মৌরি কক্সবাজার বেড়াতে এসেছে।
তার বোনের পরিবারের সাথে। বোনের পরিবার বলতে তার বোন তুলি, তুলির স্বামী, আর এক মেয়ে (৫ বছর) ও এক ছেলে (৩ বছর)। ঐ তো, তারা সমুদ্রের পানিতে খেলছে। একটা সুখী পরিবারের জন্য এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর দুটো হতে পারে না বোধ হয়। দুই বাচ্চা আর স্বামী নিয়ে তুলির কি সুন্দর জীবন। মৌরি তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দূর থেকে ওদের সুন্দর মুহূর্তটা ফ্রেমবন্দি করে নেয়।
ওদের সাথে মৌরির আসার পরিকল্পনা ছিল না। ঘটনাবশত হুট করে চলে এসেছে। সে লম্বা কাহিনি।
মৌরি আপাতত সমুদ্রের তীরে বালুর চরের উপর সাজানো সারি সারি বিচ চেয়ারগুলোর একটিতে বসে আছে।
ওখানে তার বোনের বাচ্চাদের এক্সট্রা ড্রেসসহ, খেলনা, জুতো; সাথে তাদেরও টুকটাক জিনিসপত্র একপাশে রাখা। মৌরি ওদের সাথে পানিতে নামছে না কারণ তার অস্বস্তি হচ্ছে। আর দুদিন পর তার পিরিয়ড ডেট। পা ব্যথা, পেট ব্যথা সব মিলিয়ে তার অস্বস্তি হচ্ছে বিধায় সে এখানে বসে আছে।
তার উপর পরনে রয়েছে বোরকা। কালো রঙের একটা বিদেশি বোরকা তার গায়ে। তবে ওড়নাটা পিন-আপ করা নেই।
মৌরি যথেষ্ট রক্ষণশীলভাবে বড় হয়েছে। শুধু সে নয়, তুলিও তাই। বাইরে যেতে ক্ষেত্রবিশেষে বোরকা পরে তো অনেক সময় পরে না।
কিন্তু না পরলেও যথেষ্ট শালীনতা বজায় রেখে চলে।
এই মুহূর্তে ওড়নাটা মাথায় দিয়ে কোনোভাবে গলায় পেঁচিয়ে রেখেছে সে।
এতো লং জার্নি করে এসে তার সমুদ্রপাড়ে ওড়না পিন-আপ করে আসতে মন চায়নি।
সে চারদিকে একবার তাকায়।
দেশের নানান জায়গার মানুষ। কেউ ঢাকার, কেউ উত্তরবঙ্গের, তো কেউ আবার অন্যান্য জায়গার। একেক শ্রেণির মানুষের একেক রকম পোশাক-আশাক। ওয়েস্টার্ন, দেশি সব মিলিয়ে। এই তো, যেমন সে নিজেও আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পোশাক -বোরকায়।
মৌরিদের এক পাশের বিচ চেয়ারটা খালি। আর তার পরেরটাতে বেশ কয়েকজন মহিলা দেখা যাচ্ছে। তাদের দুই পাশের দুটি চেয়ারই খালি। নিরাপত্তার জন্য দুই পাশের দুটো চেয়ার বুক করে নিয়েছে। মহিলারা প্রত্যেকে ২০–৩০ বছরের মধ্যে হবে।
তাদের গায়ে আবার ওয়েস্টার্ন পোশাক নেই। প্রত্যেকে মৌরির মতো বোরকা না পরলেও দেশি, শালীন আর মার্জিত পোশাকে আছে। তবে পোশাক-আশাকে আভিজাত্য ভাবটা বেশ লক্ষণীয়।
তাদের একপাশে আবার চার-পাঁচজন পুরুষ দেখা যাচ্ছে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তারাও সাধারণ পোশাকে আছে, তবু কেমন জানি একটা পেশাদারিত্ব লক্ষ্য করা যায় তাদের মধ্যে। হাতে দামি ঘড়ি, চোখে সানগ্লাস—তবে মনে হচ্ছে যেন অনুসন্ধানী চোখ চারদিকে। কী জানি! মৌরির তো তাই মনে হচ্ছে।
