সে স্থির হয়ে আছে, শ্বাসটুকু নিচ্ছে কি না সন্ধেহ। কিছুক্ষণ আগের ঝড়ো রাগ, তীব্র ক্ষোভ কিংবা জেদ; কোনোকিছুর ছাপ আর নেই তখন তার চেহারায়। জমাট নীরবতা ঢেকে রেখেছে। অল্প অল্প করে ঠোঁট ছুঁঁইয়ে বেশ কিছুক্ষণ লোকটা ওভাবে ওখানে পড়ে থাকল। আর কতক্ষণ ওভাবে থাকবে জানা নেই মৌরির। তবে মেজর ঠিক কতটা নিচে নামতে পারে দেখার অপেক্ষায় রইল সে। আর কতো নিকৃষ্টরুপ দেখাবে একদিনেই তা সেও দেখতে চায়।
অতঃপর কয়েক মিনিট পার হতেই অনুভব করলো তার তলপেটজুড়ে এক সূক্ষ্ম উত্তেজনার স্পর্শ বয়ে যাচ্ছে। দুটো কঠিন, দৃঢ় হাত আর কষা ওষ্ঠ তার তলদেশের অনুভূতিগুলোকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলছে। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও সারা শরীরে এক মৃদু কাঁপন ধরে গেল তার। সামলানোর প্রচেষ্টায় গভীর একটি শ্বাস টেনে নিল মৌরি। শ্বাসনালী পেরিয়ে বুক থেকে উদর অব্দি নামলো তা। স্পষ্ট হলো উদরের কম্পন।
উমরান তার গোলাপের কলিকলির ন্যায় নাভিতে আনমনে বৃদ্ধাঙ্গুলীর সুড়সুড়ি জাতীয় স্পর্শ দিলেন। এটা তার অভ্যাস। অতি প্রিয় কাউকে প্রথমবার সমস্ত লজ্জা ভাঙিয়ে যখন সুখময় যন্ত্রণায় কাঁদাচ্ছিল, তখন এভাবে নাভিদেশে খুনশুটি মিশ্রিত ছোঁয়া দিয়ে হাসিয়ে ফেলেছিল অমন মুহূর্তে।
মৌরির অল্প একটু সুড়সুড়ি লাগল, তবে হাসল না। বিছানার সফেদ চাঁদর খামচে ধরল শক্তহাতে, আনমনে ভালোলাগার মতো কিছু একটা অনুভব হলো তার ভেতর। কিন্তু সেই অনুভূতি তার মন নরম করতে পারল না। বি ‘ষাক্ত লাগছে তার কাছে এমন ছোঁয়া।
অনেক কষ্টে মন স্থির করে সে, হাত বাড়িয়ে মেজরকে সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু তার আগেই অনুভব করলো মেজরের বি ‘ষাক্ত স্পর্শ ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। মেতে উঠছে ধীরে ধীরে তার শরীরে, সবকিছুর মাঝে অকস্মাৎ সমগ্র শরীর ভীষণ হালকা অনুভব করলো সে।
পোশাকের আবরণ যেন নিজে নিজে সরতে শুরু করেছে। মৌরির চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, দৃষ্টি সিলিং ফ্যানের দিকে। অকস্মাৎ অযাচিত ব্যাথায় অল্প শীৎকারে হাঁ করে করে উঠল নিঃশ্বাস আঁটকে। বুঝতে পারল, দু’দেহের মধ্যে আর এক ইঞ্চিও দূরত্ব নেই। সেই দূরত্ব মেজর এত নিখুঁতভাবে মিটিয়ে দিয়েছে, যে মৌরি প্রতিরোধ করার জন্য প্রতিক্রিয়া দেখানোরও সুযোগ পায়নি।
ধীরে ধীরে মৌরির কিছু আর মৌরির রইলো না। মেজর সবটা নিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের অভুক্ত পিপাসুর মতো তাকে দিয়ে নিজের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। অধরে-গ্রীবাদেশে কমনীয় স্পর্শ দিতে দিতে তার কানের নিম্নাংশে ঠোঁট ছোঁয়ায়। বিড়বিড় করে কিছু বলতে শুনা গেল,
