কেটে গেছে চারদিন। মেজর উমরান মিশন থেকে ফিরেছেন। এটাই ছিল তার প্রথম মিশন হেড হিসেবে দায়িত্ব পালন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু মসৃণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সিনিয়ররা তার প্রশংসা করেছেন বেশ। সবচেয়ে বড় কথা মিশনে কোনো সৈন্য গুরুতর আহত হয়নি, এটিও তার অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে। মিশন শেষে পেয়েছেন লম্বা ছুটি। অন্যান্য ছুটিতে বাড়ি যাওয়াই হয় মূল উদ্দেশ্য, কিন্তু এবার সে পরিকল্পনা বদলে গেছে। কারণটা শ্রেয়সী। বাবা-মা যেহেতু বলেছে একবার বান্দরবান আসবেন। উমরান ঠিক করেছে, তারা এলে যা করার করবে, তারপর তাদের সাথে একসাথেই বাড়ির পথে রওনা হবে। কিন্তু বাবার জরুরি সার্জারি থাকায় আসতে দু’একদিন দেরি হবে জানিয়েছে মা। তাই অপেক্ষাতেই আছে উমরান।
চারদিন কেটে গেলেও উমরান এখনো দেখতেই পেল না পুঁই পাখির শ্রেয়সী সুন্দরীকে। আশ্রমে নেই, আশেপাশে নেই, কোথাও দেখা মেলে না তার। নেওয়াজ কুঠিরের সামনের রাস্তায় উমরান কয়েক দফা গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করেছে, শুধু এক ঝলক তাকে দেখার আশায়। কিন্তু না, সে মুখ আজো ধরা দেয়নি। সকালে হাঁটতে বের হলে নেওয়াজ কুঠিরের পথ ধরেই ঘুরে আসে সে; কিন্তু টিকিটুকুরও দেখা মেলেনি। পুঁই পাখির সাথে মাঝে মাঝে দেখা করবে বলেছিল মেয়েটি, সেটিও হলো না। কোথায় গেল সে? আজ সকাল থেকে অজান্তেই একটা দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করছে।
ছুটি চলছে, ডিউটির ঝামেলা নেই। তাই সরাসরি আশ্রমেই গেলেন উমরান। বাচ্চাদের জন্য কিছু খেলনা, খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে জানতে পারলেন, বাচ্চাদের ‘পরী’ নাকি চারদিন ধরে অসুস্থ। সেদিন এক রাতে খুব ভয় পেয়েছিল সে; এরপর থেকেই ঘর থেকে বেরোয় না একেবারেই।
উমরানের কপালে ভাঁজ পরে। রাতে ভয় পেয়েছে? বাচ্চাদের এই শ্রেয়সী পরীকে তাড়া করলে করবে উমরান নামের জ্বীন। কিন্তু সে তো কিছুই করেনি। তবে কোন ভুতে তাড়া করলো আবার এই মেয়েকে?
আশ্রম থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। মিশন শেষে প্রথম দিন সেনানিবাসে এসেছিলেন, এরপর আর আসা হয়নি। বেরোতেই পাশের চায়ের দোকানে অন্য এক মেজরকে দেখতে পেলেন। তার সঙ্গে বসে কিছুক্ষণ গল্প করলেন, কিন্তু মনে মনেই অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েটার হঠাৎ এমন অন্তরালে চলে যাওয়া কি সত্যিই শুধুই অসুস্থতা?
_”তো!! চারদিন কেটে গেলো ছুটিতে আছেন, বাড়ি ফিরছেন না? কোনো কাজ আছে এখানে?”
ওয়ান টাইম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উমরান মাথা নেড়ে জবাব দেন,
_”হ্যাঁ, তেমনই কিছু।”
_”এখানে দরকারি কাজ? আপনার বাড়িতো চট্টগ্রাম। যতদূর জানি এখানে তেমন কোনো আত্মীয়, চেনা জানা বা কাজের সুত্র নেই।”
_”একান্ত ব্যক্তিগত কাজ।”
অপর মেজর কিছুটা হেসে বলেন,
_”আচ্ছা। বুঝতে পারছি।”
মেজর উমরান কিছু বললেন না। তাকে এখনো চিন্তিত দেখাচ্ছে,
_”কিছু নিয়ে টেন্সড উমরান?”
_”তেমন কিছুনা… উম, রায়হান। আমার মিশন থেকে ফেরার দিনের পর কর্নেল কিবরিয়া কি আর এসেছিলেন সেনানিবাস?”
_” এসেছিলেন, ভীষণ মেজাজ খারাপ ছিল। কর্নেল সুলেমান স্যারের সাথে ঝামেলা হয়েছে কিছু নিয়ে।”
উমরানের কপালে ভাঁজ পরে,
_”কর্নেল সুলেমানের সাথে ঝামেলা বলতে? কি নিয়ে? কোনো আইডিয়া আছে?”
_”যতদূর শুনলাম কিবরিয়া স্যারের বন্ধু হামিদ নেওয়াজের মেয়ে আর সুলেমান স্যারের ছেলে নিয়ে ঝামেলা।”
উমরান সঙ্গে সঙ্গে তাকালেন সহকর্মী রায়হানের দিকে ফিরে। চোখে চোখ রাখলেন। তার শান্ত, কঠিন, সংযত মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ জমে উঠল। চিন্তিত-উদ্বিগ্ন চেহারাটায় কিছুটা কাঠিন্য লক্ষ্য করা যায়। তবুও শান্ত সদাগম্ভীর মুখটা।
_”শ্রেয়সীর আর রাওফানকে নিয়ে ঝামেলা বলতে?”
মেজর উমরান স্বভাবগতভাবে কাঠখোট্টা ও কঠোর, বিশেষত ডিউটির সময়। অফ-ডিউটিতেও সহকর্মীদের সাথে এমন কঠিন সুরে তিনি সাধারণত কথা বলেন না। মেজর রায়হান বুঝতে পারলেন, কিছু একটা উমরানকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তাকান উমরানের দিকে। শ্রেয়সী আর রাওফান - এমনভাবে নাম দুটো নিল যেন তাদের সাথে পূর্বে কথা হয়েছে। কিংবা কোনো রকম পরিচয় আছে। মেজর রায়হান উমরানের ভাবভঙ্গিতে লক্ষ্য রেখেই বলেন,
_”হ্যাঁ, তাই শুনলাম। রাওফান ছেলেটা নাকি হামিদ নেওয়াজের কন্যাকে বিরক্ত করে। মেয়েটির পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিন, আশ্রম থেকে যেতে সময় নাকি একা পেয়ে তাকে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছে। মেয়েটা কোনোভাবে পালিয়েছিল। এই নিয়ে বোধ হয় ঝামেলা।”
মেজর উমরানের হাতে থাকা ওয়ান টাইম চায়ের কাপটা ধীরে ধীরে মুচড়ে যেতে দেখা গেল। পায়ের অল্পসল্প নড়চড়, আর হাতের রগগুলোর ফুলে উঠা, আঙ্গুলগুলোর একটার সাথে অন্যটার ঘর্ষণ বলছে অনলের আবির্ভাব ঘটছে সারা দেহে। তীব্র রাগ নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে ভেতরে ভেতরে।
_”ইস এভ্রিথিং ওকে মেজর?”
