হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ১০

🟢

বাজার সেরে কর্নেল স্যারকে তার গন্তব্যে; অর্থাৎ শ্রেয়সীদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন উমরান। কিন্তু তার আর ফিরে যাওয়া হয়নি। কর্নেল সাহেব তাকে বাড়ি অব্দি এসে ফিরে যেতে দেননি। উমরান অবশ্য মানা করেছিলেন, কিন্তু কর্নেল স্যার তার কোনো কথা শুনেন নি। নেওয়াজ কুঠিরে নিয়ে গেছেন নিজের সাথে। বাড়িটি ভীষণ সুন্দর। নান্দনিক ডিজাইন, পাহাড় কেটে তার উপর বানানো হয়েছে বাড়িটি। নিচ থেকে ছোট ছোট কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। তারপরই পাহাড়ের উপর আভিজাত্যে মুড়ানো নান্দনিক ডিজাইনের বাড়িটি।

উমরান বাজার থেকে আসতে সময় একটা টিয়া পাখি কিনেছিলেন, সেটাও সাথে নিয়ে গেলেন। একপাশে রাস্তার ধারে বসেছিল এক লোক খাঁচার ভেতর কিছু পাখি নিয়ে। কেনা বেচা করছিল। উমরান ভাবলেন একাকীত্মের জীবনে একটা টিয়াকে সঙ্গী করা হোক।

উমরানের কিছুটা দোনোমনা থাকলেও গেলেন কর্নেল স্যারের সাথে শ্রেয়সীর বাড়ি। আজ কর্নেল আঙ্কেল আসবে তা শ্রেয়সীর জানা ছিল। তাই কলিং বেল বাজতেই বরাবরের ন্যায় উৎফুল্ল হয়ে দরজা খুলে সে। কিন্তু আঙ্কেলের সাথে মেজর উমরানকে দেখতে পাবে আশা করেনি। যতটা না উৎফুল্ল ছিল, তার চেয়ে বেশি অবাক হলো তাকে দেখে। যদিও সে তখনো মেজরের পরিচয়, নাম-ধাম কিছুই জানেনা। শুধু জানে সেনানিবাসের একজন অফিসার সে।

হতবাক শ্রেয়সী কেমন বোবা হয়ে গেলো তাকে দেখে। এই লোকটাই তো সেদিন তার খুব কাছে চলে এসেছিল। শ্রেয়সীর মনে হয়েছে আরেকটু হলেই চুমু খেয়ে দিতো অচেনা মানুষটা। কোনোভাবে পালিয়ে এসেছে সে। কিন্তু এখন তো সোজা বাড়ি চলে এলো! তাও আবার কর্নেল আঙ্কেলের সাথে। শ্রেয়সী কিছু বুঝতে পারছেনা, দ্বিধান্বিত দেখায় তাকে, সাথে কিছুটা ভয়ের রেখাও ফুঁটে উঠলো বোধ হয় চেহারায়। লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে এসেছে, এর জন্য না জানি আবার শোধ নেয়। একারণেই এসেছে কি?

কর্নেল সাহেব শ্রেয়সীর মাথায় হাত রেখে এটা সেটা বলছেন। অনেকদিন পর এসেছে তাই আদুরে স্বরে ক্ষমা চেয়ে নিলেন তার কাছে। কিন্তু শ্রেয়সীর সেদিকে মন নেই। সে নিজের বিস্ময় কাঁটাতে পারছেনা।

_”অনেক কথা হলো। এবার আমাদের ভেতরে ঢুকতে দাও মা। অতিথি নিয়ে এসেছি আজ সাথে।”

_”শ্রেয়সী, সরে দাড়া। উনাদের ভেতরে তো আসতে দে।” অতিথি নিয়ে দাড়িয়ে আছে দেখেও শ্রেয়সী তাদের আসার পথ দিচ্ছেনা এতক্ষনেও। তাই দীদুনও তাকে সরে দাড়াতে বলে।

শ্রেয়সী খেয়াল করেনি তাদের কারো কথা। তাই সব উপেক্ষা করে নিজেই প্রশ্ন করে বসে,

_”আঙ্কেল? এই লোকটা এখানে কেন?”

দীদুন আর কর্নেল সাহেবকে উমরানের সামনে কিছুটা অপ্রস্তুত দেখায় শ্রেয়সীর সরাসরি এমন প্রশ্নে। বাড়িতে একজন অতিথি এসেছে, আর মেয়েটা তাকে ভেতরে আসতে না দিয়ে জানতে চাইছে সে এখানে কেন! আবার লোকটা বলে সম্বোধন করছে। বড়দের সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয় ভুলে গেলো নাকি মেয়েটা?

