শিফা যা চেয়েছিল, অবশেষে তাই হলো। তীব্র তার কথা রেখেছে। দুজনের মৃত্যু হলো একই সাথে, একই নিশ্বাসের ছন্দে, একই ভাগ্যের বাঁধনে। তীব্র শিফাকে এক নিঃশ্বাসকালও একা ছেড়ে যায়নি। ঘুমের রাজ্যে, স্বপ্নের এক অপরূপ দৃশ্যের ভেতর হঠাৎ স্ট্রোকে তার জীবনাবসান ঘটে।
এমন দৃশ্য যেন স্বর্গও বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। একসাথে দুই প্রাণের প্রস্থান, কারও পক্ষেই মানা সম্ভব হচ্ছিল না। কতটা গভীর ভালোবাসা হলে এমন হয়? শিফার মৃত্যুর শোক তীব্রকে মুহূর্তে ভেঙে চুরমার করে দিলো। হৃদয়ের প্রিয়তমাকে ছাড়া সে থাকতে পারলো না এক মুহূর্তও। শিফার চোখ যখন চিরদিনের জন্য বন্ধ হলো, তীব্রের জীবনও সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গেল।
খান বাড়ি ও চৌধুরী বাড়ি শোকে স্তব্ধ। চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতার ছায়া। বাড়ি জুড়ে কান্নার ঢেউ, তবুও যেন কান্নার শব্দও গিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ছে অদৃশ্য কোনো শূন্যতায়। বাতাস ভারী, আলো ম্লান। আঙিনার মাটিতে ছড়ানো শুকনো পাতা যেন কাঁপছে অকারণ বাতাসে, আর সেই শব্দ মিলেমিশে যাচ্ছে সবার বুকফাটা আর্তনাদে।
মায়েরা শোকে ছটফট করছে। বুক চাপড়ে কান্না, কেউ আবার নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে, চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে আঁচল। বাবা-চাচা ভাইরা সবাই স্তব্ধ, চোখ ভিজে গেছে, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই, কেবল গভীর দীর্ঘশ্বাস। বৃদ্ধদের ঠোঁটে একটিই কথা বারবার ফিরে আসছে—
-"এমন ভালোবাসা... সত্যিই কি মৃত্যুকেও অমান্য করতে পারে?"
দুই দেহ পাশাপাশি শুয়ে আছে সাদা কাফনের ভেতরে। মশারির মতো সাদা কাপড়ের আচ্ছাদন তাদেরকে একসাথে ঢেকে রেখেছে, যেন মৃত্যুতেও তারা একে অপরকে ছাড়তে রাজি নয়। চারপাশে ধূপকাঠির ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে অশ্রুর গন্ধে। বাড়ির প্রতিটি কোণে এখন শুধু মৃত্যু-পরবর্তী শোকের অদৃশ্য শাসন, যেখানে কান্নাও থেমে গেছে, যেখানে রান্নাঘরের চুলাও নির্বাপিত।
পাশের ঘরে পায়চারি করছে কেউ, কেউ বারবার বাইরে গিয়ে আত্মীয়স্বজনদের আগমনের অপেক্ষা করছে। বড়রা বসে আছে শূন্যদৃষ্টিতে, ছোটরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে, প্রতিবেশীরা এসে ভিড় করছে, কেউ ফিসফিস করে সান্ত্বনা দিচ্ছে, কেউ শোকার্ত পরিবারের জন্য পানি এগিয়ে দিচ্ছে।
মৃত্যুর পর একটি বাড়ি যেমন নিস্তব্ধ, ভারী ও করুণ হয়ে ওঠে, খান ও চৌধুরী বাড়িতেও আজ ঠিক তেমনই পরিবেশ। দেয়াল, দরজা, জানালা, সব যেন বোবা সাক্ষী হয়ে আছে ভালোবাসার এমন এক মহিমার, যেখানে মৃত্যু-ও প্রেমিক যুগলকে আলাদা করতে পারেনি। তীব্র ও শিফাকে খান বাড়িতেই নিয়ে আসা হয়েছিল। চৌধুরী বাড়ির সবাই খান বাড়িতেই উপস্থিত।
শিফাকে তীব্রর ঠিক বাঁ পাশে কবর দেওয়া হলো। দুটি কবর পাশাপাশি, যেন মৃত্যুর পরেও তারা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে আছে। চারপাশের মাটি ভিজে আছে অশ্রুতে, শোকের ভারে বাতাসও স্তব্ধ।
ওরহান, ওসমান, মুফতি, মারুফ, ওমর খান আর ওয়াহিদ খানের চোখ ভিজে আছে নীরব অশ্রুতে। পুরুষরা হয়তো বুক ফেটে কাঁদে না, কিন্তু তাদের নিঃশব্দ কান্না আরও গভীর, আরও বেদনাময়। চোখের কোণে জমে ওঠা জল বারবার হাতের পিঠে মুছে নিচ্ছে তারা, অথচ হৃদয়ের ভেতরের আর্তনাদ কেউ শুনতে পাচ্ছে না।
