খান কোম্পানিতে আজ মহা আয়োজনে সাজ সাজ রব। চারপাশে আলো ঝলমলে, মানুষের কোলাহল, উৎসবের আমেজ। খান পরিবারের দুই কনিষ্ঠ সন্তান, আয়ান খান মুফতি ও আয়যান খান মারুফ আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিতে যোগ দেবে। এ উপলক্ষে পুরো পরিবার আনন্দে ভাসছে। যেন নতুন প্রজন্মের হাতে সাম্রাজ্যের হস্তান্তরের প্রথম প্রহর।
সবাই চলে গেছে ঝলমলে উৎসবে, শুধু ওসমান ও সাবা অনুপস্থিত। কারণ সাবার প্রথম গর্ভধারণ, পরিবারের সবার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত। চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রথম তিন মাস তাকে বিশেষভাবে যত্নে রাখতে হবে। ভিড়, হইচই, কোলাহল, সবই তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ওসমান স্নেহমাখা দায়িত্বে তাকে নিয়ে বাড়িতেই আছে।
অফিসিয়াল অনুষ্ঠান শুরু হতে আর এক ঘণ্টা বাকি। তাড়াহুড়ো করে সবাই বেরিয়ে পড়েছে, বিশাল অট্টালিকায় তখন সুনসান নীরবতা। শুধু ওসমান আর সাবা নিঃশব্দে নিজেদের ঘরেই অপেক্ষা করছে।
ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে সাবা। টেবিলের উপর রাখা ফল থেকে এক টুকরো করে মুখে নিচ্ছে, আর সামনের টিভির পর্দায় চোখ স্থির। বড় পর্দায় লাইভ ভেসে আসছে খান কোম্পানির জমকালো অনুষ্ঠান। যেন চার দেয়ালের ভেতর বসেও তারা সবার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। ওরহান বিশেষ ব্যবস্থায় এ লাইভ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, সাবা ও ওসমান যেন অনুভব করে, তারাও পরিবারের সাথেই আছে, তারাও সেখানে উপস্থিত।
ওসমান হাতে এক গ্লাস টাটকা জুস নিয়ে এসে সাবার সামনে দাঁড়াল। স্নেহভরা হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা তার হাতে ধরিয়ে দিল। সাবা জুস হাতে নিল বটে, তবে চাহনিতে যেন লুকোনো বিরক্তি। টিভির পর্দায় খান কোম্পানির ঝলমলে অনুষ্ঠান ভেসে আসছে। বাইরে উৎসবের কোলাহল, অথচ ভেতরে বাড়ির আবহটা একেবারেই ভিন্ন। নীরবতার মাঝেই সাবার মিষ্টি বিরক্তি ঘরটাকে হঠাৎ উজ্জ্বল করে তোলে।
ওসমান হাতে জুস এগিয়ে দিলেই সাবা ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীরে ধীরে বলে উঠল—
-"আপনি কি আমাকে খাইয়ে খাইয়ে মোটা বানাতে চাচ্ছেন নাকি?"
ওসমান মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল—
-"কেনো?"
সাবা চোখ গোল করে তাকাল—
-"মাত্র এতগুলো ফল খেলাম, এখন আবার জুস! সন্ধ্যা বেলা এত কিছু খেলে আমি রাতে খাবো কিভাবে?"
ওসমান শান্ত স্বরে উত্তর দিল—
-"দেখো, তুমি এখন একা নও। আমার সন্তানের ভরপুর পুষ্টি দরকার। তুমি যদি নিজে একটা পাট কাঠির মতো থাকো, আমার সন্তানও কি তাই হবে নাকি?"
সাবা হেসে ফেলল, তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল—
-"এই এই, একদম আমার স্বাস্থ্য নিয়ে খোচা দেবেন না। নিজে যে একটা হাতি সেটা খেয়াল আছে? ডাক্তার কি বলে জানেন না? প্রয়োজনের বেশি শরীরও ক্ষতিকর। আমি ৫০ কেজি থাকলেই ঠিক আছি। আপনি বরং নিজের স্বাস্থ্য দেখুন, ৮০ কেজির হাতি একখানা।"
ওসমান ভান করা অভিমানী কণ্ঠে বলল—
-"আচ্ছা, বেশ, আমি হাতি। এখন জুসটা খেয়ে নাও।"
সাবা মুখ ফুলিয়ে গ্লাসটা ঠেলে দিয়ে বলল—
-"রেখে দিন, পরে খাবো!"
ওসমান কিছু না বলে গ্লাসটা রেখে দিল। তারপর সাবাকে টেনে নিজের গা ঘেঁষে বসাল। সাবার মাথাটা আলতো করে নিজের কাঁধে নামিয়ে আনল। আঙুলগুলো সাবার চুলে বুলাতে লাগল ধীর ছন্দে।
প্রথম গর্ভধারণের পর থেকেই সাবার মুড সুইং বেড়ে গেছে, হাসি, রাগ, অভিমান, খুনসুটি সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি দিনই এক নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু ওসমান জানে, এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধরা, যত্ন নেওয়া।
দু’জনেই অবশেষে চুপচাপ হয়ে গেল। বাইরের ঝলমলে উৎসব টিভির পর্দায় ধরা পড়ছে, আর ঘরের ভেতরে নিঃশব্দে বয়ে চলেছে ভালোবাসার এক আলাদা মহোৎসব।
.
.
.
