ওমর খান ও সুরাইয়া বেগম আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর ছয় মাস কেটে গেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আদরের সন্তান ওরহানকে। সেই ওরহান, যে একসময় নিস্তেজ হয়ে শয্যাশায়ী ছিল, আজ আবার সুস্থ দেহে নিজের জীবনে ফিরেছে। হাঁটা-চলা, চলাফেরা, সবই করছে স্বাভাবিক মানুষের মতো। যেন অসুখ আর যন্ত্রণার দিনগুলো কেবল দুঃস্বপ্ন ছিল।
তবু একটি শূন্যতা রয়ে গেছে, স্মৃতি। এখনো অতীতের সেসব দিন ওরহানের মনে পরে না। ডাক্তাররা বলেছেন, হঠাৎ কোনো দৃশ্য, কোনো শব্দ কিংবা পুরোনো পরিচিত গন্ধে তার ভেতরে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি জেগে উঠতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, কোনোদিনই ফিরে আসবে না। তাই পরিবারের কেউ এ নিয়ে তাকে চাপ দেয় না। সবার বিশ্বাস, আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব।
বাড়ির আবহাওয়াও বদলে গেছে। ওরহান একসময় পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা নিয়ে সবার থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সে আগের মতোই প্রাণখোলা মেলামেশা করছে সবার সঙ্গে। সেই ব্যবধান মুছে গেছে। তার হাসি, তার প্রাণচঞ্চল উপস্থিতি আবারও বাড়িকে পূর্ণতা দিচ্ছে।
এদিকে ওসমান ও সাবার সংসারে নতুন আনন্দের বার্তা। সাবা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বহু বছর পর বাড়ি ভরে উঠেছে নতুন প্রাণের অপেক্ষার উচ্ছ্বাসে। সুরাইয়া বেগম ও তার জা মিলে সাবার চারপাশে অদৃশ্য এক সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছেন। ঘরের কোনো কাজ করতে দেন না তাকে। যেন মাটির প্রদীপকে সযত্নে রক্ষা করছেন, ভয়ে ভয়ে নিশ্বাস নিচ্ছেন।
ওসমানও যেন অন্য এক মানুষ হয়ে উঠেছে। অফিসে ব্যস্ত থেকেও প্রতিনিয়ত ফোন করে স্ত্রীর খোঁজ নেয়। আর যখন বাড়িতে থাকে, তখন স্নেহ ও যত্নে স্ত্রীকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের অশান্তি, দুঃখ ও বেদনার পর পরিবারে এখন শান্তির হাওয়া বইছে। প্রতিটি নিশ্বাসে যেন এক নতুন সূচনা, প্রতিটি হাসিতে যেন বেঁচে ওঠার গল্প লেখা হচ্ছে।
প্রতিদিনের মতোই সকাল শুরু হয়েছে। বাড়ির ডাইনিং টেবিলে একসাথে বসেছে সবাই। সবাই নাস্তা করছে। টেবিল সাজানো, নানা রকম পদে ভরে আছে। মা আর কাকিমারা স্নেহভরা হাত দিয়ে খাবার পরিবেশন করছেন। চারপাশে যেন গৃহস্থালি আনন্দ ও প্রশান্তির ছবি।
এই সময় সিঁড়ি বেয়ে নামলো ওরহান। কালো স্যুটে সজ্জিত, যেন অফিসের গম্ভীর ব্যস্ত জীবনে ফেরার ঘোষণা দিচ্ছে তার উপস্থিতি। চুপচাপ এসে শিফার পাশে বসল। সামনেই ওসমান আর সাবা। মুহূর্তের জন্য চারপাশ নীরব হয়ে গেল। তারপর ওরহান এক নজর তাকিয়ে ধীরে ধীরে খাবার খেতে শুরু করলো।
হঠাৎই তার কণ্ঠ ভেসে এলো—
-"তোমার শরীর এখন কেমন?"
সাবা হেসে জবাব দিল—
-"জ্বি ভাইয়া, ভালো আছি।"
-"ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করো। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে যে কাউকে বলবে, সংকোচ করবে না।"
-"জি ভাইয়া।"
একটু বিরতির পর ওরহান আবার বলল—
-"আচ্ছা, তোমার বাবার বাড়ির কাউকে তো আমি দেখলাম না।"
সাবার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অচেনা ছায়া খেলে গেলেও সে স্থির কণ্ঠে উত্তর দিল—
-"আমার তো শুধু মা আর এক আপু ছাড়া কেউ নেই, ভাইয়া।"
ওরহান বিস্মিত হয়ে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ল—
-"ওহ! তো ওনারা আসেন না তোমার সঙ্গে দেখা করতে? আমি তো একবারও দেখলাম না!"
