ফজরের আযান ধ্বনিত হলো আকাশের বুকে, শান্ত অথচ কাঁপন জাগানো সুরে। সেই সুরে সুরাইয়া বেগম, নিলুফার বেগম, সাবা, শিফা আর মিরহা সবাই সেজদায় অবনত, অশ্রু ভেজা কণ্ঠে কান্না মিশে যাচ্ছে প্রার্থনার তীব্র আকুতিতে। তাদের হৃদয় কেবল এক আর্তি জানে, ওরহান ও সোহার সুস্থতা।
পুরুষরা মসজিদে গিয়েছে। আর ওরহানের কাকা-কাকিকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের গুমোট পরিবেশে এত ভিড় অযথা, তাছাড়া সবার খাবারের ব্যবস্থাও তো ভাবতে হয়।
স্নেহা ও তানভীর রাতভর থেকেছে, কিন্তু ছোট্ট শিশুর টান তাদের ভোরে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করেছে।
করিডোরের নিস্তব্ধতায় ভেসে আসছে যন্ত্রের টিকটিক শব্দ, জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ আর ভোরের বাতাসের আর্দ্রতা। জানালার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে সূর্যের কিরণ, ক্লান্ত শীতল দেয়ালগুলোতে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ছে, তারপর নিঃশব্দে গলে ঢুকে যাচ্ছে আইসিইউর অন্তরালে।
ঠিক সেই সময়ে অলৌকিক এক নড়াচড়া, সোহার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। আযানের সুর যেন তার অচেতন দেহে প্রাণের পরশ ছুঁয়ে দিল। আঙুলের হালকা কম্পন দেখে নার্স দ্রুত ছুটে গিয়ে ডাক্তারকে খবর দিল।
ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে এলো সোহার। ঘন অন্ধকার ভেদ করে সে চোখ মেলল। প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর ক্রমে পরিষ্কার হলো, সে হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে আছে। নিস্তব্ধ দেয়াল, স্যালাইনের টুপটাপ ফোঁটা আর আশেপাশের চাপা উৎকণ্ঠা তার অস্তিত্ব জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু পরক্ষণেই চোখ ঘুরাতেই হৃদয় বিদীর্ণ হলো।
ওরহান, নিথর শুয়ে আছে। মাথাজুড়ে সাদা ব্যান্ডেজ, নিস্তেজ মুখমণ্ডল, বুকের ওঠানামা পর্যন্ত যেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। সোহা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে জল গড়িয়ে নামল। মনে হলো পুরো আকাশ ভেঙে তার বুকের ভেতরে ধসে পড়েছে।
সোহাকে অবশেষে নরমাল কেবিনে শিফ্ট করা হয়েছে। আর কোনো জটিলতা নেই, শুধু সময়মতো ওষুধ খেলেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে সে। কিন্তু ওরহানের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। যে কোনো সময় যা কিছু ঘটে যেতে পারে, কেউই তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
সবার মনটা অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে। এতক্ষণ সবাই সোহার কেবিনেই ছিল। তানভীর ও স্নেহা আসায় একে একে সবাই বেরিয়ে আসে। স্নেহা ও তানভীরের হাতে বেশি সময় নেই। বিদেশে ফিরে যেতে হবে। যা বলার আজই বলতে হবে সোহাকে।
সবাই দাঁড়িয়ে আছে ওরহানের আইসিইউর বাইরে। কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে ভিতরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। নিথর শুয়ে থাকা ওরহানের মুখটা ফ্যাকাশে, প্রাণহীন। তার নিঃশ্বাস যেন মাপা, যেন প্রতিটি শ্বাসের সাথে মৃত্যু আর জীবনের লড়াই চলছে।
সেই দৃশ্য দেখে সুরাইয়া বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। ওমর খান ধীরে স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে পাশে দাঁড়ালেন। চোখ তারও অশ্রুসিক্ত।
ওরহান, তার প্রথম সন্তান। বহু আকাঙ্ক্ষার ফসল। বাবারা হয়তো ভালোবাসা সহজে প্রকাশ করতে পারেন না, কিন্তু সেই ভালোবাসা যে কত গভীর, তা কেউ জানে না। ওরহানই তাকে প্রথমবার 'বাবা' ডাক শুনিয়েছিল। প্রথমবারের সেই অনুভূতি তাকে অন্য এক মানুষ বানিয়েছিল। বাকি সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা কম নয়, তবুও প্রথম সন্তানের প্রতি টানটা অন্যরকম।
কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে চোখের সামনে দেখেছে, সোহার জন্য ছেলেটা কতটা ছটফট করেছে। কতটা তড়পেছে! অথচ সে, ওমর খান, কিছুই করতে পারেনি। এক অসহায় পিতার মতো শুধু তাকিয়েই থেকেছে।
মনের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল—
-"শুনেছি, বাবারা সন্তানের হাসি ফোটাতে আকাশের চাঁদও এনে দেয়। অথচ আমি, আমি এমন এক হতভাগা পিতা! নিজের সন্তানকে তিলে তিলে ক্ষয় হতে দেখেও তার যন্ত্রণা কমাতে পারিনি। পারিনি তাকে সোহাকে এনে দিতে, যাকে পাওয়ার জন্য সে প্রতিদিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করেছে..."
আইসিইউর কাঁচের ওপারে শুয়ে থাকা ওরহানকে দেখে সবার বুক হাহাকার করে উঠল। বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে এল। চারদিকে নীরবতা, শুধু সুরাইয়া বেগমের কান্নার আওয়াজ আর বুকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে।
.
.
.
শিফা খান বাড়ি থেকে বের হয়েছে হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ আগেই ওসমান তাকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল, বেশিক্ষণ হাসপাতালে থাকলে শরীর ভেঙে যাবে, অসুস্থ হয়ে পড়বে বলে। তাই ফ্রেশ হয়ে আবারও রওনা হয়েছে সে।
বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে শিফা। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এলেই রওনা দেবে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তীব্র এসে দাঁড়ালো তার সামনে।
শিফা প্রথমে অবাক হলেও চোখ তুলে তাকিয়ে শুধু এক ঝলক দেখল। মুহূর্তের মধ্যেই মুখ ফিরিয়ে নিলো অন্যদিকে।
তীব্রের গলায় ছিল এক ধরনের করুণ আকুতি, যেন বুকের ভেতরের সবটুকু যন্ত্রণা শব্দে মিশে গেছে। সে ধীরে বলল—
-"ঘৃণা করবে না বলেছিলে... সারাজীবন ভালোবাসা থাকবে, সেটাও বলেছিলে।"
শিফা আবার ঘুরে তাকালো তার দিকে। চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা, ঠোঁটে হালকা ব্যঙ্গের হাসি। নিঃশব্দে বাতাস কেঁপে উঠলো যেন তার কণ্ঠে। সে বলল—
-"পাপ জানার পর থাকবো কি থাকবো না, তখন সেটা ঠিক করব... এটাও তো বলেছিলাম।"
এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো। চারপাশের পরিবেশ যেন হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাসের মধ্যে ঝুলে রইল তাদের কথোপকথনের ভার।
তীব্রের মুখে অসহায়তা স্পষ্ট হলো। তার চোখে আকাঙ্ক্ষা, অনুতাপ, আর অদম্য ভালোবাসার মিশ্র ঝড়। কণ্ঠ ভেঙে এলেও সে আবারও বলল, অদম্য আকুতিতে—
-"আমার আদরের ছোটবোন... যার জন্য আজ সে আর স্বাভাবিকভাবে চলতে ফিরতে পারে না, তাকে আমি কি এভাবে ছেড়ে দিতে পারি? বলো, তোমার ভাইয়া যদি এমন করত, তুমি কি মানতে পারতে?"
