ফিরে দেখা

পর্ব - ৩

🟢

-"স্যার আপনি মিস সোহার বাসার ঠিকানা চেয়েছিলেন সেটা জোগাড় করে ফেলেছি।"

-"ভেরি গুড ইহাব! মিস সোহার বাড়িতে কে কে আছে?

-"কেউই নেই স্যার উনি এক থাকেন ছোট্ট একটি বাড়িতে।"

-"ঠিক আছে! তুমি তার ওপর নজর রাখো ইহাব তার প্রতিটা মুভমেন্টের খবর আমি চাই।"

-"স্যার উনিই কি সেই মিস সোহা?"

-"হুম!"

-"Okay sir! I will keep an a eye on her don't worry."

.

.

.

.

Velvet Bloom-এর সাময়িক কর্পোরেট রুম, বড় রুমটি নিঃশব্দ, ঠান্ডা, মার্বেলের মেঝেতে গমগমে প্রতিধ্বনি। প্রান্তে টানটান পর্দা, মাঝে একটি বিশাল ডিল টেবিল, যেখানে বসেছেন চারপাশের নজরকাড়া মানুষগুলো।

সোহার ডান পাশে বসেছেন তার পিএ মিরহা, ম্যানেজার আরিফুল রাজ, অ্যাডভোকেট সূর্য শেখর।

ওরহানের পাশে রয়েছে তার পিএ ইহাব, কোম্পানির আইনজীবী সালমান কবির, এবং ওসমান।

একগুচ্ছ ডকুমেন্টেশন সামনে রেখে মিটিং শুরু হয়, পরস্পরের চোখে চোখ রেখে আলোচনা, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলা সেই আলোচনা শেষ হয় একে একে কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে। শেষে সোহা নীরব অথচ নিশ্চিত কণ্ঠে বলে—

-"I hope this partnership brings the kind of legacy both our companies deserve."

ওরহান মৃদু হাসে, চোখে তার চিরাচরিত গাম্ভীর্য আর একরাশ অপার নিশ্চয়তা।

-"Legacy তো হবেই...."




সন্ধ্যা, সোহার ছোট্ট বাড়ির সামনে! নির্জন রাস্তায় একটি ছায়াময় শরীর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে।

ওরহান।

হুডি পরা, গাড়ি থেকে অনেকটা দূরে, একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে। চোখ তুলে তাকিয়ে আছে সামনের একতলা ছোট্ট বাড়িটার দিকে। ছাদের রেলিংয়ের পাশে বসে আছে সোহা, হাতের মধ্যে খোলা বই। চোখে দূর দৃষ্টির আবেশ, পাতায় পাতায় মেঘের ছায়া পড়ছে।

ওরহানের চোখ আটকে থাকে তার প্রতিটি মৃদু ভঙ্গিমায়। সে কোনো শব্দ করে না, কেবল সোহাকে দেখতে থাকে, যেন এক জীবনের আরাম এই দৃশ্যেই। হঠাৎ, আকাশ ভেঙে নামে বৃষ্টি। সোহা বই বন্ধ করে পাশে রাখে, দাঁড়িয়ে পড়ে ছাদের কিনারায়। বৃষ্টির ধারা গায়ে মেখে সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে, চুল ভিজে পিঠ পর্যন্ত ঝরে পড়ে।

ওরহানের চোখ আটকে যায় সে দৃশ্য। সে ছাতা খোলে না। নিজেও একপলকে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে।

কেউ কাউকে ডাকে না, কেউ কিছু বলে না। তবু ওই ভেজা মুহূর্তের মধ্যে, দু’জন মানুষ, দুই বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও, একই আবেগে সিক্ত হয়ে থাকে।

আকাশে বাজ পড়ে দূরে। সোহার মনে হয় কেউ তাকে অপলক দেখেচলেছে। সোহা চোখ মেলে দেখে, চারপাশ, কেউ নেই। কিন্তু তার ভেতরটা বলে—

