ফিরে দেখা

পর্ব - ২৪

🟢

শান্তিকুঞ্জ আজও শান্ত। বরাবরের মতোই বাড়িটিতে স্থিরতা, যেন সময় এখানে থমকে আছে। অথচ বাড়ির একমাত্র মালিকের জীবনে নেই কোনো শান্তি, বাহ্যিক নীরবতার আড়ালে ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলছে অশান্তি আর নিঃসঙ্গতা। সে বাড়িতেও থাকে না খুব একটা। শুধু রাতের ঘুমের আশ্রয় হিসেবেই যেন এই বাড়িটি তার। দিনের বেলায় এ বাড়ির দেওয়ালগুলো তার নিঃসঙ্গতার সাক্ষী হয়ে ওঠে, মনে করিয়ে দেয় সে কতটা একা, কতটা শূন্য।

কিন্তু আজ সে বাড়িতেই আছে। ড্রয়িং রুমে এক কোণে বসে আছে নিথর ভঙ্গিতে। চোখ দুটো অসম্ভব লাল, যেন অশ্রুতে ভিজে লালচে হয়ে উঠেছে, কিংবা রাতভর অনিদ্রার যন্ত্রণা সেখানে আঁচড় কেটেছে। মাথা নিচু, দৃষ্টি নিবদ্ধ মাটির দিকে, এক ধরনের ভাঙন, এক ধরনের ভেতরের ভস্মীভূত দুঃখ তার শরীরভাষায় ফুটে উঠছে।

ঠিক সেই সময় হঠাৎই নীরবতা চিরে বেজে উঠল কলিং বেল। ঘরের বাতাস কেঁপে উঠল সেই আওয়াজে। এক মুহূর্তের জন্য সে চমকে চোখ তুলল, অন্যমনস্ক দৃষ্টি ছিঁড়ে ফিরে এল বাস্তবে। ধীরে ধীরে ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে তার জন্মদাত্রী, জীবনের শিকড়, রক্তের টান। আর পাশে তার আদরের ছোট বোন সাবা, চোখে ভরসা আর অনন্ত ভালোবাসার আলো।

সেই মুহূর্তে বাড়ির নিস্তব্ধতা যেন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করল। সোহা ধীরে মাথা তুলে নিলুফার বেগমের দিকে তাকাল। দৃষ্টি ক্লান্ত, গলায় কাঁপন—

-"আপনি এখানে কেন এসেছেন?"

নিলুফার বেগম শান্ত অথচ ভারী স্বরে উত্তর দিলেন—

-"ভেতরে আসতে বলবি না?"

এক মুহূর্ত স্তব্ধতা। সোহা কিছু বলল না। ঠোঁট নড়ল না, চোখে কোনো সাড়া নেই। নিঃশব্দে সরে এসে সোফায় গিয়ে বসে পড়ল, যেন কথার চেয়ে নীরবতাই তার বেশি শক্তিশালী অস্ত্র। পেছন পেছন নিলুফার বেগম ও সাবা ভেতরে প্রবেশ করলেন। ঘরে মৃদু আলো, টেবিল ল্যাম্পের হলদে আভা ছড়িয়ে পড়ছে, আর জানলার বাইরে রাতের অন্ধকার ঘন হয়ে আছে। তারা দুজনেই সোফায় গিয়ে বসলেন।

কিছুক্ষণ ভেতরে কেবল ঘড়ির টিকটিক শব্দ, আর নিঃশ্বাসের ভারী ওঠানামা। বাতাসের নীরবতাও যেন জমাট বেঁধে বসে আছে দেয়ালে দেয়ালে। অবশেষে নিলুফার বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ খুললেন—

-"একটি মেয়ের শেষ আশ্রয় তার স্বামী, তার শেষ ঠিকানা। আমার বাবা–মা আমাকে খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন। তখন আমি সদ্য এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছি। আমার দুই ভাই, আর কোনো বোন ছিল না। তাদের সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য ছিল অনেক। তখন তারা সংসারী, তাদের ঘরে সন্তানও জন্ম নিয়েছে।

আমি তখন সবে পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে বসে থাকি। একদিন দেখি, আমার দুই ভাবী আড্ডা জমিয়েছেন আমার বিয়ে নিয়ে। তারা আমার ভাইদের বোঝাচ্ছিলেন—

"বসে বসে খাচ্ছে, আর কত দিন? এখনই বিয়ে দিয়ে দাও। বাবার তো কোনো আয়–রোজগার নেই, এ বোঝা ঘাড়ে রেখে লাভ কী?"

এইসব কানভাঙানি আমার ভাইরা শুনলেন। তারাও বাবা–মাকে বলতেই, আর দেরি না করে তৎক্ষণাৎ আমার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। কোনো খোঁজখবর ছাড়াই।

আমি তখনও কোনো প্রতিবাদ করিনি। সত্যিই তো, পরের ঘরে কতদিন বোঝা হয়ে থাকব? আমার জীবনে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, বাবা কখনোই আমাকে বাইরে যেতে দিতেন না। তাই নিজের যোগ্যতায় কিছু করে নিজের জীবন চালানোর কথা ভাবতেও পারি নি।

বিয়ের পর মা আমাকে ডেকে বললেন—

"শোন, আমরা মারা গেলে কেবল আমাদের লাশ দেখতে আসবি, তার আগে পরে আর কখনো এই বাড়িতে পা রাখবি না।"

তার কথা শুনে উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে যায়। আমার দুই ভাই ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আর মা আবার বলতে থাকেন—