_”ইয়াহ…অল ফাইন। আপনি চা- টা ইনঞ্জয় করুন। আমি উঠছি। জরুরী কাজ আছে।” উমরান উঠে যান। মেজর রায়হান তার চলে যাওয়া দেখলেন সজাগ দৃষ্টিতে। মনে মনে ভাবলেন ঘটনার মাথামুণ্ডু ঠিক মিলছে না, কিন্তু… যদি তার অনুমান সত্যি হয় তাহলে মন্দ হবে না।
___
উমরান ফোন দিয়ে জরুরী ভিত্তিতে কর্নেল কিবরিয়াকে ডেকেছেন। নয়তো প্লেস দিতে বলেছেন, সে যাবে দেখা করতে। কর্নেল সাহেবের নিজেরও সেনানিবাস কাজ ছিল। তাই তিনি আসছিলেনই।
তিনি আসলে মেজর যান সেনানিবাসে কর্নেলের অফিস রুমে। দুজনে সামনা সামনি বসে আছে। কর্নেল সাহেব কিছু ফাইলপত্র ডেস্কে ঢুকিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসেন।
_”হ্যাঁ, উমরান। বলো কি বলবে? দরকারি কিছু মনে হচ্ছে।”
_”ইয়েস স্যার, খুব দরকারি।” কর্নেলের সামনে টেবিলের এপাশে বসে আছে সে। শান্ত ভাবেই জবাবটা দিল।
কর্নেল তার সামনে বসে থাকা উমরান পানে তাকান। উদ্দেশ্য সে কি বলতে চাইছে শুনা।
_”সুলেমান স্যারের সাথে শুনলাম আপনার ঝামেলা হয়েছে।”
কর্নেল কপালে ভাঁজ ফেলে বলেন,
_”তোমাকে কে বললো। আর এই নিয়ে তোমার দরকারি কি কথা থাকতে পারে?”
উমরান সোজাসুজি জানতে চান,
_”শ্রেয়সী আর রাওফান নিয়ে ঝামেলা?”
_”হ্যাঁ, এই নিয়ে কিছু বলতে চাইছ?”
_”বিস্তারিত জানতে চাইছি শ্রেয়সীর নামের পাশে রাওফানের নাম কেন থাকবে আর কতটুকু ঝামেলা?”
উমরানের কথার ভঙ্গিতে সম্মান রেখেও অদৃশ্য কোনো নাখোশভাব প্রকাশ হলো কর্নেলের প্রতি। কর্নেল সাহেব নিজের সম্মুখে উমরানকে প্রফেশনালভাবে দেখেছেন। কিন্তু আজ তাকে অন্যরকম লাগছে। তার অতিগম্ভীর চেহারাখানা দেখলেন বিচক্ষণ কর্নেল কিছুপল। অতঃপর বুঝলেন মনে হলো কিছু। হয়তো ওলিওল্লাহ সাহেব ছেলেকে শ্রেয়সী সম্পর্কে কিছু বলেছে। তাই এই অধিকারবোধ শ্রেয়সীকে নিয়ে।
_”সেদিন ওকে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছে। শ্রেয়সী পালায় কোনোভাবে। জানা গেছে রাওফান ওকে তুলে নিয়ে বিয়ে করতে চেয়েছে। এরপর পরপর দুবার একই কাজ করার চেষ্টা করে। না পেরে আর শ্রেয়সীর থা প্প র খেয়ে ক্ষেপে যায়। চারদিন আগে গভীর রাতে নেওয়াজ কুঠির গেছিল কিছু ছেলেপেলে নিয়ে। উদ্দেশ্য ওকে তুলে নিয়ে যাওয়া। ধর্মীয়ভাবে বিয়ে করে নেওয়া। ভেবেছে ওদের একবার বিয়ে হয়ে গেলেই আমি মেনে যাব। ওকে তুলে দেব রাওফানের হাতে। এই নিয়ে সুলেমান সাহেবের সাথে তর্ক হয়েছে আমার। কিন্তু তিনি উল্টো শ্রেয়সীকে উনার ছেলের জন্য দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। এই নিয়ে কিছু ঝামেলা।”
কথাগুলো উমরানের দিকে তাকিয়েই বলেন। খেয়াল করেছেন কথাগুলো শুনার সময় তার চোখের কাঠিন্য, আর চোয়ালের দৃঢ়ভাব।
উমরান সরাসরি চোখ তুলে তাকান কর্নেলের দিকে,
_”কি জবাব দিয়েছেন প্রস্তাবের?”
