হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ১৫

🟢

শ্রেয়সী আর তার মেয়ে উষশী - দু’জনেই কিছুটা সুস্থ তখন। শ্রেয়সীকে খুব সাবধানে থাকতে হয়। ডাক্তারের দেখা-শোনা শেষে মা-মেয়েকে একদিন পরেই রিলিজ দেওয়া হয়েছিল। বাড়িতে ফিরে স্বামী, শ্বাশুড়িসহ প্রত্যেকে যত্নে-সেবায় ভরিয়ে তুলেছে তাদের দিন। ছোট্ট উষশীকে ঘিরে কোয়ার্টারে উৎসবের হাওয়া। খেলনা, বাচ্চাদের নরম জামাকাপড়, রঙিন ঝুনঝুনি - সব মিলিয়ে তাদের ফ্ল্যাটের দৃশ্যও একেবারে বদলে গেছে। আশ্রমে, সেনানিবাসে আর পুরো কোয়ার্টারে মিষ্টি বিলি হয়েছে। উষশীর আগমনে সবাই আনন্দ ভাগ করে নিলো।

কারণবশত ঝামেলায় যাতে না পড়তে হয়, তাই কাগজে কলমে শ্রেয়সী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে জেনে সে সময়েই বয়স বাড়িয়ে ফেলেছিলেন কর্নেল সাহেব। সরকারি দায়িত্বে থাকা একজন মানুষের কাছে যা একেবারেই নিন্দনীয় কাজ। মাঝে এই নিয়ে সেনানিবাসে গুঞ্জন উঠেছিল। অফিসারেরা শ্রেয়সীর বিয়ের বিষয়ে জেনে মিটিং ডেকেছিলেন উমরানকে নিয়ে। যা ঘটেছে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু কর্নেল কিবরিয়া নিজের অবস্থান ব্যবহার করে বিষয়টা চেপে দেন। উপরমহলের নির্দেশে মিটিং বন্ধ হয়ে যায়। দেখানো হয় - ডকুমেন্ট অনুযায়ী শ্রেয়সী আন্ডারএজ নয়; পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শুরু থেকে তার সবরকম ডকুমেন্টে বয়স বাড়ানো হয়েছে। অথচ অফিসাররা জানে এসব সাজানো। তবে উপরমহল থেকে মিটিং দাবিয়ে দেওয়ায় পুরো বিষয়টা সেখানেই থেমে যায়। অথচ আসল ঘটনা পুরোপুরি ওপেন সিক্রেট।

তখন এও জানাজানি হয় শ্রেয়সী অন্তঃসত্ত্বা। মেজর উমরান তাওসিফের সন্তান গর্ভে তার। সাথে শ্রেয়সীকে মেজর উমরান ভালোবেসে বিয়ে করেছে তাও জানল সকলে শাহীন-দিহানদের বদৌলতে। কর্নেল সুলেমান আর তার ছেলের হাতে যে শ্রেয়সীর মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, এটা যেহেতু জানা কথা সেনানিবাসের প্রত্যেকের কাছে। তাই উমরানের এই বেপরোয়া সিদ্ধান্তকেও কেউ কেউ অবুঝ প্রেমের জেদ বলে ধরে নিলো।

তবে এসব নিয়ে আইনি ঝামেলা যাতে না হয়, তা নিয়ে কর্নেল সাহেবকে কম বেগ পোহাতে হয়নি। ক্যারিয়ারে প্রথম এমন বেয়াইনি কাজ করলেন, আবার ধামাচাপা দিতে ক্ষমতা ব্যবহার করলেন। সেদিন উমরানের জেদ আর অবুঝপনায় সায় দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলো। কিন্তু শ্রেয়সীর নিরাপত্তার জন্য সায় না দিয়ে উপায় কি ছিল? কর্নেল সুলেমান কেমন ডেঞ্জারাস মানুষ তার প্রমাণ বিয়ের অনেক আগেই দিয়েছিল উমরান। তার আসল রুপ জেনে নিয়েছিল কর্নেল, এমন অবস্থায় রাওফানের শ্রেয়সীকে নিয়ে ঝামেলা - সব মিলিয়ে শ্রেয়সীর জন্য ঝুকিপূর্ণ কিছু করতে পারে তারা বাবা ছেলে, এই আশঙ্কা করছিলেন নিজেই। সুলেমান সাহেব তার ছেলে শ্রেয়সীর প্রতি আগ্রহী, এ কথা যখন জেনেছে। তখন সে সুযোগ হাতছাড়া করত কেন? ছেলের অন্যায় শুনে ক্ষমা না চেয়ে বরং শ্রেয়সীকেই চেয়ে বসেছিল -এ থেকেই স্পষ্ট তার লোভী মনোভাব।

মূলত রাওফানের চেয়ে বেশি কর্নেল সুলেমানের ভয়েই শ্রেয়সীকে তুলে দিয়েছিলেন উমরানের হাতে। আর এই বিষয়ে অবগত বাকি দুই অফিসার আপত্তি দেখিয়েও উমরানের জেদের কাছে হার মেনেছেন। শ্রেয়সী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে উমরানের উপর নারাজ ছিলেন কর্নেল কিবরিয়া, তার উপর সেনানিবাসে প্রকাশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এই ছেলের কারণে। কিন্তু নাতনির মুখ দেখে ভুলে গেলেন সব।

উমরান ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ভর্তি করিয়েছিল শ্রেয়সীকে। সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম কড়া ধরণের হয় জানা কথা। তবে কর্নেল কিবরিয়াকে এখানেও ক্ষমতা দেখিয়ে শ্রেয়সীর জন্য নিয়মে ছাড় আনতে হয়েছে।

__

ডেলিভারির পর সময় কেটে গেল এক মাসেরও বেশি। শ্রেয়সী ঘুমোচ্ছে, আর তার দুই অবুঝ বাচ্চা -’উষশী আর পুঁই’ খেলছে। তারা দুজন এখন সঙ্গী। দুজনেরই ভাষা - বাচ্চামি, খিলখিল, আর সুরেলা শব্দে ভরা। দোলনায় শুয়ে থাকা ছোট্ট উষশী যখন হাত-পা নাড়িয়ে “উ… আ…” শব্দ করল, পুঁই তখন খাঁচার ভেতর ডানা ঝাপটে উঠল ছোট্ট সঙ্গীর সাড়া পেয়ে। শ্রেয়সী মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে সময় যা যা কথা বলে, যত গান শোনায়, যত আদর করে ডাক দেয় - সবই হুবহু মুখস্থ পুঁইয়ের।

উষশীর দোলনা একটু দুলে উঠতেই পুঁই চিকন মিষ্টি স্বরে বলে ওঠল,

“উষী… উষী… ভালোবাসি…”

অবুঝ উষশী ‘উআ’ শব্দ করে। বাচ্চা বাচ্চা চোখ দুটো চিকচিক করছে। কেদে-রেধে শান্ত হয়েছে একটু আগে।

“উ… আ… আ…” মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে শব্দ করছে সে।

উষশীর সেই ডাকে পুঁই আবার পেখম ঝাপটায়।

“ভালোবাসি… ভালোবাসি… উষী… উষী…”

উষশী মুখের বৃদ্ধাঙ্গুল বের করে আবার তীক্ষ্ণ কণ্ঠে _“উ আআইয়া” শব্দ করে উঠল। পুঁই গলা নামিয়ে একটু নরম স্বরে বলল,

“উষী ইসু? উষী কী চায়?”

