খান ভিলা—
বসার ঘরে সকলেই উপস্থিত। কেউ চুপচাপ, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে গল্পে মগ্ন। সেই সময়, বাড়ির এক কোণে শুয়ে আছে শিফা, জ্বরে কাবু। মাথায় লেগেছিল আঘাত, তারই প্রতিক্রিয়া এখন শরীর জুড়ে। ডাক্তার এসে দেখে গেছেন, ওষুধ দিয়েছেন। রাতের খাবার খাইয়ে, কপালে শীতল পাতাজল রেখে স্নেহভরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে।
বাকিরা সবাই রাতের খাবার সেরে বসার ঘরে জড়ো হয়েছে। ওরহান আগেই ফোনে জানিয়ে দিয়েছে, সে আজ ফিরছে না। মুফতি ও মারুফ, উভয়েরই চোখ ব্যস্ত মোবাইল স্ক্রিনে। এদিকে ওসমান তার বাবা ও চাচার সঙ্গে অফিসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। অন্যদিকে, সুরাইয়া বেগম ও আয়রা বেগম মিলে রান্নাঘরের শেষ দিককার কাজ সেরে নিচ্ছেন।
এমন সময় হঠাৎ করেই বাড়ির নিস্তরঙ্গ পরিবেশে এক হৈচৈ শুরু হয়ে গেল।
চিৎকার-চেঁচামেচির মাঝে কে যেন গোটা বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে। মুহূর্তেই বোঝা গেল, মিহিরিমা এসেছে।
সে সরাসরি বসার ঘরের দিকে এগিয়ে এসে তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে ওরহানকে ডাকতে লাগল। বাড়ির সবাই একে একে সেখানে এসে উপস্থিত হয়। ওসমান বিরক্ত মুখে বলে ওঠে—
-"এটা ভদ্র মানুষের বাসা, রাস্তার বাজার নয়! এভাবে চেঁচামেচি বন্ধ করো।"
মিহিরিমা রাগে দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল—
-"তোমার ভাই কোথায়, ডেকো তাকে! এত বড় সাহস হলো তার, আমার সাথে বাগদান ভেঙে দেয়! ওই মেয়ে, হ্যাঁ, সেই দুইদিনের নতুন মুখটার জন্য? সে কি জানে না, আমার সাথে সম্পর্ক শেষ করলে তার ব্যবসায় কী পরিণতি হবে?"
ওসমান ঠান্ডা কিন্তু কঠোর স্বরে বলল—
-"প্রথমত, দাদাভাই কোনো দিনই তোমাকে বিয়ে করতে রাজি ছিল না। বাবার জোরেই সেই বাগদান হয়েছিল।"
এই কথা বলেই সে বাবার দিকে রক্তবর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। বাবা মাথা নিচু করে নিরবে দাঁড়িয়ে রইলেন, কণ্ঠে কোনো প্রতিবাদ নেই। ওসমান এবার মিহিরিমার দিকে ফিরল—
-"চলে যাও। এটা ভদ্রলোকের বাড়ি, তোমার মতো রুচিহীন নাট্যশিল্পীদের জন্য নয়।"
মিহিরিমা দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
-"কোথাও যাবো না আমি! ওরহানের সঙ্গে আমার কথা না হওয়া পর্যন্ত আমি একচুলও নড়বো না।"
-"দাদাভাই বাড়িতে নেই। তার সঙ্গে পরেই যোগাযোগ করো। এখন দয়া করে বেরিয়ে যাও।"
মিহিরিমা ফোঁস করে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শীতল স্বরে বলে গেল—
-"এই অপমান আমি ভুলবো না, ওসমান। এর বদলা আমি নেবই। যার জন্য তোমরা আজ আমাকে তুচ্ছ করলে, সেই মেয়েকে আমি দেখে নেব। খুব ভালো করেই দেখে নেব।"
.
.
.
মিরহা সাবাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। সাবা তখন আগুনের মতো জ্বলছে, রাগে, দুঃখে, অসহ্য যন্ত্রণায়।মিরহা নরম কণ্ঠে বলল—
-"এতটা রেগে যাচ্ছো কেন, সাবা? একটু শান্ত হও, প্লিজ।"
সাবা ঝাঁঝালো স্বরে উত্তর দিল, কণ্ঠে তীব্র ঘৃণা ও অভিমানের ছাপ—
-"শান্ত হবো? কিভাবে শান্ত হই বলো তুমি? যেসব বাবা-মা নিজেদের সন্তানের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না, একটা ঝড়-বৃষ্টির রাতে তাকেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তাদের কি আদৌ মা-বাবা হওয়ার অধিকার আছে?"
