ঘনকালো জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ থেকে ছয়জন মানুষ। কেউ নিজের নখ খুটছে, কেউ হাত চুলাকচ্ছে, কেউ ঘাম মুছে। ভয়ে প্রত্যেকের অবস্থাই একেক রকম, একেকজনের দেহে অস্থিরতার স্পন্দন, একেকজনের চোখে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। রাতের আধারে কুয়াশা হালকা করে নামছে। চারপাশে পূর্ণিমার আলো পড়ছে, কিন্তু ঘন জঙ্গলের পাতার ভিড়ে সেই আলো পৌঁছাতে পারছে না। ঠান্ডা, শীতল বাতাস বইছে, তবুও সবাই ঘেমে জুবুথুবু অবস্থায়। ছয়জনই কালোপশক পরিহিত, মুখের রূপ অস্পষ্ট।
ভয়ের মধ্যেই পাতার খোস খোস শব্দ ভেসে আসে। কেউ এদিকে হেঁটে আসছে, পদক্ষেপ ভারী, নিশ্চিত, ভয়ংকর। সবাই চমকে উঠে, চোখ কেবল ওই দিকেই। তড়িৎবেগে পেছন ফিরে তাকায়। কালো লেদার প্যান্ট ও জাকেট, মাথায় কালো ক্যাপ, মুখে কালো মাস্ক। হাতে এক লাইটার, যা ঘোরাতে ঘোরাতে সামনে এগোচ্ছে।
মানবটি তাদের সামনে এসে থামে। কোনো শব্দ ছাড়াই, উপস্থিত ছয়জনের উপর আঘাত শুরু করে সে। আঘাতের ধ্বনিতে চারপাশের অন্ধকার যেন আরও গভীর হয়। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট পর ক্ষান্ত হয় সে। তারপর ধীরে ধীরে ছয়জনের থেকে সরে এসে নিজেকে ধাতস্ত করে দাঁড়ায়। বুক টানটান, হাতে লাইটারটি এখনও ঘোরাতে থাকে। ভয়ংকর, গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"তিনবার, তিন তিনটি বার তোরা ব্যার্থ। একটি কাজও তোদের ধারা হয় না। একটি মেয়েকে মেরে ফেলতে এত সময় লাগে তোদের? আর এই তোরা নিজেদের গুন্ডা বলে দাবি করিস?"
ছয়জনই মাটিতে হাটু গেরে বসে পড়ল। দুই হাত জোড় করে মাথা নিচু করে, কাপা কণ্ঠে বলল—
-"মাফ করুন, বস। তাকে আমরা কখনোই একা পাই নি। কেউ না কেউ সব সময় থাকে। আর যখনই একা পাই, ওই ওরহান এসে উপস্থিত হয়।"
মানবটির রাগান্বিত চেহারার পরিবর্তন ঘটলো। উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সেই মানব। হাসির প্রতিধ্বনি জঙ্গলের অন্ধকারে মুখরিত হলো। তারপর ছয়জনের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে চিৎকার করে, রাগান্বিত কণ্ঠে বলল—
-"পাবি কিভাবে, তোদের মাথায় বুদ্ধি আছে নাকি? চালাকি করে তো একা আনতেও পারিস না! এইবার তোদের সাথে কি করা যায় বল তো? এত সহজ একটি কাজ তোরা এখনো করতে পারলি না। এখন তোদের সব কটাকে এক সাথে ওপরে পাঠিয়ে দেই?"
-"না, না, বস। আমাদের আর একটি সুযোগ দিন। এইবার আপনাকে নিরাশ করবো না, বস।"
-"পারবি এবার সোহাকে মেরে ফেলতে?"
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলা এক পুরুষের গম্ভীর কণ্ঠ—
-"ওরহান জীবিত থাকতে সোহার গায়ে কেউ ফুলের টোকাও দিতে পারবে না। শুধু শুধু নিজেদের সময় নষ্ট করছিস!"
