ফিরে দেখা

পর্ব - ২৮

🟢

শীতের আগমনী বিকেল। চারদিকে কুয়াশার নরম চাদর নেমে এসেছে। পুরো ক্যাম্পাস যেন ধূসর আভায় মোড়ানো, দূরের ভবনের ছায়া অস্পষ্ট, গাছপালার ডালপালা যেন অর্ধেক লুকিয়ে গেছে কুয়াশার আড়ালে। ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসছে শুকনো পাতার মৃদু খসখস শব্দ, মাঝে মাঝে কারো নিঃশ্বাসের ভাপ সাদা ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে।

প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীরা শাল জড়িয়ে গল্পে মেতে আছে, কারো হাতে গরম চা, কারো কোলাহলে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। তবুও বাতাসে এক ধরনের নীরব শীতলতা লেগে আছে, যা মনে করিয়ে দেয়, শীত আসছে।

পুরনো বটগাছের তলায় ওরহান ও তার বন্ধুরা গোল হয়ে বসে আছে। চারপাশের কুয়াশা আরও গাঢ়, আর তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখনও একটাই, সোহা ও ওরহান।

মাসের পর মাস ধরে সোহার নাম ঘুরপাক খাচ্ছে ওদের আড্ডায়। বন্ধুরা ঠাট্টা-তামাশায় মেতে উঠলেও, ওরহানের চোখে শুধু একটিই দৃশ্য, সোহার মুখ। এক অদ্ভুত পাগলামি তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, যা কারও কথায় দমবার নয়।

সোহা ওরহানকে ভালোবাসে, তবুও কোনো সম্পর্কে জড়াতে রাজি নয়। তার দৃঢ় সিদ্ধান্ত, সে ভালোবাসার খেলায় নামবে না, সে বেছে নেবে বিয়ের সাদামাটা বাস্তবতা। এই অস্বীকৃতির দেওয়ালে যতবারই ধাক্কা খেয়েছে ওরহান, তার জেদ আরও কঠিন হয়েছে। ওরহানের ঘোষণা স্পষ্ট—বাবার ব্যবসায় হাত দিলেই, বাবা-মাকে পাঠাব সোহার বাবার কাছে।

প্রেমকে সে নিয়েছে যুদ্ধের মতো, যেখানে জয় ছাড়া আর কিছু তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

বটগাছের নিচে বসা ওরহানের চোখে তাই আজ দুটি যুদ্ধক্ষেত্র স্পষ্ট দেখা যায়, একদিকে তার অদম্য ভালোবাসার আগুন, অন্যদিকে সোহার শীতল অস্বীকৃতির প্রাচীর।

বন্ধুরা হাসি-ঠাট্টায় ভরিয়ে তুললেও, বাতাসে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য নেমে আসে। মনে হয়, গোটা ক্যাম্পাস থমকে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু এই অসম যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে।

ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে, পাতার ফাঁকে আলো-ছায়ার খেলা। গাছের নিচে বসে আছে— ওরহান, তানভীর, সিয়াম, নিশাত আর রিয়া। চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল থাকলেও এদিকটা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে। রিয়া হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—

-"তুই মেয়েটার সাথে এতদিন ধরে প্রেমের নাটক করছিস কেন?"

কথাটা যেন বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল। ওরহান গলা খাঁকারি দিল। কণ্ঠে চাপা অভিমান, চোখে অদৃশ্য আগুন—

-"সেদিন যে থাপ্পড়টা খেলাম, সেই লোকের মেয়ে সোহা। বিনা দোষে আমাকে মেরে অপমান করেছে। আমার চরিত্রে কলঙ্কের ছাপ এঁকে দিল। আমি চুপ করে থাকব? না, কখনোই না!"

তানভীর পাশে বসে ছিল, মুখে ক্লান্তি আর কপালে গভীর চিন্তার রেখা। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ধীরে কণ্ঠ তুলল সে—

-"সোহা অসম্ভব ভালো মেয়ে, দোস্ত। এই অন্যায়টা ওর সাথে করা উচিত নয়। যদি সত্যিই তুই ওকে ভালো না বাসিস, তবে এখানেই থেমে যা। সোহা এই ধাক্কা সহ্য করতে পারবে না। সে ভেঙে পড়বে।"

ওরহান ঠাণ্ডা, প্রায় নিরাসক্ত গলায় উত্তর দিল—

-"তার বাবাকে তো আমি অপমান করিনি। বরং উনি আমাকে জনসমক্ষে অপমান করেছেন। এখনো তো আমি কিছুই করিনি।"

তানভীর চেপে রাখা ক্ষোভে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ল—

-"তাহলে? আসল প্ল্যানটা কী ছিল?"

ওরহানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটল। চোখে যেন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—

-"সেদিন বিদায় অনুষ্ঠানে আমি ওকে দিয়ে কাবিননামায় সই করিয়ে নিয়েছি।"

কথা শেষ হতেই চারপাশে শোরগোল ছড়িয়ে পড়ল।

সবাই একসাথে চেঁচিয়ে উঠল—

-"মানে কি বলছিস তুই?"

মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পাতার মর্মর শব্দও যেন স্তব্ধ। ওরহান দাঁড়িয়ে রইল স্থির চোখে, ঠোঁট থেকে বেরোল শীতল অথচ দৃঢ় কণ্ঠ—

-"আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি। ভালোবাসার নামে আমি কোনো নাটক করিনি। ওর পরিচয় জানার আগেই আমি ওর প্রেমে পড়েছি।"

চারপাশ নিস্তব্ধ। কারও নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ নিশাতের গলা ফেটে বেরোল—

-"তাহলে এই প্রতারণা করে বিয়ে কেনো করলি?"