সাবা মৃদু হাসলো, তারপর শান্ত স্বরে বলল—
-"আপনি তো বিদেশে ছিলেন। আর এখন বেশিরভাগ সময়ই তো অফিসে থাকেন। আপু-আম্মু মাঝে মাঝেই আসেন, কিন্তু আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি। আপনি থাকেন না বলে হয়তো চোখে পড়েনি।"
ওরহান মাথা নাড়ল—
-"ওহ, আচ্ছা।"
এই উত্তরেই যেন টেবিলের চারপাশে আটকে থাকা নিঃশ্বাস ছুটে এলো। সবাই একসাথে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কারণ তারা জানতো, একদিন না একদিন এই প্রশ্ন ওরহান তুলবেই। কিন্তু এত সুন্দর ও দৃঢ়তার সাথে সাবা তা সামলে নেবে, এমনটা কেউ কল্পনাও করেনি।
সকালের আলোয় খান বাড়ির ডাইনিং টেবিল সাজানো হয়েছে গরম পরোটা, ডিমভাজি আর চা দিয়ে। বাবা চাচা ও ওরহাননের হাতে খবরের কাগজ ছড়িয়ে আছে। অন্যদিকে বেশি চলছে কথা আর খুনশুটি। একই টেবিলে দুই রকম দৃশ্য।
মুফতি মারুফ প্লেট ভর্তি করে বসেছে। শিফা তাকিয়ে ঠাট্টা করল—
-"দেঝদাভাই, তুই কি ভাবছিস? নাস্তার নাম করে দুপুরের ভাতও এখানেই খেয়ে ফেলবি নাকি?"
ওসমান হেসে যোগ করল—
-"আজকের খবরের কাগজে নিশ্চয়ই লেখা হবে— এক যুবকের পেটে পুরো খান পরিবারের নাস্তা উধাও!"
শিফা খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল।
-"ওই খবরটা পড়ে মানুষ ভাববে, আমাদের বাসায় আসলেই হয়তো দুর্ভিক্ষ চলছে!"
মারুফ প্রতিবাদ করে বলল—
-"তোরা আমার শত্রু। আমাকে শান্তিতে খেতেও দিস না না। খবরের কাগজে যত ভয়ংকর খবর ছাপা হয়, আমি খেয়ে অন্তত মানসিক শক্তি বাড়াচ্ছি।"
মুফতি যোগ করলো—-
-"শিফা তুইও বেশি বেশি খা। দেখতে তো পাটকাঠীর সমান।"
শিফা চেঁচিয়ে উঠলো—
-"ছোটদাভাই!"
হাসির রোল উঠল টেবিলজুড়ে। তবে সেই হাসির মাঝেই ওরহান একেবারে চুপচাপ বসে আছে। সামনে রাখা চায়ের কাপে হাত দিলেও ঠোঁটে তোলেনি। খবরের কাগজ চোখের সামনে থাকলেও সে যেন পড়ছে না, দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে, নিজের ভেতরের চিন্তায় ডুবে।
ওসমান খেয়াল করে হেসে বলল—
-"দাদাভাই, খবর পড়ছো নাকি খবরের কাগজ দিয়ে ধ্যান করছো?"
শিফা মৃদু হাসি দিয়ে যোগ করল—
-"আমাদের দাদাভাই এখন এতটাই গম্ভীর, মনে হচ্ছে তার মনের ভেতর অন্য কোনো খবর ছাপা হচ্ছে!"
