শ্রেয়সীর পরীক্ষা শুরু হয়েছে। শুধু শুরুই হয়নি। দুটো পরীক্ষা দিয়েও দিয়েছে। প্রথম দিন কর্নেল আঙ্কেলের সাথে গিয়েছিল পরীক্ষা দিতে। সিট খুজে দেওয়া, উপদেশ দেওয়া, সাহস জোগানো- সব হয়েছে। পিতা-মাতাহীন একটি মেয়ে পরীক্ষা দিতে গেছে মনেই হয়নি তার। অবশ্য আরও একজন এসেছিল সেদিন। তবে সেজন শ্রেয়সীর সামনে আসেনি। নিজের মতো এসে, আড়ালে তার সবকিছু লক্ষ্য করে, পর্যবেক্ষণ করে আবার চলেও গেছে। এসবের কিছু শ্রেয়সী জানেনা। তার দ্বিতীয় পরীক্ষার দিনই সেজন নিজের মিশনে চলে গেছে। শ্রেয়সীর সেসব জানা নেই। তার মাথায়ও নেই ঐ লোকের কথা।
দেখতে দেখতে সময়ে পেরিয়ে গেলো। মেজর উমরান তাওসিফ তার মিশনে। এখনো ফেরেন নি। শ্রেয়সীর আর বাকি আছে একটি পরীক্ষা। তারপর তার জীবনের মাধ্যমিক পর্যায়ের ইতি।
প্রতি পরীক্ষায় যেদিন যেদিন কর্নেল আঙ্কেল আসতে পারেন নি, সেদিন সেদিন দীদুন এসেছিল সাথে। শেষ পরীক্ষার দিন বান্ধবীদের সাথে পরীক্ষা শেষে কোথায় নাকি ঘুরতে যাবে। আঙ্কেলের অনুমতি নিয়েছে সে। আর দীদুনেরও থাকা যাবেনা ওখানে। কারও গার্ডিয়ান থাকবে না সাথে। তাই তারও থাকা যাবেনা। তারা মাধ্যমিক দিয়ে দিয়েছে, বড় হয়েছে এখন। কিছুদিন পর কলেজে উঠবে। একা একা বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরতে যাওয়াও বড় হওয়ার অনুভূতি দেয় এই সময়ে। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে গেলে তো আরও বেস্ট; এডভেঞ্চার ফিল। কিন্তু সেটা করা যাবেনা। কারণ শ্রেয়সীর ঘাড়ে একটাই মাথা।
বান্দরবান ঘুরতে যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। তবে উচু পাহাড়, বা রিস্কি কোনো টুরিস্ট স্পটে যাওয়ার অনুমতি নেই কারো। তারা যাবে নীলাচল ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে শৈলপ্রপাত। শহর থেকে দশ/পনেরো মিনিটের দূূরত্বে এই জায়গাগুলো। বান্দরবানের বাসিন্দা হওয়ায় এসব জায়গায় তাদের ভ্রমন আগেই হয়েছে। তবে বান্ধবীদের সাথে যাওয়ার মজা আলাদা। বলা যায়- একই শহর, একই আকাশ, একই অনুভূতি… কিন্তু ভিন্ন স্মৃতি জমানোর সফর।
পরীক্ষা শেষ হয়েছে একটা বাজে। তারা সবাই আগে পরীক্ষার কেন্দ্রের বাইরের ছোট্ট একটি ক্যাফেতে ভারী খাবার সেরে নেয়। ক্যাফেটি থেকে পরীক্ষাকালীন পুরো সময়টিতে অনেকবার খাবার দাবার কিনেছে তারা। তাই ক্যাফেরটির মালিক তাদের চেনে। তাবাসসুম একটা ফোন এনেছিল, পরীক্ষার আগে ক্যাফেটির মালিক আঙ্কেলের কাছে জমা রেখেছে ফোনটি। তার বড় ভাই এসেছিল তাকে দিতে। সে-ই কথা বলে ফোন রেখেছে আঙ্কেলটির কাছে। ফোনটি নিয়ে রওনা দেয় নিজেদের সফরে।
