বন্ধ, স্যাঁতসেঁতে এক ঘরে নিস্তব্ধতা যেন জমাট বাঁধা অন্ধকারের মতো ঝুলে আছে। মাঝখানে রাখা কাঠের চেয়ারে হাত-পা শক্ত করে বাঁধা এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ। বাঁধন এতটাই দৃঢ় যে তার সামান্য নড়াচড়ার চেষ্টাও করাতের মতো কর্কশ শব্দ তুলছে কাঠের গায়ে। আতঙ্কে ভিজে উঠছে তার কপালের ঘামবিন্দু। মুক্ত হবার মরিয়া চেষ্টা করেও সে যেন নিজের শরীরটাকে ছোটাতে পারছে না, বাঁধন কেবল আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠছে।
ঠিক সেই সময়, হঠাৎ করেই ঘরের ভারী দরজাটা কঁকিয়ে খুলে গেল। ভেতরের কালো অন্ধকারে সেই শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো ছড়িয়ে পড়ল। কারো ভারী পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তেই ঘরের আবহে এক অজানা শীতল স্রোত বইতে লাগল। বাঁধা মানুষটির চোখ বিস্ফারিত, অন্ধকার ছিঁড়ে উদ্ভাসিত হতে থাকা অবয়বগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হলো ছয়টি মুখ। আলোয় এসে দাঁড়াল তারা, ওরহান, ওসমান, মুফতি, মারুফ, তীব্র এবং তূর্য। প্রত্যেকের দৃষ্টি যেন ধারালো ছুরির মতো বিঁধে বসেছে বাঁধা লোকটির গায়ে। ঘরের ভারী বাতাসে নিঃশব্দ চাপা উত্তেজনা কাঁপতে লাগল। ওরহান মুখ ভার করে দাঁড়াল তার সামনে। তার দৃষ্টি শান্ত হলেও গভীরে লুকানো অগ্নির ঝলক স্পষ্ট।
সে আসলে তীব্রকে এখানে আনতে চায়নি। কিন্তু তীব্র, আবেগ আর জেদের বশে, জোর করেই ঢুকে পড়েছে এই গোপন আড্ডায়। তার চোখে এক অস্থিরতা, এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা, যেন কিছু প্রমাণ করার জন্যই এখানে আসা।
ছয়জন দাঁড়িয়েই আছে, আর বাঁধা মানুষটি তাদের সামনে অসহায় শিকারের মতো কাঁপছে। ঘরজুড়ে শ্বাসরুদ্ধ এক ভৌতিক নীরবতা, যেন মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য কোনো বিস্ফোরণ ঘটতে চলেছে। ওরহান ধীরপায়ে বাঁধা মধ্যবয়স্ক লোকটির সামনে এসে দাঁড়াল। তার শীতল দৃষ্টির নিচে লোকটির চোখে আতঙ্ক জমে উঠল। পকেট থেকে বের করল একটি ভারী কাটার, যা গাছের মোটা ডাল কেটে ফেলার কাজে ব্যবহার হয়। চকচকে ধারালো লোহার ফলক আলোয় ঝিলমিল করে উঠতেই ঘরের নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে উঠল। কাটারটি হাতে নিয়ে খেলাচ্ছলে ঘোরাতে ঘোরাতে ওরহান ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল—
-"মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলাম বুঝলেন, কাকু? কিন্তু আপনার ছেলে সেই আনন্দযাত্রাকে বিষচন্দ্রিমায় রূপান্তর করেছে। আচ্ছা বলুন তো, আপনার ছেলের সমস্যা টা আসলে কোথায়? ভার্সিটির জীবন শেষ বহু বছর আগে, তবু এতোদিন সে শুধু আমার ক্ষতি করেছে, আমি কিছুই বলিনি। অথচ এখন সে আমার পরিবারের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে। বলুন দেখি, ওর সঙ্গে কি করা উচিত?"
বাঁধা লোকটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো। কাঁপা কণ্ঠে সে বিড়বিড় করে বলল—
-"বাবা, কি বলছ এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।"
ওরহান ঠাণ্ডা হাসল। ধীরে ধীরে তার চারপাশে ঘুরতে লাগল, যেন শিকারিকে ঘিরে বন্য পশু শিকারের আনন্দ নিচ্ছে। তারপর বিদ্রুপ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
-"আপনার ছেলে আমার বোনকে অপহরণ করেছে। ভাবতে পারেন? আর সেই পাপিষ্ঠ সাহস দেখিয়েছে আমাকে মেসেজ করে জানাতে! আমি নববধূকে ফেলে হানিমুন ভেঙে কুত্তার মতো দৌড়ে এসেছি দেশে। শুধু তাই নয়, দেখুন, আমার বোনের স্বামীকেও রক্তাক্ত করে ফেলেছে।"
হঠাৎ থেমে গেল ওরহান। লোকটির কাঁধের কাছে নত হয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
-"আপনার ছেলে কোথায়, চাচা?"