_”শ্রেয়ু, এটা কেমন কথা? অতিথিদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়?” দীদুনের ধমকে শ্রেয়সী অবুঝ নেত্রে তাকায়।

_”কিন্তু উনি অতিথি? আমাদের কি হয়? আগে তো জানতাম না?”

দীদুন চোখ গরম করে তাকান। তাও কোনোরকমভাবে বলেন,

_”সেটা ভেতরে আসতে দিয়ে জেনে নিতে হয়? এভাবে সবার সামনে বাইরে দাড় করিয়ে রেখে নয়।”

_”শ্রেয়ু মা, আঙ্কেলের অতিথি সে। সরে দাড়াও।”

কর্নেল আঙ্কেলের নরম কণ্ঠে সে হুশে ফেরে। ইতিওতি করে কোনোরকম সরে দাড়ায়। হতবুদ্ধির ন্যায় কাণ্ড কারখানা করেছে সে বুঝতে পারে। লোকটা চলে গেলে আজ দীদুনের লেকচার শুরু হবে। শ্রেয়সীর চোখে মুখে বিরক্তি ফুঁটে উঠে। কর্নেল সাহেবের সাথে প্রবেশরত উমরানের দিকে তাকায়। অমনি দেখলো সুবিধাবাদী লোকটার দৃষ্টি তার দিকেই। কেমন গম্ভীর মদ্যপ নয়নে তাকে দেখছে। ঐ অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে শ্রেয়সী একটু কেঁপে উঠলো বোধ হয়। কিছুটা অস্বস্তি হলো। এদিক ওদিক করে নিজেকে সামলে নেয়।

ততক্ষণে তারা বসার ঘরে গিয়ে সোফায় বসেছে। কর্নেল সাহেব উমরানের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সে তাদের সেনানিবাসের নতুন মেজর এবং ডক্টর ওলিওল্লাহ চৌধুরীর ছেলে। যে ডক্টর দশ/বারো বছর আগে কর্নেল সাহেবের পিতার অপারেশন করেছিলেন। আর আজ কর্নেলের গাড়িতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় উমরানের গাড়িতে বাজার ঘুরে এসেছে। দীদুন সন্তুষ্ট হন মেজরের পরিচয় পেয়ে, উৎফুল্ল দেখায় উনাকে। তার সাথে গল্প জুড়ে দেয়। আর শ্রেয়সীকে হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করতে বলে অতিথির জন্য। শ্রেয়সী দীদুন আর আঙ্কেলের সাথে গল্প জুড়ে দেওয়া সুবিধাবাদী লোকটার দিকে তির্যক নয়নে তাকাতে তাকাতে চলে যায়।

উমরান এই সময়ে নাস্তা খাবেনা বলে মানা করে দিয়েছে। কিন্তু কথা সেটা না, আসল কথা হচ্ছে- খাবেইনা যখন, তখন সেটা শ্রেয়সী নাস্তা আনতে যাওয়ার আগে বললোনা কেন? নাস্তা আনার পর এসব নাটকের মানে কি? শ্রেয়সী দীদুন আর আঙ্কেলের সামনে কিছু বলতেও পারছেনা, আবার সহ্যও করতে পারছেনা। অসহ্য লাগছে একপ্রকার। মেজরপানে ক্ষোভ নিয়ে তাকায়। খারুস, আর সুবিধাবাদী বলে মনে মনে গা ‘লি দিচ্ছিল।

কিন্তু অকস্মাৎ আঙ্কেলের সাথে কথা বলার ফাঁকে তার দিকে তাকালো ঐ মেজর, শ্রেয়সীর বুকটা কেঁপে উঠলো সাথে সাথে। ক্ষোভের জায়গায় অল্প সংকোচ রেখা ফুঁটে উঠলো চেহারায় মেজরের শান্ত চোখের মাতালকরা দৃষ্টির শিকার হয়ে। লোকটার তার দিকে তাকানোর ভঙ্গিমাটা কেমন যেন। হৃৎযন্ত্রের কম্পন বাড়িয়ে দেয়। মনে হয় যেন এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে তার ভেতরটা।