"কেউ আছে। কে যেন দেখছে।"

বৃষ্টি থেমেছে। সোহা ধীরে ধীরে নেমে আসে ছাদ থেকে।

ওরহান দাঁড়িয়ে থাকে নিচে, নীরব, নিশ্চল। যতক্ষণ না সোহার বাড়ির প্রতিটি লাইট নিভে যায়, ততক্ষণ সে নড়েও না। শেষ আলোটিও নিভে গেলে সে নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে বসে, গাড়ি স্টার্ট দেয়, অন্ধকারে মিলিয়ে যায় এক নিঃশ্বাসে।"

.

.

.

.

সোহার পিএ মিরহা এসে জানায়, ওরহানরা এসেছেন এবং পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করতে চান।

তারা সোহার জন্য মিটিং রুমেই অপেক্ষা করছেন।

-"তুমি যাও, ওদের চা-কফি সার্ভ করো। আমি বিশ মিনিটের মধ্যে চলে আসছি।"

মিরহা মাথা নেড়ে রওনা দেয় মিটিং রুমের দিকে।

স্টাফকে নির্দেশ দেয় চা-কফি সার্ভ করার জন্য এবং ওরহানদের জানান দেয়, সোহা বিশ মিনিটের মধ্যে মিটিংয়ে যোগ দেবেন।

-"Sorry, gentlemen, আপনাদের অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত। আমি হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে ভিডিও কলে ছিলাম।"

-"It’s okay, Miss Soha,"

ওসমান শান্তভঙ্গিতে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়।

-"বেশ, তাহলে চলুন, কাজে ফেরা যাক।"

এরপর শুরু হয় আলোচনা, নিরেট প্রফেশনালিজম আর অঙ্কের নিরিখে ঠাসা এক বৈঠক, যা স্থায়ী হয় প্রায় দেড় ঘণ্টা। সবার মুখে দৃঢ়তা, কিন্তু কারও চোখেই সহজে প্রকাশ পায় না পরাজয়ের ইঙ্গিত কিংবা বিজয়ের নিশ্চয়তা।

.

.

.

.

অফিসের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এদিকে, ওরহান সোহার সম্পর্কে সব ধরনের তদন্ত শেষ করে ফেলেছে। সোহা এতদিন ফ্রান্সে ছিল, সেখান থেকেই পরে প্যারিসে গিয়ে স্থায়ী হয়। সেই ঘটনার পর থেকে সোহা কারো সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি, এমনকি নিজের পরিবারকেও ছেড়ে এসেছে সে। অবশ্য এর পুরো দায় ওরহানেরই। সবাই যখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই কেউ চাইলেও সোহাকে আর ফিরে পায়নি।

ওরহান নানা অজুহাতে সোহার সঙ্গে দেখা করে, কাজের অজুহাতে তাকে অফিসে ডেকে পাঠায়, অহেতুক মিটিংয়ের আয়োজন করে। সোহা সবই বোঝে, কিন্তু কিছু করার নেই, সব কিছুই হেড অফিসের নির্দেশে হচ্ছে। চাইলেও সে আর কিছু করতে পারছে না।

আজও ওরহান সোহাকে মিটিংয়ের নামে ডেকে পাঠিয়েছে, তাও আবার তার কেবিনের রং কী হবে, সেটি ঠিক করার জন্য! এই অপদার্থ অজুহাতেই সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ আজ ভেঙে গেছে সোহার।

ওদিকে সোহার পিএ মিরহা প্রায় কাঁপছে ভয়ে। আজ ম্যাডাম ভীষণ রেগে আছেন, না জানি কী করে বসে! জরুরি সব কাজ ফেলে তাকে এখানে আসতে হয়েছে শুধুই ওরহান স্যারের অহেতুক একটি বিষয় নিয়ে মিটিং ডাকায়। মিরহা মনে মনে ঠিকই বুঝে নিয়েছে, আজ ওরহান স্যারের রক্ষা নেই!

