ওসমান মিহিরিমার হাত টেনে টেনে নিয়ে চলেছে বেজমেন্টের গাড়ি পার্কিং এরিয়ায়। পথজুড়ে মিহিরিমা বারবার ধস্তাধস্তি করেছে, কিন্তু ওসমানের পুরুষালি শক্তির কাছে শেষমেশ হার মেনেছে সে। গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে ওসমান মিহিরিমার ড্রাইভারকে ফোন করে দ্রুত আসতে বলে। তারপর এক ঝটকায় মিহিরিমার হাত ছেড়ে দেয়। মিহিরিমা খেঁকিয়ে উঠে কব্জি কচলাতে কচলাতে বলল—
-"এত জোরে কেউ ধরে রাখে? উফ! হাতটাই বুঝি খুলে গেলো! কেন নিয়ে এলে আমায় এখানে? আজ ওই মেয়েটাকে এমন শিক্ষা দিতাম, সারাজীবন মনে রাখতো!"
ওসমান ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়—
-"নিজে বাঁচতে চাইলে এখনই শান্তভাবে বাড়ি ফিরে যাও।"
-"কে মারবে আমায়? এত সাহস কার!"
-"উফ্, এত কথা বলো না! বাসায় যাও। দাদাভাই কীভাবে তোমাকে সহ্য করে জানি না। তোমার সঙ্গে দুমিনিটও শান্তিতে কথা বলা যায় না, ঝগড়া না করে থাকতে পারো না!"
মিহিরিমার কণ্ঠ হঠাৎ কঠিন হয়ে ওঠে, চোখ দুটো আগুনে ঝলসে ওঠে—
-"ওসমান, বাড়াবাড়ি করছো তুমি। ভুলেও যেও না, আমি তোমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী!"
-"আগে সত্যি সত্যি বউ হয়ে যাও, তারপর না হয় এসব কথা বলবে।" ওসমান ঠাণ্ডা কণ্ঠে ছুঁড়ে দেয় কথাটা।
এই কথায় মুহূর্তেই আগুন জ্বলে ওঠে মিহিরীমার চোখে মুখে। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওসমানের কলার চেপে ধরে, গর্জে ওঠে—
-"ওরহান শুধু আমার! এই পৃথিবীতে যদি কেউ ওরহানের স্ত্রী হয়, তবে সে আমি, শুধু আমি! অন্য কেউ নয়, বুঝেছো?"
ওসমান এক ঝাড়া মেরে তার হাত ছুঁড়ে সরিয়ে দেয়। ওসমান এক পা মিহিরিমার দিকে এগিয়ে শান্ত অথচো শক্ত কন্ঠে বলে উঠে—
-"গাছে কাঁঠাল, গোপে তেল! তোমার অবস্থা এখন ওই কৌতুকের মতোই। ওরহানের স্ত্রী কে হবে, সেটা ঠিক করবে ওরহান, তুমি না!" এটুকু বলেই ওসমান পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মিহিরিমা রাগে, অপমানে ফুঁসতে ফুঁসতে ফ্লোরে পা দিয়ে সজোরে আঘাত করে। শব্দটা কেবল বেজমেন্টে নয়, তার বুকেও বাজে।
.
.
ওরহানের কথা শুনে সোহা রীতিমতো বাকরুদ্ধ। এই পুরুষ কী বলছে? সে নাকি সোহাকে মিস করেছে? আবার তাকে জিজ্ঞাসা করছে সোহা তাকে মিস করেছে কি না। চার বছর কেটে গেছে, তবু এই পুরুষের দাম্ভিকতা, আত্মঅহংকার, আত্মমর্যাদার সেই বর্ম একটুও চিড় খায়নি। যেন এখনো আগের মতোই অটুট, একটুও বদলায়নি।
সোহা রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করল ওরহানের দিকে। কণ্ঠে ঘৃণা, রাগ আর তীব্র বীতশ্রদ্ধতা মিলেমিশে এক রূঢ় প্রতিধ্বনি তৈরি করল—
-"আপনি বরাবরই নাটক করতে এক্সপার্ট। আশ্চর্য লাগে, কেন যে সিনেমায় নাম লেখাননি, সেটাই বুঝি না। একবার যদি নামতেন, শাকিব খানও আপনার সামনে কাঁচা হয়ে যেতেন!
নির্লজ্জের মতো একটা পরনারীর সঙ্গে আপনি এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে আছেন কেন? আপনার ফিয়ান্সে যদি সব জানতে পারে, তখনো কী আপনাকে রাখবে বলে মনে করেন?"
