কিছু চাই না।

আর হ্যাঁ, কাল রাতের জন্য এগেইন সরি। যা করেছি, ওটা আমার ভুল ছিল। এইবারের মতো ক্ষমা করে দাও, প্লিজ। এমনটা আর হবে না সামনে থেকে।”

___

_”লুকিয়ে লুকিয়ে কি উকি দিচ্ছিস? ভেতরে আয়।”

তূর্ণা পা টিপে টিপে ভেতরে আসে। অর্ণব তখন মৌরি কিছু বলতে বলতে অকস্মাৎ কল কেটে দেওয়ায় কি হয়েছে ভেবে চিন্তায় ছিল। এর মধ্যে দরজার বাইরে বোন তূর্ণাকে উকিঝুকি দিতে চোখে পড়ে। তূর্ণা এসে ভাইয়ের সামনে দাড়ায়।

_”কি হয়েছে? এমন চেহারা বানিয়ে রেখেছিস কেন? কিছু চাই?”

তূর্ণা কাচুমুচু করে উত্তর দেয়,

_”বলছিলাম ভাইয়া, সামনের সপ্তাহে আমাদের স্কুল থেকে স্টাডি ট্যুরে যাবে ঠিক করেছে সবাই। আমার সব বান্ধবীরাও যাবে। আমি মাকে জানিয়েছিলাম। মা মানা করে দিয়েছে।”

_”তো?”

অর্ণব ভাইয়ার নির্বিকার প্রশ্নে তূর্ণা হতাশ চোখে তাকায়। ভাইয়া কি বুঝতে পারছেনা সে কি চাইছে? সব তো বলার আগেই বুঝে যায় এমনিতে। এখন সে যেটা মুখে বলতে ভয় পাচ্ছে, অথচ চেহারায় স্পষ্ট। তা বুঝতে পারছেনা। তূর্ণার অভিমান হয় ভাইয়ের প্রতি। তাও চেপে গিয়ে কোনোভাবে বলে,

_”তো মানে? সবাই তো যাবে। আমি যেতে চেয়েছিলাম, মা মানা করে দিয়েছে। এটা কি ঠিক হলো?”

_”কি করলে ঠিক হতো?”

_”ভাইয়া, এমন করছ কেন। প্লিজ…”

_”কি চাইছিস মুখে না বললে বুঝব কি করে?”

_”ট্যুরে যাবো।”

_”চাচী তো মানা করে দিল। তাও যাবি?”

_”না, তুমি গিয়ে মানাবে মাকে। না না… মাকে না, বড় বাবাকে বলবে। তাহলে আর কেউ মানা করতে পারবেনা।”

_”আমি কেন বলবো?” গাঁঁয়ে শাঁর্ট জড়াতে জড়াতে বলে অর্ণব। বাইরে যাবে সে।

_”বলবেনা?” তূর্ণার কাঁতর দৃষ্টি।

_”ট্যুরে যেতে হবেনা। সবাই মিলে পিকনিক করব বাড়িতে।”

_”না আমি সবার সাথে ট্যুরেই যাবো।” জেদী কণ্ঠ তূর্ণার

_”দুইবার বলব না কথা।”

_”আমি ট্যুরেই যাবো। সবাই খালি এখানে যাবিনা, ওখানে যাবিনা এসব বলো। একই পাড়ায় বান্ধবীর বাসায় যেতে দাওনা। ইচ্ছে মতো বন্ধুত্বটাও করতে দাওনা কারো সাথে। ফোন দেখতে দাওনা, আমি কিছু বলি তখন? সেদিন আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যেতে দেয়নি কেউ। অথচ ক্লাসের সবাই গেছিল। কতো আনন্দ-মজা করেছে। আমার প্রিয় বান্ধবী হয়েও আমিই ছিলাম না শুধু। সবসময় সবাই এমন করো। এবারো এমন করছ। আমার এমন বন্ধী বন্ধী থাকতে ভালো লাগেনা বুঝোনা তোমরা? একদিন একা একা অনেক দূরে কোথাও চলে যাবো। তখন বুঝবে।” রাগে-জেদে অনেক কিছু বলে ফেলল মেয়েটা। বাড়ির প্রত্যেকে তার জন্য খুব কড়া কড়া নিয়ম বেধে দিয়েছে। প্রাইমারিতে থাকতে ছোট ছিল। তখনই সুন্দর ছিল জীবনটা। যবে থেকে একটু একটু বুঝছে সব। বন্ধু-বান্ধব হওয়ার বয়স হয়েছে, তবে থেকে সবাই এমন করে। এত কড়া নিয়ম কে জারি রাখে এখনকার যুগে? ক্লাস নাইনে পড়ে সে এখন। আর এক বছর পর কলেজে উঠবে। অথচ একটুও স্বাধীনতা নেই। সবসময় তার সাথে এমন করে কেন জিজ্ঞেস করলে বলবে তার ভালোর জন্য। যেন বাড়ির বাইরে বের হলেই কেউ তার ক্ষতি করে দেবে!! নাহয় সে পালিয়ে যাবে! মানুষের কি আর খেয়ে ধেয়ে কাজ নেই, যে সবসময় তার ক্ষতি করার জন্য বসে থাকবে! আর সেও কি বোকা যে একা একা কোথাও পালিয়ে যাবে?

