সোহা, সাবা ও নিলুফার বেগম একই সঙ্গে অবাক হয়ে পেছনে ঘুরে তাকালেন। দূর থেকে যেন এক আলো ছড়িয়ে আসছে, আর সেই আলোর ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে তীব্র। পরনে ঝকঝকে সাদা স্যুট, বুক টানটান, পকেটে গুঁজে রাখা দুই হাত। তার স্থির দৃষ্টি চারপাশকে যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিল।
সোহা বিষ্ময়ে বলে উঠলো—
-"আপনি এখানে?"
তীব্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। মাটির ওপর তার জুতার শব্দে নিস্তব্ধতার তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ঠান্ডা অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে সে বলল—
-"হুম, আমি। চলুন আমার সাথে। পরে এইসব নিয়ে কথা হবে।"
এই অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, সময় থেমে গেছে, চারপাশের পৃথিবী মুছে গেছে, শুধু তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিবার্য সত্য, যাকে এড়ানো অসম্ভব।
সোহা গভীর দৃষ্টিতে সাবা ও নিলুফার বেগমের দিকে তাকাল। সামনে সাবার বিয়ে, এই কারণেই তো তারা এক মাসের সময় নিয়েছিল। কিন্তু তূর্য চৌধুরীর এমন বেইমানি, সোহা কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। কথা দিয়েও সে কথা রাখলো না। সাবার বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত একটা আশ্রয় প্রয়োজন ছিল সোহার। তাই কোনো কিছু আর না ভেবেই, নিজের সখে গড়ে তোলা সেই প্রিয় বাড়িকে পেছনে ফেলে তীব্রর সাথে নিরব সম্মতিতে চলে গেলো।
তীব্র তাদের নিয়ে পৌঁছাল একটি ফ্ল্যাটে। এটি তীব্রর, ব্যবহার করা হয় না, অথচ ভেতরে ঢুকেই যেন এক অদ্ভুত বিস্ময় নেমে এলো। ফ্ল্যাটটা সাজানো-গোছানো, প্রতিটি কোণে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, একেবারে বসবাসের উপযোগী। সোফার পর্দা থেকে শুরু করে বুকশেলফের বই পর্যন্ত, সবকিছু এমনভাবে সজ্জিত যে মনে হচ্ছিল, তারা জানত সোহারা আজ আসবে।
সাবা ও নিলুফার বেগম বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকালেন। মনের ভেতর নিঃশব্দে সন্দেহের ঝড় বয়ে গেল, তীব্র কি সবকিছু আগে থেকেই জানত? তবে কি এ সবই পরিকল্পিত? কিন্তু বিপদের সময় যে হাত বাড়িয়ে দেয়, তার কাছে কৃতজ্ঞতার ঋণই বড় হয়ে ওঠে, প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না। তাই তারা নিজেদের প্রশ্ন চেপে রেখে নীরব রইলেন।
তীব্রর এই অপ্রত্যাশিত সহানুভূতি আর নিঃস্বার্থ উপকারের কাছে সকল সন্দেহ মুহূর্তের জন্য গোপন হয়ে গেল।
সাবা ও নিলুফার বেগমকে সেই নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে, সোহা বেরিয়ে পড়ল তীব্রর সাথে। গাড়ির চাকা যখন রাস্তায় গড়াতে শুরু করলো, তখন সোহার মনে শুধু একটাই সংকল্প, আজ, ভেলভেট ব্লুমে গিয়ে ওরহানের সমস্ত টাকা শোধ করে, একবারে সব হিসাব চুকিয়ে আসবে।
বাতাসে যেন অজানা এক উত্তেজনা। সামনে অজানা অধ্যায়, অজানা পরিণতি।
.
.
.
ওরহান গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে। চারপাশের পরিবেশে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কাচের টেবিলে রাখা আঙুলগুলো অজান্তেই ছন্দ তুলছে, কিন্তু চোখদুটো দূরে কোথাও স্থির, যেন চিন্তার ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে গেছে। পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইহাব।
ইদানিং সোহা কি করছে, সে সম্পর্কে কোনো খোঁজই পাচ্ছে না ওরহান। খবর আসে সাবা ও ওসমানের বিয়ের সমস্ত আয়োজন নিয়ে, কিন্তু সেদিন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকার কারণে সেখানে যাওয়া হয়নি তার। অথচ সোহার এই দীর্ঘ নীরবতা তাকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে। কী করছে সে? কী পরিকল্পনা করছে?কিছুই ধরতে পারছে না।
ঠিক সেই সময়, ইহাবের ফোনে একটি কল এলো। সঙ্কুচিত দৃষ্টিতে সে একটু দূরে গিয়ে কথা বলে ফিরে এলো, এবং ওরহানের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"স্যার, খারাপ খবর আছে।"
ওরহান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
-"কি?"
ইহাব দ্বিধা নিয়ে বলল—
-"ম্যাম... নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। এক মাস থাকার কথা ছিল, কিন্তু যে বাড়ি নিয়েছে সে কথা রাখেননি। আজকেই তাদের বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়েছে।"
কথাটা শোনামাত্রই ওরহানের দেহে যেন আগুন ছড়িয়ে গেল। চেয়ারের হাতল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে উঠল। রাগান্বিত কণ্ঠে গর্জে উঠল—
-"কি বলছ এসব? এখন কোথায় আছে সোহা?"
ইহাব মাথা নিচু করে শান্ত স্বরে উত্তর দিল—
-"তীব্র স্যার… তার একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে গেছেন।"
ওরহান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা ঝড় হঠাৎ থেমে গেলেও চোখে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। ঠোঁটে চাপা স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো, যাক, অন্তত নিরাপদে আছে সে, এটাই বড় কথা। কিন্তু পরক্ষণেই মাথা আবার গরম হয়ে উঠল। রাগে তার শিরাগুলো ফুলে উঠতে লাগল। সোহা তার থেকে মুক্তি পেতে এতটা মরিয়া, নিজের শখের বাড়িও বিক্রি করে দিলো!
ইহাব বুঝতে পারছিল, ভেতরে ভেতরে কতটা ঝড় বইছে তার স্যারের মধ্যে। তাই স্নিগ্ধ শান্ত কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল—
-"আপনাকে আমরা সবাই বুঝিয়েছি স্যার। এইভাবে কাজ হবে না। জোর করলে ম্যাম আরো দূরে সরে যাবে। আর ঠিক সেটাই হচ্ছে। ম্যাম যেন উন্মাদ হয়ে গেছে, শুধু আপনার থেকে দূরে থাকার জন্যই সব করছে। আপনার এই অযথা জেলাসি, এই অসহনীয় পজেসিভনেস, ম্যাম আর সহ্য করতে পারছে না।"
ওরহান ভারী শ্বাস ফেলে কপালে হাত রাখল। চোখে এক ধরনের অস্থিরতা—
-"বুঝতে পারছি না ইহাব... কী করা উচিত আমার? কিভাবে রাখব ওকে আমার কাছে?"
ইহাব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, কণ্ঠে নির্ভেজাল মমতা—
-"গত পাঁচ বছর আপনার কষ্ট আমি দেখেছি স্যার। আমি সব বুঝি। আপনি ম্যামকে একা থাকতে দিন। তাকে নিজের মতো বাঁচতে দিন। উনি যেটা চায়, সেটাই করুন। তাতেই হয়তো ম্যাম একদিন আবার আপনার কাছে ফিরে আসবেন।"
কথাগুলো যেন ঘরের ভারী বাতাসে ঝুলে রইল। ওরহান নিশ্চুপ বসে রইলেন। চোখে তীব্র আগুন, অথচ হাতদুটো শক্ত করে চেয়ারের হাতলে চেপে রেখেছে। মনে হচ্ছিল, ঝড়ের ভেতর নিজেকে আটকে রাখছে।
ঠিক তখনই দরজার হালকা শব্দে ঘর ভরে উঠলো। ভেতরে প্রবেশ করল সোহা ও তীব্র। তাদের একসাথে দেখে ওরহানের বুকের ভেতর যেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। চোখদুটো লাল হয়ে উঠলো রাগে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সে নিজেকে দমন করলো—ইহাবের বলা কথা মনে পড়লো তার।
সোহা ও তীব্র ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আসনে বসল। টেবিলের ওপরে একটি চেক বাড়িয়ে দিল সোহা। ঠান্ডা, দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"চাকরি ছাড়ার ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করলাম।"
ওরহান নিঃশব্দে চেকটি তুলে নিল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে একবার নাড়াচাড়া করে দেখল সেটি। চোখে অস্পষ্ট আবেগ, ঠোঁটে কেবল জমাটবাঁধা নীরবতা। তারপর শান্ত অথচ গভীর ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"কিভাবে জোগাড় করলে এই টাকা?"
সোহা কোনো দ্বিধা না রেখেই উত্তর দিল—
-"বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি।"
ওরহানের চোখ বিস্ফারিত হলো। কণ্ঠে ব্যথা মিশে রাগ জমে উঠলো—
-"এত ঘৃণা করো আমাকে? আমার থেকে দূরে থাকার জন্য নিজের সখের বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিলে?"
সোহা সোজাসাপ্টা উত্তর দিল—
-"হ্যাঁ।"
এই একটি শব্দেই যেন পুরো পরিবেশ কেঁপে উঠল। ওরহান চোখ তুলে তাকাতেই মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সাদা অংশ রক্তাভ হয়ে উঠল। সেই ভয়ংকর দৃষ্টিতে সোহার বুক ধক করে উঠল। ইহাব ও তীব্রও থমকে গেলো আতঙ্কে, না জানি এবার ওরহান কী করে বসবে!
কিন্তু সবার আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে, ওরহান গভীর নিস্তব্ধতা ভেঙে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—
-"কি করলে আমাকে আর ঘৃণা করবে না? আমাকে একটু হলেও ক্ষমা করবে?"
সোহা নির্দ্বিধায় উত্তর ছুঁড়ে দিল—
-"ডিভোর্স দিলে!"
মুহূর্তেই যেন বজ্রপাত নামলো পুরো অফিস রুমে। ভারী পরিবেশে শব্দটা ছড়িয়ে পড়ল "ডিভোর্স" আর চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তীব্র ও ইহাব আতঙ্কিত চোখে তাকালো সোহার দিকে, পরক্ষণেই ছুটে গেল দৃষ্টি ওরহানের দিকে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওরহান হঠাৎ হালকা হাসলো। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত বাঁক ফুটিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর নিস্তরঙ্গ অথচ শীতল কণ্ঠে বলল—
-"সাবা আর ওসমানের বিয়ের দিন... ডিভোর্স পেপার পেয়ে যাবে।"
সোহা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই উত্তর সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। ওরহান এত সহজে মেনে নেবে, এটা তার বিশ্বাসের বাইরে। তীব্র ও ইহাবও হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ মনে প্রশ্ন করছে—এই শান্ত মুখোশের আড়ালে আসলে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে? ওরহানের চোখের নীচে জমে থাকা ছায়া, ঠোঁটের বাঁক আর নিঃশব্দ নিঃশ্বাস, সবকিছুতেই যেন লুকিয়ে আছে অগ্নিগর্ভ স্রোত।
হঠাৎই ওরহান চুপচাপ টেবিলের ওপরে ফেলে রাখা চেকটি তুলে নিল। তারপর ধীরে ধীরে সোহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"কোনো টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার রেজিগনেশন... গ্রহণ করলাম।"
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই যেন হিমেল শীতলতা নেমে এলো। সোহা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওরহানের দিকে, চোখে অবাক বিস্ময় আর অজানা আতঙ্ক। তীব্র ও ইহাবও চুপ করে তাকিয়ে রইল, কোনো শব্দ নেই, শুধু নিস্তব্ধতা আর হৃদস্পন্দনের তীব্রতা শোনা যাচ্ছে যেন।
ওরহান আসনে হেলান দিয়ে বসল। নিঃশ্বাস ছেড়ে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে ইহাবকে উদ্দেশ্য করে বলল—
-"নিয়ম পরিবর্তন করে দাও। যাকে আটকে রাখার জন্য এই নিয়ম ছিল... সে যদি আর না থাকে, তবে সেই নিয়মেরও কোনো প্রয়োজন নেই।"
কথাগুলো কানে পৌঁছালেও যেন বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এলো, মনে হচ্ছিল, সবাই শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
ওরহান আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো চেয়ার থেকে। মুহূর্তের ভেতরেই পুরো রুম যেন নিঃশব্দ হয়ে এলো। উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে, কারও চোখে কৌতূহল, কারও চোখে আতঙ্ক, আর কারও মনে অদ্ভুত অজানা শঙ্কা।
দৃঢ় পদক্ষেপে দরজার দিকে এগোতে এগোতে ওরহান থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। গাঢ় অথচ শীতল কণ্ঠে বলল—
-"সাজেকে কি হয়েছিল, নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি? আশা করি নিজেকে শুরক্ষিত রাখবে। আমার অস্তিত্ব তুমি তোমার চারপাশে চাও না, আমি জানি। তাই কাছে থেকে নয়, দূর থেকেই যতটুকু সম্ভব তোমাকে আর তোমার পরিবারকে রক্ষা করব। তবে মনে রেখো, সবসময় আমি পাশে থাকতে পারব না। নিজের জন্য সতর্ক থাকতে হবে তোমাকেই।"
তার কণ্ঠস্বর শেষ হতেই নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে ঝুলে রইল চারদিকে। দেয়ালের গায়ে ঘড়ির টিকটিক শব্দও যেন থেমে গেছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত অচেনা শীতলতা।
সোহা স্থির হয়ে বসে রইল। তার চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক, ঠোঁটে জমাটবাঁধা নীরবতা। কী উত্তর দেবে সে, বুঝে উঠতে পারছে না। মুহূর্তের ভেতরেই ওরহানের এই বদলে যাওয়া আচরণ তাকে কাঁপিয়ে তুলেছে।
তীব্র কৌতূহল, ‘সাজেকে আসলে কী হয়েছিল?’ সে জানে না, কিন্তু ওরহানের কণ্ঠের সেই রহস্যময় দৃঢ়তা তার ভেতরে অজানা এক আতঙ্ক বুনে দিল।
ঘরের প্রত্যেকটি মুখে এখনো বিস্ময়ের ছায়া, কেউ নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে, কেউ চোখ নামাতে পারছে না সোহার মুখ থেকে। যেন সবাই একই সঙ্গে বোবা হয়ে গেছে।
.
