ফিরে দেখা

পর্ব - ৩৯

🟢

নভেম্বর, ২০২৬।

শীতের আগমনী হাওয়া যেন পুরো শহরটাকে নরম কুয়াশায় মুড়ে রেখেছে। জানালার কাচে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা থেকে ভেতরে ঢুকছে এক অদ্ভুত শীতলতা। এই সময়েই সোহার অন্তঃসত্ত্বা জীবনের চার মাস পূর্ণ হলো। অথচ শরীরটা মোটেও ভালো নেই।

সাবার সময়েও এরকম হয়েছিল, তাই প্রথমে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এবার যেন কিছুটা আলাদা। বমি তো হচ্ছেই, সঙ্গে এসেছে অস্বস্তিকর দুর্বলতা। মাঝে মাঝে রক্ত মিশে বেরোচ্ছে গলার ভেতর থেকে। ডাক্তার অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন— "এটা নরমাল।" তবু মায়ের বুকের ভয়টা সহজে কাটে কি?

মা-শাশুড়ির জোরাজুরিতে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হবে না পাঁচ মাসের আগে। সেই পুরোনো বিশ্বাস— "শিশু শক্ত হয়ে উঠুক, তারপর দেখা যাবে।" তবুও নিয়মিত ডাক্তার দেখানো হচ্ছে, ওষুধ চলছে।

কিন্তু বদলে গেছে অন্য এক মানুষ। যেদিন থেকে ওরহান জেনেছে সে বাবা হতে যাচ্ছে, সেদিন থেকেই তার ভেতরে যেনো এক অন্য মানুষ জেগে উঠেছে। অফিসে যাওয়া বাদ, সহকর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে সব দায়িত্ব। মুফতি আর মারুফ সামলাচ্ছে অফিস, মাঝে মাঝে ওসমান এসে সহায়তা করছে। ওরহান অফিসের কাজ সে বাড়িতে বসেই করছে। ওরহান সে যেনো এক নতুন দায়িত্বে ডুবে আছে, সোহার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি ক্লান্তি তার চোখের সামনে রক্ষিত।

চুল ধরা যখন বমি করে, হাতে-পায়ে তেল মালিশ, মাথায় তেল দিয়ে দেওয়া, সময়মতো খাবার খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, সবকিছুতে অতিরিক্ত যত্নশীল। এমনকি ডাক্তার দেখাতে গিয়েও যত প্রশ্ন করেছে যে ডাক্তার নিজেই একসময় ধমক দিয়ে বলেছিলেন—

-"মিস্টার ওরহান, রোগী আপনার স্ত্রী, না আপনি? একটু চুপচাপ থাকবেন?"

ডাক্তারের ধমক শুনে ঘেমে উঠেছিল ওরহান। পাশে বসা সোহা তখন হেসে ফেলতে গিয়েও কষ্টে থেমে যায়।বাড়িতে ফিরে আবার শুরু। একদিন তো সোজা সুরাইয়া বেগমকে বলেই বসলো—

-"মা, এই খাবারটা আর দিও না। ইউটিউবের ডাক্তার নিষেধ করেছে। ওকে অন্য কিছু খাওয়াও।"

সুরাইয়া বেগম খুন্তি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন রান্নাঘরে। কথাটা শুনে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালেন।

-"কি বললি? আমি জানি না নাকি? তিনটে ছেলে-মেয়ে জন্ম দিয়েছি আমি, তুই আমাকে শিখাবি এখন? হুশ করে বের হ!"

খুন্তির ঝলক দেখে ওরহান মুখ ছোট করে একপাশে সরে দাঁড়াল। কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মায়ের চোখের আগুন দেখে সাহসে আর কুলাল না।

বাড়ির সবাই মজা পাচ্ছে ওরহানের এই খুঁতখুঁতানিতে। হাসাহাসি, ধমক, আর ওরহানের মুখ চাওয়া-চাওয়িতে যেন বাড়ির প্রতিটি কোণ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

সোহা ঘরে বসে বই হাতে নিয়ে ওরহানের কর্মকাণ্ড ভাবছিল। বাইরে থেকে ভেসে আসা শীতের হাওয়া, দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি, আর ভেতরে এই অদ্ভুত উত্তেজনা, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, যেন সংসারের প্রতিটি দেয়াল আজ তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় লিখছে। একটা নতুন ভোর অপেক্ষা করছে। যেখানে আনন্দ, ভয় আর ভালোবাসা মিলেমিশে তৈরি করবে সম্পূর্ণ এক পরিবার।

.

