ফিরে দেখা

পর্ব - ৫

🟢

সেদিনের পর থেকে সোহা আর কখনোই ওরহান খানদের সঙ্গে কোনো মিটিংয়ে অংশ নেননি। হেড অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, সমস্ত কার্যক্রম যেন ম্যানেজার পর্যায়েই সম্পন্ন হয়। কারণ, এখন থেকে তিনি নতুন কিছু প্রজেক্টে মনোযোগ দিতে চান। যেহেতু তিনি এই ব্রাঞ্চের সিইও, তাঁর সিদ্ধান্ত হেড অফিস বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করেছে।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই মাস। এই সময়ে একবারের জন্যও সোহার সঙ্গে ওরহানের দেখা হয়নি। সমস্ত অফিসিয়াল যোগাযোগ, চুক্তি ও আনুষ্ঠানিকতা সামলেছেন ম্যানেজার সাহেব নিজেই। ইতোমধ্যে খান কোম্পানির সঙ্গে ভেলভেট ব্লুমের সকল চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। আর মাত্র সাত দিন পর ভেলভেট ব্লুমের পুরো টিম স্থানান্তরিত হবে মূল অফিসে। এ উপলক্ষ্যে এক জাঁকজমকপূর্ণ বিদায় ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনার দায়িত্বে রয়েছে দেশের অন্যতম খ্যাতিমান ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান, যারা কর্পোরেট ও অভিজাত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় সুবিখ্যাত। আজ তাদের সঙ্গেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং নির্ধারিত রয়েছে। সোহা, মিরহা ও সূর্য ইতোমধ্যেই কনফারেন্স রুমে অপেক্ষমাণ।

অবশেষে, বহুল প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্ত এসে উপস্থিত। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দলের প্রধান এবং তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী সভাকক্ষে প্রবেশ করলেন। মিরহা দ্রুত উঠে সৌজন্যমূলক হাসিতে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ভিতরে নিয়ে এলেন। তারা বসতেই মিরহা পরিচয় করিয়ে দিল—

—"ম্যাম, এই হচ্ছেন তীব্র নীল চৌধুরী এবং উনার পিএ, মিস্টার আকাশ আহমেদ। তাঁরা এসেছেন TNC Event Management থেকে। আমাদের এই ইভেন্টের মূল পরিকল্পক ও পরিচালক হলেন মিস্টার তীব্র নীল, যিনি একইসঙ্গে এই কোম্পানির ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যান। আর মিস্টার চৌধুরী, তিনি বাংলাদেশের ব্রাঞ্চ সিইও। আর এই হলেন আমাদের সিইও, মিস নেসলিহান সোহা।"

তীব্র নীল সম্মানসূচক ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালেন।

হাত বাড়িয়ে বলেন—

-"নাইস টু মিট ইউ, মিস সোহা।"

সোহা মৃদু হাসিতে হাত বাড়িয়ে জবাব দিলেন—

-"ইটস মাই প্লেজার টু মিট ইউ, মিস্টার চৌধুরী। একজন প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট ব্যক্তিত্বকে সামনাসামনি পেয়ে আমি অভিভূত। আমি ধারণা করেছিলাম, প্রথম মিটিংয়ে কেবল আপনার প্ল্যানিং টিম আসবেন, আপনি থাকবেন চূড়ান্ত চুক্তির সময়।"

তীব্র হালকা হাসিতে বললেন—

- "আমি সব কিছু নিজের তত্ত্বাবধানেই করতে পছন্দ করি। বিশেষ করে নতুন কিংবা আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট হলে, নিজে উপস্থিত না থাকলে যেন পরিপূর্ণতা আসে না। তবে একটা কথা বলব? আমি ভেবেছিলাম আপনি বিদেশি, কিন্তু আপনি তো খাঁটি বাঙালি!"