হঠাৎই নিস্তব্ধতার বুক চিরে শিফা আরেকটি প্রশ্ন করলো—
-"আপনার বোন কি আপনাকে বলেছিল প্রতিশোধ নিতে?"
তীব্রর চোখের গভীরতা জলে ভরে উঠল, আর কণ্ঠে দুঃখের ভার—
-"হ্যাঁ। সে আকুল মিনতিতে, কান্নার ভাঙনে আমাকে বলেছিল, তার এই অপমান, তার এই ভাঙা শরীরের জন্য যে দায়ী, তাকে যেন শাস্তি দেওয়া হয়। যেন তার কষ্টের প্রতিদান পৃথিবী দেখে।"
শিফার ঠোঁটে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের শীতল হাসি। চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎই জমে গেল। সে দৃঢ় অথচ বিদ্রূপমিশ্রিত কণ্ঠে বলল—
-"আমি কখনোই এটা বলতাম না। কারণ আমি কখনোই আত্মহত্যা করার চেষ্টা করতাম না। একটা প্রতিযোগিতা হেরে গেলে কেউ আত্মহত্যা করে না। জীবনে হার-জিত থাকেই। আর সব চেয়ে বড় কথা, সেদিন যদি সত্যিই কোনো অন্যায় হতো তাহলে পুলিশের সাহায্য নিতেন। কিন্তু তা করেননি আপনারা।
আচ্ছা, এত বড় একটা প্রতিযোগিতা, সেখানে সোহার মতো একজন অসহায় মেয়ে, যার না ছিল টাকা, না ছিল কোনো ক্ষমতা, সে কীভাবে আপনার মতো ক্ষমতাবান লোকের বোনের পোশাক পরিবর্তন করল? একবারও কি এই প্রশ্ন আসেনি আপনার মাথায়? নাকি বোনের ভালোবাসায় এতটাই অন্ধ ছিলেন যে বিবেক, বোধ-বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছিল?"
কথাগুলো যেন বজ্রাঘাতের মতো নেমে এলো। তীব্র বিস্ফোরিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—
-"শিফা!!!"
কিন্তু শিফার চোখে কোনো ভয় নেই, কণ্ঠে কোনো কম্পন নেই। বরং আগুনের মতো গর্জে উঠল তার উত্তর—
-"চেঁচাবেন না, মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী। আপনারা দুই ভাই মিলে একটি মেয়েকে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। মাথায় রাখবেন, আপনারাই অপরাধী। আর কখনও আমার সামনে ভালোবাসার দাবি নিয়ে আসবেন না। ভালো আপনাকে সারাজীবন বাসবো, তবে আপনার মতো ব্যক্তিত্বহীন, মেরুদণ্ডহীন পুরুষকে আমি জীবনসঙ্গী হিসেবে চাই না।"
এই বলে শিফা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসল, আর এক ঝটকায় চলে গেল দূর অজানার দিকে।
তীব্র স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল, অসহায় দৃষ্টিতে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে। চোখে তীব্র যন্ত্রণা, ঠোঁটে একান্ত বিড়বিড়ানি—
-"ভালবাসতে চাইনি তোমায়... তুমি বাধ্য করেছ ভালবাসতে। কিন্তু এইভাবে ছেড়ে যেতে দেবো না তোমায়... কখনোই না।"
.
.
.
সোহা নিজের কেবিনে শুয়ে আছে। নিস্তব্ধ কেবিনের ছায়াঘেরা পরিবেশে তার নিঃশ্বাসগুলো যেন ভারী হয়ে উঠেছে। মাথার ভেতর অগণিত চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, জীবন তাকে বারবার কত অমানবিক পরীক্ষার সম্মুখের দাঁড় করিয়েছে। কত স্বপ্নই না ছিল তার নিজের জীবন নিয়ে, কত রঙিন পরিকল্পনা। অথচ এখন সবই শূন্য, সবই বৃথা। চাওয়া-পাওয়ার কোনো অর্থ যেন আর অবশিষ্ট নেই তার কাছে।
একজনকে জীবন দিয়ে ভালোবেসেও তাকে পেলো না। হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে সেই এক যন্ত্রণার তীর, একটি প্রশ্ন, ভালোবাসার আড়ালে কি কেবল প্রতিশোধ ছিল নাকি শুধু ভালবাসা ছিল? তার বাবার প্রতি শত্রুতার প্রতিদান নিতে গিয়েই তার সঙ্গে অভিনয় করা হয়েছিল ভালোবাসার। এই একটি প্রশ্ন বারবার মাথার ভেতর ঝড় তুলছে। বারবার তাকে ভেঙে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজা খুলে নিঃশব্দে ভেতরে এলেন ওমর খান। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সোহার পাশে বসলেন।
তারপর সোহার মাথার ওপর আলতো করে হাত রাখলেন। চমকে উঠে সোহা তাকালো পাশে। চোখে ভেসে উঠল ওমর খানের গম্ভীর বিষণ্ন মুখ।
সোহাকে দেখেই তিনি হালকা হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেই হাসি যেন আরও বেশি ব্যথার আভা ছড়িয়ে দিল। সোহা কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে বসে রইল। চারপাশে এক অদ্ভুত চাপা নীরবতা নেমে এলো।
কেবিনের বাতাসে শোনা যাচ্ছে কেবল যন্ত্রণা আর অশ্রুর গোপন গুঞ্জন।
কেবিনের নিস্তব্ধতায় হঠাৎই ওমর খানের কণ্ঠ ভেসে উঠল। কণ্ঠটা ভারী, যেন বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসছে অগণিত অপ্রকাশিত ভালোবাসা—
-"ওরহান আমার প্রথম সন্তান। তাকে ঘিরে আমার কত না স্বপ্ন ছিল। মানুষ বলে, বাবা-মা সব সন্তানকে সমান ভালোবাসে। কিন্তু মনের গোপনে সত্যিটা ভিন্ন। প্রথম সন্তান, সে এক অন্যরকম আসন দখল করে নেয় হৃদয়ের ভেতর। প্রথম বাবা হওয়ার যে অপূর্ব অনুভূতি, সেটি তো কেবল ওরহান-ই আমাকে উপহার দিয়েছিল।