.

.

রাত বেশ গভীর। বাড়ির অন্যরা অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেবল সোহার ঘরে জ্বলছে টেবিল ল্যাম্পের নরম হলুদ আলো। আয়নার সামনে বসে আছে সোহা। তার চুলে বহুদিনের জট, অসুস্থতার কারণে চুল আঁচড়ানোই হয়ে ওঠেনি। প্রতিদিন ঘুমোতে যাওয়ার সময় ভেবে রেখেছে, কাউকে ডেকে দেবে, কিন্তু সে সময়ে সবাই ঘুমিয়ে থাকে। ফলে চুলের জট জমে একেবারে ঘন হয়ে গেছে। সব কাজ ফেলে সোহা চুপচাপ বসেছে আয়নার সামনে। হাতে চিরুনি নিয়ে জটগুলো আলগা করার চেষ্টা করছে ধীরে ধীরে।

এমন সময় ওরহান ঘরে ঢুকলো হাতে এক বাটি ড্রাই ফ্রুট নিয়ে। সোহাকে আয়নার সামনে বসে চুল নিয়ে ব্যস্ত দেখে এগিয়ে এসে হেসে বলল—

-"বেবি, আমাকে দাও না। আমি আঁচড়ে দিচ্ছি।"

সোহা মাথা নেড়ে জট ছাড়াতে ছাড়াতে উত্তর দিল—

-"থাক, দরকার নেই। আপনি তো আরো জট পাকিয়ে দেবেন।"

কথাটা শুনেও ওরহান কিছুই করলো না, শুধু বাটিটা সোহার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর চিরুনি তুলে নিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে বলল—

-"তুমি ফ্রুট খাও। চুল আমি ঠিক করে দিচ্ছি।"

প্রথমে অবিশ্বাস নিয়ে বসে রইল সোহা। কিন্তু ধীরে ধীরে অনুভব করলো ওরহানের হাতের ছোঁয়া। মৃদু টানে, ধৈর্য ধরে, নিখুঁতভাবে সে আঁচড়ে যাচ্ছে চুল। অবশেষে মাত্র পনেরো মিনিটে চুলের জট খুলে সুন্দর একটা বেণি বেঁধে দিল। আয়নায় নিজের চুল দেখে সোহা বিস্ময়ে চেয়ে রইল। অবাক দৃষ্টিতে ওরহানের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"এ কী! যেই আপনি এতদিন ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা লাগিয়ে আমার চুল নষ্ট করেছেন, সেই আপনি আজ পনেরো মিনিটেই সুন্দর বেণি করে দিলেন! তাহলে ইচ্ছে করেই করেছেন নাকি? আমার চুল এমনিতেই ঝরে যাচ্ছে।"

ওরহান হেসে গর্বের সুরে বলল—

-"আরে জান না। আমি শিখেছি কয়েকদিন ধরে।"

সোহা চোখ সরু করে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকাল—

-"কার কাছ থেকে শিখেছেন?"

-"পায়েল আর কেয়া মিলে শিখিয়ে দিয়েছে আমাকে।"

আয়নায় নিজের চুল দেখে সোহা নরম স্বরে বলল—

-"খুব সুন্দর হয়েছে।"

তারপর হঠাৎ ঘুরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল—

-"কিন্তু আপনি হঠাৎ চুল বাঁধা শিখতে গেলেন কেন?"

ওরহান বুক টানটান করে দাঁড়ালো, চোখে একরাশ গর্ব—

-"আমার মেয়ে আসছে না? তার চুল তো আমাকেই বেঁধে দিতে হবে। সে যেন কোনোদিন না বলে তার আব্বু সামান্য একটা বেণিও বাঁধতে জানে না। তাই শিখেছি।"

সোহা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল—

-"আপনি কি করে জানেন আপনার মেয়ে হবে?"