তারা সর্বপ্রথম যায় নীলাচল ভিউ পয়েন্ট। শ্রেয়সীরা যখন ভিউ পয়েন্টে গিয়ে দাড়ালো, সর্বপ্রথম চোখে পড়ে নদীর শান্ত জলরাশির মতো ছড়িয়ে থাকা সবুজ বনজঙ্গল, যেখানে সোনালি রোদ পড়ায় সবকিছু যেন রূপকথার মতো ঝলমল করছে। সূর্যের আলোয় নদীর কিরণ আর বনভূমির প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করে রেখেছে। স্থানীয় বলে এই দৃশ্য প্রথম দেখছে এমন নয়, অথচ তাও মুগ্ধ হতে বাধ্য। প্রকৃতির অপরুপ, অনাবিল সৌন্দর্য যে কারো চোখে মুগ্ধতা এনে দিতে, মুখে উজ্জ্বলতা এনে দিতে কিংবা মনে একরাশ প্রশান্তি এনে দিতে যথেষ্ট। সেই নীল আকাশ… কি অপরুপ দেখতে!! প্রত্যেকে সর্বপ্রথম দৃশ্যটি ফোনের ক্যামেরাবন্দি করে। তারপর একে একে নিজেদের ছবি, গ্রুপ ছবি আর নানান ভঙ্গিমা করে সেলফি নেয়।
ঘুরে ঘুরে বেশ অনেকক্ষণ সময় কাঁটায় ওখানে। দেশের নানান জায়গা থেকে আরও অনেক টুরিস্ট এসেছে। তবে দুপুরের পরের দিকের সময় হওয়ায় মানুষজন তুলনামূলক কম। ভিড় বাড়বে সূর্যাস্তের আগ সময়ে। সূর্য অস্ত যাওয়ার দৃশ্যটা উপভোগ করতে আসবে টুরিস্টরা। কিন্তু শ্রেয়সীরা অতো সময় অব্দি থাকবেনা। তারা নিজেদের মুহূর্ত জমা করে, দৃশ্যগুলো উপভোগ করে চলে যায়। শৈলপ্রপাত যাওয়ার আগে একটি বাগানে ঢুঁকে।
অসংখ্য ফুল সেখানে। অনেক টুরিস্ট ছিল। শ্রেয়সীরা সেখানে বেশি সময় কাটায়না। একটু ঘুরে ঘুরে দেখে ছবি তুলে রওনা দেয় শৈলপ্রপাত ঝরনার উদ্দেশ্যে।
স্থানীয় হওয়ায় যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছেনা। সব চেনা জানা তাদের। রাস্তা পারাপারে সমস্যা থাকলেও, সবাই মিলেমিশে আছে তাই ভয় নেই। একইভাবে ঝর্নার ওখানে সময়টাও কাটায়। প্রবেশদ্বারেই শ্রেয়সীদের হাসাহাসির শব্দে সবাই তাকাচ্ছিল। তারা সেসবে পাত্তা না দিয়ে আবার ফটোশুট শুরু করে দিল। কেউ পাথরের ওপর বসে পায়ের কাছে ঝরনা ছুঁই ছুঁই করা পানি দিয়ে ছবি তুলছে। কেউ আবার হাত বাড়িয়ে পানির ফোঁটা ধরার ভঙ্গিতে পোজ দিচ্ছে। তবে কেউ ভেজেনি পানিতে। সেভাবেই উপভোগ করেছে, আর মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছে। মানুষজনের সমাগম বেশি।
শেষে সবাই মিলে নারকেল পানি খেলো, কিছু স্ন্যাক্স কিনল। খেতে খেতে ফেরার পথে শ্রেয়সী বলে,
_“আবার একদিন আসবো কেমন? তখন নীলগিরি পর্যন্ত যাবো!”
