ফিরে দেখা

পর্ব - ২৭

🟢

আজ আকাশ ঢেকে আছে ঘন মেঘে। সূর্যের আলো যেনো কোথাও প্রবেশ করতে পারেনি, সমগ্র পরিবেশ এক অদৃশ্য শোকের আবরণে মোড়ানো। বাতাসে অকারণ ভার, চারদিকে এক নিস্তব্ধতার চাপা শব্দ। ঠিক এমনই সময়ে, এক মধ্যবয়সী নারী ধীরপায়ে হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে এক পুরুষকে।

পুরুষটি নিস্তব্ধ, চোখে শূন্যতা, ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই। তার চারপাশের দৃশ্য যেনো তার কাছে অর্থহীন। অথচ নারীটি একটানা কথা বলে যাচ্ছে, তার কণ্ঠস্বরের প্রতিটি সুরে লুকিয়ে আছে অদম্য চেষ্টা, পুরুষটির হৃদয়কে বোঝাতে, ভাঙা মনটাকে জোড়া দিতে, অন্ধকারের ভেতরে সামান্য আলো দেখাতে।

Mount Sinai Hospital-এর বিশাল করিডর তাদের সামনে প্রসারিত। সাদা দেওয়ালে নীরবতার প্রতিধ্বনি, প্রতিটি কোণে শূন্যতার এক অদৃশ্য চাপ। নারীর ঠেলা দেওয়া হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরে ঘুরে সেই নীরবতাকে খানিকটা ভাঙলেও, তার ভেতরের আশঙ্কা আর যন্ত্রণাকে কিছুতেই ভাঙতে পারছে না।

Mount Sinai Hospital-এর Rehabilitation and Human Performance Department—নিউইয়র্ক শহরের মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নাম। এটি ম্যানহাটনের পূর্ব প্রান্তে, East River-এর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। গবেষণা, চিকিৎসা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বিভাগ নিউরোলজি ও রিহ্যাবিলিটেশনের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

পুরুষটি প্যারালাইজড। শুধু শরীরই নয়, স্মৃতির ভাণ্ডার থেকেও অনেকটা বঞ্চিত। আমনেশিয়ার কালো ছায়া তার মস্তিষ্ককে ঢেকে রেখেছে। তাই নিয়মিত তাকে এখানে আনা হয়, যেনো থেরাপি আর চিকিৎসার মাধ্যমে তার হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে একটু একটু করে ফিরিয়ে আনা যায়।

চিকিৎসাগুলোও একেকটি যেনো বিজ্ঞান ও মানবিকতার মিশ্রিত শিল্পকর্ম। ফিজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে তাকে ধীরে ধীরে শেখানো হয় পেশিগুলোকে আবার সাড়া দিতে, প্যারালাইজড অঙ্গগুলোকে ধৈর্যের সাথে নাড়াতে। কগনিটিভ থেরাপিতে তার স্মৃতির গভীরে আলো জ্বালানোর চেষ্টা চলে, হারিয়ে যাওয়া নাম, মুখ, কিংবা অতীতের ক্ষুদ্রতম ঘটনাকে ফিরিয়ে আনার অনবরত প্রয়াস।

হাসপাতালের বাইরের পরিবেশ যেনো এই নিরাময়ের পথে নীরব সহচর। দূরে ঘন সবুজ বনভূমি, যার ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত হয় বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে থাকে জীবনের অজানা ব্যথা, আবার নতুন করে জেগে ওঠার শক্তিও। East River-এর বিস্তৃত বুকে আকাশের ভাঙাচোরা প্রতিচ্ছবি প্রতিনিয়ত রূপ নেয় আরেক আকাশে, যেনো এ নদী বুঝিয়ে দেয়, ভাঙা থেকেও নতুন কিছু সৃষ্টি হয়।

চারদিকে স্তব্ধতা, মাঝেমধ্যে শুধু পাখির ডানার শব্দ কিংবা জলে হালকা ঢেউয়ের খেলা। এই প্রকৃতি, এই হাসপাতাল, আর চিকিৎসার সযত্ন স্পর্শ, সবকিছু মিলেই যেনো পুরুষটির ভাঙা জীবনে নতুন করে আলো ফিরিয়ে আনার এক যাত্রা।

প্রতিদিনের মতো আজও পুরুষটি হুইলচেয়ারে বসে হাসপাতালের বিশাল প্রাচীর পেরিয়ে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এটি তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, East River-এর ধারে বসা, জলের প্রশান্তি দেখা, বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়া। যেনো এই নিয়মিততা-ই তার নিস্তব্ধ জীবনের একমাত্র আশ্রয়।

