সেরাতে শ্রেয়সীদের বাড়ি থেকে চলে আসে উমরান। আসার পরই কর্নেল সাহেবকে নিজের পিতার ব্যক্তিগত নাম্বার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কর্নেল সাহেব শুধু ফোনই করেননি, ওলিওল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতেও গিয়েছিলেন। গিয়ে নিজের মিত্রকন্যাকে উমরানের জন্য দিতে চাওয়ার আর্জি রাখেন।
ওলিওল্লাহ সাহেব তেমন অবাক হননি; ছেলের জন্য মেয়েপক্ষের তরফ থেকে প্রস্তাব আসা তার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু কর্নেল সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তিনি জানেন, তার ছেলেকে রাজী করানো সহজ হবে না। গত দুয়েক বছরে উমরান বেশ কয়েকবার বিয়ের কথা দৃঢ়ভাবে বাতিল করেছে। তবু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে নিজ দায়িত্বে বোঝাবেন। কর্নেল সাহেবের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিতে চান না।
কিন্তু ছেলের মিশনে যাওয়ার আগে দেখেশুনে আংটি পড়িয়ে রাখার কথা জানালে, কর্নেল সাহেব শ্রেয়সী সম্পর্কে জানান। সে এখনো ষোল চলছে। এবার S.S.C দেবে। তিনি এখন বিয়ের বিষয় নয়। বরং শ্রেয়সী আর উমরানের এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চাইছেন যদি তারা রাজী থাকে। আর চাইলে সবার আগে শ্রেয়সীর পরীক্ষার পর একবার বান্দরবান গিয়ে তাকে দেখে আসলেও সমস্যা নেই। পরে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে এগোতে চাইছেন কি না। যদি ভালো লাগে, এগোতে চান শ্রেয়সীকে নিয়ে- তাহলে আঠারো হলে তবেই বিয়ে পড়িয়ে দেবেন। অবশ্য যদি তারা রাজী থাকে। কর্নেল সাহেবের প্রস্তাবটি ছিল এমন। ওলিওল্লাহ সাহেবের শ্রেয়সীর বয়স শুনে কপালে ভাঁজ পড়তে দেখা যায়। তাও সরাসরি মানা করেননি। বরং ছেলে, ছেলের মায়ের সাথে এই বিষয়ে কথা বলে জানাবেন বলেছেন। কারণ, কর্নেল সাহেবকে তখনো ফেরাতে চান না তিনি। তাছাড়া শ্রেয়সীর পিতার সাথেও অল্প জানা শুনা ছিল। তাই ছেলের জন্য অবচেতন মন শ্রেয়সীকেই আনতে চাইছে ওলিওল্লাহ সাহেবের।
ভেবেচিন্তে পরদিন রাতে স্ত্রীর সাথে কথা বলে ছেলেকে ফোন দেন।
_____
_“পরী… পরী… পরী…”
পুঁই পাখির টানা সুরেলা ডাক কানে এলেও কিচেনে রাতের খাবার প্রস্তুত করতে ব্যস্ত উমরান বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলেন না। দক্ষ হাত ছুরির ধারায় কাটিং বোর্ডে ছন্দ তুলছে টুক টুক টুক শব্দ করে। আর চামচের শব্দে পাত্র বাজছে টিং টাং টিং করে। তিনি মনোযোগে নিমগ্ন। কিন্তু পুঁই পাখির ডাক থামার কোনো লক্ষণ নেই। চিকন সুরে সে অবিরত “শ্রেয়সী”-কে হাজির করার মতো করে “পরী” নামটি জপেই চলেছে।
শেষমেশ বিরক্তি আর অদৃশ্য দুর্বলতার মিশ্রণে উমরান ছুরিটা ঠাস করে একপাশে রেখে বসার ঘরে থাকা পুঁইয়ের খাঁচার কাছে এগিয়ে গেলেন।
মস্তক ঝুকিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আঙ্গুল তুলে বলেন,
_”হুশ… চুপ একদম। এই নাম আর নয়। আন্ডারস্ট্যান্ড? ডোন্ট টেক হার নেম। ইটস ডিস্ট্র্যাক্টিং মি।” যেন কোনো মনুষ্য সন্তানকে নিষেধ করছেন, যে তার কথা শুনবে অক্ষরে অক্ষরে। পুঁই যদিও একটি পোষা পাখি, কিন্তু কোনো মানুষ নয়। আর না কোনো যুক্তি তার বোধে লাগে। তাই উমরানের নিষেধ উপেক্ষাই করে আবার ডানা ঝাপটে উঠল,