_”কিছুই জানায়নি। আমি আপাদত ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু হ্যান্ডেল করতে চাইছি। সুলেমান সাহেবকে নিয়ে কিছু একটা করতে হবে সামনে।”
উমরানের দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণের কারণে চোয়াল নড়চড় করতে দেখা গেল। না চাইতেও রেগে যাবে, আর অযাচিত রাগ কর্নেলের সামনেই প্রকাশ করে ফেলবে ভেবেছিলেন কর্নেল সাহেব। কিন্তু দেখা গেল কপালে হাত ঘষে ভীষণ শান্ত স্বরে আওয়াজ তুললেন উমরান,
_”আগামী পরশু বোর্ড মিটিং ডাকুন স্যার। কর্নেল সুলেমানকে এক্সপোজ করব। রাওফানকেও বের করব। একদিনও দেরি করতে চাইছিনা।”
_”কিন্তু…”
_”সরি, স্যার। একদিনও দেরি করতে চাইছিনা। আপনার বেশি সমস্যা হলে আমাকেই ব্রিগেডিয়ার স্যারের কাছে বোর্ড মিটিং এর জন্য আপিল করতে হবে।”
_”উমরান। বুঝতে পারছি তোমার বাবা-মা শ্রেয়সীকে নিয়ে কিছু জানিয়েছে তোমায়। তাই তোমার রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শুনো। শ্রেয়সীর কিছু আমি হতে দেব না। আর সরাসরি এক্সপোজ করা মানে ক্ষেপিয়ে দেওয়া সুলেমান সাহেবকে। একান্তে করতে হবে এসব। মিটিং ডেকে সবার সামনে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুললে সুলেমান সাহেব তোমার উপর প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠবেনা তার কি গ্যারান্টি? এর চেয়ে একান্তে সবকিছু ব্রিগেডিয়ার স্যারের কাছে সাবমিট করবে। সেই যা পদক্ষেপ নেওয়ার নেবে। তোমার নামও সামনে আসবেনা। সামনা সামনি এক্সপোজ করা মানে নিজের শত্রু বাড়ানো।”
_”শত্রু হলে, শত্রুতা নেভাবো। আগে সুলেমান সাহেব, আর রাওফান -দুজনকেই কমিটি আর পদ থেকে, চাকরি থেকে বের করতে চাইছি। নাহয় আমি কিছু একটা করে ফেলব স্যার…… আপনি বুঝতে পারছেন না!! আগামী পরশুই হবে যা হওয়ার।”
_”কিন্তু…”
_”স্যার প্লিজ, আই ইন্সিস্ট। কাল একদিন সময় দিচ্ছি। পরশু বোর্ড মিটিং চাই। নাহয় আমিই করবো যা করার।” অনুরোধ কম, হুম’ কি বেশি শুনাল তার কথা।
উমরানের কথা ভেবেই আপত্তি করছিলেন কর্নেল। কিন্তু সে যখন বুঝতে চাইছেনা, দোনোমনা সত্ত্বেও মেনে নিলেন।
_”আচ্ছা। আমি করছি ব্যবস্থা।”
মেজর তাও উঠলেন না। কর্নেল ভেবেছিলেন উমরানের কথা শেষ। তাকে বসে থাকতে দেখে তাকান চোখ তুলে। চেয়ারে বসে আছে। মাথা ঝুকিয়ে একটু আগের রুডভাষী পুরুষটি কিছু ভাবছে। কর্নেল আর কিছু বলার আছে কিনা জানতে মুখ খুলতেই যাচ্ছিলেন। এর আগে মেজর মাথা তুলে অকস্মাৎ বলেন,
_”আজ শ্রেয়সীকে বিয়ে করবো স্যার। ওর আর আমার বিয়ে হবে আজ। বিকেলের দিকে আসছি নেওয়াজ কুঠির আপনার মিত্রকন্যাকে বিয়ে করতে। কোনো সমস্যা বা আপত্তি থাকলে জানান। আমি আপনার সব আপত্তি মিটিয়ে দিচ্ছি।”
কর্নেল প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না কি বললো উমরান। প্রশ্নাত্মক চোখে তাকান। কিন্তু উমরান শান্ত, দৃঢ় আর আত্মবিশ্বাসী নজরে চেয়েই আছে তার চোখ চোখ রেখে। কর্নেল বুঝলেন ভুল কিছু শুনেন নি। ছেলেটা মাত্রই বললো সে শ্রেয়সীকে বিয়ে করতে চাইছে আজ। তাও তিনি বলেন,
_”বুঝলাম না কি বলছ।”
_”না বুঝার কিছু নেই। আপনার বন্ধুর মেয়ে। যার জন্য আমাকে পছন্দ করে আমার বাবা মায়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তাকে আমিই আজ বিয়ে করতে চাইছি। যেহেতু ওর জন্য আমাকে আপনি আগে থেকেই পছন্দ করেছেন, তাই আশা করি আজই বিয়ে হওয়া নিয়ে অল্প একটু দোনোমনা থাকলেও, শ্রেয়সীর পাশে আমাকে নিয়ে ঘোর কোনো আপত্তি থাকছেনা।”
_”তোমাকে পছন্দ বলেই ওলিওল্লাহ সাহাবের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি উমরান। বুঝতে পারছি কিছুটা রেগে আছ। কিন্তু আজ বললেই আজ! এটা কেমন কথা? শ্রেয়সি এখনো ছোট। ছেলেমানুষী করছ?”
_”ছেলেমানুষীর কিছু নেই স্যার। এদিকে আমি নিজের ভেবে নিয়েছি ওকে। আর আপনি অন্য কেউ প্রস্তাব দিলে তাকে সোজা প্রত্যাখ্যান করে না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখছেন। সরি স্যার, বাট আমি এখন আপনার কাছে শ্রেয়সীকে সেইফ মনে করছিনা। যেকোনো সময় আবার না কাকে বলে দেন যে, তাকে দিতে চান মেয়ে। আমি এই রিস্ক নিতে চাইনা আ’ম এক্সট্রিমলি সরি। আর না তো আজকের পর শ্রেয়সীকে আর নিজের থেকে দূরে রাখছি - যে রাত বিরেতে নিজেকে আনসেফ লাগবে তার। আমার স্ত্রীরুপে নিরাপদে আমার পাশে, আমার ঘরে চাই ওকে। আজই হচ্ছে বিয়ে।”
_”শ্রেয়সী বাচ্চা একটা মেয়ে উমরান। কথা ভেবেচিন্তে বলো। এত সহজ না সবকিছু, ও এখনো অনেক ছোট। বিয়ে মুখে মুখে বলার কথা নয়। বিয়ের পর মেয়েদের জীবনের অনেক কিছু বদলে যায়। অনেক দায়িত্ব-কর্তব্য। মেনে নিলাম তুমি ওর উপর দায়িত্ব তুলে দেবেনা এত তাড়াতাড়ি। কিন্তু এছাড়াও সব মিলিয়ে আগের মতো কিছুই থাকেনা বিয়ের পর, অনেক কিছু বদলে যায় না চাইতেও। আর তুমি এতটাও ছোট নও যে বুঝবেনা আমি ঠিক কি বুঝাতে চাইছি।”