শব্দগুলো যেন ছয়জনের মাথায় বিদ্যুৎ হয়ে আছড়ে পড়ল। মুহূর্তেই পরিবেশে এক অদ্ভুত উত্তেজনা, ভয়, এবং অবিশ্বাসের মিশ্রণ। চারপাশের অন্ধকারে চুপচাপ লুকিয়ে থাকা জঙ্গলের গন্ধ যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
সবাই সামনে তাকিয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানবটি আস্তে ধীরে পিছু হটল, তারপর উল্টো মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল। আশ্চর্যজনকভাবে, সে একটুও অবাক নয়। কিন্তু উপস্থিত বাকি ছয়জনের চোখ যেনো বিস্ময়ে ছলছল করছে। তাদের মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, এই মানুষটি এখানে কী করছে? কীভাবে এই ঠিকানায় পৌঁছেছে? একে একে তারা একে অপরের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল, কোনো শব্দ ছাড়াই।
মানবটি লাইটারের হালকা কম্পমান আলোয় দাঁড়িয়ে, হঠাৎ উচ্চশব্দে হেসে উঠল। উচ্ছসিত হয়ে বলল—
-"ওয়েলকাম, মিস্টার ওরহান খান শাহির। তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আচ্ছা, তোর সমস্যা কী? কেন সবসময় আমার কাজে ব্যাঘাত ঘটাস?"
ওরহান, দূরে, তার প্যান্টের পকেটে দুহাত রেখে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার উপস্থিতি যেন চারপাশের বাতাসকেই হিমায়িত করে দিচ্ছে। এক ধরণের অদৃশ্য ভয় চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল, গাছের পাতা, বাতাস, এমনকি ছায়াও যেনো থমকে গেল।
হঠাৎ, ওরহান ধীর পায়ে এগিয়ে আসল। তার শীতল, গভীর কণ্ঠ যেনো কোনো ঝড়ের আগে শান্ত সমুদ্রের মতো, এবং সেই কণ্ঠে লুকানো আঘাত, আক্রমণ, এবং অদৃশ্য কর্তৃত্ব সবকিছুতে প্রভাব ফেলছে।
-"তুই বারবার আমার কলিজায় হাত দিবি, আর আমি তোকে ছেড়ে দেবো?" ওরহান অগ্নিদৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বলল কথাটি।
মানবটির ঠোঁটে বিদ্রূপের রেখা ফুটে উঠলো। ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলে উঠলো—
-"তোর কলিজা ভুনা খাওয়া আমার অনেক দিনের শখ।"
চোখে আগুন জ্বালিয়ে ওরহান উত্তর দিলো—
-সেই শখ তোর এজনমে কোনোদিন পূরণ হবে না!"
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাতাস ভারী হয়ে উঠলো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে। মানবটির ঠোঁটে হঠাৎ এক শয়তানি হাসি খেলে গেলো—
-"তুই কেনো সোহাকে এত সেফে রাখিস, বল তো?"
ওরহানের চোখ মুহূর্তেই জ্বলে উঠলো রক্তলাল শিখায়। তবুও দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"সেই প্রশ্নের উত্তর তো তোর জানা।"
মানবটি ঠান্ডা স্বরে বিষ ছুঁড়ে দিলো—
-"হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। তোর আত্মা বাস করে সোহার মাঝে। তাই তো ওকেই মেরে ফেলবো। এক ঢিলে দুই পাখি, সোহা মরবে, সাথে তুইও!"
এই অবমাননাকর উচ্চারণে ওরহানের রক্ত উথলে উঠলো। আকাশে যেনো বজ্রপাত হলো, বাতাস ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। সোহার নাম এই নরকোচ্ছিষ্টের মুখে উচ্চারিত হওয়া সে আর সহ্য করতে পারলো না।
বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো ওরহান। মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেলো দুই পুরুষের প্রলয়ঙ্কর লড়াই। মাটির গায়ে ধুলো উড়লো, বাতাসে ছড়ালো ঘাম আর রক্তের গন্ধ। চারপাশের পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো, কেউ যেনো নিশ্বাস ফেলতে সাহস পেলো না।
এ যেনো শুধু দুই শরীরের সংঘর্ষ নয়, এ ছিলো প্রাণ আর প্রেমের রক্তজ্বালা, অগ্নিঝড়ের মতো এক যুদ্ধ।
.
.
.
সোহা ও ওরহান চলে যাওয়ার পর খেলার রঙ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো, যেন আনন্দের ঢেউ এক আঘাতে স্তব্ধ হয়েছে। সবাই বিষণ্ন চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তীব্র এক পলক সাবার দিকে তাকালো। কৌতূহলী কণ্ঠে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল—
-"মিস্টার খান... মিস সোহার হাজবেন্ড?"
