ফিরে দেখা

পর্ব - ৮

🟢

পুরো হলরুম জুড়ে যেন নেমে এলো এক অবর্ণনীয় নিস্তব্ধতা। সময় থমকে গেছে, বাতাস থেমে আছে, আর মুহূর্তটি যেন চিরস্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপস্থিত প্রতিটি মানুষ নিথর, নিশ্চল। কারোর ঠোঁট নড়ে না, চোখে-মুখে বিস্ময়ের জমাট অভিব্যক্তি। বিস্ফোরিত নয়নে সবাই তাকিয়ে আছে এক দিকেই, ওরহানের দিকে।

সোহা বসে আছে স্তব্ধ হয়ে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। তার চোখে যেন গলতে থাকা বরফের মতো জমে আছে সহস্র প্রশ্ন, অমীমাংসিত এক অতীত, আর অব্যক্ত ক্ষোভের বিক্ষুব্ধ ঢেউ। অপরপাশে বসে থাকা ওরহানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক ক্রুর হাসি, যা শুধু ঠোঁটে নয়, চোখে চোখে বিঁধে যাচ্ছে শূলের মতো। সে হাসি বিজয়ের, আবার অনুশোচনার; যেন সেই হাসির গভীরে চাপা পড়ে আছে এক নির্মম ইতিহাস, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই যে এই বিজয় তার দখলে এসেছে।

ওরহানের দৃষ্টি কঠিন, স্থির। ঠিক সোহার চোখে চোখ রেখেই বসে সে। সেই চাহনিতে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, একটুকু অনুতাপ, আর অস্পষ্ট এক আকুতি, যেন অনর্থক হলেও সে একবার ফিরে পেতে চায়, শুধু একবার।

সারা হলরুম যেন অচেনা এক অন্ধকারে ঢেকে গেছে। চারপাশের মানুষেরা রূপ নিয়েছে ছায়া-মূর্তিতে। কারোর নিঃশ্বাস, কারোর গলার আওয়াজ, কিছুই নেই। আলো নিভে গেছে, শব্দ হারিয়ে গেছে। কেবলমাত্র দুইটি অস্তিত্ব টিকে আছে এই নিঃসীম নীরবতায়, সোহা এবং ওরহান। তাদের মাঝখানে যেন জমে উঠেছে এক যুদ্ধ, শব্দহীন, রক্তহীন, কিন্তু তীব্র।

CEO Vs Cheif Designer

সোহার চোখে কঠোর ঘৃণা, দহনকারী ক্রোধ। সে তাকিয়ে আছে ঠিক সেই চোখে, যেখানে একসময় বিশ্বাস ছিল, স্বপ্ন ছিল, আর ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আজ সেই স্থানেই পুঞ্জীভূত অভিমান, অপমান আর বিস্ময়ের ছায়া। অপরদিকে, ওরহানের চোখে মিশে আছে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, একটি শেষবারের প্রত্যাশা, আর হয়তো এক বিন্দু ম্লান অনুতাপ, যা লুকোনো, কিন্তু স্পষ্ট।

এ যেন কোনো নাট্যশালার মঞ্চ। স্পটলাইট পড়ে আছে কেবল দু’জনের ওপর। বাকিরা যেন দর্শক হয়ে গিয়েছে নীরব দর্শনে। কেউ কিছু বলছে না, অথচ বলা হয়ে যাচ্ছে সব, চোখের ভাষায়, হাহাকারে নীরব শব্দে।

ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ, অনুশোচনা, সব আবেগ যেন একসাথে দাঁড়িয়ে আছে এই মুহূর্তের ছায়ায়। এটি আর কেবল একটি দৃশ্য নয়, এটি এক অসমাপ্ত গল্পের মুখবন্ধ, যেখানে শব্দের চেয়ে চাহনি অনেক বেশি বলছে।

তীব্র এতক্ষণ যাবত নির্বিকার ভঙ্গিতে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। তার চোখে ছিল গভীর শান্তি, অথচ সেই শান্তির আবরণে ছিল তীক্ষ্ণ এক উপলব্ধির দৃষ্টি। ওরহানের চাহনি দেখেই সে বুঝে গিয়েছিল, অপ্রকাশ্য অনেক কিছুই প্রকাশ পেয়ে গেছে এই নিস্তব্ধ মুহূর্তে।

পুরো হলরুম জুড়ে জমাট নীরবতা চিড় ধরিয়ে হঠাৎ তীব্র সোহার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল—

-"মিস সোহা, আপনি ঠিক আছেন তো?"