সে দীদুনের কথায় আবার রাতের খাবার প্রস্তুত করতে চলে যায়। তাদের গল্পগুজবের মধ্যেই শ্রেয়সী সবটা করে ফেলে। রান্না অবশ্য দীদুন করেই রেখেছিল; সে পারেনা রাধতে। সব ডাইনিং-এ নিয়ে সাজিয়ে রাখে সুন্দর করে। মেজর, কর্নেল আর দীদুন বসে পড়েন খেতে। শ্রেয়সী খাবেনা এখন, তার সাতটা/আটটার দিকে একবার খিদে পায়, তখন খেয়ে নেয় অল্প সল্প। তারপর আবার মাঝরাতে খিদে পাবে। আর তখনই খাবে সে। তার নিয়মগুলো অন্যরকম। তাদের খাওয়ার মাঝে সবাইকে সবকিছু এগিয়ে দিয়ে চলে যায় সোফার ওখানে। ঐ মেজরটা একটা টিয়া পাখি এনেছে খাঁচায় করে। লোকটার হবে নিশ্চয়। তার খুব টিয়াটির সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মেজরের সামনে থেকে তারই টিয়াকে নিয়ে অন্য কোথাও সরে বসে কথা বলতে পারেনি সংকোচে, দ্বিধায়। এখন সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করলো না।

নানান কথা বলছে সে। টিয়ারা কথা বলতে পারে জানতো সে। আজ প্রথম দেখলো। খাঁচার ভেতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে মাথার ঝুটি ছুঁয়ে দেয় কখনো, আবার এটা সেটা বলতে বলে পাখিটিকে।

_”শুনো, আমি শ্রেয়সী। তুমি আমাকে পরী বলে ডাকবে বুঝেছ? চিকু, শানুরাও আমাকে পরী বলে ডাকে। তুমিও তাই ডাকবে। কারণ তুমিও ওদের মতো ছোট বাচ্চা, কুটুর কুটুর কথা বলো। আমার তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। ডাকো পরী……”

_”পরী, পরী…”

চিকন চিকন সুরেলা কণ্ঠে পাখিটি পরী ডাকতেই শ্রেয়সী বলে,

_”এই তো, ভেরি গুড। তোমার কণ্ঠ ভীষণ সুন্দর। আহা কি সুর, আর তোমার মালিক? যেন আজ্রাইলের কণ্ঠ। তুমি একটু তাকে শিখিয়ে দেবে কিভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয় বুঝেছ?”

_”পরী পরী পরী।”

শ্রেয়সী উৎফুল্ল হয়ে আরও কিছু কথা বলে পাখিটির সাথে।

_”শ্রেয়ু… মুড়িঘন্টটা শেষ হয়ে এলো। যা তো আরেক বাটি নিয়ে আয়।”

দীদুনের ডাক শুনে সে উঠে যায়। পাখিটি তখনো পরী, পরী করছে। শ্রেয়সী মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে আসে। সোফা থেকেই ডাইনিংটা স্পষ্ট দেখা যায়। উঠেই শ্রেয়সীর আবার মেজরের দিকে চোখ পড়লো। কিছু একটা তুলে দিচ্ছে তাকে দীদুন। তবে সে মানা করে দিলো ভীষণ ভদ্রভাবে। কি কঠোর ব্যক্তিত্ব লাগছে তাকে। অথচ শ্রেয়সী জানে লোকটা আড়ালে অন্যরকম।

ভাবতে ভাবতে মেজর আবার চোখ তুলে তার দিকে তাকালেন। কি আশ্চর্য! তাকেই দেখছিল নাকি আগে থেকে। শ্রেয়সী পাত্তা না দিয়ে চলে যায় মুড়িঘন্টটা নিয়ে আসতে।

খাওয়া দাওয়া শেষ। শ্রেয়সী আস্তে আস্তে সব গুছিয়ে নিয়েছে। তবে তখনো তারা ডাইনিং থেকে উঠেনি। আরও কথাবার্তা বলছে। শ্রেয়সী সব গুছিয়ে বাইরে এসে ডাইনিং সংলগ্ন বেসিনে যায় হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে। মনোযোগ দিয়ে হাতে হ্যান্ডওয়াশ নিয়ে ফেনা করে সে। তারপর ট্যাব ছেড়ে হাত ধুতে ধুতেই হঠাৎ সেই হৃদয় কাঁপানো কণ্ঠ শুনতে পায় নিজের অতি সন্নিকটে,

_”শ্রেয়সী নেওয়াজ?”

গাম্ভীর্যে ভরপুর সেই পুরুষালি কণ্ঠ। শ্রেয়সী তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে মাথা তুলে তাকায়। উমরান তাওসিফ; ঐ মেজরটা, খুব কাছে শ্রেয়সীর। একদম গা ঘেঁষে দাড়িয়েছে তার পেছনে। পুরুষালি দেহটা এত সন্নিকটে আছে অনুভব করে তার কিছুটা অস্বস্তি হয়।

_”আপনি?”

