সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলো। মৌরি তার স্বামীর সাথে শ্বশুর বাড়ি এসেছে। মূল গেট পেরিয়ে গাড়িটা ভেতরে প্রবেশ করলো। থেমে গেলে নামলো দুজনে। আগে মেজর, পরে মৌরি। মেজরের সাথে তাদের সওদাগর বাড়ি যাওয়া অপরজন গাড়িটা পার্ক করতে নিয়ে গেলো। লোকটা মেজরের বন্ধু। গাড়িতে দুজনার কথোপকথন শুনে বুঝেছিল সে। পরবর্তীতে যখন পরিচয় করিয়ে দেয় তখন নিশ্চিত হয়।
গাড়ি থেকে নেমে সে মুগ্ধ নয়নে তাকায় বাড়িটার দিকে। চমৎকৃত নয়ন ফেলে আশপাশটা দেখে। ঢের সুন্দর প্রাচুর্যে ভর্তি একটা বাড়ি। সাদা রংটা খুব স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, মৌরি মনে মনে নিজের জন্য ঠিক যেমন ধরণের একটা বসতি কল্পনা করে, একেবারে তেমনই। কি আশ্চর্য!! এত পছন্দ হচ্ছে কেন সব? ঠিক যেন মৌরির মনে মনে ভাসনা করা একখানা ‘ফুলবাড়ি’।
সবচেয়ে বেশি অবাক হয়, যখন সদর দরজার সামনে কলিং বেল বাজিয়ে মেজরের সাথে দাড়াতে সময়, চোখ পরে কলিং বেলের পাশে ছোট্ট করে খোদাই করা ”ফুলবাড়ি” লেখাটার দিকে। মন প্রফুল্ল হলেও কাকতালীয় বিধায় হতবাক মৌরি নিজের বিস্ময় মেজরের কাছে প্রকাশ করেনা।
মিনিট দুয়েক পর কেউ একজন দরজা খুলে দেয়।
_”এসেছেন? উফ, এত কাঁদছে মেয়েটা। কোনোভাবে শান্ত করাতে পারছিলাম না। খাবার তো খাচ্ছেইনা।”
_”এখনো কাঁদছে নাকি? দাড়ান, আমি দেখছি।” মেজরের কপালে দুশ্চিন্তার রেখা, কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।
মৌরি বুঝে নেয় ফোনের সেই বাচ্চাটার কথা বলছে। কিন্তু বাড়িতে কি আর কেউ নেই? মেজরকেই দেখতে হবে? বাচ্চাটা কাদঁছে, বাবা-মা বা বাড়ির আর কেউ কি একটু আদর দিয়ে শান্ত করতে পারেনা? সেই কখন লোকটা আসবে বাইরে থেকে, ততক্ষণ একটা বাচ্চা এভাবে কাঁঁদবে? আশ্চর্য!!
মৌরির এক হাত তখনো তার স্বামীর হাতে বন্দি। তাকে নিয়েই ভেতরে ঢুকে। কিন্তু প্রথমে চিন্তায় মৌরিকে খেয়াল না করলেও, দরজা খোলা নারীটির এবার তার দিকে নজর পরে।
_”ও কে?” মৌরিকে ইশারা করে মেজরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়েন তিনি।
মেজরের কপালে তখনো ভাঁজ; বাচ্চাটা কাঁদছে তাই শান্ত নেই নিজেও। নারীটির কথা শুনে সেভাবেই জবাব দেয়,
_”মাই ওয়াইফ, উষি’স মাদার।”
নারীটি বিস্ফোরিত নেত্রে তাকায়।
_”আপনি আবার বিয়ে করেছেন?”