সোহা যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো। মনস্তলের ঝড় কিছুটা গোপন রেখে, নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে সে উত্তর দিল—

-"জি, ঠিক আছি। কংগ্র্যাচুলেশন। আপনারা বসুন, আমি একটু আসছি।"

এ কথা বলে সে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল এবং নির্দ্বিধায় বেরিয়ে গেলো হলরুম থেকে। পেছন থেকে মিরহা দাঁড়িয়ে পড়তেই সোহা তাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল। "না, তুমি বসো," বলেই পিছু না তাকিয়ে সোহা অদৃশ্য হয়ে গেল দরজার ওপারে।

অগত্যা মিরহাকে নিঃশব্দেই বসে থাকতে হল। সে অপার দৃষ্টিতে সোহার প্রস্থান দেখল, একটি দৃশ্য যা ছিল দৃশ্যমান হলেও তীব্র অনুভবের গভীরে ঢাকা।

তীব্রের চোখে চিন্তার ছায়া।

ওরহান এবং তার পরিবারের লোকজনও সেই প্রস্থানের সাক্ষী রইল, তাদের মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল বিমর্ষতার ছায়া। যেন কেউ কিছু বলছে না, তবুও সব কিছুই বলা হয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ করেই ওরহান চুপচাপ উঠে কোথাও চলে গেল। কারো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে যেন নিজেই এক অদৃশ্য অস্থিরতার পিছু নিল সে।

এই ফাঁকে ইহাব ধীরপায়ে মিরহার পাশে গিয়ে বসলো। মিরহা তাকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকাল, চোখে ঝলসে উঠল রক্তচক্ষুর দীপ্তি। কিছু না বলে সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।

একটু অস্বস্তিতে পড়ে ইহাব গলা খাঁকারি দিল, তারপর কণ্ঠ শুকিয়ে যাওয়া এক ঢোক গিলে বলল—

-"আমি শুধু... একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।"

-"মিস মিরহা?"

- "...."

-"দেখুন, এটা পুরোপুরি ওনাদের ব্যাপার। আপনি আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছেন কেন?"

-"আমি ঠিক কেমন আচরণ করছি আপনার সঙ্গে?"

-"এই যে রাগ দেখাচ্ছেন, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, কথা বলছেন না...!"

-"আপনার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক যে আমি রাগ দেখাবো, কথা বলব না?"

-""মিস মিরহা?"

-"ডোন্ট মিস মিরহা মি!"

তার কণ্ঠে হঠাৎ বজ্রনিনাদ। দীর্ঘ চেপে রাখা ক্ষোভ যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো।

-"আপনি জানেন আজকের এই জায়গাটায় পৌঁছাতে সোহাকে কতখানি লড়াই করতে হয়েছে? জানেন সে কী কী সহ্য করেছে গত চারটা বছর ধরে? কিছুই জানেন না আপনারা। হ্যাঁ, আমি বুঝি, সোহা আর ওরহানের কোনো অতীত আছে। তবে সেই অতীতের রং সুখের নয়, সেটা আমি চোখে আঙুল দিয়ে দেখেছি এই চার বছর আর সাম্প্রতিক কদিনে। আমি সোহাকে চিনি, জানি, তার প্রতিটি কষ্ট আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আপনারা আজ যা করলেন, তার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা দেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন।"

মিরহার চোখে ছিল তীব্র তর্জনী। কথাগুলো যেন প্রতিটি অক্ষরে আঘাত করে যাচ্ছিল ইহাবের হৃদয়ে।

-"মিস মিরহা, একটু দাঁড়ান! অন্তত আমার কথাটা শুনুন!"

