হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ১৪

🟢

মেজরের ইচ্ছে ছিল শ্রেয়সীকে নিজের সাথে কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু ভেবে দেখল এতে দীদুন একা পড়ে যাবে। তাছাড়া কর্নেল সুলেমানের ব্যাপারটা একদিন পরই ডিসক্লোজ করতে চাওয়ায় অফ ডিউটি থাকা সত্ত্বেও লুকায়িতভাবে নানান কাজ করতে হচ্ছে। এসময় শ্রেয়সী কোয়ার্টারে একা পড়ে যাবে। প্রথম দিনেই একা সে মানিয়ে নিতে পারবেনা।

তাই শ্রেয়সীর ছবি তোলা পর্যায় শেষে হলেই শাহীন দিহানদের বাড়ির চারপাশে নজর রাখতে বলে চলে যান কর্নেল সাহেব, উমরান আর বাকি দুজন অফিসার। সেই যে সন্ধ্যার দিকে তারা গিয়েছিল সেনানিবাস, ফিরেছে রাত বারোটার দিকে। কর্নেল সাহেব সেনানিবাস থেকেই বাড়ি চলে যান। তার কাজ আছে। নেওয়াজ কুঠির এসেছে শুধু উমরান।

শ্রেয়সী তখন টিভি দেখছে। সাঁজপোশাক কিছুই নেই তখন গাঁঁয়ে। মেজর আসলে দরজা খুলে দিয়ে আবার রিমোট হাতে বসে পড়ে সোফায়। মনোযোগ টিভিতেই। টেবিলে দীদুনের কথামতো তার নতুন বরের জন্য খাবার আগেই প্রস্তুত করে রেখেছে। দীদুনের ওষুধ আছে, আর রাত জাগতে পারেনা। তাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

উমরান ডাইনিং এ গিয়ে এক গ্লাস পানি খান। তারপর মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখতে থাকা নতুন বউয়ের পাশে বসেন আরাম করে। Disney Plus এ একটা অ্যানিমেটেড ফিল্ম দেখছে সে। ‘Moana’ নাম ফিল্মটার। অ্যাডভেঞ্চার, মিউজিক্যাল আর ফ্যামিলি জনরার ফিল্ম। খারাপ না, তবে এই বয়সে এসে এত মনোযোগ দিয়ে এসব অ্যানিমেশন কে দেখে? এগুলো দেখে দেখেই অনুভূতি বুঝতে শিখল না এখনো এই মেয়ে। কোথায় রোমান্টিক মুভি, সিনেমা দেখবে তা না। উমরান বিরক্তি নিয়ে জানতে চান,

_”খেয়েছ?”

_”হ্যাঁ, অনেক আগে। দীদুনের সাথে।” সামনে দৃষ্টি রেখেই জবাব দেয় সে।

_”দীদুন ঘুমিয়ে পড়েছে?”

_”হ্যাঁ, ঘুমের ওষুধ ছিল।”

উমরান মাথা নাড়ান।

_”কিন্তু আমি তো খায়নি। স্বামী বাইরে থেকে এসেছে। আর তুমি তাকে খাবার বেড়ে না দিয়ে বসে বসে কার্টুন দেখছ?”

_”টেবিলে সব রাখা আছে উঠে দেখুন। গিয়ে খেয়ে নিন।”

উমরান সরু চোখে তাকান। কিছু না বলে উঠে পড়েন। কোয়ার্টার থেকে কিছু পোশাক নিয়ে এসেছে আসতে সময়। সেসব নিয়ে শ্রেয়সীর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেন।

তারপর এসে টেবিলে গিয়ে খাবার সেরে নিলেন আস্তে ধীরে। সব আবার গুছিয়েও রাখলেন। শ্রেয়সীর নতুন বর শ্বশুর বাড়িতে প্রথম দিনই নিজে নিজে এতকিছু করছে। এতে তার কোনো পাত্তাই নেই। মন দিয়ে টিভি দেখছে। অথচ সে জেগে ছিল মেজর আসলে যেন সবকিছু এগিয়ে দিতে পারে, সাহায্য করতে পারে - এ কারণেই। দীদুনও ঘুমানোর আগে বারবার করে তা বলে দিয়েছিল মেজর আসলে যেন কি লাগে না লাগে দেখে। এখন এসব তার মাথাতেই নেই। মন দিয়ে Maui আর Moana-র পরিকল্পনা শুনছে। একটি পাহাড়ের উপর উঠবে তারা। যেটার ভেতর সব খাজনা আছে। তারপর Moana কি বলে শুনবে, এর আগে অকস্মাৎ মনে হলো সে হাওয়ায় ভাসছে। ভয়ে চিৎকার করার আগেই মুখ চেপে ধরল কেউ। শ্রেয়সী আতঙ্কিত ভঙ্গিতে চারদিকে তাকালো। তারপর বুঝল কি হচ্ছে তার সাথে। মেজর তাকে কোলে নিয়েছে।

_”কি সমস্যা? এভাবে কোলে নিয়েছেন কেন? আর টিভি বন্ধ করলেন কেন?”

_”বন্ধ থাক, আর দেখতে হবেনা টিভি। আজ কি টিভি দেখার দিন?”

_”তাহলে? কিসের দিন? কিছু হয়েছে?”

মেজর কোলে থাকা বউকে আরেকটু চেপে নেন নিজের দিকে,

_”আমাদের বিয়ে হয়েছে মেয়ে। ভুলে গেছ?”

_”ওহ, হ্যাঁ। মানে না, ভুলব কেন? মনে আছে আমার। আমিতো অনেকক্ষণ আনন্দ করেছি। একটু আগে শাড়ি খুলে সাঁজ ধুয়ে বসলাম।”

মেজর তাকে নিয়ে রুমের দিকে চলতে চলতে বলেন,

_”ভালো করেছ। এবার চলো।”

_”আরেকটু দেখলে কি হতো? আমার পরীক্ষাও শেষ। এমন করছেন কেন? আর নামান আমাকে প্লিজ।”

_”হুশ, চুপ। বেশি বুঝো। স্বামী রেখে টিভি দেখছে… কাল থেকে টিভিতে সবরকম অ্যানিমেশন-কার্টুন বন্ধ। রোমান্টিক মুভি সিনেমা দেখবে শুধু। তারপর বুঝবে প্রেম-ভালোবাসা আর স্বামী কি!!”

শ্রেয়সী কিছু বলতে চাইলেও মেজর আর বলতে দিলেন না। রুমে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। শ্রেয়সীকে নামিয়ে না দিয়ে অকস্মাৎ যেমন আছে সেভাবেই বুকে নিয়ে পিঠ এলিয়ে দিলেন বিছানায়। শুয়ে পড়লেন তাকে নিয়ে।

_”আরেহ, এভাবে কে শুই? সরুন, বালিশ ওদিকে।”

মেজর উত্তর না দিয়ে তার মাথা বুকে চেপে ধরে। শ্রেয়সী বুঝল তাকে শব্দ না করতে বলছে। সে করলো না। মেজর বিয়ে করে অসুস্থ হয়ে গেল নাকি? এমন করছে কেন?