_”আমি”

কথাটি বলার সাথে সাথে উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে পরে শ্রেয়সীর মুখের উপর। সে দম নিয়ে বলে,

_”এখানে কি চাই?”

_”তোমাকে”

শ্রেয়সী ভ্রু কুচকে তাকায়। উমরান সেকথা বাদ দিয়ে বলেন,

_”আমার পাখিটার সাথে কি কি গল্প করলে?”

পাখিটির কথা বলায় শ্রেয়সীর চেহারায় উজ্জ্বল ভাব দেখা গেলো,

_”শিখিয়েছি অনেক কিছু। খুব মিষ্টি আপনার পাখিটা।”

_”তাই?”

_”হ্যাঁ খুব মিষ্টি। আচ্ছা ওর নাম কি?” পাখিটির নাম জানতে প্রশ্নাতুর দৃৃষ্টিতে তাকায় সে। উমরান সেই আগ্রহভরা পেখম রাঙা নয়নপানে স্বীয় চোখ বুলিয়ে বলেন,

_”নাম ঠিক করিনি এখনো। তুমি বলে দাও কি নাম রাখব।”

শ্রেয়সীকে উৎফুল্ল দেখালো নাম রাখার দায়িত্ব তাকে দেওয়ায়।

_”পুঁই; পুঁই পাখি ডাকবেন ওকে হ্যাঁ? আমি একবার একটা বিড়াল পেলেছিলাম অনেক দিন। ওকে পুঁইসোনা ডাকতাম। কিন্তু ওর ঠিক মতো কেয়ার করতে জানিনা বলে দীদুন কার সাথে জানি যোগাযোগ করে দিয়ে দিয়েছে। আপনি ওকে পুঁইপাখি ডাকবেন, ঠিক আছে?”

শ্রেয়সীর অতি সন্নিকটে অবস্থানরত মেজর আপন দৃষ্টিপটে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তার চোখের কম্পন, অধরের সূক্ষ্ম রেখা আর বাকভঙ্গির কোমল উঠানামা। কথার সমাপ্তিতেই তার কপালে ঝরে পড়া বেবি হেয়ারগুলো তিনি অতি মৃদু নিঃশ্বাসে ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দেন। প্রশান্ত গভীর স্বরে বলেন,

_”ঠিক আছে…… শ্রেয়সী, যেমনটা তুমি বলো।”

শ্রেয়সী লাজে সংকোচে চোখ বুজে নিল। এমন করলো কেন মেজরটা? শ্রেয়সীর কেমন কেমন লেগেছে।

এর মধ্যে তাকে ঘেষে কিছুটা অগ্রসর হয়ে বেসিনে হাত দুটো পরিস্কার করলেন উমরান। শ্রেয়সী অস্বস্তিতে ঘাট হয়ে দাড়িয়ে রইলো।

_”আ আপনি সেদিন আমার সাথে বাজে কাজ করতে চেয়েছিলেন আমি বলে দেবো আঙ্কেল আর দীদুনকে।”

_”আচ্ছা।” উমরান হাত ধুতে ধুতে জবাব দেন।

_”সত্যি বলে দেবো।” কোণা চোখে মেজরের পুরুষালি নির্লিপ্ত চেহারায় নজর বুলিয়ে বলে শ্রেয়সী।

তবে উমরান ফের নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলেন,

_”আচ্ছা”

শ্রেয়সী একটু গাইগুই করে নিজেই আবার বললো,

_”আপনি কি সরি সেদিনের জন্যে?”

উমরানের ততক্ষণে হাত ধোঁয়া শেষ। কথাটি কানে যেতেই ভ্রূকুটি করে শ্রেয়সীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। মেয়েটার চোখ-মুখের সূক্ষ্ম আগ্রহ বলছে কিছু বলতে চাই। কিন্তু তার জন্য তাকে সরি হতে হবে।

_”সরি হলে?” সরাসরি ক্ষমাপ্রার্থনার শব্দ উচ্চারণ না করে উমরান প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শ্রেয়সীর কণ্ঠে নেমে এলো নরম স্বর,

_”আপনি সরি হলে তো বলবো না কাউকে। ইটস ওকে বলে সেসব মিটিয়ে নেবো। তার বদলে আপনি আমাকে পুঁইসোনার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতে দেবেন, দেখা করতে দেবেন। ডিল?”

