কেটে গেছে পূর্ণ দুই মাস। এই সময়ে সাইফুল শেখের নামে মসজিদে মিলাদ পড়ানো হয়েছে। এতিমখানার ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য সেদিন ছিল এক উৎসব, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন জামাকাপড়, টেবিলে সাজানো হয়েছিল গরম ভাত আর মাংসের হাঁড়ি। ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধে চারপাশ ভরে উঠেছিল। প্রতিটি আয়োজন ওরহান নিজ হাতে করেছে, তার পাশে ছায়ার মতো ছিল ওসমান।
সোহা, সাবা, নিলুফার বেগম, তারা অবাক চোখে দেখছিলেন সবকিছু। ভাবতেই পারছিলেন না, যে সাইফুল শেখ একসময় এত বিতর্কের, এত কষ্টের কারণ ছিল, তার মৃত্যুর জন্য এত বড় করে মিলাদ, এতিমদের জন্য এমন ভোজ, এটা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। বিস্ময়, শ্রদ্ধা আর এক অদ্ভুত নীরব আবেগে তাদের অন্তর ভরে যাচ্ছিল।
মসজিদের ভেতর দোয়ার সুর ভেসে বেড়াচ্ছিল। ইমামের কণ্ঠে করুণ আর্তি, চারপাশে সুবাহানাল্লাহ আর আমিনের ধ্বনি। ছোট ছোট বাচ্চাদের চোখে খুশির দীপ্তি, নতুন জামার ঝকঝকে কাপড়ে তাদের মুখ যেন আলো ছড়াচ্ছিল। এতিমখানার উঠোনে রান্নার হাঁড়ির ধোঁয়া উঠছিল আকাশের দিকে, যেন সেই ধোঁয়া সব দুঃখ, সব ক্ষোভকে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সেই মুহূর্তে সবার মনে হলো, মৃত্যুর সামনে মানুষের অপমান, ক্ষোভ, রাগ সবই ক্ষুদ্র হয়ে যায়। সাইফুল শেখ চলে গেছেন, কিন্তু তার জন্য দোয়া করতে করতে সবাই অনুভব করলো, মৃত্যু কেবল একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, একে অপরের প্রতি জমাট ক্ষোভকেও সমাধির নিচে চাপা দিয়ে দেয়।
.
.
.
রাত তখন এগারোটা। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে খান বাড়িতে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। রাতের খাবার সবাই একসাথে বসে সেরে নিয়েছে, টেবিলে গরম ভাত, তরকারি আর আলাপের হালকা সুর ভেসেছিল কিছুক্ষণ। কিন্তু খাওয়া শেষ হতেই যেন পরিবেশ বদলে গেল।
যার যার মতো করে সবাই উঠে দাঁড়ালো, কেউ ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল, কেউ করিডর পেরিয়ে চলে গেল নিজের ঘরে। ঘরের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হতে লাগলো, আর পুরো বাড়ি ঢেকে গেল নিস্তব্ধ অন্ধকারে।
কেবল দূরের কোনো কুকুরের ডাকে, কিংবা বাতাসে দুলে ওঠা জানালার কাঁচে শব্দ করে উঠছিল, যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে ভাঙার ব্যর্থ চেষ্টা। খান পরিবারের প্রতিটি সদস্য তখন নিজ নিজ কক্ষে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সোহা নিঃশব্দে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাতের আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। চোখের গভীরে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন সমস্ত নক্ষত্রও সেই শূন্যতা ভরতে অক্ষম। হঠাৎই কোমরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শে চমকে উঠলো সে।
সেই হাত ধীরে ধীরে সরতে সরতে এসে থামলো পেটের কাছে। হঠাৎ এক জোরালো চাপে সোহা সামান্য পিছনে গিয়ে মিশে গেল এক প্রস্থ উষ্ণ বুকে। মুহূর্তেই নিঃশ্বাস আটকে গেল তার, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ আসলো না ঠোঁটে।
ওরহান নিজের মুখ ডুবিয়ে দিলো সোহার খোলা চুলের ভেতর। চুলের ঘ্রাণে, তার নীরব দেহভাষায়, এক অদৃশ্য আবেশে ভরে উঠলো চারপাশ। সোহা ধীরে ধীরে চোখ বুজে নিলো, মনে হলো, পৃথিবীর সব শূন্যতা যেন সেই বুকের ভেতর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
সোহা ধীরে ধীরে নিজের হাত রাখলো ওরহানের হাতে। ঠান্ডা বাতাসে তার কণ্ঠ কাঁপছিল সামান্য।
-"আমার বাবার ওপর আপনার কোনো ক্ষোভ, কোনো রাগ নেই?"