ওরহান গভীর শ্বাস নিল। কণ্ঠ যেন বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণার স্রোত—

-"আমি আমার আব্বু-আম্মুকে নিয়ে গিয়েছিলাম সোহার বাবার কাছে। কিন্তু উনি আমার বাবা-মাকে চরম অপমান করেছেন। সোহা এ ঘটনার কিছুই জানে না। উনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মরলেও মেয়েকে আমার হাতে তুলে দেবেন না। আমি সেদিন ক্ষমা চেয়েছিলাম, নিজের কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু উনি জেদের দেয়ালে অটল রইলেন। আমার আর কোনো পথ ছিল না। এভাবেই একমাত্র আমি সোহাকে আমার নামে করতে পেরেছি। অন্যথায়, সোহা কোনোদিন বাবার অমতে আমার কাছে আসত না।"

তানভীরের চোখে অবিশ্বাস ভরে উঠল। গলা কাঁপল, যেন শব্দও ভেঙে পড়ছে—

-"কিন্তু সোহা এই প্রতারণা কোনোদিন মেনে নেবে না। তোকে ক্ষমা করবে না।"

হঠাৎ ওরহানের চোখ দুটো তীব্র জ্যোতিতে ঝলমল করে উঠল। তার কণ্ঠে শোনা গেল দহনজ্বালা, অশ্রুত এক যন্ত্রণার গর্জন—

-"আমি কী করব বল?ওর জন্য আমি সব অপমান সহ্য করেছি। প্রতিশোধ নেওয়ার শক্তি আমার ছিল, সুযোগও ছিল। চাইলে আমি প্রতিশোধে অন্ধ হয়ে যেতাম, কিন্তু সোহাকে অস্ত্র বানাইনি। আমি শুধু তাকে ভালোবেসেছি। আর তাকে পাওয়ার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, আমি তাই করেছি... যদি সেটা প্রতারণার বিয়েও হয়, তবে আমি সেই অপরাধ বুক পেতে নিতে রাজি।"

কথা শেষ হতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। কারও নিঃশ্বাস বুকের ভেতর থেকে বেরোতে পারল না। বাতাসেও যেন ঝুলে রইল ওরহানের কণ্ঠের দহনে, যেন এই মুহূর্তে প্রত্যেকেই তার হৃদয়ের ক্ষত চোখে দেখতে পাচ্ছে।

দীর্ঘক্ষণ নীরবতা। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো ঝড় চেপে বসেছে। হঠাৎ গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে বন্ধুদের দিকে তাকাল ওরহান। চোখে এক অদ্ভুত জ্যোতি, কণ্ঠে হাহাকার মেশানো দৃঢ়তা—

-"জানিস, ওকে আমি কেবল পছন্দ করি না... ওকে আমি নিঃশ্বাসের মতো চাই। যেমন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বাতাস ছাড়া থাকতে পারে না, তেমনই আমি ওকে ছাড়া এক মুহূর্ত কল্পনা করতে পারি না।

ওর নামটা মনে এলেই আমার ভেতর এক অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার এক নিমিষে মিলিয়ে গেল। আর তার হাসি দেখলেই মনে হয়, এই জীবনের প্রতিটি কষ্ট, অপমান সার্থক।

আমি জানি না কখনো ওকে পাবো কিনা। কিন্তু যদি না পাই, তবে হয়তো বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মধ্যে তফাৎটুকুও বুঝতে পারব না। কারণ ও ছাড়া আমার জীবন মানেই এক শূন্য মরুভূমি, যেখানে কোনো ফুল ফোটে না, কোনো সুর বাজে না। তাই ওকে পাওয়ার সব চেষ্টাই আমি করব।

তোরা যদি আমার বুকের ভেতরটা একবার শুনতে পারতিস, তবে বুঝতিস, আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন শুধু তার নাম ধরে ডাকে। আমি বেঁচে আছি... শুধু তার জন্যই।"

ঠিক তখনই, ঝড়ের মতো ছুটে এসে সোহা ওরহানকে জোরে এক চড় মারল। ঘটনাটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে মুহূর্তেই চারপাশ থমকে গেল। বাতাস যেন স্তব্ধ, নিঃশব্দ, ভারী।

ওরহান গালে হাত রেখে নিথর দাঁড়িয়ে রইল। আর সেই মুহূর্তেই সোহা ফেটে পড়ল ক্ষোভে, কণ্ঠে ছিল দগ্ধ আগুন—

-"প্রতারক! এত বড় প্রতারণা করলে আমার সঙ্গে? কী অপরাধ ছিল আমার? বারবার ফিরিয়ে দিয়েছি আপনাকে, তবু পেছনে পেছনে ঘুরলেন কেন? প্রতিশোধ নিতে? এত নিচে নামলেন আপনি? আপনাকেই ভালোবেসে, আপনাকেই বিশ্বাস করে শেষমেশ আমাকে শেষ হতে হলো! এত অভিনয়! এত নিখুঁত ভালোবাসার ভান! এত মিথ্যার জালে বেঁধে রেখেছিলেন আমাকে! যেন আমি কেবল এক পুতুল, আর আপনি এক দক্ষ অভিনেতা! না, না... এত নিখুঁত অভিনয় কোনো অভিনেতার পক্ষেও সম্ভব নয়। মানুষ কীভাবে পারে এতটা নির্মম, এতটা নিষ্ঠুর হতে? বলুন, কীভাবে পারে?"

তার চোখ বেয়ে টলমল করে নামল অশ্রু, বুকভরা ক্ষোভ, হতাশা আর অপমানের দহন। চারপাশে কেউ সাহস পেল না কোনো শব্দ করার। শুধু নেমে এল ঘন নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে রইল ওরহান, মাথা নিচু, কণ্ঠ স্তব্ধ, দৃষ্টি ভারী।

ও বুঝতে পারল, সোহা কিছুটা জেনেছে, কিন্তু পুরোটা নয়। তার ভালোবাসার গভীরতা, আত্মত্যাগের সত্য, সবই রয়ে গেল অজানার আড়ালে।

ওরহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, কিছু বলতে চাইল। কিন্তু সোহা হাত তুলে থামিয়ে দিল। কণ্ঠে ছিল বিষাদে মোড়া বিদ্রুপ—

-"আমাকে ঠকিয়ে বিয়ে করেছেন! আমি জানতামই না যে আমি বিবাহিত! আমি তো বারবার বলেছি, আমি প্রেমের সম্পর্কে জড়াব না। আপনার পরিবার নিয়ে আসুন, সামাজিকভাবে সামনে আসুন। কিন্তু আপনি? প্রতিশ্রুতি দিলেন—'ব্যবসায় বসলেই পরিবার নিয়ে আসবেন।' অথচ প্রতারণা করে কাবিননামায় সই করালেন! কেন? বাবাকে অপমান করতে? নাকি একদিন কাগজটা উঁচু করে দেখানোর জন্য?