উষশী দুই হাত তুলে নিজের ভাষায় বলল,

“আ… আআ… উ -উহ!”

পুঁই সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি ভুলভাল অনুকরণ করল,

“আ-আ… পুঁই আছে! উষী -নেই ভয়!”

উষশী হাত বাড়িয়ে পুঁইয়ের দিকেই তুলে। পুঁই সেই ছোট্ট আঙুল দেখে বলল,

“মা-মা বলে… উষী সুন্দর… উষী আমার বন্ধু…” উষী পা ছুড়ে অর্থহীন শব্দ করলে পুঁইও ছন্দ মিলিয়ে সুর তুলল আবার,

“হাসো হাসো… উষী হাসো… ভালোবাসি… ভালোবাসি…”

এর মধ্যে অতি পরিচিত কারো ফিসফিস কণ্ঠে দুজনে থেমে যায়,

_”হয়েছে দুজনের অনেক কথা। রাতে তো কর না এসব ভালোবাসা বাসি। সেই মাম্মাকে জ্বালাও সারারাত। এখন ঘুমোচ্ছে সে, দুজনে ভালো বাচ্চা হয়ে থাকো দেখি……” উমরান দুপুরে লাঞ্চ সময়ে কোয়ার্টারে এসেছেন। রুমে এসে মেয়ের মাকে বিছানায় বেকায়দায় ঘুমোতে দেখে সবার আগে সন্তর্পণে ঠিক করে শুইয়ে দিলেন। কপালে চুমু আঁকলেন। তারপর মেয়ের দোলনার কাছে এসে দুই খেলার সঙ্গীকে ফিসফিস করে কথাগুলো বলেন।

মেজরকে দেখে পুঁই ডানা ঝাপটে উঠলো। কিন্তু মেজরের ইশারায় আর বেশি শব্দ করল না বাধ্য বাচ্চার মতো। উষশী পাপাকে চেনে বোধ হয়। মুখটা পরিচিত। তাই খুশি হলো বুঝি পাপার চেহারা দেখে। হাত পা ছড়িয়ে নড়ে উঠে। এক হাত অল্প একটু তুলে ‘উ আআ’ শব্দ করে। চাহনি পাপার দিকে। উমরানের মনে হলো মেয়ে তার কোলে উঠতে চায়। প্রথমবার মেয়ে কোলে আসতে চাইছে নিজে - এমনটা মনে হতেই খুব শান্তি লাগল তার।

হেসে সন্তর্পণে মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। পাশের টুলে থাকা পুঁই এর খাঁচাটিও নিলেন অন্য হাতে। তারপর চলে গেলেন রুমের বাইরে। এখানে বাচ্চাদের আদর জুড়ে দিলে শ্রেয়সীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটবে।

দীদুন আর তাহুরা চৌধুরী টেবিলে খাবার খাচ্ছেন। উমরান পুঁই এর খাঁচা একপাশে রেখে মেয়েকে কোলে নিয়েই বসে পড়েন খেতে।

_”শ্রেয়সী খেয়ে শুয়েছে?”

_”না, কোথায় খেল? উষীকে ফিডিং করিয়ে কোলে নিলো, ঘুম পাড়াতে পাড়াতে দেখলাম নিজেই ঘুমিয়ে গেল অথচ তোর মেয়ের ঘুমের নামগন্ধ নেই। পরে আস্তে করে নিয়ে দোলনায় রেখে দিয়ে আসলাম উষীকে। আর ডাকিনি ওকে। একটু ঘুমাক। উঠে খাবে। ঘুম ভাঙলে মাথা ব্যাথা করবে।”

মায়ের কথা শুনতে শুনতেই উমরান মেয়েকে একহাতে সুন্দরভাবে বুকে আগলে নিয়ে অন্যহাতে খাবার নিয়ে খেতে শুরু করেন। মেয়ে নিয়ে যেকোনো কায়দায় খাওয়ার অভ্যাস ভালোই হচ্ছে তার। অথচ আগে সবকিছু পরিপাটি অবস্থায় না থাকলে, নিজে পরিপাটি হয়ে বসতে না পারলে খেতেই পারত না। পিতৃত্ব এভাবেই পরিবর্তন এনে দেয় বুঝি!!

_”ছুটি নিয়েছিস?”

মায়ের প্রশ্নে উমরান মাথা নাড়িয়ে জবাব দেন,

_”হ্যাঁ নিয়েছি।”

_”কতদিনের দিলো?”

_”একমাসের আপিল করেছিলাম মা। একমাসেরই দিয়েছে।” গাঁ ঝাকিয়ে মেয়েকে অল্প নাড়াতে নাড়াতে বলেন। উষী তখন বাবার শাঁর্ট ভিজিয়ে দিয়েছে মুখের লালায়। হাতে সেখানটাই ধরে অকস্মাৎ ‘ইউউউ’ জাতীয় শব্দ করে উঠে, পা নাচিয়ে উঠে।

মেয়ে কোনো কারণে আনন্দ অনুভব করছে বুঝে প্রত্যেকে তাকালেন। উষশী একটু শব্দ করলেও আকর্ষণীয় লাগে তাদের কাছে। উমরান সেভাবেই গালে চুমু এঁকে দেন মেয়ের।

_”সবকিছু প্যাকিং শুরু করো মা আজ থেকে। শনিবারেই রওনা দেব।”

তারা চট্টগ্রাম যাবে। উমরানের নিজেদের বাড়ি। এখন শ্রেয়সী অনেকটা সুস্থ। উমরানের বিয়ে হলো, বাচ্চা হয়ে গেল। অথচ তার বউ বাচ্চা এখনো নিজেদের শ্বশুর বাড়ি, দাদা বাড়ির দেখা পেলোনা। এখানে আকিকা দেওয়া হয়েছে একবার উষশীর। নিজেদের বাড়ি যাবে এবার। সেখানে গিয়ে উষশীর আকিকাও হবে। সাথে শ্রেয়সীকে পরিচয় করানো হবে আত্মীয় স্বজনদের সাথে। মূলত উমরান তাওসিফের স্ত্রী-সন্তান উভয়ের জন্যই অনুষ্ঠানটি।