কিন্তু মিরহা শুনল না। তার চোখে অগ্নি, পদচারণায় বিদ্রোহ। গটগট করে হেঁটে চলে গেল সে, যেন নিজের রাগের ভারে মাটিও কেঁপে উঠছিল। ইহাব দিশেহারা হয়ে তার পেছনে ছুটে গেল, প্রতিটি পদক্ষেপে অনুতাপ আর অজানা উত্তরের ভার।

তীব্র এতক্ষণ চুপচাপ, নিঃশব্দে পুরো দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল। সে কিছু বলল না, কিন্তু তার চোখের গভীরে এক রহস্যময় ছায়া আঁকাবাঁকা হয়ে উঠল। সব কিছু বোঝার মতো যথেষ্ট ছিল, সোহা ও ওরহানের মাঝে এখনো দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত এক অতীত। এবং সেই অতীতই তীব্রর সামনে আজ সবচেয়ে বড় বাধা।

তীব্র ধীরে উঠে দাঁড়াল। ব্লেজারটা গুছিয়ে নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে হাঁটা শুরু করল। তার লক্ষ্য স্পষ্ট, সোহার পাশে থাকা। যেভাবেই হোক, ওরহানকে সে আর সামনে এগোতে দেবে না।

শিফা ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখ দুটো একদৃষ্টে আটকে রইল এক অচেনা পুরুষের পেছনে, যাকে সে প্রথম দেখাতেই হারিয়ে ফেলেছে নিজের হৃদয়ে। এক সুদর্শন শ্যামলা গড়নের যুবক, যার চেহারায় ছড়িয়ে আছে অনাহূত মুগ্ধতা।

চুলগুলো পরিপাটি করে আচড়ানো, যেন প্রতিটি রেখাতেই ছাপ রেখে গেছে আত্মবিশ্বাস। চারকোল রঙের বেলেজার, ইন করে পরা সাদা শার্ট আর নিখুঁতভাবে ছাঁটা প্যান্ট, সব মিলিয়ে যেন রাজপ্রাসাদ থেকে নেমে আসা কোনো আধুনিক রাজপুত্র। কালো পেটেন্ট জুতোজোড়া তার চলাফেরার সঙ্গে মিলে আরও রাজকীয় ছাপ ফেলে।

শিফা নিজের অজান্তেই পিছু নিতে থাকে তার, চোখ সরাতেই পারছিল না। হঠাৎ পাশে থেকে কারও ফিসফিস করা কণ্ঠে উচ্চারিত নামটা কানে এলো। সে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল—তীব্র নীল চৌধুরী।

শিফার ঠোঁটে মৃদু এক হাসি খেলে গেল। হৃদয়ে ছুঁয়ে যাওয়া অনুভূতির ঢেউয়ে সে নিঃশব্দে বিড়বিড় করল—

-"হৃদয় চুরির অপরাধে আপনাকে এই হৃদয়ের কারাগারে আজীবনের বন্দী হতে হবে, তীব্র নীল চৌধুরী।"

শিফা পিছু নিয়েছে তীব্রর। তীব্র বেরিয়েছিল সোহার খোঁজে, হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো এক মেয়েলি, কোমল কণ্ঠস্বর। থমকে দাঁড়াল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল, এক অপ্সরীর মতো সুন্দরী মেয়ে হাঁটুর ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, দুই হাত হাঁটুর ওপরে রাখা, যেন দম নিতে গিয়ে মুহূর্তখানেক নিজেকে সামলাচ্ছে। তার বুকে তখনও শ্বাসের ঘন ছন্দ ওঠানামা করছে, যেন সদ্য দৌড়ে এসেছে শুধু তাকে থামাতে।