.
.
তীব্র সোহাকে তার নিজস্ব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ঠিক হয়েছে, সাবার বিয়ের পরই সোহা সেখানে যোগ দেবে। আজ সাবার গায়ে হলুদ, ঘরভর্তি রঙিন আলো, উজ্জ্বল হলুদ শাড়ির ঝলক, সোনালি গয়নার ঝিলিক আর বাঙালি বিয়ের ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানে মেতে উঠেছে চারপাশ। সাবা দৃঢ়ভাবেই বলেছিল, সে চায় তার বিয়েটা হোক সম্পূর্ণ বাঙালি রীতিতে, বিদেশি সাজসজ্জা বা অনুষ্ঠানের চাকচিক্য তার দরকার নেই।
এমন আনন্দঘন পরিবেশের মাঝেই সোহার মনে জমে আছে এক অদৃশ্য অস্থিরতা। ওরহানের ফিরিয়ে দেওয়া চেক দিয়ে বাড়িটা ফেরত নিতে চেয়েছিল সে, কিন্তু পারলো না। কারণ সে বাড়িটি ফেরত দিবে না। উল্টো সোহার সাথে বাজে আচরণ করছে, যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, তীব্রর ব্যবহার দিন দিন অদ্ভুত হয়ে উঠছে। সে বারবার জোর দিয়ে বলছে—
-"এখানেই থাকিন। আগে বিয়েটা হোক, তারপর সবকিছু দেখা যাবে।"
তার এই আচরণ সোহার ভেতরে সন্দেহের কাঁটা গেঁথে দিচ্ছে। সে প্রশ্ন করে নিজেকেই, তীব্র এমন কেন করছে? সেই দিনটা... কিভাবে ঠিক সেই মুহূর্তে উপস্থিত হলো সে? যেখানে ওরহানের মতো ক্ষমতাবান মানুষও কিছু বুঝে উঠতে পারেনি, জানতে পারেনি, সেখানে তীব্র কীভাবে জানলো? কীভাবে এতটা নিখুঁতভাবে এসে দাঁড়ালো?
মনের ভেতরে ঝড় উঠছে সোহার। বাইরের আলো-আঁধারি, হাসি-আনন্দে ভরা স্নিগ্ধ পরিবেশের মাঝেই সে অনুভব করছে এক অদ্ভুত চাপা ভয়। হাসির আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে কোনো অজানা রহস্য, কোনো অদৃশ্য ছায়া।
ঘরের কোণে বসে থাকা সোহা সবকিছু দেখছে, কিন্তু তার চোখে আনন্দের রঙ নেই। বরং আছে তীব্র কৌতূহল, অস্বস্তি আর অজানা আতঙ্কের ছাপ। যেন কারও অদৃশ্য দৃষ্টি তাকে আঁকড়ে ধরে আছে, যাকে সে খুঁজে পাচ্ছে না।
ছাদে গায়ে হলুদের তোড়জোড় চলছে। চারপাশে রঙিন কাপড়ের আলপনা টাঙানো, সোনালি-লাল ফেয়ারি লাইটে ঝলমল করছে পুরো ছাদটা। প্লাস্টিকের চেয়ার, রঙিন কুশন ঢাকা মেঝেতে বসার জায়গা, সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ।
ওসমানদের বাড়ি থেকে তত্ত্ব এসে পৌঁছেছে। লাল শালুতে ঢাকা বড় বড় ট্রে ভরা মিষ্টি, শাড়ি, চুড়ি আর কনের সাজের সরঞ্জাম সাজানো হয়েছে ছাদের এক কোণে।
কনেকে বসানো হয়েছে ছাদের মাঝ বরাবর সাজানো মঞ্চে, গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা দিয়ে সজ্জিত। তার গায়ে হলুদ-কমলা শাড়ি, চুলে ফুলের সাজ, হাতে কাঁচের চুড়ি। মুখে মিষ্টি লাজুক হাসি, বন্ধুদের খুনসুটিতে গালে হাত দিয়ে হেসে ফেলছে, আবার কখনো চোখ নামিয়ে নিচ্ছে লাজে।
বাতাসে ভেসে আসছে হলুদের গন্ধ, আতরের সুবাস, আর রান্নার মশলার হালকা গন্ধও। মেয়েরা ঢোলক বাজাচ্ছে, করতালের তালে তালে গাইছে ঐতিহ্যবাহী গান। হাসি-আনন্দ আর হাততালিতে ভরে উঠেছে ছাদ, মুহূর্তে মনে হচ্ছে আকাশের তারারাও যেন নিচে নেমে এসে উৎসবে যোগ দিয়েছে।
.
.
.
ওরহান খান কোম্পানিতে বসে আছে। পাশে বসে আছে ওসমান ইহাব। ওসমান, ওরহানকে এত শান্ত দেখে প্রশ্ন করল—
-"তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দেবে?"
-"হ্যাঁ। ও তো এটাই চাইছে। জোর করে তো দেখলাম পেলাম না। ডিভোর্স দিয়ে দেবো। তারপর নতুন করে আবার আমার প্রেমে ফেলব। তখন এই ধোঁকার তকমা আর লাগতে দেবো না।"
ওসমান হালকা হাসল। সে জানে, তার ভাই সোহাকে ছাড়া বাঁচবে না। আজ যদি ওসমান তার ভালোবাসার মানুষকে পায় আর তার ভাই না পায়—না, এটা কখনোই হতে দেওয়া যাবে না। যে করেই হোক, সোহা ভাবীকে তার ভাইয়ের সঙ্গে এক করতে হবে। সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে ওসমান বলল—
-"আজ গায়ে হলুদে যাবে না ও বাড়ি?"
-"না!"
-"কেন?"
-"সোহা আমার থেকে দূরে থাকতে চায়। কিছুদিন থাকুক দূরে।"
-"তোমার আপন ভাইয়ের গায়ে হলুদ। কেউ কিছু বলবে না। তুমি যাচ্ছ, আমার সাথে। কথা শেষ।"
ওরহান কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু ওসমান আর কিছু শুনল না। সে ইহাব ও ওরহানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সকালের অনুষ্ঠান আলাদা হয়েছে, রাতেরটা একসাথে হবে।
.
.
.
চৌধুরী ভিলা। গভীর নীরবতায় মোড়া ড্রয়িং রুম, ভারী পর্দার আড়াল দিয়ে আসা ক্ষীণ আলো ঘরটিকে এক রহস্যময় আবহে ভাসিয়ে রেখেছে। সোনালি কাঠের আসবাবে জ্বলজ্বল করছে প্রাচীন বংশমর্যাদার ছাপ। ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে আছে, বাতাসের ভেতরেও টানটান উত্তেজনা জমাট বেঁধে আছে।
তূর্য চৌধুরী বসে আছেন কাষ্ঠভরা দৃষ্টিতে। তাঁর পাশেই হুইলচেয়ারে এক নারী, শ্বেত শাড়ির আঁচলে ঢাকা, তাঁর চোখে জ্বলজ্বল করছে পুরোনো প্রতিহিংসার আগুন। আর সামনে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন এক সুদর্শন পুরুষ, পরনে সাদা-হলুদের মিশ্রণে রাঙানো পাঞ্জাবি, তাঁর ভঙ্গিতেই ফুটে উঠছে আত্মবিশ্বাস আর অহংকার।
নীরবতার আবরণ ভেঙে তূর্য চৌধুরী গম্ভীর স্বরে বললেন—
-"আমরা প্ল্যান মতোই এগোচ্ছি। সোহার থেকে তার বাড়ি কেড়ে নিয়েছি। যদিও ওরহান ওই নিয়ম জারি না করলে আমাদের আরো কাঠ-খড় পোড়াতে হতো। এখন কেবল বাকি আছে ওর কর্মজীবন ধ্বংস করা। ভেলভেট ব্লুম থাকলে সেটা সহজ হতো... কিন্তু না থাকলেও আমাদের পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই। ওর ডিজাইনার জীবনটাকে চূর্ণ করে দিতে হবে। পাঁচ বছর আগে যে অপরাধ ও করেছে, তার শাস্তি পেতেই হবে।"
তূর্যের কথায় সোফায় বসা পুরুষ হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসিটা যেন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে গোটা ঘরকে কাঁপিয়ে তুলল, আর সেই শব্দে বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। হুইলচেয়ারের নারী নীরব, তবে তাঁর আঁকাবাঁকা আঙুল মুঠো বেঁধে রেখেছে যেন ভেতরের ক্রোধ গোপন করছে।
তখন সোফার পুরুষটি মাথা সামান্য উঁচু করে গভীর স্বরে বলল—
-"কিছু সময়ের জন্য আমরা লক্ষ্যচ্যুত হয়েছিলাম। কিন্তু এ বার নয়। যেভাবেই হোক, আমাদের প্রতিশোধ নিতেই হবে।"
তার কণ্ঠস্বর যেন বজ্রাঘাতের মতো ছেদ করল ঘরের শ্বাসরুদ্ধ নীরবতাকে। মুহূর্তেই চৌধুরী ভিলার দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে উঠল আসন্ন অন্ধকার ষড়যন্ত্রের।
.
.
.
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। পুরো আয়োজন বসানো হয়েছে সোহার ফ্ল্যাটের ছাদে। চারপাশে ঝুলছে হলুদ-সোনালি সাজসজ্জা, বাতাসে মিশে আছে ফুলের মিষ্টি গন্ধ। খান পরিবারের আত্মীয়-স্বজন ইতিমধ্যেই ভিড় জমিয়েছে। অথচ সোহাদের কাউকেই ডাকা হয়নি, নিলুফার বেগম কঠোরভাবে বারণ করেছিলেন। আমন্ত্রিত হয়েছে শুধু সাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব।
তানভীর ও স্নেহা, যারা কানাডায় শিফ্ট হয়ে গেছে, তাদের দাওয়াত পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু টিকিট না পাওয়ায় তারা এই অনুষ্ঠানে আসতে পারেনি। তবে বিয়ের মূলদিনে তারা যোগ দেবে। সাবার মাধ্যমে সোহা আবারো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। পুরোনো বন্ধু ফিরে আসবে এই সংবাদে সোহার মুখে অনেকদিন পর হাসির আলো ফুটে উঠেছে। স্নেহা তাকে বারবার জানিয়েছে—অসংখ্য কথা জমে আছে বলার জন্য। সোহা শুধু বলেছে, "এসো, সব বলবে সামনে।"
এদিকে খান পরিবারের সকলে এসেছে এবং বিয়ের আয়োজনের প্রতিটি কাজে আন্তরিকভাবে সাহায্য করছে। বাড়ির দুই ছেলে, মুফতি আর মারুফ, ছুটে ছুটে সহযোগিতা করেছে। সবার পরনে একই রঙের পোশাক, পুরুষদের হলুদ পাঞ্জাবি, নারীদের গায়ে হলুদ শাড়ি। একেবারে বাঙালি গায়ে হলুদের আবহ। গানের তালে তালে একে একে সবাই ছাদের স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্টেজে সাবাকে বসানো হয়েছে। পাশে বসলো ওসমান। তার চারপাশে জমে উঠেছে হাসি-আড্ডা। অন্যদিকে নিলুফার বেগম দাঁড়িয়ে আছেন সোহাকে নিয়ে। শিফা ও তার কাকি, সুরাইয়া বেগমও এসে সোহাদের পাশে ভিড় জমালেন। বাকি ছেলেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। ওমর খান ছোট ভাইকে পাশে নিয়ে গম্ভীর স্বরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই ছাদের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো ওরহান। সাদা-হলুদের মিশ্রণে তৈরি পাঞ্জাবি পরে যেনো এক অদ্ভুত দীপ্তি ছড়াচ্ছে তার অবয়ব থেকে। সুদর্শন সেই উপস্থিতি মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি কেড়ে নিলো। সোহা একবার তাকালো। বুকের ভেতর হালকা কম্পন। সে ভেবেছিল ওরহান হয়তো আসবে না। বুকের ভেতর কোথাও একটা আক্ষেপ জমে ছিল, নিজের ছোট ভাইয়ের গায়ে হলুদের মতো শুভক্ষণে যদি সে অনুপস্থিত থাকে, তবে এ আয়োজনের আনন্দই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তবুও মনের গভীরে সোহা বিশ্বাস রেখেছিল, রক্তের টানে, পরিবারের টানে, একসময় সে আসবেই।
আজ যদি সত্যিই সে না আসত, তবে সোহা নিজেই তাকে ডেকে আনতো। ওরহানের অনুপস্থিতি সোহা মেনে নিতে পারতো না। কারণ সে জানে, ওরহান শুধু একজন ভাই নয়, খান পরিবারের মর্যাদার প্রতীকও। আর সেই প্রতীক যদি এ উৎসবে অনুপস্থিত থাকে, তবে চারপাশের সাজসজ্জা, গান, হাসি, সবই যেন ফিকে হয়ে যাবে। নিজেকে অপরাধী মনে হতো।
সোহা তাকিয়ে রইলো নিঃশ্বাস বন্ধ করে। ভিড়ের কোলাহল তার কানে পৌঁছালো না, যেন সমস্ত শব্দ মিলিয়ে গিয়ে শুধু ওরহানের উপস্থিতিই দৃশ্যপটে স্থির হয়ে রইলো। চারপাশে মানুষ চলাফেরা করছে, হাসছে, কথা বলছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে সোহার চোখে কেবল একটিই মানুষ, ওরহান। পাশেই দাঁড়িয়ে মিরহা ফিসফিস করে উঠলো—
-"ওরহান স্যারকে অনেক সুন্দর লাগছে তাই না, সোহা?"
সোহা হঠাৎই চমকে উঠে চোখ নামিয়ে নিলো। কিছু বলল না। নীরবতার আড়ালে বুকের ভেতর কেমন যেন অস্থিরতা জমে উঠল। অথচ মিরহার সরল কণ্ঠে প্রশ্নটা ঝুলে রইলো বাতাসে। সোহা দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখলো, ওরহানের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ইহাব। চোখের কোণে অচেনা হাসি নিয়ে সে বলল—
-"তোমার হবু বরকেও তো বেশ সুন্দর লাগছে!"