ওরহান তবু নির্লিপ্ত, যেন কিছুই শোনেনি। তার মোহনীয় দৃষ্টি এখনো সোহার দিকেই নিবদ্ধ। সোহা যেন তার চোখে এক নেশাসদৃশ অস্তিত্ব, যার দিকে তাকিয়ে সে নির্বাক, নেশাগ্রস্ত। শান্ত, নেশালো স্বরে ওরহান বলল—
-"আমি বরাবরই নির্লজ্জ, এটা তুমি ভালো করেই জানো। দেখো, আমি কিন্তু তোমাকে ছুঁইনি। আমাদের মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব আছে।
আচ্ছা, তোমাকে একটু স্পর্শ করি?"
এক মুহূর্তের জন্য সোহা থমকে গেল। হ্যাঁ, সত্যিই, ওরহান তাকে ছোঁয়নি, তাদের মাঝখানে এখনো একটা শীতল ফাঁক রয়ে গেছে। কিন্তু ওরহানের শেষ কথাটা তার রক্ত ফুটিয়ে তুলল। কানের গোড়া পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল সোহা, রাগে যেন শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে আগুন ধরে গেল। ওরহান চোখে চোখ রেখে বিদ্রুপে হেসে উঠল। ঠোঁটে রসিকতার ঝিলিক নিয়ে সে শক্ত বাক্য ছুড়লো—
-"হাত ভেঙে পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবো একদম।"
ওরহানের কপালে ভ্রু কুঁচকে উঠল। একটুখানি নাটকীয় ভঙ্গিতে আহত অভিমানের ছাপ ছড়িয়ে নিলো গলায়—
-"তুমি তো একসময় স্নিগ্ধ ছিলে, কোমলমতি। এখন দেখছি চার বছরে রুদ্ররূপে রূপান্তরিত হয়েছো?"
-"সবই আপনারই দান, মিস্টার খান!"
সোহা এক নিঃশ্বাসে বলল, ঠোঁট দুটো কঠোর রেখায় টেনে। বলেই সে এক ধাক্কায় ওরহানকে সরিয়ে নিজের পথ ধরে এগিয়ে যায়। কিন্তু হেঁটে যেতে যেতে ওরহানের বলা শেষ বাক্যটি ঠিকই তার কানে এসে বাজে—
-"আমি কিন্তু তোমাকে স্পর্শ করিনি, তুমি আমাকে করেছো। সুতরাং, এখন থেকে আমি যদি স্পর্শ করি, তাতে আর বাধা নেই।"
.
.
.
সোহা দ্রুত পা চালিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। ক্লাচের মতো মোচড়ানো মুখ, শ্যামলা ত্বক রাগে লাল হয়ে উঠেছে। নাকের পাটা কাঁপছে, আর বারবার দুই হাত কচলাচ্ছে যেন মনের ভেতরের উত্তাপ হাত বেয়ে বেরিয়ে যাবে। গাড়ির কাছে এসে সে মিরহাকে কল করে—
-"গাড়ির কাছে চলে এসো, এখনই।"
অপর প্রান্তে থাকা মিরহা তখনো ইহাবের সঙ্গে কিছু আলোচনা করছিল। সে দ্রুত বিদায় নিয়ে সোহার কাছে চলে আসে। কাছে এসেই সোহার চেহারা দেখে থমকে যায়। একবারে বুঝতে পারে, কিছু একটা ঘটেছে। খুব বাজে কিছু। মিরহা হালকা কাশল, যেন পরিবেশটা নরম করতে চায়।
সোহা তার দিকে তাকিয়ে গলার কাঁপন চেপে রেখে বলল—
-"আজ আর অফিসে যাবো না। তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাও।"
মিরহা একটু দম নিয়ে বলল—
-"কিন্তু... মাম আপনি... আপনি কিভাবে যাবেন তাহলে?"
সোহা দৃষ্টি ঘুরিয়ে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল—
-"অফিসের বাইরে তোমাকে ‘মাম’ বলতে নিষেধ করেছি, মিরহা।"
-"সরি... সোহা। কিন্তু এখনো তো আমাদের ডিউটি চলছে।"
সোহা মাথা হেঁট করে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। তারপর ক্লান্ত কণ্ঠে বলল—
-"হ্যাঁ, ঠিক। কিন্তু এখন আমি তোমাকে ছুটি দিলাম। যাও, বাড়ি গিয়ে একটু রেস্ট নাও।"
মিরহা দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল—
-"কিন্তু তুমি...?"