"একটি মেয়ের আপন বলতে কেবল তার স্বামী। এই যে দেখ—আমরা তোকে বিয়ে দিয়ে পর করে দিলাম। তোর ভাইয়ারা তোকে পর করে দিল বউদের কথা শুনে। তোর শ্বশুর–শাশুড়িও একদিন আলাদা করে দেবে। তোর সন্তান হলে তারাও বিয়ে করে চলে যাবে অন্য সংসারে। নইলে বউয়ের কথায় তোকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসবে। তাই যতদিন বাঁচবি স্বামীর পাশে বাঁচবি। তাকে ছেড়ে একচুলও সরবি না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবি যেন তোদের মৃত্যু হয় একসাথে। যেন সন্তানদের ভয়াবহ রূপ তোদের কারও চোখে না পড়ে।"

এই বলে মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাঁর পাশে দাঁড়ানো বাবাও চোখ মুছতে লাগলেন। সেই মুহূর্তে আমার ভাইয়ারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু বাবা–মা ততক্ষণে তাদের প্রতি অভিমান জমিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আমাকেও কসম দিয়ে দিলেন—"কখনো যেন ভাই–ভাবীদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখিস।"

বলতে বলতে থেমে গেলেন নিলুফার বেগম।

কণ্ঠ রুদ্ধ, শরীর কাঁপছে, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তিনি। পাশে বসা সাবা আর সোহা মাথা নিচু করে নীরবে শুনছিলেন, কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, শুধু নিলুফার বেগমের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। চোখের পানি মুছে, কাঁপা ঠোঁট শক্ত করে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন—

-"আমি বিয়ের পর আর ওই বাড়িতে কোনোদিন পা রাখিনি। একদিন সংবাদ এলো, বাবা-মা দুজনেই একসাথে জায়নামাজে সেজদারত অবস্থায় মারা গেছেন। সেদিন আমি বুঝেছিলাম, সত্যিই এই পৃথিবীতে স্বামী ছাড়া আর আপন কেউ নেই। সন্তান, ভাই, বোন, বাবা-মা, সবাই একদিন ছেড়ে চলে যায়। শেষে শুধু দুজন মানুষ বেঁচে থাকে একে অপরের ভরসা হয়ে—স্বামী আর স্ত্রী। যাদের মধ্যে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ সবচেয়ে গভীর আত্মিক সম্পর্ক।

আমার ভাইয়েরা তখন তাদের ভুল বুঝেছিল, কিন্তু আমি মেনে নিয়েছিলাম আমার বাবা-মায়ের কথা। তারা বউদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে একমাত্র বোনকেই নয়, বাবা-মাকেও হারিয়েছিল। আমি সবসময় আল্লাহর কাছে দুয়া করেছি, আমার সন্তান যেন এমন না হয়, যেন তারা আলাদা করে না দেয়, বরং শেষ বয়সে বাবা-মার আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সেইদিন মা যা বলে গিয়েছিলেন—"যত কিছু হোক না কেন, স্বামীর পাশ ছেড়ে যাস না।" সেই কথার ভার আমি সারা জীবন বয়ে নিয়ে চলেছি। তাই সেদিন, স্বামী ভুল হলেও, আমি আমার নিজের মেয়ের পক্ষ নিতে পারিনি। কারণ আমার দুনিয়ায় ওই মানুষটা ছাড়া আর কেউ নেই। আমিও তার একমাত্র আপনজন।

তোরা বড় হয়েছিস, বিয়ে হবে, সংসার হবে, বাচ্চা-কাচ্চা হবে। একসময় সবকিছুতে ব্যস্ত হয়ে যাবি। কিন্তু আমি আর তোর বাবা একা হয়ে যাবো। তখন আমাদের ছাড়া আমাদের পাশে আর কেউ থাকবে না। তাই আমি বাধ্য হয়েছিলাম তোর বাবার অন্যায়কে সাপোর্ট করতে।

কিন্তু আজ... আজ তিনি আবারও একই ভুল করেছেন। অন্যায়কে সমর্থন মানে, নিজেকেও অন্যায়কারীর আসনে দাঁড় করানো। একবার সেই অপরাধে শরিক হয়েছি, দ্বিতীয়বার আর হতে চাই না।

আমি জানি, আমার করা অন্যায়ের কোনো ক্ষমা নেই। আমি তোর কাছে অপরাধী। তুই হয়তো আমায় ক্ষমা করতে পারবি না, তবুও আমি চেষ্টা করবো তোর ক্ষমা পাওয়ার।

সেইদিন আমি আমার স্বামীকে বেছে নিয়েছিলাম... আজ আমি আমার সন্তানকে বেছে নিয়েছি। তাকে তার অন্যায়ের জবাবদিহি করতেই হবে। শাস্তি পেতেই হবে। তুই কি আমাকে তোর কাছে রাখবি?"