বেশ অনেকক্ষণ শ্রেয়সীকে বুকে নিয়ে পড়ে থাকে। মনে হলো হালাল ভাবে বুকে টানতে পেরে আর ছাড়তে চাইছেনা।

_”শ্রেয়সী?”

_”হু, বলুন।” মেজর অসুস্থবোধ করছে ভেবে সে তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়।

_”রাওফান কি করেছিল?”

_”ওহ, আপনি তো রাওফান কিছু করলে আপনাকে জানাতে বলেছিলেন। আমার মনে ছিলনা…” একটু থেমে আবার বলে, _”রাওফান আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নিজের সাথে। আমাকে নাকি বিয়ে করবে। আমি মানা করে দিয়েছিলাম। তারপর দেখি হাত ধরে টানতে চায় সে, আমি পালিয়ে এসেছি দুবার। পরে আবার আসলে আরেকদিন, তখন আমাকে জোর করে কোলে নিয়ে গাড়িতে তুলতে চেয়েছিল। আমি চড় দিয়েছিলাম। ঐ লোকটা আমার গাঁঁয়ে হাত দিলে আমার কেমন জানি বমি আসে। চড় দিয়েছিলাম বলে রেগে গিয়েছিল। বলেছে আমাকে দেখে নেবে, আমার ক্ষতি করবে। আমি ভয় পেয়ে আর বের হইনি ঘর থেকে। তারপর আমাকে না পেয়ে পরদিন রাতের বেলা বাড়ি চলে আসলো। আমার মাঝরাতে খিদে পায়। তাই উঠেছিলাম। দীদুন ঘুম। ফ্রিজের কাছে যখন দাড়ায়, তখন করিডোরের জানালাটার বাইরে কাউকে দেখেছি। খুলতে চাইছিল ওটা। কয়েকজন আছে দেখে আমি ভয় পেয়েছিলাম। দীদুনকে ডেকেছি, কিন্তু ঘুমের ওষুধ খায় বলে শুনতে পায়নি। তারপর কর্নেল আঙ্কেলকে কল দিয়ে জানালে, দশ/পনেরো মিনিট পর চারদিকে অনেক গাড়ির আওয়াজ শুনি। আঙ্কেল কল দিয়ে বললো ওদের আঙ্কেল পাঠিয়েছে। আমাদের ক্ষতি করবেনা। ওদের ধরবে শুধু। কিন্তু ততক্ষণে রাওফান আর ওর সাথে থাকা অন্যরা পালিয়ে গেছে। কেউ দেখেনি। কিন্তু আমি ওর গলা শুনেছি। ওটা রাওফান ছিল আমি জানি। আমি মেরেছি বলে শোধ নিতে এসেছে।”

মেজর মন দিয়ে শুনলেন শ্রেয়সীর সব কথা। মিশনে যাওয়ার আগে সাবধান করে যাওয়া সত্ত্বেও এই রাওফান এত দুঃসাহস দেখিয়েছে, কথাগুলো যতবার শুনছে ততবারই যেন রক্ত টগবগ করছে তার, শিরা উপশিরা ফুলে উঠছে। শ্রেয়সীকে নিজের সাথে চেপে চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিলেন। মনে মনে অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করে নিলেন রাওফানকে নিয়ে। শেষে শ্রেয়সীর মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলেন,

_”আচ্ছা, ঘুমাও। আর কোনোদিন তোমার সামনে আসবেনা রাওফান। নেওয়াজ কুঠিরের আশেপাশেও আসবেনা। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”

কথার মাঝেই শ্রেয়সীর ভারী নিঃশ্বাস বুকে লাগে তার। অর্থাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে।

এরপর সারারাত ঘুমন্ত শ্রেয়সীকে দেখতে দেখতেই কেটে যায়। সেদিন তাদের আর্মিদের নিয়ে বদনাম করছিল মেয়েটা। সত্যি বলতে রাগ, ক্ষোভ কিছুই জাগেনি তখন মেয়েটার প্রতি। বরং কৌতূহল ছিল কিশোরী মেয়েটাকে নিয়ে। বাচ্চামি-অবুঝপণা স্পষ্ট, তাও আত্মবিশ্বাস কণ্ঠে। এতে যেন আগ্রহ বেড়েছে তার। প্রথম দেখাতেই সুপ্ত অনুভূতি এলেও সেভাবে টের পায়নি তখন। কিশোরী চঞ্চল মেয়েটা তাকে সেভাবে আলাদা নজরে দেখেইনি মেজর জানে। নিজেই চরমমাত্রায় মেয়েটিতে ডুবেছে। আর এখনো ডুবছে। এই মেয়েটি নিশ্চিন্তে ঘুম। তার বুকে, তার সাথে এক বিছানায়। উমরানের এই রাত দীর্ঘ হবে। বুকের উপর আকাঙ্ক্ষিত, কমনীয় রমণী শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে ভারী নিঃশ্বাস ফেলে। এ রাত মেজরের দীর্ঘ হবে।

_____

পরদিন কর্নেল সুলেমানের কীর্তি ফাঁস করতে প্রয়োজনীয় সব রকম প্রমাণ আর তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংগ্রহ করেছেন উমরানসহ বিশ্বস্ত কয়েকজন মিলে। আর যথাসময়ে মিটিং এ ব্রিগেডিয়ার সাহেব আর সিনিয়র অফিসারদের কাছে সবকিছু পেশ করেন। সিনিয়র জুনিয়র সবরকম সৈন্য, অফিসারদের সামনে কর্নেল সুলেমান আর তার ছেলের কুকীর্তি তুলে ধরেন।

দেশের বড় আর মোস্ট ওয়ানটেড মাদক চোরাচালান ব্যবসার সাথে জড়িত তারা। একদম শুরু থেকেই এই দলটির সাথে যুক্ত। অথচ এদের ধরার মিশনগুলোতে থেকে কর্নেল সুলেমান কি সুক্ষভাবেই না তাদের সাহায্য করে গেছে প্রতিবার। সীমান্ত পথে নিজে দাড়িয়ে থেকে মাদকদ্রব্যের পাঁচার করেছে আবার আনিয়েছে কর্নেল সুলেমান, সাথে তার ছেলে- এমন প্রমাণও পেশ করা হয়েছে। সামনে মাদক পাঁচারকারীদের বিরুদ্ধে যে মিশনটা আছে, সেটাও ভেস্তে দেওয়ার সব পরিকল্পনা করে রেখেছিল বাবা ছেলে। অনেক লম্বা হাত এদের। উমরান সবকিছু তুলে ধরলেন সেদিন সিনিয়র জুনিয়র সকলের সামনে।