তীব্র ভ্রু কুঁচকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শিফা ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক করে নিল। তারপর নিঃশব্দ সাহস বুকে নিয়ে এগিয়ে এসে তীব্রর চোখে চোখ রাখল—

-"ভালোবাসি আপনাকে, তীব্র নীল চৌধুরী।"

সরাসরি প্রেম প্রস্তাব

সোহা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেই দেখতে পেলো, দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরহান। কালো শার্ট ইন করা, তার ওপর সাদা ব্লেজার, সাদা প্যান্ট, পায়ে চকচকে কালো জুতো। বাঁ হাতে বিলাসবহুল ঘড়ি ঝলমল করছে। তার দৃষ্টি সোজা সোহার দিকে স্থির, অপলক।

সোহা কোনো কথা বললো না। নীরব ভঙ্গিতে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই ওরহান হঠাৎই তার বাহু ধরে নিজের সামনে দাঁড় করালো। সোহা বিরক্ত হলো তার এই স্পর্শে। চোখ রাঙ্গিয়ে এক ঝটকায় বাহু ছাড়িয়ে নিলো। দুরত্ব রেখে সোহা ঠাণ্ডা অথচ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলো—

-"আর একবার স্পর্শ করলে আপনার চেহারার মানচিত্র চিরতরে বদলে দেবো।"

ওরহান হেসে ওঠে, ঠোঁটে খেলা করে চঞ্চল বিদ্রূপ—

-"কীভাবে বদলে দেবে? চুমু দিয়ে? আই ডোন্ট মাইন্ড, জান! তোমার পূর্ণ অধিকার আছে আমার মুখের মানচিত্র বদলানোর। এসো, অধিকার ফলাও, নির্দ্বিধায়।"

বলেই নিজের মুখ এগিয়ে দিলো ওরহান, স্পষ্ট এক অবজ্ঞার অভিব্যক্তি নিয়ে, যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।

সোহা নাক-মুখ কুঁচকে নিলো তীব্র ঘেন্নায়। এক ঝটকায় ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। কণ্ঠে আগুন ঝরিয়ে বলল—

-"নির্লজ্জ পুরুষ! আমি নর্দমায় চুমু খাই না। যদি কোনো মানুষ হতো তাও ভেবে দেখতাম!!"

ওরহানের চোখ মুহূর্তেই আগুনে জ্বলে উঠলো। চোখের সাদা অংশ রক্তিম হয়ে উঠলো ক্ষোভে। পরক্ষণেই, এক ঝড়ের মতো খপ করে সোহাকে টেনে নিলো নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে। এতটাই শক্ত করে ধরে রেখেছে যে ওরহানের নখ ডেবে গেছে সোহার কোমল বাহুতে। ব্যথায় সোহা কেঁপে উঠলো, মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো একটি যন্ত্রণাভরা শব্দ।

ঠিক তখনই ওরহানের চোখে-মুখে নেমে এলো রহস্যময় এক পরিবর্তন। সে হিসহিস করে উঠে, গভীর, নীচু হাস্কি কণ্ঠে, যার প্রতিটি শব্দে জড়ানো কামনা, হুমকি আর অধিকারবোধ বলল—

-"আমি ব্যতীত তোমার দিকে কেউ কুদৃষ্টিতে তাকাবে না। আমি ব্যতীত কেউ তোমাকে স্পর্শ করবে না। কেউ যদি তোমার ত্রিসীমানায় দাঁড়িয়ে বিকৃত মনোভাব নিয়ে নিশ্বাস ফেলে—তাহলে সেই নিশ্বাস চিরতরে থামিয়ে দেব, জান আমার।"

ওরহানের এ হঠাৎ আবেদনময়, নীচু কণ্ঠে সোহা কিছুটা ঘাবড়ে গেলো। এক অনির্বচনীয় স্রোত বয়ে গেলো তার শরীর জুড়ে। রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো শিউরে। সে নিঃশব্দে তাকালো ওরহানের চোখে। সেই দৃষ্টি যেন অদ্ভুত এক বন্ধন, হিংস্রতা আর মোহের মাঝামাঝি কোথাও। সোহা ভ্রান্ত হয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। ওরহান ধীরে ধীরে তার মুখ সোহার কানের কাছে নিয়ে গেলো, ফিসফিসে বলল—