সোহা ও সাবা চুপ করে বসে রইল। ঘরে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সোহা কোনো কথা বলল না। শুধু ভেতরে ভেতরে বুঝে গেল, মানুষ নিঃসঙ্গতাকে ভয় পায়। সারাজীবন একা কাটানো যায় না। পাশে কারও উপস্থিতি, কারও নির্ভরতা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। সন্তান কিংবা বাবা-মা সেই একাকিত্বের পূর্ণ সমাধান নয়, প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন হয় তার একান্ত ব্যক্তিগত মানুষের, যার কাছে সে আশ্রয় নেবে, যাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচবে।

তার মা ভুল করেছেন, অন্যায় করেছেন, তবুও সোহা অনুভব করল, সেই অন্যায়ও এসেছে নিঃসঙ্গতার ভয় থেকে, নিজের টিকে থাকার জন্য। নিজের কথা ভাবা কোনো অপরাধ নয়। তাই সে প্রতিবাদ করল না,কোনো কথা বলল না। শুধু শান্ত কণ্ঠে সাবাকে বলল—

-"ঘরে নিয়ে যা ওনাকে। খাবার ফ্রিজে আছে, খেয়ে নিও দুজন।"

এইটুকু বলেই সোহা উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে পা টেনে চলে গেল ছাদের দিকে। তার গাম্ভীর্যপূর্ণ নিঃশব্দ প্রস্থানকে কেউ ভাঙতে সাহস পেল না। সাবা, নিলুফার বেগম, সবাই স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার পিছুপিছু। নিঃশব্দে যেন বাতাসও দাঁড়িয়ে গেল সেই মুহূর্তে।

.

.

.

সকাল সকাল সোহার নামে একটি চিঠি এসে পৌঁছাল।

ডাকপিয়নের কাছ থেকে সাবা সেটি রিসিভ করে ড্রয়িংরুমের টেবিলে রেখে দিলো, তারপর ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে তখন নিলুফার বেগম রান্নায় ব্যস্ত। সোহা ভোর রাতে ঘুমিয়েছিল, তাই তাকে কেউ ডাকেনি।

দুপুর প্রায় বারোটা নাগাদ সোহা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসল। টেবিলের ওপর রাখা খামের দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা তার নাম—

"মিস নেসলিহান সোহা।"

একটা অজানা শঙ্কা তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। হাত কাঁপতে কাঁপতে খামটা তুলে নিলো সে। কাগজ বের করে পড়তে শুরু করল—

"মিস নেসলিহান সোহা,

আপনার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আমাদের ভেলভেট ব্লুম কোম্পানি-এর নিয়ম অনুযায়ী চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যদি কেউ স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকে এক কোটি টাকা জরিমানা প্রদান করতে হবে।

অন্যদিকে, যদি অফিস কর্তৃপক্ষ কোনো ভ্যালিড কারণ ছাড়াই কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে, তবে সেই কর্মচারীকে অফিস কর্তৃপক্ষ এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।

আপনি যেহেতু গতকাল চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন, তাই আপনাকে জানানো যাচ্ছে, অফিসে এসে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করে যাবেন।

ধন্যবাদ,

—কর্তৃপক্ষ"

রাগে সোহার সারা শরীর জ্বলে উঠল। চোখে যেন আগুন দপদপ করছে। তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল, আঙুলের গিঁট সাদা হয়ে গেল চেপে ধরার চাপে।

এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ঘরে ঢুকে দ্রুত পোশাক বদলাল। প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল তীব্র অস্থিরতা, যেন শরীরের ভেতর ক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এরপর ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলো সে।

নিলুফার বেগম রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে ডাক দিলেন—

-"কিছু খেয়ে যা মা!"

কিন্তু সোহা যেন কিছুই শুনল না। কারও কথা, কারও আহ্বান, তার কানে পৌঁছাল না। হনহন করে বেরিয়ে গেল গাড়ি নিয়ে।

ড্রয়িংরুমের ফাঁকা জানালা দিয়ে বাতাস হঠাৎ থেমে গেল, আর নিস্তব্ধ ঘরে কেবল নিলুফার বেগমের অসহায় কণ্ঠ প্রতিধ্বনির মতো ভেসে রইল।

.

.

.

সোহা ঝড়ের বেগে সোজা ঢুকে পড়ল ওরহানের কেবিনে। কেবিনের ভারী পর্দা টানা, এয়ারকন্ডিশনের শীতল বাতাসে ঘরটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। অথচ সোহার শরীর জ্বলছে রাগে। ভেতরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল, ইহাবও সেখানে বসে আছে। যেন তারা আগেই জানত আজ সোহা আসবেই।

সোহা নিজের হাতে ধরা খামটা হঠাৎই ছুঁড়ে মারল ওরহানের মুখের দিকে। কাগজগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তেই ঘরে উত্তেজনার ঝড় বইতে লাগল। রাগে কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে সোহা চেঁচিয়ে উঠল—

-"এইসব কি নাটক শুরু করেছেন আপনি?"

ওরহান ধীর, ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল—

-"কিসের নাটক? এগুলো কোম্পানির রুল। তোমাকে মানতেই হবে। সবার জন্যই একই নিয়ম।"

সোহার চোখ জ্বলজ্বল করছে। দাঁত চেপে সে প্রশ্ন করল—

-"কবে থেকে জারি হলো এই নিয়ম? আমি কেন জানি না?"

ওরহান হেলান দিয়ে বসলেন, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি খেলে গেল।

-"এক মাস আগেই তো ঘোষণা করা হয়েছে।"

এক মুহূর্ত সোহা থেমে গেল। তার ভুরু কুঁচকে এল। হঠাৎ মনে পড়ল, এক মাস আগে বোর্ড মিটিং করে সত্যিই এই নিয়ম ঘোষণা করা হয়েছিল। মুহূর্তেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আর সেই প্রতিক্রিয়া উপভোগ করছে ওরহান, চোখে মিটিমিটি হাসি, ঠোঁটে নিষ্ঠুর বিদ্রুপ।

সোহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"কত দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হবে?"

