ফিরে দেখা

পর্ব - ২০

🟢

মিরহা ও ইহাব চিরকুটটি পড়ে মুহূর্তেই হতবাক হয়ে গেল। সোহার ক্ষতি করার ইঙ্গিত মিরহাকে বিভ্রান্ত করে তুলল। সে কিছুই বুঝতে পারল না। প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে রইল ইহাবের দিকে। ইহাব সব জানে। ওরহান আগেই তাকে জানিয়েছিল গত রাতে সোহার ওপর হওয়া আক্রমণের কথা। সেই সূত্রে ইহাব নিজেও খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছে। মিরহার কৌতূহল মেটাতে সবকিছু খুলে বলল সে।

মিরহার কণ্ঠে ক্ষোভ ভেসে উঠল—

-"আপনার স্যারের ধারা কিছু হবে না। সে সোহার সাথে কি করেছে আমি সব জানি।"

ইহাব শান্ত গলায় জবাব দিল—

-"ভুল বুঝছেন, মিস মিরহা। ম্যাম আপনাকে যতটুকু বলেছেন, তা কেবল তাঁর সাথে যা ঘটেছে তাই। এর পেছনের আসল সত্য তিনি যাচাই করেননি।"

মিরহার বিস্ময় থামল না—

-"তাহলে আপনার স্যার কেন সত্যিটা বলেননি?"

ইহাব ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করল—

-"বোঝার চেষ্টা করুন, ম্যাম এখন স্যারের ওপর ভীষণ রাগান্বিত। এই মুহূর্তে স্যার যাই বলবেন, তাঁর কাছে সবই মিথ্যা মনে হবে। তাই স্যার নীরব রয়েছেন। সময়মতো তিনি সব পরিষ্কার করে দেবেন। আপনার মোটা মাথাটাকে একটু বিশ্রাম দিন, এত ভাববেন না। আর ম্যামকে কিছু জানবেন না।"

মিরহার চোখ রাগে চকচক করে উঠল—

-"আপনি আমাকে মাথা মোটা বললেন?"

ইহাব কোনো উত্তর দিল না, ঠোঁটের কোণে কেবল একটুখানি মিটিমিটি হাসি। সেই হাসি মিরহার রাগ আরও বাড়িয়ে দিল। হঠাৎই ধপ করে এক ঘুষি বসিয়ে দিল ইহাবের বাহুতে, তারপর অভিমানী ভঙ্গিতে সরে গেল সেখান থেকে।

.

.

.

শিফার রুম থেকে বেরিয়ে সোজা তীব্রর রুমে গিয়েছিল সোহা, তার এমন আচমকা চলে আসার কারণ জানতে। কিন্তু তীব্র কারো সাথেই কথা বলছে না দেখে সে আর কথা বাড়ায়নি, নিঃশব্দে ফিরে আসছিল।

রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিল ওরহান। কপাল কুঁচকে তার চোখ সোজা সোহার দিকে, চোখের ভাষা বলছিল, সে রেগে আছে। সোহা পাত্তা দিল না, পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু ওরহান হঠাৎ তার বাহু চেপে ধরে টেনে নিয়ে গেল নিজের রুমে।

সোহার মুখ তৎক্ষণাৎ লাল হয়ে উঠল রাগে—

-"সমস্যা কী আপনার? এইভাবে টেনে আনলেন কেনো?"

ওরহান ঘুরে দাঁড়াল তার দিকে, গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

-"তীব্রর সাথে তোমার এত মাখামাখি সম্পর্ক কেনো?"

-"তার কৈফিয়ত আপনাকে দিতে বাধ্য নই আমি!"

-"সোহা!"

-"ডোন্ট শাউট, মিস্টার খান।"

ওরহান দু’পা এগিয়ে এলো, সোহা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু’পা পিছিয়ে গেল। প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে, টানটান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ওরহান বলল—

-"তুমি আমার বউ। আমার সব জানার অধিকার আছে।"

-"কিসের বউ? ধোঁকা দিয়ে কাবিননামায় সই করালেই কেউ স্বামী হয়ে যায় না। ইসলামিক শরীয়তে এটা কোনো বিয়ে না। আর যখন-তখন আমাকে ছুঁবেন কেনো?"