সব শেষে বাবা-ছেলেকে পদ থেকে সরানোর, চাকরি থেকে বের করার সিদ্ধান্ত নেন সিনিয়র অফিসাররা। সাথে গ্রেফতারি পরোয়ানা তো আছেই। যদিও আজকের পুরো মিটিং এর কিছুই রাওফান আর কর্নেল সুলেমান জানেনা। তারা এখানে উপস্থিত নেই। উমরান এখানে মিটিং শুরু করার আগেই কর্নেল সুলেমানের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলছিলেন সৈন্যদের দিয়ে। যদিও আগে থেকে নজরদারিতে ছিল।

এরপর বাকি সিদ্ধান্ত ব্রিগেডিয়ার সাহেব নিজেই নিলেন। উমরান আর তার সাথে মিলে কর্নেল সুলেমানকে এক্সপোজ করা অফিসারদের আর কিছু করতে হলো না।

___

দিনগুলো কাটতে লাগল নিজস্ব গতিতে। কর্নেল কিবরিয়ার জমজ দুই ছেলে অসুস্থ। দীদুন চলে গেলেন তাদের কাছে। এর মধ্যে আবার উমরানের বাবা-মা এসেছিলেন পুত্রবধুকে দেখতে। শ্রেয়সীকে দেখে, তার সাথে কথা বলে- তাদের মন খচখচানি একেবারেই মিলিয়ে গেল। এত মিষ্টি পুত্রবধুকে নিয়ে তাহুরা চৌধুরী এতদিন দ্বিধাদন্ধে ছিলেন ভেবে আফসোসই করলেন। শ্রেয়সীরও তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। মনমতো শ্বশুর শাশুড়ি পেয়ে খুশি সে। তবে ভোরে এসে রাতে আবার চলে গেলেন তারা। ওলিওল্লাহ চৌধুরী ব্যস্ত মানুষ। স্বামীর জন্য তাহুরা চৌধুরীও কোথাও থাকতে পারেন না চাইলেও। তাই চলেই যেতে হলো।

উমরান আর শ্রেয়সীই শুধু থাকছে খালি বাড়িটিতে। সাথে আছে পুঁই। শ্রেয়সীকে নিজের সাথে সহজ করে তোলা কঠিন কিছু ছিলনা উমরানের জন্য। একেতো নিজেই মিশুক প্রকৃতির মেয়েটি। তার উপর কারো স্বল্প অকৃত্রিম ভালোবাসা পেলেই গলে যায়। আহ্লাদী হয়ে উঠে। তার বর এখন তার কাছে সবচেয়ে বিশ্বস্ত, সবচেয়ে ভরসার। যার কাছে মনখারাপি-মনউদাসী-ভালোলাগা-চঞ্চল মস্তিস্কের ভাবনাগুলো- সব বলা যায়। যে তাকে বাচ্চাদের মতো আগলে রাখে, বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেলে আধঘুমে তুলে আদর করে খাইয়ে দেয়, আবার কোলে নিয়ে রুমে আনে যাতে ঘুম না ভাঙে। খুব খুব যত্ন আর ভালোবাসা দেয় শ্রেয়সীকে। যাকে বলে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট। শ্রেয়সীর সবচেয়ে কাছের মানুষ এখন তার স্বামী; তার ব্যক্তিগত পুরুষ।

আগের মতো অবাধে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি নেই এখন তার। মাঝে মাঝে নিজেই আশ্রমে নিয়ে যায়, তবে সাথে নিয়ে আসেন উমরান। আবার কখনো বাচ্চাদেরও নিয়ে আসেন। এমনই চলছে তাদের দিনগুলো।

তবে না চাইতেও কিছু পরিবর্তন চলে আসলো তাদের জীবনে। হালালভাবে একসাথে থাকবে, নিরাপদে নিজের সাথে রাখবে, তারপর সময় হলে সংসারও শুরু হবে আস্তে আস্তে - এই ছিল উমরানসহ প্রত্যেকের চাওয়া। কিন্তু সম্পূর্ণ খালি একটি বাড়িতে হালাল সম্পর্কে থাকা দুজন নর-নারী একা, একসাথে থাকছে। অথচ তাদের মধ্যে কোনোরকম ‘চাওয়া-পাওয়া-চাহিদা জাগছেনা’ এমন কথা বিশ্বাসযোগ্য না কোনোকালেই। উমরানেরও জেগেছে চাওয়া-পাওয়া। তবে সামলেছে নিজেকে, কঠোর সংযমের সাথে সামলেছে। কিন্তু একরাতে শ্রেয়সী নিজেই সেই সংযম আর টিকিয়ে রাখতে দিল না।

নতুন নতুন ফোনে ফেসবুক একাউন্ট খুলেছে তখন সে। রিলস দেখে বেশি। একদিন একটা কিসিং ভিডিও সামনে আসলে মন দিয়ে দেখল তা। কৌতূহলবশত ঐ ভিডিও যে পেইজ থেকে দেখছে সেই পেইজে ঢুকে। এমন ধরণের অসংখ্য ভিডিও সেখানে। শ্রেয়সী কি ভেবে মাঝের একটাতে ঢুকে দু সেকেন্ডের মতো দেখেই ফোনটা সোফায় পাশে ছুড়ে ফেলল। ছিঃ ছিঃ! কি দেখল সে। বুক ধরফর করছে তার। ঘেমে উঠল বোধ হয় একটু। কপালে গলায় হাত দেয়। কয়েক সেকেন্ড যায়। প্রথমে একটু অন্যরকম লাগলেও আস্তে আস্তে আবার ফোন হাতে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে আগ্রহ নিয়ে পুরো ভিডিও দেখে। খুব পেশোনেটভাবে কিস করছে দুজন নারী পুরুষ এঁকে অপরকে। মনে হচ্ছে শ্বাস নিতে দেবেনা। গাঁয়েও কোথায় কোথায় হাত দিচ্ছে। শ্রেয়সী এটা দেখে ফোন রেখে দেয়। প্রথমবার এসব দেখায় কেমন কেমন লাগছে তার। সোফায় শুয়ে পড়ে সে। থম মেরে কিছু ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে যায়।

তখন উমরান বাইরে থেকে এসেছে। রাত দশটা। দুবার বেল বাজিয়েও খুলছেনা দেখে নিজেই চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুঁকে যায়। সোফায় শ্রেয়সী ঘুমিয়ে আছে দেখে, তার কাত হওয়া মাথাটা সোজা করে দিয়ে ফ্রেশ হতে যায়। দশ/পনেরো মিনিট পর যখন বসার ঘরে আসে তখনও সে ঘুম। রাতের জন্য আলাদা কিছু রাধতে হবেনা। যা আছে রাতে হয়ে যাবে দুজনের। উমরান গরম করে নেন সেসব।

