প্রণয়ের সুর

পর্ব - ৪২

🟢

নিখিলের গলা ফাটানো চিৎকারে এক প্রকার দৌড়েই ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে নেহা!

বিরক্তিতে কপাল ভাজ পড়েছে তার এই এক রোগ মানুষটার, বাড়িতে যতক্ষণ থাকবে দুদণ্ড শান্তি দেয় না নেহা কে,একটু চোখের আড়াল হলেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে।

আর কি তখন বাড়ি শুদ্ধ মানুষ নেহা কে নিয়ে মজা উড়াবে!

নেহা কোমড়ে দু হাত রেখে তাকিয়ে রইলো নিখিলের দিকে,সাত সকাল বেলা চিৎকার করেছে তাও কোনো কারন ছাড়াই!নেহার মেজাজ বিগড়ে গেলো,কবে শুধরোবে এই বদ লোকটা?

নেহার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকানো দেখেই নিখিল বোকা বোকা হাসলো,বউয়ের হাতে মা'র খেতে হবে ভেবেই কন্ঠে আদর মিশিয়ে ডাকলো--,,নেহা বউ আমার!

নেহা সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো,নিখিল এবার বিছানা ছেড়ে উঠে আসলো দ্রুত,নিখিল কে আসতে দেখেই নেহা চারপাশে চোখ বুলালো,হাতের কাছে যা পাবে আজকে তা দিয়েই এর মাথা ফাটিয়ে তবেই থামবে!

নিখিল ফট করে এসে নেহাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো।

নেহার সব জারিজুরি এখানে এসেই থেমে যায়,সে দুবর্ল হয়ে পড়ে এই অসভ্য পুরুষটার ছোঁয়ায়।

তার এই দুর্বলতাটার কথা, এই মহাশয় জেনেছেন শুরুতেই তাই তো ফায়দাটা ভোগ করেন সুধে আসলে!

নেহা নিখিলের প্রসস্ত বুকটায় মাথা এলিয়ে দিলো,তাও রাগ তো দেখাতেই হবে,আহ্লাদী পনায় সে বেশ পটু!

নেহা মুখ বাঁকিয়ে বললো--,,সুরন তো সরুন নাটক করেন সব সময়!

নিখিল মৃদু হেসে বললো--,, আমি কি ধরেছি নাকি?তোকে ধরতে যাবো কেনো আমি?আমার কি খেয়ে দেয়ে আর কোনো কাজ নেই নাকি?

নেহা ধাম করে একটা বসালো নিখিলের বাহুতে,বিরবিরিয়ে বললো--,,অসহ্য!

--,,সহ্য করতে বলেছি আমি?

নেহা এবার মাথা তুললো,হাত বাড়িয়ে দু হাতে নিখিলের চুল গুলো টেনে ধরলো,চোখ রাঙিয়ে বললো--,,আমার সুখ সহ্য হয় না আপনার?সকাল সকাল ঝ'গড়া করার তাল করছেন কেনো?একদম সব কটা চুল ছিঁড়ে ফেলবো বলে দিচ্ছি!

নিখিল নেহার কোমর জড়িয়ে ধরে কপালে কপাল ঠেকালো,নেহার দিকে গভীর চোখে তাকালো সে, চোখ জোড়া তার হাসছে,ঠোঁটের কোনেও হাসিটা চড়াও হয়েছে।

নেহা নিখিলের গলা জড়িয়ে ধরে ভ্রু নাচালো,নিখিল শুধু তাকিয়েই রইলো।নেহা এবার ধিমি স্বরে জিজ্ঞেস করলো--,, কি ব্যাপার মহাশয় এতো খুশির কারন?

নিখিলের বরাবরের মতোই সহজ স্বীকারোক্তি--,,তুই!

নেহা হাসলো,হেসে মাথা নোয়ালো খানিকটা।ওই যে তার অসময়ে ভীষণ রকম লজ্জা পাওয়ার রোগ আছে?এ লোকটার সামান্য কথায় সে লজ্জাবতী পাতার ন্যায় চুপসে যায় বার বার।

নিখিল হাত বাড়িয়ে নেহার গাল দুটো নিজের হাতের আঁজলায় নিলো,ফিসফিসিয়ে ধরে আসা গলায় বললো--,,ম্যাম একটা চুমু খাই?