সাবার চোখে ছায়া নেমে এলো। তার দৃষ্টি যেনো অতীতের কোনো অদৃশ্য গহ্বরে ডুবে গেলো। মলিন কণ্ঠে উত্তর দিলো—
-"হুম।"
এরপর আর কোনো প্রশ্ন করলো না তীব্র। সে বুঝে ফেললো, এখানে এক গভীর অতীত আছে, কিন্তু সেই অতীতের গল্প কেউ উচ্চারণ করবে না। নিছক কৌতূহল দেখানো এখানে বোকামি। তাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে, এবং সবার ভিড় থেকে দূরে চলে গেলো।
শিফা তার চলে যাওয়া দেখলো নিস্তব্ধ চোখে, কিন্তু কিছু বললো না। তারপর সাবাও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তাকে অনুসরণ করলো ওসমান, এক অনুচ্চারিত ছায়ার মতো।
খোলা আকাশের নীচে, এক নির্জন পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সাবা। হিমেল বাতাসে তার খোলা চুলগুলো পাখির ডানার মতো উড়ে যাচ্ছিল। বাতাসে যেন এক অদৃশ্য বিষণ্নতার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সাবার পাশে এসে দাঁড়ালো ওসমান। তার চোখে ছিল নীরব দৃঢ়তা, আর কণ্ঠে শান্ত স্রোতের মতো স্নিগ্ধতা—
-"কি এত ভাবছো?"
সাবা চমকে উঠলো। গভীর চিন্তার আবেশে সে চারপাশ ভুলে গিয়েছিল। ওসমানকে দেখে ভয়ের কোনো ছায়া নামলো না তার চোখে। সামনের দূরত্বে মুখ ফিরিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল—
-"আমার আপুর জীবনে কি কোনোদিন সুখ আসবে না?"
ওসমানও দৃষ্টি ফেরালো সামনে। হিমেল বাতাসে তাদের নীরবতা ভেসে গেলো কিছুক্ষণ। তারপর শীতল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"ভাবির কোনো দোষ নেই। সব দোষ আমার ভাইয়ের। তার উচিত ছিল শুরুতেই সবকিছু পরিষ্কার করে বলা। কিন্তু সে ছিল ভীষণ উদাসীন, ঠিক ভার্সিটি জীবনের মতোই। সময় থাকতে লিজার একটা ব্যবস্থা করলে আজকের এই অবস্থা তৈরি হতো না।"
সাবার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো—
-"লিজার বিষয়টা আলাদা। আপু সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে... ধোঁকা দিয়ে বিয়েটা করার জন্য।"
ওসমানের চোখ গভীর হয়ে উঠলো। তার কণ্ঠে জমে থাকা অতীতের ভার—
-"বাবা-মা গিয়েছিলেন। তোমার বাবা তখন ভীষণ অপমান করেছিলেন ওনাদের। সেই সত্যটা আজও গোপন। তোমাদের বাবা-মা তোমাদের কিছু জানায়নি।"
সাবা হঠাৎই চমকে উঠলো। শীতল বাতাসে যেনো তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। পাশ ফিরে ওসমানের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞাসা করলো—
-"কি বলছেন আপনি এসব?"
ওসমান ধীরে মাথা নাড়লো। গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"হুম। দাদাভাই ভাবী ছাড়া বাঁচবে না। গত চার বছর কেমন কেটেছে, সেটা শুধু আমরা জানি... আর আল্লাহ জানেন। দাদাভাই বাধ্য হয়েছিল ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করতে। নাহলে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলতো সোহাকে। তোমার বাবা-মা তখন ভাবির বিয়ে অন্যত্র দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।"
সাবার চারপাশ যেনো মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে গেলো। কোনো শব্দ খুঁজে পেলো না সে। তার নিজের বাবা, যে বাবা ছিল তার ভরসা, সে-ই কি এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে? কোনো ছেলে কিংবা তার পরিবার সম্পর্কে না জেনে, শুধু একদিনের এক রাগে, ঘৃণার আগুনে এমন ভয়ঙ্কর অন্যায়?
বুকে যেনো দমবন্ধ কষ্ট জমে উঠলো। সেই যন্ত্রণার ভার আর ধরে রাখতে পারলো না সাবা। নিঃশব্দে চোখ ভিজে গেলো। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়লো, যেনো প্রতিটি ফোঁটায় লুকিয়ে আছে অপমান, বিশ্বাসঘাতকতা আর ভাঙা স্বপ্নের আর্তনাদ।
.
.
.