সোহা মাথা নোয়ালেন—

-"জ্বি, আমি বাঙালি। প্যারিসে পড়াশোনা করেছি, কাজও করেছি কয়েক বছর। শুরুতে আমাদের কোম্পানিতে আমি ডিজাইনার হেড হিসেবে যোগ দিই। এরপর অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে আমাদের পদোন্নতি হয়। মূলত এই বাংলাদেশের শাখাটি পরিচালনার জন্যই আমাদের প্রস্তুত করা হয়েছিল।"

তীব্র মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। তারপর হালকা হাসিতে বললেন—

-"হুম, বুঝলাম। তবে একটা প্রশ্ন করতে পারি? ম্যাম, আপনার পদবি নেই?"

সোহা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। মুখে যেন এক অনুচ্চারিত বিষাদের ছায়া। তীব্র তা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন—

-"সরি, সম্ভবত আমি সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছি।"

সোহা ধীর ও শান্ত কণ্ঠে বললেন—

-"না, ঠিক আছে। আমার কোনো পদবি নেই। যেটা ছিল, সেটা আমি নিজেই ত্যাগ করেছি... Let’s get back to work."

-"ইয়াহ, সিওর। তাহলে বলুন, আপনারা কেমন ডেকোরেশন থিম ভাবছেন?"

সোহা দৃঢ় গলায় বললেন—

-"সব কিছুই হবে বাঙালি ঐতিহ্যের ছোঁয়ায়। আমাদের কোম্পানি আন্তর্জাতিক হলেও, আমরা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। আমাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো,এই দেশের ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। আমাদের অতিথিরা, ক্লায়েন্ট, পার্টনার,সবাই যাতে এই দেশকে এক ঝলকে চিনে নিতে পারেন।"

তীব্র মাথা নাড়লেন—

-"চমৎকার! তাহলে আমরা এই থিম নিয়ে পরিকল্পনা করি এবং পরবর্তী মিটিং-এর দিন চূড়ান্ত করি?"

-"জী, অবশ্যই।"

তীব্র উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই বললেন—

-"তবে আজ বিদায় নয়, খুব শিগগিরই আবার দেখা হবে।"

সোহা সৌজন্যমূলক হাসিতে সাড়া দিলেন।

TNC ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের সঙ্গে সেই দিনের মিটিংটি সেখানেই শেষ হয়।

এরপর সোহা আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে ফেললেন, ভবিষ্যৎ প্রজেক্টগুলোর সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে পরিকল্পনা গুছিয়ে নিলেন।

.

ফিরে দেখা গল্পের ইমেজ - নওরিন ইথিকা

.

ওসমান আজ এসেছে শিফাকে ভার্সিটি থেকে নিয়ে যেতে। শুনেছে, শিফা নাকি একটি ছোটখাটো এক্সিডেন্ট করেছে। গাড়ি থামিয়ে ভার্সিটির সামনে পৌঁছাতেই ওসমানের চোখে পড়ে, এক স্নিগ্ধ সুন্দরী মেয়ে শিফাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির পরনে আকাশি রঙের থ্রি-পিস, চোখ দুটো টানা টানা, গায়ের রং ফর্সা, দেখলেই মুগ্ধ হতে হয়। বয়সে শিফার কাছাকাছি হবে।

ওসমান দ্রুত এগিয়ে যায়। শিফার কপালে ব্যান্ডেজ। মুখে একটু ফ্যাকাসে ভাব। বন্ধুদের সঙ্গে বিদায় নিয়ে বেরোনোর সময় হঠাৎ পা পিছলে ইটের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় সে। মাথায় চোট পায়। দুর্ভাগ্যক্রমে বন্ধুরা তখন অনেক আগেই চলে গিয়েছিল। এই অপরিচিত মেয়েটি, যার নাম তখনও অজানা, পথে যেতে যেতে শিফাকে পড়ে থাকতে দেখে, দ্রুত তাকে ধরে উঠে বসায়, চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায় মেডিক্যালে, সেখান থেকে সঠিক যত্নও করে।

শিফার মুখ থেকে সব শুনে ওসমান মেয়েটির দিকে তাকায়। সে তখনও মাথা নিচু করে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একফালি লাজুক হাসি।

ওসমান কোমল কণ্ঠে বলল—

-"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। যদি কিছু মনে না করেন, আপনার নামটা জানতে পারি?"