তার সঙ্গে আসা মাঝবয়সী নারী, যিনি হুইলচেয়ার ঠেলে এখানে নিয়ে এসেছিলেন খাবার সংগ্রহের জন্য ভেতরে ফিরে গেছেন। ফলে নদীর তীরের বিস্তৃত নীরবতায় পুরুষটি এখন সম্পূর্ণ একা।

চোখ স্থির হয়ে আছে রূপালি জলে, যেখানে আকাশের ভাঙাচোরা ছায়া ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে চলেছে। সেই দৃষ্টিতে যেনো এক অদৃশ্য প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, কোনো উত্তরহীন খোঁজ, যা ভাষায় প্রকাশ পায় না। ঠোঁটে জমাট নীরবতা, অথচ সেই নীরবতাই অনেক কিছু বলে দেয়।

জলের উপর আলো-ছায়ার খেলা প্রতিনিয়ত তার নিস্তব্ধতাকে প্রতিধ্বনি করে, যেনো জলও বুঝে গেছে তার ভেতরের অচল বেদনা। হালকা বাতাস এসে ছুঁয়ে যায় তার চুল, কপালের রেখা, কিন্তু তার দেহ নিস্তরঙ্গ, যেনো অনুভূতির সমস্ত প্রবাহ কোথাও আটকে গেছে।

এই দৃশ্য যেনো কোনো মানুষের নয়, বরং একাকিত্বের প্রতীক, একজন মানুষ, যিনি আছেন, তবু যেনো নেই।

ঠিক তখনই, যেন সময় নিজেই ধীরে ধীরে থেমে যায়, এগিয়ে আসে এক রমণী। প্রতিদিনের মতো, নির্দিষ্ট সময়ে, একই ছন্দে, তার উপস্থিতি যেনো পূর্বনির্ধারিত। মুখ ঢাকা সাদা মাস্ক, চোখে কালো সানগ্লাস, কে তিনি, কী তাঁর পরিচয়, সবই অজানা। কিন্তু তার ধীর পদচারণাই লেকের চারপাশের বাতাসকে অন্যরকম করে তোলে—এক অদ্ভুত রূপক, যা স্থবিরতায় নতুন সঙ্গীতের সুর মিশায়।

তিনি হুইলচেয়ারের পাশে নিঃশব্দে বসে পড়েন। কোনো শব্দ নয়, কোনো ভঙ্গি নয়, শুধু এক অদ্ভুত উপস্থিতি। তার অস্তিত্বেই যেন চারপাশের স্তব্ধতা ভাঙে, অদৃশ্য তরঙ্গ তৈরি করে যা পুরুষটির নিস্তব্ধ মনকে ছুঁয়ে যায়।

আজও সেই একই নিয়ম, একই ছন্দ। এক মানবের একাকী অপেক্ষা,লেকের নীরব সৌন্দর্য, আর সেই অচেনা নারীর অদ্ভুত সঙ্গ, সব মিলিয়ে এক দৃশ্য, যা চোখে দেখা যায় না, শুধু অনুভূত হয়। কেবল কণ্ঠস্বরের অমূর্ত ছায়া, উপস্থিতির নীরব স্পর্শ, এবং দৃষ্টি দিয়ে মেপে দেখা যায় সেই অদ্ভুত মিলন।

নীরবতার আবরণ ভেঙে হঠাৎই সেই নারীটির কণ্ঠ ভেসে এলো—

-"কিভাবে বুঝলেন আমি আসব? প্রতিদিন আপনি অপেক্ষা করেন আমার গল্প শোনার জন্য। আমিও ভালোবাসি বলতে। তাহলে শুরু হোক... এক পাগল প্রেমিকের করা পাগলামির গল্প।"

লেকের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হুইলচেয়ারে বসা মানুষটি ধীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি, অথচ অন্তর্লীন অস্থিরতা যেনো ঢেউ তুলছিলো। সেই নীরব সম্মতিই ছিল তার একমাত্র জবাব।

চারদিক তখন গোধূলির আলোয় রঙিন। আকাশে মেঘের ফাঁকে ঝলসে উঠছিলো শেষ বিকেলের আলো, তার ছায়া লেকের জলে নাচছিলো। নিস্তব্ধ বাতাসে ভেসে আসছিলো জলের মৃদু ঢেউয়ের শব্দ। দূরের পাহাড়গুলো যেন এই কথোপকথনের নীরব সাক্ষী।

নারীটির চোখে ছিল গল্পের আবেশ, কণ্ঠে রহস্যের ছোঁয়া। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন কেবল গল্প বলছেন না, বরং অতীতের কোনো লুকানো দরজা খুলে দিচ্ছেন। আর হুইলচেয়ারে বসা মানুষটিকে সেই অদৃশ্য দরজার ওপাশে ডেকে নিচ্ছিল প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য—

