শিফা... শিফা...
সাদা চাদরে ঢাকা হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে তীব্র। বুকের ভেতর নিঃশ্বাস টেনে নিচ্ছে ধীর, ভারী ছন্দে, যেন প্রতিটি শ্বাস কেবল যন্ত্রণার দড়ি বেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা। কপালের ঘাম শুকিয়ে গিয়েছে, ঠোঁট ফেটে চৌচির। অথচ অচেতন দেহের নিস্তব্ধতার মাঝেও ঠোঁট দুটি থেমে নেই, অবিরাম কেঁপে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো বেদনা ভেদ করে কেবল একটিই নাম খুঁজে নিচ্ছে—
-"শিফা..."
রাত পেরিয়ে, দিন পেরিয়ে রাত, রাত ভেঙে নতুন ভোর। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা অচেতন থেকে গেছে তীব্র। হাসপাতালের ঘরটা এক অদ্ভুত নীরবতায় আবদ্ধ। ফ্লুরোসেন্ট আলোয় ধূসর হয়ে আছে দেয়ালগুলো, সেলাইনের ফোঁটা ফোঁটা শব্দ যেন সময়ের ক্ষুদ্র টিকটিকি, থেমে থেমে বাজছে। জীবাণুনাশকের ঠাণ্ডা গন্ধে বাতাস ভারী, আর শূন্যতার চাপ বুকে পাথরের মতো চেপে আছে।
হঠাৎই, তীব্রের চোখদুটি কেঁপে উঠলো। ধীরে ধীরে খুলে গেল তার দৃষ্টি। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল। নিস্তব্ধতার বুক চিরে বজ্রপাতের মতো বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠ—
-"শিফা!"
এক হাহাকার, এক দগ্ধ আর্তনাদ, যা পুরো কক্ষটাকে কাঁপিয়ে দিল। কণ্ঠে এমন তীব্রতা, এমন বেদনাময়তা, যেন মৃত্যুর অন্ধকার থেকে ফিরে আসা এক প্রার্থনা। পাশে দাঁড়ানো নার্স হকচকিয়ে সরে গেল, তার হাতের সেলাইনের নল কেঁপে উঠল আতঙ্কে।
তীব্র হঠাৎ ছটফট করে উঠে বসল। চোখ দুটো পাগলামির আগুনে জ্বলছে, নিঃশ্বাস ভারী, কণ্ঠ গর্জনময়—
-"আমার শিফা কোথায়? কোথায় রেখেছেন আমার শিফাকে?"
তার চিৎকারে ঘরটা যেন আরও আঁধার হয়ে গেল। যেন চারপাশের দেয়ালও শিউরে উঠলো এই অগ্নিঝরা আর্তনাদে। কণ্ঠে আতঙ্ক, চোখে অস্থিরতা, মুখজুড়ে উন্মাদনা, যেন শ্বাস নিতে গেলেও শিফাকে না পেলে অক্সিজেন কম পড়বে তার ফুসফুসে। তীব্রের দৃষ্টি চারদিকে ছটফট করে ঘুরছে, হাত-পা বিছানার ওপর ছটফট করছে, আর কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরোচ্ছে একটাই শব্দ—
-"শিফা... শিফা..."
নার্সের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কক্ষে উপস্থিত প্রত্যেকেই স্তব্ধ, কেউ এগোতে পারছে না, কেউ সান্ত্বনা দিতে সাহস পাচ্ছে না। তীব্রের চিৎকার যেন শুধু হাসপাতালের দেয়ালেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে না, বরং উপস্থিত প্রত্যেকের বুকের ভেতর কেঁপে বাজছে। হারানোর ভয়, মৃত্যুর অশনি ছায়া যেন তাদের হৃদয়ে আঘাত করছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। নার্স আর চিকিৎসকেরা শেষমেশ বাধ্য হলো তাকে শান্ত করার জন্য ঘুমের ইনজেকশন দিতে। সূচ প্রবেশ করতেই ধীরে ধীরে তার ছটফটানি থেমে এল, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল। একসময় নিস্তব্ধতা ফিরে এলো ঘরে। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আর আগের মতো ছিল না। দেয়ালের ফাঁক গলে এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তার আর্তনাদ—
-"শিফা... শিফা...
.
.
.
