ফিরে দেখা

পর্ব - ৪০

🟢

আজ খান বাড়িতে এক অন্যরকম সকাল। চারদিকে যেনো উল্লাসের ঢেউ বয়ে চলেছে। গৃহের প্রতিটি কোণ আজ দীপ্ত হয়ে উঠেছে উৎসবের আলোয়। কারণ আজ খান বাড়ির বড় সন্তান, ওরহান খান শাহীরের জন্মদিন। তারিখ—৯ জানুয়ারি। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ সে পা রেখেছে তেতাল্লিশতম বছরে। এই একটি দিনকে ঘিরেই আজ আলোকিত হয়ে উঠেছে খান বাড়ির প্রতিটি প্রাঙ্গণ, প্রতিটি নিঃশ্বাস।

ওরহান নিজে সাধারণত জন্মদিনের কোনো আড়ম্বর ভালোবাসে না। কিন্তু আজ সন্তানদের অশেষ জেদের কাছে সে হার মানতে বাধ্য হয়েছে। সন্তানের অনুরাগী আহ্বান যেনো তাঁর হৃদয় গলিয়ে দিয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি দিতে হয়েছে এই আয়োজনের জন্য।

ফলে খান বাড়ি আজ যেনো রূপ নিয়েছে এক রাজপ্রাসাদে। ঝলমলে আলোর মালা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। নকশি করা কাপড়ে সাজানো প্রাঙ্গণ, ফুলের মালায় মোড়ানো বারান্দা ও বাগানের প্রতিটি পথ যেনো নিজস্ব গল্প বলে যাচ্ছে। ভেতরে পা রাখলেই মনে হয়, সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্য, ভালোবাসার বন্ধন আর আনন্দঘন উচ্ছ্বাস মিলে গড়ে তুলেছে এক অবিস্মরণীয় পরিবেশ।

বাতাস ভরে আছে খুশির গুঞ্জনে। কোথাও শিশুদের কোলাহল, কোথাও অতিথিদের হাসি আর আড্ডার ঢেউ। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সুগন্ধি মসলার আবেশ, যেনো রন্ধনও এই উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রাসাদের মতো সেই বাড়িতে প্রতিটি মুহূর্তে ঝলমল করছে অতিথি-অভ্যর্থনার মহিমা।

আজকের এই আয়োজন শুধু একটি জন্মদিনকে ঘিরে নয়, বরং খান বাড়ির সব ভালোবাসা, ঐক্য আর নিঃস্বার্থ আবেগের প্রকাশ। মনে হয় যেনো সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে, সকলেই সাক্ষী সেই মহোৎসবের, যেখানে হাসি, আলো আর হৃদয়ের টান মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক অমোঘ আকর্ষণ।

.

.

.

রাত নামতেই খান বাড়ি উৎসবের আলোয় ঝলমল করে উঠল। অতিথি–অভ্যর্থনার দায়িত্বে সামনের দরজায় দাঁড়ালেন ওমর খান। তাঁর পাশে ওয়াহিদ খান, অতিথিদের নিয়ে প্রাণখোলা গল্পে মেতে উঠলেন। ভেতরে সুরাইয়া বেগম আর আয়রা বেগম টেবিল গোছানো ও পরিবেশনের কাজে ব্যস্ত। নিলুফার বেগম ফুলের সাজসজ্জা ও আলোয় শেষ মুহূর্তের নজর দিচ্ছেন। ওসমান দৌড়াদৌড়ি করছে কখনো ক্যামেরা হাতে, কখনো কেক কাটার প্রস্তুতিতে। হঠাৎ মারুফ খেপিয়ে বলল—

-"মেঝদাভাই তোমার বিয়ে নাকি আজ? বরবেশে সেজেছ কেনো?"

সাথে সাথেই মুফতি যোগ করল—

-"একদম যা বলেছিস। দেখছিস না একটু পর পর বউয়ের খোঁজে রান্না ঘরে উঁকি দিচ্ছে।"

মারুফ হো হো করে হেসে উঠল।

সাবা রান্না ঘর থেকে খাবার এনে টেবিলে রাখছিল। দেবরদের কথা শুনে গম্ভীর মুখে বলল—

-"তোমাদের বয়স হয়েছে, তবু বাচ্চাদের মতো খোঁচাখুঁচি ছাড়ো না!"

ওসমান ভুরু কুঁচকে জবাব দিল—

-"বয়স তো তোমার স্বামীর হয়েছে, আমার নয়। আমি এখনো ইয়াং স্টার!"

সাবা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে কোমরে দুই হাত রেখে বলল—

-"আর আমার স্বামীটা কে শুনি?"

ওসমান জ্বিভ কামোর দিলো। পাশে পায়েল এসে দাঁড়িয়ে বললো—

-"মেঝদাভাই কি অন্য মেয়েকে পটানোর জন্য এই রূপ নিয়েছ আজ?"

কেয়াও সাথে তাল মিলিয়ে বলল—

-"হুম বলো বলো!"

ওসমান সাবার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে রক্তচুক্ষ নিয়ে তাকিয়ে আছে। দ্রুত পায়ে বউয়ের কাছে এসে বলল—

-"এই দুস্তুগুলো আমাদের শান্তিতে পার্টি করতে দিবে না বউ। তুমি ওদের কথা ধরো না।"

সাবা আড়চোখে তাকিয়ে কুনুই দিয়ে গুতা দিলো পেটে।

মারুফ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল—

-"শান্তিতে পার্টি মানে শ্মশানঘর। আমাদের জন্যই তো আসর জমে।"

মুফতি আবার খোঁচা দিল—

-"ঠিকই বলেছিস। তবে আজকে কেক কাটার পর সাবাই সাবার চোখে নজর দে। দেখি কাকে আগে খাইয়ে দেয়।"

সাবা লাল মুখে বলল—

-"মুফতি ভাই! এত বাজে মজা বাদ দাও।"

তবু সবাই হেসেই চলল। অতিথিরাও মজা পাচ্ছিলেন, যেন তিন ভায়েরা আর তাদের স্ত্রীর খুনশুটি উৎসবেরই অংশ হয়ে উঠেছিল।

.

.

.

ওরহান আজ বেজায় ব্যস্ত, তার আদরের রাজকন্যাকে সাজিয়ে দিতে। কোমল আঙুলে মেয়ের চুল গুছিয়ে বেঁধে দিচ্ছে । পাশে দাঁড়িয়ে যমজ পুত্র আয়নার সামনে ভঙ্গি করছে। যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে বাবা, ছেলে আর মেয়ে মিলেমিশে তৈরি হচ্ছে নতুন দিনের জন্য।

এ রীতি তাদের প্রতিদিনের। ভোর হলে ওরহান নিজ হাতে সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। কোথাও বেড়াতে গেলে বা উৎসবের দিনে, তিনজনের সাজগোজের কাজটুকু সেই করেন। অফিসের সময় বাদে ওরহানের সমস্ত জীবনটাই সন্তান আর সোহাকে ঘিরে, তাদের ভালোবাসাতেই তার পূর্ণতা।

আজ তিনজনের সাজে মিলেছে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য। সবাই পরেছে কালো পোশাক।

ওরহান, কালো থ্রি-পিস স্যুটে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে। ফর্সা গায়ে কালোর ছায়া আরও দীপ্তি এনেছে। ঘন দাড়ি তাঁর মুখশ্রীকে পরিণত করেছে আরও গম্ভীর, অথচ কোমল। ঘনো পাপড়িওয়ালা চোখ, চিকন গোলাপি ঠোঁট, আর লম্বা নাকের রেখায় জ্বলজ্বল করছে প্রৌঢ় সৌন্দর্য।

ছেলে, বাবার মতো স্যুট পরেছে। শ্যামলা রঙে কালো পোশাক যেন আরও তীক্ষ্ণতা এনেছে। ডাগর চোখে কিশোরসুলভ দীপ্তি, চিকন পাতলা ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলে বেড়াচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই নিয়ে খেলা করছে, মাঝে মাঝে বাবার মতো ভঙ্গি করে হাসির কারণ হচ্ছে। মেয়ে, যমজ হলেও ভাইয়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একদম বাবার ফটোকপি। ফর্সা মুখে কালো ফ্রক যেন চাঁদের গায়ে রাতের ছায়া। ঘন পাপড়িওয়ালা চোখে ঝলমল করছে কোমল দীপ্তি। চিকন গোলাপি ঠোঁট আর লম্বা সরু নাক তার মুখশ্রীতে এক অনবদ্য সৌন্দর্য এঁকে দিয়েছে। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আয়নার এক ফ্রেমে ফুটে উঠেছে দুটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি।