উমরান মেয়েকে তার দাদির কাছে দিয়ে স্ত্রীকে ঘুম থেকে তুলে খাবার খাওয়ালেন। ছোটকালে আধঘুম থেকে বাবারা যেভাবে তুলে খাওয়ায় বাচ্চাদের, আর বাবার রাজকন্যারা গাঁইগুই করে খায়। ঠিক সেভাবে। পার্থক্য শুধু, উমরান তার রাজকন্যাকে নয় বরং রাণীকে খাওয়াচ্ছে। শ্রেয়সী খাবেনা খাবেনা করেও খেয়ে নিলো। তারপর আবার উমরান নিজেই ঘুম পাড়িয়ে দিলেন মাথায় হাত বুলিয়ে। রাতে ভীষণ জ্বালায় মেয়ে। অনেক ধকল যায় দুজনের। শ্রেয়সীর একটু বেশি। ঘুমে তলিয়ে গেছে বুঝে সন্তর্পণে বিছানায় রেখে, চললেন মেয়ের কাছে। তাকে অল্পসল্প আদর করে দিয়ে চলে গেলেন ক্যাম্প।

সময় গড়ালো। উমরানের একটা পরিপূর্ণ জীবন আছে এখন। তার স্ত্রী-সন্তান। তাকে পূূর্ণতা এনে দিয়েছে যে, আর তার অংশ - তাদের সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আগে অবশ্য একবার আশ্রমে গেলেন শ্রেয়সীকে নিয়ে। আজকাল সেখানে আসা যাওয়া একেবারেই কমে গেছে আগের তুলনায়। শ্রেয়সীকে দেখে সবার মুখে হাসি ফুটলো। উষশীকে কোলে নিয়ে একেকজন আদর করে আশীর্বাদ দিল। সন্ধ্যার আগেই রওনা না দিলে পথ লম্বা হয়ে যাবে, তাই বিদায় জানিয়ে বের হলো তাহুরা চৌধুরী, শ্রেয়সী, উমরান আর উষশী। দীদুনকে দুদিন আগে কর্নেল সাহেব নিজের সাথে নিয়ে গেছেন। তিনি ছেলে আর ছেলের পরিবারের সাথেই যাবেন অনুষ্ঠানে। বের হয়ে আশ্রম ঘুরে সবার কাছে মা-মেয়ে আবার স্নেহ ভালোবাসা নিয়ে পাড়ি দিল চট্টগ্রামে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

__

রাস্তা তখন ফাঁকা। পাহাড়ি পথ ঘুরে ঘুরে নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। হালকা বাতাসে উষশী আছে মায়ের কোলে প্যাকেট হয়ে। শ্রেয়সী জানালার পাশে হেলান দিয়ে মেয়েকে দেখছিল, আর নানান কথা বলছিল মেয়ের সাথে। পাশে উষশীর দাদী। উমরান স্টিয়ারিং হাতে মাঝেমাঝে পিছনের আয়নায় তাকিয়ে তাদের দেখছেন। পুঁই পাশে খাঁচায় বসে আছে।

_”আমমম্মআ মায়া আআ আ!!” উষশী কোলে থাকতে চাইছেনা। কি চাইছে স্পষ্ট না। তবে শ্রেয়সী ধরে নিলো সামনে অর্থাৎ পাপার কাছে যেতে চাইছে মেয়ে।

_”পাপা ড্রাইভ করে…… যেতে পারেনা ওখানে। মাম্মা আছি না? দাদু আছে দেখ!!” মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে কোলে অল্প একটু ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে শ্রেয়সীর নানান কথা।

_”দিদিভাই… দাদু আসবে? আসো কোলে…… এই তো আসো সোনা। পাপ্পা ড্রাইভ করে। পাপা নিতে পারেনা। দাদুর কাছে এসো আমার লক্ষীসোনা।”

উষশী মুখ ফিরিয়ে নিল, সে কারো কোলে যাবেনা। মায়ের কোলেও থাকতে চাইছেনা।

_”বেশি বেশি দুষ্টু হইসে আমার সোনা। মাম্মার কথা শুনেনা, দাদুর কথা শুনেনা। খালি পাপ্পা। পুঁই পাখিকে কোলে নেব এবার থেকে মাম্মা। সে উষশীর মাম্মাকে ভালোবাসে হু। তোমার মতো না।” শ্রেয়সী কথাগুলো বলে নাটুকে ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নেয় উষশী থেকে।

মায়ের মেকি অভিমানী চেহারায় চোখ বুলিয়ে উষশী অকস্মাৎ ‘উইইউয়াআ’ জাতীয় শব্দ করে হেসে উঠে। তাকে হাসতে দেখে শ্রেয়সীও হাসে। আবার মেকি অভিমানী চেহারা বানিয়ে নাটক করল মেয়েকে বাবার কাছে যাওয়ার বায়না ভুলিয়ে রাখতে। উষশীও মাকে বারবার এক ভঙ্গি অনুকরন করতে দেখে মজা পাচ্ছে বুঝি!! এদিকে পুঁই পাখিও ডানা ঝাপটে সুর তুলছে তাদের সাথে।

তাহুরা চৌধুরীর চোখ লেগে গেল অল্প ঘুমে। মা মেয়ের খিলখিল হাসি শুনে উমরান গাড়ির লুকিং গ্লাসে তাকালেন। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে মেয়ের সাথে খেলতে থাকা স্ত্রীকেও মেয়ের কাছে বাচ্চা হয়ে ধরা দিতে দেখে। চোখ ফিরিয়ে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দেন।

সবকিছু শান্ত তখন। গাড়িও বেশ শান্তভাবে ড্রাইভ করছেন। সময়ের সাথে সাথে উমরান বুঝতে পারলেন কিছু একটা ঠিক নেই। গাড়ির ব্রেকফেল করেছে। করেছে? নাকি আগে থেকে করানো? - ভাবার মতো সময় বা মানসিকতা জাগল না উমরান তাওসিফের। প্রথমে কপালে ভাঁজ ফেলে আদৌ ব্রেকফেল করেছে ভাবনাটা সঠিক কিনা যাচাই করলেন স্টিয়ারিং চেপে। না…… ব্রেকফেল করা। সবার আগে ফোন দিয়ে কাউকে জানাতে দেখা গেল গাড়ির ব্রেকফেলের বিষয়টা। মেয়ের সাথে কথা বলতে থাকা শ্রেয়সী শুনলনা তা।

তখনও উমরান শান্ত। তবে কপালে গাঢ় ভাঁজ। একপলক আয়নায় তাকালেন। মা ঘুমাচ্ছে। আর তার স্ত্রী সন্তান তখনো আবোল তাবোল বকে নিজেরা নিজেরা হাসছে। পুঁই পাখি চুপচাপ। উমরানের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে দেখা গেল এক ফোটা। অর্থাৎ, উপরে উপরে শান্ত দেখালেও ভেতরটা ততটাই অস্থির। ক্রমাগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনার যথাসাধ্য চেষ্টা করল; হলো না।

_“শ্রেয়সী?”

_”হু?” মেয়ের থেকে মনোযোগ সরিয়ে স্বামীর ডাকে তাকায় সে,

_”উষীকে সুন্দর করে ধরো। মায়ের আরো কাছে যাও। শক্ত করে ধরে বসো।”

এভাবে বলায় শ্রেয়সীর কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছু একটা ঠিক লাগছেনা,

_”কি হয়েছে মেজর? কোনো সমস্যা?”