লোকটি আতঙ্কে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু শব্দ বেরোনোর আগেই ঝলকে উঠল কাটারের ধার। মুহূর্তেই লোকটির ডান হাতের একটি আঙুল ছিঁড়ে পড়ল। চারদিক কাঁপিয়ে উঠল এক বীভৎস চিৎকার।রক্তে ভিজে ওঠা কাটারটি হাতে নিয়ে ওরহান আবার ঝুঁকে এলো, যেন তার কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে কানের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে—
-"প্রতিবার মিথ্যে বলার চেষ্টা করলে একটি করে আঙুল হারাবেন।"
লোকটির বুক ধড়ফড় করে উঠল। হাঁটুর বয়সী এক তরুণের হাতে এইভাবে অপমানিত ও অত্যাচারিত হবে, এমন কল্পনাও সে কোনোদিন করেনি। কিন্তু সন্তানের অপরাধের বোঝা তাকে আজ এই শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অবশেষে ভয় আর যন্ত্রণার কাছে হার মেনে, কাঁপতে কাঁপতে সত্য স্বীকার করে নিল সে।
শিফাকে আটকে রাখা হয়েছে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে। ভাঙাচোরা দেয়াল, শ্যাওলা ধরা জানালা আর অন্ধকারে ঢাকা সেই বাড়িটি যেন নিঃশব্দে লুকিয়ে রেখেছে এক ভয়ঙ্কর কিছু। বাতাসে ভাসছে শূন্যতার গন্ধ, জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে এক শীতল স্রোত, যেন ভেতরে কারও অসহায় নিঃশ্বাস বন্দি হয়ে আছে।
ঠিকানা হাতে পাওয়া মাত্রই আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি কেউ। ধুলো উড়িয়ে, কাঁকড়া পিষে ছুটে গেছে তারা সেই অভিশপ্ত বাড়ির দিকে। গাড়ির চাকার গর্জন রাতের নীরবতা চিরে যেন মৃত্যুঘণ্টার মতো বাজতে লাগল। প্রত্যেকের চোখে জ্বলছে একটাই লক্ষ্য, শিফাকে উদ্ধার করা। সময় যেন থেমে আছে, অথচ প্রতিটি সেকেন্ড তাদের শিরায় শিরায় বজ্রের মতো বইছে।
রাত ঘনিয়ে এসেছে। আকাশ জুড়ে নেই কোনো চাঁদের আলো, কেবল কালো মেঘের ভারী পর্দা। বাতাসে হঠাৎ দমকা হাওয়া উঠে শীতল স্রোত বইয়ে দেয়। দূরে কোথাও কুকুরের কর্কশ ডাক, যা আরও ভয়াবহ করে তোলে পরিবেশটাকে। শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভাঙাচোরা বাড়ি, কংক্রিটের ফাটল যেন দুঃখে ভেঙে পড়তে চাইছে, অর্ধভাঙা কাঁচের জানালায় ঝুলছে অন্ধকারের কুৎসিত ছায়া। শ্যাওলা ধরা দেয়ালে জমাট অন্ধকার এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন বহু যুগ ধরে এখানে মানুষের ছায়াও পড়েনি। স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভেসে আসে এক অচেনা দুর্গন্ধ, আর সেই সাথে ভেতরের অদ্ভুত নীরবতা বাড়িয়ে দেয় আতঙ্কের মাত্রা।
ঘরের ভেতরে মাঝখানে মাটির সাথে লোহার শিক দিয়ে বাঁধা শিফা। তার দুই হাত শক্ত রশিতে বাঁধা, মুখে কাপড় চেপে দেওয়া। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় মাথা, হাত-পা জুড়ে ক্ষতচিহ্ন। রক্ত শরীরেই শুকিয়ে পাথর হয়ে আছে। দুইদিন-দুই রাত না খেয়ে দুর্বল শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। পালাবার শক্তি নেই, আশার আলো নেই। চোখে ভয় আর গভীর ক্লান্তির ছাপ। শরীর অবিরাম কাঁপছে, আর সেই কাঁপা নিঃশ্বাসের সাথে ঘরটিতে ছড়িয়ে পড়ছে এক শীতল আতঙ্ক। বহুবার মুক্তি পাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই হাত-পা ছটফট করে শেষে পরাজিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে গেছে। চারদিকের অন্ধকারে কেবল শোনা যাচ্ছে তার দ্রুত হৃদস্পন্দন, এক বেদনাময় সঙ্গীতের মতো।
ঠিকানা হাতে পাওয়া মাত্রই সবাই ছুটে এসেছে সেই বাড়িতে। আশেপাশে একটি মানুষের ছায়াও দেখা গেলো না, সম্ভবত চাচাকে তুলে নেওয়ার খবর পেয়ে পালিয়ে গেছে সে। এখন কেবল শিফাকে বাঁচানোই একমাত্র লক্ষ্য। ওরহান, তীব্র, ওসমান, মুফতি, মারুফ, ইহাব, তূর্য, সবাই একসাথে এসেছে। সাথে রয়েছে অসংখ্য বডিগার্ড। কারণ যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ নেমে আসতে পারে, বলা যায় না কোথা থেকে বিপদ ছুটে আসবে। সবাই সতর্ক, প্রত্যেক পা ফেলার সাথে সাথে বাতাসে ভাসছে উত্তেজনার চাপা গর্জন। বাড়ির দিকে তারা যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে, মনে হচ্ছে যেন মৃত্যু তাদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্ধকারে আচ্ছন্ন পুরো বাড়িটিতে দল ছড়িয়ে পড়ল। ভাঙা দরজা, কর্কশ কড়িকাঠ, শ্যাওলা ধরা মেঝে পেরিয়ে তারা খুঁজতে লাগল প্রতিটি কোণ। বাতাস ভারী হয়ে আছে, যেন দেয়ালগুলোও নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। অবশেষে এক নির্জন কক্ষে দেখা মিলল শিফার, লোহার শিকের সাথে হাত-পা বাঁধা, মুখে কাপড় গোঁজা। নিথর শরীর কাঁপছে, চোখে ক্লান্তি আর আতঙ্কের ছাপ। তীব্রআর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে বুকের সাথে আগলে নিল শিফাকে। এক মুহূর্তের দেরিও করল না, হাতের বাঁধন, পায়ের বাঁধন, মুখের বাঁধন সব ছিঁড়ে খুলে দিল। সারামুখ জুড়ে ছড়িয়ে দিল অগণিত চুমু। কান্নায় ভেঙে পড়ল তীব্র, চোখে ঝাপসা জল, বুকের ভেতরে হাজারো ব্যথার হাহাকার।
শিফাও কাঁপতে কাঁপতে হেঁচকি তুলে কান্না শুরু করল। অস্পষ্ট গলায় ভাঙা সুরে বলল—
-"কোথায় ছিলেন আপনি? আমি কত ভয় পেয়েছিলাম জানেন?"