_”আবার একদিন আসার জন্য সবাই একসাথে হতে পারি নাকি দেখ আগে। যদি আমাদের কলেজ ভিন্ন হয়। তাহলে কবে দেখা হবে তারই ঠিক থাকবেনা কারো।”
_”তখন নতুন নতুন বান্ধবী হবে সবার নতুন কলেজে গিয়ে।”
_”হ্যাঁ, কে কোথায় গিয়ে পরি তার ঠিক নেই। তবে মাঝে মাঝে দেখা করায় যায়, কি বলিস?” তাবাসসুমের কথায় কেউ উত্তর দেবে তার আগে আফ্রাহর কণ্ঠ শুনা যায়,
_”আরেহ… ওটা ক্যাপ্টেন রাওফান না? শ্রেয়া দেখ…”
সবাই তাকিয়ে দেখে আফ্রাহর কথায়। ঝর্নার ওখানে রাওফানকে দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ের সাথে। ঐ মেয়েটির ছবি তুলে দিচ্ছে সে। পাশে আরও দুটো মেয়ে আর ছেলে আছে। তাদের সাথে কিছু বলে হাসাহাসি করছে- দূর থেকেও বুঝল শ্রেয়সীরা। সে বিরক্তি নিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়,
_”আমাকে দেখাচ্ছিস কেন আজব! ঐ লোকটা অসহ্য, যায় করুক আমার কি? ওদিকে তাকাস না আর তোরা। চল সামনে ফির। হাঁটতে থাক।”
_”কিন্তু তোকে না রাওফান ভালোবাসে? এই ছেলেটা এখানে আবার আরেকটা মেয়ে নিয়ে ঘুরছে। কি ছেলেরে বাবা… বিশ্বপ্রেমিক একদম। যাকে পায় তাকেই ভালোবাসে।” তাবাসসুম
_”বাদ দে। আমি তো বলেইছিলাম আমার কাজিনের সাথেও প্রেম করে রাওফান। এরকম আরও কতজনের সাথে করে দেখ। এ আর নতুন কি!!”
_”কিন্তু আমি ভাবছি, সেনাবাহিনীতে থেকেও এই ছেলে ওত ছুটি পায় কি করে। মাঝে মাঝেই দেখা যায় এখানে সেখানে। সবসময় সেনানিবাসে থাকতে হবে এটা বলছিনা । কিন্তু অসময়ে অনেক সময় শ্রেয়ার সামনে হাজির হতে দেখা যায়।” তাবাসসুম
_”আরেহ এই ছেলের বাপ হচ্ছে কর্নেল। তাই হয়তো এক্সট্রা সুবিধা দেয়। কি জানি। যতই সেনানিবাস হোক, কড়া নিয়ম হোক। এসব নেপোটিজম সবখানেই চলে কমবেশি।” আফ্রাহ
নানান কথাবার্তার সাথে ডাবের পানি খেতে খেতে হাটছে তারা। ছবিগুলো তাদের ফোনে যেন পাঠিয়ে দিতে দেরি না করে, আর কার পরীক্ষা কেমন হয়েছে। কি পাওয়ার আশা আছে, এসব নিয়েও কথা বলছিল। এর মধ্যে পেছন থেকে কারো গলায় উচ্চশব্দে শ্রেয়সী ডাক শুনে থেমে যেতে হয়। প্রত্যেকেই পেছন ফেরে। বিশ্বপ্রেমিক রাওফান…
_”শ্রেয়সী। তুমি এখানে? মানে তোমরা এখানে? আমিতো জানতাম না তোমরা এখানে আসবে। পরীক্ষা শেষে এসেছ নাকি? আমি আরও ভেবেছিলাম আজকেও কর্নেল স্যার নাহয় তোমার দীদুন আসবে তোমাকে নিতে। তাই তোমার সাথে দেখা করতে যাইনি।” সে দৌড়ে এসেছে হয়তো ওদের দূর থেকে এখানে দেখতে পেয়ে। হাপাচ্ছে কিছুটা। দেখতে যদিও বেশ হ্যান্ডসাম। কিন্তু চরিত্রে গলদ।
জবাবটা তাবাসসুম দেয়,
_”ওর সাথে দেখা করতে হবে কেন? শ্রেয়ার সাথে আপনার কি? আপনার প্রেমিকা তো ওখানে ঝর্নার পানিতে ভিজছে। আবার এখানে এসে অন্য কাউকে পিরিতের কথা বলছেন? আপনি তো যা তা লেভেলের শেয়াল দেখি। কয়টা মুরগী লাগে?
রাওফান বিরক্তি নিয়ে তাকায় মেয়েটির দিকে। পাত্তা না দিয়ে শ্রেয়সীর দিকেই তাকায়। তার চোখে মুখেও বিরক্তি,
_”শ্রেয়সী তোমার সাথে একা কথা বলতে চাই। একটু এদিকে আসবে?”