মুহূর্তেই মিরহার গাল লালচে হয়ে উঠলো। লাজুক হেসে সে চোখ নামিয়ে নিলো। সেই দৃশ্য দেখে সোহা আবারও বলল—
-"তো, কবে বিয়ে করছ তোমরা?"
মিরহা মাথা নিচু করে উত্তর দিলো—
-"বাবা-মা ঢাকা আসবে, তারপরই বিয়ে করে ফেলবো।"
সোহার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।মেয়েটা একেবারেই সরল হৃদয়ে ভরা। অথচ সেই সরলতাই যেন সোহার চোখে তাকে আরো আপন করে তোলে।
মিরহা সোহাকে খুব ভালবাসে, অসীম অনুরাগে, নিঃশর্ত বিশ্বাসে। সেদিন নিলুফার বেগম ও সাবা হঠাৎ চলে এসেছিল শেখ বাড়ি ছেড়ে। তারপর দুই দিন যেতে না যেতেই মিরহা সব জেনে গেলো। আর জানার পর সে দেরি করেনি। একটুও সময় নষ্ট না করে শেখ বাড়ি ছেড়ে দেয়, সোহার পাশে দাঁড়াতে তীব্রর ফ্ল্যাটেই উঠে আসে।
নিস্তব্ধতার মধ্যে তখনো বাতাসে ভেসে ছিলো অদৃশ্য উত্তেজনা। মানুষের আনাগোনা, আলো-ছায়ার খেলা, চোখে পড়ার মতো কোনো দৃশ্য নয়, বরং অন্তরের ভেতরে জমে থাকা আবেগই যেন চারপাশের পরিবেশকে আরও নাটকীয় করে তুলেছিলো।
মীরহা হঠাৎ কথার স্রোত ঘুরিয়ে বলল—
-"তীব্র স্যারকে তো দেখছি না!"
সোহার চোখ কৌতূহলে ভরে উঠলো। চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে সে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল—
-"সকাল থেকেই তো এখানে ছিল। কোথায় গেলো? অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে তো! কোথাও যাবে সেটা তো বলেও নি..."
কথার ভেতরেই যেন এক অদৃশ্য অস্থিরতা ঘনীভূত হলো। সোহার চোখে হালকা দুশ্চিন্তার ছায়া। মীরহাও আর দাঁড়িয়ে রইল না, চারপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে খুঁজতে শুরু করল। ভিড়ের ফাঁকে আলো-ছায়ার খেলা, মানুষজনের কোলাহল, সাজসজ্জার ঝলক, সবকিছুর ভেতরেই যেন একটা শূন্যতা ভেসে বেড়াচ্ছে।
আর ঠিক তখনই, দরজার দিক থেকে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো তীব্র। একদম সাদা-হলুদের মিশ্র আভায় ঝলমল করা পাঞ্জাবিতে তাকে দেখে মুহূর্তেই যেন পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
সোহা তাকে দেখেই তড়িঘড়ি এগিয়ে এলো। উৎকণ্ঠা মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"কোথায় গিয়েছিলেন?"
-"একটা জরুরি কাজ ছিল, তাই ফিরতে দেরি হয়ে গেল।"
-"আচ্ছা। আপনাকে সত্যিই অনেক ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে আমি একা সবকিছু সামলাতে পারতাম না।"
-"আরে, ধন্যবাদ দেওয়ার কি আছে! সাবা তো আমার ছোটবোনের মতোই।"
সোহা মুচকি হেসে নীরবে মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎই তাড়াহুড়োর আভাস দিয়ে বলল—
-"অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। আমি ওদিকে যাচ্ছি, আপনি আসুন।"
কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইলো। সোহা দ্রুত পা চালিয়ে ভিড়ের ভেতরে হারিয়ে গেল।
তীব্র স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখের গভীরে রহস্যময় আলো, ঠোঁটের কোণে দুলছে এক গূঢ় হাসি, যেন কিছু না বলেও অনেক কিছু বলে দিচ্ছে।
দূরে, আলো-অন্ধকারের আড়ালে ওরহান সেই দৃশ্য নিরবে লক্ষ করছিল। মুহূর্তে আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল মাটিতে, ধোঁয়া মিলিয়ে গেল রাতের আকাশে। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলো তীব্রর দিকে। তার দৃষ্টি ধারালো, কণ্ঠস্বর ব্যঙ্গ মাখা—
-"আমাকে পছন্দ করো, তীব্র?"
তীব্র হঠাৎ কপাল কুঁচকে তাকালো তার দিকে। কণ্ঠে ছিলো অবজ্ঞার ঠাণ্ডা সুর—
-"তোমাকে পছন্দ করতে কেনো যাবো? আমি ছেলেদের পছন্দ করি না।"
ওরহান বিদ্রুপের হাসি ছুঁড়ে দিল। কণ্ঠে কৌতুক, অথচ চোখে তীক্ষ্ণতা—
-"না মানে... আমার সাথে মিলিয়ে পাঞ্জাবি পড়েছো, আর কী ভাববো বলো?"
তীব্র মুহূর্তেই খেয়াল করলো, সত্যিই! দুজনের পরনে একই রঙের, একই নকশার পাঞ্জাবি। মুহূর্তের জন্যে চারপাশের কোলাহল যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ভিড়ের হাসি-আড্ডা দূরে সরে, দুই দৃষ্টির সংঘর্ষে যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। তীব্র ধীর কণ্ঠে উত্তর দিল—
-"এক রকম হতেই পারে। এই রকম পাঞ্জাবি মার্কেটে অভাব নেই। তাই বলে তোমাকে পছন্দ করতে যাবো কেনো? করলে তোমার বোনকে করতে পারি।"
ওরহানের ঠোঁটে তখনো বিদ্রূপের রেখা। চোয়াল শক্ত করে বলল—
-"সেটা আমি জানি। কিন্তু আমার বোনকে পছন্দ করে কোনো লাভ নেই... আমি আমার বোনকে দেবো না তোমার কাছে।"
তীব্র ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। চোখে ছিলো শীতল আগুন, কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা—
-"কেনো দেবে না? কী কমতি আছে আমার মধ্যে?"
ওরহান হেসে ফেলল, হাসির ভেতরে লুকানো কটাক্ষ—
-"এই এই! এমন ভান করছো যেন সত্যিই আমার বোনকে পছন্দ করো। অথচ এতদিন তো সোহার পিছু পিছু ঘুরছিলে!"
তীব্র হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি বজ্রপাতের মতো ঝলসে উঠলো—
-"কি বললে? আমি সোহার পিছু ঘুরছিলাম?"
ওরহান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কণ্ঠে ব্যঙ্গ, অথচ শব্দে বিষ—
-"মানে... তুমি সোহাকে পছন্দ করো না?"
তীব্র শীতল স্বরে উত্তর করল—
-"না। সবই তোমার মনের ভুল। আমি কেনো সোহাকে পছন্দ করতে যাবো?"
ওরহান ভ্রু উঁচিয়ে সোজা তাকাল তার চোখে—
-"তাহলে ভেলভেট ব্লুমে শেয়ার কিনেছো কেনো? আর সোহার সাথেই এত ঘনিষ্ঠতা কেনো?"
এই প্রশ্নের ভার যেন চারপাশের আলো-ঝলমলে উচ্ছ্বাসকে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ করে দিল। তীব্র হঠাৎ গলায় খটখটে কাশি চেপে উঠল। উত্তর করার বদলে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর একেবারে নীরবে ঘুরে দাঁড়াল।
পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতে লাগল ভিড়ের গুঞ্জনে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ওরহানের মনে হলো, তীব্রর চোখের দৃষ্টিতে যে ছায়া দেখেছিল, সেটা কি কোনো গোপন রহস্যের ইঙ্গিত?
ওরহান স্তব্ধ হয়ে গেল। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তীব্রর প্রস্থানপথে। তার ভেতরে সন্দেহের কাঁপন ছড়িয়ে পড়লো। কোনো এক অজানা সত্যির আভাস যেন মনের গভীরে আলোড়ন তুললো।
অস্থির হাতে দ্রুত ফোন বের করল সে। কণ্ঠে তীব্রতা মিশিয়ে কাউকে কল করল—
-"তীব্র সম্পর্কে সব খোঁজ-খবর এনে দাও... যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।"
.
.
.
শিফা দাঁড়িয়ে ছিল দূরে, নিঃসঙ্গ আর নীরব। চারপাশে নিস্তব্ধতার গুমোট ছায়া, হাওয়াও যেন থমকে আছে। সাজেকের সেদিনের ঘটনার পর থেকে তীব্রর ব্যবহারে আঘাত পেয়ে সে মনের ভেতরে দূরত্বের দেয়াল তুলে দিয়েছিল। অথচ আজ... আজ সেই দেয়াল ভেঙে তীব্র নিজেই এগিয়ে এলো শিফার দিকে।
নীরবে শিফার পিছনে এসে দাঁড়ালো তীব্র। মুহূর্তেই হাওয়ার স্পন্দন যেন বদলে গেলো। আলতো করে হাত রাখলো শিফার কাঁধে। শিফা আচমকা চমকে উঠলো, যেন বজ্রপাত ছুঁয়ে গেলো শরীর। ঘুরে তাকাতেই চোখে চোখ পড়লো, তীব্রর গভীর, স্থির দৃষ্টি। তীব্র ধীরে হাত সরিয়ে নিয়ে মোলায়েম কণ্ঠে বললো—
-"ভয় পেলেন?"
শিফার ঠোঁটে কাঁপুনি। চোখে দ্বিধার ঝড়।
-"না... মানে হঠাৎ করে আসায় একটু ভয় পেয়েছি।"
তীব্র মুচকি হেসে উঠলো। সেই হাসিতে ছিল অদ্ভুত মায়া, আবার প্রশ্নবিদ্ধ এক চ্যালেঞ্জও। দু’হাত পেছনে ভাঁজ করে স্থির দাঁড়িয়ে, যেন কোনো সাক্ষীর সামনে দাঁড়িয়েছে, তীব্র বললো—
-"ভালোবাসেন আমাকে?"
শিফা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নীরবতা ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। বাতাস পর্যন্ত থমকে গেলো যেন উত্তর শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু সে কিছু বললো না।
তীব্র আবারও ঝুঁকে, আগের চেয়ে গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠে ডাকলো—
-"আমাকে ভালোবাসেন, মিস ওয়াজিহা খান শিফা?"
শিফার বুক কেঁপে উঠলো। দীর্ঘ নীরবতার পর, সমস্ত ভেতরের বাঁধ ভেঙে গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো এককথা—
-"হ্যাঁ!"
মুহূর্তটা থমকে রইলো। সময় যেন শ্বাস বন্ধ করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। শিফার সেই এক শব্দ "হ্যাঁ" ছড়িয়ে গেলো নিস্তব্ধতার ভেতর, আকাশ জুড়ে বেজে উঠলো অদৃশ্য কোনো সুর, যেন অদৃশ্য সেতারের তার কেঁপে উঠেছে।
তীব্রর চোখে এক ঝলক আলো খেলে গেলো। গলা ভারী হয়ে এলো, কণ্ঠে এক অদ্ভুত কম্পন—
-"আমার সবকিছু জানেন? জেনে-শুনেই ভালোবেসেছেন আমাকে?"
শিফা গভীর দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। ঠোঁটে একটুখানি কাঁপা হাসি, কণ্ঠ নরম অথচ দৃঢ়—
-"জেনে শুনে কেউ ভালোবাসে না, মিস্টার চৌধুরী। ভালোবাসা হয়... হয়ে যায়। যেদিন প্রথম আপনাকে দেখি, সেদিনই ভালোবেসেছি।"
তীব্র স্থির দাঁড়িয়ে রইলো, চোখে শূন্যতার ছায়া নেমে এলো। তার ভেতরের দহন যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। কাঁপা কণ্ঠে আবার প্রশ্ন করলো—
-"যদি কোনো দিন জানতে পারেন আমি নিকৃষ্ট একজন মানুষ... খুব খারাপ একজন মানুষ, তখনও ভালোবাসবেন আমায়?"
শিফা দৃষ্টি নামিয়ে নিলো এক মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার চোখ তুলে তাকালো, ভেতরের গভীরতা কণ্ঠে ফুটে উঠলো—
-"ভালোবাসা ভালো-খারাপ দেখে হয় না... শুধু হয়ে যায়। শুধু এটুকু জানি সারাজীবন ভালোবাসতে পারব আপনাকে।"
তীব্র এক পা এগিয়ে এল। চোখে অনিশ্চয়তার ঝড়, ঠোঁটে চাপা প্রশ্ন—
-"বুঝে শুনে বলছেন তো?"
শিফা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-"মানে?"
তীব্রর কণ্ঠে বিষণ্ণ গাম্ভীর্য নেমে এলো।
-"মানে ধরুন, যদি কোনোদিন জানতে পারেন আমি একজন পাপী... সেদিনও কি বলতে পারবেন যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন? সেদিনও কি আমার পাশে থাকবেন? নাকি আমায় ছেড়ে চলে যাবেন?"