তাহলে নিন, আজ আপনার সেই খায়েশ পূর্ণ হোক। যে বিয়ে আমার অজান্তে হয়েছে, তাকে আজ আমি স্বীকৃতি দিলাম... অপমানের শর্তে।"

সোহা এক দীর্ঘ শ্বাস টেনে চোখ বন্ধ করল। অশ্রুধারায় তার মুখ ভিজে গেল। আবার চোখ খুলে সরাসরি তাকাল ওরহানের চোখে। লালচে চোখে জ্বলছিল দগ্ধ ক্ষোভ, আর ওরহানের চোখে ফুটছিল অসহায়তার ছায়া।

বরফের মতো ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সোহা উচ্চারণ করল—

-"আমি নেসলিহান সোহা শেখ, আজ এই মুহূর্তে সেই প্রতারক উন্মাদ প্রেমিক ওরহান খান শাহিরকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করলাম। আর সেই স্বামীকেই আজ হৃদয় থেকে দাফন করলাম।"

কথা শেষ করে চোখ মুছে ঘুরে দাঁড়াল সোহা।

তার পদক্ষেপে ছিল ক্রোধ, অভিমান আর গা ছমছম করা দৃঢ়তা। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ। তারা সেই শান্ত, ভীতু মেয়েটিকে চিনতেই পারছিল না।

রিয়া ছুটে গিয়ে কাঁপতে থাকা ওরহানকে ঝাঁকিয়ে ধরল—

-"যা, দৌড়া! বোঝা ওকে। নিজের মনের সত্যি কথা বল। আর কিছু গোপন করিস না।"

ওরহানের হুঁশ ফিরল। সে দৌড়ে গেল সোহার পিছু, ভালোবাসা, অনুতাপ আর অপ্রকাশিত সত্য বুকে নিয়ে।

কিন্তু ও ধরতে পারল না সোহাকে। সোহা ঘৃণার সাগরে ডুবিয়ে তাকে ফেলে চলে গেল।

ঠিক তখনই আকাশ ফেটে বৃষ্টি। সোহা রিকশায় উঠে অদৃশ্য হলো অন্ধকারে। পথে দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেল ওরহান, ইটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মুখথুবড়ে পড়ল ভেজা রাস্তায়।

তানভীর আর সিয়াম দৌড়ে এসে তাকে ধরে উঠাল, টেনে নিয়ে গেল বাড়ি। কিন্তু তার পাগলামি থামানো গেল না। ডাক্তার এসে ঘুমের ইনজেকশন দিলেন। তিন দিন ধরে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হলো। চতুর্থ দিনে আর সম্ভব হলো না, এত বেশি ঘুমের ওষুধ দিলে শরীরই ভেঙে যাবে।

ঘুম ভাঙতেই ওরহান যেন ঝড়ের মতো উঠে দাঁড়াল। গায়ে কেবল একটি শার্ট জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল বাইরে। পেছন পেছন মা, কাকি, বাড়ির সবাই ছুটে এসে তাকে আটকালো, কিন্তু সে শোনেনি। কান পেতে থাকলেও যেন পৃথিবীর আর কোনো শব্দ ওর কানে পৌঁছায় না।

ও দৌড়ে গেল সোহার বাড়ির সামনে। দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। কিন্তু কোথাও দেখা মিলল না সোহাকে।

হতাশ পায়ে ছুটল ভার্সিটির দিকে। সেখানে খোঁজ করলে জানতে পারল, সোহা ভার্সিটি আসে না বেশ কিছুদিন।

হঠাৎই সাবা তার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে আতঙ্ক, জিজ্ঞেস করল—

-"আপু কোথায়?"

ওরহান খেয়ালও করল না যে, এ মেয়েটি সোহার ছোট বোন। ভাবলেশহীন কণ্ঠে উত্তর দিল—

-"জানি না।"

তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে পাগলের মতো পুরো ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে খুঁজতে লাগল। করিডোর, ক্লাসরুম, লেকের ধারে, সবখানেই শুধু এক নাম খুঁজল, “সোহা।” কিন্তু কোথাও সে নেই।

হতাশ হয়ে আবার ফিরে এল শেখ বাড়ির সামনে। এবার ঠিক করল, সোহা বাড়ির ভেতর ঢুকুক বা বেরোক, একবার দেখলেই কথা বলবে।

কিন্তু দিন গড়াল, রাত গড়াল, সোহা আর বেরোল না, ভেতরেও ঢুকতে দেখা গেল না।

এলাকার মানুষ জটলা বেঁধে ফিসফিস করতে লাগল—

-"এই ছেলেটা কে?"

-"পাগল নাকি?"

-"আজ পনের দিন ধরে এখানে দাঁড়িয়ে থাকে।"

-"হ্যাঁ, রাতে ওকে রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখি।"

-"শেখ বাড়ির মেয়ের প্রেমিক নাকি?"

-"কে জানে! মেয়েটাকেও তো আর দেখা যায় না।"

-"সাইফুল শেখ পুলিশ ডেকে তাড়িয়ে দেয় না কেন?"

-"হুঁ... কিছু একটা আছে বোধহয়।"

রাস্তা দিয়ে মানুষ আসে-যায়। সবাই চেয়ে দেখে, ফিসফিস করে, হাসাহাসি করে। কিন্তু ওরহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে শুধু শেখ বাড়ির দরজার দিকে অচল দৃষ্টি।

এভাবেই টানা এক মাস। একই কাপড় গায়ে। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর কাঁপে, রোদে পুড়ে চামড়া ঝলসে যায়। কিন্তু সে যায় না। না কোনো ঘরে, না কোনো ছায়ায়।

কাউকে কিছু বলে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। কারও মায়া হয় না। কেউ সোহাকে নিয়ে একটুকরো খবরও দেয় না।

আজ হঠাৎই সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল।অসহায়, দগ্ধ কণ্ঠে, বুকফাটা যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠল—

-"সোহা...!!!!"