অন্যদিকে বাড়ির ভেতরে বিমর্ষ হয়ে বসে আছেন সুরাইয়া বেগম, আয়রা বেগম, সাবা, সোহা, কেয়া ও পায়েল। ঘরের এক কোণে কেউ স্থির দৃষ্টিতে শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ অশ্রুসিক্ত চোখ মুছে আবার কান্না ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। নারীদের বুকফাটা আহাজারি ঘর ভরিয়ে তুললেও কোথাও যেন শূন্যতা, কোথাও নিস্তব্ধতা।
প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনরা এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। কেউ সান্ত্বনার হাত রাখছে কাঁধে, কেউ আবার নিঃশব্দে চোখ মুছছে। একে অপরের দিকে তাকিয়েই বোঝা যাচ্ছে, এ শোক ভাগ করার নয়, কেবল বহন করার। উঠোন ভরে গেছে মানুষে, তবু সবার মনে একই অনুভূতি, এ বাড়ি আর আগের মতো রইল না। চঞ্চল শিফার চঞ্চলতা হারিয়েছে খান বাড়ি
বাতাসে ধূপকাঠির ধোঁয়া মিশে আছে শোকের ভারী গন্ধে। চারদিকে শুধু এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
-"ভালোবাসা কি সত্যিই এত শক্তিশালী, যে মৃত্যুর প্রাচীরও তাকে আলাদা করতে পারে না?"
আজ খান বাড়ি ও চৌধুরী বাড়ি যেন দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নিদর্শন হয়ে, যেখানে মৃত্যুও প্রেমের কাছে পরাজিত হয়েছে।
.
.
.
কেটে গেছে ছয়টি দীর্ঘ মাস। শিফা আর তীব্রর মৃত্যুতে যে গভীর শোকের অন্ধকার খান বাড়িকে গ্রাস করেছিল, সময়ের স্রোতে সেই ব্যথা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। অশ্রুভেজা দিনগুলো মলিন হলেও, তাদের স্মৃতির আবেশ এখনো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। তবু জীবনের নিয়মে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, তাই খান পরিবারের আঙিনা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার আলোয় ভরে উঠতে শুরু করেছে।
এরই মধ্যে নতুন জীবনের আগমনী বার্তা যেন আলো ছড়িয়ে দিল। সাবার নয় মাস পূর্ণ হলো। পরিবারের সবার চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রত্যাশার দীপ্তি, যেন শোকের ধূসর মেঘ সরিয়ে জীবনের রঙিন আকাশ ফিরে আসছে। আর সত্যিই তাই হলো। কয়েকদিন পরেই সবার কোল আলো করে জন্ম নিলো এক ফুটফুটে রাজপুত্র। শিশুটির প্রথম কান্না যেন খান বাড়ির নিঃশ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ ভেঙে দিলো, চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো নতুন জীবনের সুরভি।
শিশুর নামকরণ নিয়েও আবেগ ভর করলো পরিবারকে। মৃত্যুর আগে শিফা স্বপ্নবিলাসী চোখে তার অনাগত ভাতিজার জন্য একটি নাম ঠিক করে গিয়েছিল। সেই নামই যেন তার শেষ ইচ্ছার প্রতিধ্বনি। ওসমান ও সাবা, চোখে অশ্রু আর মুখে পরম স্নেহের হাসি নিয়ে, নিজেদের সন্তানের জন্য সেই নামই বেছে নিলো। সেই মুহূর্তে সবার কণ্ঠ একসাথে উচ্চারিত হয়েছিল—
-"নীলাভ্র ইজহান খান।"
শিশুটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, শিফা যেন এখনো খান পরিবারের ভেতরেই বেঁচে আছে, তার স্বপ্ন, তার ভালোবাসা, তার নিঃশ্বাস এই নবজাতকের মধ্যেই নতুনভাবে জীবিত। ঘর ভরে উঠলো এক অদ্ভুত আলোয়, যেখানে মৃত্যুর শোক আর জীবনের আনন্দ একসাথে মিশে এক অনির্বচনীয় আবেগ সৃষ্টি করলো।
চোখ বুজলেই যেন বোঝা যায় এই দৃশ্য প্রত্যেকে হৃদয়ে ধরে রাখবে সারাজীবন।
.