তীব্র ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছিল। সমান তালে পায়চারি করছে সে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে জমা হচ্ছে অগ্নিগর্জন। কপালের রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে, চোখে জ্বলছে অগ্নিশিখা। ফোনের ওপাশের মানুষটির প্রতি ভীষণ ক্ষোভে ফেটে পড়লো তার কণ্ঠ—
-"একটা কাজও পারো না তোমরা! টাকা দিয়ে তোমাদের রাখা হয় কেনো?"
ওপাশ থেকে কী উত্তর এলো, সেটা বোঝা গেল না। কিন্তু তীব্রের ভেতরে ক্ষোভের আগুন আরও তীব্র হলো। দাঁত চেপে, রাগান্বিত চাপা স্বরে আবারও গর্জে উঠলো—
-"প্ল্যান পরিবর্তন হয়েছে। এইভাবে কোনো কাজ হবে না। এবার সরাসরি আঘাত করতে হবে... প্রফেশনাল দিকটা ধ্বংস করতে হবে!"
চারপাশে বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। রাতের আঁধারে কিংবা দিনের নিস্তব্ধ আলোয়, চারদিক যেন তার রাগে কেঁপে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো এক চিকন, মেয়েলি কণ্ঠস্বর—
-"কাকে আঘাত করার কথা বললেন?"
আচমকা সেই কণ্ঠে জমাট নীরবতা ভেঙে পড়লো বজ্রপাতের মতো। তীব্রের পদক্ষেপ থমকে গেল। রাগে জ্বলে ওঠা মুখ মুহূর্তেই টানটান হয়ে উঠলো অচেনা বিস্ময়ে।
তীব্র পেছন ফিরে তাকালো। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো, ফোনটা কেটে দিলো দৃঢ় ভঙ্গিতে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিফার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
-"আড়ি পেতে আমার কথা শুনছিলেন?"
শিফা থমকে গেলো। কণ্ঠ কেঁপে উঠলো—
-"না... আসলে আমি..."
কিন্তু বাক্য শেষ করার সুযোগও দিলো না তীব্র। গর্জনমাখা ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যেতে যেতে বলে উঠলো—
-"আমার পেছন ঘোরা বন্ধ করুন। এত অপমানের পরও কোন মুখে আসেন আমার সামনে? সাথে আমাকে আপনার সব ফালতু উপহার দেওয়াও বন্ধ করুন।"
শিফা স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তার দু’চোখে অব্যক্ত বেদনা জমে উঠলো। এক ঝটকায় দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। কাঁপা হাতে চোখ মুছে সে পিছিয়ে আসতে চাইলো। ঠিক তখনই সামনে ভেসে উঠলো সোহা, মলিন মুখে, নিঃশব্দ পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। শিফা আর স্থির থাকতে পারলো না। ভাঙা হৃদয়ের টানে দৌড়ে গেলো সোহার দিকে।
সেই দৃশ্য তীব্রের চোখ এড়ালো না। তার পদক্ষেপ থেমে গেলো। বুকের ভেতর জমা ক্রোধ হঠাৎ যেনো ভারী নিস্তব্ধতায় রূপ নিলো। দূর থেকে সোহাকে একবার দেখেই ঠোঁট নড়লো তার। নিঃশব্দ অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বিড়বিড় করে বলল—
-"আপনার জন্য... মনের অজান্তেই যেই অনুভূতি জন্মেছিল, আজ সেই সব অনুভূতিকে নিজ হাতে গলা টিপে হত্যা করলাম।"
চারপাশে হিমেল বাতাস বইছিল। নীরব আকাশ যেনো তার কথার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠলো। সোহা আর শিফা শুনল না, কিন্তু বাতাস যেনো শুনলো তীব্রের বুকের ভিতর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া এক মানুষের আর্তনাদ।
.
.
.