ছেলে-মেয়েকে পরিপাটি করে সাজিয়ে অবশেষে ওরহান পার্টিতে এসে দাঁড়ালো। সোহা তখনও ব্যস্ত, কখনো সাজসজ্জার দিকে খেয়াল রাখছে, কখনো খাবারের আয়োজন সামলাচ্ছে। আসলে ওরহানের জন্মদিন উদযাপনের পুরো পরিকল্পনাটাই ছিল সোহার। কিন্তু সেই সত্যটা ওরহান জানেই না। ছেলে-মেয়েকে দিয়ে কৌশলে সোহাই তাকে রাজি করিয়েছিল এই আয়োজনের জন্য। ওরহান যখন নামলো, তখন পুরো পরিবেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। একসাথে সবাই তাকে ঘিরে ধরলো। ব্যবসায়িক বন্ধুরা এগিয়ে এসে খোঁজখবর নিতে লাগলো। আর সেই ফাঁকেই কৌতূহলী হয়ে ওরহানের সন্তানদের নাম জানতে চাইল তারা।

হালকা হাসি মুখে ওরহান উত্তর দিলো—

-"ওরা যমজ। বয়স দশ বছর। মেয়ের নাম উমাইজা ফিহা খান, আর ছেলের নাম উমায়ের ফাহীন খান।"

কথাটা শোনার পর উপস্থিত সবার চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক। যমজ হলেও যেনো মায়ের ছায়া লেগে আছে ছেলের মুখে, আর বাবার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট মেয়ের চেহারায়। মুহূর্তেই দু’জনকে নিয়ে প্রশংসার ঢেউ উঠলো।

ঠিক তখনই পরিবেশ আরও সরব করে ঢুকে পড়লো ওরহানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোনো বন্ধুদের দল, তানভীর, সিয়াম, রিয়া, নিশাত, আর তানভীরের স্ত্রী স্নেহা। একে একে তারা ওরহানকে শুভেচ্ছা জানালো। স্নেহা হেসে সোহাকে খুঁজে নিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, আর বাকি সবাই মেতে উঠলো ওরহানের সঙ্গে অতীত স্মৃতিচারণায়।

সিয়াম মৃদু হাসি দিয়ে বলল—

-"অনেক যুদ্ধ করে অবশেষে সোহাকে পেলি তবে।"

রিয়া চটজলদি যোগ করল—

-"পাবেই তো! সত্যিকার ভালোবাসা কখনো হারে না।"

তানভীর ওরহানের কাঁধে চাপড় দিয়ে বলল—

-"দেখছিস না, এখন দুই বাচ্চার বাপ আমাদের ওরহান।"

সবাই হেসে উঠলো। হাসির রেশ মিলিয়ে যেতেই ওরহান একটু থেমে দূরের দিকে তাকালো। তার চোখ আটকালো, সোহার ওপর। ব্যস্ততা সামলে দাঁড়িয়ে আছে সে, গম্ভীর অথচ স্নিগ্ধ আলো ছড়ানো মুখে। আর তার একটু দূরেই ছোটাছুটি করছে যমজ সন্তানরা, নীলাভ্রোর সঙ্গে খেলা করছে প্রাণভরে।

সেই দিকে তাকিয়ে ওরহানের ঠোঁটে ফুটে উঠলো গভীর তৃপ্তির হাসি। কণ্ঠে যেনো আস্থার দীপ্তি নিয়ে সে বলল—

-"জীবনে যত কষ্ট, যত যুদ্ধই করেছি, আমার আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি পুরস্কার দিয়েছেন।"

বন্ধুরা নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য। যেনো তার প্রতিটি শব্দের ভেতর থেকে ভেসে এলো জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের গন্ধ, আবার ভেসে এলো অশেষ প্রাপ্তির শান্ত সুর। এভাবেই হাসি, খুনসুটি আর স্মৃতিচারণার ভেতর দিয়ে চলতে থাকলো পার্টির আবহ। চারপাশে আলো ঝলমলে সাজ, মানুষের উল্লাস আর অন্দরমহলে অদৃশ্য এক আবেগের ঢেউ, সব মিলিয়ে জন্মদিনের সেই রাত যেনো হয়ে উঠলো এক অবিস্মরণীয় নাট্যমঞ্চ।

.

.

.

রাতের খাবার শেষ, মানুষেরা বসে আছে গল্পগুজবে, চারপাশ মৃদু আলোর স্নিগ্ধতায় ভেজা, গুঞ্জন হালকা, কোথাও কোথাও হাসির ঝলক। পার্টির বাতাস এবার ধীরে ধীরে সরে আসে শান্ততার দিকে, ঠিক সেই নরম মুহূর্তে সোহার কণ্ঠ ভেসে উঠে, নরম অথচ দৃঢ়—

-"আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আজ আমার স্বামীর তেতাল্লিশতম জন্মদিনে আসার জন্য। তিনি বরাবরই জন্মদিন পালনে উদাসীন। বরং তার কাছে জন্মদিন মানেই এক বিরক্তি। তার কথা হচ্ছে— 'দুনিয়াকে ঘটা করে কেন জানাতে হবে আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি?'

আজ সেই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে চাই। হে, স্বামী মহাশয়, আপনি মোটেও বুড়ো নন। আপনি এখনো সেই পঁচিশ বছরের তাগড়া যুবক রয়ে গেছেন, যাকে দেখে প্রথম আমার ভেতরে প্রজাপতি উড়ার অনুভূতি অনুভব হয়েছিল। দশ বছরের সংসারের পরও আজ যখন আপনাকে দেখি, তখনো আমার মনে হয় প্রথম দিনের সেই অনুভূতি, যেন নতুন করে আপনাকে খুঁজে পাই।

তাই, আপনার জন্য আমার সন্তানদের পক্ষ থেকে, আমার পক্ষ থেকে, আর খান বাড়ির সবার পক্ষ থেকে আমরা একটি বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করেছি।"

কথা শেষ করেই সোহার হাতের ইশারায় মুহূর্তে দোতলার বারান্দা থেকে সাদা পর্দা গড়িয়ে পড়লো। আলো নিভে গেল চারদিকে, আর হঠাৎই সেই পর্দায় ভেসে উঠলো এক আবেগঘন দৃশ্যপট—

সাদা পর্দায় ভেসে উঠেছে ওরহান। তাকে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট দুই নবজাতককে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অবসন্নতা, তবু চোখে অদ্ভুত আলো। পর্দার ভেতর থেকে ভেসে আসছে সোহার কণ্ঠ—

-"আমাদের জীবনের সমস্ত যুদ্ধ, সংগ্রাম ও ভালো কর্মের ফল হিসাবে আল্লাহ আমাদের ওদের দিয়েছে।"

কথাটি শুনে ওরহান তখন তৃপ্তি নিয়ে সোহার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়েছিল।

পরবর্তীতে পর্দায় ভেসে উঠলো উমাইজা ও উমায়েরের প্রথম হাটা। শিশু উমাইজা আর উমায়ের হাঁটতে শিখছে। ওরহান দু’হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চারা টলতে টলতে দৌড়ে এসে বাবার বুকে পড়ে যাচ্ছে। সেই দৃশ্যে ভেসে আসে শিশুদের হাসি, আর ওরহানের কণ্ঠ—

-"এসো আমার যোদ্ধারা, বাবার বুক সবসময় তোমাদের জন্য খোলা।"

পরবর্তীতে পর্দায় ভেসে উঠলো পারিবারিক খুনশুটি। রান্নাঘরে ওরহান, সোহা আর দুই সন্তান একসাথে রান্না করছে। ময়দা মাখতে গিয়ে বাচ্চারা বাবার মুখে মাখিয়ে দিচ্ছে, আর সবাই হেসে উঠছে। সোহা অপার্থিব কোমলতায় সন্তানদের দিকে তাকিয়ে আছে।বুক ভরে যায়, চোখের কোণে জমে ওঠে আনন্দের ঝিলিক। আত্মনিবেদনে স্বামীর দিকে তাকানোয় ফুটে ওঠে ভরসা, কৃতজ্ঞতা আর সারাজীবনের সঙ্গী হিসেবে নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। চোখের ভাষায় যেন বারবার বলে ওঠে—"তোমরা আমার সর্বস্ব, তোমাদের হাসির জন্যই আমার বেঁচে থাকা।" পর্দায় সাবটাইটেল ভেসে ওঠে—