মেয়েটি চোখ তুলে সরল স্বরে বলল—

-"নওশিন সাবা । ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও নিশ্চয়ই এটাই করত।"

ওসমান মাথা নাড়ে—

-"না, সবাই করে না। মানুষ অনেক ছিল, কিন্তু কেউ তো এগিয়ে আসেনি। আপনি এসেছিলেন। এজন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ। ও হ্যাঁ, আমি পরিচয় দিইনি। আমি ওসমান খান শান্ত। আর উনি আমার ছোট বোন, ওয়াজিহা খান শিফা।"

"ওসমান খান শান্ত... ওয়াজিহা খান শিফা...."

নাম দুটি যেন মুহূর্তেই বাজে সাবার কানে। সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে থাকে। মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে যায়। চোখে ঝিলিক মিশ্র আবেগের।

তারপর নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে—

-"ওরহান খান শাহির কি আপনার বড় ভাই?"

ওসমান ও শিফা দুজনেই চমকে ওঠে। একে অপরের চোখে বিস্ময় মেশানো প্রশ্ন খোঁজে। ওসমান ধীরে উত্তর দেয়—

-"হ্যাঁ, আপনি আমার ভাইকে চেনেন?"

সাবার ঠোঁটে তিক্ততার ছায়া ফুটে ওঠে। গলার স্বর কেঁপে ওঠে—

-"হ্যাঁ, চিনব না আবার? যেই মানুষটা কয়েক বছর আগে আমার কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে... তাকে চিনব না?"

এই বলে নওশিন সাবা শিফাকে ছেড়ে, এক রিকশায় উঠে নির্দ্বিধায় চলে যায়। ওসমান ও শিফা নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। কী হলো, কেন হলো, কোনো কিছুই তাদের বোধগম্য হয় না। নওশিন সাবা যেন হঠাৎ করে কোনো হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের এক পৃষ্ঠা ছিঁড়ে চলে গেল।

ওসমান আপন মনে বিড়বিড় করে উঠল—

-"এই মেয়েটা দাদাভাইকে চেনে কীভাবে? ‘কলিজা ছিঁড়ে নিয়েছে’ বলল... মানে? নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে। আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে।"

শিফা ওসমানের কনুই ধরে মুচকি হেসে বলল—

-"কি হলো, মেজদাভাই? এত ভাবছো কেন? মেয়েটাকে চিনলে নাকি? আর সে দাদাভাইকে চেনে কিভাবে?"

ওসমান অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল—

-"জানি না.... চল, বাড়ি চল। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে তো আর কিছু বের হবে না।"

এই বলে দুজনে ধীর পায়ে রওনা দিলো বাড়ির পথে। পেছনে পড়ে রইল নওশিন সাবা নামের এক রহস্যময় ছায়া, যার সাথে জড়িয়ে আছে কোনো এক অতীতের না-বলা গল্প...

.

.

.

মিরহা ও সোহা অফিস থেকে বের হয় রাত ঠিক আটটার দিকে। শহরের ব্যস্ততা তখনও কমেনি, তবে সারাদিনের ক্লান্তির ছায়া চারদিকে ধীরে ধীরে নেমে এসেছে। দু’জন দুই পথ ধরে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেয়। সোহার জীবনে ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটা যেন কেবলই অতীতের একটি অধ্যায়, যেখানে পুরোনো মুখগুলো এখন কেবলই স্মৃতির আবছা রেখা, কোনো সংযোগ আর নেই বললেই চলে।

মিরহা বাড়ি ফিরে আসে। আজ ভাড়ার নির্ধারিত দিন। একটু বিশ্রাম নিয়ে, নিজেকে সামলে নিয়ে, নিচে বাড়িওয়ালার ফ্ল্যাটে যায়। দরজায় কড়া নাড়তেই সাবা দরজা খুলে দেয়, চিরচেনা সেই হাসিমাখা মুখে। ভদ্রভাবে সে মিরহাকে ভেতরে নিয়ে আসে, সোফায় বসতে দেয়।

কিছুক্ষণ পরেই সাইফুল শেখ এসে মিরহার পাশে বসেন। মিরহা ভদ্রতাবশে সালাম দেয়। সাইফুল শেখ সালামের উত্তর নেন—

-"কেমন আছেন, মিস মিরহা?"