পরদিন ভোর। হাসপাতালের জানালায় আলো–অন্ধকারের খেলা। শূন্য কক্ষে সূর্যের কোমল রশ্মি এসে পড়ছে, সাদা দেওয়ালের ওপর ছায়ারা লম্বা হয়ে নীরব ছবি এঁকে দিচ্ছে। সেলাইনের ফোঁটা ফোঁটা শব্দ যেন ঘড়ির কাঁটার মতো টিকটিক করছে, সময়কে আরও ভারী করে তুলছে।
ঠিক তখনই তীব্রর নিদ্রা ভাঙল। চোখ মেলতেই সে টের পেল, একা নয় সে। খান বাড়ি আর চৌধুরী বাড়ির প্রায় সবাই তার শয্যার চারপাশে উপস্থিত। কারও মুখে উদ্বেগ, কারও চোখে অশ্রু, কারও ঠোঁটে প্রার্থনার ফিসফাস।
ওরহানের মুখে ভয় ঢেকে রেখেছে এক অদৃশ্য অস্থিরতা। সুরাইয়া বেগম নিরন্তর কাঁদছেন, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা অশ্রুধারা আর থামতে চাইছে না। সোহা, কেয়া, পায়েল, সাবা, সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে, অসহায় ভালোবাসায় আহত একজন মাকে আগলে রেখেছে।
তীব্র সবার দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। চোখ এখনো ভারী, শরীর জুড়ে ওষুধের অবসাদ। মাথায়, হাতে-পায়ে শক্ত ব্যান্ডেজ তার প্রতিটি নড়াচড়া অবরুদ্ধ করছে। তবু কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসতে চাইলে ওরহান দ্রুত এগিয়ে এলো।
-"উঠতে হবে না!"
ওরহানের কণ্ঠ দৃঢ়, তবু ভেতরে চাপা কাঁপন লুকিয়ে আছে। চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ, ঠোঁটে অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা।
সে তীব্রর চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
-"কি হয়েছিল সেদিন রাতে? সব বলো আমাকে।"
তীব্র কিছুক্ষণ নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওরহানের চোখে। দৃষ্টিতে ভেসে উঠল অদ্ভুত এক শূন্যতা, যেন অন্ধকার তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে ধীরে, ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল—
-"সেদিন...
শিফা, চঞ্চল পায়ে এসে দাঁড়াল তীব্রর সামনে। তখন তীব্র ডুবে ছিল অফিসের জরুরি কাজে। টেবিলে ছড়ানো কাগজ, হাতে কলম, চোখ মনোযোগী। কিন্তু হঠাৎই দৃষ্টি তুলে তাকাতেই শিফাকে দেখে থমকে গেল সে। শিফার চোখে তখন সোহাগভরা দুষ্টু আলো। সেই চাহনির টান সামলাতে পারল না সে নিজেই। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তীব্রর কোলে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল, ঠোঁটে খেলে গেল দুষ্টুমি, কণ্ঠে শিশুর মতো আল্লাদী সুর—
-"চলুন না, ঘুরে আসি!"
তীব্রর চোখে দ্বন্দ্বের ঝড়। একদিকে কাজের চাপ, অন্যদিকে শিফার অবুঝ আবদার। কলম ধরা হাত থমকে গেল। এক হাত নিজের অজান্তেই শিফার কোমরে চলে গেল, আরেক হাত দিয়ে টেনে নিল তাকে বুকে। গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"এত রাতে?"
শিফার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলে গেল। চোখে ঝিলিক দিল এক অচেনা উজ্জ্বলতা, যেন রাতের অন্ধকার ভেদ করে ভোরের প্রথম আলো নেমে এসেছে। শিফা ধীরে মাথা নামিয়ে রাখল তীব্রর প্রশস্ত কাঁধে। তার নিঃশ্বাসে মিশে গেল জড়ানো গন্ধ, মিষ্টি অস্থিরতা। কণ্ঠে ক্ষীণ অভিযোগের সুর, যেন অভিমানের বৃষ্টিধারা ঝরে পড়ল ঠোঁট থেকে—
-"সব সময় কাজ, কাজ, কাজ! আমি কি শুধু দায়িত্ব আপনার কাছে? দাদাভাই আমাকে কোনোদিন সন্ধ্যার পর বের হতে দেয়নি। অথচ আমার অনেক শখ... রাতের আকাশ দেখব, রাতের রাস্তায় হাঁটব, রাস্তার টং দোকানে বসে চা খাব, বৃষ্টিতে ভিজব।"
শিফার কথাগুলো যেন নিস্তব্ধ কক্ষে মৃদু গুঞ্জনের মতো ভেসে বেড়াল। তীব্র থম মেরে শুনছিল। সেই কথাগুলো তার চোখের ভেতরে রঙিন ছবি এঁকে দিচ্ছিল, চাঁদনী রাত, বৃষ্টিভেজা রাস্তা, আর চায়ের দোকানে শিফার খিলখিল হাসি।
শিফা মুখ তুলে তাকাল তীব্রর দিকে। চোখে শিশুসুলভ ঝিলিক, ঠোঁটে মিষ্টি খুনসুটি, কণ্ঠে আদুরে অনুনয়—
-"চলুন না, যাই!"