ওরহান শুধু হালকা হাসল, কিছু বলল না। তার চোখে তখনও সেই অজানা শূন্যতার ছায়া ভাসছে, যা কোনো খবরের কাগজে লেখা থাকে না, শুধু হৃদয়েই পড়া যায়।
নাস্তা শেষ হতেই একে একে সবাই বেরিয়ে গেলো নিজেদের গন্তব্যে। সকালের সেই হাসি-আনন্দে ভরা টেবিল ফাঁকা হয়ে গেল। ওরহানের কাজ অফিসে, আর শিফার গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিদিনের মতো আজও ঠিক হলো, শিফাকে নামিয়ে দিয়েই সে যাবে অফিসে।
গাড়িতে বসে আছে দু’জন। ওরহান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ধীর গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। চারপাশের ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে জীবনের ছুটোছুটি চললেও, গাড়ির ভেতরটা যেন এক অদৃশ্য নীরবতায় আচ্ছন্ন। কিছুদিন ধরেই ওরহান খেয়াল করছে, শিফা আর আগের মতো চঞ্চল নেই। কারও সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাও বলে না। মুখে সবসময় চাপা একটা নিস্তেজতা, যেন ভেতরের আলো নিভে গেছে।
ওরহানের বুকের ভেতর অজানা দুশ্চিন্তা জমে আছে। অবশেষে নীরবতা ভেঙে সে মুখ খুললো।
-"ছেলেটা কে?"
শিফা যেন বজ্রাহত হলো। হঠাৎ করে চমকে উঠে ভাইয়ের দিকে তাকালো। কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"কোন ছেলে? কার কথা বলছো দাদাভাই?"
ওরহানের চোখ গাঢ়, কণ্ঠে দৃঢ়তা—
-"যে আমার বোনের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে।"
শিফা কষ্ট ঢাকতে হালকা হাসির ভান করল—
-"কই, আমি তো হাসি।"
ওরহান আর সহ্য করতে পারলো না—
-"আমার সাথে মিথ্যে বলার চেষ্টা করবি না। তোকে আমি মানুষ করেছি। আমার চেয়ে কে তোকে বেশি চেনে?"
শিফার চোখ ভিজে উঠলো। মাথা নিচু করে নরম স্বরে বলল—
-"কোনো ছেলে নেই, ভাইয়া।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই গাড়ি এসে থামলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক সুদর্শন যুবক। তার দৃষ্টি সোজা শিফার দিকে, অপেক্ষায় যেন অধীর।
ওরহান হাত তুলে ইশারা করল তার দিকে—
-"এই ছেলেটা প্রতিদিন এখানে আসে। নিজের অফিসের কাজ ফেলে শুধু তোকে দেখার জন্য। তোকে কথা বলার জন্য। আমি সব খোঁজখবর নিয়েছি। এই ছেলের সাথে তোর সম্পর্ক কী?"
শিফা এক ঝলক তাকিয়ে দেখল, তীব্র। অপেক্ষারত চোখে অদ্ভুত এক টান। বুকের ভেতর কেমন অস্থিরতা জেগে উঠলো, কিন্তু শিফা দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ঠোঁট শক্ত করে বলল—
-"আমাকে পছন্দ করে। কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করি না। ও শুধু বিরক্ত করে আমাকে।"
ওরহানের কণ্ঠ ভারী—
-"ব্যবস্থা করবো?"
শিফা নিঃশব্দে মাথা নাড়লো—
-"প্রয়োজন নেই। আমি পারবো।"
ওরহান শেষবারের মতো চোখে চোখ রাখলো—
-"সত্যি?"
শিফার কণ্ঠ ক্ষীণ, তবু দৃঢ়—
-"হুম।"
গাড়ির ভেতর আবারও নীরবতা নেমে এলো। বাইরের কোলাহল যেন গায়ে লাগছিল না। শুধু অদৃশ্য এক দ্বন্দ্ব, এক চাপা রহস্য ঘিরে রেখেছিল দু’জনকে।
শিফা গাড়ি থেকে নামলো। ওরহান ভরসাভরা দৃষ্টিতে তাকে একবার দেখেই গাড়ি ঘুরিয়ে দিল। তার বিশ্বাস অটুট, সে কোনো দুর্বল বোন বড় করে নি।
শিফা দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে তীব্র। চোখে অপেক্ষার ছাপ, মুখে অস্থিরতা। কিন্তু শিফা থামলো না। সোজা সামনে এসে দাঁড়ালো তীব্রর মুখোমুখি। এক মুহূর্তও সময় না দিয়ে উচ্চকণ্ঠে ফেটে পড়ল—
-"সমস্যা কী আপনার? আমি বলেছি না, আমার সামনে আর কোনোদিন আসবেন না? তাহলে কেন এসেছেন? আমি আপনাকে আমার জীবনে চাই না। সোজা বাংলা বুঝেন না আপনি?"