গাঁঁয়ে পারফিউম লাগাতে লাগাতে অর্ণব চাচীর মেয়ের সব কথা শুনল মন দিয়ে। সবাই তাকে কেন এতটা চাপে রাখে, কড়া নিয়মে বেধে রাখে!! এই নিয়ে মেয়েটার তাদের সবার প্রতি অসংখ্য অভিযোগ। কিন্তু কিছু করার নেই। এভাবেই কাঁটাতে হবে সারাজীবন। উগ্র স্বাধীনতা দূরে থাক, সর্বনিম্ন স্বাধীনতাটুকুও দেওয়া সম্ভব না। বাড়ির কেউ তা দেবেনা, আর না তো সে হতে দেবে। একবারে শিক্ষা পেয়েছে প্রত্যেকে, নানান ভয় আর আশঙ্কা থাকে তূর্ণাকে নিয়ে সবার মনে। আয়নার সামনে চুলে আঙ্গুল চালিয়ে তা সেট করতে করতে অর্ণব বলে,

_”রেডি হয়ে আয়, আমরা বাইরে যাবো। মৃন্ময়কেও ডাক।”

অর্ণব ভাইয়া প্রতিবার এমন করে। সে কতো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে, অথচ তার জবাব না দিয়ে নির্লিপ্তে উপেক্ষা করে যায়। সম্পূর্ণ নিজের মতো কিছু একটা বলে দেয় প্রত্যেকবারই। তূর্ণার মন চাইলো ভাইয়ের ঠিক করা ঐ চুলগুলো টেনে এলোমেলো করে দিতে। কিন্তু এমনটা করলে তার মাথার একটা চুল আস্ত থাকবে না। কিন্তু বাইরে যাবে বলছে কেন? ভাবতে গিয়ে একটু আগের তীব্র রাগ আর মন খারাপির বিষয়টা ভুলে গেল। কৌতূহল নিয়ে জানতে চায়,

_”কোথায় যাবো ভাইয়া? তুমি তো এই সময়ে বাবাদের কারখানায় যাও… আমাকে আর মৃন্ময়কেও ওখানে নিয়ে যাবে? বড় বাবা বকবেনা আমাকে ওখানে নিয়ে গেলে?”

অর্ণব আয়নায় চোখ রেখেই হাঁতের চিরুনি দিয়ে তূর্ণার মাথায় ঠোকা দেয়,

_”মুখ বেশি চালাস। যেটা বলছি সেটা কর।”

_”কিন্তু বড় বাবা বকবে আমি নিশ্চিত। সাথে মায়ের বকুনিও পড়বে। তোমাকে তো কেউ কিছু বলবেনা। সব বকা আমাকেই শুনতে হবে। তাছাড়া মৃন্ময় বাড়ি নেই, পাড়ার মোড়ে গেছে খেলতে।” বিরক্তি তার কণ্ঠে

_”কে বকবে না বকবে এসব ভাবতে বলেছি তোকে? গিয়ে রেডি হয়ে আয় তুই, আজ কারখানায় যাব না। মেলায় যাবো। রাস্তায় মৃন্ময়কে পেলে বাইকে তুলে নেবো, না পেলে নেই।”

তূর্ণাকে উৎফুল্ল দেখালো,

_”প্রগতিপাড়া মাঠে যে মেলা বসেছে ওটায়?”