-"ইসলামিক শরীয়ত মেনে আবারও বিয়ে করবো। তবে কাগজে-কলমে তুমি আমার বউ, এটা কেউ অচ্যুত ও অবিনাশী করতে পারবে না।"

একটু থেমে ওরহান আবারও বলে—

-"আমার ছোঁয়া খারাপ লাগে?"

-"ঘেন্না করি আপনাকে। খারাপ লাগবেই।"

-"মানিয়ে নাও। আমার ছোঁয়ায় তোমাকে সারাজীবন কাটাতে হবে।"

— "সারাজীবন কে কাটাবে আপনার সাথে?"

ওরহান আবার দু’পা এগিয়ে এল। এবার সোহা আর পিছুতে পারল না, পিঠ গিয়ে ঠেকল দেয়ালে। তার সামনে দাঁড়িয়ে ওরহান ফিসফিস করে বলল—

-"তুমি ভালো করেই জানো আমি কেমন। তোমার চারপাশে আমি কোনো ছেলেকেই সহ্য করতে পারি না। সেখানে তুমি মিডিয়ার সামনে তীব্রর গায়ের ওপর পড়ে ছিলে শান্তিতে?"

-"ওটা এক্সিডেন্ট ছিল!"

-"আমার ছোঁয়া তোমার ঘেন্না লাগে, কিন্তু তীব্রর ছোঁয়া ভালো লাগে?"

-"ওরহান!"

সোহা চিৎকার করে উঠল, কণ্ঠে রাগ, ভয় আর অপমানের তীব্র মিশ্রণ।

ওরহান স্মিত হাসল। সরাসরি সোহার চোখে চোখ রেখে বলল—

-"পৃথিবীতে আমি ব্যথিত যত পুরুষ আছে, তাদের সবার ছোঁয়া তোমার কাছে বিষের মতো বিষাক্ত, এ কথা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে, বিষরানী?"

সোহা নীরবে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ওরহান সামান্য ঝুঁকে নরম স্বরে বলল—

-"এত রাগ, এত ঘৃণা... সব আমার ওপরই?"

সোহা ধীরে মুখ তুলে তাকাল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"কালকের জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনি সত্যিই ঘৃণার উপযুক্ত। আমার সাথে কি করেছিলেন, মনে নেই?"

ওরহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সোহার সব অভিযোগ শুনবে, সব ভাঙা সেতু মেরামত করবে। তাকে ছাড়া থাকার যে যন্ত্রণা, তা সোহা জানুক।

সোহা আবার প্রশ্ন করল—

-"কি হলো, কথা বলছেন না কেন?"

ওরহান শান্ত গলায় উত্তর দিল—

-"ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করা ছাড়া আর কোনো অন্যায় কি করেছি, জান?"

সোহা ঠোঁটে বিদ্রূপের রেখা টেনে বলল—

-"কিছু করেননি? লিজা কেন আমাকে চড় মারল? কেন বলল আপনি তার প্রেমিক? কেন সেই ভিডিও দেখল সে? আর মিহিরিমা? কাবিননামার জোরে আমার ওপর অধিকার ফলিয়ে, বিবাহিত হয়েও কেন অন্য নারীকে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন?"

ওরহান নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর শীতল কণ্ঠে বলল—

-"তার শাস্তি লিজা পেয়েছে। আমি কোনো দিনই তার প্রেমিক ছিলাম না। আর যে ভিডিও তোমাকে দেখানো হয়েছিল, তা ছিল অসম্পূর্ণ, পুরোটা তোমাকে দেওয়া হয়নি। মিহিরিমাকে বিয়ের কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না, ওটা ছিল বাবার একতরফা ঘোষণা, আমাকে না জানিয়েই। তবে ধোঁকা দিয়ে তোমাকে বিয়ে করার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী... ক্ষমা করো, জান।"

সোহা হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ওরহান বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হাসি থামিয়ে সোহা স্থির দৃষ্টিতে ওরহানের চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল—