সেদিন আকাশ ছিল অশান্ত। হঠাৎ করেই ঝড়-বৃষ্টি নেমে এলো শহরের বুকে। কারো কল্পনাতেও ছিল না আজ বৃষ্টি হবে, অথচ মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেলো, দিনের আলো মুছে গিয়ে চারদিক যেন সুনসান অন্ধকারে ডুবে গেলো।

ভার্সিটির আনাচে-কানাচে তখন তুমুল হৈচৈ। ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটোছুটি করছে, কেউ আশ্রয় খুঁজছে, কেউ বই মাথায় তুলে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছে, আর কেউবা হেসে খেলে বৃষ্টির জলে ভিজে যাচ্ছে নির্বিকার আনন্দে। বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির মাতাল করা গন্ধ, কৃষ্ণচূড়া গাছের রক্তিম ফুলগুলো বৃষ্টির ভারে নুয়ে পড়ে একে একে ঝরে পড়ছে মাটিতে। মনে হচ্ছিল, লালচে পাপড়িগুলো যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে রক্তাক্ত স্মৃতির মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।

ঠিক সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো এক পঁচিশ বছরের তাগড়া যুবক। কিছুক্ষণ আগেও তার চঞ্চল পা ছুটছিল, কিন্তু হঠাৎই যেন সময় থেমে গেলো। দৃষ্টিতে ছিল অস্থিরতার ঝলক, তবু চোখের সামনে যা উদ্ভাসিত হলো, তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত শব্দ নিঃশেষে মিলিয়ে গেলো।

এক তরুণী, দুই হাত মেলে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটি বন্ধ, ঠোঁটে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি, যেনো তার সমস্ত দুঃখকষ্ট ধুয়ে ফেলছে বৃষ্টির ধারায়। চারপাশে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ, ঝরে পড়া কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল, আর সেই তরুণীর বৃষ্টিবিলাস, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে উঠলো এক জীবন্ত ছবি, যার সৌন্দর্যে যুবক থমকে গেলো।

তার চোখে পড়লো না ঝড়, না বৃষ্টি, না কোলাহল, শুধু সেই তরুণী। যেনো প্রকৃতির সমস্ত উন্মাদনা থেমে দাঁড়িয়েছে তাকে কেন্দ্র করে।

যুবকটি তাকিয়ে রইলো। সমস্ত পৃথিবী তোলপাড় করা এই ঝড় যেনো এখানে এসে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি, কোলাহল, দৌড়ঝাঁপ, সবকিছু ফিকে হয়ে শুধু সেই নীল শাড়ি পরিহিতা তরুণীর উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

হঠাৎ বুকের ভেতর এক অচেনা ধ্বনি উঠলো। মনে হলো, তার সমস্ত অস্থিরতা, সমস্ত ছুটে চলার কারণ যেন এই মুহূর্তেই খুঁজে পেল। চোখের সামনে দাঁড়ানো তরুণীটিকে দেখে বুকের ভেতর প্রথমবারের মতো জন্ম নিলো এক অদ্ভুত টান, এক অজানা আকর্ষণ।

সে বুঝতে পারলো না, কেন এত ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ এই একজনই আলাদা হয়ে উঠলো। হয়তো বৃষ্টির গর্জন, কৃষ্ণচূড়ার ঝরে পড়া লাল ফুল কিংবা ভেজা মাটির মাতাল করা গন্ধ, সবকিছু মিলে তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে এই দৃশ্যের সামনে।

সময় আর এগোচ্ছে না, বরং থমকে গেছে। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ, ঝড়-বৃষ্টির গর্জন, ছাত্রদের দৌড়ঝাঁপ, সবকিছু মিলিয়ে গিয়ে কেবল সেই তরুণীর চোখের কৌতূহলী দীপ্তিই আলো ছড়াচ্ছে তার অন্তরে।

বৃষ্টি নেমেছিল শহরের বুকে, কিন্তু আসল ঝড় বয়ে গেলো যুবকের হৃদয়ে।

যেন কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়ানো সেই মুহূর্তটাই ছিল তার জীবনের প্রথম অধ্যায়। এতদিন যা কিছু দেখা, জানা, অনুভব, সবকিছু মুছে গিয়ে সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হলো নতুন এক জীবন, এক অনুচ্চারিত কাহিনি।