-"জ্বি আঙ্কেল, ভালো। আপনি কেমন আছেন?"

-"এই তো, মোটামুটি ভালোই।"

ঠিক সেই মুহূর্তেই, নিলুফার বেগম হাতে ট্রে করে নাস্তা নিয়ে এসে হাজির হন। ট্রে নামিয়ে তিনি মিরহার বিপরীতের সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়েন। মৃদু হাসি মুখে, কণ্ঠে স্নেহের সুরে জানতে চান—

-"তোমার বাড়িতে কে কে আছেন, মা?"

-"বাবা, মা, ছোট ভাই আর এক বোন আছেন, আন্টি।"

-"তারা এখনো চট্টগ্রামেই থাকেন?"

-"জ্বি আন্টি, ওখানেই। পার্বত্য এলাকার বাইরে তারা বেশিদিন থাকতে পারেন না।"

-"ও আচ্ছা!"

একটুখানি নীরবতা নেমে আসে। তারপর সেই নীরবতা ভেঙে মিরহা আবার জানতে চায়—

-"আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে তো শুধু আপনি, আঙ্কেল আর সাবা থাকেন? সাবার কোনো ভাইবোন নেই?"

নিলুফার বেগম এক মুহূর্ত চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে বলেন—

-"আছে। আমাদের বড় একটা মেয়ে ছিল।"

-"তিনি কি আপনাদের সাথে থাকেন না?"

প্রশ্নটা করতেই নিলুফার বেগমের মুখে মুহূর্তেই মলিনতা ছায়া ফেলে। চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রুর চিকচিকে জলরেখা। সাইফুল শেখও মাথা নিচু করে ফেলেন। চারপাশে হঠাৎ যেন এক নিঃশব্দ ভারী নীরবতা নেমে আসে, যে নীরবতার ভার অনুভব করে মিরহা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। হাতে ধরা চায়ের কাপটি আস্তে করে টেবিলে নামিয়ে রাখে। কণ্ঠ নিচু করে, মৃদুভাবে বলে—

-"সরি আন্টি। হয়তো বেশি কিছু জেনে ফেলার চেষ্টা করলাম... দয়া করে ক্ষমা করবেন।"

ঠিক তখনই পাশ থেকে সাবা এসে রূঢ় স্বরে বলে ওঠে—

-"ওনাদের কোনো বড় মেয়ে নেই। চার বছর আগেই মা*রা গেছেন।"

সাইফুল শেখ কড়া গলায় ধমক দেন—

-"সাবা!"

-"চেঁচিও না বাবা। তুমি নিজ হাতে তোমার বড় মেয়েকে মে*রে ফেলেছো।"

নিলুফার বেগম চুপচাপ অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকেন। তার কান্নার শব্দ যেন নিঃশব্দ অথচ ছলছল করা এক আর্তনাদ। মিরহার বিস্ময় আর দুশ্চিন্তার সীমা থাকেনা। মাত্র কিছুক্ষণ আগেও যাকে মৃ*ত বলা হলো, তাকেই তো বলা হচ্ছিল 'আমাদের সাথে থাকে না', সবকিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির মধ্যে অস্বস্তির বাতাবরণ স্পষ্ট টের পায় সে।

দ্রুত সাবার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে সাইফুল শেখকে উদ্দেশ্য করে বলে—