ওরহান কাছে এগিয়ে এসে সোহাকে দাঁড় করিয়ে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট এসে ঠেকল সোহার কানের কাছে। ফিসফিস করে বলল—

-"আমার মেয়েই হবে। সে আগেই আমাকে বার্তা দিয়ে গেছে তার আগমনের।"

সোহা মৃদু হেসে বলল—

-"কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে ছেলে হবে।"

-"না, দেখো আমাদের মেয়েই হবে।"

-"আচ্ছা, যেটাই হোক না কেন, শুধু যেন সুস্থ সবল একটা সন্তান আসে। এটাই চাই।"

ওরহান তার কথা শুনে সোহাকে সামনে এনে কপালে নরম চুমু খেয়ে বলল—

-"হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছ।"

ঘরটা যেন তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। চুলের বেণির মতো জড়িয়ে গেল দু’জনের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর অনন্ত প্রতীক্ষা।

.

.

.

আজ আকাশে সূর্য উঠেছে। কুয়াশা ভেদ করে ঝলমলে রোদ এসে পড়েছে রাস্তায়। শীতের তীব্রতা যেন আজ কিছুটা কম। সোহার আবদারে ওরহান তাকে নিয়ে বের হয়েছে। বহুদিন পর, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর এভাবে বাহিরে আসা। এতদিন কেবল ডাক্তার দেখানোই ছিল সীমা। এমনকি সোহা নিজের বুটিকেও যেতে পারে নি, মিরহা একা একা হিমশিম খাচ্ছে সেখানে। তবু ওরহানকে বোঝানো যায় নি, আর তার কথা অমান্য করার সাহসও হয় নি কারো।

আজ তারা এসেছে শহরের এক নিরিবিলি পার্কে। শীতের রোদে নির্জনতার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। দুজনে পাশাপাশি বসে আছে ঘাসে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় যেভাবে সোহার হাত শক্ত করে ধরেছিল ওরহান, সেই হাত এখনো ছাড়েনি। যেন ভয় করছে, হাত ছাড়লেই হয়তো সোহা হারিয়ে যাবে।

দীর্ঘ নীরবতার পর হঠাৎ ওরহান কথা বলল। কণ্ঠটা কেমন যেন ভিজে আছে—

-"আমাদের কোনোদিন একটা প্রেম হলো না, নীলশ্যামা।"

সোহা চমকে তার মুখের দিকে তাকালো। ওরহান দূরে চেয়ে থেকে বলতে লাগল—

-"আমাদের একসাথে কোনো স্মৃতি নেই। আমরা কখনো প্রেমিক-প্রেমিকার মতো ঘুরতে বের হইনি। কখনো রিকশার হুড তুলে শহরটা ঘুরে দেখিনি। কোনো পার্কে বসে বাদাম খাওয়া হয়নি। তুমি কোনোদিন আমার কাছে আবদার করোনি, ‘আমায় ভালোবাসো’ বলে শোনাওনি। অধিকার ফলাওনি আমার ওপর। সব শেষে, আমাদের একটা প্রেমই হলো না।"

ওরহান থেমে তাকাল সোহার দিকে। তার চোখে চিকচিক করছে অশ্রুর আলো। এই দৃশ্য সোহার চোখ এড়াল না। সে অপলক চেয়ে রইল, এই মানুষটার দিকে, যাকে সে একসময় ভুল বুঝেছিল, আঘাত করেছিল, কষ্ট দিয়েছিল। অথচ এই মানুষটাই ভার্সিটির সেই দাম্ভিক, অহংকারী, টক্সিক বদমেজাজি ছেলে থেকে আজ সবচেয়ে নরম আর ভালোবাসায় পূর্ণ স্বামী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু ওরহান? কখনো কোনো অভিযোগ আনেনি। কখনো বলেনি, সে কষ্ট পেয়েছে। অথচ আজ, প্রথমবারের মতো, তার কণ্ঠে আক্ষেপ ফুটে উঠেছে, একটি অপূর্ণ প্রেমের জন্য।

সোহা তার হাত শক্ত করে ধরে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

-"আমার জন্যই কিছু হয়নি। আফসোস হচ্ছে আপনার? আমার ওপর আপনি অসন্তুষ্ট?"