শারীরিক গঠনও চোখে পড়ার মতো প্রত্যেকের। গায়ে আটসাট শার্ট-প্যান্ট। বয়স তিরিশের কোঠায় হবে হয়তো, কিংবা বেশিও হতে পারে।
মোট কথা, চোখে পড়ার মতো সুদর্শন পুরুষ প্রত্যেকে।
ওদের চুলের কাঁটার ধরণ দেখে মৌরির মনে হচ্ছে সামরিক বাহিনীর লোক হবে হয়তো। তার ধারণা সত্যি হলো যখন দেখল তাদের একজন পকেট থেকে কিছু একটা বের করতে গিয়ে অফিসিয়াল আর্মি আইডি কার্ডটা হাতে নিলো।
মৌরি বুঝতে পারে এরা সামরিক বাহিনীরই সদস্য।
সে ধারণা করে মহিলাগুলো কোন বিশেষ ব্যক্তিবর্গের স্ত্রী-কন্যা-বোন এমন কিছু হবে। তারা পরিকল্পনা করে ঘুরতে এসেছে আর সামরিক বাহিনীর বিশ্বস্ত লোকেরা তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে।
মৌরি আর কিছু ভাবেনা। সে অপরিচিত কিছু মানুষকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে জীবনের কয়েক পল নষ্ট করে ফেলেছে ভেবে নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয়।
এর মধ্যে দেখে তার ফোনে কল আসছে। তার প্রিয় বান্ধবী অনামিকার ফোন। সে রিসিভ করে।
"হুম বল।"
"কী মামা... কক্সবাজারের হাওয়া খেয়ে ভুলে গেলা নাকি? একটা ছবিও তো দিলে না।"
"দূর ভাই। না আসলে ভালো হতো বোধ হয়। অস্বস্তি হচ্ছে ভীষণ। দুদিন পর পিরিয়ড ডেট। বসা থেকে উঠতেও ইচ্ছে করছে না। পেট ব্যথার কারণে।"
"এইচ্ছা... তো একটাও পিক উঠাস নাই? নাহয় ভিডিও কল দেতো? পিচ্চি দুইটাকেও দেখি।"
মৌরি উঠে বসে। নেট সমস্যা করছে ভীষণ। কথা কেটে কেটে আসছে। সে উঠে একটু হাঁটতে হাঁটতে বলে,
"আরেহ, ভিডিও কল সম্ভব না। কলে কথা বলতে পারছি এটাই বেশি। গাড়ি থেকে নেমে ১ জিবি নিয়েছিলাম। এখন শেষের পথে।"
"ওয়াইফাই ইউজারদের এই একটা সমস্যা। সব বাহাদুরি বাড়িতে। বাইরে গেলেই ফকির। আচ্ছা কল কাট। আর বেশি অস্বস্তি হলে বসে থাক এক জায়গায়।"
মৌরি কল কেটে দেয়।
কিন্তু ফোনে চোখ রেখে পেছন ফিরতে গিয়ে একটা লোকের সাথে ভীষণ বাজেভাবে ধাক্কা খায় সে। লোকটা বোধ হয় নিজেও ফোনে কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
ওরা ধাক্কা খেয়ে সেই খালি সিটটাতে পড়ে যেটা মৌরিদের পাশে ছিল।
ইশ!!! খুব বাজেভাবে পড়েছে মৌরি লোকটার গায়ের উপর।
মৌরির স্পর্শকাতর অঙ্গ লোকটার দেহের সংস্পর্শে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে তাড়াতাড়ি উঠে যেতে নেয়। কিন্তু তাড়াহুড়োয় ভারসাম্য ঠিক রাখতে না পেরে আবার পড়ে যায়। এবার অন্য কোথাও অবাঞ্ছিত কিছু অনুভব করে।
মৌরি সাথে সাথে চোখ কিচেঁ বন্ধ করে নেয়। লজ্জায়, অপমানে তার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। না জানি কত লোক তামাশা দেখছে। ছিঃ!