_”পরী… পরী… পরী…”
উমরান দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
_”শাঁট আপ পুঁই। ঐ মেয়েটাকে এমনিতেই মাথা থেকে নামাতে পারছিনা কোনোভাবে। ডোন্ট পোক মি টু থিংক মোর এবাউট হার।”
পুঁই যেন আরও একগুয়ে হয়ে উঠল,
_”পরী… পরী… পরী… পরী…”
উমরান তার কথা অমান্য করায় পাখিটির উপর রেগে যেতে পারলেন না। মস্তিষ্ক নিষেধ করলেও মন চাইছে শ্রেয়সীকে নিয়ে ভাবতে।
পুঁইয়ের সুরেলা ডাক এবার তিনি মন দিয়ে শুনলেন। আনমনে চেয়ার টেনে খাঁচার পাশে বসে পড়লেন। হাঁটুতে হাত রেখে গালে ভর দিলেন। একটু সময় নিয়ে শুনলেন সেই একটানা ডাক।
অবশেষে ভ্রুকুটি করে পাখির দিকে তাকিয়ে বললেন,
_”ঐ সুন্দরী তোকে পরী ডাক শিখিয়েছে? শ্রেয়সী শেখায়নি?”
_”সুন্দরী পরী সুন্দরী পরী।”
উমরান আর কিছু বললেন না। যেন এই ডাকে তিনি হেরে গেলেন। খাঁচাটি নিয়ে চলে যান কিচেনের ওপাশে ছোট ব্যল্কনিতে। রেখে আসেন পুঁই পাখিকে ওখানে। তারপর আবার কাজে ফিরে গেলেন।
খেয়াল করলে বোঝা যাবে, ব্যালকনি থেকে আসা সেই “পরী… পরী…” ডাক আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট, আরও কাছে, আরও গভীরভাবে উমরানের কানে লাগছিল।
তবে কিছুক্ষণ পর চপিং বোর্ডে ছুরির খটখট শব্দের সঙ্গে উমরানের কপালের ভাঁজও যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। কত কথা বলেছে সে। তার মধ্যে শুধু “সুন্দরী” শব্দটাই পুঁই পাখি একবারেই রপ্ত করে ফেলল! আশ্চর্যই বটে। মনে হচ্ছে, চারদিকের সবাই যেন উঠেপড়ে লেগেছে ওই মেয়েটাকে তার মন-মস্তিষ্কের স্থায়ী বাসিন্দা বানাতে। আর অদ্ভুতভাবে, সকলে তাতে সফলও হচ্ছে।
একপাশে রাখা ফোন রিং হচ্ছে শুনে এগিয়ে যান। বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। প্রতিদিনের ন্যায় কথাবার্তা বলেন বাবা-মায়ের সাথে।
অবশেষে তার বাবা জানায়, কারো সাথে এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চাইছে তার। উমরান চুপই থাকেন। পরে মা ফোন নিয়ে ভিডিও কল দেন, শ্রেয়সীর ব্যাপারে স্বামীর কাছে যা শুনেছে সব জানিয়ে বলেন,
_”কি হলো? চুপ করে আছিস যে। সব তো শুনলি। তোর যেহেতু এখন বিয়ে করতে সমস্যা। মেয়েটারও বয়স হয়নি। তাই আঠারো হলেই বিয়ে পড়াবো। আরও দুই বছর পর। তাহলে নিশ্চয় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। আপাদত দেখেশুনে আংটি পড়িয়ে রাখবো। নাকি অন্য কোনো পছন্দ আছে তোর।”
_”তেমন কিছু না মা।”
খাবার প্লেট সাজাতে সাজাতে জবাব দেন। প্রায় প্রস্তুত। ভাত, সাথে হালকা মসুর ডাল। পাশে এক পিস গ্রিল চিকেন আর অল্প মিশ্র সবজি।
_”তাহলে? এখনো চুপ করে আছিস কেন? বিয়ের দুইবছর আছে আরও। যদিও মেয়েটার বয়স একটু কম। কিন্তু কোনো ব্যাপার না। তোর বাবা আর আমার বয়সের পার্থক্য এর চেয়েও অনেক বেশি। তবে মেয়েটা দেখতে কেমন, চালচলন কেমন -দেখতে তর সইছেনা আমার। তোর মিশন শেষ হলেই একবার গিয়ে দেখে আসবো। ততদিনে ওর পরীক্ষাও শেষ হবে।”
শসার কয়েকটা স্লাইস কাটতে কাটতে জবাব দেন উমরান,
_”আচ্ছা, দেখা যাক।”
তার মা তাহুরা চৌধুরী ছেলের সহজ উত্তর শুনে অবাকই হলেন। এত তাড়াতাড়ি মেনে নিলো?