ওরহান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল—

-"এক মাস।"

সোহা নীরবে মাথা নাড়ল। ওরহান ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল—

-"এত টাকা কোথায় পাবে তুমি? তার চেয়ে বরং আবার চাকরিতে ফিরে এসো। তাহলে এই টাকা দিতে হবে না।"

সোহা ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর ওরহানের ভঙ্গি নকল করে ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল—

-"টাকা কোথা থেকে পাবো সেটা আমার চিন্তা। আপনাকে ভাবতে হবে না। সাত দিনের মাথায় এই টাকা আপনার একাউন্টে পৌঁছে যাবে।"

এরপর কোনো কথা না বলে সোহা উল্টো ঘুরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তার দৃঢ় পদক্ষেপের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো।

ওরহান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মিটিমিটি হাসতে লাগল। ইহাব উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে বলল—

-"স্যার, ম্যাম যদি সত্যিই টাকা পরিশোধ করে তখন কী হবে?"

ওরহান ঠোঁটে এক চিলতে বিদ্রুপ টেনে দিলো—

-"কোথায় পাবে এক কোটি টাকা? ভুলে যেয়ো না, তার জমানো সব টাকা দিয়ে সে ওই বাড়ি আর গাড়ি কিনেছে। এখন তার ব্যাংক একাউন্টে বড়জোর তিন–চার লাখ টাকা আছে।"

ইহাবের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, এক অদ্ভুত দুশ্চিন্তার ছায়া তার চোখে—

-"কিন্তু স্যার... এইসব করা কি ঠিক হবে? এতে তো ম্যাম আপনার থেকে আরও দূরে সরে যাবে।"

ওরহান হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। চোখে অদ্ভুত দীপ্তি, কণ্ঠে একরাশ একগুঁয়ে জেদ—

-"দূরে যাতে না সরে, সেই জন্যই তো এইসব করছি। ও এমনি এমনি আমাকে কাছে টানতে দেবে না। এই অফিস ছাড়া আর কোনো উপায় নেই ওকে নিজের কাছে ফেরানোর। যেভাবেই হোক, ওকে এখানেই ফিরে আসতে হবে।"

.

.

.

সোহাকে বেরিয়ে আসতে দেখে মিরহাও তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলো। রোদেলা দুপুর, বাতাসে হালকা উষ্ণতা, চারপাশে গাড়ির শব্দ আর মানুষের আনাগোনা। অথচ সেই কোলাহলের মাঝেই যেন দুজনার কথোপকথন আলাদা এক আবহ তৈরি করলো। সোহা দ্রুত হাঁটছিল, আর মিরহা তার পিছু নিলো।

-"দাঁড়াও, সোহা..."

মিরহার কণ্ঠে দম ফুরিয়ে আসা শ্বাসের সুর। সোহা থেমে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। ভিড়ভাট্টার মধ্যে তাদের চোখাচোখি হলো, একজনের চোখে তীব্র অবাধ্যতা, আরেকজনের চোখে অশান্ত উদ্বেগ।

মিরহা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলো—

-"ওরহান স্যার তোমাকে এক কোটি টাকা জরিমানার নোটিশ দিয়েছিল, তাই না?"

সোহা নিঃশব্দে মাথা নাড়লো। তার চোখে বিদ্রোহের অগ্নি, ঠোঁটে তিক্ততার ছাপ।

মিরহার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ভেসে উঠলো—

-"তাহলে তুমি কী করবে? এত বড় বোঝা একা কিভাবে সামলাবে? তার চেয়ে বরং ফিরে এসো।"

সোহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো—

-"না! ওই বজ্জাত লোকের সামনে আমি আর যাব না। আমি আমার বাড়ি বিক্রি করে দেব। এক কোটি টাকা সহজেই জোগাড় করতে পারবো।"

মিরহার গলায় প্রায় চিৎকার ভেসে উঠলো—

-"কি বলছো তুমি? বাড়ি বিক্রি করে দিলে কোথায় থাকবে? আর এত অল্প সময়ে এসব কিভাবে সম্ভব?"

সোহা দৃঢ় কণ্ঠে বললো—

-"উকিল সাহেবকে আমার বাড়ি আসতে বলো। কোথায় থাকবো সেটা পরে ভাববো। এখন আমাকে যেতে দাও।"

কথা শেষ করেই সোহা দ্রুত হেঁটে চলে গেল। রোদের মধ্যে তার ছায়া লম্বা হয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল ভিড়ের ভেতর। মিরহা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, যেন সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

আর সেই মুহূর্তে, দূরের আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে সব শুনে ফেলল তীব্র। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে খেলে গেল রহস্যময় এক হাসি। পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বার টিপলো। দুপুরের ব্যস্ত শহরের গুঞ্জনের মধ্যে তার গোপন ফিসফিসানি মিলিয়ে গেল অজানা এক অশুভ ইঙ্গিতে।

.

.

.

