ফিরে দেখা

পর্ব - ৯

🟢

সোহা আপন মনে হেঁটে চলেছে। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে চারপাশে। অনবরত চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, তবু সে কোনো দিকে তাকায় না, সোজা সামনে এগিয়ে যায়। হঠাৎই একটি মেয়েলি চিকন কণ্ঠের আত্মচিৎকার কানে আসে, কেউ যেন প্রাণ বাঁচানোর জন্য আকুতি করছে।

সোহা মুহূর্তের জন্যও কিছু না ভেবে রাস্তার আশপাশে চোখ বুলিয়ে কিছু একটা খুঁজতে থাকে। রাস্তার একপাশে পড়ে থাকা একটি বাঁশ নজরে আসতেই সেটি তুলে নেয়। এরপর শব্দের উৎসের দিকে পা বাড়ায়।

সামনের দৃশ্য চোখে পড়তেই সোহার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তিনজন পুরুষ একটি মেয়ের সঙ্গে জোরজবরদস্তি করছে। সোহার মাথায় মুহূর্তেই রক্ত চেপে বসে। চারপাশে জনমানবশূন্য এই বৃষ্টির রাতে আর কোনো উপায় নেই। সোহা একটুও দেরি না করে আক্রমণ করে বসে। পেছন থেকে এক পুরুষের মাথায় সজোরে বাঁশের আঘাত হানে। প্রচণ্ড চিৎকারে লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শব্দ শুনে দ্বিতীয়জন পেছনে তাকাতেই দেখে শাড়ি পরা এক মেয়ে বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের দলের একজন ইতিমধ্যেই মাটিতে অচেতন।

লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে সোহার দিকে তেড়ে আসে। সোহা সুযোগ বুঝে তার সংবেদনশীল স্থানে সজোরে এক লাথি বসিয়ে দেয়, সঙ্গে মাথায় আরেকটি আঘাত। নিজের দলের দুই সঙ্গীকে এই বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখে তৃতীয় জন ভয়ে দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায়।

বোনকে বাচানো, ফিরে দেখা গল্পের পর্ব ৯, লেখিকা নওরিন ইথিকা

সোহা হাপিয়ে উঠেছে। বুক ভরে ভারী নিশ্বাস ফেলছে। তখনই তার দৃষ্টি পড়ে মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে। মুহূর্তেই সোহার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে।

মেয়েটিকে দেখে সোহা হকচকিয়ে উঠল। হাতের বাঁশটি শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল। সোহা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন সময় থেমে গেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে।

তার সামনে... এই মেয়েটি... এই মেয়েটিই!

সোহা এক হাহাকারভরা চিৎকার ছেড়ে দিল। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে তাকাল। সোহাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে। চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল বৃষ্টির অবিরাম ঝরঝর শব্দ। উপস্থিত দুই রমণীর কারও মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। হঠাৎই সোহা ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে আগলে নিল। বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল—

-"সাবা! আমার সোনা... তুই ঠিক আছিস তো? তুই এখানে কেন, এত রাতে? তোর মানসম্মানওয়ালা বাপ কোথায়? কেন তোকে এত রাতে রাস্তায় ফেলে রেখেছে? কী হইছে ? কিছু বল! আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বল... চুপ করে আছিস কেন?"