-"থামুন, আংকেল। আমি সাবাকে নিয়ে যাচ্ছি। আজ রাতটা ও আমার সাথেই থাকুক। আপনারা একটু বিশ্রাম নিন।"

কোনো অপেক্ষা না করেই সাবার কাঁধে হাত রেখে মিরহা তাকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসে। নীরবতার ভারে ভারাক্রান্ত বাড়ির বাতাস। সাইফুল শেখ ধীরে ধীরে স্ত্রীকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যান। নিলুফার বেগম কান্নায় হেঁচকি তুলে ফেলেন। সাইফুল শেখ স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বলেন—

-"কেঁদো না। আমাদেরই ভুলে আমরা আমাদের মেয়েকে হারিয়েছি। আল্লাহ চাইলে একদিন আবার তাকে ফিরে পাবো।"

.

ফিরে দেখা গল্পের ইমেজ - নওরিন ইথিকা

.

সোহা ধীর পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটছে। আজ ইচ্ছে করেই গাড়ি আনেনি সে। কেন যেন চারপাশটা ভারী লাগছে, অন্তরজুড়ে নেমে এসেছে এক নিঃসীম বিষণ্ণতা। এই জীবন আর ভালো লাগে না তার। এক সময় ছিল,সব ছিল। ভরপুর জীবন, স্বপ্নে রাঙানো ভবিষ্যৎ, আপন মানুষদের স্পর্শ। আর আজ? সে নিঃস্ব। একা। নিজের কষ্টের হিসাব মিলাতে মিলাতে অন্যমনস্কভাবে হাঁটছে সোহা।

ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ কারও এক বলিষ্ঠ বক্ষের সঙ্গে গিয়ে ধাক্কা খায় সে। এতটাই শক্ত ধাক্কা যে মাথায় হালকা ব্যথা অনুভব করে। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখতে পায়, ওরহান।

তার কপাল কুঁচকে আছে। চোখেমুখে স্পষ্ট রাগের ছায়া। চাহনিতেই যেন আগুন জ্বলছে।

সোহা তাকে এক ঝলক দেখে চোখ সরিয়ে নেয়। বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে যায়, যেন এই লোকটির অস্তিত্বই নেই তার জন্য। কিন্তু ওরহান তা মেনে নিতে পারে না।

এক ঝটকায় সোহার কব্জি ধরে টেনে নিয়ে আসে নিজের দিকে। তারপর কোমরে শক্ত করে জড়িয়ে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। আচমকা এই টান আর জোরে চেপে ধরা, সব মিলিয়ে সোহার কাঁধে একপ্রকার যন্ত্রণা টের পায় সে।

ওরহানের বলিষ্ঠ বাহুর স্পর্শে আরও রাগে ফুঁসে ওঠে সোহা। চোখেমুখে ক্রোধের ঝড়, তবুও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ধস্তাধস্তি করতে থাকে।

ওরহান এখনও তার ডান হাতের কব্জি ধরে রেখেছে। আর অপর হাতে কোমর জড়িয়ে রেখেছে দৃঢ়ভাবে।

এই অসহায়তা আর অসহ্যতা সহ্য করতে না পেরে সোহা অবশেষে গর্জে ওঠে—

-"সমস্যা কী? এইভাবে ধরার মানে কী? আমার বাড়ির রাস্তায় আপনি করছেনটা কী ঠিক?" স্বরে ক্ষোভ আর অপমানের তীব্র ঝাঁজ।

ওরহান সোহার কথাগুলো যেন কানেই তুলল না। গলার স্বর ছিল দৃঢ়, ভারী, এবং জোরালো—

-"আজ কত দিন ধরে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছি, কিন্তু তুমি দেখা দিচ্ছো না! কেন আমাকে এড়িয়ে চলছো? কেন ইগনোর করছো আমাকে?"

সোহা রাগে ফুসে উঠল।

-"কেন দেখা করব? ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে তো আপনার যোগাযোগ হয়েছে, না? আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তো সমস্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তাহলে আর কী কারণে আপনার সঙ্গে আমার দেখা করা প্রয়োজন?"