তীব্র হেসে ফেলল মৃদু স্বরে। তার আঙুল বাড়িয়ে শিফার সরু নাক বেয়ে নামাল, তারপর আলতো টোকা দিয়ে বলল—
-"আমার কাছে এর চেয়ে ভালো বুদ্ধি আছে।"
শিফার চোখে কৌতূহলের ঝিলিক ছলছল করে উঠল। শিশুর মতোই তীব্রর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
-"কি?"
তীব্র ধীরে ধীরে তার মুখ শিফার মুখের কাছে নিয়ে এল। চোখে অদ্ভুত এক মোহ, ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। তার হাত শিফার পা থেকে আলতো ভঙ্গিতে স্লাইড করতে করতে উপরের দিকে উঠছিল। মুহূর্তেই শিফা বুঝে ফেলল তীব্রর মতলব। সে ঝটকা দিয়ে কল থেকে নেমে এল, কোমরে হাত রেখে কণ্ঠে কঠিন অথচ দুষ্টু ভঙ্গি—
-"একদম উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা করবেন না! আমাকে ঘুরতে নিয়ে চলুন। নইলে এই 'বউ' ছোঁয়ার স্বপ্ন কোনোদিনও পূরণ হবে না।"
তীব্র আঁতকে উঠে হকচকিয়ে বলল—
-"এইসব কি বলছো, বউ? বউ না ছুঁলে বাঁচব কিভাবে?"
শিফা ভান করে মুখ ফিরিয়ে নিল, ঠোঁটে দায়সারা ভঙ্গি—
-"আমি কি জানি! আগে ঘুরতে নিয়ে চলুন।"
তার চোখে জেদ, ঠোঁটে খুনসুটি, কণ্ঠে শিশুসুলভ আদেশ, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা তীব্রর বুক কাঁপিয়ে দিল। সে বুঝল, এই মেয়েটার কাছে হার মানা মানেই জীবনকে নতুন করে জয় করা। অবশেষে শিফার জেদের কাছে নতি স্বীকার করল তীব্র।
রাতের শহরটা তখন নিস্তব্ধ অথচ আপন সৌন্দর্যে ভরপুর। আকাশে চাঁদ, বাতাসে হালকা শীতলতা। দু’জনে পাশাপাশি হাঁটল দীর্ঘ পথ ধরে, টং দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিল, হাসাহাসি করল তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। বৃষ্টি হলো না, কিন্তু রাতের বাতাসে ছিল এক অদ্ভুত স্বচ্ছতা, যেন অদৃশ্য কোনো উৎসব চলছে চারপাশে। রাত আরও গভীর হলে তারা গাড়িতে উঠল। শহরের রাস্তায় তখন অল্প কিছু যানবাহন। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তৈরি হচ্ছিল দীর্ঘ ছায়া, আর ফাঁকা রাস্তায় হেডলাইটের সাদা রেখা কেটে যাচ্ছিল ঘন অন্ধকারের বুক চিরে।
তীব্র দু’হাতে শক্ত করে স্টিয়ারিং চেপে ধরে মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল। রাস্তার আলো হেডলাইটে কেটে যাচ্ছিল অন্ধকার, ফাঁকা পথ পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলছিল নিস্তব্ধ শহর। শিফা তার এক বাহুতে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসেছিল। বাইরের কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছিল আলো–আঁধারের খেলা, ভেসে যাচ্ছিল শহরের ঝলমলে নীয়ন সাইনবোর্ড। কয়েক মুহূর্তের শান্ত নীরবতার পর, হঠাৎ শিফার কণ্ঠ সেই নীরবতা ভেঙে দিল—
-"আচ্ছা... সেদিন তো আপনি বলেছিলেন, আমি যদি ১০০ বছর বাঁচি, তাহলে আপনি একদিন কম বাঁচতে চাইবেন। কিন্তু যদি নিয়তি আমাকেই আগে নিয়ে নেয়... তখন কি করবেন?"