স্মরণ হয়, প্রথমবার যখন 'বাবা' বলে ডাকল, মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব সুখ একসাথে আমার বুকে নেমে এসেছে। তার ছোট ছোট হাতের স্পর্শে আমি খুঁজে পেতাম আকাশের শান্তি, তার আদো-আদো কথাগুলোতে খুঁজে নিতাম জীবনের অর্থ। তার কোমল ঠোঁটের ছোট্ট ছোট্ট চুমুতে আমি যেন পুরো জগৎকে পেয়ে যেতাম।
ওরহানের সাথে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল প্রথম, অনন্য আর অমূল্য। তার হাসি ছিল আমার দিনের সূর্যোদয়, তার কান্না ছিল আমার হৃদয়ের তোলপাড়। হয়তো কখনো প্রকাশ করতে পারিনি, হয়তো তার সামনে কখনো বলে উঠতে পারিনি কতটা ভালোবাসি তাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি দোয়ায় কেবল তার মঙ্গল চেয়েছি।
সে আমার রক্তের প্রথম স্রোত, আমার হৃদয়ের প্রথম ধ্বনি, আমার জীবনের প্রথম পূর্ণতা। আমি আজও তার দিকে তাকালে সেই ছোট্ট ছেলেটিকেই দেখি, যে বাবার হাত আঁকড়ে ধরে হাঁটতে শিখেছিল।
হ্যাঁ, সে ভুল করেছে। অপরাধও করেছে। কিন্তু তার ভুলের জন্য আমি আজ হাত জোড় করে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। আমার ছেলেকে দোষারোপ করার আগে মনে রেখো, তার ভালোবাসা, অন্তত তোমার প্রতি তার ভালোবাসা, কোনোদিন ভেজাল ছিল না।"
শব্দগুলো যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এলো সোহার বুকের ওপর। নিঃশ্বাস আটকে গেল তার। চারপাশের পরিবেশ থমকে দাঁড়ালো।
সোহা হঠাৎই চমকে উঠল, অশ্রুতে ভিজে উঠল তার চোখ। দূরত্ব ভুলে সে দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল ওমর খানের হাত, যেন এই মুহূর্তেই সেই অদৃশ্য বন্ধনটুকু আবার খুঁজে পেতে চায়।
-"কি করছেন আংকেল, আপনি এইসব? আমি তো আপনার মেয়ের সমবয়সী! আমাকে এভাবে লজ্জিত করবেন না।"
সোহা থেমে গেল, বুকের ভেতর কেমন অজানা কাঁপন জাগল।
ওমর খান আর নিজের ভেতরের বাঁধন ধরে রাখতে পারলেন না। চোখ থেকে ধারা বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। কণ্ঠ ভেঙে গিয়ে ফুপিয়ে উঠলেন তিনি—
-"আমার ছেলে... আমার ছেলেটা কত বছর ধরে মৃত্যু যন্ত্রণার মতো কষ্ট ভোগ করছে, মা! প্রতিদিন, প্রতিটি রাত আমি তার কষ্টের শব্দ শুনেছি, অথচ কিছুই করতে পারিনি। আমি বাবা হয়েও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি... আমার সন্তান ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে, তবুও আমি অসহায়! সেই মুহূর্তগুলোতে আমি একেবারে ব্যর্থ, ভীষণ অপমানিত, ভীষণ দুঃখী, অসহায় এক বাবা!
আজ কত বছর পেরিয়ে গেল, তবুও আমার সন্তানের মুখে সেই প্রাণখোলা হাসি আমি আর খুঁজে পাই না। সেই হাসি হারিয়েছে, যেন আমার ঘরের আলো নিভে গেছে, আমার প্রাণশক্তি মুছে গেছে।"
কথাগুলো বলতে বলতে ওমর খানের বুক হাহাকার করে উঠল। কান্নার স্রোতে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। তিনি কাঁপা হাতে এগিয়ে এসে সোহার সামনে দাঁড়ালেন, কণ্ঠ ভেঙে গিয়ে প্রার্থনার সুর পেল—
-"আমি তোমার কাছে সেই হাসি ভিক্ষে চাইছি মা! সেই পুরোনো দিনের আলো ফিরিয়ে দাও। নিজের ছেলের মুখের সেই অবুঝ, নির্মল হাসিটা ফিরে পেতে আমি আজ ভিক্ষা চাইছি তোমার কাছে। দয়া করে... দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দিও না। আমি বাবা, একজন বাবার বুকের হাহাকার তুমি কি ফিরিয়ে দেবে? একজন বাবা সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চাইছে, এর চেয়ে বড় প্রার্থনা, এর চেয়ে পবিত্র ভিক্ষা কি আর কিছু হতে পারে?"
তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রতিটি শব্দে ছিল ভাঙা বুকের হাহাকার, প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে ছিল সন্তানের প্রতি অশেষ ভালোবাসার করুণ স্বাক্ষর।
সোহা নিথর বসে রইল। মনে হলো, এ দৃশ্য কোনো কল্পনা নয়, এ যেন জীবন্ত এক চিত্রকাব্য। সামনে দাঁড়ানো মানুষটা বাবার আসল রূপ দেখিয়ে দিল, যেখানে অহংকার নেই, নেই মর্যাদার দেয়াল, আছে শুধু অশেষ ভালোবাসা আর সন্তানের মুখে একফোঁটা হাসি ফেরানোর জন্য হাহাকার।
সোহা স্থবির হয়ে রইল। চোখের সামনে যেন এক অদৃশ্য দৃশ্য ভেসে উঠল, একজন অসহায় বাবা, যে নিজের সন্তানের জন্য পৃথিবীর কাছে হাত পাতছে, সম্মান ভুলে ভিক্ষা করছে। বাবার ভালোবাসার এমন রূপ সে কোনোদিন দেখেনি।
তার মনে পড়ে গেল, তার নিজের বাবা! যিনি একদিন মানুষের কথায় ভেসে গিয়ে তাকে নির্দ্বিধায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। কেমন অদ্ভুত বৈপরীত্য! একজন বাবা সন্তানের জন্য পৃথিবীর কাছে মাথা নত করছে, আরেকজন বাবা সন্তানের জন্য সামান্য বিশ্বাসটুকুও রাখতে পারেনি।
সোহা কিছু বলতে পারল না। বুকের ভেতর হাহাকার জমে উঠল, এমন বাবাও হয়, যে সন্তানের হাসির জন্য নিজের সব অহংকার মুছে ফেলতে রাজি হয়ে যায়।
.
.
.