সে আবার উঠার চেষ্টা করতে চাইলে হঠাৎ যার সাথে ধাক্কাটা লেগেছে, লোকটা আটকে নেয় তার বাহু ধরে।
"রিল্যাক্স, আস্তে আস্তে উঠতে হবে মিস। নাহয় আবার সেইম ঘটনা ঘটতে পারে।"
মৌরি সম্মুখের পুরুষটার গমগমে কণ্ঠ শুনে শিউরে ওঠে। কথা বলার দরুণ তার ভারী নিঃশ্বাস মৌরির মুখে এসে পড়ছে। পুরুষালি ঘ্রাণটা একদম নাকের সাথে বারি খাচ্ছে।
কিন্তু মৌরি এক পলকও তাকিয়ে দেখেনি ঐ গম্ভীর কণ্ঠের চেহারা।
উল্টে কুণ্ঠিত চোখে আশেপাশে তাকায়। কেউ কেউ ওদের তামাশা দেখছে তো কেউ নিজেদের মতো আছে।
তার বোন, দুলাভাই- বাচ্চাদের নিয়ে সমুদ্র পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে গেছে, তা সে অনামিকার সাথে কথা বলার সময়ই দেখেছে।
কিন্তু তারা না দেখলেও, এই অপরিচিত মানুষগুলোর সামনে এমনভাবে একটা পুরুষ মানুষের সাথে... লজ্জ্বায়, অপমানে মুখটা রক্তিম হয়ে এলো।
মৌরি বুঝতে পারে লোকটা তাকে নিরাপদে সরাতে চাইছে, কিন্তু তাকে বাহু ধরে সরাতে চাইলে আবার সেই অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
তাই কী করবে বুঝতে পারছে না। আবার কোমরে হাত দিয়ে সরাতেও দ্বিধাবোধ করছে।
সে পাশের ঐ মহিলাগুলোর দিকে তাকায় অসহায় চোখে। তারা অবাক চোখে হঠাৎ কী থেকে কী হলো তা বুঝতে চাইছিল।
মৌরিকে এমন কাতর চোখে সাহায্যের জন্য তাকাতে দেখে দুজন মহিলা নিজেদের সামলে ওদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
মৌরিকে ধরে আস্তে করে উঠালে লোকটাও ছট করে দাঁড়িয়ে যায়।
মৌরি তারপর আর খেয়াল করে না লোকটিকে। সে নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত। কি থেকে কি হলো। তার গা ঘিনঘিন করছে।
যদি কেউ ভিডিও করে নেয় আজকের ঘটনাটা? এখানে তো এমন ঘটনার প্রকোপ বেশি। মৌরি ভাবতে পারছে না কিছু। সে কাকে গিয়ে বলবে তার এতো বড় ক্ষতি হওয়াটা রুখতে?
লজ্জায় অপমানে হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে নিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে মৌরি খেয়াল করে না ইতোমধ্যে কেউ তার দুশ্চিন্তার অবসান ঘটানোর কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে।
মেজর উমরান তার সহকর্মীদের দিয়ে সবার আগে আশেপাশে থাকা মানুষগুলোর ফোন চেক করে। আর যারা যারা ভিডিও করেছে ঘটনাটা তাদের ফোন থেকে তা সম্পূর্ণ ডিলিট করায়। তাদের পেশার কারণে এই কাজটা করতে ঝামেলা পোহাতে হয়নি। মসৃণভাবে করে নিয়েছে।
সাথে ভিড় কমিয়ে জায়গাটা খালি করায়।
মেজর উমরান কাছে এসে দেখতে পায় মেয়েটা লজ্জায় এখনো চোখের জল ফেলছে। মুখ লুকাতে চাইছে হাতের আড়ালে।
সে কিছু বলে না, শুধু মাথা নামিয়ে তেরছা নজরে মেয়েটার লজ্জায় সিক্ত মুখটা দেখে।
মৌরির চারপাশে সেই মহিলাগুলো বসে আছে। তারা হতাশ চোখে একে অপরের দিকে তাকায়।
মৌরি চোখ-মুখ মুছে নিয়ে কোনোভাবে বলে,
"আ-আমি অত্যন্ত দুঃখিত। লোকটা যদি আপনাদের কারো স্বামী হয়ে থাকে তাহলে দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনাটা ঘটাইনি। অ্যাক্সিডেন্ট ছিল একটা। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমি মোটেও ওমন মেয়ে নই।"