সোহা খান কোম্পানিতে ঢুকেই কারো বাধা না মেনে সোজা চলে যায় ওরহানের কেবিনে। কেবিনে তখন উপস্থিত ছিলেন ইহাব, ওসমান এবং মিহিরিমা। দরজা ঠেলে ঢুকে সোহা সজোরে টেবিলে এক আঘাত হানে।

সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। চারপাশ থমথমে।

শুধু ওরহান, স্নিগ্ধ, স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে সোহার দিকে। তার চোখে কোনও বিস্ময় নেই, যেন এই ঝড় আসবেই, তা সে আগেই জানত।

সোহা তখন রাগে ফুঁসছে। কণ্ঠে আগুন মিশে সে বলে ওঠে—

-"সমস্যা কী আপনার?" সোহার কণ্ঠে যেন আগুনের ঝড়। "সামান্য একটা বিষয় নিয়ে আপনি মিটিং ডাকেন? আমি কি খেয়ে-দেয়ে আর কোনো কাজ পাই না যে, আপনার এই বা*লের ইন্টিরিয়র ডিজাইন ঠিক করে দেব! আগেই তো বলে দিয়েছি, জরুরি কিছু না হলে আমাকে ডাকবেন না। প্রয়োজন হলে আমি নিজেই চলে আসব। কিন্তু না, সেটাতো আপনাকে মানায় না! আপনি তো দ্য গ্রেট ওরহান খান শাহির! আপনার যখন যা ইচ্ছা, সেই ভাবেই সবকিছু চলবে, তাই তো? আমাকে কি পুতুল ভাবেন আপনি?"

একটানা কথাগুলো বলে থেমে গেল সোহা। একদমে এত কিছু বলে হাপিয়ে উঠেছে সে। চোখে মুখে রাগের আগুন যেন ঠিকরে পড়ছে। লম্বা একটি নিশ্বাস ফেলে সোহা আবারও বলে—

-"অযথা মিটিং ডেকে আমার সময় নষ্ট করছেন! নিজের একটা কোম্পানি আছে আপনার, সেখানে কি কোনো কাজ নেই। নাকি আপনার সব কাজ এখন আমার কোম্পানিতেই সীমাবদ্ধ?" তার কণ্ঠে তীব্র ঘৃণা আর অভিমানের ছায়া। পুরো ঘর নিঃশব্দ।

ইহাব বিস্ময়ে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে, এই শান্ত শিষ্ট, ভদ্র মেয়েটির এমন ভয়ংকর রূপ সে কখনও দেখেনি। গলার কাছ দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। একবার ওরহানের স্থির চোখের দিকে তাকাচ্ছে, তো একবার রণরূপী সোহার দিকে।

ওসমান যদিও প্রথমে কিছুটা চমকে উঠেছিল, কিন্তু এখন আর তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যেন এই মুহূর্তের জন্যই সে প্রস্তুত ছিল। ভাইকে সে আগেই সাবধান করেছিল, তবে তাতে কান দেননি ওরহান।

কিন্তু চুপ করে থাকতে পারেনি মিহিরিমা। সে দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠল—

-"এই মেয়ে! তুমি জানো কার সঙ্গে কথা বলছো?"

মিহিরিমা গর্জে উঠল, গলার স্বর তীব্র বিষে ভরা।

"থার্ড ক্লাস মেয়ে! কে তোমাকে কেবিনে ঢোকার অনুমতি দিয়েছে? আয়নায় নিজেকে দেখেছ? তোমাকে তো ফকিন্নির মতো লাগছে, এইসব কী ধরনের পোশাক পরে এসেছো তুমি? এখনই বেরিয়ে যাও এখান থেকে! তুমি তোমার যোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছ, আর তার ফল কী হতে পারে, তা তুমি কল্পনাও করতে পারো না। কোন সাহসে তুমি ওরহানের কেবিনে ঢুকে এভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো?”