শিফা এক দীর্ঘ শ্বাস নিলো। চারপাশের হাওয়া যেন ভারী হয়ে উঠলো। ধীর অথচ অনড় কণ্ঠে সে উত্তর দিলো—
-"ভালোবাসব। তবে থাকবো নাকি চলে যাবো, সেটা আপনার পাপের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু একথা নিশ্চিত... ভালোবাসা কোনোদিন ফুরাবে না।"
তাদের কথোপকথনের মাঝখানে নেমে এলো এক অদৃশ্য নীরবতা। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার সুর, দূরের গাছের পাতায় বাতাসের কাঁপুনি, সবই যেন থেমে গিয়ে তাকিয়ে আছে শুধু দু’জনের দিকে। আকাশে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিলো চাঁদ, যেন একমাত্র সাক্ষী হয়ে দাঁড়ালো এই মুহূর্তের।
হঠাৎই তীব্র মুচকি হাসলো। সেই হাসিতে ছিল ভয় আর মোহের অদ্ভুত মিশেল। এক নিমেষে এগিয়ে এসে শিফাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। অপ্রস্তুত শিফা চমকে উঠলো, চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেলো, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন ঝড়ের মতো বেজে উঠলো। তীব্রর বাহুর বন্ধন ছিল অনড়, ভাঙার নয়, যেন সে পৃথিবীর সমস্ত ভয় থেকে শিফাকে আগলে রাখছে, আবার একইসঙ্গে শিকল পরিয়ে দিচ্ছে।
তীব্র মাথা নিচু করে শিফার কানে খুব কাছে ফিসফিস করে বললো—
-"আমি ধ্বংসকারী... আমাকে নিজের ভালোবাসার ফাঁদে ফেলেছ তুমি। আর এর শাস্তি সারাজীবন আমার হয়ে থাকতে হবে তোমায়। আমি যত বড় পাপী হই না কেনো, তুমি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না। আমি সেটা কখনো হতে দেবো না।"
শিফার দৃষ্টি কেঁপে উঠলো। তার কানে বেজে চললো তীব্রর গলা, সেই কথাগুলো যেন কোনো অভিশাপ, আবার একইসঙ্গে এক অনিবার্য অঙ্গীকার। সে কিছুই বুঝলো না, তীব্রর অন্ধকার কথার ইঙ্গিত, কিংবা ভেতরে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণার রহস্য। শুধু নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলো তার বাহুর ভেতরে, দম বন্ধ করে অনুভব করতে লাগলো, এই মুহূর্ত থেকে তার পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না।
.
.
.
গায়ে হলুদের সমস্ত নিয়মকানুন যথাযথভাবে সম্পন্ন হলো। ঢাকের তালে, গানের ছন্দে আর উজ্জ্বল রঙের আলোয় ভরে উঠেছিল পুরো আঙিনা। হাসি-আনন্দ, উল্লাস আর মেহেদির গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছিল চারপাশে। সবার মুখে ছিল আনন্দের দীপ্তি, যেন কোনো অশুভ ছায়াও সেখানে প্রবেশ করতে সাহস পায় না।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা একে একে বিদায় নিলো। সবার মুখে তৃপ্তির ছাপ, কারও হাতে ফুলের পাপড়ি, কারও চোখে শেষ মুহূর্তের হাসি। খান বাড়ির সবাইও চলে গেলেন ধীরে ধীরে। আঙিনায় থেকে গেল শুধু সাবার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীরা, যারা এখনো আড্ডায় মেতে আছে।
সব আনন্দের মাঝেও সোহা এক অদৃশ্য শূন্যতায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলো। ভীষণ অবাক সে। ওরহানের আচরণ যেন তাকে ঘিরে রহস্যের দেয়াল তুলে দিয়েছে। সেদিনের পর থেকে ওরহান নিজের কথা রেখেছে, একবারের জন্যও সোহার সামনে আসেনি। কথা বলা তো দূরের কথা, যেন ইচ্ছা করেই চোখের আড়ালে থেকেছে।
সোহা বোঝে না, এ কিসের অভিমান? নাকি এ এক অদ্ভুত অঙ্গীকার? তার চারপাশে হাসির স্রোত বয়ে গেলেও, ভেতরে ভেতরে সে শুধু খুঁজে ফিরছে সেই অনুপস্থিত দৃষ্টি... সেই অনুচ্চারিত শব্দগুলো, যা তাকে আরও অস্থির করে তুলছে।
.
.
.
আজ সাবা আর ওসমানের বিয়ের দিন। খান বাড়ির পক্ষ থেকে আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, আলাদা কোনো বউভাত হবে না। বরং বড় করে একদিনেই বিয়ের আয়োজন করা হবে, যাতে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এমনকি ব্যবসায়িক পার্টনাররাও সবাই একসাথে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারে।
সোহা এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল অনায়াসেই। তার ভেতরে যেন একরকম স্বস্তি ছিল, বড় আয়োজন মানেই একসাথে সবাইকে সামলানো সহজ হবে। বিকেল থেকে কমিউনিটি সেন্টারে অতিথিদের আগমন শুরু হলো। চারপাশ ঝলমল করছে আলো আর সাজসজ্জায়। সাবা তখনো পার্লারে, সাজগোজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
এদিকে স্নেহা ও তানভীর দূর দেশ থেকে এসে পৌঁছেছে, তারা রাতের অনুষ্ঠানেই যোগ দেবে। আর খান বাড়ির ভেতরে সোহা, তীব্র, মুফতি মারুফ, শিফা, সকলেই প্রাণপণে ব্যস্ত। সাজগোজের তোয়াক্কা করার মতো অবকাশ কারও নেই। একেকজনের হাতে একেকটা দায়িত্ব, অতিথি দেখা, আয়োজন দেখা, খাবারের তালিকা মেলানো। সত্যিই, খান পরিবারের সকলে পাশে না থাকলে সোহার একার পক্ষে এত বড় দায়িত্ব সামলানো সম্ভব হতো না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। অতিথি আসার গুঞ্জন বাড়তে লাগলো। এবার সকলে একটু বিরতি নিয়ে তৈরি হওয়ার চেষ্টা করলো। শিফা তীব্রর সাথে মিলিয়ে পরেছে সোনালী রঙের ঝলমলে লেহেঙ্গা। সেটি আজ সকালে নিজে হাতে এনে দিয়েছিল তীব্র, তার চোখে যেন অদৃশ্য আনন্দের ঝিলিক ছিল।
অন্যদিকে, সোহা তার স্বভাবমতোই সাজগোজ থেকে দূরে থাকলো। কালো রঙের এক সাধারণ সুতির শাড়ি পরে নিলো। সে বরাবরই এ ধরনের আড়ম্বর পছন্দ করে না, সাজসজ্জার চাকচিক্য তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না।
তবে পুরো বিয়ের ভিড়ের মাঝেও এক শূন্যতা চোখে পড়লো। ওরহান, যে এখনো পর্যন্ত অনুষ্ঠানে আসেনি। সোহা মুহূর্তের জন্য থেমে ভেবেছিল, তবে তেমন গুরুত্ব দিলো না। মনে মনে নিজেকে আশ্বস্ত করলো, বিয়ের আসরে, কাবিনের সময়, ওরহান নিশ্চয়ই হাজির হবে।
সব আয়োজনের ভিড় সামলে, শাড়ি গুছিয়ে সোহা অবশেষে পার্লারের পথে রওনা হলো। সাবাকে নিয়ে আসতে হবে তাকে, আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার জন্য।
সাবা সোহাকে জোড় করে হালকা মেকআপ করলো, চোখে সুক্ষ্ম কাজল, ঠোঁটে নরম রঙের লিপস্টিক। মাথায় ঝকঝকে ফুলের সাজ। তারপর দুই বোন বেরিয়ে পরলো।
সাবা পরেছে অফ-হোয়াইট লেহেঙ্গা। সাথে পাকিস্থানি মেকআপের স্পর্শ। ফর্সা ত্বকের সুবাস আর লেহেঙ্গার কোমল আলো মিলে সাবাকে যেন অপ্সরার মতো সুন্দর করে তুলেছে। ওসমান ইতিমধ্যেই স্টেজে বসে ছিল। সাবাকে একটি আলাদা রুমে বসানো হলো। আজ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে, তারপরই স্টেজে তার উপস্থিতি দেখানো হবে।
ইতিমধ্যে ওরহান এসে উপস্থিত হল। সেপুরো বিয়ের কার্যক্রম নিখুঁতভাবে সুরে করল। বিয়ে সম্পন্ন হবার পর সাবাকে স্টেজে নিয়ে আসা হলো। ধীরে ধীরে মুখ দেখানো হলো, তারপর শুরু হলো ফটোশ্যুট।
ওসমান সাবাকে দেখেই মৃদু হেসে বলল—
-"সাবা, তোমার এই লাজুক হাসি, চোখের উজ্জ্বলতা, সবই আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে।"
ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে সে দুষ্টুমি করছে। সাবাকে জ্বালাচ্ছে।
-"আজ তুমি শুধু সুন্দরই নও, তুমি যেন আমার সব স্বপ্নের ছায়া হয়ে এসেছো। আমি চাই, এই মুহূর্তটা কখনো শেষ না হোক।"
সাবা লজ্জায় হয়ে লাল হয়ে গেল। ওসমান আরও কাছে এগিয়ে এসে বলল—
-"তুমি জানো, আমি সবসময় তোমার পাশে থাকতে চাই। এই হাসি, এই আনন্দ, সবই শুধু তোমার জন্য।"
সাবার চোখে উত্তেজনা আর আনন্দের খেলা, আর ওসমানের এই গভীর কথাগুলো তার হৃদয়কে গলে দিচ্ছিল।
.
.
.
বিয়ে পড়ানো শেষ। চারপাশে উচ্ছ্বাসের ঢেউ, কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্পে মেতে উঠেছে, নতুন বউকে ঘিরে চলছে বিস্ময় আর প্রশংসা। টেবিল ভরে উঠেছে সুস্বাদু খাবারে, হাসি আর আলাপে অনুষ্ঠান যেন আনন্দের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
সব কোলাহলের বাইরে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে সোহা চুপচাপ সবকিছু দেখছিল। তার চোখে যেন এক অদ্ভুত নীরব আলো, যেখানে টান আছে, কিন্তু স্বীকার করার সাহস নেই। মন বলছিল এগোতে, কিন্তু ঠোঁট জমে আছে শব্দহীন।
ঠিক তখনই পেছন থেকে নিঃশব্দে এগিয়ে এলো ওরহান। সোহা বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখ ওরহানের চোখে আটকে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই চোখে কোনও ক্রোধ নেই, নেই আঘাতের ছাপও। শুধু এক শান্ত কণ্ঠস্বর—
-"একটু ওইদিকে আসো, কথা আছে।"
সোহা কোনো প্রতিবাদ করল না। ওরহানের পিছু পিছু ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। দু’জনে যখন উৎসবমুখর ভিড় থেকে সরে এলো, তখন চারপাশের শব্দ মিলিয়ে গেল। বাকি রইলো কেবল নিস্তব্ধতা, আর হালকা বাতাসের ফিসফিসানি।
ওরহান থামল। তার হাতে একখানা কাগজ। মুখে কোনও আবেগ নেই, শুধু দৃঢ়তা। কাগজটা বাড়িয়ে দিল সোহার দিকে। সোহা দ্বিধা নিয়ে কাগজটা হাতে নিল। খুলে দেখতেই বুক কেঁপে উঠল, ডিভোর্স পেপার।
মুহূর্তেই সময় থেমে গেল যেন। তার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হতে লাগল, শরীর অবশ হয়ে এলো। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো ওরহানের দিকে।
কিন্তু ওরহান আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত। তার ঠোঁট থেকে ভেসে এলো গভীর অথচ নিস্তরঙ্গ কণ্ঠ—
-"তোমার ইচ্ছে পূরণ করলাম। হ্যাঁ, ধোঁকা দিয়ে তোমাকে বিয়ে করেছিলাম। তুমি ডিভোর্স চাইছিলে, আমি তোমাকে দিলাম। জোর করে কাউকে পাওয়া যায় না... আমি দেরি হলেও বুঝেছি।"
সোহার বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। সমস্ত শক্তি যেন গলে মাটিতে মিশে গেল। তার হাত কাঁপছে, চোখে অসহায়তা জমে উঠছে, আর ভিতরে এক তীব্র শূন্যতা।
ওরহানের সই করা কাগজটা সামনে। সোহা শুধু সই করলেই সব শেষ। কাগজে একবার তাকাল সোহা, তারপর চোখ উঠাল ওরহানের দিকে, চোখে অসংখ্য প্রশ্ন, অথচ ঠোঁট নীরব।
ওরহান আবার বলল, শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে—
-"ডিভোর্স দিতে চাও না?"
সোহা ঠোঁট শুকনো, কিন্তু গলায় হঠাৎ শব্দ উঠল—
-"কে বলল চাই না।"
কাঁপা হাতে কলম ধরল সে, সই করল কাগজে। সেই সইয়ের শব্দ যেন হৃদয়ে দাগ কেটে গেল। কাগজটা ফিরিয়ে দিল ওরহানের হাতে।
ওরহান কাগজ গ্রহণ করল। ঠোঁটে ফুটল এক হালকা, তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া মেশানো হাসি। তারপর এক দীর্ঘ নীরবতা। সোহা ভেবেছিল এখানেই সব শেষ। কিন্তু না, ওরহান হঠাৎ আরেকটা কাগজ বের করল।
সেই কাগজটা এগিয়ে দেওয়ার সময় তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত আলো। আগের চেয়ে গভীর, বোঝা যায় না এমন এক জোছনা, যা সোহাকে আরও বিভ্রান্ত, আরও অসহায় করে তুলল।
তার সামনে রাখা হলো একখানা কাগজ। ভারী নীরবতার মাঝে কাগজটার শব্দ যেনো বজ্রপাতের মতো শোনা গেল।
-"তোমার বাড়ির দলিল। তোমাকে আর অন্য কোথাও থাকতে হবে না। বাড়ি ফিরে যাও। আর... এক কোটি টাকা আমায় দিয়ে দিও। আমার টাকায় কেনা বাড়িতে তুমি থাকবে না, আমি জানি। তাই তোমার সম্মানে আঘাত না লাগুক ভেবেই নিজেই টাকা চেয়ে নিলাম।"
কথাগুলো ছুরির মতো কেটে গেল চারপাশের স্তব্ধতা। বাতাসে এক অদ্ভুত চাপা ভার তৈরি হলো।
কিছুক্ষণ ওরহান স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। তার চোখে যেনো হাজার ঝড় জমে আছে, অথচ ঠোঁট অচল, কোনো শব্দ বেরোলো না। সময়টা যেনো জমে গেল, ঘড়ির কাঁটাও থেমে গেল তার সেই নীরবতার সাথে।
হঠাৎ, ধীরে ধীরে, ওরহান আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিলো। তার দৃষ্টি গভীর, দৃঢ়, যেনো নিজের ভেতরের সমস্ত অশান্তি চাপা দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
-"ভেলভেট ব্লুম-এর আমার সব শেয়ার তোমার নামে করে দিয়েছি। কাবিন শোধ হয়ে গেছে। তুমি এখন ভেলভেট ব্লুম-এর সিইও। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ভেলভেট ব্লুম-এর ত্রিসীমানায় আমি আর কোনোদিনও পা রাখবো না।"
তার কণ্ঠে ছিলো নিঃশব্দ বজ্রধ্বনি। সেই প্রতিজ্ঞা কেবল কথার সীমায় রইলো না, এ যেনো এক অদৃশ্য শপথ, যা সোহার আত্মাকে শিহরিত করে তুললো।
ঘর নিস্তব্ধ। বাতাস স্থির। কাগজের সাদা পাতায় লেখা কালো অক্ষরগুলো যেনো নিজেরাই জীবন্ত হয়ে উঠলো, এখানে শেষ হলো এক অধ্যায়, আর শুরু হলো আরেক অনিশ্চিত যাত্রার।
সোহা অবাক হয়ে গেল। যে বাড়ি ফেরত নেবার শক্তি ও সাহস তার নিজের ছিল না, সেই বাড়িই কীভাবে ফিরিয়ে আনলো ওরহান? আর সিইওর চেয়ার, যেটি দখল করতে ওরহান একসময় সব ছলচাতুরি, শেয়ার কেনাবেচার খেলা খেলেছিল, আজ সে-ই আবার নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দিলো! কেন? ওরহানের ভেতরে কী এমন পরিবর্তন ঘটছে?