তারপর শ্রেয়সীর কাছে আসেন। হাঁটুমুড়ে বসে ঘুমন্ত বউকে দেখেন। কপালে এসে থাকা চুলগুলো সরিয়ে চুমু খান সেথায়, নাকে ঠোঁট ছোয়ান, উদ্দেশ্য তাকে জাগানো। কিন্তু মেয়েটার কোনো হুশ নেই। নড়চড় নেই দেখে উমরান তাকান।

স্নিগ্ধ মায়াবী একটা চেহারা, চোখের ঘন পাপড়ি, এই পাপড়িগুলোর পিটপিট করে তার দিকে প্রথম তাকানোর সময়ই মন খুইয়েছিল উমরান। এই চোখ দুটো দেখলে চোখের গভীরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তার। স্নিগ্ধ মুখটা দেখলে আদর আদর পায়। উমরান আনমনে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়ান। আবার ছোয়ান, আস্তে আস্তে গভীর করেন ছোঁয়া। হাতদুটো কখনো তার নরম গালে তো কখনো লতানো শরীরটিতে নরমভাবে বিচরণ করছে। ঘুমন্ত শ্রেয়সীর নরম গোলাপী অধরদুটোতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ডুবতে গিয়েও হঠাৎ হুশে ফেরেন। কিন্তু ছেড়ে দিতে গিয়ে আর পারলেন না, কারণ শ্রেয়সী তার গলায় হাত দিয়ে আঁটকে নিয়েছে। আবার অধরে অধরে মিলিয়ে দিল সে। উমরান তার গালে হাত রেখে আদুরে ভাবে সরাতে চান। কিন্তু শ্রেয়সী একটু আগে যেভাবে তার স্বামী চুমু খেয়েছে তাকে, ঠিক সেভাবে নিজে চুমু দিতে চাইছে। তবে পারছেনা, ওভাবে চুমু খেতে জানেনা সে, তাই সুবিধা করতে পারছেনা। উমরান আস্তে করে অধর ছাড়িয়ে শ্বাস টানেন। শ্রেয়সী অল্প হাপাচ্ছে। উঠে বসতে বসতে বলে,

_”সরিয়ে দিলেন কেন?”

_”কি করছিলে এটা? এসব কোথা থেকে শিখলে?”

_”আমি সব জানি, আমি ঘুমালে আপনি প্রতিদিন চুমু খান আমাকে। গালে, কপালে, ঠোঁটে আরও সবখানে চুমু খান। আমি সব বুঝতে পারি।”

মেজর সরু চোখে বলেন,

_”ঘুমানোর ভান ধরা হয় তাহলে?”

_”একটু আগে যেভাবে চুমু দিলেন? ওভাবে আবার দিন, আমিও ওভাবে অনেকক্ষণ লাগিয়ে চুমু খাব।”

উমরান দাড়িয়ে যান,

_”বেশি পাকনা পাকনা কথা বলছ মেয়ে। তোমাকে এসব কে শিখিয়েছে? তোমার ফোন কোথায়? কার সাথে কথা বলেছ?”

শ্রেয়সী নিজের কোমল হাতে স্বামীর হাত ধরে টেনে আবার বসিয়ে দেয় পাশে,

_”কেউ বলেনি, আমি ভিডিওতে দেখেছি। আপনি রাতে আমাকে লুকিয়ে যেভাবে চুমু খান সেভাবে খান না প্লিজ। আমার ভালো লাগে তখন।”

_”শ্রেয়সী… চুপ! এসব বলেনা। খেতে চলো। খাবার গরম করেছি সব। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।”

_”না, আগে যা বলছি করুন…” কথাটা বলে আকস্মিক পাদুটো দুদিকে করে উমরানের কোলে উঠে বসে। শ্রেয়সীর পড়নে বক্ষযুগল অব্দি হালকা পিচ-গোলাপি রঙা শিফন কাপড়ের অফ-শোল্ডার শর্ট টপ, বার্ডোট নেকলাইন যাকে বলে। যার কারনে প্রলুব্ধিময় কলার বোনগুলোসহ গ্রীবাদেশ উন্মুক্ত। আর কোমর হতে সফেদ নরম সিল্কের আরামদায়ক স্কার্ট, যার একপাশ হাঁঁটুর কিছুটা উপর থেকে নিচ অব্দি কাঁটা। ওভাবে বসায় নিম্নাংশের পোশাকটি মেলে গেল, হাঁটুর উপর অব্দি ধবধবে সাদা অংশ উন্মুক্ত হয়ে উঠল উমরানের নিকট। শ্রেয়সী তার কোলে প্রথমবার বসছেনা এভাবে। নানানরকম মনখারাপি কিংবা খুনশুটিময় মুহূর্তে নানানভঙ্গিমায় স্বামীর কোলে বসেছে সে। তখনো সুপ্ত চাওয়া পাওয়া জাগে উমরানের, আর আজও পুরুষালি দেহটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল তার। মাথার চুল আঁকড়ে ধরে অধরে অধর মিলিয়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে মেয়েটা। তবে তাও ঠিকঠাক পারছেনা। মেজর যেভাবে নরম-ভেজা চুমু দিয়েছিল সময় নিয়ে, সেভাবে হচ্ছেনা। উল্টো কামড়ে দিচ্ছে সে। উমরানের মায়া হলো স্ত্রীর উপর। তাকে দূরে সরাতে গিয়েও পারলেননা। হাঁটুর উপরে উন্মুক্ত অংশে রাখা একহাত উরুতেই রেখে, অন্য হাত সন্তর্পণে তার কোমরে আনলেন। নরম পোশাকের উপর ভারী হাতের বিচরণে আরও এলোমেলো হলো তা। কোমর বেয়ে নিতম্বে যায় হাত। চেপে কাছে টেনে নিলেন উমরান। অমনি উত্তপ্ত দেহখান শক্ত হয়ে উঠল তার।

উমরান শ্রেয়সীর এলোমেলো হয়ে থাকা সিল্কি চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে ঠিকভাবে চুমু খেতে সাহারা দিলেন। অধরে অধরে আস্বাদন থেকে জিহ্বার স্পর্শে আরাম পেয়ে আরো উন্মাদ হয়ে উঠল শ্রেয়সী। উমরানও তাল মেলালেন। তার হৃৎপিণ্ডের গতি বেসামাল তখন। অধর ছেড়ে অতি নিকটে থেকেই, হাঁপাতে হাঁপাতে গালে হাত রাখলেন স্ত্রীর। নিম্নস্বরে বলেন,

_”ভুল করছ শ্রেয়সী। তুমি এখনো ছোট, আরও অনেক বড় হতে হবে। আমার কথা শুনো।”