ওরহান ঠান্ডা কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—

-"তোমার সঙ্গে দেখা করতে কি এখন কারণের দরকার পড়ে?"

সোহা তার কথায় একটুও পিছু হটল না। সোজা চোখে তাকিয়ে বলল—

-"অবশ্যই দরকার পড়ে। আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক ছিল, তা ছিল শুধুই পেশাগত। সেই সম্পর্কও এখন শেষ। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।"

ওরহান এবার আরও কঠিন স্বরে বলল—

-"তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমাদের সম্পর্ক কেবল পেশাগত ছিল না। ছিল আরও অনেক কিছু।"

সোহা ফেটে পড়ল। ওরহানের শক্ত বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল—

-"আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। চার বছর আগেই সব শেষ হয়ে গেছে।"

সোহার কণ্ঠে ছিল নিঃসংশয় কঠোরতা, চোখে ধিক্কারের ঝলক।

ওরহান নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। সেই চোখে তাকিয়ে রইল নিস্পন্দ, নির্নিমিষে। সব শেষ? চার বছর আগে সোহা সবকিছু শেষ করে দিয়েছে? কিন্তু ওরহান তো কখনো শেষ করেনি। এই চার বছর সে উন্মাদ হয়ে খুঁজেছে সোহাকে, রাস্তায়, শহরে, স্বপ্নে, নিঃশ্বাসে। তার হৃদয়ে তো কোনো পরিসমাপ্তি ঘটেনি। বরং সেই অনুভবই তাকে আজও টেনে এনেছে এখানে।

হঠাৎই সে সোহার কোমরে আরও শক্ত করে বাহু জড়িয়ে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। সোহার শরীর শিউরে উঠল সেই স্পর্শে। ঘৃণা যেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ল। সে থরথর কণ্ঠে বলে উঠল—

-"ছাড়ুন আমাকে। ঘেন্না লাগছে আপনার স্পর্শে! গা জলে যাচ্ছে আমার, ছাড়ুন! আপনি অন্যের বাকদত্তা। সেই অবস্থায় কীভাবে অন্য এক নারীকে স্পর্শ করছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে।"

সোহার চেষ্টা ছিল প্রবল। সে ছাড়িয়ে নিতে চায় নিজেকে ওরহানের শক্ত বন্ধন থেকে, কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হয়। তার শরীরের প্রতিবাদ যেন ভেঙে পড়ে ওরহানের শক্তির সামনে।

ওরহান শেষমেশ ছেড়ে দিল, তবে পুরোপুরি নয়। কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিলেও ডান হাতের কব্জি এখনো শক্তভাবে ধরে রেখেছে সে।

একটানা টেনে নিয়ে যেতে থাকল সোহাকে নিজের গাড়ির দিকে। মুখে তার কণ্ঠ ছিল নিঃসঙ্গ অথচ দৃঢ়—

-"আমি কোনো পরনারীকে স্পর্শ করিনি, নীলশ্যামা। আমি ছুঁয়েছি আমার একান্ত নারীকে। তোমাকে। তোমার প্রতি আমার অধিকার আছে, সেটা তুমি জানো। এই অধিকার আমাকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন। তুমি চাইলেও অস্বীকার করতে পারবে না।"

গাড়ির দরজা খুলে সোহাকে পাশের সিটে বসিয়ে দিল সে। তারপর নিজে গিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে। সোহা দরজা খুলে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতেই ওরহান খপ করে তার হাত চেপে ধরল।

এবার এক হাতে সোহার কব্জি ধরে রাখল, অন্য হাতে ড্রাইভিং করতে লাগল। সোহার চেষ্টা থেমে নেই, তবু দুর্বল শরীরে, শোচনীয় ক্লান্তিতে সে পেরে উঠছে না। ওরহানের শক্তির বিপরীতে তার সমস্ত প্রতিবাদ যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