_”খুব ভালোবাসি তোমাকে, খুব বেশি। নিঃস্ব ছিলাম এতদিন আমরা বাবা মেয়ে। ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি। সেদিন সমুদ্রপাড়ে ধাক্কা লাগা মেয়েটা তুমি না হয়ে অন্য কেউ হলে, আমি কি করতাম নিজেও জানিনা। কিন্তু সরাতে গিয়ে তোমাকে দেখে মনে হলো কোনো মিরাক্কেল ঘটতে চলেছে আমার জীবনে। তাও যে কাউকে তুমি ভেবে নিইনি ট্রাস্ট মি।”...... থেমে চুমু এঁকে দেয় আরও গাঢ় ভাবে,
_”তোমার কাছেই তোমার পরিচয় জেনে নিতাম। কিন্তু হারিয়ে গেলে এক মুহূর্তে, তখন অবচেতন মন বলছিল মূূল্যবান কিছু চলে গেল আবার। রাগ হচ্ছিল খুব। তবে ঐ দুজনকে এসে তোমার খোঁজ করতে দেখে মনে হলো আবার পাবো তোমায়, হারাওনি তখনও। তোমার নাম পরিচয় জানলাম। কিন্তু বিশ্বাস হয়নি কিছু। মনে হচ্ছিল তুমি আমার শ্রেয়সী। তোমাকে খুঁজে তোমার কাছে এসে বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিলাম, তুমি জানতেই পারোনি। কিন্তু আমি তখনই বুঝে গেছি তুমি আমার শ্রেয়সী, আমার উষশীর মা। তোমার ঘ্রাণ চিনতে আমার অসুবিধা হয়নি। ততক্ষণে জানলাম তোমার পরিচয়েও অনেক কিছু গর্বর আছে। তাই আর অপেক্ষা করিনি। একটুও অপেক্ষা করিনি।”
বিরবির করে কথাগুলো বলে তার গালে চুমু খায়। হাতের স্পর্শ গাঁঁয়ের নিচে লতানো শরীরটাতে। মৌরি নিজের নারীঅঙ্গে স্বামীর আদররুপী বি ‘ষাক্ত স্পর্শের আগে তার কোনো কথা কর্ণগোচর করতে পারল না। অতঃপর মেজর আবার মেতে উঠে মৌরিতে।
মৌরি মন থেকে এই মুহূর্ত অনুভব করলে বুঝতে পারতো; ঠিক কতোটা ভালোবাসা, আবেগ আর স্নেহের সাথে এই মানুষটা তাকে এভাবে কাছে টেনে নিয়েছে। একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারতো অন্তঃস্থলের ঠিক কতোটা গভীর থেকে মেজর এই কথাগুলো বলেছে। কিন্তু স্তব্দ মৌরি, নেশাগ্রস্থের মতো তার মধ্যে মজে থাকা মেজরের কণ্ঠের এই ফিসফিস শব্দগুলো কানে নিতে পারল না।
বেশ কিছু সময় গড়িয়ে গেল। মেজর তখন প্রেম পিয়াস মেটাতে ব্যস্ত। মৌরি হাঁপাচ্ছে কিছুটা। অকস্মাৎ বাইরে থেকে বাচ্চার ক্রন্দনস্বর ভেসে আসতেই ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে আনলেন মেজর। শীতের মধ্যেও কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সামনের এলোমেলো চুল কপালে এসে পড়েছে। থেমে নিস্তেজ মৌরির ঠোঁটে শুষ্ক চুমু এঁকে দিলেন, তারপর উঠে পড়েন মৌরির গাঁয়ে চাঁদরখানা ঠিকঠাক ভাবে জড়িয়ে দিয়ে। অতঃপর ওয়াশরুমে গিয়ে স্নান সেরে বের হতে পাঁচ মিনিট লাগালেন বোধ হয়। মেজর অভ্যস্ত অল্প সময়ে স্নান সারতে। সিঙ্গেল ফাদার থাকায় মেয়ে তাকে আরও অনেক কিছুতে অভ্যস্ত করে তুলেছে।