উমরান গাঢ় শ্বাস টেনে একটু থেমে বলেন,
_”আপনি এই নিয়ে চিন্তামুক্ত থাকুন। আমি সব সামলে নেব। আমার কারণে শ্রেয়সীর কোনো ক্ষতি হবেনা। আই প্রমিস! বাঁধা দেবেন না প্লিজ, আজই ওকে আমার নামে চাই স্যার।”
কর্নেল কিবরিয়া সামনে বসে থাকা মেজর পদের অফিসারটিকে দেখেন মন দিয়ে। প্রাপ্তবয়স্ক, দায়িত্ববান অফিসারটি বুঝজ্ঞান হারিয়ে অনৈতিক একটা প্রস্তাব রাখছে, তাও কোথাও একটা সন্তুষ্ট দেখাল কর্ণেলকে। প্রিয় বন্ধুর মেয়ের জন্য এই ছেলেকে পছন্দ করেছিলেন, কিন্তু ছেলেটা আগে থেকেই শ্রেয়সীকে মন দিয়ে বসে আছে বুঝতে পারেন নি। তিনি তো ভেবে রেখেছিলেন উমরান বিয়েতে আপত্তি করবে শ্রেয়সীর বয়স কম হওয়ায়। বাবা মায়ের কথায় রাজী হলেও প্রথম প্রথম কোথাও একটা নারাজগী থেকে যাবে মেয়েটাকে নিয়ে। কিন্তু তার ভাবনা-চিন্তার আগেই নিজে মন দিয়ে রেখেছে শ্রেয়সীকে। মন্দ না ব্যাপারটা।
_”বেশ!! তাই হোক। এসো আজ নেওয়াজ কুঠির। আমি মেয়ে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবো।”
__
উমরান বাবা-মাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে, যে আজ বিয়ে করছে তাদের প্রস্তাবিত মেয়েকে। ওলিওল্লাহ চৌধুরী আর তাহুরা চৌধুরী হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলে উমরান সবটা খুলে বলেন। কিন্তু তার বাবা মায়ের মন মানছেনা। একমাত্র ছেলের এমন তাড়াহুড়ো বিয়ে কোনোভাবেই চান না তারা। তার উপর শ্রেয়সীকে নিয়ে এত ঝামেলা শুনে কোথাও একটা দ্বিধা কাজ করছে তার মায়ের মনে। আগে ওকে দেখলে একটা কথা ছিল। মেয়েটার স্বভাব-চরিত্র-চালচলন এসব সম্পর্কে জানাশুনা থাকলে নিশ্চিন্তে নাহয় মত দিতেন। কিন্তু কিছুই জানেন না মেয়েটা সম্পর্কে। এভাবে ছেলে পছন্দ বলে বিয়ে করে নিচ্ছে?
উমরান তাদের বিষয়টা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সে জানে শ্রেয়সীকে সামনা সামনি দেখলে এসব দ্বিধাদন্ধ আর থাকবেনা বাবা মায়ের মনে। তাই আপাদত কিছু না বলে শুধু অনুমতিটুকু নিলো। তার বাবা মাও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারলেন না।
__
তখন বিকেল,
উমরান তাওসিফ ছুটিতে থাকা সত্ত্বেও অফিসে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে চলে যান নেওয়াজ কুঠিরের উদ্দেশ্যে। কর্নেল সাহেব নিজেও একটু আগেই এসেছেন। মাকে সবটা জানান। বৃদ্ধা আপত্তি করেন নি। উমরানকে শ্রেয়সীর জন্য আগেই তো ভেবেছিল তারা। আপত্তি থাকার মানে হয়না। বিশেষ করে কদিন ধরে যেভাবে আতঙ্কে আছে মেয়েটা। তিনি বয়স্ক মানুষ আর কতদিনই বা থাকবেন? উপরওয়ালার ডাক আসার আগে শ্রেয়সীকে যোগ্য কারো হাতে তুলে দেওয়ায় একমাত্র চাওয়া ছিল। তাই আপত্তি থাকার মানেই হয়না। বরং আজ তার খুশির দিন।
কাজী সময় হলে চলে আসবে, কর্নেল সাহেব জানিয়ে রেখেছেন। উমরান বলেছিল সেনানিবাস থেকে কয়েকজন বিশ্বস্ত অফিসারকে সাথে আনবে যাদের সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু মা-ছেলে এতক্ষণ আলোচনা করেও শ্রেয়সীর কানে বিয়ের কথা তুলতে পারলেন না। বড্ড দ্বিধায় আছেন মেয়েটাকে কিভাবে বিয়ের কথা জানাবেন, আর রাজীই বা কিভাবে করাবেন …
উমরান দুজনকে সাথে নিয়ে এলেন। একজন সহকর্মী মেজর রায়হান আর অপরজন জুনিয়র এক অফিসার। দীদুন তাদের বসতে দিলে, বাকিরা বসলেও উমরান বসলেন না। শ্রেয়সীর সাথে একান্তে দেখা করতে চাইছেন। দ্বিধাদন্ধ নিয়ে দীদুন শ্রেয়সীর রুমে দিয়ে আসেন তাকে।
শ্রেয়সী তখন ব্যাল্কনিতে। বাড়িতে কতকিছু হয়ে যাচ্ছে তাকে নিয়ে। অথচ এসবের কোনো ধারণা নেই তার। ব্যাল্কনি থেকে বাড়িতে পরপর দুটো গাড়ি আসতে দেখেছে সে। কিন্তু পাত্তা দেয়নি। এ চারদিনে এমন কত গাড়ি এসেছে সেনাদের। তাছাড়া বাড়ির চারদিক সেদিন থেকেই কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা। একটা সরু সাদা বেঞ্চিতে বসে ব্যাল্কনির রেলিংএ কনুই অব্দি হাত বিছিয়ে তাতে মাথা ফেলে রেখেছে সে। আকাশ দেখছে আর গুণগুণ করে গান গাঁইছে। আর কোনো কাজ নেই তার। বাইরেও যেতে ভয় করে। ভেবেছিল কত মজা করবে পরীক্ষার পর। কিন্তু সবকিছু পানশে হয়ে আছে।
_”শ্রেয়সী?” খুব কাছে থেকে ভেসে আসা কণ্ঠ। কে সেটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। পাশে ঘাড় কাত করে তাকাতেই দেখল মেজর। তার পাশে এসে বসেছেন। ভ্রুকুটি করে সে জবাব দেয়,
_”আপনি? এখানে কি করছেন?”
_”এসেছি, তোমার সাথে কথা বলতে।” বড্ড শান্তভাবে স্বরে তার পাশে বসে জবাব দিলেন মেজর
_”আমার সাথে আপনার কি কথা?”