বোনকে পেয়ে জড়িয়ে ধরা, ফিরে দেখা গল্পের পর্ব ৯, লেখিকা নওরিন ইথিকা

সাবা চোখ তুলে তাকাল বোনের দিকে। শ্যামলা শরীরে লাল-সাদা শাড়ি বৃষ্টিতে কী স্নিগ্ধ লাগছে তার বোনকে! হঠাৎই সাবা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সোহাকে, যেনো ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। শব্দ করে কেঁদে উঠল সে।

সোহা স্নেহভরে সাবার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল। বেশ কিছুক্ষণ সেইভাবেই কাটল। তারপর সোহা সাবাকে নিয়ে ধীরে ধীরে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটি গাড়ি পেয়ে তাতে উঠে বসল তারা। বাড়ি ফিরে এলো সোহা ও সাবা, দু’জনেই ক্লান্ত, ভেজা শরীর।

দুই বোন ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে বসেছে। সোহা রান্নাঘর থেকে দু’কাপ গরম কফি নিয়ে এসে বোনের পাশে বসল। সাবা মাথা এলিয়ে দিল সোহার কোলের ওপর। সোহা নিঃশব্দে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সোহা মৃদু কণ্ঠে বলল—

-"কি হয়েছে সাবা? সবটা খুলে বল।"

সাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, চোখের জলে ভিজে উঠল মুখমণ্ডল।

-"বাবা সেদিন হার্ট অ্যাটাক করেছেন। গত পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। আমি সেদিকেই যাচ্ছিলাম। মা ওখানেই আছে। আমি একটি টিউশনি শেষ করে বেরিয়েছিলাম, আর তখনই ওই তিনজন লোক আমার পিছু নেয়। তারপর বাকিটা তো তোমার সামনেই হয়েছে। আজ তুমি না এলে... আমাকে কেউ বাঁচাতে পারত না আপু।"

সোহা শক্ত করে সাবার হাত ধরল। স্নেহভরা কণ্ঠে বলল—

-"শহহহ... কিছু হবে না তোর। আমি আছি তো! আল্লাহ আছেন। আল্লাহ তোর কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না।"

সাবা বোনের উদরে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে উঠল। সোহা নিঃশব্দে বোনকে বুকের মাঝে আগলে রাখল। মনে মনে অনুভব করল, আজ যদি সে ঠিক সময়ে না থাকত, তাহলে সাবার জীবনে কত বড় বিপর্যয় নেমে আসত!

.

.

.

সকালবেলা সাবা ও সোহা ঘুম থেকে উঠল। নাস্তা শেষ করেই সাবা হাসপাতালের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। গত পাঁচ দিন ভার্সিটিতে যাওয়াই হয়নি তার; আজ অন্তত একটু যাওয়া দরকার ভেবেই সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। সারা রাত সোহা তাকে বুঝিয়েছে যার ফলে সাবা এখন বেশ শক্ত হয়েছে।

সোহা একটা ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ল। গতকাল হেডকোয়ার্টার থেকে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কিন্তু তাকে আগে থেকে কেনো ইনফর্ম করা হলো না? সে মেইলবক্স চেক করতে শুরু করল। কোথাও কোনো মেইল নেই, তার সিইও পদ থেকে ডিজাইনার হেডে ট্রান্সফার হওয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

সোহা ল্যাপটপটি পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল। জানালার পাশে গিয়ে চিন্তিত দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে রইল। যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তো আমাকে জানানোর কথা... আমি প্রতিদিন মেইল চেক করি, তাহলে আমাকে কেনো মেইল করা হলো না?

হঠাৎই কিছু মনে পড়তেই সোহা দ্রুত ল্যাপটপটি নিয়ে বসে পড়ল। স্প্যাম মেইল ফোল্ডার খুলে দেখল, সেখানে একটি মেইল রয়েছে। যেখানে তার সিইও পদ থেকে ডিজাইনার হেড হওয়ার সব ডিটেইলস লেখা আছে। মেইলটি স্প্যাম ফোল্ডারে চলে যাওয়ায় এতদিন সে দেখতে পায়নি।

সোহা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেয়ার বিক্রি হয়েছে... তারা সিইওর পদটি চাইছিল, তাই বাধ্য হয়েই দিতে হয়েছে। মুহূর্তেই সোহা বুঝে গেল, ওরহান ছাড়া আর কেউ তাকে এইভাবে জব্দ করতে পারবে না। বুকের ভেতর থেকে আরেকটি ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

হঠাৎই কলিং বেল বেজে উঠল। সোহা ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দরজার কপাট খুলে দিলো। আর তারপর চোখের সামনে যা দেখলো, তাতে তার দৃষ্টি বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। প্রায় এক হাজারেরও বেশি সাদা গোলাপ যেন স্বর্গীয় সৌরভে ভরে দিয়েছে চারপাশ। মুহূর্তের জন্য সোহা যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেল। এত ফুল... কে পাঠালো?