তার গলা কেঁপে ওঠে। চোখ দুটি আগুনের মতো জ্বলছে, আর ঠোঁট কাঁপছে ক্ষোভে।
-"আমার আপু... আমার আপু আজ কোথায়, জানো তুমি? আমি কিছুই জানি না। সে কি ভালো আছে, না কি কোনো অমানুষের হাতে পড়ে গেছে, বেঁচে আছে তো এখনো? চারটি বছর ধরে খুঁজে চলেছি আমরা, একফোঁটা খোঁজ পাইনি! কোথাও না, কারো কাছেই না! সব দোষ আমার বাবা-মায়ের। আমি কোনো দিন তাদের ক্ষমা করবো না। কোনো দিনও না!"
শেষ কথাগুলোতে সাবার কণ্ঠ যেন ভেঙে পড়ে। সে অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়ে মিরহার সামনে। দুঃখ, হতাশা আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা যন্ত্রণায় যেন চিৎকার করে কাঁদতে থাকে সে।
মিরহার কিছু জিজ্ঞেস করারও সুযোগ রইল না। কেবল মেয়েটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে সে বসে রইল নিঃশব্দে। সাবার কান্নার শব্দে তার নিজের বুকেও মোচড় ওঠে।
মিরহা অনুভব করল, এই পরিবারের বুকে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর ক্ষত, কোনো যন্ত্রণার অতল গহ্বর, যা বাইরে থেকে বোঝার নয়। কতটা অসহায় হলে একটি পরিবার এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
তার হৃদয়ে শুধু একটাই প্রার্থনা উঠে এল—
আল্লাহ, কোথায় আছে তাদের সেই হারিয়ে যাওয়া বড় মেয়েটি? দয়া করে তাদের মিলনটা আর বিলম্ব করো না।
ওরহান স্তব্ধ। নীরবতা যেন তার চারপাশের সমস্ত শব্দ গিলে নিয়েছে। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়ে, যে কোনোদিন রাগ করে তাকায়নি, যার চোখে সবসময় নরম আলো ঝিলমিল করত, আজ সেই মেয়েটিই তাকে চড় মারল? এই কোমল মাটির মতো মেয়েটি? এই শান্ত স্বভাবের সোহা?
ওরহান যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ভাষা হারিয়ে ফেলে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই সোহা যেন হঠাৎ দিগ্বিদিক হারিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেল।
ওরহান দ্রুত ছুটে এসে তাকে পড়ে যাওয়ার আগেই নিজের বাহুতে তুলে নেয়। আতঙ্ক আর অপরাধবোধে তার বুক ধড়ফড় করছে।
আর ঠিক তখনই আকাশে গুঞ্জন তুলে এক ঝাঁক ড্রোন ভেসে আসে। সোনালি রঙের ফিতায় বাঁধা ড্রোনের নিচে ছোট ছোট ব্যানার, তাতে লেখা—
"Sorry Soha."