তীব্র কাঁপা গলায় তার কানে ফিসফিস করে বলল—
-"এইতো এসেছি সোনা... দেরি করে আসার জন্য সরি। তুমি ঠিক আছো তো?"
শিফা মাথা নাড়তে নাড়তে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। সেই নাড়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার গভীর অসহায়ত্ব, সে মোটেও ঠিক নেই।
ততক্ষণে ওরহান, ওসমান, মুফতি, মারুফ, ইহাব, তূর্য সবাই ছুটে এসে ঘরে ঢুকল। ভাইদের দেখে শিফা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছোট্ট শিশুর মতো কান্না ভেঙে পড়ল। ওরহান আর ওসমান ছুটে গিয়ে বোনকে আগলে নিল। সবার চোখ জলভেজা, তাদের বোনের এই দুর্দশা সহ্য করার মতো নয়। ওরহান শিফার মুখ দুই হাতের আজলায় নিয়ে গভীর উদ্বেগে বলল—
-"কোনো ক্ষতি করেছে তোর? মেরেছে?"
শিফা মাথা নাড়ল—
-"না... কিছুই করে নি। সেইদিন রাতে এনে রেখে গেছে... আর একবারও আসে নি।"
ওরহানের চোখ জ্বলে উঠল ক্রোধে। দাঁত চেপে বলল—
-"ওকে যদি হাতের কাছে পাই... পিস্ পিস্ করে কেটে ফেলব!"
ওরহান শিফাকে ধরে উঠাল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আড়াল থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ। মৃত্যু যেন হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল! গুলিটা সোজা ওরহানের বুকের দিকে ছুটে আসছিল। শিফা সেটা লক্ষ্য করে। এক ঝটকায় সে ওরহানকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। আর তার নিজের বুক বিদীর্ণ হলো গুলির আঘাতে। মুহূর্তের মধ্যেই শিফা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। এতটাই দুর্বল ছিল যে একটিও চিৎকার বের হলো না তার কণ্ঠ থেকে।চারদিক কেঁপে উঠল চিৎকারে। "শিফা" সবার কণ্ঠ একসাথে ছিঁড়ে গেল।
ওদিকে গুলি চালানো আততায়ী পালাতে চাইছিল। কিন্তু বডিগার্ডরা মুহূর্তেই তাকে ধরে ফেলল। অথচ তখন আর কারও চোখ সেই দিকে নেই, সবাই ছুটে গেল শিফার দিকে। তীব্র কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে শিফাকে কোলে তুলে নিল। তার চোখে অগ্নি, বুকে অগ্নি, আর চোখের জলে ডুবে আছে পৃথিবীর সব যন্ত্রণা। আর কোনো দেরি নয়। সবাই মিলে দ্রুত ছুটে গেল গাড়ির দিকে। চাকা ঘুরল বজ্রবেগে। রাত চিরে ছুটে চলল গাড়ি, শিফাকে বাঁচানোর জন্য, সময়ের সাথে এক মরিয়া লড়াইয়ের জন্য। হাসপাতালের পথে সেই মুহূর্তটা যেন মৃত্যুর সাথে দৌড়।
.
.
.
শিফাকে তড়িঘড়ি করে অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। মুহূর্তেই হাসপাতালের করিডোর জুড়ে শীতল বাতাসে ভেসে উঠল উদ্বিগ্ন পায়ের শব্দ। খান বাড়ি আর চৌধুরী বাড়ির সবাই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে এসেছে। প্রত্যেকের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ, অস্থির ভঙ্গিতে বসে আছে নীরবতার ভেতর। সেই নীরবতা যেন শ্বাসরুদ্ধকর, কেউ কথা বলছে না, শুধু মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে ভারী নিশ্বাস ফেলার শব্দ আর করিডোরে নার্সদের দ্রুত পায়ের আওয়াজ। দেওয়ালের সাদা রঙের মতোই সবার মুখ ফ্যাকাশে, ভয় আর আশঙ্কার অদৃশ্য ছায়া গ্রাস করেছে পুরো পরিবেশ।
কেউ হাত মুঠো করে বসে আছে, কেউবা প্রার্থনারত ভঙ্গিতে চোখ বুঁজে রেখেছে। সময় যেন জমাট বেঁধে আছে, প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি ভারী পাথর। শিফার ভাগ্য এখন অপারেশন থিয়েটারের সাদা দরজার আড়ালে লুকিয়ে। আর দরজার ওপাশে কী ঘটছে, সেই অদৃশ্য অজানার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই যেন নীরবে প্রার্থনা করছে— "শিফা বাঁচুক!"