সাদা গোলাপের বন্যা, ফিরে দেখা গল্পের পর্ব ৯, লেখিকা নওরিন ইথিকা

তার দৃষ্টি ফুলের স্রোতের ফাঁক গলে চারপাশে ছুটে বেড়ালো, কিন্তু কেউ নেই। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যেন দৃশ্যটিকে আরও রহস্যময় করে তুলল। গোলাপের সমুদ্রের ওপরে চোখে পড়লো একটি ছোট্ট কার্ড। সোহা ধীরে হাত বাড়িয়ে কার্ডটি তুলে নিল। আঙুলের স্পর্শে কাগজ কেঁপে উঠলো, যেন সেখানে লুকিয়ে আছে এক অজানা অনুভূতির ভার।

কার্ডে লেখা—

"অভিনন্দন নেসলীহান সোহা। বড় পর্যায় থাকলেই করো যোগ্যতা প্রকাশ পায় না। ছোট পর্যায় থেকেও মানুষ নিজের যোগ্যতাকে ফুটিয়ে তুলতে পারে। আশা করি আপনি একজন ডিজাইনার হিসাবে পুরো পৃথিবীতে রাজ্যত করবেন। তাই আপনাকে হাজার সাদা গোলাপের শুভেচ্ছা আমার শুশ্রী।"

—তীব্র নীল চৌধুরী

কার্ডটি পড়ে হতভম্ব হয়ে গেলো সোহা। তীব্র তার বাড়ির ঠিকানা কোথা থেকে পেলো? এক মুহূর্তের জন্য অবিশ্বাসের ছায়া তার চোখে ভেসে উঠল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল। এতকিছু ভাবার সময় নেই। ঠোঁটের কোণে হালকা একটুখানি হাসি খেলা করলো, অদ্ভুত এক প্রশান্তির হাসি। সাদা গোলাপগুলো অসম্ভব সুন্দর। এক হাজার ফুলের স্নিগ্ধ গন্ধে সোহার ছোট্ট বাড়িটা যেন সাদা স্বপ্নে ভরে উঠলো। ফুলের গন্ধে ঘর যেন মোমো করছে। সোহা ড্রয়িং রুমে ফুলগুলো যত্ন করে রেখে দিলো। তারপর দ্রুত অফিসের জন্য তৈরি হতে লাগলো।

দশ তলা বিশ্বট ভবন, তার গাড়ি এসে থামলো সেই বিশাল ভবনের সামনে। এটাই ভেলভেট ব্লুমার-এর অফিসিয়াল ভবন। এখানেই একসময় তাকে সিইও হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। অথচ আজ, কারো চতুরতার কাছে হার মেনে, তাকে আবারও ডিজাইনার পদে ফিরে আসতে হলো।

আজ সোহা সাদা রঙের শাড়ি পরেছে। কাঁধে পড়ন্ত আঁচল, চুলগুলো নিখুঁতভাবে বেনি করা। সাদা চুড়ির টুংটাং শব্দ যেন নিজের সত্ত্বার শক্তি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তীব্রের পাঠানো ফুলের তোড়া থেকে একটি সাদা গোলাপ বেছে নিয়ে মাথায় গুঁজেছে সে। ফুলের সুবাসে তার চারপাশটা যেন আরও শান্ত, আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে।