আকাশজুড়ে সেই শব্দেরা ভেসে বেড়ায়, ক্ষমা প্রার্থনার এক নিঃশব্দ কাব্য যেন। কিন্তু সোহার আর সেই দৃশ্য দেখা হলো না।
ব্যথাতুর হৃদয়ে অজ্ঞান হয়ে রইল সে, তাদের ভালোবাসার, অভিমানের এবং ভুল বোঝাবুঝির এক ঘৃণিত পুরুষের বুকে।
ওরহান নিঃশব্দে, অথচ অশ্রুত কষ্ট নিয়ে সোহাকে বুকে আগলে তুলে নিলো। নিঃসীম মায়ায় ভেজা হাত দু’টোয় তাকে ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির দরজা খুলে সোহাকে আস্তে করে বসিয়ে দিলো, আর নিজে স্টিয়ারিংয়ে বসে দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটে চলল হাসপাতালে।
হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সোহাকে ভর্তি করানো হলো। কিছুক্ষণ পরে ডাক্তারের কণ্ঠে ভেসে এলো আশ্বাস—
-"উনি অতিরিক্ত মানসিক চাপে জ্ঞান হারিয়েছেন। বিশ্রাম দরকার, ঘুম হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কিছু নেই। চাইলে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।"
ওরহান এক দৃষ্টিতে সোহার নিস্পন্দ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, এই অচেতন মুখে যেন সমস্ত অভিযোগ ঘুমিয়ে আছে। অপরাধবোধের মাঝে দাঁড়িয়ে ওরহান যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে।
একরাশ অপরাধবোধ, একধরনের না বলা মায়া আর দায়িত্ববোধ থেকে সে সিদ্ধান্ত নেয়, সোহা এক রাত হাসপাতালেই থাকুক, নিরাপদে। সে নিজে পাশে থেকে রাত জেগে পাহারা দিল তার নিঃশব্দ অনুতাপে নিঃশেষ হওয়া ভালোবাসাকে।
সকালে সোহার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলেই দেখে, তার বিছানার পাশেই মাথা নিচু করে চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে ওরহান। অন্ধকার রাতে ভেঙে পড়া সেই মুখটা একবার দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে সে। ইচ্ছে করে মাথায় একটা স্নেহভরা হাত রাখে, একবার, একটিবার।
কিন্তু... না। ঘেন্না। ঘেন্না পিছু টানল। বুকের ভেতরে গুমরে থাকা ব্যথা তাকে বাধা দিল।
সোহা নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। কোনো শব্দ না করে, কাউকে কিছু না বলে, হাসপাতালের দেয়ালগুলোকে নীরব সাক্ষী রেখে বেরিয়ে যায়। তার গন্তব্য, নিজের বাড়ি। নিজস্ব নীরবতার অভয়ারণ্য।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর ওরহানের ঘুম ভাঙে। চোখ খুলেই সে কিছুক্ষণের জন্য দিশেহারা হয়ে যায়। মনে পড়ে রাতের সবকিছু। এক ঝলকে তাকায় পাশে, বিছানা ফাঁকা।
হঠাৎই বুকের ভেতরটা ধড়ফড়িয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি করে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। হাসপাতালের প্রতিটি করিডর, প্রতিটি সিঁড়ি, নার্সিং স্টেশন থেকে রিসেপশন, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সোহার কোনো সন্ধান পায় না সে। কেউ তাকে কিছু জানাতে পারে না। শেষ ভরসা, সিসিটিভি ফুটেজ। মনিটরের স্ক্রিনে দেখে, সোহা নিজেই নিরবে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছে।
ওরহানের ঠোঁটের কোণে এক দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে। নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। আর কীভাবে সে চেষ্টা করবে? সোহা তো তার কোনো কথা শুনতেই চায় না। ভগ্ন হৃদয় আর অনুশোচনায় ভারী পা টেনে হাসপাতালের বিল মিটিয়ে বাইরে আসে ওরহান।
বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ করে দেয়। নিঃসঙ্গ নিঃশ্বাসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, যেমন করে কেউ নিজের ভেতরের ভাঙা আয়না দেখার সাহস করে।