সোহা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো বিধ্বস্ত ওরহানের কাছে। ওরহান চোখ তুলে তাকাতেই সোহাকে দেখে এক মুহূর্তে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। শিশুর মতো হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লো ওরহান। ভাঙা কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলো—
-"আমার একমাত্র আদরের বোনের এই অবস্থা হলো! আমার সাথে শত্রুতা ছিল, আমার ওপরে প্রতিশোধ নিতো, কিন্তু না... বারবার তোমাকে, আমার পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করেছে।"
সোহা তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো। নিজের চোখের পানি আটকে রাখতে না পারলেও সান্ত্বনার হাত বাড়ালো। ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল—
-"কিছু হবে না, হীর... শিফা সুস্থ হয়ে উঠবে। আপনি যদি এভাবে ভেঙে পড়েন, তবে আমাদের সামলাবে কে? আপনাকে শক্ত হতে হবে, আমাদের জন্য।"
ওরহান গভীর শ্বাস নিলো। ধীরে ধীরে সোহাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। চোখের পানি মুছে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"ঠিক বলেছ তুমি। তুমি সবাইকে দেখে রেখো। আমি ওই জানোয়ারের ব্যবস্থা করে আসছি।"
ঠিক তখনই তীব্র এগিয়ে এলো। তীব্রর চোখে আগুন জ্বলে উঠছে। সে বলল—
-"আমিও যাবো আপনার সাথে।"
ওরহান তার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো, তারপর মাথা নেড়ে নীরব সম্মতি জানালো। সোহা দুজনকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলো, কাঁপা কণ্ঠে অনুরোধ করলো, কিন্তু কেউ শুনলো না।
হাসপাতালের করিডোর থেকে বেরিয়ে গেল দুই উন্মাদ মানুষ, একজন বোনের জন্য পাগলপ্রায় বড় ভাই, আরেকজন নিজের ভালোবাসার জন্য দুঃসাহসী স্বামী।
.
.
.
ওরহান ও তীব্র ফিরে এলো সেই পরিত্যক্ত বাড়িতে। ভগ্ন দেয়ালের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ভেতরে ঢুকছে, আর বাতাসে পচা গন্ধ ও ধুলোর কটু দুর্গন্ধ মিশে আছে। ঘরের মাঝখানে কাঠের পুরনো ভাঙা চেয়ারে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা রুদ্র, যেভাবে শিফাকে একসময় আটকে রাখা হয়েছিল, সেই একই ভঙ্গিতে।
ওরহান সামনে এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর কলার মুঠো করে ধরলো। ক্রোধে তার চোখ রক্তাভ। গর্জে উঠলো—
-"আমার সাথে শত্রুতা ছিল, আমার উপরেই প্রতিশোধ নিতি। আমার পরিবারকে কেনো টানলি এর মধ্যে? আমার বোনকে কেনো কষ্ট দিলি?"
রুদ্রর ঠোঁট থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, শ্বাস কষ্টে দম নিতে পারছে না। তবুও ফিসফিসিয়ে বলল—
-"তুই লিজাকে ভুলে গেছিস, ওরহান? ভার্সিটির সবার সামনে তাকে অপমান করেছিলি তুই। লিজা সেই অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল। সে আমার ভালোবাসার মানুষ ছিল। তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই, আমি তোমার পরিবারকে নিশানা করেছি। শিফা ছিল শুধু শুরু!"