কেটে গেছে পনেরো দিন। এই অল্প সময়েই সাবা আর ওসমানের মধ্যে যেন এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। নিজেদের অজান্তেই তারা একে অপরের প্রতি টান অনুভব করতে শুরু করেছে। ওসমান এখন প্রায় প্রতিদিনই সাবার ভার্সিটিতে ছুটে আসে। খান কোম্পানির অগণিত ব্যস্ততা, মিটিং আর দায়িত্বের ভিড়েও সে যেন সাবার জন্য সময় বের করাটাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করে।

ক্যাম্পাসের বিকেলের আবহাওয়া, চারদিকে হালকা বাতাসে দুলতে থাকা গাছের সারি, ফাঁকা করিডোরের জানালা দিয়ে ভেসে আসা রোদের সোনালি রেখা, আর ছাত্রছাত্রীদের হাসি-আড্ডার শব্দ মিলেমিশে যেন প্রেমের এক নিখুঁত পটভূমি সাজিয়ে দেয়।

দূরে, নির্জন পুকুরপাড়ে পাশাপাশি বসে আছে ওসমান আর সাবা। চারদিকে সন্ধ্যা নামার আবহ—ডুবন্ত সূর্যের লালচে আলো পুকুরের জলে প্রতিফলিত হয়ে ঝিকিমিকি করছে, বাতাসে কাশফুলের দোল, আর দূরে পাখিরা ফিরতি ডানায় গুঞ্জন তুলছে। চারপাশের সেই নিস্তব্ধ পরিবেশ যেন অদৃশ্য এক আবেশে ঢেকে রেখেছে তাদের দুজনকে।

ওসমান গভীর দৃষ্টিতে সাবার দিকে তাকিয়ে ধীরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল—

-"তোমার সাথে না দেখা হলে দিনটা যেন অসম্পূর্ণ লাগে। কাজের ফাঁকে যতই দৌড়ে আসি না কেন, তোমার হাসিটাই আমার ক্লান্তি মুছে দেয়।"

সাবার ঠোঁটে লাজুক এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। চোখ দুটো নিচু হয়ে গেল, অথচ বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত কাঁপুনি জেগে উঠলো। তার স্নিগ্ধ কণ্ঠে ভেসে এলো—

-"সবাই কি এমন করে ভালোবাসে? নাকি আপনি অন্যরকম?"

ওসমান মৃদু হেসে, চোখের গভীরে জমে থাকা সবটুকু ভালোবাসা মেলে ধরে উত্তর দিল—

-"ভালোবাসা সবার জন্য আলাদা। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসা আমার কাছে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক। তোমাকে ছাড়া আমি নিজের অস্তিত্বই কল্পনা করতে পারি না।"

সেই মুহূর্তে চারপাশের সকল শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেল। বাতাসের মৃদু সুর ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। দু’জন মানুষের হৃদস্পন্দন একে অপরের সাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করলো।

ওসমান আলতো করে সাবার হাতটা নিজের হাতে নিল। স্পর্শের সাথে সাথেই সাবার শরীর কেঁপে উঠল, অথচ সেই কাঁপুনি ছিল মধুর এক আশ্বাস। চারপাশে যত মানুষই থাকুক, তাদের দুজনের পৃথিবী যেন মুহূর্তেই এক গোপন আবেশে ঢেকে গেল।

সাবার চোখ ভিজে উঠলো, কণ্ঠ কেঁপে এলো—

-"আপনি এভাবে কাছে এলে মনে হয় আমি আর একা নই। পৃথিবীর সব দুঃখকষ্ট যেন মুছে যায়।"

ওসমানের কণ্ঠ গম্ভীর অথচ অদ্ভুত কোমলতায় ভরা—

-"তুমি কোনোদিন একা নও, সাবা। যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তুমি আমারই আশ্রয়। আর আমি তোমার।"

ঠিক তখনই আকাশে লাল-কমলা আভা আরও গাঢ় হলো। সূর্যাস্তের আলো তাদের দুজনের মুখে পড়ে মুহূর্তটিকে এক অলৌকিক সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলল। পুকুরের জলে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে যেন তাদের ভালোবাসার ছবি আঁকতে লাগলো। চারপাশের গাছপালা, নিস্তব্ধতা, বাতাসের মিষ্টি গন্ধ, সবকিছু মিলে সেই বিকেলটিকে তাদের প্রেমের এক চিরন্তন সাক্ষীতে পরিণত করলো। মনে হচ্ছিল, যেন পৃথিবী থেমে গেছে কেবল এই দুই প্রাণের মিলন দেখার জন্য।

রাত গভীর হয়ে এসেছে। নিস্তব্ধ শহরের পথে হালকা কুয়াশা নামতে শুরু করেছে। চারপাশে ফাঁকা রাস্তা, মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো যানবাহনের হর্ণ, কিংবা নিঃসঙ্গ কুকুরের ডাক। এই নীরবতার মাঝেই ওসমানের গাড়ি ধীরে ধীরে ছুটে চলেছে নিজ গতিতে। জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে গাড়ির ভেতরে অদ্ভুত শান্ত এক আবহ তৈরি করেছে।

ওসমান স্টিয়ারিং ধরে চুপচাপ সামনে তাকিয়ে আছে। পাশে বসা সাবা মাঝে মাঝে তার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। একসময় নীরবতা ভেঙে সাবার কণ্ঠ ভেসে এলো—

-"ওরহান ভাই আর আপুর মাঝে কি এইসব কোনো দিন ঠিক হবে না?"

ওসমান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বলল—

-"সব দোষ আমার ভাইয়ের। ভালোবাসার বদলে সে ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছে। এতে আর কি, ভাবী তো দূরে সরে যাবেই।"

সাবা গভীর দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করল—

-"ওরহান ভাই তো অমনই। এত বছর ধরে তাকে চিনি। সে নিজের ব্যক্তিত্বের বাইরে যেতে পারে না। ওরহান ভাই টক্সিক, এটা আপুও জানে।"

ওসমানের কণ্ঠ এবার একটু কঠিন হলো, তবু তাতে ছিল আক্ষেপের ছোঁয়া—

-"যেমনই হোক, ভাইয়ার উচিত ছিল প্রথমেই ক্ষমা চাওয়া। ক্ষমা পাওয়ার জন্য সবকিছু করা। তা না করে সে জোর করে ভাবীকে কাছে টানতে চাইছে। অথচ এতে ভাবী আরও দূরে সরে যাচ্ছে, সেটা সে বুঝতেই পারছে না।"

সাবা ধীরে মাথা নাড়ল। শুধু একটি শব্দে তার ভেতরের ভারী অনুভূতি ঝরে পড়ল—

-"হুম!"