রাত গভীর। বার্বিকিউ পার্টি শেষ হলো অবশেষে। সারাক্ষণ পার্টিতে ওরহানের অনুপস্থিতি সবাই লক্ষ্য করেছে। একে একে সবাই তার খোঁজ নিয়েছে, শুধু সোহা, সে একবারও খোঁজ করেনি। যেন ইচ্ছাকৃতভাবে নাম উচ্চারণ এড়িয়ে গেছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই খোলা আকাশের নিচে, তারাভরা আঙ্গিনায় গোল হয়ে বসলো। অফিসের অন্যান্যরা নিজেদের সঙ্গী নিয়ে এসেছিল—তারা ইতিমধ্যেই নিজ নিজ কক্ষে চলে গেছে। তীব্র একটু দূরে দাঁড়িয়ে, মুখ নিচু করে ফোন টিপছিল। বাকিরা শান্তভাবে বসেছিল গোল করে।
মিরহা ইহাবের পাশে বসে ছিল। ইহাবের বেহায়া দৃষ্টি তাকে অস্বস্তিতে ডুবিয়ে দিল। লজ্জায়, অস্বস্তিতে সে আর সহ্য করতে পারলো না। ধীরে ধীরে উঠে এসে সোহার পাশে গিয়ে বসল।
মুহূর্তটা অদ্ভুত শান্ত। আকাশ ভরে গেছে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয়। সেই সাদা আলো চারপাশকে ছুঁয়ে একরকম রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। তার সাথে ছিল সোনালি তারার লাইটিং, যেন চাঁদের আলোয় পৃথিবীরই প্রতিচ্ছবি। বাতাস ঠান্ডা, হালকা শীতল স্পর্শে গায়ে কাঁটা দিয়ে যাচ্ছিল। নিস্তব্ধতায় শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
ঠিক সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে, ওসমান গভীর অথচ শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল—
-"অনেক বিষণ্ন লাগছে। সবাই এভাবে মনমরা হয়ে থাকলে ভালো লাগে না।"
ওসমানের কথায় নিস্তব্ধতা ভাঙলো।
সাবা হালকা হাসলো। বলল—
-"হুম, ঠিক বলেছেন। চলো, সবাই একে একে গান গাই।"
সাবার প্রস্তাবে একে একে সবাই মাথা নাড়লো সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে। চাঁদের আলোয় ভরা সেই খোলা প্রাঙ্গণে, তারাভরা আকাশের নিচে শুরু হলো গানের আসর। একে একে সবাই নিজেদের মতো গান ধরলো। কারো কণ্ঠে স্মৃতির ছোঁয়া, কারো কণ্ঠে বিষণ্নতার রেশ, আবার কারো গলায় ফুটে উঠলো অদৃশ্য আনন্দ।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তীব্র সেই দৃশ্যের দিকে একবার তাকালো। দ্রুত আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই, শিফা গান ধরলো।
তার গলায় সুর নেমে এলো নদীর কলকল ধ্বনির মতো, কখনো আবার শিশিরভেজা সকালের মতো কোমল। সেই সুরে এক অদ্ভুত টান ছিল, যা মুহূর্তেই চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আবিষ্ট করে ফেলল। এত মধুর কণ্ঠস্বর তীব্র এর আগে কখনো শোনেনি। নিজের অজান্তেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল শিফার উপর। চোখে যেন মুগ্ধতার আলো জ্বলে উঠলো। এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলো সব রাগ, সব অহংকার—শুধু সুরের ঢেউয়ে ভেসে যেতে লাগলো।
চাঁদের আলোয় ভরা সেই প্রাঙ্গণ তখন নিস্তব্ধ। সবাই গোল হয়ে বসে আছে, শুধু রাতের হাওয়া আর বারবিকিউর আগুন থেকে উড়ে আসা ছাই মাঝে মাঝে ভেসে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। সেই নিরবতা ভেঙে শিফার কণ্ঠ ভেসে এলো—
"আমার আগুনের ছাই জমে জমে,
কত পাহাড় হয়ে যায়।
আমার ফাগুনেরা দিন গোনে গোনে,
আর উধাও হয়ে যায়..."
সবার নিঃশ্বাস যেন একসাথে আটকে গেলো। সুর মিশে গেল রাতের আকাশে, কেউ আর শব্দ করলো না।
তীব্র, যে এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছিল, তার দৃষ্টি আর সরলো না। শিফার কণ্ঠ বুকের গভীরে জমে থাকা শূন্যতাকে যেন অজান্তেই নাড়া দিলো।
"যত পথের বাধা,
সবই তো কালো সাদা,
কবে ঠিকানা পেয়ে হবে রঙীন।"
শিফার গলায় তখন ব্যথা আর আশার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। যেন এই গান শুধু একটি সুর নয়, তার নিজের জীবনেরই নিঃশব্দ আর্তনাদ।
মিরহা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসেছিল, চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করছিল। সাবা অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে, যেন তারাদের ভিড়েও কোথাও অদৃশ্য ব্যথা খুঁজছিল। আর সোহা, তার ঠোঁট কাঁপছিল অনবরত, প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ের গোপন ক্ষতকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
তীব্র চোখ নামাতে পারলো না। শিফার কণ্ঠে ধরা দিলো এক অদৃশ্য যন্ত্রণা, যা তার বুকের ভেতরে জমে থাকা অহংকারকে ধীরে ধীরে গলিয়ে দিচ্ছিল।
"চেনা নামেরই ডাকে,
আমি কি পাবো তাকে,
কবে রে আসবে সে রোদেলা দিন।"
চাঁদের আলোয় শিফার মুখমণ্ডল তখন দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। তীব্রের ভেতরে দ্বন্দ্ব, একদিকে অহংকার, অন্যদিকে এক অদৃশ্য টান, যা সে উপেক্ষা করতে পারছিল না।
গান চলতে থাকলো—
"তোরই তো কাছে চাই পুরোনো কথাটাই,
শুনতে আবার করে ও...
এমনও যদি হয়, মনেরা নদী হয়,
ভাসাবো অনেক দূরে।"
সেই লাইনগুলো শোনার সাথে সাথে তীব্রের বুক কেঁপে উঠলো। মনে হলো, কথাগুলো যেন সরাসরি তার উদ্দেশেই বলা। অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলো সুরের সাথে ভেসে যেতে লাগলো, ঠিক যেন এক অশান্ত নদীর স্রোত।
শেষবার ভেসে এলো—
"যত পথের বাঁধা,
সবই তো কালো সাদা,
কবে ঠিকানা পেয়ে হবে রঙীন।
চেনা নামেরই ডাকে,
আমি কি পাবো তাকে,
কবে রে আসবে সে রোদেলা দিন..."
গান শেষ হতেই চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। যেন প্রতিটি মানুষ নিজের ভেতরের গভীরে ডুবে গেছে। শিফার চোখে অশ্রু জমে উঠেছিল, কিন্তু সে মাথা নিচু করে রইলো।
তীব্র দাঁড়িয়েছিল স্থির হয়ে, বুকের ভেতরে এক অচেনা কষ্ট, এক অনুচ্চারিত অনুভূতি নিয়ে। ঠোঁট নড়লো তার অজান্তেই—
-"প্রণীতা... আমাকে ভালোবেসো না। এই পথে পা দেবার আগে থেমে যাও। এই বুকে তোমার মতো নিষ্পাপ ফুলের জন্য জায়গা নেই, এখানে ঢুকলে তা চূর্ণ হয়ে যাবে। আমি চাই না তোমার কোমলতা ধ্বংস হোক, চাই না তোমার হাসি কখনো কষ্টে মিলিয়ে যাক। দূরে থেকো, যেন তোমার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকে, যেন তোমার হৃদয় না ভাঙে। আমি তোমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নই। আমার হৃদয় অপবিত্র, সেখানে তোমাকে জায়গা দিয়ে তোমাকে অপবিত্র করতে চাই না, আমার পবিত্র ফুল।"
.
.
.
শিফার গান শেষ হতেই মুহূর্তটা আবারও নিস্তব্ধতায় ভরে গেল। বাতাসে যেন শুধু চাঁদের হালকা আলো আর আগুনের খোঁচা ভেসে চলল। শিফা তা লক্ষ্য করলো। অগোচরে নিজের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে সে সোহার দিকে হালকা তাকিয়ে বলল—
-"এবার তোমার পালা!"