প্রশ্নগুলো সোহাকে ঘিরে ধরছিল। সে মুখ খুলে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, ঠিক তখনই বাতাস কেটে এলো এক কণ্ঠস্বর। গভীর পুরুষকণ্ঠ। তীক্ষ্ণ, বিরক্ত, প্রায় চেঁচিয়ে বলা শব্দ।
ওরহান আর সোহা দু’জনেই চমকে ঘুরে তাকালো। শব্দের উৎস সন্ধান করে তারা ধীরে ধীরে এগোল।
ভেতরের ঘর থেকে আসছে সেই আওয়াজ। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা ধরা পড়লো চোখে, এক পুরুষ ফোনে কথা বলছে, কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা। তার গায়ে সোনালী রঙের পাঞ্জাবি, আলোয় ঝলমল করছে। কিন্তু কণ্ঠস্বর কাঁপছে রাগ আর অস্থিরতায়—
-"আমি সোহাকে ভালোবাসি না। কতবার বলব তোদের?"
কিছুক্ষণের বিরতি, ফোনের ওপাশ থেকে কারও কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু তা অস্পষ্ট। তারপর আবার শব্দ ছুটে এলো—
-"হ্যাঁ, আমি বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো আমি ওকে ভালোবাসি। কিন্তু সাজেকের শেষ দিনে বুঝেছি, আমার সব অনুভূতি, আমার সমস্ত টান ছিল শিফার জন্য। আমি যা ভেবেছিলাম, যে সোহাকে ভালোবাসি, তা আসলে ভুল ছিল।"
-"..."
-"হ্যাঁ... আমার এই ভুলের জন্যই আমাদের প্ল্যান সাকসেসফুল হয়নি। তবে এখন সবকিছু হচ্ছে। এখন আর কোনো বাধা নেই।"
ফোনের ওপাশ থেকে অস্পষ্ট গুঞ্জন ভেসে এলো। তারপর আবার গর্জে উঠলো সেই পুরুষকণ্ঠ—
-"সোহার বাড়ি ওরহান ফিরিয়ে নিয়েছে মানে? কী বলছিস তুই? কবে হলো এসব?"
-"..."
-"এইজন্যই তো ওরহান আজ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত! আচ্ছা... সমস্যা নেই। ওর কর্মজীবন আমি ধ্বংস করবোই। এবার পালানোর পথ নেই।"
কণ্ঠে অদ্ভুত দম্ভ, ঘৃণা আর এক ধরনের শয়তানি হাসির আভাস।
-"..."
-"কীভাবে করবো শুন। ওকে আমি আমার কোম্পানিতে এনেছি। ইন্টারন্যাশনাল ডিজাইন অনুষ্ঠানে পাঠাবো ওকে। আর সেখানেই... ওর জীবন শেষ করে দেবো। ঠিক যেমন রশ্মির জীবন ধ্বংস করেছে। বদনাম করে মাটিতে মিশিয়ে দেবো।"
শব্দগুলো সোহার শরীরে ঠাণ্ডা স্রোতের মতো বয়ে গেল। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। হাত কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতর তীব্র কাঁপন।
ওরহান জানতো! আজ সে সবটা সত্যি উদ্ঘটন করেছে। তার চোখে নেই কোনো বিস্ফোরণ, বরং এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা, যেনো সবকিছু অনুমান করেই রেখেছিল। সে নিজেই সোহাকে সব বলতো। তার আগেই সব সামনে চলে এলো।
সোহা হঠাৎ কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলে ফেললো—
-"কে রশ্মি, মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী? কার জীবন ধ্বংস করেছি আমি?"
শব্দটা বজ্রপাত হয়ে আঘাত করলো। তীব্র নীল চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে পেছনে তাকালো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সোহা আর ওরহান। তাদের চোখ দুটো যেন আগুনে জ্বলছে।
এক মুহূর্তে তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। চোখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। ফোনটা তার হাত থেকে শব্দ করে মেঝেতে পড়ল।
চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু বাতাসের ফিসফিসানি, যেন সাক্ষী হয়ে থাকলো এই বিস্ফোরণের।
পুরো ঘর জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। যেন বাতাসও থমকে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ঠাস্ করে শব্দ হলো, তীব্রর কাঁপা হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সেই ভাঙনের কর্কশ আওয়াজ ছিন্ন করে দিল স্থবিরতার দেয়াল।
সোহা ও ওরহান ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলো। দু’জনের দৃষ্টি নিবদ্ধ তীব্রর দিকে। সোহা তীব্রর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার চোখে প্রশ্ন, অথচ কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা—
-"আমি যতদূর আন্দাজ করতে পারছি, রশ্মি আপনার ছোট বোন। এর আগে-ও আপনি তার কথা বলেছিলেন। আমি না আপনাকে চিনি, না আপনার পরিবারকে। তবে বলুন, আমি কীভাবে আপনার বোনের জীবন ধ্বংস করলাম?"
ঘরটা যেন মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সোহার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো, ঝড়ের আগে জমে ওঠা নীরবতার মতো।
তীব্রর চোখে আগুন দপদপ করছে। নিজের আদরের ছোট বোনের নাম সোহার ঠোঁট থেকে বেরোতেই যেন মনের ভেতর দাউদাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে এলো, সোহাকে আঘাত করতে উদ্যত হলো।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ওরহান ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক নিঃশ্বাসে সোহাকে টেনে নিল নিজের আড়ালে। ওর দৃষ্টি কঠিন, কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ ও দৃপ্ত—
-"নিজের সীমা অতিক্রম করবে না, তীব্র। তুমি ভুলে যাচ্ছ, তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছো, আর কার গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিলে।"
ঘরটা যেন আরও উত্তাল হয়ে উঠল এই সংঘর্ষের আঁচে। তীব্র রাগে ফেটে পড়ল, বুক ধড়ফড় করছে, চোখ রক্তবর্ণ—
-"কিছু ভুলি নি আমি, কিছুই না! এই মেয়েটা... এই মেয়েটাই আমার হাসিখুশি পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করেছে। ওকে শাস্তি পেতেই হবে। সাহস কোথা থেকে পায় ও আমার বোনের নাম মুখে আনার!"
তার কণ্ঠ যেন বজ্রপাতের মতো ঘর কাঁপিয়ে উঠল। নিস্তব্ধতা ভেঙে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল চারদিকে।
সোহা হতভম্ব। এই তীব্রকে সে যেন চিনতেই পারছে না। চোখে-মুখে শুধু বিষ, শুধু ঘৃণা, আর সেই ঘৃণার লক্ষ্য একমাত্র সে। শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁপন নেমে এলো। ঠোঁট শুকিয়ে গেল, শব্দ গলা থেকে বেরোলো না। বিষণ্ন, বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কেবল তাকিয়ে রইল সোহা।
এদিকে তীব্র আর ওরহানের চিৎকার-চেঁচামেচি যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে। হলঘর জুড়ে প্রতিধ্বনি কাঁপিয়ে তুলছে দেয়াল। হট্টগোল শুনে হলরুম থেকে সবাই ছুটে এলো। ওসমান, আকাশ, ইহাব, মুফতি, মারুফ মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তীব্র আর ওরহানকে আলাদা করে ধরে রাখতে। দু’জনের উত্তপ্ত শরীর থেকে তীব্র শ্বাস বেরোচ্ছে, যেন মুহূর্তেই আবার বিস্ফোরণ ঘটবে।
বাকি সবাই দাঁড়িয়ে আছে হতভম্ব, বিস্ময়ের ঘোরে স্তব্ধ। কেউই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এই দৃশ্যটা সত্যি। এমন সময় ওমর খান এগিয়ে এলেন। তাঁর কণ্ঠ গম্ভীর, অথচ উদ্বেগে ভরা—
-"কি হয়েছে? তোমরা কি শুরু করলে?"
ঠিক তখনই সাবা ছুটে এলো। আতঙ্কে কাঁপতে থাকা সোহাকে জড়িয়ে ধরল বুকের ভেতর। তার সাথে যোগ দিল শিফা। সোহার এই বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ অবস্থা দেখে সাবা আর শিফা একসাথে উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করল—
-" কি হয়েছে? বলো না...!"
ঘর জুড়ে তখনো উত্তেজনার ভারী শ্বাস, অব্যক্ত ভয়ের ছায়া, আর অজানা এক আশঙ্কার দমবন্ধ করা আবহ।
ওরহানের চোখ রক্তবর্ণ রাগে ঝলসে উঠল। হঠাৎ সে গর্জে উঠল, তীব্রর দিকে ইশারা করে—
-"ওকে জিজ্ঞাসা করো, হ্যাঁ ওকেই! ও-ই আসল অপরাধী। ও তার ছোটভাই তূর্য নীল চৌধুরীকে দিয়ে সোহার বাড়ি হাতিয়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সোহার ক্ষতি করতে চেয়েছে
ঘরটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল। চারপাশের সবাই নিস্তব্ধ, নিঃশ্বাস আটকে শুনছে। বিস্ময়ে, অবিশ্বাসে সবার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল তীব্রর দিকে। যেন প্রতিটি চোখ তার মুখ থেকে সত্যটা ছিনিয়ে নিতে চাইছে।
সোহা হঠাৎ কেঁপে উঠল। বুক কাঁপছে, ঠোঁট কাঁপছে। কণ্ঠস্বর ভাঙা, আতঙ্কে মোড়া—
-"আপনি... সব জানতেন?"
ওরহানের চোখ নরম হলো। উত্তাল রাগের ভেতর থেকে যেন শান্ত স্রোত বয়ে এলো। ঠান্ডা, নিয়ন্ত্রিত স্বরে বলল—
-"আজকেই সব জানতে পেরেছি। তোমাকে বলার আগেই তুমি তীব্রর মুখে সব শুনে ফেলেছ।"
এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল সোহা। তারপর ঠোঁটের কোণে ফুটল তাচ্ছিল্যের এক ব্যঙ্গাত্মক হাসি। সেই হাসির ভেতর জমা হলো অভিমান, ভাঙন আর অনাদরের তীক্ষ্ণতা। চোখ তুলে সোজা তীব্রর দিকে তাকিয়ে বলল সে—
-"ফাঁসির আসামী জানে তার অপরাধ কী। আদালতে বিচার হয় তার। কিন্তু আমার? আমার তো কোনো বিচারই হলো না। শুধু শাস্তি নির্ধারণ হলো। তো বলুন মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী, আমি কি জানতে পারি আমার অপরাধ? নাকি আমার কি সেই অধিকার নেই?"
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সোহার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো চারপাশে, একটি আহত হৃদয়ের আর্তনাদ, যা যেন সবার বুক ভেদ করে গিয়ে গেঁথে বসলো।
তীব্র এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। এলোমেলো পাঞ্জাবির ভাঁজ ঠিক করে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁয়ে গেলো উপস্থিত প্রতিটি মুখে। মুহূর্তের জন্য যেন পুরো হলঘর নিস্তব্ধ। হঠাৎ শিফার চোখের সঙ্গে চোখ মিলতেই তার শরীর কেঁপে উঠল। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে, ভারী কণ্ঠে বলতে শুরু করলো—
-"আমাদের পরিবার ছিল অতি ছোট্ট একটি আশ্রয়। দুই ভাইয়ের অমূল্য ধন ছিল একটি মাত্র বোন। বাবা-মা, আমরা সবাই মিলে হাসি-আনন্দে ভরিয়ে রাখতাম সংসার। আর সেই সংসারের প্রাণ, আমাদের হৃদয়ের আলো ছিল আমার বোন, রশ্মি তেহজীব চৌধুরী।
রশ্মির স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী। সে ডিজাইনার হতে চাইত, পৃথিবী জয় করতে চাইত তার সৃষ্টির শক্তি দিয়ে। ফ্রান্সে পড়াশোনা করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতিটি দিন কাটাতো সে।
ঠিক সেই সময় ভেলভেট ব্লুম কোম্পানি আয়োজন করলো একটি ফ্যাশন শো। ঘোষণা ছিল, যে জিতবে, সে পাবে বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নপূরণের স্কলারশিপ। রশ্মি জীবনকে বাজি রেখেছিল সেই প্রতিযোগিতায়। কিন্তু ফলাফল এল অন্যরকম। বিজয়ী হলো মিস সোহা। আর আমার বোন? হেরে গেলো।
কিন্তু এ হার কোনো স্বাভাবিক হার নয়। প্রতারণা, ছলচাতুরির শিকার হয়েছিল রশ্মি। তার নিঃশব্দ রাতগুলোতে যত্নে তৈরি করা পোশাক চুরি করে নিল সোহা। আর তার জায়গায় রেখে দিলো অন্য পোশাক, যা রশ্মির সৃষ্টি ছিল না। ফলে, অবিচারের বোঝা বয়ে হেরে গেলো আমার বোন।
সেদিন, সেই মঞ্চের বাইরে, পরাজয়ের দহন আর অপমানের আগুনে দগ্ধ হয়ে রশ্মি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। ভাগ্যক্রমে মৃত্যু তাকে ছুঁতে পারেনি, কিন্তু বেঁচে থেকেও সে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর অভিশাপে আবদ্ধ হলো। সে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেললো হাঁটার ক্ষমতা।
আমার বোনের কান্না, সেই অঝোর অশ্রু, আমাদের দুই ভাইয়ের বুক ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। আমরা সহ্য করতে পারিনি তার সেই বেদনার আর্তনাদ। প্রতিটি অশ্রুবিন্দু ছিল আমাদের অন্তরে গেঁথে দেওয়া বিষাক্ত তীর। তাই শপথ নিয়েছিলাম প্রতিশোধ নেবো।
বছরের পর বছর আমরা খুঁজেছি সোহার নাম, তার অস্তিত্ব, তার ছায়া। অবশেষে আমরা তাকে পেয়েছি।
আপনিই বলুন, মিস্টার ওরহান খান! যদি আপনার বোন শিফার সঙ্গে এমন অবিচার হতো, আপনি কি চুপচাপ বসে থাকতেন? আপনি কি সহ্য করতে পারতেন তার জীবনের আলো নিভে যাওয়ার সেই দৃশ্য?"
