প্রকৃতি কারও ঋণ রাখে না। মানুষ যে বীজ বপন করে, তারই ফল ভোগ করতে হয় এই পৃথিবীর বুকেই। আল্লাহ ক্ষমাশীল, কিন্তু তিনি অবহেলাকারী নন। তিনি ছেড়ে দেন না। অহংকারী বান্দাদের তিনি ঘৃণা করেন, মানুষের হক নষ্টকারীদের তিনি শাস্তি দেন। আর যখন দেন, তখন সেই প্রাপ্য এমনভাবে সামনে এসে দাঁড়ায় যে পৃথিবীর চোখ নিজেই সাক্ষী হয়ে যায়।
আজকের সকালটা যেন সেই সাক্ষ্যের দিন।আকাশে ফেটে পড়েছে রোদের ঝলকানি, কিন্তু সেই আলো কারও চোখে শান্তি আনছে না। বরং মনে হচ্ছে, এই আলোই আজ প্রকৃতির কঠোর সত্য উন্মোচনের জন্য নেমে এসেছে। দূরে কাকেরা কাকলি তুলছে, তাদের ডানার শব্দে ভয়, অশুভ, আর অশান্তির ছায়া আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে তারা যেন মৃত্যুর বার্তাবাহক।
শেখ বাড়ির সামনে মানুষের ঢল। প্রত্যেকেই আতঙ্ক আর কৌতূহলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। পুলিশের মুখ গম্ভীর, চোখে দায়িত্বের ছাপের সাথে সাথে লুকানো ঘৃণা। বাতাসে ঘন হয়ে আছে এক অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ। সে গন্ধ শুধু দেহের পচন নয়, এ যেন এক জীবনের পাপফল, যা মাটির গহ্বর থেকে ভেসে উঠে পুরো চারপাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
মানুষ ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। কেউ নাকে কাপড় চেপে ধরে দূরে সরে যাচ্ছে, কেউ আবার কৌতূহলী চোখে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে থাকতে চাইছে, যেন দেখেই বিশ্বাস করতে পারে প্রকৃতির এই বিচার। এ দৃশ্য শুধু একটি বাড়ির নয়, এ দৃশ্য যেন পুরো সমাজকে আয়নায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
এখানে মৃত্যু কেবল একজনের নয়, অহংকারেরও। আর এই দুর্গন্ধ শুধু শরীরের ক্ষয় নয়, মানুষের অবিচার, পাপ আর অন্যায়ের পরিণতি, যা আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
সাইফুল শেখের মৃত্যু যেন নীরব এক বিচার হয়ে দাঁড়াল। টানা তিন মাস তার নিথর দেহ পড়ে আছে নিজ ঘরের ভেতর। পচে গলে গেছে পুরো শরীর, মাংসে ধরেছে পোকা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে অসহ্য এক দুর্গন্ধ, যা শুধু বাতাসকেই নয়, মানুষের অন্তরকেও বিষিয়ে তুলছে।
দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায়, আজ কর্মচারীরা এসেছিল লাইন কেটে দিতে। দরজায় কড়া নাড়তেই তাদের নাকে এসে লাগে সেই তীব্র গন্ধ। শিউরে উঠে পিছু হটে তারা। খবর যায় পুলিশের কাছে। আর তারপর দরজা ভেঙে বের করে আনা হয় সাইফুল শেখের লাশ, এক দেহ, যা আর দেহ নেই, কেবল ভগ্নাবশেষ।
কখনো যিনি নিজেকে রাজা ভেবেছিলেন, আজ তিনি পড়ে আছেন নিঃসঙ্গ এক শবদেহ হয়ে। সাইফুল শেখ ছিলেন অহংকারে আচ্ছন্ন দম্ভী মানুষ। তার কাছে পৃথিবী মানে ছিল কেবল 'আমি'। ভালোবাসা, সম্মান কিংবা স্নেহ, কোনো শব্দই তার অভিধানে ছিল না। স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন, কেউই তার কাছে প্রিয় ছিল না। সবাইকে তিনি বেঁধে রেখেছিলেন কঠোর শাসনের শৃঙ্খলে। তার চোখে বাকিরা ছিল কেবল প্রজা, আর তিনি নিজেই ছিলেন রাজা।