ওরহান মাথা নাড়ল ধীরে। সোহার শরীর জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল—

-"না, নীলশ্যামা। তোমার জন্য নয়। আমাদের পরিস্থিতি ছিল তাই হয়নি। তোমার ওপর আমি কোনোদিন অসন্তুষ্ট হইনি। আমার শুধু আক্ষেপ, আমি তোমাকে একটা সুন্দর কল্পনার প্রেম দিতে পারিনি।"

সোহা তার বুকের ওপর হাত রেখে আলতো সুরে বলল—

-"আক্ষেপ করবেন না।আপনি আমার জীবনে আছেন, আর আপনার সন্তান আমার গর্ভে। এর চেয়ে বড় প্রেম আর কী হতে পারে? একজীবনে একটা প্রেম না হলো তাতে কি? আমাকে যতটা আপনি ভালোবেসেছেন, কেউ কোনোদিন পারেনি, পারবেও না। এটাই আমার কাছে সব।"

ওরহান মাথা নিচু করে সোহার কপালে চুমু খেল। দু’জন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। চারপাশের পাখির ডাক, হালকা রোদ আর হাওয়া তাদের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলল।

ফিরতি পথে হঠাৎ রাস্তায় ফুচকা আর আইসক্রিম দেখে সোহা বাচ্চাদের মতো বায়না ধরল। অন্য সময় হলে সে কখনো এমন করত না। কিন্তু গর্ভাবস্থার মুড সুইং, ওকে করেছে একেবারে শিশুসুলভ। ওরহানের বুক ভরে গেল আনন্দে। জীবনে এই প্রথম সে দেখল, তার পরিণত, সংযত, অভিমানী স্ত্রী আজ বাচ্চাদের মতো বায়না করছে।

স্বাস্থ্যগত কারণে ঠিক না জানলেও, ওরহান সেই আবদার ফেলতে পারল না। হাসিমুখে বলল—

-"চল, আজ তোমার বাচ্চামি মেনে নিলাম।"

সূর্যের আলোয়, পার্কের নিরিবিলি বেঞ্চে বসে, ফুচকার কাগজের থালায় ভাগাভাগি করে, ওদের প্রেম আসলে নীরবেই জন্ম নিল।

.

.

.

১০ মে ২০২৭।

সময় যেন আজ থমকে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের করিডরে নিস্তব্ধতা, শুধু কৃত্রিম আলো জ্বলছে ম্লান শীতলতায়। দেওয়ালের ঘড়ির কাঁটা টিক টিক শব্দে যেন সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি সেকেন্ডের ভয়াবহ চাপা উত্তেজনা।

দেখতে দেখতে চোখের পলকে কেটে গেলো সোহার অন্তঃসত্ত্বা দশ মাস। পাঁচ মাসের আল্ট্রাসাউন্ডেই জানা গিয়েছিল, সোহা ও ওরহানের যমজ সন্তান হবে। সেই খবরের আনন্দে যেন আকাশ আলোয় ভরে উঠেছিল, কিন্তু সেইসাথে এসে জুড়েছিল সোহার দুর্বল শরীর আর অজস্র অসুস্থতার যন্ত্রণা।

আজ সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিন। অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো যেন রক্তিম সূর্যের মতো জ্বলছে, কারো চোখে আলো নয়, বরং আতঙ্কের অগ্নিশিখা। পরিবারের সবার মুখে চাপা উদ্বেগ। সাবা তার এক বছরের সন্তানকেও নিয়ে এসেছে, সে-ও অপেক্ষা করছে উৎকণ্ঠায়।

আর ওরহান? সে যেন পাগলপ্রায় এক অস্থির সাগর। করিডরের এদিক-ওদিক হাঁটছে, আবার হঠাৎ থেমে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে সে ছুটে গেলো মসজিদের দিকে।

রাতের আকাশে ম্লান চাঁদ। মসজিদের নীরব আঙিনায় বাতাস বয়ে যাচ্ছে ধীর ছন্দে। সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে প্রবেশ করলো ওরহান। সাথে মুফতি, ওয়াহিদ খান ও ওসমান। ওমর খান ও মারুফ হাসপাতালে। যদি কোনো সমস্যা হয়, সেই জন্য তারা আসে নি।