-"আপনি আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছেন। আমি বারবার বলেছিলাম, বাবাকে বলুন বিয়ের কথা। কিন্তু আপনি? সম্মানহানি করার জন্য ইচ্ছে করেই আমায় ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করলেন। ভালোবাসার মিথ্যে নাটক করলেন। প্রতারণা করলেন।"

সে কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। কণ্ঠে জমাট ব্যথা—

-"যদি এই কাজটা আমি করতাম... যদি আমি আপনাকে ধোঁকা দিতাম, তাহলে কি আপনি আমাকে ক্ষমা করতেন? নাকি ভালোবাসতেন?"

ওরহান মাথা নিচু করে রইল। ঠোঁট নড়ল না, গলা দিয়ে একটিও শব্দ বেরোল না।

সোহা ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বলল—

-"কখনোই পারতেন না। উল্টো আমায় ঘৃণা করতেন, আর খুঁজে বের করে প্রতিশোধ নিতেন। যেখানে একই ভুল আমি করলে আপনি ক্ষমা করতেন না, সেখানে আপনি কি আমার ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য?"

ওরহানের মাথা তখনও নত— যেন মুখ দেখানোর সাহস নেই।

সোহা শান্ত অথচ কঠিন স্বরে আবার বলল—

-"যান, আমি আপনাকে ক্ষমা করলাম। কিন্তু এই ক্ষমার বিনিময়ে আপনি সোহাকে হারালেন। মানুষ জীবনে সবকিছু পায় না, কিছু অপূর্ণতা থাকতেই হয়, তবেই জীবনের আসল স্বাদ মেলে।"

ওরহান স্থির দাঁড়িয়ে রইল, মাথা নত, চোখে হাহাকার, হৃদয়ে নিঃশব্দ ভাঙনের প্রতিধ্বনি। সোহা তার হবে না তাকে ছেড়ে দেবে কথা টি শুনে মুহূর্তে রেগে গেলো। চোখের সাদা অংশ লালবর্ণ ধারণ করলো। মাথা তুলে তাকালো সোজা সোহার চোখের দিকে। ওরহানের দৃষ্টি দেখে সোহা ঘাবড়ে গেলো।

ওরহান রাগে ফেটে পড়েছে। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে সোহাকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। চোয়াল শক্ত করে ধরে নিজের মুখটি একেবারে সোহার মুখের কাছে এনে, চাপা কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বলল—

-"নাটক করতে যাইনি আমি! প্রতিশোধের ইচ্ছা ছিল, স্বীকার করছি... কিন্তু কিছুই করিনি। না প্রতারণা করেছি, না অভিনয়, না প্রতিশোধ। তোর সাথে যা করেছি, সবটাই করেছি নিজের ইচ্ছেতে, মন থেকে।

তোর বাবাকেও আমি এক মুহূর্তের জন্য অপমান করিনি, যেখানে এই ওরহানের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ অপমান করে গেলে খালি হাতে ফেরে না। শুধু তোকে সম্মান জানাতেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছি। আমি কোনো অন্যায় করিনি, কোনো ছলচাতুরী করিনি।

তাই তোকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, তোর এই ছেলেমানুষি রাগ-অভিমান, এই tantrum আমি আর সহ্য করব না! তুই আমার, শুধুই আমার। জোর করে বিয়ে করি, ধোঁকা দিয়ে করি, যেভাবেই হোক না কেন, এখন তুই শুধুই এই ওরহানের। অন্য কোনো পুরুষ তোকে একবারের জন্যও চোখ তুলে দেখার অধিকার রাখে না, সেই অনুমতি আমি কাউকেই দিইনি।

তুই আমার মানে, এই ওরহানের সম্পূর্ণ অধিকারভুক্ত, আমার শ্বাসের মতো, আমার রক্তের মতো, আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।"