তীব্র ভড়কে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলালো। কণ্ঠে অসহায়তার সুর—
-"বোঝার চেষ্টা করো, শিফা। আমি না জেনে অন্যায় করে ফেলেছি। তার শাস্তিও পাচ্ছি প্রতিদিন। এক বছর ধরে তোমার থেকে এই দুরত্ব... আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আমার বোন যা করেছে তার শাস্তি সে পেয়েছে। তুমি অন্তত আমাকে ক্ষমা করো।"
শিফার চোখ জ্বলে উঠলো ক্রোধে। ঠোঁট কাঁপলেও কণ্ঠে দৃঢ়তা—
-"ক্ষমা? পারবো না। না জেনে করেছেন মানে কী? নিজের কুলাঙ্গার বোনকে খুশি করতে আপনি সব জেনে-শুনেই করেছেন! আজ আপনাকে শেষবারের মতো বলছি, এটাই ফাইনাল warning। আর কোনোদিন আমার আশেপাশে আসার চেষ্টা করবেন না। আর যদি করেন, যদি আবারো আমার সামনে আসেন... আমি পুলিশ ডাকব!"
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে শিফা ঘুরে দাঁড়াল। এক বিন্দু দেরি না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করলো।
পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো তীব্র। নিঃশব্দে, অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো তার প্রিয় মানুষটির পিছু হটার দিকে। চারপাশের ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেল শিফা, আর তীব্র রয়ে গেল একা, অনুতাপ ও অক্ষমতার ভারে দম বন্ধ হয়ে আসা আকাশের নিচে।
.
.
.
প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে ঢাকা শহর। রাস্তায় কংক্রিটের পাঁজর থেকে তপ্ত বাতাস বেরোচ্ছে, যেন আগুনের হাওয়া। সেই আগুনের ভেতরে আটকে আছে হাজারো গাড়ি, হর্নের কর্কশ শব্দে ভরাট পুরো পরিবেশ।
গাড়ির ভেতরে বসে আছে ওরহান। কপালে ভাঁজ, চোখে তীব্র বিরক্তি। গরমে ঘাম কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, আর যানজটের এই অবসানহীন দমবন্ধ অবস্থা তার মেজাজকে আরো খিটখিটে করে তুলেছে। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে বসে আছে, যেন রাগের বাঁধ ভেঙে যাবে কোনো মুহূর্তেই।
কিন্তু হঠাৎই কিছু একটা ঘটলো।
চোখ ফেরাতেই ওরহানের দৃষ্টি এক জায়গায় থমকে গেলো। মুহূর্তেই হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো, মস্তিষ্ক যেন এলোমেলো এক ঝড়ে ভেসে গেলো। চারপাশের কোলাহল, হর্নের শব্দ, গরমের যন্ত্রণা, সব মিলিয়ে ধোঁয়াশার মতো মিলিয়ে গেলো। সময় যেন থমকে দাঁড়ালো এক অদৃশ্য মুহূর্তে।
ওরহানের চোখে এখন কেবল সেই নারী।
তার উপস্থিতি এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে দিলো ওরহানের ভেতরে। বিরক্তির সব রেখা মুছে গেলো কপাল থেকে। কপালের ভাঁজ নরম হয়ে এলো। চোখের রাগ গলে গিয়ে মিশলো মুগ্ধতার ঝিলিকে। রাগে চেপে রাখা ঠোঁটের কোণে অচেতনেই ফুটে উঠলো হালকা হাসি।
যেনো পুরো শহরের ভিড়, গরম, যানজট, সবকিছু অর্থহীন হয়ে পড়লো। পৃথিবী সরে গিয়ে এক নারীকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে রইলো ওরহানের চোখের দৃষ্টি।
এক নীল সুতি শাড়ি পরা এক রমণী যানজটের ফাঁক গলে রাস্তা পার হচ্ছিল। চুল বিনুনী করে বাঁধা, কপালে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট। প্রচণ্ড গরমে শরীর ঘেমে উঠেছে, ছোট ছোট বেবি হেয়ারগুলো ঘামে লেপ্টে রয়েছে কপাল আর ঘাড়ে। সে বারবার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছছে, কিন্তু তবুও ঘাম থামছে না।