ঝলমলে আলোয় সজ্জিত বিশাল অডিটোরিয়াম। মঞ্চে রঙিন পর্দা, ঝিকিমিকি আলোর ঝর্ণাধারা, আর সামনের আসনে বসে আছে শহরের বিশিষ্টজনেরা। ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই বোঝা যায়, এ যেন উৎসব নয়, খান সাম্রাজ্যের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক করলো মহার্ঘ সময়, ঠিক তখনই ধীর পায়ে স্টেজে উঠলেন খান কোম্পানির চেয়ারম্যান, ওমর খান। সাদা পোশাক আর কালো কোটে তাকে যেন রাজকীয়ই লাগছে। তাঁর মুখে বয়সের রেখা থাকলেও চোখেমুখে গর্ব, দৃঢ়তা আর সন্তুষ্টির ঝলক। আলো যখন তাঁর উপর পড়ল, হল ঘরে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু শোনা গেল তাঁর কণ্ঠস্বর—
-"আসসালামুয়ালাইকুম। আপনাদের সবাইকে স্বাগতম আমাদের আজকের এই মহা-অনুষ্ঠানে।"
মুহূর্তেই চারদিক থেকে করতালির ঝড় উঠল। তিনি মুচকি হেসে আবার বললেন—
-"আমি গত তিরিশ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছি। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে আমার ছোট ভাই, ওয়াহিদ খান, প্রতিটি পদক্ষেপে আমার ছায়াসঙ্গী ছিল। সে যদি আমার পাশে না থাকতো, তবে আজকের এই 'খান কোম্পানি' কোনোদিন দাঁড়াতো না।"
মঞ্চের আলোয় ভেসে উঠল প্রথম সারিতে বসে থাকা ওয়াহিদ খানের গর্বিত মুখ।
ওমর খান থেমে নিঃশ্বাস নিলেন, তারপর স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন—
-"আমাদের সংসারকে নিখুঁতভাবে চালিয়ে নিয়ে গেছেন আমার সহধর্মিনী সুরাইয়া বেগম এবং আমার ভাইয়ের স্ত্রী আয়রা বেগম। আমরা দুই ভাই আল্লাহর দরবারে প্রতিটি নামাজে কৃতজ্ঞতা জানাই, এমন মহীয়সী নারী আমাদের সহধর্মিনী হয়েছেন। খান কোম্পানি আমার স্বপ্ন হলেও, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আমার স্ত্রী, আমার ভাই এবং আমার ভাইয়ের স্ত্রী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আমার ভাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে এসেছে ব্যবসায়, আর আমাদের গিন্নিরা আমাদের সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।"
মঞ্চে যেন প্রতিটি শব্দের সঙ্গে ইতিহাস লেখা হচ্ছে। তিনি গর্বভরে উচ্চারণ করলেন—
-"আজ আমি বলতে বাধ্য, আমাদের বংশের পাঁচটি রত্ন, আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে, আর আমার ভাইয়ের দুই ছেলে। এদের সঠিক শিক্ষা, সঠিক নৈতিকতা আর মূল্যবোধের পেছনে একমাত্র কৃতিত্ব তাদের মায়েদের। আমি আর আমার ভাই সারাজীবন ব্যবসার ঘেরাটোপে থেকেছি, কিন্তু আমাদের ঘরের আঙিনায় আলো ছড়িয়েছে আমাদের সহধর্মিনীরা।"
মুহূর্তের জন্য তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল। বিশাল অডিটোরিয়ামে নেমে এল গম্ভীর নীরবতা। সবাই নিঃশ্বাস আটকে শুনছে। তারপর তিনি দৃঢ় কণ্ঠে শেষ ঘোষণা দিলেন—
-"আজ, এই মুহূর্তে আমি আমার দীর্ঘ তিরিশ বছরের কর্মজীবনের ইতি টানছি। আমি এবং আমার ভাই, আমরা দু’জন আজ থেকে খান কোম্পানির সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিলাম।"
কথা শেষ হতেই চারদিক থেকে বজ্রধ্বনির মতো করতালির ঝড় উঠল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা ওমর খানের চোখ জ্বলজ্বল করছে তৃপ্তির আলোয়। উপস্থিত সবার মনে হলো, তারা যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে উঠেছে।
মুহূর্তের মধ্যেই হলঘরে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। অতিথিদের মধ্যে চাপা ফিসফিসানি, অবাক দৃষ্টির বিনিময়। ওরহান স্তম্ভিত হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল, চোখ দুটোতে বিস্ময়ের ছায়া। সুরাইয়া ও আয়রা বেগমের চোখ ছলছল করছে, তাদের দৃষ্টি যেন অতীতের শূন্য সময়ের হিসেব টানছে। মুফতি, মারুফ, শিফা, সবাই নিস্তব্ধ, হঠাৎ ঘোষণার ভারে থমকে গেছে। ব্যবসায়িক বন্ধুরা হতবাক, যেন কথার ভেতরে অদৃশ্য বজ্রপাত নেমে এসেছে।
ওমর খান মঞ্চে স্থির দাঁড়িয়ে। তাঁর গলায় ক্লান্ত অথচ দৃঢ় এক সুর, যেন দীর্ঘদিনের চেপে রাখা স্বীকারোক্তি ভেসে আসছে শব্দে শব্দে—
-"আমি জানি, আজকের এই সংবাদ আপনাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। তবুও এ সিদ্ধান্ত আমার নিতেই হতো। সারাটি জীবন আমি আর আমার ভাই পরিশ্রম করেছি, দিন-রাত শুধু কোম্পানির জন্য। অথচ আমাদের সন্তানদের পাশে বসে সময় দেওয়া হয়নি, সহধর্মিণীদের প্রাপ্য সঙ্গটুকুও দিতে পারিনি।"
মুহূর্তে হলে নেমে এল নিস্তব্ধতা। শুধু মাইক্রোফোনে ভেসে আসা ওমর খানের গলা—
-"তাই ঠিক করেছি, আজ থেকে পুরো কোম্পানির দায়িত্ব আমি আমার সন্তানদের হাতে তুলে দেব। আমাদের প্রয়োজন এখন আর ব্যবসা নয়, প্রয়োজন পরিবারের সান্নিধ্য। বাকি জীবন আমরা দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবো, সহধর্মিণীদের সাথে। আর হ্যাঁ, এবার যখন অতিথি আসবে আমাদের বাড়িতে, আমরা থাকবো ওদের পাশে। সন্তানের বেড়ে ওঠা মিস করেছি, কিন্তু নাতি-নাতনিদের শৈশব কোনোভাবেই হারাতে চাই না। জীবন এখন ঢলে পড়েছে, তাই চাই শেষটুকু কাটুক আপনজনদের উষ্ণতায়।"