সোহা সোজা ডিজাইনার ফ্লোরে চলে গেলো। কিন্তু সেখানে গিয়েই জানলো, তার জন্য কোনো কেবিন বরাদ্দ নেই। মুহূর্তেই এক অস্বস্তির ছায়া নামলো চারপাশে। ঠিক তখনই মিরহা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উপস্থিত হলো। হাঁটুর ওপর হাত রেখে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। চোখে তাড়াহুড়োর আতঙ্ক।

তারপর সোহাকে বললো—

-"আপনার কেবিন নয়তলায়, ম্যাম।" মিরহার কণ্ঠে এক ধরনের তাড়াহুড়ো।

সোহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো—

-"তুমি এখানে কি করছো?"

মিরহা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলো—

-"আমি তো আপনার পিএ, ম্যাম।"

সোহা অবাক হয়ে বলল—

-"না, তুমি তো সিইওর পিএ। তোমাকে সিইওর জন্যই অ্যাপয়েন্ট করা, মিরহা।"

মিরহার চোখে একরাশ দৃঢ়তা—

-"আমি ওই কুদ্দুসের আন্ডারে কাজ করবো না। তাছাড়া ওনার পিএ আছে, আমাকে প্রয়োজন নেই। তাই আমি আপনারই পিএ।"

সোহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এই মেয়েটি যে একেবারে অদ্ভুত, তা বুঝতে বাকী রইলো না। সে আর কথা না বাড়িয়ে মিরহাকে সঙ্গে নিয়ে ওপরে উঠলো।

লিফটের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তীব্রর সাথে দেখা হলো। মুহূর্তের জন্য চারপাশ যেন স্থির হয়ে গেল। দুজনেই মিষ্টি এক হাসি উপহার দিলো একে অপরকে। তীব্রের চোখ সোহার মাথায় ঠাঁই নেওয়া সাদা গোলাপে গিয়ে থামলো। সেটা যে তার পাঠানো ফুলের তোড়া থেকে এসেছে, তা বুঝতে তার সময় লাগলো না। মুচকি হেসে তীব্র বলল—

-"সুন্দর লাগছে, মিস সুশ্রী।"

সোহা হালকা লজ্জায় মাথা নুইয়ে দিলো—

-"ধন্যবাদ, মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী। আর ফুলগুলোর জন্যও ধন্যবাদ। ফুলগুলো সত্যিই অনেক সুন্দর ছিল।"

তীব্রের কণ্ঠে প্রশংসার গভীরতা—

-"দারুণ মানিয়েছে আপনাকে। মনে হচ্ছে সাদা রং যেন আপনার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। তার ওপর গোলাপটি মাথায় গুঁজতেই আপনার সৌন্দর্য যেন হাজারগুণ বেড়ে গেল।"

সোহা হেসে ফেললো—

-"বেশি বেশি বলছেন চৌধুরী সাহেব।"

তীব্রের দৃষ্টি স্থির, কণ্ঠ দৃঢ়—

-"না, এক বিন্দুও বেশি বলছি না।"

সোহা মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসলো। তীব্র দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো, যেন নিজের ভেতরের আলোড়ন লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।

এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা মিরহা সব শুনছিল। তাদের কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ তার কানে আসছিল পরিষ্কারভাবে। মনে মনে বলল, "আরে তীব্রগতি, আস্তে যা ভাই! হোঁচট খেয়ে পড়লে কিন্তু তোর একূল অকূল দুকূল যাবে। যাকে লাইন মারছিস তার জীবনে পুরুষ নোট আলাউড।"

এইসবের মাঝেই লিফট এসে থামলো নয়তলায়। এখানেই ওরহানের কেবিন। ঠিক তার অন্য পাশে ডিরেক্টরের কেবিন, তীব্রের। লিফটের দরজা খোলার সাথে সাথে চারপাশে চাপা এক অজানা টানটান ভাব ছড়িয়ে পড়লো।

তীব্র নিজের কেবিনের দিকে যেতে যেতে সোহার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"আমি আসব আপনার সাথে?"