তার কণ্ঠ গর্জে উঠল আকাশে। মুহূর্তে চারপাশ থমকে গেল। মানুষের ভিড় জমে উঠল। কিন্তু ওরহানের চোখে কেবল একটাই ছবি, শেখ বাড়ির দরজা।

-"সোহা... বেরিয়ে !"ওরহানের গলা কেঁপে যাচ্ছিল।

-"আমার কথা একবার শোনো... আমি কোনো মিথ্যে বলি নি। সবটা বলার একটিবার সুযোগ দাও আমাকে।"

কিন্তু নীরব বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলো না।

বরং মুহূর্তেই গর্জে উঠল এক দাপুটে পদশব্দ।

দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সাইফুল শেখ। হাতে মোটা এক বাঁশ। চোখেমুখে দাউ দাউ আগুন। বাঁশ উঠিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হতেই, ওরহান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তার পায়ে জড়িয়ে ধরল। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে কণ্ঠরোধ ভাঙা স্বরে বলল—

-"আমি কোনো অন্যায় করি নি, আংকেল! সেদিনের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছি। দয়া করে এত পাষাণ হবেন না। আমাকে একবার... শুধু একবার সোহার সাথে দেখা করতে দিন। আমি আপনার পায়ে পড়ছি! আমি তাকে ছাড়া বাঁচব না। আমার ভালোবাসা মিথ্যে নয়।"

কিন্তু তার মিনতি শিলার মতো কঠিন হৃদয়ে গিয়ে ঠেকল না। সাইফুল শেখ এক ঝটকায় পা সরিয়ে দিলেন। হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক লাথি মারলেন। ওরহান ছিটকে পড়ল মাটিতে।

সাইফুল শেখ গর্জে উঠলেন—

-"আমি মরে গেলেও সোহা তোর হবে না! তোর মতো ছেলের জন্য আমার মানসম্মান মাটিতে পড়বে? শুনে রাখ, সোহা এই বাড়িতে নেই। আমি ওকে তাড়িয়ে দিয়েছি। বের করে দিয়েছি আমার ঘর থেকে!"

কথাগুলো বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ল ওরহানের বুকে।সোহা নেই? তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে?

মুহূর্তে পৃথিবী ঘুরে উঠল তার চোখের সামনে। সব শব্দ নিঃশেষ হয়ে গেল, শুধু সাইফুল শেখের গর্জন যেন কানে বাজতে থাকল বারবার—

-"বের করে দিয়েছি!"

দরজা ধপ করে বন্ধ হয়ে গেল। ভিড় ছত্রভঙ্গ হলো।রাস্তায় নির্জনতা নেমে এল।

ওরহান নিথর বসে রইল মাটিতে।চোখদুটো শূন্যে আটকে আছে। বুকে জমে আছে হাজার প্রশ্ন, অথচ ঠোঁট দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

সে কেবল নিঃশ্বাস নিচ্ছে, আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে ধ্বনিত হচ্ছে একটাই নাম—"সোহা..."

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। পাগলের মতো বসে থাকা ওরহানের ভিজে চুল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎই কারো হাত মাথার ওপর ছাতা ধরল। ওরহান চোখ তুলে তাকাল, তানভীর।

চুপচাপ এগিয়ে এসে তানভীর তার পাশে বসে কাঁধে হাত রাখল। আর কিছু না বলেই ওরহান বন্ধুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

-"ভালোবাসা কি তবে অন্যায়, তানভীর? আমি কেনো আমার ভালোবাসাকে পাচ্ছি না? কেনো? আমি তো প্রতিশোধ নেইনি... তাহলে কেনো আমাকে এই অপবাদ দেওয়া হলো? কেনো?"

ভাঙা গলার প্রতিটি শব্দ যেন আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো।

তানভীর ধীরে ধীরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

তারপর একে একে খুলে বলল সবকিছু, মকবুল সাহেবের সেই অভিশপ্ত ছবি, লিজার ঘৃণ্য ভিডিও,

আর সাইফুল শেখের নির্মম রোষ... যে হাতের মুঠোয় থাকা সোহাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলো নির্দয়ভাবে।

শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো ওরহান। শরীর যেন হিম হয়ে গেল। সে জানত না, তার অজান্তেই এত ঝড় বয়ে গেছে সোহার জীবনে। সে কিছুই করতে পারেনি, কিছুই না।

চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে অবিরত। লালচে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে ওরহান ধীরে জিজ্ঞাসা করল—

-"সোহা... এখন কোথায়?"

তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।

-"সোহা কসম দিয়ে বলেছে আমি যেন কাউকে ওর ঠিকানা না বলি। তুই আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ও আমার বোন। আমি ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারব না, ওর বিশ্বাস ভাঙতে পারব না।"

নিঃশব্দ হয়ে গেলো চারদিক। বৃষ্টি এখনো ঝরছে, কিন্তু তার শব্দও যেন মিলিয়ে গেছে কান থেকে।

ওরহান আর কিছু বলল না। চেয়েছিলো... খুবই চেয়েছিলো, তবুও সে তানভীর আর সোহার সম্পর্কের মাঝখানে বিশ্বাস ভাঙ্গবে ন,া তাই বন্ধুত্বের দোহাই সে দিলো না।

যখন সোহা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন সে পাশে থাকতে পারেনি, থেকেছিল তানভীর। তাই আজ সে মুখ বন্ধ রাখল।

কিন্তু বুকের ভেতরে একটাই সিদ্ধান্ত গর্জে উঠল, সোহাকে খুঁজে বের করবে। যেভাবেই হোক, নিজের ক্ষমতায়।

ওরহান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। তার চোখে এক শীতল আগুন জ্বলছে। এই মহল্লা থেকেই সোহা রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে গেছে। এই অপমান, এই আঘাত, এই রক্তের দাগ মুছে যাবে না। প্রতিটা ফোঁটা রক্তের হিসাব সে নেবে। যারা সোহাকে কলঙ্কিত করেছে, তাদের জবাব দিতেই হবে।