"আরেহ রিল্যাক্স!! তুমি এতো টেনশন নিও না। তোমরা কেউই ইচ্ছাকৃত ঘটনাটা ঘটাওনি তা আমরা দেখেছি। আর মেজর আমাদের মধ্যে কারো স্বামী হয় না বুঝেছ? তাই এতো টেনশন নেওয়ার কিছু নেই।"
"ওহ... তাহলে উনার ওয়াইফকে আমার হয়ে সরি বলে দেবেন প্লিজ আপনারা কেউ। আ-আমি আসি এখন।"
কোনোভাবে কথাটা বলে মৌরি উঠে চলে যেতে নিলে তাদের মধ্যে একজন মহিলা তাকে হাত ধরে বসায়।
"শুনো মেয়ে। জীবনে চলতে ফিরতে এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এসব নিয়ে ফ্রাস্ট্রেটেড হওয়ার কিছু নেই। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মেয়েই তো জীবনের কোনো না কোনো এক পর্যায়ে সেক্সুয়াল এবিউজের শিকার হয়। তারা কি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে না? নিজেদের লাইফ পার্টনারের সাথে সুন্দর জীবন কাটাচ্ছে না? ডেফিনেটলি কাটাচ্ছে। সেখানে এটা জাস্ট একটা অ্যাক্সিডেন্ট। নিজেকে মানসিক পীড়ায় রেখো না। এন্ড ডোন্ট গেট মি রং ফর স্পিকিং বোল্ডলি। বাট তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে খুব বেশি ট্রিগার হচ্ছো ব্যাপারটা নিয়ে। তাই খোলাখুলি ভাবে বলা।"
মহিলাটির কথার মধ্যেই মেজর উমরান তার বাকি সহকর্মীদের একজনের সাথে একপাশে গিয়ে কিছু কথা বলে।
মৌরি আদৌ কিছু কানে ঢুকিয়েছে কিনা কে জানে। সে তাদের সবাইকে ছোট করে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায়।
মেয়েগুলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে। তবে মৌরিকে আর আটকায় না। মৌরি হাঁটতে হাঁটতে পাশে নিজেদের সিটে না গিয়ে কোথায় চলে যাচ্ছে তা সে নিজেও জানে না।
মেজর উমরান যার সাথে কথা বলছিল সে কথা শেষ করে কোথাও একটা চলে গেলে নিজে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। কিন্তু এসে আর মেয়েটাকে দেখতে পায় না।
"হয়ার ইজ শি?" মেজর উমরানের গম্ভীর স্বরে তারা তাকায়।
"হুহ? কার কথা বলছেন?"
"হয়ার ইজ দ্যাট গার্ল?"
"ওহ... মেয়েটা? সে তো নিজের চেয়ারে চলে গিয়েছিল, ঐ তো..." বলে আঙুল দেখালেও মৌরিকে আর দেখতে পায় না সেখানে।
তারা খুব অবাক হয়। মেয়েটা কোথায় গেলো?
"আরেহ, মেয়েটা তো চলে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছি ওখানেই গিয়ে বসবে। বাট কোথায় চলে গেলো? এখানে তো নেই।"
মেজর উমরান তাদের কথা শুনে। তারপর চারদিকে তাকায় অনুসন্ধানী চোখে। কিন্তু কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় চলে গেলো মেয়েটা?
এর মধ্যে দুটো ছোট ছোট বাচ্চা দৌড়ে খেলতে খেলতে আসে ঐ সিটে। পেছনে বাবা-মাও আসছে তাদের।
"মাম্মা? খালামনি এখানে বসেছো না? কোই?"
"মাম্মান খালামনি কোথায়? আমি শামুক আনছিলাম অনেক খালামনির জন্য।"
"থাকবে তো বাব্বা। রাখো ওখানে তোমার জুতোর পাশে। খালামনি নেবে।"
তুলি চারপাশে দেখে। কিন্তু মৌরিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
সে তার স্বামীকে বলে,
"মৌরি কোথায় গেলো? এদিক-ওদিক হাঁটতে গিয়ে চেয়ার গুলিয়ে ফেলল না তো?"
তার স্বামী নিজেও চারপাশে তাকায়। শ্যালিকাকে খুঁজে না পেয়ে পাশের এক-দুইজনকে জিজ্ঞেস করে।
মেজর উমরান সব দেখে। তার রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। এভাবে কোথাও চলে যাওয়ার মানে কি?