সোহা ইতিমধ্যে উল্টো দিকের রাস্তায় পা বাড়িয়ে দিয়েছে। পেছন থেকে মিরহার ডাকে থেমে সে ফিরে তাকাল। চোখে এক স্নিগ্ধ কিন্তু বেদনাময় হাসি।
-"আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, মিরহা। আমি ঠিক আছি। তুমি বাড়ি ফিরে যাও।"
বলেই সোহা ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। মিরহা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকল, চোখে বিষণ্ণতা। তার মনের ভেতরে চিন্তার ঢেউ উঠতে লাগল।
এই মেয়েটি সহজে রাগে না। কিন্তু একবার রেগে গেলে... নিজেকেই যেন চিনতে পারে না। তখন সে একেবারে নীরব হয়ে যায়, মুখে কিছু না বলেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। আজও তাই করল সে। সেই বাদামি ডাগর চোখজোড়া, যেখানে একসময় হাসির রঙ লেগে থাকত, আজ সেখানেও শুধুই কষ্ট আর ক্ষতের ছায়া। কি এমন ঘটেছে সোহার সঙ্গে? এত মিষ্টি একটি মেয়ে পাথরের মতো ঠাণ্ডা, নিরাবেগ হয়ে উঠল কীভাবে?
ভাবতে ভাবতে মিরহা গাড়িতে উঠে বসে। মন ভার করা এক নিঃশ্বাস ফেলে সিটে হেলান দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করে। শহরের ব্যস্ততা, হর্ন, বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলা, সবকিছুই যেন হঠাৎ নীরব হয়ে যায় মিরহার ভেতরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পৌঁছে যায় নিজের ভাড়া বাসায়।
চারতলা বিশিষ্ট এই ভবনটিতে সে মাত্র কিছুদিন হলো উঠেছে। প্যারিস থেকে ফেরার পর কিছুদিন হোটেলে ছিল, পরে ভালো নিরাপদ বাসা না পেয়ে এই ভবনেই উঠে পড়ে। চারতলায় তার ফ্ল্যাট, নিচতলাগুলোতে বাড়িওয়ালারা থাকেন। তিনতলা ও দুতলা মিলিয়ে ডুপ্লিক্স ভাবে করা। নিচ তলা ও চারতলা ভাড়া দেন তারা। তাদের পরিবারে সদস্য মাত্র তিন জন। সাইফুল শেখ তার স্ত্রী ও এক কন্যা।
গাড়ি থেকে নামতেই সামনেই দেখা হয়ে যায় সাইফুল শেখের সঙ্গে। তিনি মুখে হালকা হাসি নিয়ে বলেন—
-"আসছেন মিস মিরহা? আজ একটু আগে ফিরলেন দেখি?"
মিরহা বিনীতভাবে সালাম জানিয়ে সংক্ষেপে বলল—
-"জ্বি, আজ একটু তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল।"
-"ভালো করেছেন, বিশ্রাম দরকার হয় মাঝে মাঝে।"
একটি ভদ্র ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে মিরহা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতেই দেখা হয়ে যায় সাবার সঙ্গে। বাড়ীওয়ালার একমাত্র মেয়ে। সব সময় কেমন নিশ্চুপ হয়ে থাকে। বেশি একটা কথা বলে না। হয়তো শান্ত স্বভাব তার। ভার্সিটি থেকে ফিরেছে সদ্য, ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলছে, মুখে ক্লান্তির ছাপ।
-"হ্যালো আপু! আজ তো বেশ আগে ফিরলেন!" সাবা হেসে বলে।
-"হ্যাঁ, আজ একটু তাড়াতাড়ি!" হালকা হাসি দিয়ে উত্তর দেয় মিরহা।
সাবা মাথা নেড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। মিরহাও ধীরে ধীরে নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসে। ঘরের দরজাটা খুলে ফেলার পর সে একবার পেছন ফিরে তাকায়, যেন এখনও সোহার মুখ ভেসে আছে মনে। এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক ফুঁড়ে। এই মেয়েটা এতটা চুপ হয়ে গেল কেন? কোথায় হারিয়ে গেল সেই আগের উচ্ছ্বসিত, প্রাণবন্ত সোহা?
.
.