_”যা বলছি করো সোনা। উষীকে শক্ত করে ধরো। মাকে ডাকো।”

শ্রেয়সী ভয় পেয়ে ডাকল শাশুড়িকে। উমরান তখন গাড়ির বেপয়োয়া গতি নিয়ন্ত্রণে তীব্র চেষ্টায়। রাত হওয়ায় গাড়ি কম রাস্তায়। তবে আকস্মিক একটি ট্রাক সামনে থেকে দ্রুতগতিতে আসলো হর্ন বাজাতে বাজাতে। উমরান গাড়ি অন্যদিকে নিয়ে গেলেন ট্রাকের সামনে না পড়ার জন্য। কিন্তু অন্ধকারে দেখা না গেলেও ওপাশে অনেক গাছ, ধাক্কা খেয়ে কোনোভাবে গাছ পেরোলেই খাঁদ। গাছ পেরুলো না তারা। তবে জোরে ধাক্কা লাগায় গাড়িটা বাইরে থেকে কেমন মুচড়ে যেতে দেখা গেলো। গাছটা পুরোপুরি হেলে গেছে। ভেতর হতে তাদের চিৎকারের আওয়াজ এলো, বাচ্চার কান্নার আওয়াজ এলো, পাখির সুরেলা কণ্ঠ করুন শুনালো। জানালার পাশে থাকা মা মেয়ে গাড়ি কাত হয়ে থাকায় বাইরের দিকে হেলে যাচ্ছে। তার উপর জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে পুরোপুরি। বন্ধ করে দিয়েও লাভ হবেনা। তাহুরা চৌধুরী ছেলে বউ আর নাতনির গাঁঁয়ের উপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তার নিচে উষশী চাপা পড়েছে। শ্রেয়সী কাঁদছে। মেজরকে ডাকছে, যেন মাকে ধরে। তার মাথা বেয়ে র ‘ক্ত পড়ছে অবিরত। কিন্তু চিন্তা শাশুড়ি, আর মেয়েকে নিয়ে। উমরান স্ত্রী-সন্তান আর মাকে দেখলেন। একজনের উপর অপরজন চাপা পড়ছে। কিন্তু সিট বেকে যাওয়ায়, গাড়ির কাঁচ ভেঙে হাতে পায়ে ঢুকায় র ‘ক্তা ক্ত হয়ে পড়েছে উমরানের শরীর। সে পাখির খাঁচাটা কোনোভাবে বের করে বাইরে যথাসম্ভব সাবধানে আর ধীরে কোথাও ছুড়ে ফেলল। গাড়ি বেকায়দায় মুচড়ে যাওয়ায় ওপাশ থেকে চেয়েও আসতে পারছে না পেছনে পরিবারের কাছে। উমরানের মা অজ্ঞান হয়ে আছেন। গাড়ি বামদিকে হেলে থাকল। উমরান চিৎকার করে উঠলেন,

_“শ্রেয়সী, উষশীকে শক্ত করে ধরো! একহাতে সিট আঁকড়ে ধরো সোনা। কিছু হবেনা, আমি আসছি এখন। সিটটা কোনোভাবে ধরে রাখো প্লিজ। ছাড়বেনা কেমন? আমি আসছি।” সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বেকে যাওয়া সিট সরাতে সরাতে বলল সে।

শ্রেয়সী মেয়েকে বুকের সাথে চেপে ধরলো প্রাণপণে। পুঁই বাইরে খাঁচার ভেতর আতঙ্কে ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে।

_”মেজর… ভয় করছে। তাড়াতাড়ি আসুন।” একহাতে মেয়েকে আগলে রেখে অন্যহাতে সিটের মাথা আঁকড়ে ধরে বলে সে। পাহাড়ি রাস্তা হওয়ায় পাশে খোলা জানালার দিকে তাকালেই নিচে সবুজ বন জঙ্গল দেখা যাচ্ছে শুধু। আর কিছুনা। উমরান প্রাণপনে মাকে ডাকছে আর এপাশে আসার চেষ্টা করছে।

সময় গড়িয়ে গেল, উমরান তখনো চেষ্টারত। এদিকে শ্রেয়সী নিস্তেজ প্রায়। এক মুহূর্ত, দ্বিতীয় মুহূর্ত…… তারপর শ্রেয়সীর সিট আঁকড়ে ধরা হাত ছুটে গেল। কোনোরকম ব্যালেন্স করে মেয়েকে সিটের উপর দিয়ে গলিয়ে পেছনের সিটে অল্প করে ছুড়ে ফেলল। র ক্তা ‘ক্ত অচেতন তাহুরা চৌধুরীর সম্পূর্ণ ভার শ্রেয়সীর উপর। পেটে সেলাইয়ের জায়গায় খুব আঘাত লেগেছে তার। তাও প্রাণপণে মাকে ডাকছে। কথা বলছেনা কেন? মায়ের কি হলো!! আতঙ্কে বুক কাপঁছে তার। মেজর বারবার আরেকটু শক্ত করে ধরে রাখতে বলছে তাকে। কিন্তু শ্রেয়সী চোখে মুখে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছেনা। মাথায় গাছের আঘাত লেগেছে খুব জোরে। কপাল বেয়ে মাথা থেকে র ‘ক্ত পড়ছে টুপটুপ করে। কোথাও একটা ফে ‘টেছে সে বুঝতে পারছে খুব। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ দুটো খোলা রাখতে পারছেনা। সবকিছু অন্ধকার কেন? শ্রেয়সীর কান্না পেলো। সে কি ম ‘রে যাবে? বাবা-মায়ের কাছে চলে যাবে এত তাড়াতাড়ি!! উষশীর কি হবে তাহলে? বুকের দুধ খায় মেয়েটা এখনো। পৃথিবীতে এসেছেই তো সেদিন। মাম্মাকে ছাড়া কিভাবে থাকবে! মেজর… মেজর কি তাকে ভুলে যাবে? সব অন্ধকার দেখছে সে। মেজরের বারবার একটু শক্ত করে ধরার অনুরোধ কানে বাজল। কিন্তু রাখতে পারল না সে অনুরোধ। শরীর সায় দিচ্ছেনা। তলপেটে আর মাথায় তীব্র যন্ত্রণা তার, চোখ খুলতে পারছেনা। আস্তে আস্তে অচেতন হয়ে পড়লো। ভারসাম্য ছুটে গেলে গড়িয়ে পড়তে লাগলো ভাঙা জানালা দিয়ে নিচের দিকে। না কোনো চিৎকার, না তো কান্না… কোনো শব্দ হলো না। পড়ে গেল শুধু। বুকের ভেতর জমাট বাঁধা চিৎকার বেরিয়ে আসলো উমরানের।

_”শ্রেয়সীঈঈ…… এই, কোথায় পড়ে গেলে। শ্রেয়সীঈঈ।”