চুল থেকে টুপটুপ পানি পড়ছে। কোনোভাবে ট্রাউজারটা পড়েছে নিম্নাংশে, তোয়ালে দিয়ে ভেজা গাঁ-টা মুছে, ওটা গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন মেয়েকে নিতে। মিনিট দুয়েকের মধ্যে আবার ফিরেও আসলেন।
উষশী তখনও কাঁদছে অবিরত।
_”মাম্মা, লক্ষীসোনা আমার, কাঁদেনা। এই তো পাপা। আমার কলিজা গুড গার্ল, কাঁদেনা মা……”
_”আম্মা… আমার প্রিন্সেস, কাঁদেনা তো মা। আমার লক্ষী……”
মেজর নানান এলোমেলো কথা বলে মেয়েকে কোলে ঝাকাচ্ছে শান্ত করার চেষ্টায়। লাইট জ্বলানো একটা ঝিলমিল বল হাতে নিয়ে ওটা দেখালেন, আর নানানরকম কথা বলে শান্ত করতে চাইছে মেয়েকে। আদর্শ পিতা একজন। মৌরি এসে অব্দি যা দেখেছে তাতে তাই বুঝল। মেয়ের প্রতি আলাদারকম ভালোবাসা। কারো কাছে গম্ভীরভাষী, কারো কাছে প্রতারক, অথচ মেয়ের কাছে আলাদা রুপ।
_’সোনা মা, আমার, লক্ষী মা… কাঁদেনা, পাপা আছেনা? এই তো পাপা… আমার কলিজা!!” গালে চুমু এঁকে আরও কিছু খেলনা দেখান, মেয়েকে নিয়ে পায়চারী করতেই থাকেন। উষশী কাঁদছে, পাপার গাঁঁয়ে খামচি দিচ্ছে।
বেশ সময় গড়াল, উষশীর কান্না থামল না। একে তো শীত। তার উপর সদ্য স্নান সারায় হিমশীতল উদাম শরীরের কারণে পাপার কোলে আরাম পাচ্ছেনা সে। মেজরও বুঝতে পারলেন তা। ক্রন্দনরত কন্যাকে বিছানায় রাখেন গাঁঁয়ে শাঁর্ট জড়ানোর উদ্দেশ্যে। বিছানায় রাখায় উষশীর কান্নার বেগ বাড়ল বৈকি!
নির্লিপ্তে শুয়ে থাকা মৌরি পাশের ক্রন্দনরত বাচ্চাটির দিকে চোখ ফেরাল। কী কান্না তার! ঠোঁট কাঁপছে, চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। যতদূর বুঝল, মেয়েটার মা নেই। 'মা-হীন এক অসহায় শিশু' কথাটা ভেবেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল তার। টের পেল, অদ্ভুত টান টানছে তাকে। মোহাচ্ছন্ন হয়ে হাত বাড়াল সে। পাশে শুয়ে থাকা উষশীর নাড়তে থাকা হাত আঙুলে ছুঁইয়ে দেয়। শিশুটির ছোট্ট আঙ্গুলের মুষ্টিবদ্ধ হাতটি ধরে হালকা নেড়ে দিল আদুরে ভঙ্গিতে।
উষশী টুক করে তাকায়। ‘উয়াআআ উয়াআআ’ শব্দে কান্না চলছে তখনও, কিন্তু নতুন মুখটির দিকে তাকানোতে কৌতূহলও ফুটে উঠল তার চোখে। মৌরির ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে তা বুঝে। সে উষশীর গোলাপি ঠোঁটে আলতো আঙুল ছুঁইয়ে দেয়। উষশীর কান্নাভেজা মুখে হালকা হাসির রেশ ফুটল।
মৌরি পরপর কয়েকবার একইভাবে ছুঁইয়ে দিলে উষশী বুঝল, সে খেলছে নতুন এই পরিচিত-মতো মুখটির সঙ্গে। কান্না ধীরে ধীরে চুপসে এলো। কিছুক্ষণ পর পুরোপুরি থেমে “এআআ…” শব্দ করে হাত-পা নেড়ে উঠে। মৌরি তার চোখের পানি মুছে দিল।