কথাগুলো যেন মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল সবাইকে। বাতাসে গা ছমছমে এক আবেশ, কেউ কথা বলছে না, শুধু চোখে চোখে বিস্ময়, কানে কানে অনুচ্চারিত প্রশ্ন।
উপস্থিত ব্যবসায়িক পার্টনার ও বন্ধুদের মুখে বিস্ময়ের পরই ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। প্রথমে চমক, পরে যেন গভীর আনন্দ। পরিবারের সকলের চোখে তখন এক অন্যরকম আলো, বোঝাপড়ার ভেতর লুকোনো সন্তুষ্টি। সুরাইয়া বেগম ও আয়রা বেগম খুশিতে আত্মহারা, আবেগের ঢেউ সামলাতে না পেরে চোখের অশ্রু বাঁধ মানছে না, মুক্তার মতো ঝরে পড়ছে।
ওমর খান এবার দৃঢ় অথচ আবেগমাখা কণ্ঠে অফিসিয়াল ঘোষণা শুরু করলেন—
-"খান কোম্পানির নতুন চেয়ারম্যান হবে আমার বড় সন্তান, ওরহান খান শাহির। সিইওর দায়িত্ব থাকবে আমার ছোট ছেলে, ওসমান খান শান্তর হাতে। ডিএমডি পদে থাকবেন আমার আপন ভাই, ওয়াহিদ খান, আর আয়রা বেগমের সন্তান আয়ান খান মুফতি। আর COO হিসেবে দায়িত্ব নেবে আয়যান খান মারুফ।"
মুহূর্তের মধ্যে বজ্রপাতের মতো করতালি ফেটে পড়ল চারদিক থেকে। পুরো হলঘর ভরে গেল উল্লাসে। একে একে তিন ভাই উঠে গেলেন স্টেজে, ওসমান বাড়িতে থাকায় শুধু তিনজনই পাশে দাঁড়ালেন। আলো-ঝলমলে মঞ্চে তাদের উপস্থিতি যেন ভবিষ্যতের নতুন দিনের অঙ্গীকার।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ওমর খান গভীর নিশ্বাস নিয়ে আবারও মাইকের দিকে ঝুঁকলেন। অতিথিদের চোখেমুখে প্রত্যাশার ছাপ।
-"আজকের ঘোষণা যেন শেষই হচ্ছে না!" হালকা হাসি ছুঁয়ে গেল তাঁর ঠোঁটে।
-"যাইহোক, সর্বশেষ ঘোষণা হচ্ছে, এই মাসের শেষের দিকে মুফতি ও মারুফের বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।"
আবারও হলঘর ভরে উঠল উল্লাস, করতালি আর উচ্ছ্বাসের স্রোতে। হাসি, আবেগ আর আনন্দ মিলেমিশে এক অপূর্ব আবহ তৈরি করল। যেন সবার চোখের সামনে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো।
ঘোষণার পর হলঘর ধীরে ধীরে আগের ছন্দে ফিরল। কেউ আলাপচারিতায়, কেউবা খাবারের টেবিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওরহান হাসিমুখে অতিথিদের কাছে মুফতি ও মারুফকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, গর্ব আর স্নেহ মিশ্রিত ভঙ্গিতে। অন্যদিকে, ওমর খান ও ওয়াহিদ খান তাঁদের সহধর্মিণীদের পাশে দাঁড়িয়ে, মুগ্ধ নয়নে ছেলেদের সাফল্য দেখছেন। চোখের গভীরে তৃপ্তির দীপ্তি।
ঠিক সেই সময় পার্টির জমকালো আড়ম্বরের ভেতরে নেমে এলো হঠাৎ এক ছায়া। তীব্র, আজও এসেছে, যেন তার উপস্থিতিই অনাহূত ঝড়। ভিড়ের আড়াল পেরিয়ে সে শিফার হাত চেপে ধরল, টেনে নিয়ে গেল কোণের দিকে, যেখানে আলো পৌঁছায় না। শিফার মুখে আতঙ্ক, শরীর শিউরে উঠল অপ্রত্যাশিত স্পর্শে।
-"সমস্যা কি আপনার? হাত ছাড়ুন!"
শিফার কণ্ঠ কাঁপছে, তবুও প্রতিবাদের দৃঢ়তা আছে তাতে।
তীব্রের চোখে অনুশোচনা আর একরাশ অস্থিরতা—
-"আর কতদিন এভাবে থাকবে বলো? এইবার তো ক্ষমা করো! গত এক বছর ধরে ক্ষমা চাইছি!"
শব্দগুলো তীব্র আবেগে উচ্চারিত হলেও, তার শক্ত হাতের বাঁধনে শিফা মুক্ত নয়। শিফা ছটফট করছে, চারপাশে বাজছে হাসি আর করতালির শব্দ, অথচ এই কোণায় জমে উঠছে নিঃশব্দ এক ঝড়। শিফার কণ্ঠ বিদীর্ণ হাহাকারের মতো কেঁপে উঠল—
-"পারবো না ক্ষমা করতে! আপনাকে আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না আমি। কতবার বলব? আপনাকে দেখলেই সেই বীভৎস কথাগুলো মনে পড়ে আমার... ঘেন্নায় গা গুলিয়ে ওঠে!"
তীব্র যেন আঘাত পেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল আলো। গলায় ফিসফিস স্বর—
-"এতটা ঘেন্না করো আমায়?"
শিফা নিশ্চুপ। চোখ ফিরিয়ে নিল। তীব্র ধীরে ধীরে তার হাত ছেড়ে দিল, দুজনের মধ্যে দূরত্ব এনে দাঁড়াল। শূন্যতার ফাঁকে কেবল ভাসছিল অতীতের প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি।
তীব্র দৃষ্টিটা সরাতে না পেরে বলল—
-"তুমি তো বলেছিলে আমাকে সারাজীবন ভালোবাসবে। তাহলে এখন এই পরিবর্তন কেন? আমি তো তোমাকে ভালোবাসতে চাইনি, তুমি-ই আমাকে বাধ্য করেছিলে তোমাকে ভালোবাসতে।"
শিফার ঠোঁট কাঁপল, তীব্রতার সুরে ভাঙল তার নীরবতা—
-"আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সেটাই।"
এই কথাটা তীব্র সহ্য করতে পারল না। মুহূর্তেই সে শিফাকে দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরল। তার উত্তপ্ত নিশ্বাস শিফার মুখে আছড়ে পড়ছে। শিফার বুক ধড়ফড় করছে, নিঃশ্বাস দ্রুত হচ্ছে, হৃদপিণ্ড যেন বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চঞ্চল চোখ বারবার এদিক-সেদিক ছুটছে, মুক্তির পথ খুঁজছে।
তীব্রর কণ্ঠ গম্ভীর, তবুও তাতে কোমলতার আবেশ—
-"আমার প্রণীতা! তুমি আমার পাথর হৃদয়ে ভালোবাসার বীজ রোপণ করেছিলে। সেই বীজ এখন বটবৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ভালোবাসার বৃক্ষ থেকে আমি মুক্তি পাচ্ছি না। তোমাকে এক নজর না দেখলে আমার শান্তি হয় না। তোমাকে ছোঁয়ার তৃষ্ণায় আমি তৃষ্ণার্থ। তোমাকে পাওয়ার নেশায় আমি আসক্ত। তোমার এই ঘৃণা ভরা দৃষ্টি আমাকে ক্ষতবিক্ষত করছে, প্রণীতা!