_”আছে কিছু।” হাল্কা স্বরে শুধু এটুকুই বললেন তিনি।
শ্রেয়সী তাকে আপাদমস্তক দেখে। শরীরে আটসাট করা শাঁর্ট, হাতা গোটানো কনুই পর্যন্ত, ফর্মাল প্যান্ট, হাতে সেই চিরচেনা রোলেক্স ঘড়ি। শার্টের ওপরের বোতাম খোলা। বুকের লোম ঝিলিক দিচ্ছে। তার পাশে বসার কারণে পুরুষালি সুগন্ধ গাঢ় হয়ে নাকে আসছে। এক অদ্ভুত অস্বস্তি বোধ হলো তার। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। উমরান তা-ই লক্ষ্য করে স্বল্প হাসলেন নিঃশব্দে। কথা আছে বলেও কিছু বলছেনা দেখে শ্রেয়সী নিজেই সামনে দৃষ্টি রেখে বলে,
_”আপনি না মিশনে ছিলেন? চলে এসেছেন?”
_”হ্যাঁ, চারদিন হলো এসেছি।”
_”ওহ। আমার সাথে কি কথা? আর কখন এলেন?”
_”এসেছি আরকি! তোমার তো দেখা পাওয়া যায়না। তাই আমিই এলাম।”
তাকে আজকাল বাইরে দেখা যায়না এটা এই মেজরও খেয়াল করেছে। পরীক্ষার পরও এমন ঘরবন্দি জীবন কাঁটাতে হচ্ছে কথাটা মনে পড়ায় শ্রেয়সীর বদনখানি মলিন হলো।
_”আশ্রমে আসো না কেন? কোথাও দেখা যায়না আজকাল।” সহজ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন মেজর, সে চাইছেই কথায় কথায় শ্রেয়সীকে সহজ করে তুলতে এই মুহূর্তে। বোধ হয় কাজও করলো তার চাওয়া,
_”এমনিই, বাইরে যেতে ভয় করে আমার।” ম্লান কণ্ঠে জবাব দেয় শ্রেয়সী
_”এভাবে বাড়িতে থাকতে সারাদিন ভালো লাগে?”
_”একটুও না।”
_”পুঁই পাখিকে মাঝে মাঝে দেখতে চেয়েছিলে। অথচ ওকেও দেখতে এলেনা।” বেঞ্চে নিজের দুপাশে হাত রেখে কিছুটা পেছন দিকে হেলে আছে মেজর। সেভাবেই উদাস শ্রেয়সীকে দেখতে দেখতে বলেন।
তার এ কথায় শ্রেয়সীকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে দেখা যায়। চোখে মুখে কিছুটা উৎসাহ,
_”আপনি ওকে নিয়ে এসেছেন মেজর? বসার ঘরে আছে পুঁই?”
‘মেজর’ শব্দটি তার কণ্ঠে এমনভাবে উচ্চারিত হলো যে, উমরানের শরীরের ভেতর শিরশির অনুভূতির ঢেউ ছুটে গেল। ধীরে ধীরে মোহনীয় দৃষ্টি ফেলে বলেন,
_”আনিনি তো, তুমি তো বলো নি যে, ওকে দেখতে চাও।”
শ্রেয়সীকে নাখোশ দেখায়,
_”আশ্চর্য! আপনার কি বুদ্ধি নেই? আমি কয়েকদিন ধরে কোথাও যাচ্ছিনা খেয়াল করেছেন। তাও আমার বাড়ি আসছেন দেখেও পুঁই পাখিকে আনলেন না। বিরক্তিকর!!”
মেজরের আসা নিয়ে আলাদা কোনো খুশি না থাকলেও, পুঁইকে না আনায় বিরক্তি তার চোখে মুখে। নিজের প্রতি শ্রেয়সীর উদাসীনতা বুঝেও উমরানের ঠোঁটের কোণায় অল্প হাসির রেশ দেখা গেল।
_”অল্প সময়ের জন্য কারো বাড়িতে গেলে মানুষ পোষা পাখিকেও নিয়ে যায় জানতাম না। তুমি শিখিয়ে দিলে, এবার থেকে যার তার বাসায় নিয়ে যাব।”
_”যার তার বাসায় নেয়না। আমি বলেছি আমার কাছে আনতে। উফ আপনার মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই। কি বললে কি বুঝেন…” নির্বোধ মেজর সামান্য কথাও বুঝল না বুঝি শ্রেয়সীর!! সে বিরক্ত।
_”উ, বুঝতে পারছি তোমার কথা। তুমি পুঁই এর সাথে সময় কাঁটাতে চেয়েছ। এইতো?”
এবার কিছুটা সন্তোষ শ্রেয়সীর চেহারায়। তবে তাকে উত্তর দিতে না দেখে মেজর নিজেই বলেন,
_”কিন্তু আমি আনলেও আর কতক্ষণই বা সময় কাঁঁটাতে পারবে তুমি ওর সাথে তাইনা? সেই তো আমার সাথে চলে যাবে আবার। তারপর তুমি আবার একা।”
মন খারাপী বাড়ল বৈকি!! তবে বুঝতে দেয়না মেজরকে।
_”তবে আমার কাছে একটা সলিউশন আছে…” - উমরানের কণ্ঠ গাঢ় হলো। _”......তুমি চাইলে তা ফলো করতে পারো। পুঁই পাখিকে সর্বক্ষণ কাছে পাবে। কি আমার সমাধানটা শুনবে? গ্রহণ করবে?”
শ্রেয়সীর কপালে ভাঁজ পড়ে। আড়চোখে তাকিয়ে বলে,
_”কি সমাধান? আগে বলুন। তারপর ভেবে দেখব।”
মেজর তৎক্ষণাৎ একটু কাছে সরে এলেন। মুখটি ঝুঁকে এল তার কানের খুব কাছাকাছি। শ্রেয়সী ভাবল সেদিনের মতো আবার চুমু খেতে চাইবে। অথচ না, সে ঠোঁট কানের কাছে এনে শ্রেয়সির চেহারায় নজর রেখে ফিসফিস করে মোহনীয় কণ্ঠে খুব সুন্দর একটা প্রস্তাব রাখল,
_”বিয়ে করে নাও আমাকে শ্রেয়সী। আমার বউ হয়ে আসো আমার ঘরে, পুঁইকে সর্বক্ষণ পাশে পাবে। করবে আমায় বিয়ে?”