.
.
ওরহান ও সোহার জীবনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ওরহান পুরোদমে অফিসের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। ছোটভাই যেন বউ আর বাচ্চার সঙ্গে সময় কাটাতে পারে, তাই কাজের সব চাপ নিজের কাঁধেই তুলে নিচ্ছে সে। অন্যদিকে, সোহার দিন কাটছে তার বুটিক নিয়ে ব্যস্ততায়।
এদিকে নীলাভ্রর বয়স এখন তিন মাস। পুরো খান বাড়ি যেন শিশুটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। তার এক চিলতে হাসি, মিষ্টি কান্না কিংবা ছোট্ট হাত-পা নাড়ানো, সবকিছুতেই পরিবারের সবার আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। ঘরে এখন এক নতুন জীবনের উচ্ছ্বাস, খুশির ঝলকানি।
সোহা রান্না ঘরে কাজ করছিল। বাড়ির বড় বউ হওয়ায় তার দায়িত্ব সব চেয়ে বেশি। কেয়া ও পায়েল অবশ্য তাকে যথেষ্ট সাহায্য করে। সাবা তো বাচ্চা নিয়ে পারে উঠে না। তাই তাকে কেউ কোনো কাজ করতে দেয় না। রান্না করতে করতে ক্লান্ত সোহা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লো। উদ্বিগ্ন হয়ে সবাই সোহাকে তার ঘরে শুইয়ে দিলো। ডাক্তার ডেকে আনা হলো। ডাক্তারের পরীক্ষার পর মুখে রহস্যময় হাসি ফুটলো। তিনি ওরহানের দিকে তাকিয়ে বললেন—
-"মিষ্টি মুখ করাও।"
ওরহান অফিসে ছিল। সোহার অজ্ঞান হওয়ার খবর শুনে সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছে। ওরহান হতভম্ব, বিস্মিত দৃষ্টিতে ডাক্তারকে প্রশ্ন করলো—
-"কেনো, আঙ্কেল?"
ডাক্তার স্নিগ্ধ হেসে উত্তর দিলেন—
-"বাবা হতে যাচ্ছ।"
এক মুহূর্তে পুরো বাড়ি আনন্দে ফেটে পড়লো। খুশির রোল উঠলো চারদিকে। ওমর খান আর ওয়াহিদ খান ছুটে গেলেন মিষ্টি আনতে। মেয়েরা সবাই সোহাকে ঘিরে ধরে উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে তুললো। সুরাইয়া বেগমও সোহার মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিলো চুমু দিল। তারপর হাসিমুখে সবাইকে নিয়ে বাহিরে চলে গেলেন, ছেলে আর ছেলের বউকে একান্ত সময় দেওয়ার জন্য।
বাড়ির কোলাহল নিস্তব্ধ হলে, এক শান্ত আবেশ নেমে এলো ঘরে। ওরহান আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে সোহার পাশে বসল। তার হাত দুটো সোহার হাতের উপর রাখলো। অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিসফিস করে বলল—
-"অনেক ঝড়-ঝাপটার পর অবশেষে আমরা সুখের মুখ দেখছি!"