ওরহানের ধীরে ধীরে হুঁশ ফিরল। চোখ মেলতেই সে বুঝল, সে শুয়ে আছে হাসপাতালের সাদা বিছানায়। চারপাশে জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ, যন্ত্রপাতির ঠান্ডা শব্দ, আর মাথার ওপরে ঝুলে থাকা আলো যেন তার চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে।
সে চেষ্টা করল উঠে বসতে, কিন্তু পারল না। বুকের ভেতর কেমন আতঙ্ক জমে উঠল। শরীরের একটা বড় অংশ যেন তার নিজের নয়। শুধু মাথা ও দুই হাত সামান্য নড়ছে, বাকিটা অসাড়, পাথরের মতো ভারী। ঠোঁট কেঁপে উঠল, কিন্তু গলাটা শুকনো।
ঠিক সেই সময় ডাক্তাররা তার চারপাশে ব্যস্ত, নাড়ির স্পন্দন মেপে চলেছেন, নোট নিচ্ছেন, আবার যন্ত্রপাতি যাচাই করছেন। কেবিনের বাইরে সোহা, সাবা, খান বাড়ির প্রতিটা সদস্য, ইহাব, মিরহা, নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে আছে, প্রত্যেকের মুখে উৎকণ্ঠার ছায়া।
হঠাৎই সুরাইয়া বেগম আর থাকতে পারলেন না। নারীর টান তাকে আর বাহিরে আটকে রাখতে পারল না। চোখ ভেজা, মুখ কাঁপা, তিনি প্রায় জোর করেই কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
ওরহান মায়ের চেহারা দেখেই যেন অস্থির হয়ে উঠল। অসহায় কণ্ঠে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠল—
-"মা... মা, আমি আমার শরীরের কিছুই ফিল করতে পারছি না কেনো? আমার সঙ্গে আসলে কি হয়েছে? আমি হাসপাতালে কেনো শুয়ে আছি? আমার শরীর কেনো কথা শুনছে না?"
সুরাইয়া বেগমের চোখে আতঙ্ক, বুকের ভেতর অসহায় কান্না জমে উঠছে। সন্তানকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তার বুক ফেটে গেল, একদিকে মাতৃত্বের টান, অন্যদিকে উত্তরহীন প্রশ্নের বোঝা।
ওরহানের এই এক কথায় যেন উপস্থিত সবার মাথায় বাজ পড়ে গেল। সোহা স্তব্ধ, সবাই দম বন্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন, আর সুরাইয়া বেগমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে কি সত্যিই কিছুই মনে করতে পারছে না?
ডাক্তার নিজেও বিস্ময়ে জমে গেলেন। রোগীর চোখেমুখের অজস্র প্রশ্ন, কণ্ঠের অসহায়তা, সবকিছুই তাকে থমকে দিল। কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে তিনি গভীর দৃষ্টিতে একবার ওরহানের দিকে তাকালেন, তারপর সবার দিকে ঘুরে বললেন—
-"আপনারা সবাই বাইরে অপেক্ষা করুন, দয়া করে। এখনই জরুরি কিছু পরীক্ষা করতে হবে।"
নার্সরা এগিয়ে এসে সুরাইয়া বেগমকে আস্তে করে সরে যেতে বলল। তিনি অনিচ্ছায় সন্তানের হাত ছাড়লেন, চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে। ওরহানের কণ্ঠের ভয়ার্ত প্রশ্ন যেন এখনো কানে বাজছে— "মা, আমার শরীর কিছু শুনছে না কেনো?"
কেবিনের বাইরে তখন অদ্ভুত এক নীরবতা। প্রত্যেকে পায়চারি করছে, অস্থিরভাবে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। চারপাশে শুধু উদ্বেগ আর আতঙ্কের ভারী বাতাস।
সোহা দুই হাত একত্রে চেপে ধরেছে বুকের কাছে, মনে হচ্ছে তার নিজেরই দম বন্ধ হয়ে আসছে। উপস্থিত সবাই ঠোঁট কামড়ে চোখ লুকানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু অশ্রু ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে অজান্তে।
কিছুক্ষণ পর কেবিনের দরজা খুলে গেল। ডাক্তার গম্ভীর চেহারায় বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার চাহনিতে অস্বস্তি, ঠোঁটে চাপা নিঃশ্বাস। সবার দৃষ্টি তার দিকে ছুটে গেল, ডাক্তার ধীরে ধীরে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
-"আমাদের অনুমান যদি সঠিক হয়... তবে ওরহান সম্ভবত তার শরীরের একটি বড় অংশ অনুভব করতে পারছে না। বলতে গেলে, আংশিক পক্ষাঘাতের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তবে আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, তার স্মৃতিশক্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে সাম্প্রতিক অনেক কিছুই মনে করতে পারছে না।"
ডাক্তারের প্রতিটি শব্দ যেন উপস্থিত সবার বুকের ভেতর হিমেল ধারালো ছুরির মতো বিঁধতে লাগল। মুহূর্তেই চারপাশে গা ছমছমে নীরবতা নেমে এলো, মনে হচ্ছিল, এই নীরবতার শব্দই সবচেয়ে তীব্র, সবচেয়ে ভয়ংকর।
ডাক্তার একটুখানি থেমে আবার বললেন—
-"ওনার মাথায় প্রচণ্ড গভীর আঘাত লেগেছিল। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ। সেই আঘাত পাওয়ার মাত্র দশ সেকেন্ড পরেই তিনি হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ব্রেইন স্ট্রোক করেন। এর ফলেই পুরো শরীর মুহূর্তে অবশ হয়ে যায়, যেন এক নিমিষে প্যারালাইজড হয়ে পড়েন। মাথার আঘাত মস্তিষ্কের নিউরনে প্রভাব ফেলেছে, যার কারণে স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনকার কিছুই আর তিনি মনে করতে পারছেন না... উনি যেন পাঁচ বছর আগের সময়ে ফিরে গেছেন।"
কথাগুলো বলতে বলতে ডাক্তার গম্ভীর দৃষ্টিতে চারপাশে তাকালেন। সবার মুখ নিস্তব্ধ, চোখ বিস্ফারিত।
-"ওনাকে ধীরে ধীরে সবকিছু খুলে বলতে হবে, বুঝিয়ে জানাতে হবে। কারণ, এমন অবস্থায় হঠাৎ বড় ধাক্কা দিলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ওরহান ব্যতিক্রম। মানসিকভাবে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী একজন মানুষ। তার থেকে সব গোপন করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। একজন বিচক্ষণ মানুষকে অন্ধকারে রাখা সম্ভব নয়। এতগুলো প্রশ্ন তার মাথা ঘুরছে তার উত্তর না পেলে তিনি আর অসুস্থ হয়ে পরবে। তাই সত্যিটা জানালে তেমন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা নয়। বরং ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারবেন।"
ডাক্তার হালকা শ্বাস ফেলে আরও যোগ করলেন—
-"ওনার মাথায় যে ধরনের আঘাত হয়েছে, তার ফলে ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি হতে পারে। এতে দেখা দেয় স্মৃতিভ্রংশ (Amnesia), আংশিক পক্ষাঘাত (Paralysis), কখনো বা বাকশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ আবার ব্রেইনের রক্তনালী ফেটে বা জমাট বেঁধে স্ট্রোক ডেকে আনে। এ দু’টির সম্মিলনেই ওরহানের বর্তমান অবস্থা।"
সামান্য থেমে তিনি আবার বললেন—
-"তাকে এখন ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তিনি শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। শিগগিরই ওনাকে আইসিইউ থেকে সরিয়ে সাধারণ কেবিনে নিয়ে যাওয়া হবে। বাকিটা নির্ভর করছে আপনাদের ওপর, কখন, কীভাবে, কতটুকু ওনাকে জানাবেন।"
ডাক্তারের ঠোঁট থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি শব্দ যেন মৃত্যুর কালো ছায়া ছড়িয়ে দিচ্ছিল চারপাশে। উপস্থিত সকলে নিস্তব্ধ, যেন কারও নিঃশ্বাসও শোনা যাচ্ছে না, কেবল ভয়, শঙ্কা আর এক অজানা ভবিষ্যতের ভার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ডাক্তারের বলা প্রতিটি শব্দ যেন তীরের মতো বিদ্ধ হলো উপস্থিত সবার বুকের ভেতর। নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ গুমরে উঠছিল।
হঠাৎই সোহা উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সুরাইয়া বেগমের হাত ধরে তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিল। চারপাশে সবাই চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। সোহা ঠান্ডা, অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বলল—
-"আপনি জন্ম দিয়েছেন আপনার সন্তানকে। হাত-পা না থাকলেও, আপনার কাছে তার বেঁচে থাকা-ই সবচেয়ে বড় সত্য। যতক্ষণ সে জীবিত, ততক্ষণ তার সবকিছুই আপনার জন্য অর্থপূর্ণ। আমি কি ভুল বলছি?"