অর্ণব সম্মতি জানালে সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেনা। ছুটে তৈরি হওয়ার উদ্দেশ্যে। ভাইয়া মেডিক্যাল থেকে ছুটিতে বাড়ি এলে এই সময়ে বাবাদের কারখানাতেই যায় প্রতিবার, আজ একটু রেগে গেছিল বলে ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ পেলো। তার মানে এবার থেকে মাঝেমাঝে এমন রাগ দেখালে মন্দ হবেনা।

__

উমরান বাবার সাথে কথা বলে স্ত্রীকে কোন ডক্টর দেখালে ভালো হবে সে পরামর্শ করছিল। তার বাবা নিজেও একজন নিউরোলজিস্ট। দেশে থাকলে আর তেমন কোনো চিন্তা ছিলনা। কিন্তু ওলিওল্লাহ চৌধুরী স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য লন্ডন আছেন বেশ অনেকগুলো মাস। তিনি দেশে নিজেদের হস্পিটালের এক ডক্টরের সাথে কথা বলে রেখেছেন তার ছেলে বউয়ের বিষয়ে। সেসবই জানাচ্ছিলেন ছেলেকে। কালই যাওয়ার কথা বলে রেখেছেন তিনি। কিন্তু তার আগে উষশীর মা আগে যাদের বাড়ি ছিল, তাদের সাথে কিছু কথা বলা দরকার। কারণ কিছু বিষয় জেনে নিতে হবে ডক্টর দেখানোর আগে।

বাবার সাথে পরামর্শ করে ভাবনা অনুযায়ী বিকেলে উমরান মৌরির ভাই অর্ণবের সাথে দেখা করতে যায়। একটা ক্যাফেতে বসবে তারা। অর্ণব আগেই চলে এসেছে। তূর্ণাকে নিয়ে মেলায় থাকতেই ফোন পেয়েছিল উমরান তাওসিফের, তারা বেরিয়েছিল দুপুরের পর। ওকে মেলায় ঘুরাতে ঘুরাতে বিকেল হয়েই এসেছিল। উমরান তাওসিফের কল পেয়ে তূর্ণাকে বাড়ি নামিয়ে দেয় আর কিছুক্ষণ ঘুরে। পরপর এখানেই চলে এসেছে। সে বসে দশ মিনিট পরই মেজরকে দেখা যায় প্রবেশ করতে।

_”মিস্টার তাওসিফ, এদিকে…” ডাক শুনে উমরান তাকান। অর্ণবকে দেখে এগিয়ে এলেন।

_”হ্যালো অর্ণব, ভালো আছো?” কাছে এসে হ্যান্ডশেক করেন। অর্ণব তার অনেকটাই ছোট বয়সে। তাই তুমি সম্বোধনটাই রাখলেন।

অর্ণব সৌজন্য হেসে জবাব দেয়,

_”জি আলহামদুলিল্লাহ। ভালোই যাচ্ছে সব। আপনার কি অবস্থা? মৌ ভালো আছে?”

_”হ্যাঁ, আছে ভালো। তোমার বাড়ির সবাই ভালো তো?”

_”আছে… মৌরির হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ায় সবার মানসিক অবস্থা একটু খারাপই যাচ্ছে। বিশেষ করে আমার মা!! ও আমাদের সবার কাছে মৌরিই এখনো। তাই বুঝতেই পারছেন… একটু সময় লাগবে সবার আগের মতো শক্ত হতে।”

উমরান বুঝলেন বিষয়টা। কিন্তু কিছু করার নেই। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সম্মতি দেন। ওয়েটারকে ডেকে দুকাপ কফির অর্ডার দিলেন।

_”তো মিস্টার তাওসিফ। জরুরী তলব দিলেন। দরকারি কোনো কথা আছে মনে হচ্ছে। আপনি প্রসঙ্গে আসতে পারেন। চিন্তিত দেখাচ্ছে আপনাকে।”