ওরহান সামনে পা বাড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেনো বজ্রধ্বনি।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তানভীর আতঙ্কে ওরহানের দিকে তাকিয়ে রইল। বন্ধুর এই নীরবতা যেনো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। তার চোখে হঠাৎই ভেসে উঠল সেই পুরোনো চেহারা, ডানপিটে ওরহান। যে অকারণে মারামারি করত, রক্ত ঝরাত, ভয় দেখাত, আজ সেই ছেলেটিই ফিরে এসেছে।

এরপর থেকে ওরহান আর আগের মতো রইল না।

যেই সোহার ভালোবাসার জন্য সে নিজেকে বদলেছিল, সেই সোহার জন্যই আবার নিজের পুরোনো সত্ত্বায় ফিরে গেল।

অকারণে ঝামেলায় জড়ানো, অযথা মারামারি করা,

রাতের পর রাত সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে পুড়িয়ে ফেলা, নিদ্রাহীন রাত কাটানো, এটাই তার নতুন নিয়ম হয়ে উঠল।

খান বাড়ির সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করল তাকে সামলাতে।

কিন্তু পারে নি কেউ। ওরহানের বুকে জমে থাকা দুঃখ আর আগুনকে থামানোর ক্ষমতা কারো নেই।

মায়ের চোখের জল, মায়ের আহাজারি, সবই বৃথা।

ওরহানের শোকে তার মা শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

খান বাড়ির পরিবেশ নিস্তব্ধ, ভারী, শোকাচ্ছন্ন।

আর সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ওরহানের চোখে শুধু একটাই প্রতিজ্ঞা, সোহাকে ফিরিয়ে আনা আর তার উপর হওয়া প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া।

.

.

.

সেদিনের পর কেটে গেছে এক মাস।এই এক মাসে ওরহান খুঁজে বের করে ফেলেছে সত্যিটা। যে ছবি গুলো মকবুল সাহেবের হাতে গিয়েছিল, সেগুলো দিয়েছিল তার ছেলে রুদ্র।

রুদ্র, ওরহানের বহু বছরের শত্রু। রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব যেমন থাকে, তেমনই এক অদৃশ্য লড়াই চলছিল তাদের মধ্যে। তবে পার্থক্যটা স্পষ্ট। রুদ্র বরাবরই পেছন থেকে আঘাত করেছে, আর ওরহান বুক চিতিয়ে সবার সামনে লড়াই করেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

রুদ্রকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে এসেছে ওরহান। পাশে ছিল তানভীর আর সিয়াম। রুদ্রকে এনে সোজা শেখ বাড়ির সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

তারপর মাইক হাতে তুলে নিয়ে পুরো মহল্লা কাঁপিয়ে ঘোষণা করল—

-"সবাই বেরিয়ে আসুন। আজ আপনাদের চোখের সামনে সত্যিটা দেখাবো।"

এক এক করে এলকার মানুষজন ভিড় জমাল।

সাইফুল শেখ, নিলুফার বেগম, এমনকি মকবুল সাহেবও এলেন। তিনি এখনো জানেন না, সামনে পড়ে থাকা জর্জরিত ছেলেটি তার নিজের রক্ত।

মকবুল সাহেব ওরহানের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন—

-"কি সমস্যা তোমার?এক মাস ধরে আমাদের জ্বালিয়ে মারছো, এখন একটু শান্তি দাও তো। আবার এসেছ কেন?"

ওরহান চোখ কুঁচকে বিদ্রুপের হাসি ছুড়ে দিল।

তার চোখে লাল আগুনের ঝিলিক—

-"শান্তি দেবো, অবশ্যই দেবো। আজকের পর থেকে আমাকে আর কেউ দেখবেন না। কথা দিলাম। কিন্তু..."

সে থেমে রুদ্রর দিকে ইশারা করল।

-"তার আগে আপনাদের একটা খাতির দাড়ি করি।"

মকবুল সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন—

-"মানে?"

ওরহান সামনে এগিয়ে গিয়ে রুদ্রকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে । চারদিকের মানুষ হা করে তাকিয়ে আছে, কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না, যেন এক অদৃশ্য ভয়ে পাথর হয়ে গেছে।

ওরহান সজোরে রুদ্রর কলার ধরে মাটি থেকে টেনে তুললো। তারপর মুষ্টিবদ্ধ হাত ঘুরিয়ে আঘাত করল সরাসরি নাকে। এক চাপে রুদ্র মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

নাক ফেটে তৎক্ষণাৎ রক্ত গড়িয়ে পড়ল।

রুদ্র উঠতে চাইলে ওরহান লাথি মেরে পাঁজরে বসালো।

শব্দ হলো যেন হাড়ে চিড় ধরেছে। রুদ্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল।

ওরহান চুল ধরে টেনে আবার দাঁড় করালো। এবার তার কপালে মাথা ঠুকে দিল জোরে। চোখের পাতা ফুলে গেল মুহূর্তেই। ভিড় থেকে মকবুল সাহেব চিৎকার করে উঠল—"থামো! মেরে ফেলবে ওকে!"

রুদ্র কাতর কণ্ঠে ক্ষমা চাইতে চাইতে হাত তুলল,

কিন্তু ওরহানের চোখে কোনো দয়া নেই। সে হঠাৎ হাত মুচড়ে পেছনে টেনে ধরল। গুড়গুড় শব্দে রুদ্রর ডান হাত ভেঙে গেল। রুদ্রর মুখ থেকে তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এল।

মুখে একের পর এক ঘুষি, প্রথমে গালে, তারপর চোয়ালে, রুদ্রর ঠোঁট ছিঁড়ে রক্ত ঝরল। মকবুল সাহেব ভিড় ঠেলে সামনে এসে চিৎকার করলেন—

-"কি করছো! থামাও ওকে! ও আমার ছেলে!"

কিন্তু ওরহান যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার চোখে শুধুই রক্তের প্রতিশোধের তৃষ্ণা।

তানভীর ও সিয়াম বুঝতে পারলো পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। তাই তারা দু’জনে মিলে ওরহানকে জোর করে টেনে সরিয়ে আনলো রুদ্রের কাছ থেকে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। ক্রোধে উন্মত্ত ওরহান হাতের নাগাল না পেলেও পা বাড়িয়ে যতদূর পৌঁছায়, রুদ্রের শরীরে লাথি বসিয়ে দিল।

অনেকটা দূরে টেনে আনা হলো ওরহানকে, তবুও তার ক্রোধ থামছে না। বুক ফেটে চিৎকার করে উঠলো—

-"সত্যি কথা বল! না হলে আজই তোকে আমি জীবন্ত কবর দেবো!"