বৃষ্টিস্নাত নীল শাড়ি পরিহিতা শ্যামলা রমণীকে দেখে যুবকের সমগ্র পৃথিবী থমকে গেল। চারপাশে ঝড়-বৃষ্টির উন্মত্ত দাপাদাপি, ছাত্রদের হাসি-চিৎকার, আশ্রয়ের খোঁজে ছুটোছুটি, সব মিলিয়ে চারদিক তখন উত্তাল সমুদ্রের মতো অস্থির। অথচ সেই ভিড়ভাট্টার মাঝেই কৃষ্ণচূড়ার তলে দাঁড়ানো তরুণীকে দেখে মনে হলো, সে যেন এক অদ্ভুত নীরবতার প্রতীক, এক স্ফটিক শান্তি, যা সমস্ত বিশৃঙ্খলাকে ছাপিয়ে গেছে।

নীল শাড়ির ভাঁজে ভিজে ওঠা অনির্বচনীয় সৌন্দর্য, চুলের ভিজে গন্ধে ভেসে আসা অদৃশ্য মাদকতা। প্রকৃতি যেন আজকের এই ঝড়-বৃষ্টি সাজিয়েছে কেবল তাদের দু’জনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য।

ভার্সিটির সব চেয়ে সুদর্শন পুরুষ, ভিড়ের মাঝে চোখে পড়ার মতো চেহারা, সেই পুরুষের দৃষ্টি থমকে গেলো এক শ্যামলা মেয়ের সামনে। সেই মেয়ের সৌন্দর্য গলার মুক্তোর মতো ঝলমল করা নয়, তার সৌন্দর্য ছিল নিঃশব্দ, সহজ, ভিজে শাড়ির মতো স্নিগ্ধ। শ্যামলা রঙে ঢাকা সেই মুখ, ভেজা চুলের আড়ালে লাজুক দৃষ্টি, এ যেনো অন্য কোনো জগতের টান।

সেই দিনের পর থেকে তরুণীটিকে নিয়ে প্রতিটি খুঁটিনাটি খোঁজখবর জেনে নিয়েছিল সে। জানতে পেরেছিল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বন্ধু বলতে হাতে গোনা একজন 'স্নেহা' যুবকের বন্ধুর প্রেমিকা। অতি সাধারণ পরিবারের সহজ-সরল কন্যা। স্বভাবে ভীষণ ভীতু, অতুলনীয় নম্রতা তার চোখেমুখে। ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা যেন তার স্বভাববিরুদ্ধ কিছু। কোনো ছেলে কথা বলতে গেলেই সে ভয়ে সরে দাঁড়ায়, কখনো বা পালিয়ে যায়।

এই কথাগুলো যখন যুবকটি শুনেছিল, তখন থেকেই সে এক অদৃশ্য প্রহরীর মতো তাকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। ভিড়ের ভেতরে থেকেও তার চোখ সবসময় খুঁজে নেয় একটিই মুখ। গ্রন্থাগারের নির্জন কোণে, কিংবা বৃষ্টিভেজা করিডরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে, সবসময় যেনো সে এক মুখের প্রতীক্ষায় থাকে। তবুও, হৃদয়ের গভীরতম আসনে জমে থাকা ভালোবাসার কথা প্রকাশ করার সাহস, সে কোনোদিন খুঁজে পায়নি।

তার ভেতরকার দোলাচল ছিল অসহনীয়। যদি তরুণী তাকে পছন্দ না করে? যদি তার সামনে দাঁড়ানোতেই ভয়ে সরে যায়? যদি চিরদিনের মতো চোখ ফিরিয়ে নেয়? এই আশঙ্কার ভার তাকে এক বছরেরও বেশি সময় স্তব্ধ করে রেখেছিল।

কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। সেই বছর গড়িয়ে গেছে। যুবকের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন আজ শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি শোনায় তার চারপাশে। অন্যদিকে তরুণী তখনো সবে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, যৌবনের দীপ্তিময় প্রহরে দাঁড়িয়ে।

চারপাশে গ্রীষ্মের বিদায়ী আলো, ক্যাম্পাসের আকাশে ভেসে বেড়ায় পাখির উচ্ছ্বসিত ডাক। রঙিন পাতার ফাঁক গলে বইতে থাকে কোমল হাওয়া। প্রকৃতি যেন গেয়ে চলেছে জীবন আর ঋতুর অনন্ত সঙ্গীত। অথচ সেই অনন্ত সঙ্গীতের ভেতর যুবকের অন্তর যেন ছায়ায় ঢাকা।

সে জানে, আর সময় নেই। এবার যদি না বলে, তবে আর কোনোদিন বলা হবে না। স্নাতক শেষ হবার পর বাবার ব্যবসার ভার নিতে হবে তাকে, ব্যস্ততার ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে যাবে এই প্রিয় ক্যাম্পাস। আর কোনোদিন দেখা মিলবে না সেই চোখের, যে চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে তার নীরব জীবনের সমস্ত স্বপ্ন।