কিন্তু জীবন শেষ পর্যন্ত তাকে শিখিয়ে দিল কঠিন শিক্ষা। যাদের শাসন করে রেখেছিলেন সারাজীবন, মৃত্যুর সময় তাদের কাউকেই পাননি পাশে। শেষ নিশ্বাসের সঙ্গী হয়েছে শুধু নীরব দেয়াল, আর মৃত্যুর পর সঙ্গী হয়েছে পচন আর গলে যাওয়া নিঃসঙ্গ দেহ।
অহংকার মানুষকে যতই শক্ত মনে করাক, প্রকৃতি তাকে ভেঙে ফেলার নিজস্ব পথ খুঁজে নেয়। আর সাইফুল শেখ, তারই নির্মম উদাহরণ।
তিনি কখনও বুঝতেই পারেন নি, অযথা রাগ, অহংকার, শাসন দিয়ে মানুষকে বেঁধে রাখা যায় না। মানুষকে কাছে টেনে রাখে কেবল ভালোবাসা, মায়া, মমতা আর সম্মান। এই সহজ সত্য তিনি জীবনে কোনোদিন উপলব্ধি করেন নি। সারাজীবন তিনি ছিলেন নিজের দম্ভের মসনদে আসীন। ভুল বা ত্রুটি যেন তার কাছে অচেনা শব্দ। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই অহংকারই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। আর সেই অহংকারই তাকে একাকীত্বের গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিলো। কতটা নির্মম ভাগ্য, মৃত্যুর তিন মাস পর তার লাশ উদ্ধার হলো। এতোদিনে একবারও কেউ খোঁজ নিল না, তার নাম উচ্চারণ করল না।
শহরের বাতাস আজ ভারী, তীব্র দুর্গন্ধে যেনো শ্বাস নিতেও কষ্ট। শেখ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। নীল আলো জ্বলছে তার গায়ে, কিন্তু আলোতে নেই কোনো প্রাণ, নেই কোনো আশা। চারপাশের লোকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে, তবুও দূরে সরে। তাদের কণ্ঠে চাপা ফিসফিসানি—
-"এতোদিন কেউ টের পেল না?"
-"তিন মাস ধরে পড়ে ছিল ঘরে!"
-"টের পাবে কিভাবে? স্ত্রী সন্তান কারো সাথেই তো সুসম্পর্ক ছিল না!"
-"হ্যাঁ। সম্মান দিত না ভালোবাসা দিত না। কেবল শাসন করত। রাগ ঝরতো।"
-"মেয়েটাকে বিনাদোষে বের করলো।"
-"স্ত্রীর হক আদায় করে নি। তাকে রোবটের মতন পরিচালনা করেছে।"
-"হ্যাঁ। নিলুফার ভাবী কত ভালো মানুষ ছিলেন। এক তরফা ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন।"
দুর্গন্ধের তীব্রতা এতটাই প্রবল যে ভেতরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। যে-ই ভেতরে প্রবেশ করে, চোখ-মুখ ঢেকে মুহূর্তেই বাইরে বেরিয়ে আসে। শহরের নীরব রাস্তায় শুধু শোনা যায় পুলিশের গম্ভীর কণ্ঠ, আর মাঝে মাঝে ছুটে আসা মানুষের অবাক দীর্ঘশ্বাস।
খান বাড়ির লোকজন দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। কিন্তু তাদের চোখে অশ্রু নেই, মুখে শোকের ছায়া নেই। যেন কেউ অচেনা এক মৃতদেহের খবরে এসেছে। সোহার একমাত্র ফুপু তার পরিবার নিয়ে উপস্থিত, তবুও তাদের মুখে নেই কোনো বেদনা। উপস্থিতির মাঝে নেই কোনো সম্পর্কের দাবি, নেই কোনো স্মৃতির ভার।
যে মানুষ একদিন ছিলেন কারো পিতা, কারো স্বামী, কারো ভাই, আজ তার মৃত্যুর সংবাদে সকলে একত্র হয়েছে, কিন্তু বাতাসে নেই শোক, নেই কান্না। আছে শুধু শহরের নিস্তব্ধতা, দুর্গন্ধে ভারী হওয়া হাওয়া আর একাকীত্বে হারিয়ে যাওয়া এক জীবনের নির্মম সমাপ্তি।
.