বাড়ির সদস্যরা ওরহানের এই অবস্থা দেখে গভীর উদ্বেগে পড়ে যায়। কিন্তু তার চোখের ভাষা, মুখের নিরবতা এমন কিছু বলছিল, যার মাঝে ঢোকার সাহস সেদিন কারো ছিল না।
সবাই বোঝে, ওরহান ভেঙে পড়েছে। কিন্তু কেউই এগিয়ে এসে কিছু বলতে পারে না।
----------
ওসমান আজ আবার এসেছেন শিফার ভার্সিটিতে। সেই মেয়েটিকে খুঁজতে, যার চোখের গভীরে লুকানো ছিল এক অজানা কষ্টের ছায়া।
গতবার সে কিছুটা আন্দাজ করেছিল, এবার নিশ্চিত হয়েছে, সোহা, সেই মেয়েটি, তার ভাই ওরহানের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া আলো, আর এই সাবাই তার বোন।
সব জানতে পেরে ওসমান আর স্থির থাকতে পারেনি। বারবার মনে হয়েছে, সোহার সাথে আরও কিছু হয়েছে যা তাদের অজানা। একটা ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে আছে যন্ত্রণা, বিচ্ছেদ আর চারপাশের নীরবতা।
তাই সে আজ আবারও এসেছে, চেষ্টা করে দেখতে, হয়তো এবার কিছু বোঝাতে পারবে।
ভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেছে, তবুও সে দাঁড়িয়ে ছিল নিরব ধৈর্যের অবলম্বনে।
অবশেষে সাবাকে বেরিয়ে আসতে দেখে। সাবা সামনে এগিয়ে আসছে। ওসমান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ওসমানকে দেখে সাবার মুখে একরাশ অবজ্ঞা খেলে যায়। কোনো ভান বা ভদ্রতা ছাড়াই সে সোজা মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে চায়।
সেই উপেক্ষা সহ্য করতে না পেরে ওসমান গলার স্বর নরম করেও দৃঢ় করে বলে ওঠে—
-"দয়া করে একটু দাঁড়ান। প্লিজ, একবার শুনে নিন। জরুরি কিছু কথা আছে আপনার বোনকে নিয়ে।"
তার কণ্ঠে কোনো জোর ছিল না, ছিল কেবল একরাশ অনুরোধ, একটুকরো মানবিকতা।
সাবার পা হঠাৎ থেমে গেল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ঘুরে তাকাল ওসমানের দিকে। তার চোখে ছিল প্রশ্ন, ক্লান্তি আর এক চিলতে সহনুভূতি। হ্যাঁ, ওরহান যা ভুল করার করেছে, কিন্তু তার পুরো পরিবার তো সেই অপরাধে অংশীদার নয়।
এই চিন্তাটিই মনে হয় ওর অভিমানী হৃদয়কে খানিকটা নরম করে দিল। সাবা ধীর পায়ে ফিরে এলো। সোজা চোখে তাকিয়ে বলল—
-"কি বলবেন, বলুন। আমার টিউশনি আছে, দ্রুত বলুন যা বলার।"
ওসমান একটু গলা খাঁকারি দিয়ে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল—
-"একটা রেস্টুরেন্টে বসে কথা বললে ভালো হতো। মানে... এত মানুষের মাঝখানে তো সব বলা যায় না, তাই!"
সাবা একটুখানি মাথা নাড়ল, সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বলল—
-"সামনেই একটা ক্যাফে আছে, ওখানে চলুন।"
দুজনেই ধীরে পা বাড়াল। কাফের কাঁচের দরজায় ঢুকে একটা নিভৃত টেবিলে গিয়ে বসল। ওয়েটার এসে কফির অর্ডার নিয়ে চলে গেলে কিছু মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নামলো।
সাবা এগিয়ে এসে বলল—
-"কি বলবেন, এবার বলুন।"
ওসমানের চোখে যেন বিস্ময়ের ঝলক খেলে গেল।
-"আপনি যে কথা শুনতে রাজি হবেন, সেটা কখনো কল্পনাও করিনি আমি।"
সাবার চোখে স্থির দৃষ্টি। গলায় কঠিন অথচ সংযত সুর—
-"দোষ করেছে আপনার ভাই। তার পরিবার নয়। তাই আমার যত রাগ, যত অভিমান, সব ওরহানের প্রতি। আপনার বা আপনার পরিবারের প্রতি নয়।"
ওসমান এবার গভীর দৃষ্টিতে সাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"ভালো কথা। তবে আপনি কি আমাকে একটু বিস্তারিত করে বলতে পারেন, আমার ভাই আসলে ঠিক কী কী অপরাধ করেছে?"
-"কেন আপনার ভাই আপনাকে কিছু বলেনি?"