এই সামান্য ব্যাপারে এতো রিয়্যাক্ট একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না? যদিও মেজর উমরান মানে আজকে যা হয়েছে তাদের মধ্যে, তার মতো অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা এই জীবনে আর হয় না।
কিন্তু তাই বলে এভাবে সবাইকে চিন্তায় রেখে ফেরারি হওয়ার মানে কি? আর সে তো ব্যাপারটার সমাধান করছিলই।
তার ভাবনার মধ্যেই মৌরির বোনের স্বামী তাদের কাছে এসে মৌরির বর্ণনা দিয়ে তাকে কোথাও দেখেছে কিনা জানতে চায়।
মহিলাগুলো জবাব দেওয়ার আগে মেজর উমরানের দিকে একবার তাকায়। উমরান তাদের চাহনি দেখে চোখের ইশারায় কিছু একটা বলে।
তারপর তাদের একজন বলে,
"মেয়েটাকে দেখেছিলাম এখানে বসে থাকতে। কিছুক্ষণ আগে দেখলাম চারপাশ দেখতে দেখতে এমনি হাঁটছিল। বেশ দূরে চলে গিয়েছিল হাঁটতে হাঁটতে। আমার মনে হয় হারিয়ে গেছে। চেয়ার গুলিয়ে ফেলেছে। এখানে প্রায় সবগুলোই তো একরকম। তাই হয়তো।"
বাচ্চা দুটো তাদের খালামনিকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে কেঁদে কেঁদে খালামনি খালামনি জপছে।
মৌরির বোনের অবস্থাও খারাপ। সে নিজেও চিন্তায় কি করবে বুঝতে পারছে না। কখনো নিজেকে দোষ দিচ্ছে তো কখনো স্বামীকে খুঁজে দিতে বলছে। তুলি আর তার বাচ্চাদের মহিলাগুলো সামলায়।
মেজর উমরান তুলির স্বামীকে নিজের কার্ড দেখিয়ে মৌরির সম্পর্কে সব তথ্য নেয় তাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে।
তুলির স্বামী মেজর উমরানের পরিচয় জেনে একটু আশ্বস্ত হয় যে, আইনের লোক যখন শুরুতেই সাথে আছে মৌরিকে তাড়াতাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে।
তবু সে এদিক-সেদিক নিজের মতো খুঁজতে যেতে চাইলে মেজর উমরান বাধা দেয়।
"আপনি আপনার ওয়াইফ আর সন্তানদের সামলান মিস্টার। আমি তো সব তথ্য নিয়েছি। মিস মৌরিকে নিরাপদে আপনাদের কাছে পৌঁছে দেব, ডোন্ট ওরি। আপনার ওয়াইফ আর সন্তানের এই মুহূর্তে আপনাকে সবচেয়ে বেশি দরকার।"
তুলিরা এখানে এসেছিল তার স্বামী দীপ্তর নানা বাড়িতে বেড়াতে। তার নানাবাড়ি এখানে কক্সবাজার। কক্সবাজার এসেছে আর সমুদ্রে ঘুরতে আসবে না এমন হয়? তাই শ্যালিকা আর স্ত্রী সন্তান নিয়ে সে এসেছিল।
দীপ্ত চাইলে নিজের স্ত্রী সন্তানকে নিরাপদে তার নানাবাড়িতে রেখে এসে মৌরিকে খুঁজতে পারে আরও লোক লাগিয়ে। কিন্তু এতে বাড়িতে অর্থাৎ দীপ্তর নানাবাড়ির লোকেদের মধ্যে জানাজানি হলে ব্যাপারটা অন্য পর্যায়ে যেতে পারে। মৌরির চরিত্রে কালি লাগতে পারে।
তাই সে আপাতত মেজর উমরানের কথামতো স্ত্রী সন্তানকে সামলায়, আর মেজরের উপর আস্থা রেখে মৌরিকে খোঁজার দায়িত্ব দেয়।
তাছাড়া মেজরের উপর অবিশ্বাস হওয়ার কিছু দেখছে না। উল্টে তাদের সাথে আসা মহিলাগুলোর তার স্ত্রী সন্তানদের প্রতি আন্তরিকতা দেখতে পাচ্ছে। আর মৌরিকে খোঁজার জন্য মেজর উমরানও একা নেই। আরও তিন-চারজন অফিসার আছে সাথে। যারা প্রত্যেকে ডিফেন্সের লোক।
মৌরি সত্যি সত্যিই হারিয়ে গেছে। সে একটু ঐ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে দূরে সরে আসতে চেয়েছিল। তাই হাঁটতে হাঁটতে কোথায় এসেছে খেয়াল নেই।
এখন সে ফিরে যেতে চেয়েও পারছে না। মৌরির জীবনে আজকের দিনটার মতো স্মরণীয় আর বাজে অভিজ্ঞতার দিন বোধ হয় আর কখনো আসেনি। তার খুব আফসোস হচ্ছে, কোথায় চলে এলো সে? ফোনেও ব্যালেন্স নেই। ডাটাও শেষ, কাউকে কল দিতে পারছে না।
সে কোনো উপায় না পেয়ে রাগে-দুঃখে বালুর উপর বসে পড়ে, আর হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে। এক ভুলের পর কোন দুঃখে যে আরেক ভুল করলো সে।
উফ... এতো কান্না পাচ্ছে কেন?