_”ডোন্ট শাউট রাইমা, উষি চিৎকার-চেঁচামেচি শুনলে ভয় পাবে।” শীতল স্বরে রাইমা নামের নারীটিকে চুপ করতে বলেন।
নারীটি হতবম্ব ভাব কাঁঁটাতে না পারলেও নিজেকে সামলে নেয়। উষি উচ্চ শব্দে ভয় পায়।
——
বাচ্চাটির বয়স কত হবে? এক বছর বা তার কাছাকাছি; এর বেশি হবেনা।
মেঝেতে বাচ্চাদের একটি ছোট চেয়ার বসিয়ে উমরান তাওসিফ নিজের ক্রন্দনরত কন্যাকে তুলে বসালেন। এই মুহূর্তে তার মধ্যে আর মেজর মেজর ভাবটা লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। শুধু আর শুধু মাত্র একজন পিতা। যার চোখে মুখে মেয়ের জন্য মমতার ছাপ স্পষ্ট। এক হাত দিয়ে বাচ্চার কোমর আগলে তার স্থিতি নিশ্চিত করেন, যাতে হেলে না যায়। অন্য হাতে চামচ। চামচে দুধ আর নরম খিচুড়ি নিয়ে কন্যার মুখের কাছে ধরলেন।
_”মাম্মা, টেক দিস।”
_”উম মা মা” আধো আধো কণ্ঠে কিছু বলতে মুখ খুলেছিল। তার পিতা এই ফাঁকে মুখে খাবার ঢুকিয়ে দেয়। উষি অল্প করে খেতে খেতে টলমল চোখে হেসে উঠে রিনঝিন শব্দ করে। চোখ ভেজা থাকলেও পিতাকে কাছে পেয়ে আর কাদছেনা।
_”নাও মাম্মা, মাই প্রিন্সেস! আরেকটু… এই তো শেষ!!”
উষি খিচুড়ির চামচ টেনে নিলো, কিছুটা মাটিতে পড়ে গেল। উমরান তাওসিফ হালকা হাসেন। এক হাত দিয়ে কন্যার ছোট্ট হাত ধরে খেতে সাহায্য করলেন। দুধের ফিডারটাও পাশে রেখে মাঝে মাঝে চুমুক নেওয়ার সুযোগ দিলেন।
_“সী? পারফেক্ট! ইউ’র ইটিং সো ওয়েল মাই গার্ল। ওয়ান মোর স্পুনফুল, ওকে?”
উষি খিলখিল করে হাসে, নানান অসংলগ্ন শব্দ করে খিচুড়ি আর দুধের সাথে খেলতে খেলতে ফেলে দিলো। উমরান তাওসিফ চুপচাপ, শান্ত হাতে সামলে নিলেন, মনে হলো যেন অভ্যস্ত এসবের সাথে। এক হাতে বাচ্চাকে ধরে রাখছে, আরেক হাতে খাওয়াচ্ছে, কোনো অভিজ্ঞ মায়ের মতো, এতটাই নিখুঁত যে মনে হচ্ছে এই কাজে তিনি পুরো জীবন ধরে অভিজ্ঞ।
খাওয়ানোর পর বাচ্চার চুল, ভেজানো কাপড়, মুখ-মুখোশ, সব এক এক করে পরিষ্কার করে দিলেন। রাতের এই মুহূর্তে, একা হাতে সব সামলাচ্ছেন। খাওয়ানো, পরিচর্যা, আদর -সবই।
মৌরি বিছানায় যন্ত্রমানবের মতো স্থির হয়ে বসে সবটা দেখলো। বাহিরটা দেখে তার ভেতরের অনুভূতি বোঝা মুশকিল, তবে ভালো কিছু চলছেনা তার মন মস্তিষ্কে।
বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে তার দোলনায় আস্তে করে সাবধানে শুইয়ে দেন পিতা। তারপর ‘শুউ শুউ’ শব্দ করে হাত বুলিয়ে দিলেন, যাতে উঠে না যায়। কন্যা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে নিশ্চিত হয়ে উঠে আসেন। মৌরিকে পাথর মূর্তি হয়ে বসে থাকতে দেখে বলেন,
_”মৌরি! আপনাকে ড্রেস বের করে দিয়েছিলাম। ফ্রেশ হয়ে নেন নি এখনো।”
_”কি ছিল এসব?”
উমরান মৌরির থমথমে কণ্ঠে একটু থেমে যান, এতক্ষণে সবটা মাথায় খেলে যায় তার। মেয়েটা কাদঁছে শুনে চিন্তা আর উৎকণ্ঠায় অন্য কিছুতে মনোযোগ ছিলনা। তবে মেয়ে মাত্রই ঘুমিয়েছে। এই মুহূর্তে কোনো আলাপ-আলোচনা, কিংবা কথা কাটাকাটি চান না তিনি। তাই শান্ত কণ্ঠেই বলেন,
_”কাল কথা বলি আমরা? এখন উষি ঘুমাচ্ছে, চিৎকার চেচামেচি কিংবা যেকোনো উচ্চ শব্দে ও ঘুমাতে পারেনা।”
_”ডিভোর্সি, বিপত্নীক, নাকি বহু বিবাহ?”
_”এমন কিছুই না, আপনি ভুল বুঝছেন। আমি কাল বলছি আপনাকে সব।”
_”বাচ্চাটার বাবা কে?”