সুরাইয়া বেগমের অশ্রুসিক্ত নয়ন ঝাপসা হয়ে এলো। নিঃশব্দে তিনি মাথা নাড়লেন, যেন হ্যাঁ বলতে চাইছেন, তবু সেই অশ্রু ভিজে ওঠা দৃষ্টিতেই ছিল অব্যক্ত সম্মতি।
চারপাশে নিস্তব্ধতা আরও গভীর হলো। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সোহা আর সুরাইয়ার দিকে।
ওসমান আর শিফা মায়ের পাশে গিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তাদের চোখেও ঝলমল করছিল উদ্বেগ আর কষ্টের ছায়া। অন্যদিকে সাবা এগিয়ে এসে সুরাইয়া বেগমকে বুকে জড়িয়ে নিল, যেন মায়ের ভেঙে পড়া বুকটাকে আগলে রাখছে।
সোহা এক মুহূর্ত থামল, তারপর আবারও দৃঢ় অথচ কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"সুস্থতা আল্লাহর এক অমূল্য নেয়ামত। আল্লাহর কাছে হাত তুলুন, দোয়া করুন, ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক, আপনার সন্তান জীবিত আছে। এইটাই সবচেয়ে বড় দয়া। একদিন নিশ্চয়ই সে সুস্থ হয়ে উঠবে। তাই এইভাবে কান্না করে ভেঙে পড়বেন না। আপনাদের দুর্বলতা দেখলে আপনার সন্তানও ভেঙে পড়বে। সে নিজেকে বোঝা মনে করবে। তাকে মানসিকভাবে শক্ত করার দায়িত্ব আপনাদের। তাই আগে আপনারা নিজেরা শক্ত হোন। বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না।"
সোহার প্রতিটি কথাই যেন আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিল সবার মনে। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের ভারী বাতাস কিছুটা হালকা হয়ে এলো। কান্নাভেজা চোখগুলো হাতের আঙুলে মুছে নিল সবাই। ওরহানের জন্য তাদের শক্ত থাকতে হবে, যে কোনো মূল্যে।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা ভেঙে, সুরাইয়া বেগম কাঁপা কণ্ঠে সোহাকে প্রশ্ন করলেন—
-"তুই... তুই থাকবি তো আমার ছেলের পাশে?"
সোহা এক মুহূর্তও দেরি না করে, নির্দ্বিধায় উত্তর দিল—
-"থাকবো। যেহেতু সে পাঁচ বছর আগে ফিরে গেছে, তার মানে সে আমাকে ভুলে গেছে। আমার মনে যেই শঙ্কা, যেই প্রশ্ন, যা আমাকে তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে বাধা দিয়েছিল, এবার তা যাচাইয়ের মুহূর্ত হবে। এটি হবে প্রমাণ, সত্য নাকি ভ্রান্ত, সেটাই এখন জানার বিষয়।"
-"মানে কি বলতে চাইছিস তুই?"
-"যদি ওরহান সত্যিই আমাকে ভালোবাসে, তাহলে সে আবারও আমার প্রেমে পড়বে। আর যদি সবকিছু শুধুই প্রতিশোধের অংশ হয়, তাহলে সে কখনোই আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসেনি, এবং ভবিষ্যতেও ভালোবাসবে না।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই নির্ধারিত হবে, আমি কি তার জীবনে আসব, নাকি থাকব না। বরং উল্টোও হতে পারে, সে কি আমাকে তার জীবনে চায়, নাকি চায় না।"
সোহার কথায় চারদিক যেন থমকে দাঁড়াল। উপস্থিত সকলে একে অপরের চোখে চোখ রাখল, কিন্তু কারো ভেতরে কোনো দ্বিধা রইল না। তারা সবাই ওরহানকে চেনে। পাঁচ বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে তারা ওরহানের স্বভাব, তার জেদ আর তার একরোখা মনোভাব খুব কাছ থেকে দেখেছে। তাই তাদের বিশ্বাস, ওরহান যদি পাতালের আঁধারেও হারিয়ে যায়, তবু খুঁজবে শুধু সোহাকেই।
অতএব সিদ্ধান্ত হলো, ওরহানের সামনে সোহার অস্তিত্বের পর্দা ফাঁস করা হবে না। তাকে জানানো হবে সব কিছু, কিন্তু সোহা, এই নামটি কেউ উচ্চারণ করবে না তার সামনে। এই নীরব খেলা, এই গোপন পরীক্ষা প্রকাশ করবে, ওরহানের ভালোবাসা সত্যিই খাঁটি সোনার মতো অটল, নাকি তাতে ভেজালের ছাপ রয়েছে।
সিদ্ধান্তে এক ধরনের রহস্যময় আবহ ছড়িয়ে পড়ল। যেন ঘরভর্তি বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। কারো মুখে হাসি নেই, কারো চোখে জল নেই, তবু চারদিকে অদৃশ্য এক নাটকীয় স্রোত বইছে।
আর সোহা, সে তো এই পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। এত বছরের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, মনের গভীরে জমে থাকা শঙ্কা, সব কিছু থেকে মুক্তি পাবে এই পরীক্ষার ফলাফলে। যদি সত্যিই প্রমাণিত হয় ওরহানের ভালোবাসা অম্লান ও অটুট, তবে সোহা নির্দ্বিধায় তাকে আপন করে নেবে। সমস্ত আঘাত, সমস্ত ক্ষত, সমস্ত প্রশ্ন, মিলিয়ে যাবে একাকার হয়ে।
সেই মুহূর্তে যেন সবাই নিঃশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করতে লাগল, ভালোবাসার এই খেলায় ওরহানের পরীক্ষা শুরু হোক।
.