চুমু নিয়ে শ্রেয়সীর কৌতূহল মিটেছে। সে লম্বা শ্বাস টেনে সরে আসতে নেয়। কিন্তু মুখে এক কথা বললেও উমরানই তাকে কোমর চেপে রেখে দিলেন নিজের কোলে, অতি সন্নিকটে। বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলেন কোমল নারীদেহটাকে। শ্রেয়সী শরীরে কোথাও অযাচিত ছোয়া পেল। দ্বিধা নিয়ে তাকায়। ব্যাথা পাচ্ছে সে।

_”মেজর…”

_”হুশ… এভাবেও ভালো লাগবে তোমার।”

_”ব্যাথা পাচ্ছি আমি।”

শ্রেয়সী হাত সরিয়ে বললেও মেজর পাত্তা দিলেন না। একটু আগে নিজেই বউকে ছোট বলছিলেন। আবার এখন নিজেই ভুলে গেলেন সেকথা।

আকস্মিক তার উন্মুক্ত গ্রীবাদেশে উন্মাদের মতো চুমু দিতে দিতে কোলে নিয়ে উঠে পড়েন। চললেন রুমের উদ্দেশ্যে। দরজা পায়ে ঠেলে লাগিয়ে ছুড়ে ফেললেন নরম বিছানায়। শ্রেয়সীর লতানো শরীরে পোশাক-আশাকের ঠিক নেই। বিছানায় কনুই ঠেকিয়ে মাথা তুলে মেজরের দিকে তাকায়। প্রথমবার শ্রেয়সীর সম্মুখে এতটা আত্মসংযম খুইয়েছে উমরান। তাই শ্রেয়সীকে আতঙ্কিত দেখায় স্বামীকে হঠাৎ এমন অচেনা আচরনে দেখে।

উমরান তখন অস্থির ভঙ্গিতে হাতঘড়ি আর পড়নের শাঁর্ট খুলে কোথাও ছুড়ে ফেলেছে। উন্মুক্ত তার পুরুষালি নগ্ন দেহ। শ্রেয়সীর পাগলামির কারণে আর্মি কাট দেওয়া আকর্ষণীয় চুলগুলোর অবস্থা এলোমেলো। অস্থির উমরান প্যান্টের বেল্ট আর জিপার খুলে শ্রেয়সীর দিকে এগোতেই তার নরম কণ্ঠ কানে আসে,

_”মেজর, এমন করছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে আপনার? দুপুরেও তো ঠিক ছিলেন।”

শ্রেয়সী তার স্বামীর ভেতরের দহনের সিকি পরিমাণ টের পেল না। নিজেরটুকু বুঝে নিয়ে এখন নিষ্পাপ সে। উমরান তার অবুঝপণা উপেক্ষা করে তার মাধ্যমে নিজেকে শান্ত করতে গিয়েও থেমে যায়।

দেহ-মস্তিষ্ক এত কিছু না ভেবে শরীর যা চাইছে নিয়ে নেওয়ার আহ্বান দিলেও মন সায় দিলনা। তার মন গহীনে অবস্থান এই মেয়েটির। দৈহিক চাহিদা মেটাতে এভাবে ঝাপিয়ে পড়া সম্ভব না। মন মানল না শ্রেয়সীর অবুঝ দৃষ্টিতে চোখ রেখে হায়েনা হয়ে এগিয়ে যেতে। কিন্তু এখন পিছিয়ে যাওয়াও সম্ভব না।

গাঢ় শ্বাস টানেন উমরান। যথাসম্ভব সামলে কাছে আসেন বউয়ের। সে তখনও কনুই ঠেকিয়ে স্বামীপানে চেয়ে আছে প্রশ্নাত্মক চোখে। উমরান আধশোয়া হলেন তার উপর। দুটো শরীর ছুঁইয়ে গেল। শ্রেয়সীর গালে আদুরেভাবে হাত রেখে কাতর স্বরে বলেন,

_”শরীর খারাপ লাগছে শ্রেয়সী।”

শ্রেয়সীকে বিচলিত দেখাল। জ্বর হলো কিনা দেখে কপালে-গলায় হাত দিয়ে।

_”একটু গরম শরীর। বুকের দিকে কাপঁছে। জ্বর আসবে বোধ হয়।” চিন্তিত কণ্ঠ তার। _”খাবার খেয়ে নিই চলুন। ওষুধ খেলে ভালো লাগবে। নাহয় রাতে আরও বেড়ে যাবে জ্বর।”

উমরান তার গলায় থাকা হাতটা বুকের দিকে টেনে নামান, _”হ্যাঁ জ্বর আসবে হয়তো তোমাকে না পেলে।”

শ্রেয়সী কিছু বলতে চাইল। কিন্তু উমরান থামিয়ে দেন। চোখে চোখ রাখেন বউয়ের। অত্যন্ত কাতর, আর পিপাসু তার দৃষ্টি। বুকটা তখনও তীব্র বেগে কাপঁছে। অতি নিকটে আনেন মুখটা। শ্রেয়সীর গালে নাক ঠেকিয়ে ফিসফিস কণ্ঠ তুলেন,

_”শুনো… আজ বাজে কাজ করব আমরা। তুমি ভয় পাবেনা ঠিক আছে? আমি আছি। একটু কষ্ট লাগবে। কিন্তু আমি আদর করে দেব। ভয় পাবেনা।” কথাগুলো বলার সময় তাদের অধর ছুঁয়ে গেল। শ্রেয়সী আনমনে এই ধরণের কিছু একটা আন্দাজ করছিল। স্বামীর কথা শুনে অজান্তে কেঁপে উঠল। সেই কম্পন আর চোখ দেখে উমরান বুঝলেন সে কি চাইছে শ্রেয়সী ধরতে পেরেছে। তার হাত বুক থেকে মুখের কাছে এনে চুমু খায়।

স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক বুঝে শ্রেয়সী, তবে দাম্পত্যের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের গভীরতা কতটুকু জানা নেই। শুধু জানে যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়, তা আর কারো সাথে হয়না। হলে সেটা খারাপ কাজ। কিন্তু মেজর বুঝিয়ে দিলেন সবটা। একটু আগে ছোট বলে থামিয়ে দেওয়া স্ত্রীকে বড় করে করে তুললেন নিজ হাতে। আদর্শ স্বামীর মতো সব শিখিয়ে পড়িয়ে কাছে টেনে নিলেন। যেখানে যেখানে শ্রেয়সী থেমেছে, দ্বিধায় পড়েছে, ভয় পেয়েছে। সেখানে সেখানে মেজর অভয় দিলেন, আগলে নিলেন স্ত্রীকে, শিখিয়ে দিলেন সবটা। দুটো দেহের মিলন হলো। ধীরে ধীরে আরাম পেয়ে মেতে উঠল চরম উন্মাদনায়। শ্রেয়সীর শীৎকারে নিস্তব্দ, খালি বাড়িটির প্রতিটি কোণা কেঁপে উঠল। মেজর উমরান তাওসিফের পাগলামির সাক্ষী হলো শ্রেয়সীর সাথে সাথে ঘরের প্রতিটি ইট, আসবাব। সদ্য সপ্তদশে পা দেওয়া শ্রেয়সীর জীবনে প্রথমবার অপার্থিব স্বামী সুখ বোঝার, আর অনুভব করার অভিজ্ঞতা হলো।