অকস্মাৎ উষশী গাঁ খিচিয়ে কেমন একটা শব্দ করে হেসে উঠে। চোখে তখনো পানি চিকচিক করছে। কান্নাভেজা চোখে হাসির ঝিলিক। মৌরির ভালো লাগলো। তবে চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব তখনো। উষশীর দিকে অল্প করে একহাত বাড়ায় আনমনে। উষশী বুঝল তাকে কাছে ডাকছে।
তুলতুলে গাঁ খানা তুলে শব্দ করতে করতে এগিয়ে এলো,
_“বা বা, পা মায়াআআ…”
হামাগুড়ি দিয়ে এসে মৌরির কাছে পৌঁছালে, বাকিটা সে নিজেই কোলে তুলে নেয়।
মৌরি ধীরে উঠে বসে বালিশে হেলান দেয়, বুক অব্দি চাঁদর টানে। উষশীকে কোলে তুলে নেয়। সে মহাখুশি, আনন্দ তার চোখে-মুখে। হাত-পা নেড়ে নানান শব্দে সাড়া দিচ্ছে। মৌরি নিম্নস্বরে ঘুম পাড়ানোর মতো ছন্দ তুলে, তবে উষশী ঘুমায়না। নিজের মতো শব্দ করে,
_“এআআ… গুঁ গুঁ… বা আ… আমা মাম্ম মাআ।”
একটু আগের কান্নার রেশ নেই; চোখ চিকচিক করছে। ছোট্ট হাত দিয়ে কখনো মৌরির গলা টোকা দেয়, কখনো চুল টানে, আবার চেইন ধরে টানাটানি করতে থাকে।
মৌরি নরম স্বরে বলে,
_“তুমি তো খুব দুষ্টু মেয়ে… আস্তে আস্তে… ব্যাথা পাচ্ছি…” অতি নিম্ন তার ক্লান্তস্বর, শুধু উষশীর কানেই গেল বোধ হয়।
মেজর দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে সবটা দেখলেন। শরীরে এখন শার্ট ঢেকে আছে, যার বোতাম খোলা হওয়ায় বুকটা উন্মুক্ত, চুল অল্প ভেজা। হাতে উষশীর কুসুম গরম দুধের ফিডারটা নিয়ে দরজার কাছে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকলেন। নিজের অজান্তেই মুখে একরকম পরিতৃপ্তির রেখা ফুঁটে উঠল। এমন দৃশ্য যে তার জীবনে সত্যি হয়ে উঠবে, তা মাত্র এক মাস আগেও ভাবনার অতীত ছিল।
মেয়েকে তার মা বুঝে নিয়েছে দেখে, তখনই চলে গেছিলেন কিচেনে, উষশীর জন্য দুধ আনতে। রুমে প্রবেশ করেন নিঃশব্দে। খাটের পাশের ছোট্ট টেবিলে রাখেন হাতের ফিডার। অতঃপর গাঁ এলিয়ে দেন বিছানায়।
_“ফিডিং করাতে হবে। পর্যাপ্ত না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাই উঠে গেছে।”
এমনভাবে বললেন যেন মৌরিকেই নিজ স্তন হতে মাতৃদুগ্ধ খাওয়াতে হবে। কথার সেই ইঙ্গিত মৌরির ভিতরে তীব্র অস্বস্তি আর অপমানের শিরশিরে আঘাত তৈরি করল। পাশে আরামে শুয়ে থাকা প্রতারক স্বামীর দিকে ফিরল না সে। তাকে নির্লিপ্ত দেখে মেজর নিজেই পাশ থেকে ফিডারটা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে বিছানায় রেখে দেন। অতঃপর উপুড় হয়ে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে থাকেন। দৃষ্টি মা মেয়ের দিকে।