কেউ উত্তর দিল না। চারদিকে ঝাপসা অন্ধকার। বেশ কয়েকবার ডাকল। বেরুতে পারছেনা বাইরে কোনোভাবে। আর না এপাশে আসতে পারছে। বেশ অনেকক্ষণ ডাকল স্ত্রীকে। কিন্তু চুপচাপ নিস্তব্ধ চারদিক। ফাটা কাঁচের পাশে র ‘ক্ত গড়িয়ে নামছে। চাকার কাছে মাটি খানাখন্দ। ইঞ্জিনের ভেতর সাদা ধোঁয়া উঠছে। কপাল ফেটে র ‘ক্ত নামছে। মা অচেতন, শাড়ি পেচিয়ে যাওয়ায় কোনোভাবে ঝুলে আছে। উষশীর ক্ষীণ গোঙানি শোনা যাচ্ছে। খাঁচার ভেতর পুঁই উল্টে পড়ে আছে -কাঁপছে, বেঁচে আছে।

রাস্তার ওপারে কেউই টের পায়নি এখনো। নীচের খাদে নিস্তব্ধ বন আর ভাঙা গাড়ির ধাতব গন্ধ মিলেমিশে যেন মৃ ‘ত্যু-নীরবতা ছড়িয়ে দিয়েছে।

উমরান আরও কিছুক্ষণ শ্রেয়সীর নাম ধরে ডাকল চিৎকার করে। রাতের অন্ধকারে খোলা জায়গায় সেই চিৎকার বেজে বেজে তার কানেই ফিরে এলো আবার। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। কিছুসময় পর থেমে গেল। চেষ্টা করল না এপাশে আসার, আর না তো বাইরে বের হওয়ার উপায় খোঁজার। যে অবস্থায় আছে সেভাবেই পড়ে রইল। চোখ দুটো স্থির, গাড়ির সামনের ভাঙা র ‘ক্তাক্ত কাঁচগুলোতে। কানে উষশীর গোঙানি তখনও। একসময় তাও বন্ধ হয়ে গেল।

কিছুসময় পর অনেকগুলো গাড়ির শব্দ কানে এল। এম্বোলেন্সের শব্দ, পুলিশের গাড়ির শব্দ, ফায়ার সার্ভিস এসেছে। ঘটনাস্থল চিহ্নিত করে উদ্ধারে নেমেছে। কেউ একজন পাখির খাঁচাটি নিয়ে গেল। পুঁই পাখি দুর্বল অসহায় কণ্ঠে ‘উষী, পরী’ কে ডাকছে। উমরান চোখ বুজে নিলেন। র ‘ক্তাক্ত শরীরটি নিস্তেজ হতে দেখা গেল। একটু আগে যেভাবে প্রাণপণে বাচার চেষ্টা করছিল। তার কিছুই লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা তখন আর।

_____

স্থানঃচট্টগ্রাম

_“তুষার। তুমি কোন ধর্মের?”

_”হোয়াট?”

_”তুমি কোন ধর্মের তুষার?”

_”হোয়াট… হোয়াট কাইন্ড অব কোয়েশ্চন ইজ দিস মৌরি? আই মিন, তুমি এসব কেন জানতে চাইছ হঠাৎ?”

_”আমার দরকার তাই জানতে চাইছি? তুমি কোন ধর্মের তুষার?”

_”অফ কোর্স, আ'ম আ ক্রিশ্চিয়ান। তুমি হঠাৎ এই প্রশ্ন করছ কেন? এনিথিং রং বেইবি?”

একমন আতঙ্ক নিয়ে টাইপ করতে থাকা মৌরি তুষারের রিপ্লাইটা পেয়ে রুদ্ধশ্বাস ফেলে ফোনটা রেখে দিল। তুষার খ্রিষ্টান…… তার ভালোবাসার মানুষটা একজন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। মুসলিম ধর্মের নয়। অথচ সে এতদিন জানতইনা। কখনো ধর্ম নিয়ে কথায় উঠেনি তাদের মধ্যে এতদিন। মৌরি এখন কি করবে? কোথায় যাবে? কিভাবে এর সমাধান করবে?

তুষারকে খুব ভালোবাসে সে। মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। এখন ওকে ছাড়া কিভাবে থাকবে? কিভাবে কি করবে? এই মুহূর্তে তুষারকে খুব দরকার ছিল তার। খুব দরকার ছিল।

ভেতরটা অস্থির হলেও বাইরে থেকে সম্পূর্ণ নিস্তেজ মৌরি। পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে সে। আজ পর পর দু দুটো সংবাদ পেয়েছে। একটাও তাকে খুশি করার মতো সংবাদ নয়। যে ছেলেটাকে প্রাণপণে ভালোবেসে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছে। তার অংশ মৌরির ভেতরে। আবার মৌরির ভেতরে নতুন আসা সত্তাটির জন্মদাতা একজন বিধর্মী ছেলে। মৌরি এত ধাক্কা কিভাবে সামলাবে একসাথে? কার সাহায্য নেবে? সবকিছু ভাবতে গিয়ে ভেতরের অস্থিরতা বাইরে চলে এল। মনে হচ্ছে এখুনি দম আঁটকে ম ‘রে যাবে। খাটের পাশে ফ্লোরে বসে আছে সে। হাতের ফোনটা এলোমেলোভাবে কোথায় ছুড়ে ফেলেছে জানা নেই। মৌরির অস্থিরতায় শ্বাস আঁটকে আসছে।

সে আগের সব ভুল-দোষ-ত্রুটি পেছনে ফেলে নতুনভাবে বাঁচবে ভেবেছিল। কিন্তু তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তার পরিবার এসব জানলে মে ‘রে ফেলবে। বাবার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে। মা কষ্টে ম ‘রেই যাবে। বাইরে মুখ দেখাতে পারবেনা কেউ। ইতোমধ্যেই তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিল, সব শুধ্রে নিতে চেয়েছিল। তাহলে কেন এই বিপত্তি আসল? তার কি সুন্দর-সুস্থ জীবন পাওয়া হবেনা? সে নিজেকে শুধ্রে নেওয়ার যোগ্য না?

মৌরির চোখ যায় বিছানার পাশে দাদীর ওষুধের বক্সের দিকে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কিছুপল। তখনো তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসে সমগ্র দেহ কাপঁছে তার। আস্তে আস্তে হামাগুড়ির মতো করে ওষুধের বক্সের পাশে চলে যায়। ওখান থেকে এক পাতা ওষুধ নিল। নাম দেখল Amlodipine লেখা গাঁয়ে। দাদীর প্রেশারের ওষুধ। দুটো খেয়েছে শুধু। আরও বারোটা আছে। পাতাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। শুরু থেকে তুষারের সাথে নিজের সবটা আবার ভাবল। দেখা হওয়া, প্রণয়, সম্পর্কের শুরু, এঁকে অপরের প্রতি ভালোবাসা, ভালোবাসায় করা ভুল, আর সেখান থেকে আজ - সবটা ভাবল সে। ওষুধের পাতাটা থেকে একেক করে সব ওষুধ বের করে নিল। পাশে গ্লাস থেকে মুখে পানি নেয়, ওষুধগুলো সব একসাথে হাঁ করে মুখে পুরে।

_”আপু, এতক্ষণ কি করছ রুমে। বলেছি না তোমাকে বড়মা ডাকছে।”

ছোট বোন তূর্ণা বলতে বলতে রুমে আসে।

_”কি হলো? এভাবে দাড়িয়ে আছ কেন? চলো…… খেতে ডাকছে সবাইকে। বড়বাবা এসে সবাইকে ডাইনিং না দেখলে বকবে।”

মৌরি দৌড়ে ওয়াশরুমে যায়। মুখ থেকে সব ফেলে দিল গড়গড় করে। পানিসহ সবকিছু বেরিয়ে গেল। তূর্ণা বোনের কি হলো দেখতে পেছন পেছন ছুটে আসে। মৌরি সে আসার আগে ট্যাঁব ছেড়ে সবটা পরিষ্কার করে ফেলে।

_“কি হয়েছে আপু? তুমি কি অসুস্থ? খারাপ লাগছে?”