আমাকে এই যন্ত্রণার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দাও। আমার অপরাধের শাস্তি আমি পেয়েছি, সোহা সেই সব শাস্তি আমাকে দিয়েছে। তুমি তো সাক্ষী ছিলে! তাহলে কেন তুমি আমাকে বুঝতে চাইছো না?"
শিফার চোখে অশ্রু নেই, তবু দৃষ্টি তীব্রের দিকে অটল। ঝাঁঝালো কণ্ঠে সে বলল—
-"আপনি একজন পাপী। আমি আপনাকে ভালোবেসে নিজেও পাপী হয়েছি। আপনি জেনে বুঝে অন্যায় করেছেন, যার কোনো ক্ষমা নেই। আমার পরিবার আমাকে কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করতে শিখায়নি। আমার দাদাভাই নিজেও এক অন্যায়ের জন্য আজ ছয় বছর ধরে শাস্তি ভোগ করছে, এখনো ভোগ করছে। আমাদের পরিবার সেই অন্যায় মেনে নেয়নি। এখনো সোহা ভাবির পাশে আমরা আছি। আমার দাদাভাই নিজের অজান্তেই এক অগ্নিপরীক্ষা দিচ্ছে, আর আমরা সেই অগ্নিপরীক্ষার অংশ।
সেখানে আমি আপনাকে কীভাবে ক্ষমা করি? আপনার অন্যায়ের শাস্তি, যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে, তাও নিতান্তই কম।"
তীব্র এক ধাক্কা খেয়েছে মনে হয়। সত্যিই তো, ওরহান ভালোবাসার সেই পরীক্ষা দিয়ে চলেছে, আর তীব্র এক মুহূর্তের জন্যও সেই আনুপাতিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারল না। মাথা নীচু করে সে দাঁড়িয়ে রইল। শিফাকে ছেড়ে কিছুটা দুরত্ব রেখে।
শিফা একনজর তাকাল, চোখে এক নিঃশ্বাসের প্রশান্তি। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে প্রস্থান করতে পা বাড়াল।
তীব্র চোখ না তুলেই বলল—
-"ভালোবাসার এই অগ্নিপরীক্ষা আমি দেবো, প্রণীতা, আর আমি বিজয়ী হবো। অপেক্ষা করো আমার জন্য।"
হলঘরটা চুপচাপ, শিফার পায়ের শব্দ, তীব্রের ফিসফিস কণ্ঠ, সব মিলেমিশে যেন সময় স্থির হয়ে গেছে। বাতাসে জমে আছে অগ্নিপরীক্ষার উত্তাপ, আর হৃদয়ে বাজছে এক অদ্ভুত তৃষ্ণার সুর।
.
.
.
সাবা ঘুমিয়ে পড়েছে। অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে অচেতন ঘুমের দেশে হারিয়ে গেছে সে। ওসমান ধীরে ধীরে তাকে পাজাকলে তুলে নিলো, যেন কাঁচের পুতুল ভেঙে যাবে এই ভয়ে। সাবা প্রেগনেন্ট হওয়ার পর থেকেই ওসমান সাবাকে নিয়ে নীচতলাতেই থাকে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামায় যদি তার অসুবিধা হয়, যদি কোনো অঘটন ঘটে, সেই আশঙ্কায়।
ওসমান সাবাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ওপরে টেনে দিলো পাতলা একখানা চাদর। উজ্জ্বল লাইট নিভিয়ে দিলো ঘরজুড়ে, কেবল জ্বালিয়ে রাখল ডিমলাইট, নরম আলোয় ঘরে নেমে এলো নিস্তব্ধ আবহ। চারপাশ যেন নিঃশ্বাস ফেলে শুয়ে রইলো।
সাবার পাশে বসে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো ওসমান। যেন চোখ ফেরানোই তার পক্ষে অসম্ভব। জানালা খোলা, বাইরে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশজুড়ে। সেই চাঁদের রূপালি রশ্মি ঢুকে পড়ছে ঘরে, এসে পড়ছে সাবার শান্ত মুখে। মনে হচ্ছে আলোর ঝরনা নেমে এসেছে তার ওপর।
ওসমানের কাছে মনে হলো, আজ যেন স্বর্গের কোনো নূর ছড়িয়ে পড়েছে এই ঘরে, আর তার উৎস সাবার মুখশ্রী।
ওসমান আলতো হাতে সাবার মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো সরিয়ে দিলো। যেন প্রতিটি কেশগুচ্ছও তার স্নেহে ভিজে উঠছে। তারপর ধীরে ধীরে সাবার ওপর ঝুঁকে এলো। নিজের অধর এগিয়ে সাবার নরম অধরে ছোঁয়ালো, আলতো, স্নিগ্ধ এক চুম্বনে ভরে দিল ভালোবাসার দ্যোতনা।
এরপর একে একে সাবার গালে, নাকে, চোখের পাতায় রাখলো ভালোবাসার পরশ। প্রতিটি স্পর্শে যেন সে বলতে চাইছে, "তুমি আমার সব, আমার শ্বাস, আমার জীবনের পূর্ণতা।"
সাবার শান্ত মুখের ওপর পড়তে লাগলো ওসমানের গরম নিশ্বাস। হঠাৎ বিরক্তিতে সাবা ঘুমের ঘোরেই কপাল কুঁচকে নিলো। দৃশ্যটা দেখে ওসমান মৃদু হাসলো, মনে হলো, এ অভিমানও তার কাছে অনাবিল সৌন্দর্য।
সাবার সরল মুখমণ্ডলে নিজের আঙুলের কোমল বিচরণ চালালো। সেই ছোঁয়ায় যেন নতুন করে লিখে দিলো তাদের প্রেমের গল্প। মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে সে ফিসফিস করে বললো—
-"তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন!"