উমরান নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে শ্রেয়সীকে কাছে টেনে নিলেও, ভেবেছিলেন যথাযথ বয়স না হওয়ায় শেষদিকে অনেক ধকল পোহাতে হবে বউকে, সাথে তাকে আগলাতে গিয়ে নিজেকেও। কিন্তু শ্রেয়সীর অকস্মাৎ অনুপযোগী সময়ে স্বামীকে গ্রহণ করে নেওয়াতে তেমন অতিরিক্ত কোনো অসুস্থতা দেখা গেল না। সুন্দরভাবে সামলে নিল মেজরকে।

__

সময় কেটে যায়। মেজর আর শ্রেয়সীর মধ্যে কোনো ফাঁকফোকর নেই। সুন্দর চলছে জীবন। আদর ভালোবাসার কমতি নেই। মেজরের ডিউটি শুরু হলো, শ্রেয়সীর রেজাল্ট দিল। ভালো পাস করেছে। উমরানের চিন্তাভাবনা তাকে এখানের ক্যান্টনমেন্ট কলেজে দেওয়ার।

সব স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল। কিন্তু এর মাঝে উমরান অন্যকিছুর আভাস পান শ্রেয়সীর মধ্যে। উজ্জলতা বাড়ছে দিনদিন। তবে কিছু বললেই ক্ষেপে যায়, এই ভালো আবার এই খারাপ, যেকোনো কিছুর স্বাভাবিক ঘ্রাণ-গন্ধ সহ্য করতে পারেনা কিছুদিন ধরে। ধনে পাতার ঘ্রাণও গন্ধ লাগে। এমনকি প্রিয় খাবারের ঘ্রাণেও নাকি গন্ধ লাগে কখনো কখনো। বমি পায় তার। উমরানের সন্ধেহ হয়। শ্রেয়সীর পিরিয়ড সম্পর্কে তার চেয়ে উমরানের খেয়াল থাকে বেশি। সে তো নিজের ডেটই ভুলে যায়। এখন স্বাভাবিক ডেট পেরিয়ে গেছে চারদিন। তবে একদিন দুদিন এদিক ওদিক প্রতিমাসেই হয় শ্রেয়সীর । হয়ে গেলে তো চিন্তা নেই। তাও সেদিনই শ্রেয়সীকে ওষুধের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতো সে। কিন্তু তার আগেই খাওয়ার মাঝে হঠাৎ উঠে গিয়ে বেসিনে বমি করে ভাসিয়ে দিল। উমরান তাড়াতাড়ি যান। আগলে নেন পেছন থেকে। শ্রেয়সী আরো কিছুক্ষণ বমি করে ক্ষান্ত হয়। মেজর তার চুল গুছিয়ে তাকে পরিষ্কার করে দিয়ে পানি খাওয়ান। শান্ত করে পাজাকোলে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসেন, তাকে কোলে রেখেই সামনের ছোট টেবিল থেকে একটু লবন নিয়ে তার মুখে দেন। চিন্তিত কণ্ঠে শুধান,

_”শ্রেয়সী, তোমাকে ভালোবাসলে সকালে যে পিলগুলো দিই ওগুলো কি বাদ দিয়েছ কখনো?”

ক্লান্ত শ্রেয়সী স্বামীর বুক থেকে চোখ তুলে তাকায়। তার ওষুধ খেতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু মেজর আদর করলে যে ওষুধগুলো দেয় সেগুলো খেলে শরীরে ব্যাথা থাকবেনা বলেছিল। তার প্রথম প্রথম ব্যাথা করতো। এখন তো করেনা সেভাবে। তাই খায়না সে। কিন্তু মেজর এসব বুঝবেনা। ওষুধ খায়নি বললেই রেগে যাবে।

শ্রেয়সী ভাবতে দেখে চিন্তিত উমরান তার গালে হাত দিয়ে বলেন,

_”ডোন্ট লাই সোনা। আমি কিন্তু রেগে যাবো। তুমি কি পিল বাদ দিয়েছ কখনো? আমাকে জানাও।”

_”আমার ব্যাথা করেনা তাই খায়না, শুধু শুধু ওষুধ খেলে তো আরো অসুস্থ হয়ে পড়ব।”

বিরক্তিতে মুখ কুচকে নিল উমরান। মেয়েটা পিল বাদ দিয়েছে। মানে তার ধারণা ভুল। ভেবেছিল পিল ছাড়া নিজে সতর্কতা নিয়ে ওর কাছে যাওয়ার সময়তেই যা হওয়ার হয়েছে। তবু সন্ধেহ থেকে ওষুধের কথা জানতে চাইলো। কিন্তু এই মেয়ে আসলেই খায়নি…

_”আমি তো নিজেই খাইয়ে দিই প্রত্যেকবার। সেসব লুকিয়ে ফেলে দিতে তুমি?” কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চায় সে।

_”না। ওগুলো খেয়েছি। সেদিন ভোরবেলা কাছে এসে আবার ফোন পেয়ে ওষুধ খেতে বলে চলে গেছিলেন। তখন উঠতে মন চায়নি আর।”

মেজর কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। বিপদে ফেলে দিল এই মেয়ে। কোনোভাবে ধারণা ঠিক হলে কর্নেল স্যারের কাছে মুখ দেখাতে পারবেনা। কথা দিয়ে কথা রাখতে পারল না।

সেদিনই হসপিটাল গিয়ে টেস্ট করিয়ে নিলেন। ধারণা ভুল নয়। ডক্টর জানাল বমির আর খাবার খেতে না চাওয়ার কারণ গর্ভধারণ ছিলনা। খাবার হজমজনিত সমস্যার কারণে এসব হয়েছে। তবে সে সদ্য সন্তান গর্ভধারণ করেছে, এ কথাও সত্য। টেস্টে রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে।