ওরহানের বুক থেকে বজ্রগর্ভ গর্জন বেরিয়ে এলো,
এক নিমিষে যেন পরিবেশ কেঁপে উঠল। নিস্তব্ধ ঘরে চাপা শ্বাস, কারো গলা শুকিয়ে এলো, আর শিফার চোখে ভয়ের ছায়া দপদপ করে জ্বলে উঠলো।
-"তোর মতন অন্ধ আমি নই!" ওরহান বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলো।
-"শুধু বোনের মুখের কথা বিশ্বাস করে কোনো প্রমাণ ছাড়াই কাউকে দোষী বানিয়ে তার জীবন ধ্বংস করতে যাই না আমি। প্রমাণ ছাড়া এই ওরহান কিছু করে না!"
খান পরিবারে তখন নেমে এলো অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। বাতাস পর্যন্ত যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। অবিশ্বাস আর হতবাক দৃষ্টিতে সবাই তাকিয়ে আছে তীব্রর দিকে। সোহা, যে এতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছিল, তার দিকে চোখ রাখতে কারো সাহস হলো না। তীব্রর অভিযোগে ঘরের ভেতর যেন তীব্র ঝড় বইছে, কিন্তু সেই ঝড়কে ছিঁড়ে হঠাৎ সাবা চিৎকার করে উঠলো—
-"আমার বোন কিছুই করে নি! সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম। আমার চোখের সামনে সবকিছু হয়েছে। আমার বোন কোনো অন্যায় করে নি, আমি সাক্ষী!"
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেলো। তীব্র এক তাচ্ছিল্যের হাসি খেলিয়ে দিলো ঠোঁটে, যেন কাঁটার মতো বিঁধে গেলো সবার অন্তরে।
-"সে তোমার বোন। তাকে বাঁচাতে মিথ্যে বলাটা তোমার কাছে সহজ। তাই না?"
সোহার বুকের ভেতর জমে থাকা দুঃখ, অপমান আর ক্ষোভের বাঁধ এক নিমিষে ভেঙে গেলো। সে আর নিজের আবেগ আটকাতে পারলো না। হঠাৎই সাবা ও শিফার হাত সরিয়ে দিয়ে বজ্রদ্রুত পায়ে তীব্রর সামনে এসে দাঁড়ালো।
তারপর—
ঠাস! ঠাস!
পরপর দুটি তীব্র চড় বসলো তীব্রর গালে। মুহূর্তেই হলঘর স্তব্ধ। কারো নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন শোনা যাচ্ছে না।
তীব্র স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে রইলো সোহার দিকে। নিজের গালে হাত চেপে ধরে সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না সে। উপস্থিত সকলে হতবাক। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।
সোহা তখন আগুনঝরা চোখে তীব্রর দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো—
-"আহাম্মকের দল সব! তোর বোন একটা কথা বললো, আর তার সত্যতা যাচাই না করেই তুই আমার জীবন ধ্বংস করতে ছুটে এলি? যে অপরাধের জন্য আমাকে দোষী বানালি, তার প্রমাণ আছে তোদের কাছে? একটাও?"
সোহার কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে আগুন জ্বলছে। ঘরের নিস্তব্ধতা বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠছে তার কথায়।
-"তোরা দুই ভাই কুত্তার মতো আমার পিছু নিয়েছিস। আমাকে সব দিক থেকে নিঃস্ব করার জন্য রক্তচোষার মতো লেগে গেছিস। কিন্তু কখনো কি ভেবেছিস, আমি আদৌ দোষী কি না? কখনো কি জানার চেষ্টা করেছিস সত্যটা?"
সোহার গলা থেমে এল। বুক ওঠানামা করছে তীব্র শ্বাসে। চোখ বেয়ে অঝোর অশ্রু ঝরছে, তবু সে থামছে না। কণ্ঠে জ্বলছে আগুন—
-"যতবার চেষ্টা করেছিস, আমাকে ভাঙতে পারিস নি। কারণ আমি অপরাধী নই! আমি নির্দোষ!"
হঠাৎ সে স্তব্ধ হলো। নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু তার হাপরের মতো ওঠানামা করা শ্বাসের শব্দ। চোখের কোণ বেয়ে নামছে অশ্রু, অথচ মুখভঙ্গি জ্বলে উঠছে অগ্নিশিখার মতো। সোহা হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে আবারও ঝড়ের মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
-"সাজেকে আমার ওপর যে হামলা হয়েছিল... সেটাও কি আপনি করিয়েছিলেন?
তীব্র মুহূর্তের জন্য থমকালো, চোখ নামিয়ে আনলো। তারপর ঠোঁট থেকে বেরোল ভারী স্বর—
-"না!"
সোহার চোখ আরও শাণিত হলো। কণ্ঠ কাঁপছে রাগে আর বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণায়—
-"কীভাবে বিশ্বাস করবো আপনাকে? যেখানে আমার কোনো অপরাধ ছিল না, তাও বিশ্বাস না করে আমার জীবন ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন, সেখানে মিথ্যে বলাটাও তো আপনার কাছে তুচ্ছ ব্যাপার। তাই না?"
ঘরের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ। সবার চোখে একসাথে বিস্ময় আর ভয়। তীব্র আবারও বললো—
-"আমি যা করেছি, তা সব স্বীকার করার ক্ষমতা আমার আছে।"
এক মুহূর্তের জন্য ঘরজুড়ে নেমে এলো মৃত্যুর নীরবতা। আর ঠিক তখনই, সোহা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো!
তার সেই হাসি ছিল না স্বাভাবিক, না আনন্দের। যেন দুঃখ আর যন্ত্রণার গভীর খাদ থেকে উঠে আসা ভৌতিক প্রতিধ্বনি। চারপাশের দেয়ালগুলো কেঁপে উঠলো তার উন্মাদনার সুরে।
উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কারো মুখ দিয়ে কথা বের হলো না। খান পরিবারের বুকের ভেতর দুশ্চিন্তার শীতল ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো। কেউ কেউ আতঙ্কে এক পা পেছিয়ে গেলো। মনে হলো অতিরিক্ত মানসিক চাপে মেয়েটা ভেঙে পড়ছে, না আবার কোনো সর্বনাশ ঘটায়!
সোহার হাসি থামছে না। অথচ সেই হাসির ভেতর দিয়ে গাল বেয়ে নামছে অশ্রুধারা। চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রু টপ টপ করে পড়ছে মেঝেতে। সোহার কণ্ঠে তখন অদ্ভুত এক মিশ্র সুর, অট্টহাসি, কান্না আর হাহাকার একসাথে বাজছে। চোখ বেয়ে অশ্রু টলটল করে ঝরছে, কিন্তু ঠোঁটে এখনো আঁকা আছে বেদনাভরা হাসি। সে ফিসফিসে অথচ বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলো—
-"আজ যদি আমার একটা ভাই থাকতো...!"
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রত্যেকটি মানুষ নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
-"আজ যদি আমার একটা ভাই থাকতো, খুব ভালো হতো। এই যে বোনের জন্য দুই ভাই ছুটে এসেছে একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন ধ্বংস করতে, আমার ভাই থাকলেও নিশ্চয়ই আসতো আমাকে বাঁচাতে। অথবা আমার বাবা থাকলে, সেও নিশ্চয়ই আসতো আমাকে রক্ষা করতে।"
সোহার গলা কেঁপে উঠলো। চোখের কোন বেয়ে টলটল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, অথচ ঠোঁটে অদ্ভুত এক বিদ্রূপাত্মক হাসি।
-"কিন্তু আমায় জন্ম দিয়েছে এক অমানুষ। তার চোখে সে ছাড়া বাকি সবাই খারাপ। কবে কোথায় হঠাৎ এক ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো, তার চোখে সেই ছেলেই হয়ে গেলো দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য মানুষ। আর তাকে অপমান করে বাড়ি ফিরে এলো।"
সোহার বুক ওঠানামা করছে তীব্র শ্বাসে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরলো শাড়ির আঁচল। তারপর ভাঙা অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলো—
-"সেই ছেলে তার অপমানের শোধ নিতে বেছে নিলো আমায়। কারণ, আমার বাপ থেকেও নেই, ভাই নেই। আমি তো সহজ টার্গেট। তাই আমার সম্মানহানি করাটা তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। আমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়াটা তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ।"
সোহার গলা তখন কাঁপছে, চোখ জ্বলছে ক্ষোভে—
-"তারপর এলো দুই ভাই প্রতিশোধ নিতে। যেই অন্যায়, যেই অপরাধ আমি কখনো করিনি, সেই অপরাধের বোঝা চাপিয়ে দিলো আমার গায়ে। সবার চোখে আমি দুর্বল, আমি অসহায়। তাই যার যখন ইচ্ছে আমায় আঘাত করছে, প্রতিশোধ নিচ্ছে আমার ওপর।"
হঠাৎই সে চিৎকার করে উঠলো—
-"কেনো? কী অপরাধ আমার? আমি জন্ম নিয়ে কি খুব বড় ভুল করে ফেলেছি নাকি?"
তার কণ্ঠে বজ্রের গর্জন, চোখে অশ্রু, শরীরে কাঁপন। ঘরের প্রতিটি মানুষ নিস্পন্দ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাতাস ভারী হয়ে এসেছে, যেন অশ্রু ও রক্তের গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ।
সবাই নিস্তব্ধ। মাথা নিচু করে আছে যেন শোকসভায় উপস্থিত। তীব্রর ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে, কথা বলার শক্তি যেন হঠাৎ হারিয়ে ফেলেছে। সাবা, নিলুফার বেগম, শিফা, সুরিয়া বেগম, সবাই অঝোরে কাঁদছে।
ওদের চোখের পানি যেন ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছে। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে সোহার দিকে।
ওরহান এগিয়ে আসতে চাইলো। কিন্তু সোহা হঠাৎ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে বাতাসও যেন থমকে দাঁড়ালো। তারপর ধীর অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—
-"পড়ে আসবেন না ক্ষমা চাইতে মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী। ঐ যে দেখুন, "দ্য গ্রেট ওরহান খান শাহি" আজ ক্ষমা চাইছে! মাসের পর মাস কেটে গেছে। জানেন, আমার খুব করে ইচ্ছে করে তাকে ক্ষমা করে দিতে, আপন করে নিতে, ভালোবাসি তো, তাই তার কষ্ট আমার সহ্য হয় না। কিন্তু... ওই ধোঁকা, আমি ভুলতে পারি না। জানেন আজ আমার ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে। আমাকে ডিভোর্স দিয়েছেন সে। কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছে।"
কথাগুলো বলেই সোহা হঠাৎ হেসে ফেলল, একটা তীব্র, বিদ্রূপ মেশানো হাসি। ওরহানের দিকে তাকাল সে। ওরহানের চোখে অসহায়ত্বের কুয়াশা, সেই দৃষ্টি যেন কেবল একটাই কথা বলছে, "আমি তোমাকে ভালোবাসা দিতে চেয়েছি কলঙ্ক নয়!"
কিন্তু ডিভোর্সের উচ্চারণ ঘরে বজ্রপাতের মতো নামল।
সবার নিঃশ্বাস আটকে গেল। হঠাৎ মনে হলো, যেন ঘরের চারপাশে নীরবতার মেঘ জমে আছে, আর প্রত্যেকে সেই মেঘের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সোহার দিকে।
সোহা চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে দু’পা এগোল তীব্রর দিকে। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আগুন—
-"ক্ষমা করব না আপনাকে। আপনারা সবাই বিনাদোষে আমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছেন। আমার চোখে আপনারা সকলেই দোষী। তাই এবার আমার পালা, আমার প্রতিশোধের পালা। আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবো, আর সেই মুহূর্তে আপনি ক্ষমা চাইতে আসলেও আমি ফিরিয়ে দেবো আপনাকে।
কেনো আমি সব সময় সবাইকে বুঝবো? আমাকে কি বোঝে কেউ? কেনো আমি সবার ভুল ক্ষমা করব? আমাকেই বা কবে ক্ষমা করা হয়েছে?