-"সুখ মানে বড় কিছু নয়, ছোট্ট হাসি, ছোট্ট মুহূর্ত।"

ওরহান সোহাকে আগলে নিলো। অন্য হাতে বাচ্চাদের আগলে নিলো। কপালে আলতো চুমু খাচ্ছে। দুজনের চোখে নীরব ভালোবাসার ভাষা। ভেসে আসে ওরহানের কণ্ঠ—

-"তুমি যদি পাশে থাকো, তবে পৃথিবীর কোনো যুদ্ধই আমাকে হারাতে পারবে না।"

চারজন একসাথে, বাগানের সবুজ ঘাসে বসে, আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছে। শিশুরা বাবার কাঁধে উঠে "আমাদের হিরো" বলে ডাকছে। পর্দায় লেখা ভেসে ওঠে—

-"এটাই আমাদের আসল গল্প— ভালোবাসার, সংগ্রামের, আর প্রাপ্তির।"

পরবর্তীতে সাদা পর্দায় ভেসে উঠলো বাড়ির বাগান। ওরহান লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে, অভিনয় করছে যেন সে সেনাপতি। চারপাশে বাচ্চারা কাঠের তলোয়ার হাতে চিৎকার করছে। ওমর খান হেসে ডাকলেন—

-"এইবার যুদ্ধ শেষ করো, সেনাপতি! নইলে আমার নাতি নাতনিরা তোমাকে বদ করে ফেলবে।"

ওরহান তার বাবার পাশে এসে বলল—

-"জীবনে তো আমাকে হারাতে পারো নি তাই এখন আমার ছেলে-মেয়ে ও ভাতিজাকে ট্রেইন করছ নাকি?"

ওমর খান তিন নাতি নাতনীর গালে চুমু খেয়ে বললেন—

-"একদম ঠিক ধরেছো।"

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

পরবর্তীতে ভেসে উঠলো রান্নাঘরের খুনশুটি। রান্নাঘরে সোহা, সাবা, কেয়া, পায়েল, আয়র বেগমা আর সুরাইয়া বেগম লুচি ভাজছে। ওরহান চুপিচুপি ঢুকে একটা লুচি চুরি করে মুখে দিলো। সাবা সাথে সাথে বলল—

-"দাদাভাই! চুরি করার স্বভাব এখনো গেলো না তোমার? সব তো টেবিলে নিয়েই যাবো।"

ওরহান লুচি খেতে খেতে বলল—

-"চুরি করা জিনিসের মজাই আলাদা সাবা রানি।"

ওসমান হেসে বলল—

-"এই হচ্ছে আমাদের বড় ভাই! এবার তোমরা বুঝেছো আমাদের গুরু কে?"

সোহা চুপ করে মাথা নাড়তেই সবাই হেসে ফেলে।

পরবর্তীতে ভেসে উঠলো দাদা নাতিদের মুহূর্ত। ওয়াহিদ খান উঠোনে বসে আছেন, হঠাৎ নীলাভ্র তার কাঁধে চড়ে বসলো। ঠিক তখনই ওরহান এসে বলল—

-"চাচা, এবার ঘোড়াটাকে আমি চালাবো।"

ওয়াহিদ খান জোরে হাসলেন—

-"আমি তো বুড়ো ঘোড়া, আমার বদলে তুমি-ই টগবগ করে ছুটো।"

ওরহান সঙ্গে সঙ্গে নীলাভ্রকে নিজের কাঁধে তুলে নিল। তারপর তার উদ্দেশে বলল—

-"চলো চাম্প তোমাকে পৃথিবীর সেরা ঘোড়ার সফর করাবো।"

একদিন পরিবারের সবাই বসে গল্প করছিল। মুফতি ও মারুফকে শুরুতে কেউ আলাদা করতে পারত না।মুফতি আর মারুফকে নিয়ে মজা করছে সবাই। হঠাৎ ওরহান ঢুকে বলল—

-"আমি কিন্তু শৈশব থেকে বুঝতাম, কে মারুফ আর কে মুফতি।"

পায়েল খিলখিলিয়ে বলল—

-"আমরা তো এখনো মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলি।"

কেয়া যোগ করলো—

-"হ্যাঁ, শুরুতে তো মুফতির বদলে মারুফকে ভরসা করে সব বলতাম।"

ওরহান মজা করে কপালে হাত দিয়ে বলল—

-"তাহলে আমার ভাইদের হাতেই সংসারের প্রথম ঝামেলা শুরু হয়েছে!"

পরবর্তীতে সাদা পর্দায় ভেসে উঠলো খোলা ছাদ। সবাই মিলে বসে আছে। শিশুরা আকাশের তারার দিকে আঙুল তুলে বলছে—

-"ওই তারাটা আমাদের বাড়ি।"

ওরহান আলতো স্বরে উত্তর দিলো—

-"হ্যাঁ, ওই তারাটাই আমাদের খান পরিবারের আলো। আমার আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার।"

তারপর সোহার দিকে তাকিয়ে আস্তে যোগ করলো—

-"আর তুমি সেই আলোকে ধরে রেখেছো। তোমাদের জন্যই আমি আমি।"

পর্দায় শেষ লাইন ভেসে ওঠে—

-"ওরহান, তুমি একজন বেস্ট সন্তান, ভাই, স্বামী আর সব শেষে শ্রেষ্ঠ পোতা। আমাদের সকলের গর্ব।"

আলো আবারও নিভে গেলো। ওসমানের কন্ঠে ভেসে এলো—

-"দাদাভাইয়ের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ যাকে যোগ না করলে আমাদের সবার জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।এ

পর্দায় ধীরে ধীরে ভেসে উঠলো সাদা–কালো ছবি।

একটি আঙিনায় শিফা বসে আছে, খিলখিলিয়ে হাসছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওরহান। দুজনের চোখে–মুখে নিখাদ ভালোবাসা আর বন্ধন। শিফার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—

-"দাদাভাই তুমি যদি পাশে থাকো, আমি কোনোদিন একা নই।"

ওরহানের গলায় শোনা গেল আবেগভরা উত্তর—

-"তুই শুধু আমার বোন না শিফা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।"

এরপর ফুটেজ বদলালো—

শিফা রান্নাঘরে চুরি করে ওরহানের প্লেটে মাছের টুকরো তুলে দিচ্ছে। হেসে বলছে—

-"তোমার পছন্দের না দিলে তো খাবার স্বাদই নেই।"

ওরহান হাসিমুখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

এক মুহূর্তের জন্য পর্দা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে শিফার ছবি মিলিয়ে গেল আলোর ভেতর।

শেষে লেখা ভেসে উঠলো—

-"শিফা, এই পরিবারে তোমার হাসি এখনো বাজে, তোমার জায়গা এখনো খালি। তোমাকে সবাই এখনো ভালোবাসে। তোমার কথা রাখতে কেউ কাঁদে না।"

পর্দা থেকে নামলো এক ফোঁটা অশ্রুর মতো আলো। ওরহানের চোখে জল জমে উঠলো। সোহা তার হাত শক্ত করে ধরলো। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু নিঃশব্দ আবেগ ছড়িয়ে পড়লো সবার হৃদয়ে।

ভিডিও শেষ। আলো জ্বলে উঠলো, আর উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো। সোহার চোখে জল, বাচ্চাদের মুখে উচ্ছ্বাস, আর ওরহান নিজের চোখের অশ্রু লুকাতে পারলো না। ওরহানের চোখ ভিজে উঠেছে। অশ্রু টলমল করছে দাড়ির ভেতর। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, যেনো নিজেকে খুঁজে পেল গত দশ বছরের প্রতিটি স্মৃতিতে।

ঠিক তখনই উমাইজা দৌড়ে এসে বাবার হাত ধরে বলল—

-"আব্বু, তুমি আমাদের সুপারম্যান।"

উমায়ের যোগ করলো—

-"আর আমাদের সেরা বন্ধু।"

সোহা নীরবে পাশে দাঁড়ালো। পরিবারের সবাই একে একে ওরহানের গায়ে হাত রাখলো। সেই মুহূর্তে চারপাশে হাসির শব্দ মিলিয়ে গেল, মনে হলো যেন পুরো পরিবেশই এক অদৃশ্য আবেগে ডুবে গেছে। ওরহান আস্তে বলল—

-" আমার আল্লাহ... আমি যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি দিয়েছেন আমাকে।"

.