সেই মুহূর্তে তার কানে পুরুষালি ঠোঁটের প্রায় অচেনা স্পর্শে পুরো শরীরটা শিহরিত হলো। আনমনে মাথা অল্প একটু পিছিয়ে নিল। মেজরও স্বাভাবিকভাবে সরে এলেন। শ্রেয়সী স্বস্তির শ্বাস নিল। আরেকটু হলে হৃদপিণ্ডটা যেন বেরিয়ে আসত।
সে চোখ গরম করে বলে,
_”মাথা খারাপ আপনার? আবার সেদিনের মতো শুরু করেছেন।”
_”ভুল ভাবছ। তুমি আমাকে বিয়ে করে নাও, আমার ঘরনী হয়ে গেলে সারাদিন আমার সাথে। আই মিন, পুঁই পাখির সাথে সময় কাঁঁটাতে পারবে। ভেবে দেখ। তোমার লাভের জন্যই বলছি।”
_”আমাকে আপনি বাচ্চা পেয়েছেন? বোকা পেয়েছেন?”
_”তুমি কি বাচ্চা নও?”
মেজরের হেয়ালি প্রশ্নে সে বিরক্ত হয়ে বলে,
_”আপনি চলে যান তো। ভালো লাগছেনা আমার।”
_”না যাব না” মেজরের জেদী কণ্ঠে শ্রেয়সী রেগে তাকায়,
_”কেন?” চোখ গরম করে জিজ্ঞেস করে সে
_”কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
রাগ-বিরক্তি দেখালেও শ্রেয়সীর কিশোরী তনুমনটিতে পাশে বসে থাকা পুরুষটির কথাবার্তায় কিছু একটা হচ্ছে। পেটের ভেতর প্রজাপতিরা উড়ছে বুঝি! এর মধ্যে আবার এটা কি বলে দিল?
_”না, মিথ্যা বলছেন আপনি” শ্রেয়সী অস্বীকার করে।
_”মিথ্যা বলছিনা শ্রেয়সী। তোমাকে সত্যি ভালোবাসি।” তার চোখে চোখ রেখে গভীর কণ্ঠে বলেন মেজর
শ্রেয়সীর চেহারায় দ্বিধাদন্ধ স্পষ্ট, সাথে ভেতরে ভেতরে অচেনা কিছু তীব্র অনুভূতির জোয়ার। এদিক ওদিক করে মেজরের দিকে না তাকিয়েই সে বলে,
_”তাও আপনাকে বিয়ে করব না।”
উমরানকে কিছুটা হতাশ স্বরে শ্রেয়সীর কাছে এসে তার উদ্দেশ্যে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন রাখতে শুনা যায়,
_”কেন? আমাকে কি তোমার পছন্দ না শ্রেয়সী? দেখতে খারাপ লাগে?”
শ্রেয়সী বুঝতেও পারছেনা মেজর উমরান তাওসিফ কিভাবে নিজের ব্যক্তিত্ব থেকে বের হয়ে, সদা গম্ভীর আবরণটি উপেক্ষা করে - প্রেয়সীকে তার উপায়ে বিয়েতে রাজী করাতে নেমেছে।
সে আড়চোখে তাকায় মেজরপানে। আপাদমস্তক পুরুষটিকে দেখে নেয়। অপছন্দ করার মতো কিছু খুজে পেল না। বরং দেখতে দেখতে পুরুষালি দেহটাতে চোখ যেতেই, লোমশ উন্মুক্ত বুকে নজর যেতেই - ভেতরটা অন্যরকম লাগল তার। বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল বোধ হয়। কি হচ্ছে সে বুঝতে পারছেনা। চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে,
_”না”
তার ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করছিলেন মেজর। তাকে খুঁঁটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল তাও দেখলেন। উত্তর পেয়ে সাথে সাথে প্রশ্ন ছুড়েন,
_”কি না? পছন্দ না বুঝি?”
না ছুঁয়েও লোকটা তার অতি সন্নিকটে অবস্থান করছে। তার উপর কথাবার্তা এমন ভাবে বলছে যে শ্রেয়সী ছাড়া আর কারো কানে যাবেনা। অতি ধীর মোহনীয় আর মাতাল করা সেই কণ্ঠস্বর।
_”বলছি তেমন কিছুনা।” শ্রেয়সীর গলা নিচু, লাজে ভরা
উমরান আরও কাছে ঝুঁকে এলেন,
_”মানে পছন্দ আমাকে?”
শ্রেয়সীর কান লাল দেখাল। তার গায়ের উপর উষ্ণ ভারী শ্বাস এসে পড়ছে মেজরের। লাজুক মুখটাতে মেকি বিরক্তি ফুঁটিয়ে বলে,
_”উফ, আপনি বেশি বুঝেন। আপনাকে বিয়ে করব না।”
মেজর ঠোঁট চেপে অল্প হাসলেন,
_”আচ্ছা সরি, কম বুঝব। তোমার ঠিক আর কোথায় আপত্তি আমাকে বিয়ে করতে জানাও!! তাহলে আমি সেসবও ঠিক করে নেব প্রমিস!”
_”অনেক আপত্তি।”
_”একটা জানাও…”
_”আপনার বাড়িতে কে কে আছে?” নিচু স্বরে জানতে চায় সে
_”বাবা-মা, আমি। কেন?”
_”ভাই বোন নেই বাড়িতে?”
_”না, বাড়িতে ভাই বোন তো নেই। কেন তোমার ভাই বোন লাগবে বুঝি? আই মিন, ননদ-দেবর?”
শ্রেয়সী সরাসরি চোখ রাখেনা। কিছুটা কোণা চোখে তাকিয়ে নজর সামনে রেখেই বলে,
_”হ্যাঁ, আমার পুরো পরিবার চাই। বাবা, মা, ভাই-বোন সবার ভালোবাসা চাই। সবার মতো একটা বড় পরিবার”
মেজর বুঝলেন তার চাওয়া। আর সাথে সাথে মেয়েটিকে আপন করার, পরিবার দেওয়ার ইচ্ছে আরও বাড়ল বোধ হয়।
_”কিন্তু ভাই তো নেই, বোন আছে সে শ্বশুর বাড়ি। তোমার কি বাবা মায়ের ভালোবাসা নিয়ে হবেনা শ্রেয়সী?” ভীষণ নমনীয়-আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন উমরান। শ্রেয়সীকে কথায় ভুলিয়ে বিয়েতে মত নেওয়ার চেষ্টা তীব্রভাবে চলছে। শ্রেয়সী আনমনে বলে,
_”আচ্ছা, হবে। কিন্তু আপনি তো এখানে থাকেন, কোয়ার্টারে। বাবা মা কি এখানে থাকবে? নাহয় আমি বাবা মায়ের সাথে বাড়ি থাকবো ঠিক আছে বিয়ের পর? আপনি ছুটি পেলে চলে আসবেন আমাদের কাছে” উৎসুক চোখে সরাসরি তাকায় এবার সে।
তার এত দূর অব্দি ভাবনা শুনে মেজরের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা গেল। তবে নাখোশ স্বরে জবাব দেন,
_”না শ্রেয়সী, খুব বাজে চিন্তা এটা। তুমি আমার সাথে থাকবে। আমি যেখানে থাকব সেখানে। বাবা-মা মাঝে মাঝে আসবে, আর আমরাও যাব। এতে কি তোমার হবেনা? তুমি পড়ালেখা করবে, পুঁই পাখি আছে, আমি থাকব। দেখবে তোমার ভালো লাগবে। তারপর অনেক সময় কেটে গেলে, আমাদের বাবু হবে -তখন যা চাইছ সব পাবে। আমাদের একটা পরিবার হবে। সবার ভালোবাসা পাবে। এটা বেস্ট না আইডিয়া?”