_”উমি, তুই কি মেয়েটাকে দেখেছিস? ওখানেই তো থাকে বললো। শ্রেয়সী নাম ওর। তোদের সেনানিবাসের পাশেই যে আশ্রম? ওটা ওর বাবার। ওখানে নিশ্চয় আসা যাওয়া থাকবে, তুই কি ওকে দেখিসনি?”
_”দেখেছি।”
এবার কিছুটা সরু চোখে তাকান তাহুরা চৌধুরী ছেলের দিকে,
_”দেখেছিস? দেখতে কেমন?”
_”সুন্দর।”
এবার নড়েচড়ে বসেন তিনি। মনোযোগ দিয়ে দেখেন কিচেনে কর্মরত ছেলের চেহারাখানা। এই ছেলে কতবার যে বলেছিল- এখন বিয়ে করবেনা, কাউকে ভালো লাগলে নিজেই জানাবে। আর এখন দেখছেন ব্যাপার অন্য!!
_”তা সোলমেট খুঁজে পেলে নিজেই জানাবে বলা মেজরের কি এমন হলো যে বাবা-মায়ের নিয়ে আসা প্রস্তাব ভালো লাগছে। পাত্রীকে সুন্দর বলছে মায়ের সামনে।”
_”তুমিই তো জানতে চাইলে ওকে দেখেছি কি না, দেখতে কেমন। তাই বললাম সুন্দর। ভুল বলেছি কিছু?” বলতে বলতে ফোনটা হাতে নেন। ছোট একটা বাটিতে দই নিয়ে চলেন ডাইনিং এ।
_”তা ভুল বলেননি মেজর সাহেব। কিন্তু কিভাবে কি হলো মা জননীকে জানান শুনি।”
_”কোথায় আবার কি হলো? কিছুই তো হয়নি, রান্নাটা শেষ হলো শুধু, একটু পর খাওয়া শেষ হবে।”
_”তাই? রান্না আর খাবারের কথা রাখেন দেখি এখন। আপনার চোখ মুখ বলছে অন্য কিছু হয়েছে আপনার ভেতর। সেটা নিয়ে কিছু বলেন। আমি শুনে ধন্য হই।”
উমরান টানা স্বরে বলেন,
_”মা…… কিছু হয়নি।”
_”তুই কি ওর সাথে প্রেমে ট্রেমে জড়িয়ে গেছিস উমি? বোর্ড পরীক্ষা দেবে এবার। অল্পবয়সী একটা মেয়ে। আমি তো ঠিক করে রেখেছিলাম ওর সাথে এনগেজমেন্ট হয়ে গেলেও তোদের তেমন যোগাযোগ রাখতে দেবনা। অন্তত প্রথম বছর তো নাই। আর এখন তো মনে হচ্ছে অন্য কিছুর আভাস পাচ্ছি। উমি পছন্দ অব্দি যেন হয়। আমার ছেলের কাছে পরীক্ষার্থী কোনো মেয়ের সাথে পরীক্ষার আগ সময়ে প্রেমজনিত ঘটনায় জড়ানোর মতো কিছু আশা করছিনা অন্তত।” ছেলে যেহেতু বান্দরবান সেনানিবাস গেছে বেশিদিন হয়নি, তাই অল্পসময়ই পেয়েছে এ জানা কথা। অর্থাৎ, যদি প্রেম থেকেও থাকে দুজনের, তাহলে এই অল্প কদিনে হয়েছে। তাই নাকের ডগায় পরীক্ষা -এমন কোনো কিশোরিকে নতুন নতুন নিজের সাথে প্রেমে জড়িয়ে আবেগে ভাসিয়ে দেওয়া অপরাধ চোখে দেখছেন তিনি। এবং অবশ্যই তার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেরই অপরাধ তা। এই বয়সে মেয়েটি আবেগী হবে স্বাভাবিক, কিন্তু তার ছেলে তো নয়।
_”উফ মা, বেশি বেশি ভাবছ। আমি কি পাগল যে ওর সাথে প্রেম করবো। প্রেম করার বয়স আছে আর? করলে বিয়ে করবো। কিসের সাথে কি ভাবো!!”