প্রশ্নটা শুনে তীব্রর বুক কেঁপে উঠল। গাড়ির গতি তখনও সমান, কিন্তু তার ভেতরের ছন্দ যেন থমকে গেল। চোখ এক মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে উঠল, তারা ছাওয়া আকাশ নীরব হয়ে তাকিয়ে আছে, যেন সেই প্রশ্নেরও সাক্ষী। নিচু অথচ কাঁপা স্বরে বলল তীব্র—
-"আমার ইচ্ছে সবসময় আমি একদিন আগে মরি। আমি আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি যেন তোমার চেয়ে একদিন কম বাঁচি। কারণ তোমাকে ছাড়া আমার একদিনও সম্ভব নয়। কিন্তু... যদি নিয়তি তোমাকে আমার আগে নিয়ে যায়, আমি বাঁচব না। আমি তোমার পিছু পিছু চলে আসব।"
স্টিয়ারিংয়ে রাখা তার আঙুল কেঁপে উঠল। হঠাৎ পাশের রাস্তার আলো এসে পড়ল তার চোখে, সেখানে দেখা গেল ভেজা ঝিলিক, যেন চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আলোকে ধরে ফেলেছে। শিফা ধীরে মাথা তুলে তাকাল তীব্রর দিকে। ঠোঁটে মৃদু হাসি, চোখে গভীর স্নেহ। তারপর সোজা হয়ে বসল, মুখ ফেরাল জানালার দিকে। জানালার ওপাশে কালো আকাশ, সেখানে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। সেই দীপ্ত আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল তার চোখে। শিফার কণ্ঠে তখন এক অটল দৃঢ়তা, তবু ভেতরে লুকিয়ে থাকা মায়া আর ব্যথা মিশ্রিত—
-"আমিও আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না। একদিন আগে মরা-বাঁচা এসব আমি বুঝি না। দুনিয়াতে যদি সত্য কিছু থাকে, সেটা মৃত্যু। তাই আমি আল্লাহর কাছে শুধু চাই, আমাদের দু’জনকে যেন একসাথে মৃত্যু দেওয়া হয়। আমরা যেন কখনও একে অপরকে ছাড়া এক মুহূর্তও না থাকি। সেই ‘একা থাকার’ যন্ত্রণা যেন আমাদের ভাগ্যে না আসে। আমি চাই... আমাদের মৃত্যু হোক একসাথে।"
তার কথাগুলো যেন নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হলো। গাড়ির ভেতরে এক গভীর আবহ নেমে এলো, ভালোবাসা, ভয়, আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার অদ্ভুত শিহরণ। কথাগুলো বলে শিফা কাচের জানালায় হেলান দিল। বাইরে রাতের শহর দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছিল, আলো–আঁধার মিশে যাচ্ছিল যেন তাদের অদৃশ্য প্রার্থনার সঙ্গে।
তীব্র মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি সরাল শিফার দিকে। তার চোখে ঝিলমিল করছিল ভেজা দীপ্তি, যা গোপন করার আর কোনো উপায় রইল না। সে অনুভব করল, এই মেয়েটি কেবল তার প্রিয় নয়, বরং তার জীবন, তার মৃত্যু, তার নিয়তি। রাস্তার দিক থেকে চোখ ফেরানো ভুল, কিন্তু তীব্র পারল না। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল শিফার দিকে। মনে হচ্ছিল, এতদিন সে শিফাকে যতটা ভেবেছে, তার চেয়েও গভীর এক রহস্য লুকিয়ে আছে তার ভেতর। এই মেয়েটি কেবল ভালোবাসার মানুষ নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে সত্য প্রার্থনা। ভাবনার স্রোতে ভেসে যেতে যেতে তীব্রর বুক ভরে উঠল অদ্ভুত এক উপলব্ধিতে— সত্যিই তো, যেখানে এক মুহূর্তও তাকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব, সেখানে একদিন আগে কিংবা পরে মরা নিয়ে হিসেব করার কী মানে? চরম সুখ তো আসলে কেবল একসাথে মৃত্যুতেই। কিন্তু ভাগ্যের খেলা কেউ টের পায় না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই, সামনের ফাঁকা রাস্তাকে বিদীর্ণ করে বজ্রপাতের মতো এক প্রাইভেট কার এসে পড়ল তাদের গাড়ির সামনে! এক মুহূর্তে থমকে গেল সবকিছু।
ধাক্কা!