শ্রেয়সীর এবার মতিভ্রম ছুটল,
_”আপনি চলে যান। আমাকে লজ্জা দিতে আমার সাথে মজা করছেন আমি বুঝতে পারছি। টিভিতে আমি অনেক বিয়ে দেখেছি, বড়দের ছাড়া বিয়ে হয়না জানা আছে। তাছাড়া বিয়ে হচ্ছে পারিবারিক, সামাজিক আর ধর্মীয় রীতি। আপনি আরেকবার স্কুল থেকে লেখাপড়া শুরু করুন। সব ভুলে গেছেন।”
_”বড়দের সাথে নিয়ে বিয়ে করতে হয় আমি জানি তো। তোমার কর্নেল আঙ্কেল আর দীদুনও থাকবে। সবাইকে সাথে রেখে আমরা বিয়ে করব। আর বইয়ে অনেক কিছু লিখেনা। তুমি কি জানো? প্রেম ভালোবাসা থাকতে হয় বিয়েতে। আমিতো তোমাকে ভালোবাসি। তাই বিয়ে করতে চাইছি। সবাইকে সাথে রেখে ভালোবেসে বিয়ে করব। তুমি কি রাজী?” তখনো শ্রেয়সীর খুব কাছে সে।
কর্নেল আঙ্কেল আর দীদুনের কথা বলায় কিছুটা থামল শ্রেয়সী। তবে তাও মনে দ্বিধা,
_”কিন্তু আফ্রাহ বলেছিল……”
তাকে পুরো কথা শেষ করতে দেয়না উমরান। দুজনের মধ্যে কোনো কিন্তু থাকার মতো ফাঁকফোকর রাখবেইনা স্থির করে রেখেছে বোধ হয়,
_”ও ভুল জানে… সবাই এক হয়না শ্রেয়সী। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। তোমার জায়গায় কেউ কোনোদিন আসবে না, কোনোদিন পারবেও না। যদি তোমার মনে সন্দেহ থাকে, তবে শোনো - আমি তোমাকে প্রমিস করছি, তুমি ছাড়া আর কোনো মেয়ের দিকে আমি চোখ তুলে তাকাব না। আর কাউকে কাছে ডাকব না, কারো গন্ধ, কারো স্পর্শ, কারো হাসি… কিছুই আমাকে টানবে না। কারণ কেউ শ্রেয়সী নয়। তোমার মেজরের কাছে একজনই যথেষ্ট। সেই একজন তুমি, শুধু তুমি। আমার শ্রেয়সী…“
থেমে আবার বলে,
_”আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। আর যতদিন নিঃশ্বাস চলবে ততদিন তোমাকেই ভালোবাসবো। যেদিন তোমার মনে হবে আমি এই ভালোবাসায় কোথাও মিথ্যা বলেছি। সেদিন তুমি নিঃসংকোচে আমার কাছে এসে দাঁড়াবে। আমি নিজ হাতে আমার রিভলবার তোমার হাতে তুলে দেব… তুমিই গুলি চালাবে আমার বুকে। কারণ তুমি ছাড়া আমার বুকে আর কোনো স্পন্দন থাকার অধিকার নেই।”
_”কিন্তু আমি গুলি চালাতে জানিনা।”
তার কথার গভীরতা বুঝল না মেয়েটা। উমরান হতাশ নিঃশ্বাস ফেলেন। সাথে কিছুটা হাসিও পেল। তবু চেপে গেলেন। শ্রেয়সীকে বলেন,
_”ঠিক আছে আমি শিখিয়ে দেব। এখন চলো। বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। আমাদের বিয়ে হবে।”
___
শ্রেয়সীর বিয়ে হয়ে গেল। বুঝতেও পারেনি সে কি থেকে কিভাবে কি হলো!! তখন মেজর বললো তাদের আজই বিয়ে। বসার ঘরে নাকি সবাই আছে, ওদের বিয়ে হবে ওখানে। সব আয়োজন করে রেখেছে। হতবম্ব শ্রেয়সী কি হয়েছে না হয়েছে দেখতে গেল। কিন্তু হতবম্ব ভাব তো গেলো না। উল্টো বিস্ময়ে শব্দ উচ্চারণ করতেই যেন ভুলে গেল এত মানুষ আর সাজানো ঘর দেখে।
উমরান সেই শ্রেয়সীর দায়িত্বে থাকা সেনা আর তার বন্ধু বান্ধবদের দেখা পেয়েছিলেন এখানে আসতে সময়। তারা তাদের মেজর শ্রেয়সীকে পছন্দ করে এটা নিজেরাই তদন্ত করে জেনে নিয়েছিল। মেজরকে দেখে ওদের মধ্যে যে দুজন তার মিশনে থাকাকালীন সময়ে সেনানিবাস ছিল। তারা শ্রেয়সীকে রক্ষা করতে না পারায় ক্ষমা চেয়ে নেয়। মেজর সেসব দিকে না গিয়ে তাদের পাঠিয়েছিলেন শ্রেয়সীর জন্য বিয়ের শাড়ি-চুড়ি-অলংকার আর বউ সাঁজাতে, ঘর সাঁজাতে কিছু ফুল কিনে নিয়ে আসার জন্য। শ্রেয়সীর অতি সাদা মাটা বিয়ে পছন্দ হবেনা তার ধারণা মতে।
শাহীন, দিহানরা হঠাৎ বিয়ের বাজার কেন অবাক হলেও প্রশ্ন না করে মেজরের কথামতো কাজ করে, আর সেসব নিয়ে সোজা নেওয়াজ কুঠির পৌছায়।
শ্রেয়সী বাইরে এসে তাদের প্রত্যেককে দেখে অবাক হয়েছে। দীদুন তাকে কিছু বলতে না দিয়ে নিয়ে যায় রুমে শাড়ি পড়াতে। অল্পসময়ে শাড়ি চুড়ি আর নানান রকম ভারী অলংকার পড়িয়ে বউ সাজিয়ে দেয় তাকে। মুখে ঠোঁটেও অল্প কিছু দিল বোধ হয়। ব্যাস, তাকে নিয়ে বাইরে যেতেই দেখল মেজরের পাশে বসিয়ে দিয়েছে। কাজী সাহেব কি কি যেন পড়া শুরু করলো। দীদুন, কর্নেল আঙ্কেল, সিনিয়র জুনিয়র কিছু অফিসার- সবার সামনে সৃষ্টিকর্তাকে সাক্ষী রেখে শ্রেয়সীকে কবুল বলতে বললে সে দীদুন আর আঙ্কেলের ইশারা পেয়ে বলে দিল। তারপর মেজরকেও তার হাত ধরে কবুল বলতে শুনলো। সে বিয়ের অনুভুতি ঠিকঠাক অনুভব করতে পারেনি, হতবম্বভাব কাটিয়ে ঘুরেফিরে সবাইকে দেখলো। খেজুর বিলি করছে অন্যান্য অফিসারদের মধ্যে তার কর্নেল আঙ্কেল।
শ্রেয়সী চারদিকে হাসিখুশি সবাইকে দেখে নিয়ে, মেজরের দিকে ধীরে এগিয়ে নেয় মুখটা। কৌতূহলী সহজ কণ্ঠে জানতে চাইল,
_”বিয়ে হয়ে গেছে?”