.
.
ওরহান সোহাকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ নিষ্পলক, যেনো ভেদ করতে চাইছে সোহার নীরব মুখ। অথচ সোহার চোখে কোনো অশ্রু নেই, ঠোঁটে কোনো কাঁপন নেই। যেন সমস্ত অনুভূতিকে গিলে ফেলে স্থির হয়ে গেছে সে। ওরহানের বুকের ভেতর ঢেউ খেললেও সোহার নিস্পৃহতা সেই ঢেউ ভেঙে দিচ্ছে বারবার।
নিলুফার বেগমের চোখও একই রকম শূন্য। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু যেনো দাঁড়িয়ে নেই, অচল, স্তব্ধ। সুরাইয়া বেগম তাকে বাহু দিয়ে ধরে রেখেছেন, ভয় হয় যে হঠাৎ ভেঙে পড়বেন। অথচ ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাওয়া যেনো বহু আগেই ঘটে গেছে।
সাবাকে আনা হয়নি। সবাই ভেবেছে এই পরিবেশ তার কোমল মনে বিষ ঢেলে দেবে। কিন্তু সাবারও আসার ইচ্ছে ছিল না। হয়তো সে নিজেই জানত, যে মানুষকে কখনো আপন মনে হয়নি, তার মৃত্যুতে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। সাবার নীরব অনুপস্থিতি যেনো আরও স্পষ্ট করে দিলো, মৃত্যুতেও সাইফুল শেখ একা।
শহরের বাতাস ভারী। লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে গলি থেকে গলিতে। মানুষেরা দাঁড়িয়ে আছে ভিড় করে, তবু প্রত্যেকে দূরে। নাকে রুমাল চেপে ফিসফিস করছে কেউ—
-"কীভাবে সম্ভব? তিন মাস ঘরে পড়ে ছিল!"
-"একবারও খোঁজ নেয়নি কেউ? কতটা একা হলে এভাবে মরতে হয়?"
কেউ কেউ অবাক চোখে তাকিয়ে আবার নীরব হয়ে যায়। অদ্ভুত এক অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে ভিড়ের মাঝে।
অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে শেখ বাড়ির সামনে। তার নীল আলো শহরের রাতকে ছিঁড়ে ফেলছে, কিন্তু আলোয় কোনো প্রাণ নেই, শুধু মৃত্যু আর গন্ধ। পুলিশ তার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শেষ করছে। একপর্যায়ে তারা সাইফুল শেখকে কবর দেয়। কোনো আত্মীয়ের হাত তার গায়ে ছোঁয় না, কোনো আপনজন তাকে কাঁধে তোলে না।
দূর থেকে নিলুফার বেগম, সোহা আর অন্যরা দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চোখে নেই কান্না, নেই কণ্ঠে বিলাপ। তখনই সুরাইয়া বেগম ফিসফিস করে বললেন—
-"আপা, কান্না করুন। বুকের ভেতরের কষ্ট জমিয়ে রাখবেন না। কাঁদলে হয়তো হালকা লাগবে।"
নিলুফার বেগমের নিষ্প্রাণ চোখ ঘুরে যায় দূরে। কণ্ঠে নেই শক্তি, আছে কেবল জমাটবাঁধা দীর্ঘশ্বাস—
-"আমার স্বামী ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় কেটেছে তার সঙ্গে। কিন্তু কোনোদিন ভালোবাসা অনুভব করিনি। একতরফা সংসার করেছি, একাই ভালোবেসেছি, শুধু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে। আজ সত্যি বলছি আপা, আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। কান্না আসছে না। যে মানুষটা আমার আপন ছিলেন না, তার জন্য চোখ ভিজে না, এটাই স্বাভাবিক। উনি ছিলেন শুধু নিজের। কারো না। ভালো ভাই, ভালো স্বামী, ভালো পিতা, কিছুই হয়ে উঠতে পারেননি।"
তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ বাতাসে গুমোটের মতো ছড়িয়ে পড়লো। চারপাশের নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে গেল। শহরের আকাশে জমাট বাঁধা অন্ধকারের মতোই সাইফুল শেখের জীবনের পরিসমাপ্তি হলো, নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধ, সম্পর্কহীন।
সুরাইয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক নারীর সারা জীবনের কাহিনি, ভালোবাসাহীন সংসার, একতরফা বোঝা বয়ে চলা, আর অবশেষে নিঃসঙ্গ মৃত্যুর শীতল সমাপ্তি। ভাষাহীন হয়ে পড়লেন তিনি। একজন নারী ভালোবাসা ছাড়া এভাবে সারা জীবন পার করে দিতে পারে, এ দৃশ্য তার বুকের ভেতরকে ভারী করে দিলো।
অ্যাম্বুলেন্সের নীল আলোয় ভেসে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মাঝে হঠাৎ সোহার কণ্ঠ ভেসে এলো। মলিন, ভাঙা স্বর—
-"হীর?"