রুদ্র মুখ বুজে রইলো। তার ঠোঁট একটিবারও কাঁপলো না। এই দৃশ্য দেখে ওরহান আবার তেড়ে যাওয়ার উপক্রম করলে, মকবুল সাহেব হঠাৎ কেঁপে ওঠা গলায় বলে উঠলেন—

-"আমি বলছি বাবা! আমার ছেলেকে আর মেরো না... মরে যাবে ও।"

তারপর তিনি ভেঙে পড়া স্বরে, কান্না মেশানো গলায় মহল্লার সবার সামনে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলেন—

-"আমাদের মাফ করবেন শেখ সাহেব। আপনার মেয়ে নির্দোষ ছিল। তার চরিত্রে কোনো দাগ ছিল না। যেই ছবি আমি আপনাদের দেখিয়েছিলাম, সেগুলো কেবল সাধারণ ছবি। এই ছেলে... এই ওরহানই সোহা মাকে প্রেম নিবেদন করেছিল। কিন্তু সোহা মা বারবার তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। রুদ্র ও ওরহান ওদের মধ্যে ঝামেলা ছিল, শত্রুতা ছিল। সেই কারণেই আমার ছেলে ছবি তুলেছিল... আমাকে দেখিয়েছিল। আর আমি, আমি নিজেই ঘৃণায় অন্ধ হয়ে মিথ্যা সাজিয়ে আপনাদের বলেছিলাম। কারণ, আপনার মেয়েদের নিয়ে অহংকার, সেই দম্ভ আমার সহ্য হয়নি। তাই প্রতিশোধ নিয়েছিলাম। এতে আমার আর আমার ছেলের দুজনেরই কাজ হাসিল হয়েছে।"

কথাগুলো ঝড়ের মতো আঘাত হানলো চারপাশে। মুহূর্তেই পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাস যেন থমকে দাঁড়ালো, আকাশের নীরবতা নেমে এলো জনতার ভিড়ে।

মহল্লার মানুষ স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো মকবুল সাহেব আর তার ছেলের দিকে। সেই দৃষ্টি ছিলো ঘৃণায় ভরা, অভিশাপের মতো জ্বলন্ত। কেউ কেউ আর ধরে রাখতে না পেরে ফিসফিসিয়ে উঠলো—

-"কি লজ্জার কথা! এরা এতদিন আমাদের সবাইকে প্রতারিত করেছে!"

-"এমন কলঙ্কের বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই ওদের।"

জনতার চোখের আগুনে মকবুল সাহেব কেঁপে উঠলেন। আকাশের বাতাসও যেন গুমোট হয়ে এলো, মানুষের দম চেপে ধরলো। চারপাশের নীরবতায় শুধু শোনা যাচ্ছিল কারো দমবন্ধ হওয়া শ্বাস, আর মাটিতে গড়িয়ে পড়া এক পিতার অনুতপ্ত কান্না।

মহল্লার মানুষজন গুঞ্জন তোলে—

-"নিজের মেয়ের দোষ ঢাকতে অন্যের নির্দোষ মেয়েকে বদনাম করলো।”

-"আহারে! লক্ষী মেয়েটাকে বাড়ি ছাড়া করলো রে..."

বিভিন্ন দিক থেকে এমন নিন্দার ঝড় উঠতেই ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগলো ওরহান। তানভীর ও সিয়ামের আঁকড়ে ধরা হাত থেকে নিজেকে আলগা করে নিলো। আর কোনো হৈচৈ নয়, শান্ত অথচ ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো সাইফুল শেখের দিকে।

হঠাৎ সবার চোখের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো তার সামনে। ভাঙা গলায়, তীব্র যন্ত্রণায় কাঁপা কণ্ঠে বললো—

-"প্রথম আপনার মেয়েকে আমি বৃষ্টিতে ভিজতে দেখেছিলাম। আমি কখনো বৃষ্টি পছন্দ করতাম না, কিন্তু সেদিন থেকে বৃষ্টি আমার ভালো লেগে যায়। বিশ্বাস করুন শেখ সাহেব, আমার ভালোবাসা নির্ভুল। কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়, সত্যিই আমি সোহাকে ভালোবেসেছি।

হাজার চেষ্টা করেছি নিজেকে আটকানোর। বারবার চেয়েছি তাকে ভোলার জন্য। কিন্তু যতবার তাকে ভুলতে গিয়েছি, ঠিক ততবার শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছি আমি। আমার বুক হাহাকার করেছে। আমি মেনে নিতে পারি না, ওকে আমি পাবো না।

দুই মাস হয়ে গেছে... আমি ওকে একবারও দেখি নি। এই দুই মাস আমার কাছে মৃত্যু যন্ত্রণা ছিল। আপনি কেনো এত নিষ্ঠুর ছিলেন? কেনো দিলেন না সেদিন সোহাকে আমার হাতে? তাহলে আজ আমার সোহা আমার বুকেই থাকতো! আমি এসেছিলাম আপনাদের কাছে ভিক্ষে চাইতে, আপনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অপমান করে।

আজ মকবুল আর তার ছেলে যতটা দোষী, শেখ সাহেব, ততটাই দোষী আপনিও।"

কথাগুলো বলে ওরহান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। চারপাশের জনতার চোখের দিকে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর বুক চিরে, রক্তিম চিৎকার ছুঁড়ে দিলো সবার মাঝে, ওরহানের কণ্ঠ যেনো বজ্রপাতের মতো ছিঁড়ে এলো চারপাশে—

-"আমার সোহা নিষ্পাপ! সে ফুলের মতো পবিত্র। তাকে আমি কোনোদিন অপবিত্রভাবে স্পর্শ করিনি। আমি তাকে বৈধভাবে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু... সোহার বাবা তা হতে দিলেন না। আজ সাইফুল শেখের অকারণ জেদ আর অহংকারের জন্য আমার সেই ফুল ঝরে পড়েছে। আমার নিষ্পাপ, কোমল, নীলশ্যামা কলঙ্কের বোঝা কাঁধে নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছে। আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার বেঁচে থাকার কারণ..."