ওরহান থেমে গেলো। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে মুখ তুলে তাকালো সোহার দিকে। তারপর তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। ওরহানের ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে, চোখে বিস্ময়ের ছায়া।
-"রাগ? ক্ষোভ? কেনো থাকবে?"
সোহা গভীর দৃষ্টিতে তাকালো তার চোখে। কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা আক্ষেপ মিশে ছিল সেই দৃষ্টিতে।
-"আমার বাবার জন্য আপনি অনেক অপমানিত হয়েছেন। আমাকে পর্যন্ত পেতে আপনাকে তপস্যা করতে হয়েছে। অন্তত কিছুটা রাগ তো থাকারই কথা।"
ওরহান হেসে উঠলো মৃদু স্বরে। সেই হাসি ছিল বিষণ্ন অথচ দৃঢ়। বাতাসে উড়ে আসা সোহার চুল মুখ ঢেকে দিলো, ওরহান আলতো করে চুল সরিয়ে দিলো তার কপাল থেকে।
-"তোমার বাবার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই। উনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু আমার কোনো ক্ষতি করতে পারেননি। বরং..." ওরহান থামলো এক মুহূর্ত, কণ্ঠ নরম হয়ে এলো, "বরং আমি সারাজীবন তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।"
সোহার কপাল ভাঁজ হয়ে গেলো। বিস্ময়ে ভরা কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করলো—
-"কেনো?"
ওরহান সোহাকে বুকের ভেতর শক্ত করে টেনে নিলো। তার কণ্ঠ নরম, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন সোহার হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছিল—
-"তোমার বাবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ এই জন্য যে, উনিই আমাকে শিখিয়েছেন ধৈর্য কী জিনিস। তোমাকে পেতে উনি যত বাধা দিয়েছেন, ততবার আমি নিজেকে শক্ত করেছি, নিজের ভালোবাসাকে প্রমাণ করেছি। উনি না থাকলে হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।"
ওরহান থেমে গেলো কিছুক্ষণ। তারপর সোহার মাথায় হাত রেখে আবার বলল—
-"তোমার বাবার অপমান, তিরস্কার,এসবই আমাকে আরও নিশ্চিত করেছে যে আমি সত্যিই তোমাকে চাই, শুধু চাই না, প্রাপ্যও তুমি। আর আজ তুমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছো। তাই বলছি সোহা, আমি যদি কারো কাছে কৃতজ্ঞ থাকি, তবে তোমার বাবার কাছেই। কারণ উনি না থাকলে আমি হয়তো তোমার ভালোবাসার এতো গভীরতা অনুভব করতে পারতাম না।"
সোহা ধীরে ধীরে চোখ বুজে নিলো। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের পাথর যেন গলতে শুরু করলো। রাতের বাতাসে তাদের নীরবতা মিশে গেলো, আকাশের নক্ষত্র যেন সেদিনের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রইলো। ওরহান ধীরে ধীরে সোহাকে আরও কাছে টেনে নিলো। কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তার সঙ্গে কোমলতা—
-"উনিই তোমাকে জন্ম দিয়েছেন। উনি যদি তোমাকে পৃথিবীতে না আনতেন, তবে আমি কোনোদিন তোমাকে পেতাম না। তুমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার, সোহা। আমি মোনাজাতে তোমাকে চেয়েছিলাম, আর আমার আল্লাহ তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। বিশ্বাস করো, নীলশ্যামা, আমার ভেতর একটুও রাগ বা ক্ষোভ নেই। বরং আমি তোমার বাবাকে হাজার বার ধন্যবাদ দেই, শুধু এজন্য যে, উনি তোমাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন। আর আমার আল্লাহ আমার ভাগ্যে তোমাকে লিখে দিয়েছেন।"
সোহার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো অশ্রুতে। সে আলতো করে ওরহানের বুকে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল—
-"এত ভালোবাসেন আমাকে?"
ওরহান মৃদু হেসে উত্তর দিলো—
-"নিজের চাইতেও বেশি।"
সেই মুহূর্তে বারান্দার নিস্তব্ধতায় যেন পৃথিবী থেমে গেলো। রাতের আকাশের অসংখ্য তারা সাক্ষী হয়ে রইলো দুই হৃদয়ের নিঃশর্ত ভালোবাসার।
.