ঘরের চারপাশে তখন নিস্তব্ধ রাত, জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো জড়িয়ে ধরেছে দু’জনকে। মনে হচ্ছিল, ভালোবাসার এই দৃশ্যটা স্বয়ং আকাশও নীরবে উপভোগ করছে। ওসমান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সাবার মুখশ্রীর পানে। ফিসফিস করে বলে উঠলো—
-"যেদিন প্রথম তানভীর ভাইয়ের বিয়েতে তোমায় দেখেছিলাম, সেদিনই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, তুমি একদিন আমার হবে। তোমার হাসি, তোমার চোখের ভাষা, তোমার সরলতা আমাকে মুহূর্তেই বশীভূত করেছিল। সেদিনই স্বপ্ন বুনেছিলাম, জীবনের প্রতিটি সকাল-সন্ধ্যা তোমার সঙ্গেই কাটাবো।
কিন্তু মাঝখানে কত বাধা, কত ঝড়ঝাপটা এলো। কত ভুল বোঝাবুঝি, কত অপেক্ষা, কতটা প্রার্থনা...! তোমাকে নিজের করার সেই স্বপ্ন পূর্ণ হতে আমার পাঁচটা বছর লেগে গেলো। পাঁচটা বছর যেন পাঁচটা যুগের মতো দীর্ঘ, তবু আমি কখনো হাল ছাড়িনি।
কারণ আমার নিয়ত ছিল নির্মল। আর সেই নিয়তই আজ আমাকে এই পরম প্রাপ্তির কাছে এনেছে। আজ তুমি আমার জীবনের পরম সাথী, আমার ভালোবাসার প্রতিমূর্তি। আর কিছু দিনের মধ্যেই তুমি আমাদের সন্তানের মা হবে।
ভাবতে পারো, আমার বুকের ভেতর এখন কেমন আলোড়ন চলছে? আমি যেন প্রতিদিনই নতুন করে জন্ম নিচ্ছি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে।"
.
.
.
খান বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় যেনো ধীরে ধীরে উৎসবের রূপ নিচ্ছে। আঙিনাজুড়ে আলো-আঁধারি পরিকল্পনা, রান্নাঘরে ব্যস্ততা, ঘরের ভেতর বাইরে আলোচনার ঝড়। অনুষ্ঠানের পর থেকেই ছেলেরা সবাই কাজে এমনভাবে ডুবে গেছে যে নিঃশ্বাস ফেলারও ফুরসত নেই। বিয়ের আর মাত্র দশ দিন বাকি। প্রতিটি সদস্যের মুখে উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা, কে কোন কাজ সামলাবে, কোন অতিথি কোথায় থাকবে, মেন্যু কেমন হবে, সব মিলিয়ে এক অন্যরকম সজীবতা।
আজ শুক্রবার। ঠিক করা হয়েছে সবাই মিলে বসে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা হবে। খান বাড়ির বিশাল ড্রয়িং রুমে একে একে সবাই জড়ো হয়েছে। আলো-আঁধারিতে ঘরটা যেন উৎসবের আবহে ভরে উঠেছে। কিন্তু এই আনন্দমুখর পরিবেশের মাঝেই একা দাঁড়িয়ে আছে ওরহান।
তার চোখে-মুখে বিরক্তি। মনে হলো, যেনো সে এই পুরো তোড়জোড়ের অংশই নয়। ধীরে ধীরে নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে হঠাৎ করেই ফেটে পড়লো—
-"আচ্ছা মা, এই বাড়ির সবচেয়ে বড় ছেলে আমি। আমার বয়স ৩২ বছর হয়ে গেলো। অথচ আমার বিয়ে নিয়ে তোমাদের কোনো চিন্তাই নেই! আর এই ২৫ বছরের দুই রামছাগলকে নিয়ে তোমরা মহা উৎসব করছো। ওদের বিয়েতে এত তোড়জোড়, এত মাথা ব্যথা!
আর দেখো, ওসমান তো বড় ভাইয়ের আগে নিজেই বাপ হতে যাচ্ছে। আরে বলি, তোদের লজ্জা করে না? বড় ভাই এখনও ঘরে বসে অবিবাহিত, আর ছোট ভাইয়ের বিয়েও হয়ে গেছে, সে আবার বাচ্চা পয়দা করতেও বসে গেছে!"
ওসমান হঠাৎ কেশে উঠলো। পাশে বসা সাবা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেললো ওড়নার আড়ালে। ঘরে হালকা ফিসফিস হাসির ঢেউ উঠলো। মুফতি ও মারুফ মিটিমিটি হেসে উঠলো। চোখে-ঠোঁটে দুষ্টুমির খেলা।
মুফতি দাদাভাইকে উদ্দেশ করে বলল—
-"চিন্তা করোনা দাদাভাই। আমরা তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমরা তোমার আগে বাবা হবো না।"
কথাটা শুনেই ঘরে চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়লো। মুহূর্তের মধ্যেই ওসমান পেছন থেকে গাট্টা মেরে বসলো মুফতির মাথায়। মুখ গম্ভীর করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—
-"বিয়ে তো করছিস, গাধা।"
মুফতি মাথা চুলকাতে চুলকাতে হেসে উত্তর দিলো—
-"তো কি করবো? দাদাভাই অপেক্ষায় থাকলে এই জীবনে আমাদের বিয়ে আর হবে না!"
ওরহান তখন লাল মুখে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠলো—
-"একেকটা নির্লজ্জ পেলে পুষে বড় করেছি!"
ঘরজুড়ে হাসির রোল পড়লো। ওমর খান, ওয়াহিদ খান, সুরাইয়া বেগম, আয়রা বেগম, সবাই মুখ টিপে হাসছে। কেউ লুকোতে পারছে না আনন্দ আর অস্বস্তির মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
শেষ পর্যন্ত ওমর খান কাশির ভঙ্গি করে গলা পরিষ্কার করলেন। হাসি দমিয়ে গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করলেন—
-"আহ ওরহান, এত বিরক্ত হচ্ছ কেনো? ওদের তো পছন্দের মানুষ ছিল, তাই বিয়ে দিচ্ছি। তোমার যদি তেমন কেউ থাকে, সোজা বলে দাও, তোমাকেও বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। আমরা বাবা কারো জন্য মেয়ে খুঁজে আনতে পারবো না। যে ছেলে নিজের পছন্দ খুঁজে আনবে, তাকেই আগে বিয়ে দিয়ে দিব।"
ওরহান বিরক্ত স্বরে বলে উঠলো—
-"বাবা!"