ওরহান ওযু শেষে দাঁড়ালো নফল নামাজে। পেছনে দাঁড়ালো ওসমান, মুফতি আর ওয়াহিদ খান। তাদের কণ্ঠে সুরা পাঠের প্রতিটি ধ্বনি ভেসে গেলো গুমোট আকাশে। নামাজ শেষে সবাই মোনাজাত সমাপ্ত করে উঠতে যাচ্ছিল, তখনই শোনা গেলো বুকফাটা আর্তনাদ। ওরহান দু’হাত তুলে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার কণ্ঠে যেন বজ্রপাত—

-"আমাকে ক্ষমা করো, আল্লাহ। আমার জীবনের যত পাপ আছে, সব কিছুর শাস্তি আমাকে দাও। আমাকে ক্ষমা করো। আমার সোহার কিছু করো না, আমার সোহাকে কেড়ে নিও না। আমার সন্তানদের প্রাণ ভিক্ষা দাও। বহু যুদ্ধের পর আমি আমার সোহাকে পেয়েছি, এইভাবে তাকে কেড়ে নিও না আল্লাহ। আমার নিস্পাপ সন্তানদের আমার বুকে দাও। আমি জেনে-বুঝে না জেনে-বুঝে যত অন্যায় করেছি, তার শাস্তি তুমি আমার সন্তানদের ও আমার সোহাকে দিও না। আমি তোমার কাছে তাদের জীবন ভিক্ষা চাইছি, আমার খোদা। আমার জীবনে করা কোনো ভালো কাজের বিনিময়ে তুমি তাদের ভিক্ষে দাও আমাকে। আমাকে ফিরিয়ে দিও না, আমার আল্লাহ।"

তার ফুঁপিয়ে কান্নায় মনে হলো পুরো মসজিদ কেঁপে উঠছে। বাতাস ভারী হয়ে গেলো। যেন আকাশের তারারাও নেমে এসেছে এই আর্তি শোনার জন্য। ওসমান, মুফতি ও ওয়াহিদ খান অশ্রুসিক্ত নয়নে হাত তুললো—

-"হে আল্লাহ, এই পাগলের জীবনে আর কোনো ঝড় আনো না। সারাজীবন লড়াই করেছে সে। এবার ওকে দাও শান্তি, দাও সুখ।"

হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভাঙলো। ওসমানের ফোন কেঁপে উঠলো। ওপাশে ওমর খানের কণ্ঠে কম্পন। ওসমান ওমর খানের কথা শুনে ফোন রেখে ওরহানকে কম্পিত কন্ঠে বলল—

-"দাদাভাই, তোমার যমজ সন্তান হয়েছে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে, দুজনেই সুস্থ আছে। আর ভাবীও সুস্থ আছে, কেবিনে দেওয়া হয়েছে।"

খবরটি যেন আকাশভরা বজ্রাঘাত, কিন্তু তা দুঃখ নয়, সীমাহীন আনন্দের ঝড়। ওরহান লাফিয়ে উঠে ওসমানকে জড়িয়ে ধরলো—

-"সত্যি বলছিস ভাই? আমার সোহা, আমার বাচ্চারা ঠিক আছে?"

ওসমান অশ্রুসিক্ত চোখে মাথা নেড়ে উত্তর দিলো—

-"হ্যাঁ।"

ওরহান এবার ভাইদের, চাচাকে একে একে জড়িয়ে ধরলো। তার কণ্ঠে কাঁপা আর কান্নার মিশ্রণ—

-"আমার সোহা, আমার বাচ্চারা ঠিক আছে, তুমি শুনেছ চাচু?"

ওয়াহিদ খান বললেন—

-"হ্যাঁ বাবা, শুনেছি। চল, বাচ্চাদের মুখ দেখে আসি।"

কিন্তু ওরহান আবার মাটিতে নেমে গেলো, সেজদায় লুটিয়ে পড়লো শুকরিয়ার অশ্রুতে। মনে হলো আকাশের নক্ষত্ররাও নেমে এসে সেজদার মাটি ছুঁয়ে নিলো তার কৃতজ্ঞতায়।

হাসপাতালের কেবিনে নিস্তব্ধতা। বাইরে রাতের আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, অন্ধকার ভেদ করে আসছে নতুন দিনের সূর্য। সেই আলো যেন মিলেমিশে গেছে ভেতরের আনন্দে।