.
.
খান পরিবারের ড্রয়িং রুমে আজ অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য বিরাজ করছে। সাজানো ঝাড়লণ্ঠন, সুশোভিত আসবাবপত্র, আর পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকতে থাকা বিকেলের ক্ষীণ আলো পুরো ঘরে এক অচেনা প্রতীক্ষার আবহ তৈরি করেছে। চারপাশ এতটাই সুশৃঙ্খল, এতটাই নিখুঁত, যেন ঘর নিজেই বুঝে আছে, আজকের দিনটির বিশেষ তাৎপর্য।
কারণ আজ শিফাকে দেখতে এসেছে পাত্রপক্ষ। বিদেশ ফেরত এক যুবক, বহু বছর ধরে ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। বিয়ের পর শিফাকেও নিয়ে যাবে সে বিদেশে। খবরটা শুনেই পরিবারের মনে মিশে গেছে গর্ব আর এক ফোঁটা সংশয়। ওমর খান বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন, কারণ আগামীকালই মুফতি–কেয়া, মারুফ–পায়েল, ওরহান–সোহা রওনা দেবে মধুচন্দ্রিমার জন্য। তাই আজকের মধ্যেই সব দেখা-সাক্ষাৎ সেরে ফেলতে হবে।
রান্নাঘরে ব্যস্ত সোহা, শাশুড়ি ও চাচী-শাশুড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রান্নার আয়োজন সামলাচ্ছে। অন্যদিকে ঘরের ভেতরে সাবা, কেয়া আর পায়েল যেন তিন পরী মিলে শিফাকে সাজিয়ে তুলছে। সোনালি জরির কাজ করা শাড়ি, হালকা গয়না, চুলে সযত্নে গুঁজে দেওয়া ফুল, সব মিলিয়ে যেন আসলেই এক নতুন কনে।
সাজাতে সাজাতে হঠাৎ কেয়া দুষ্টুমি মিশ্রিত হাসি আটকাতে না পেরে ফিসফিস করে বলল—
-"দেখ, তোমাকে সাজাতে সাজাতে কেমন কনের মতো লাগছে!"
শিফা চোখ পাকিয়ে ফিসফিস করে জবাব দিল—
-"আমি আজও বলছি, বিয়ে করব না!"
কথাটা যেন ঘরে জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতাকে মুহূর্তেই ভারী করে তুলল। পায়েল গম্ভীর ভঙ্গিতে শিফার চোখে কাজল জড়াতে জড়াতে ধীরে বলল—
-"আমরা জানি, শিফা। তাই তোমাকে আর বোঝাতে চাই না। শুধু একটা কথা বলি, যদি ছেলেটাকে দেখে সত্যিই ভালো না লাগে, তবে কেউ তোমাকে জোর করবে না।"
সাবা ঠোঁট কামড়ে কৌশলী ভঙ্গিতে যোগ করল—
-"ঠিক তাই। তবে সরাসরি না বললেই ভালো। না হলে হাজার প্রশ্নে জর্জরিত হবে সবাই, আর তুমি উত্তর দিতে চাইবে না। তাই আজ শুধু চুপচাপ বসে থাকো। তারপর পছন্দ না বললেই সব শেষ।"
শিফা নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতরে যেন অজস্র ঝড় বয়ে যাচ্ছে, অথচ ঠোঁটের কোণে নিস্তব্ধতা। চোখের গভীরে ক্ষীণ আলো, যেখানে তীব্রর নাম খোদাই হয়ে আছে। তাকে হয়তো ক্ষমা করতে চায় শিফা, কিন্তু পারছে না। সেই অভিমান, সেই কষ্ট তার হৃদয়ে আগুনের মতো জ্বলে আছে। অথচ মনের আরেক কোণে তীব্রকেই আঁকড়ে ধরে আছে অদ্ভুত ভালোবাসা।
হঠাৎ কেয়া মজা করে শিফার কানে ফিসফিস করে বলল—
-"তবে কি তীব্রর জন্যই এই অমত? আচ্ছা শোনো, যদি হঠাৎ তীব্র এসে বলে— 'শিফা, আমি ফিরে এসেছি', তখনও কি বলবে— 'না, তোমাকে ক্ষমা করব না'?"