নেহা ঠোঁট চেপে হাসছে,হাসতে হাসতে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালো,নিখিল ভ্রু কুঁচকে জোর পূর্বক শক্তপোক্ত একটা চুমু খেলো নেহার ঠোঁটে।

নেহা এবার ও হাসলো,নিখিল গাল ফুলিয়ে নিলো মুহুর্তেই।নেহা নিখিলের ফাটা বেলুন মতো চুপসে যাওয়া মুখ দেখে আরেক দফা হাসলো।

নিখিল নেহা কে ছেড়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্য পাশ ফিরে গেলো এবার।

নেহা নিখিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, হাতে ওড়না পেঁচাতে পেঁচাতে আঁড়চোখে কয়েকবার তাকালো।

নিখিলের হেলদোল নেই, বুকে দু হাত গুঁজে মুখ বাঁকিয়ে ফোঁস ফোঁস করছে শুধু।

নেহা মিন মিন করে বললো--,,চুমু লাগবে ইমিরের চাচ্চু?

নিখিল অন্যপাশ ফিরে গেলো,নেহাও সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো,নেহা আবারও বললো--,,লাগবে লাগবে?

নিখিল বলে উঠলো অভিমানী সুরে--,,আমাকে কেনো চুমু দিবে মানুষ? আমি আর কে?আদিখ্যেতা যেনো বাহিরের মানুষ কে দেখানো হয়!আর কোনো আহ্লাদী পণায় সায় দিবো না আমি কারোর,সে যেনো কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে নেয়!

এবার নেহার রাগ করার পালা,নিখিল জানে এখন এ নাটকবাজ মহিলা উল্টো রাগ করবে,স্বামী রাগ করেছে বউ একটু রাগ ভাঙ্গাবে তা না,,, সব সময়ের মতো সেই নিখিল কেই এসব করতে হয়!

নেহা মুখটা কালো করে ফেললো,আষাঢ়ের আকাশের মতো মেঘ জমলো নেহার গোলগাল আদুরে বদনে।

--,,আমি বেশি আহ্লাদ করি?আদিখ্যেতা করি?এখন আর আমাকে ভালো লাগে না আপনার?বাহিরের কাউকে দিয়ে দিতে চাচ্ছেন?ঠিক আছে আর করবো না!একা একা ভালো থাকেন!

নেহা ধুপধাপ পা ফেলে দরজার কাছে চলে গেলো,নেহার আগেই নিখিল গিয়ে দরজার সামনে দু হাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়লো। নেহা নিখিল কে টেনে সরাতে চাইলো।

ব্যর্থ হয়ে গা'লিও দিলো--,,হাতি একটা!

নিখিল নেহাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো,নেহা তড়িঘড়ি করে নিখিলের গলা জড়িয়ে ধরে বললো--,,আপনা কে আমি,,,

--,,জানি জানি আদর করবি!

নেহা চোখ পাকিয়ে তাকালো,নিখিল নেহা কে নিয়ে বারান্দায় গেলো,নেহা কথাই বললো না আর!বয়েই গেছে তার কথা বলতে।

নিখিল নেহার কানের কাছে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বললো--,,শুনছেন মিসেস চৌধুরী? নিখিলের একান্ত ব্যক্তিগত আকাশে জ্বলজ্বল করা একমাত্র শুকতারা, তাঁরকা কুলের মহারাণী নিহারীকা! আপনি কি শুনছেন?

আমি এক অবোধ সাধারণ পুরুষ সত্তা, আপনাকে ভীষণ রকম ভালোবাসি।

আপনি আমার শরৎ এর আকাশ মহাশয়া।আমার হৃদয়ের আকাশের রঙধনু আপনি,আমার গোটা জীবনটায় শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিও আপনি!

আপনাকে ভালোবেসে আমার মন ভরে না কেনো বলতে পারেন?আমি চাতক পাখির ন্যায় মুখিয়ে থাকি আপনাকে একটু সময় দেখার আশায়,আজও!

আপনার আপত্তি না থাকলে সারাজনম আপনাকে দেখেই কাটিয়ে দিতে চাই আমি।এটুকু অধিকার কেঁড়ে নেওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন না কিন্তু,,,আদরে আদরে মে'রে ফেলার ক্ষমতাও কিন্তু আমি রাখি,জানেন তো?

আশা করি জানেন!