মৌরি হাত বাড়িয়ে ফিডার নেয়। উষশী তখন খেলছে তার বুকে মাথা রেখে। মুখে নানান ‘এয়াআআ’ সূচক শব্দ। কখনো ‘মাম ম্মা, আমাআ পা’ শব্দ করছে। মৌরির গলার চেইনটা তার খেলার বস্তু। মুখে ফিডার লাগিয়ে দেয় মৌরি। উষশী খেলায় মনোযোগ রেখেই ‘চুক চুক’ শব্দ করে টেনে নিল অল্প করে।
সময় গড়াল। উষশী খেলছে। মৌরি আনমনে তার গাঁ ঝাকায় খাচ্ছেনা মনে হলে। অদ্ভুত এক টান তৈরী হচ্ছে মনে; অথচ এই বাচ্চা সম্পর্কে কিছুই জানে না সে, নামটাও নয়। বিরোধাভাসের মতো লাগে। এই শিশুটির বাবা-ই তার জীবনটাকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। বাড়িতে কয়েক ঘণ্টা আগেও যার আগমণে অধীর অপেক্ষায় ছিল মৌরি, সেই লোকটা এখন তার দুঃস্বপ্নের কেন্দ্র। মৌরি বুঝতে পারছে, তার জীবনে বড় একটি ট্র্যাজেডি ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে। ভবিষ্যতে সব কিছু ঠিক হয়ে গেলেও, কিংবা সে এখান থেকে চলে গেলেও - এই কয়েক ঘণ্টার ঘটনাগুলো তার জীবনের ধ্রুবসত্য হয়ে থাকবে।
উষশী খেলতে খেলতেই হঠাৎ না খেয়ে খিলখিলিয়ে হাসল। ছোট্ট হাত দিয়ে গলা খামচে ধরল মৌরির। মৌরি নরম গলায় বলল,
_“মারবে নাকি মেয়ে?”
আদুরে কথায় অবুঝ উষশী আরও হেসে ওঠে, যেন তার জগতে দুঃখের কোনো অস্তিত্বই নেই।
মেয়ের কাণ্ড দেখে উমরানও নিঃশব্দে হাসেন। মা মেয়ের মুহূর্তটা ফ্রেমবন্দি করার উদ্দেশ্যে পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিতেই অসংখ্য ফোনকল ভেসে উঠল স্ক্রিনে। সেই সন্ধ্যায় বাড়িতে আসার পর থেকেই ফোন আসছিল সবার। কিন্তু মেয়ে কাঁদছিল বলে সময় পাননি। ঘুম পাড়াতে সময় সাইলেন্ট করে রেখেছিলেন। এরপর আর মনে ছিলনা। উমরান ফোন নিয়ে উঠে ব্যাল্কনিতে চলে যান। এত রাতে সবাই ঘুম থাকবে। তাই বোনকেই লাগালেন কল। রিসিভ হলো প্রায় সাথে সাথে,
_”কিরে ভাই, কি সমস্যা তোর? না কোনো ফোনকল, না মেসেজ, না নিজে রিসিভ করছিস আমি কল দিলে। কোনো আপডেটই দিচ্ছিসনা। আমরা মানুষ তো না কি? টেনশন হয়না?”
মেজর বোনের পরপর প্রশ্নে থেমে জবাব দেন,
_”রিল্যাক্স… ব্যস্ত ছিলাম উষিকে নিয়ে। আর ফোন সাইলেন্ট ছিল, তাই দেখতে পাইনি কল।” তার বোন একটু স্বস্তি পেল বোধ হয়।
_”তাই বল। আমি আরও কোনো বিপদ হলো নাকি চিন্তায় ছিলাম। উষি ঠিক আছে? ঘুমোচ্ছে নাকি?”
_”না, ঘুমিয়েছিল, আবার উঠে গেছে। এখন খেলছে তার মায়ের সাথে।”
_”হ্যাঁ। এবার ওর কথা বল… কি খবর শ্রেয়সীর? তোদের চিনতে পারছেনা এখনো? উষিকেও চিনল না?” চিন্তিত কণ্ঠ তার।
উমরান গাঢ় শ্বাস টেনে বলেন,
_”না, চিনতে পারেনি কাউকে। যা বুঝলাম, কিছুই মনে নেই আগের।”
_”তো তুই কিছু মনে করানোর চেষ্টা করেছিস? মনে করালেও চিনতে পারছেনা কিছু?”