শিফা কোনো উত্তর দিল না। শুধু ম্লান হেসে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। সেই প্রতিচ্ছবির চোখে ভেসে উঠল এক অদৃশ্য নাম, তীব্র।
ঘরের আবহ আবারও নীরব হয়ে গেল। বাইরে সন্ধ্যার আলো নিভে আসছে, পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকছে হাওয়া, যেন বলছে, শিফার লড়াই আসলে নিজের সঙ্গেই। ভালোবাসা আর অভিমান, ক্ষমা আর অস্বীকৃতির এই দ্বন্দ্বে সে আটকে আছে। একদিকে বেদনা, অন্যদিকে অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা।
ড্রয়িং রুমে অতিথিরা ইতিমধ্যেই বসে আছে। সোনালি ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় তাদের হাসিমাখা মুখ ঝকঝক করছে। হালকা গল্পগুজবের ফাঁকে কাচের কাপের টুংটাং শব্দে ভেসে আসছে চায়ের ধোঁয়া। ওমর খান ও ওয়াহিদ খান অতিথিপরায়ণ ভদ্রতায় ব্যস্ত, তবু চোখেমুখে লুকোনো এক অস্বস্তির ছায়া স্পষ্ট ধরা পড়ছে।
বাহ্যিক হাসি আর আনন্দের ভেতরে অদৃশ্য এক নাটক জমে উঠছে। শিফার অন্তরের দ্বন্দ্ব, ভাবীদের নীরব সমঝোতা, আর তীব্রর ছায়াময় অনুপস্থিতি, সব মিলিয়ে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই সাজানো-গোছানো পরিবেশের মাঝেই যেন কেউ না দেখেও বুঝতে পারে, আজকের দিন শুধু শিফার জন্য এক পরীক্ষা।
ঘরে দাঁড়িয়ে শিফা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে নিখুঁত সাজ, শরীরে মিষ্টি রঙের শাড়ি, তবু চোখের গভীরে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—
-"আমি কি তীব্র কে ক্ষমা করে আপন করতে পারবো? তীব্র ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে আমি মেনে নিতে পারবো না!"
হঠাৎ দরজা খোলা হলো। নিস্তব্ধতার এক ফালি চেরা শব্দে শিফাকে ধীরে ধীরে ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসা হলো। মুহূর্তেই ঘরের বাতাস যেন বদলে গেল। হাসি-আড্ডার ভিড় হঠাৎ থেমে গেল, সমস্ত নজর একত্রিত হলো শিফার উপর।
সোনালি গয়না আর শাড়ির আভা তার ফর্সা গায়ে আরও দীপ্ত হয়ে উঠেছে। এক মুহূর্তে মনে হলো, কোনো শিল্পী তার ক্যানভাসে নিখুঁত প্রতিকৃতি এঁকে রেখেছে, আর আজ সেই ছবিই জীবন্ত হয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
শিফাকে ধীরে ধীরে এনে বসানো হলো ছেলের পাশে। ড্রয়িং রুম তখন এক অদৃশ্য নীরবতার কবলে, শুধু দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির টিকটিক ভেসে আসছে।
ওমর খান সন্তুষ্ট দৃষ্টিতে চারপাশ ঘুরে দেখলেন। মনে হলো, উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন শিফাকে ইতিমধ্যেই মেনে নিয়েছে। ছেলের মা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন—
-"খুব সুন্দর লাগছে আপনাদের মেয়েকে। আমাদের পছন্দ হয়েছে।"
ছেলেও একবার গোপনে তাকাল শিফার দিকে। তার দৃষ্টিতে সহজেই ধরা পড়ল লুকোনো প্রশংসা। কিন্তু শিফার চোখ তখন নিচু, ঠোঁটে ক্ষীণ কাঁপুনি, যেন কোনো নীরব প্রতিবাদকে প্রাণপণ লুকিয়ে রাখতে চাইছে।
ওমর খান সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
-"আচ্ছা, ছেলেমেয়েকে আলাদা একটু কথা বলতে দিই। নিজেদের মধ্যে মতামত বিনিময় করা জরুরি।"