নেহা নিখিলের দিকে তাকালো গভীর চোখে,এ মানুষটার প্রতি হুট করেই জন্মে যাওয়া মুগ্ধতার রেশ কি কোনো দিন কাটবে না?জানে না নেহা কি জা'দু করেছে এ পা'গল পুরুষ তাকে!

নেহার চোখে ভীড় করেছে দুষ্টুমিরা,নেহা নিখিলের বুকের কাছটায় আরো কিছুটা সেঁটে রইলো,শার্টের বোতামের সাথে খেলা করতে করতে বললো--,,জানি না তো,আপনি কবে আমায় আদর করেছেন?সব সময় তো শুধু ধমকা ধমকিই করেন!

--,অতো লোভ ভালো নয় মেয়ে!

--,,কে বললো শুনি?ভালোবাসায় লোভ করতে হয়,চরম লো'ভী হতে হয়!

আমার জানা মতে মিস্টার নিখিল মেহমেত চৌধুরী এ দিকটায় আমার থেকেও বড় লোভী!

এই যে দেখুন না, সকাল হতে না হতেই চোখ খুলে যখন আমাকে সে পাশে পেলো না অমনি তার বায়না ধরা শুরু হয়ে যায়,কি কি বলে প্রতিদিন আবদার সাজায় জানেন আপনি?

নেহা আমার শার্ট পাচ্ছি না তো,নেহা চিরুনি কই রেখেছিস?ওই নেহা তোকে ঘরের কাজ করতে হবে কেনো একটা আস্ত জামাই ফেলে?

জামাই কে কদর করিস না তুই?

আল্লাহ তোকে পাপ দিবে বেয়াদব মহিলা!

তুই একটুও স্বামী ভক্ত না নেহা?দূরে দূরে থাকিস কেন বলতো?স্বামীর গা ঘেঁষে থাকতে হয় সব সময় কতো বার বলতে হবে বল তো তোকে?

আরো কি কি বলে শুনবেন?অকারণেই সামনে বসিয়ে রেখে বলবে--,,নড়িস না তো মন ভরে দেখতে দে,মনই ভরছে না আমার!

ওদিকে আমার পা ব্যাথা হয়ে যায়,কোমর ধরে আসে তবুও নাকি উনার দেখাই শেষ হয় না,কি মসিবতে আছি বলুন তো লোকটা কে নিয়ে।যখন তখন বায়না ধরবে, বাড়ির এতো গুলো মানুষের সামনে আমাকে লজ্জায় ডুবিয়ে দিয়ে ভাগবে,নির্লজ্জ পুরুষ একটা!

তার সব কিছুতেই শুধু বারাবাড়ি, হুহ্!

ভালোবাসার নাম করে আমাকে টর্চা'র করে ব'দ লোকটা আপনি কি তা জানেন?বলুন তো লোকটার কি শা'স্তি হওয়া উচিত?

নিখিল নেহা কে নিয়ে এবার ঘরের ভেতরে চলে আসলো,বিছানার কাছে এনে নেহাকে তুলতুলে বিছানাটায় ছুঁড়ে ফেলে বললো--,,শা'স্তি হিসেবে নিখিল ব্যাটাকে দু মাসের জন্য অফিসের কাজে বাহিরে যাওয়া উচিত,যতই হোক বউ বিরক্ত হচ্ছে বলে কথা!

নেহা বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে আসতে বললো--,,কই যাবেন আপনি আমাকে ছেড়ে?

নিখিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম ঠিকঠাক করলো,চুল গুলোতে জেল লাগিয়ে পারফিউমের বোতলে হাত দিলো।

নেহা এসে খপ করে তা নিজের হাতে নিয়ে নিলো,,,

নিখিল বিরক্তি নিয়ে বললো--,, দে!

নেহা পারফিউমের বোতল পিঠের পেছনে লুকিয়ে বললো--,,না ওইটার স্মেল বেশি সুন্দর, আপনার বউ আছে ভুলে গেছেন নাকি?এসব দিয়ে বাহিরে গিয়ে মেয়ে পটানোর ধান্দা করে কোনো লাভ হবে না!

নিখিল আরেকটা বের করলো উপরের তাক থেকে, নেহা এবার হাতে থাকা বোতল টা জোরে শব্দ করেই রেখে দিলো!

চিবিয়ে চিবিয়ে বললো--,,আমাকে রাগ দেখানোর ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি!