ওরহানের প্রতিটি শব্দ যেনো ধারালো ছুরির মতো বিদ্ধ হলো সবার অন্তরে। তীব্র কণ্ঠে বলা কথায় জনতার মাথা নত হয়ে এলো। কারো ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই। সমাজের নিষ্ঠুর মুখোশ সবার সামনে উন্মোচিত হলো। তারা বুঝলো, সত্য না জেনেই কত বড় অন্যায় করেছে, এক নির্দোষ মেয়েকে তারা কাঁটার মিছিলে ঠেলে দিয়েছে। অথচ শাস্তি পেলো না অপরাধীরা, শাস্তি পেলো কেবল একটি নির্দোষ প্রাণ।

আকাশও যেনো দুঃখে ভেঙে পড়লো। মেঘ জমলো চারদিকে, তারপর ঝরতে শুরু করলো বৃষ্টি। সবার ভিড় জমলো শেখ বাড়ির সামনে। ভারী দরজার আঙিনায় রক্তাক্ত রুদ্র, পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা মকবুল সাহেব। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ওরহান, অগ্নি চোখে, বেদনা ভরা দেহে।

হঠাৎই সে ধপ করে শুয়ে পড়লো মাটিতে। বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীর ভিজিয়ে দিলো। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু বৃষ্টির সঙ্গে মিশে গেলো, যেন আকাশ আর মানুষের কান্না একাকার হয়ে গেছে।

সে মুখ তুলে তাকালো আকাশের দিকে, ভিজতে ভিজতে বুক চিরে চিৎকার করে উঠলো—

-"তোমায় প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, তুমি ছিলে ঠিক নীলপদ্মের মতো নির্মল, স্বচ্ছ আর অপরূপ। অথচ আমার জীবনে তোমার আগমন হলো নীল বিষ হয়ে। সেই বিষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল আমার শরীর, মন আর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে, আমাকে করে তুলল নিঃশেষিত।"

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ওরহান একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। মনে হলো যেনো তার বুকের গভীর অভিযোগ সে নীলিমার কাছে সঁপে দিচ্ছে, আকাশই যেন সে বার্তা পৌঁছে দেবে সোহার কাছে।

চারপাশে উপস্থিত সবাই নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখে অসহায়তা। তানভীর ও সিয়ামের চোখে অশ্রুর ঝিলিক, বন্ধুর এই ভঙ্গুর, ভেঙে পড়া অবস্থা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

হঠাৎই ওরহান ভাঙল সেই নীরবতা। ভারী কণ্ঠে আবারও বলে উঠল—

-"আমার একটিমাত্র ভুলের শাস্তি তুমি আমায় সারাজীবনের জন্য দিয়ে দিলে, নীলশ্যামা। এই শাস্তি, এ জন্মে আর ফুরোবার নয়।

নিঃসঙ্গতার এই ভার আমি আর বহন করতে পারছি না। প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক অদৃশ্য অন্ধকার গহ্বরের মতো আমাকে টেনে নিচ্ছে, গিলে ফেলছে আমার সমস্ত অস্তিত্ব। আমি তো শুধু চেয়েছিলাম সামান্য শান্তি... একটুখানি তোমার সান্নিধ্য। আমার একটিমাত্র ভুলের কি কোনো ক্ষমা নেই?

আমি কি এমন অপরাধ করেছি, যার দণ্ড এভাবে আজীবন ভোগ করতে হবে আমাকে?

শুনেছি, ভালোবাসলে নাকি সব ভুল, সব অন্যায় গলে যায়, বাতাসের মতো মিলিয়ে যায়। সব ক্ষমা করা যায়, সব বিস্মৃতির অন্ধকারে ডুবে যায়। তাহলে কেন তুমি পারলে না, নীলশ্যামা? কেন আমার সেই একটিমাত্র ভুলের জন্য তোমার হৃদয়ে সামান্য ক্ষমাটুকুও জায়গা পেল না?

আমি ভেঙে যাচ্ছি প্রতিদিন। তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবী এক বিশাল মরুভূমি, যেখানে বালুর ঢেউ দগ্ধ করে দিচ্ছে আমার দেহ, আমার প্রাণ। প্রতিটি নিশ্বাসে আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি, অথচ এই বুকের ভেতর দগদগে আগুনের কোনো নিভে যাওয়া নেই। তুমি নেই, অথচ তোমার ছায়া চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, এক অদৃশ্য অগ্নিশিখার মতো। আমি তোমাকে ছুঁতে পারি না... দেখতে পারি না... এ কেমন দহন?

তবুও প্রতিটি অন্ধকার রাতে, প্রতিটি নিঃসঙ্গ ভোরে তোমার অভাব আমাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।

আমি শুধু একবার চাই... শুধু একবারের জন্য... আমার সামনে এসে দাঁড়াও, নীলশ্যামা। তোমার চোখে আমি ডুবে যেতে চাই, তোমার স্পর্শে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে চাই। তারপর মরণও কবুল।

.

.

.

কেটে গেছে তিনটি দীর্ঘ বছর। এই সময়ের ভেতর ওমর খান তার ছেলে ওরহানের বিয়ের ঘোষণা করে দিয়েছেন মিহিরিমার সাথে। খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই ওরহান প্রথমে ভেঙে পড়েছিল তীব্র ক্ষোভে, কখনো বিষণ্ণ, কখনো রাগে ফেটে পড়েছে। কারণ, তার হৃদয়ের গভীরে আজও খোঁজ চলছিল কেবল একজনের, সোহা। সে-ই ওরহানের স্ত্রী, সে-ই তার জীবনের একমাত্র নারী।

ওরহান নিজের পরিবারের সবার কাছে বারবার স্বীকার করেছে সত্যটা। বলেছে, সে ছাড়া অন্য কারো সাথে বিয়ে মানে বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু ওমর খান কোনো কথা শুনলেন না। বাবার চোখে ছেলের এই যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছিল না। তাই একরকম জেদ করেই তিনি আয়োজন শুরু করে দিলেন।