রাগে ওরহানের হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, দমবন্ধ করা উত্তাপে কাঁপছে তার সমগ্র দেহ। চোয়াল শক্ত করে ধরা, সেই ব্যথায় সোহার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। তা লক্ষ্য করেই ওরহান হঠাৎ সোহাকে ছেড়ে দেয়, যেন নিজেরই ভেতরে চমকে ওঠে। মুহূর্তেই তাকে টেনে নেয় নিজের বুকে, আকুল বেদনায় ভরা কণ্ঠে বলে—

-"কেনো বোঝেন না আমাকে? কেনো এমন বাধ্য করেন আপনাকে আঘাত করতে? ভালোবাসি আপনাকে... আমার ভালোবাসা আমার মতোই বিষাক্ত, তবুও তা আপনার জন্যই বেঁচে আছে। আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারি না। গত চার বছর আমি পাগলের মতো খুঁজেছি আপনাকে... পাইনি। কেনো আমাকে ছেড়ে দিতে চান?"

সোহা কাঁপা গলায়, কান্নায় ভিজে কণ্ঠে উচ্চারণ করল—

-"ধোঁকা দিয়েছেন আমাকে... বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন আপনি।"

ওরহান ধীরে সোহাকে বুক থেকে সরিয়ে সামনে দাঁড় করাল। দুই হাতে তার মুখ আগলে ধরে আশা ও ব্যথা মিশ্রিত গলায় বলল—

-"ক্ষমা করুন... আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। আমার উপায় ছিল না। আপনার বাবা কখনোই আপনাকে আমার হাতে তুলে দিতেন না। আমার আর কোনো পথ ছিল না। বিশ্বাস করুন, মিহিরিমাকে আমি কোনোদিন বিয়ে করতে চাইনি, ওটা ছিল কেবল আব্বুর ইচ্ছা, তার একতরফা ঘোষণা। আমি তো কখনোই এটাকে এঙ্গেজমেন্ট বলে মানিনি।"

সোহা চোখ ফিরিয়ে বলল—

-"ছাড়ুন আমায়... যেতে দিন!"

ওরহান ধীরে হাত ছেড়ে দিল, যেন ভেতরে ভেতরে নিজেকেই শূন্য করে দিল। ধীরে খাটের ধারে গিয়ে বসে পড়ল। সোহা ঘুরে দরজার দিকে এগোতেই, ওরহানের কণ্ঠ আবার কেঁপে উঠল—

-"ভালোবাসি আপনাকে! আমার আল্লাহ জানেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। আপনাকে ফিরে আসতেই হবে, এই ওরহানের কাছে। ফিরে দেখা হয়েছে আমাদের, এটা কাকতালীয় নয়। আমি চাইলে আপনাকে জোর করে নিজের কাছে রাখতে পারি, কিন্তু আপনার প্রতি সম্মান রেখেই তা করিনি। আমাকে বাধ্য করবেন না। আমি এখন যা-ই বলি, আপনার কাছে মিথ্যে মনে হবে। যাদের কথা আপনি বিশ্বাস করবেন, তারাই আপনাকে সত্যিটা বলবে। ততদিন, অপেক্ষা করুন আমার জন্য।"

ওরহানের চোখে তখনো ভিজে ধোঁয়া, কণ্ঠে গলিত অনুনয়, আর বুকের ভেতরে, ভালোবাসার এক অসহায় গর্জন।

.

.

.

সারাদিন কারো বাইরে যাওয়া হলো না আর। দিনটি যেন শ্বাসরুদ্ধকর এক অধ্যায়ের মতো কেটে গেল, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, নীরবতায় মোড়া। প্রত্যেকে নিজের ঘরে নিঃশব্দে সময় পার করেছে, যেন দেয়াল আর ছায়া ছাড়া আর কারো সঙ্গ পায়নি। দুপুরে কারোর মুখে এক টুকরো খাবার পর্যন্ত ওঠেনি।

এখন রাত। আগামীকাল সবাই ঢাকা ফিরে যাবে। আজ রাতের জন্য আগে থেকে ঠিক করা ছিল, বারবিকিউ, হাসি-মজা, আর কিছু মধুর স্মৃতি গেঁথে নেওয়ার আয়োজন। বাইরে ততক্ষণে টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করেছে লাইট, ধোঁয়ার হালকা গন্ধ মিশে আছে বাতাসে। সবাই সেই প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত, কেউ মেরিনেড করছে, কেউ কাঠিতে গেঁথে নিচ্ছে মাংসের টুকরো, কেউ আবার চুল্লির আগুন ঠিক করছে।