একটুখানি থেমে সাবা তীক্ষ্ণ অথচ সংযত কণ্ঠে বলল,
-"আসলে বলবেই বা কী করে? যে অন্যায় করে, সে তো কখনও ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের অপরাধ ঘোষণা করে বেড়ায় না।"
ওসমানের মাথা নিচু হয়ে গেল। অভিযুক্ত সে নয়, তবুও অপরাধের ভার যেন কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তারই। ভাইয়ের ভুল, কিন্তু লজ্জা, অপমান আর দুঃখ তার গোটা পরিবারের কপালে জুটেছে। আর সেই এক ভুলে, একটি মেয়ের জীবন হয়ে গেছে ছারখার। তার স্বপ্ন, তার সম্মান, তার স্থিরতা, সব যেন ঝড়ে উড়ে গেছে। ওসমান কিছু বলল না। নীরবে সেই অপমান মাথা পেতে নিল।
সাবা তাকে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে একটুখানি মুচকি হাসল, একটা তিক্ত অথচ বিষণ্ণ হাসি। তারপর ধীরে চোখ দুটো অতীতে হারিয়ে ফেলল।
পাঁচ বছর আগে।
তখন সাবা নবম শ্রেণিতে পড়ে। টানা সাদা ও নীল ইউনিফর্মে বাঁধা এক নির্ভেজাল কিশোরী।
তাদের পরিবার, একটি সাদামাটা মধ্যবিত্ত সংসার। বাবা একজন সরকারি কলেজের সম্মানিত অধ্যাপক। সেই সাথে কিছু ব্যবসাও করতেন, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার আশায়। তার আয়-রোজগারে চারতলা একটি বাড়ি গড়ে তুলেছিলেন, যার মাঝের দুইতলা (দ্বিতীয় ও তৃতীয়) মিলিয়ে ডুপ্লেক্স, আর নিচতলার একটি অংশ ও ছাদতলাটি ভাড়া দেওয়া হতো।
পরিবারে ছিল বাবা, মা, বড় বোন সোহা এবং ছোট মেয়ে সাবা। চারজনের সেই ছোট সংসারে সুখ ছিল, অহংকার না থাকলেও গর্ব ছিল, দুঃখ থাকলেও ছিল একসাথে লড়ার সাহস।
সোহা ছিল বরাবরই একটু শান্ত স্বভাবের মেয়ে। কোনো ঝগড়া, কোনো বিতর্কের মধ্যে সে যেতে চাইত না। তার কথা, তার চাওয়া-পাওয়া, সবই ছিল মাপজোকের ভেতর। বন্ধুও ছিল হাতে গোনা দু-একজন।
সেই সময় সোহা অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে উঠার জন্য পরীক্ষা দিয়েছে। একটি সংবেদনশীল সময়, যখন এক মেয়ে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্ন আঁকে চোখে, আর হয়তো তখনই কোথাও থেকে নেমে এসেছিল অন্ধকার।
-"মা... ও মা! তাড়াতাড়ি আমার খাবার দাও! আজ স্কুলে আমার শেষ পরীক্ষা! দেরি হয়ে যাবে, জলদি করো!"
স্কুলের ইউনিফর্ম পরে, হাতে পরীক্ষার খাতা-কলমের সরঞ্জাম নিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সাবা। তার কণ্ঠে রীতিমতো হাহাকার।
সাবার এমন হাঁকডাকে বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো সোহা। সে তখন খাবার টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় চোখ গুঁজে রেখেছে। তার আজ কোনো পরীক্ষা নেই। সামনে পরীক্ষা, তাই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
-"আহ, সাবা! একটু ধীরে কথা বলতে পারিস না? তোর চিৎকারে পড়ায় মন বসে না!" মুখ তুলে ভ্রু কুঁচকে বলে সোহা।
সাবা দুষ্টু হেসে কটাক্ষ ছুঁড়ে দেয়—
-"এত পড়ে কী হবে, আপু? শেষমেশ সেই দর্জিই তো হবি, জামা-কাপড়ই সেলাই করবি!"
সোহা মুখটা রাগে লাল করে বলে ওঠে—
-"চুপ কর গাধা! আমি ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ছি। মূর্খদের মতো কথা বলবি না!"
সাবা কাঁধ উঁচু করে চোখ টিপে মুচকি হেসে বলে—
-"সে একই কথা, আপু! তুই পড়াশোনা করে জামা-কাপড় সেলাই করবি, আর দর্জিরা না পড়েই জামা-কাপড় সেলাই করে। তোদের মধ্যে পার্থক্যটা শুধু সার্টিফিকেটের!"
সোহা এবার আরও বিরক্ত হয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলে—
-"বাবা! কিছু বলছ না তোমার ছোট মেয়েটাকে?"