_”আরেহ আরেহ!! চিপায় কি কাজ ভাই? আমাদের সামনে আমাদের বান্ধবীকে আপনি চিপায় ডাকছেন, সাহস তো কম নয়। আপনি সেনাবাহিনী নাকি আর কি সেসব জানবে আপনার সেনানিবাস। এখানে এসব হিরোগিরি দেখালে গণধোলায় খাওয়াবো, সাবধান।” আফ্রাহ
রাওফান দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
_”চুপ থাকো। বেশি কথা বলা স্বাস্থের জন্য খারাপ। আর শ্রেয়ুকে আমি ভালোবাসি। তাই আমার কাছে ওর কোনো ক্ষতি হচ্ছেনা। তোমরা সাইড হও। ওর সাথে আমার কথা আছে।
তাবাসসুম এগিয়ে এসে বলে,
_”আহ, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে। আমরা নাকি সাইড হবো। আর কিসের ভালোবাসা হ্যাঁ? আজ এর সাথে, কাল ওর সাথে… আপনার ভালোবাসার নমুনা জানা আছে। আপনিই বরং সাইড হন দেখি এখান থেকে। রাস্তা আঁটকে আছে। হুশ হুশ…” তাকে তাড়ানোর মতো করে বলে।
রাওফান রেগে কিছু বলতেই যাচ্ছিল, শ্রেয়সীর দিকে একপলক তাকিয়ে আবার অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায়। রাগ দমায়। জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে বলে,
_”শুনো মেয়েরা। তোমারদের বান্ধবীকে আমি ভালোবাসি। আর কাউকে না। কোথাও কোনো প্রেম নেই আমার। তাই এসব আজে বাজে কথা বলবেনা। তোমাদের এসব ভুলভাল কথার কারণে শ্রেয়সী আমাকে ভুল বুঝবে। আমার ভালোবাসাকে ভুল বুঝবে। তোমরা তাই চুপ থাকো।”
_”কাহেকি ভালোবাসা ভাই? ঐ যে ঝর্নাধারার নিচে যে রঙ্গনা আছে তাকেও আপনি ভালোবাসেন। আমার কাজিন মাহিকেও ভালোবাসেন, এরকম উদার ভালোবাসার কথা বলছেন? যা আপনি রাস্তা ঘাটে বিলান?”
রাওফান আফ্রাহর মুখে মাহির নাম শুনে অবাক হয়। মাহির কাজিন এই মেয়ে? তাহলে তো সমস্যা… সে সামলে বলে,
_”চুপ করো। ঐ মেয়েটা আমার বান্ধবী হয়। বান্ধবী আর প্রেমিকার পার্থক্য কি বুঝবে তুমি পিচ্ছি। আর মাহিও আমার বান্ধবী। সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয় হয়না? ওরকম।” শেষ দিকে শ্রেয়সীপানে তাকিয়ে কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলে সে।
_”আচ্ছা? আমি শ্রেয়সীকে একদিন দেখায় আপনাদের দুজনের একসাথে কিছু ছবি? যেগুলো মাহি আপুর ফোনে আছে! তারপর বুঝা যাবে বান্ধবী নাকি প্রেমিকা। কেমন?”
রাওফান দমে যায়। মেয়েটা তার সম্পর্কে সব জেনেই তর্কে নেমেছে বুঝল। তবে কথা কাটিয়ে আর কিছু বলবে তার আগে শ্রেয়সীর কণ্ঠ কানে আসে,
_”চুপ কর সবাই। কে কাকে ভালোবাসে না বাসে এসব জেনে আমার কাজ নেই। আপনি চলে যান প্লিজ। আমি হাজার বার বলেছি যেখানে সেখানে আমার সামনে এসে কথা বলার চেষ্টা করবেন না, বিরক্ত করবেন না। তাও একই কাজ করেন। আমি বিরক্ত বোধ করি এতে বুঝতে পারেন না? আশ্চর্য!! যান এখান থেকে প্লিজ।”
তারপর বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে বলে,