_”কিছু মনে করাইনি। করাবোওনা এখন। ওর সমস্যাটা কোথায় এখনো সঠিক জানিনা। কেন আমাদের চিনতে পারছেনা কিছুই বুঝতে পারছিনা। ব্রেনে কোনো আঘাত লেগেছিল, নাকি ট্রমার কারণে মানসিক আঘাতে সব ভুলে গেল। কোনো আইডিয়া নেই। যাদের কাছে ছিল, তারা নাকি ওকে কখনো কিছু মনে করানোর চেষ্টায় করেনি। আর না তো মেমোরি ফেরানোর উদ্দেশ্যে কোনো ডক্টর দেখিয়েছে। তাই ওদের কাছেও কিছু জানতে পারিনি। ডক্টরের পরামর্শ ছাড়া আপাদত কিছুই জানাব না ওকে। মনে করাতে গিয়ে কোনো কারণে হেল্থের অন্য কোনো সমস্যা হলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।”
_”তাও ঠিক। কিন্তু ওর যদি কিছু মনে না-ই থাকে। তাহলে নিয়ে এলি কিভাবে? আই মিন, নিয়ে এলেও রাখলি কিভাবে? উষশী কার মেয়ে জানতে চায় নি?”
ব্যাল্কনির ফাঁক দিয়ে ভেতরে স্ত্রী কন্যার দিকে দৃষ্টি ফেলে মেজর বলেন,
_”জানতে চেয়েছে।”
_”তো? কি বলেছিস?”
_”বলেছি আমার মেয়ে।”
_”তারপর?”
_”ভুল বুঝেছে আমাকে। প্রতারণা করেছি এমনটা তার ধারণা।”
_”উষিকে কিভাবে দেখছে?”
_”ওকে ঠিকই ভালোবাসছে, আদর করছে। কাঁদছিল একটু আগে, ওর পাশে রেখে দিলাম। দেখলাম নিলো। আদর করল, শান্ত করল। এখনো ওর বুকেই উষি। আমাকেই ভুল বুঝেছে শুধু।”
উমরানের বোন দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
_”যায় হোক, ডক্টরের কনসার্ন ছাড়া এখন কিছু মনে করানোর চেষ্টা না করা-ই বেটার।”
_”হু… বাবা মা ভালো আছে?”
_”হ্যাঁ, সবাই ঠিক আছে। বাবাকে একটু আগে ঘুমাতে পাঠালাম। চিন্তায় ছিল।” থেমে ফোন কান থেকে সামনে এনে, দেখে আবার বলে,
_”আচ্ছা ভাই… এখন রাখছি। রাত তিনটা দেশে। তোরা এখনো জেগে। কি যে করছিস বউকে পেয়ে বাবা মেয়ে মিলে কি জানি… এবার ওকে একটু বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্বস্তি পাওয়ার মতো কিছু একটা বল। আর ঘুমিয়ে পড়। সাবধানে থাকিস।”
উমরান সম্মতি জানিয়ে ফোন কাটলেন। তবে বোনের একটা কথা কানে বাজল তার। বউ পেয়ে বাবা মেয়ে মিলে অনেক কিছু করে ফেলেছে এখন অব্দি। মেজর ঠোঁট চেপে ভাবলেন কথাটা। অতঃপর ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ভেতরে তাকান। বছরখানেক পর বউকে ফিরে পেয়েছে। ভালো কথা। কিন্তু আবেগে-তৃষ্ণায় আজই ওকে কাছে টেনে নেওয়া ঠিক হয়নি। একটু সময় নেওয়ায় যেত। তার উপর তখন বউয়ের শরীরে মেতে ছিল, কিছু কথা বলেও ফেলেছে ঘোরে থেকে। ভাগ্যিস মেয়েটা কানে তুলেনি সেসব।