শ্রেয়সী মেজরের এত চিন্তাভাবনা, পিল খাওয়া না খাওয়া -এসবের কাহিনী জানেনা। তবে জানল মা হবে। অবাক হলো, ভয় পেলো - তবে আনমনে খুশিই হলো। আস্তে আস্তে মা হবে এ কথা চিন্তা করতে করতে খুশির মাত্রা বাড়ল। তার একটা বাবু হবে - অন্যরকম লাগছে শুনতে। ভয় আনন্দ নিয়ে মিশ্র অনুভূতি। এদিকে উমরানের বাবা-মা খবর শুনে পরদিনই চলে আসলেন। পুরোপুরি খুশি না তারা। বরং চিন্তিত দেখাল। উমরান আর শ্রেয়সীর বিয়ে নিয়ে সবার অন্য পরিকল্পনা ছিল আগে থেকেই। এই বিষয়টা একেবারেই ভাবনাতে আনেনি কেউ। উমরান সামলে নেবে ভেবেছিল। তাই অপ্রত্যাশিত সুসংবাদে আনন্দের চেয়ে চিন্তিত দেখাল সবাইকে বেশি। যে মাসে শ্রেয়সী সতেরোতে পা দিয়েছে সে মাসেই বিয়ে হলো। এখনো তিনমাস হয়েছে বিয়ের, এর মধ্যেই গর্ভধারণ। তার ক্ষতির আশঙ্কায় প্রত্যেকেই চিন্তিত।

শ্রেয়সীর চেকাপ হলো। মুটামুটি ঠিক আছে সব, তবে লম্বা জার্নি আর উচু জায়গায় চলাচলে সম্পূর্ণ বাঁধা দিয়েছেন ডক্টর। হরমোনাল কিছু ইমব্যালেন্সের কারণে একটু এদিক ওদিক হলেই যেকোনো সময় বাচ্চা চলে যেতে পারে। তাই খুব সাবধানে থাকতে হবে। এতে যেন সকলের চিন্তা আরও বাড়ল। দীদুন চলে আসে তাদের কাছে। শ্রেয়সীর যেহেতু স্বামী আছে, তাই অসুস্থ নাতিদের আবদারে তাদের সাথে থেকে গিয়েছিলেন। আবার চলে আসলেন। উমরানের মাও আর ফিরলেন না। এই সময়টায় শ্রেয়সীকে নিজের সাথে নিয়ে যাবেন ঠিক করেছিলেন আসার সময় জার্নিতেই। ছেলে থাকবে তার ডিউটিতে। সারাদিন মেয়েটা একা। এসময় কতরকম সমস্যায় হয়!! কিন্তু জার্নি নিষেধ শুনে নিজেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। উমরানের তার প্রতি কর্নেলের নারাজগী চোখে পড়লো। তবে সে কিছু মনে করল না। নারাজ হওয়াই স্বাভাবিক।

সময় কেটে গেল। দীদুন, শাশুড়ি, স্বামী - প্রত্যেকের আদর, স্নেহের সাথে কাটছে শ্রেয়সীর অন্তঃসত্ত্বাকালীন সময়। অতিরিক্ত যত্ন আর দেখভালের দরকার পড়ছে। শ্রেয়সী যেন মাতৃত্ব অনুভব করতে শিখছে। কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। চিন্তাভাবনা নিজের চেয়ে নিজের ভেতর থাকা অংশটার জন্য বেশি হয়। তাকে নিয়ে ভাবতে মন চায় শুধু। মাঝে মাঝে খিটখিটে আচরণ করলে সবাই সামলে নেয়। উমরান যেন আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠল। আরো আগলে রাখছে স্ত্রীকে। তবে ভয়ে থাকে পরিবার নিয়ে। কারণ সাবেক কর্নেল সুলেমান আর রাওফান নিয়ে সুসংবাদ নেই। পালিয়েছে কোর্টে তোলার আগে। নিরাপত্তার জন্য নেওয়াজ কুঠির থেকে কোয়ার্টারে শিফট করেছেন সবাইকে নিয়ে। দীদুন আর তাহুরা চৌধুরী একরুমে থাকলে ঠিকঠাক হয়ে যায় সেখানে তাদের।

দেখতে দেখতে নানান অসুস্থতা-সুস্থতা, খারাপলাগা-ভালোলাগা-মুড সুইং-চেকাপ সব পেরিয়ে অনেকগুলো মাস কেটে গেল। আট মাস তেরো দিনের মাথায় শ্রেয়সীর প্রসব বেদনা উঠল। যদিও আরও দুদিন পর ডেট দিয়েছিল। উমরান তখন ঘুমের মধ্যে হাশফাশ করা স্ত্রীর হাত পা মেজে দিচ্ছিলেন, প্রত্যেকবার যেমন অস্বস্তিবোধ করে রাত হলে, তেমনই ভেবে। কিন্তু অস্বাভাবিক শ্বাসগতি দেখে লাইট জ্বালিয়ে আবার কাছে আসবে, তার আগে শ্রেয়সীর চিৎকারে সবার ঘুম ছুটে যায়। দীদুন আর তাহুরা চৌধুরী ছুটে আসেন। তাদের গল্প করতে করতে মাত্রই চোখ লেগেছিল। বিগত দুচারদিন ধরে রাতে কেউ ঘুমায়না শ্রেয়সীর কারণে, ঘুমের মধ্যেও সজাগ থাকা ধরণের অবস্থা। শ্রেয়সীর চিৎকার বাড়ছে, যন্ত্রণা বাড়ছে। উমরান কল দিয়ে তার পাশের ফ্ল্যাটে থাকা সহকর্মী রায়হানকে গাড়ি বের করতে বলেন, শ্রেয়সীর ওয়াটার ব্রেক করেছে। উমরান তাকে কোলে নিয়ে নিচে নেমে যান তৎক্ষণাৎ। দীদুনকে বাসায় রেখে তাহুরা চৌধুরীও দরকারি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ছুটেন ছেলের পেছন পেছন। শ্রেয়সীর চিৎকারে কোয়ার্টারে অন্যান্য সৈন্যরা আর তাদের স্ত্রী-সন্তানেরা জেগে গেল। আর কারো ঘুম হলো না। দীদুন চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। তাকে মেজর রায়হানের স্ত্রী সামলালো।

শ্রেয়সীর যেকোনো সময় পেইন উঠলেই ডেলিভারি যেন তাড়াহুড়া ছাড়া, কোনোরকম বাঁধা বিপত্তি ছাড়া, সুষ্ঠুভাবে হয়ে যায় - ওলিওল্লাহ চৌধুরী সে ব্যবস্থা তিন/চার মাস থাকতে বাচ্চার ভ্রূণ অবস্থাতেই করে রেখেছেন এখানকার হস্পিটালে। কিছুক্ষণ পর খবর এলো নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না, সি সেকশন লাগবে। দীদুন জায়নামাজ পেতে বসলেন সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে।