মৌরি গাঁয়ের উর্ণা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে শ্বাস টেনে বলে,

_”কিছু হয়নি, চল। দেরি হলে বাবা বকবে।”

বোনের সাথে চলে যায় খেতে। মৌরির বাবা ভীষণ কড়া ধাঁচের মানুষ। সবকিছু নিয়ম মতো চাই। তিনি খেতে নামার আগে বাড়ির প্রত্যেককে ডাইনিং এ উপস্থিত থাকতে হবে। বাচ্চারা না থাকলে বকা শুনে বউরা। তাই মৌরির মা-চাচিকে দায়িত্ব নিয়ে ডাকতে হয় সবাইকে।

মৌরি গিয়ে বসলো খেতে। তার বসার পর পরই বাবা আসে। সবাই খোশ মেজাজে খেতে শুরু করে। খেতে বসে কথা বলা তার বাবা চাচ্চুরা পছন্দ করেনা। কিন্তু তূর্ণা-মৃন্ময়ের জন্য এখনো এই নিয়ম কড়াকড়িভাবে প্রযোজ্য হয়নি; বাড়ির সবার ছোট বলে। তারা গল্প জুড়েই খাচ্ছে।

সবকিছু প্রতিদিনের মতো। মা চাচী সবাইকে বেড়ে দিয়ে খেতে বসেছে। চাচ্চুর সবার আগে খাওয়া শেষ হয়ে গেল। তূর্ণা-মৃন্ময়ের গল্পের শেষ নেই। কথায় কথায় আবার ঝগড়াও লেগে যায়, আবার ভালো হয়ে যায় নিজেরা, দাদী আস্তে ধীরে খেয়ে উঠল - সব আগের নিয়ম। শুধু মৌরির ভেতরটাই থমকে গেছে।

তুষারের সাথে তার পরিচয় ক্লাস টেনে থাকতে। তুষার তখন তাদের স্কুল থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে থাকা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি -টির অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মৌরিকে পছন্দ করতো সে। তার স্কুল আসা যাওয়া করার সময় দূর থেকে চোখাচোখি হতো প্রায় সময়। মৌরির ভালো লাগত সেসব। কয়েকমাস এভাবে গেল। তারপর স্কুলের বিদায় অনুষ্ঠানের দিন তুষার পথ আটকে দাড়ায় প্রথমবার। সে জানায় মৌরিকে ভালোবাসে। মৌরি কিছু বলেনি। তবে ভয় পেয়েছিল তুষারের এমন পথ আটলে দাঁড়ানোয়। কেউ দেখে নিলে, আর বাড়ির কারো কানে গেলে বিপদ হয়ে যাবে। বাবা মানুষটা ভীষণ কড়া তার। কিন্তু ভাগ্য ভালো মৌরির পরিচিত কেউ দেখেনি সেদিন। তুষার মৌরির নাম্বার চায়।

_”আম, আমার ফোন নেই।” মিনমিন করে জবাব দেয় সে।

_”বাড়ির আর নেই ফোন? তাদের কারো নাম্বার দাও। স্কুল শেষ করে ফেললে। কোন কলেজ না কোন কলেজ যাও এরপর। তোমার সাথে কথা না বলে, তোমাকে না দেখে তো থাকতে পারব না। বাড়ির যে কারো নাম্বার দাও প্লিজ। আমি যখন তখন ফোন দেব না। তুমি বললেই দেব প্রমিস।”

মৌরির মন-মস্তিষ্ক তখন নতুন নতুন কিশোরী আবেগে টইটুম্বুর। এই ছেলেটাকে তার ভালো লাগে। চোখের চাহনী একদম অন্যরকম। দেখতে গ্রিক পুরাণের দেবতাদের মতো। তার বয়সী বাকি পাঁচটা ছেলের চেয়ে ভিন্ন একেবারে। চুলের স্টাইল বলুক বা কথা বলার ভঙ্গি - সব ভিন্ন। চলাফেরাও সবার চেয়ে আলাদা।

লাজে রাঙা চেহারায় কোনোভাবে দাদীর নাম্বারটাই দেয় সেদিন মৌরি। তারপর তুষার যখন ধীরে বললো “আজ রাতে ফোন দিলে কি পাবো তোমায় মৌ?”

তখন তার ভেতর আবেগী প্রজাপতিরা গুড়গুড় করছিল। সে ইতিবাচক উত্তর জানিয়ে বান্ধবী অনামিকাকে নিয়ে চলে আসে।

অনামিকা তখন প্রথমবার তুষারকে খেয়াল করেছে। এই ছেলের সাথে বান্ধবীর ইটিশপিটিশ চলে সে জানত না। সেদিন জানল।

তুষার কল দিল। মৌরির কথা হলো অল্পসল্প সেদিন। তারপর আর দেয়নি ফোন। মৌরি মানা করে দিয়েছে, পরীক্ষা তাই। তারপর পরীক্ষা শেষে একদিন মৌরি নিজেই ফোন দিল লুকিয়ে। তুষারের সাথে কথা হলো। মৌরির ভেতর ভালোলাগা আসলো। আস্তে আস্তে তাদের কথা হতেই লাগল প্রতিদিন। এভাবে লাগাতার চললো। প্রণয় হলো। সম্পর্কে জড়ালো। কলেজে উঠে দেখা সাক্ষাৎও শুরু হলো। তখন নতুন নতুন স্বাধীনতা পেলে যেমন অনুভূতি হয়। ঠিক তেমন অবস্থা মৌরির। পারিবারিক আদর্শ, রীতি-নীতি, মূল্যবোধ যা শিখে বড় হয়েছে। সব থেকে আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হলো প্রেমের ছোঁয়া পেয়ে। ক্লাসের নাম করে রেস্টুরেন্টে-ক্যাফেতে দেখা করা, ঘুরতে যাওয়া - সব হলো। গভীর থেকে গভীর হলো প্রেম। তুষার যে পরিবেশে বড় হয়েছে, যেমন তার চলাফেরা। মৌরিও তেমনভাবেই চলার চেষ্টা করে। গভীর গভীর কথাবার্তা হয় তাদের মধ্যে ফোনালাপে। কোনো ফাঁকফোকর রইলো না একসময়। দুজন দুজনকে নিজেদের সবকিছু শেয়ার করে। একদিন দেখা করতে গিয়ে কথায় কথায় জানল তুষারের বাড়িতে আজ কেউ নেই। সবাই আত্মীয়ের বাড়ি। আর তারা সেদিন যে জায়গায় ঘুরতে গিয়েছে সেটা তাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। জেনে মৌরিই আবদার করল তাদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার। ভবিষ্যৎ শ্বশুর বাড়ি কেমন দেখবে সে। তুষার নিয়ে গেল।