এই ব্যস্ততার ভিড়ের বাইরে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তীব্র ও সোহা—তাদের মধ্যে গোপন, গম্ভীর কিছু কথা চলছে। অন্যদিকে ওসমান হালকা বিরক্তি জাগানো ভঙ্গিতে সাবাকে উত্যক্ত করছে। আর শিফা, ওরহানের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে, জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে তীব্র ও সোহাকে, দৃষ্টি যেন কথার চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ।

ওরহান বেশিক্ষণ আর এই নীরব চাপ সহ্য করতে পারল না। ধীর পায়ে হাঁটা ধরল সোহার দিকে। তার এই গতিবিধি বুঝে শিফা হঠাৎ সবার মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাল। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল কিন্তু পরিকল্পিত হাসি নিয়ে বলল—

-"সবাই এদিকে আসো, আমরা একটা খেলা খেলব।"

শিফার ডাক শুনে সবাই আসতে লাগল। সারাদিনের বিষণ্নতা কাটাতে, শেষ রাতের কিছু মুহূর্ত স্মৃতিতে বেঁধে রাখতে কেউই না করল না। হয়তো ভেতরে ভেতরে সবাই চায়, বিদায়ের আগে একটু হেসে নেওয়া যাক।

শিফা খেলাটার নিয়ম বুঝিয়ে দিল—চিরকুটে লেখা থাকবে কিছু প্রশ্ন বা কাজ। যেই যেটা তুলবে, তাকে সেটাই করতে হবে। কথাটা শোনামাত্র হালকা উত্তেজনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল মুখে মুখে।

অল্প সময়ের মধ্যেই সবাই গোল হয়ে বসল। এক পাশে—তীব্র, সোহা, তারপর ওরহান। ওরহানের পাশে সাবা, তারপর ওসমান, তার পর মিরহা, ইহাব, আকাশ, আর শেষে শিফা। মাঝখানে রাখা হলো একটি বড় কাঁচের বোল, যার ভেতরে সাবা আর শিফা ভরছে নানা রঙের ছোট ছোট ভাঁজ করা চিরকুট, প্রতিটিই যেন অজানা উত্তেজনার প্রতিশ্রুতি।

বাতাসে বারবিকিউয়ের ধোঁয়া, লাইটের নরম ঝিলিক, আর গোপন গোপন দৃষ্টি বিনিময়, সব মিলিয়ে রাতটি যেন নতুন নাটকের মঞ্চে পরিণত হলো।

শিফা হাতে থাকা বোতলটি ধীরে ঘুরিয়ে দিলো। ঘূর্ণির মতো ঘুরতে ঘুরতে বোতল থেমে গেল ইহাবের দিকে নির্দেশ করে। মুহূর্তেই চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল, হাততালি বেজে উঠল। নিয়মমতো ইহাব একটি চিরকুট তুললো। তাতে লেখা—

-"নিজের পাশে বসে থাকা রমণীকে প্রোপোজ করতে হবে।"

ইহাবের মুখে বিন্দুমাত্র ইতস্ততা নেই। যেন এই মুহূর্তটির জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। উঠে দাঁড়িয়ে মিরহার সামনে গিয়ে স্থির দৃষ্টিতে বলল—

-"ভালোবাসি আপনাকে। আমার গার্লফ্রেন্ড হবেন?"

সবাই বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাল। সোহা অবাক হয়ে বলে উঠল— "জিএফ বানানোর কথা বলে দিলো ইহাব ভাই!"