এখন যেন শেষ বিকেলের রঙিন আলোয় দাঁড়িয়ে আছে সে, একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তের সামনে। একদিকে ভালোবাসা প্রকাশ, অন্যদিকে নিঃশব্দ বিদায়। আকাশের ভেসে চলা মেঘের মতোই তার হৃদয় দ্বিধার বোঝা নিয়ে দোল খাচ্ছে।

এবার আর দ্বিধার অবকাশ নেই। হৃদয়ের গোপন দরজায় বহুদিন ধরে যে ঝড় বন্দি ছিল, তাকে মুক্তি দিতেই হবে। এক বছরের নীরব অপেক্ষা, গোপন দৃষ্টি, অজানা ভয়, সবকিছুর অবসান চাই। তরুণীকে নিজের ঘরের সম্রাজ্ঞী বানানো আর কেবল প্রয়োজন নয়, এ যেন জীবন-অস্তিত্বের অপরিহার্য শপথ।

দিনের পর দিন তার মুখখানি না দেখলে সময় থেমে যেত। ক্যাম্পাসের ভিড়ের মাঝেও যদি এক ঝলক তাকে না দেখা যেত, তবে দিনটা নিস্তব্ধ অন্ধকারে ঢেকে যেত। অলস দুপুরের সূর্যালোকও তার অনুপস্থিতিতে নিভে আসত, যেন পৃথিবী নিজেই আড়ালে চলে গেছে।

ওর উপস্থিতি না পেলে রাতগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত। চারদিকের আলো নিভে যেত, বুকের ভেতর শ্বাসকণার ভারে দম বন্ধ হয়ে আসত। চোখের আয়নায় যদি সে ভেসে না ওঠে, তবে জীবন স্থবির হয়ে পড়ত, ঘড়ির কাঁটাও যেন নিস্তব্ধ নিদ্রায় মগ্ন হত।

ভালোবাসার সেই অমোঘ আকর্ষণ, যে টান মহাকর্ষের থেকেও দৃঢ়, তাকে আর শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা অসম্ভব। এ টান ভেঙে দিতে পারে দূরত্ব, অতিক্রম করতে পারে ভয়, এমনকি রুখে দিতে পারে সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতও।

সেই মুহূর্ত এসে গেছে। অনুভূতিদের প্রকাশ করতে হবে। দু’হৃদয়ের মিলনের মহোৎসবেই জাগবে নতুন অধ্যায়।

প্রেম হবে অমৃত, প্রেম হবে অরুণোদয়ের প্রথম আলো।

চোখে চোখ রাখলেই লেখা হবে অমর ভালোবাসার মহাকাব্য, যেন এক অবিনাশী গল্প, যা সময়ের বুকেও চিরকাল ধ্বনিত হবে।

.

.

.

যুবকটি তখন বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আড্ডায় ব্যস্ত। চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, মৃদু কোলাহল, ক্যাম্পাসের বিকেলের নিরুদ্বেগ পরিবেশ। হঠাৎই অপর দিক থেকে তানভীর ছুটে এলো, আর ঠিক সেই মুহূর্তে সামনের করিডর দিয়ে এগিয়ে আসছিল এক তরুণী।

অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় মেয়েটি পড়ে গিয়েছিল। ওড়না বাতাসে দুলে উঠল, হাত থেকে বই ছিটকে পড়ল মাটিতে। বিনয়ের সাথে দ্রুত একটুখানি হাসি নিয়ে সে বলল—

-"সরি।"

কণ্ঠস্বরটা যেনো নিস্তব্ধ বিকেলে বেলফুলের মতো নরম। অথচ আসল দোষ ছিল তানভীরের, তবুও দায় নিজের কাঁধেই নিল সে। তারপর তাড়াহুড়ো করে সরে গেল।

যুবকের দৃষ্টি কিন্তু আটকে রইল সেখানেই। অপলক চোখে সে তাকিয়ে রইল তরুণীর প্রস্থানের দিকে। যেন সময় হঠাৎ থমকে গেছে, চারপাশের কোলাহল মিলিয়ে গেছে অদৃশ্য কোনো স্রোতে। তার বন্ধুরা কিছু একটা বলছে, হাসছে, কিন্তু সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।

শুধু সেই মুখখানি তার হৃদয়ের আয়নায় ভেসে রইল।

ঠিক তখনই তানভীরের কণ্ঠে ভেসে এলো জরুরি সুর—

-"রুদ্রর একটা ব্যবস্থা করতে হবে, ওরহান। ও বেশি বাড়াবাড়ি করছে।"