ওরহান তৎক্ষণাৎ সোহাকে আঁকড়ে ধরলো। তার কণ্ঠে স্নেহের পরশ—
-"বলো, জান।"
সোহা কেঁপে উঠলো, ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল—
-"আমার কান্না পাচ্ছে না। অথচ উনি আমার বাবা ছিলেন। আমি ওনাকে খুব ভালোবাসতাম। কিন্তু উনি আমার সঙ্গে অনেক অন্যায় করেছেন। নিজের ভুল কখনো স্বীকার করেন নি। বিনা দোষে আমাকে শাস্তি দিয়েছেন। আমি তাকে ঘৃণা করি। আমি কি সন্তান হিসেবে ব্যর্থ হীর?"
ওরহান তার বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলো সোহাকে। আলতো করে ললাটে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলল—
-"একদমই না, আমার জান। তুমি সন্তান হিসেবে শ্রেষ্ঠ। বাবার প্রতি ক্ষোভ রেখেও তুমি তাকে সম্মান করেছ। ভুল ছিল তার, তোমার নয়। উনি নিজের দোষে সব হারিয়েছেন। এতে তোমার কোনো দোষ নেই, না আন্টির, না সাবার। নিজেকে কখনোই দোষী ভেবো না, বেবি।অহংকার আর মিথ্যে দম্ভ মানুষকে ধীরে ধীরে একা করে দেয়, এই মৃত্যু তারই প্রমাণ।"
ওরহান থেমে যায় এক মুহূর্ত, তারপর আবার নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে—
-"মানুষ যদি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, মমতা আর ক্ষমার বদলে অহংকারকে আঁকড়ে ধরে, তবে সে একদিন নিজের চারপাশ খালি করে ফেলে। তখন মৃত্যুর পরেও পাশে থাকে না কেউ। তোমার বাবার গল্প, জান, আসলে আমাদের জন্য শিক্ষা, ভালোবাসাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, না হলে জীবিত থেকেও মানুষ মৃত।"
সোহা কাঁপা হাতে ওরহানের শার্ট খামচে ধরলো। বুকের ভেতর জমাটবাঁধা বেদনা এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এলো। চারপাশের রাত নিস্তব্ধ, বাতাস ভারী। অচেনা নীরবতার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ভোর হলো। আর ভোরের প্রথম আলো ফুঁড়ে সাইফুল শেখকে দাফন করা হলো, অচেনা, নির্লিপ্ত শহরের কোলাহলে হারিয়ে গেলো তার শেষ চিহ্ন।
আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। শহরের বাতাসে আজও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আছে। অচেনা নীরবতার মাঝেই পুলিশ দাফন সম্পন্ন করলো। কোনো স্বজনের কাঁধে নয়, অপরিচিত মানুষের হাতে চলে গেলো সাইফুল শেখ।
ভোরের প্রথম আলো পড়লো তার কবরে। যেনো সূর্য নিজেও জানিয়ে দিলো, অহংকার, দম্ভ, একাকীত্ব, সবই ক্ষণস্থায়ী। শেষে শুধু মাটিই আপন।
.
.
.