সোহা কেবিন ছেড়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ওসমান নিঃশব্দে প্রবেশ করে ওরহানের কক্ষে। চেয়ার টেনে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দেয়, চোখ দুটো একটুখানি বন্ধ করে রাখে। কক্ষজুড়ে এক ধরনের ভারী নিস্তব্ধতা। বাতাসে যেন অপরাধবোধ, অভিমান আর অতীতের গন্ধ ভাসছে। কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে সামনের মানবটির দিকে তাকাল, যে এখনো চুপচাপ, চেয়ারে মাথা এলিয়ে, চোখ বুঁজে বসে আছে। যেন তার ভেতরকার যুদ্ধে সে সম্পূর্ণ মনোযোগে নিমগ্ন।
ওসমান তার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল—
-"ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল দাদাভাই।"
ওরহান চোখ মেলে তাকাল। দৃষ্টি ধীর, মুখে কোনো ভঙ্গি নেই। শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে সে উত্তর দিল—
-"আমি কি অস্বীকার করেছি কিছু?"
-"তাহলে এসব কী করছো তুমি? আবার চার বছর আগের সেই পথেই কেন হাঁটছো?"
ওরহানের ঠোঁটে এক ব্যঙ্গহীন শুষ্ক হাসি খেলে গেল।
-"তুই কি মনে করিস, ও আমাকে এত সহজেই ক্ষমা করে দেবে?"
-"তবে কি এটাই পথ? যে পথে কেবল ঘৃণার পরিমাণ বাড়ে?"
-"ওর হৃদয়ে যে ভালোবাসার বীজ আমি একদিন বুনেছিলাম, তা আবার জাগাতে হলে, আমায় ভার্সিটির সেই ওরহান হতে হবে।"
-"তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে? যে সোহা আবারও ভালোবাসবে সেই বখাটে, হিংস্র ওরহানকে?"
ওরহান এবার চোখ নামিয়ে ফেলল। গলার সুর কিছুটা ম্লান—
-"কে বলেছে ও আবার ভালোবাসবে? আমি তো বলিনি..."
-"তবে তুমি কী বলতে চাও?"
ওরহানের কণ্ঠ নিচু কিন্তু গভীর—
-"ভালোবাসা তো এখনো আছে। অভিমান আর কষ্টের প্রাচীর শুধু তাকে আড়াল করে রেখেছে।"
ওসমানের মুখ তিক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল—
-"ভালোবাসা জাগ্রত করে তুমি কি করবে? ভুলে যেয়ো না, তুমি এখন এনগেজড ।"
-"ভুলি নি কিছুই। এক মুহূর্তের জন্যও না। আমি আজও সব মনে রাখি। আমি এই বিয়েতে রাজি নই এটা তুইও জানিস। শুধু মাত্র সোহা যাতে জানে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করছি, যদি ও ফিরে এসে আমার কাছে অধিকার চায়, শুধু মাত্র সেইজন্যই আমি চুপ ছিলাম। এখন আর চুপ থাকার সময় নয়।"
-"তবে থেমে যাও এখনই। সে তো ফিরে আসে নি। ক্ষমা চাও, বিদায় নাও। ভালোবাসা জাগিয়ে কী হবে? তোমাকে ও বিয়ে করবে না। আর তাছাড়া তুমি ওকে ভালোও বাসো না।"
-"ও আমার শুধু আমার ওসমান।"
-"দাদাভাই!"
ওরহান এবার নিশ্চুপ, মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখ আর মুখ লুকিয়ে রাখল বিশাল কাচের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে শহরের আলো-আঁধারি দৃশ্যপট চোখে পড়ে। জীবনের ব্যস্ততা, অগোছালো গন্তব্য, ক্ষুদ্র মানবপ্রাণের ছুটে চলা।
ওসমানও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ওর পাশে দাঁড়াল। বাইরের দিকে দৃষ্টি রেখে শান্ত গলায় বলল—
-"ভালো না বাসলে কাছে রেখে কী করবে? তার চেয়ে মিহিরিমাকে বিয়ে করে ফেলো। আর তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নাও।"
ওরহান এখনো নিশ্চুপ। কোনো শব্দ, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার শরীরী ভাষায়। কাচের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু যেন শরীরখানা এখানে থাকলেও মনটি আটকে আছে অন্য কোথাও, কোনো পুরনো দুপুরে, কোনো অনুচ্চারিত ভালোবাসায়।
ওসমান আড়চোখে ভাইকে দেখে। সেই নীরবতা, সেই চোখে স্থির দৃষ্টির পেছনে কী লুকিয়ে আছে তা বুঝতে চেষ্টা করে।
একটা দীর্ঘ মুহূর্ত কাটে, নিঃশব্দে, ভারী বাতাসের মতো। তারপর সে সন্দিহান গলায় ধীরে বলে ফেলে—
-"ভালোবাসো?"