শয্যায় শুয়ে আছে সোহা। ক্লান্ত শরীর, তবু ঠোঁটে শান্তির ছোঁয়া। পাশে শুয়ে আছে দুটি ছোট্ট প্রাণ, যেন জান্নাত থেকে নেমে আসা দুটি ফেরেশতা। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ যেন জীবনের সবচেয়ে মধুর সংগীত।

ওরহান এগিয়ে এসে প্রথমেই সন্তানের কপালে চুমু খেলো। তারপর সোহার পাশে বসল। তার চোখ ভরে উঠলো অশ্রুতে। অবশেষে সোহা চোখ মেললো, দুর্বল হাসিতে বললো—

-"বাচ্চাদের দেখেছেন?"

ওরহানের কণ্ঠ কাঁপলো আবেগে—

-"তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বেবি। আমার সন্তানদের পৃথিবীতে আনার জন্য তুমি যেই লড়াই করেছ তার কাছে আমি কি বলে তোমাকে ধন্যবাদ দেবো জানি না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি জান, তোমাকে কোনোদিন এক ফোঁটা কষ্ট পেতে দিব না। তুমি আমাকে দুনিয়ার সব সুখ দিয়েছ। দুনিয়ার সব চেয়ে বড় উপহার দিয়েছো তুমি আমায়!"

সোহা আর কিছু বললো না। তার চোখ ছলছল করছিল, ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে যাচ্ছিল, সেই হাসি যেন পৃথিবীর সব ভালোবাসার প্রতীক।

.

.

.

খান বাড়ির সবাই এসে দেখা করল সোহার সাথে। এই আনন্দঘন মুহূর্তে নিলুফার বেগমও পুরোটা সময় সোহারের পাশে থেকেছেন। তিনি থাকেন মেয়ের কেনা বাড়িতেই। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকবেন না, ওই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নিয়ে নিয়েছেন তিনি। মেয়ের বুটিক ব্যবসার দেখভালও করেন তিনি নিজ হাতে। তাই জীবনের এই পরিণত বয়সে তাকে আর রোজগারের চিন্তা করতে হয় না। প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক এসে পৌঁছে যায় হাতে। মেয়েদের কৃতিত্বেই তিনি আজ স্বাবলম্বী, সম্মানিত।

অনেক ঝড়ঝাপটার পর অবশেষে সোহা ও ওরহানের জীবনে এসেছে সুখের সোনালি আলো। এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে গিয়ে সবাই খুশিতে আপ্লুত। আল্লাহর দরবারে লাখো বার শুকরিয়া আদায় করেছেন তারা। ওমর খান নাতনিকে কোলে তুলে নিলেন। অপরদিকে সুরাইয়া বেগম নাতিকে বুকে নিয়ে এলেন সোহার শয্যার পাশে। দুজনেই একসাথে বসে গেলেন তার পাশে।

ওমর খান চোখ ভরে তাকিয়ে বললেন—

-"দেখো মা, আমার নাতনি একেবারে ওরহানের ছায়া। ফর্সা গায়ের রং, ঘনো পাপড়িওয়ালা চোখ, সরু চিকন নাক, গোলাপি ঠোঁট, যেন ওরহানেরই ছোট্ট প্রতিচ্ছবি।"

অন্যদিকে সুরাইয়া বেগম নাতিকে কাছে টেনে দেখালেন—

-"দেখো মা, আমার নাতি একেবারে তোমার মতন। শ্যামলা গায়ের রং, চিকন ঠোঁট, টানা টানা চোখ, সরু নাক, যেন হুবহু তুমি।"

সোহা মৃদু হেসে উত্তর দিল—

-"আমার তো মনে হয় দুজনই আপনাদের মত হয়েছে।"

ওমর খান গর্বভরা কণ্ঠে বললেন—

-"হ্যাঁ, তা তো বলতে পারো। ওরহান আসলে আমারই ছায়া। যৌবনকালে আমি ওর চেয়েও বেশি সুদর্শন ছিলাম।"