একটি নির্জন, নিরিবিলি স্থানে গাড়ি থামায় ওরহান। চারদিক নিস্তব্ধ, নীরব প্রকৃতির ছায়ায় ঢাকা। জনমানবশূন্য সেই স্থান, চারপাশে ঘন গাছপালা, আর সামনেই এক গভীর খাদ।

ওরহান ধীরে গাড়ি থেকে নেমে আসে। তারপর সোহাকে সাবধানে ধরে নামিয়ে আনে। সোহার শরীর ছটফট করছে। মুখে আগুন ঝরছে, চোখে ঝড়।

ওরহান বারবার থামাতে চায় তাকে। বুঝাতে চায় কিছু, কিন্তু সোহা একবিন্দু শুনতেও নারাজ। বাধ্য হয়ে কণ্ঠ একটু কঠোর করে বলে ওঠে—

-"চুপ । শান্ত হও সোহা! অন্তত আমার কথা তো শোনো। এত উত্তেজিত হচ্ছ কেনো? আমাকে কিছু বলার সুযোগ তো দাও!"

কিন্তু সোহা এবার যেন খেপে ওঠা বাঘিনীতে রূপ নেয়। দাঁতে দাঁত চেপে, চোখে বিদ্বেষ জ্বালিয়ে বলে ওঠে—

-"কি শুনবো আপনার? কেনো এনেছেন আমাকে এখানে? কি বলার থাকতে পারে এখন আপনার? যা বলার, যা করার, চার বছর আগেই করেছেন আপনি। আজ আপনার কোনো কথা শোনার এক বিন্দু ইচ্ছেও নেই আমার।"

ওরহান হতচকিত। কিছুতেই সোহাকে থামাতে পারছে না সে। এই রূপ, এই আগুন সে কখনো দেখেনি সোহার চোখে। সেই নরম, নত মেয়েটি আজ যেন আগুনে পাথর। সে ভাবতে থাকে, একি শুধুই তার ভুলে? নাকি এই চার বছরে কোনো অজানা দহন আরও পুড়িয়েছে তাকে?

ভেতরে ভেতরে টাল খেতে থাকে ওরহান। সে জানে, এখন কথা দিয়ে নয়, কিছু অনুভব দিয়ে সোহাকে থামাতে হবে।

অবশেষে, এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে ওরহান এগিয়ে এসে সোহাকে নিজের বুকে টেনে নেয়, কোনো রূঢ়তায় নয়, এক ধরনের বেদনাভেজা আবেগে। তারপর, এক নিঃশ্বাসে, সমস্ত দোটানা উপেক্ষা করে নিজের অধর রাখে সোহার অধরে। রক্তিম চুম্বনদ্বার ছুঁয়ে দেয় সোহার অধর, প্রতিটি কাঁপনে উচ্চারিত হয় এক নিঃশব্দ অধিকার।

সোহা প্রথমে বোঝেই না কী হচ্ছে! তার পুরো শরীরটা থেমে যায়। নিঃশ্বাস আটকে আসে। চোখ বিস্ফারিত হয়ে থাকে এক অবিশ্বাসের ঘোরে। তার হৃদয়ের গতি অসামঞ্জস্য হয়ে ওঠে। মনে হয় চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, শুধু গুমরে ওঠা এক দীর্ঘশ্বাস শব্দ করছে ভিতরে ভিতরে।

কয়েক মুহূর্ত কেটে যায়। তারপরই বাস্তবতার ঝাঁপটা এসে পড়ে সোহার মুখে। সে হঠাৎ করে ধাক্কা দেয় ওরহানকে। দূরে সরিয়ে নেয় নিজেকে। আর ঠিক পর মুহূর্তে তার চোখে আগুন ঝরে পড়ে, সে সজোরে ওরহানের গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।

ঘটনার তীব্রতায় মুহূর্তটি জমে যায়। ওরহানের মুখে ব্যথা নয়, বরং এক চিলতে হতবাকের ছায়া। সোহার চোখে জ্বলে ওঠে বিদ্রূপ আর তীব্র অপমানবোধ।

Story Cover