রুদ্রর এই স্বীকারোক্তি শুনে মুহূর্তেই ওরহানের রক্ত মাথায় উঠে গেলো। তীব্রর চোখেও নেমে এলো হত্যার ঝড়। দুজনের প্রতিশোধে উন্মত্ত হাত উঠলো রুদ্রর উপর।
ওরহানের হাতে থাকা লোহার রড আছড়ে পড়লো রুদ্রর হাঁটুতে। মুহূর্তেই ভয়ানক কচকচ শব্দে হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। রুদ্র চেয়ারে দুলে উঠলো, এক অমানবিক আর্তনাদ ছিঁড়ে দিলো বাতাস। তীব্র পিছনে সরে এসে বুটজোড়া ঠুকে দিলো তার পেটের উপর, রুদ্রর শরীর বেঁকে গেলো, মুখ দিয়ে রক্ত আর লালার ফেনা গড়াতে লাগলো। ওরহান আঘাত করতে করতে চেঁচিয়ে বলল—
-"তোর লিজা আমার সোহাকে মিথ্যে বলেছিল অপমান করেছিল। আমি যেটা করেছিলাম ওর কর্ম ফল ছিল। আর তুই কি করলি? আমার সোহাকে বারবার আঘাত করার চেষ্টা করেছিস। মিহিরিমার সাথে হাত মিলিয়েছিলি। সোহাকে না পেরে তুই আমার আদরের ছোটবোনকে মৃত্যু দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছিস। এখন তোর সাথে যা হবে সেটা তোর কর্ম ফল।"
ওরহান রড আছড়ে মারলো তার কাঁধে, হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেলো। তীব্র মুঠো দিয়ে ঘুষি মারতে মারতে রুদ্রর মুখের দাঁত একে একে ভেঙে ফেললো। দাঁতগুলো টুপটাপ শব্দ করে রক্তে ভিজে মেঝেতে পড়তে লাগলো। রুদ্রর শরীর থেকে রক্ত নদীর মতো গড়িয়ে যাচ্ছিলো, মেঝে লাল হয়ে উঠলো।
তীব্র একটা কেরোসিনের কৌটা এনে রুদ্রর গায়ে ঢেলে দিলো। দেশলাই কাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, শুধু একটুখানি আগুন ছোঁয়ালেই পুরো শরীর পুড়ে ছাই হবে। আতঙ্কে রুদ্র ছটফট করতে লাগলো, চোখ ফেটে বেরিয়ে আসবে এমন অবস্থায়। অত্যাচারের প্রতিটি মুহূর্তে রুদ্রর গলা থেকে বেরোচ্ছিলো জন্তুর মতো হাহাকার, আর সেই হাহাকার চারদিকের অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো।
কিন্তু মানুষের মরিয়া বেঁচে থাকার চেষ্টা শেষ মুহূর্তেও তাকে শক্তি দেয়। রক্তে ভেজা দড়ির এক পাশ নিরন্তর লড়াইয়ে একটু একটু করে আলগা হয়ে গিয়েছিল। ওরহান যখন রড আবার তুললো, আর তীব্র দেশলাই নিয়ে তার চোখে চোখ রেখে হুমকি দিচ্ছিলো, সেই ফাঁকেই রুদ্র চেষ্টা করে বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে সক্ষম হলো।
দড়ি ছিঁড়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই উঠে দাঁড়ালো সে। শরীর ক্ষতবিক্ষত, হাড় ভাঙা, তবুও মৃত্যুভয় তাকে দৌড়াতে বাধ্য করলো। অন্ধকার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলো রুদ্র, দরজা ভেঙে করিডোরে, তারপর বাইরের রাস্তায়। ওরহান আর তীব্র এক পলকের জন্য চোখ শরিয়েছিল। সেই সুযোগই রুদ্র কাজে লাগিয়েছে। ওরহান তীব্র দুজনেই গর্জন তুলে পেছনে ছুটলো, পাগলা শিকারের মতো।
কিন্তু রুদ্রর ভাগ্যে ছিলো অন্য রকম মৃত্যুর লিখন। অন্ধকার রাস্তায় হঠাৎই সামনের দিক থেকে এক বিশাল ট্রাক গর্জন তুলে এগিয়ে এলো। চোখের পলকে সেই ট্রাক রুদ্রকে পিষে দিলো। মুহূর্তেই হাড়-মাংস চূর্ণ হয়ে এক বিকৃত দেহে পরিণত হলো সে। মাথা, হাত, বুক, কোনো অঙ্গ অবিকৃত রইলো না। রাস্তার পিচ লাল হয়ে উঠলো রক্তে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো মৃত্যুর কটু গন্ধ।
ওরহান আর তীব্র স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলো সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সামনে। প্রতিশোধ সম্পূর্ণ হলো বটে, কিন্তু তাদের চোখে প্রতিশোধের শীতল আগুনের বদলে ছায়া ফেললো অদ্ভুত এক শূন্যতা।
.
.
.