এই সময়েই কেবিনে প্রবেশ করল ওরহান। ঠোঁটে খেলা করল মুচকি হাসি।

-"হ্যাঁ, আর তোমার পিছনে তখন লাইন ধরে থাকত কচি মেয়েরা! মা, দেখেছো? তোমার স্বামী এখনো তার যৌবনের প্রেম লীলার গল্প শোনাচ্ছে আমার ধূকে।"

কথা শেষ হতেই সুরাইয়া বেগম চোখ রাঙিয়ে তাকালেন স্বামীর দিকে। সাথে সাথে ওমর খানও ছেলের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকালেন। পরিবেশে হঠাৎ এক ধরনের অস্বস্তির হাওয়া বইতে লাগল। সুরাইয়া বেগম ধুপধাপ পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন নাতিকে নিয়ে। ওমর খানও তাড়াহুড়ো করে পিছন নিলেন, স্ত্রীর অভিমান ভাঙানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

এই দৃশ্য দেখে ওরহান হেসে ফেলল মৃদুস্বরে। তারপর ধীরে ধীরে এসে বসলো সোহার পাশে। সোহা ভুরু কুঁচকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ওরহান অসহায় ভঙ্গিতে বলল—

-"আরে, আমি আবার কী করলাম? রেগে যাচ্ছো কেনো, আশ্চর্য!"

সোহা কটমট দৃষ্টিতে জবাব দিল—

-"মানে, আপনি কী পরোক্ষভাবে বোঝাতে চাইছেন যে আপনার পিছে একসময় অসংখ্য মেয়ের ভিড় ছিল?"

ওরহান হকচকিয়ে বিষম খেলো। তারপর হাত নাড়িয়ে বলল—

-"আরে না না! কী সব ভাবছো তুমি? তেমন কিছুই না।"

তার ঠোঁটে চাপা হাসির চেষ্টা দেখা দিল, কিন্তু সোহার চোখে রয়ে গেলো অভিমান আর রাগের মিশ্র ঝলক। পরিবেশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল, যেন কেবিনের দেয়ালও সাক্ষী হলো এই খুনসুটির।

ওরহান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। সোহার চোখে রাগের আগুন, ঠোঁটে নীরবতা। চারপাশের পরিবেশও যেন ভারী হয়ে উঠল। খুনসুটি এক মুহূর্তে পরিণত হলো এক অদ্ভুত টানটান নীরবতায়। হঠাৎই ওরহান আস্তে করে সোহার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল—

-"জান, তুমি না রাগ করলে আমি একেবারেই অসহায় হয়ে যাই। বিশ্বাস করো, তোমার ছাড়া আমার পৃথিবী ফাঁকা। আমার অতীতের গল্প নিয়ে আর ভাবো না, আমি শুধু তোমাকেই চাই, শুধু তোমাকেই দেখি।"

সোহা ঠোঁট ফোলানো ভঙ্গিতে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল। চোখে জল চিকচিক করছিলো, তবে মুখে অভিমানী গাম্ভীর্য। ওরহান হঠাৎ মৃদু হেসে শিশুর মতো করে বলল—

-"তুমি কি জানো, আমার দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে কে?"

সোহা কোন উত্তর দিল না। গুমরে বসে রইল। ওরহান আবার ঝুঁকে এসে তার কানে ফিসফিস করে বলল—

-"আমার দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা এখন আমার পাশে শুয়ে আছে... আর সেই মেয়েটার নাম সোহা।"

এইবার সোহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রু টলমল করে গড়িয়ে পড়ল। অভিমান গলে গেল ভালোবাসার উষ্ণতায়।

ওরহান আলতো করে তার চোখের পানি মুছে দিলো। তারপর শিশুর মতো করে ফিসফিস করে বলল—

-"আমার অভিমানী রানি, তুমি রাগ করলে আমি বাঁচবো কীভাবে?"

সোহা মৃদু হেসে ফিসফিস করে উত্তর দিল—

-"আমি যদি রাগ না করি তবে রাগ ভাঙ্গানোর জন্য আপনি এত চেষ্টা তো করবেন না।"

দুজনের চোখাচোখি হলো। সেই দৃষ্টি ছিল অভিমান, ভালোবাসা আর জীবনের গভীর বন্ধনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কেবিনের চার দেয়ালের ভেতরে যেন নিঃশব্দে বেজে উঠলো সুখের সুর।

Story Cover