.

.

পার্টি শেষ। একে একে সবাই নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। খান বাড়ি ধীরে ধীরে আবার সেই চেনা নীরবতায় ঢেকে গেল। চারপাশে এক ধরনের শান্ত স্নিগ্ধতা নেমে এলো, যেনো দিনের সমস্ত উচ্ছ্বাস, হাসি আর কোলাহল ধীরে ধীরে নিভে এসে এখন শুধু স্মৃতির মতো ভাসছে।

ওরহান তখনো তার বাবা, চাচা আর ভাইদের সঙ্গে বসে গল্প করছিল। অন্যদিকে, গৃহিণীরা প্রতিদিনের অভ্যস্ত ছন্দে কাজ শেষ করছিলেন। কেয়া ও পায়েল মিলে বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। সব দায়িত্ব সেরে সবাই একসাথে বসলো, আর কিছুক্ষণের জন্য গল্পে মেতে উঠলো।

গল্পের মাঝেই আচমকা ওমর খান কণ্ঠ উঁচু করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তার কণ্ঠে এক ধরনের গাম্ভীর্য, যেনো ভেতরে অনেক ভেবেচিন্তে তিনি কথা বলছেন—

-"ওরহান, তুমি আর সোহা তো কোনোদিনই সেভাবে কোথাও ঘুরতে যেতে পারোনি। সেবার গেলে আর... শিফার সঙ্গে কত বড় অঘটন ঘটে গেল!"

কথাটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের পরিবেশ যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। বাতাসে অদৃশ্য এক চাপা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউ যেন সহজে শ্বাস নিতেও পারছিল না। সবাই এক মুহূর্তের জন্য চুপ মেরে গেল।

ওমর খান নিজেকে সামলে নিলেন, চোখে ছিল পিতার স্নেহ আর প্রজ্ঞার দীপ্তি। তিনি ধীরে ধীরে আবার বললেন—

-"তোমাদের জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে। তাই এবার আমি নিজেই ব্যবস্থা করেছি। তোমাদের দুজনের জন্য তুরস্কের টিকিট বুক করেছি। আগামীকাল ভোরেই তোমরা রওনা দেবে। পনেরো দিনের জন্য, শুধু তোমরা দুজন!"

কথা শেষ হতেই ওরহান অস্থির কণ্ঠে প্রশ্ন করলো—

-"বাবা, উমাইজা আর উমায়ের?"

ওমর খান মৃদু হেসে স্নেহমাখা স্বরে আশ্বস্ত করলেন—

-"তাদের নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। আমি নিজেই ওদের সব বুঝিয়ে বলেছি। তুমি ভুলে যাচ্ছ, তারা তোমার সন্তান। অল্প বয়সেই ওরা অনেক বোঝদার হয়েছে। আমাদের সঙ্গে থাকলে তাদের কোনো সমস্যা হবে না। আর মাত্র পনেরো দিনের তো ব্যাপার।"

তার কথা শেষ হতেই বাড়ির সবাই যেন একযোগে সোহা আর ওরহানের দিকে তাকালো। চোখেমুখে ঝলমল করছিল ভালোবাসার আলো। সবার কণ্ঠ মিলে একসঙ্গে উচ্চারণ করলো—

-"তোমাদের এবার যেতেই হবে। এতদিন তোমরা শুধু দায়িত্ব আর সংগ্রামের ভেতর ডুবে ছিলে। এবার নিজের জন্য, নিজেদের দুজনের জন্য সময় দাও।"

ঘরের বাতাসে তখন নতুন এক আবেগ ভেসে উঠলো। বিস্ময়, আনন্দ আর এক অদ্ভুত প্রত্যাশার আলোয় ভরে উঠলো খান বাড়ির শান্ত পরিবেশ। মনে হচ্ছিল, আজ রাতের এই নীরবতা আসলে এক নতুন যাত্রার প্রারম্ভ।

রাত গভীর। সোহা সুটকেস নামিয়ে কাপড় গুছোচ্ছিল। তার হাত বারবার কেঁপে যাচ্ছিল উত্তেজনায়। পাশে বসে ওরহান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলো, চোখেমুখে বিস্ময় আর আনন্দ মেশানো প্রশান্তি।

ওরহান ধীরে বললো—

-"সোহা, বিশ্বাস হচ্ছে? আমরা সত্যিই যাচ্ছি!"

সোহা মৃদু হেসে উত্তর দিলো—

-"আমারও যেন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। এত ব্যস্ততার মাঝে আমরা নিজেদের সময়ই দিতে পারি নি।"

ওরহান তার হাতটা চেপে ধরে বললো—

-" হ্যাঁ ঠিক বলেছ। এবার কোনো অঘটন হবে না। এই ভ্রমণ শুধু আমাদের দুজনের জন্য। শুধু আমরা।"

সোহা চোখ নামিয়ে নরম স্বরে বললো—

-"হ্যাঁ। যেই সময় আমাদের নিজেদের দেওয়ার কথা ছিল, তখন আমরা একে অন্যের পাশে ছিলাম না। এইবার শুধু আপনি আর আমি।"

ওরহান উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল সোহাকে। বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল—

-"আর কোনো বাধা আসবে না আমাদের জীবনে।"

.

.

.

ভোরের আবছা আলোয় উমাইজা আর উমায়ের দৌড়ে এল ঘরে। বাবা-মাকে ব্যাগ গুছোতে দেখে তারা খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো।

উমাইজা উজ্জ্বল চোখে বললো—

-"আম্মু, আব্বু! আমরা খুব খুশি যে তোমরা যাচ্ছো। দাদুভাই আমাদের সব বলছে কাল।"

উমায়ের দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো—

-"আমাদের নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না। আমরা দাদুর সঙ্গে থাকবো। রাজত্ব করবো একেবারে। বোনকেও আমি দেখে রাখবো!"

সোহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো—

-"সত্যি বলছো উমায়ের? তোমাদের কষ্ট হবে না? বোনকে আগলে রাখতে পারবে?"

উমায়ের মাথা নাড়লো—

-"না আম্মু, কষ্ট কেন? এটা তো মাত্র পনেরো দিনের জন্য। আমরা চাই তোমরা আনন্দ করো, হাসিখুশি হয়ে ফিরো। আর নীলাভ্র ভাই আছে তো। আমরা দুই ভাই মিলে বোনকে দেখে রাখবো।"

উমাইজা মজা করে যোগ করলো—

-"তবে একটা শর্ত আছে। প্রচুর ছবি তুলতে হবে, আর ফিরেই আমাদের গল্প শোনাতে হবে।"

ওরহান হেসে ছেলে মেয়েকে কোলে নিয়ে চুমু খেয়ে বললো—

-"আচ্ছা। তোমরা লক্ষ্য বাচ্চা হয়ে থাকবে কেমন। ভাইয়াকে জ্বালাবে না প্রিন্সেস।"

উমাইজা ও উমায়ের বাবার দুই গালেই চুমু দিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো।

সোহা দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বললো—

-"আমাদের ভাগ্য ভালো, তোমরা আমাদের সন্তান।"

হাসিতে ভরে গেল ঘর। সন্তানদের এই বোঝদার আচরণে সোহা আর ওরহানের হৃদয় হালকা হয়ে গেলো।

ভোরের কুয়াশায় খান বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হয়েছে। সবার চোখে একসাথে ঝলমল করছে ভালোবাসা।ওমর খান এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন—

-"স্মৃতি নিয়ে ফিরো, দুঃখ নয়। এই যাত্রা তোমাদের জীবনের নতুন সূচনা হয়ে উঠুক।"

ওরহান বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ওরহান ভাইদেরও জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলো। সোহা শাশুড়ি, মা বোন, জাদের জড়িয়ে ধরলো, চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ। গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হাত নাড়লো। বাতাসে তখনো ভেসে আসছিল শিশুদের কণ্ঠ—

-"আম্মু, আব্বু! ভালো করে ঘুরে এসো!"