উমরান তাকান ঘাড় ফিরিয়ে। তার অতি সন্নিকটেই বসে আছে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। এই মেয়েটাকে রাজী করিয়ে হাসি খুশিভাবে মত নিতে, কবুল বলাতে - একটু আগে যা যা করলো, যা যা বললো ব্যক্তিত্বের বাইরে গিয়ে। তার সারাজীবন মনে থাকবে। আপাদমস্তক দেখেন। বউ বউ লাগছে। শাড়ি ঠিক মতো যাচ্ছেনা এখনো তার সাথে। তাই বাচ্চা বউ বললেও ভুল হবেনা। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে তার মতোই নিম্ন স্বরে জবাব দেন,
_”হ্যাঁ, হয়ে গেছে। তুমি আমি স্বামী স্ত্রী এখন। আমার বউ তুমি।”
শ্রেয়সী মেজরের এত অনুভূতি নিয়ে বলা কথা অনুভব করতে পারল না। সরে আসে। দীদুন অন্যপাশে বসা। তার দিকে অগ্রসর হয়ে আবার জানতে চায়,
_”দীদুন, এই মেজরের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে?”
_”হ্যাঁ, তোর বিয়ে হয়ে গেছে ঐ মেজরের সাথে। বুঝতে পারছিস না এখনো?” তার ঘোমটা ঠিক করতে করতে বলেন।
_”কিন্তু গান বাজনা কিছুই তো হলো না। এরকম বিয়ে কে করে? এটা হয়নি, আবার বিয়ে করবো আমি।”
তার কথা শুনে দীদুন থতমত খেয়ে যায়। বাকিরাও শুনল শ্রেয়সীর কথা।
_”গান বাজনা এবার হবে শ্রেয়ু মা। একটু আগে যেটা হলো, ওটা সবার বিয়েতেই ওভাবে হয়। এবার হবে গান বাজনা। নাও নাও আঙ্কেলের ফোনে ছবি তুলো, বউ সেজেছ ছবি তুলবেনা?”
সবার বিয়েতে এমনই হয় শুনে আর কিছু বললো না। জুনিয়র সেনা, অর্থাৎ জুনিয়র সেনারা নিজেরাই স্পিকারে জোরে গান লাগিয়ে দিল, বাড়িতে বিয়ে বিয়ে আমেজ আসল। নানান ফুল এনে সুন্দর করে সাজিয়েছিল ঘরটা। সেই সাজানো ঘরে শ্রেয়সী অনেক ছবি তুলল। শাহীন দিহানরা তুলে দিল তার সব ছবি।
ওদিকে কর্নেল সাহেব, মেজর উমরান আর তার সাথে আসা দু’জন অফিসারকে সোফায় বসে কোনো গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনা করতে দেখা গেল। শ্রেয়সী সেসবের ধার ধারল না। সে বর নিয়েও ছবি তুলবে। বান্ধবীদের দেখাতে হবে ভবিষ্যতে। সে তো এখনই ভিডিও কল দিয়ে সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সবাই একসঙ্গে মানা করে দিয়েছে। কাউকে জানানো যাবেনা যে তার বিয়ে হয়ে গেছে। যখন সবাই বলবে জানাতে, তখন জানাবে। তখন আরো বড় করে গান-বাজনা আর খাওয়া দাওয়ার সাথে বিয়ে হবে তার। টিভিতে যেমন হয় তেমন। যদিও কার্টুন দেখে বিয়ে কিভাবে হয় জানার কথা না। কিন্তু মাঝে মধ্যে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখত সে। আর গানে টানে তো কতো বিয়েই দেখেছে। তবে সেসব হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে বেশিরভাগই। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে কিভাবে হয় বুদ্ধি হওয়ার পর কখনো স্বচক্ষে দেখা হয়নি তার। এখনই তো তার সবকিছু দেখার সময়, চেনার সময়। দুনিয়া সম্পর্কে জানার সময়। মেজরের হাত ধরে শুরু হলো আজ সেসব। সর্বপ্রথম বিয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করল তার হাত ধরে। প্রথমে বুঝতে না পারলেও এবার খুশিই লাগছে দেখতে গেলে। বর নিয়ে ছবি তুলল সে। আরও নানানভাবে শ্রেয়সীকে তার একার, আবার তার বরের সাথে - অনেক অনেক ছবি তুলে দিল ভাইয়াগুলো। সে সন্তুষ্ট। শাড়ি নিয়ে এদিক ওদিক করতে করতে বেশ কয়েকবার পরেও যাচ্ছিল, প্রত্যেকবার তার স্বামী বাঁচিয়ে নিয়েছে তাকে। বাবাহ… এমন একটা স্বামীই তো চাই, আর কি লাগে শ্রেয়সীর?