পাশের চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন সাইফুল শেখ। মেয়েদের কথোপকথনে একচিলতে হাসি খেলে যায় তার মুখে। চোখের উপর রাখা চশমাটা একটু নীচে নামিয়ে সাবার দিকে তাকিয়ে বললেন—
-"মোটেও ভুল কিছু তো বলেনি সাবা। দেখো, তোমরা পড়াশোনা করে জামা-কাপড় তৈরি করো, তাই সবাই তোমাদের ‘ডিজাইনার’ বলে সম্মান করে। আর যারা পড়াশোনা না করেই জামা বানায়, তারা ‘দর্জি’, তাদের কি কোনো সম্মান নেই?"
সোহা মুখ নামিয়ে বলল—
-"আমি এটা বলিনি, বাবা...!"
সাইফুল শেখ হেসে বলেন—
-"তাহলে ওর ‘দর্জি’ বলায় তুমি নিজেকে অসম্মানিত মনে করছ কেন?"
সোহা একরাশ অভিমান নিয়ে জবাব দেয়—
-"আমি অসম্মানিত বোধ করিনি বাবা। ও আমাকে খোঁচা দিচ্ছিল, সেইজন্যই বলেছি।"
সাইফুল শেখ এবার পত্রিকাটা ভাঁজ করতে করতে হালকা হেসে বলেন—
-"বেশ, খুব হয়েছে। এখন কথা বন্ধ করে খাওয়ায় মন দাও দু’জনেই। বই, সেলাই আর দুষ্টুমি, সব পরে হবে!"
সকালের নাস্তা শেষ করে সাইফুল শেখ ছোট মেয়ে সাবাকে নিয়ে স্কুলের পথে রওনা হন। রিকশা থেকে নেমে স্কুলের গেটের দিকে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ এক ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগে তার। ছেলেটি একটি মেয়ের সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা বলছিল, ফলে সামনে থাকা সাইফুল শেখকে খেয়ালই করেনি।
ধাক্কা খেয়ে খানিকটা পিছিয়ে পড়েন সাইফুল শেখ। মুহূর্তের মধ্যে তিনি ছেলেটির দিকে ফিরে এক চড় বসিয়ে দেন। তারপর ক্ষোভে গর্জে ওঠেন—
-"অসভ্য ছেলে! রাস্তা-ঘাটে দেখে চলাফেরা করতে পারো না? মেয়ে মানুষের সাথে ফুর্তি করতে করতে যাচ্ছো, বয়স্ক মানুষ চোখে পড়ে না তোমার?"
বলেই তিনি ছেলেটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সাবার হাত ধরে স্কুলের ভেতরে ঢুকে পড়েন।
ওরহান হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, গালে হাত চেপে ধরে। মুহূর্তে কী ঘটে গেল, সে বুঝে উঠতে পারে না। তার চোখে ধরা পড়ে না কোনো রাগ, বরং অবিশ্বাস। ঠিক তখনই রিয়া ওরহানের কাঁধে হাত রাখে। তার স্পর্শে হুঁশ ফিরে পায় ওরহান। রিয়া নরম গলায় বলে—
-"দোস্ত, মুরব্বী মানুষ... ভুল করে ফেলেছে। ছেড়ে দে ব্যাপারটা।"
ওরহান চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় উত্তর দেয়—
-"কীভাবে ছেড়ে দিই বল? সামান্য একটা ধাক্কায় উনি আমাকে কষে চড় মারলেন, তার ওপর আমার চরিত্র নিয়েও কথা তুললেন! তুই তো জানিস, যদি ভুল করি আমি সরি বলি, কিন্তু অন্যায়ের দায় বিনা কারণে মাথা পেতে নিই না আমি।"
রিয়া একটু দুশ্চিন্তায় কপাল কুঁচকে বলল—
-"তাহলে এখন কি করবি? মুরব্বী মানুষটার সাথে মারামারি করবি নাকি?"
ওরহান মাথা নেড়ে বলে—
-"না, তেমন কিছু না।"
রিয়া চোখ বড় করে তাকিয়ে জানতে চায়—
-"তাহলে? কি করবি?"
ওরহানের চোখে ঝিলিক ওঠে—
-"যে আমাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে, তাকেও প্রকাশ্যে অপমানিত হতে হবে... ব্যস।"
এই বলে সে দৃঢ় পায়ে সেই দিকেই হাঁটা ধরল। রিয়া পেছনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই ছেলের রাগ, প্রচণ্ড আর অসীম। না জানি রাগের বশে কী করে বসে!