সোহা শান্ত স্বরে উত্তর দিল—

-"প্রয়োজন নেই, আমি সামলে নিতে পারবো।"

তীব্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। কিছুটা অজানা উদ্বেগের ছায়া চোখে নিয়ে সে নিজের কেবিনের উদ্দেশে পা বাড়ালো। সোহা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ওরহানের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলো, সঙ্গে মিরহা।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্যটি চোখে পড়লো, ইহাব দাঁড়িয়ে আছে সোজা, চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। তার পাশেই উল্টো মুখ করে চেয়ারে বসে রয়েছে ওরহান। সোহা ভেতরে ঢুকতেই চেয়ারটি ধীরে ঘুরিয়ে তাকালো ওরহান। ঠোঁট ফুলে রক্ত জমে রয়েছে, পুরো মুখ এখনো লালচে ও ফোলা। দৃশ্যটি এক মুহূর্তের জন্য সোহার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠলো। সে চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল, যেন আরেক সেকেন্ডও তাকিয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

এদিকে ইহাবের চোখ মিরহার দিকে স্থির হয়ে আছে। যেন দৃষ্টির ভাষায় কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু মিরহা একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকালো না, দৃষ্টি নামিয়ে রইলো মেঝের দিকে। ইহাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ চোখ নামিয়ে নিলো।

সোহা ধীরে ধীরে ওরহানের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। এক নিঃশব্দ, চাপা পরিবেশে কণ্ঠস্বরটা যেন আরও ভারি হয়ে উঠলো—

-"ডিজাইনের হিসাবে যখন নিয়োগ করেছেন, তাহলে কেবিন দিতে কিপ্টামি করছেন কেনো?" সোহার কণ্ঠে রাগ ও অপমানের সুর স্পষ্ট।

ওরহান ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—

-"তোমার জন্য দুনিয়া কিনে এনে পায়ে ফেলতে রাজি আমি। আর সামান্য কেবিন দিতে পারব না বলছ?"

সোহা ঠোঁট কামড়ে সংযত স্বরে বলল—

-"তাহলে কোথায় আমার কেবিন?"

ওরহান কোনো কথা না বলে চোখ দিয়ে ডান পাশে ইশারা করলো। সোহা ও মিরহা দুজনেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো সেই দিকে। আর তারপরই সোহা বুঝতে পারল, পুরো একটি নতুন কেবিনের সেটআপ ঠিক পাশেই সাজানো রয়েছে। তার মানে সোহাকে এখানেই বসতে হবে, ওরহানের ঠিক সন্নিকটে! সোহার বুকের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত চাপা শ্বাস জমে উঠলো।

এদিকে মিরহা মুখে মুখে বিড়বিড় করছে, চোখে বিরক্তির ছাপ—

-"হায় রে কপাল... এই কুদ্দুসের সাথে বসে কাজ করতে হবে নাকি! সালা বদের হাড্ডি!" মিরহা দাঁতে দাঁত চেপে ফোঁস করে উঠল।

"আমার মামের কেবিন ধকল করে তাকে ৪ ইঞ্চের জায়গা দিস! তোর মাথায় থাডা পড়ুক, সালা। তুই নর্দমায় পড়ে যা। তোকে যদি আমি ড্রেনের পানি না খাইয়েছি, তো আমার নামও মিরহা না!"

তার চোখের দৃষ্টি এতটাই খেয়ে ফেলার মতো ছিল যে ইহাব দম গিলতে গিলতে এক পা পিছিয়ে গেল। মনে হলো দৃষ্টিতেই যেন মানুষকে পুড়িয়ে ফেলতে পারে মিরহা।

ওরহান তখনও স্থির দৃষ্টিতে কেবল সোহাকেই দেখছে। মিরহার ওই দৃষ্টি দেখলে না জানি তার এই হাফ পেন্টাল বস কি করত! ইহাব মনে মনে আল্লাহকে ডাকলো—"হায় আল্লাহ, এই মেয়েটার রাগের আগুনে যেন আমি না পুড়ি!"