_”তাহলে দুপক্ষ থেকে নয় বলছিস…”
_”না”
_”তোর পছন্দ?”
_”হু”
_”কর্নেল কিবরিয়া তোর বাবাকে প্রস্তাবটা যে দিলো। আমাদের যদি অপছন্দ হতো? তোর কানে না তুলেই যদি ফিরিয়ে দিতাম?”
_”তোমাদের মানিয়ে ওকেই বিয়ে করতাম।”
_”বাব্বা……জল তাহলে এতদূর গড়িয়ে গেলো।”
মায়ের কথায় খেতে খেতে উমরানের ঠোঁটের কোণে সুক্ষ হাসির রেশ দেখা যায়। এদিকে পুঁই কিছুপল নীরব থেকে আবার শ্রেয়সীকে জপতে শুরু করেছে।
____
পরদিন খুব সকালে উমরান কোয়ার্টার থেকে বেরোন। অবশ্য প্রতিদিনই বের হন মর্নিং ওয়াকে। তবে আজ বেরিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু না করে, পকেটে হাত গুঁজে কোয়ার্টারের সামনে জিপটার দিকে চোখ রেখে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছু ভাবেন। আজ অন্য কোথাও যেতে মন চাইছে। যদিও ধরতে গেলে এখন ভোরের আলো ফুঁটেছে মোটেই। তাও যদি হেঁটে যায়, আর গিয়ে তার দেখা না পাওয়া অব্দি আসতে মন না চায়। তখন আরেকটু থেকে যেতে ইচ্ছে করবে। এতে হেঁটে গেলে সময়ের ভেতর আবার ফিরে আসা সম্ভব হবেনা।
সাড়ে আটটায় সেনানিবাসে মর্নিং ব্রিফিং শুরু, অফিসে উপস্থিত হতে হবে। জিপ নিয়ে গেলে তার দেখা পেতে দেরি হলেও একটানে ফিরে আসা যাবে। ভাবনা চিন্তায় আর সময় ব্যয় না করে জিপ নিয়েই বেরিয়ে পড়েন।
সদরের ওখানে কোনো একটা কোচিং সেন্টারে পড়ে সেই কাঙ্ক্ষিতজন, একথা উমরানের জানা। জিপ নিয়ে চলেন সদরের উদ্দেশ্যে। কিন্তু শ্রেয়সীদের কোচিং সেন্টার খুজে পেতে পেতে দেখা গেলো সব স্টুডেন্ট ঢুঁকে পড়েছে। উমরান অপেক্ষা করেন। জিপ নিয়ে একপাশে অপেক্ষারত থাকেন। এবং অপেক্ষা করতে করতে আটটার ঘর ছুঁয়ে নেয়। ততক্ষণে লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়েছে। শেষে অধৈর্য হয়ে দূর থেকেই জানালা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত রমণীর দেখা পাওয়া যায় কি না খুঁজেন। আর পেয়েও যান অবশেষে। জানালার পাশেই বসেছে সে। স্কুলে বিদায় হয়ে গেছে, তাই যায়না। একারণে গাঁয়ে স্বাভাবিক পোশাক, ইউনিফর্ম নেই। সামনে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে বাকি স্টুডেন্টদের মতো। হাতে কলম। স্যার কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন হয়তো। বেশ কয়েক মিনিট মাতা ‘ল প্রেমিকের ন্যায় চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন।