ওমর খান হেসে হাত তুলে বললেন—
-"আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার ছেলের পিছে আর লাগবো না।"
এই সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এসে ওরহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন—
-"তোকে একটি মিষ্টি নিলীশ্যামা এনে দেবো।"
হঠাৎই ওরহানের শরীর কেঁপে উঠলো। নামটি যেনো বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো আঘাত করলো তার মস্তিষ্কে। কোথাও যেনো আগে শুনেছে এই নাম, কোথায়? কখন? মনে করতে পারছে না। চোখে-মুখে ভয় আর বিভ্রান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। মাথা চেপে ধরে বসে পড়লো সে।
মুহূর্তেই ঘরের আনন্দ-উচ্ছ্বাস থেমে গেলো। সবাই চিন্তিত চোখে তাকিয়ে রইলো ওরহানের দিকে। পরিবেশটা যেন হঠাৎই ভারী হয়ে উঠলো।
তখনই মুফতি, মারুফ অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙতে হেসে বললো—
-"দাদাভাই, আমাদের বিয়ের শপিং কিন্তু তুমি করবে!"
ঘরের ভেতর আবারও হালকা হাসির ঢেউ বয়ে গেলো, কিন্তু ওরহানের মস্তিষ্কে তখনো ঘুরপাক খাচ্ছে সেই একটি নাম, নিলীশ্যামা...
ওরহানের মাথা হঠাৎই প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হয়ে উঠল। অতীতের কোনো স্মৃতি মনে আনার আপ্রাণ চেষ্টায় তার ভ্রূ কুঁচকে গেল, চোখে ভেসে উঠল বিভ্রান্তির ছায়া। অপ্রস্তুত কণ্ঠে সে তোতলাতে তোতলাতে বলল—
-"হ্যাঁ? হ্যাঁ... ঠিক আছে।"
কথাগুলো যেন শূন্যে ঝুলে রইল। আর এক মুহূর্ত দেরি করল না ওরহান। ভারী পদক্ষেপে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল সে। কক্ষে নেমে এলো নিস্তব্ধতার শীতল আঁধার। উপস্থিত সবার চোখ তার চলে যাওয়ার পথে স্থির হয়ে রইল, অসহায়, বিমূঢ় আর ব্যথাতুর দৃষ্টিতে।
নিঃশব্দ ভাঙল মারুফ। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলল—
-"এবার দাদাভাইকে ক্ষমা করা উচিত। ভাবির সঙ্গে যেভাবেই হোক দেখা করাতেই হবে!"
কথাটির সাথে সাথে সবাই মাথা নাড়ল সম্মতির সুরে। শূন্য কক্ষটিতে যেন এক অদৃশ্য সিদ্ধান্তের গাম্ভীর্য ভাসতে লাগল।
সাবা এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"ইহাব ভাইকে বলে দিও, শপিং করাতে যেন আপুর বুটিকে নিয়ে যায়। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবার আপুকেও বুঝতে হবে। দাদাভাই যতটা কষ্ট পেয়েছে, আর নয়! এ মুহূর্তে আপুকে সামনে আসতেই হবে।"
সাবার কথায় পরিবেশে যেন অদৃশ্য এক অঙ্গীকারের আবহ তৈরি হলো। সবাই বুঝে গেল, আসন্ন সময়ে তাদের জীবনের মোড় ঘুরতে চলেছে।
.
.
.
সকালের আলো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ওরহান ইতোমধ্যেই অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি। স্যুট-টাই ঠিক করে একেবারে নিচে নেমে এলো সে। নাস্তার টেবিলে সবাই যেন তার অপেক্ষাতেই ছিল। ওরহান বসতেই কোলাহল ভেঙে গেল, একে একে সবাই খাওয়া শুরু করল।
সুরাইয়া বেগম মায়ের স্নেহমাখা হাতে ছেলের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে কোমল কণ্ঠে বললেন—
-"আজকে আর অফিসে যাওয়ার দরকার নেই, ওরহান। মুফতি, মারুফ আর কেয়া-পায়েল, সবাইকে নিয়ে শপিংয়ে যাবে তুমি।"
ওরহান একটু বিরক্তির সুরে জবাব দিল—
-"মা, আমার অনেক কাজ আছে। তোমরাই যাও।"
সুরাইয়া বেগম এবার দৃঢ় কণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দিলেন—
-"কাল মুফতি কি বলেছিল ভুলে গেছ? তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে, ওদের শপিং তুমি করাবে।"
কথার কোনো উত্তর দিল না ওরহান। শুধু চুপচাপ মাথা নিচু করে খেতে লাগল। নীরবতা ভাঙল খাওয়া শেষে। মোবাইল বের করে ইহাবকে কল দিল সে—
-"একটা ব্রাইডাল বুটিকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নাও।"
ওপাশ থেকে ইহাবের প্রশ্ন ভেসে এলো—
-"স্যার, আমার বউ যেখানে জব করে, সেখানেই নেব?"
ওরহান এক মুহূর্ত ভেবে বলল—
-"ঠিক আছে, নাও।"
সবাই প্রস্তুত হয়ে গাড়িতে উঠল। পথে কেয়া আর পায়েলকে তুলে নেওয়া হলো। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ওরহান নিজে, পাশে মুফতি। পেছনের সিটে বসেছে মারুফ, কেয়া আর পায়েল।
ধানমন্ডির ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি থামল একটি নতুন বুটিকের সামনে। মাত্র এক বছরের মধ্যে নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে, প্রায় সব ধরনের পোশাক পাওয়া যায় সেখানে, ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য। বুটিকের নাম "নেসহীর"।
এক এক করে সবাই নামল। দরজার সামনে আগেই দাঁড়িয়ে ছিল ইহাব। ওরহানদের আসতে দেখেই সে এগিয়ে এলো এবং তাদের নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরে ঢুকতেই সুশ্রী এক তরুণী এগিয়ে এসে সালাম জানাল। ইহাবের চোখে গর্বের ঝিলিক ফুটে উঠল। সে পরিচয় করিয়ে দিল—
-"স্যার, আমার wife, মিরহা অবন্তী।"
ওরহান ভদ্রতাসূচক এক হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল—
-"Nice to meet you."