খান বাড়ির উঠোনে তখন মিশে ছিলো দোয়া, ভালোবাসা আর প্রত্যাশার স্রোত, যেনো এই ভ্রমণ শুধু ওরহান আর সোহাকে নয়, পুরো পরিবারকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে।

.

.

.

ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে নামার মুহূর্তে সোহা উচ্ছসিত হয়ে ওরহানের বাহু আঁকড়ে ধরে বলল—

-"হীর দেখুন, আমরা সত্যিই চলে এসেছি! কত সুন্দর শহর! আমি কি স্বপ্ন দেখছি?"

ওরহান হাসলো, লাগেজ ঠেলতে ঠেলতে স্ত্রীর দিকে মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো—

-"তুমি যদি স্বপ্ন দেখো, তাহলে আমিও তোমার সঙ্গে একই স্বপ্নে আছি।"

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই শহরের আলো, ব্যস্ত সড়ক, গরম কফির গন্ধে সোহা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। ট্যাক্সির জানালা দিয়ে সে একনাগাড়ে সবকিছু দেখছিল। মাথাটা জানালার ভেতরে ঢুকিয়ে ওরহানের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"কত সুন্দর! আমি সবকিছু দেখতে চাই, কিছু বাদ যাবে না।"

ওরহান তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বললো—

-"তাহলে শুরু হোক আমাদের প্রেমের নতুন সফর।"

ওরহানরা রাতেই হোটেলে চেক-ইন করে নিলো। দীর্ঘ পথের ভ্রমণে ক্লান্ত শরীর, তাই হালকা পাতলা খাবার খেয়েই শুয়ে পড়ল দুজনেই। ঘুম নেমে এলো যেন শরীরের প্রতিটি শিরায় বিশ্রামের এক নরম ছায়া ঢেলে দিয়ে।

পরদিন সকালে সূর্যের কোমল আলো যখন জানালার ফাঁক গলে ঘরে প্রবেশ করলো, তখন তারা তৈরি হয়ে বের হলো শহর ঘুরে দেখতে। ইস্তানবুলের সকাল যেন অন্য এক জাদুতে মোড়া, কোথাও আজানের ধ্বনি, কোথাও ব্যস্ত সড়কের গুঞ্জন, আবার কোথাও নীল আকাশের নীচে রঙিন কফিশপের অলস গন্ধ।

নাস্তা করে তারা বেরিয়ে পরলো বসফরাসের উদ্দেশে। নৌকা ভ্রমণ করবে যারা। বসফরাসের বুক চিরে নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে। চারপাশের জলরাশি নীল আভায় ঝিকমিক করছে, দূরে ঝলমলে সেতু আর ঐতিহাসিক প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে। বাতাস যেন সমুদ্রের গোপন সুর বয়ে আনছে, আর সেই বাতাসেই সোহার চুল উড়ে উঠলো। সে হঠাৎ মৃদু স্বরে বললো—

-"এই নদীটা কেমন জানেন? আমার মনে হয়, এর বুকের প্রতিটি ঢেউ কোনো না কোনো প্রেমের গল্প বয়ে নিয়ে চলেছে।"

ওরহান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললো—

-"হয়তো ঠিকই বলছো। তবে আজ এই নদী আমার কাছে একটাই গল্প শোনাচ্ছে, তুমি আর আমি।"

সোহা হেসে মাথা কাঁপালো। তার চোখে ঝিলিক খেলে গেল, যেনো বাতাসের সঙ্গেই দুষ্টুমি করছে।

-"তাহলে আমাদের ভালোবাসা কি এই নদীর স্রোতের মতো? অবিরাম, থামাহীন?"

ওরহান মৃদু হেসে তার হাত চেপে ধরলো।

-"হ্যাঁ, ঠিক তাই। আর যতদিন এই স্রোত বয়ে যাবে, ততদিন আমাদের ভালোবাসাও অটুট থাকবে।"

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। নীল জলে দুলে উঠলো আলোছায়ার খেলা, বাতাস থেমে গিয়ে যেন তাদের কথোপকথনকেই শোনার চেষ্টা করলো। সোহা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, যেনো কিশোরী বয়সের নির্মল উচ্ছ্বাস আবার ফিরে এসেছে। সেই হাসি ভাসতে লাগলো বসফরাসের জলে, আর ওরহানের চোখে ফুটে উঠলো এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা, যা শুধু ভালোবাসাই বুঝতে পারে।

সারাদিন নৌকায় ঘুরেছে ওরহান ও সোহা। বসফরাসের নীল জলরাশি, দূরের প্রাসাদ আর সেতুগুলো যেন প্রতিটি মুহূর্তে তাদেরকে নতুন কোনো স্বপ্নে ডেকে নিচ্ছিল। বাহিরেই সেরেছে সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার। খোলা আকাশের নিচে, বাতাসের মৃদু স্পর্শে সেই খাবারের স্বাদ যেন ভিন্ন এক আনন্দে ভরে তুললো তাদের দিন। বিকেলে তারা আশেপাশে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করলো, রাস্তার ধারে ছোট্ট কফিশপের গন্ধ, ব্যস্ত মানুষের চলাফেরা, দোকানের কোলাহল, সবই যেন অন্য এক জগতের অভিজ্ঞতা। অবশেষে ক্লান্ত পায়ে হোটেলে ফিরে এলো তারা। সামনে তো আরও পনেরো দিনের দীর্ঘ যাত্রা, ধীরে, সময় নিয়ে প্রতিটি শহর ঘুরে দেখার প্রতিজ্ঞা করেছিল দু’জনে।

পরের দিন সকালে সোহা ও ওরহান বেরিয়ে পড়লো হাজিয়া সোফিয়া আর ব্লু মসজিদ-এর উদ্দেশ্যে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন তারা হাজিয়া সোফিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো, সোহা থমকে গেল। বিশাল স্থাপত্য তার চোখকে অভিভূত করে তুললো। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি প্রথমে ছিল চার্চ, পরে মসজিদ, আবার জাদুঘর, আর এখন আবার মসজিদ, এই দীর্ঘ ইতিহাস যেন দেয়ালের প্রতিটি ইটে খোদাই হয়ে আছে। উঁচু গম্বুজটা আকাশকে ছুঁয়ে গেছে, চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিনারগুলো গাম্ভীর্যের প্রতীক।

ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো যেন সময়ের স্রোত উল্টে যাচ্ছে। মার্বেলের মেঝেতে প্রতিফলিত আলো, দেওয়ালের সূক্ষ্ম মোজাইক, অদ্ভুত নীরবতা, সবকিছু মিলিয়ে সোহা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো। ওরহানের হাত শক্ত করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললো—

-"এত বড়, এত সুন্দর... আমি হারিয়ে যাচ্ছি হীর!"

ওরহান তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো—

-"তুমি হারিয়ে গেলে আমি আবার তোমায় খুঁজে আনবো। কারণ তুমি আমার সব।"

সোহা চোখ নামিয়ে নরম স্বরে হেসে উঠলো। তারপর ধীরে বললো—

-"আপনি পাশে থাকলে আমি আর কিছুতেই হারাই না, বরং খুঁজে পাই নিজেকে।”

ওরহান তার আঙুলগুলো সোহার আঙুলের ভাজে দিয়ে শক্ত করে ধরলো। তারপর সোহার সামনে এসে দাড়িয়ে আবেদনময়ী কন্ঠে বলল—

-"তুমি জানো সোহা, এ পৃথিবীর প্রতিটি সৌন্দর্য আমার কাছে ফিকে, যদি তোমাকে না পাই। হাজিয়া সোফিয়ার গম্বুজও ম্লান হয়ে যাবে, যদি তোমার হাসি চোখে না দেখি।"

সোহা বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললো—

-"আপনি এমন কথা বললে আমার মনে হয়, আমি আপনার বুকের ভেতরেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলি। আপনার ভাষ্যমতে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য আমার কাছে তুচ্ছ।"

ওরহান মৃদু হেসে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো—

-"তুমি আমার প্রার্থনার উত্তর, আমার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র স্থাপত্য।"