মৌরিকে থামতে না দেখে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলেন উমরান,
_”আমি”
_”আপনি আবার বিয়ে করেছেন? -এই কথার মানে কি?” মৌরি তার স্ত্রী শুনে রাইমা এই কথায় বলেছিল বাইরে, উমরান আবারও শান্তভাবেই জবাব দেন,
_”আগে একবার বিয়ে করেছিলাম।”
_”আমাকে ঠকানোর কারণ?”
_”ভুল ভাবছেন, কাল আপনাকে সব খুলে বলছি। আজ একটু শান্ত থাকুন…… প্লিজ।”
মৌরির শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে। কান লাল হয়ে উঠেছে রাগে।
_”আমার পরিবার, আমার বাবা এসব জানলে আপনি পার পেয়ে যাবেন ভেবেছেন?”
উমরান কপালে ভাঁজ ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকান, তাকে ভয় দেখাচ্ছে।
_”পাবো না?”
মৌরি এদিক ওদিক তাকায় অস্থির ভঙ্গিতে, নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টায়। শেষে না পেরে বলে,
_”আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে এখান থেকে চলে যান, নয়তো আমাকে খালি কোনো রুম দেখিয়ে দিন, প্লিজ। আমি খারাপ কিছু করে ফেলবো, আমার সামনে থেকে চলে যান আপনারা।”
উমরান অশান্ত মৌরিকে দেখে তার কাছে আসতে চান। তবে কি ভেবে থেমে গেলেন, একপলক বিছানার পাশে ঘুমন্ত কন্যার দোলনার দিকে তাকান। তারপর দরজার কাছে গিয়ে রাইমাকে ডাক দেন নিচু স্বরে। রাইমা নামের মাঝবয়সী নারীটি এসে মেজর উমরানের কথায় আস্তে ধীরে ঘুমন্ত উষিকে নিয়ে চলে যান। উমরান তারা চলে গেলে দরজা লাগাতে যায়।
_”আপনিও চলে যান, আপনাকে আমার সহ্য হচ্ছেনা।” হাপাচ্ছে মৌরি, গাঁয়ে থাকা দুপাট্টাটির কিছু অংশ কাঁদে, কিছু অংশ নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
উমরান দেখেন তাকে। কিছু না বলে দরজাটা লাগিয়ে তার কাছে আসেন।
_”শান্ত হোন, আমি আপনাকে কাল সব বলবো। এত উত্তেজিত হবেন না।”
মৌরির মাথা কাজ করছেনা। কি বলা উচিত, কি করা উচিত -কিছুনা। অতি রাগ, উত্তেজনা, অস্থিরতায় সে হঠাৎ কেদে উঠলো। সবকিছু জালিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার, মেজরকে কিছু করে দিতে ইচ্ছে করছে। কিছুই করতে না পেরে খুব কাঁদলো মৌরি।
লোকটা তাকে এভাবে ঠকালো? বিয়ে করেছিল আগে, একটা বাচ্চা আছে। তাও কতো সহজে না সেদিন বলেছিল তার উপর বিশ্বাস রাখতে, তাকে বিশ্বাস করে হাত ধরতে। সারাজীবন নাকি তাকে আগলে রাখবে, ঐ হাত আর ছাড়বেনা। কি আত্মবিশ্বাস ছিল লোকটার চোখে মুখে তখন!! এভাবে ঠকাতে পারলো? এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে মানুষ মানুষকে ঠকাতে পারে? আর সে? সে বোকার মতো ঐ অপরিচিত লোকটার নামে কবুল পড়ে ফেলেছিল। কি বোকা সে! এই লোকের পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে দুবার না ভেবে। ঠকে যাওয়া একজন নারীর হাহাকার যেমন হয়, ঠিক তেমন করুন শুনাচ্ছে মৌরির কান্না। নিজের উপর রাগ লাগছে তার। জীবনটা এত নাটকীয় হয়ে উঠলো কবে?
ঘণ্টা খানেকের মতো কাঁঁদতে কাঁঁদতে যখন কিছুটা শান্ত হয়, থেকে থেকে কেপে উঠে -তখন গিয়ে তাকে পূর্ণ মনোযোগে দেখতে থাকা মেজর মুখ খুলেন,
_”এভাবে কাদার কি আছে?”