.
.
কেটে গেছে এক মাস। দীর্ঘ যন্ত্রণা শেষে সোহা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। একরাশ স্বস্তি নিয়ে তাকে ঘিরে রেখেছে পরিবার। ওদিকে, অনেক দ্বিধা আর আলোচনার পর অবশেষে ওরহানকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তির মাঝেই হঠাৎ নেমে এলো আরেক ঝড়, মিহিরিমার মৃত্যুর সংবাদ যেন সকলকে স্তব্ধ করে দিল। শোক আর আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠল বাড়ির বাতাস।
প্রতিদিন নিয়ম করে পুলিশ আসে তদন্তের খোঁজে। প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি দৃষ্টি যেন দেয়াল জমে ওঠা অদৃশ্য ছায়ার মতো ছুটে আসে সবার উপর। ঘরে-বাইরে গুমোট চাপা উত্তেজনা, কোথাও যেন হালকা ফিসফাসে শোনা যায় শঙ্কার প্রতিধ্বনি।
তবুও এই জটিল পরিস্থিতির ভেতরে ওসমান অদ্ভুত কৌশল আর সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তায় সব সামলে নিচ্ছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে একরকম রহস্য, প্রতিটি ব্যবহারে দৃশ্যমান অটল স্থিরতা। যেন সে-ই অদৃশ্য হাতে গোটা পরিবেশটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
চৌধুরী বাড়ি—
তীব্র আর তূর্যের মধ্যে ঝামেলা যেন নিত্যদিনের ঘটনা। দু’জনের রাগ, প্রতিহিংসা আর হিংস্রতা প্রতিটি কথার আঘাতে ফেটে পড়ে। সোহার কিছুই তারা করতে পারল না, মন শান্ত হলো না। বিশেষত তূর্য, সে মানতেই পারছে না, তার বোনের প্রতিশোধ নিতে না পারার অপমান। অন্যদিকে তীব্র যেন সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এখন কেবল শিফাকে নিয়েই মেতে আছে। এটাই তূর্যের রক্ত গরম করে তুলছে।
ঘরের ভেতরে দুই ভাইয়ের তুমুল ঝগড়া চলছিল। একে অপরের দিকে বিষের মতো শব্দ ছুড়ে দিচ্ছিল তারা। তীব্রর বাবা–মা মরিয়া হয়ে সামলাতে চাইছে, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর ছেলেদের ক্রোধে হারিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছে সেই কলহ। কোণে বসে থাকা রশ্মি চুপচাপ যেন এক অদৃশ্য দর্শক, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি, চোখে নিষ্ঠুর আনন্দ। সে যেন এই পারিবারিক বিপর্যয়ের নাটক উপভোগ করছে নিঃশব্দে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ করেই ভেসে এলো কলিং বেলের ঝংকার। তীব্রর মা অস্থির পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজা খুলে সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই পরিচিত মুখ, ওসমান, সোহা। তার গম্ভীর উপস্থিতি যেন এক ঝড়ের মতো বয়ে এলো বাড়ির দোরগোড়ায়। পাশে ইহাব, আর তাদের পেছনে অগণিত গার্ডের গম্ভীর ছায়া, যেন এক অপ্রতিরোধ্য বাহিনী।
সোহা কারো দিকে না তাকিয়েই, তীব্রর মাকে পাশ কাটিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল। তার পদচারণার শব্দ ঘরের নীরবতা চিরে ছড়িয়ে পড়ল, মুহূর্তেই বাড়ির আবহ বদলে গেল। রক্তে জমে থাকা ক্রোধ, অশান্তি, আতঙ্ক, সব মিলিয়ে যেন চৌধুরী বাড়িতে নামল এক নতুন বিপর্যয়ের সূচনা।
মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যেন বাতাসও থেমে গেছে। রশ্মির চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল, সোহাকে দেখে রাগে তার হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে কাঁপতে লাগল। ঘরের পরিবেশে হিংস্র এক চাপা আগুন ছড়িয়ে পড়ল।
এদিকে ওসমান আর ইহাব তাদের বাহিনী নিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। গার্ডদের দৃঢ় পদচারণা যেন মাটিকে কাঁপিয়ে তুলল। তীব্র উত্তেজনার মাঝেই সোহা ধীর, দৃপ্ত ভঙ্গিতে সোফার দিকে এগিয়ে গেল। বসতেই মনে হলো, সে যেন এ বাড়ির শাসক, চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি দেয়াল তার উপস্থিতিতে কেঁপে উঠল।
তূর্য হঠাৎ ক্ষিপ্ত বাঘের মতো তেড়ে আসতে চাইল, কিন্তু তীব্র দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে আটকে দিল। দুই ভাইয়ের চোখে তখন রক্তমাখা ক্রোধ, অথচ সোহা স্থির, অচঞ্চল পাথরের মতো।
তীব্র দাঁত চেপে সোহাকে উদ্দেশ্য করে বলল—
-"এখানে কেন এসেছেন? কী চান আপনি?"
সোহা ধীরে মুখ তুলল। তার তীক্ষ্ণ চাহনি যেন ধারালো তলোয়ার, কারো বুক চিরে দিতে সক্ষম। ঠান্ডা অথচ দৃঢ় গলায় সে উত্তর দিল—
-"প্রতিশোধ নিতে এসেছি। যেটা আপনারা দুই ভাই নিতে গিয়েছিলেন। এখন যদি আমি নির্দোষ হয়েও আপনাদের প্রতিশোধের শিকার হই... তবে আমার সঙ্গে করা সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ আমি নেব না?"
তার কণ্ঠস্বর ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনি তুলল। মুহূর্তেই চারদিকে হিমশীতল নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কারো নিঃশ্বাস, কারো দৃষ্টি, কিছুই আর স্বাভাবিক রইল না। মনে হলো, এই এক কথাতেই চৌধুরী বাড়ির সমস্ত অন্ধকার গোপন রহস্য বেরিয়ে পড়তে যাচ্ছে।
তূর্য ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। চোখ রক্তবর্ণ, শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে চিৎকার করে উঠল—
-"এই মুখ সামলে কথা বল! ওরহান নেই এখানে যে তোকে বাঁচাবে। আমার বাড়িতে ঢুকে আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেবি তুই?"