সূর্যের আলো যেন তাকে ঘিরে রেখেছে এক অদ্ভুত আভায়। শ্যামলা রঙের মুখমণ্ডল ঘামে ঝলমল করছে, আর তাতে সৌন্দর্য যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। দ্রুত পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে চললো সে। এক মুহূর্তের জন্যও কারও দিকে তাকালো না। অথচ ওরহানের চোখে সে যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু হঠাৎই ওরহানের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল রমণী। যেন কোনো মরীচিকা হঠাৎ মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে। স্তব্ধতা কেটে যেতেই ওরহান তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। জামার বোতাম ছুটে গড়িয়ে পড়েছে, অথচ সে খেয়ালই করলো না। চারপাশে তাকালো, খুঁজলো মরিয়া হয়ে, কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত রূপ আর কোথাও নেই।
পেছনের গাড়িগুলো কর্কশ হর্ন বাজাতে লাগলো। চারপাশ থেকে ধমক, বিরক্তির আওয়াজ উঠতে লাগলো। ওরহান বিরক্ত হয়ে দাঁত চেপে আবার গাড়িতে উঠলো, ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো। রাস্তায় গতি ফিরলো, কিন্তু ওরহানের মনে শুধু এক অবিরাম ধাক্কা।
গাড়ি ছুটছিল, কিন্তু চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই নারীর মুখ। নীল শাড়ি, বিনুনী করা চুল, ঘামে ভেজা মুখের উজ্জ্বলতা, সবকিছুই যেন তার অন্তরের ভেতরে গেঁথে গেল।
.
.
.
ওরহানের গাড়ি এসে থামল শহরের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পনেরো তলা ভবনের পার্কিং লটে। এটাই খান কোম্পানির প্রধান কার্যালয়, চকচকে কাঁচের দেয়াল যেন শহরের আকাশকে প্রতিদিন আয়নায় বন্দি করে রাখে।
দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামতেই তার চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধ চাপা গাম্ভীর্য ছড়িয়ে পড়ল। তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে সে এগিয়ে গেল লিফটের দিকে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যেই ছিল অদৃশ্য কর্তৃত্বের ছায়া। লিফটের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল, আর মুহূর্তেই ওরহান সোজা উঠে গেল দশ তলায়, তার নিজস্ব কর্মমঞ্চে।
ফ্লোরে পা রাখতেই কর্মচারীদের মধ্যে এক অদৃশ্য স্রোত বয়ে গেল। চেয়ারের শব্দ থেমে গেল, সবার দৃষ্টি এক বিন্দুতে স্থির। যে যেখানে বসে ছিল, দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নোয়ালো শ্রদ্ধায়। সালামের ধ্বনি একে একে ভেসে এল, যেন কোনো সংগঠিত মৃদু কোরাস। ওরহান প্রতিটি সালামের উত্তর দিল শান্ত অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে, তবে তার দৃষ্টি সোজা ছিল নিজের কেবিনের দিকে।
অফিসে প্রবেশ করলেই যেখানে ব্যস্ততায় ডুবে যাওয়ার কথা, সেখানে সে থেমে গেল। কেবিনে ঢুকে প্রথমেই ইহাবকে ডাকল। কণ্ঠে কোনো কোমলতা নেই, আবেগহীন কঠিন স্বর, তবু তার কথার ভেতর এমন এক নিঃশব্দ আদেশ ছড়িয়ে ছিল, যা অমান্য করার সাহস কেউ করতে পারে না—
"ওই নারীকে খুঁজে বের করো। এখনই।"
ওরহানের কণ্ঠে ছিল শীতল অথচ দৃঢ় এক আদেশ।
ইহাব মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। কপাল কুঁচকে, মাথা চুলকে বিস্মিত স্বরে বলল—
-"কোন মেয়ে, স্যার?"
ওরহান চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। বিরক্তির ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠল চোখেমুখে। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করল—
-"যাকে আজকে জ্যামের ভেতর রাস্তা পার হতে দেখলাম... সেই মেয়েকে।"
ইহাব বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। যেন কথার ভেতরে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, অথচ সে বোঝার মতো সূত্র পাচ্ছে না। বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে অবশেষে বলে উঠল—
-"আপনি কাকে দেখেছেন, সেটা আমি কীভাবে জানব, স্যার?"