_”তোরাও চল। যেখানে সেখানে যার তার সাথে লেগে যাস। এসব তর্কের কোনো দরকার আছে? যে যার সাথে প্রেম করবে করুক, আমাদের কি? চল…” সবাইকে বকাঝকা করে নিয়ে যায় শ্রেয়সী। যদিও তারও ইচ্ছে করে কিছু কথা আচ্ছা করে শুনিয়ে দিতে এই বেয়াদবটাকে। কিন্তু সে এই নিয়ে ঝামেলা হলে -এই বিষয়টাই খুব ভয় পায়। কর্নেল আঙ্কেলের কানে গেলে? তাই যেকোনো ভাবে এড়িয়ে চলায় বরং ভালো।
রাওফান বারবার ডাকলে থামেনা। শেষে হতাশ হয়ে দাড়িয়ে থাকতে হয় তাকে। এই মেয়েটাকে কোনোভাবেই বাগে আনতে পারছেনা সে। এতদিন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছে। কিন্তু আফ্রাহ মেয়েটা যা জানে বললো, এসব নিশ্চয় বান্ধবীকেও দেখিয়েছে। এরপর হাজার মিষ্টি কথা বললেও এই মেয়ে আর গলবে? না।
মনে তো হয় না এভাবে আর কাজ হবে বলে। কিন্তু এই কচি পাখি ছেড়ে দেওয়া যাবেনা কোনোভাবেই। অনেক টাকার ব্যাপার এই মেয়ে। যেভাবে হোক লাগবে একে। তার ভয় এই কর্নেল কিবরিয়া না আবার অন্য কোথাও দিয়ে দেয় তার শিকারকে। একবার নিজের নামে কবুল বলিয়ে ফেলতে পারলে ধর্মীয়ভাবে কর্নেল কিবরিয়াও নিশ্চয় তখন আর বেশি বাড়াবাড়ি করবেনা। শুধু তাকে একটু ভালো ছেলে হয়ে চললে হবে।
তখন তার দায়িত্বে চলে আসবে এই মেয়ে। আর আঠারো হলেই কাগজে কলমে বিয়ের নাম করে প্রপার্টির কাগজ পত্রে সাইন…ব্যাস! আর কি চাই লাইফে। তারপর নিজের মতো জীবন কাটাবে। শ্রেয়সী যাক গোল্লায়!!
কিন্তু কিভাবে কি করবে? এখন তো তাকে ভালোভাবে ফাঁদে ফেলা অসম্ভব। রাওফান ভেবে দেখলো, শ্রেয়সীর দেখবাল করা, নিরাপত্তা দেওয়া প্রায় সৈন্য এখন সেনানিবাসে নেই। মেজর উমরানের নেতৃত্বে কোনো এক মিশনে আছে তার সাথে। সেনানিবাসে আছে হয়তো দুয়েকজন। এরা নিশ্চয় প্রশিক্ষণ সময়েও শ্রেয়সীর নিরাপত্তার জন্য তার আশেপাশে ঘুরঘুর করবেনা নিজেদের দায়িত্ব আর ডিউটি বাদ দিয়ে। ঐ সময়েই কিছু করা যাক। উহু, বড় কিছু করা যাক। যাতে শ্রেয়সীর জন্য সেই হয় একমাত্র চয়েস।
___
শ্রেয়সীর পরীক্ষা শেষ। সে এখন মুক্ত পাখি। তাকে আর বই নিয়ে বসে থাকতে হবেনা রাতদিন। ঘুরবে ফিরবে, আনন্দ করবে। রাতে তাবাসসুমের থেকে অনেক বলে কয়ে ছবিগুলো নিয়েছে। পল্টিবাজ বান্ধবীটা একটা ছবির বিনিময়ে এক হাজার খুজছিল! মগের মুল্লুক নাকি? টাকা গাছে ধরে!! যে একটা ছবির বিনিময়ে এক হাজার দেবে। সে অনেক বলে কয়ে শেষে নেয় ছবিগুলো।
দীদুন আর সে মিলে সারাসন্ধ্যা দেখেছে একটা একটা খুটিয়ে খুটিয়ে। দীদুনের আবার অনেক কিছু পর্যবেক্ষন করতে হয়। একটা গ্রুপ ছবিতে পেছনের এক লোককে দেখা যাচ্ছিল। তাদের প্রত্যেককে দেখছে বাঁকা চোখে। শ্রেয়সীরা সেসব খেয়ালই করেনি। দীদুন চশমা লাগানো জুহুরি চোখে দেখে ফেললো। সাথে সাথে বলে, ‘এজন্য আমি একা তোদের যেতে দিতে চাইনি। এসব চোখ লম্বা লোকের অভাব নেই আশেপাশে। কখন কি হয়ে যায়।” দীদুনের কথায় সে তেমন পাত্তা দেয়না। লোকটা অতি খারাপ দৃষ্টিতে দেখছেনা বুঝায় যাচ্ছে। একসাথে এতগুলো অল্পবয়সী মেয়ে ঘুরছে দেখে একটু কৌতূহল ছিল বোধ হয়। সে তেমন পাত্তা দেয়না। আরও দেখায় ছবি। রাতটা কেটে যায় অন্যান্য দিনের মতো। তফাৎ শুধু শ্রেয়সী পড়ার টেবিলে নয়, টিভির সামনে - এটুকুই।