-"তোমার এই শ্যামল রূপ আমাকে প্রতিবার মুগ্ধ করে, শ্যামাঙ্গিণী। চার বছর আগে, যখন তোমাকে প্রথম শাড়িতে দেখি, আমার হৃদয়জুড়ে এক অজানা তোলপাড় শুরু হয়েছিল। জানো? সেই তোলপাড় এখনো থামেনি। বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশ্বাস করো, তোমার এই রূপ... আমাকে পাগল করে তুলছে।"

ওরহানের কণ্ঠে নেমে এলো এক নেশালো রেশ। তার প্রতিটি শব্দে যেন কাতর আবেগ গড়িয়ে পড়ছে। সেই কণ্ঠে এমন এক আকুতি, যা মুহূর্তের জন্য সোহার বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো।

সে একটুখানি থমকে গেলো। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কিন্তু হঠাৎ, অতীতের কিছু নির্মম মুহূর্ত বিদ্যুৎবেগে ফিরে এলো। কথাগুলো যেন মস্তিষ্কের ভেতর আঘাত করতে লাগলো বারবার, কর্কশ কণ্ঠে, নির্মম উচ্চারণে। এক নিঃশ্বাসে জেগে উঠলো সব ক্ষত।

সোহা নিজের দুই হাত ওরহানের বুকের ওপর ঠেলে দিলো, এক শক্তিশালী ধাক্কা!

ওরহান ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক পা পেছনে সরে গেলো। হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলো সোহার দিকে।

সোহার শরীর রাগে কাঁপছে। বুক ওঠানামা করছে ক্ষিপ্র শ্বাসে। সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছে না।

চোখ রক্তিম, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সেই চাহনিতে ছিল দহন, দহন নয়, যেন এক নীরব শপথ!

ওরহানের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো কিছু। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই সোহা বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলো—

-"এই, এই তোর মিথ্যার নাটক কখনোই থামবে না, তাই না? হাঁপিয়ে উঠিস না তুই? এতটা অভিনয়, একজন মানুষ কীভাবে পারে? একবার আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে তোর সখ মিটে নি? আবার ফিরে এসেছিস সেই একই ভঙ্গিমা, সেই একই মধুর বিষাক্ত বুলি নিয়ে! কী প্রমাণ করতে চাইছিস, বল? একটা মেয়ে কতটা বোকা, কতটা অসহায় হতে পারে, এইটাই তো?

তোর কি ধারণা, তোর এই সাজানো আবেগের আগুনে পুড়ে আমি আবার পা বাড়াবো? তুই কি ভাবিস, আমি এতটাই নির্বোধ যে, তুই প্রথম গুলিটা মিস করেছিলি বলে আমি তোকে বিশ্বাস করে দ্বিতীয়বার নিজেকে নিশানা বানাবো?

মরে যাব আমি তবু তোর মতো চরিত্রহীন, প্রতারক, মিথ্যেবাদী একজন পুরুষকে আর কখনো বিশ্বাস করবো না!"

চিৎকার করে উঠে বলল সোহা। তার চোখের কর্নিশ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো, তীব্র রাগে, দুঃখে, অপমানে।

.

.

.

-"কি বলছেন আপনি, ভেবেই বলছেন তো?" — তীব্র ভ্রূকুঞ্চিত করে কটমট করে তাকাল শিফার দিকে।

শিফা এক ধাপ এগিয়ে এল। চোখে তীব্র আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি। বলল—

-"জ্বি মিস্টার, আমি যা বলেছি, তা শতভাগ ভেবেচিন্তেই বলেছি।"

তীব্র ঠোঁট চেপে প্রশ্ন করল—

-"তুমি জানো, আমি তোমার থেকে কত বছরের বড়?"