গাড়ির ভেতর আবারও নীরবতা নেমে এলো। বাইরের অন্ধকার আর ভেতরের আলো-ছায়া মিলে যেন এক অদৃশ্য আবেগে ঢেকে দিল তাদের দুজনকে। গাড়ির জানালার কাঁচে ঝুলে থাকা কুয়াশার ফোঁটাগুলোও যেন সাক্ষী হয়ে রইল এই কথোপকথনের, যেখানে ভালোবাসা, আক্ষেপ আর অপূর্ণতার ভার মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভুতি তৈরি করেছিল।

গাড়ি তখনও ছুটে চলেছে নির্জন রাস্তায়। চারপাশে গভীর রাতের নীরবতা, মাঝে মাঝে রাস্তার হালকা আলো এসে গাড়ির কাঁচে পড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে বাতাসে জমে উঠছে আবেগের ভার, আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই ওসমান ধীর কণ্ঠে বলল—

-"আচ্ছা বাদ দাও... আমাদের একান্ত মুহূর্তে ওদের নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। আমার ভাই নিজের দোষ বুঝুক, নিজের মতো করে শিখুক ক্ষমা চাইতে। আমরা ভেবে মাথা নষ্ট করব না।"

সাবা মৃদু স্বরে বলল—

-"হুম... আপু তো বাড়ি বিক্রি করে দিবে পরশু।"

ওসমানের চোখে হালকা দৃঢ়তা ঝলসে উঠল।

-"করুক, তার যা ইচ্ছে। সারাজীবন তার ওপর মানুষ জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। অন্তত এবার সে নিজের মতো করে বাঁচুক, নিজের মর্জি মতো চলুক।"

সাবা গভীরভাবে শোনে, শুধু ছোট্ট একটি শব্দে সায় দিল—

-"হুম..."

কিছুক্ষণ নীরবতা ভর করে রইল। তারপর ওসমান হঠাৎ গম্ভীর অথচ দৃঢ় স্বরে বলল—

-"আচ্ছা শোনো, কাল আমি আমার পরিবার নিয়ে আসব তোমাদের বাড়িতে... বিয়ের কথা বলতে।"

সাবা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। গাড়ির ভেতরের হালকা আলোয় তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।

-"কি বলছেন এসব, এই পরিবেশে?"

ওসমান ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল—

-"আমার ভাই যতদিন না ক্ষমা চাইবে, ততদিন এই পরিবেশই চলবে। কিন্তু আমি আর অপেক্ষা করতে পারি না। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মতো লুকিয়ে প্রেম করার মানুষ আমি নই। তোমাকে নিয়ে আমি খোলাখুলি চলতে চাই, সাবা।"

সাবা কিছু বলল না। শুধু তার ফর্সা মুখটা হঠাৎই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে নিলো, অথচ বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন আরও জোরে বাজতে লাগলো।

ওসমান তার এই নীরবতা আর লাল মুখখানি লক্ষ্য করে মিটিমিটি হাসল। রাতের নীরব রাস্তা, গাড়ির ভেতরের মৃদু আলো, আর দুই তরুণ-তরুণীর অদৃশ্য ভালোবাসা, সব মিলিয়ে সেই মুহূর্তটিকে করে তুলল আরও নাটকীয়, আরও জীবন্ত। মনে হচ্ছিল, যেন রাতের আকাশও তাদের গোপন আবেগকে সাক্ষী করে তারাগুলো ঝিলমিল করে উঠছে।

.

.

.

ইদানিং হুটহাট করেই বৃষ্টি নেমে আসে। ভেজা মাটির গন্ধে চারপাশ স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, বাতাসে জমে ওঠে অদ্ভুত শীতলতা। সকাল-সন্ধ্যায় কুয়াশা নেমে আসে পরিবেশে, যেন প্রকৃতিও নিঃশব্দে কোনো অজানা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

সকালে নিলুফার বেগম ব্যস্ত নাস্তা তৈরিতে। রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিলের শব্দের সাথে মিশে আছে তার দম ফেলার ফাঁক না পাওয়া ব্যস্ততা। ওদিকে ওসমান ফোনে সোহাকে সব বুঝিয়ে বলছে। সোহা কোনো আপত্তি জানায়নি। তাই মা-মেয়েতে মিলে সব কাজ দ্রুত সেরে ফেলছে। সাইফুল শেখের সাথে তাদের আর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি-ও চেষ্টা করেননি। যেন স্ত্রী-সন্তানদের জীবন্ত কবর দিয়ে দিয়েছেন, একেবারেই সম্পর্ক ছিন্ন করে নিয়েছেন।

সকাল গড়িয়ে প্রায় এগারোটার সময় খান পরিবারের গাড়িগুলো এসে থামল বাড়ির সামনে। একে একে সবাই নামল। শুধু মুফতি মারুফ আসতে পারেনি, ভার্সিটিতে পরীক্ষা থাকার কারণে। আর ওরহান, সে মিটিংয়ের দোহাই দিয়ে আসেনি। দুটি কোম্পানি একসাথে সামলানোর ভান করছে, অথচ আসলেই ব্যস্ত সে সোহাকে নানা ভাবে জ্বালানোর পাঁয়তারা নিয়ে।