মিরহা কোমল ভঙ্গিতে উত্তর দিল—
-"Same to you, sir."
অতিথিপরায়ণ ভদ্রতায় মিরহা তাদের আরামদায়ক আসনে বসিয়ে দিল। কেয়া আর পায়েলকে নিয়ে সে এগিয়ে গেল বুটিকের রঙিন সেকশনে, যেখানে ঝলমলে আলোয় ঝুলছে বিয়ের নান্দনিক পোশাকগুলো। রঙিন সিল্ক, জমকালো কাজ আর নরম জর্জেটের ছোঁয়া যেন এক অন্যরকম স্বপ্নলোক তৈরি করেছে।
ওদিকে মুফতি আর মারুফ উঠে গেল নিজেদের জন্য পোশাক দেখতে। দু’জনের পদচারণায় বুটিকের ভেতরকার কোলাহল আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেও ওরহান নির্বিকার। সোফার নরম কুশনে হেলান দিয়ে সে বসে রইল, হাতে ধরা ফোনে চোখ আটকে রাখল। আঙুলের স্পর্শে স্ক্রল হতে থাকল মোবাইলের স্ক্রিন, কিন্তু তার দৃষ্টিতে যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা ভেসে বেড়াচ্ছে। চারপাশের কোলাহলের সাথে তার নির্লিপ্ততা এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করল।
হঠাৎই ওরহানের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অশান্তি জেগে উঠল। তার হার্টবিট দ্রুত হয়ে গেল, যেন বুকের ভেতর থেকে শব্দগুলো বাইরে ছিটকে আসছে। বিস্ময়ে কপালে ভাঁজ পড়ল, সে হাত রাখল বুকে, কিন্তু এই হঠাৎ ঝড়ের কারণ কিছুতেই ধরতে পারল না।
মনে হলো, বহুদিনের শূন্যতা যেন আজ অচেনা এক পূর্ণতায় ভরে উঠছে। অদ্ভুত এক টান, অজানা এক টানে বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। মনে হলো খুব আপন, খুব চেনা কেউ যেন খুব কাছেই রয়েছে।
চঞ্চল হয়ে উঠল ওরহান। সে উঠে দাঁড়াল, চোখে খুঁজতে লাগল অদৃশ্য এক উপস্থিতিকে। এদিক-ওদিক তাকালো, কারো দেখা নেই। অস্থির পায়ে হাঁটতে লাগল বুটিকের ভেতরের রুমগুলোর দিকে।
হঠাৎ তার পা থমকে গেল এক দরজার সামনে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ আরও তীব্র হলো। অজান্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ভেতরে।
আর সেখানে, সেই রমণী! রাস্তা পার হওয়ার দিন যাকে প্রথম দেখেছিল, আজও যেন ঠিক একই রূপে দাঁড়িয়ে আছে। বেগুনি রঙের সুতির শাড়ি, চুল সুন্দর করে বিনুনী করা। হাতে ধরা কলম, ভ্রু কুঁচকে মনোযোগ দিয়ে মানিকুইনে রাখা এক পোশাকে নকশা আঁকছে।
ওরহানের দেহ যেন স্থির হয়ে গেল, অথচ তার পা দুটো আপনাআপনিই এগিয়ে গেল সেই নারীর দিকে। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল, বুকের ভেতরে চলতে লাগল অদ্ভুত এক সঙ্গীত।
রমণী তখনও ডুবে ছিল নিজের কাজে। হঠাৎ কারও উপস্থিতির টান অনুভব করে সে পেছনে ফিরে তাকাল। চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে অপ্রস্তুততা। কণ্ঠে কেঁপে ওঠা আশ্চর্যের সুর—
-"আপনি?"
মুহূর্তটিতে মনে হলো, ওরহান যেন অন্য এক জগতে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের শব্দ মুছে গেছে, কেবল দু’জন মানুষের নিঃশব্দ উপস্থিতি ঘরটিকে ভরে রেখেছে। ওরহান ধীরে, গভীর কণ্ঠে বলল—
-"ওরহান।"
রমণী কপাল কুঁচকে বিস্ময়ে প্রশ্ন করল—
-"এখানে কি করছেন আপনি?"
ওরহানের ঠোঁটে ভেসে উঠল রহস্যময় উত্তর—
-"আপনাকে দেখছি।"
রমণীর চোখে রাগ আর অবিশ্বাসের ঝিলিক। কণ্ঠে ক্ষুব্ধতা—
-"মানে? কী ধরনের অসভ্যতা!"
কিন্তু ওরহান নির্বিকার। তার দৃষ্টি যেন মগ্ন হয়ে বলল—
-"আপনার নাম কী? না... থাক, আপনার নাম নীলশ্যামা, হ্যাঁ, এই নামটাই আপনার জন্য একেবারে পারফেক্ট!"
রমণী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে উঠল। কণ্ঠে রূঢ় শীতলতা—
-"আপনি কি বলছেন এসব? বেরিয়ে যান এখান থেকে!"
ওরহান হঠাৎ নিজের মধ্যে ফিরে এলো। বিস্ময় থেকে অপ্রস্তুত হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। আস্তে আস্তে বলল—
-"সরি... আসলে বুঝতে পারিনি। আমরা শপিং করতে এসেছি।"
রমণী এবার শান্ত স্বরে জবাব দিল—
-"তাই বলুন।"
ওরহান দ্বিধা ভাঙল—
-"আপনার নামটা জানতে পারি?"
রমণী সোজাসুজি উত্তর দিল—
-"নেসলিহান সোহা।"
ওরহানের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। যেন নামটা তার অন্তরে অচেনা অথচ পরিচিত এক তারার মতো আলো ছড়িয়ে দিল। ধীরে বলল—
-"আমি ওরহান খান শাহির।"
সোহা হালকা বিরক্তির সুরে ভ্রু উঁচু করে বলল—
-"হ্যাঁ, একটু আগেই তো বললেন।"
অপ্রস্তুত হেসে মাথা নত করল ওরহান। সোহা আবার নিজের কাজে ডুবে গেল, কলমের আঁচড়ে নকশা ফুটে উঠতে লাগল কাপড়ের উপর।
আর ওরহান? সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুগ্ধ নয়নে দেখল সোহাকে। মনে হলো, এই নারীকে সে আগে কোথাও দেখেছে, কোনো গভীর সম্পর্ক আছে তার সাথে। হৃদয়ের গোপন কোণে এক অনিবার্য টান বাজতে লাগল, এক অচেনা পরিচয়ের গভীরতায় হারিয়ে যেতে লাগল ওরহান।
.