শিফা হাসল মৃদু বিদ্রূপে—

-"কত আর হবেন! আমার দাদাভাইয়ের বয়সের কাছাকাছি, তার বেশি হবেন না।"

তীব্র চোখ সংকুচিত করল—

-"তোমার দাদাভাইয়ের বয়স কত?"

-"ত্রিশ!" নির্ভার উত্তর শিফার।

-"নাম কী তোমার দাদাভাইয়ের?"

শিফার ঠোঁটে খেলল চাহনি, চোখে ছলকে উঠল দুষ্টুমি—

-"আরে মিস্টার! আমার দাদাভাইয়ের নাম দিয়ে আপনি প্রেম করবেন নাকি! বরং আমার নাম শুনুন, ওয়াজিহা খান শিফা। তবে আপনি আমাকে 'জান' বলে ডাকতেই পারেন!"

তীব্রের কপাল আরও কুঁচকে গেল। যেন মস্তিষ্ক জ্বলে উঠল বিস্ময়ে। এই মেয়েটা কি উন্মাদ নাকি? সর্বোচ্চ ১৭-১৮ বছর বয়স, অথচ নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যেই প্রেম নিবেদন করছে। তাও আবার এমন দম্ভ নিয়ে, যেনো সবটাই স্বাভাবিক! রাগে গলা কেঁপে উঠল তীব্রের—

-"বেয়াদব মেয়ে! তোমার বয়স কত? লজ্জা করে না? নিজের থেকে গুনে গুনে ১২ বছরের বড় একজন পুরুষকে প্রেম নিবেদন করছ! ঠাসিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় মারলেই হয়তো মাথাটা জায়গা মতো আসবে! ইডিয়েট!"

শিফা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন একরাশ শোরগোল ভেসে এলো বাতাসে। দুইজনেই থমকে দাঁড়ালো। চোখাচোখি হল একবার। তারপর শব্দের উৎস খুঁজতে দু’জনে এগিয়ে গেল সেই অজানার দিকে, যেখানে গল্প হয়তো নেবে নতুন মোড়।

.

.

.

সোহার বিধ্বস্ত রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল ওরহান।

এই যে চেনা মুখ, তাতে আজ চিনির মতো গলে যাওয়া হাসি নেই, চোখে জলকণা জমাট, ভাঙাচোরা হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি যেন একে একে ফুটে উঠছে চোখেমুখে।

সে মুহূর্তে আর নিজেকে সামলাতে পারল না ওরহান।

দ্রুত এগিয়ে এসে সোহাকে আপন বুকের মাঝে চেপে ধরল। ভাঙা গলায়, কাঁপা কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ল তার প্রতিটি শব্দে—

-"রিল্যাক্স, বেবি... বিশ্বাস না করলেও চলবে। তুমি আমাকে যা শাস্তি দিতে চাও, দিও। গালি দাও, চিৎকার করো, মারো, ধাক্কা দাও, যা খুশি করো তুমি। আমি কিচ্ছু বলব না। শুধু... প্লিজ, ঠান্ডা হও... শান্ত হও, সোনা। আমি সত্যিই খুব... খুব সরি।"

ওরহানের কণ্ঠে কেঁপে উঠল অনুতাপ, চোখে নামল এক ফোঁটা জলের ভার। সে জানে, এ চোখের জল সোহাকে ফেরাবে না, তবু, এই ভালোবাসার মুদ্রাহীন ভাষায় সে শেষ প্রয়াসটুকু ছুঁড়ে দিল ভালোবাসার আকাশে। হয়তো কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে, সে আকাশ আবার আলো পাবে সোহার হাসিতে।