ড্রয়িং রুমের বাতাস তখন আরও ঘন, ভারী। যেন সময় এক অদৃশ্য নাটকের সূচনা করতে যাচ্ছে। একদিকে সবার অদম্য আগ্রহ, অন্যদিকে শিফার বুকের ভেতরে চাপা বিদ্রোহ, যেন পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিবার্য মোড়, যে কোনো মুহূর্তে দৃশ্যপট পাল্টে দেবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে খান বাড়িতে যেন আকস্মিক ঝড় নেমে এলো। ড্রয়িং রুমের সাজানো পরিবেশ এক নিমেষে উলটপালট হয়ে গেল। দরজা জোরে ঠেলে প্রবেশ করল তীব্র। পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে তূর্য, বাবা–মা আর বডিগার্ড।
এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল ঘর। অতিথিদের মুখে বিস্ময় জমাট বাঁধল। যেন নাটকের মঞ্চে আকস্মিক এক চরিত্র প্রবেশ করেছে, আর পুরো দৃশ্যপটের ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
তীব্র কোনো ভূমিকা না করে, কোনো ভণিতা ছাড়াই সরাসরি শিফার দিকে এগিয়ে গেল। এক নিঃশ্বাসে, এক মুহূর্ত দ্বিধা ছাড়াই সে শিফাকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিল।
ঘরের বাতাস হঠাৎ জমাট বাঁধল। সকলে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। কারও মুখে ভাষা নেই, কারও শরীরে নড়াচড়া নেই। আর তীব্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি ভরা হাসি ঝুলিয়ে ঘোষণা করল—
-"ক্ষমা করবেন হবু শ্বশুর আব্বা। আপনার কন্যা আমার ওপর বেশ রাগ করেছে। অভিমান ভাঙানোর দায়িত্ব তো আমারই। তাই নিয়ে যাচ্ছি তাকে, একটু আদরে বোঝাবার জন্য।"
কথা শেষ করেই সে উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করল। যেন কোনো বিজয়ী সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রিয়তমাকে বুকে নিয়ে ফিরছে।
ড্রয়িং রুম মুহূর্তেই শোরগোল ফেটে পড়ল। সাবা, কেয়া, পায়েল বিস্ময় প্রকাশ করছে চোখে চোখ রেখে। ওমর খান আর ওয়াহিদ খান কিছু বলার আগেই শিফার ভাইরা বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে এসে তীব্রর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল।
ওরহান গুরুগম্ভীর স্বরে গর্জে উঠল—
-"আমার বোনকে ছোঁয়ার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?"
তীব্র থামল না। শুধু রাশভারী দৃষ্টিতে ওরহানের চোখে চোখ রাখল। ঠোঁটে তখনও ব্যঙ্গমাখা হাসি—
-"নিজের নারীকে ছোঁয়ার জন্য আবার অনুমতির দরকার হয় নাকি?"
ওসমান খেঁকিয়ে উঠল—
-"নামাও আমার বোনকে!"
তীব্র এবার শান্ত, অথচ দৃঢ় স্বরে বলল—
-"উহু, নামাবো না।"
মুফতি ও মারুফ ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হতেই তূর্য আর বডিগার্ড দ্রুত তাদের থামিয়ে দিল। ফলে আক্রমণ করতে গিয়েও ভাইরা আরও ক্ষুব্ধ, আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।
ওরহান হাত তুলে সবাইকে থামাল। চোখে বিদ্যুতের ঝলক, গলায় দমবন্ধ করা হুমকি—
-"আমার ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করার আগে ওকে নামিয়ে দাও, তীব্র।"
তীব্র চোখ টিপল, ঠোঁটে কটাক্ষমাখা দুষ্টুমি—
-"আরে সালাবাবু, এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আমি তো আপনার মতো ধৈর্য ধরে ভালোবাসার আগমনের প্রতীক্ষায় বসে থাকতে পারবো না। প্রেমের আসরে বসে অপেক্ষা করা আমার ধাঁচ নয়। আমার ততটা ধৈর্যও নেই। আমি এসেছি আমার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিতে, নিয়ে যাচ্ছি আপনার বোনকে। রাগ করে আছে আমার ওপর, সেই রাগ ভাঙিয়ে আবার ফিরিয়ে দেবো। আর হ্যাঁ... জামাই বরণের জন্য প্রস্তুত থাকবেন!"
ওরহান হঠাৎই বজ্রের মতো গর্জে উঠল—
-"তীব্র! আমার বোনকে নামাও বলছি। নইলে আমার চেয়ে ভয়ংকর আর কেউ হবে না!"