.
.
সেদিনের পর কেটে গেছে পুরো সাত দিন। কিন্তু সেই দিনের দেখা যেন এক অনিবার্য টানে প্রতিদিনই ওরহানকে টেনে নিয়ে আসে আবারও সেই বুটিকে। আজও এসেছে, অফিসের কাজ ফেলে, বাহানায় বিয়ের জামা-পাকাপড় নিতে। অথচ মূল উদ্দেশ্য একটাই, সোহাকে দেখা।
প্রতিদিনই সে এখানে আসে, তবে আড়াল থেকে চুপিচুপি দেখে চলে যায়। নিজেকেও প্রশ্ন করে, কেন এমন করছে? উত্তর খুঁজে পায় না। শুধু বোঝে, এই মেয়েটির সাথে তার অতীতের কোনো সম্পর্ক নিশ্চয়ই আছে। কারণ সোহাকে কাছে পেলেই বুকের ভেতর এক অপার্থিব সুখ ঢেউ খেলে যায়। সেই সুখের খোঁজেই তো সময়-অসময়ে সবকিছু ছেড়ে এখানে ছুটে আসে সে।
আজও তাই। ওরহান সোফায় বসে আছে, সামনে বিয়ের পোশাকগুলো গুছিয়ে রাখা। সোহা আর মিরহা এসে যত্ন নিয়ে টেবিলে রাখল সব। এরপর ট্রেতে সাজানো নাস্তা এনে দিল তারা। একসাথে সবাই বসেছে সোফায়। চারপাশে কোলাহল, তবু ওরহানের দৃষ্টি যেন স্থির এক জায়গায়, আড়চোখে সোহাকে দেখে যাচ্ছে বারবার।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সে যেন সাহস সঞ্চয় করল। কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হঠাৎ সোহার দিকে এগিয়ে দিল একটি কার্ড। কণ্ঠে ভদ্রতার আবরণে লুকোনো এক অচেনা আবেগ—
-"আমার ভাইদের বিয়ে আগামী শুক্রবার। আপনাকে আমন্ত্রণ জানালাম। আপনার পরিবারকে নিয়েই আসবেন, কিন্তু।"
সোহা চুপচাপ কার্ডটা গ্রহণ করল। তার চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময় খেলে গেলেও ঠোঁট রইল নিঃশব্দ।
মিরহাকে আলাদা করে আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজন হয়নি, সে তো ইহাবের স্ত্রী। হ্যাঁ, ইহাব বিয়ে করেছে পাঁচ মাস আগে। ঠিক ওরহানের আমেরিকা থেকে ফেরার পরপরই।
কক্ষে নেমে এলো এক অদৃশ্য আবহ, যেখানে আমন্ত্রণপত্রের রঙিন কাগজ যেন হয়ে উঠল দুটি অচেনা হৃদয়ের মাঝে এক নতুন সেতুবন্ধনের প্রতীক। অচেনা হৃদয় নাকি পূর্ব পরিচিত? সময় বলবে সে কথা।
.
.
.
ওরহান যেন পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে গেছে। বিয়ের প্রস্তুতির কাজে সবাই এতটাই ডুবে যে অফিস সামলানোর সময়ই নেই তার। দু’দিন হলো সে বাড়িতেও ফিরতে পারেনি। শুধু বিয়ের পোশাকগুলো এনে দিয়ে আবার কাজে ছুটে গেছে।
গায়ে হলুদের আগের দিন। বাড়ির কাজকর্ম শেষ করে সকলে ড্রয়িংরুমে বসেছে। চারপাশে রঙিন আলো, সজ্জার আভা আর উৎসবের গুঞ্জন, তবু পরিবেশে যেন চাপা এক নীরবতা। কথার মাঝে হঠাৎ ওসমান বলে উঠল—
-"ভাবির সঙ্গে দেখা হয়েছে। দাদাভাই এতদিন গোপনে গিয়েও দেখেছে। আমি তো আগেই বলেছিলাম, আমার দাদাভাই মৃত্যুর আগেও ভাবীকেই চাইবে। দেখছো না? স্মৃতিশক্তি হারিয়েও দাদাভাই আবার নতুন করে ভাবীকে ভালোবেসেছে। এখন তো সব পরিষ্কার, দাদাভাই কোনো প্রতিশোধের জন্য কিছুই করে নি। যা করেছে, কেবল ভাবীকে ভালোবেসেই করেছে।"
তার কথায় সবার মুখে একরকম স্বস্তির ছায়া ফুটে উঠল। সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল সবাই। সাবা নিচু স্বরে যোগ করল—
-"আপুর সঙ্গেও কথা হয়েছিল। আপুও এখন সব বুঝতে পারছে। তার মনে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, সবই কেটে গেছে।"
শিফা মলিন কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
-"দাদাভাইয়ের একটি ভুলের জন্য আমরা সবাই মিলে তার সঙ্গে অবিচার করেছি। ভাবির বিষয়টা গোপন করা উচিত হয়নি আমাদের। যে মানুষটা অসুস্থ, তার কাছেই আমরা অগ্নিপরীক্ষা নিচ্ছি, অথচ সে কিছুই জানে না।"
শিফার কথায় ভারী হয়ে উঠল পরিবেশ। আয়রা বেগম এগিয়ে এসে মমতাভরে শিফার মাথায় হাত রাখলেন। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
-"ওরহান কিছু মনে করবে না। যতক্ষণ সে সোহাকে পাচ্ছে, সে পাতালেও যেতে রাজি। এই পরীক্ষা তো সামান্য তার কাছে।"
সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হৃদয়ের ভেতর একটাই প্রশ্ন গুঞ্জন তুলল, কবে ফিরবে ওরহানের জীবনে প্রকৃত সুখ? কবে ফিরে আসবে তার হারানো স্মৃতি?