সোহার ভেতরে যেন হঠাৎ কিছু জেগে উঠল, অভিমানের আঁধারে এক ধাক্কা যেন আলোর মতো প্রবেশ করল। সে মুহূর্তে আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। অগ্নিদগ্ধ চোখে তাকিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল ওরহানকে। তারপর, নিজের শরীরের সর্বশক্তি একত্র করে একের পর এক থাপ্পড় বসাতে থাকল তার মুখে।

আঘাত ও থাপ্পর

সোহার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, তা যেন শুধু কান্না নয়, হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা প্রতিটি বেদনার ধারা। রাগে শরীর থরথর করে কাঁপছে। ভাঙা হৃদয়ের চিৎকার যেন ফুটে উঠছে প্রতিটি আঘাতে।

ততক্ষণে পুরো খান পরিবার এসে উপস্থিত হয়েছে।

ইহাব, মিরহা, ওসমান, তারা সবাই এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল সোহা, ওরহান আর শিফাকে খুঁজতে। আর তখনই, সবার চোখে পড়ে সেই দৃশ্য, ওরহান ও সোহার তর্কাতর্কি, তার মাঝখানে হঠাৎ এই অগ্নুৎপাত! সোহার হঠাৎ এমন আক্রমণ আর কান্নার সমবেত রূপ, সমস্ত পরিবেশ নিঃশব্দে স্তব্ধ করে দিল।

স্তব্ধতা কাটতেই প্রথম এগিয়ে এল ওসমান। তার সঙ্গে সাড়া দিল ইহাব আর মিরহা। তারা ছুটে এলো সোহাকে থামাতে। ওদিকে শিফা ও তীব্রও এসে গেছে। শিফা দেখে অবাক, তার প্রিয় দাদাভাই এক তরুণীর হাতে মার খাচ্ছে, আর প্রতিরোধের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করছে না।

ওসমান শিফার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বলল, সোহাকে সরিয়ে আনতে। ইশারার অর্থ বুঝে শিফা দ্রুত এগিয়ে গেল। তীব্রও তার সঙ্গে যোগ দিল। মিরহা আর শিফা মিলে কোনো রকমে সোহাকে ধরে টেনে আনল দূরে।

এদিকে ইহাব আর ওসমান শক্ত করে ধরে রেখেছে ওরহানকে, তার ফর্সা মুখশ্রী ততক্ষণে লাল হয়ে উঠেছে। ঠোঁট ফেটে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। চোখেমুখে যেন ভেঙে পড়া মানুষটির হতাশা, অপরাধবোধ আর একটুকরো প্রেমের মৃত্যু লেগে আছে।

সমগ্র দৃশ্যপট এমন এক আবেগঘন নিস্তব্ধতায় আবৃত,

যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভূতিই উচ্চারিত।

সোহার চোখ একবার ঘুরে গেল সেই চেনা মুখের দিকে। ওরহান তখনও দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে এক অপার্থিব, অথচ নির্মল হাসি। মুখে যেনো এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি, "তোমার দেওয়া প্রতিটি শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব, তুমি শুধু একবার শাস্তি দিয়ে দেখো, আমি প্রতিবাদ করবো না।"

সোহা চোখ ফিরিয়ে নিল। আরও একবার তাকাতে পারল না। ওরহানের ঠোঁটের রক্ত গড়িয়ে পড়েছে সাদা ব্লেজারে, তাতে যেন পাপ আর ক্ষমার এক রক্তমাখা ইতিহাস আঁকা হয়ে গেছে।

তীব্র তার তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। পুরো খান বাড়ির কেউ সোহার দিকে একটাও তির্যক কথা বলেনি, নিশব্দে দাঁড়িয়ে সবাই, কারও মুখে বিস্ময়, কারও চোখে বিষণ্নতা। শুধু শিফা এবং ওরহানের মায়ের চোখে অশ্রুর ছায়া। তীব্র বিস্ময়ে তাকাল শিফার দিকে, এই মেয়ে... এই আবেগভরা চোখ... এই কি তবে ওরহানের বোন! কিছু না বলেই, নিঃশব্দে সরে গেল তীব্র।