তার কণ্ঠে এমন ঝড় উঠল, যেনো চারপাশের বাতাস থমকে দাঁড়াল। শিফার বুকের ভেতর কাঁপন জাগল, আর ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকেই মুহূর্তের জন্য শ্বাস আটকে রাখল।
তীব্র কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু ঠিক তখনই সোহা ঝড় থামানোর মতো করে তাদের মাঝে এসে দাঁড়াল। তীব্রর দিকে রাগে-জ্বলা চোখে তাকালো, কিন্তু ঠোঁট খুলল না। এক নিঃশব্দ হুঁশিয়ারি যেনো ঝরে পড়ছিল তার দৃষ্টির তীব্রতা থেকে। তারপর ওরহানের দিকে ফিরে কণ্ঠ নরম করল, তবুও দৃঢ়তায় পূর্ণ—
-"শান্ত হোন, হীর। শিফার কোনো ক্ষতি করবে না উনি। ওদের মধ্যে বোঝাপড়া জরুরি, তাই এই মুহূর্তটা তাদের দিতে হবে।"
ওরহান তীব্র প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, বুকের ভেতরকার আগুন যেনো অগ্নি হয়ে ফেটে বেরোবে, তখনই এক অদৃশ্য শক্তির মতো পেছন থেকে বাবার হাত এসে তার কাঁধে স্থির হলো।
ওমর খানের সেই হাত ছিল দৃঢ়, আশ্বাসদায়ক। ওরহান চোখ ঘুরিয়ে বাবার দৃষ্টি দেখতেই বুকের ঝড় থেমে এলো। সেই এক দৃষ্টিতেই যেনো বলা হলো— "আমি আছি। শিফার কিছু হবে না।"
এক মুহূর্তেই ওরহানের অন্তরে শান্তির স্রোত নেমে এলো। দাঁড়িয়ে থাকা শিফার চার ভাই একই সঙ্গে নিঃশ্বাস ফেলল। তাদের চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠল বিশ্বাস, বাবার চোখে যে নিশ্চয়তা রয়েছে, তাতে বোনের দিকে কোনো ছায়া আসবে না।
ঘরের বাতাসে যেনো এক অদৃশ্য ভারসাম্য তৈরি হলো। হাহাকার আর ক্রোধের মাঝেই জন্ম নিলো নীরব।
ততক্ষণে তীব্র শিফাকে কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগোতে শুরু করেছে। তার পদক্ষেপ ছিল অদ্ভুত দৃঢ়, যেনো পৃথিবী নিজে সামনে এসে দাঁড়ালেও তাকে থামাতে পারবে না।
পুরো ঘর স্তব্ধ। সময় যেন এক নিমেষে থমকে গেছে। কারো ঠোঁট কাঁপছে, অথচ শব্দ বেরোচ্ছে না। কারো চোখে জ্বলছে অগ্নিশিখা, আবার কারো মুখে আঁকা আছে বিস্ময়ের ছাপ।
শিফা ততক্ষণ তীব্রর কাধে পড়ে থেকে একেবারে রণক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছে। শখানেক কিল–ঘুষি বর্ষণ করেছে, আর তার ঠোঁট থেকে ঝড়ের মতো বেরোচ্ছে গালাগালির ধারাবাহিকতা। অথচ তীব্র যেনো অন্য এক জগতে। নির্বিকার, অবিচল, কেবল একরাশ রহস্যময় হাসি ফুটে আছে ঠোঁটে। তার চোখের গভীরে জ্বলছে এক উজ্জ্বলতা, যেনো এই যুদ্ধ, এই অভিমান, এই অগ্নিবর্ষী প্রতিরোধই তাদের ভালোবাসার আসল শপথ।
শিফার গালাগালির আড়ালে স্পষ্ট বোঝা যায়, সে এখনো ভালোবাসে। বরং সেই প্রতিরোধের ভেতরেই যেনো তার সবচেয়ে সৎ আবেগগুলো লুকিয়ে আছে। আর তীব্রর শক্ত বাহুবন্ধনেই রয়েছে তার প্রকৃত আশ্রয়, তার চিরন্তন ঠিকানা।
গাড়ির কাছে গিয়ে তীব্র সাবধানে শিফাকে বসিয়ে দিল, তারপর নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। শিফা অধৈর্য হাতে দরজা খুলে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই তীব্র হঠাৎ তার খুব কাছে ঝুঁকে এলো। শক্ত বাহু দিয়ে শিফাকে সিটের সাথে চেপে ধরে নিঃশ্বাসের মতো ফিসফিস করে বলল—
-"এত হাইপার হলে চলবে প্রণীতা? কিছু এনার্জি বাঁচিয়ে রাখো। আমাকে সামলাতে এখনো বেশ খানিকটা শক্তি প্রয়োজন হবে তোমার... মাই লাভ।"