মেজর উমরানের সব মিলিয়ে পনেরো মিনিট লেগেছে মৌরিকে খুঁজে বের করতে আর তার অবস্থান জানতে। ফোন নাম্বার ট্র্যাক করতে দিয়েছিল সে। আর মৌরির অবস্থান জানার সাথে সাথে সে নিজে চলে আসে ওখানে।
মৌরির লোকেশন সমুদ্রের নির্জন দিকে দেখেই তার মাথা ধরে গিয়েছিল। তবে এখানে এসে ওকে বসে বসে কাঁদতে দেখে নিজেকে শান্ত করে।
আস্তে আস্তে মৌরির পেছনে এসে এক হাঁটু গেড়ে বসে।
"মিস মৌরি?"
মৌরি ডাক শুনে পেছন ফিরে তাকায়।
"হারিয়ে গিয়েছেন বলে কাঁদা হচ্ছে? নাকি আমার কারণে?"
মৌরি লোকটাকে প্রথমে চিনতে পারেনি। পরে লোকটা কে বুঝতে পারলে তাকে এখানে দেখে অবাক হয়। কিন্তু আবার তার কথা শুনে লজ্জায় পড়ে যায়।
সে নিজেকে একটু আড়াল করতে গিয়ে হারিয়ে গেছে। আবার তার কারণে কাঁদছে নাকি জিজ্ঞেস করছে। ছিঃ!! ঐ বাজে ঘটনার ইঙ্গিত দিল।
সে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
"আমি কাঁদছি না। আর আপনি এখানে কেন? আপনি প্লিজ চলে যান।"
"আমিতো চলে যেতে আসিনি, আপনাকে নিতে এসেছি।"
"আমাকে নিতে আসার দরকার ছিল না। আমি কারো কাছ থেকে ফোন নিয়ে যোগাযোগ করে ঠিক চলে যেতে পারতাম। আমার একটু একা থাকতে ভালো লাগছিল তাই বসেছি।"
"কিন্তু আপনাকে এখন আমার সাথে যেতে হবে মিস মৌরি।"
"আমার সাথে আপনার কি কাজ?"
"আপনাকে আমার বউ বানাবো। রিসোর্টে কাজী এসে অপেক্ষা করছে আলরেডি। তাড়াতাড়ি চলুন।"
"কি বললেন?"
"বলেছি আপনার আমার বিয়ে হবে একটু পর। আপনার ডকুমেন্টস পাঠানো শেষ। কাজী সাহেব সব রেডি করে রেখেছেন। শুধু আপনার আমার কবুল বলা বাকি।"
"মাথা ঠিক আছে আপনার? কি যা তা কথা বলছেন?"
"উহু, ঠিক নেই আমার মাথা। আপনি নষ্ট করে দিয়েছেন। আচ্ছা আপনি বলছিলেন না, আমার ওয়াইফকে যেন সরি বলে দেয় ওরা, আমার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন বলে..."
"চুপ! চুপ করুন। কোনো ঘনিষ্ঠ হইনি। ওটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল।"
মেজর উমরান আরো কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। মৌরি থামিয়ে দেয় তাকে।
"আচ্ছা, অ্যাক্সিডেন্ট... ঐ অ্যাক্সিডেন্টের পর আপনার যেমন অনুভূতি হয়েছিল, আমারও তেমন হয়েছে। শুধু আপনি দেখাতে পেরেছেন সবাইকে কিন্তু আমি পারিনি। তবে আপনার গা ঘিনঘিন করলেও আমার তা করেনি। আমার আপনাকে আরও..."
"দয়া করুন মিস্টার, প্লিজ। সীমা লঙ্ঘন না করে দয়া করুন আমার উপর।"
"ঠিক আছে, আমাকে বিয়ে করে নিন।"