খান বাড়ির চারপাশে আজ অদ্ভুত নীরবতা। ড্রয়িং রুমে সবাই জমে বসে আছে, যেন সময় থেমে গেছে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু শূন্য দৃষ্টি আর অস্থির নিস্তব্ধতা। গত রাতেই মুফতি কেয়া আর মারুফ পায়েলের ফ্লাইট ছিল, কেউ আর সেই ফ্লাইটে যেতে পারে নি। সবার মনোযোগ আটকে ছিল একটিই ঘটনায়, সোহার বাবার দাফন।
সবার মাঝে থমথমে নীরবতা জমাট বেঁধেছে। হঠাৎ সেই স্তব্ধতার ভেতর সাবা ঢুকে এলো। তার মুখে হালকা হাসি, চোখে চঞ্চলতা, যেনো সে পুরো ঘরের ভারী পরিবেশটিকে এক মুহূর্তেই ভেঙে ফেলতে চায়। সাবা এসে সবার মাঝে বসলো।
ওসমান অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো তার প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে। তার মনে হলো, সাবার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর বেদনা। সেই বেদনাকে কেউ স্পর্শ করতে পারছে না।
ঠিক তখনই ওমর খান ও ওয়াহিদ খান উঠে এসে সাবার পাশে বসলেন। একদিকে হাত রাখলেন সাবার মাথায়, অন্যদিকে পিঠে স্নেহভরা স্পর্শ। কোমল কণ্ঠে বললেন—
-"কষ্ট হলে কেঁদে নাও, মা। আমাদের সামনে নিজেকে ভালো রাখার অভিনয় করতে হবে না।"
সবাই তাকিয়ে আছে সাবার দিকে। তাদের চোখে একটাই প্রশ্ন, এই নীরবতার মাঝে সে কী বলবে?
সাবা ধীরে মাথা তুললো। ওমর খানের চোখে চোখ রেখে এক মিষ্টি হাসি দিলো, আর নরম স্বরে বলল—
-"আপনি আমার শ্বশুর। এই এক বছরে আপনি আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, আমার তিন-দশকও পূর্ণ না হওয়া জীবনের তেইশ বছরে আমার জন্মদাতা পিতাও সেই উষ্ণতা দেননি। আমার প্রতি তাঁর ছিল না কোনো ভালোবাসার টান, ছিল না কোনো হৃদয়ের আকর্ষণ, শুধুই কর্তব্যবোধের বন্ধনে আবদ্ধ এক সম্পর্ক। বিশ্বাস করুন, আপনার যদি কিছু হয় তবে আমার বুকে যে যন্ত্রণার ঢেউ উঠবে, তার এক কণা-পরিমাণও আমার জন্মদাতা পিতার মৃত্যুর সংবাদে জাগেনি। বাবার ছায়া আমি পাইনি কোনোদিন, পেয়েছিলাম কেবল এক কঠোর শিক্ষক, যিনি সারাক্ষণ ভুল ধরতেন আর শাস্তি দিতেন। তিনি আমার আপন নন, তার জন্য কেনই বা অশ্রু বিসর্জন দেব আমি?"