মিরহা প্রথমে হেসে খেলা ভেবে “হ্যাঁ” বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইহাব হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। গভীর স্বরে বলল—

-"ভেবে চিন্তে উত্তর দিবেন, মিস মিরহা। আমি কিন্তু খেলার জন্য বলিনি। আমি সত্যিই আপনাকে ভালোবাসি। উত্তর এখন না দিলেও চলবে।"

মিরহার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল তার মুখে। বিস্ময়ে যেন কথা হারিয়ে ফেলল সে। চারপাশে হাসাহাসি শুরু হলো, কেউ শিস বাজালো, কেউ করতালি দিলো। ইহাব ধীর পায়ে ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসল। মিরহা তখনও কোনো উত্তর দেয়নি।

এরপর একে একে বোতল ঘুরতে লাগল সবার দিকে।

আকাশের ভাগ্যে এল— নাচতে হবে।

ওসমানকে বলা হলো— গোসল করতে হবে।

সাবার জন্য চ্যালেঞ্জ— হোটেল থেকে কিছু চুরি করে আনতে হবে।

শিফার হাতে এল প্রশ্ন— পৃথিবীতে দেখা সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষের নাম বলো।

শিফা নির্দ্বিধায় তীব্রর নাম উচ্চারণ করল। সবাই এক মুহূর্ত থমকে গেল। ওরহান ঠাট্টা করে বলল—

-"আমার থেকেও বেশি?"

শিফা হেসে উত্তর দিল—

-"তুমি তো দাদাভাই। তোমার সৌন্দর্য পৃথিবীর বাহিরে ছড়িয়ে আছে।"

এই উত্তর শুনে হাসির ঝড় বয়ে গেল। এরপর বোতল ঘুরে পড়ল তীব্রর দিকে। তার প্রশ্ন— পছন্দের কেউ আছে কি না? তীব্র সোজাসুজি “না” বলে দিলো।

শেষে বোতল এসে থামল সোহার সামনে।

তার জন্য প্রশ্ন—

-"তার জীবনে কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে কি না?"

সোহা একটুও ইতস্তত না করে স্থির কণ্ঠে বলল—

-"আমি বিধবা।"

শব্দটি যেন হঠাৎ নীরবতার বুক চিরে বেরিয়ে এলো। উপস্থিত সবাই কেশে উঠল, শুধু তীব্র ছাড়া। সে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সোহার দিকে।

সাবা চুপিচুপি ওরহানের কানে কানে ফিসফিস করে বলল—

-"জীবিত জামাইকে মৃত বানিয়ে দিলো ভাইয়া... কিছু বলবেন না?"

ওরহানের ঠোঁটের কোণে তীব্র ব্যঙ্গ, কণ্ঠে ধীর বিষ—

-"বলব শালিকা... একাকী ভাবে। ধৈর্য ধরো।"

সাবা মিটিমিটি হেসে ওঠে, অথচ ওরহানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে গিয়েছে সোহার দিকে। রাগে তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠছে। জীবিত অথচ স্ত্রী তাকে মৃত ঘোষণা করে বসেছে, এর চেয়ে বড় অপমান কী হতে পারে!

তীব্র গলাখাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল—

-"বিধবা মানে? আপনার কি বিয়ে হয়েছিল?"

সোহা প্রথমে এক ঝলক তাকাল ওরহানের দিকে। তার মুখভঙ্গি দেখে ভেতরে ভেতরে আনন্দে ভরে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে তীব্রর দিকে ফিরল—

-"হ্যাঁ। এক খাটাস লোক আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছিল। তারপর আমি তাকে খুন করে দেই।"

শীতল অথচ নির্লিপ্ত স্বরে কথাটি বলে সোহা আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। একবারও পেছনে না তাকিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল।

সবার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল তার প্রস্থানপথে। তীব্র যেন কিছুই বুঝতে পারল না। শিফা, সাবা, ওসমান, তিনজনেই ওরহানের নাজেহাল মুখ দেখে হাসি চেপে রাখতে পারল না। শেষমেশ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। ওরহান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, মুখে ক্ষোভের তীব্রতা—

-"তোদের সব কোটাকে দেখে নেব আমি! মজা নিচ্ছিস তোরা? নে, বিয়ের পর তোদের নাজেহাল অবস্থা দেখে আমিও মজা নেব!"

রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল সে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বিড়বিড় করে বলল—

-"সালার কপাল! বিয়ে করেছি একটা, না বউকে ছুঁতে পারি, না কাছে রাখতে পারি, উল্টো বউ আমায় মৃত ঘোষণা করে বেড়ায়! দেখাচ্ছি মজা।"

ওরহান সোহার রুমের দরজার সামনে এসে সজোরে ধাক্কা মারতে লাগল। প্রতিটি আঘাতে দরজার কাঠ কেঁপে উঠছে। বিরক্ত ও কিছুটা বিস্মিত হয়ে সোহা দরজা খুলে দিতেই, বজ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরহান তার ওপর। সোহা মুহূর্তেই হকচকিয়ে গেল।

ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল সে। নিঃশব্দে উল্টে দাঁড়াল, দৃষ্টি স্থির সোহার চোখে। ধীরে ধীরে তার দিকে এগোতে লাগল। চলতে চলতে গায়ের কোর্ট খুলে ফেলল, হাতের এক ঝটকায় টাই ছুড়ে মারল মেঝেতে। একে একে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে কণ্ঠে আগুন ঝরল—

-"তুমি বিধবা? আমি মৃত?"

সোহা অজান্তে ঢোক গিলে ফেলল। তার ভেতরে যেন অজানা শঙ্কা কাঁপন ধরিয়েছে। ওরহানকে তার মোটেই স্বাভাবিক লাগছে না। চোখে অদ্ভুত এক জ্বালা, পদক্ষেপ দৃঢ় ও ভারী। ভয়ে ভয়ে সে পেছাতে লাগল।

কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করল—

-"কি করছেন আপনি? এগোচ্ছেন কেন? শার্টের বোতাম খুলছেন কেন?"

ওরহানের ঠোঁটে কঠিন ব্যঙ্গ—

-"তোমাকে শাস্তি দিতে। জীবিত স্বামীকে মৃত বানিয়ে দিলে কিভাবে তুমি?"

হঠাৎ ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে ওরহান সোহাকে ঠেলে দিল শীতল দেয়ালে। পিঠ ঠেকে গেল বরফ-ঠান্ডা কাঠের তৈরি দেয়ালে, সেই শীতলতা তার শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁপন তুলল। সোহা আতঙ্কে চোখ বিস্মৃত করে কিছু বলার জন্য অধর মেলতেই, বজ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরহানের ওষ্ঠ, তীব্র, দহনজ্বালা মিশ্রিত এক স্পর্শে।

এ চুম্বনে ছিল না কোনো কোমলতা, ছিল বহু বছরের অবদমিত ক্ষুধা, দমিয়ে রাখা আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ। তার ঠোঁট যেন তৃষ্ণার্ত মরুভূমির বালুকাবেলায় প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে ফেলেছে, কিন্তু সে ফোঁটা শুষে নেওয়ার তাড়নায় আর থামতে পারছে না। সোহার নরম, কাঁপা ঠোঁটের উপর নিজের সম্পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ওরহান, যেন প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি টানে সে শুষে নিতে চায় সেই তপ্ত সত্তা, যা এতদিন তার নাগালের বাইরে ছিল। প্রতিটি টানে, প্রতিটি চাপে যেন দাবি জানাচ্ছে, “তুমি আমার”।

সোহা প্রাণপণে তাকে ঠেলছে, বুকের মাঝে আঘাত করছে, নখের আঁচড় কাটছে তার কাঁধে। কিন্তু ওরহানের দেহ যেন পাথরে খোদাই করা মূর্তি, এক বিন্দুও নড়ছে না। তার গায়ে জমে থাকা উষ্ণতা ও নিশ্বাসের তাপ মিশে যাচ্ছে সোহার কাঁপা শ্বাসে। চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে, উত্তেজনা, ক্ষোভ, আর অব্যক্ত বাসনার ঘন গন্ধে পূর্ণ।