নিখিল টু শব্দ টুকুও করলো না,নেহা গিয়ে খাটের উপর পায়ে পা তুলে বসলো।

নিখিল হাত ঘড়ি পড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো,নেহা এখনো বসে আছে সেখানে,নিখিলের এ টুকু এরিয়ে চলাও এ মেয়ের সহ্য হয় না,আবার চেঁচামেচি করে বললে--,,দূরে থাকুন আমার থেকে।সারাদিন শুধুই ডাকাডাকি করেন কেনো?বিরক্ত করেন কেনো?তবে নিখিল নিজেও জানে এ বেয়াদবটার মুখেই যতো জোর!

নিখিল বেরিয়ে গেলো হনহনিয়ে, নেহা দেখলো বসে বসে!

নিখিল সিঁড়ি বেয়ে নামতেই দেখলো,জেরিন আর সাব্বির প্রতিদিন কার মতো আজও ঝ"গড়া করছে। সোফার বালিশ গুলো একটাও জায়গায় নেই, দুজন মিলে ছুড়াছুঁড়ি করে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলেছে।

অন্য দিকে সেতারা বেগম হা হুতাশ করছেন,ছেলে মেয়ে পালার বয়সে দুজন এখন নিজেরাই বাচ্চাদের মতো মারা'মারি করছে।

নিখিল গিয়ে এক ধম'ক দিতেই জেরিন গাল ফুলিয়ে বললো--,, ভাইয়া!

সাব্বির ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে সোফায় বসে বললো--,,ভাবি এক গ্লাস পানি দাও তো পে'ত্নীটার সাথে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে সকাল সকাল এতোগুলা এনার্জি লস হইলো আমার!

ঘসেটিবেগম কোথাকার,দাদী এটাকে বিদায় করে দাও তো!দুচক্ষে দেখতে পারি না এরে আমি!

সেতারা বেগম সাব্বিরের কান চেপে ধরে বললো--,, তবে রে হতচ্ছাড়া, পরে যে তুই আমার নামে মা'মলা দিবি তোর বউ ভাগানোর দায়ে,বুড়ো বয়সে থানা পুলিশের চক্করে পড়তে পারবো না আমি!

সোহানা এসে সাব্বির কে এক গ্লাস পানি দিয়ে বললো--,,দুজন মিলে সারাক্ষণ ঝ'গড়া করো কেনো?

ভাইয়া তুমি এখানে নেহা কই,নামেনি এখনো?

নিখিল বের হতে হতে বললো--,,রুমে আছে ডেকে নাও!

সোহানা হাঁক ছেড়ে বললো--,, নেহা নিচে আসো,কি যেনো বানাচ্ছিলে তুমি ভাইয়ার জন্য, আমরা কেউ কিন্তু হাত লাগাইনি তুমি এসে বানাও!

নেহা উপর থেকেই চেঁচিয়ে বললো--,,সব কিছু ডাস্টবিনে ফেলে দাও ভাবি।

নিখিল ভ্রু কুঁচকে তাকালো,মহারাণী হাত পুড়ি'য়ে আবার কি রান্না করার কথা চিন্তা করেছে।

নিখিল আবার সিঁড়ির দিকে গেলো,সাহিল নিখিল কে দেখেই বললো-,,অফিস যাবি না?আবার রুমে যাচ্ছিস যে?

নিখিল বলল--,,ওয়ালেট ফেলে এসেছি তুমি যাও আমি আসছি!

সাহিল ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো--,,ওয়ালেট?

নিখিল ভাইয়ের ইঙ্গিত পূর্ণ কথা বুঝতে পেরে হেসে বললো--,, এখন কিছু বললে তো বলবা ভাই নির্লজ্জ হয়ে গেছে!

সাহিল হাস্যউজ্জ্বল কন্ঠে বললো--,, যা যা, না হয় আমার বোন তোর চুল একটাও আস্ত রাখে কিনা সন্দেহ!

নিখিল ভাইয়ের দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঘরের দিকে চলে গেলো!

সাহিল সোহানার উদ্দেশ্য বললো--,,বউউউ!

অমনি সেতারা বেগম নাতির পেটে গুঁতো বসালেন হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে!

সাহিল ভ্রু কুঁচকে বললো--,,তুমি এতো হিং'সুটে কেনো দাদী?তোমার জন্য কি বউকে একটু ডাকতেও পারবো না?