ওসমান তখন কটমট করে তাকাল মিহিরিমার দিকে। মনে মনে ফুসতে লাগল, এই মেয়ে জানে সে কাকে কি বলছে? "দাদাভাই না এখনি এক থাপ্পড়ে বসিয়ে দেয়...!" তার দৃষ্টি জ্বলে উঠল ক্ষোভে।

"বাবা কিভাবে এই মেয়েটার সঙ্গে দাদাভাইয়ের বিয়ে ঠিক করলেন, আল্লাহই জানেন। পশুর সঙ্গেও সহাবস্থান সহজ, কিন্তু এই মেয়ের সঙ্গে?"

ইহান নির্লিপ্ত। অভ্যস্ত সে মিহিরিমার রকমারি ‘ফ্যাশন সেন্স’ আর বাচাল স্বভাবের প্রতি। কথা যেখানেই গিয়ে পড়ুক না কেন, এই মহিলা ঠিকই তার গোবরতুল্য রুচির প্রমাণ দিয়ে দেন, মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তার চোখে একটাই প্রশ্ন, স্যার কিভাবে এ নারীর সঙ্গে সংসার করবেন?

অন্যদিকে, ওরহানের চোখ রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। চোয়াল শক্ত, হাত মুষ্টিবদ্ধ। এতক্ষণ যে মানুষটি অবিচল ছিল, তার ভিতর এখন আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।

সোহা, যে এতক্ষণ রাগে ফুঁসছিল, মিহিরিমার এই কথায় হঠাৎই স্থির হয়ে গেল। তার চোখে এক শীতল অথচ জ্বালাময় দৃষ্টি। ধীরে ধীরে চারপাশে নজর বুলিয়ে নিল, কে কোথায় আছে। তারপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে একবার নিজের পোশাকে চোখ বুলিয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করল—

-"আপনি কে? ওহ...ওহ! বুঝেছি। আপনি তো সেই মেয়েটি, নামটা যেন কী ছিল? হ্যাঁ, মনে পড়েছে.... বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া স্লাট কন্যা।" সোহা ঠান্ডা অথচ ছুঁইয়ে যাওয়া সুরে বলল।"কী যেন বলছিলেন আপনি? আমার পোশাকে নাকি আমাকে ফকিন্নীর মতো লাগছে? Well, guess what, রানী লাগছে। On the other hand, you are looking like a slut."

ফিরে দেখা গল্পের ইমেজ (নওরিন ইথিকা)

তার কথায় মুহূর্তেই ঘর নিস্তব্ধ। ওরহানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলে যায়। সোহা তখন নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে চলল—

-"আমি বাঙালি ট্র্যাডিশনাল শাড়ি পরেছি। কিন্তু আপনি তো মাশাআল্লাহ...! পেট, পিঠ, হাত, হাঁটু, সবই তো আপনি স্বেচ্ছায় দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন।" তার কণ্ঠে তখন ঘৃণা মিশে গেছে তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে। "পুরুষ মানুষ তো টাকা খরচ করে নারীর শরীর দেখতে যায়। আর আপনি? এত মূল্যবান সম্পদ, বিনা খরচেই বিলিয়ে দিচ্ছেন। অভিনন্দন।"

মিহিরিমা রাগে ফুঁসছে। তার জীবনে এমন অপমান কেউ কখনও করেনি। ক্ষেপে উঠে সে তেড়ে যায় সোহার দিকে, আঘাত করার জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই ওরহান সামনে এসে তাকে থামিয়ে দেয়। রক্ত লাল চোখে ওরহানের দিকে তাকায় মিহিরিমা। ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল—

-"তুমি আমাকে আটকাচ্ছ কেন? ছাড়ো! আজ এই মেয়েটাকে শিক্ষা দিতেই হবে। কে এই মেয়ে? কে দিয়েছে ওকে এত সাহস আমাকে অপমান করার? আজ আমি ওকে মেরেই ফেলব!"