শেষমেশ ওরহান চুপ করে গেল। নিজের ভেতরে ভেবে নিল, হয়তো এই বিয়ের খবর শুনেই সোহা ফিরে আসবে, ঠিকই দেশে আসবে। তাই সে প্রকাশ্যে কিছু বলতে বারণ করলেও পরে আর কিছু বলে নি। অথচ তাতেও সোহা ফেরেনি।

তিন বছর ছয় মাস পর, অবশেষে আশার আলো দেখা দিল। একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, যাকে ওরহান নিযুক্ত করেছিল বহু আগেই, এনে দিলো সোহা সম্পর্কিত প্রতিটি খুঁটিনাটি সংবাদ।

ওরহান তখন পাড়ি জমাল প্যারিসে। তিন মাস সেখানে থেকেছে সে। কিন্তু একবারও সরাসরি যায়নি সোহার কাছে। দূর থেকে নিরব পর্যবেক্ষকের মতো নজর রেখেছে প্রতিটি চলাফেরায়, প্রতিটি আভায়। সেই দূরত্বের দৃষ্টি দিয়েই সে জানতে পারলো, ভেলভেট ব্লুম শিগগিরই বাংলাদেশে তাদের একটি শাখা খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ সুযোগই কাজে লাগালো ওরহান। নিজের নামে কোম্পানির শেয়ার কিনে নিলো। তবে ক্ষমতা বা পদ দাবি করলো না। তার একমাত্র শর্ত ছিল, সোহাকে যেন বাংলাদেশ ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়।

ওরহান কোনো কিছুই ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়নি। সূক্ষ্মভাবে, ধাপে ধাপে, সম্পূর্ণ পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই সে সোহাকে বাংলাদেশে ফিরতে বাধ্য করলো। নিজের কোম্পানির সঙ্গে ভেলভেট ব্লুমের যৌথ চুক্তি, সেটাও ছিল তার সুপরিকল্পিত ফাঁদ। সিইও পদে নিজের নাম প্রস্তাব করেছিল, সব কিছু সাজানো ছিল যেন একদিন সোহা বাধ্য হয় ফিরে আসতে, তার চোখের সামনে দাঁড়াতে।

কিন্তু সোহা কিছুই টের পায়নি। তার অজান্তেই চারপাশের জগৎ এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম জালে বোনা হচ্ছিল, যার প্রতিটি সুতোর প্রান্ত ধরে রেখেছিল ওরহান। আর ঠিক সেই জালেই ধরা পড়ে অবশেষে সোহা।

তবুও শেষ রক্ষা হলো না। কারণ, সোহা তার প্রতি এতটুকুও নরম হলো না। সেই আগের মতোই কঠোর, অবিচল। ক্ষমার আলো তার চোখে জ্বলেনি।

ওরহানের সমস্ত হিসেব, সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত কৌশল এক মুহূর্তে যেন অর্থহীন হয়ে পড়লো, কারণ তার সবচেয়ে বড় প্রার্থনা, সোহারের ক্ষমা, সে পেলো না।

.

.

.

নারীটি থেমে গেল। প্রতিদিন এই সময়ে গল্প শেষ হয়ে যায়। এরপর কি ঘটেছিল, সে নিয়ে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করে না। যেনো তার ভেতরে এক গোপন দরজা আছে, যা কাউকে খোলার অনুমতি দেয় না।

হুইলচেয়ারে বসে থাকা লোকটি এদিন প্রথমবারের মতো তার দিকে সরাসরি তাকালো। নারীটি উঠে চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই লোকটি কাঁপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলো—

-"বসুন। আজ কিছু কথা বলব আপনাকে।"

অপ্রত্যাশিত ডাকে নারীটি থমকে দাঁড়ালো। এতদিনে প্রথমবার সে মুখ ফুটে কিছু বলল। এক মুহূর্ত চেয়ে থেকে ধীরে ধীরে আবার আগের জায়গায় বসে পড়লো নারীটি।

লোকটি গভীর শ্বাস নিয়ে বললো—

-"আমি আজকের পর আর এই দেশে থাকবো না। আমার শরীর এখন মোটামুটি সুস্থ। বাকি সেবা আমাকে বাড়িতেই নিতে হবে। তাই আজই বাংলাদেশ ফিরে যাচ্ছি।"

নারীটির ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটলো। স্বরটাও কোমল শোনালো—

-"কংগ্রাচুলেশন।"

লোকটি নির্বিকার মুখে বসে রইলো। তারপর গলা নামিয়ে বলল—

-"গত ছয় মাস ধরে আপনি আমাকে একই গল্প শোনান। আমি বুঝতে পারি... আপনি আমাকে চেনেন। অথচ আমি আপনাকে চিনি না। আমার স্মৃতি এখনও ফেরেনি।"

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল—

-"এই গল্প আমাকে অদ্ভুত শান্তি দেয়। মনে হয় যেনো আমারই গল্প। ঝাপসা কিছু স্মৃতি মাঝে মাঝে আঘাত করে, কিন্তু স্পষ্ট হয় না। আপনি কেন প্রতিদিন একই সময়ে আসেন? কেন একই গল্প বারবার আমাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন? আসলে কার জীবনের গল্প এটা?"

নারীটি তখন হালকা নড়লো। মুখে মাস্ক থাকায় তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসি বোঝা গেল না, শুধু চোখ দুটো কেমন যেন ঝিলমিল করে উঠলো। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে। উল্টো ঘুরে চলে যেতে যেতে ফিসফিস স্বরে বলে গেল—

-"সব প্রশ্নের উত্তর পেতে নেই।"

লোকটি যেনো এক অদৃশ্য শূন্যতায় টেনে নেওয়া হলো। হতবাক চোখে নারীর পিছু পিছু তাকিয়ে থেকে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো—

-"আপনার নাম কী? অন্তত বলুন, গল্পটা কার?"

নারীটির পদক্ষেপ থামলো না। চোখে এক অদ্ভুত বিদ্রুপ আর মুখে বাঁকা হাসি। তার কণ্ঠ ভেসে এলো ধ্বনিত বজ্রের মতো—

-"গল্পটা আমারই, মিস্টার ওরহান খান শাহির।"

Story Cover