ওরহান কিছুক্ষণ নিরব রইল। তার চোখে ভাসল এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি, যেন কোনো অজানা কাহিনী হঠাৎ তার মনে এসে ধাক্কা দিয়েছে। মুহূর্তের ভেতরেই সে বিষয়টা বুঝতে পারল, ইহাবকে বলা বৃথা। চেয়ারে হেলান দিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল—
-"নিজের কাজে যাও।"
এরপর কেবিনের ভেতর নেমে এল নিস্তব্ধতা, আর ওরহানের চোখে সেই অপরিচিত মেয়ের মুখ ভেসে উঠল, অচেনা অথচ অস্বাভাবিকভাবে পরিচিত মনে হচ্ছিল।
ইহাব বিরক্ত মুখে সরে যেতে লাগল। যেতে যেতে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল—
-"স্মৃতিশক্তির সাথে মাথার তারও বুঝি ছিঁড়ে গেছে! কি বলছে, কি করছে, নিজেই আর ধরতে পারছে না।"
তার পায়ের শব্দ করিডোরে মিলিয়ে যেতেই কেবিনে নেমে এল গভীর নীরবতা। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ওরহান চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। চোখের পাতার ওপর এক অদৃশ্য ক্লান্তি এসে ভর করল, আর মুহূর্তেই সে চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু অন্ধকারও তাকে শান্তি দিল না। চোখ বন্ধের সাথে সাথেই ভেসে উঠল সেই রমণীর মুখ, অচেনা অথচ অদ্ভুতভাবে চেনা মনে হয়। হঠাৎই যেন বুকের ভেতর এক অজানা আলোড়ন শুরু হলো।
ওরহান দ্রুত চোখ মেলে ফেলল। নিজেকে ধমকাল ভেতরে ভেতরে—"না, এভাবে ভাবা যাবে না।" মাথা নাড়ল তীব্র বিরক্তিতে। আর এক মুহূর্তও সেই মুখকে জায়গা দিতে চাইল না নিজের মনে।
অবশেষে, মনকে অন্যদিকে সরাতে সে নিজেকে গেঁথে দিল কাজের পাহাড়ে। ফাইলের স্তূপ আর নথির ভিড়ের আড়ালে ঢেকে ফেলল নিজের অস্থিরতা, যেন কাগজের ভেতরেই ডুবিয়ে দিতে পারবে সেই অনাহূত মুখটিকে।
.
.
.
রাত তখন প্রায় দশটা। খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে নীরব অথচ পরিচিত এক গৃহস্থালি আবহ বিরাজ করছে। আলো-আঁধারির মাঝে বসার ঘরে সবাই নিজের মতো ছড়িয়ে আছে। শিফা আর সাবা সোফার এক কোণে পাশাপাশি বসে গল্পে মগ্ন। টিভির পর্দায় চলমান নাটকের আলোয় মা-চাচীরা ডুবে আছেন নিজস্ব জগতে। বাড়ির পুরুষেরা এখনো বাইরে।
সাবা এক সময় শিফার দিকে হালকা ঝুঁকে ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—
-"তীব্র এখনো ভার্সিটিতে আসে?"
শিফা ক্ষণিক চুপ করে থেকে কেবল মাথা নাড়ল—
-"হুম!"
সাবার চোখে কৌতূহল আর উৎকণ্ঠা মিশ্রিত ছায়া। সে আবারও জিজ্ঞেস করল—
-"কি করবে তুমি? কিছু ভেবেছো?"