ঘরে সবাই বসে নাস্তা করছেন। পরিবেশে ভেসে আসছে পরোটা, গরম দুধ-চা আর হালকা মিষ্টির গন্ধ। গল্প-গুজবের শব্দে ঘর ভরে উঠেছে, তবুও কোথাও একটা চাপা উত্তেজনা যেন টের পাওয়া যাচ্ছে। যেন আসন্ন কথোপকথন সবার হৃদয়ে এক অদৃশ্য কাঁপুনি বইয়ে দিচ্ছে।

ঠিক তখনই ওসমানের বাবা, ওমর খান, একগাল গম্ভীরতা নিয়ে কথার সূত্রপাত করলেন। কণ্ঠে স্মৃতির ভার, চোখে অভিজ্ঞতার দাগ—

-"সাড়ে পাঁচ বছর আগে আপনাদের দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম সোহা মায়ের জন্য। আজ আবারও এলাম, তবে এবার সাবা মায়ের জন্য। আশা করি, গত বারের মতো এবারও অসম্মানিত হতে হবে না।"

কথাগুলো শোনামাত্রই পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চায়ের কাপ থেকে ওঠা ধোঁয়াও যেন মুহূর্তের জন্য জমে থেমে গেল আকাশে। মনে হচ্ছিল, ঘরের প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি আসবাবপত্র, এমনকি সকালের আলো-ছায়াও যেন কান পেতে আছে এই কথোপকথনের পরবর্তী স্রোত শোনার জন্য।

ঘরে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। ওমর খানের কথায় নিলুফার বেগম লজ্জায় মাটির দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে ভেসে উঠল পুরোনো দিনের অপমানের তিক্ত স্মৃতি। সোহা স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। তার মনে প্রশ্নের ঝড় উঠল, ওরহানের বাবা-মা তার জন্য গিয়েছিল, আর ফিরেছিল অপমানিত হয়ে?

সোহা আস্তে আড়চোখে তাকালো নিলুফার বেগমের দিকে। তিনি মাথা নিচু করে নীরবে বসে আছেন, যেন স্মৃতির ভারে চেপে গেছেন। মুহূর্তেই সোহা নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো। দৃঢ় অথচ ভদ্র কণ্ঠে ওমর খানের উদ্দেশ্যে বলল—

-"অতীতে কি হয়েছে, আংকেল, আমি জানি না। তবে ভবিষ্যৎ যেন সুন্দর হয়, সেই চেষ্টাই আমাদের করা উচিত। ওসমান ভাইয়া আর সাবা একে অপরকে ভালোবাসে। তাই এখানে অযথা বাড়তি কথার কোনো অবকাশ দেখি না। আমরা রাজি, আপনারাও রাজি, তাহলে এখন বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করলেই বোধহয় ভালো হবে।"

সোহারের দৃঢ় কথায় ওমর খানের চোখে ভেসে উঠল তৃপ্তির ঝিলিক। তিনি আনন্দে হেসে বললেন—

-"ঠিক বলেছ মা। তাহলে আমরা সবাই মিলে দিন-তারিখ ঠিক করি। তবে... সাইফুল শেখের..."

কথা শেষ করতে না দিতেই নিলুফার বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন—

-"ওনার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার মেয়েদের কোনো বাবা নেই।"

তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে ঘরে বসা কারো পক্ষে আর একটি শব্দ উচ্চারণ করা সম্ভব হলো না। নীরব সম্মতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

শেষমেশ ঠিক করা হলো, আজ থেকে দশ দিন পরেই বিয়ে। মুহূর্তটি যেন ঘরের বাতাসকেও ভারী করে তুলল। সবার চোখেমুখে ছিল আশ্চর্য মিশ্র অনুভূতি, স্বস্তি, আনন্দ আর একটু অজানা শঙ্কা।

দুপুরে লাঞ্চ শেষ করে যখন সবাই বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন সুরাইয়া খান এগিয়ে এসে সোহারের পাশে দাঁড়ালেন। মায়াভরা দৃষ্টিতে তার মাথায় আলতো করে হাত রাখলেন। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সেই মুহূর্তে যেন এক মাতৃত্বের স্নেহ ছড়িয়ে পড়ল পুরো পরিবেশে। তাঁর চোখে ভেসে উঠছে মায়ের শূন্যতার আশঙ্কা, কণ্ঠে জমে থাকা অদৃশ্য আকুতি—

-"তুই কি যাবি না আমার বাড়ি? আমার বাড়ি কি শূন্য থেকে যাবে?"

সোহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল—

-"ছেলের বউ তো যাচ্ছে, তখন পূর্ণ হবে। আমার যাওয়ার কি প্রয়োজন?"

সুরাইয়া বেগম চোখ ভিজে ওঠা আড়াল করতে না পেরে বললেন—

-"তুই তো বড় বউ!"

সোহা এবার ঠান্ডা কণ্ঠে এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল যা মুহূর্তেই পরিবেশকে ভারী করে তুলল—

-"শিফাকে যদি কেউ ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করত, সেই বিয়ে আপনারা মেনে নিতেন?"