সোহা ভেতরে ভেতরে আবেগে ভরে গেল, চোখে ঝিলিক নেচে উঠলো। তাদের কথাগুলো যেনো প্রাচীন দেয়াল আর গম্বুজে প্রতিধ্বনিত হলো, ইতিহাসের গভীরে মিলেমিশে গেল।

হাজিয়া সোফিয়ার প্রতিটি কোণ তারা ঘুরে ঘুরে দেখলো। আয়তন এত বড়, সৌন্দর্য এত গভীর যে প্রতিটি জায়গায় থেমে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কখনো তারা গম্বুজের নিচে দাঁড়িয়ে রইলো, কখনো মোজাইক ছবির দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলো, আবার কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে ইস্তানবুলের দৃশ্য দেখলো।প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগে গেল হাজিয়া সোফিয়া ঘুরে দেখতে। তারপর তারা হেঁটে চলে গেল সুলতান আহমেদ মসজিদে, যা ব্লু মসজিদ নামে বিখ্যাত।

মসজিদের ছয়টি মিনার দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল, যেনো আকাশের দিকে ছুটে গেছে। ভেতরে ঢুকে সোহা মুগ্ধ হয়ে গেল, দেয়ালে নীল রঙের অসংখ্য টাইলসের কারুকাজ, গম্বুজের নিচে ছড়ানো আলো, বিশাল আঙিনার প্রশান্তি, সবই যেন আত্মাকে শান্ত করে দিল। ভেতরে ছিল ভিড়, কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝেও এক ধরনের নীরবতা, এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ। ওরহান নরম স্বরে বললো—

-"এখানকার প্রতিটি টালি, প্রতিটি নকশা যেন ইবাদতের ভাষায় কথা বলে।"

সোহা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উত্তর দিলো—

-"হ্যাঁ, এখানে দাঁড়ালে মনে হয় হৃদয়টাই অন্যরকম হয়ে যায়... যেন সবকিছু পবিত্র।"

প্রায় দুই ঘণ্টা তারা ব্লু মসজিদ ঘুরে দেখলো। মাঝে মাঝে থেমে ছবি তুললো, কখনো শুধু দাঁড়িয়ে পরিবেশটা অনুভব করলো। দিনের আলো আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে এলো। সূর্য পশ্চিম আকাশে রঙ ছড়াতে ছড়াতে ডুবে যাচ্ছিল, আর মসজিদের আঙিনায় ছায়া-আলো খেলছিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামার আগেই তারা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু হৃদয় ভরে গেল ইতিহাস, সৌন্দর্য আর অভিজ্ঞতায়। এদিনের ভ্রমণেই কেটে গেল পুরোটা দিন, সকাল থেকে প্রায় সাত ঘণ্টা তারা হারিয়ে ছিল এই দুই বিস্ময়ের ভেতর।

হোটেলে ফিরে সোহা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই যেনো এখনো তার সামনে ভেসে উঠছিল বিশাল গম্বুজ, রঙিন টাইলস আর সেই প্রাচীন দেয়ালের গম্ভীর সৌন্দর্য।

পরের দিন সকালবেলা তারা রওনা হলো ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত গ্র্যান্ড বাজারের উদ্দেশ্যে। শহরের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন বাজার যেন এক জীবন্ত গোলকধাঁধা, চোখ ধাঁধানো গম্বুজ, আঁকাবাঁকা সরু পথ আর রঙিন দোকানের সারি। প্রবেশদ্বারেই মশলার তীব্র ঘ্রাণ, কারুকাজ করা তুর্কি কার্পেটের ঝলক, রঙিন কাচের ঝাড়বাতির আলো মিলে যেন স্বপ্নলোকের এক দ্বার উন্মুক্ত করলো। ভেতরে ঢুকতেই সোহা একেবারে চঞ্চল পাখির মতো ছুটে চললো এক দোকান থেকে আরেকটিতে। চোখের দৃষ্টিতে যেন শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। সে প্রতিটা জিনিষ হাতে নিয়ে ওরহানকে বলছে—

-"হীর এটা নিন, ওটা নিন! উমাইজা আর উমায়েরের জন্য এই জুতোটা কেমন হবে? ওই নীল কাচের নেকলেসটা দারুণ না?"

ওরহান পিছনে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসলো। তার চোখে ক্লান্তির চেয়ে ভালোবাসার স্রোত বেশি। খানিকটা ঠাট্টার সুরে বললো—

-"তুমি কি আমাকে বাজারের খচ্চর বানাতে চাও? আমার হাত দুটো তো এখন থেকেই ব্যাগে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে!"

সোহা দুষ্টুমি ভরা ভঙ্গিতে থেমে গেলো, তারপর মায়ামাখা চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো—

-"আপনি তো আমার খচ্চর নন, আপনি আমার নায়ক। আর নায়কেরই কাজ নায়িকার সব ইচ্ছে পূরণ করা।"

ওরহান ভুরু কুঁচকে কৃত্রিম বিরক্তির ভান করলো, তবে ঠোঁটের কোণে খেলা করা হাসি তার আসল অনুভূতিকে ফাঁস করে দিলো। একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো—

-"তাহলে শুনো নায়িকা, নায়কেরও একটা শর্ত আছে, এত দোকান ঘোরার পর যদি আমার কাঁধে ব্যথা হয়, তবে রাতে তোমাকেই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।"

সোহা লাজুক হেসে মাথা নাড়লো, ঠোঁটে খেললো দুষ্টু ঝিলিক। চারপাশের ভিড়, হাকডাক, মশলার গন্ধ, রঙিন কাপড়ের ঢেউ, সব যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। শুধু তাদের দু’জনের খুনশুটি আর ভালোবাসার নীরব সুর ভেসে উঠলো সেই বিশাল গ্র্যান্ড বাজারের ভিড়ের মাঝখানে।

সোহা এক দোকানে ঢুকে রঙিন সিল্কের ওড়না হাতে তুলে নিলো। নরম কাপড়টা আঙুলে মুড়ে মুড়ে দেখছে, চোখে বিস্ময়ের দীপ্তি—

-"কী সুন্দর! উমাইজা পরলে রাজকন্যার মতো লাগবে।"

ওরহান হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসলো—

-"রাজকন্যা হবে ঠিকই, তবে দাম শোনার পর তোমারই হয়তো হার্ট অ্যাটাক হবে।"

দোকানদার সাথে সাথেই দাম বলে উঠলো। শুনে সোহা অবাক হয়ে বললো—

-"এইটুকু কাপড়ের দাম এত! না না, এটা আমি নেবো না।"

ওরহান হেসে দোকানদারের দিকে তাকিয়ে তুর্কি ভাষায় দরদাম শুরু করে দিলো। কথার লড়াইয়ে কখনো হাত নাড়ছে, কখনো হেসে ফেলছে। শেষে দাম প্রায় অর্ধেক কমিয়ে ফেলে ওড়নাটা হাতে ধরিয়ে দিলো সোহার কাছে।

-"দেখলে? নায়ক শুধু ব্যাগ টানে না, যুদ্ধও করে।"

সোহা হাসি চেপে রাখতে পারলো না। আলতো করে ওড়নাটা ওরহানের গলায় জড়িয়ে দিলো তারপর টুপ করে গালে একটি চুমু দিয়ে বলল—

-"আমার নায়ককে পুরস্কার দিলাম।"

ওরহান চোখ টিপে বললো—

-" আসল পুরস্কারটা রাতে চাই।"

সোহা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো, কিন্তু ঠোঁটে খেললো দুষ্টু হাসি। এরপর তারা গেলো মশলার দোকানে। লাল মরিচ, জাফরান, দারচিনি, এলাচ,। মিলিয়ে যেন রঙের ঝড়। বাতাসে ছড়িয়ে আছে তীব্র গন্ধ, মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। সোহা এক প্যাকেট জাফরান হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিলো।

-" এটা নিলে রান্না কত সুন্দর হবে!"