সেতারা বেগম ডাকলেন--,,ওই নাত বউ তোর জামাই টারে একটু পি'টিয়ে সিদে করতে পারিস না?বউ থাকতে এতো বিগড়া'ইলো কেমনে আমার নাতি?

সোহানা বললো রান্না ঘর থেকে--,,দাদী তুমি শাসন করো,আমাকে তো পাত্তাই দেয় না!

সেতারা বেগম ক্ষেপে গেলেন,সাহিল কে ধমকালেন, আচ্ছা মতো কথা শুনাতে ও বাদ রাখেনি।

এদের কথার মাঝেই, জেরিন সাব্বিরের আরেক দফা ঝ'গড়া চালু হয়ে গেছে।

জেরিন রেগে বললো--,, মীর জাফর তুই আজকে থেকে নিজের রুমে থাকবি,আমার সামনে যদি পড়েছিস না থাপড়ে গাল লাল করে দিবো!

সাব্বির বলে উঠলো--,,কে তুই হ্যাঁ?থাকলাম না তোর সাথে কি আসবে যাবে?সেইম টু ইউ চ'ড় আমিও দিবো!

জেরিন রেগে গাল এগিয়ে দিয়ে বললো--,,নে মা'র,এক্ষুণি মার'বি না মা'রতে পারলে আজকে আমি তোকে মার'বো!

সাব্বির সবার দিকে একবার তাকালো,না কেউ তাদের কে খেয়ালই করছে না,সুযোগ বুঝে সাব্বির জেরিনের গালে চুমু দিলো ফটাফট!

জেরিনের নাকের পাটা ফুলে ফেঁপে উঠলো।রাগে ঘামছে নাকের পাটাতন।

জেরিন গাল দুটো ফুলালো,সাব্বির জেরিনের কাঁধে মৃদু ঠেস মে'রে বললো--,,ঘসেটিবেগম জানিস নাকের আগা ঘামা মেয়েরা নাকি স্বামী সোহাগি হয়?জামাইরা নাকি অনেক আদর টাদর করে তাদের?

জেরিন দাঁত কটমটিয়ে,খেয়া ফেলা টাইপ লুক দিতেই সাব্বির মাথা চুলকে বললো-,-,আমার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছিস কেনো?সেতারা বানুই তো বললো!তুই অস্বীকার করছিস?আমি তোকে আদর করাতে কার্পন্য করি?

জেরিন ধামধুম কয়েকটা বসালো সাব্বির কে,চুল টেনে ধরে বললো--,,সাব্বিরের বাচ্চা।তোকে আমি আজকে মে'রেই দম নিবো!

তখনই পাশ থেকে ধমকে উঠলো হামিদা বেগম,মেয়েকে শাসিয়ে বললো--,,আবার জেরিন, বড় হবি কবে?এরকম আচরণ করছিস কেনো ওর সাথে?ছাড় বলছি!

জেরিন ছেড়ে দিলো, যাওয়ার আগে রাগী সুরে বললো--,,আমার সাথে লাগা না,আসিস আবার আমার সামনে গলা টি'পে দিবো তোর আমি, ইত'র, বদ'মাইশ, ইব'লিশ!

সাব্বির জেরিনের হাত চেপে ধরে বাহিরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো--,,আয় লং ড্রাইভে যাবো, তুই না কাশফুল দেখার বায়না ধরেছিলি আজ কে দেখাবো।

জেরিন নিজের দিকে তাকিয়ে বললো--,, আরে এমন ফকি'ন্নি সাজে কে ঘুরতে যায়?তুই দাঁড়া আমি রেডি হয়ে আসছি!

সাব্বির জেরিন কে জোর করে সাথে করে নিয়ে গেলো,বাহিরে তখন ঠান্ডা বাতাস বইছে আজ সূর্য মামার দেখা নেই,মেঘলা আকাশ।

বাতাসে বইছে শরৎ এর ভেজা গন্ধ।বৃষ্টি আসবে হয়তো?

জেরিন বলে উঠলো -,,বৃষ্টি আসবে সাব্বির বাইকে যাবি তুই?

সাব্বির নিজের হাত টা বাড়িয়ে দিলো জেরিনের দিকে ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ঝুলিয়ে বললো--,,আজ বৃষ্টি নামুক তোর নামে,প্রেমের প্রজাপ্রতিরা উড়ে যাক বেনামি খামে!