মৌরি ধীরে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। টলমল চোখ, অতি কান্নার ফলে চোখের পাতা ফুলে গেছে। নাক লাল হয়ে এসেছে। ঠোঁট দুটোও কাপঁছে তিরতির করে। প্রতারক লোকটাকে দেখে মৌরি; ক্লান্ত তার চাহনি। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। কিভাবে একটা মেয়েকে এমন বাজেভাবে ঠকিয়েও নির্লিপ্ত এই মানুষটা। ক্লান্ত -মৌরির শ্বাস-প্রঃশ্বাস আর চোখের চাহনি। পলক ফেলে আরেকবার তাকাতে তাকাতে নিজেকে প্রতারকটার বুকে আবিষ্কার করে। তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন উমরান। বুকে ঠায় দেন। আগলে নেন নিজের সাথে। মনে হলো অনেকদিনের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। মৌরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়না। নিঃশব্দে পরে থাকে একটা প্রতারকের বুকে। বেশ অনেকক্ষণ পরে থাকলো মৌরি সেথায়। এর মধ্যে তার মাথায়, গালে, কপালে কতশত চুমু একে দিয়েছে লোকটা; মৌরির সেসব হিসেব নেই।
_”কাল বলছি সব। এত কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই, ইউ আর দা ওয়ান এন্ড অনলি। তাছাড়া এর চেয়ে বেশি কষ্ট নিয়ে দিনের পর দিন পার করেছি আমরা বাবা-মেয়ে, এই সামান্যতে হাপিয়ে গেলে চলবে?”
মৌরি কোনো জবাব দিল না। উমরান তাকে আরও কিছুক্ষণ আগলে রাখেন। মনে হচ্ছে মেয়েটাকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলতে চায়। কিছু সময় পর নিজের তৃষ্ণা নিবারন করে তাকে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেন। বাইরে যান, মৌরির জন্য খাবার নিয়ে কয়েক মিনিটের ভেতর আবার ফিরে আসেন। মৌরি তখনও চুপচাপ বসে আছে। নিঃশব্দ, নিরুত্তাপ সে। উমরান তাকে খাইয়ে দেন। খাওয়া শেষে সব ঠিকঠাক করে মৌরির কাছে আসেন,
_”রাত হচ্ছে। আসুন, ফ্রেশ হয়ে নিন।”
মৌরি সাড়া শব্দ করেনা, একদৃষ্টে বিছানার সফেদ চাঁদরে চোখ রেখে বসেই থাকে। কি চিন্তা করছে কি জানি!
উমরান ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস ফেলে মৌরির জন্য বের করে রাখা কাপড়গুলো নিয়ে তার কাছে বসেন। বেডসুইচ টিপে লাইট নিভিয়ে দেন কোনো কথাবার্তা ছাড়া। মৌরিকে আবার কাছে টেনে নেন। একে একে পড়নের ভারী পোশাকগুলো খুলে ফেলেন। মৌরি একবার হাত ধরে আঁটকেছিল, কিন্তু উমরান তা উপেক্ষা করে যান।
_”ডিভোর্সি, বিপত্নীক, নাকি বহুগামী পুরুষ -বললেন না এখনো।”
_”আজ রাতটা স্বামী ভাগের যন্ত্রণা নিয়ে কাটান, কাল বলছি।”
পোশাক পরিবর্তন করিয়ে দিয়ে তাকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়েন উমরান। তার চোখে শান্তির ঘুম নামলেও নামতে চাইছেনা মৌরির চোখে। সেদিনের সবকিছু ভাবলো সে। প্রতিটা মুহূর্ত মনে করলো। প্রতিটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, প্রতিটা কথা; তারপর আজ যা দেখল-শুনল-বুঝল। সবশেষে সেই একটা কথায় আসলো মৌরির,
_”প্রতারক”
_”ভুল ভাবছেন।”
লোকটা জেগে আছে, মৌরি ভেবেছিল ঘুমিয়ে পড়েছে। তার বিরবির করে উচ্চারণ করা শব্দটা শুনেছে। আবার উত্তরও দিলো। এত বড় একটা প্রতারণা করেও শুরু থেকে লোকটা কি নির্বিকার! কোনো অনুশোচনা, অনুতাপের রেশটুকু নেই। নিরুত্তাপভাবে তাকে বুকে আঁটকে রেখে শুয়ে আছে। পুরো একটা মাস যে মানুষটার জন্যে তড়পেছে দিনের পর দিন, সে এতটা অনুভুতিহীন, এতটা বিবেকবর্জিত হবে মৌরি ভাবেনি। তার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে। মৌরির চোখের পানিতে মেজরের বুক ভিজে যাচ্ছে। শেষে আর না পেরে মৌরিকে সরিয়ে উঠে বসেন, বিছানায় পিঠ ঠেকে মৌরির। কি হলো টাহর করবে তার আগে নিজের অতি সন্নিকটে উমরানকে দেখতে পায়। তার গাঁয়ের উপর উঠে এসেছে। চোখ মুখ কঠোর। দুয়েক সেকেন্ডের মতো কঠোর দৃষ্টিতে তাকে চেয়ে অকস্মাৎ তার অধরে অধর মিলিয়ে দেন। পিপাসুর মতো তার দু ঠোঁটের স্বাদ নেন, তারপর তার গাল-কপাল-চিবুক-ঘাড় কোনোটাই বাদ রাখেন নি। ভালোবাসার রুক্ষ ছোঁয়া দেন।
_”একটা বছর, পুরো একটা বছর দিন রাত আমরা বাবা মেয়ে তোমার জন্য তড়পেছি শ্রেয়সী, অথচ তুমি আমাদের ভুলে বসে আছ, তার বেলা কিছুনা?”