সুরাইয়া বেগম মুহূর্তেই নির্বাক হয়ে গেলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। ঘরজুড়ে নেমে এলো চাপা নীরবতা।

সোহা গভীর শ্বাস নিয়ে শান্তভাবে বলল—

-"আমাকে বউ ভাববেন না, আন্টি... মেয়ে ভাবুন। সারাজীবন পাশে থাকবো। কিন্তু যে সম্পর্ক কোনো বিয়েই নয়, সেই সম্পর্কের সুতো ধরে রেখে লাভ নেই।"

তার কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিমান, বরং ছিল অনড় সত্যের স্পর্শ। বাতাস থেমে গেল, চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন তাদের কথোপকথনকে আরও তীব্র করে তুলল। সুরাইয়া বেগমের চোখে অশ্রু ভরে উঠল, আর সেই অশ্রুই যেন প্রমাণ হয়ে রইল, সোহা শুধু তাদের ‘বউ’ নয়, হৃদয়ের গভীরে এক অবিচ্ছেদ্য ‘মেয়ে’।

.

.

.

সাবা, নিলুফার বেগম, সবাই মিলে কতবার যে সোহাকে বুঝিয়েছে, আর বাড়ি যেন না বিক্রি করে, আবার চাকরিতে ফিরে যায়, ওরহানকে একটা সুযোগ দেয়। সবাই বলেছে— "ওরহান তোকে ভালোবাসে, সে বদলাবে।" কিন্তু সোহা কোনো কথাই কানে তোলেনি। তার ভেতরে এক অচল দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।

ওরহান তাকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছে, এই সত্যটা সোহা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তার মন বলে, যে শুরুতেই প্রতারণা করে, তার ভালোবাসা সত্যি হতে পারে না। ক্ষমা করার শক্তি নেই তার। ক্ষমা করতে চেয়েও বার বার ব্যার্থ সে। অথচ সে প্রতিশোধপরায়ণও নয়, না হলে এতদিনে ওরহানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিত। কিন্তু না, সোহা শুধু দূরে সরে গেছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওরহানের আশেপাশেও সে থাকবে না। তার জন্য যা যা প্রয়োজন, নিজের জীবন গড়ার জন্য যা যা দরকার, সব সে করবে, কিন্তু ওরহানকে আর নিজের পথে আসতে দেবে না।

আজ বাড়ির রেজিস্ট্রির দিন। সকাল থেকে কেউই বাড়িতে নেই। কাজ সেরে দুপুরে যখন তারা ফিরে এলো, তখন সামনে যা দেখল, মুহূর্তেই সবার চোখ থমকে গেলো।

বাড়ির সামনের উঠোনজুড়ে ছড়ানো তাদের জামাকাপড়, বড় বড় লাগেজগুলো একটার ওপর একটা রাখা। বাড়ির প্রধান দরজায় ঝুলছে ভারী তালা। আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন পুলিশের লোক।

নিলুফার বেগম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সাবার মুখ শুকিয়ে গেল। আর সোহা, তার চোখে বিস্ময়ের সাথে সাথে জমে উঠলো ক্ষোভ। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সে পুলিশের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—

-"এইসব কি হচ্ছে? আমাদের জিনিসপত্র বাইরে কেন রাখা হয়েছে?"

পরিবেশ হঠাৎই ভারী হয়ে উঠল। ঠান্ডা বাতাসও যেন থেমে গেল। সাবা, নিলুফার বেগম চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে, যেন পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটতে যাচ্ছে সেই অপেক্ষায়।

পুলিশের একজন এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"ম্যাম, আপনাদের আজই বাড়ি খালি করে দিতে হবে। যিনি এই বাড়ি কিনেছেন, তার নির্দেশ এটাই।"

সোহা হতবাক হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল—

-"আপনারা কী বলছেন? আমাদের তো আরও এক মাস থাকার কথা এখানে!"

পুলিশ শান্ত অথচ কঠিন ভঙ্গিতে বলল—

-"দুঃখিত ম্যাম। জানি না আপনাদের সঙ্গে কী বোঝাপড়া হয়েছিল। তবে কোনো লিখিত চুক্তিপত্র নেই, তাই আমাদের কিছু করার সুযোগও নেই।"

সোহার চোখ বড় হয়ে উঠল বিস্ময়ে। কথাগুলো যেন কানে ঢুকলেও মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছে না। এরই মাঝে নিলুফার বেগম আর সাবা এসে ভাঙা গলায় বলল—

-"সত্যিই তো আপু, আমরা তো কোনো কাগজে চুক্তি করিনি... এখন আমরা কী করব?"

সোহার বুক কেঁপে উঠল। হাত কাঁপতে কাঁপতে সে তাড়াহুড়ো করে ফোন বের করল। একের পর এক নম্বরে কল দিল তূর্য চৌধুরীকে, যে মানুষটির হাতে তারা বাড়ি বিক্রি করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কলটি বারবার কেটে যাচ্ছে। বুঝতে দেরি হলো না—নম্বরটি ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

মুহূর্তেই সোহার পৃথিবী যেন অন্ধকারে ডুবে গেল। বুকের ভেতর জমাট বেঁধে থাকা আশা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হলো। ঠোঁট কাঁপতে লাগল, চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে। সে অসহায়ভাবে ফিসফিস করে বলল—

-"এখন আমি কী করব... কোথায় যাবো আমরা?"

ঠিক তখনই, নীরবতা ভেদ করে উঠল এক গম্ভীর অথচ দৃঢ় পুরুষকণ্ঠ—

-"চলে আসুন, মিস সোহা। আপনার জন্য আপনার নতুন বাড়ি অপেক্ষা করছে।"

Story Cover