শিফার মুখে তখন যেন এক অদ্ভুত দৃঢ়তার রেখা ফুটে উঠল। গলায় ভারী অথচ স্বচ্ছ শব্দে সে বলল—
-"দেখো সাবা, তীব্রকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি। আমার হৃদয়ের গভীরতম স্থানে তার জন্য অশেষ টান আছে। কিন্তু ভালোবাসা মানেই অন্ধ হওয়া নয়। আমি অন্যায় মেনে নিতে পারি না। যদি প্রয়োজন পড়ে, সারাজীবন একা কাটাতে রাজি আছি। তবুও তীব্রকে গ্রহণ করব না।"
ঘরজুড়ে তখন হালকা নীরবতা নেমে এলো। টিভির শব্দও যেন দূর থেকে আসা এক ব্যাকগ্রাউন্ড সুরে মিলিয়ে গেল। সাবা স্থির চোখে শিফার দিকে তাকিয়ে রইল, সে বুঝল, শিফার এই সিদ্ধান্ত কেবল কোনো আবেগ নয়, বরং এক অটল প্রতিজ্ঞা।
সাবা কণ্ঠে একটুখানি নরম সুরে বলল—
-"কিন্তু সে তো তোমাকে ভালোবাসে।"
শিফার চোখে তখন এক কঠিন দৃষ্টি ভেসে উঠল। কথাগুলো যেন হাওয়ায় কেটে গেল—
-"ভালোবাসা? ভালোবাসলে কি এভাবে চোখ বুজে অন্যায়কে আঁকড়ে ধরা যায়? সে নিজের বোনকে অন্ধ বিশ্বাস করে এক নিষ্পাপ মেয়ের জীবন শেষ করতে গিয়েছিল। ভাবো তো সাবা, যদি দাদাভাই না থাকতেন, সোহা ভাবির সাথে কি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেত তুমি বুঝতেই পারছ। আর সত্য প্রকাশ না পেলে, তূর্য আর তীব্রের প্রতিহিংসার আগুন কি কোনোদিন কমত? তীব্র বোধবুদ্ধি হীন মানুষ, সত্যতা যাচাই না করেই অন্যের জীবন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি কি সেই মানুষকে গ্রহণ করব?"
সাবা স্তব্ধ। শিফার প্রতিটি শব্দ তার অন্তর কাঁপিয়ে দিল। প্রতিবাদ করার মতো কোনো যুক্তি তার খুঁজে পাওয়া গেল না। শিফা যা বলল, তার একটিও বাক্য ভুল নয়।
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের আবহ পাল্টে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে একে একে বাড়ির পুরুষেরা ফিরে এলেন। ঘরে হঠাৎ এক ভারি ক্লান্তির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। সবাই সোজা নিজেদের ঘরে চলে গেল ফ্রেশ হতে, আর ওরহান এসে মায়ের পাশে সোফায় বসে পড়ল।
সুরাইয়া বেগম ছেলের দিকে তাকালেন। তার মুখে অদ্ভুত এক ক্লান্তির রেখা, চোখে অনাবৃত শূন্যতা। মায়ের হৃদয় কেঁপে উঠল। তিনি স্নেহভরা হাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
-"কাজের অনেক চাপ যাচ্ছে বাবা?"
ওরহান কোনো উত্তর দিল না। চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে হেলান দিয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতা ভেদ করে ধীরে চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাল সে। গলায় অশান্তির কাঁপন, কথাগুলো যেন অন্তরের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো—
-"আচ্ছা মা, আমার জীবনে কি কোনো নারী ছিল?"
সুরাইয়া বেগম বিস্মিত।
-"হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করছিস?"
ওরহান যেন নিজের ভেতরের অচেনা শূন্যতার সাথে লড়ছে। তার কণ্ঠে ভারী ক্লান্তি—
-"মা, আমার কেমন যেন লাগে... মনে হয় ভেতরে অনেক ফাঁকা। যেন আমার আত্মার একটা অংশ কোথাও হারিয়ে গেছে, আমার কাছ থেকে কে যেন কেড়ে নিয়েছে। তোমরা সবাই আছো তবুও করো শূন্যতা আমায় পড়ায়। আর এটা যে কোনো নারী সেটা বুঝতে করো অসুবিধা হবে না।"
ঘর নিস্তব্ধ। টিভির শব্দ মিলিয়ে গেছে দূরের কোলাহলে। সুরাইয়া বেগম মৃদু বিস্ময়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন—
-"কেনো এমন মনে হয় তোমার?"
ওরহানের চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি ভেসে উঠল। কণ্ঠে কাঁপন, যেন বুকের গভীর যন্ত্রণার স্বর—
-"জানি না মা। আমি শুধু জানি, আমার বুকটা সবসময় ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আমি কাউকে খুঁজে বেড়াই... অথচ পাই না। মাঝে মাঝে বুকের ভেতর এমন যন্ত্রণা হয়, মনে হয় কেউ আমার ভেতর থেকে সবচেয়ে মূল্যবান কিছু ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। বলো মা, এমন কেনো হয়?"