অতল গহ্বর থেকে ছিঁড়ে আসা শব্দ যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে টুকরো টুকরো করে দিল। তীব্রর গাড়ি ভয়ানক আঘাতে পিছিয়ে ছিটকে গেল। সিটবেল্টের টান, টায়ারের ভয়ঙ্কর স্কিড, কাঁচ ভাঙার ঝনঝনানি, সবকিছু মিশে মুহূর্তেই মৃত্যুভয়ের কালো পর্দা নেমে এলো। তীব্র আর শিফা একসাথে ছিটকে পড়ল পাশের দরজার কাচে। শিফার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো হৃদয় বিদারক আর্তনাদ। আর তীব্র, তার আঘাতটা যেন মৃত্যুর মতোই ভয়াবহ। মাথা সজোরে আছড়ে পড়ল স্টিয়ারিংয়ের শীতল ধাতব অংশে।
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। ভাঙা কাঁচের টুকরোর ফাঁকে তীব্র শেষবারের মতো দেখতে পেল শিফার আতঙ্কিত মুখ। কানে মিশ্রিত হচ্ছিল অচেনা শব্দগুলো, কাঁচের ভাঙা ঝনঝনি, হর্নের বিকট আওয়াজ, পথচারীর চিৎকার... সব একসাথে মিশে এক ঘূর্ণায়মান অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছিল তাকে। শরীর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছিল। রক্তে ভিজে যাচ্ছিল জামার কলার। ঠোঁট নড়ল একবার, সে শিফার নাম উচ্চারণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু শব্দ বেরোল না।
তারপর, অন্ধকার। নিস্তব্ধতা।
আর যখন চোখ খুলল, তখন সে আবিষ্কার করল, হাসপাতালের সাদা চাদরে ঢাকা বেডে শুয়ে আছে। মাথা আর কপাল ব্যান্ডেজে জড়ানো, শরীর ভারী ও অসাড়। চারপাশে অচেনা সিলিং, জীবাণুনাশকের গন্ধ, সেলাইনের ফোঁটা ফোঁটা শব্দ। তীব্র এক ঝটকায় মনে করল, শিফা! তার বুক হাহাকার করে উঠল। বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো এক মাত্র নাম, দম বন্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে—
-"শিফা..."
এইটুকুই বলেই থেমে গেল তীব্র। কথার ভেতরকার ভারে যেন ঘরভর্তি নীরবতা আরও ঘনীভূত হলো। ওরহান যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে কঠোর হয়ে উঠলো। সে হঠাৎই দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। তার এই হঠাৎ ওঠায় ঘরে উপস্থিত সবার মধ্যে কৌতূহল আর উৎকণ্ঠার সঞ্চার হলো। চোখ দুটো তার দিকে নিবদ্ধ হলো, অপেক্ষা, ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্র দৃষ্টি। ওরহান ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেল ওমর খানের দিকে। সবার সামনে থেমে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল—
-"সবাইকে বাড়িতে নিয়ে যাও বাবা। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তোমার মেয়েকে নিয়ে আসছি আমি।"
কথার প্রতিটি অক্ষর যেন বজ্রাঘাতের মতো কানে বাজলো। বাতাসের ভেতরে হঠাৎই এক অদৃশ্য কম্পন নেমে এলো। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ওরহান ফিরে দাঁড়াল। পদক্ষেপে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল ঝড়ের আভা। সে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে পড়লো। ঘরের মানুষগুলো তখনও স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার পেছনে, যেন বুঝতে পারছিল না সামনে কী আসতে চলেছে। দরজা থেকে বেরিয়েই ফোন বের করলো সে। কণ্ঠে চাপা ক্রোধ, তবু শব্দ ছিল শীতল, তীক্ষ্ণ ছুরির মতো—
-"চাচাকে তুলে আনো ইহাব।"
এক নিঃশ্বাসে বলে ফোন কেটে দিলো। চারদিকের নিস্তব্ধতার ভেতর সে একা নিজের সঙ্গেই বিড়বিড় করে উঠলো—
-"বহুত হয়েছে। আর না। ভার্সিটির দুশমনির মধ্যে তুই আমার সোহা, আমার পরিবারকে টেনে এনেছিস। এবার তোর জান নিয়েই শান্ত হবে ওরহান। আমাকে জাগ্রত করা তোর বড় ভুল হয়েছে। ঘুমন্ত বাঘ কত ভয়ংকর হয়, এবার টের পাবি।"
তার কণ্ঠে গর্জন ছিল, চোখে প্রতিজ্ঞার আগুন। যেন এক অগ্নিঝরা মুহূর্তে ওরহান নতুন করে জন্ম নিলো, আর সেই জন্ম কারো জন্য শুভ নয়, কেবল ভয়ংকর।