মৌরি না তার স্বামীর ‘তুমি’ ডাক আর ভিন্ন নামে সম্বোধন শুনলো, আর না তার বলা কথাগুলো কানে তুললো। সে নিজের থেকে প্রতারক লোকটাকে দূরে সরাতে ব্যস্ত। মেজরকে ক্রমাগত ঠেলছে সে দূরে সরাতে। কিন্তু সুঠামদেহী ভারী লোকটাকে এক ইঞ্চিও সরাতে পারলনা।
_”সরুন বলছি…”
উমরান তাওসিফ হঠাৎ দমিয়ে নেন নিজেকে। মানুষ সঠিক হলেও, রাগ অভিমান প্রকাশের জন্য সময় সঠিক নয়। নমনীয় করে তুলেন দৃষ্টি। তাকে দূরে সরাতে প্রচেষ্টারত স্ত্রীর মুখখানা দেখেন। কিন্তু হঠাৎ আবার জেদ উঠে তার মনে। পা দিয়ে পা আঁটকে নেন স্ত্রীর। কপালে, গালে, নাকে, ঠোঁটে সারা মুখে আবার রুক্ষভাবে ঠোঁট ছোঁয়াতে থাকেন ক্রমাগত।
_“ছাড়ুন প্রতারক লোক, ফ্রড কোথাকার…”
মেজর তার ঠোঁটে আবার হামলা চালান। একেবারেই ছাড় দেন না। মুখে প্রকাশ করতে না পারুক, যে ভাষায় সে নিজের ভেতরের জ্বালাটুকু মেটাতে পারবে। স্ত্রীও মানসিক বিভ্রান্তিতে পড়বেনা, অবুঝ থাকবেনা- সে ভাষাতেই প্রকাশ করলেন নাহয়। তারপর ধীরে ধীরে নিচে নামেন। গলায় কষা ওষ্ঠের ছোঁয়া দেন ক্রমাগত। ভিজে যায় মৌরির সমগ্র গ্রীবাদেশ। ধীরে পেটের দিকে নেমে আকস্মিক থেমে যান। চেহারার ভঙ্গিমা পাল্টে যায়, স্নেহ ফুঁটে উঠে সেথায়। বছর খানেক আগের প্রসব বেদনায় কাতর নারী চিৎকার কানে ভাসে, হস্পিটালে অপারেশন থিয়েটারের লাইট জ্বলছে-নিভছে, বাইরে মাথাভর্তি দুশ্চিন্তা নিয়ে বসে আছে সবাই -বছর খানেক আগের দৃশ্যখানা মনে করে আনমনে উমরান মৌরির উদর হতে পড়নের কাপড় সরিয়ে নেন, পাজামার ফিতেটাও খুলে নেন ধীরে। পোশাক সরিয়ে নাভির নিচে কাঁটা দাগটা দেখেন। মন ভরে দেখে চোখের তৃষ্ণা মেটান। হাঁলকা হাতে ছুঁয়ে দেন, ঠোঁট ছুঁইয়ে বেশ কিছুক্ষণ তার নিচে অল্প করে মাথাটা ফেলে রাখেন। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দগুলো কারো কানে গেলে ঠিক বুঝে যাবে তাতে কতখানি প্রশান্তি আছে।
কিন্তু যার বোঝা দরকার সে? মৌরি কি আদৌ বুঝল?