ওরহানের গলা তখন ধীর কিন্তু কঠিন।

-"স্টপ ইট, মিহিরিমা। এটা আমার অফিস, নাটক করার মঞ্চ না। বেরিয়ে যাও, রাইট নাউ। ওসমান, ওকে নিয়ে যাও। ইহাব, তুমিও বের হও। মিস সোহা’র সাথে আমার কথা আছে।"

ওসমান কিছু না বলে মিহিরিমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। ইহাবও মাথা নীচু করে বেরিয়ে আসে।

দরজা পেরিয়ে বাইরে এসে ইহাব দেখে, মিরহা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যমনস্কভাবে হাতের নখ খুঁটছে। সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল—

-"কি হয়েছে, মিস মিরহা? আপনাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?"

মিরহা ধীরে চোখ তুলে তাকায়, এক লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল—

-"আজ একটা বিশাল অর্ডারের মিটিং ছিল। আপনার ফোনে ডেকে পাঠানোয় আমাদের সেই মিটিং মাঝপথে ছাড়তে হয়েছে। আর তাতেই ডিলটা হাতছাড়া হয়েছে। মাম খুব রেগে আছেন। তিনি সহজে রাগেন না, কিন্তু একবার রেগে গেলে নিজেই জানেন না কী করেন।

তাই ভয়ও লাগছে, চিন্তাও হচ্ছে।"

ইহাব বুঝে গেল মিরহার উদ্বেগ অমূলক নয়। সত্যিই, ওরহান স্যার আজকের মতো তুচ্ছ বিষয়ে সবাইকে ডেকে পাঠিয়ে পুরো প্রজেক্টের ক্ষতি করেছেন। এদের দুজন, ওরহান আর সোহা, একসাথে থাকলে পুরো অফিস যেন দম বন্ধ হওয়া এক আতঙ্কে থাকে। "এই দু’জনের মধ্যে এমন কী আছে, যা কেউ বুঝে না?" মনেই ভাবল ইহাব। তারপর হঠাৎ মিরহার তুরি বাজানোর শব্দে ধ্যান ভেঙে যায়। সে মিরহার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে আশ্বস্ত করে, তারপর তাকে নিয়ে ক্যান্টিনে চলে যায়।

ক্যান্টিনে বসে একে একে সব খুলে বলতেই মিরহা গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। তার চোখে অস্পষ্ট এক আশঙ্কা খেলা করে, আর চারপাশ যেন ভারী হয়ে ওঠে অজানা কোনো কিছুর পূর্বাভাসে।

সবাই চলে যাওয়ার পর ওরহান নীরবে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর একে একে সব পর্দা নামিয়ে আনল। ঘরটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ ও আড়ালভরা হয়ে উঠল।

সোহা রাগে ফুঁসছিল, তবুও তার চোখ ছিল স্থির, ওরহানের প্রতিটি পদক্ষেপ সে গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করছিল। এত বছরেও এই মানুষটিকে সে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি, আর আজ যেন সে নতুন করে রহস্যময় হয়ে উঠছে।

ওফিসরুমটা বেশ বড়। মাঝখানে একটি নান্দনিক কাঠের টেবিল, দু'পাশে আরামদায়ক দু'টি সারি-ধরে সোফা, মাঝখানে একটি কফি টেবিল। অন্য সব জায়গা খোলা, প্রশস্ত। একদিকে পুরো দেয়ালজুড়ে কাঁচ, যা শহরের ব্যস্ত কোলাহলময় দৃশ্য তুলে ধরে, অথচ বাইরের কোনো শব্দ এই ঘরের নিঃশব্দতাকে ছুঁতে পারে না। অন্য পাশের দেয়ালটা আধা-কাচ আর আধা-দেয়াল, যেন বাইরে কর্মরতদের ওপর নজর রাখার একটি নিখুঁত পরিকল্পনা। সোহা তখন ওরহানের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, অবিচল, স্থির।