সোহা চমকে উঠলো। হালকা লজ্জা ও আতঙ্ক মিশিয়ে শিফার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল—
-"আমি গান পারি না, শিফা।"
সাবা মৃদু হেসে বলল—
-"সবাই গেয়েছে। তুইও যেমন পারিস গা আপু।"
সাবার কথায় তাল মিলিয়ে উপস্থিত সবাইও সমর্থন জানালো—
-"এখানে কেউ প্রোফেশনাল নয়। তাই তুমি গাও। কোনো সমস্যা নেই।"
সোহা অসহায় চোখে চারপাশের মানুষদের দিকে তাকালো। অদৃশ্য একটা চাপ, লজ্জা আর উত্তেজনার মিশ্রণ তার দেহে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাস থমকে গেলো, তারপর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সব দ্বিধা ও ভয়কে ছেড়ে দিতে চাইছে।
চাঁদের আলোয় ভেজা সেই প্রাঙ্গণ যেন এক ধাক্কায় নীরব সঙ্গীতের আয়োজন হয়ে উঠল, সবার চোখে প্রত্যাশা, মৃদু উত্তেজনা আর অদ্ভুত শান্তি। সবার জোরাজোরিতে সোহা গান ধরলো—
"হো আফরিন দম আফরিন দম
দমদামদম আফরিন দম
ইশক পেহলি শ্বাস ভি আওর
ইশক হি হ্যায় আখরি দম"
ঠিক সেই মুহূর্তে এলো ওরহান। এলোমেলো পা ফেলে ধীরগতিতে হাঁটছে। সোহা চোখ বন্ধ করে গাইছে, তার কণ্ঠস্বর যেন চারপাশের বাতাসকেও মুগ্ধ করে তুলছে। তীব্র দূরে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সেই চোখে যেন অদৃশ্য কোনো মায়ার ছোঁয়া। পাশে বসে থাকা সকলে নিঃশ্বাসরুদ্ধ বিস্ময়ে সোহাকে দেখছে।
"তুজহকো জাহাঁ পে আপনা
দিল য়ে দিয়াঃ থা মৈনে
দিল তোদনে উস জাগাহ
পর হি বুলায়া মুজহকো"
ওরহানের পা হঠাৎ থমকে যায়। দূর থেকে সে তাকিয়ে থাকে তার বিষরাণীর দিকে। আজ আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, সেই চাঁদের শুভ্র আলো সোহাকে যেন আরও আবেদনময়, আরও অলৌকিক করে তুলেছে।
"তারাস নহি আয়া তুজহকো, তারাস নহি আয়া তুজহকো
খুদগরজ ইশক য়ে তেরা, সামঝ নহি আয়া মুজহকো"
ঠিক তখনই, ঠাস করে কোনো ভারী বস্তু পড়ার শব্দে গান থেমে যায়। সবাই একসাথে চমকে উঠে পেছনে ঘুরে তাকায়। মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। বিস্ময় আর আতঙ্কের মিশ্রণে বাকরুদ্ধ হয়ে থাকে সবাই। অন্ধকারে ভারী নীরবতা নেমে এসেছে। বাতাসে শীতল গুমোট, যেনো প্রকৃতিও দম আটকে তাকিয়ে আছে সামনে ঘটে চলা দৃশ্যটির দিকে।
ওরহান মাটিতে লুটিয়ে আছে। অন্ধকারের ঘন চাদরে তার চেহারা স্পষ্ট নয়, শুধু অস্পষ্ট ছায়ায় বোঝা যায়, কেউ একজন নিথর দেহে পড়ে আছে। উপস্থিত সকলে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে, দৃষ্টির তীক্ষ্ণতায় যেনো অন্ধকার ভেদ করতে চায়।
হঠাৎই নীরবতার বুক চিরে এক হাহাকার ভেসে ওঠে, সোহার কণ্ঠে, ভয়ানক বেদনায় কাঁপা এক চিৎকার—
-"ওরহান!"
সবাই একসঙ্গে আঁতকে ওঠে। চমকে যায় চারপাশ। দৃষ্টি ফিরে যায় সোহার দিকে, তারপর আবার পড়ে থাকা সেই মানবটির দিকে। মুহূর্তেই সবার বুকের ভেতর শীতল আতঙ্কের ঝড় বয়ে যায়।
সোহা তখন আর স্থির থাকতে পারে না। শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরেই হোঁচট খেতে খেতে ছুটে আসে সামনে। কেঁপে ওঠা হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকা ওরহানের মাথা তুলে নেয় সযত্নে নিজের কোলে। তার চোখ ছলছল করছে, ঠোঁট কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে অদ্ভুত শঙ্কায়।
সোহার পিছুপিছু বাকিরাও দৌড়ে আসে। তীব্র নিজের ফোন দ্রুত পকেটে গুঁজে ছুটে আসে, শিফা হঠাৎই ওরহানের নিথর দেহ দেখে হাহাকার ছুঁড়ে দেয়—
-"দাদাভাই!"