আজ আমি আমার বেগমের সাথে বৃষ্টি বিলাস করতে ইচ্ছুক,বেগম সাহেবা আপনি কি ভিজবেন এই শরৎ এর বৃষ্টি তে আমার সাথে?

জেরিন সাব্বিরের হাতে হাত রেখে বাইকের পেছনে উঠতে উঠতে বললো--,,যত্তসব অদ্ভুত ইচ্ছে তোর!ভিজবোনা বললেই কি শুনবি তুই?ঠিকই তো রোমান্টিকতার নাম করে চেংদোলা করে নিয়ে গিয়ে ভিজাবি,চিনি না তোকে?

সাব্বির বাইকে জোরে সোরে এক টান বসালো,জেরিন গিয়ে পড়লো সাব্বিরের পিঠের উপর,রেগে দু টো কথা শোনাতে মন চাইলেও,পরিবেশ টা তা হতে দিলো না!

প্রকৃতি চায় আজ প্রেম হোক,মনমানিল্য রা দূরে ছুটে পালিয়ে যাক,ভালোবাসার দূরত্ব কমে আসুক!

মেঘলা দিন,টুপটাপ বিছিয়ে পড়া বৃষ্টির কনারা সব সময়ই ভালোবাসার রঙ বয়ে আনে,স্নিগ্ধ মন মানাতো বাতাসে মাতাল করা প্রেমের সুর তোলে।প্রেমিক প্রেমিকার সাধ্য কোথায় তা উপেক্ষা করার?

------------------

নেহার চোখ মুখ লাল হয়ে এসেছে,নেহাকে কাঁদতে দেখেই নিখিলের মাথায় হাত পড়লো,এবার এটাকে মানাতে গেলে আজ আর অফিস যাওয়া হবে না,

তখনই শাহআলম চৌধুরি তাকে খোঁচাবে বিয়ে তো আর কেউ করেনি দুনিয়ায়!শুধু আমার পুত্রই বিবাহিত বউয়ের আঁচল ছেড়ে বেরোতেই চায় না!বুড়ো বাপ টাকে খাঁটিয়ে মারা'র ধান্দা, কই এ বয়সে নাতি নাতনিদের সাথে খেলবো তা না ছ্যাঁ ছেঁ অফিসে বসে ফাইল দেখতে হচ্ছে!

নিখিল তপ্ত শ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গেলো,নেহা নাক টানছে থেমে থেমে।

নিখিল গম্ভীর সুরে বললো--,,আমি তো বউ পিটা"ই না।কাঁদা কি হয়েছে?

নেহা চোখ তুলে তাকালো,অভিমানে টইটম্বুর হলো মুখটা।

--,,কিছু হয়নি,আপনি কেনো এসেছেন আবার?

--,,প্রশ্নের জবাব পাইনি আমি!

নেহা ওড়না গায়ে জড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলো,বের হতে হতে বললো--,,কারো মা'রা লাগবে কেনো?মানুষের দুর্বলতা জানলে তাকে হাতে মা'রা লাগে নাকি?

কেউ একজন বউ পিটা"য় না শুধু যত্ন করে অবহেলা করে!অবহেলা সহ্য করার মতো শক্তি নেই তো তাই কাঁদছিলাম।

নেহা দরজা ঠেলে বেরোতে চাইলো,নিখিল বলে উঠলো তখনই--,,কাছে টানতে চাইলেই তো দোষ, কাছাকাছি থাকলে নাকি মানুষজন বিরক্ত হয়,তাই তো,,,,,

নেহা এগিয়ে এসে বললো--মুখের কথা যারা বিশ্বাস করে, মন পড়তে পারে না তাদের কে নেহা মোটেও ভালোবাসে না!

নিখিল নেহাকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো,জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে বললো--,,এটুকু কারনে কাঁদতে হবে?আমার কষ্টের কোনো মূল্য নেই নাকি?

কাজল লেপ্টে ফেলার সাহস কই পাও?

নেহা চুপটি করে রইলো,নিখিল নেহার মাথা টা নিজের বুকের উপর থেকে তুলে চোখ মুছে দিলো,কনিষ্ঠ আঙুলের ছোঁয়ায় লেপ্টে যাওয়া কাজল টুকু মুছে দিলো যত্ন নিয়ে।

নেহার কপালে চুমু দিয়ে বললো--,, এই যে সারাদিন কারনে অকারনে রাগ করিস,আমি যখন থাকবো না এ রাগ কে ভাঙ্গাবে শুনি?