হঠাৎ বিরক্তি ও ক্ষুব্ধতা মিশিয়ে ওরহান ঠোঁট সরিয়ে নিল। ঝড়ের বেগে সোহার দুই হাত নিজের লোহার মতো হাতের মুঠোয় বন্দি করল, মাথার ওপর তুলে ঠেসে দিল ঠান্ডা দেয়ালে। তার আঙুলের চাপ এত প্রবল যে সোহা স্পষ্ট অনুভব করল, তার হৃদস্পন্দন যেন কবজির শিরায় ধুকপুক করে বাজছে।

ওরহানের চোখে তখন দহন, এক তীব্র ক্ষুব্ধ সমুদ্র, যার ঢেউ ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে। তার শ্বাস গরম বাতাসের মতো সোহার মুখে এসে লাগছে, কপালের শিরা টানটান। মুখোমুখি দাঁড়ানো সোহা হাঁপাচ্ছে, চোখে ভয়ের শিহরণ, কিন্তু তাতে মিশে আছে এক অনমনীয় রাগের আগুন। কণ্ঠ কাঁপছে, অথচ প্রতিটি শব্দ ধারালো অস্ত্রের মতো—

-"বারাবারি করছেন... ছেড়ে দিন আমাকে।"

কণ্ঠে ভয় ও প্রতিরোধের কম্পন, অথচ চোখে এক ঝলক অস্থিরতা।

ওরহানের ঠোঁটের কোণে তীব্র এক হাসি ফুটল। হাঁপাতে হাঁপাতে, গাঢ় ও কর্কশ স্বরে সে ফিসফিস করে বলল—

-"শ্‌শ্‌শ্‌... বেবি... তোমাকে তোমার প্রাপ্যই দিচ্ছি।"

তার গলার গভীরতা আর দমবন্ধ করা উষ্ণতা সোহার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ নামিয়ে দিল। ওরহান আবারও মুখ বাড়িয়ে আনল সোহার ঠোঁটের কাছে, কিন্তু সোহা তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নিল।

ওরহান এক মুহূর্ত থেমে তার সেই অবাধ্যতা লক্ষ্য করল, তারপর বিদ্রূপের মৃদু হাসি ফুটিয়ে সোহার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। ঠোঁটের নরম চাপ, গলার ধারে ছোট ছোট উষ্ণ চুম্বন, মাঝেমধ্যে হালকা কামড়, প্রতিটি স্পর্শে যেন অবরুদ্ধ করে ফেলছে তাকে। শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে সাথে সোহার বুক ওঠানামা করছে, আর ওরহানের নিঃশ্বাসের তাপ সেখানে মিশে গিয়ে মুহূর্তটিকে আরও দমবন্ধ করে তুলছে।

সোহা বারবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও ওরহানের মুঠি লোহার মতো অটল। সেই ঘনিষ্ঠতার মধ্যে, ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে গভীর স্বরে ওরহান বলল—

-"ভালোবাসি, মিসেস ওরহান খান শাহির। আমাকে অস্বীকার করার কোনো পথ আমি রাখিনি তোমার জন্য। মৃত হই বা জীবিত, তুমি পুরোপুরি আমার। আর এই ওরহানের সত্তার প্রতিটি বিন্দু, প্রতিটি স্পন্দন, তোমারই।"

তার কণ্ঠে ছিল অদম্য অধিকারবোধ, চোখে ছিল এক অগ্নিদীপ্ত ভালোবাসা, যা প্রতিরোধের সব পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

ওরহানের খসখসে দাড়ি ঘষে লাগছে সোহার কোমল ঘাড়ে। মাঝে মাঝে তার তীক্ষ্ণ কামড়ে ব্যথায় কেঁপে উঠছে সোহা, চোখ-মুখ যন্ত্রণায় কুঁচকে গেছে। ওরহানের কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ বাণের মতো এসে আঘাত করল তার মনে। সোহা স্থির হয়ে গেল, ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল তার দিকে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, দৃষ্টি সরে গেল দরজার দিকে। চোখে পড়ল, কেউ একজন নিঃশব্দে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। পুরো শরীর কালো পোশাকে মোড়া, মুখও ঢেকে রাখা।

হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। পরক্ষণেই সোহা সমস্ত শক্তি জড়ো করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল—

-"কে... কে ওখানে?"

Story Cover