আমার নিজের জন্মদাতা মাঝরাতে জানোয়ারের মতো আমাকে পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো। সে কি কখনো ক্ষমা চাইলো? সে কি আমাকে ক্ষমা করলো? না, বরং সবাই মিলে বিচারকের আসনে বসে আমাকেই দোষী সাব্যস্ত করলো।
আজ সময় এসেছে আমি সেই রায় ফিরিয়ে দেবো। আজ আমার পালা প্রতিশোধের।
বাড়ি ফিরে যান, মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী। সত্যকে খুঁজে বের করুন। আর সাবধান থাকবেন, যেনো পরে আফসোস করতে না হয়।"
এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠলো। চারপাশের দেয়ালগুলো পর্যন্ত যেন শিউরে উঠলো সেই কণ্ঠের আগুনে। মনে হলো, প্রতিটি শব্দ কাঁপিয়ে দিচ্ছে রাতের স্তব্ধতা, আর প্রতিশোধের ছায়া ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে সবাইকে।
বলেই সোহা উল্টো ঘুরে বেরিয়ে পড়লো। ঘূর্ণিঝড়ের মতো ছুটে চলেছে সে। তার পেছনে ছুটছে ওরহান। হঠাৎই সোহা ধাক্কা খেলো স্নেহার সাথে। স্নেহা চিৎকার করে ডাকলো তাকে, কিন্তু সোহা যেন বধির! কান পর্যন্ত পৌঁছালো না সেই আর্তনাদ।
আকাশও যেন এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। বজ্রপাতের গর্জন বিদীর্ণ করে দিচ্ছে নিস্তব্ধতা, ঝড়-বৃষ্টি ঝরে পড়ছে অবিরাম। অন্ধকার রাতের নির্জন রাস্তায় ছুটে চলেছে সোহা। বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সে থেমে নেই। রাস্তা ফাঁকা, একটি গাড়িও নেই।
হঠাৎই, কোথায় থেকে যেনো একটি প্রাইভেটকার তীব্র বেগে ছুটে এলো। মুহূর্তেই ধাক্কা মারলো সোহাকে। বজ্রপাতের মতোই আছড়ে পড়লো সে মাটিতে।
ওরহান তখন দৌড়ে আসছিলো পেছন থেকে। আর্তনাদ ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো তার গলা থেকে, এক বীভৎস, হৃদয় বিদারক চিৎকার। সে ঝড়ের বেগে ছুটে গেলো সোহার দিকে। মাটিতে লুটিয়ে থাকা শরীর দেখে তার চোখে যেন পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে গেলো।
ওরহানের সেই চিৎকার শুনে সকলে বেরিয়ে এলো।
আর মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেলো চারদিক। ঝড়, বজ্রপাত, বৃষ্টি, সব মিলেমিশে তৈরি হলো এক ভয়ঙ্কর আবহ, একটি নির্দয়, রক্ত হিম করা দৃশ্যের সামনে সবাই থমকে দাঁড়িয়ে রইলো।
ওরহান ধপ করে মাটিতে বসে পড়লো। কাঁপা হাতে তুলে নিলো সোহার মাথাটা। রক্ত ঝরছে অবিরাম। বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটা সোহার নিস্পন্দ মুখশ্রীতে আঘাত হানছে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। কপাল বেয়ে রক্তের ধারা নেমে এসেছে, মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির স্রোতে। ওরহানের সাদা পাঞ্জাবি মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠলো।
সে কাঁপা কণ্ঠে ডাকলো—
-"সোহা... সোহা..."
কিন্তু কোনো উত্তর নেই। নিঃশব্দ শূন্যতা যেন আরও গভীর হলো। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই ছুটে এসে ঘিরে ধরলো তাদের। মুহূর্তেই দৃশ্যপটে নেমে এলো মৃত্যুর বিষণ্ণ আবহ।
হঠাৎই ওরহান আর্তনাদ করে উঠলো। সেই আর্তনাদ ছিঁড়ে গেলো আকাশ-বাতাস। চারপাশের আকাশ তখন ঘন অন্ধকারে ডুবে গেছে। নিস্তব্ধতা এত ভারী, মনে হলো মৃত্যুপুরীর কোনো পর্দা যেন নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। শোনা যাচ্ছে শুধু এক অসহায় পুরুষের হাহাকার, একটা আর্তনাদ, যা বুক চিরে আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ওরহানের শরীর কাঁপছে, বুক ওঠানামা করছে ব্যথার তীব্রতায়। শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। সে কাঁপা হাতে সোহার নিস্পন্দ মুখে হাত রাখলো। তার চোখ থেকে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়লো, টুপটাপ ঝরে পড়ছে সোহার গালে। কিন্তু জীবনের আলো আর নেই। সেখানে শুধু মৃত নিস্তব্ধতার প্রতিধ্বনি। ওরহান হাহাকার মেশানো কন্ঠে ডেকে উঠল—
-"আইইই... আইইইই... চোখ খোল! তুমি তো ডিভোর্স চেয়েছিলে, আমি দিয়েছি! তাহলে চলে যাচ্ছো কেনো?"
ওরহানের গলা ভেঙে আসছে, কণ্ঠে অসহায়তা। চোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুর স্রোত, যেন বন্যার মতো আছড়ে পড়ছে বুকের গভীরে। কাঁপা কণ্ঠে সে আকুল হয়ে বলতে থাকে—
-"চোখ খোল বলছি... দেখো, আমি... আমি তোমার সব কথা শুনবো। আর কোনোদিন তোমাকে কষ্ট দেবো না, আঘাত করবো না। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি তো বলেছিলে, ডিভোর্স দিলে ক্ষমা করবে, ঘৃণা করবে না। তাহলে নিজের কথা রাখছো না কেনো?"
হঠাৎ বুক ফুঁড়ে কান্না ফেটে বের হলো তার ভেতর থেকে—
-"ও মা... মা! ওকে বলো চোখ খুলতে! আমার বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে... শ্বাস নিতে পারছি না। মা, তুমি বলো, ও যেনো আমার সাথে ঝগড়া করে! তুমি বললে ও শুনবে। আমি মরে যাবো ওকে ছাড়া মা গো... আমি পারবো না, মা... আমি পারবো না! ওকে বলো, আমার কষ্ট হচ্ছে... তোমরা কেউ তো কিছু বলো!"
আকাশ ভারী মেঘে ঢেকে গেছে, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে চারপাশে মৃত্যুর স্নিগ্ধ শীতলতা। আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা আর্তনাদ ছিঁড়ে দিচ্ছে রাতের সমস্ত নীরবতা। মনে হচ্ছে পৃথিবীর বুক জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই হাহাকার, এক অসহায় পুরুষের চরম ভাঙন।
ওরহান কাঁপা হাতে সোহার গালে বারবার হালকা থাপ্পড় দিচ্ছে। কিন্তু সাড়া নেই। তার ভাঙা কণ্ঠে আবারও করুণ ডাক শোনা গেল—
-"আইইই... আইইইইই... চোখ খোলো? শোনো, আমার কষ্ট হচ্ছে। আমার প্রাণভোমরা... আমাকে না মেরে এভাবে ঘুমিয়ে যাচ্ছো কেনো? জান আমার, চোখ খোলো না।"
শব্দ আটকে যাচ্ছে বুকের গভীরে। প্রতিটি অক্ষর গলে অশ্রুবিন্দু হয়ে সোহার নিস্প্রাণ মুখে পড়ছে। চারপাশে নীরবতা জমাট বেঁধে আছে, শোকের ভারে বাতাসও যেন হাঁপিয়ে উঠেছে।
হঠাৎই ওরহান বুক ফুঁড়ে হাহাকার করে উঠলো—
-"তোমাকে ভালোবেসে আমি মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছি... ভালোবাসাটা কি আমার অন্যায়? কেনো এত শাস্তি দিচ্ছো আমায়?
পাঁচ বছর আমি জাহান্নামের আগুনে পুড়েছি... আর কত দগ্ধ করবে আমায়?
যদি ভালোবাসা অপরাধ হয়, তবে অপরাধী আমি। আমাকে মৃত্যু দাও, হে আল্লাহ্... কিন্তু আমার প্রাণভোমরাকে এমন শাস্তি দিও না!"
তার বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে। গলা কাঁপছে, অশ্রুধারা থামছে না। ওরহান তাকিয়ে আছে সোহার নিস্পন্দ ঠোঁটের দিকে, যেন সেখান থেকেই ফের জীবনের সাড়া পাবে। ভাঙা গলায় আবারও বলে উঠলো—
-"তুমি ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না... তুমি আমার প্রাণ, আমার বেঁচে থাকার কারণ। চোখ খোলো! দেখো, তোমার ওরহান কষ্ট পাচ্ছে। আর কত কষ্ট দেবে আমায়, জান? এইবার তো ক্ষমা করো!
সোহা জান... আমার কলিজা... আমার চোখের আলো... চোখ খোলো, বেবি... একবার শুধু চোখ খোলো।"
চারপাশের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠলো। অন্ধকার রাত যেন শোকগ্রস্ত হয়ে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, শুধু প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক অসহায় প্রেমিকের উন্মাদনা। এ যেন প্রেমের শেষ আকুতি, শেষ নিঃশ্বাস, যা বুক বিদীর্ণ করে আকাশে গর্জে উঠছে। যেন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ একসাথে গলে মিশে গেছে সেই হাহাকারে।
ওরহানের এই আর্তনাদ কেউ সহ্য করতে পারলো না।
নিলুফার বেগম ও সাবা সোহার এই রক্তাক্ত, নিস্পন্দ অবস্থা আর দেখতে না পেরে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো।
তীব্র আতঙ্কিত দৃষ্টিতে সবকিছু দেখছিলো। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ ভেজা। মনে মনে বিড়বিড় করছে—
"এমনটা তো আমি চাইনি... প্রতিশোধ চেয়েছিলাম, প্রাণ নিতে নয়..."
শিফা একবার ঘুরে তার দিকে তাকালো। কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে তীব্রের দিকে ছুঁড়ে দিলো তীক্ষ্ণ অভিযোগ—
-"এখন নিশ্চয় খুশি আপনি? প্রতিশোধ পূরণ হয়েছে আপনার!"
তীব্র কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু শিফা শুনলো না। তার চোখে তখন শুধু ক্ষোভ আর ঘৃণার স্রোত।
ওসমান দৌড়ে এসে ওরহানের কাঁধে হাত রাখলো। কণ্ঠে তীব্র তাড়াহুড়ো—
-"দাদাভাই, ভাবীকে হাসপাতালে নিতে হবে! জলদি করো, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। দেরি হয়ে যাবে। আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।"
ওসমানের কথা শুনে ওরহান কাঁপা হাতে সোহার গলায় হাত রাখলো। ধুকপুক করছে বুকে, শ্বাস চলছে, তবে ধীরে। সেই মুহূর্তে তার চোখ জ্বলে উঠলো এক আশায়। সে সোহাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে কেঁদে উঠলো। কপালে কাঁপা চুমু খেয়ে বললো—
-"কিছু হবে না, সোনা... আমার বিষরাণী তার বিষে আমাকে বিষাক্ত না করে কোথাও যেতে পারে না। আমি কোথাও যেতে দেবো না তোমাকে... আমি যেতে দেবো না!"
চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে রইলো। বজ্রপাতের আলো ক্ষণিকের জন্য আলোকিত করলো ভিজে রাস্তাটা, যেন আকাশও সেই প্রতিশ্রুতির সাক্ষী হলো।
.
.
.
সোহাকে নিয়ে অবশেষে হাসপাতালে আনা হলো। সঙ্গে নিলুফার বেগম ও সাবাকেও ভর্তি করানো হলো, তাদেরও জ্ঞান হারানো অবস্থায় আনা হয়েছিল।
সোহার মাথায় গুরুতর আঘাত। রাস্তার উঁচু জায়গায় মাথা ঠেকে গিয়েছিল, গাড়ির ধাক্কায় শরীরও ক্ষত-বিক্ষত। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, এ দুর্ঘটনা নিছক কাকতালীয় নয়, কেউ ইচ্ছে করেই তার ওপর গাড়ি তুলে দিতে চেয়েছিল।
হাসপাতালের করিডোরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চারপাশে মৃত্যুভয়ের গাঢ় নিস্তব্ধতা। সবাই অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছে, সময় যেন বয়ে যেতে চাইছে না।
ওরহান ওটি-র সামনে এদিক-ওদিক পায়চারি করছে, প্রতিটি পদক্ষেপে তার অস্থিরতা স্পষ্ট।
অবশেষে ওটি-র ভেতর থেকে সোহাকে বের করে আনা হলো। সবাই ছুটে এলো একসাথে। ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন—
-"২৪ ঘণ্টার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। আপাতত তাকে আইসিইউ-তে শিফট করছি।"
সবার চোখে জল, মুখে ভয়ের ছাপ। ঠিক তখনই নিলুফার বেগম ও সাবার জ্ঞান ফিরলো। তারাও ছুটে এলো, কাঁদতে কাঁদতে সোহার খবর জানতে চাইলো।
কিন্তু ডাক্তার কড়াভাবে জানিয়ে দিলেন, ভেতরে কারো যাওয়ার অনুমতি নেই। সবাই কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো উদ্বিগ্ন হয়ে, অথচ সেই দরজার ওপারে শুয়ে আছে জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর লড়াইয়ে নিস্তব্ধ এক প্রাণ।
ওরহান সেখানে থামলো না। ডাক্তারকে কঠিন হুমকি দিলো, চোখে আগুন জ্বালিয়ে ভয় দেখালো। তারপরে জেদ নিয়ে সোজা ঢুকে গেলো সোহার কেবিনে।
বাকি সবাই তাকে আটকাতে চাইলেও লাভ হলো না।
ওরহানের চোখে তখন একমাত্র লক্ষ্য, সোহার পাশে থাকা। কেউ তার সামনে দাঁড়াবার সাহস পেলো না।
করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। চারপাশে গুমোট অন্ধকারের মতোই ভেসে বেড়াচ্ছিল এক অদৃশ্য ভয়, আর এক অনিশ্চিত প্রশ্ন, সোহা কি বেঁচে ফিরবে?