_”হ্যাঁ, দরকারি কথা বলতে শ্রেয়সীর বিষয়ে জানতে চাইছিলাম। ওকে ডক্টর দেখাবো। একজন নিউরোলজিস্টের এপয়েনমেন্ট নিয়েছি। কিন্তু তার আগে ওর শারীরিক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যা যা বিষয় জানা আছে তোমাদের। তা জেনে নেওয়া দরকার মনে হলো। বাড়িতে এসব নিয়ে কোনোরকম আলোচনায় যেতে চাইনা শ্রেয়সীর সামনে। তাই তোমাকে জরুরীভাবে এখানে ডাকা।”

অর্ণবকে কিছুটা দ্বিধান্বিত দেখাল। মৌরির স্বামী নিশ্চয়ই তার মেমোরি ফিরিয়ে আনতে চাইবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সবটা মনে পড়ার পর কি তাদের ভুল বুঝবে? দূরে সরে যেতে চাইবে? এ ভেবে কিছুটা হাহাকার হয় তার। ঠোঁট ভিজিয়ে সময় নিয়ে বলে,

_”কখন দেখাবেন ডক্টর?”

_”এপয়েনমেন্ট আগামীকাল রাতেরই নিয়েছি। দেখি কতটুকু কি করতে পারি।”

অর্ণব মাথা নাড়ায়। গভীর শ্বাস টেনে বলে,

_”কি কি জানতে চাইছেন বলুন। আমি বলছি।”

_”সর্বপ্রথম যেটা জানতে চাই। শ্রেয়সীকে নিজেদের কাছে রেখে দিতে চাও বলে কোনো ডক্টর দেখাওনি বুঝলাম। কিন্তু তুমি নিজেও মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। ডক্টর না দেখালেও নিজে অনেক কিছুই বুঝো। সে মোতাবেক ওকে দীর্ঘ একবছর পর্যবেক্ষণ করে কতটুকু কি জেনেছ, কি বুঝেছ - সবটা জানতে চাই।”

অর্ণব জিরিয়ে বলে,

_”ও হস্পিটালে কোমায় ছিল দুমাস। তারপর বাড়ি নিয়ে আসলাম। শুরুতে কিছুই মনে ছিল না। ট্রমার কারণে কথা বলতো না, চুপচাপ থাকতো। ঘুমালে নানান স্বপ্ন দেখতো, মাঝে মাঝে প্যানিক আট্যাক হতো। সাথে এক্সিডেন্টে জখমের কারণে শরীরের নানান অসুস্থতা তো ছিলই। আস্তে আস্তে আমাদের সবার যত্নে কিছুটা ভয় কাটে। তারপর আগের ঘটনা নিয়ে, আই মিন আপনাদের নিয়ে নানান ভাঙা ভাঙা কথা বলতো। যার কিছুই আমাদের বুঝে আসতো না। আসলে ও ঠিকঠাক বুঝাতে পারতো না। কথা সাজিয়ে-গুছিয়ে বলতে পারত না। আমার মনে হয় ট্রমার কারণেই হতো এমনটা। যে বিষয়গুলো ওর মনে ছিল। সেগুলো নিজেই ঠিকঠাক প্রসেস করতে পারতোনা ট্রমার সময়টাতে।

বাচ্চাদের মতো অবুঝ ছিল আচরণ। তাই আমরা আগের ঘটনা উপেক্ষা করে গিয়ে, নিজেদের মতো বুঝালে - কিছুটা সময় নিয়ে হলেও সেসব আপন করে নিতো। যা মনে আছে তা নিছকই দুঃস্বপ্ন। এমনটাই বুঝিয়েছি প্রতিনয়ত। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম, ওর বয়সী একটা মেয়ের স্বাভাবিক যে বিষয়গুলো নিয়ে জ্ঞান থাকা উচিত। সেসবেতেও দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারতনা। এতে আমাদের আরও সুবিধা হলো। আস্তে আস্তে নিজেদের মতো বুঝিয়ে আমাদেরই বানিয়ে নিলাম ওকে। বলতে গেলে এখন ও যে মৌরি হিসেবে আছে। সবটা তিলে তিলে আমাদের নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা মৌরি। খুব বেশিদিন হয়ওনি ওর আমাদের মৌরি হিসেবে স্বাভাবিক হওয়ার, আর স্বাভাবিক জীবনে আসার। আমরা ওকে ওর নিজের কাছেই প্রতিনিয়ত আমাদের একজন হিসেবে পরিচয় করিয়েছি। যে কারণে হয়তো আপনাদের একেবারেই ভুলে বসেছে। ডক্টরের পরামর্শে গেলে সবকিছুর আরও সঠিক বাখ্যা পাবেন।”

_”ও যে এক সন্তানের মা, তাতো বুঝে যাওয়ার কথা। তোমরা বুঝতে পারোনি তখন এই বিষয়ে কিছু? ডক্টর জানায়নি?”