তার এই সমঝোতার পেছনের কারণ-ধরণ আর সরলতা দেখে উমরানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির আভাস ফুটে উঠলেও তিনি তা প্রকাশ করলেন না।

_”ওকে ডিল।”

অল্প বিরতির পর গম্ভীর কণ্ঠে উমরান আবার জিজ্ঞেস করলেন,

_”রাওফান কি আর বিরক্ত করেছিল কোনোভাবে তোমাকে?”

শ্রেয়সী চুক্তিবদ্ধ হয়ে চলে যেতে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু মেজরের কথা শুনে আবার থেমে যেতে হয়।

_”না তো, সেদিন বিকেলেই শেষবার ছিল, আর বিরক্ত করেনি।”

উমরানের চেহারায় সন্তুষ্টির রেখা দেখা গেলেও, কথাটি বলেই শ্রেয়সীকে একটু দ্বিধান্বিত দেখালো।

_”কিন্তু আপনি কিভাবে জানলেন রাওফানের কথা?”

_”সেসব জেনে তোমার কাজ নেই। তুমি ক্যাপ্টেন রাওফান কোনোভাবে বিরক্ত করার চেষ্টা করলে আমাকে জানাবে এবার থেকে ঠিক আছে?”

এই কথায় শ্রেয়সীর চোখেমুখে হালকা ভয় জেগে উঠল।

_”আপনি কি কর্নেল আঙ্কেলকে জানিয়ে দিয়েছেন এসব?”

উমরান দৃঢ়তা বদলে মৃদু স্নেহে তার মাথায় এক আলতো টোকা দিলেন।

_”জানায়নি কাউকে। এত চিন্তা করতে হবেনা ছোট্ট মাথায়।” অল্প থেমে আবার বলেন,

_“আর, কি বলেছি মনে থাকবে? আমাকে জানাবে সামনে আর বিরক্ত করলে বা যোগাযোগের চেষ্টা করলে।”

শ্রেয়সী মাথায় হাত ঘষে বিরক্ত চোখে বলে,

_”শ্রেয়সী নিজেকে নিজে সেইফ করতে জানে। শি ডোন্ট নিড এনিওয়ানস হেল্প। আপনাকে বলতে হবেনা।”

_”এত ঝাঝ দেখিয়ে লাভ কি? আমারই তো ঘরে উঠতে হবে মনে হচ্ছে। আমাকে না বলে আর কাকে বলবে?”

শ্রেয়সী কথার মানে বুঝতে না পেরে কিছু জানতে চাইবে তার আগে দীদুনের কণ্ঠ শুনা যায়,

_”শ্রেয়ু, মেজর বেসিনে হাত ধুতে গিয়েছিল। এখন ওয়াশরুমে বোধ হয়। একটু দেখতো কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, রুম টুম গুলিয়ে ফেললো বোধ হয়।”

শ্রেয়সী বলতেই নিচ্ছিল যে তার সামনে আছে মেজর। কিন্তু এর মধ্যেই উমরানের কথায় জমে যায় সে।

_”শুনো শ্রেয়সী নেওয়াজ, সামনে থেকে বাড়িতে কেউ আসলে দরজা খুলার আগে পীফোল ক্যামেরায় কে এসেছে দেখে নেবে। তারপর ঢেকেঢুঁকে পোষাক পড়ে তাদের সামনে যাবে বুঝেছ? আমার সামনে এসেছ, এসেছ। আর কারো সামনে যেন বাড়ির পোষাকে যাওয়া না হয়।”

শ্রেয়সী জমে গিয়ে নিজের দিকে তাকায়। তার পড়নে একটা ছোট টপ। নরম নেটের হালকা পীচ-নিউড রঙের ক্রপ টপটি নাভির খানিক উপরে শেষ হয়েছে। আর নাভি থেকেই শুরু হয়েছে তার নরম কাপড়ের প্লাজু। বাড়িতেই এমন পোষাক পড়ে সে। কিন্তু এখানে এমনভাবে বলার মতো খারাপ কি আছে? নাহ, কিছু নেই… মেজরের চোখ-ই খারাপ!!

থমথমে শ্রেয়সী চলে যায় ওখান থেকে। কিন্তু সে বুঝতে পারলোনা, পাতলা কাপড় শরীরের বাঁককে ঢেকে রাখলেও তার উপস্থিতি স্পষ্ট করে তুলেছিল নারীত্বের কোমল অবয়ব। মেজর কিছু বললেননা ষোড়শী কন্যাটিকে। পকেটে হাত গুজে চলেন তার পিছু পিছু।

কর্নেল সাহেবের জরুরী কল এসেছিল। তিনিও কথা শেষ করলেন। দীদুন কিছু ফল কেটেছে অতিথির জন্য। নিয়ে আসেন সেসব।

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ১০ গল্পের ছবি