কথাগুলো হঠাৎই তাকে টেনে আনল বাস্তবে। যেনো স্বপ্ন থেকে চমকে জেগে উঠল। এক মুহূর্ত থেমে সে উত্তর দিল—

-"চল, দেখি ওকে।"

কণ্ঠে দৃঢ়তা, তবে চোখে তখনো লেগে আছে সেই তরুণীর ছায়া।

মাঠের এক প্রান্তে জড়ো হল তানভীর, ওরহান, সিয়াম, রিয়া, নিশাত, সবাই। ধীরে ধীরে তারা এগিয়ে গেল রুদ্রের গ্রুপের দিকে, যারা আড্ডা দিচ্ছিল। এক নজরে দেখা মাত্রই ওরহান রুদ্ধশ্বাস হয়ে সামনে ছুটল।

রুদ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরহান এলোপাথাড়ি আঘাত করতে শুরু করল। ঝকঝকে গ্রীষ্মের বিকেলের আলোয় উড়ে যাচ্ছিল ধুলো। রুদ্র হোঁচট খেয়ে পড়ল, তারপরও প্রতিহিংসার তাগিদে আঘাত ফিরিয়ে দিল।

দুজনেই রক্তাক্ত, কণ্ঠস্বর মিশে গেল মাঠের হাওয়ায়, সঙ্গী বন্ধুরা ছুটে এসে দু’পক্ষকে আলাদা করতে লাগল। তবু ওরহানের চোখের অগ্নি ম্লান হল না। সে চেঁচিয়ে উঠল—

-"তোর সাহস কি করে হয় তানভীরের গায়ে হাত তোলার?"

রুদ্র কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে চেঁচিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাল—

-"তোর বন্ধু কিভাবে আমাকে অপমান করে? আমি আমার পছন্দের নারীকে সামলাতে পারি না, কিসব কথা এইগুলো?"

ওরহান দাঁত ঘষে চেঁচিয়ে ওঠল—

-"পারিসই তো না। কেন লিজা আমার পিছে ঘুরে? ওকে হাজার বার বারণ করা সত্ত্বেও, আমার আগে পিছে কেনো ঘুরে?"

-"কারণ তুই বাধ্য করিস। আমার সঙ্গে সূত্রুতা থেকে তুই ওকে টার্গেট করেছিস।"

ওরহান কণ্ঠ কাঁপলো না, ঠাণ্ডা চোখে উত্তর দিল—

-"তোর মতন ছোটলোক নই আমি। এমন নিচু কাজ আমি করি না। আমার আর তোর মধ্যে যা কিছু, সেটা আমাদের মধ্যে। এ জন্য আমি কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে টানি না। সেটা তোর স্বভাব।"

হঠাৎ রুদ্রের চিৎকার করে উঠল—

-"ওরহান!"

ওরহান দ্বিগুণ চেঁচিয়ে বলল—

-"একদম চেচাবি না। আমার ও আমার বন্ধুদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবি। নইলে এর পরিণাম খারাপ হবে। আর তোর নির্লজ্জ লিজাকে বলে দিস, আর কোনো দিন আমার আমার আশেপাশে যেন না আসে। নেক্সট টাইম দেখলে আমি ওকে জানে মেরে ফেলবো।"

তানভীর আর সিয়াম দ্রুত ওরহানকে ধরে মেডিকেল রুমে নিয়ে আসে। মাথায় হাতের চোট, শরীরে লাল দাগ, রক্ত আর ঘাম মিশ্রিত। রিয়া, নিশাত, তানভীর আর সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। নার্স দ্রুত ওরহানের ট্রিটমেন্টে ব্যস্ত।

ঠিক সেই সময়, হঠাৎ করেই লিজা কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে মেডিকেল রুমে প্রবেশ করল। চোখে আতঙ্ক, হাতগুলো কেঁপে উঠছে, দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওরহানকে জড়িয়ে ধরে। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে সে চেঁচিয়ে বলল—

-"কে করেছে তোমার এই অবস্থা জান?"

ওরহান হঠাৎ এক ঝটকায় লিজাকে ধাক্কা দিল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে, চোখে বিস্ময় আর আতঙ্কের ছাপ। ওরহানের চিৎকার ধ্বনিতে মেডিকেল রুমের শান্তি যেন কাঁপল—

-"বেঈশা মেয়ে মানুষ! তোর মতো নির্লজ্জ, চরিত্রহীন মেয়ে আমি দুটো দেখিনি। তোকে কতবার বলেছি আমার সামনে আসবি না! আমার ব্যক্তিগত মানুষ আছে। কখনো আমাকে স্পর্শ করবি না। নেক্সট টাইম আমার সামনে আসলে, একদম জানে মেরে ফেলব তোকে!"