একটা আট তলা বিল্ডিংএ থাকে তারা। তাদের ফ্ল্যাট চার তলায়। কারো সাথে কারো ফ্ল্যাটের মানুষের যোগাযোগ নেই। সবার যার যার দরজা বন্ধ। মৌরি তুষারদের বাড়ি এমন জানলে আসতে চাইতনা। সে ভেবেছিল তাদের মতো বড় একটা বাড়ি। যেটাতে শুধু তারাই থাকে। এমন ফ্ল্যাট সিস্টেম বিল্ডিংএ থাকে জানত না। কিছুটা ইতস্তত করলেও এসে যখন পড়েছে আর কিছু বললো না। সেদিন মৌরিকে নিজেদের ফ্ল্যাট ঘুরে ঘুরে দেখায় তুষার। মা-বাবা, বোন, তার গ্র্যানি, সে - কে কোথায় থাকে দেখিয়েছে। তারপর কফি নিয়ে সোফায় বসে দুজনে। তুষার খুব ভালো গান গাইতে পারে, প্রায়ই মৌরিকে গিটার নিয়ে গান গেয়ে শোনায়। সেদিনও শুনালো। এরপর সব ঠিক মনে হলেও আসলে আর কিছু ঠিক ছিল না। অঘটন ঘটে যায় প্রথমবার। তুষার কথায় কথায় আবদার করে বসে মৌরিকে কাছে পাওয়ার। মৌরি প্রথমে মানা করলেও শেষে আর টিকতে পারেনি তুষারের প্রেমময় আবদারের সামনে। দুজনে আবেগের বশে মস্ত বড় ভুল করে ফেলে। নিজেদের এঁকে অপরের কাছে বিলিয়ে দেয়। মৌরি কলেজের নাম করে প্রেমিকের সাথে ঘুরতে এসে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল তখনই করে ফেলল। মৌরি শুনেছিল, শারীরিক সম্পর্ক হয়ে গেলে নাকি প্রেমিকরা প্রেমিকাদের থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তুষারের মধ্যে তেমন কিছুই দেখা গেলনা। তাকে আগের চেয়ে বেশি কেয়ার করতে, ভালোবাসতে দেখা যায়। এতে যেন মৌরি আরো গলে গেল তার ভালোবাসায়। এভাবে চলতে লাগল তাদের দিনগুলো। এঁকে অপরের প্রতি ভালোবাসা, মাঝে মাঝে কলেজ ফাকি দিয়ে দেখা করা - এভাবেই চলছিল। তবে আর দৈহিকভাবে কাছে আসাআসি হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম চলল প্রায় এক বছরের কাঁছাকাছি। এর মাঝে মৌরির সেদিন একা ফ্ল্যাটে যা হয়েছিল তা একেবারেই ঠিক হয়নি - এই উপলব্দি এসেছে। আগে অপরিণত, আবেগী থাকলেও সময়ের সাথে সাথে ঠিক ভুল বুঝতে শিখছে। তাই আগের চেয়ে তুষারকে সময় দেওয়া কমিয়ে দিল। জীবনটা শুধু তুষার নিয়ে নয়। পরিবার, লেখাপড়াসহ তারও একটা জীবন আছে, ভবিষ্যৎ আছে কিন্তু তুষার তার এই পরিবর্তন নিতে পারল না। ভুল বুঝল। মৌরি অন্য কাউকে মন দিয়েছে ধরে নিল সে। ফোনালাপে প্রায় ঝগড়া হয় দুজনের। মৌরি হাজারবার বুঝিয়েছে সে তুষারকেই ভালোবাসে। তাও ছেলেটা মানছেনা মৌরির এই পরিবর্তন। একদিন দেখা করল আবার। তুষারের অবস্থা দেখে মৌরি স্তম্ভিত তখন। কি হাঁল করেছে নিজের!! বিদেশি ছেলেদের মতো দেখতে সবদিক দিয়ে চার্মিং ছেলেটার চুল উশকোখুশকো। শাঁর্টের হাতা দেখে মনে হচ্ছে কোনোভাবে গাঁয়ে জড়িয়ে এসেছে সে। আইরন করা শাঁর্টের জায়গায় কেমন কুঁচকানো। চোখ মুখ লাল।

_”তুষার…এই অবস্থা কেন তোমর? কি হাঁল করেছ? তোমার কি জ্বর?”

কথাটা বলে অল্প করে কপালে হাত ছুঁইয়ে দেখে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ছেলেটার। সে বিচলিত হয়ে উঠে,

_”একি, গা তো পুড়ে যাচ্ছে। তুমি এই অবস্থায় দেখা করতে এসেছ কেন? মেডিসিন নাওনি?”

তুষার তার হাত খপ করে ধরে ফেলে,

_”এই জ্বরে গা পুড়বেনা আমার। তুমি অবহেলা করলে পুড়ে ভেতরটা। অন্য কিছুতে না। তুমি আগের মতো ভালোবাসো না কেন আমায়? আমি কি কোনো ভুল করেছি? নাকি তুমি অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছ মৌ?”

_”চুপ করো। অন্য কাউকে ভালোবাসিনা আমি হাজার বার বলেছি। তোমাকেই ভালোবাসি শুধু। তাও এসব কেমন পাগলামি? জ্বর নিয়ে বাড়িতে বিশ্রাম না নিয়ে এভাবে জোর করে আমার সাথে দেখা করছ। আঙ্কেল-আন্টি নেই বাসায়? উনারা কি দেখেনি তোমার এই অবস্থা?”