হস্পিটালে কর্নেল কিবরিয়া, মেজর রায়হান, উমরান আর তাহুরা চৌধুরীসহ উমরানের ঘনিষ্ঠ আরও একজন জুনিয়র অফিসার আছে। ওটিতে ঢুকানোর ঠিক ছত্রিশ মিনিট পর বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনা গেলো। প্রত্যেকের অস্থির পায়চারী থামলো। উমরান চেয়ারে বসেছিলেন দুহাটুতে কনুই ঠেকিয়ে হাতে মুখ ঢেকে। শ্রেয়সীর প্রতিটি চিৎকার কানে বাজছে তখন তার। বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতেই একটা গভীর শ্বাস টানতে দেখা গেল। উঠলেন না বসা থেকে। সবাই ওটির দরজা খোলার অপেক্ষায়। শেষে লাইট নিভতেই দরজা খুলে ডক্টর বের হলেন। প্রত্যেকে এগিয়ে গেল। কোলে একটা ছোট্ট প্রাণ। শ্রেয়সীর মেয়ে বাবু হয়েছে।

বাচ্চার কণ্ঠ সরাসরি কানে আসতেই উমরান উঠে এগিয়ে এলেন। ছোট প্রাণটার দিকে তাকালেন। ক্ষীণ স্বরে আওয়াজ তুলে কাঁদছে তখনো। ডক্টর বাচ্চার বাবার কাছে বাচ্চাকে তুলে দিতে চাইলেন সবার আগে।

_”কংগ্র্যাচুলেশনস, মেয়ে বাবু হয়েছে আপনার।”

_”আমার ওয়াইফ…”

_”শি ইজ টোটালি ফাইন। আউট অব ডেঞ্জার। একটু অব্জারবেশনে রাখলে হবে।”

প্রত্যেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে উমরান সবার আগে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। সময় নিয়ে দিলেন মেয়েকে ঠোঁটের আদুরে স্নেহের ছোঁয়া।

তারপর তাহুরা চৌধুরী নিয়ে নিলেন। মহিলার খুশির অন্ত নেই। দীদুনের ফোন আসছে, ডক্টরদের কাছে উমরানের বাবার ফোন আসছে মিনিটে মিনিটে। ভদ্রলোক রাস্তায় আছেন। আগামীকালই চলে আসার কথা ছিল বান্দরবান। কিন্তু সুসংবাদ আজই চলে আসলো। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের উপর কোনো কথা নেই।

__

শ্রেয়সী বেডে শুয়ে আছে। দূর্বল চোখ দুটো খুলে ঝাপসা নেত্রে সবার আগে বাচ্চা কোলে নিয়ে তার সামনে দাড়ানো স্বামীকে দেখল। আদর করছে কিছু বলে বলে। শ্রেয়সীর চোখ দুটো কোলের ছোট্ট প্রাণটাকে একটু কাছ থেকে দেখতে চাইছে। স্বামীর দিকে চোখ তুলে তাকাল। তখনই উমরান শ্রেয়সীকে চোখ খুলতে দেখলেন। এতক্ষণ বসেই ছিলেন স্ত্রীর পাশে। বাচ্চা কাদঁছে বলে একটু হাটছিলেন। শ্রেয়সীকে চোখ খুলতে দেখে কাছে আসলেন। শ্রেয়সী অল্প একটু হাত বাড়িয়েছে, অর্থাৎ বাচ্চাকে খুজঁছে। উমরান দিলেন। তার পাশে যত্ন করে শুয়ে দিলেন কন্যাকে। শুইয়ে দিয়ে মা-মেয়েদুজনকে কপালে চুমু খেয়ে চেয়ার টেনে বসলেন খুব কাছে।

_”আমার মেয়ে। কার মতো দেখতে লাগছে শ্রেয়সী?”

_”আমার মতো…” দূর্বল কণ্ঠ তার

_”উহু, ভুল। তুমি দেখ। চোখ দুটো আমার।”

শ্রেয়সীর অভিমান হলো। তার পেটে থেকে, লা ‘তি গুতা মে ‘রে এখন পাপার মতো হলো তার মেয়ে? আর সে যে এতগুলো দিন জেদ ধরে বলেছিল তার বাচ্চা তার মতো হবে?

_”মিথ্যা বলছেন। আমি ঠিক করে দেখতে পারছিনা বলে মিথ্যা বলছেন। আমার মতো হয়েছে আমি জানি।”

শ্রেয়সীর পাশে শুইয়ে দেওয়ায় সে আসলেই ঠিকঠাক মেয়েকে দেখতে পারছেনা দূর্বল শরীরে নড়চড় করে। উমরান উঠে মেয়েকে কোলে নিয়ে তার মায়ের সামনে ধরলেন। একদম কাছে নিয়ে দেখালেন। শ্রেয়সীর মন দিয়ে দেখল মেয়েকে। চোখ জুড়িয়ে গেল বুঝি তার। এও দেখল, চোখ দুটো তার মতো লাগছে। বিশেষ করে পাপড়িগুলো তার মতো ঘন। মেজর মিথ্যা বলে তাকে ভয় দেখিয়েছে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে তার। হাঁল্কা স্বরে বলে,

_”আমার মেয়ে আমার মতো।”

মেজর দেখলেন সদ্য বাচ্চা জন্ম দিয়েও স্ত্রীর বাচ্চা বাচ্চা কাণ্ডখানা। চোখ জুড়িয়ে দেখে অল্প হাসলেন। আরেকটু কাছে এগিয়ে দিতেই শ্রেয়সী মেয়ের কপালে চুমু খেল।

_”ওর নাম কি রাখবে?”

_”মা নাম দিয়েছিল একটা। ওটা সুন্দর।”

_”কি নাম?”

_”উষশী।”

উমরান মা এই নাম ঠিক করেছে জানতেন না। বেশ ভালো লাগল নামটা। তাদের দুজনের সাথে মিলিছে।

_”উষশী তাওসিফ চৌধুরী। আমার মাম্মা…” কথাটি বলে স্ত্রীর পাশে শুয়ে থাকা মেয়েকে আদর এঁকে দেন গালে। হাত পা নেড়ে একটু ‘উউ…’ শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। শ্রেয়সী হেসে উঠে। মেয়ে যাই করে দেখতে ভালো লাগছে। পাপার আদর খেয়ে কে ছুঁলো নারাজ সে, বুঝল শ্রেয়সী।

শ্রেয়সী মেয়ের কাণ্ড দেখে হাসছিল। আকস্মিক মেয়ের কাছ থেকে সরে এসে উমরান তার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলেন। আদুরে ভাবে ছুইঁয়ে দিলেন। গালেও আদর এঁকে দিলেন স্ত্রীর। তারপর কানের কাছে মুখ এগিয়ে ফিসফিস কণ্ঠে বলে,

_"তোমাকে ধন্যবাদ শ্রেয়সী। আমার শ্রেয়সী, আমার সন্তানের মা। তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি।"

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ১৪ গল্পের ছবি