তার চোখ বেয়ে নেমে এলো একফোঁটা অশ্রু, যা ঝলমল করে পড়লো সোহার আঙুলে। সোহা মৃদু হেসে, ভালোবাসার স্পর্শে সেই অশ্রুবিন্দু মুছে দিলো। তারপর নিঃশ্বাসের উষ্ণতা মিশিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল—
-"যা খারাপ হওয়ার হয়েছে, তা শেষ। আর পর থেকে আমাদের জীবনে যা আসবে, সবই ভালো হবে, ইনশা আল্লাহ্।"
এ কথা বলতেই এক অদ্ভুত আবেগে ভরে উঠলো পরিবেশ। ঘর যেন উষ্ণতার আলোয় দীপ্ত হলো। ওরহান সোহার কপালে আলতো চুমু খেলো, যেন তার সমস্ত কষ্ট আর দুঃখ মুছে দিতে চায়। সোহার চোখে জ্বলে উঠলো আশার দীপশিখা। তাদের দুজনের দেহ একে অপরের আরো কাছে এলো, হৃদস্পন্দন যেন এক হয়ে বাজতে লাগলো।
সেই নীরবতায়, বাইরের পৃথিবী দূরে সরে গেলো। শুধু রইলো দু’জন মানুষ, ভালোবাসা, আশা আর নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতিতে বাঁধা।
মধ্যরাত। সোহাকে ঘুম পাড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে ওরহান। পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরালো। নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশ কালো আঁধারে মোড়া, সেই আঁধার ভেদ করে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছেড়ে দিয়ে ওরহান আপন মনে বলতে লাগলো—
-"রাতের নীরবতা কেবল ক্যানভাস, সেখানে লেখা হয় মানুষের সবচেয়ে ব্যথিত আকাঙ্ক্ষা। সবার জীবনে পূর্ণতা মানে একসাথে বেঁচে থেকে জীবন কাটানো নয়, পূর্ণতা কখনো এক নিয়মে বাঁধা থাকে না। করো জীবনে পূর্ণতা মানে তীব্র ও শিফার মতন একসাথে মৃত্যু। যা সবার ভাগ্যে জোটে না। ভালোবাসার মানুষের সাথে জীবন সবাই কাটাতে পারে; কিন্তু মরতে কজন পারে? বুঝবার শক্তি নেই এই প্রশ্নে, কারণ মৃত্যু আল্লাহ্র ইচ্ছা, এক নিঃশব্দ নিয়ম, যা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আপনি মরার চেষ্টা করলেও সফল হবেন না আল্লাহ্ না চাইলে।
এখানে প্রশ্নটাই এক অন্যরকম পূর্ণতার, সে পূর্ণতা যে কেবল জীবনের রঙে নয়, বরং মৃত্যুর মুহূর্তের সংগে মিলেমিশে জন্মায়। আল্লাহ্ চাইলে সব হয়, সে ক্ষেত্রে আল্লাহ্ আপনার চাওয়া পূরণ করে, আপনার ভালোবাসার মানুষের সাথেই আপনাকে মৃত্যু দিলো; আর চেয়ে বড় পূর্ণতা আর কি আছে? মৃত্যুই চিরন্তন সত্য। ভালোবাসার মানুষের সাথে মৃত্যুবরণ করা সবার ভাগ্যে লেখা থাকেনা, এই সৌভাগ্যই প্রকৃত পক্ষে আধ্যাত্মিক পরিতোষ, এক রকম নীরব বিজয়।"
ওরহান সিগারেটের শেষ অঙ্গারটুকু বাতাসে মিলিয়ে দিতে দিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আকাশের দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভেতরে ফিরে এলো। নিদ্রিত সোহার কপালে চুমুর নরম ছাপ রেখে তার পেটে আলতো করে হাত রাখল। ফিসফিস স্বরে যেন নিজের অস্তিত্বকেই বলল—
-"সবার জীবনের পূর্ণতা এক নয়... আমার জীবনের পূর্ণতা তো জন্ম নিচ্ছে আমার নীলশ্যামার গর্ভে।"
সেই পবিত্র আশ্রয়ে স্নেহমাখা এক চুমু এঁকে ওরহান সোহাকে বুকের গভীরে টেনে নিল। বাইরে রাত নক্ষত্রে ভরে উঠছিল, আর ভেতরে এক নিঃশব্দ স্বপ্নের ভোর ফুটতে শুরু করেছিল।