_”পেরেছিলাম। না বোঝার তো কিছুই নেই। ডক্টরও জানিয়েছিল। ও হস্পিটালে কোমায় থাকার সময়টাতেই জানতাম এসব। তাছাড়া জ্ঞান ফিরেও ওর স্তনদুগ্ধ আসা জারি ছিল। মা এই বিষয়টা সামলে নিতো। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে ওর স্তন হতে দুগ্ধ আসাও কমে গেল। সুস্থ হওয়ার পর নিজেরও এ বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ ছিল না। কারণ কোমা থেকে ফিরে ট্রমায় ছিল। সে সময় ওকে খাওয়ানো, গোসল করানোসহ অন্যান্য নানান ছোট ছোট কাজ মা-ই করেছে। ডেলিভারির চিহ্নগুলোও এ ক্সি ’ডেন্টের পর নানা অপারেশনের কারণে হয়েছিল। ও কখনো জানতে চাইলে এমনটা বলতে বলেছিলাম মাকে। তবে মনে হয়না এই নিয়ে আলাদা প্রশ্ন ওর মনে জেগেছে বলে। কারণ ওতো, নিজের এসব শারীরিক জখম থেকে সবরকম সমস্যার কারণ এক্সিডেন্ট; এই বিষয়টা জানতো। আমরাই ওকে মৌরি পরিচয় দিয়ে নানান কিছু মেলাতে না পারলে বারবার বলতাম - এক্সিডেন্টে আঘাতের ফলে ভুলে গেছিস, তাই মনে পড়ছেনা। এভাবেই একসময় পুরোপুরি আমাদের মৌরি হয়ে উঠে। যদিও স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে খুব বেশি সময় হয়নি এখনো।”

উমরান বেশ মনোযোগী চিত্তে সবকথা শুনলেন। এরা যে ওকে বাড়ি নিয়েই গেছিল নিজেদের মেয়ে হিসেবে রেখে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, তা একেবারেই পরিষ্কার। নাহয় এত নিখুঁতভাবে সবটা সামলাতে পারতনা। কি অদ্ভুদ! মেয়েটা এক সন্তানের জননী, এ কথা জেনেও কি করে এমনটা করতে পারে কোনো মানুষ। ওকে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া দরকার, ওর যে একটা সদ্য জন্ম দেওয়া সন্তান আছে, সেই বাচ্চাটারও মাকে দরকার - এ কথা কি একবারো মাথায় আসেনি? ওকে কিছু মনে করানোর চেষ্টা তো করেইনি। বরং সবকিছু ভুলিয়ে নিজেদের পরিচয় দিতে উন্মাদ ছিল। কিছুটা ক্ষোভ এলেও প্রকাশ করলেন না উমরান। স্বার্থপর মানুষদের পাল্লায় পড়েছিল তার বউ। খারাপ মানুষদের নয়। এ নিয়েই তার সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এখন যেটুকু সুস্থ অবস্থায় পেয়েছে স্ত্রীকে। তা নিয়ে এদের প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে দোষারোপ করে সময় নষ্ট করার মানে হয়না।

_”আচ্ছা, বুঝতে পারছি সবটা। ধন্যবাদ তোমাকে। ডক্টরকে এসব কিছু জানাতে হতো। চিকিৎসায় সব তথ্যই দরকার পড়বে।”

অর্ণব শুনলো তাদের মৌরির স্বামীর কথা। মেজর যে তাদের উপর অল্প হলেও নারাজ, আর কিছুটা ক্ষোভ আছে। তা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু কিছু করার নেই। তাদের জন্য ঐ সময়টায় এই মেজরের বউকে মৌরি পরিচয়ে রেখে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিলনা। সে বলে,

_”মৌরির যে বাচ্চাটা… আই মিন আপনাদের সন্তান। ছেলে নাকি মেয়ে?”

