হাসপাতালের পরিবেশ যেন এক অদৃশ্য চাপের ঘনঘটা। চারপাশে অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার, অস্থির পায়ের শব্দ, আর মাঝে মাঝে স্ট্রেচারের ধাতব চাকার কটকট শব্দ মিলেমিশে এক ধরনের মৃত্যুভয়ের সুর তোলে। সাদা দেয়ালে ম্লান আলো ছায়ার মতো কেঁপে ওঠে, যেন জীবনের সাথে মৃত্যুর টানাপোড়েন সেখানে লেগেই আছে।
বাতাসে জীবাণুনাশকের গন্ধ, তার মাঝেই রক্তের কাঁচা ধাতব গন্ধ মিশে আছে, শরীর কাঁপিয়ে তোলে। নার্সদের তাড়াহুড়ো ভরা পদক্ষেপ, ডাক্তারদের গম্ভীর মুখ, আর অপেক্ষমাণ স্বজনদের কান্না–হাহাকার মিলেমিশে হাসপাতালকে করে তোলে এক অস্থির অশ্রুধারার নদী। যেন এই জায়গাটা জীবনের শেষ লড়াইয়ের মঞ্চ, কেউ ফিরে আসে, কেউ থেকে যায় শীতল সাদা চাদরের আড়ালে।
তীব্রর এক ফোন কলে মুহূর্তেই আকাশ কাঁপিয়ে নামল একটি হেলিকপ্টার। শব্দের তীব্রতা যেন রাতের নীরবতাকে বিদীর্ণ করে দিল। গুঞ্জন তুলে ওরহানকে ও বাকিদের দ্রুত তুলে নিয়ে ছুটে এলো রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের ছাদে, ঢাকার সবচেয়ে দামী, সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরহান অজ্ঞান দেহে স্লাইডারের ওপর শুয়ে অপারেশন থিয়েটারের ভেতর মিলিয়ে গেল। দরজার ভেতর লাল আলো জ্বলে উঠল—"Operation in Progress"। আর বাইরে করিডোরে জমে উঠল এক অদৃশ্য আতঙ্ক, অস্থিরতার ভারী কুয়াশা।
সাদা মার্বেল ঘেরা উজ্জ্বল করিডোর, শীতল এয়ারকন্ডিশনের হাওয়া, তবু সবার বুকের ভেতর এক অদৃশ্য জ্বালা। পায়চারি করছে তীব্র, বারবার ঠোঁট কামড়ে ধরে। ইহাবের কপালে ঘাম জমেছে, অথচ ঠান্ডা বাতাসে সেই ঘামকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছে। শিফার চোখে জল গড়িয়ে গাল ভিজিয়ে নিচ্ছে, মিরহা চুপচাপ সাদা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ নামিয়ে রেখেছে। সাবা হাতের আঙুল চেপে চেপে ধরে বসে আছে, আর ওসমান চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, সে যেনো দৃষ্টি হারিয়েছে দূর অজানার দিকে।
আর সোহা? বাইরে শান্ত দেখালেও ভেতরে যেনো আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত চলছে। প্রত্যেক সেকেন্ডে তার বুকের ভেতর ঝড় বইছে, যদি ওরহান না বাঁচে?
করিডোরের নীরবতা কেবল ভাঙছে জুতোর টকটক শব্দ আর দূরে নার্সদের ফিসফিসানি। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির কাঁটা যেন বিদ্রুপ করে একেকটা মিনিটকে দীর্ঘতর করছে। অপেক্ষার সময়টুকু সবার কাছে এক একটি শতাব্দীর মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিশীলিত আলোকসজ্জা, ঝকঝকে পরিবেশ, সব আধুনিক যন্ত্রপাতি, এসবের মাঝেও আজ চারপাশে ভাসছে কেবল একটাই অনুভূতি অজানা আশঙ্কার ভয়। কারও ঠোঁটে প্রার্থনা, কারও চোখে অশ্রু, কারও বুকের ভেতর চিৎকার চাপা দিয়ে রাখা, এই করিডোর যেন এখন মানবিক যন্ত্রণার এক জীবন্ত দলিল।
তিন ঘণ্টার দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে অবশেষে অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজাটি আস্তে আস্তে খুলে গেল। সবার বুকের ভেতর জমে থাকা নিশ্বাস যেন একসাথে আটকে গেল সেই শব্দে। সাদা পোশাকে ডাক্তার ও নার্সেরা ধীরে ধীরে স্ট্রেচার ঠেলে বেরিয়ে এলো। আর সেখানে—
ওরহান। শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো, মাথায় মোটা সাদা পট্টি। নিস্তেজ, নির্জীবের মতো শুয়ে আছে, চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁট সাদা, নিঃশ্বাস যেন অতি ক্ষীণ এক ছায়া।
তার এই অবস্থায় চারপাশের করিডোর হঠাৎ আরও নীরব হয়ে উঠল। কারও কণ্ঠ বের হলো না, শুধু সবার চোখে আতঙ্ক আর অশ্রুর ঘূর্ণি। সোহা দু’পা এগিয়ে এসে স্ট্রেচারের পাশে দাঁড়াল, চোখের জল সামলাতে না পেরে বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। শিফার ঠোঁট কেঁপে উঠল, সাবার হাতের আঙুল একে অপরকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ইহাব আর ওসমানের চোখে অজানা ভয়ের অন্ধকার জমাট বেঁধে গেল।
অপারেশন থিয়েটারের দরজার ওপরে লাল বাতিটা নিভে গেছে ঠিকই, কিন্তু এই করিডোরের ভেতর অন্ধকার এখনো ঘনীভূত। মনে হচ্ছে, হাসপাতালের উজ্জ্বল আলোতেও সবার বুকের গভীর আশঙ্কা ঢাকা পড়ছে না।
ওরহানের নিস্তেজ দেহ যেন এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে শুয়ে রইল সবার সামনে—ফিরে দেখা হবে আবার?
.
.
.
হোটেল রুমের ভেতরটা যেন এক অদ্ভুত চাপা অন্ধকারে মোড়া। বাইরে শহরের কোলাহল থাকলেও এই ঘরে সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ভারী পর্দা টেনে দেওয়া, বাতাসের চলাচল নেই বললেই চলে। টেবিলের ওপর রাখা এক আধখানা গ্লাস, তাতে জমাট বাঁধা পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে ধীরেধীরে। ঘরের বাতাসে মিশে আছে ঘাম, ওষুধ আর রক্তের কটু গন্ধ।
বিছানায় আধশোয়া মানবটির গায়ে দাগ আর ক্ষতের ছড়াছড়ি। শরীরের জায়গায় জায়গায় ব্যান্ডেজ, তবু সে শান্ত নয়, অগ্নিগর্ভ কণ্ঠে একের পর এক বাক্য নিক্ষেপ করছে। তার চোখে রক্তচক্ষুর শিখা, ঠোঁটে বিকৃত হাসি, প্রতিটি শব্দে যেন মৃত্যুর হুমকি।
ডাক্তারটি অভ্যস্ত হাতেই কাজ করছেন বটে, কিন্তু বুকের ভেতর কাঁপুনি থামছে না। প্রতিটি ব্যান্ডেজের টান, প্রতিটি সেলাই যেন দম বন্ধ করা উত্তেজনার ভেতর সম্পন্ন হচ্ছে। চোখের কোণায় ভয়ের ছায়া লুকানো থাকলেও মুখে ফুটে ওঠে না। কারণ তার সামনেই রাখা আছে চকচকে কালো পিস্তল, নীরব অথচ নির্মম পাহারাদার।
ঘরের ভেতর যেন হিমশীতল নীরবতার সঙ্গে জড়াজড়ি করে রয়েছে দমবন্ধ আতঙ্ক। কেবল সেই মানবটির গর্জনেই ভাঙছে চারপাশের স্তব্ধতা।
-"আহাম্মকের দল সব! তোদের কে বলেছিল ওকে ছুরি মারতে?"
-"কিন্তু বস, আপনি তো পারছিলেন না ওর সাথে। আর একটু হলেই তো আপনাকে গলা টিপে মেরে ফেলত।"
-"মেরে ফেলত, ফেলত! লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসায় কোন বাহাদুরি দেখলি তুই? সালা, আমার সব প্ল্যান ভেস্তে দিলি। তোদের সব কটাকে মেরে জানাজা পড়িয়ে পুঁতে ফেলব আমি।"
-"বস... আমাদের ভুল হয়েছে, কিন্তু ও সত্যিই ভয়ংকর ছিল। আমরা ভেবেছিলাম এভাবেই..."
-"চুপ! অজুহাত চাই না আমি। কাজ চাই। যদি এবার সোহাকে শেষ করতে না পারিস, তাহলে শপথ করে বলছি, তোদের খুঁড়ে কবর দেব আমি নিজের হাতে।"
-"বস, এবার আর কোনো ভুল হবে না। শপথ..."
-"শপথ? তোর শপথের দাম জানিস কত? একটা ভাঙা সিগারেটের টুকরোর সমানও না। আমি যা বলি, সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবি। না হলে তোর মাথার খুলি উড়ে যাবে এই টেবিলের ওপরেই।"
ঘরের ভেতর আবারও গুমোট নীরবতা নেমে এলো। কেবল মানবটির কর্কশ শ্বাস আর ডাক্তারির হাত কাঁপার শব্দই শোনা যাচ্ছে।
.
.
.
ওরহানকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন— জ্ঞান না ফিরলে বলা যাবে না সে বিপদমুক্ত কিনা। পরিবারের কাউকে আইসিইউতে প্রবেশের অনুমতি নেই, তাই সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ঠিক সামনের করিডোর ঘেঁষে থাকা এক ওয়েটিং রুমে, সাদা আলোয় ভরা, নীরব অথচ চাপা আতঙ্কে মোড়া একটি ঘর।
সেখানে শিফা কান্না করতে করতে ওসমানের বুকেই ঘুমিয়ে গেছে। পাশে বসে সাবা, কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মিরহা ও ইহাব দূরে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে, শহরের আলো-অন্ধকার মিশ্রিত দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে কিন্তু আসলে চোখ তাদের ভেতরের অশান্তিতে নিমগ্ন।
খান বাড়ির সবাইকে ইনফর্ম করা হয়েছে। তারা আসতে চাইলেও ওসমান না করে দিয়েছে, মা এই অবস্থায় ওরহানকে দেখতে পারতেন না।
আকাশ ও তীব্র এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশব্দ অথচ গম্ভীর ছায়ার মতো। আর সোহা, সে কারও মতো বসে নেই, দাঁড়িয়ে আছে আইসিইউর কাচঘেরা দরজার সামনে, অচল প্রতিমার মতো। চোখে অশ্রু আসতে চাইছে কিন্তু সোহা নিজেকে শক্ত করে রেখেছে, যেন ভেঙে পড়লে বাকিদের মনোবলও ভেঙে যাবে।
বেশ কিছুক্ষণ এইভাবেই থাকার পর সোহা ধীরে ধীরে সবার মাঝে এসে দাঁড়াল। তারপর তীব্রর দিকে তাকিয়ে বলল—
-"মিস্টার চৌধুরী আপনি বাড়ি চলে যান। শুধু শুধু এখানে থেকে কি করবেন!"
-"কিন্তু মিস সোহা..."
-"কোনো কিন্তু নয়, আপনারা বাড়ি যান।"
কথাগুলো বলেই সোহা ঘুরে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার সরাসরি ওসমানের দিকে।
-"শিফাকে নিয়ে বাড়ি যান ভাইয়া। এখানে এত মানুষের থাকার প্রয়োজন নেই। জ্ঞান না ফিরলে তো আর ডাক্তার কিছু বলতেও পারবে না। আর মিস্টার ইহাব, আপনি কি মিরহা আর সাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারবেন?"
ইহাব ইতস্তত করে বলল—
-"কিন্তু ম্যাম, আপনি?"
সোহার চোখে তখন অদ্ভুত দৃঢ়তা।
-"আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি এখানেই থাকব। কোনো সমস্যা নেই।"
তখনই তীব্র এগিয়ে এলো। তার গলায় উৎকণ্ঠা মিশ্রিত কৌতূহল—
-"রাতে ঝামেলা হতে পারে। থাকবেন কোথায়? কি পরিচয়ে থাকবেন আপনি?"
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশে নীরবতা নেমে এলো। তারপর সোহা ধীরে ধীরে বলল—
-"ধোঁকা দিয়ে হোক, আর যেভাবেই হোক, কাগজে-কলমে আমি ওনার স্ত্রী। আমি মানি আর না মানি, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।"
ব্যস। আর কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না। সবাই মাথা নিচু করে নিল। করিডোরে নেমে এলো এক অদ্ভুত নিশ্চুপতা, যেন বাতাসও দাঁড়িয়ে পড়েছে সেই সত্যের ভারে।
.
.
.
ভোরের আলো হাসপাতালের জানালা ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছে। করিডোরে নার্সদের কোলাহল, দূরে ওষুধের ট্রলির শব্দ, আর চারদিকে হালকা সাদা আলো, সব মিলিয়ে হাসপাতালের সকালটা যেন নতুন আশার আভাস নিয়ে এসেছে। খান পরিবারের সবাই ভোরেই এসে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালে। সবার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত স্বস্তির ঢেউ।
ফজরের আযানের সাথে সাথে এক অলৌকিক মুহূর্তে ওরহান চোখ মেলে তাকায়। যেন আযানের ধ্বনি ভেদ করে তার নিস্তেজ প্রাণে নতুন শ্বাস ফিরে আসে। এখন তাকে স্থানান্তর করা হয়েছে নরমাল কেবিনে।ডাক্তাররা সব চেকআপ শেষে বলেছে—"সে বিপদমুক্ত।"
কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা। সাদা দেয়ালে সকালের আলো চিকচিক করছে। ওরহান শান্ত ঘুমে আচ্ছন্ন, পাশে বসে আছে সোহা, অবসন্ন চোখে, তবু বুক ভরা তৃপ্তি নিয়ে। এক রাতের লড়াই যেন তার মুখে স্পষ্ট লেখা।
খান বাড়ির সবাইকে দেখে সোহা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই সুরাইয়া বেগম দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। কান্না মিশ্রিত কণ্ঠ কাঁপছিলো—
-"তোকে কি বলে ধন্যবাদ দেবো মা? আমার ছেলের খেয়াল রেখেছিস সারারাত। তুই না থাকলে আমার ছেলেটার কি হতো?"
সোহা কিছু বলল না। শুধু চোখ নামিয়ে রাখল। তার ভেতরে যেন এক স্রোত বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভাষায় প্রকাশের মতো শক্তি নেই।
ওরহানের বাবা, চাচা এসে সোহার মাথায় হাত রাখলেন। সোহা কেঁপে উঠল। বহু বছর পর আজ সেই পিতৃস্নেহের হাত তার মাথায় পড়ল। বুকের ভেতরে অচেনা উষ্ণতার ঢেউ খেলল।
সোহা একবার তাকাল সবার মুখের দিকে। প্রত্যেকের চোখেই অশ্রুর চিকচিক করা আভা। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মুফতি মারুফ, শিফা, ওসমান, তারা নীরব দর্শক, তবু তাদের দৃষ্টিতে গভীর ভালোবাসা ও স্বস্তি মিশে আছে। মা, চাচী, সবাই এগিয়ে এসে সোহাকে আদর করে দিলেন, মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে। ঘর ভরে উঠল এক অদ্ভুত পারিবারিক আবেগে, যা এতদিন যেন লুকিয়ে ছিল অজানার অন্ধকারে।
ঠিক তখনই, বিছানায় শুয়ে থাকা ওরহানের চোখ আস্তে আস্তে খুলে গেল। ফ্যাকাশে ঠোঁট নড়ল, আর অস্পষ্ট সুরে সে ডাকল—
-"মা..."
সবাই দ্রুত ওরহানের বেডের চারপাশে ঘিরে দাঁড়ালো। কেবিনের হালকা আলোতে সাদা দেয়াল আর পরিষ্কার মেঝে যেন সবার আবেগের প্রতিফলন পাচ্ছিল। সবাই উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছে, কেমন লাগছে?
সুরাইয়া বেগম ছেলের হাত শক্ত করে ধরে কেঁদে চলেছেন। চোখে অশ্রু, মুখে চিন্তার ছাপ। ওরহান একবার সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে মায়ের দিকে।
-"ঠিক আছি আমি। কেঁদো না মা, তোমার শরীর খারাপ করবে। দেখো, আইএম এল ওকে।"
সুরাইয়া বেগমের কান্না থামলো না। কেবল বুকের ভেতরে চাপা দম বন্ধ করা শব্দ যেন বাইরে বেরোতে পারছিল না।
ঠিক তখন ডাক্তার আর একজন নার্স কেবিনে ঢুকলেন। ওরহানের চেকআপ করে তারা ধীরে ধীরে সুরাইয়া বেগমের পাশে এসে বললেন—
-"কাঁদবেন না, ম্যাম। এতে রোগীর ক্ষতি হতে পারে। নিজেকে শান্ত রাখুন। আপনার সন্তান বিপদমুক্ত। আপনাদের পরশুই তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। শুধু আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় পানি লাগাবেন না। আর বাকি সব যত্ন নিয়ম মতো নিবেন। বাড়িতে বেড রেস্টে রাখবেন।"
বাড়ির সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনল ডাক্তারদের কথা। ওরহান ওসমানের দিকে তাকাল।
-"সোহা কোথায়?"
ওসমান কাছে এসে দেখল সোহা নেই। সে মলিন মুখে বলল—
-"সারারাত এখানেই ছিল। ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল না। বাড়ি চলে গেছে বোধহয়। পরে আবার আসবে।"
ওরহান হালকা হাসল। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"কাকে কি বোঝাচ্ছিস? সে আর আসবে না। এতটা অভিমান আমার ওপর? কবে অবসান হবে এই অভিমানের? বেঁচে থাকা অবস্থায় ক্ষমা পাবো তো?"
সুরাইয়া বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে বললেন—
-"পাবে বাবা। এইভাবে হবে না। তুমি ওর যত্ন কর, নিজের অনুভূতি প্রকাশ কর। ভালোবাসা দাও। দেখবে সোহা ঠিক ফিরে আসবে তোমার কাছে।"
ওরহান মলিন হেসে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে শান্তি, কিন্তু ভেতরে মিশে আছে সেই দীর্ঘ রাতের কষ্ট আর স্বস্তির ঢেউ।
.
.
.
কেটে গেছে দেড় মাস। ওরহান পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিল মাত্র পনের দিনে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে সোহা একবারও তার খোঁজ নিতে যায়নি। যায়নি দেখতে। যেনো সম্পর্কের সকল বন্ধন এক মুহূর্তেই ছিন্ন করেছে সে।
তার ইচ্ছে করে—মাফ করে দিতে, ভুলে যেতে অতীতের সেই আঘাত। তবুও হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা সেই বিশ্বাসঘাতকতা সহজে ক্ষমা করা যায় না। তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে আবারও।
পনের দিনের মাথায় সুস্থ হয়ে অফিসে ফিরল ওরহান। একসাথে ভেলভেট ব্লুম ও খান কোম্পানির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল সে। অন্যদিকে, তীব্র বিশ দিন অফিসে আসেনি। বাড়ি থেকেই সব কাজ সামলেছে সে। এ সময়ে সোহাকে আর জ্বালায়নি ওরহান। বরং তাকে দিয়েছে আলাদা কেবিন। অহেতুক কোনো কারণে ডেকে পাঠায়নি। অকারণ আলাপে জড়ায়নি। দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল অদ্ভুত এক শান্তিতে, এক প্রকার নীরব যুদ্ধে।
বিশ দিন পর আবারও অফিসে এসেছে তীব্র। সে সোহা আর ওরহানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলেও, ওরহান তাকে সহ্য করতে পারে না। তীব্র সেটা বোঝে, অনুভব করে, কিন্তু প্রকাশ করে না, কোনো প্রতিক্রিয় দেখায় না।
অফিসের নানা কাজে সোহা এখন তীব্রর কাছেই বেশি আসে। কেবল একান্ত জরুরি স্বাক্ষরের জন্যই যায় ওরহানের কেবিনে। নাহলে যেনো ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে এড়িয়ে চলে। এই এক মাস, এক অদ্ভুত শান্তি, নীরবতা আর দমবন্ধ করা ভালো থাকার অভিনয়ে কেটে গেল সবার।
.
.
.
গত পনের দিন ধরে ওরহান সোহাকে মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার করছে। অকারণেই কেবিনে ডেকে বসিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তীব্রর কেবিনে যাওয়াটা যেন অপরাধ, তার জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ওরহান। এমনকি কোম্পানির নিয়মই পাল্টে দিয়েছে সে। ফলে বাধ্য হয়ে সোহাকে আর তীব্রর কাছে যায় না। এখন সামান্য কাগজে স্বাক্ষর লাগলেও যেতে হয় ওরহানের কাছেই।
অতঃপর শুরু হয় ওরহানের খেলা। সোহার প্রতিটি কাজে সে ভুল খুঁজে বেড়ায়। প্রতিটি কাজ বারবার নতুন করে ডিজাইন করতে বাধ্য হয় সোহা। প্রতিদিন ওভারটাইম করতে হয়, আর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে খাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। সোহা বুঝতেই পারছে না ওরহানের হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ। এতটুকু সে বুঝেছে কোনো বিষয়ে বেশ ক্ষিপ্ত ওরহান। আর সেটারই বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এইভাবে।
কিন্তু আজ, আজ সোহা প্রচণ্ড রেগে আছে। কারণ আজ ওরহান সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
মিটিং রুমের ভেতর, সহকর্মীদের সামনে, সোহার ডিজাইন নিয়ে করেছে উল্টোপাল্টা মন্তব্য। তার ইগো সোজা আঘাত করেছে এই কথাগুলো। চারপাশের দেয়াল যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল সেই বিদ্রূপে।
আর তীব্র, সে নীরব দর্শকের মতো বসে ছিল। চোখের সামনে ঘটতে থাকা এই নাটকীয় মুহূর্তের প্রতিটি খুঁটিনাটি দেখেছে।
ওরহান সব বুঝেও থেমে থাকেনি। বরং আরো নির্দয় হয়ে, একের পর এক প্রশ্ন করেছে সোহাকে। যেন ইচ্ছে করেই তাকে জ্বালাচ্ছে, রাগাতে চাইছে।
.
.
.
মিটিং রুম থেকে বেরিয়েই সোহা ফেটে পড়ল। রাগে তার দু’চোখ লাল, নিঃশ্বাস প্রলয়ী ঝড়ের মতো দ্রুত। হাতে থাকা সব কাগজপত্র একের পর এক ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে মেঝেতে। সারা রুমে যেন কাগজের ঝড় বইতে লাগল।
মিরহা পেছন পেছন এসে সোহাকে থামানোর চেষ্টা করল।
-"শান্ত হোন ম্যাম..."
কিন্তু সোহা যেন আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে।
-"পারছি না! পারছি না শান্ত হতে! এই মানুষটা...এই পুরুষটা আমাকে শান্তি দিচ্ছে না।"
মিরহার কণ্ঠ কাঁপল।
-"তাহলে... এখন কি করবেন?"
সোহা হঠাৎ থেমে গেল। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। ধীরে ধীরে মাথা তুলল, আর মিরহার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
-"দেখাচ্ছি... এখনই দেখাচ্ছি কি করবো।"
এক ঝড়ো গতিতে সে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। পেছন পেছন মিরহাও এগোলো। সোহার পায়ের শব্দ যেন বজ্রের গর্জন, করিডর কেঁপে উঠল। ওরহানের কেবিনের সামনে এসে এক ধাক্কায় দরজা খুলে ফেলল। দরজার আঘাতে সারা ফ্লোরে প্রচণ্ড শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। পাশের রুম থেকে বিস্মিত হয়ে তীব্র দৌড়ে বেরিয়ে এলো।
ভেতরে তখন ওরহান আর ইহাব জরুরি কোনো আলোচনা করছিল। সোহাকে দেখেই তাদের মুখে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। পরিবেশে হিমশীতল নীরবতা নেমে এলো, শুধু সোহা যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে।
সোজা এগিয়ে গিয়ে সে ওরহানের টেবিলে হাতের মুঠো আছড়ে মারল।
-"সমস্যা কি আপনার? এত অত্যাচার করছেন কেন? আমি শান্তিতে থাকলে কি আপনার সহ্য হয় না?"
ওরহান মুখ তোলল। চোখেমুখে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, কণ্ঠস্বরও শীতল।
-"কি করেছি আমি?"
সোহার দেহ কেঁপে উঠল ক্রোধে।
-"কি করেছেন? ডিজাইনের কি বুঝেন আপনি? বারবার আমার কাজে খুঁত ধরছেন। অযথা আমাকে দিয়ে পরিশ্রম করাচ্ছেন। আসলে সমস্যা কি? কার ওপরের রাগ আমার ওপর ঝাড়ছেন?"
ওরহান এ সময় চেয়ারে হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো। তার কণ্ঠে কঠোরতা জমে উঠল।
-"অফিসটা কাজের জায়গা, মিস সোহা। তীব্রর সাথে আড্ডা দিয়ে গল্প করার আড্ডাখানা নয়।"
সোহা হকচকিয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারল, এটা তো সরল শাসন নয়, এ একরাশ হিংসা। ওরহানের চোখে জেলাসির ছায়া। তীব্রর সাথে তার বন্ধুত্বটাই যেন ওরহানের সহ্য হচ্ছে না। এজন্যই তার কাজে অকারণ খুঁত ধরা, অপমান, আর এই অবিরাম চাপ। অথচ সোহার কাজে ত্রুটি নেই, সবই নিখুঁত।
ক্রোধে তার রক্ত ফেটে যাচ্ছে।
-"ফাজলামি পেয়েছেন নাকি? আমি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করি। সব কাজ নিখুঁত। অথচ আপনি মিটিং রুমে আমাকে সবার সামনে অপমান করেন!"
ওরহান আবারো ঠান্ডা গলায় বলল, কিন্তু কণ্ঠের নিচে ছিল হুকুমের শীতলতা।
-"এটাই এখন থেকে নতুন নিয়ম। ইহাব, নোটিশ জারি করো। কোনো ভুল হলে সবার সামনে মিটিং রুমেই বলা হবে।"
শব্দগুলো সোহাকে ছুরির মতো বিদ্ধ করল। তার সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। এক ঝটকায় সে নিজের গলায় ঝুলে থাকা আইডি কার্ড ছিঁড়ে ফেলল। টেবিলে ছুঁড়ে রেখে বজ্রকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল—
-"তোর চাকরি তুই কর! আমার লাগবে না এই চাকরি।"
এক মুহূর্ত নীরবতা। কক্ষে যেন বাতাস জমে গেল। ইহাব স্তব্ধ, মিরহা হতবাক, তীব্র চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু সোহা আর পিছনে তাকালো না। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলো। তার পায়ের শব্দ করিডরে প্রতিধ্বনিত হলো, যেন বিদ্রোহের পদচিহ্ন লিখে রেখে যাচ্ছে প্রতিটি ইটে।