___
উষশীকে বুকে নিয়ে আনমনে অনেক কিছু ভেবে নিয়েছে মৌরি। তখনো ভেবে চলেছে। উষশী কখনো ফিডার মুখে নিচ্ছে তো কখনো নিচ্ছেনা। এসবের মধ্যে তার মুখ থেকে অল্প সাদা দুধ মৌরির গলায় পড়ে, বেয়ে বুক অব্দি আসে। মৌরির সেসবে খেয়াল নেই। উষশী হাতের এক আঙ্গুলে তা স্পর্শ করে। তার নড়চড়ে চাঁদর সরে গেল। উন্মুক্ত হয় বুকের একাংশ। উষশী সাদা দুধের ফোঁটার ওখানে আঙ্গুল দিয়ে খেলতে খেলতে মাথা এগিয়ে অল্প করে মুখ বসিয়ে দেয়, ছোট্ট জিহ্বা দিয়ে স্পর্শ করে, মুখে নানান শব্দ তার।
ভাবুক মৌরি শিউরে উঠল। ঝট করে তাকায়। মেয়েটা এসব কি করছে? তার হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিক গতিতে কাপঁতে শুরু করেছে তখন। সরাতে গিয়ে বুঝল উষশী অকস্মাৎ বক্ষ বৃন্তে ছুঁয়ে দিয়ে তাতে মুখ বসিয়ে দিয়েছে। তুলতুলে গাঁ টা স্থির নেই, তবে মুখটা ওখানেই। স্তব্দ মৌরি আবার সরাতে গিয়ে বুঝতে পারল মেয়েটার দাঁতও উঠেছে অল্প করে। সুক্ষ ব্যাথায় চিনচিন করে উঠে বুকটা। মৌরি এমন পরিস্থিতিতে কি করতে হয় জানেনা। ভয় লাগছে তার, অস্বস্তি হচ্ছে ভীষণরকম। এমন কিছুর সম্মুখীন হতে হবে তা কখনো কল্পনাই করেনি সে। ভয়ে সরাল না। যদি দাঁতে কামড়ে দেয় সরাতে চাইলে? এমনিতেও ব্যাথা সারা শরীরে, ওখানটাই আরও বেশি। তার উপর এই মেয়ের কাণ্ড। মৌরি গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেল।
মেয়েটার বাবার আগমন থেকে কম কিছু ধকল যায়নি তার উপর। এখন নিজেও শুরু করেছে অ ‘সভ্যতা। ছোট্ট উষশীর কর্মকাণ্ডে মেজরের উপর রাগের ছাপ পড়লো। এই লোক এক দিনেই তার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। মেয়ে-মেয়ের বাবা - দুটোর চাপই সমান। এভাবে থাকা সম্ভব না। এমন ধোঁকার সম্পর্কে সে থাকতে পারবেনা।
কথাগুলো ভেবে মেজরের কথা মনে পড়তেই অকস্মাৎ থমকে যায় সে। জমে যায় যেমন আছে সেভাবে। লোকটা তার পাশে শুয়ে আছে। কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব মাত্র। খুব বুঝতে পারছে সে। কোনফাঁকে এসে শুয়ে পড়েছে খেয়াল করেনি মৌরি। সে আর ফিরে তাকায়না ওদিকে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে লোকটা ঘুমায়নি। তাদের পানেই চেয়ে আছে অ ‘সভ্যের মতো দৃষ্টি ফেলে। সে উষশীসমেত ধীরে চাঁদর গাঁঁয়ে তুলে অপরপাশ কাঁত হয়ে ফিরে যায়। মেজরের দিকে পিঠ করে শুয়ে থাকে উষশীকে বুকে রেখেই।