ওরহান ধীরে ধীরে, নীরব পায়ে এগিয়ে আসছিল তার দিকে। কোনো তাড়াহুড়া নেই, উত্তেজনাও নেই। চোখে একরকম প্রশান্তি, এমন প্রশান্তি যা ঝড়ের আগে নেমে আসে। তার মুখে কোনও প্রকাশ নেই, না অভিমান, না রাগ, না কষ্ট। কেবল একটা অদ্ভুত স্থিরতা। এমন ভঙ্গি, যা দেখে বোঝা যায়, সে সবকিছু জানে, এবং তবু কিছুই বলবে না।

এভাবে, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে ওরহান এগিয়ে এল সোহার দিকে। ঘর জুড়ে এক দমবন্ধ নিস্তব্ধতা। কেবল বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে চুপিসারে জমে থাকা অতীতের প্রতিধ্বনি। ওরহান এসে থেমে গেল একেবারে সামনে, মুখোমুখি। সোহা তার বুক অবধি লম্বা, ওরহান সামান্য নিচু করল মাথা, আর সোহা একটু উঁচু করল তার চিবুক। চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তটি থমকে গেল, সময় যেন জমে গেল তাদের মাঝখানে।

ওরহানের চোখে সেই চিরচেনা গভীর চাহনি। সেই চোখের চাহনি, যা একসময় তাকে শিহরিত করত ভীতির কাঁপুনিতে, যা একদিন মনের ক্যানভাসে আবেগের রং ছড়িয়ে দিত, আর ঠিক একদিন, সেই চাহনিই তাকে নিঃশব্দে ভেঙে দিয়েছিল। একই দৃষ্টি, একই আলো, কিন্তু সেই চাহনির অর্থ কী, সেটা আজও বুঝে উঠতে পারেনি সোহা। হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হয়ে উঠেছে, শিরায় শিরায় ঝিমঝিম অনুভব, কিন্তু সোহা নিজের ভেতরের কাঁপনটুকু ওরহানকে বুঝতে দেয় না। চোখে কঠোরতা, মুখে অচঞ্চল দৃঢ়তা।

ওরহান কিছুটা বিস্মিত হলো, এই প্রতিরোধ সে আগে দেখেনি। কিন্তু তবু তার মুখে প্রশান্ত, নিঃশব্দ এক হাসি। ধীরে ধীরে, কোনও শব্দ না করে, ওরহান সামনে থাকা টেবিলের দুই পাশে হাত রাখল। তার শরীরের উত্তাপ হালকা করে ছুঁয়ে গেল সোহার স্নায়ুগুলো।

তারপর খানিকটা ঝুঁকে এল সে। সোহা সামান্য পেছন দিকে হেলে গেল, কিন্তু আর পিছু হটার জায়গা ছিল না।

ওরহানের দুই বাহুর মাঝে বন্দি সে, দুই হৃদয়ের মাঝে এক বিন্দু দূরত্ব, যেখানে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিশে যায়

আর শব্দেরা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সোহার ভেতরটা যেন ঝড়ে কাঁপছে, কিন্তু বাইরে থেকে সে পাথরের মতো স্থির। ওরহানের শরীরের গন্ধ, তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা, তার চোখের জ্বলন্ত প্রশ্রয়, সব মিলিয়ে একটা তীব্র, তীক্ষ্ণ শিহরণ বইছে তার ভিতর জুড়ে।

ওরহান তখন চোখে এক রহস্যময় দীপ্তি নিয়ে মুখটা এনে দিল একেবারে কাছে। যতটা কাছাকাছি হলে আর কণ্ঠস্বরের দরকার পড়ে না, শুধু হৃদয়ের স্পন্দনে কথারা উচ্চারিত হয়। তার ঠোঁট নড়ল, কণ্ঠে যেন নরম অথচ ভারী এক আগুন, গভীর, ধীর, এবং অভিমান মেশানো সুরে বলল—

-"I missed you.... Did you miss me?"

ফিরে দেখা গল্পের ইমেজ (নওরিন ইথিকা) ওরহান সোহা
Story Cover