ওরহান চোখ বড় বড় করে বললো—

-"তুমি রান্না করবে বলে নয়, আমার মনে হচ্ছে এটা কিনলে রান্নাঘরেই আমাকে ঘুমাতে হবে।"

সোহা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো—

-"তাহলে আজ থেকে রান্নাঘরই হবে আপনার রাজ্য।"

ওরহান কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো—

-"তবে রান্নাঘরে যদি তুমি থাকো, আমি রাজা হতে রাজি।"

সোহা হেসে মাথা নাড়লো, আবার নতুন দোকানের দিকে ছুটে গেলো। গ্র্যান্ড বাজারের ভিড়ের কোলাহলে তাদের এই ছোট ছোট খুনশুটি, হাসি আর ভালোবাসার মুহূর্তগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

রাতের হোটেল কক্ষে ফিরে এসেছে তারা। খানিকটা বিশ্রাম নেয়ার পর, বাংলদেশে ফোন কলে দু’ঘণ্টা ধরে কথায় কথায় মিশে রইল। সোহা ফোন রাখতেই ওরহান তাকে সোফা থেকে তুলে পাজাকোলে নিয়ে হেঁটে বিছানার দিকে এগোতে লাগলো।

সোহা চেঁচিয়ে উঠলো—

-"আরে! কি করছেন? নামান, পড়ে যাব !"

ওরহান থেমে সোহার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ধীরসুরে বললো—

-"তোমার ভার বইতে আমি সক্ষম জান। বয়স হয়েছে বুড়ো হই নি যে তোমাকে উঠাতে পারবো না।"

বলতেই সোহাকে বিছানায় ফেলে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে পড়লো ওরহান, তার চোখের অদ্ভুত দীপ্তি, শরীরের নরম ছোঁয়া এক সঙ্গে মিশে গেল। সোহা দুই হাত দিয়ে তার বুক ঠেকালো, চিবুক নামিয়ে চোখে বিস্ময় আর লাজের মিলন—

-"কি করছেন?"

-"আমার পুরষ্কার নিচ্ছি।"

বলেই ওরহান ধীরে ধীরে সোহার হাত ধরে, তার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। লোমশিহরানো স্পর্শ, চুম্বন, মৃদু, গভীর, আবার আগুনে ঝলসানো, দু’জনের নিঃশ্বাস একসাথে মিলিত হলো। সোহা চোখ বন্ধ করে শরীর দিয়ে অনুভব করল, আর ওরহানের হাত আলতো করে চুলের মধ্যে হারালো।

বাতাসে মিলিত হলো হোটেলের নরম আলো, দূরের শহরের শান্তি, আর তাদের হৃদয়ের তীব্র গতি। এই মুহূর্তে সময় যেন থেমে গিয়েছে, শুধু তারা, তাদের স্পর্শ, আর একে অপরের প্রতি অনবরত আকর্ষণ।

পরের দিন তারা রওনা দিলো প্রিন্সেস আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। নীরব সমুদ্র ঘিরে দ্বীপ যেনো গল্পের বই থেকে উঠে আসা এক স্বপ্নরাজ্য। স্নিগ্ধ বাতাসে ভেসে আসে ঘোড়ার টগবগ শব্দ, রাস্তার পাশে ছায়াঘেরা বৃক্ষ, দূরে নীল জলে ভাসমান সাদা পালতোলা নৌকা।তারা সাইকেল ভাড়া করলো। পাথুরে সরু রাস্তায় সাইকেলের ঘণ্টা বাজতে বাজতে সোহা হেসে বলল—

-"দেখুন আমি আপনার চেয়ে দ্রুত যাচ্ছি।"

ওরহান ধীরে সাইকেল চালাতে চালাতে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন—

-"যাও, যতদূর যাও না কেন... আমি শেষ পর্যন্ত তোমার পেছনেই থাকবো।"

আর পরদিন তাঁদের গন্তব্য কাপাডোকিয়া। ভোরবেলায় সূর্যোদয়ের আগে আকাশ যেনো হালকা রঙের ক্যানভাস, একে একে উঠতে থাকে রঙিন গরম বেলুন। সমগ্র আকাশ জুড়ে বেলুনের মেলা, কেউ গোলাপি, কেউ নীল, কেউবা লালচে সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। সোহা দু’হাত মেলে শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে ভেসে উঠলেন—

-"হী র, মনে হচ্ছে আমি উড়ছি।"

ওরহান তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরে মৃদুস্বরে বলল—

-"আমি কখনো ভালোবাসায় বিশ্বাস করি নি। চাইওনি কখনো। এর কোনো ব্যবহারিক মূল্য আমি দেখতাম না, সত্যি বলতে, আমি এর ছাড়া জীবন কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু তারপর আমি তোমাকে দেখলাম। তোমার হাসি, তোমার শক্তি, তোমার বুদ্ধিমত্তা আর করুণা। এমনকি তোমার একগুঁয়ে স্বভাব আর জেদও। তুমি আমার আত্মার সেই খাঁজ পূর্ণ করেছিলে, যা আমি চিরকাল শূন্য ভাবতাম, আর সেই ক্ষতগুলিকে সুস্থ করেছ, যা আমি জানতামও না। তখন আমি বুঝলাম... সমস্যা ভালোবাসায় বিশ্বাস না থাকার নয়। সমস্যার কারণ ছিল, আমি সমস্ত ভালোবাসা তোমার জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম।"

সোহা ছলছল চোখে ওরহানের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হামলে পড়ল ওরহানের বুকে।

.

.

.

রাতে তাঁরা উঠল গুহা-হোটেলে। পাথরের গায়ে সাজানো আলোকিত কক্ষ, মোমবাতির আলোয় সাজানো টেবিল। বাতাসে ভেসে আসছিলো উষ্ণ রুটি ও মসলাদার মাংসের ঘ্রাণ। সোহা এক টুকরো খাবার তুলে দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন—

-"আপনি কি জানেন, আপনাকে ভালোবেসে আমি কতটা ধনী হয়েছি?"

ওরহান চোখ ভিজিয়ে উত্তর দিলেন—

-"তাহলে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ।"

তার পরদিন তাঁদের পথ ধরলো পামুক্কালের দিকে।

দূর থেকে দেখতে সাদা পাহাড় যেনো তুলোর আস্তরণে ঢাকা, বয়ে আসছে উষ্ণ জলধারা। ধাপে ধাপে সাজানো সাদা শিলার গায়ে সূর্যের আলো পড়ে এক অদ্ভুত দীপ্তি ছড়াচ্ছে। সোহা ঝর্ণাধারার মতো নেমে আসা পানিতে ছপছপ করে ওরহানের দিকে জল ছিটিয়ে দিলেন।

-"এই যে! ধরতে পারেন তো ধরুন।"

ওরহান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে শুধু বললেন—

-"তুমিএমনই থাকো সোহা, শিশুর মতো ছটফটে, প্রাণবন্ত। আমি শুধু তোমাকে উপভোগ করি।"

এরপর তাঁদের গন্তব্য আনতালিয়া। সামুদ্রিক বাতাসে ভেসে আসা নোনা গন্ধ, দূরে ফেনায়িত ঢেউ, বালুকাবেলায় ছড়িয়ে থাকা শামুকের খোলস, সব মিলিয়ে এক রহস্যময় সৌন্দর্য। সোহা হঠাৎ খালি পায়ে দৌড়ে গেলেন জলের কিনারার দিকে—

-"আমাকে ধরুন যদি পারেন।"

ওরহান ধীরে হাঁটছিলেন, তাঁর দৃষ্টি সোহা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরলো না।

-"আমি তোমাকে ধরতে চাই না... শুধু দেখতে চাই, তুমি কেমন করে সমুদ্রের মতো স্বাধীন হয়ে ছুটে।"

রাতে তারা সৈকতের বালিতে বসে তারাভরা আকাশ দেখল। সোহা মাথা ওরহানের কাঁধে রেখে ফিসফিস করে বললেন—

-"আমি চাই এই রাত কখনো শেষ না হোক।"

ওরহান তাঁর কানে মৃদুস্বরে উত্তর দিলেন—

-"তাহলে এই রাত আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।"

সোহা মৃদু কন্ঠে বললেন—

-"মানুষ যায়, সময় চলে যায়.. কিন্তু প্রেম? প্রেম কি টিকে থাকে?"