সোহা ধীরে ঘর ঘুরিয়ে ওরহানের দিকে তাকালো। চোখে কঠোরতা ও অবজ্ঞার মিশ্র ছাপ। তারপর কণ্ঠকে স্থির রেখে বলল—

-"বেশ ঠিক আছে। সালা কিপটার বাচ্চা একটা ফুল কেবিনও দিতে পারলেন না? যাক, কোনো ব্যাপার না। আমার আবার আপনার মতন বড় বড় রুম, বেশি বেশি মেয়ের প্রয়োজন নেই। আমি অল্পতেই সন্তুষ্ট।"

সোহার কণ্ঠে ঠান্ডা ব্যঙ্গের সুর এতটাই স্পষ্ট যে ওরহান ভেতরটা আঁকুপাঁকু করে উঠল। সে বুঝলো, এই খোঁচা একেবারে সরাসরি তার দিকে ছোঁড়া। তবুও কোনো প্রতিউত্তর করলো না। কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ তার বুকের ভেতর জমা হতে থাকলো, এই হিসাব সে একান্তভাবে নেবে, সেটা নিজের মনের ভেতর পাকা করল।

সোহা ঘুরে দাঁড়াল এবং মিরহাকে তাকিয়ে বলল—

-"এসো, কাজ করি।"

মিরহা মাথা নাড়লো আর দুজনে কাজে লেগে পড়লো। চারপাশে যেন মুহূর্তেই এক অদ্ভুত চাপা নীরবতা নেমে এলো। ওরহান আর ইহাব আড়চোখে পুরোটা দেখছে। ওরহান যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এত শান্তভাবে, কোনো তর্ক না করেই সব মেনে নিলো সোহা! তার ভেতরের অস্থিরতা আরও বাড়তে লাগলো। ইহাবের চোখে এক ধরনের অস্বস্তির ছাপ, আর ওরহানের চোখে জমে থাকা ঝড় থমকে আছে।

হঠাৎই সোহা কাজের ফাঁকে মিরহাকে তাকিয়ে বললো—

-"আজকে আমাকে কেমন লাগছে, মিরহা?" হঠাৎ সোহা সরল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।

মিরহা খানিকটা হকচকিয়ে গেল। সোহা তো এ রকম প্রশ্ন আগে কখনো করে না। আজ কেন এমন করলো, সেটা নিয়ে মন মনে নানা ভাবনার ভিড় জমলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে বলল—

-"অসম্ভব সুন্দরী লাগছে, মাম। বিশেষ করে সাদা গোলাপ, যেন এককথায় একরাশ প্রশান্তি।"

সোহা সাদা গোলাপটা মাথা থেকে সরিয়ে নিয়ে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলো—

-"আজ আমাকে এক হাজার সাদা গোলাপের শুভেচ্ছা পাঠানো হয়েছে। এই ফুলগুলোর ভিড়ে থেকে এটি তুলে মাথায় গুঁজেছিলাম।"

-" কে পাঠিয়েছে, মাম?" মিরহার চোখে উৎসুকতা মিশে উঠলো।

-"তীব্র নীল চৌধুরী," সোহা গম্ভীর কণ্ঠে বলল।

ওরহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে উঠলো, যেন গর্জন করতে চায় কিন্তু বেধে রাখা হয়েছে। মুষ্টিগুলো অচেনা এক উত্তেজনায় কড়া হয়ে উঠলো। ইহাব গলায় এক শুকনো ঢোক গিলে ফেললো, বুঝতে পারছিলো ওরহান অতিরিক্ত রেগে গেছে। ফিসফিসিয়ে ইহাব বললো—