সুরাইয়া বেগম ছেলের কাঁধে হাত রেখে ধীরে বললেন—
-"এইসব তোমার মনের ভুল। অকারণ কষ্ট কোরো না বাবা। আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন।"
ওরহান কিছুটা চুপ করে থেকে হঠাৎ নিচু গলায় বলল—
-"জানো মা, আজকে কি হয়েছে?"
-"কি হয়েছে?"
-"আজ আমি এক মেয়েকে দেখেছি। তাকে দেখেই মনে হলো... আমার যে শূন্যতা এতদিন বুকের ভেতর কুরে কুরে খাচ্ছিল, তা আর নেই। মনে হলো আমি সব পেয়ে গেছি। অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছেয়ে গেল সারা শরীরে। যেন তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমার সব সুখ, শান্তি... আমার হারিয়ে যাওয়া আত্মার অংশটুকু।"
সুরাইয়া বেগম গভীর দৃষ্টি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
-"মেয়েটার নাম কি বাবা?"
ওরহান মাথা নাড়ল—
-"জানি না।"
-"কেনো?"
ওরহানের চোখে তখনও সেই অদ্ভুত আলো জ্বলছে। নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
-"আমি তাকে দেখার মধ্যে এতটাই বিভোর ছিলাম যে সে কখন আমার চোখের আড়াল হয়ে গেল, আমি বুঝতেই পারলাম না।"
মায়ের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল, যেন আশ্বাসের স্নেহময় আলো—
-"আচ্ছা। যদি সে তোমার ভাগ্যে থাকে, তবে নিশ্চয়ই আবারও দেখা হবে। এখন যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। খাবার সাজিয়ে দিচ্ছি।"
ওরহান উঠে ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। একটু পর একে একে সবাই ফ্রেশ হয়ে একসাথে রাতের খাবার খেয়ে নিলো। তারপর বাড়িটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেল, শুধু দেওয়ালের ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে সময় বয়ে নিয়ে চলল, আর সবার অচেতন নিদ্রার ভেতরে বোনা রইল এক অদ্ভুত অজানা রহস্যের সূচনা।
রাত তখন প্রায় একটা। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কোনো কুকুরের ডাক আর দেওয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যায়। কিন্তু এই নীরবতার মাঝেই ওরহানের বুকের ভেতর বইছে এক অজানা ঝড়। ঘুম তার চোখ এড়িয়ে গেছে বহু আগেই। স্মৃতিশক্তি হারানোর পর থেকেই এই শূন্যতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, আজ যেন তা আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
আমেরিকার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়, যখন এক অচেনা নারী গল্প শোনাতে আসত। তার উপস্থিতির সময়টুকুই ছিল ওরহানের জীবনের একমাত্র শান্তি। সে মুহূর্তগুলোতে ওরহান মনে করত, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ সে-ই। অথচ এখন মনে হয় কেউ যেন তার সেই ঘুম, সেই শান্তি, সেই প্রশান্তি চুরি করে নিয়েছে। প্রতিটি নিশ্বাসে শুধু শূন্যতা আর যন্ত্রণা।
তবে আজকের দেখা বদলে দিয়েছে সবকিছু। সেই অচেনা মেয়েটিকে দেখার পর মনে হয়েছে বুকের ফাঁকা জায়গাগুলো হঠাৎ করেই পূর্ণ হয়ে গেছে। যেন অচেনা কেউ, অথচ চিরচেনা, তার আত্মার হারানো অংশ ফিরিয়ে দিয়েছে।
ওরহান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো। ধোঁয়ার ধূসর কুণ্ডলী আকাশে মিলিয়ে গেল নিস্তব্ধ রাতের আঁধারে। তার চোখ উপরে আকাশের দিকে নিবদ্ধ। ঠোঁট নড়ল ধীরে, কণ্ঠে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সুর—
-"যেইভাবেই হোক, আপনাকে খুঁজে বের করব আমি। আমার নিজের মনের শান্তি খুব প্রয়োজন। এই শূন্যতা কাটানোর জন্য আপনাকে প্রয়োজন।"
সিগারেটের আগুনে ক্ষণিকের লাল আলো জ্বলে উঠল। রাত আরও গভীর হলো, আর সেই অন্ধকারে ওরহানের প্রতিজ্ঞা যেন আকাশকেও সাক্ষী রাখল।