এসব টিনেজ প্রেমিকদের মতো কাজ কারবার মেজর উমরান করছে শুনলে বোধ হয় কেউ বিশ্বাসই করবেনা। আর তার সৈন্যরা যদি কানা পরিমাণও টের পায়, তাহলে মান ইজ্জত কিছুই থাকবেনা। চিনতেই পারবেনা বোধ হয় তাদের কঠোর, গাম্ভীর্যে ভরপুর মেজরকে। এদিকে আটটায় শ্রেয়সীদের ছুটি হওয়ার কথা হলেও দিচ্ছেনা ছুটি। হয়তো পরীক্ষার্থী বলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সাজেশন, কিংবা লেকচার দিচ্ছে তাদের টিচার। একথা মাথায় আসতেই শ্রেয়সীর চোখে পড়ার আগে সেখান থেকে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন উমরান। পা বাড়ান জিপের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু শ্রেয়সী তাকে না দেখলেও, মেজর উমরান তার কিছু সৈন্যদের দেখলেন কিছুটা দূরে দাড়িয়ে তাকে আগাগোড়া পর্যাবেক্ষণ করছে। কারো চোখে কৌতূহল, তো কারো চোখে বিস্ময়। মেজরের চোখে চোখ পড়ে প্রত্যেককে থতমত খেতে, কিংবা ইতস্তত করতে দেখা গেলো। এরা সবাই চব্বিশ থেকে ছাব্বিশের ভেতর বয়স। কেউ ক্যাপ্টেন, কেউ লেফটেন্যান্ট পদে আছে। দুজন আবার সাধারণ সেনা। মোট পাঁচজনকে দেখা যাচ্ছে। দুটো বাইক। মেজর উমরানের বিষয়টা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে এরা, কিংবা পুরোটাই ধরে নিয়েছে। বাকি শুধু, ঠিক কোন মেয়ের জন্য মেজরের আসা সেটা জানা। এসব বুঝতে পেরেও মেজরের মধ্যে তেমন দ্বিধা দেখা গেলোনা। বরং বরাবরের ন্যায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন,
_”দলবেধে এখানে আসার কারণ?”
তাদের ইতস্তত করতে দেখা যায়। স্যার নিজেই তাদের দেখে ফ্যাসাদে পড়ে যাবেন ভেবেছিল। কিন্তু চোখ মুখ দেখে সিকি পরিমাণও বিচলিত দেখাচ্ছেনা। শাহিন নামের ছেলেটা গলা নামিয়ে বলে,
_”আ, আসলে স্যার। শ্রেয়সী ম্যাডামের ছুটি হবে একটু পর। উনি ঠিকঠাক পৌছে গেলেই বাইক নিয়ে টান দিতাম।”
মেজর সরু চোখে তাকান। যদিও ছেলেটা মিথ্যা বলছেনা। সে মূলত শ্রেয়সীর নিরাপত্তার জন্যই এসেছিল। রাওফানের বিষয়টা জানাতেও পারছেনা কর্নেল স্যারকে। আবার বিরক্ত করে, নাকি প্রেমের সম্পর্ক আছে তাও নিশ্চিত নয়, তাই যদি বিরক্ত করে এমনটা হয়ে থাকে। তাহলে রিস্ক নিতে চায়না। তার দায়িত্ব শ্রেয়সীকে রক্ষা করা।
_”প্রশিক্ষণ এত দুর্বল দিয়েছি? যে একজনকে রক্ষা করতে পাঁচজন সৈন্যের দরকার পড়ছে।”
_”স্যার আমি একাই পারি ম্যাডামকে রক্ষা করতে। ওরা তো এসেছে অন্য কাউকে প্যানিক দিতে। না মানে… রক্ষা করতে।” শাহিন ছেলেটি বাকিদের দিকে ইঙ্গিত করে কথাটি বলে, আর নিজের গা বাঁচিয়ে নেয় কোনোভাবে।