পরদিন সে সকালে খুব সময় লাগিয়ে উঠে ঘুম থেকে। পরীক্ষা শেষে একটু আরামের ঘুম দেবে এটা তো ছিল এতদিনের চাওয়া। আটটার দিকে উঠে। খাওয়া দাওয়া সারে। নেওয়াজ কুঠিরের এরিয়ার ভেতর অনেক ফুঁল গাছ আছে। শ্রেয়সীর বাগান। সেদিন সেনানিবাস থেকে যে ফুঁল নিয়ে এসেছিল? সেটাও ওখানে লাগানোর জন্যই নিয়েছিল।
শ্রেয়সী ওয়াটারিং ক্যান নিয়ে পানি দেয় সেথায়। ক্যানটির মুখের দিকে ঝাঁঝরি লাগানো। যার কারণে খুব সুন্দরভাবে পানি যায় গাছে। সব শেষে আরও নানান নিত্য কাজ সেরে সে দীদুনকে বলে চলে যায় চেনা পরিচিত গন্তব্য আশ্রমে। সারাদিন কাটিয়েছে সেখানে। বাচ্চাদের পেলে শ্রেয়সীর আর কি লাগে? অনেক ঘুরাফেরা করেছে, খেলাধুলা করেছে সে। তার অন্যান্য বান্ধবীরা হয়তো নানার বাড়ি, মামার বাড়ি, ফুফুর বাড়ি কিংবা আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাবে। তার ওসব কিছু নেই। একটা নিজস্ব বাড়ি, বাবার রেখে যাওয়া আশ্রম, আর আশ্রমের কিছু মানুষরুপী জীবন্ত ফুল। অবশ্য কর্নেল আঙ্কেল বলে, সে নিজেই তার বাবার রেখে যাওয়া একটা জীবন্ত ফুল।
শ্রেয়সী বাচ্চাদের নিয়ে সেনানিবাসের ওখানে গিয়ে ঐ মেজর লোকটাকে খুজেছে। আজকের জন্য যেন পুঁই পাখিকে তাদের সাথে দেয়। কিন্তু লোকটা নাকি নেই। কোন মিশনে গেছে। আর আরেক অফিসারকে পাখিটির দেখভাল করার জন্যে বলে গেছে। সেই অফিসার মালিকের অনুমতি ব্যতীত তাকে দেবেনা। শ্রেয়সী নাখোশ মনে ফিরে আসে। তবে বাচ্চাদের সাথে থাকলে কি আর তার মন খারাপ থাকতে পারে বেশিক্ষণ? খেলাধুলা-ঘুরাফেরা আরও কতো কি যে করলো!!
দেখা যায়, শ্রেয়সীর বয়সী স্বাভাবিক পরিবার পরিবেশ পেয়ে বেড়ে উঠা অন্যান্যরা তার চেয়ে যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান বেশি রাখে, পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝ বেশি রাখে। হয়তো বাচ্চাদের সাথে থাকতে থাকতে সে মন মস্তিস্কের দিক দিয়ে বড়ই হতে পারছেনা। নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতর জীবন হওয়ায় দুনিয়া সম্পর্কে জানাশুনাও সীমিত তার।
সে দুপুরের খাওয়া দাওয়া আশ্রমেই সেরেছে। বিকেলের আগ সময়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ ধরে। কিন্তু তার অল্প সময়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য তৈরি করে নেওয়া শর্টকাট রাস্তায় বোধ হয় তার জন্য কাল হলো। রাওফান এসেছে তার পথ আগলাতে। শ্রেয়সী বিরক্ত হলেও তেমন ভয় পায়না প্রথমে।
_”আপনি কোন জাতের মানুষ আমি বুঝিনা। এত কথা বলি, একটাও গাঁঁয়ে লাগেনা? আবার দুদিন না হতেই পথ আটকাতে এসেছেন।”