শিফাকে অবশেষে নরমাল কেবিনে স্থানান্তর করা হলো। ডাক্তাররা জানালেন, শিফার প্রিম্যাচিউর ভাবে জন্ম হয়েছিল। জন্মের সময় শরীর পূর্ণতা পায়নি, তাই তার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল। সামান্য সংক্রমণ বা ক্লান্তিতেই তার দেহ ভেঙে পড়ে। এই দুর্বলতার সাথে যোগ হয়েছে আরও ভয়াবহ দুঃসহতা। দুর্ঘটনার পর টানা দুই দিন সে কিছুই খেতে পারেনি, যার ফলে তার শরীর মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় পড়ে গেছে, রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত কমে গিয়েছিল। ক্ষুধার্ত শরীরটিতে আর শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। দুর্ঘটনায় হাড়ভাঙা আঘাত, ভেতরে রক্তক্ষরণ আর তার ওপরে গুলির আঘাত, সব মিলিয়ে তার দেহ আর সামাল দিতে পারেনি।
ডাক্তাররা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, শিফার দেহ এখন শকের মধ্যে। রক্ত সঞ্চালন বিঘ্নিত, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, অঙ্গগুলো একে একে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যত চিকিৎসাই করা হোক, তার শরীর প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো শক্তি রাখে না। পরিবারের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার মৃদু কণ্ঠে বললেন—
-"তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। কোনো চিকিৎসায় তাকে আর সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব হবে না। আপনারা তার সাথে শেষ কিছু মুহূর্ত কাটান।"
ডাক্তারদের সেই রায় যেন আকাশভেঙে পড়লো সবার মাথায়। শিফাকে কেবিনে রাখা হলো, যাতে পরিবারের আপনজনেরা তার পাশে থেকে শেষ মুহূর্তের স্পর্শ, শেষবারের মতো কথা বলার সুযোগ পান। কেবিনের বাইরে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবার উৎকণ্ঠিত মুখ। একে একে সবাই শিফার পাশে যাচ্ছে, তার হাত ধরে কথা বলছে, আর চোখের পানি গোপন করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। কেবিনের দরজার বাইরে জমে থাকা নীরবতা যেন মৃত্যুর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ওমর খান ও সুরাইয়া বেগম জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতে ভেঙে পড়েছিলেন। একমাত্র মেয়ের মৃত্যুসংবাদ তাদের বুক বিদীর্ণ করে দিয়েছিল। শোকের চাপে তারা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন। বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। সবাই মিলে তাদের বোঝালেন, শান্ত করলেন। অবশেষে তারা নিজেদের ভেঙে পড়া বুক সামলে মেয়ের কক্ষে প্রবেশ করলেন। শিফা তাদের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসি দিলো। কণ্ঠে কাঁপন, তবু দৃঢ়—
-"আব্বু, আম্মু, প্লিজ কান্না করবেন না। আমি কষ্ট পাবো।"
সন্তানের শেষ ইচ্ছে রাখতে বাবা-মা সমস্ত যন্ত্রণা বুকের ভেতর চেপে রাখলেন। অশ্রুজলে ভিজে যাওয়া চোখ লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন, যদিও সেই হাসি ছিল হাজারটা ছিন্নভিন্ন কাঁটার মতো বেদনায় ভরা।
এই সময় ওরহান ও তীব্র ভেতরে প্রবেশ করল। ডাক্তার অনুমতি দিয়েছিলেন মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। হাসপাতালের নির্জন করিডরে শুনে এসেছিল ভয়ানক খবর, শিফার হাতে আর বেশি সময় নেই। তাদের নিঃশ্বাস আটকে এলো, বুকের ভেতর জমাট বাঁধল অচেনা শূন্যতা। কোনো ভাষা খুঁজে পেল না তারা।
ওরহান ধীরে ধীরে শিফার পাশে গিয়ে বসল। তার হাত দুটো নিজের হাতে জড়িয়ে ধরল। বুক ফেটে কান্না ঝরতে লাগল। কণ্ঠরোধ হয়ে এলেও বলল—
-"ক্ষমা করে দে, বোন। আমি তোকে বাঁচাতে পারলাম না।"
শিফা চোখ তুলে তাকাল। মৃত্যুর ছায়া মুখে স্পষ্ট, তবু তার হাসি ছিল স্বর্গীয় শান্তির মতো।
-"এইভাবে বলো না দাদাভাই। কার মৃত্যু কেমন লেখা আছে, তা কেউ বলতে পারে না।"
ওরহান হাহাকার ভরা নিঃশ্বাস ফেলল। চোখের জল দমিয়ে বলল—
-"তুই ঠিক বলছিস। তোকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে যে, সে তোকে ছাড়িয়ে অনেক আগেই চলে গেছে। তার কবরও জোটেনি। ট্রাক তার শরীর থেতলে দিয়েছে। পুলিশ তার ছিন্নভিন্ন দেহের অংশ খুঁজে জোগাড় করার চেষ্টা করছে, কিন্তু বৃথা।"
শিফা হালকা ম্লান হাসি দিয়ে ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরল। ফিসফিস করে বলল—
-"দাদাভাই, আমার একটা কথা রাখবে?"
ওরহানের বুক কেঁপে উঠল। চোখ জলে ভরে এল। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে প্রতিজ্ঞার মতো বলল—
-"বল, তোর সব কথা রাখবো!"
ঘরটিতে শোকের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু কান্নার দমকা শব্দে বাতাস কেঁপে উঠছে। বুকফাটা আর্তনাদ স্তব্ধ হয়ে জমে আছে ঘরের দেয়ালে। সেই ভারী পরিবেশের ভেতরে শিফার কণ্ঠ ভেসে এল, একটি নিঃশেষিত জীবনের শেষ আলোড়ন যেনো। শিফা ধীরে ধীরে বলল—
-"তুমি ভাবীকে নিয়ে সুখে সংসার করো। আর কখনও আলাদা হয়ে যেও না। তোমাদের ঘর জুড়ে যেনো ফুটফুটে বাচ্চা আসে। আর আমাকে যখন মনে করবে, কখনও কেঁদো না। আমি কষ্ট পাবো!"
ওরহান কাঁপা গলায় উত্তর দিলেন—
-"কথা দিলাম।"
শিফা হাতের ইশারায় সোহাকে কাছে ডাকল। কান্নায় চোখ-মুখ ফুলে গেছে সোহার। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শিফার কাছে এল সে। শিফা তার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ভাঙা, দুর্বল কণ্ঠে শিফার শেষ ইচ্ছে ধ্বনিত হলো—
-"আমার দাদাভাই তোমায় অনেক ভালোবাসে। কখনও তাকে কষ্ট দিও না। আমাকে ভুলে যেও না। তোমার বাচ্চাদের বলবে, তাদের একটা ফুপু ছিল, আছে, যে এখন আকাশের তারা হয়ে গেছে। আমি তারা হয়ে সবসময় তোমাদের দেখব। কিন্তু আমাকে মনে করে কখনও কেঁদো না। সুখের মুহূর্তে, হাসি মুখে আমাকে মনে করবে কেমন?"