আইসিইউ কেবিনে মৃত্যুর মতো নীরবতা। যন্ত্রের টুংটাং শব্দগুলোই কেবল জানিয়ে দিচ্ছে, জীবন এখনো কোনো এক সুতোর সঙ্গে লড়াই করছে। সাদা চাদরের নিচে নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে আছে সোহা। তার মুখশ্রী ক্লান্ত, ফ্যাকাশে, চোখদুটো বন্ধ, যেন গভীর নিদ্রার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। মাথার পাশে স্যালাইন ঝুলছে, বুকের ওপর যন্ত্রপাতির সূচক আলো উঠানামা করছে নিস্তরঙ্গ সাগরের ঢেউয়ের মতো।
ধীরে ধীরে দরজাটা খুললো। ভারী পায়ের শব্দে নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠলো। ওরহান প্রবেশ করলো ভেতরে। তার চোখে দুঃস্বপ্নের মতো ভয়ের ছাপ, অস্থির শ্বাসে বুক ওঠানামা করছে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে মৃত্যুর সন্নিকটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সামনে শুয়ে থাকা সোহাকে দেখে তার শরীর শিহরিত হলো।
সে থমকে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ, তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো সোহার মাথার পাশে। কাঁপা হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো তার শীতল আঙুল। ঠান্ডা অনুভূতিতে যেন বুকটা হিম হয়ে এলো।
মেশিনের আলো তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে, অশ্রুবিন্দু দপদপ করে জ্বলজ্বল করছে ম্লান আলোয়।
ওরহানের ঠোঁট কাঁপলো, নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো ফিসফিস—
-"জান, দেখো তুমি একা নও, আমি আছি তোমার পাশে।"
ঘরের বাতাস ভারী, নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে। মনে হচ্ছে পুরো বিশ্ব শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে এই এক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে।
ওরহান ধীরে সোহার হাতের ওপর নিজের কাঁপা হাত রাখলো। অশ্রুসজল চোখে ফিসফিস করে বললো—
-"সোহা... মনে আছে, সঞ্জীবনী বইয়ের সেই লাইনগুলো? "মনের সনে, মন ছুঁয়ে দিলে প্রেম-সন্ধিক্ষণে... আমাদের ফের দেখা হবে নন্দনকাননে...!"
আজ তুমি নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে আছো, অথচ আমি জানি, এই শব্দগুলো সত্যি হবে। আমরা আবারও দেখা করবো, কোনো নন্দনকাননে... যেখানে মৃত্যু, কষ্ট, অশ্রু, কিছুই থাকবে না। থাকবে শুধু তুমি আর আমি, অনন্ত ভালোবাসায়।"
আইসিইউ কেবিনের শূন্য নিস্তব্ধতায় ওরহানের কণ্ঠ যেন বইয়ের পংক্তিগুলোকেই সঞ্জীবনী শক্তি বানিয়ে তুললো। মনে হলো, শব্দগুলো আকাশ ভেদ করে সোহার হৃদয়ে ধ্বনিত হচ্ছে।
.
.
.
ইহাব হঠাৎ করেই ছুটে এলো। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আইসিইউ’র ভারী দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। ওরহান ভেতর থেকে বের হলো। মুহূর্তেই সবাই দৌড়ে গেলো তার কাছে। হৃদকম্পিত নিশ্বাসে কেউ কিছু বলতে চাইলে, ওরহান এক দৃষ্টিতে মায়ের চোখে চোখ রেখে বলল—
-"জরুরি কাজ আছে মা... আমি আসছি। আমার প্রাণভোমরা তোমাদের জিম্মায় রেখে গেলাম... দেখে রেখো।"
এক নিঃশ্বাসে বলা এই কথাগুলো যেন বিদায়বাণীর মতো ঝরে পড়লো তার ঠোঁট থেকে। কেউ কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পেল না। দ্বিতীয় মুহূর্তে, অদ্ভুত এক দৃঢ়তায় সে ঘুরে দাঁড়ালো। ইহাব আর ওসমানকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুতপদে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে।
গাড়ি ছুটছে অন্ধকার রাতের বুক চিরে। বাতাস কাঁপছে, চাকার ঘর্ষণে চারপাশে আতঙ্কের সুর যেন বাজছে। চোখের সামনে ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে শহরের আলো, বাড়ছে নিঃসঙ্গতা। মুহূর্তেই পথ বদলে গাড়ি ঢুকে পড়লো ঘন কালো জঙ্গলের ভেতর। সেই জঙ্গল যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের পা ফেলা ভুলে গেছে। কেবল ঝিঁঝিঁর ডাক আর অচেনা জন্তুর গর্জন ভেসে আসছে গহীন থেকে।
অবশেষে গাড়ি থামলো এক পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে শীতল বাতাস বেরিয়ে আসছে, সঙ্গে অজানা মৃত্যুর গন্ধ। দেয়ালের প্রতিটি ফাটল যেন অতীতের রক্তাক্ত গল্প বলে চলেছে।
ভেতরে—
একটি কাঠের চেয়ারে শক্ত করে বাঁধা আছে এক রমণী। তার অবয়ব কাঁপছে, অথচ মুখে অসহায় নিশ্চুপতা। অপরদিকে, তার দুপাকে নির্মমভাবে থেতলে দেওয়া হয়েছে, দেহ ছড়িয়ে আছে চেয়ারে বাধা অবস্থায়। চারপাশে এমন এক শীতল নীরবতা, যেন মৃত্যুই এখানে চিরস্থায়ী অধিকার নিয়ে বসে আছে।
ওরহান স্থির চোখে বাড়িটি পরখ করলো। গভীর নিশ্বাস নিয়ে সে গাড়ির দরজা বন্ধ করলো।
ওসমান ও ইহাবকে ভেতরে বসে থাকতে বলেই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেই মৃত্যুভরা বাড়ির দিকে।
এ যেন এক নিষিদ্ধ অন্ধকারের রাজ্য, যেখানে এখন প্রবেশ করছে ওরহান, শুধু সাহস নয়, বুকে ঝড় আর অদম্য প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
করিডোরের মতো দীর্ঘ নীরবতার ভেতর হঠাৎ ভেসে এলো পায়ের শব্দ। চেয়ারে বাঁধা রমণী চোখ তুলে তাকালো। মুহূর্তেই তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠলো, সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওরহান।
আতঙ্কে মিহিরিমার গলা শুকিয়ে গেলো। ভয়ে বিস্ফারিত চোখে সে তাকিয়ে রইলো। ওরহান ধীরপদে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠ যেন বরফের মতো শীতল, তবু তাতে লুকানো আগুন—
-"তোমাকে বলেছিলাম সোহার থেকে দূরে থাকতে। কেনো শুনলে না, মিহিরিমা?"
মিহিরিমা শুকনো ঢোক গিলে ফেলে। অসহায় কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলল—
-"আমি... আমি কিছু করি নি, ওরহান। আমাকে এইভাবে বেঁধে রেখেছ কেনো?"
ওরহানের চোখে অদ্ভুত দীপ্তি ঝলসে উঠলো। কঠিন, নির্মম কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল—
-"তুমি আমার সোহার ওপর গাড়ি তুলে দিয়েছো, আবার বলছ কিছু করোনি? কে দিলো তোমাকে এই সাহস?"
মিহিরিমার শরীর কেঁপে উঠলো। চোখ ভিজে এলো আতঙ্কে। কাঁপা কণ্ঠে সে মিনতি করলো—
-"বিশ্বাস করো, ওরহান... ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল। আমি ইচ্ছে করে কিছু করি নি। বিশ্বাস করো!"
ওরহানের ঠোঁটে এক নির্মম হাসি ফুটে উঠলো।
চোখ দু’টো যেন বজ্রপাতের মতো ঝলসে উঠলো। শীতল অথচ ধারালো কণ্ঠে সে বলল—
-"ইচ্ছে করে করো বা না করেই করো... করেছ তো। তোমাকে বারবার বলেছি সোহার থেকে দূরে থাকতে।
তাহলে কেনো তুমি তার চারপাশে ঘুরতে গেলে? কেনো এতো মাস ধরে তার ওপর নজর রাখছ?"
মিহিরিমা স্থবির হয়ে বসে রইলো। কী বলবে, কীভাবে বলবে, কিছুই খুঁজে পেল না। ওরহানের চোখে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝে গেল, সে সব জেনে গেছে। এবার আর কোনো ছলচাতুরি, কোনো মিথ্যা তাকে রক্ষা করবে না।
তার বুকের ভেতর আতঙ্কের ঝড় বয়ে গেলো, কীভাবে বাঁচবে সে ওরহানের হাত থেকে?
কম্পিত ঠোঁট নড়ল, গলা থেকে বের হলো মিনমিনে কণ্ঠস্বর—
-"ক্ষমা করো আমাকে... আর এমন করবো না।"
ওরহান হঠাৎ হেসে উঠলো। সেই হাসিতে ছিল না কোনো দয়া, কোনো করুণা। ঠাণ্ডা অথচ ধারালো দৃষ্টিতে মিহিরিমার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"আর কিছু করার সুযোগ রাখবো না তোমার। সেই ব্যবস্থাই করতে এসেছি!"
এ কথা বলেই সে ধীরে ঘুরলো। পকেট থেকে বের করলো একটি ছোট্ট রিমোট। ঠাণ্ডা দৃঢ়তায় বোতাম টিপতেই মুহূর্তে মাথার ওপর থেকে ঝরে পড়তে শুরু করলো এসিডের বৃষ্টি।
মিহিরিমা চেয়ারে বাঁধা, চিৎকার করে উঠলো ভয়ংকর আর্তনাদে। তার কণ্ঠ ফেটে গেলো, বুকের ভেতর থেকে নির্গত হলো বীভৎস চিত্কার। চামড়া গলতে শুরু করলো, শরীরের গন্ধে চারপাশ ভরে উঠলো তীব্র জ্বালা আর মৃত্যুর শ্বাসরোধী ছায়ায়। সে কাঁপতে কাঁপতে অনুনয় করলো—
-"থামাও, ওরহান! প্লিজ থামাও... আমি মরতে চাই না!"
কিন্তু ওরহানের চোখে কোনো আবেগ ছিল না।
সে নির্বিকার ভঙ্গিতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
চারদিকে কেরোসিনের লাইন আগেই টেনে রাখা ছিল।
সিগারেট লাইটার জ্বালিয়ে ছুঁড়ে দিতেই মুহূর্তে শিখা লেলিহান হয়ে উঠলো, আগুনের প্রাচীর ঘিরে ফেললো পুরো ঘর। পথ রুদ্ধ হয়ে গেলো, এখন আর পালাবার কোনো সুযোগ নেই।
এসিডের ঝরনা আর দাউ দাউ করা আগুনের মাঝেই নিশ্চিত মৃত্যু মিহিরিমার। তার আর্তনাদ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো আগুনের গর্জনে।
ওরহান একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
অদ্ভুত এক ঠাণ্ডা দৃঢ়তা নিয়ে সে বেরিয়ে এলো সেই মৃত্যুভরা বাড়ি থেকে।
বাড়ি থেকে বের হতেই আচমকা অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লো ওরহানের ওপর। মুহূর্তেই মাথায় আঘাত, লোহার মতো ভারী কোনো বস্তু দিয়ে একের পর এক তিনটি প্রচণ্ড আঘাত।
ওরহান ভয়ংকর এক চিৎকার দিয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলো। তার কপাল ফেটে বেরিয়ে এলো রক্তের স্রোত। রক্ত মাটিতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে কালো রাতের অন্ধকারে চিকচিক করে উঠলো লালচে আভায়।
নিঃশব্দ জঙ্গল ভেদ করে ওরহানের সেই তীক্ষ্ণ চিৎকার ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। দূরে বসে থাকা ওসমান আর ইহাব মুহূর্তেই আঁতকে উঠলো। ছুটে এসে তারা দেখলো, মাটিতে লুটিয়ে থাকা ওরহান, মাথা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে, নিঃশ্বাসে ব্যথার ঝড়।
দু’জনেই হতবাক। বুক কেঁপে উঠলো আতঙ্কে। কোনো প্রশ্ন করার অবকাশ ছিল না। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ওসমান আর ইহাব দ্রুত তাকে তুলে নিলো গাড়িতে।
চাকার গর্জন ছুটে গেলো হাসপাতালের দিকে, অন্ধকার পথ কেটে।
কিন্তু এই আক্রমণ স্পষ্ট করে দিলো, কেউ একজন এসেছিল মিহিরিমাকে বাঁচাতে। আর সেই অচেনা ছায়া ওরহানকে আঘাত করে রেখে গেছে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।
.
.
.
অপারেশন রুমের ভারী দরজা ধীরে খুলে গেল।
অজ্ঞান ওরহানকে স্ট্রেচারে করে বাইরে আনা হলো।
সাথে সাথেই শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো বাড়ির সবাই।
সুরাইয়া বেগম ছেলের এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বুক চেপে ধরলেন, আর্তনাদ করলেন একবার, তারপরই অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়লেন মাটিতে। নার্সরা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেলেন তাকে সামলাতে।
চারপাশে কান্নার স্রোত। কেউ কী বলবে, কীভাবে সান্ত্বনা দেবে, বুঝে উঠতে পারছে না। কারো কণ্ঠে শব্দ নেই, চোখে শুধু অঝোর অশ্রু। এক বিভীষিকাময় সময় যেন সবাইকে শ্বাসরোধ করে বেঁধে ফেলেছে।
এমন সময় ওসমান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। গভীর দম নিয়ে সবার সামনে ঘটনার বিবরণ দিল। শব্দগুলো শুনে চারপাশ আরও স্তব্ধ হয়ে গেল, স্পষ্ট হলো, কোনো অচেনা শত্রুই ওরহানকে আঘাত করেছে।
কিন্তু সে কে? এই প্রশ্নই যেন সবার মনে ছুরি হয়ে বিঁধলো।
অবশেষে, ওরহানকে রাখা হলো আইসিইউতে। আর সোহা... যে আগেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, তার পাশে একই রুমে রাখা হয়েছে ওরহানকে। তারা দু’জন পাশাপাশি শুয়ে আছে। দু’জনেই অচেতন, দু’জনেই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।
পরিবারের সবাই দাঁড়িয়ে আছে সেই কাঁচের ঘরের বাইরে। চোখ ভিজে আছে আতঙ্কে আর অজানা আশঙ্কায়।
কি হবে তাদের ভাগ্যে? জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ জিতে কি ফিরে আসবে তারা? না কি দু’জনেই একসাথে পারি জমাবে মৃত্যুর দেশে?
সেই ভয়াবহ অজানা প্রশ্নের উত্তরে হাসপাতালের করিডোর নিস্তব্ধ, শুধু কান্না আর অস্থিরতার গুমোট ছায়ায় ঢাকা।