_”তুমি এত বিরক্ত হও দেখেই তোমাকে বিরক্ত করতে ভালো লাগে সোনা। এখন এত কথা না বলে চলো তো আমার সাথে। এক জায়গায় যাবো। তোমাকে নিয়ে” কথাটা বলে শ্রেয়সীর হাত ধরতে এগিয়ে আসে সে।
শ্রেয়সী তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে যায়,
_“কাছে আসবেন না খবরদার। গাঁঁয়ে হাত দিলে আমি কি করবো নিজেও জানিনা। দূরে থাকুন।”
_”পরে দেখিও এই ঝাঝ। আমি মন দিয়ে দেখবো। আজ কাজ আছে। এক জায়গায় যেতে হবে। দেখি চলো।”
শ্রেয়সী খেয়াল করে দেখলো রাওফান একটা গাড়িও নিয়ে এসেছে। ঐ তো দূরে রাস্তায় এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে হাইচটা। এসব গাড়ি মানুষকে অপহরণ করতেইতো ব্যবহার করে দেখা যায় নাটক সিনেমাই। তার ভেতরটা কেমন আতংকে কেঁপে উঠে। কি করতে চাইছে এই বদ ছেলেটা। শ্রেয়সী নিজের ভয়টুকু লুকিয়ে বলে,
_”কর্নেল আঙ্কেলকে বলে দিলে কি হবে খেয়াল আছে? উনার ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চয় আলাদা করে জানাতে হবেনা। দূরে থাকুন অসভ্য লোক, সারাক্ষণ আমার পেছন পেছন। আর কোনো কাজ নেই আপনার?”
_”তোমার কর্নেল আঙ্কেল সম্পর্কে আমার বেশ জানা আছে। সাথে তার ক্ষমতা সম্পর্কেও। কিন্তু তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ আমার বাবাও একজন কর্নেল। একই ক্ষমতা তারও আছে। এখন আমাকে আর অ সভ্যতামী করতে বাধ্য করো না। ভালোই ভালোই সাথে আসো।”
শ্রেয়সী আর কিছু না বলে দৌড়াতে শুরু করে। রাওফান তাকে দৌড়াতে দেখে নিজেও তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ধরে ফেলে।
_”এই নরম নরম পা দুটো নিয়ে দৌড়ে আর কতদূরই বা যাবে তুমি শ্রেয়সী। শুধু শুধু ঝামেলা করছ। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না পাগলি। জাস্ট বিয়ে হবে আজ। তিন বার কবুল বলে দেবে তুমি। তারপর আর কোনো কাজ নেই। তোমাকে আমিই নেওয়াজ কুঠির ছেড়ে আসবো, ডোন্ট ও্যরি।”
_”ছাড়ুন বলছি বাজে লোক কোথাকার। আমি আপনাকে বিয়ে করবো না কোনোদিন। আপনার মতো খারাপ আর বদ মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। আপনাকে আমার চায় না। আমার হাত ছাড়ুন। আমি একবার কর্নেল আঙ্কেলকে বলে দিলে আপনার বাবাও আপনাকে বাচাতে পারবেনা। ছাড়ুন আমাকে।” ধস্তাধস্তি শুরু করে দুজনে
রাওফানের তাকে বাগে আনতে বেশি কষ্ট হয়না। হাতের বাহুতে ধরেই তুলতুলে গড়নের এই মেয়েকে আয়ত্তে নেওয়া যাচ্ছে। সে শ্রেয়সীকে কাঁধে তুলে নিতে হাত বাড়ায়। ওকে কোলে নিবে এর আগে শ্রেয়সী পাশ থেকে একটা গাছের ছোট ছাল পড়েছিল, সেটা নিয়ে তার হাতে এক টান দেয়। ওটার মাথাটা কোণা জাতীয় আর লম্বা ধরণের। সাথে আলযুক্ত। রাওফানের হাতে যথেষ্ট জোরে পড়েছে টানটা। গভীরে ঢুকেছে হয়তো। তার হাতটা জ্বলে উঠলো, লাল র ‘ক্ত বের হচ্ছে। শ্রেয়সীকে ছেড়ে হাতটা দেখবে, এমন সময় সুযোগ পেয়ে সে আর দাড়ায়না। চলে যায় সেদিন যে গতি নিয়ে মেজরের থেকে পালাচ্ছিল, ঠিক ঐ বেগে দৌড়ে। আর টিকিটিও পাওয়া যায়নি তার।