সোহা কথা বলতে পারল না। গলা আটকে গেছে তার। বুক থেকে শুধু অসহায় হেঁচকি উঠে আসছে। চোখের জলে ভিজে গেছে মুখ। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতির আভাস দিল সে।
ঘরের ভেতর শোকের ঢেউ আরেকবার ঝড় তুলল। চারপাশে নিস্তব্ধ মানুষগুলো যেনো জমাট বেঁধে থাকা পাথর, শুধু চোখের জলই তাদের জীবিত থাকার প্রমাণ দিচ্ছে। সবশেষে এগিয়ে এল তীব্র। তীব্র ও শিফাকে একাকী সময় দেয়ার জন্য সবাই বেরিয়ে গেলো।
তীব্রর মাথা নিচু, কপালে কাটা দাগ এখনো ব্যান্ডেজে মোড়া। তার পদক্ষেপ নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে শিফার পাশে এসে থামল। সে বসে পড়ল শিফার কাছে, মাথা আরো নিচু হয়ে গেল।শিফা নিথর চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর কণ্ঠ থেকে ভেসে এলো ফিসফিস করা শব্দ, যা শুনে ঘরের বাতাসও যেন থমকে গেল—
-"আপনাকে আমি অনেক ভালোবাসি। কখনও ভাবী নি, এইভাবে আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনি কি আমার ওপর অসন্তুষ্ট? কেন নজর ঘোরাচ্ছেন, আমার দিকে তাকান!"
তীব্রের চোখে নোনাজল লেগে ভাঁজ কেটে পড়ে, সে দুপাশে মাথা নেড়ে নিশ্চিহ্ন করে, ভাষা হারায়। শিফা মৃদু কণ্ঠে বলে—
-"নীল, আমাদের সংসার এ জীবনে পূর্ণতা পেল না।"
তীব্র হঠাৎ শিফার দিকে তাকাল, তার চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক, যেনো ক্ষত আর অঙ্গিকার এক্সঙ্গে জেগে উঠে। ধীরে ধীরে শিফার কাছে এসে, কপালে আগুন-শীতল এক চুমু দিল—
-"প্রণীতা, ভয় করো না। পরপারে আমাদের গৃহ রচিত হবে। আমার সমাধির বাঁ পাশে শায়ন করবে তুমি। মর্ত্য থেকে মাটির অন্তরাল অবধি আমি তোমায় অবিচ্ছিন্ন রাখব, প্রিয়তমা। এক নিশ্বাসকালও তোমায় একাকী ছাড়ব না। আমি আসব তোমার পিছু পিছু। কথা দিলাম!"
শিফা তীব্রের কলার ধরে টেনে নিজের দিকে আনে, তীব্রের মুখ এখন শিফার মুখের খুব কাছে। হাহাকার আর অটল অঙ্গীকার মিলেমিশে ঘরের বাতাসকে ভারাক্রান্ত করে। শিফা ফিসফিস করে, গলার কম্পে বলে—
-"আমি আপনার অপেক্ষায় থাকবো।"
ঘর জুড়ে তখন স্তব্ধতা, যেন সময় নিজেই থেমে গেছে। তীব্রর চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। সেই নোনা জলে আলো ঝলসে উঠল ক্ষীণ প্রদীপের মতো। শিফা মলিন মুখে হালকা স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলল, এক শেষ দীপ্তি, মৃত্যুর আগে ভালোবাসার দ্যুতি।
সে নিজের অধর ধীরে এগিয়ে এনে ছুঁইয়ে দিল তীব্রর অধরে। মুহূর্তেই ঘর ভরে উঠল অদ্ভুত আবেশে। দুজনের চোখ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে গেল। চারপাশের শোক, কান্না, ভাঙা নিঃশ্বাস সব হারিয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। যেন কেবল তারা দুজনেই আছে, মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে জীবনের শেষ পূর্ণতার স্বাদ নিচ্ছে।
কতক্ষণ এইভাবে নিথর হয়ে ছিল তারা, কেউ জানে না। হয়তো ক্ষণিক, হয়তো অনন্তকাল। সময় তখন মুছে গিয়েছিল। তীব্র শুধু জানত, ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, শিফার ঠোঁট তার ঠোঁট থেকে আলগা হয়ে যাচ্ছিল। তার শক্ত করে ধরা কলারের হাত ঢিলে হয়ে এলো। আঙুলগুলো ফসকে যেতে লাগল, যেন জীবনের সুতো ছিঁড়ে যাচ্ছে। শিফার গরম নিশ্বাস আর তীব্রর মুখে পড়ছিল না। বাতাস নিস্তব্ধ হয়ে এলো, এক অদৃশ্য যন্ত্রণার ভারে ঘর ভরে উঠল। তীব্র বুঝল, শেষ হয়ে আসছে... অথচ শিফার সেই নিভে যাওয়া নিঃশ্বাসেও ছিল শুধু ভালোবাসার গন্ধ।