উমরান হাসলেন তার কাণ্ড দেখে। ভীষণ হাসি পাচ্ছে তার। তখন কল কেটে এসে শুয়ে পড়েছিলেন। মেয়েটা আপন ভাবনায় মশগুল ছিল। তাই বুঝতে পারেনি। সবটা দেখেছেন। উষশী কি কি করছে তা মৌরি খেয়াল না করলেও সে খুব খেয়াল করেছে। তাও থামায়নি। এতদিন পর মাকে পেয়েছে। যা মন চাইছে করুক। তাই মন দিয়ে দেখছিলেন। মেয়ের দুষ্টুমি আর স্ত্রীর কাণ্ড ভেবে আবার ঠোঁট চেপে হাসেন। মাথা নেড়ে বালিশে আরাম করে রাখেন মুখটা। পেছন থেকেই দেখতে থাকেন তাদের। মৌরি স্পষ্ট বুঝল মেজর হাঁসছে, আর দৃষ্টি তাদের দিকেই।
_______
_”আপনার মেয়েকে নিন।”
কোনো সাড়াশব্দ নেই। মৌরি এবার স্বামীর বাহুতে অল্প হাত ছুঁইয়ে ফের আওয়াজ তুলে,
_”আপনাকে বলছি, মেয়েকে নিন।”
উমরান ঘুমুঘুমু চোখদুটো খুলে তাকান। মৌরির বুকে একেবারে লেপ্টে আছে উষশী। সে ছাড়াতে পারছেনা। ছাড়ালেই উঠে যাবে মৌরি নিশ্চিত। তাই তার বাবাকেই দায়িত্ব গছিয়ে দেওয়া উচিত কার্য হবে।
_”উহ… হুম? কি বলছ?” উমরান স্ত্রীপানে দৃষ্টি ফেলে বলেন। কণ্ঠে ঘুমভাব স্পষ্ট।
_”বলছি আপনার মেয়েকে নিন। আমি উঠব। ওয়াশরুম যাবো। শাওয়ার নিতে হবে।”
ভ্রু টানটান করে তাকান উমরান। পরক্ষণে পাশ হাতড়ে ফোন নিয়ে স্ক্রিনে সময় দেখেন। ভোর পাঁচটা। তিনজনে ঘুমিয়েছেই সাড়ে তিনটার দিকে। ফোন রেখে গাঁ টেনে স্ত্রীর দিকে ঘেষে যান। উদরে হাত জড়িয়ে মিশিয়ে নেন বুকে, উষশীসমেত প্যাকেট হয়ে গেল তিনজন।
_”ঘুমাও, এত তাড়াতাড়ি শাওয়ার নিতে হবেনা শীতের মধ্যে।”
_”নিতে হবে।” মৌরির কণ্ঠে দৃঢ়তা আর জেদ। গাঁঁয়ে লজ্জ্বার আবরণ বলতে আছে শুধু চাঁদরটা। সেই চাঁদরে আবার তার সাথে ঢুঁকে আছে এরা দুজন। মিশে আছে তার সাথে। এতকিছুর পরেও সব এত সহজভাবে দেখছে লোকটা, মৌরির গাঁ জ্বলে যাচ্ছে ক্ষোভে। তার উপর গোসল করার কারণ দিয়ে এখন বলছে করতে হবেনা।
_”এত জেদ… গোসল ফরজ তা জানা আছে আমার। উষি সারারাত কাঁদে প্রায়সময়। বিগত দিনগুলোতেও রাতে ঠিকঠাক ঘুমায়নি আমি না থাকায়। এতদিন পর ভালোভাবে ঘুমোচ্ছে তোমার কাছে আরাম পেয়ে। এখন উঠলে ওর ঘুম ভেঙে যাবে। শাওয়ার নিয়ে এসে আর আরাম পাবেনা তোমার ঠাণ্ডা গাঁঁয়ে। আরেকটু সকাল হোক। দুজনে একসাথে শাওয়ার নেবে।” ধীমি কণ্ঠে কথাগুলো বলে কানের কাছে ঠোঁট ছোঁয়ান মৌরির।
মৌরির পিঠ তার বুকে। আর মৌরির বুকে উষশী। সে মেজরের কথাটা শুনে বুকে মেয়েটির দিকে তাকায়। নিষ্পাপ আদুরে মুখটা দেখে অমান্য করার ইচ্ছে জাগল না। বরং আনমনে তার গোলগাল মুখটাতে ঠোঁট ছোঁয়ায়। অতঃপর চোখ বুঝে নেয়। এত তাড়াতাড়ি স্নান করার ইচ্ছে তারও ছিলনা। উষশীর নড়চড়ে ঘুম ভাঙলে, অকস্মাৎ নিজেকে ঐ লোকের বাহুবন্ধনে দেখে সরে এসেছিল। অনেকক্ষণ এটা সেটা ভেবে সবার আগে তার ছোঁয়া মুছতে গোসল করার কথা মাথায় আসে। কিন্তু উষশীর মুখটার দিকে তাকিয়ে জেদ চাপা পড়ে গেল।