_”স্যার, আমরাও… না মানে এমনি এদিকটাই এসেছিলাম আজ। শাহিনের জ্বর ছিল রাতে। শ্রেয়সী ম্যাডামের কোনো বিপদ হলে জ্বর নিয়ে শাহিন কিইবা করবে তাইনা?……” শ্রেয়সীর বান্ধবী তাবাসসুমকে বিরক্ত করা সেই লেফটেন্যান্ট ইতস্তত করে কথাগুলো বলছিল। কিন্তু মেজরের তীক্ষ্ণ চোখের নজরে পড়ে থেমে যায়।
_”স্যার আমার এদিকে কাজ ছিল সত্যি বলছি।” দিহান নামের এক সৈন্য কথাটি বলে গলায় জোর দিয়ে।
_”বুঝতেই পারছি কোন কাজে এসেছ প্রত্যেকে।” প্রত্যেককে মাথা নত করতে দেখা যায় মেজরের কাছে ধরা পড়ে। অথচ ধরা পড়তে যাচ্ছিল মেজর নিজেই। শনির প্রকোপ তাদের দিকে ঘুরে গেলো। এর মধ্যে মেজরের শান্ত কণ্ঠে তীক্ষ্ণবাণী শুনা গেলো,
_”দলবেধে আসা এক ধরণের অসভ্যতা। যে কেউ ইভটি ‘জার ভাববে। ছোট ছোট কিশোরি মেয়েগুলো তো আরও আগে। তোমরা আর আগের মতো নেই। সেনাজীবনে পা দিয়েছ। ইউনিফর্ম গাঁঁয়ে না থাকলেই নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিতে হবে এমন কথা নেই। একজন সৈন্যের গাঁঁয়ে অফ ডিউটিতেও ইভটি 'জার কিংবা বখা 'টে তকমা লাগা অ 'সম্মানজনক।”
_”বুঝতে পেরেছি স্যার।” তাদের মধ্যে কারো একজনের মিনমিন কণ্ঠে কথাটি শুনা গেলো।
_”বলছিনা যে স্বাভাবিক জীবন বাদ দিতে হবে। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই মেয়েগুলোর পরীক্ষা। একথা নিশ্চয় জানা আছে। এমন সময়েও এসব তোমাদের থেকে আশা করিনি। আবার দলবেধে আসারও সাহস করো দেখে অবাক হচ্ছি।”
_”সরি স্যার, আর হবেনা।” নত মাথায় ক্ষমা চেয়ে নেয় প্রত্যেকে।
_”এখন যাও। একটু পরই গ্রাউন্ডে উপস্থিত থাকতে হবে প্রত্যেককে। আর এখানে দাড়িয়ে না থেকে যাও।” মেজরের কঠোর কণ্ঠে প্রত্যেকে বাইকে উঠে। কিন্তু একটাতে দুজন হলেও। অপরটাতে দেখা গেলো তিনজন বসেছে। তিনজন এক বাইকে এমনিই এলাউড না। এই পাহাড়ি রাস্তায় এরা আর্মির সদস্য হয়ে পাঁচজন মিলে দুটি বাইক নিয়ে এসেছে মেয়েগুলোকে পটাতে… উমরানের চোখে বিরক্তি দেখা যায় নিজের সৈন্যদের এমন অবুঝপনায় আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতায়। তারাও বিষয়টা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ে বাইক টান দিয়ে।
উমরানও আর সময় নষ্ট করেন না। শ্রেয়সীদের ছুটি দেওয়ার সময় হয়েছে। জিপ নিয়ে সাইড হয়ে যান। ছুটির পর শ্রেয়সী বান্ধবীদের নিয়ে পাহাড়ি ছোট ছোট জিপগুলোতে উঠে চলে গেলে, মেজর উমরানও হাত ঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেন।