ফিরে দেখা

পর্ব - ২৩

🟢

সোহা ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেলে কেবিনে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। দরজা কাঁপতে কাঁপতে ধীরে থেমে গেল, আর তার পরেই নীরবতা যেন আরো ঘনীভূত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসে জমে উঠল এক ধরনের শ্বাসরুদ্ধ চাপা উত্তাপ।

ওরহান চেয়ারে বসে রইল, নড়ল না একচুলও। তার দৃষ্টি কঠোরভাবে নিবদ্ধ টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলা আইডি কার্ডে। ছোট্ট প্লাস্টিকের টুকরোটা যেন চোখের সামনে থেকে বুকের ভেতরে অদৃশ্য আগুন ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অথচ তার মুখে কোনো ভাঁজ নেই, নির্লিপ্ত, নিস্পৃহ, পাথরের মতো নিশ্চল।

ইহাব একবার কিছু বলতে গিয়েও গলা শুকিয়ে থেমে গেল। তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিরহার বুক ওঠানামা করছে দ্রুততায়। সে অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে কেঁপে ওঠা গলায় বলল—

-"স্যার... ম্যাম তো চাকরি..."

ওরহান ধীরে, খুব ধীরে হাত তুলে ইঙ্গিত করল তাকে থামার। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফুটল। সেই হাসির মধ্যে ছিল না কোনো উষ্ণতা, ছিল কেবল বরফের মতো নির্দয় শীতলতা। কিন্তু চোখে তখনও দপদপ করছে ঈর্ষার আগুন। আগুন সে আটকে রেখেছে, তবু তার ঝলক যেন সমস্ত ঘর ভরে দিচ্ছে।

-"চাকরি কেউ এভাবে ছাড়ে না, মিস মিরহা।" সে শান্ত গলায় বলল।

-"ও ফিরে আসবেই।"

মিরহার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে এগিয়ে এলো খানিকটা, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কণ্ঠে ব্যাকুলতা—

-"কিন্তু... আপনি ইচ্ছে করেই ওকে অপমান করলেন! কেন?"

ধীরে ধীরে ওরহানের দৃষ্টি উপরে উঠল। তার চোখদুটি লালচে, ভেতরে জ্বলে উঠছে অবদমিত ঝড়, অথচ কণ্ঠস্বর রইল একইভাবে নির্লিপ্ত—

-"আমি কাউকে হারানোর ভয় পাই না। কিন্তু ওকে অন্য কারও সাথে ভাগ করতেও চাই না। ও আমার একান্তই আমার। ওকে তীব্রর সাথে দেখলে আমি সহ্য করতে পারি না। ভেতরে ঝড় উঠে।"

এক মুহূর্তে চারপাশ যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। ইহাব আর মিরহা নির্বাক। কেবিনের দেয়াল যেন চাপা অন্ধকারে ঢেকে গেল। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা আইডি কার্ডটাও তখন নিছক কোনো জিনিস নয়, সেটাই যেন ওরহানের বুকের ভেতরের গভীর হাহাকারের প্রতীক।

ওরহান হেলান দিল চেয়ারের গায়ে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরল, যেন বুকের ভেতরের ঝড়কে কোনোভাবে আটকে রাখতে চাইছে। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো, কিন্তু তাতেও মুক্তি নেই।

করিডরে তখনও বাজছে সোহারের তীক্ষ্ণ পদচিহ্নের প্রতিধ্বনি— ধুপ, ধুপ, ধুপ। প্রতিটি ধ্বনি যেন ওরহানের কানে বজ্রপাতের মতো আঘাত করছে। তার চোখে দপদপ করছে অব্যক্ত যন্ত্রণা, অথচ মুখে রয়ে গেছে আগের মতো নির্লিপ্ত ছায়া।

কিন্তু সত্যি হলো, ভেতরে ভেতরে ওরহান ভেঙে পড়ছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আর সেই ভাঙনের শব্দ কেবল ওরহানই শুনতে পাচ্ছে।

.

.

.

সোহা অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছে। নিঃশব্দ পদক্ষেপে গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল সে। হঠাৎই যেন সময় থেমে গেলো, তার পা জমে গেল স্থির মাটির উপর। সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিলুফার বেগম, সাইফুল শেখ এবং সাবা।

এক মুহূর্তে বুকের ভেতর হাওয়া বন্ধ হয়ে এলো, চোখের পলকে স্তব্ধ হয়ে গেলো সোহা। কত বছর পার হয়ে গেছে! তবু এ মুখগুলো তার ভেতরে এমন ঝড় তুললো, যেনো অতীতের অগ্নিগর্ভ কোনো অধ্যায় আবার হঠাৎ খুলে গেছে।

ঠিক এই কারণেই তো সে বাংলাদেশে ফেরার কথা কখনো কল্পনাতেও আনেনি। ভেবেছিলো, এই মাটিতে পা রাখলেই হয়তো আবার অতীতের সেই কষ্ট, সেই লাঞ্ছনা, সেই অশ্রু তাকে তাড়া করবে। অথচ এবার উপায় ছিল না। অফিস থেকে না পাঠালে, সে এ জীবনে বাংলাদেশে আসার কথাই ভাবতো না।

সোহা দাঁড়িয়ে আছে নির্বাক, নিঃশ্বাস পর্যন্ত টেনে নিতে পারছে না। চারপাশে যেন বাতাস ভারী হয়ে গেছে, শহরের কোলাহল মিলিয়ে গেছে, কেবল সেই দুটি মুখ আর তার অতীতের ঘূর্ণিঝড় ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে বর্তমানকে।

সাবা এগিয়ে এলো। সোহার হাত দৃঢ়ভাবে ধরে কণ্ঠ নরম করে বলল—

-"বাবা অনেক জোর করছিলেন। বাধ্য হয়ে নিয়ে এসেছি।"

সোহা নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সাবার দিকে। মনে হলো নিজের মনেই বলছে—একদিন না একদিন তো এই মুখোমুখি হওয়া অনিবার্য ছিল। আজই নাহয় হয়ে গেলো... তাতে বা এমন কী ক্ষতি?

ঠিক সেই মুহূর্তে নিলুফার বেগম এগিয়ে এলেন। অশ্রুসিক্ত নয়ন, কাঁপতে থাকা ঠোঁট, মেয়ের দুই হাত শক্ত করে ধরে বললেন—

-"মাফ করে দে মা... আমরা ভুল করেছি। অন্যায় করেছি।"

চারপাশের বাতাসে নীরবতার চাপা ভার নেমে এলো। দূরে দাঁড়ানো মানুষজনও যেন নিঃশ্বাস আটকে দেখছে দৃশ্যটা। সোহা স্থির দেহে দাঁড়িয়ে রইলো। শীতল, প্রখর কণ্ঠে উত্তর দিলো—

-"কিসের জন্য মাফ চাইছেন আপনি? নিজের শিক্ষাকে চিনতে না পারার জন্য? নিজের পেটের সন্তানকে বিশ্বাস করতে না পারার জন্য? নাকি কলঙ্কের তকমা গায়ে মেখে ঝড়-বৃষ্টির রাতে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য?"

নিলুফার বেগম কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। তিনি নিশ্চুপ। কেবল কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার শরীর কাঁপছে অনুশোচনায়।

সাইফুল শেখ এগিয়ে এলেন। স্ত্রীর কাঁধে আশ্বাসের হাত রাখলেন। মুখ নিচু, চোখ ভিজে আছে লজ্জা আর কষ্টে। ভারী কণ্ঠে বললেন—

-"সব কিছুর জন্য, মা। আমাদের ভুল হয়েছে, অন্যায় হয়েছে। সেদিন তোকে একবারও নিজের কথা বলার সুযোগ দিইনি। অন্যের মুখের কথা শুনে অকারণেই তোকে কলঙ্কিত করেছিলাম আমরা। মাফ করে দে, মা।"

সোহা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠলো। হাসিটা শান্ত হলেও তাতে তীব্র ব্যঙ্গ ছিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাবার চোখ ভরে উঠছে অশ্রুজলে, কিন্তু সে চুপ করে আছে। সোহা ধীর কণ্ঠে বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"পাঁচ বছর পর আপনাদের অনুতাপ হচ্ছে? যেদিন আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন, তখন একবারও কি ভেবেছিলেন কোথায় যাব আমি সেই গভীর রাতে? যদি কোনো বিপদে পড়তাম? ভাবেননি... কিছুই ভাবেননি। শুধু নিজের মান-সম্মান বাঁচানোর চিন্তাতেই ব্যস্ত ছিলেন। অথচ আমি তো আপনাদেরই সন্তান, আপনাদের রক্তের। তবু আমার বলা কথার কোনো মূল্য ছিল না আপনাদের কাছে। বাইরের মানুষের গুজবই আপনাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছিল। তাই কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দিলেন আমার মাথায়। আমাকে দেশ ছাড়তে হলো... সেই কলঙ্কের দায় বয়ে বেড়াতে হলো, যা আসলে আমার ছিলই না।"

শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে বলছিল সোহা, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো বুকে আঘাত করছিল নিলুফার বেগম আর সাইফুল শেখের। তারা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাতাসও যেন কেঁপে উঠলো সেই নিঃশব্দ কান্নার স্রোতে।

সোহারের চোখ দিয়েও অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সে ভাঙছে না, শুধু বলছে। সেই শান্ত উচ্চারণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ক্ষতবিক্ষত আত্মার দীর্ঘ পাঁচ বছরের দগদগে ইতিহাস।

পাশে সাবা দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে, যেন বোনের কষ্টটা সেও নিজের বুকের ভেতর অনুভব করছে।

সাইফুল শেখ ধীরে ধীরে স্ত্রীকে ছেড়ে দাঁড়ালেন। কাঁপা হাতে চোখের অশ্রু মুছে নিলেন তিনি। তারপর মেয়ের সামনে এসে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন। তাঁর গলা ভারী, কণ্ঠ কেঁপে উঠল গভীর অনুতাপে ভরা স্বরে—

-"সন্তান হাজার দোষ করলেও বাবা-মা নির্দ্বিধায় তাদের ক্ষমা করে বুকে আগলে নেয়। কিন্তু বাবা-মা দোষ করলেও কেনো তাদের ক্ষমা করা যায় না, বলবি মা? আমি তোর জন্মদাতা পিতা... তোর কাছে হাত জোড় করে নিজের অন্যায়ের ক্ষমা চাইছি। আমাকে ক্ষমা করবি না?"

চারপাশে হঠাৎ যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাতাসের ফিসফিস শব্দও যেন থেমে গেল।

সোহা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার চোখের গভীরে। সেখানে সে দেখল ভাঙা অহংকার, অনুতাপ আর হাহাকার। ধীরে নিজের চোখের অশ্রু মুছে নিল সে। তারপর কুণ্ঠিত পায়ে দু’পা এগিয়ে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল। সাইফুল শেখের কাঁপা জড়ো করা হাতে নামিয়ে দিল সোহা। নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আমি ওরহানকে বিয়ে করেছি।"

ঠাস! এক মুহূর্তে বজ্রপাতের মতো ছিটকে এলো সেই শব্দ। বাতাস কেঁপে উঠল, প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে গেল চারদিকে।

সাবা আর নিলুফার বেগম আতঙ্কে মুখ চেপে ধরলেন দু’হাতে, তাদের বিস্মিত দৃষ্টি গিয়ে আটকালো সাইফুল শেখের মুখমণ্ডলে। চারপাশে দাঁড়ানো মানুষগুলোর পদচারণ মুহূর্তেই থেমে গেল, যেন সময় হঠাৎ থমকে গেছে।

অদূরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ নিরব পর্যবেক্ষক ছিল ওসমান। প্রতিটি মুহূর্ত তার চোখে বন্দী হচ্ছিল। ওসমানই সাবাকে বলেছিল সাইফুল শেখ ও নিলুফার বেগমের দেখা করিয়ে দিতে সোহার সাথে। কিন্তু ঘটনাটা এমন রূপ নেবে, তা সে কল্পনাও করেনি। আকস্মিক এই দৃশ্যে হতভম্ব হয়ে গেল ওসমান। হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তে দ্রুততর হয়ে উঠল তার। হঠাৎ ছুটে এসে দাঁড়াল সোহার পেছনে।

চারপাশে ভারী নীরবতা নেমে এলো। বাতাসে অদৃশ্য এক চাপা ঝড় বইতে লাগল। কেউ কথা বলছে না, তবু মনে হচ্ছিল অজানা গর্জন ধ্বনিত হচ্ছে চারিদিকে।

সোহার মুখ হালকা বাম দিকে হেলে গেছে। গালে লালচে আঘাতের দাগ ফুটে উঠছে। জীবনে প্রথম, পাঁচ বছর আগে, সাইফুল শেখ তাকে মেরেছিল। আর আজ, দ্বিতীয়বার সেই নিষ্ঠুর হাত তার ওপর উঠলো।

আকস্মিক আঘাতে সোহা হালকা করে হাসল। সেই হাসি যেন ব্যথার নয়, ছিল তাচ্ছিল্য মেশানো বিদ্রুপে ভরা। ধীরে ধীরে তার হাসির আওয়াজ বাড়তে লাগল। চোখ তুলে উচ্চস্বরে অট্টহাসি ছড়িয়ে দিল চারপাশে। সেই হাসি শীতল বাতাস ভেদ করে, নিস্তব্ধতাকে ভয়ঙ্কর করে তুলল।

সাইফুল শেখ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে, ঠোঁট কাঁপছে ক্রোধে। নিলুফার বেগম, সাবা আর ওসমান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন সোহার প্রতিক্রিয়ার দিকে।তাদের চোখে বিস্ময় আর ভয় জমে উঠল, তারা বুঝতে পারছে না এই মেয়ে হাসছে কেন!

আরও ভয়াবহ চমক দিয়ে সাইফুল শেখ হঠাৎ গর্জে উঠলেন। তাঁর কণ্ঠ যেন বজ্রপাতের মতো ফেটে পড়ল—

-"ওই ছেলেকেই তোর বিয়ে করতে হলো? আর কোনো ছেলে ছিল না দেশে? ওই অভদ্র ছেলেকেই তোর বিয়ে করতে হলো? মান-সন্মান সব শেষ করে দিয়েছিস তুই আমার! তোকে মেয়ে বলতেও ঘেন্না হচ্ছে আমার। বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় একা একা বিয়ে করে নিলি তুই!"

চারপাশে থমথমে নীরবতা নেমে এলো। বাতাস ভারী হয়ে উঠল, যেন প্রতিটি শব্দ আকাশে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সবার বুকের ভেতর জমে গেল অজানা আতঙ্ক। দূরে কোথাও একটা কাক হঠাৎ ডেকে উঠল, কিন্তু সেও যেন এই দৃশ্যের ভয়াবহতায় থেমে গেল মাঝপথে।

সোহা দাঁড়িয়ে আছে গর্বিত ভঙ্গিতে, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। তার হাসি আর সাইফুল শেখের গর্জন মিলে এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে দিল পরিবেশে।

সাবা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। তার চোখে বিস্ময়ের ছায়া স্পষ্ট। নিলুফার বেগম ও ওসমানও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে, কারোর মুখে কোনো শব্দ নেই। যেন মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেছে।

হঠাৎই সোহা হাসি থামিয়ে ধীরে মায়ের দিকে মুখ ফেরাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—

-"আপনারও কি একই বক্তব্য, মিসেস শেখ?"

সেই প্রশ্নে বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। নিলুফার বেগম এক ঝলক স্বামীর রুদ্রমূর্তি লক্ষ্য করলেন। তাঁর চোখে আগুন, মুখে ক্রোধ। কিন্তু তারপরও বুক ভরা সাহস সঞ্চয় করে নিলুফার বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—

-"আমার মেয়ে যাকে ভালোবাসে, তার সাথে যদি সুখী থাকে, তবে আমার কোনো সমস্যা নেই। তার জীবন তারই। সে-ই অধিকার রাখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, কার সাথে জীবন কাটাবে, সেটা ঠিক করার।"

নীরব চারপাশে সেই কণ্ঠ যেন বাজের মতো প্রতিধ্বনিত হলো। সোহা মায়ের কথা শুনল। এক মুহূর্ত চোখ বুজে মাথা নিচু করল, ধীরে ধীরে মাথা দোলাল সম্মতির ইঙ্গিতে। তারপর চোখ তুলে তাকাল বাবার দিকে।

তার চোখে আর ভয় নেই, নেই দ্বিধা। কেবল তীব্র দাহ আর অবিচল দৃঢ়তা। চারপাশে জমাট নীরবতা, বাতাস থমকে আছে, সবার চোখ তাদের দিকে নিবদ্ধ। সোহা শীতল কণ্ঠে বলল—

-"একটা ছেলের সাথে শুধু একদিন ধাক্কা লেগেছিল। তাকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ না দিয়ে, এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে আপনি তাকে বিচার করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন। নিজের রক্ত, নিজের মেয়েকে মানুষের মিথ্যে অভিযোগে অভিযুক্ত করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আর আজ সেই একই মেয়ের কাছেই মাফ চাইতে এসেছেন! হাস্যকর!"

কথার শেষে সোহা হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসি যেন বিদ্রুপে ভরা ছুরি, চারপাশের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে কেটে গেল। সবাই স্তব্ধ, কেউ বুঝতে পারছে না এই হাসির আড়ালে কতটা দহন লুকিয়ে আছে।

হাসি থেমে গিয়ে আবারও শীতল অথচ বজ্রসম কণ্ঠে বলতে শুরু করল সোহা—

-"গভীর রাতে মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার আগে কোথায় ছিল আপনার মান-সন্মান? মেয়েরা তো পরিবারের সম্মান হয়, তাহলে সেই সম্মানকেই তো আপনি নিজ হাতে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছিলেন ঝড় বৃষ্টির গভীর অন্ধকার রাতে।"

চারপাশে হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। উপস্থিত সবার নিঃশ্বাস আটকে এলো, কেবল সোহাই দাঁড়িয়ে রইল অবিচল এক শিলা হয়ে। তার চোখে বিদ্রোহের আগুন, ঠোঁটে অবজ্ঞার রেখা। মনে হচ্ছিল প্রতিটি শব্দ বিদ্যুৎ হয়ে আঘাত করছে সাইফুল শেখের বুকে।

থেমে গেল সোহা। গভীরভাবে একবার শ্বাস নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা এক হাসি টেনে সাইফুল শেখের চোখে চোখ রেখে বলল—

-"কিসের মেয়ে বলে আপনি দাবি করছেন? আপনার মেয়ে মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। আপনার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে নেসলিহান সোহা। আপনার মেয়ে নই আমি।"

এই কথার পর হঠাৎ অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ল সে। সেই হাসি বিদ্রুপে মেশা, তীক্ষ্ণ তলোয়ারের মতো কেটে যাচ্ছিল নিস্তব্ধ বাতাসকে। হাসির ফাঁকেই আবারও উচ্চস্বরে বলতে শুরু করল সোহা—

-"ক্ষমা চাইতে এসেছেন? নিজেকে তো পরিবর্তনই করেননি আপনি। ঠিক আগের মতোই আছেন, অন্ধ অহংকারী, শুধু নিজের নিয়ম-কানুন নিয়ে মত্ত। আপনি তো কাউকে ভালোবাসেননি কোনোদিন। একটু আগে বললেন না, সন্তানদের সব ভুল বাবা-মা ক্ষমা করে? কই, পাঁচ বছর আগের আমার না-করা অন্যায়ের জন্য যে ভয়াবহ শাস্তি দিয়েছিলেন, সেটা ভুলে গেলেন? আমি তো তার এক আনাও আপনাদের ফিরিয়ে দিইনি। ফিরিয়ে দিলে নিতে পারবেন তো, মিস্টার শেখ? আর সবে তো বললাম, ওরহান আমার স্বামী। এটাও আপনার চোখে ভুল! কই, আপনি তো ক্ষমা করতে পারলেন না। তবে আমি কেন আপনাকে ক্ষমা করব?"

শব্দগুলো বের হচ্ছিল হাসতে হাসতে, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অনবরত অশ্রু। প্রতিটি ফোঁটা যেন জ্বলন্ত আগুন হয়ে মাটিতে পড়ছিল।

ওসমানের চোখও ভিজে উঠল, ছলছল করছে তার দৃষ্টি। সাবা হেঁচকি তুলে কাঁদছে, শব্দে বুক ফেটে যাচ্ছে তার। নিলুফার বেগম আঁচলে মুখ গুঁজে অশ্রুজলে ভিজিয়ে ফেলছেন।

আর সাইফুল শেখ, তিনি স্থির দাঁড়িয়ে, যেন বজ্রাঘাতে অবশ হয়ে গেছেন। চোখ বড় বড়, মুখ শূন্যতায় ভরা। ক্রোধ, লজ্জা, অনুতাপ, বিস্ময়, সব মিলেমিশে তার দেহকে স্তব্ধ করে রেখেছে। চারপাশের বাতাস ভারী, যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসই ধ্বনিত হচ্ছে শোকার্ত সঙ্গীতে।

সোহা নিজের চোখের অশ্রু মুছে নিল। তারপর ধীরে সাইফুল শেখের চোখের গভীরে তাকাল। কণ্ঠে ছিল শীতলতা, কিন্তু সেই শীতলতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অগ্নিগর্ভ দাহ—

-"আমার কোনো পরিবার নেই। আমি অনাথ। পাঁচ বছর আগে আমার পরিবারের সবাই মারা গেছে। আমিও আপনাদের কাছে মৃত, আপনারাও আমার কাছে মৃত। আর একটা কথা শোনেন, আপনার এই রাগ, এই দম্ভ, এই অহংকার... শুধু নিজেকেই ভালোবাসা আপনাকে একদিন একেবারে নিঃসঙ্গ করে দেবে। বিশ্বাস করুন, মিস্টার সাইফুল শেখ... আমি, নেসলিহান সোহা, আপনার মৃত্যুতে একফোঁটা চোখের অশ্রুও বিসর্জন দেব না।"

চারপাশে থমথমে নীরবতা নেমে এলো। বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেল, নিঃশ্বাসও ভারী হয়ে উঠল। নিলুফার বেগম, সাবা আর ওসমান স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলেন, কেউ কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না। সাইফুল শেখও নিশ্চুপ, তাঁর চোখ নিথর, যেন বজ্রাঘাতে ভস্মীভূত হয়েছে অন্তর।

সোহা আর একটি কথাও বাড়াল না। দৃঢ় পদক্ষেপে সবার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। তাঁর পায়ের শব্দ মাটি কাঁপিয়ে উঠল, যেন বিদ্রোহের সুর বাজছে প্রতিটি ধাপে। গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে বসলো।

ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই চারপাশ কেঁপে উঠল, আর মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি ছুটে বেরিয়ে গেল সেই ভারী পরিবেশ ফুঁড়ে। পেছনে রইল শুধু স্তব্ধতা, আর ভেঙে পড়া এক পরিবারের শূন্য নিঃশ্বাস।

.