চারপাশের পরিবেশ হঠাৎ যেনো ভারী হয়ে ওঠে। বাতাসে শোকের চাপা গন্ধ, ভয়ের ছায়া আর অশ্রুর আর্দ্রতা মিশে যায়। নিস্তব্ধ রাতটিও যেনো থমকে দাঁড়ায়, কেবল মানুষের আর্তনাদই ছিন্ন করে সেই শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ।
রক্তে পুরো ফ্লোর লাল হয়ে গেছে। ঘন গন্ধে বাতাস ভারী, যেন শ্বাস নেওয়াটাই কষ্টকর। শিফা ছুটে এসে নিথর দেহটার পাশে বসে পড়ে। কাঁপা হাতে ভাইয়ের হাত আঁকড়ে ধরে রাখে, যেন ছাড়তে চাইছে না কখনো। ওসমানও দৌড়ে এসে আরেক হাত শক্ত করে ধরে ফেলে। এদিকে সাবা ছুটে এসে সোহার পেছনে দাঁড়ায়, কাঁপা শরীরটা আঁকড়ে ধরে বোনকে সামলানোর চেষ্টা করে। একে একে সবাই ভেঙে পড়ে, ঘিরে বসে ওরহানকে ঘিরে এক বৃত্তের মতো।
শিফা হেঁচকি তুলে কাঁদছে, বুকের ভেতরকার ব্যথা যেন শব্দ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। ওসমানের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
-"কি হয়েছে দাদাভাই? কে করেছে তোমাকে আঘাত? এইসব কিভাবে ঘটলো?"
ওরহানের শরীর ক্ষতবিক্ষত। মুখের ওপর জখমের দাগ, ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়িয়ে নামছে। কপাল চিরে গেছে, সেখানে থেকে অঝোরে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পেটে গভীর ছুরির আঘাত, যেন বাঁধ ভেঙে যাওয়া নদীর মতো অবারিত রক্তক্ষরণ। শরীর নিস্তেজ, প্রাণশক্তি নিঃশেষিত।
ভাই-বোনের আঁকড়ে ধরা হাত ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নেয় ওরহান। দুর্বল শরীর, ভেঙে পড়া দৃষ্টি। সোহা নিথর পাথরের মতো বসে আছে, কোলে শুয়ে আছে ওরহানের মাথা। সোহার এক হাত ওরহান নের বুকে রাখা। তার চোখে অশ্রু জমাট বেঁধেছে, ঠোঁট কাঁপছে, অথচ কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই।
হঠাৎই ওরহান তার রক্তাক্ত হাত বাড়িয়ে দেয়। সেই হাত কাঁপতে কাঁপতে সোহার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। রক্তের আর্দ্রতায় ভিজে ওঠে সোহার আঙুল। ওরহানের রক্তাক্ত হাত ধীরে ধীরে সোহার গালে স্পর্শ করে। অন্যহাত সোহার হাতের ওপরে রাখা।
রক্তাক্ত ঠোঁট নড়ে ওঠে, ভাঙা শ্বাসের ফাঁকে। কণ্ঠস্বর দুর্বল, তবু গভীর বেদনার ভারে কাঁপছে কাপতে কাপতে ওরহান বিস্ফারিত বেদনায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল—
-"ক্ষমা করুন আমাকে... আমি অন্যায় করেছি আপনাকে ধোঁকা দিয়ে। আমি ইচ্ছে করে করিনি... আমার উপায় ছিল না। আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি... বিশ্বাস করুন... আমার ভালোবাসায় এক বিন্দু মিথ্যে ছিল না। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মানুষ মিথ্যে কথা বলে না..."
শব্দগুলো নিভে যাওয়া প্রদীপের শেষ শিখার মতো কেঁপে ওঠে। এক নিঃশ্বাসের ভারে, এক অশ্রুর তীব্রতায় প্রতিটি বাক্য যেন বুকে আঘাত হানে উপস্থিত সবার। সোহার চোখে ঝাপসা অশ্রু নেমে আসে, তার দু’হাত রক্তে ভিজে ওঠে। শিফা কাঁদতে কাঁদতে হাহাকার ছুঁড়ে দেয় রাতের বুক ফাটিয়ে, আর ওসমান নিঃশব্দে আঁকড়ে ধরে ভাইয়ের শীতল হতে থাকা হাত।
তারপর—আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না ওরহান। মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর। একসময় যে শরীর জীবনের উচ্ছ্বাসে দৌড়ে বেড়াত, হাসতো, লড়তো, সেটি এখন নিথর, রক্তে ভিজে থাকা এক দেহ মাত্র।
চারপাশ নিস্তব্ধ। বাতাস থেমে গেছে, সময়ও যেন স্তব্ধ। চারদিকে শুধু কান্না, হাহাকার আর অব্যক্ত মৃত্যুর গুমোট ছায়া সকলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।