বলেই ওরহান হন হন করে হেঁটে বেরিয়ে গেল, তার পায়ের ধাক্কা মাটিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রক্তের লাল দাগ আর ক্রোধের উষ্ণতা মিলেমিশে রুমের বায়ু ভারী হয়ে গেছে।

রিয়া ও নিশাত দ্রুত লিজার কাছে এগিয়ে বসল। লিজার চোখে বিস্ময়, লালচে চোখে অশ্রুর আভা। রিয়া কণ্ঠে চরম বিরক্ত নিয়ে বলল—

-"নিজের ভালো চাস তো, শুধরে যা। বেহায়া মেয়ে মানুষ। মেয়ে মানুষের কলঙ্ক তুই।"

নিশাত মাথা নাড়ল, নিঃশব্দে সমর্থন জানাল। লিজা হকচকিয়ে থাকল, বুকের ভেতর এক অচেনা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল। শব্দহীন ধাক্কার মতো এই মুহূর্ত তাকে না শুধু ব্যথিত করেছে, বরং ভয়, লজ্জা আর হতাশার এক অদ্ভুত মিলনে আবদ্ধ করে রেখেছে।

মেডিকেল রুমের দেয়ালগুলো যেনো এই ক্রোধ, ধিক্কার আর আবেগের সব বোঝা মিশ্রিত করে রাখল।

.

.

.

ওরহান এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। শরীরের ভেতরটা দুর্বল, কিন্তু মন তার একরোখা, অবাধ্য। সুরাইয়া বেগম শত চেষ্টা করেও তাকে আটকাতে পারলেন না। মায়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সে আবারও বেরিয়ে পড়েছে।

ভার্সিটির প্রবেশদ্বারের সামনে বাইকের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরহান। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট, ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে আকাশে মিশে যাচ্ছে। দৃষ্টি তার একমুখী, শুধুই সেই প্রবেশদ্বারের দিকে। প্রতিদিনের মতো আজও অপেক্ষা করছে সোহাকে দেখার জন্য।

প্রতিদিনের মতন নিয়মিত দৃশ্য, কিন্তু আজ যেন বাতাসের গায়ে অদ্ভুত এক ভিন্নতা। ভার্সিটির ফটকে দেখা দিল সোহা, তবে একা নয়, তার পাশে একজন বয়স্ক পুরুষ। সেই মানুষটিকে ওরহান চেনে। কয়েকদিন আগে বিনা অপরাধে যিনি তাকে অপমান করেছিল, গায়ে হাত তুলেছিল, সেই তিনিই আজ সোহাকে সঙ্গ দিয়ে এসেছে।

এক মুহূর্তে ওরহানের চোখে রক্ত চড়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ আর অপমানের দহন আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল তার সমগ্র অস্তিত্বে। রাগে তার শিরা-উপশিরা টানটান হয়ে উঠল।

সে আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। ছুটে গিয়ে সোহাকে প্রশ্ন করল সেই বয়স্ক লোকের পরিচয় নিয়ে। উত্তর পেতে এক নিঃশ্বাসে যেন পৃথিবী থমকে গেল,

লোকটি আর কেউ নয়, সোহার বাবা।

এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নামল ওরহানের ভেতরে। রাগে ও হতাশায় হাতের সিগারেটটা মুঠোয় চেপে নিভিয়ে ফেলল, যেন আগুন নয়, নিজের অন্তরের জ্বালা নিভিয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। চোখে-মুখে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা অভিমান আর দহন লুকিয়ে সে ফিরে গেল।

ফটকের সামনে তখন কেবল ছড়িয়ে রইল সিগারেটের ভস্ম আর একরাশ দমিত দীর্ঘশ্বাস।

সেদিনের ঘটনার পর থেকে ওরহান যেন এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি হয়ে গেছে। প্রতিটি মুহূর্তে তাকে গ্রাস করছে তীব্র দ্বন্দ্ব। একদিকে নিজের অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার অগ্নিদাহ, যা তার পুরুষ অহংকারকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করছে, অন্যদিকে সোহা, তার ভালোবাসার মানুষ, যার প্রতি অনুভূতি তাকে বারবার নরম করে ফেলছে। এই দুই স্রোতের টানাপোড়েনে ওরহান নিজের ভেতরে ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন। সে কিছুতেই মানতে পারছে না ওই লোকের মেয়ে সোহা।

তার চোখে মুখে সবসময় এক ধরনের অস্থিরতা ছায়া ফেলে। কথায়-কর্মে বেড়িয়ে আসে খিটখিটে রাগ, যেন সামান্য কিছুতেই দাউ দাউ করে ওঠে ভেতরের আগুন। মনের শান্তি কোথাও নেই, যেন প্রতিটি দিন এক যন্ত্রণার প্রহর গুনে যাচ্ছে।