তার কণ্ঠস্বর দেয়াল কাঁপিয়ে তুলল। কিন্তু পরমুহূর্তেই দৃশ্যটা বদলে গেল।
সোহা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে অগ্নিশিখার মতো দাহ, মুখে অটল দৃঢ়তা। হঠাৎই সে তূর্যের গালে সজোরে এক চড় মারল। সেই শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো কানে বাজল সবার।
সোহা গর্জে উঠল—
-"একটা কথা বলবি না, বেয়াদব! এতদিন তোদের সব সহ্য করেছি বলে ভেবেছিস আমি দুর্বল? ভুল করেছিস! একদমই না। তোদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য ওরহানের প্রয়োজন নেই, আমি নিজেই যথেষ্ট! এখন আমি যা বলব, চুপচাপ দেখে যাবি। একটি শব্দ বললে, হাড়গোড় ভেঙে এখানে ফেলে রেখে দেবো!"
তার কণ্ঠস্বর ছুরি-কাঁচির মতো ধারালো, ঘরের প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেল। তূর্যের বুক ওঠানামা করছে, ঠোঁট কাঁপছে কিছু বলার জন্য, কিন্তু সোহারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার কণ্ঠ আটকে দিল।
ঠিক তখনই ওসমান এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। দৃঢ় অথচ ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—
-"চুপচাপ থাকো। সব সত্য জানতে পারবে।"
ঘরের বাতাসে তখন এক অদৃশ্য ভারী ছায়া নেমে এলো। প্রতিটি হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল, সবাই অপেক্ষায় রইল, এবার প্রকাশ পাবে সেই সত্য, যা এতদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
সোহা এগিয়ে গিয়ে সরাসরি রশ্মির সামনে দাঁড়াল। তার চোখে ঝড়ের আভাস। কোনো কথা না বলে হঠাৎই এক ঝটকায় রশ্মিকে হুইলচেয়ার থেকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিল।
মুহূর্তেই চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ হিমশীতল হয়ে গেল। বিস্ময়ের অভিঘাতে সবাই স্তব্ধ, নড়তে কিংবা শ্বাস নিতে পর্যন্ত ভুলে গেল যেন। একে অপরের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল বিস্ময়ে।
তীব্রর মা ছুটে এসে মেয়েকে আঁকড়ে ধরলেন, কণ্ঠ কাঁপছিল অবিশ্বাসে—
-"তুই না হাঁটতে পারিস না! তাহলে এখন হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলে কিভাবে? বল, কেনো এইসব ছলচাতুরি করলি আমাদের সাথে?"
ঘর জুড়ে প্রশ্নের ঝড় উঠল। তীব্র, তূর্য আর তাদের বাবা অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে গেল। তারা উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে রশ্মির চারপাশ ঘিরে দাঁড়াল।
রশ্মি ঘাবড়ে গেলো। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে ভয়ের ছায়া। চঞ্চল দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘুরছে, যেন পালানোর পথ খুঁজছে। এতগুলো বছর ধরে যে সত্য গভীর অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছিল, সেটি আজ হঠাৎ দিনের আলোয় নগ্ন হয়ে পড়ল। এইভাবে তা প্রকাশ পাবে, সে কল্পনাও করেনি।
কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল তার ঠোঁটে, গলা শুকিয়ে আসছিল, আমতা আমতা করে কিছু বলতে চাইছিল। কিন্তু সোহা আর এক মুহূর্তও সহ্য করল না। বজ্রনাদী কণ্ঠে ধমক দিয়ে উঠল—
-"চুপ! একটাও কথা বলবি না।"
তারপর তীক্ষ্ণ চোখে রশ্মির দিকে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাল। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি মুখ নিস্তব্ধ, কেউ নড়ছে না। সবার উদ্দেশে সোহা স্পষ্ট কণ্ঠে বলতে শুরু করল—
-"পাঁচ বছর আগের সেই কম্পিটিশনে আমি জিতেছিলাম আমার নিজ যোগ্যতায়। কারো দয়ার দান নয়। আপনারা শুনেছেন, রশ্মির পোশাক পরিবর্তনের গল্প, সব মিথ্যে। আর রইল তার আত্মহত্যার নাটক। ওটা কোনো দুর্বল মেয়ের হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না... ছিল ওর সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। কারণ, এই হারের লজ্জা সে মেনে নিতে পারেনি। আমাকে ধ্বংস করার জন্য নিজের জীবনকেও বাজি রেখেছিল।"
সোহার কণ্ঠ কাঁপছিল না, বরং প্রতিটি শব্দ যেন ছুরি হয়ে বুকে বিঁধছিল।
-"কিন্তু ও কল্পনাও করতে পারেনি, আমি দেশ ছেড়ে চলে যাব। তাই এতগুলো বছর ধরে এই নাটক চালিয়ে যেতে হয়েছে ওকে। হুইলচেয়ার, অসহায়তার মুখোশ, সবই ছিল ভণ্ডামি। আমাকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারলেই ও নিজেকে জয়ী প্রমাণ করতে পারত। আর যদি ও আবার দাঁড়িয়ে যেতো, তাহলে তো আপনাদের প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো কারণই থাকত না।"
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ভারী বাতাসে যেন সবার নিঃশ্বাস আটকে গেছে। হঠাৎ তীব্র রাগে ফেটে পড়ল। চোখ রক্তবর্ণ, হাত কাঁপছিল ক্রোধে। সে এক লাফে এগিয়ে গিয়ে রশ্মির মুখে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল। বজ্রপাতের মতো শব্দে ঘর কেঁপে উঠল।
-"তুই আমাদের সাথে এতবছর ধরে প্রতারণা করেছিস?"
তীব্র চেঁচিয়ে উঠল, তার কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছিল অবিশ্বাস ও অপমানের তীব্রতায়।
তীব্রর প্রশ্ন যেন বজ্রাঘাতের মতো ছুটে এলো—
-"যা বলছে, সব ঠিক?"
ঘর নিস্তব্ধ। রশ্মি কোনো অজুহাত খুঁজে পেল না। মাথা নুইয়ে সম্মতির সঙ্কেত দিল। পরমুহূর্তেই তার চোখ বেয়ে টলমল অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই অশ্রুতেও ছিল না অনুতাপ, বরং তীব্র দহন। সোহার দিকে তাকিয়ে রাগে ঝলসে উঠল তার দৃষ্টি।
সে কেঁপে কেঁপে বলল—
-"এই থার্ড ক্লাস বস্তির মেয়ের কাছে আমি হারব, এটা আমি কোনোদিন মেনে নিতে পারিনি। সেটা আমার জন্য অপমান ছিল। তাই আমি ওকে শেষ করে দিতেই এই পরিকল্পনা করেছিলাম।"
কথাটা শেষ হতেই ঘরের ভেতর এক অগ্নিঝড় বয়ে গেল। আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলো না। তূর্য ক্ষেপে উঠে সজোরে এক চড় মেরে রশ্মিকে মাটিতে ফেলে দিল।
-"তোর জন্য আমরা একটা নিষ্পাপ মেয়ের ক্ষতি করেছি! তাকে ধ্বংস করার জন্য এত গুলো বছর অপেক্ষা করেছি। নিজেদের নীতি ভুলে শুধু তোকে ভালোবেসে তোর কথা বিশ্বাস করে একটি নির্দোষ মেয়ের ক্ষতি করতে চেয়েছি আমরা। এই শিক্ষা দিয়েছিলাম তোকে?"