নেহা উতলা হয়ে উঠলো,ও টুকু কথার জের ধরে কি এখন সত্যি সত্যি চলে যাবে নাকি পা'জি লোকটা?কি করে থাকবে নেহা?হৃদকম্পন শুরু হলো তার।

পা উঁচু করে নিজেকে নিখিলের বরাবর করার চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলো, গাল ফুলিয়ে বললো--,, একটু নিচু হন না।

নিখিল মাথা নিচু করতেই নেহার চুমুর বর্ষণ পড়লো নিখিলের রুক্ষ দাঁড়ির ভাঁজে চাপা পড়া গালটাতে।কপালে,থুতনিতে চুমুতে ভরিয়ে দিলো নেহা।

দু হাতে নিখিলের গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়লো সে,ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলিয়ে রেখে বললো--,,দেখি এবার কিভাবে যান আমার মায়াজাল কেটে?যাওয়ার নাম নিলে না জানে মে'রে দিবো!

আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারি নাকি?

নিখিল নেহার কোমর জড়িয়ে ধরে শূন্য উঠিয়ে ফেললো তাকে, নাকে নাক ঘঁষে আদুরে বুলি ছাড়লো--,,থাকতেই যখন পারবেন না দূর দূর করেন কেনো?এই যে আজও অফিসের লেইট করিয়ে ছাড়লেন!

আপনার শ্বশুর কি আমাকে ছেড়ে কথা বলবে?

নেহার হাসি যেনো ঠোঁট থেকে সরছেই না,এ না কাঁদছিলো কিছু সময় পূর্বেও?

নিখিল নেহার দু গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো--,,রাগ কমেছে?

নেহা চোখে হাসলো,মিছে মিছে মুখ ভার করে বললো--,,বিকেলে আকাশী পাড়ের সাদা শাড়ি পড়বো,,,যদি কেউ কাশফুল বাগানে ঘুরতে নিয়ে যায়,তার মহা মূল্যবান সময়ের থেকে সম্পূর্ণ বিকেলটা আমায় দেয় তবে রাগ কমানোর চেষ্টা করতে পারি!

নিখিল নেহার নাকের ডগায় টোকা দিলো,সঙ্গে সঙ্গে নেহা ফুঁসে উঠলো--,,নাক উঁচু ধুরন্ধর লোক কোথাকার।আমার নাকটার উপর কিসের এতো রাগ বলুন তো আপনার?সেই প্রথম দিন থেকে নাকটার উপর হা'মলা চালিয়ে যাচ্ছেন!ভাললাগে না কিন্তু এসব।

নিখিল দুষ্টু হেসে বললো--,, এভাবেই গলায় ঝুলে থাকবেন?অফিসেও চাইলে যেতে পারেন আমার কোনো অসুবিধে নেই!

নেহা গলা ছেড়ে নিচে নামলো,নিখিল নেহার কোমর জড়িয়ে কাছাকাছি এনে বললো--,,ভালোবাসি বউ!

নেহা চোখ ছোট ছোট করে বললো--,,মোটেও না, এক ফোঁটাও না, একটু ও না,একদমই না,,,,!

নিখিলের কপালে ভাজ পড়লো,সে ভ্রু কুঁচকালো।

চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলো--,, কি না?

নেহা চমৎকার হেসে বললো--,, একটুও ভালোবাসি না।

বলেই ভো দৌড় দিলো,নিখিল পিছু নিয়ে বললো--,, তবে রে আবার হাতের কাছে পাই,,,

নেহা দরজায় গিয়ে থেমে পিছু ফিরলো--,, এই শুনুন জলদি ফিরবেন, আমি কিন্তু অপেক্ষায় থাকবো!

নিখিল হেসে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকলো,বুকের বা পাশে হাত রেখে মাথা নুইয়ে বললো--,, আপনার আদেশ শিরোধার্য আমার মিসেস,আপনার কথা ফেলে দেওয়ার

দুঃসাহস আমার কোনো কালেই না জন্মাক,,,,!

------ ~ সমাপ্ত ~ ---------

প্রণয়ের সুর পর্ব ৪২ গল্পের ছবি