-"স্যার, কন্ট্রোল রাখুন। মামকে এইভাবে পাবেন না। আপনাকে অন্য পন্থা বেছে নিতে হবে। জোরজবরদস্তি করলে আপনি মামকে হারিয়ে ফেলবেন।"

ওরহান মনোযোগ দিয়ে শুনল, কিন্তু তার ভেতর কী কী চলছে, বুঝতে পারা মুশকিল। আকস্মিকভাবে উঠে দাঁড়ালো সে। ইহাব দুশ্চিন্তায় ঘাবড়ে গেলো। হাত দুটো নিজে থেকেই পানি গ্লাসের কাছে নিয়ে গেল।

সোহা আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো ওরহানকে, তারপর নিজেকে কাজের পেছনে ছুঁড়ে দিলো।

ওরহান গটগট পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো, আর ইহাব দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনে মনে ভেবে নিলো, এই যাত্রায় যেন তার জীবনটা বেঁচে গেলো। সে দ্রুত ওরহানের পিছু নেমে পড়লো।

সোহা বিজয়ের এক নিঃশব্দ হাসি হাসলো। হাসিটা ছিলো এক ধরনের রহস্যময় আত্মবিশ্বাস, যা দেখে মিরহা অবিলম্বে বুঝতে পারলো, সোহার ইচ্ছে ছিল ওরহানকে বের করে দেওয়া। মনে মনে সে প্রশংসা করলো সোহার কৌশলের জন্য।

দুজনেই আবার কাজের মাঝে মনোনিবেশ করলো, পুরো একঘণ্টা পেরিয়ে গেলো। কিন্তু ওরহানের কোনো খবর নেই, সে এখনও ফিরে আসেনি।

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে তাদের চোখ উঠে গেল। প্রায় দশজন লোক একসাথে কেবিনে প্রবেশ করলো। সবাই হাতে হাতে রক্ত লাল গোলাপের তোড়া ধরে আছে, প্রায় হাজার খানেক করে। দশজনের হাতে মিলিয়ে যেন দশ হাজার রক্ত লাল গোলাপের সমুদ্র বয়ে চলেছে।

লাল গোলাপের বন্যা, ফিরে দেখা গল্পের পর্ব ৯, লেখিকা নওরিন ইথিকা

সোহা ও মিরহার ভ্রু কুঁচকে গেলো, অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি, বিস্ময় আর হতবাকির মধ্যে তারা যেন হারিয়ে গেলো। চোখ যেন মেলে গেল, হৃদয় বারে বারে অবিশ্বাসে কাঁপতে লাগলো।

তখনই, তাদের মাঝ থেকে একজন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সোহার হাতে একটি কার্ড বাড়িয়ে দিলো। কার্ডটা ছোট্ট, কিন্তু তার ওপর লেখা ছিল এক গভীর অর্থপূর্ণ বার্তা—

"রক্ত লাল গোলাপ যেমন মাটির বুকের ওপর দাগ রেখে যায়, যেমন এক দহন, তেমনি ভালোবাসার ক্ষতও হৃদয়ের পৃষ্ঠে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে। এই গোলাপগুলো আমার অগ্নি-ছোঁয়া অনুভূতি, যা তোমার সাহস, দৃঢ়তা এবং অদম্য আত্মার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। আজকের এই উপহার শুধুই ফুল নয়, বরং প্রেমের, ব্যথার, সংগ্রামের, বিজয়ের ও এক বিষাক্ত ভালোবাসার প্রতীক।

তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো, সেখানে প্রতিটি লাল পাপড়ি যেন তোমার প্রতি আমার অটুট বিষাক্ত ভালোবাসার অঙ্গীকার বহন করে। ভয় পেয়ও না, এগুলো শুধু রক্তের মতো নয়, বরং তোমার পথে আলোর প্রদীপ।

"ভালোবাসি আমার দহনকারী, আমার বিষরানি।"

—ওরহান খান শাহির

Story Cover