সেই প্রশ্নটা যেন বাতাস কেটে ওরহানের বুকে এসে বিঁধল। কিন্তু ওরহান তবুও চুপ। চোখে-মুখে কোনো ভঙ্গি নেই, কণ্ঠে কোনো কাঁপন নেই। কেবল নীরবতা তার ভাষা হয়ে রয়ে যায়। তবুও ওসমান জানে, এই নীরবতার মাঝেই লুকিয়ে আছে সব উত্তরের ভার।
একজন হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের অপরাধ, গোপন আকুলতা... এবং অব্যক্ত ভালোবাসা।
ওরহান নিরুত্তর। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কেবল তার নিঃশব্দ উপস্থিতি যেন সাড়া দিচ্ছে এক প্রাচীন যন্ত্রণার।
ওসমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দৃষ্টিতে একরাশ অসহায়তা। তারপর ধীর পায়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ওরহান এখনো দাঁড়িয়ে। স্থির, নির্বাক। বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু দৃষ্টি তার ভেতরের কোনো এক ক্ষত-বিক্ষত স্মৃতিপটে আটকে আছে।
.
.
.
সোহা আপন মনে হেঁটে চলেছে, নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গতায়। সে বরাবরই একা। গত চার বছর ধরে, একা এক জীবনের গল্প লিখে চলেছে সে। হাঁটতে হাঁটতে রাত হয়ে গেছে সোহা খেয়াল ও করেনি। শহরের কোলাহল উপেক্ষা করে হাঁটতে হাঁটতে সে এসে পৌঁছেছে এক নির্জন প্রান্তে, একটুখানি নিস্তব্ধতা যেখানকার বাতাসেও বেদনার গন্ধ লেগে থাকে।
নিচু বেঞ্চটিতে বসে শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল সামনে। চারপাশে জীবন চলমান, অথচ তার ভিতরটায় এক গভীর স্থবিরতা। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কেবল মনের ভেতর জেগে উঠছে একের পর এক অতীতের স্মৃতি, ধূসর, দহনভরা স্মৃতি।
যে পরিবার তার অস্তিত্ব ছিল, আশ্রয় ছিল, সেই পরিবারই কি না একদিন বিশ্বাস হারিয়ে তার পায়ের নিচের মাটি কেড়ে নিয়েছিল! যে বাবা-মা একসময় সোহার শরীরের সামান্য আঁচ দেখলে চোখে জল এনে ফেলতেন, সেই তারাই ঝড়-জলের রাতে একটিবারও পিছনে না তাকিয়ে তাকে গৃহচ্যুত করেছিল। একবারও কি তারা ভেবেছিল এই মেয়েটির কথা? ভেবেছিল, কোথায় যাবে সে, কিভাবে বাঁচবে? যে সত্যটা তার চোখে ছিল, সেটা তারা দেখতে পেল না, কিন্তু বাইরের লোকের বানানো গল্পই তাদের কাছে হয়ে উঠল চরম বাস্তব।
এই কি ছিল তাদের ভালোবাসা? এই কি ছিল সন্তানের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস?এই সব প্রশ্ন এখনো প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় সোহাকে। ঘুম কেড়ে নেয়, রাত ছিঁড়ে রাখে।
আজ চার বছর পর আবারও দেখা মিলল সেই মানুষের। যে এক সময় তার পৃথিবী ছিল, শান্তি ছিল।
যার এক উপস্থিতিতে সে হারিয়ে যেত অনুভূতির সমুদ্রে, আজ তার চোখে তাকালেই যেন হঠাৎ করেই পুরনো সব ক্ষত ঝাঁঝরা হয়ে যায়। সেই চেনা চেহারা এখন বিষ হয়ে ধরা দেয় তার কাছে। সেই নাম, সেই কণ্ঠস্বর আজ কেবল দগ্ধ করে। যার ভালোবাসা এক সময় আশ্রয় ছিল, সেই ভালোবাসাই আজ ব্যথার সমুদ্র। চিন্তায় হারিয়ে গিয়ে সোহা হঠাৎ অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো—
-"ঘৃণা করি...!"