সোহা এবার ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে শিফা ও মিরহার আবেগভরা বাঁধন থেকে। তারপর পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু এক মুহূর্ত, কোনো এক গভীর বোধে থেমে গেল পা। ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মতো তাকাল ওরহানের দিকে।

তার কণ্ঠে তখন এক কাঁপা, অথচ স্থির সিদ্ধান্তের বজ্রনিনাদ—

-"ভুলেও আর কোনো দিন আমাকে স্পর্শ করার কথা তো দূরের কথা, আমার সামনে আসারও সাহস করবেন না।"

তারপর আর একবারও পিছনে না তাকিয়ে সোহা চলে গেল, সবাই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দে প্রত্যক্ষ করল সেই প্রস্থান, যেখানে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো একটি সম্পর্কের পরিসমাপ্তি।

কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু মাথা নিচু করে এক এক করে সবাই যেন নিজ নিজ আত্মবোধে ডুবে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি, ওরহান, যেন গোলা কাটা কোনো পাখির মতো ছটফট করতে লাগল।

হঠাৎই হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠল সে—

-"ছাড়! আমাকে ছেড়ে দাও। সোহা চলে যাচ্ছে! সোহা চলে যাচ্ছে! ওকে আটকাও কেউ... প্লিজ, কেউ ওকে আটকাও!"

অসহায় চোখে তাকাল সে তার মায়ের দিকে। চোখে এক শিশুর আকুতি, ভাঙা গলায় ডেকে উঠল—

-"ও মা... মা... মাগো... প্লিজ, কিছু করো। ওকে আটকাও না মা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে চলে গেলে, আমি মরে যাবো মা।"

গল্পের সিনারি, ফিরে দেখা, নওরিন ইথিকা

ছেলের এই আহাজারিতে ভেঙে পড়লেন মা আর চাচী। কান্নার রোল উঠল দুজনের গলায়, যেন বুকফাটা আর্তনাদ।

ওসমান আর ইহাব ওরহানকে শান্ত করার চেষ্টা করছে,

কিন্তু সে যেন নিজেই নিজের শরীর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইছে। ওমর খান ও ওয়াহিদ খান এগিয়ে এলেন। দুজনেই ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। ওমর খান স্তব্ধ কণ্ঠে, ভাঙা গলায় বললেন—

-"মাফ করে দে, আব্বা... আমার জন্য তোর এই দুর্দশা। এই ছিন্নভিন্ন অবস্থা, আমাকে মাফ করে দে, প্লিজ।"

গলা ভেঙে গেল ওরহানের। কান্না আর কণ্ঠ একসঙ্গে কাঁপছে। ওয়াহিদ খান ভাইপোর মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। তবুও ওরহান থামছে না। পোড়া বুকের কান্না যেন কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না। তাকে শান্ত করার জন্য যা যা সম্ভব, তা-ই করছে সবাই, কিন্তু ওরহানের আত্মার ভাঙন কোনো ঔষধে আর সারে না।

শেষমেশ ইহাব, ওসমান, ওমর খান আর ওয়াহিদ মিলে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে তুলল। নিঃশব্দে, ভগ্ন হৃদয়ে সবাই তাকে নিয়ে ফিরে এল খান ভিলা।

ডাক্তার ডেকে আনা হলো। ধীরে ধীরে নাড়াচাড়া করে দেখলেন ওরহানের অবস্থা। চোখে ক্লান্তি, সারা শরীর জুড়ে উদ্বেগের ধকল। অবশেষে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ওরহানকে নিস্তব্ধ নিদ্রার জগতে পৌঁছে দিলেন।

শান্ত হয়ে এলো ঘর, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা যেন এক অদৃশ্য কান্নায় ভারী হয়ে রইল। ওরহানের ঘুমন্ত চোখের কোণেও তখনও ভেজা, আর বাকিদের মনে, একটি সম্পর্কের অপূর্ণতার রক্তচিহ্ন ঠিকই রয়ে গেল।

Story Cover