_”মেয়ে।”

অর্ণবের ঠোঁটের কোণে অজান্তে হাসির রেখা দেখা গেল। মৌরির একটা বাচ্চা আছে। জানতো এ কথাটা। তাও নতুন লাগছে শুনতে। সাথে ভালোও লাগছে। স্বার্থপর হয়ে রেখে দিয়েছিল নিজেদের কাছে। স্বামী সন্তানের থেকে দূরে। অথচ এখন মৌরির মেয়ে আছে শুনে ভালো লাগছে। মৌরি তার মেয়ের কাছে আছে। বাচ্চাটা মাকে পেয়েছে। ভালোই লাগছে ব্যাপারটা ভাবতে। মৌরিতো তার বোন। বোনের মেয়ে তো ভাগ্নি। ওর বাচ্চাটা তার ভাগ্নি। অদ্ভুদ রকম ভালো লাগল তার এসব ভেবে।

_”ওর ছবি দেখতে পারি?”

উমরান অর্ণবকে পুঁইপাখিকে সাথে নিয়ে আসতে বলেছিল। এনেওছে সে। কফিতে চুমুক দিয়ে ওকেই দেখছিল খাঁচার ভেতর। পুঁই ডানা ঝাপটে এদিক ওদিক করছে। এই পুঁইটাকে নিয়ে এসেছিল সে। অথচ এখনো ওর চেয়ে শ্রেয়সী আর উষশীকে পেলেই খুশি হয়। আশ্চর্য বিষয়!! অকৃতজ্ঞ পুঁই…

ভাবনার মধ্যে অর্ণবের কথাটা কানে এলো। উমরান তাকান। অর্ণব তার দিকেই চেয়ে আছে। তাদের মৌরির মেয়েকে দেখতে চায় সে।

ফোনটা টেবিলেই রাখা ছিল। ওটা নিয়ে স্ক্রিন অন করতেই মেয়ের ছবিটা ভেসে উঠে। ওয়ালপেপারেই আছে মেয়ের ছবি। অর্ণব ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল।

ছোট্ট একটি কন্যা, চোখ বন্ধ করে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। পাশে ছোট একটা খরগোশ; বাচ্চাটির খেলনা ওটা। সফেদ বিছানায় খুব শান্তিতে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। অর্ণবের মনে হলো স্বপ্নে কোনো এক রুপকথার জগতে হারিয়ে গেছে এই মেয়ে, যেখানের প্রিন্সেস সে। মৌরির মেয়ে এটা। ভেবে তার চেহারায় অন্যরকম একটা দ্যুতি খেলে গেল। অর্ণবের তার বোনের মেয়েটাকে দেখা ফুরোচ্ছেনা। হালকা গোলাপি রঙা লেইসের নরম জাল আর ফোটা-কাটা কাপড়ের নকশা করা একটা ড্রেস গাঁঁয়ে। মাথায় একটা হেয়ারবেন দিয়ে দিয়েছে। ছোট ছোট চুলগুলো খুব একটা দেখা যাচ্ছেনা নরম কাপড়ের বড় সড় হেয়ারবেনটির কারণে। এত রুপবান আর স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে!! গোলমুটে গাল আর ক্ষুদ্র নাক - একেবারে মৌরির মতো। বাবার মতোও হয়েছে কিছুটা। কিন্তু অর্ণবের চোখে শুধু বোনের চেহারাটায় ভেসে উঠছে। ছোট নরম তুলতুলে হাত দুটো মাথার দুপাশে। আর এক পা আলগা করে ঘুমোচ্ছে। ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে সে। ফোনের স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে ভাগ্নিকে ছুঁয়ে দিল।

দেখা হলে দিয়ে দেয় ফোন। দুজনে উঠল। অর্ণব তার বোনকে দেখেশুনে রাখার কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলো দ্বিধায়। তবে উমরান পুঁইএর খাঁচা নিয়ে উঠে সতঃস্ফূর্তভাবেই বলে,