ওরহান ধীরে চোখ নামিয়ে নিলো। সোহাকে নিজের বুকে শক্ত করে ধরে বলল—

-"প্রেম যদি সত্যি হয়, তবে সে ধ্বংসস্তূপেও ফুটে ওঠে।"

সোহা ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো। দুইহাত দিয়ে ওরহানকে আর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল—

-"হীর এই দিনগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।"

ওরহান তাঁর চোখ মুছে দিয়ে নরম কণ্ঠে বললেন—

-"এই ভ্রমণ শেষ নয়, সোহা। আমাদের প্রেমের নতুন অধ্যায়ের শুরু।"

ওরহান সোহার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো চুমু খেয়ে বললো—

-"জীবনের প্রতিটি দিনকে আমরা এভাবেই বাঁচবো, যেনো তা প্রথম প্রেমের মতো।"

ইস্তাম্বুলের আকাশে তখন অর্ধচন্দ্র ঝুলছে। চারপাশে অগণিত আলোর ঝিলিক, শহর যেন স্বপ্নে আঁকা কোনো রূপকথার মঞ্চ। দূরে বসফরাসের বুকের মাঝখানে একাকী দাঁড়িয়ে আছে Maiden’s Tower, নিঃশব্দ, গম্ভীর, অথচ অদ্ভুত মায়ায় ভরা। চারপাশের কালো জলে প্রতিফলিত আলোর নাচন, ঢেউয়ের স্পর্শে বারবার ভেঙে তৈরি করছে এক রহস্যময় ঝিকিমিকি। বাতাসে লবণের গন্ধ, আর দূরের ঢেউয়ের শব্দ মিলেমিশে চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক সুরম্য মায়াবী ছন্দ।

ওরহান ও সোহা আজ সন্ধ্যা এখানে কাটাবে বলে ঠিক করেছে। আজ তাদের শেষ দিন। কাল বাংলাদেশ চলে যাবে তারা। আজ সোহা নীল শাড়িতে যেন আকাশেরই একটি অংশ হয়ে গেছে। হালকা বাতাসে তার আঁচল দুলে দুলে এসে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে ওরহানের গা। হলুদ পাঞ্জাবি পরা ওরহানকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো কবিতার মানুষ, আজ সোহা নীল শাড়িতে, নীরব অথচ আকর্ষণীয়।

ওরহান মুগ্ধ চোখে সোহাকে দেখছিল। দুপা এগিয়ে এসে ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—

-"জানো নীলশ্যামা, আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো ফিরে এসেছে। সেদিনও তুমি ছিলে নীল, আর আমি হলুদ... যেন ভাগ্যই আমাদের রঙ মেলাতে চেয়েছিল।"

সোহা কিশোরীর মতো চঞ্চল ভঙ্গিতে হেসে মাথা কাত করে বলল—

-"তাহলে বুঝি এই রঙেই আমাদের প্রেমের শুরু হয়েছিল? নীল আর হলুদ মিলে যে সবুজ হয়, তেমনি আপনি আর আমি মিলেই এক হয়ে গেছি।"

ওরহান তার হাত ধরে টেনে নিলো কাছে। চোখে চোখ রেখে গম্ভীর সুরে বলল—

-"তুমি সবুজের মতোই, শান্ত, জীবনময় আর আমার অস্তিত্বের আশ্রয়।"

হঠাৎ শিশুসুলভ আবদারে সোহা বলল—

-"এই Maiden’s Tower-এর আলো নিভে যাওয়ার আগে প্রতিশ্রুতি দিন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপনি শুধু আমারই থাকবেন!"

ওরহান মৃদু হাসি দিয়ে তার গাল ছুঁয়ে নিল। আরও কাছে টেনে এনে মোহনীয় কণ্ঠে বলল—

-"প্রতিশ্রুতি দিলাম জান। যতদিন সমুদ্র বয়ে যাবে, যতদিন আকাশে তারা জ্বলবে, ততদিন তুমি আর আমি আলাদা হবো না।"

চারপাশ হঠাৎ থমকে গেল। নিস্তব্ধ রাত যেন তাদের কথাগুলোকে শোনার জন্য থেমে রইল। শুধু সমুদ্রের হালকা ঢেউ আর তাদের মিশে যাওয়া নিঃশ্বাস ভরিয়ে দিল পরিবেশকে। নীল শাড়ি আর হলুদ পাঞ্জাবির রঙ মিশে রাতটিকে পরিণত করল এক অনন্ত প্রেমের আকাশে।

ঠিক তখনই সোহা হঠাৎই ওরহানের হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠল। ওরহান বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কিন্তু মুহূর্তেই সোহা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে। চোখেমুখে এক অভূতপূর্ব দৃঢ়তা।

-"আমি কখনো আপনার কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করিনি। আজ আমি আমার ভেতরের সব কথা আপনাকে জানাবো।"

ওরহান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সোহা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস নিল, তারপর আবার চোখ মেলে সোজা তাকাল ওরহানের চোখে। তার ঠোঁট থেকে বেরোলো বহুদিন জমে থাকা ভালোবাসার স্বীকারোক্তি—

-"আপনার চোখে তাকালে মনে হয়, সমুদ্রের গভীরতাও ম্লান হয়ে যায়। আপনার হাসির আলোয় অন্ধকার রাতও তারার মতো ঝলমল করে। আপনি আমার কবিতার অক্ষর, আমার নিঃশ্বাসের সুর। আপনার নীরবতা আমার হৃদয়ের সবচেয়ে মধুর সঙ্গীত। ভালোবাসা যদি রঙ হতো, তবে আপনিই হতেন সেই চিরন্তন রংধনু। আপনাকে ছাড়া সময় যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকা এক অন্তহীন অপেক্ষা। আপনি এলে পৃথিবী বসন্তের প্রথম ফুলের মতো প্রাণ পায়। আপনার ছোঁয়ায় হৃদয় জেগে ওঠে, যেন শুষ্ক মরুভূমিতে হঠাৎ বৃষ্টি নামে। আপনি আমার প্রথম অনুভূতি, আমার প্রথম ভালোবাসা। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ, আর শেষ পুরুষ।

এই নেসলিহান সোহা আপনাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে হীর— আমার সন্তানদের বাবা, আমার দুনিয়া।"

ওরহান নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল, বিস্ময় আর আবেগে যেন তার চারপাশের পৃথিবী থেমে গেছে। এতদিন ধরে অনুভব করলেও, এই প্রথম সোহা নিজের মুখে বলল, সে ওরহানকে ভালোবাসে। সেই স্বীকারোক্তির শব্দে যেন ইস্তাম্বুলের রাতও থমকে দাঁড়াল, আর বসফরাসের কালো জল নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে রইল তাদের প্রেমের শপথের।

ওরহান স্তব্ধতা ভেঙে সোহাকে আস্তে তুলে নিলো। তার চোখের কোণে জমে উঠেছিল অশ্রুকণা, যেন আনন্দ আর বেদনার মিশ্র এক অদ্ভুত দীপ্তি। সোহাকে দাঁড় করিয়ে কাছে টেনে আনতেই নিজের অধর চেপে দিলো সোহার অধরে। নিস্তব্ধ রাত, বসফরাসের ঢেউ আর টাওয়ারের আলো যেন থমকে দাঁড়িয়ে শুধু তাদেরই দেখছিল।

বেশ কিছুক্ষণ একে অপরের নিশ্বাসে ডুবে থাকার পর ওরহান সোহার ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরাল। তারপর তাকে জড়িয়ে নিল বুকের ভেতর শক্ত করে, যেন পৃথিবীর সব ভয়, সব অনিশ্চয়তা থেকে আড়াল করছে। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"ভালোবাসি আমার সন্তানদের মাকে।

ভালোবাসি আমার প্রেমিকাকে।

ভালোবাসি আমার সোহাকে।

জীবনে যেই প্রেম হয়তো তোমায় দিতে পারিনি, সেই প্রেমের সমস্ত ঋণ আমি এই পনেরো দিনে শোধ করার চেষ্টা করেছি, আমার ভালোবাসা।"

সোহা চোখ বুজে ওরহানের বুকে মুখ লুকিয়ে রাখল। তাদের নিঃশ্বাসে, তাদের স্পর্শে, তাদের অশ্রুতে মিলেমিশে তৈরি হলো এক অমর প্রতিশ্রুতি, যা শুধু প্রেম নয়, বরং এক জীবনের পূর্ণতা। সোহা বন্ধ চোখেই বলে উঠলো ফিসফিসিয়ে—

-"ভালোবাসি আমার হীর!"

Story Cover