_”কেউ নেই, সবাই ন্যানির বাড়ি গেছে। ন্যানি সিক খুব। উনাকে দেখতে গেছে।”

মৌরি বুঝল তুষারের নানু অসুস্থ। তাই সবাই উনাকে দেখতে গেছে। তুষার অসুস্থ বলে সে যাইনি। নিশ্চয় বাড়ির লোকেরা বিশ্রাম নিতে বলেই গেছে ছেলেকে। কিন্তু সে পাগলামি করছে এখানে তার সাথে, বাসায় বিশ্রাম না নিয়ে। তুষারের প্রতি মায়া হলো তার। অনেক কিছু বুঝিয়ে সুজিয়ে বাড়ি নিয়ে গেল নিজেই। ছেলেটা শুধু একটা কথায় জপছে, ‘মৌরি কেন তাকে আগের মতো আর ভালোবাসেনা।’

তুষারকে স্যুপ বানিয়ে খাইয়ে দিল, জ্বরপট্টি দিল। কিন্তু তুষারের জ্বর মৌরির দেখা পেয়েই আগের চেয়ে কমতে শুরু করেছে। মন শান্তি থাকলে শরীরও শান্তি লাগে। মৌরির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। কোনোভাবে মৌরির থেকে দূরে যেতে চাইছেনা। মৌরি তখন তার এ কদিনের সামান্য অবহেলায় তুষারের কি অবস্থা হলো ভেবে অনুশুচনায় ভুগছে। এভাবে কাউকে সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে নিজের মন মর্জিমতো দূরে সরে যাওয়া উচিত হয়নি বুঝল। যা কিছু উপলব্দি করেছে নিজে সেসব তুষারকে অল্প হলেও বুঝিয়ে, স্পেস নেওয়া উচিত ছিল। তুষারের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে। তুষার মৌরির সে হাত নিয়ে চুমু খেল তাতে। একবার দুবার বারবার চুমু খেল। আবার কোলে মাথা রেখে তার পেটে মুখ গুজল। জ্বরের কারণে শ্বাসটাও গরম তার। মৌরি কেঁপে উঠল সাথে সাথে। তুষারের হাঁবভাব আর গতি ঠিক দিকে এগোচ্ছেনা। সে কোনোরকম বুঝিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চাই। কিন্তু তুষার মানছেনা। এতদিন পর মনমতো একটু সেবা পেয়েছে প্রেয়সীর, আর ছাড়তে চাইছেনা। একটু গভীরভাবে চাই তার মৌরিকে। তুষার লাগামছাড়া হয়ে উঠে। মৌরির কোনো কথা শুনেনা। মৌরি অনেক চেয়েও বুঝাতে পারল না ছেলেটাকে। এই যে সে আজ কোনোরকম শারীরিক মেলামেশা চাইছেনা, এতেও তুষার ভুল বুঝছে। তার ধারণা মৌরি তার প্রতি অনাগ্রহী এখন। শেষে না পেরে ভুল হচ্ছে জেনেও আবেগ, অনুভূতিবিহীন নিজেকে আবার সপে দিল তুষারের কাছে। আবার করে ফেলল চরম ভুল।

সেদিনের মতো ভুল যাতে আর না হয়, তাই সে চেয়েছিল গোপনে দুজনে বিয়ে করে নিতে। এটাই একমাত্র সমাধান। তারপর সে নিজের মতো পড়ালেখা করবে। তুষারের আর কোনো ইন্সিকিউরিটি থাকবেনা যে মৌরি অন্য কাউকে ভালোবাসে বলে তাকে অবহেলা করছে। তারপর তুষার যেদিন মুটামুটি ভালো একটা চাকরি পাবে। সেদিনই প্রস্তাব দেবে মৌরির বাবাকে। ততদিন অন্য কোথাও যাতে তার বিয়ের কথা না উঠে বাড়িতে, সেই দায়িত্ব নিজে নেবে মৌরি। সব ভুলকে ফুল করে নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচবে পরিকল্পনা করে নিয়েছিল সে।

কিন্তু সব ভুল চাইলেই ফুঁল বানানো যায়না। ভুলের চিহ্ন তার পেটে চলে এসেছে। আজ নিশ্চিত হলো। আর আজই তুষার খ্রিষ্টান, এ কথা অনামিকা ফোন করে জানাল। অথচ এই এক বছরের সম্পর্কে সে নিজে কোনোদিন বুঝতে পারেনি যে দুজন দু ধর্মের মানুষ। তুষারের মম, ড্যাড, গ্র্যানি, ন্যানি - এসব সম্বোধনের কারণ নেহাতই আধুনিকতা ভেবেছিল। কারণ শুরু থেকেই তার চালচলন, পোশাক-আশাক, হাবভাব, কথা বলার ভঙ্গি - সব বিদেশি ধরণের। তুষারদের বাড়িও তো গিয়েছে সে, কই তেমন কিছু তো চোখে পড়েনি যাতে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারত এই বিষয়ে। আর না তো তুষারকে কখনো আলাদা কোনো সৃষ্টিকর্তার নাম নিতে শুনেছে। সবসময় তো গড ডাকত সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু এটাতো আজকাল কতো মুসলিম, হিন্দুরাও বলে কথায় কথায়। তুষারকেই কেন ভিন্ন ধর্মের হতে হলো? এখন সে তুষারের সাথে অবৈধ মেলামেশা করে এক পাপ করেছে। পাপের ফলও এসেছে। ভিন্ন ধর্মী কাউকে বিয়ে করে কিভাবে অন্য পাপ করবে? আবার তাকে বিয়ে না করলে বাচ্চাটা? এই সমাজ, তার পরিবার, বাবা, মা - মৌরির সন্তানকে মেনে নেবে? মৌরি জানেনা এত এত পাপ কি করে গুচাবে সে!! কোন পাপ থেকে বাচার পথ খুঁজবে! কিন্তু তুষারকে ছাড়াও বাঁচা সম্ভব না। কখনো না……

খেতে খেতে এসব ভাবনায় এতটাই ডুবে গেল মৌরি, যে দাদীর অনবরত ডাক কানেই ঢুকছেনা তার। যখন ধ্যান ভঙ্গ হলো তখন সবাই খেয়ে যার যার মতো চলে গেছে। শুধু দাদিই পানের বাটা নিয়ে আবার বসেছে নিজের জায়গায়। তাকে ভাত না খেয়ে বারবার নড়চড় করতে দেখে ধমক দিচ্ছে।

মৌরি ধমক শুনে পানি দিয়ে বাকি ভাতটুকু গিলে নেয় কোনোভাবে। তারপর উঠে চলে যায়। দাদীর কথার উত্তর দেয়না।

সেই যে রুমে ঢুকেছে, আর বের হয়নি মৌরি।

একেবারে রাতে যখন আবার খেতে ডাকতে গেল মা। তখন দেখল মৌরি ফ্যানের সাথে ঝুলছে। মৌরির মায়ের আত্মচিৎকার আর আর্তনাদে সবাই ছুটে আসে। মৌরিকে ফ্যানের সাথে দড়ি পেছিয়ে ঝুলতে দেখে প্রত্যেকে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। চাচ্চু তাড়াতাড়ি যান ভাতিজির কাছে। হাঁটুদেশ আগলে ধরে, যাতে গলায় প্যাঁচ কিছুটা আলগা হয়। মৌরিকে নামানো হয়। শ্বাস চলছে তখনো। রাতের অন্ধকারে বুকভর্তি আতঙ্ক, মুখে সৃষ্টিকর্তার নাম আর মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে সকলে ছুটেন হস্পিটালের উদ্দেশ্যে। সময় পেরোলে ডক্টর এসে জানালো ভ্রূণটা রাখা সম্ভব হয়নি।

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ১৫ গল্পের ছবি