_”উঠছি আজ। শ্রেয়সীর সামনে এসব আলোচনায় বসতে চাইনি আমি। তাই এভাবে এখানে ডাকা। নাহয় বাড়িতেই আসতে বলতাম। শুনো… আমি তোমাদের থেকে একেবারেই কেঁড়ে নিইনি ওকে। সেদিনও বলেছিলাম, আমাদেরটুকু আমরা বুঝে নিলেও। তোমাদের প্রাপ্য অধিকার থাকবে শ্রেয়সীর প্রতি। আমি তোমাদের ওর সাথে সম্পর্ক রাখা নিয়ে কোনোরকম বাঁধা বা আপত্তি রাখিনি। না তো রাখার দরকার মনে করেছি এখনো অব্দি। তাই তোমরা যখন মন চায় তোমার বোনকে দেখতে আসতে পারো। ও বরং খুশিই হবে তোমাদের পেলে। ও খুশি থাকলে আমিও খুশি। তোমার মাকে, আর বাড়ির সবাইকে নিশ্চিন্তে থাকতে বলো। তোমাদের সাথে কোনোরকম বিশেষ দূূরত্ব এনে রাখিনি আমি। তাই যখন মন চায় দেখতে আসবে। তোমার মাকে বলবে, তার মেয়ে খুব ভালো থাকবে স্বামী সন্তানের সাথে। ভেবে নাও বোনকে সুস্থভাবেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছ। আর সে এখন সংসার করছে। হু? ভালো থেকো।” কথাটা বলে অর্ণবের কাঁধে হাত ছোঁয়ান। অর্ণব হেসে সম্মতি জানাল।

____

মৌরির না চাইতেও বাড়িটাকে আর বাড়ির সবকিছু নিজের ভাবতে হচ্ছে। রাইমা নামের মহিলাটিকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে উষশীর পাপা। আবার মেয়েকে তার কাছে গছিয়ে দিয়ে কোথায় চলে গেল। এখন সব তাকে দেখতে হচ্ছে, সামলাতে হচ্ছ - যেন এসব তার। মৌরির গাঁ জ্বলে যাচ্ছে এসব ভাবলে। কিছু করবেনা করবেনা ভাবলেও তা আর হয়ে উঠছেনা। মেয়েটার সাথে খেলছে, আদর করছে। তাকে খেলতে দিয়ে, খেয়াল রাখতে রাখতে আবার নানান কাজ করতে হচ্ছে। রান্না করতে হবে, উষশীরও খিদে পায় সময়ে সময়ে, তাছাড়া বাড়িতে এটা ওটা এলোমেলো দেখলে - ওসব নিয়ে বসে থাকা যায়না। যখন জানে এসব আর কেউ করবেনা সে ছাড়া। আর না তো করার মতো কেউ আছে। লোকটা তো খাওয়ার সময় হলে আসবে মনে হচ্ছে। ততক্ষণে সে মেয়েসহ সবটা সামলে নিলো। এটা সেটা সব করে একটু গাঁ টা বিছানায় ফেলতে ইচ্ছে করলো তার। তিন চাকার গাড়িটা থেকে মেয়েকে নিয়ে নেয়। উষশী ওতে বসেই থাকে শুধু। পা দিয়ে চালাতে পারেনা সে। নাতো বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে। খেয়াল রাখতে হয় যতক্ষণ থাকে।

মৌরি কোলে নিয়ে গালে চুমু এঁকে আদর দেয়, পেটে মুখ গুজে কাতুকুতু দেওয়ার মতো আদর করে। উষশী হেসে উঠে বাচ্চা কণ্ঠে সুর তুলে। নানাম দুষ্টুমি করতে করতে রুমে গিয়ে বিছানায় রাখে উষশীকে। একটু শুবে ভেবেছিল। কিন্তু রুমেও উষশীর সব খেলনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সে সবটা গুছিয়ে জায়গায় জায়গায় রাখতে গিয়ে বেডের পাশে টেবিলের উপর একটা ছোট ফ্রেমের ছবি রাখা আছে খেয়াল করলো। আগে এতকিছুতে চোখ পড়েনি। কৌতূহলে কাছে গিয়ে দেখে। হাতে নিয়ে চোখের সামনে আনতেই হস্পিটালের বেডে রোগীদের পোশাক গাঁঁয়ে এক মেয়ের পাশে ছোট একটা বাচ্চার ছবি ভেসে উঠল। তার চোখের সামনে স্পষ্ট ছবিটা। মৌরি থমকে দেখল ওটা।

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ১৮ গল্পের ছবি