.

.

সোহা চলে গেছে। তার পদধ্বনি মিলিয়ে যেতেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। নীরবতার মাঝে সাবা হঠাৎ এগিয়ে এসে সাইফুল শেখের দিকে চোখ গেঁথে দিল। কণ্ঠে ছিল জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ—

-"এতগুলো বছরেও আপনি কিছুই বুঝলেন না? আবারও সেই একই ভুল করলেন? একটুও অনুতপ্ত নন আপনি? এত ঘৃণা কেন করেন ওরহান ভাইকে?"

সাইফুল শেখ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েকে ধমক দিলেন। কিন্তু মুহূর্তেই সামনে এসে দাঁড়ালেন নিলুফার বেগম। কাঁপতে কাঁপতে তিনি মেয়েকে আগলে নিলেন, আর চোখে চোখ রাখলেন স্বামীর দিকে। তার কণ্ঠে ছিল দমিত যন্ত্রণার জ্বালা—

-"এক মেয়েকে হারিয়েও শিক্ষা হয়নি আপনার? অন্যের দোষ ধরতে গিয়ে নিজের ভুলগুলো দেখতে পান না! এত রাগ, এত অহংকার... সবটা ছেড়ে দিন। মৃত্যুশয্যায় যেন অন্তত একজন মানুষ পাশে থাকে, সেইরকম ব্যবহার করুন। আপনি কাউকে ভালোবাসেন না, কাউকে সম্মান দেন না, অথচ প্রত্যাশা করেন সবাই আপনাকে সম্মান দেবে! মনে রাখবেন, সম্মান ভিক্ষে চাওয়ার জিনিস নয়।"

মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল পরিবেশ। সাইফুল শেখ বিস্মিত দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন, কথাহীন, নির্বাক। আর কোনো সুযোগ না দিয়ে নিলুফার বেগম মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে ঘুরে দাঁড়ালেন।

তিনি ওসমানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখের কোণে লুকানো অশ্রু ঝিলিক দিচ্ছিল। কণ্ঠ ভাঙছিল বারবার, তবুও তিনি স্পষ্ট বললেন—

-"তোমার জন্যই আমি আজ আমার মেয়েকে ফিরে পেয়েছি। পাঁচ বছর আগে স্বামীকে হারাতে চাই নি বলে, আমি নিজের কন্যাকে বিসর্জন দিয়েছিলাম। অথচ স্বামী নয়, সে ছিল আসামি, যে ভালোবাসার অর্থ কোনোদিন বোঝেনি। আমাকেও ভালোবাসেনি, সেটাও বুঝি। কিন্তু আমি তো ভালোবেসেছিলাম, তাই পাশে থেকেছি। আজ আবার আমার মেয়েকে পেয়েছি, আমি তাকে আর হারাতে চাই না। তুমি কি আমাকে আমার মেয়ের বাড়ি পৌঁছে দেবে বাবা?"

ওসমান কিছুই বলল না। শুধু নীরবে মাথা নাড়ল। তার চোখেমুখে ভেসে উঠল এক অদৃশ্য অঙ্গীকারের ছাপ। ধীর পায়ে তিনি এগিয়ে গেলেন নিজের গাড়ির দিকে।

সন্ধ্যার আলো ঘনিয়ে এসেছে, বাতাসে কেবল অশ্রুর গন্ধ। নিলুফার বেগম আর সাবাকে সঙ্গে নিয়ে ওসমান গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে পড়ল, সোহার বাড়ির উদ্দেশ্যে।

Story Cover