ওমর খান চোখ ভিজে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বুকের মাঝে শক্ত করে আগলে নিলেন সাবাকে। ঠিক সেই সময় ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামলো সোহা। তার পেছনেই ছিল ওরহান। সোহা এসে এক পাশে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে শান্ত কণ্ঠে বলল—
-"কালকের যে ফ্লাইট মিস হয়ে গিয়েছিল, আজ তার নতুন টিকিট কাটা হয়েছে। আমরা সবাই আজকেই রওনা হব।"
সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সোহার দিকে। কিন্তু সোহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ঠিক তখনই ওরহান পেছন থেকে এগিয়ে এসে বলল—
-"আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু ও আমার কথা কিছুতেই শুনছে না।"
ওমর খান ধীরে ধীরে সোহার কাছে এলেন। নিজের দুই হাত বাড়িয়ে নিয়ে সোহার হাত আগলে সোফায় বসালেন তাকে। স্নেহভরা কণ্ঠে শান্তভাবে বললেন—
-"নিশ্চয়ই যাবে, মা। তবে এখন নয়, চল্লিশ দিন পর। উনি তোমাদের জন্মদাতা। বাবা হতে পারেননি, ভালোবাসতে পারেননি, তবু তিনি তোমাদের বাবা ছিলেন। একজন মানুষকে আমরা বেছে নিই না, তাঁকেই ভাগ্য বেছে দেয় আমাদের জন্য। তাই ওনাকে ক্ষমা করে দাও। মৃত মানুষের প্রতি ক্ষোভ রাখা উচিত নয়। আমিও তোমার বাবা, আমার কথা রেখো।"
সোহার চোখ ভিজে উঠল। এক ঝটকায় ওমর খানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ভাঙা, নিরেট কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
-"আপনি আমার বাবা না হয়েও যে ভালোবাসা দিলেন, আমার জন্মদাতা কেনো দিল না? আমরা দুই বোন সারাজীবন বাবার ভালোবাসার জন্য আকুল থেকেছি। তাঁর ইচ্ছেমতো চলেছি, প্রতিটি কথাই মেনে নিয়েছি। তবুও তিনি আমাদের ভালোবাসেননি। তাঁর কাছে অহংকার আর সম্মানই বড় ছিল। নিজের সন্তানকে চিনলেন না কখনো, একবারও ভাবলেন না সন্তানের কথা। সত্য জানার চেষ্টা করেননি। বিনা দোষে নির্বাসন দিয়ে দিলেন!"
কথাগুলো শেষ হতেই সোহা ভেঙে পড়ল। ওমর খান আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারলেন না। তিনি সোহাকে শক্ত করে বুকের ভেতর টেনে নিলেন। কাঁপতে থাকা কাঁধে হাত বুলিয়ে গভীর, নিশ্চিন্ত স্বরে বোঝাতে লাগলেন—
-"শান্ত হও মা... সব কষ্ট আজ আমার বুকে ঝরে পড়ুক। তোমার না পাওয়া ভালোবাসা, বুকের হাহাকার আমি ভাগ করে নেবো। রক্তের সম্পর্ক দিয়ে বাবা হওয়া যায় না, বাবা হওয়া যায় ভালোবাসা দিয়ে।একদিন সব ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে।"
সোহা ওমর খানের বুকে মুখ লুকিয়ে আরও জোরে কাঁদতে লাগল। সেই দৃশ্য যেন পুরো ঘরটাকে ভারী করে তুলল।
ওরহান নিঃশব্দে এগিয়ে এসে সোহার পাশে বসলো, তার কাঁধে হাত রাখল। এক সান্ত্বনার ছোঁয়া দিলো, যেনো বোঝাতে চাইলো— "তুমি একা নও, আমি আছি।" অন্যদিকে ওসমান সাবার পাশে বসলো, নিঃশব্দে স্ত্রীর হাত চেপে ধরে শক্তি যোগাল।
এক কোণে সুরাইয়া বেগমের কাঁধে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছেন নিলুফার বেগম। তিনি যেনো আর সামলাতে পারছেন না নিজেকে। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে মুফতি আর মারুফ, নীরব দর্শকের মতো। তাদের চোখে বেদনা, অথচ ঠোঁট নীরব, কেবল হাহাকার জমে আছে বুকের ভেতর।
শিফা, কেয়া আর পায়েল এসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। তারা নীরবে কান্না করছিল, কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখের জলে মিশে থাকা অদৃশ্য আর্তনাদ। বাবা থাকতেও সেই বাবার আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা তারা যেন কল্পনাও করতে পারে না।
দূরে দাঁড়িয়ে আছেন আয়রা বেগম ও ওয়াহিদ খান। তারা দু’জনেই অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন, কোনো সমাধান নেই, কেবল গভীর অসহায়ত্বের বোঝা তাদের চোখে-মুখে।
ঘরটিতে আর কোনো শব্দ নেই। চারদিকে শুধু চাপা কান্নার ধ্বনি, ভেতরে জমে থাকা অভিমান আর ভালোবাসার অদৃশ্য বাঁধন। এক মুহূর্তে সবাই যেনো একটি পরিবারের মতো জড়ো হলো, যেখানে ব্যথা একসাথে ভাগাভাগি করা যায়, যেখানে কান্নার মধ্যে দিয়েই খুঁজে পাওয়া যায় আপনজনের উষ্ণতা।