ঘরটিতে যেন সময় থমকে দাঁড়াল। চারদিকে সবার বুকফাটা কান্না চাপা পড়ে নিস্তব্ধতা হয়ে ঝুলে আছে, অথচ তীব্রর জগৎ যেন সীমাবদ্ধ হয়ে গেল শিফার ক্ষীণ নিঃশ্বাসে।
ধীরে ধীরে সে শিফার শরীর বালিশে ছুঁইয়ে দিলো, যেন ভেঙে না যায়, যেন ফুলের পাপড়ি আলগা না হয়ে যায়। অশ্রুসিক্ত নয়নে অবিরাম তাকিয়ে রইলো শিফার মুখের দিকে, একইসাথে শান্ত, আবার মৃত্যুর ছায়ায় আচ্ছন্ন। কতক্ষণ এভাবে বসে ছিল তীব্র, সে নিজেই জানে না। হয়তো কয়েক মুহূর্ত, হয়তো যুগের সমান দীর্ঘ। সময়ের গড়ন ভেঙে পড়েছিল সেই ঘরে।
আস্তে করে ঝুঁকে এসে শিফার কপালে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো সে। সেই চুম্বনে ছিল অঙ্গীকার, আকুলতা, আর ভাঙা হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা। শিফার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বসে রইলো তীব্র। বাতাসের ভেতর ক্রমশ নিঃশ্বাসের আভাস ফিকে হয়ে আসছিল। ঘরের পরিবেশ তখন ভারী হয়ে উঠেছিল, এক চিলতে আলো, কিছু থেমে যাওয়া কান্না, আর দু’জন মানুষের ভালোবাসার শেষ দৃশ্যপট।
তীব্র উঠে শুয়ে পড়ল শিফার পাশে। চোখ বন্ধ করে শিফাকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্রর ক্লান্ত শরীর মৃত শিফাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
.
.
সাদা গোলাপের বাগান ভোরের রোদের আলোয় যেনো রূপকথার রাজ্য। শিশিরভেজা পাপড়ি ঝলমল করছে, আর বাতাসে ভেসে আসছে মৃদু সুবাস। প্রতিটি ঝোঁপ, প্রতিটি ডালপালায় সাদা গোলাপেরা মাথা তুলে তাকিয়ে আছে, যেনো তারা নিজেরাই বিস্মিত শিফার দৌড়ের প্রাণবন্ততায়।
শিফা ছুটছে উন্মুক্ত প্রাণে, গায়ে সাদা গাউন মেলে ধরেছে আলোর ঝিলিক। বাতাসে উড়ছে তার খোলা চুল, যেনো রাতের অন্ধকারে জোনাকির অগ্নিশিখা। হাতে ধরা একগুচ্ছ সাদা গোলাপ তার দৌড়কে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
তীব্র তার পিছু পিছু ছুটছে, শ্বাস দ্রুত হচ্ছে, মুখে ক্লান্তি মিশে গেলেও চোখে খেলা করছে অদম্য আনন্দ। বারবার হাত বাড়াচ্ছে, কখনো শিফার উড়ন্ত চুলের প্রান্তে আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো মাত্র এক ধাপ দূরে থেকেও তাকে ধরতে পারছে না। এই ফাঁকি, এই ধরা-ছোঁয়ার খেলা যেনো দুজনের প্রেমকথাকে আরও রঙিন করে তুলছে।
শিফার খিলখিল হাসি বাগানের নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সেই হাসি যেনো গোলাপের সুবাসের মতো, ছুঁয়ে যাচ্ছে তীব্রের হৃদয়ের প্রতিটি কোণ। তীব্র যতই ছুটে আসে, শিফা ততই আরেকটু এগিয়ে যায়, যেনো তাকে ধরা দেওয়ার জন্যই আবার পালাচ্ছে।
শেষমেশ, ক্লান্তি ও আকাঙ্ক্ষার মিশ্র মুহূর্তে তীব্র হঠাৎ শিফার হাত আঁকড়ে ধরে ফেলে। দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। তাদের বুকে দ্রুত ওঠানামা করছে, শ্বাসপ্রশ্বাস মিশে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। শিফার চুল মুখের সামনে ছড়িয়ে পড়েছে, তীব্র তার কাছে ঝুঁকে পড়ে সেই চুল সরিয়ে দেয় আলতো ছোঁয়ায়।
চোখের দৃষ্টি আটকে যায় চোখে, নীরবতার ভেতরও যেনো তীব্র কোনো ঝড় বয়ে যায়। শিফার ঠোঁটের কোণে এখনো খেলা করছে হাসি, আর তীব্র সেই হাসির মায়ায় ডুবে যাচ্ছে পুরোপুরি। তাদের নিকটতা, তাদের হাপানো নিঃশ্বাস, গোলাপের সুবাস আর ভোরের আলো মিলে এক অপূর্ব মঞ্চ তৈরি করেছে, যেনো পুরো বাগান নীরবে সাক্ষী রইলো এক চিরন্তন প্রেমের আলিঙ্গনে।
তীব্র শিফার কানে ফিস ফিস করে বলল—
-"তোমার নীল কথা রেখছে প্রণীতা!"