তূর্যের কণ্ঠে ছিল ক্রোধ আর ভেঙে পড়া যন্ত্রণার মিশ্রণ।
বাবা, মা, তীব্র, মিলে চিৎকার শুরু করল। অভিশাপ, ভর্ৎসনা, অভিযোগে ভরে উঠল চারদিক। রশ্মি কুঁকড়ে মাটিতে বসে কাঁপছিল, অথচ চোখে এখনও জেদ আর বিষাক্ত আগুন জ্বলছিল।
ঠিক তখনই সোহা হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল। তার কণ্ঠ দৃঢ়, অথচ শান্ত—
-"থামুন।"
মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সবার দৃষ্টি গিয়ে থামল সোহার উপর। তার চোখে তখন অদ্ভুত জ্যোতি, যেন সত্য প্রকাশের পর সে আর কারো ক্রোধ বা বিচারকাজের প্রয়োজন অনুভব করছে না। সোহার কণ্ঠে বিষ মিশে ছিল—
-"মিথ্যে কথার জালে ফাঁসিয়ে আমাকে শেষ করতে চেয়েছিলে। আমি এতটা দয়ালু নই। তাই আমি আর কাউকে ক্ষমা করতে পারব না।"
তার নির্দেশে গার্ডরা সঙ্গে সঙ্গে রশ্মিকে ধরে ফেলল। ঘরে চাপা চিৎকার আর হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল। সোহা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল রশ্মির দিকে, তারপর তার দু’পা শক্ত করে টেনে নিল। রশ্মির মুখ থেকে আতঙ্কে চাপা গোঙানি বেরিয়ে এলো।
তীব্র উৎকণ্ঠায় এগিয়ে এলো, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল—
-"প্লিজ সোহা, কিছু করবেন না ওকে ছেড়ে দিন। যা হয়েছে, যা করার আমরাই করেছি। আমাদের শাস্তি দিন, কিন্তু ওকে কষ্ট দেবেন না।"
সোহার চোখ জ্বলজ্বল করছিল। সে তীব্রর দিকে তাকাল, ঠোঁটে ফুটে উঠল অদ্ভুত হালকা হাসি।
-"এই সত্য জানার আগে আমি যদি আপনার কাছে মিনতি করতাম, তাহলে কি আপনি আমাকে ক্ষমা করতেন? আমাকে ছেড়ে দিতেন?"
নীরবতা নেমে এলো। মাথা নিচু করে নিল চৌধুরী বাড়ির সবাই। কেউ উত্তর দিল না, কারণ উত্তর দেবার মতো মুখ নেই কারো।
সোহার হাসি তখন আরও গভীর হলো, ঠান্ডা, নির্মম। সে ধীরে ধীরে বলল—
-"যা বুনেছো, তাই কাটবে। প্রতিশোধের ধার আমি দেখাব আজ।"
সোহার কণ্ঠে আগুনের মতো দহন—
-"আমিও করব না ক্ষমা। অনেক বুঝেছি জীবনে, কিন্তু আমাকে কেউ কখনো বোঝেনি। আমি একা, আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না... সহজ-সরল বলে সবাই আমাকে মনে করেছে অবলা অসহায় নারী। যার যেমন ক্ষমতা ছিল, সেইসব নিয়ে আমার ক্ষতি করার জন্য সবাই উঠে-পড়ে লেগেছিল। আর আজ আমি কেন ক্ষমা করব? না, কখনোই না!"
তার কথার সাথে সাথে চারদিকে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল। তীব্র, তূর্য আর তাদের বাবা-মা ছটফট করতে লাগল, কিন্তু ওসমান, ইহাব আর গার্ডরা তাদের শক্ত হাতে ধরে রাখল। কারো আর নড়ার শক্তি রইল না।
রশ্মি তখন কাঁদছিল, হাত জোড় করে মিনতি করছিল—
-"ক্ষমা করে দাও... দয়া করো..."
কিন্তু সোহারের চোখে কোনো করুণা ফুটে উঠল না। ঠান্ডা, শীতল দৃষ্টিতে সে এগিয়ে গেল। পরমুহূর্তে এক ঝটকায় রশ্মির পা মুচড়ে দিল। অস্থি ভেঙে যাওয়ার শব্দে ঘর যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। রশ্মি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল, তার চিৎকার চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলল।
তীব্র আর তূর্য এই দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। তারা ছটফট করে উঠল, চোখ ভিজে গেল অসহায়ত্বে। তাদের মা এক হাহাকার ছেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। কিন্তু সোহা কোনো দয়া দেখাল না আজ।
সে জানে, সব অন্যায় যদি চুপচাপ মেনে নেওয়া হয়, তবে সেও হয়ে যাবে অন্যায়ের সহযোগী। সবাইকে ক্ষমা করা যায় না।
ধীরে ধীরে সোহা উঠে দাঁড়াল। তার চোখে আগুন, ঠোঁটে শীতল দৃঢ়তা। গার্ডরা তখন তীব্র-তূর্যদের ছেড়ে দিল। তারা ছুটে গিয়ে রশ্মিকে আগলে নিল, মাটিতে কাতরাচ্ছে সে, ব্যথায় দম ফাটছে।
সোহা সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। রশ্মির কাতর আর্তনাদ, তীব্র–তূর্যের অসহায়তা, মায়ের কান্না, সব মিলিয়ে এক বিভীষিকার আবহ ঘর ভরে দিল। অথচ সোহার চোখে ভয় নেই, আছে শুধু নির্মম তৃপ্তি। ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি, কণ্ঠস্বর বরফশীতল অথচ ধারালো—
-"এটাই প্রতিশোধ। অন্যায়ের বিচার আমি নিজেই করেছি। এখন তোমরা বুঝবে, কেমন লাগে যখন কাউকে অন্যায়ভাবে ভেঙে দেওয়া হয়।"
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। সবার চোখ তার দিকে স্থির। তারপর সোহা ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল, যেন নিজের রক্তক্ষত মনের শেষ বোঝাটুকুও নামিয়ে রাখল।
সে আবার বলল, এবার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের আগুন—
-"মিথ্যেকে আজ আমি সত্যি করে দিলাম। এখন যতটুকু শক্তি আছে, যতটা প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছে আছে, সব নিয়ে এসো। আমি সাদরে গ্রহণ করব।"
তার কথার প্রতিধ্বনি ঘরে বাজতে লাগল, দেয়াল যেন কেঁপে উঠল সেই সুরে। সবাই মাথা নিচু করে নিস্তব্ধ, আর সোহা দাঁড়িয়ে আছে বজ্রের মতো দৃপ্ত ভঙ্গিতে, যেন এক নারী নয়, বরং প্রতিশোধের প্রতিমূর্তি।