এক মাস কেটে গেছে, পুরো তিরিশটি দীর্ঘ রাত ও সকাল। তবু একবারও সোহারের মুখ দেখা হয়নি ওরহানের। অনুপস্থিতির এই শূন্যতা তাকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে। অপেক্ষা, অভিমান আর অস্থিরতার দহন তাকে প্রতিনিয়ত আরো অশান্ত করে তুলছে। মনে হয়, বুকে জমে থাকা আগুন যেন কোনোদিনও নিভবে না।

তানভীর আর সিয়াম কিছুতেই বুঝতে পারছিল না ওরহানের এই হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ। তাদের দুজনের চোখেই স্পষ্ট হচ্ছিল, বন্ধুটি যেন দিন দিন ভেতর থেকে গলে যাচ্ছে, মেজাজ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আজ তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছে ওরহানের বাড়িতে, সব সত্য জানার জন্য।

প্রথমে ওরহান কিছুতেই মুখ খুলতে চাইছিল না। মুখে অনিচ্ছা, চোখে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া, কথায় কেবল অস্পষ্টতা। কিন্তু তানভীর আর সিয়ামের অবিরাম প্রশ্ন, তাদের একরোখা জেদ শেষে তাকে ভেঙে দিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সব কথা খুলে বলল ওরহান, অপমান, সোহা, আর সেই বয়স্ক মানুষের চড় থাপ্পড়ের গল্প।

ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন এক ধরনের ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাতাস যেন জমে গেল স্থির হয়ে। তিনজনের মাঝেই নীরবতার পর্দা টানল, কেবল বুকের ভেতর ধকধক শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।

অবশেষে সিয়াম নীরবতা ভেঙে বলল—

-"তুই এক কাজ করতে পারিস। আগে সোহার সাথে সম্পর্কটা পাকাপোক্ত কর। তারপর সময় এলে ওর বাবাকে অপমান করিস, তোর প্রতিশোধও নেওয়া হবে।"

কথাটা শুনেই তানভীর তীব্র কণ্ঠে ধমকে উঠল—

-"কি আজেবাজে বলছিস সিয়াম! এইসব হয় নাকি?"

সিয়ামের চোখ লালচে হয়ে উঠল, রাগে গলা কেঁপে উঠল—

-"কেন হবে না? ওরহানকে বিনা দোষে কেন অপমান সহ্য করতে হবে? কেনই বা একটা থাপ্পড় খেয়ে চুপ করে থাকতে হবে?"

তানভীর গভীরভাবে তাকাল ওরহানের দিকে। মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি শান্ত, কিন্তু ভেতরে গভীর কঠোরতা। ধীরে ধীরে সে বলল—

-"শোন, তোর সাথে যা হয়েছে, সেটা যে অপমানজনক আমি মানি। কিন্তু ভুলে যাস না, তুই সোহাকে ভালোবেসেছিলি সবকিছু জানার অনেক আগেই। এখন যদি তাকে প্রতিশোধের সিঁড়ি বানাস, তাহলে তুই কেবল তাকে হারাবি। আমার মতে, প্রতিশোধের আগুন ত্যাগ করে তোর ভাবা উচিৎ শুধু সোহাকে নিয়ে। ওকে পাওয়া ছাড়া তোকে অন্য কিছু শান্তি দিতে পারবে না।"

তানভীরের কথা শুনে ওরহান দীর্ঘক্ষণ চুপ রইল। চোখের গভীরে যেন অসংখ্য ঝড় বয়ে গেল। কথা বুঝল সে, হৃদয়ও মানল।

ওরহান নিজের মুঠো শক্ত করে ফিসফিস করে বলল—

-"তুই ঠিকই বলছিস তানভীর।আমি অপমান হজম করার মানুষ নই। আমি সোহাকে চাই, যদি তাকে না পাই... তবে এই দুনিয়া জ্বালিয়ে ছাই করে দেব। প্রতিশোধ, হয়তো কোনোদিন নেব না। কিন্তু যদি সোহা আমার হাতে তুলে না দেয় তখন বিষয়টা অন্যরকম হয়ে যাবে। সোহাকে পেলে আর কিছুই চাই না আমি। আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না ওই লোকের মেয়ে আমার নীলশ্যামা। কিন্তু ও যার মেয়েই হোক, ওকে আমার চাই।"

ওরহানের চোখে তখন এমন এক দীপ্তি জ্বলজ্বল করছিল, যেন ভালোবাসা আর ধ্বংসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে, আর এই দুইয়ের মাঝে সে ভালোবাসা বেছে নিয়েছে।

Story Cover